রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : অষ্টম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)


final Apples illustration
ছবি: গ্রেগরী ফেরান্ড (Gregory Ferrand) এর একটি ইলাসট্রেশন : ছবিটি একেছিলেন  ইসরায়েলী লেখক সাভইয়ন লিবরেখট (Savyon Liebrecht)  এর নাটক
Apples from the Desert এর পোষ্টার হিসাবে (graphite and colored in Photoshop); ছবিটির মুল বক্তব্য পুরাতনদের বয়ে চলা অযৌক্তিক ট্রাডিশন আর বংশগত ঘৃণাকে পেছনে ফেলে নতুন করে জীবনের মুল্যকে অনুধাবন করে শান্তিকে আলিঙ্গন করার একটি স্বপ্ন।

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : অষ্টম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ,  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব) ,পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)
ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; ষষ্ঠ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)ষষ্ঠ অধ্যায় (শেষ পর্ব)
সপ্তম অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; সপ্তম অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব) ; সপ্তম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব) ;
সপ্তম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ; সপ্তম অধ্যায় ( শেষ পর্ব)

ধর্মের সমস্যাটা আসলে কি? ধর্ম কেন এত হিংস্র ?

ধর্ম আসলেই মানুষকে বিশ্বাস করাতে পেরেছে যে, একজন অদৃশ্য স্বত্তার অস্তিত্ব আছে – আকাশে যিনি বসবাস করেন –আপনি যা কিছু করছেন, প্রতিটি দিনের প্রতিটি মিনিটে, সব কিছুই তিনি দেখছেন। এবং এই অদৃশ্য স্বত্তার কাছে দশটি কর্মের একটি বিশেষ তালিকা আছে, যা তিনি চান আপনারা অবশ্যই সেসব কিছু যেন না করেন; এবং যদি আপনি সেই দশটি নিষেধাজ্ঞার কোন একটি অমান্য করেন, তাহলে তার বানানো একটি বিশেষ জায়গা আছে, গন গনে আগুন আর কালো ধোয়ায় পরিপুর্ণ, পুড়িয়ে যন্ত্রনা আর নির্যাতন করার একটি জায়গা; সেখানে তিনি আপনাকে পাঠাবেন থাকতে এবং যন্ত্রনা সহ্য করতে এবং পুড়তে এবং শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মরার উপক্রম হতে এবং আপনি সেখানে অনন্তকালের জন্য নিরন্তর ভাবে যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকবেন আর কেবল কাদতে থাকবেন… কিন্তু তিনি আপনাকে ভালোবাসেন: জর্জ কারলিন

_________________________________

বৈশিষ্টগত প্রকৃতির কারনেই কোন ধরনের মুখোমুখি দ্বন্দেই আমি তেমন সুবিধা করতে পারিনা। আর আসলেই আমি মনে করিনা শত্রুভাবাপন্ন হয়ে, কোন সত্য অনুসন্ধান করার প্রক্রিয়াটা আদৌ উপযোগী হতে পারে ; এবং আমি নিয়মিতভাবেই আনু্ষ্ঠানিক নানা বিতর্কে অংশ নেবার জন্য আমন্ত্রন প্রত্যাখ্যান করে থাকি; আমি একবার আমন্ত্রিত হয়েছিলাম তৎকালীন এডিনবরার ইয়র্ক এর আর্চ বিশপ এর সাথে একটি আনুষ্ঠানিক বিতর্কে। নিজেকে এর জন্য বেশ সন্মানিত মনে করেছিলাম, এবং আমন্ত্রনটি সাদরে গ্রহন করেছিলাম। সেই বিতর্কের পর বিশিষ্ট ধার্মিক পদার্থ বিজ্ঞানী রাসেল স্ট্যানার্ড তার Doing Away with God? বইটিতে Observer পত্রিকায় সেই বিষয়ে তার লেখা একটি চিঠি পুণ:মুদ্রন করেন:

 মহাশয়, অতিরিক্ত তৃপ্তিময় শিরোনাম ‘God comes a poor Second before the Majesty of Science’ এর অধীনে, আপনার বৈজ্ঞানিক সংবাদদাতা জানাচ্ছেন যে ( তাও আবার ইষ্টার রোববারের মত একটি দিনে) কিভাবে ধর্ম ও বিজ্ঞান বিষয়ক একটি বিতর্কে রিচার্ড ডকিন্স ইয়র্কের আর্চবিশপের উপর কিভাবে ‘গুরুতর বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমন’ করেছিলেন। আমাদের জানানো হয়েছে, ’কুৎসিৎ আত্মপ্রসাদের হাসি হাসা’ নাস্তিকরা’ এবং ’সিংহরা ১০ এবং খৃষ্টানরা শুন্য;’

ধার্মিক বিজ্ঞানী স্ট্যানার্ড এভাবেই Observer এর কাছে একটানা বয়ান দিতে থাকেন যে, কিভাবে সেই পত্রিকাটি তার সাথে আমার এবং বার্মিংহামের বিশপ ও বিখ্যাত কসমোলজিষ্ট স্যার হেরমান বন্ডির রয়্যাল সোসাইটিতে পরবর্তী একটি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যে সাক্ষাৎকারটা কোন প্রতিদ্বন্দীতা মুলক বিতর্ক আকারে হয়নি, এবং তার ফলাফলে সেই আলোচনা অপেক্ষাকৃত বেশী গঠনমুলক হয়েছিল; আমি শুধু একমত হতে পারি, প্রতিদ্বন্দীতামুলক বিতর্কের ফরমাটের প্রতি তার স্পষ্ট নিন্দাজ্ঞাপনে জানানোর সাথে।

বিশেষ করে, আমার বই A Devil’s Chaplain এ যে কারনগুলো আমি উল্লেখ করেছিলাম, কিছু সব নির্দিষ্ট কারনেই আমি কোন সৃষ্টিবাদী বা ক্রিয়েশনিষ্টদের সাথে কোন বিতর্কে অংশগ্রহন করতে চাইনা; ((আমার আসলে সেই দু:সাহস নেই সে কারনগুলো উল্লেখ করে আমন্ত্রন প্রত্যাখান করার, অন্তত একটি কারন যা আমার সবচেয়ে প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক সহকর্মী ব্যবহার করেন সচরাচর, যখনই কোন সৃষ্টিবাদী তার সাথে কোন আনুষ্ঠানিক বিতর্ক আয়োজন করার চেষ্টা করে, ( আমি তার নাম বলবো না, তবে তার বাক্যটি অষ্ট্রেলীয় বাচনভঙ্গীতে পড়তে হবে): ‌ ”এটা তোমার জীবন বৃত্তান্তে বেশ ভালো দেখাবে, আমারটায় ততটা না।’))

যদিও যুদ্ধং দেহী কোন প্রতিযোগিতার প্রতি আমার সুস্পষ্ট অপছন্দ থাকা সত্ত্বেও, কোন না কোন এক ভাবে আমি ধর্মের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণার এবং আক্রমনাত্মক একটি মনোভাবের খ্যাতি অর্জন করে ফেলেছি; আমার সহকর্মীরা যারা একমত যে, ঈশ্বরের কোন অস্তিত্বই নেই এবং যারা একমত যে নৈতিক হবার জন্য আমাদের ধর্মের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই, এবং আমরা ধর্ম এবং নৈতিকতার মুল শিকড়কে ধর্মের বাইরের একটি ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারি, তারাও মৃদু বিস্ময়কর একটি ধাধা নিয়ে আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করেন: তুমি কেন এত ধর্মের বিরুদ্ধে এত বিদ্বেষপুর্ণ মনোভাব পোষন করো বলোতো ? ধর্মের আসলে সমস্যাটা কি? আসলেই কি ধর্ম এত বেশী ক্ষতি করে যে, আমাদের এর বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে যুদ্ধ করতে হবে? কেন আমরা আমাদের মত থাকি না, আর তাদেরকে তাদের মত ছেড়ে দিচ্ছি না তাদের মত করে জীবন কাটাতে, যেমন আমরা করে থাকি রাশিচক্র যেমন বৃষ আর বৃশ্চিক রাশির সাথে, বা ক্রিষ্টাল শক্তি আর লেই লাইন এর ক্ষেত্রে ? এরা সব কি সেই সব উদ্ভট ধ্যানধারনারই একটি না, যা কোন ক্ষতি করছে না আমাদের?

আমি হয়তো এর উত্তরে বলি  যে এধরনে বৈরী আচরন যা আমি কিংবা অন্যান্য নাস্তিকরা মাঝে মাঝে ধর্মের বিরুদ্ধে প্রদর্শন করে তা শুধু লিখিত বা উচ্চারিত শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর শুধুমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক মতভিন্নতার কারনে আমি কিন্তু কাউকে বোমা মেরে হত্যা করার ইচ্ছা পোষন করছি না, বা শিরোচ্ছেদ করতে বা আগুনে পুড়িয়ে ক্রশে চড়িয়ে মারতেও চাইছি না বা কোন উচু দালানের দিকে উড়োজাহাজ চালাতে চাইছি না; কিন্ত আমার প্রশ্নকর্তারা সাধারণত সেখানেই তাদের কথা থামান না, তিনি হয়তো আরো বলতে পারেন এমন কোন কিছু: ”তোমার এই বিদ্বেষপুর্ণ মনোভাব কি তোমাকে একজন ’মৌলবাদী নাস্তিক’ হিসাবে চিহ্নিত করছে না, ঠিক তোমার মতানুযায়ী তুমিও তো একই ভাবে উগ্র আর গোড়া, যুক্তরাষ্ট্রে বাইবেল বলয়ে বসবাসকারীরা যেমন তাদের মতামতে গোড়া আর উগ্র?

প্রথমেই আমার প্রতি এই মৌলবাদীতার অভিযোগকে আগে পরিহার করার প্রয়োজন বোধ করছি, কারন এই অভিযোগ আমার প্রতি হতাশাজনকভাবে সর্বজনীন।

 মৌলবাদিতা এবং বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে নাশকতামুলক তৎপরতা: 

মৌলবাদীরা বিশ্বাস করেন যে তারাই ঠিক কারন সেই সত্যটিকে তারা কোন একটি পবিত্র গ্রন্থে পড়েছেন এবং আগে থেকেই, তারা জানেন, কোনকিছুই সেই ধারনকৃত লালিত বিশ্বাস থেকে তাদেরকে একচুলও নাড়াতে পারবে না। প্রবিত্র গ্রন্হের সত্য হচ্ছে একধরনের এক্সিয়ম বা কোন প্রমান বা যুক্তি ছাড়াই যাকে সত্য বলে মেনে নেয়া হয়, যা কখনোই কোন যৌক্তিক আলোচনার উপসংহার না। যাই হোক না কেন পবিত্র গ্রন্থ অবশ্যই সত্যি, এমন কি যখন যথেষ্ট প্রমান এর বীপরিতে। বিরুদ্ধ সেই প্রমানগুলোই অবশ্যই ছুড়ে ফেলে দিতে হবে, কারন পবিত্র গ্রন্থ অবশ্য মান্য। অথচ ঠিক এর বীপরিত, হচ্ছি আমি, একজন বৈজ্ঞানিক হিসাবে কোন কিছুতে বিশ্বাস স্থাপন করি (যেমন ধরুন বিবর্তন প্রক্রিয়া), সেটা প্রবিত্র গ্রন্থে পড়েছি বলে তা কিন্তু না বরং আমি বিশ্বাস করি কারন আমি এর স্বপক্ষে সব প্রমানগুলোর বিশ্লেষন ও পর্যালোচনা করেছি এবং আসলেই দুটো মধ্যে পার্থক্য অনেক বেশী। বিবর্তন সংক্রান্ত কোন বই এ বিশ্বাস স্থাপন করা হয় এ জন্য না যে তারা পবিত্র গ্রন্থের মত কোন কিছু, বরং তাদের বিশ্বাস করা হয় কারন সেই বইগুলোতে সাধারণত পরস্পরকে মজবুত বা দৃঢ় করে এমন অগনিত প্রমান উপস্থাপন করে থাকে। নীতিগতভাবে, কোন একজন পাঠক চাইলেই সেই প্রমানগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন। বিজ্ঞানের কোন বইয়ে যখন ভুল হয়, কেউ না কেউ একসময় সেই ভুলটি উদঘাটন করে এবং এর পরবর্তী সংস্করনগুলোতে সেই ভুলটি সংশোধন করা হয়। এবং খুবই স্পষ্টভাবে আমরা এমন কিছু কোন ধর্মগ্রন্থর সাথে হতে দেখিনা।

দার্শনিকরা, বিশেষ করে সৌখিন দার্শনিকরা যাদের অল্প কিছু দর্শন সম্বন্ধে লেখাপড়া আছে এবং আরো বিশেষভাবে যারা সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ বা কালচারাল রিলেটিভিজম দ্বারা সংক্রমিত তারা হয়তো বা  এই পর্যায়ে ক্লান্তিকর একটি রেড হেরিং দেখাবেন বা মুল বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে যাবার প্রচেষ্টায় একটি ভ্রান্ত যুক্তি প্রস্তাব করতে পারেন: একজন বিজ্ঞানীর ’স্বাক্ষ্য প্রমানের‘ উপর বিশ্বাসটাইতো কোন মৌলবাদী বিশ্বাসের মতই একটি বিষয়। এই বিষয়টি নিয়ে আমি আমার অন্য কিছু লেখায় বিশদ আলোচনা করেছি আগে, এখানে শুধু সংক্ষিপ্তভাবে তার কিছুটা পুনরাবৃত্তি করবো। সৌখিন দার্শনিকের টুপি মাথায় দিয়ে আমরা যা কিছ দাবী করি না কেন, আমরা সবাই আমাদের জীবনে প্রমানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করি। যদি আমি কোন হত্যার জন্য অভিযুক্ত হই, বিবাদী পক্ষের আইনজীবি আমাকে কঠোর ভাবে জিজ্ঞেস করবেন, অপরাধ সংঘটিত হবার আগের রাত্রে আমি শিকাগোতে ছিলাম এই কথাটি সত্যি কিনা। আমি এখানে দর্শনের যুক্তি দিয়ে এমন কোন উত্তর দিয়ে কিন্তু পাশ কাটিয়ে যেতে পারবো না, যেমন: “এটা নির্ভর করছে আপনি ‘সত্যি’ বলতে কি বোঝাচ্ছেন সেই বিষয়টার উপর,” কিংবা কোন নৃতাত্ত্বিক বা আপেক্ষিকতাবাদী আবেদন দিয়ে , যেমন, “শুধুমাত্র আপনার পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক ‘ছিলাম’ অর্থে  আমি শিকাগোতে ছিলাম সেদিন;”; বঙ্গোলীজদের এই ‘কোথাও থাকার ধারনাটি’ সম্পুর্ণ ভিন্ন, সে অনুযায়ী আপনি সত্যি ‘কোথাও আছেন’ বলতে বোঝাবে, আপনি হচ্ছেন সুগন্ধী তেল মর্দন করা নির্বাচিত একজন বয়োবৃদ্ধ , যিনি ছাগলের শুকনো অন্ডকোষ থেকে নস্যি নেবার যোগ্যতা রাখেন;”

হতে পারে বিজ্ঞানীরা মৌলবাদী, ’সত্য’ বলতে কি বোঝায় যখন সেটি কোন বিমুর্ত উপায়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়; কিন্তু সেঅর্থেও বাকীরাও কিন্তু সেরকমই মৌলবাদী। আমি যখন বলছি নিউজিল্যান্ড এর অবস্থান হচ্ছে দক্ষিন গোলার্ধে তার চেয়ে আবার আমি যখন বলছি বিবর্তন সত্যি, তা কিন্তু  কোন অংশেই আমাকে বেশী মৌলবাদী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করছে না। আমরা বিবর্তনে বিশ্বাস করি কারন এর স্বপক্ষে অসংখ্য স্বাক্ষ্য প্রমান আছে এবং আমরা এটিকে অবশ্যই দ্রুত প্রত্যাখান করতে দ্বিধা বোধ করবো না, যদি নতুন কোন স্বাক্ষ্য প্রমান আমাদের হাতে আসে যা কিনা বিবর্তনকে সম্পুর্ণ ভুল প্রমানিত করে; কোন সত্যিকারের মৌলবাদী এভাবে কোন কথা কখনোই বলবেন না।

খুবই সহজ তীব্র আবেগ আর মৌলিবাদীতা, এই দুটি বিষয়কে একই মনে করে সংশয়াচ্ছন্ন হওয়া। আমাকে যথেষ্ট আবেগ তাড়িত মনে হতে পারে আমি যখন মৌলবাদী কোন সৃষ্টিবাদী বা ক্রিয়েশনিষ্টদের বিরুদ্ধে বিবর্তনের পক্ষে লড়াই করি, কিন্তু এর কারন তাদের মৌলবাদের প্রতিদ্বন্দী এটি আমার কোন মৌলবাদ তা কিন্তু না; এর কারন বিবর্তনের স্বপক্ষে প্রশ্নাতীতভাবে অত্যন্ত দৃঢ় অসংখ্য স্বাক্ষ্য প্রমান আছে এবং আমি আবেগময় একটি হতাশার শিকার হই যখন দেখি আমার বিরোধী পক্ষ সেটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন বা সাধারণত যা হয়ে থাকে, প্রমানগুলোর দিকে তারা নজর দিতেই অস্বীকার করেন, শুধুমাত্র যার কারন যখন এটি তাদের পবিত্র গ্রন্থর সাথে ভিন্নমত পোষন করছে। আমার সেই আবেগ আরো জোরালো হয়, যখন আমি দেখি এই সব দুর্ভাগা মৌলবাদীরা এবং তারা যাদের প্রভাবিত করছে তারা  ঠিক কতটুকু ’বঞ্চিত’ হচ্ছেন বিবর্তনের ধারনাটি অনুধাবন না করতে পারার জন্য। বিবর্তনের সত্যগুলো এবং সেই সাথে অন্যান্য বৈজ্ঞানিক সত্যগুলো প্রত্যেকটি অত্যন্ত্ গভীরভাবে বিস্ময়কর এবং সুন্দর। আসলেই কতুটকু দুর্ভাগ্যজনক যদি তা না জেনেই কাউকে মরতে হয়! অবশ্যই সেই বিষয়টি আমাকে তীব্র আবেগাক্রন্ত করে ফেলে, আর কেনই বা সেটা করবে না? কিন্তু বিবর্তনে আমার বিশ্বাস কখনোই মৌলবাদ সমতুল্য না আর এটি কোন অন্ধ বিশ্বাসও ‍না, কারন আমি জানি আমার মন পরিবর্তন করতে কি প্রয়োজন এবং আমি আনন্দের সাথেই তা করবো যদি প্রয়োজনীয় প্রমান মেলে।

এবং এরকম ঘটনা বহু ঘটেছেও। আগে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র থাকাকালীন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রানী বিজ্ঞান বিভাগের একজন সন্মানিত নেতৃস্থানীয় বিশেষজ্ঞর গল্প বলেছিলাম, বহু বছর ধরে তিনি অত্যন্ত্ আবেগের সাথেই বিশ্বাস করতেন এবং পড়াতেন যে গলজি অ্যাপারাটাস ( প্রানী কোষের অভ্যন্তরে একটি আনুবীক্ষনীক অঙ্গানু) এর আসলে বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই: একটি বিভ্রম বা ভুল করে মনে করা কোন একটি বৈশিষ্ট। প্রতি সোমবার বিকেলে প্রানী বিজ্ঞান বিভাগের একটি প্রথা ছিল যে সমস্ত ডিপার্টমেন্ট একজন ভিজিটিং লেকচারারের সেমিনারে অংশ নেবে। একটি সোমবারে আমাদের অতিথি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কোষ বিজ্ঞানী, যিনি সম্পুর্ন বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য প্রমান সহ আমাদের জানান যে গলজি অ্যাপারাটাস বলে আসলেই কোষের অভ্যন্তরে অঙ্গানু আছে। সেই বক্তৃতার শেষে সেই বৃদ্ধ অধ্যাপক হল ভর্তি মানুষের সামনে এসে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীর সাথে হাত মেলালেন এবং বেশ আবেগের সাথে বলেন, ”আমার প্রিয় সহকর্মী, আপনাকে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই, গত পনেরো বছর ধরে আমি ভুল জানতাম;” আমরা সবাই তখন হাততালি দিয়ে উঠেছিলাম তীব্র জোরে। কোন মৌলবাদী কখনোই তা করবে না। এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে অনেক বিজ্ঞানীও হয়তো তা করবেন না, কিন্তু সব বিজ্ঞানী অন্তত সায় দেবে এটিকে আদর্শ হিসাবে চিহ্নিত করে। যার ব্যতিক্রম রাজনীতিবিদরা কিন্তু তা করবেন না কখনোই, তারা হয়তো বলবেন এগুলো হচ্ছে মত একেবারে উল্টোদিকে ঘুরিয়ে নেয়া বা ডিগবাজী মারা। একটু আগেই বর্ণনা করা এই ঘটনাটির স্মৃতি এখনও আমাকে আবেগতাড়িত করে।

একজন বৈজ্ঞানিক হিসাবে, আমি মৌলবাদী ধর্মের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষন করি কারন এটি সক্রিয়ভাবে বৈজ্ঞানিক সব উদ্যোগকে কলুষিত করছে। ধর্ম আমাদের শেখায় আমাদের যেন আমাদের মন পরিবর্তন না করি, মহাবিশ্বে যত বিস্ময়কর জিনিস জানার আছে আমরা যেন সেগুলো সম্বন্ধে জানার কোন আগ্রহ অনুভব ‍কিংবা সক্রিয়ভাবে জানার চেষ্টা করি; এটি বিজ্ঞানকে দুর্বল করে, আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে দুর্বল করে দেয়। আমার জানা মতে এর সবচেয়ে দু:খজনক ‍উদহারন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভুতত্ত্ববিদ কার্ট ওয়াইস, যিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ডেটনে ব্রায়ান কলেজের সেন্টার ফর অরিজিনস রিসার্চ এর পরিচালক। কলেজটির নাম ব্রায়ান হবার কারন কিন্তু কোন দুর্ঘটনা নয়, এর নামকরণ হয়েছে উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান এর নামানুসারে, যিনি বিজ্ঞান শিক্ষক জন স্কোপস এর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন বিখ্যাত ১৯২৫ সালের ডেটন ’মাঙ্কি ট্রায়াল’ এ। ওয়াইস তার শৈশবের স্বপ্ন পুর্ণ করতে পারতেন কোন একটি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হয়ে, যার মটো হয়তো হতো ’বিশ্লেষনাত্মক ভাবে চিন্তা করতে হবে’, ব্রায়ান কলেজের ওয়েবসাইটের অক্সিমোরোনের মত কোন কিছু না ‘বিশ্লেষনী মনোভাব এবং বাইবেল এর মত চিন্তা করুন‘; ওয়াইস শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভুতত্ত্ববিদ্যায় ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন এবং এরপর আরো দুটি উচ্চতর ডিগ্রী নেন ভুতত্ত্ববিদ্যা এবং জীবাশ্মবিদ্যায় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ( কোন অংশেই যা কম নয়), যেখানে তিনি স্টিফেন ডে গুল্ড এর ছাত্র ছিলেন ( আরো বিশাল একটি ব্যাপার); তিনি খুবই যোগ্য এবং মেধাবী তরুণ বিজ্ঞানী ছিলেন, প্রকৃত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ানো এবং গবেষনা করবেন, তার জীবনের এমন স্বপ্ন পুরণের পথেই তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন।

ঠিক তখনই একটি দুর্ঘটনা ঘটে।এই আঘাতটি বাইরে থেকে না, তার ভিতর থেকেই এসেছিল..তার নিজের মনে, যে মন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়েছিল একটি মৌলবাদী ধর্মের ছত্রছায়ায় তার বেড়ে ওঠার কারনে, যে মৌলবাদী বিশ্বাস তাকে বাধ্য করে পৃথিবী -তার শিকাগো ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ভুতাত্ত্বিক পড়াশুনার বিষয় – দশ হাজার বছরের চেয়ে কম প্রাচীন তা বিশ্বাস করার জন্য। যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন তিনি বোঝার মতো যে, তার ধর্মবিশ্বাস আর বিজ্ঞান একটি মুখোমুখি সংঘর্ষের দিকে এগুচ্ছে এবং তার মনের ভিতরেও সেই দ্বন্দও ক্রমশ প্রকট হয়েছিল এবং একদিন তিনি আর সহ্য করতে পারেননি; একদিন ব্যপারটা সমাধান করার জন্য একটি কাচি হাতে বাইবেলে নিয়ে বসলেন, তিনি পুরো বাইবেলের যে অংশগুলোকে বাদ যেতে হবে যদি পৃথিবী সম্বন্ধে তার বৈজ্ঞানিক ধারনা সত্য হয়ে থাকে, সেগুলো আক্ষরিক অর্থে কাটতে বসলেন; এই অতিমাত্রায় সৎ আর কষ্টকর অনুশীলনের পর, তার বাইবেল এর আসলে খুব কম অংশই অক্ষত ছিল যে,

 যতই চেষ্টা করিনা কেন আমি, সারা ধর্মগ্রন্থ জুড়ে অক্ষত মার্জিন থাকার সুবিধা সত্ত্বেও আমার পক্ষে বাইবেলটা দুই ভাগে ভাগ না হয়ে যাওয়া ছাড়া ধরতেই পারছিলাম না; আমাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে বিবর্তন আর ধর্মগ্রন্থের মধ্যে কোনটা আমি বেছে নেব। হয় ধর্মগ্রন্থ সত্যি এবং বিবর্তন ভুল বা বিবর্তন সত্যি এবং আমাকে অবশ্যই বাইবেল ছুড়ে ফেলতে হবে। ঠিক সেই মহুর্তে, সেই রাতে আমি ঈশ্বরের কথা মেনে নেই এবং এর পরিপন্থী সবকিছুকে প্রত্যাখান করি, বিবর্তন সহ। এবং এভাবে,অনেক দু:খ সাথে বিজ্ঞানে আমার সব স্বপ্ন আর আশাকে আগুনে ছুড়ে ফেলি।

বিষয়টি আমাকে দারুন ব্যাথিত করে; কিন্তু অন্যদিকে গলজি অ্যাপারাটাসের গল্পটি আমাকে আন্দোলিত করে মুগ্ধতায় আর শ্রদ্ধায়, কার্ট ওয়াইস এর কাহিনী আসলে করুণারই উদ্রেক করে.. করুনা এবং বিতৃষ্ণা। তার নিজের পেশাগত জীবন আর তার জীবনের সুখের প্রতি এই আঘাত তার নিজেরই দেয়া.. তা এত বেশী অপ্রয়োজনীয় ছিল.. সহজেই তা এড়ানো সম্ভব ছিল। শুধু তাকে বাইবেলকে ছুড়ে ফেলে দিতে হতো বা তিনি সেটাকে প্রতিকী বা রুপকভাবে ব্যাখ্যা করতেন, যেমন করে বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিকরা করে থাকেন। তবে তার বদলে তিনি মৌলবাদীদের মতই কাজটি করলেন এবং বিজ্ঞানকে ছুড়ে ফেলে দেন তার জীবন থেকে..সেই সাথে প্রমান এবং যুক্তি, তার সব স্বপ্ন আর আশাগুলো;

হয়তো মৌলবাদীদের মধ্যে অনন্য একটি উদহারন , কার্ট ওয়াইস সৎ ছিলেন, অতিমাত্রায় সৎ একজন মানুষ, যার সততা তাকে কষ্ট দিয়েছে এবং ধ্বংশ করেছে। তাকেই টেম্পলটন পুরষ্কার দেয়া উচিৎ, তিনি হয়তো এর প্রথম সত্যিকারের যোগ্য পুরষ্কৃত কেউ হতে পারতেন। ওয়াইস সবার সামনে যে বিষয়টি নিয়ে আসেন, সেটা গোপনে সবার চোখের আড়ালে ঘটছে সবসময়ই, সাধারনত সকল মৌলবাদীদের মনে, যখন তারা বৈজ্ঞানিক স্বাক্ষ্য প্রমানের মুখোমুখি হন, যা তাদের দৃঢ় ভাবে ধারন করা মতামতের সাথে ভিন্নমত পোষন করে। তার কাহিনী উপসংহারটি লক্ষ্য করুন:

 যদিও একটি কয়েক হাজার বছর বয়সী তরুন পৃথিবীকে মেনে নেবার জন্য প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক কারণ আছে, তবে আমি একজন ইয়াং আর্থ ক্রিয়েশনিষ্ট কারন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাওয়া আমার ধারনা; আমি যেমন আমার অধ্যাপকদের সাথে যা আলাপ করেছি বহু বছর আগে,যখন কলেজে ছিলাম, যদি এই মহাবিশ্বের সব প্রমান সৃষ্টিবাদের বিরুদ্ধে যায়, আমি হবো প্রথম ব্যক্তি সেটা স্বীকার করার জন্য, তারপরও আমি সৃষ্টিবাদী থাকবো কারন ঈশ্বরের নিজের কথায় তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে, এবং এখানেই আমাকে অবশ্যই দাড়াতে হবে।

তিনি সম্ভবত লুথারকে উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন তার শেষ সিদ্ধান্তের স্থির হয়ে দাড়ানোর কথা বলতে, যেমন লুথার তার নিজের মুল বক্তব্যকে ভিটেনবুর্গ এর চার্চের দরজায় যেমন লাগিয়ে দিয়েছিলেন।   কিন্তু হতভাগা কুর্ট ওয়াইস আমাকে বরং ১৯৮৪ সালের উইনস্টোন স্মিথ এর কথাই বেশী মনে করিয়ে দেয়, যে কিনা যদি বিগ ব্রাদার বলেন দুই আর দুই যোগ করলে পাচ হবে, তাই বিশ্বাস করার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠা করেছিলেন (উনস্টোন স্মিথ জর্জ ওরওয়েল এর Nineteen Eighty-Four উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র); যদিও উইনস্টোন, নির্যাতিত হয়েছিলেন; ওয়াইস এই ভিন্নচিন্তার হেতু কিন্ত অবশ্যম্ভাবী শারীরিক নির্যাতনের শঙ্কা নয় বরং অন্য একটি অবশ্যম্ভাবী বাধ্যবাধকতা ছিল ‍তার জন্য – আপাতদৃষ্টিতে কারো কারো কাছে যা অনস্বীকার্য ও শিরোধার্য – তা হলো ধর্মীয় বিশ্বাস: তর্কসাপেক্ষে যা মানসিক নিপীড়নেরই আরেকটি একটি রুপ। আমি ধর্ম সম্বন্ধে বৈরী মনোভাব পোষন করি কারন কার্ট ওয়াইস এর সাথে এটি যা করেছে এবং ধর্ম যদি হার্ভার্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত কোন ভুতত্ত্ববিদের সাথে এমন করতে পারে তাহলে চিন্তা করে দেখুন অন্য কোন সাধারন মানুষতের, যাদের সেই মেধাও নেই এবং প্রতিরোধ করার মত কোন প্রস্তুতিও নেই, তাদের ক্ষেত্রে তাহলে এটি কি করতে পারে।

অগনিত নিরীহ, উৎসাহী, কৌতুহলী, আর পরিষ্কার ভালো মনের তরুন শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে ধ্বংশ করতে মৌলবাদী ধর্ম বদ্ধপরিকর। আর অমৌলবাদীদের তথাকথিত ’মৃদু’ আর ’কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন’ ধর্ম হয়তো তা করছে না ঠিকই, তবে অবশ্যই এটি পৃথিবীকে মৌলবাদীদের জন্য নিরাপদ করে তুলছে, খুব শৈশব থেকেই শিশুদের একটি মন্ত্র শিখিয়ে, সেটা হচ্ছে: প্রশ্নাতীত অন্ধ বিশ্বাস হচ্ছে একটি মহৎ গুন।

________________________ চলবে

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : অষ্টম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s