MMR ভ্যাক্সিন আর অটিজম বিতর্ক

1098463_10151663597443521_1738257782_n
ছবি: Jeryl Lynn Hilleman with her sister, Kirsten, in 1966 as a doctor gave her the mumps vaccine developed by their father ( Dr. Maurice Hilleman)

বিস্ময়করভাবে এম এম আর (MMR: Mumps,Measles,Rubella Vaccine) ভ্যাক্সিন আর অটিজম এর সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক এখনও চলছে। সকল বৈজ্ঞানিক প্রমানের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে শক্তিশালী ভ্যাক্সিন বিরোধী গ্রুপ এর মদদ দিয়ে যাচ্ছে এখনও। সম্প্রতি ফেসবুকেও একটি নিউজ শেয়ার করা হয়েছে, সেখান থেকেই আসলে এই লেখার সুত্রপাত। যারা এই বিতর্কটি সম্বন্ধে জানেন না তাদের জন্য শুরু থেকে শুরু করাই ভালো।

ঘটনাটি সুচনা হয়েছিল একটি বিতর্কিত গবেষনা পত্র প্রকাশের সাথে। সেটি লিখেছিলেন বৃটিশ একজন ডাক্তার, যার নাম অ্যান্ড্রু ওয়েকফিল্ড (Andrew Wakefield)।তিনি একটি গবেষনায় দাবী করেন MMR ভ্যাক্সিন এর সাথে অটিজম এর সম্পর্ক আছে ( অটিজম ছাড়াও ইনফ্লামেটরী বাওয়েল ডিজিস এর সাথে যুক্ত করেন তিনি) বা এই ভ্যাক্সিনটি অটিজমের কারণ।বিখ্যাত Lancet পত্রিকায় তার সেই বিতর্কিত গবেষনাপত্রটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। এর সাথে সাথেই বিষয়টি মিডিয়ায় আসে বিস্ময়কর ব্যপকতায়।প্রেস কনফারেন্স এ তিনি আরো দাবী করেন এই ভ্যাক্সিনটি তিন টি ডোজ দেবার কারনে এই ঘটনাটি ঘটছে, এর বদলে একটা ডোজ দেয়া যেতে পারে ( বিষয়টি কেন আমরা একটু পরেই দেখবো)।

এখানে মনে রাখা প্রয়োজন এই গবেষনাটি তিনি করেছিলেন মাত্র ১২ জন শিশুর ( হ্যা বারো জন) উপর, যাদের প্রত্যেকের অটিজম ছিল। দাবানলের মত খবরটি ছড়িয়ে পড়ে বৃটেন এবং অন্যান্য জায়গায়। শঙ্কিত বাবা মা রা ব্যপক হারে MMR: Mumps,Measles,Rubella Vaccine টি বর্জন করতে শুরু করেন।অটিজম সহ শিশুদের বাবা মা রাও প্রশ্ন করতে শুরু করেন এই যোগসুত্র টি নিয়ে। ফলাফলে বহু দেশেই হাম বা মিজলস এর প্রকোপও বেড়ে যায়, ২০০৯ অবধি সেই বেড়ে যাবার হারটি অব্যাহত ছিল। কিস্তু তারপর এই দাবী যাচাই করে দেখার জন্য বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয় বৃটেন,যুক্তরাষ্ট সহ বহু দেশের স্বতন্ত্র অসংখ্য গবেষনায়, প্রত্যেকটি স্পষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমান করে যে MMR ভ্যাক্সিনটির সাথে অটিজম হবার কোনই সম্পর্কই নেই। এছাড়া ভাববার বিষয় হলো মাত্র ১২ জন শিশুর উপর এই গবেষনায় তিনি কতটুকু গ্রহনযোগ্য ভাবে উপসংহারে পৌছাতে পারেন, আর কেনই বা এই উপসংহারটি লুফে নিয়েছিল মিডিয়া।এমনকি খুব সম্প্রতি ডেনিশ স্টাডিটি যা সবচেয়ে বেশী সংখ্যক শিশুদের নিয়ে গবেষনাটি করেছে, সেটিও প্রমান করেছে এই ভ্যাক্সিনটির সাথে কোনই সম্পর্ক নেই।

কিভাবে তাহলে ওয়েকফিল্ড তার এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন ?

আরো ব্যপক এবং সুশৃঙ্খল নিয়মতান্ত্রিক গবেষনা যা কিনা বারবার ব্যর্থ হয়েছে ওয়েকফিল্ডের দাবীকৃত ফলাফলটির মত একই উপসংহারে পৌছাতে। আসলেই ওয়েকফিল্ডের গবেষনাটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু হয় এটি প্রকাশের পর পরই। মিডিয়ায় ব্যপক প্রচার ও অপপ্রচারের এক পর্যায়ে দেখা যায় আসলে বিজ্ঞান বিষয়ে মুলধারার সাংবাদিকতার মৌলিক কিছু সমস্যা আছে।তবে ঠিক এই মুহুর্তে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, ব্রায়ান ডিয়ার (Brian Deer) বিষয়টির মুল খোজেন,তার সেই প্রতিবেদনটি প্রথমে সানডে টাইমস ও পরে বিবিসি তে প্রচারিত হয়।
ব্রায়ান ডিয়ার তার অনুসন্ধানে বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ তথ্য বের করে আনেন ওয়েকফিল্ড এর গবেষনাটি নিয়ে।

ওয়েকফিল্ডের গবেষনাটি প্রকাশের দু বছর আগে, ডাক্তার ওয়েকফিল্ডকে ভাড়া করেছিলেন একজন আইনজীবি, রিচার্ড বার, তিনি মুলত: চিকিৎসকদের অবহেলাজনিত ম্যালপ্রাক্সিস আর নেগলিজেন্স এর কেসগুলো করে থাকেন। বারের পরিকল্পনা ছিল MMR প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধে একটি ক্লাস অ্যাকশন মামলা পরিচালনা করবেন। তিনি ওয়েকফিল্ডকে কন্ট্রাক্ট দেন তার জন্য একটি গবেষনা করতে; উদ্দেশ্য হচ্ছে এই এমএমআর ভ্যক্সিনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রমান তৈরী করে তাকে দিতে হবে, যা প্রায় ১৬০০ পরিবারের একটি ক্লাস অ্যাকশন মামলার স্বপক্ষে ব্যবহার করা হবে। এই কাজের জন্য প্রতি ঘন্টায় ডাক্তার ওয়েকফিল্ড ১৫০ পাউন্ড করে ভাতা পান এবং এই টাকাটা রিচার্ড বার বের করেছিলে UK legal Aid থেকে।দেখা যায় পুরো গবেষনায় তিনি অন্যান্য খরচ ছাড়াও মোট ৪৪৬,৬৪৭ পাউন্ড পান, এবং আরো ৫৫০০০ পাউন্ডের বাড়তি আবেদন করা হয় এই গবেষনার জন্য। শুধু তাই না, নিয়মানুযায়ী গবেষনা পত্রিকায় প্রকাশনার আগে ফান্ড কোথা থেকে আসলো, সেটা শর্তমাফিক যে জানাতে হয় লিখিত ভাবে, ডাক্তার ওয়েকফিল্ড সেটা করেননি অনৈতিকভাবে। কিন্তু শুধু এটাই না, আরো একটি বিষয় আছে। ওয়েকফিল্ডের প্রেস কনফারেন্স এ, যেখানে তিনি তিনটি ডোজের বদলে একটি ডোজ দেবার ভ্যাক্সিন প্রস্তাব করেছিলেন, তার ঠিক একমাস আগে তিনি নিজেই তার নামে একটি এক ডোজের মিজলস বা হাম এর ভ্যাক্সিন এর পেটেন্ট এরও আবেদন করেছিলেন।আর সেই একডোজ ভ্যাক্সিনের ভবিষ্যত নির্ভর করছে খুব কার্যকরী MMR এর ভ্যাক্সিনের প্রতি যদি বিশ্বাসটি ভাঙ্গা যায়।

তার মুল তত্ত্ব ছিল ভাইরাসটিতে ব্যবহৃত জীবন্ত তবে রোগ করে না দুর্বল সেই মিজলস ভাইরাসটি অটিজম আর ইনফ্লামেটরী বাওয়েল ডিজিজ এর কারণ হয়। পরে এখানে আলোচনায় আসে ভ্যাক্সিনের জন্য ব্যবহার করা একটি কেমিক্যাল, মারকারী যৌগ থায়োমারসাল, থায়োমারসাল থাকে সাধারণত মাল্টি ডোজ ভায়ালে, এরা ভ্যাক্সিনকে ব্যাক্টেরিয়া বা ফাঙ্গাসের সংক্রমন থেকে বাচায়। বার বার প্রমান হয়েছে থায়োমারসাল যে মারকারী যৌগটি থাকে সেটি ইথাইল মারকারী (***** এটি মিথাইল মারকারী নয়***))) এবং সহজে শরীর এটি বাইরে বের করে দেয়, এটি কোন ক্ষতি করেনা বা শরীরে জমা হয়না। এই যৌগটি যে ক্ষতি করে না সে বিষয়টি অসংখ্য বৈজ্ঞানিক গবেষনায় প্রমানিত। তারপরও ২০০১ সাল থেকে থায়োমারসাল কে শিশুদের কোন ভ্যাক্সিনেই ব্যবহার করা হয়না।

সাংবাদিক ব্রায়ান ডিয়ার ওয়েকফিল্ডের গবেষনার কাগজ পর্যালোচনা করার জন্য বিশেষজ্ঞদেরও সাহায্য নেন। তারা উদঘাটন করেন যে Royal Free Hospital এ যেখানে গবেষনাটা হয়েছিল, সেখানকার কোন ক্লিনিশিয়ান আর প্যাথলজী বিশেষজ্ঞ আসলেই এমন কোন রিপোর্ট দেননি যা কিনা এই MMR কে কারণ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারে। এবং ওয়েকফিল্ডের প্রকাশিত রেজাল্ট আর গবেষনার মুল কাগজের কোন মিলই নেই। এবং দেখা যায় ক্লিনিক্যাল রেকর্ড আর ডায়াগনোসিস সব বদলে ফেলা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল এবং Lancet জার্নাল প্রতিটি সুত্র যাচাই করে দেখেন এবং Lancet সেই গবেষনাপত্রটিকে তাদের প্রকাশনা থেকে সরিয়ে নেয় প্রয়োজনীয় নোটিশ সহ। ডা: ওয়েকফিল্ডের বিরুদ্ধে প্রায় ১৪৭ দিনে র একটি শুনানি চলে UK Genarel Medical Council এ, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রমানিত হয়। বিচারক প্যানেল এর সদস্যরা সবচে বিচলিত হন, ১২ জন অটিজম সহ শিশুর উপর ওয়েকফিল্ডের গবেষনার নামে করা নানা পরীক্ষাগুলো নিয়ে, যা শিশুদের উপর করা যে কোন গবেষনার মুল সব নীতিকে চুড়ান্তভাবে লঙঘন করেছিল।ওয়েকফিল্ড শিশুদের উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত নানা টেষ্ট করেন তার তত্ত্ব প্রমান করার জন্য। এর মধ্যে বহুবার রক্ত নেয়া,কলোনোস্কোপী,বেরিয়াম মিল এক্সরে সহ নানা টেষ্ট প্রত্যেকটি শিশুর উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত যন্ত্রনা দিয়েছিল। এবং বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ডাক্তার ওয়েকফিল্ড সম্পুর্ণ অনৈতিকভাবে হাসপাতালের রিসার্চের এথিকস কমিটির অনুমতি ছাড়াই সেই কাজটি করেছিলেন। যে কোন গবেষকের জন্য এটি ভয়াবহ একটি অপরাধ, এছাড়া অন্য অপরাধতো আছেই।
স্পষ্ট প্রমান হয় তার বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ। তার অসততা ও দ্বায়িত্বহীনতার অপরাধে তার লাইসেন্স বাতিল করা হয়। তিনি যুক্তরাজ্য ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে আস্তানা গাড়েন, তার সমর্থনে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের গোড়া ভ্যাক্সিন বিরোধী লবি, যাদের গলার আওয়াজ যথেষ্ট বেশী। তারা প্রচার করে এই নিরপরাধ ডাক্তারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, সেটা করছে ভ্যাক্সিন প্রস্তুতকারী কোম্পানীগুলো, আর তাদের টাকায় কেনা সরকার আর বৈজ্ঞানিক সব প্রতিষ্ঠানগুলো, হ্যা বিস্ময়কর একটি অভিযোগ (***** এখানে মনে রাখা প্রয়োজন ভ্যাক্সিন, প্রোডাক্ট হিসাবে সবচেয়ে কম লাভজনক****))); সুতারাং বিজ্ঞানীদের গবেষনার কাছে পরাজিত এই লবী বেছে নেয় মিডিয়ার যুদ্ধকে, তাদের সাথে যোগ দেয় কিছু অজ্ঞ সেলেব্রিটিও, আর তখন থেকেই এই বিতর্ক চলছে।এই বিতর্ক এখন শুধু ওয়েকফিল্ড না, আরো জটিল করে তুলছে বিজ্ঞানবোধহীন মিডিয়াগুলোও।

আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বাস করি, বিজ্ঞানের সুফল ভোগ করছি প্রতিটি মুহুর্তে।বিজ্ঞান বদলে দিয়েছে আমাদের জীবন,তারপরও বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের সন্দেহর কোন ঘাটতি নেই।অমুলক ভয় আর ক্ষোভ সবধরণের যুক্তিপুর্ণ আলোচনার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে প্রায়ই। আমাদের সমাজ এখনও সব স্বাক্ষ্য আর প্রমান যা বৈজ্ঞানিক গবেষনার মাধ্যমে প্রমানিত সেগুলো মনে করে কারো ব্যক্তিগত মতামত আর অন্ধ অযৌক্তিক বিশ্বাসকে মনে করে সত্যিকারের নীরিক্ষা নির্ভর চিন্তা হিসাবে।

ওয়েকফিল্ড শুধু মিথ্যা গবেষনা করেননি, তা প্রমানও করা হয়েছে, তারপরও দু:খজনকভাবে সেই ফলাফল চিরকালের জন্য বদলে দিয়েছে ভ্যাক্সিন সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের ধারণা, হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে অসংখ্য শিশুকে, যাদের জন্য ভ্যাক্সিন অবশ্য প্রয়োজনীয় কারন প্রতিরোধ করা সম্ভব এমন কোন রোগ থেকে শিশুদের রক্ষা না করাই তো বড় একটি অপরাধ।

****** এখানে একটি পাদটিকা যোগ করছি, আমি বিজ্ঞানের ইতিহাস ভালোবাসি, সেখানে একজনের ইতিহাস এখনও বাংলায় না লেখার জন্য প্রায়ই কষ্ট অনুভব করি ( তাকে নিয়ে অবিলম্বেই কিছু লিখবো, নিজের কাছে আজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম), তিনি হলেন অনুজীববিজ্ঞানী ড: মরিস হিলেমান, যার হাতে আবিষ্কার হয়েছিল বহু ভ্যাক্সিন, বলা হয় একক ব্যাক্তি হিসাবে তিনি এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী মানুষের জীবন বাচিয়েছেন। আমরা খুব কম মানুষই তার নাম জানি। MMR ভ্যাক্সিনটি তারই আবিষ্কার, যা তিনি প্রথম দিয়েছিলেন তার নিজের মেয়েকেই……… ******

Advertisements
MMR ভ্যাক্সিন আর অটিজম বিতর্ক

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s