চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব (পাঁচ)


ছবি:  চার্লস ডারউইনের On the Origin of Species  এর প্রথম সংস্করন।( সুত্র:  ইন্টারনেট), রাজকীয় সবুজ কাপড়ে ডারউইন যখন প্রথম বইটি দেখেছিলেন..সেই মুহুর্তের অনুভুতি লিখেছিলেন …এভাবে I am infinitely pleased ‍and proud at the appearance of my child. বিজ্ঞানের ইতিহাসের বোধহয় সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন বইটি হলো চার্লস ডারউইনের লেখা  On the Origin of Species বইটি; ১৮৫৯ সালে ২৪ নভেম্বর বইটি প্রকাশ করেছিলেন লন্ডনের প্রকাশক জন মারে। জীববিজ্ঞান সহ বিজ্ঞানের প্রায় সব শাখায়, প্রায় বছর আগে প্রকাশিত এ্ই বইটির প্রভাব বলার অপেক্ষা রাখেনা।

 

লেখাটির মুল সুত্র: Carl Zimmer এর Evolution, the triumph of an idea র প্রথম দুটি অধ্যায়; এছাড়াও কিছু বাড়তি তথ্য এসেছে বিভিন্ন সুত্র থেকে:

চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (এক)
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (দুই)
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব(তিন)
 চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব(এক)
 চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব(দুই)
 চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব(তিন)
 চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব(চার)

দ্বিতীয় পর্ব : যেন কোন হত্যার স্বীকারোক্তি করার মত 
দুই

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মোড়ক ‍উন্মোচন:

জোসেফ হুকার এর উত্থাপিত কিছু সন্দেহ নিয়ে ভাবতে শুরু করেন ডারউইন; ডারউইনের একটি দাবী ছিল, উদ্ভিদ এবং প্রানী যারা কোন দ্বীপে বসবাস করে, তারা সেখানেই সৃষ্ট হয়নি, তারা হচ্ছে আদিতে এখানে বসতি স্থাপনকারীদের পরিবর্তিত বংশধর; যদি তাই সত্যি হয়, তাহলে সেই দ্বীপে তাদের পৌছানোর জন্য  একটি উপায়ের প্রয়োজন আছে; হুকার একজন অভিজ্ঞ উদ্ভিদবিজ্ঞানী, তিনি জানেন বীজ বাতাসে বা পানিতে ভেসে বহু মাইল অতিক্রম করতে পারে, কিন্তু ডারউইন যে পরিমান দুরত্বের কথা বলেছেন, সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন;

হুকারের সন্দেহ মোকাবেল করতে ডারউইন একটি চৌবাচ্চা ভর্তি লবন পানিতে বীজ ছড়িয়ে দেন, এবং পরে পরীক্ষা করে দেখেন যে চার মাস পরও বীজগুলো সক্রিয় থাকে এবং মাটিতে রোপন করলে তাদের অঙ্কুরোদগমও হয়; তিনি আবিষ্কার করেন পাখিরা তাদের পায়ের সাথে বীজ বহন করতে পারে এবং প্যাচাদের অন্ত্রনালীতে খাওয়া  বীজও সক্রিয় থাকতে পারে, তাদের মলের সাথে বেরিয়ে আসা বীজ সক্রিয় থাকে;


ছবি: জোসেফ ডাল্টন হুকার (Sir Joseph Dalton Hooker 1817 – 1911), বৃটেনের অন্যতম সেরা উদ্ভিদবিজ্ঞানী, যিনি ভৌগলিক উদ্ভিদবিদ্যার জনক ছিলেন; প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটি প্রথম ডারউইন এমা এবং জোসেফ হুকারকে জানিয়েছিলেন; ডারউইনের ঘনিষ্ট বন্ধু হুকার কিউর রয়্যাল বোটানিক্যাল গারডেনস এর পরিচালক ছিলেন দীর্ঘ সময়কাল।

ডারউইনের তত্ত্ব একটি হাইপোথিসিস সৃষ্টি করেছিল এবং পরীক্ষার মাধ্যমেই হাইপোথিসিসটি সত্য প্রমানিত হয়; ডারউইন আবারো তার ব্রীডিং বা কৃত্রিম প্রজননের গবেষনাও শুরু করেন;  তার কিছু বন্ধু ছিলো যাদের সাথে তিনি জিন খেতেন মাঝে মাঝে, তাদের কেউ কেউ কবুতরের প্রজননের সাথে জড়িত ছিলেন, তারাই তাকে জানিয়েছিল কিভাবে ছোট ছোট প্রকরণ বা ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টাবলী ব্যবহার করে একেবারে নতুন জাতের কবুতর প্রজনন করা সম্ভব; ডারউইন নিজেই  কবুতর পালতে শুরু করেন তাদের কৃত্রিম প্রজননের পরীক্ষার জন্য এবং তাদের গঠন দেখতে তাদের মেরে গরমপানিতে সিদ্ধ করে কংকালটি আলাদা করে পরীক্ষা করে দেখেন কি পরিমান ভিন্নতা আছে ভিন্ন ভিন্ন এই জাতগুলোর মধ্যে; তিনি দেখেন যে প্রতিটি কৃত্রিম প্রজননেনর মাধ্যমে সৃষ্ট ব্রীড এত বেশী ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টসুচক, যদি তারা বন্য হতো তাহলে তাদের আলাদা আলাদা প্রজাতি হিসাবে চিহ্নিত করা হতো; কবুতরের অ্যানাটোমির প্রতিটি অংশই অন্য ভ্যারাইটি বা প্রকরণের থেকে আলাদা, তাদের নাকের ছিদ্র থেকে তাদের বুকের পাজর, ডিমের আকৃতি; কিন্তু সবার জানা প্রতিটি কবুতরের জাত হচ্ছে একটি প্রজাতির রক ডোভ এর বংশধর;

১৮৫৬ সাল নাগাদ ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের স্বপক্ষে এত বেশী প্রমান জড়ো করেছিলেন, যে তিনি আবারো তার সীল গালা করা ১৮৪৪ সালের সেই প্রবন্ধটির খাম খোলেন এবং নতুন করে লেখা শুরু করেন, খুব দ্রুতই  ছোট সেই রচনাটি বিশাল আকারের লক্ষাধিক শব্দ সম্বলিত একটি পুর্ণাঙ্গ গবেষনা গ্রন্থে রুপান্তরিত হয়;  এতগুলো বছরের তার সমস্ত অভিজ্ঞতা- তার সমুদ্রযাত্রা, তার পড়াশুনা, বিভিন্ন জনের সাথে তার আলোচনা, বার্ণাকল আর বীজ নিয়ে তার গবেষনা সবকিছু তিনি বিস্তারিতভাবে সাজালেন তার তত্ত্বটির স্বপক্ষে; তিনি দৃঢ়সঙ্কল্প ছিলেন তার তত্ত্বের বিরুদ্ধবাদীতাকে তিনি অসংখ্য বাস্তব স্বাক্ষ্য প্রমানের বন্যায় ভাসিয়ে দেবেন;

১৮৪৪ সানে এমাকে যখন চার্লস তার পান্ডুলিপিটি পড়তে দিয়েছিলেন, তারপর থেকে তিনি তার তত্ত্ব  বিষয়ে খুব সামান্যই কথা বলেছিলেন, কিন্তু এখন তিনি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী আরো কিছু মানুষের কাছে বিষয়টি উন্মোচন করতে, বিশেষ করে তরুন প্রজন্মের কিছু বিজ্ঞানী, যারা নতুন কোন সম্ভাবনার প্রতি অনেক বেশী মুক্তমনা ও সংস্কারমুক্ত; এরকম একজন ছিলেন তার সাম্প্রতিক বন্ধু .. যার নাম থমাস হাক্সলী;


ছবি: থমাস হেনরী হাক্সলী; (Thomas Henry Huxley  1825 – 29 June 1895), বৃটিশ জীববিজ্ঞানী , ডারউইনের বিবর্তনের তত্ত্বের প্রতি তার জোরালো সমর্থনের জন্য তাকে বলা হতো ডারউইনের বুল ডগ; ১৮৬০ সালে স্যামুয়েল উলবারফোর্সের সাথে অক্সফোর্ডে তার বিতর্কটি বিবর্তন তত্ত্বের গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ একটি মুহুর্ত ছিল;

ডারউইনের মত সম্ভ্রান্ত সচ্ছল পরিবারের বিজ্ঞান চর্চা হাক্সলীর ভাগ্যে জোটেনি; কসাইখানার উপরের ছোট একটি ঘরে তার জন্ম হয়েছিল, তার বাবা, একজন ব্যর্থ স্কুলের টিচার এবং তারপর একটি ব্যর্থ ব্যাঙ্কের পরিচালক; হাক্সলীকে পড়ানোর মত তেমন কোন অর্থ তার ছিল না; ১৩ বছর বয়সে একজন ডাক্তারের সহকারী হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি, তিন বছর পর সেই ডাক্তারের সাথে লন্ডনে আসেন হাক্সলী, যেখানে তার সুযোগ হয় সার্জন হিসাবে একটি প্রশিক্ষন নেবার, শ্বশুর বাড়ী থেকে কিছু ধার, সামান্য বৃত্তির টাকা নিয়ে কষ্টে সৃষ্ঠে তাকে তার প্রশিক্ষন শেষ করতে হয়; তার ধার করা টাকা শোধ দেবার তখন একটাই উপায় ছিল, তাহলো নিউ গিনি অভিমুখে সমুদ্র যাত্রা করা এইচ এম এস র‌্যাটলস্নেক নামের একটি জাহাজে অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন হিসাবে যোগ দেয়া;  হাক্সলী সেই সময় প্রানীবিজ্ঞান সম্বন্ধে খানিক আগ্রহী হতে শুরু করেছিলেন, এই সুযোগটা তাকে তার মনের মত যত খুশী বিচিত্র নমুনা সংগ্রহ করার সুযোগ করে দিয়েছিল;

১৮৫০ সালে প্রায় ৪ বছর পর হাক্সলী দেশে ফিরে আসেন এবং ডারউইনের মত এই সমুদ্র যাত্রা তাকেও একজন বিজ্ঞানীতে রুপান্তরিত করেছিল; এবং ডারউইনের মতই, তার সুনামও দেশে ফেরার আগেই ইংল্যান্ডে পৌছে যায়, বিশেষ করে পর্তুগীজ মান ও য়ার (Portuguese man o’ war) নামের একটি অদ্ভুত সামুদ্রিক প্রানী সম্বন্ধে তার প্রকাশিত একটি প্রবন্ধর কারনে, যে প্রানীটি আসলে অনেকগুলো একক প্রানীর একটি কলোনী; হাস্কলী রয়্যাল নেভীর সাথে একটি বিশেষ সমঝোতায় আসেন, যারা তাকে বেতন সহ তিন বছরের ছুটি দেয়, তার গবেষনা অব্যাহত রাখার জন্য; কোন ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী না থাকা সত্ত্বে মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি রয়্যাল সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন;

এর মধ্যে অবশ্য নেভী থেকে আরো তিন বার সমুদ্র অভিযানে ডাকা হয়, তিনবার প্রত্যাখ্যান করার পর নেভীর চাকরীটি তিনি হারান, লন্ডনে অন্য কাজ খোজার জন্য তার কঠিন সংগ্রাম শুরু হয় এই সময়, একটি স্কুল অব মাইনস এ খন্ডকালীন চাকরী জোটে তার; পাশাপাশি পত্রিকায় নিবন্ধ আর রিভিউ লেখার কাজ শুরু করেন; সংসার চালানো তার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে যেত; হাক্সলী যারা বিজ্ঞানের নানা শাখায় আধিপাত্য বিস্তার করতেন শুধুমাত্র তাদের সম্পদ থাকার কারনে, তাদের প্রতি খানিকটা তিক্ততার অনুভুতি পোষন করতেন; তারপরও তার সীমিত সামর্থের মধ্যে নিজের জন্য কিছু সুনাম প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং সাহসী হাক্সলী তখন ইংরেজ জীববিজ্ঞানীদের পুরোধা রিচার্ড ওয়েনকে আক্রমন করতে দ্বিধা বোধ করতেন না;

ওয়েন সে সময় একটি স্বর্গীয় বিবর্তনের ধারনা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছিলেন, তার প্রস্তাব ছিল, সময়ের প্ররিক্রমায় ঈশ্বর নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করেন, তবে সবসময়ই তার মুল পরিকল্পনার আদিরুপ বা একটি আর্কিটাইপের উপর ভিত্তি করে, ওয়েন জীবনকে দেখতেন ধাপে ধাপে সুন্দর একটি স্বর্গীয় পরিকল্পনার ক্রমশ উন্মোচন হিসাবে, যা সাধারন থেকে ধীরে ধীরে বিশেষায়িত আর জটিলতর সৃষ্টির দিকে অগ্রসর হতে থাকে: একটি “ঐশ্বরিক নির্দেশায়িত নিরন্তন পরিবর্তন (ordained continuous becoming) ; ওয়েন তার অর্থবান পৃষ্ঠপোষকদের শান্ত করার জন্য, যারা এখনও স্বাচ্ছন্দবোধ করে প্রজাতির জটিলতা ব্যাখ্যা করার জন্য ধর্মতত্ত্বের আশ্রয় নিতে, আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, ”জীববিজ্ঞান এখনও সর্ব্বোচ্চ নৈতিক ধারনাগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত ;”

নানা বক্তৃতা আর পত্রিকার কলামে হাক্সলী ওয়েনকে উপহাস করেন  ঈশ্বরকে একজন ড্রাফটসম্যান বা নকশা কারিগরে রুপান্তর এবং জীবাশ্ম রেকর্ডকে ঈশ্বরের বার বার পুণরাবৃত্তি বা রিভিশন হিসাবে দেখানো এই প্রচেষ্ঠাকে; হাক্সলী কোন ধরনের বিবর্তনের তত্ত্ব ব্যাখ্যা মেনে নেননি, তা স্বর্গীয় হোক বা সাধারণ প্রাকৃতিকই হোক না কেন; তিনি পৃথিবীর বা জীবনের ইতিহাসের কোন অগ্রগতি দেখেননি তখন পর্যন্ত, তবে তার ধারনাটি বদলে যায় ১৮৫৬ সালে এক সপ্তাহন্তে, যখণ ডারউইন হাক্সলীকে তার ডাউন হাউসে নিমন্ত্রন জানান;

ডারউইন তাকে বিবর্তন সংক্রান্ত তার নিজস্ব সংস্করণটি বর্ণনা করেন, যা প্রকৃতির নানা প্যাটার্ণকে ব্যাখ্যা করেতে পারে ঐশ্বরিক বা বিশেষ কোন সত্ত্বার হস্তক্ষেপ ছাড়াই; তিনি হাক্সলীকে তার কবুতর আর বীজ দেখান, এবং বেশ তাড়াতাড়ি হাক্সলী ডারউইনের ব্যাখ্যা বুঝতে পারেন, এবং পরবর্তীতে তিনিই ছিলেন ডারউইনের সবচেয়ে কাছের এবং শক্তিশারী একজন মিত্র;

ডারউইনের এই ধীরে ধীরে সতর্কতার সাথে তার তত্ত্বকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার প্রক্রিয়া ভালোভাবেই এগিয়ে চলছিল, একটি চিঠি আসার আগ পর্যন্ত, জুন ১৮,১৮৫৮ সালে ডাউন হাউসে সএকটি চিঠি এসে পৌছায়, ডারউইন চিঠিটা পান পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে সুদুর মালয় দ্বীপপুন্জ থেকে একজন ভ্রমণরত প্রকৃতি বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস এর কাছ থেকে; ওয়ালেস তখন দক্ষিন পুর্ব এশিয়ায়, নানা ধরনের নমুনা সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে পাঠাতেন তার খরচ চালানেরা জন্য এবং প্রজাতির বিবর্তনের ব্যাখ্যা খুজতেন তার কাজের ফাকে; তার ২১ বছর বয়সে তিনি রবার্ট চেম্বারস এর Vestiges of the Natural History of Creation বইটি পড়েছিলেন, এবং সময়ের পরিক্রমায় প্রকৃতির পরিবর্তনের এবং ক্রমান্বয়ে উর্ধমুখী সরল থেকে জটিলতর সৃষ্টির ধারনাটি তাকে মুগ্ধ করেছিল; ডারউইনের বীগল ভ্রমনের কাহিনী পড়ে তিনিও সিদ্ধান্ত নেন, তাকেও যেভাবে হোক এমন সমুদ্র যাত্রায় যেতে হবে;

১৮৪৮ সালে তার প্রথম যাত্রা ছিল আমাজন জঙ্গল অভিমুখে; এরপর তিনি যান ডাচ উপনিবেশ বাটাভিয়ায়, যা এখন ইন্দোনেশিয়া নামে পরিচিত; তার উদ্দেশ্য ওরাঙ উটান সম্বন্ধে জানা, ও সেই সাথে মানুষের বংশধারা সম্বন্ধে কিছু জ্ঞান অর্জন করা; সাধারন পরিবারের ছেলে ওয়ালেস তার এই যাত্রার ব্যয়ভার মেটাতেন নানা ধরনের প্রানী বা উদ্ভিদ নমুনা সংগ্রহ করে লন্ডনে তার নানা খদ্দের এবং দোকানে পাঠানোর মাধ্যমে; তার নমুনার এরকম একজন খদ্দের ছিলেন ডারউইন, ডারউইন তার কাছ থেকে পাখি সংগ্রহ করতেন, এভাবে দুই প্রকৃতিবিদের সাথে চিঠি আদান প্রদান  শুরু হয়;

ডারউইন ওয়ালেসকে আরো ব্যাপকভাবে এবং তাত্ত্বিকভাবে বিবর্তন  সম্বন্ধে ভাবতে পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং তাকে জানান কিভাবে প্রজাতির সৃষ্টি হয় সে বিষয়ে তার নিজেরও একটি তত্ত্ব আছে; পরে প্রজাতির বিবর্তন সম্বন্ধে স্বতন্ত্রভাবে প্রায় একই ধারনায় উপনীত হওয়া ওয়ালেস সিদ্ধান্ত নেন ডারউইনকে ‍তিনি তার নিজের তত্ত্ব জানিয়ে একটি চিঠি লেখার; আর যখন ডারউইন চিঠি পড়লেন তিনি হতবাক হয়ে গেলেন; ওয়ালেস মালথাস ভালো করে পড়েছেন, এবং তার মত ওয়ালেসও প্রকৃতির উপর জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রভাব কি হতে পারে সেটা ভেবেছিলেন;  এবং ডারউইনের মত তিনিও উপসংহার টানেন এটিও সময়ের পরিক্রমায় প্রজাতিকে পরিবর্তন করে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করতে পারে;

যখন তিনি ওয়ালেসের চিঠি পেয়েছিলেন, তখনও তারা নিজের লেখাটি আরো কয়েক বছর পর তার তত্ত্বটি প্রকাশের কথা ভাবছিলেন; কিন্তু তার এখন চোখের সামনেই আরেকজন বিজ্ঞানীর হাতে লেখা তার নিজের আবিষ্কৃত তত্ত্বের অনেকটুকু, যদিও হুবুহু নয় : ওয়ালেস একই প্রজাতির সদস্যদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি, তিনি শুধু প্রস্তাব করেছিলেন, অযোগ্য বা আনফিট সদস্যদের বাছাই করে বাদ দিয়ে দেয় পরিবেশ; কিন্তু ডারউইন ওয়ালেস এর প্রাপ্য স্বীকৃতি কেড়ে নেননি, ওয়ালেস এখন স্বীকৃত প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটি সহ-উদ্ভাবক হিসাবে; তার ভদ্রতা আর সন্মানবোধ অনেক গভীর, তিনি তার নিজের বই পুড়িয়ে ফেলবেন তবে এমন কিছু করবেন না যেন কেউ তার দিকে আঙ্গুল তুলে বলতে পারে, তিনি ওয়ালেস এর সাথে প্রতারণা করেছেন; সুতরাং ডারউইন লাইয়েল সাথে আলোচনা করে লীনিয়ান সোসাইটিতে দুটো গবেষনাপত্রই পাঠ করে শোনানো উদ্যোগ নেন; ১৮৫৮ সালে জুন ৩০, সোসাইটির সদস্যরা প্রথম বারের মত ডারউইনের ১৮৪৪ সালে লেখা প্রবন্ধটির সার সংক্ষেপ, এবং ১৮৫৭ সালে তার তত্ত্বের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে হুকারকে লেখা একটি চিঠির কিছু অংশ এবং ডারউইনকে পাঠানো ওয়ালেস এর প্রবন্ধটি শোনেন; তার বিশ বছরের সতর্ক গবেষনা আর এটি প্রকাশ করার বিষয়ে তার ইতস্ততার ইতি হয় হঠাৎ করে; এখন সারা পৃথিবী বিচার করার পালা।


ছবিঃ আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস (বায়ে)বিবর্তন কেমন করে কাজ করছে সে বিষয়েই শুধুমাত্র ডারউইনের মত একই উপসংহারেই পৌছাননি,এমনকি তিনি একই বাক্য ব্যবহার করেছিলেন তার তত্ত্বাটকে ব্যাখা করতে;


ছবি: ওয়ালেস, (ছবিতে তার জীবনের শেষে). ১৮৫৮ সালে ডারউইনকে তার রচনাটা পাঠানোর জন্য কোনদিনও মনস্তাপে ভুগেছিলেন কিনা, তা কখনো প্রকাশ করেননি।

কিন্তু তেমন কোন ধরনের  প্রতিক্রিয়া শুরুতে আসেনি; ডারউইন এবং ওয়ালেস  এর পেপারটি পড়া হয়েছিল লীনিয়ান সোসিইটির দীর্ঘ একটি অধিবেশনে প্রায় তাড়াহুড়ো করেই..এবং নীরবতাই পেপার দুটির ভাগ্যে জুটেছিল সেই মুহুর্তে; হয়তো সেগুলো খুবই সংক্ষিপ্ত, বা সদস্যরা যথেষ্ট নম্র ছিল যে তারা অনুধাবন করতে পারেননি সেমুহুর্তে ডারউইন এবং ওয়ালেস আসলে কি প্রস্তাব করেছেন তাদের যুগান্তকারী দুটি প্রবন্ধে;


ছবি: লিনিয়ান সোসাইটিতে যৌথ পেপার পড়ার শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্মারক প্লেক

এর ডারউইন সিদ্ধান্ত নিলেন একটি বৈজ্ঞানিক জার্ণালে এ বিষয়ে তার মুল যুক্তি গুলো তুলে ধরবেন বিস্তারিতভাবে; এর পরের মাসে ডারউইন অনেক চেষ্টা করলেন তার সুবিশাল প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটিকে ছোট একটি সারসংক্ষেপ আকারে নিয়ে আসার, যেন তিনি তা জার্ণালে প্রকাশ করতে পারেন; কিন্তু যতই দিন যেতে লাগলো তার সেই সার সংক্ষেপই আবারো আকার নিতে শুরু করলো একটি পুর্ণাঙ্গ বইয়ের; কিছু করার ছিল না তার, ডারউইনের কাছে অনেক বেশী যুক্তি তর্ক প্রস্তাব এবং প্রমান ছিল যা যে কোন সম্ভাব্য প্রতি আক্রমন যা তিনি জানতেন অবশ্যই আসবে, তাদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারে; তিনি জন মারে র সাথে যোগাযোগ করেন, তার আগের বইটির লন্ডন ভিত্তিক প্রকাশক, এবং জিজ্ঞাসা করেন তিনি তার আরেকটি নতুন বই প্রকাশ করতে আগ্রহী কিনা ;তার  Journal of Researches বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল, সুতরাং মারে ডারউইনের নতুন বই প্রকাশে রাজী হলেন সাথে সাথেই; এই বইটি নামই On the Origin of Species by Means of Natural Selection;

ছবি: ছবি: Origin of Species এর প্রথম সংস্করন

বইটি লেখার সময়ই ডারউইন বেশ গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন তবে,রাজকীয়  সবুজ রঙের কাপড়ে বাধাই প্রথম কপিটি  তার হাতে এসে পৌছায়, ১৮৫৯ সালের নভেম্বর মাসে;  ইয়র্কশায়ারের একটি বিশ্রামাগারে তিনি আরোগ্য লাভ করছিলেন, এর পর পরই তার জন্য সৌজন্য কপিগুলো আসে, ডারউইন সবার প্রথমেই ওয়ালেসকে একটি কপি তার ইন্দোনেশিয়ার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন; এবং বইটির সাথে ছোট একটি চিরকুট লিখে দিয়েছিলেন, “ঈশ্বরই জানেন, মানুষ কি ভাববে।”

 

__________________________ চলবে

Advertisements
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব (পাঁচ)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s