রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : চতুর্থ অধ্যায় (শেষ পর্ব)

ছবি:  উইলিয়ার্ড ফ্রাঙ্ক লিবি (Willard Frank Libby: (December 17, 1908 – September 8, 1980); উইলিয়াম ফ্রাঙ্ক লিবি যুক্তরাষ্টের একজন ভৌতরসায়নবিদ যিনি ১৯৪৯ সালে পোষ্ট ডক জেমস আর আরনল্ড এবং গ্রাজুয়েট ছাত্র আর্ণি অ্যান্ডারসন কে নিয়ে মাত্র ৫০০০ ডলার এর একটি রিসার্চ প্রজেক্টে প্রথম বারের মত রেডিও কার্বন ডেটিং প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানের এমন একটি আবিষ্কারের উদহারণ খুব কম আছে যা  তার আবিষ্কারের ক্ষেত্র ছাড়া বহুক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভুমিকা রেখে যাচ্ছে। ১৯৬০ সালে লিবি রসায়নে নোবেল পুরষ্কার পান।


ছবি: কার্বন ১৪ সাইকেল

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ :  চতুর্থ অধ্যায় (শেষ পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

The Greatest Show on Earth: The evidence for evolution by Richard Dawkins

 প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)  তৃতীয় অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব)তৃতীয় অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) | চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব) | চতুর্থ অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

নীরবতা এবং মন্থর সময় ….

চতুর্থ অধ্যায়: শেষ পর্ব

কার্বন

সব মৌলগুলোর মধ্যে কার্বনকেই মনে করা হয় জীবনের জন্য অপরিহার্য – যা ছাড়া  যে কোন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ত্ব কল্পনা করা বেশ দুরুহ একটি কাজ। এর কারন হচ্ছে, কার্বনের অসাধারন একটি ক্ষমতা আছে চেইন বা দীর্ঘ বহু সংখ্যক অনুর শৃঙ্খল বা চক্র বা রিং তৈরী করার মাধ্যমে নানা জটিল সংগঠনের অনুসমষ্ঠী বা যৌগ তৈরী করার। আমাদের খাদ্যচক্রে এটি প্রবেশ করে সালোক সংশ্লেষনের মাধ্যমে, যে প্রক্রিয়ায় সকল সবুজ উদ্ভিদ বায়ুমন্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড অনুকে সুর্যের আলোর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পানির অনুর সাথে যুক্ত করে শর্করা বা সুগার তৈরী করে। আমাদের শরীর এবং অন্যান্য সকল জীবিত প্রানীদের শরীরের সব কার্বন আসে বায়ুমন্ডলের কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে, উদ্ভিদের মাধ্যমে। এবং এটি আবার নিরন্তর ভাবে বায়ুমন্ডলে আবার পুণঃ ব্যবহারের জন্য বা রিসাইকেল হয়ে বায়ুমন্ডলে ফিরে যায়: যখন আমরা প্রশ্বাস ফেলি, যখন বর্জ ত্যাগ করি এবং যখন আমরা মারা যাই।

আমাদের বায়ুমন্ডলে  কার্বন ডাই অক্সাইড এর বেশীর ভাগ কার্বন হচ্ছে কার্বন ১২, যা তেজষ্ক্রিয় না; তবে প্রতি ট্রিলিয়ণ কার্বন পরমানুর একটি পরমানু হচ্ছে কার্বন ১৪, যা রেডিওঅ্যাকটিভ। এটি  দ্রুত ক্ষয়ও হয়, যার হাফ লাইফ ৫৭৩০ বছর, আমরা আগে যা উল্লেখ করেছি, এটি ক্ষয়ীভুত হয়ে রুপান্তরিত হয় নাইট্রোজেন ১৪ এ। উদ্ভিদের জৈবরসায়ন প্রক্রিয়া এই দুই ধরনের কার্বন এর মধ্যে কোন পার্থক্য করতে পারে না ব্যবহার করার সময়; কোন একটি উদ্ভিদের কাছে কার্বন হচ্ছে কার্বন হচ্ছে কার্বন, সুতরাং উদ্ভিদ তার প্রয়োজনে কার্বন ১২ র পাশাপাশি কার্বন ১৪ ব্যবহার করে,এবং দুই ধরনের কার্বন পরমানুই শর্করা বা সুগার অনুতে যুক্ত হয়, ঠিক যে অনুপাতে তারা বায়ুমন্ডলে বিদ্যমান সেই অনুপাতে। বায়ুমন্ডল থেকে যে কার্বন উদ্ভিদ সংগ্রহ করে ( কার্বন ১৪ র সেই সমানুপাতে) তা খুব দ্রুত খাদ্য শৃঙ্খল বা ফুড চেইন এর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যখন তৃণভোজী প্রানীরা বৃক্ষকে খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে, এবং তৃনভোজীদের খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে মাংশভোজীরা এবং এভাবে সমস্ত প্রানীর মধ্যে; সব জীব, সেটা উদ্ভিদ হোক বা প্রানী হোক, কার্বন ১৪ র সাথে কার্বন ১২  যে অনুপাতে বায়ুমন্ডলে আপনি ‍খুজে পাবেন, ঠিক সেই আনুপাতিক হারে তা সকল জীবের মধ্যেই  বিদ্যমান।


ছবি: রেডিওকার্বন ডেটিং

বেশ,তাহলে কখন ঘড়িটি শুন্যতে স্থির করা হলো বা এটি জিরো করা হলো? এটা হয় সেই মুহুর্তে যখন কোন জীব্তি জীব, প্রানী কিংবা উদ্ভিদ মারা যায়। ঠিক সেই মুহুর্তে, এটি খাদ্য শৃঙ্খল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়; এবং নতুন করে বায়ুমন্ডল থেকে উদ্ভিদের মাধ্যমে আর কোন কার্বন ১৪ তার মধ্যে প্রবেশ করে না; এবং বহু শতাব্দী অতিক্রান্ত হবার পরে, শব দেহে বা কোন কাঠের টুকরোয় বা এক টুকরো কাপড়ে থাকা কার্বন ১৪,  এটি নির্দিষ্ট হারে ক্ষয় হয়ে রুপান্তরিত হয় নাইট্রোজেন ১৪ এ। সেকারনে কোন নমুনায় কার্বন ১৪ র সাথে কার্বন ১২  র অনুপাত ক্রমশ কমতেই থাকে সেই স্ট্যান্ডার্ড অনুপাতের চেয়ে, যা প্রতিটি জীবন্ত প্রানী তাদের বায়ুমন্ডলের সাথে শেয়ার করে থাকে। এবং ধীরে ধীরে শুধু কার্বন ১২ ই টিকে থাকবে বা আরো সঠিকভাবে বললে কার্বন ১৪ র পরিমান এতই কমে যাবে যা পরিমাপ করা সম্ভব হবে না। এবং কার্বন ১৪ র সাথে কার্বন ১২ র অনুপাত ব্যবহার করা যেতে পারে ঠিক কতটা সময় পার হয়েছে সেই জীবটির মৃত্যুর পর থেকে, যখন যে খাদ্য শৃঙ্খল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং বায়ুমন্ডলের সাথে তার সব আদান প্রদানও থেমে গিয়েছিল।


ছবি: কসমিক রে.. এবং কার্বন ১৪ জেনারেশন

সবই ঠিক আছে কিন্তু শুধু মাত্র  এটি কাজ করে কারন বায়ুমন্ডলে নিরন্তরভাবে কার্বন ১৪ পুণনবায়ন বা সরবরাহ হচ্ছে। সেটা ছাড়া, অন্যান্য প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ছোট হাফ লাইফ সহ আইসোটোপদের মত পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হবার জন্য কিন্তু কার্বন ১৪ র হাফ লাইফ যথেষ্ট ছোট । কার্বন ১৪ বিশেষভাবে আলাদা কারন এটি সারাক্ষনই তৈরী হচ্ছে আমাদের বায়ুমন্ডলের উপরের স্তরে নাইট্রোজেন এর উপর কসমিক রে বা মহাজাগতিক রশ্মির আঘাতে; বায়ুমন্ডলে নাইট্রোজেন হচ্ছে সবচেয়ে বহুল পরিমানে বিদ্যমান একটি গ্যাস এবং এর পারমানবিক ওজন ১৪, যা কার্বন ১৪ র মতো। পার্থক্য হচ্ছে কার্বন ১৪ র আছে ৬ টি প্রোটন এবং ৮ টি নিউট্রন, অন্যদিকে নাইট্রোজেন ১৪ র আছে ৭ টি প্রোটন ও ৭ টি নিউট্রন ( মনে রাখবেন নিউট্রন এর ভর কিন্তু প্রোটনের ভরের প্রায় সমান); মহাজাগতিক রশ্মির কণা কোন একটি নাইট্রোজেন পরমানুর নিউক্লিয়াসে একটি প্রোটনকে আঘাত করে তাকে নিউট্রণে রুপান্তর করতে সক্ষম। যখন এটি ঘটে পরমানুটি রুপান্তরিত হয় কার্বন ১৪ তে, পর্যায় সারনীতে কার্বন নাইট্রোজেন এর ঠিক একঘর নীচেই অবস্থান করে এবং যে হারে এই রুপান্তর ঘটে সেটি প্রায় একটি ধ্রুব সংখ্যা যা শতাব্দীর পর শতাব্দী অপরিবর্তিত থাকে। আর সেই কারনে কার্বন দিয়ে সময় নিরুপন বা ডেটিং এর কাজটি করা সম্ভব।  যদিও সত্যিকার অর্থে এই রুপান্তরের হার একেবারে ধ্রুব না  এবং হিসাব নিকাশের ক্ষেত্রে সেই বিষয়টি আমাদের নজরে রাখতে হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের বায়ুমন্ডলে কার্বন ১৪ র এই কম বেশী হারে সৃষ্টি হবার প্রক্রিয়াটির আমাদের কাছে একটি সঠিক ক্যালিব্রেশন বা পরিমাপ আছে, এই বিষয়টি নজরে রেখে আমাদের সময় নিরুপন প্রক্রিয়াটিকে আরো সুক্ষ্ম করে নিতে পারি আমরা। মনে রাখবেন, মোটামুটিভাবে একই সময়ের রেন্জ বা সীমা যেখানে কার্বন ডেটিং কাজ করতে পারে, সেই একই সময়ের রেন্জে কিন্তু কাঠের বয়স নিরুপনের আমাদের হাতে আরো একটি বিকল্প উপায় আছে – ডেনড্রোক্রোনোলজি – যা পুরোপুরি সঠিক একেবারে নিকটবর্তী বছর পর্যন্ত। স্বতন্ত্র উপায়ে ট্রি রিং ডেটিং এর মাধ্যমে আগে থেকেই জানা কোন কাঠের নমুনার বয়স আর তার কার্বন ডেটিং এর মাধ্যমে পরিমাপ করা বয়সের দিকে তাকিয়ে আমার কার্বন ডেটিং এর পরিবর্তনশীল ভুলগুলোকে ক্যালিব্রেট করে নিতে পারি। তারপর আমরা এই ক্যালিব্রেশনটিকে ব্যবহার করি যখন আমরা অন্য কোন জৈব নমুনার বয়স নির্ণয় করতে যাই, যার জন্য আমাদের ট্রি রিং এর কোন উপাত্ত নেই ( সংখ্যাগরিষ্ট ক্ষেত্রেই যা সত্যি);

কার্বন ডেটিং তুলনামুলকভাবে সাম্প্রতিক একটি আবিষ্কার, চল্লিশের দশকে মাত্র এর যাত্রা শুরু।  শুরু দিকে, বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমান জৈব নমুনার অংশ দরকার হতো সময় নিরুপন করার প্রক্রিয়ায়। এরপর ৭০ এর দশকে যখন মাস স্পেকট্রোমেট্রি পক্রিয়াটি কার্বন ডেটিং এর জন্য ব্যবহার উপযোগী করে খাপ খাইয়ে নেয়া হয়, তখন মুল নমুনার খুব সামান্য অংশই প্রয়োজন হয় কাজটি করার জন্য। এই বিষয়টি প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনার সময় নিরুপনের ক্ষেত্রটি একটি বিপ্লবের সুচনা করেছিল।

এর একটি বিখ্যাত উদহারণট ছিল, শ্রাউড অব তুরিন (Shroud of Turin)। যেহেতু এই বিতর্কিত ও আলোচিত কাপড়ের টুকরাটিকে দেখলে মনে হয় রহস্যজনকভাবে এর উপর দাড়ীওয়ালা, ক্রুশে মৃত্যু বরণ করা কোন মানুষের অবয়বের অস্পষ্ট একটি ছাপ আছে, অনেক মানুষই আশা করেছিলেন এটি হয়তোবা যীশুর সময়কালের কোন একটি কাপড়, ঐতিহাসিক রেকর্ডে এটি আবির্ভাব হয় মধ্য চতুর্দশ শতাব্দী ফ্রান্সে, এবং এর আগে কেউই জানতেন না এটি কোথায় ছিল। ১৫৭৮ সাল থেকে এটি তুরিন এ, এবং ১৯৮৩ সাল থেকে এর রক্ষনাবেক্ষনের পুরো দ্বায়িত্ব নেয় ভ্যাটিকান। যখন মাস স্পেকট্রোমেট্রি র ব্যবহার শুরু হয়, তখনই সুযোগ আসে চাদরটির খুব ছোট একটি টুকরো নিয়ে এর সম্ভাব্য সময়কালটি নির্ণয় করার প্রচেষ্টা নেবার। কারন এর আগে সময় পরিমাপের জন্য প্রয়োজন ছিল বেশ বড় নমুনার অংশ, যা এর রক্ষকরা আদৌ দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তবে অল্প পরিমান নমুনা কেটে নেবার ব্যাপারে পরে ভ্যাটিকান সম্মতি জানায়। সেই ছোট টুকরাটির আবার তিনটি ক্ষুদ্রতর টুকরো তিনটি বিশেষায়িত ল্যাবে পাঠানো হয়, যারা কার্বন ডেটিং করার ব্যপারে বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞ ; অক্সফোর্ড, অ্যারিজোনা ও জুরিখ, তাদের পুরোপুরি স্বতন্ত্রভাবে কাজ করা সুযোগ দেয়া, নিজেদের মধ্যে কোন আলোচনা না করে, তিনটি ল্যাবরেটরি তাদের ফলাফল ঘোষনা করেন, কাপড়টি বোনার জন্য যে ফ্ল্যাক্স ব্যবহার করা হয়েছে সেটি কবে মারা গেছে সেই সময়কাল অক্সফোর্ড বলেছিলে ১২০০ খৃষ্টাব্দ, অ্যারিজনার ল্যাব ১৩০৪ এবং জুরিখ ১২৭৪; প্রত্যেকটি সময়কাল ভ্রান্তির স্বাভাবিক মার্জিনের মধ্যেই থাকে। যা তাদের নিজেদের মধ্যে সামন্জষ্যপুর্ণ, এবং ১৩৫০ এর দশকের সাথেই এই তথ্যগুলো মেলে, যখন তুরিন এই চাদরটি আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল;তুরিনের শ্রাউড বা চাদরের সময়কাল নিয়ে বিতর্ক থামেনি, কিন্তু সেটা এমন কোন কারনে না  যা কিনা কার্বন ডেটিং প্রক্রিয়ার উপর কোন সন্দেহ সৃষ্টি করতে পারে। যেমন, চাদরের কার্বন হয়তো কোন অগ্নিকান্ডের ফলে বাইরের কার্বন দিয়ে দুষিত হয়েছে, যা ঘটেছিল ১৫৩২ সালে;  আমি বিষয়টি নিয়ে আর আলোচনা বাড়াবো না, কারন চাদরে গুরুত্বটা ঐতিহাসিক.. বিবর্তনীয় কোন গুরুত্ব এটির নেই। তবে এটি বেশ ভালো একটি উদহারণ ছিল, এটা বোঝানোর জন্য যে, ডেনড্রোক্রোনোলজীর ব্যতিক্রম, কার্বন ডেটিং নিকটবর্তী বছর পর্যন্ত নিখুত নয়, শুধুমাত্র নিকটবর্তী শতাব্দী পর্যন্ত এটি নিরুপন করতে পারে।

আমি অবশ্য বারবার বলেছি যে বহু ভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ঘড়ি আমাদের কাছে আছে যা আধুনিক বিবর্তন বিশেষজ্ঞ গোয়েন্দারা ব্যবহার করতে পারেন সময় নিরুপনে এবং এছাড়া ঘড়ি গুলো সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন তাদের পারস্পরিক সময় নিরুপনের সীমানা একটি অন্যটির সাথে ওভারল্যাপ করে। রেডিওঅ্যাকটিভ ঘড়িগুলো কোন এক টুকরো শিলা খন্ডের বয়স নিরুপন করতে পারে স্বতন্ত্রভাবে ,শুধু মনে রাখতে হবে ঘড়িগুলো সব একই সাথে শুন্যতে স্থির হয়েছিল শিলাটির কঠিন আকার ধারন করার সময়; যখন এ ধরনে তুলনামুলক গবেষনা করা হয় ভিন্ন ভিন্ন ঘড়ি ব্যবহার বরে, দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন ঘড়িগুলো একই ধরনের ফলাফল ইঙ্গিত করছে প্রত্যাশিত ভুলের সীমারেখার মধ্যে। আর এই বিষয়টি বিজ্ঞানীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলে ঘড়িগুলোর সঠিক ফলাফল দেবার ক্ষমতার উপর। এভাবে কোন জানা পাথরের উপর পারস্পরিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত ও পরীক্ষা করে দেখা ঘড়িগুলো দিয়ে বেশ আস্থার সাথেই আরো কিছু গুরুত্বপুর্ণ সময় নিরুপনের সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে; যেমন এই পৃথিবীর বয়স নির্ণয়, আপাতত যে বয়স এর পরিমাপে ঐক্যমতে আছেন বিজ্ঞানীরা তা হলো ৪.৬ বিলিয়ন বছর। যে সময়কালটি নির্ণয়ে বেশ কয়েক ধরনের ঘড়ি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের ঐক্যমত বিস্ময়কর না, কিন্তু দু:খজনকভাবে আমাদের এটি বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়, কারন আশ্চর্যজনকভাবে যা আমি প্রথমেই উল্লেখ করেছিলাম ( এবং এই বইটির সংযোজনীতেও যা আছে),যে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ এবং এর কিছুটা কম বৃটিশ জনসংখ্যা দাবী করেন যে তারা বিশ্বাস করেন পৃথিবীর বয়স বিলিয়ন বছরের হিসাবে পরিমাপ করা তো দুরের কথা, এটি নাকি ১০০০০ বছরেরও কম। হতাশাজনকভাবেই বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এবং বেশীর ভাগ মুসলিম বিশ্বে, এই সব ইতিহাস অস্বীকারকারীরের কিছু স্কুল এবং স্কুলে কি পড়ানো হবে তার উপর তাদের প্রভাব খাটাতে পারেন।

অবশ্য ইতিহাস-অস্বীকারকারীরা দাবী করতে পারেন, ধরুন, পটাশিয়াম আর্গন ঘড়ির কিছু সমস্যা আছে, যেমন হতে কি পারে না যে বর্তমানে আমরা যেভাবে খুব ধীর গতিতে পটাশিয়ামের ক্ষয়ীভবন দেখছি, সেটি শুধু মাত্র ঘটেছে সেই হারে নুহ নবীর সেই মহাপ্লাবনের পর থেকে? যদি, এই মহাপ্লাবনের আগে, পটাশিয়াম ৪০ আইসোটোপটির এর হাফ লাইফ খুব বেশী মাত্রায় ভিন্ন হয়ে থাকে, তাহলে? যেমন তাদের হাফ লাইফ সেই সময় হয়তো ছিল মাত্র কয়েক শত বছর,  বর্তমানের ১.২৬ বিলিয়ন বছর না ? এই  বিশেষ দাবীটির মধ্যে তাদের অযৌক্তিক আবদারটি কিন্তু চোখে পড়ার মত। অবাক কথা বলুন তো কোন মহান কারনে পদার্থবিদ্যার সব সুত্র বদলে যাবে, এভাবে খেয়ালখুশী মত এত বিশাল আকারে আর তাদের দাবীর জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনকভাবে? এবং এটি আরো বিস্ময়করভাবে উদ্ভট দাবী হিসাবে প্রমানিত হয় যখন আপনাকে প্রতিটি  প্রাকৃতিক ঘড়ির ক্ষেত্রে আলাদা আলাদাভাবে এ ধরনের দাবী করতে হবে। বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য সকল আইসোটোপই দিয়ে পরীক্ষার ফলাফল জানাচ্ছে পৃথিবীর বয়স ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন বছরের মাঝামাঝি কোনেএকটি অবস্থানে, এবং তারা এই কাজটি করছে এই ধারনা নিয়ে যে তাদের হাফ লাইফ আমরা এখন যা পরিমাপ করি, সবসময়ই তা অপরিবর্তিত ছিল – যা আমাদের জানা পদার্থবিদ্যার সব সুত্র মেনেই চলে, আসলেই এই পদার্থবিদ্যার নিয়মই দৃঢ়ভাবে দাবী করে এই ফলাফলটি। ইতিহাস অস্বীকারকারীদের তাহলে সবগুলো আইসোটোপের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা ভাবে তাদের নিজস্ব অনুপাত অনুযায়ী তাদের হাফ লাইফকে নাড়াচাড়া করে এমন ভাবে ঠিক করে ক্যালিব্রেট করতে হবে  যেন সেগুলো পৃথিবী তার যাত্রা শুরু করেছে মাত্র ৬০০০ হাজার বছর আগে, তাদের প্রস্তাবিত এই অবাস্তব, গোজামিল সুত্রটি মেলাতে পারে, এটাকেই বলা যেতে পারে বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে সুত্র মেলানো।

আমি কিন্তু এমনকি অন্য ডেটিং প্রক্রিয়াগুলোর বর্ণনাই দেইনি এখানে, যাদের প্রত্যেকটি একই ফলাফলে উপনীত হয়েছে।যেমন ধরুন ফিশান ট্র্যাক ডেটিং ( Fission Track Dating); বিভিন্ন প্রাকৃতিক সময় নিরুপনের এই ঘড়িগুলো সময়ের যে ভিন্ন ভিন্ন ব্যপ্তিকাল  বা রেন্জ বা সীমারেখায় কাজ করে সেটা মনে রেখেই ভাবুন কি পরিমান উদ্দেশ্যমুলক এবং জটিল হতে পারে পদার্থ বিদ্যার বিদ্যমান নানা সুত্রকে নাড়া চাড়া করা জন্য, যেন সব ঘড়িগুলো এক সাথে একটার সাথে আরেকটা  সুবিধাজনকভাবেই সামন্জষ্যপুর্ণ হয়, অবশেষে তাদের এমন একটি মাত্রায় এনে দাড় করানো যা কিনা দেখাতে পারে পৃথিবী তাদের দাবী মতন মাত্র ৬০০০ বছর প্রাচীন, বিজ্ঞানের প্রস্তাবিত ৪.৬ বিলিয়ন বছর হতেই পারে না। যেহেতু এধরনের হস্তক্ষেপের প্রধান উদ্দেশ্য ব্রোন্জযুগের মরুভমির কোন গোত্রভুক্ত একটি বিশেষ গ্রুপের মানুষের সৃষ্টি সংক্রান্ত কল্পনা প্রসুত কোন কিংবদন্তীকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা, সেখানে কমপক্ষে যা বলতেই হবে, কেমন করে কেউ এই গল্প শুনে কেউ বোকা বনতে পারে সেটাই বিস্ময়কর।

এসব ছাড়াও আরো এক ধরনের বিবর্তনীয় ঘড়ি আছে বিজ্ঞানের হাতে, যাকে বলা হয় মলিকিউলার ক্লক, আমি আপাতত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখতে চাইছি, কারন ১০ অধ্যায়ে মলিক্যুলার জেনেটিক্স এর বেশ কিছু ধারনা নিয়ে আমি আলোচনা করবো।

_________________________________________________ চলবে…

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : চতুর্থ অধ্যায় (শেষ পর্ব)

2 thoughts on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : চতুর্থ অধ্যায় (শেষ পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s