রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : অষ্টম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

alan-turing
ছবি: অ্যালান টিউরিং (Alan Mathison Turing,  23 June 1912 – 7 June 1954), ১৯৫৪ সালে বৃটিশ গনিতজ্ঞ অ্যালান ট্যুরিং, জন ভন নিউমান এর সাথে যিনি কম্পিউটারের জনক হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবী রাখেন, আত্মহত্যা করেছিলেন তার ব্যাক্তিগত জীবনে সমকামীতার জন্য অভিযুক্ত হবার পর। 

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : অষ্টম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ,  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব) ,পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)
ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; ষষ্ঠ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)ষষ্ঠ অধ্যায় (শেষ পর্ব)
সপ্তম অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; সপ্তম অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব) ; সপ্তম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব) ;
সপ্তম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ; সপ্তম অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
অষ্টম অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; অষ্টম অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

ধর্মের সমস্যাটা আসলে কি? ধর্ম কেন এত হিংস্র ?

ধর্মবিশ্বাস এবং সমকামীতা:

তালিবানদের অধীনে আফগানিস্থানে সমকামিতার আইনী শাস্তির বিধান ছিল মৃত্যুদন্ড, তা কার্যকর করার জন্য তাদের রুচি অনুযায়ী যে পদ্ধতি তারা অনুসরন করতো তা হলো অভিযুক্তকে কোন একটা পাচিলের  নীচে মাটিতে জীবন্ত কবর দিয়ে তার উপরে পাচিলটা ঠেলে ফেলে দেয়া। এই ‘অপরাধটি’ একান্তই ব্যক্তিগত একটি ব্যাপার, যা দুজন সম্মত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ঘটে যারা অন্য কারো কোন ক্ষতি করেনি, আমরা এখানে আবার দেখতে পাই ধর্মীয় চুড়ান্তবাদীতার একটি বৈশিষ্টসুচক উদহারণ। আমার নিজের দেশ ইংল্যান্ডও এক্ষেত্রে তাদের নাক উচু করার কোন অধিকার নেই। বিস্ময়করভাবে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত জীবনে সমকামীতাকে চিহ্নিত করা হতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে। ১৯৫৪ সালে বৃটিশ গনিতজ্ঞ অ্যালান ট্যুরিং, জন ভন নিউমান এর সাথে যিনি কম্পিউটারের জনক হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবী রাখেন, আত্মহত্যা করেছিলেন তার ব্যাক্তিগত জীবনে সমকামীতার জন্য অভিযুক্ত হবার পর। স্বীকার করে নিচ্ছি যে ট্যুরিংকে কোন পাচীলের নীচে জীবন্ত কবর দিয়ে পাচিল চাপা দেয়া হয়নি ট্যাঙ্ক এর সাহায্যে। তবে তাকে দুটো বিকল্প দেয়া হয়েছিল, দুই বছরের কারাদন্ড (কল্পনা করা খুবই সহজ যে জেলখানায় অন্য কয়েদীরা তার সাথে কেমন ব্যবহার করতো) অথবা হরমোন ইনজেকশনের একটি কোর্স যাকে বলা যেতে পারে রাসায়নিক কাসট্রেশন এর সমান যা তার স্তনের আকারও বাড়াতো। তার সর্বশেষ এবং ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল সায়ানাইড ইনজেক্ট করা একটি আপেল।

জার্মান সেনাবাহিনীর অত্যন্ত্য জটিল এনিগমা কোড এর রহস্য খুজে বের করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভুমিকা পালনকারী এই বুদ্ধিজীবি, নাৎসীদের পরাজিত করার ক্ষেত্রে যিনি তর্কসাপেক্ষে আইসেন হাওয়ার এবং চার্চিলের চেয়ে বেশী অবদান রেখেছিলেন। ব্লেচলী পার্কে ট্যুরিং ও তার ‘আল্ট্রা’ সহকর্মীদের কল্যানে মিত্রবাহিনীর জেনারেলরা যারা যুদ্ধের মাঠে ছিলেন, তারা জার্মান পরিকল্পনার কথা জার্মান জেনারেলদের তা কার্যকর করার বহু আগে থেকে জানতে পেরেছিলেন তাদের পাঠানো সব এনিগমা কোডের বার্তার মর্মোদ্ধার করার মাধ্যমে। যুদ্ধের পর, ট্যুরিং এর দ্বায়িত্ব আর যখন অতি গোপনীয় ছিলনা, তাকে জাতির ত্রানকর্তা হিসাবে তাকে নাইটহুড দিয়ে সন্মানিত করার কথা উচিৎ ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে এই ভদ্র, অসাধারন প্রতিভাটিকে তার জাতি ধ্বংস করেছিল, একটা অপরাধের জন্য, যে তথাকথিত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে ব্যাক্তিগতভাবে তার  একান্ত জীবনে, কারো কোন ক্ষতি যে অপরাধে ঘটেনি। আবারো সেই নির্ভুল বৈশিষ্টমুলক চিহ্ন ধর্মবিশ্বাস ভিত্তিক নৈতিকতাবাদের, যেখানে একজন ধর্মবাদী অতি উৎসাহে অন্য মানুষরা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কি করছে (এমন কি কি চিন্তা করছে) তার নজরদারী করতে বাড়তি আগ্রহ প্রদর্শন করে থাকে।

আমেরিকার তালিবানদের’ সমকামীতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ধর্মীয় চুড়ান্তবাদীতার শ্রেষ্টতম উদহারন। রেভারেন্ড জেরী ফালওয়েল এর কথা শুনুন, যিনি লিবার্টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা: ‘এইডস সমকামীদের জন্য শুধুমাত্র ঈশ্বরের শাস্তিই কেবল না, এটি সমকামিতা সহ্য করার জন্য পুরো সমাজেরও জন্য ঈশ্বর প্রদত্ত শাস্তি।’ এধরনের মানুষের সম্বন্ধে আমার প্রথম যেটা নজরে আসে সেটা হলো তাদের বিস্ময়কর খৃষ্টিয় মহানুভবতা। কোন ধরনের একজন ভোটার আসলেই ধর্মীয় গোড়ামীতে পুর্ণ, কোন কিছু সম্বন্ধে সঠিক কোন জ্ঞান না থাকা এমন একজনকে সিনেটর, যেমন নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান জেসী হেমস কে নির্বাচিত করে যেতে পারে বছরের পর বছর? যে মানুষটা ব্যাঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘The New York Times আর Washington Post নিজেরাই আক্রান্ত সমকামীদের দ্বারা, সেখানে প্রায় প্রত্যেকেই সমকামী।’ এর উত্তর আমার মনে হয়, তার ভোটারটা আসলেই সে ধরনের মানুষ যারা নৈতিকতাকে সংকীর্ণ ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকেই দেখেন, এবং আর যারা তাদের মত একই চুড়ান্তবাদী বিশ্বাস ধারন করে না,তাদেরকে  তারা হুমকি হিসাবে মনে করেন।

আমি এর আগে প্যাট রবার্টসনকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম, যিনি ক্রিষ্চিয়ান কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা।  ১৯৮৮ সালে তিনি রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়নে ক্ষেত্রে একজন সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন এবং প্রায় ৩০ লক্ষ স্বেচ্ছাসেবককে তিনি তার প্রচারনার কাজে ব্যবহার করেছিলেন, সেই সাথে সমতুল্য পরিমান আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতাও তার ছিল: কি পরিমান জনসমর্থন আছে এমন একজন মানুষের প্রতি যার স্বভাবসুলভ কিছু মন্তব্য যেমন: ‘(সমকামীরা) চার্চে আসতে চায় এবং চার্চ সার্ভিসকে ব্যহত করতে চায় চারিদিকে রক্ত ছড়িয়ে এবং মানুষকে এইডস এ আক্রান্ত করার মাধ্যমে এবং যাজকদের মুখে থুতু দেবার জন্য।’ বা ( প্লানড প্যারেন্টহুড) শিশুদের সেচ্ছাচারী যৌনকর্মে উদ্বুদ্ধ করছে, মানুষকে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন, সব ধরনের পশুকাম, সমকামিতা, ইত্যাদ নানা কাজে লিপ্ত হতে উৎসাহ দিচ্ছে –যার প্রত্যেকটি কাজ বাইবেল এ গর্হিত।’ রবার্টসন এর নারীদের প্রতি মনোভাবও, আফগান তালিবানদের কৃষ্ণ হৃদয়ও উষ্ণ করবে: ’আমি জানি নারীদের এই কথা শুনতে খারাপ লাগবে কিন্তু যদি আপনারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, তাহলে অবশ্যই পুরুষের শ্রেষ্ঠত্ব, আপনার স্বামী, আপনাদের মেনে নিতে হবে। পুরো সংসারের মাথায় আছেন যীশুখৃষ্ট আর স্ত্রীর উপরে আছেন তার স্বামী এবং এটাই এভাবে হবে, আর কোন কথা নেই এর উপর।’

ক্যাথলিকস ফর ক্রিশ্চিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন এর সভাপতি গ্যারী পটার বলেন, ’যখন খৃষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠরা এই দেশের ক্ষমতা নেবে তখন আর কোন শয়তানের প্রার্থনা ঘর থাকবে না। আর কোন অবাধ পর্ণোগ্রাফির বিতরণ হবে না, সমকামীদের অধিকার নিয়ে আর কোন কথা নেই। খৃষ্টীয় সংখ্যাগরিষ্ঠরা ক্ষমতা দখলের পর, বহুজাতিবাদ বা প্লুরালিজমকে দেখা হবে অনৈতিক এবং অশুভ হিসাবে এবং রাষ্ট্র এমন কাউকে কোন ধরনের ’অশুভ’কাজ করার অনুমতি দেবে না।  এই উদ্ধৃতি থেকে খুব পরিষ্কার এই অশুভ কাজ এর অর্থ এই না যে এমন কিছু করা, যা অন্য মানুষর উপর কোন খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে,এটি বোঝাচ্ছে ব্যক্তিগত চিন্তা এবং কাজ যা তথাকথিত খৃষ্ঠীয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের মনের মত না।

ওয়েষ্টবোরো ব্যাপ্টিষ্ট চার্চের যাজক ফ্রেড ফেল্পস আরেকজন, যিনি খুবই তীব্রভাবে সমকামী বিরোধী, যখন মার্টিন লুথার কিং এর বিধবা পত্নী মারা যান, তার অন্তেষ্টিক্রিয়ার সময় পাষ্টর ফ্রেড একটি সমাবেশ এর আয়োজন করে সেখানে তার ব্যানারে লেখা ছিল, ’ঈশ্বর সমকামীদের ও সমকামী সমর্থকদের ঘৃণা করে, সুতরাং ঈশ্বর করেটা স্কট কিং কেও ঘৃণা করেন এবং এখন তিনি তাকে নরকের আগুনে পোড়াচ্ছেন, যেখানে আগুন কখনো নেভে না এবং তার দগ্ধ হবার যন্ত্রণার ধোয়া উপরে উঠে আসবে অনবরতকাল।‘ ফ্রেড ফেল্পকে পাগল বলে পাত্তা না দেয়া খুব সহজ, কিন্তু তার আছে প্রচুর মানুষের সমর্থন, যারা সম্পদশালী। তার নিজের ওয়েবসাইট অনুযায়ী ফেল্প ১৯৯১ সাল থেকে মোট ২০০০০ সমকামী বিরোধী সমাবেশের আয়োজন করেছেন যুক্তরাষ্টও,কানাডা, জর্ডান এবং ইরাক ( হিসাবে প্রায় গড়ে প্রতি চারদিনে একটি), যেখানে তার ছাপানো স্লোগানের মধ্যে অন্যতম ‘THANK GOD FOR AIDS’;  তার ওয়েবসাইটের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট হচ্ছে একটি হিসাব বা টালি, যা কোন বিশেষ একজন সমকামী মারা গেলে কত দিন সে নরকের আগুনে পুড়ছে সেই দিন সংখ্যা প্রদর্শন করে। সমকামীতার প্রতি মানসিকতা ধর্ম অনুপ্রানিত নৈতিকতার অনেককিছুই স্পষ্ট করে দেয়, সেই একই রকম নৈতিকতা আমরা দেখি গর্ভপাত ও মানুষের জীবনে পবিত্রতা বিষয়ক কিছু উদহারনে;

________________________ চলবে

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : অষ্টম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

2 thoughts on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : অষ্টম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

  1. অজ্ঞাত বলেছেন:

    ধর্ম মানুষের যুক্তিবোধের উপরে ভিত্তি করে চলে না ।ধর্মের প্রধান ভিত্তি হলো ভয় । একজন ধার্মিক মানুষ একজন ভীতু মানুষ ।
    কিন্তু, মানুষের প্রাণের মৌলিক অবস্থা হলো মুক্তি । মানুষ এই মুক্তাবস্থায় জন্ম নেয় । পরবর্তীতে সমাজের পেষণে সে তার অন্তরের মুক্তিকে জেলখানার মধ্যে বন্ধ করে রাখে ।
    এর ফলে কি হয়?
    একজন স্বৈরশাসকের পায়ের নীচে থাকলে মানুষের কি হয়? তারা সর্বক্ষণ ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে অবস্থান করে – এর ফলে তাদের মনের মধ্যে অপরাধবোধ এবং ঘৃণার জন্ম নেয় ।
    একজন ধার্মিকের মন একই রকম অপরাধবোধ এবং ঘৃণায় পরিপূর্ণ । এই ঘৃনা এবং অপরাধবোধ তাদের নিজেদের প্রতি, নিজেদের পরিবারের প্রতি অত্যাচার, এবং অন্য মতামতলম্বীদের প্রতি প্রতিহিংসার দ্বারা চরিতার্থ করে ।
    ব্যাপারটা যদিও এত সিম্পল নয়,তবুও স্বল্প পরিসরে এটুকুই বলা চলে ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s