জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

72827356.ItK78rjF

sepfer23222

juanfernandez_firecrown-feeding-3

firecrown_female
ছবি: The Juan Fernández Firecrown (Sephanoides fernandensis) is a hummingbird found today solely on Isla Róbinson Crusoe, one of a three-island archipelago belonging to Chile. It is non-migratory and shares the island with its smaller relative the Green-backed Firecrown (S. sephaniodes), which seasonally migrates to the mainland. (বর্তমানে হুয়ান ফারনানদেজ এর তিনটি দ্বীপই খুব দুষ্প্রাপ্য আর বিচিত্র  সব চমকপ্রদ উদ্ভিদ ও প্রানীদের জীবন্ত একটি মিউজিয়াম, অনেক প্রজাতি যা শুধু এখানেই পাওয়া যায় – পৃথিবীর অন্য কোনখানেই তাদের দেখা যায় না।  এদের মধ্যে যেমন আছে পাচটি প্রজাতির পাখি ( তার মধ্যে আছে একটি ৫ ইন্চি মর্চে ধরা বাদামী রঙ এর হামিংবার্ড, চমৎকার এবং অবলুপ্ত হবার পথে হুয়ান  ফারনানদেজ ফায়ারক্রাউন), ((উপরের তিনটি ছবি পুরুষ পাখি..নীচের একটি ছবি স্ত্রী পাখি)) ছবিসুত্র: http://www.talking-naturally.co.uk/juan-fernandez-firecrown/

জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : চতুর্থ অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)
(অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

Why Evolution Is True: Jerry A. Coyne

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায় : প্রথম পর্ব ;  দ্বিতীয় পর্ব ; তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্বশেষ পর্ব
তৃতীয় অধ্যায়: প্রথম পর্ব , দ্বিতীয় পর্ব , তৃতীয় পর্ব , শেষ পর্ব
জীবনের ভুগোল 

এইচ এম এস বীগল এ প্রকৃতিবিদ হিসাবে অবস্থান কালে দক্ষিন আমেরিকাবাসী প্রানীদের নানা ভৌগলিক অবস্থানে বিস্তার এবং মহাদেশটির বর্তমান আর অতীত বাসিন্দাদের মধ্যে ভুতাত্ত্বিক সম্পর্ক সংক্রান্ত কিছু বিশেষ গুরুত্ব্পুর্ণ সত্য আমার দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল। আর আমার কাছে মনে হয়েছিল এই বিষয়গুলো প্রজাতির উদ্ভব বিষয়টিতে কিছুটা নতুন করে আলোকপাত করে – আমাদের অন্যতম সেরা এক দার্শনিক যাকে বলেছিলেন সব রহস্যর রহস্য। (চার্লস ডারউইন, অন দি অরিজিন অব স্পিসিস।)

পৃথিবীর কিছু নির্জনতম স্থানের উদহারন হচ্ছে দক্ষিনে মহাসাগরে অবস্থিত বিচ্ছিন্ন কিছু ভলকানিক বা আগ্নেয় দ্বীপপুন্জ্ঞ। তাদেরই একটা যেমন, বিখ্যাত সেন্ট হেলেনা, আফ্রিকা আর দক্ষিন আমেরিকার মাঝামাঝি একটি জায়গায় যার অবস্থান – বৃটিশদের বন্দী হিসাবে যেখানে নেপোলিয়ন তার জীবনের শেষ পাচটি বছর কাটিয়েছিলেন, তার নিজের দেশ ফ্রান্স থেকে বহু দুরে নির্বাসনে। কিন্তু যে দ্বীপপুন্জটি সবচেয়ে বেশী বিখ্যাত তার বিচ্ছিন্নতা আর নির্জনতার জন্য, সেটি হচ্ছে  হুয়ান ফারনানদেজ দ্বীপপুন্জ্ঞ : চিলি র উপকুল থেকে চারশ মাইল পশ্চিমে চারটি ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্ঠি, যার মোট আয়তন প্রায় চল্লিশ বর্গ কিলোমিটার। এটি বিখ্যাত হবার কারন হচ্ছে এই দ্বীপগুলোর একটিতে  আলেকজান্ডার সেলকার্ক, বাস্তব জীবনের সেই সত্যিকারের রবিনসন ক্রুশো, তার বিচ্ছিন্ন, নির্জন একাকী বেশ কয়েকটি বছর কাটিয়ে ছিলেন পরিত্যক্ত নাবিক হিসাবে।


ছবি: হুয়ান ফারনানদেজ দ্বীপ পুন্জ্ঞ

জাতিগতভাবে একজন স্কট, আলেকজান্ডার সেলক্রেগ নামে তার জন্ম হয়েছিল ১৬৭৬ সালে, শেলকার্ক স্বভাবে খুবই বদমেজাজী ছিলেন, ১৭০৩ সালে Cinque Ports নামের একটি জাহাজে সেইলিং মাষ্টার হিসাবে তিনি সমুদ্র যাত্রা করেছিলেন। Cinque ports মুলত ছিল বৃটিশ বেসরকারী নৌযান, যাদের অনুমতি দেয়া হয়েছিল, স্পেন ও পর্তুগালের জাহাজ আক্রমন করে লুট করার জন্য। জাহাজের একুশ বছর বয়সী ক্যাপ্টেনের স্বেচ্ছাচারী আচরণ অকারণ ঝুকি নেবার প্রবণতা আর জাহাজের খারাপ অবস্থা দেখে শেলকার্ক দাবী করেন, তিনি আর এই জাহাজে থাকবেন না, তাকে যেন কোন একটি দ্বীপে নামিয়ে দেয়া হয়। তিনি আশা করেছিলেন, অল্প কয়েকদিনের মধ্যে তাকে হয়তো উদ্ধার করবে অন্য কোন জাহাজ। যখন Cinque ports  হুয়ান ফারনানাদেজ গ্রুপের, Más a Tierra দ্বীপে খাবার আর পানির জন্য থেমেছিল, ক্যাপটেনও শেলকার্কের দাবী মেনে নিয়েছিলেন আনন্দের সাথেই, শেলকার্ক স্বেচ্ছায় জাহাজ ছেড়ে দ্বীপে থেকে গেলেন; তার সাথে ছিল কিছু কাপড়, বিছানাপত্র, কিছু যন্ত্রপাতি, একটা ফ্লিন্টলক বন্দুক, তামাক, একটি কেতলী আর একটা বাইবেল। এভাবে তিনি শুরু করেছিলেন তার সাড়ে চার বছরের একাকী জীবন।


ছবি: Statue of Selkirk in Lower Largo, Scotland ( বাস্তব জীবনের সেই রবিনসন ক্রুশো)

Más a Tierra বা মাস আ টিয়েরা য় কোন জনবসতি ছিলনা, শেলকার্ক ছাড়া সেখানে অন্য স্তন্যপায়ীদের মধ্যে সেখানে শুথু ছিল ছাগল,ইদুর আর বিড়াল, আর এদের সবগুলোকেই এই দ্বীপে নিয়ে এসেছিল এর আগের নাবিকরা যখন তাদের জাহাজ ভিড়েছিল এখানে । শুরুর কিছু দিনের একাকীত্ব আর হতাশা কাটিয়ে, শেলকার্ক তার নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন, শেল ফিশ আর ছাগল শিকার করে, ফল আর তার আগের নাবিকদের রোপন করে যাওয়া শাকসব্জী খেয়ে, এছাড়া দুটো কাঠের টুকরো ঘষে আগুন জ্বালিয়ে, ছাগলের চামড়া দিয়ে জামা বানিয়ে, তার থাকার ইদুর তাড়ানোর জন্য  বিড়াল পেলে ।

১৭০৯ সালে শেলকার্ককে অবশেষে উদ্ধার করেছিলো আরেকটি বৃটিশ জাহাজ, আর আজব ঘটনা হলো সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনও ছিলেন সেই Cinque Ports এরই পুরোনো ক্যাপ্টেন। ছাগলের চামড়ার আচ্ছাদনে ঢাকা  এই বুনো মানুষটাকে দেখে নাবিকরা বিস্মিত হয়েছিল, এছাড়া দীর্ঘদিন আলাদা থাকার কারনে এমনকি তার ইংরেজীও ছিল দুর্বোধ্য। জাহাজে প্রয়োজনীয় ফলমুল, আর ছাগলের মাংশ মজুত করার পর শেলকার্কও ইংল্যান্ড অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। ইংল্যান্ডে ফিরে তিনি একজন লেখককে সাথে নিয়ে তার সেই বিস্ময়কর অভিযানের রোমাঞ্চকর কাহিনী লিখে ফেলেছিলেন, The Englishman, ধারণা করা হয় এই কাহিনীটাই ড্যানিয়েল ডিফোকে অনুপ্রানিত করেছিল তার কালজয়ী উপন্যাস Robinson Crusoe  লেখার জন্য। অবশ্য এরপর শেলকার্ক সাগর তীরের রোমাঞ্চহীন জীবনে মন বসাতে পারেননি আর, আবারো সাগরে ফিরে যান ১৭২০ সালে ,এবং এক বছর পর আফ্রিকার উপকুলের কাছাকাছি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সময় আর চরিত্রের মিলন ও আকস্মিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল সেলকার্কের কাহিনী। কিন্তু এই আকস্মিক কিছু ঘটার সম্ভাবনা আরো বড় একটি গল্পেরও মুল সুত্র  মনে রাখতে হবে: হুয়ান ফারনানদেজ দ্বীপপুন্জ এবং এরকম আরো অনেক দ্বীপে বসবাসকারী মানুষ নয় এমন অধিবাসীদের গল্প। যদিও সেলকার্ক  জানতেন না, Más a Tierra ( এখন যা পরিচিত Alejandro Selkirk দ্বীপ নামে) এ তার আগে থেকেই বসতি গড়েছিল তার মত আরো আগে আসা এরকমই পরিত্যাক্ত প্রানীদের উত্তরসুরীরা- গাছ,পাখি আর কীটপতঙ্গদের সেই রবিনসন ক্রুসো রা যারা আকস্মিক ভাবেই কোন কারনে এই দ্বীপে এসে হাজির হয়েছিলো অতীতে, সেলকার্ক আসার বহু হাজার বছর আগেই। নিজের অজান্তেই তিনি বসবাস করে গেছেন বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার নানা পরিবর্তনের ল্যাবরেটরীতে।

বর্তমানে হুয়ান ফারনানদেজ এর তিনটি দ্বীপই খুব দুষ্প্রাপ্য আর বিচিত্র  সব চমকপ্রদ উদ্ভিদ ও প্রানীদের জীবন্ত একটি মিউজিয়াম, অনেক প্রজাতি যা শুধু এখানেই পাওয়া যায় – পৃথিবীর অন্য কোনখানেই তাদের দেখা যায় না।  এদের মধ্যে যেমন আছে পাচটি প্রজাতির পাখি ( তার মধ্যে আছে একটি ৫ ইন্চি মর্চে ধরা বাদামী রঙ এর হামিংবার্ড, চমৎকার এবং অবলুপ্ত হবার পথে হুয়ান  ফারনানদেজ ফায়ারক্রাউন), ১২৬ প্রজাতির উদ্ভিদ ( যার মধ্যে আছে সুর্যমুখী পরিবারে বেশ কিছু অদ্ভুদ সদস্য), একটি ফার সিল এবং বেশ কিছু কীটপতঙ্গ। তুলনামুলক এমন কোন জায়গা খুজে পাওয়া যাবে সারা পৃথিবীতে যেখানে এরকম ছোট একটি জায়গা এতগুলো স্থানীয় প্রজাতির দেখা মিলবে। কিন্তু দ্বীপগুলোয়, যে প্রজাতিগুলো নেই সেকারনেও যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য: এখানে কোন স্থানীয় প্রজাতির উভচরী প্রানী, সরীসৃপ বা স্তন্যপায়ী প্রানী নেই – যারা পৃথিবীর সব মহাদেশেই ব্যপকভাবে উপস্থিত। এই অদ্ভুত বিচিত্র ধরনের স্থানীয় প্রজাতির উপস্থিতির প্যাটার্ণ, যেখানে অনেক প্রধান প্রধান শ্রেনীর প্রানীরা সুস্পষ্টভাবে অনুপস্থিত, বার বার পুনরাবৃত্তি হয়েছে সামুদ্রিক দ্বীপগুলোতে। এবং আমরা দেখবো এই  সব প্যাটার্ণগুলো বিবর্তনের স্বপক্ষে সুস্পষ্ট কিছু প্রমান দিচ্ছে।


ছবি:  প্রায় বিলুপ্ত হবার পথে দুর্লভ ক্যাবেজ ট্রি (Dendroseris litoralis – the Cabbage Tree) ; এটি হুয়ান ফারনানদেজ দ্বীপের স্থানীয়, এবং সুর্যমুখী পরিবারের একটি গাছ। ১৯৮০ সালে মাত্র তিনটি গাছ বেচে ছিল, বতর্মান বেশ কিছু বোটানিকাল গার্ডেনে গাছটি দেখা যায়। সুত্র: http://www.strangewonderfulthings.com/195.htm


ছবি: ক্যাবেজ ট্রি; সুত্র: http://www.strangewonderfulthings.com/195.htm


ছবি: কাবেজ ট্রি : সুত্র: http://www.strangewonderfulthings.com/195.htm

যোগের প্রচুর চিঠি পত্র ঘেটে, তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, শুধু প্রানী আর উদ্ভিদের উৎপত্তি আর গঠনের ব্যাখ্যা করার জন্যই না, সারা পৃথিবীতে তাদের বিস্তারের ব্যাখ্যা করার জন্যও বিবর্তন এর  প্রয়োজন আছে। এই বিস্তার বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়। কেন সামুদ্রিক দ্বীপগুলোতে এমন অদ্ভুত আর ভারসাম্যহীন উদ্ভিদ আর প্রাণের সম্ভার থাকে যা বেশ ভিন্ন কোন মহাদেশের প্রানী আর উদ্ভিদের সম্ভার থেকে? কেন অষ্ট্রেলিয়ার নিজস্ব সব স্তন্যপায়ীরা মুলত মারসুপিয়াল, অথচ প্লাসেন্টা নির্ভর স্তন্যপায়ীদের  প্রাধান্য দেখা যায় বাকী সারা বিশ্ব জুড়ে? যদি প্রজাতিদের সৃষ্টিই করা হয়ে থাকে, তাহলে কেনই বা কোন সৃষ্টিকর্তা একই ধরনের ভুতাত্ত্বিক গঠন আর জলবায়ু বিদ্যমান এমন বিচ্ছিন্ন আর দুরবর্তী এলাকাগুলো, যেমন আফ্রিকা আর আমেরিকার মরুভুমি, এমন সব প্রজাতি দিয়ে পুর্ণ করেছেন, যাদের উপরিদৃষ্টি দিয়ে দেখলে হয়তো একই মনে হয় অথচ তাদের মধ্যে গভীর মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে ?

ছবি: Robinsonia gayana


ছবি: Juan Fernández fur seal (Arctocephalus philippii)

এসব প্রশ্নগুলোর উত্তর ডারউইনের আগে অনেকেই ভেবেছেন, তৈরী করেছেন এর যুক্তিসঙ্গত একটি ব্যাখ্যার ভিত্তি, যার উপরেই ডারউইন গড়ে তুলেছিলেন অসাধারন বুদ্ধিমত্তার তার নিজস্ব সংশ্লেষনটি – তবে বিষয়টি তার কাছে এতই গুরুত্ব্পুর্ণ ছিল যে তার The Origin বইটিতে দুটি পুরো অধ্যায় বরাদ্দ করেছিলেন তার ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করতে। এই অধ্যায়গুলোকে প্রায়শই বিবেচনা করা হয় বায়োজিওগ্রাফী বা জৈবভুগোল বিষয়ের মুল ভিত্তি স্থাপনকারী রচনা হিসাবে – Biogeography – হচ্ছে পৃথিবীতে নানা প্রজাতির জীবের বিস্তার ও বিন্যাস নিয়ে অধ্যয়ন। এবং যখন জীবনের ভুগোল নিয়ে বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা  প্রথম  প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল, তখনই  মুলত তা পুরোটাই ছিল সঠিক,যা আরো বেশী সুনির্দিষ্ট আর সমর্থিত হয়েছে পরবর্তীতে অসংখ্য গবেষনার ফলাফলে। বিবর্তনের জৈবভৌগলিক প্রমান এখন এত বেশী শক্তিশালী যে আমি এখনও এমন কোন সৃষ্টিবাদী বই ,নিবন্ধ বা বক্তৃতা দেখিনি যা এটিকে মিথ্যা প্রমাণ করা চেষ্টা করছে। সৃষ্টিবাদীরা শুধুমাত্র ভান করে যে এমন কোন প্রমানের অস্তিত্ত্বই নেই।

মজার ব্যাপার হলো জৈবভুগোলের শিকড় বা উৎস কিন্তু ধর্মের গভীরে অবস্থিত। শুরুর দিকের ’প্রাকৃতিক ধর্মতাত্ত্বিক’রা চেষ্টা করেছিলেন প্রমান করে দেখাতে যে পৃথিবীতে জীবদের বিস্তৃতি আর তাদের বন্টন বিন্যাস বাইবেলে বর্ণিত সেই নোয়া র আর্ক ( নুহ এর নৌকা) আর মহাপ্লাবনের ঘটনার সাথে সামন্জষ্যপুর্ণ। সব জীবিত প্রাণীকে মনে করা হতো সেই জোড়া প্রানীদের.. যাদের নোয়া তার আর্কে ঠাই দিয়েছিলেন -, তাদের বংশধর। যে জোড়া প্রানীরা তাদের বর্তমান স্থানে এসে হাজির হয়েছে মহাপ্লাবন পরবর্তী আর্কের নোঙ্গর করা স্থান থেকে যাত্রা শুরু করে ( সাধারনত প্রথাগতভাবে যা মনে করা হয় আরারাত পুর্বতচুড়ায়, যার অবস্থান পুর্ব তুরস্কে); কিন্তু এই ব্যাখ্যার অবশ্যই কিছু সুস্পষ্ট সমস্যা আছে: যেমন কেমন করে ক্যাঙ্গারু আর জায়ান্ট আর্থওয়ার্ম এতগুলো সাগর পাড়ি দিয়ে তাদের বর্তমান অবস্থান অষ্ট্রেলিয়াতে পৌছেছিলো? সিংহদেরে জোড়া কি খুব সহজে অ্যান্টিলোপদের তাদের খাদ্য বানাতো না …আর প্রকৃতিবিদরা ধারাবাহিকভাবেই নতুন নতুন প্রজাতির প্রানী ও উদ্ভিদ আবিষ্কার করে যাচ্ছিলেন, তা দেখে এমন কি গোড়া বিশ্বাসী প্রকৃতিবিজ্ঞানীও বুঝতে পেরেছেন, কোন নৌকারই তো আসলে ক্ষমতা নেই সম্ভাব্য সকল জীবদের সেখানে জায়গা দিতে পারে, এবং ছয় সপ্তাহ ধরে তাদের খাওয়া ও পানি ব্যবস্থা করাতো আরো দুরুহ ব্যাপার।

সুতরাং তারা অন্য একটি তত্ত্ব দিলেন: যা প্রস্তাব করছে অনেকগুলো বা মাল্টিপল সৃষ্টি যা সারা পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত করা হয়েছিলো। মধ্য ১৮০০ য়  বিখ্যাত সুইজারল্যান্ডের বিখ্যাত প্রাণীবিজ্ঞানী লুই আগাসিজ (Louis Agassiz), তখন তিনি অধ্যাপনা করছেন হার্ভার্ডে, তিনি প্রস্তাব করেন যে, “প্রজাতি অপরিবর্তনযোগ্য ও স্থিরই শুধু না, তাদের বিস্তারও, প্রত্যেকটি প্রজাতির তাদের সৃষ্টির সেই জায়গায় কিংবা সেই জায়গার নিকটবর্তী কোন অবস্থানে থাকে।“

কিন্তু বেশ কিছু নতুন পর্যবেক্ষন তার এই ধারণাটি ভিত্তিহীন প্রমান করে। বিশেষ করে যখন ক্রমশ সংখ্যায় বাড়তে থাকা জীবাশ্মগুলো কোন প্রজাতি অপরিবর্তনযোগ্য আর স্থির এই দাবীটাকে মিথ্যা প্রমান করে। ভতত্ত্ববিদ যেমন চার্লস লায়েল, ডারউইনের বন্ধু ও মেন্টর, প্রমান খুজে পেতে শুরু করেন যে, পৃথিবী শুধু বহু প্রাচীনই না এটি ক্রমশই পরিবর্তিত হচ্ছে। বীগলের যাত্রায় ডারউইন নিজে জীবাশ্ম সামুদ্রিক শেল আবিষ্কার করেছিলেন আন্দিজ এর চুড়ায়, যা প্রমান করে ,এখন যা উচু পর্বতমালা তা এক সময় ছিল সাগর তলে। ভুমি উপরে উঠে আসতে পারে আবার ঢেবে যেতে পারে এবং মহাদেশগুলো যা আমরা এখন দেখছি তা হয়তো একসময় হয়তো ছোট কিংবা বড় ছিল আকারে। এবং আরো ছিল প্রজাতিদের বিস্তার সংক্রান্ত কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন.. কোন দক্ষিন আফ্রিকার উদ্ভিদ সম্ভার বা ফ্লোরা দক্ষিন আমেরিকার দক্ষিনাংশের যেমন দেখা যায় তার মত? কিছু জীববিজ্ঞানী প্রস্তাব করেন যে সব মহাদেশই কোন একসময় স্থল সংযোগ বা ল্যান্ড ব্রিজ দিয়ে ‍যুক্ত ছিল ( ডারউইন লাইলের কাছে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন এই স্থলসংযোগ বা ল্যান্ড ব্রিজগুলোর কথা আবিষ্কার করা হয়েছে ভোজবাজীর মত খুব সহজে, যেমন করে কোন বাবুর্চি অতি সহজে প্যানকেক বানায়।) কিন্তু এছাড়াও এমন কোন প্রমানও তখন ছিল না, যা প্রমাণ করে তাদের অস্তিত্ব ছিল।

এই সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য, ডারউইন নিজেই একটি তত্ত্ব প্রস্তাব দেন। প্রজাতিদের ভৌগলিক বিস্তার, তিনি দাবী করেন সৃষ্টিবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না, বরং বিবর্তনই পারে এর ব্যাখ্যা দিতে। যদি উদ্ভিদ ও প্রানীদের কোন উপায় থাকে অনেক দুরত্ব অতিক্রম করার ছড়িয়ে পড়ার এবং তারা ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন জায়গায় নতুন প্রজাতির উদ্ভবের কারণ হতে পারে। তাহলে এটি, এবং পৃথিবীর কিছু প্রাচীন পরিবর্তনের সাথে, যেমন হিমবাহের সম্প্রসারণ আর সংকোচন পর্বগুলো – ব্যাখ্যা দিতে পারে বায়োজিওগ্রাফীর অনেক বিশেষ বৈশিষ্টগুলো যা তার পুর্বসুরী প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের বেশ ধাধায় ফেলে দিয়েছিল।

ডারউইনের সেই ধারণাটি সঠিক প্রমানিত হয়েছিল, যদিও পুরোপুরি না। বাস্তবিকভাবেই বায়োজিওগ্রাফীর অনেক গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্ট অর্থবহ হয় যদি তাদের ব্যাখ্যায় জায়গা দেয় জীবদের বিস্তার, বিবর্তন এবং বদলে যাওয়া পৃথিবীর ভুপ্রকৃতি। তবে একেবারে প্রত্যেকটি ফ্যাক্ট না: আকারে বড়, উড়তে পারেনা এমন পাখি, যেমন অস্ট্রিচ, রিয়া আর এমু দের দেখা যায় যথাক্রমে আফ্রিকা, দক্ষিন আমেরিকা এবং অষ্ট্রেলিয়ায় । যদি তাদের সবারই উড্ডয়ন অক্ষম কোন সাধারন পুর্বসুরী থাকে, কিভাবে তারা এত দুরে বিস্তৃত হতে পেরেছিল? কেনই বা পুর্ব চীন আর পুর্ব উত্তর আমেরিকায়, বিশাল ভৌগলিক ব্যবধান যাদের মধ্যে, এক ধরনের উদ্ভিদের দেখা মেলে, যেমন টিউলিপ ট্রি আর স্কাঙ্ক ক্যাবেজ, যা এর মধ্যবর্তী কোন ভুখন্ডে দেখা যায় না?

এসব প্রশ্নে উত্তর এখন আছে যা এখন আমাদের কাছে আছে তা ডারউইনের সময় জানা ছিল না, এর কারন অবশ্য দুটি আবিষ্কার, যা তার পক্ষে কল্পনাও করা সম্ভব ছিল না: কন্টিনেন্টাল ড্রিফট এবং মলিক্যুলার ট্যাক্সোনোমি। ডারউইন অনুধাবন করতে পেরেছিলেন পৃথিবী পরিবর্তিত হয়েছে বিশাল সময় ধরে কিন্তু তার কোন ধারণা ছিলনা আসলেই ঠিক কতটুকু পরিবর্তন ঘটেছে পৃথিবীতে। ১৯৬০ এর দশক থেকেই, বিজ্ঞানীরা জানতেন বর্তমানের চেয়ে অতীতে পৃথিবীর ভুগোল ছিল খুবই ভিন্ন, যখন বিশাল সুপার মহাদেশগুলো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে, যুক্ত কিংবা বিচ্ছিন্ন হয়েছে খন্ড বিখন্ড হয়ে।

এবং প্রায় ৪০ বছর আগে থেকেই, আমরা ডিএনএ আর প্রোটিন অনুক্রমে জমা তথ্য আমাদের  নানা প্রজাতির মধ্যে বিবর্তনীয় সম্পর্ক কি শুধু সেটাই জানাচ্ছে না যে, এছাড়াও তারা আমাদের তথ্য দেয় মোটামুটি কোন সময়ে একজন আদি সাধারণ পুর্বসুরী থেকে তারা বিভাজিত হয়েছে। বিবর্তনীয় তত্ত্ব পুর্বধারণা করছে এবং সব প্রাপ্ত প্রমান সেই ধারনারই স্বপক্ষে প্রমান যোগাচ্ছে, যে ধারনা প্রস্তাব করছে, প্রজাতি যখন তাদের সাধারণ পুর্বসুরী প্রানী থেকে বিভাজিত হয়, তাদের  ডিএনএ অনুক্রম মোটামুটি পরিবর্তিত হয়ে সরলরৈখিক ভাবে সময়ের সাথে। আমরা এই আনবিক বা মলিক্যুলার ঘড়ি টি ব্যবহার করতে পারি, যা আমরা আরো সুক্ষ্ম করে মিলিয়ে নিতে বা ক্যালিব্রেট করে নিতে পারি জীবিত প্রজাতির জীবাশ্ম পুর্বসুরীদের দিয়ে, বিশেষ করে যে প্রাণীদের জীবাশ্ম রেকর্ড এর ঘাটতি আছে তাদের জন্য তাদের বিভাজন সময় নির্ণয় করার জন্য।

মলিক্যুলার ক্লক ব্যবহার করে আমরা আন্ত প্রজাতি বিবর্তনীয় সম্পর্ক মেলাতে পারি, আমাদের জানা মহাদেশ আর হিমবাহের এর অবস্থান আর এছাড়া সত্যিকারের স্থল সংযোগ সেতু  যেমন পানামা র ইসমাস সৃষ্টি হবার সময়কাল সংক্রান্ত তথ্যগুলো বিশ্লেষন করার মাধ্যমে। প্রক্রিয়াটি আমাদের জানায় প্রজাতির উৎপত্তি কি নতুন মহাদেশ ও নতুন বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি হবার সাথে সম্পর্কযুক্ত কিনা। এই আবিষ্কারগুলোই বায়োজিওগ্রাফিকে রুপান্তরিত করেছে একটি সুবিশাল গোয়েন্দা কাহিনীতে : নানা ধরনের কৌশল ব্যবহার করে আপাতদৃষ্টিতে সংযোগহীন তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করে জীববিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেন প্রজাতিরা যেখানে বাস করে তারা ঠিক কেন সেখানে বাস করে। আমরা এখন যেমন জানি, আফ্রিকা আর দক্ষিন আমেরিকার উদ্ভিদদের মধ্যে সদৃশ্য বিস্ময়কর না, কারন তাদের পুর্বসুরীরা একসময় একটি বিশাল সুপার কন্টিনেন্ট বা মহাদেশ – গন্ডোওয়ানা (Gondwana) তে বসবাস করতো, যা বহু অংশে বিভক্ত হতে ( এখন আফ্রিকা, দক্ষিন আমেরিকা, ইনডিয়া, মাদাগাসকার, অ্যান্টার্কটিকা) শুরু করেছিল  প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বছর আগে।


ছবি: সুপার কন্টিনেন্ট গন্ডোয়ানা ( লেট জুরাসিক পর্বে পৃথিবী .. ১৫২ মিলিয়ন বছর আগে)

বায়োজিওগ্রাফীর প্রতিটি রহস্য সমাধানের কাজই বিবর্তনের স্বপক্ষে জড়ো করেছে জোরালো প্রমান। যদি প্রজাতি বিবর্তিত না হতো, তাহলে তাদের পৃথিবীতে যেভাবে আমরা বিস্তৃত দেখি, জীবিত কিংবা জীবাশ্ম, তার কোন অর্থই হয় না। আমরা প্রথমে সেই প্রজাতিদের সম্বন্ধে কথা বলবো যারা মুল মহাদেশে বাস করে তারপর অন্যদের যারা বাস করে দ্বীপে, কারণ এই ভিন্ন ভিন্ন এলাকা আমাদের ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রমান যোগায়।

_____________________ চলবে

 

Advertisements
জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s