দুটি ছবি আর কিছু ইতিহাস ভাবনা …

ছবি: The School of Athens, বা  Scuola di Atene

((( নীল তুরোক  এর The 2012 CBC Massey Lectures থেকে… অনুপ্রাণিত))))

দি স্কুল অফ এথেন্স, ইতালীয় রেনেসাঁর অন্যতম শিল্পী ও স্থপতি রাফায়েল এর আঁকা একটি অসাধারন ফ্রেসকো; ভ্যাটিকানে পোপের প্রাসাদে পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস এর বানানো লাইব্রেরী ঘরের পুর্ব দেয়াল জুড়ে এটি একেছিলেন ১৫০৯ থেকে ১৫১১ সালে। কাজটি অসাধারন কারন এটি মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপুর্ণ মুহুর্তর প্রতিনিধিত্ব করছে। প্রাচীন গ্রীসে মুক্ত চিন্তা বিকাশের সেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়ের পাত্র পাত্রীরা এখানে বন্দী হয়েছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।

কোন না কোন ভাবে এই সময়ের মানুষরা পৃথিবীটাকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছিলেন প্রথম বারের মত.. প্রাচীন, উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া ধ্যান ধারনা, গোড়া মতবাদ আর কুসংস্কারকে একপাশে সরিয়ে রেখে তারা নুতন করে ভাবতে শুরু করেছিলেন। সেই ভাবনা মুল প্রক্রিয়া ছিল বিস্তারিত আলোচনা, বিতর্ক, যুক্তি, তারাই প্রথম বুঝতে শুরু করেছিলেন এই মহাবিশ্ব কেমন করে কাজ করে এবং কোন মুলনীতি বা নৈতিকতার উপর আমাদের সমাজটি পরিচালিত হবে বা হওয়া উচিৎ। আর এই ভাবে তাদের ভাবনা সভ্যতার ইতিহাসকে বদলে দিয়েছিল আমুল। এখানে উপস্থিত মানুষগুলোর কাছে পুরো মানব জাতি চিরদিনের জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে। সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান আর শিল্পকর্মে বহু মৌলিক ধারনা গোড়াপত্তন হয়েছিল এ সময়টাতেই এই মানুষগুলোর হাত ধরে। আজ আমরা যেখানে দাড়িয়ে আছি, মানুষ বলে গর্ব করছি.. তার সুচনা হয়েছিল এদের হাত ধরেই..

8607_10151553521043521_851364233_n

ছবিটা ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে রাফায়েল এই চিত্রকর্মে আছে গুরুত্বপুর্ণ দার্শনিক সবাই, তবে রাফায়েল কাউকে চিহ্নিত করে যাননি। তার ব্যবহৃত আইকোনোগ্রাফীর নানা সুত্র ধরেই আমরা বুঝতে পারি এখানে উপস্থিত আছেন দার্শনিক, গনিতজ্ঞ, বিজ্ঞানী, লেখক .. .যেমন অ্যারিষ্টোটল, প্লেটো এবং সক্রেটিস.. প্রতেক্যেই আলোচনায় মগ্ন। এছাড়া আছেন পারমেনাইডেজ, তাকে কোন একভাবে বলা যেতে পারে স্টিফেন হকিংস এর গ্রীক সংস্করণ। হকিন্স এর মত পারমেনাইডেস ও মনে করতেন এর খুব মৌলিক একটি স্তরে এই বিশ্ব অপরিবর্তিত আছে, অন্যদিকে এখানেও আছেন হেরাক্লিটাস,যিনিও এখানে আছেন, মনে করতেন বিশ্ব নিরন্তর দুটি বীপরিত শক্তির টানাপোড়েন এর মধ্যে গতিশীল অবস্থায় আছে। দার্শনিক ছাড়া গনিতজ্ঞ আছেন, সামনে ডানে ইউক্লিড, তার জ্যামিতির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, পারমেনাইডেজ এর পাশে আছেন হাইপাশিয়া, প্রথম মহিলা গনিতজ্ঞ ও দার্শনিক… পুরো দৃশ্যটাই যেন কোন অসাধারন বিশ্ববিদ্যালয়ের মত… যেখানে জ্ঞানের অনুসন্ধান, বিনিময় আর নতুন ধারনার জন্ম হয় নিত্য। পিথাগোরাসের ঘাড়ের উপর দিয়ে উকি দিচ্ছে আর নোটবুকে টুকে নিচ্ছে যে মানুষটি , দেখে মনে হয় কোন কিছু চুরি করে নকল করছে.. কোন একভাবে হয়তো সেটাই করছেন তিনি, তার এক চোখ আছে গনিতে আরেক চোখ বাস্তব এই পৃথিবীতে.. ইনি অ্যানাক্সিমানডার.. যাকে অনেকেই মনে করেন পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানী। ইজিয়ান সাগরের পুর্বে আধুনিক তুরস্কের মিলেটাস বলে অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি গ্রীক শহরে ৬০০ খৃষ্ঠ পুর্বাব্দে তিনি বেচে ছিলেন। সেই সময় পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রন করতো রাজা বা ঐতিহ্যবাহী শাসকরা যাদের নানা ধরনের অধিভৌতিক বা ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল; তারপরও কোনভাবে অ্যানাক্সিমানডার ও তার শিক্ষক থেলিস এবং তার নিজের ছাত্ররা এবং এর পর যারা এসেছে.. সবাই তাদের যুক্তির শক্তি ব্যবহার করেছেন, ইতিহাসে ইতিপুর্বে যারা এসেছেন তাদের চেয়ে বহুগুনে বেশী।

এবার রাফায়েল  এর ফ্রেস্কো থেকে আরো চারশ বছর পর তোলা একটি ফটোগ্রাফ..
এই ছবির পাত্র পাত্রীরাও আমুল বদলে দিয়েছিল এই মহাবিশ্বর গঠন আর প্রকৃতি সম্বন্ধে আমাদের সব ধারণা..

1017315_10151556952298521_375566711_n

একই ছাদের নীচে একই সাথে বেশ কিছু অনন্য অসাধারন প্রতিভাবান মানুষের উপস্থিতি খুব কমই ঘটেছে পৃথিবীর ইতিহাসে। নীচের ছবিটি ক্যামেরায় এমন একটি মুহুর্ত বন্দী হয়েছিল ১৯২৭ সালে ব্রাসেলস এ পঞ্চম সোলভে সম্মেলনের সময় (Solvay Conference on Electrons and Photons in Brussels); এই ছবি উপস্থিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে ১৭ জন নোবেল পুরষ্কার জিতেছিলেন বিভিন্ন সময়ে।

বেলজিয়াম এর International Solvay Institutes for Physics and Chemistry প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বেলজিয়ামে এর শিল্পপতি আর্ণষ্ট সোলভে ১৯১২ সালে, ১৯১১ সালে (নিমন্ত্রিত) পদার্থ বিজ্ঞানীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত পৃথিবীর প্রথম সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবার পর। এরপর প্রতি ৩ বছর পর পর পৃথিবীর সেরা পদার্থবিজ্ঞানীরা এখানে জড়ো হন, তাদের পেশাগত ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সব ধারনাগুলো নিয়ে মত বিনিময় করার জন্য। সোলভে র সবচেয়ে বিখ্যাত সম্মেলনটি হয়েছিল ১৯২৭ সালে অক্টোবর মাসে, ইলেক্ট্রন এবং ফোটন, সদ্য প্রস্তাবিত কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছিল সেবার আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয়.. বলাবাহুল্য সম্মেলনে দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন আইনস্টাইন এবং নীল বোর, কথিত আছে আইনস্টাইন হাইসেনবার্গের আনসার্টেইনটি প্রিন্সিপাল নিয়ে যখন তার মতামত দিলেন, God does not play dice.’ বোর তার উত্তরে মন্তব্য করেছিলেন ‘Einstein, stop telling God what to do.’ বোর এবং আইনস্টাইন এই দুই মহারথীর ঠোকাঠুকি আরো অনেকবার হয়েছে নানা সময়ে।উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে, পদার্থ বিজ্ঞানীরা ধারনা করেছিলেন, খুব শীঘ্রই তারা প্রকৃতি গঠণ সম্বন্ধে একটি মৌলিক ব্যাখ্যায় পৌছে যাবেন; তাদের কাছে তখন ছিল নিউটনের ল অব মেকানিকস, ম্যাক্সওয়েল এর থিওরী অব ইলেক্ট্রিসিটি, লাইট, ম্যাগনেটিজম.. এছাড়াও ম্যাক্সওয়েল এর ঘনিষ্ঠ বন্ধ উইলিয়াম থমসন (লর্ড কেলভিন) এর থিওরী অব হিট .. এছাড়া আরো কিছু মৌলিক অগ্রগতি। পদার্থবিজ্ঞানের আবিষ্কার শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল আর সেই সাথে সুচনা করেছিল বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের। বাকী ছিল অল্প কিছু বিষয়..যেমন পরমানুর গঠন.. তা সত্ত্বেও মহাশুন্য আর সময়ের মধ্যে দিয়ে পার্টিকেল এবং ফিল্ডের বিচরণ সংক্রান্ত পদার্থবিদ্যার তৎকালীন ক্ল্যাসিকাল দৃশ্যটি তখনও ছিল বেশ নিরাপদ । কিন্তু অবাক হবার পালা ..বিংশ শতাব্দীর শুরুতে… পুরো দৃশ্যটাই হয়ে গেল জটিল, যার থেকে উত্তরণ সম্ভব হয়েছিল ১৯২৫ থেকে ১৯২৭ সালে বেশ কিছু বৈপ্লবিক আর অসাধারন চিন্তার হাত ধরে। সেই অনন্য প্রতিভাবান মানুষগুলো সবাই তাদের শ্রেষ্ঠতম সময়ে বন্দী হয়েছেন এই আলোকচিত্রটি।

এই বিপ্লবে পদার্থবিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বকে একধরনের বিশাল মেশিন হিসাবে ভাবনাটি পুরোপুরি উল্টে যায় এবং এই জায়গাটা প্রতিস্থাপিত করে আরো বেশী অজানা আর অদ্ভুত কিছু ধারনা, ৫ম সোলভে সম্মেলনটি ডাকা হয় মহাবিশ্ব সম্বন্ধে নতুন এই সব ধারনাগুলো ঠিক যখন দানা বাধতে শুরু করেছিল। ধারনা করা হয় পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর চেয়ে অস্বস্তিকর সম্মেলনটি ছিল এটি।

১৯২৫ সালে প্রতিভাবান জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম তত্ত্বের সুচনা করেন. এই বলে যে.. discard all hope of observing hitherto unobservable quantities, such as the position and period of the electron… বরং try to establish a theoretical quantum mechanics, analogous to classical mechanics, but in which only relations between observable quantities occur…হাইজেনবার্গ এর কাজ পারমানবিক নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘুরতে থাকা ইলেক্ট্রনের সেই পরিচিত চিত্রটি আরো বেশী জটিল করে ‍তুলেছিল, এর পর পরই ১৯২৬ সালে অস্ট্রিয় পদার্থবিজ্ঞানী এরউউন শ্রোডিঙ্গার হাইজেনবার্গের ব্যাখ্যার মত আরেকটি ব্যাখ্যা প্রস্তাব করেন, যেখানে ইলেক্ট্রনদের তিনি উপস্থিত করেন ওয়েভ বা তরঙ্গ হিসাবে। ১৯২৭ সালে হাইজেনবার্গ তার বিখ্যাত uncertainty principle টি প্রস্তাব করেন। যা স্পষ্টভাবে দেখায় যে নিউটনের ক্ল্যাসিকাল মহাবিশ্বে – যেখানে প্রতিটি পার্টিকেল একটি নির্দিষ্ট অবস্থান ও বেগ আছে, সেটি আর মানা সম্ভব হচ্ছে না। যখন পদার্থবিজ্ঞানীরা ব্রাসেল এ ১৯২৭ সালে অক্টোবরে জড়ো হনে, ততদিনে মহাবিশ্বের সেই ক্ল্যাসিকাল রুপটি আর টেকে নি।

ছবিটির সামনের সারিতে ঠিক মাঝখানে আছে অবশ্যই আইনস্টাইন, তার পাশে পা আড়াআড়ি করে রাখা ডাচ পদার্থবিজ্ঞানী.. Hendrik Lorentz এর পাশে Marie Curie, যিনি তার স্বামী পিয়ের ‍কুরি কে নিয়ে প্রমান করেছিলেন তেজস্ক্রিয়তাও একটি পারমানবিক ক্রিয়া। এখানে উপস্থিত সবার মধ্যে তিনি একমাত্র দুবার নোবেল পুরষ্কার জিতেছিলেন। তাদের আবিষ্কারই কিন্তু প্রথম ধারনা দিয়েছিলো পারমানবিক কণাদের অদ্ভুত আচরণ সম্বন্ধে। এই মিটিং এর একবছরের পর তেজষ্ক্রিয়তা ব্যাখ্যা হয়েছিল কোয়ান্টাম তত্ত্বের আলোকেই। কুরীর পাশে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক..বিষন্ন মুখে হাতে টুপি ধরে..১৯০০ সালে তিনি কোয়ান্টাম বিপ্লবের সুচনা করেছিলেন যখন প্রথম তিনি প্রস্তাব করেছিলেন that light carries energy in packets called “photons.” তার ধারনাটিকে বিস্তারিত প্রমান করেছিলেন ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন, মাঝের সারির মাঝখানে লরেন্জ আর আইনস্টাইন ঠিক মাঝে দাড়ানো পল ডিরাক (Paul Dirac), অসাধারন প্রতিভাবান ইংরেজ এই বিজ্ঞানী তার ঠিক পেছনে দাড়ানো এরউইন শ্রোডিঙ্গারের সাথে আধুনিক পার্টিকেল ফিজিক্স এর জনক। ওয়ার্ণার হাইজেনবার্গ পেছনে ডান দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে দাড়ানো, তার সামনে বসে ম্যাক্স বর্ণ..তারা দুজনে কোয়ান্টাম তত্ত্বের ম্যাট্রিক্স মেকানিক ফরমুলেশনটি করেছিলেন, যার গানিতীক পরিণতিটি দিয়েছিলেন পল দিরাক। বর্ণের পাশেই বসে আছেন ডেনিশ পদার্থবিজ্ঞানী নীল বোর, আরেকজন প্রভাবশালী বিজ্ঞানী যিনি প্ল্যাঙ্ক এর কোয়ান্টাম তত্ত্বটির ধারনাটি বর্ধিত করেছিলেন হাইড্রোজেন পরমানুর ক্ষেত্রে, এর পর থেকে যিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের গড ফাদারের দ্বায়িত্ব পালন করে গেছেন।

বোর কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে Institute for Theoretical Physics প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে হাইজেনবার্গ সহ বহু পদার্থবিজ্ঞানীর মেন্টর ছিলেন তিনি। তার এই প্রতিষ্ঠানটি কোয়ান্টাম তত্ত্বর বিশ্ব কেন্দ্র ছিল, হাইজেনবার্গ পরে মন্তব্য করেছিলেন To get into the spirit of the quantum theory was, I would say, only possible in Copenhagen at that time, বোরই মুলত দায়ী কোয়ান্টাম তত্ত্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যাটি গড়ে তোলার জন্য, যা পরিচিত Copenhagen interpretation হিসাবে। হাইজেনবার্গের ডানে বসা উলফগ্যাঙ্গ পলি (Wolfgang Pauli), আরেক তরুন অষ্ট্রীয় প্রতিভাবান বিজ্ঞানী যিনি Pauli exclusion principle টি আবিষ্কার করেছিলেন, যা দাবী করে দুটি ইলেক্ট্রন একই সময় একই অবস্থায় থাকতে পারে না। এই মুলনীতি, এছাড়া quantum theory of spin যেটাও পলি আবিষ্কার করেছিলেন, গুরুত্বপুর্ণ ছিল বোঝার জন্য যে কিভাবে ইলেক্ট্রন পরমানু আর অনুর মধ্যে জটিলভাবে আচরণ করে। মজার ব্যপার হলে তখন দিরাক, হাইজেনবার্গ ও পলি সবাই বয়সে তরুন.. বয়স পচিশের আশে পাশে.. তাসত্ত্বে একেবারে নতুন আবিষ্কারের সামনে সারিতে দাড়িয়ে।

Advertisements
দুটি ছবি আর কিছু ইতিহাস ভাবনা …

3 thoughts on “দুটি ছবি আর কিছু ইতিহাস ভাবনা …

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s