চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব (চার)


ছবি: চার্লস রবার্ট ডারউইন (১২ ফেব্রুয়ারী ১৮০৯ -১৯ এপ্রিল ১৮৮২)(ছবি সুত্র: Scientific American, January 2009)

লেখাটির মুল সুত্র: Carl Zimmer এর Evolution, the triumph of an idea র প্রথম দুটি অধ্যায়; এছাড়াও কিছু বাড়তি তথ্য এসেছে বিভিন্ন সুত্র থেকে:

চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (এক)
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (দুই)
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব(তিন)
 চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব(এক)
 চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব(দুই)
 চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব(তিন)

দ্বিতীয় পর্ব : যেন কোন হত্যার স্বীকারোক্তি করার মত 
দুই

আবারো আত্মগোপন:

তার গোপনীয়তার দুজন স্বাক্ষী সহ, ডারউইন ধীরে ধীরে যথেষ্ট পরিমান আত্মবিশ্বাস অর্জন করছিলেন তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের ধারনাটি প্রকাশ করার জন্য; কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস পুরোটাই হারিয়ে গিয়েছিল এর একমাস পরে; ১৮৪৪ সালের অক্টোবর মাসে Vestiges of the Natural History of Creation নামের একটি বই ছাপাখানা থেকে হয়ে এসেছিল, যার লেখক একজন স্কটিশ সাংবাদিক, রবার্ট চেম্বারস, সেই মুহুর্তে যিনি বেনামে বা অজানা থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিলেন, এবং নিজের পরিচয় গোপন রাখার জন্য এতটাই চেষ্টা করেছিলেন, তার প্রকাশক কোথায় তাকে সন্মানী পাঠাবেন এমনকি সেই ঠিকানাটিও তিনি লুকিয়ে রেখেছিলেন, অবশ্য এত সতর্কতা অবলম্বন করে তিনি যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন কোন সন্দেহ নেই তাতে;


ছবি: রবার্ট চেম্বারস (Robert Chambers, 1802 – 1871)  স্কটিশ ভুতত্ত্ববিদ, প্রকাশক; চেম্বারস ১৮৪৪ সালে  Vestiges of the Natural History of Creation বইটি প্রকাশ করেন; যদিও তিনি তার নামে এটি প্রকাশ করেননি, তার মৃত্যুর পরেই কেবল লেখকের মুল পরিচয়  জানা গিয়েছিল।  যদিও প্রস্তাবিত বিবর্তন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে চেম্বারস এর যুক্তির দুর্বলতা ছিল তা সত্ত্বেও  বিতর্কিত বহুল পঠিত এই বইটি প্রথম বারের মত বিবর্তন বা ট্রান্সমিউটেশন আর সৃষ্টির সাথে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের যোগসুত্রের ধারনাটি সাধারন পাঠকদের কাছে পৌছে দিয়েছিল।

Vestiges of the Natural History of Creation বইটি কোন সমস্যা ছাড়া তার যাত্রা শুরু করেছিল, সৌরজগত ও তার নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলো বর্ণনা করে ও কিভাবে একটি গ্যাসপুর্ণ ডিস্ক থেকে পদার্থবিদ্যা আর রসায়নের সুত্র মোতাবেক পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলো সেগুলো পর্যালোচনা করার মাধ্যমে; সেই সময়ের আলোকে যতটুকু তথ্য জানা ছিল, সেই আলোকে তিনি ভুতাত্ত্বিক রেকর্ড এবং ইতিহাসে পরিক্রমায় নানা ফসিলের উত্থানের কথা উল্লেখ করেন: সরল জীবাশ্মগুলো প্রথমে এবং পরে জটিলতর জীবাশ্মগুলোর আবির্ভাবে কথা উল্লেখ করে বলেন সময়ের পরিক্রমায় ক্রমান্বয়ে জটিল ও উচ্চ ফর্মের জীবনের আবির্ভাব হয়েছিল যারা তাদের চিহ্ন রেখে গেছে জীবাশ্ম রেকর্ডে; এরপর চেম্বারস একটি বিতর্কিত দাবী করে বসেন; যদি মানুষ মেনে নেয় ঈশ্বর মহাজাগতিক সব বস্তুগুলোকে নিজ হাতে সাজিয়েছেন প্রাকৃতিক সুত্র মেনেই, তাহলে ”জৈব সকল সৃষ্টিও প্রাকৃতিক নিয়মেরই ফসল, যা ঠিক তার মনের ইচ্ছারই প্রতিফলন,” এমনভাবে ভাবতে আমাদের আসলে বাধাটা কোথায়? চিংড়ী থেকে স্কিংক, প্রতিটি প্রজাতি আলাদা আলাদা ভাবে তার সৃষ্টি করতে হয়েছে এমন ভাবার চেয়ে এটাই বরং যুক্তিযুক্ত, নিশ্চয়ই এই ধারনাটি খুব বেশী হাস্যকর না খানিকটা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার জন্য.”

আর কিভাবে এই প্রাকৃতিক নিয়মগুলো কাজ করে সে বিষয়ে চেম্বারস একটি মিশ্র ব্যাখ্যা দিলেন, রসায়নের আর ভ্রুণতত্ত্ববিদ্যা থেকে পরোক্ষ ‍উপায়ে সংগৃহীগ তথ্য নিয়ে তিনি প্রস্তাব করেন, হয়তো বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ কোন নির্জীব পদার্থকে প্রথমে সরল অনুজীবে রুপান্তরিত করেছিল; এরপর জীবন বিবর্তিত হয়েছে এর ক্রমবিকাশকে পরিবর্তন করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; চেম্বারস এখানে নির্ভর করেছিলেন জার্মান জীববিজ্ঞানীদের পরিত্যক্ত পুরোনো কিছু ধারনাকে; তিনি প্রস্তাব করেছিলেন, যে জন্মগত ক্রটির কারন হচ্ছে ভ্রুণের ক্রমবিকাশের প্রতিটি পর্যায় বা ধাপ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়া; একটি শিশুর হয়তো জন্ম হতে পারে হৃৎপিন্ডে চারটির বদলে মাত্র দুটি প্রকোষ্ট নিয়ে, যেমন মাছের মত; ধারনা করা হতো যে এই ক্রটিগুলো হবার কারন ”মায়ের শরীরের এই ভ্রুণের ক্রমবিকাশের প্রক্রিয়ার কোন ক্রটির জন্য, যা প্রভবিত হতে পারে মায়ের দুর্বল স্বাস্থ্য বা অন্য কোন দুর্ভোগের কারনে;“ কিন্তু যদি এর বিপরীত ঘটনা ঘটে, কোন মা হয়তো এমন শিশু প্রসব করে যে কিনা ক্রমবিকাশের আরো একটি নতুন ধাপ অতিক্রম করতে পারে; কোন হাস হয়তো এমন কোন ছানা দিতে পারে যার শরীর ইদুরের মত,এভাবে হাসের ঠোট যুক্ত প্ল্যাটিপাসের সৃষ্টি হতে পারে; ”এভাবে নতুন ফর্মের নতুন সৃষ্টি, যেমনটা দেখা গেছে ভুতাত্ত্বিক রেকর্ডের পাতায়, আসলেই কখনোই গর্ভাবস্থায় একটি নতুন ধাপের অগ্রগতি ছাড়া আর কিছু নয়;”

চেম্বারস আদৌ ভাবেননি, তার পাঠকরা কিছু মনে করা উচিৎ হবে, যদি তারা মাছ থেকে বিবর্তিত হয়েছে এমন কিছু বলা হয়; ঘটনার যে ধারাবাহিকতা তিনি প্রস্তাব করেছিলেন: “সবচেয়ে বড় মাপের বিস্ময়গুলো, তাদের প্রত্যেকটির মধ্যে আমরা একজন সর্বশক্তিমানের ইচ্ছার প্রতিচ্ছায়া দেখতে পাই, প্রতিটি প্রানীর পরিবেশের সাথে সামন্জষ্য রেখেই তাদের তিনি নিখুতভাবেই সাজিয়েছেন;“ Vestiges of the Natural History of Creation এর মধ্যবিত্ত বৃটিশ পাঠকরা তাদের জীবন আগের মতই কাটিয়ে যেতে পারেন সেই একই নৈতিকতার কম্পাস ব্যবহার করে; “এভাবে আমরা শ্রদ্ধাময় একটি অভ্যর্থনা দেই, যা কিছু প্রকৃতির মাধ্যমে উন্মোচিত হয়; এবং একই সাথে আমরা পুরোপুরি শ্রদ্ধাও বজায় রাখি  যা কিছু আমরা পবিত্র হিসাবে মনে করে থাকি, যার কোনকিছুই শেষ অবধি পরিবর্তন করারও কোন আবশ্যিকতা প্রশ্ন হয়েতো কখনোই উঠবে না;”

Vestiges of the Natural History of Creation খুবই ব্যবসা সফল একটি প্রকাশনা হয়েছিল, সেই সময় প্রায় দশ হাজারের বেশী কপি বিক্রী হয়েছিল; প্রথম বারের মত ইংল্যান্ডর জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে বিবর্তনের ধারনার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বইটি; কিন্তু বইটি সম্বন্ধে সামনের সারির সব বৃটিশ বিজ্ঞানীদের মন্তব্য ছিল অত্যন্ত্য বিরুপ, তারা অনেকেই বইটিকে অত্যন্ত্য তিক্ত আর কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন, বিখ্যাত অ্যাডাম সেজউইক লেখেন, আমার মনে হয় এর লেখক একজন মহিলা,  আংশিকভাবে এর কারন হচ্ছে, বইটি মজবুত সব যুক্তিগুলো সম্বন্ধে যে পরিমান অজ্ঞতা প্রকাশ করছে সে জন্য;“ সেজউইক আরো সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেন, কিভাবে জীবনের এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গী সব শ্লীলতা আর শোভনতাকে অবমুল্যায়ন করতে পারে; ”যদি এই বইটা সত্যি হয়ে থাকে”, তিনি ঘোষনা করেন,” তাহলে ধর্ম হচ্ছে মিথ্যা, মানুষের আইনকানুন পাগলামো আর মনের খেয়াল আর অত্যন্ত নিম্নমানের অবিচার; নৈতিকতা হচ্ছে পাগলের প্রলাপ;”

বইটির প্রতি বিশেষ করে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিকদের হিংস্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে ডারউইন আবার নিজেকে গুটিয়ে নেন তার নিজস্ব বিজ্ঞানের জগতে; ‍তার আসলে ধারনাই ছিলনা যে, অ্যাডাম সেজউইক সহ তার অন্যান্য শিক্ষকরা বিবর্তন সম্বন্ধে এত দৃঢ় আর প্রবল একটি বিরুদ্ধ ধারনা পোষন করেন; তবে নিজের গড়ে তোলা তত্ত্বটিকে তিনি পরিত্যাগ করেননি, বরং ডারউইনের তখন একটাই চিন্তা ছিল, চেম্বারের সাথে যা হয়েছে, সেই নিয়তিটাকে কিভাবে এড়ানো যায় যখন তিনি তার প্রস্তাবটিকে জনসমক্ষে আনবেন;

ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন যুক্তি প্রমানের দিক থেকে চেম্বারস এর বইটির ভুল এবং দুর্বলতাগুলো আসলে কোথায়; চেম্বারস শুধু অন্য বিজ্ঞানীদের প্রস্তাবিত ধারনাগুলো পড়েছেন এবং সেই সব ধারনাগুলো একসাথে মিশিয়ে একটি অস্পষ্ট আর দুর্বল যুক্তির উপর ভিত্তি করে তার প্রস্তাবগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন; ডারউইন বুঝতে পারলেন, খানিক ভিন্নভাবে তিনিও কিন্ত কিছুটা একই দোষে দোষী -তার ধারনার ভিত্তি বেশ কিছু বিজ্ঞানী আর অবিজ্ঞানীদের ধারনা যা তিনি তাদের কাছ থেকে শুনেছেন বা পড়েছেন – লাইয়েল, মালথাস এমনকি তার নাপিতও সেই তালিকায় আছেন; যদিও ভুত্ত্ত্ববিদ্যার একজন স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ হিসাবে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত, কিন্তু ডারউইন ভাবছিলেন জীববিজ্ঞান বিষয়ে তার কোন প্রস্তাব প্রকাশ করলে তাকে একজন বহিরাগত আনাড়ী বিশেষজ্ঞ হিসাবে বিবেচনা করা হতে পারে; তাকে যেন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয় এমন একটি অবস্থা নিশ্চিৎ করতে হলে ‍তার নিজেকে প্রমান করতে হবে প্রথম সারির একজন প্রকৃতিবিদ হিসাবে, যার প্রকৃতির নানা জটিলতাকে সহজে সামাল দেবার যোগ্যতা আছে

এরপর তিনি বীগলের সমুদ্রযাত্রার সময় সংগ্রহ করা নানা নমুনা, যা  তিনি নিজে পরীক্ষা করেননি গত ৮ বছরে তার ফিরে আসার পর, সেগুলোর দিকে তিনি নজর দিলেন; তার সংগ্রহের নমুনার একটি কাচের বোতলে ছিল একটি বার্নাকল এর নমুনা। যদিও বেশীর ভাগ মানুষ মনে করেন জাহাজের হাল বা নীচের যে কাঠামোর উপর নৌকা ‍বা জাহাজ তৈরী হয়, সেগুলোর গায়ে লেগে থাকা  এমন কিছু যা চেছে পরিষ্কার করার উপাদান ছাড়া বার্নাকল এর আর কোন গুরুত্ব নেই; কিন্তু আসলই তারা সমুদ্রের সম্ভবত সবচেয়ে বিচিত্রতম একটি প্রানী; প্রথম দিকে প্রানী বিজ্ঞানীরা ভাবতেন বার্ণাকলরা আসলে এক ধরনের মোলাস্ক, যেমন ক্ল্যাম বা ঝিনুক বা ওয়েষ্টার, যাদের শক্ত খোলসটা আটকে থাকে কোন একটি পৃষ্ঠের উপর, কিন্ত আসলে এরা ক্রাষ্টাসিয়ান গোষ্ঠীভুক্ত, যেমন লবস্টার এবং চিংড়ী; ১৮৩০ সালেই বিজ্ঞানীরা কেবল তাদের প্রকৃত বৈশিষ্ট খানিকটা আবিষ্কার করেছিলেন, বিশেষ করে যখন একজন বৃটিশ আর্মি সার্জন তাদের লার্ভা লক্ষ্য করে আবিষ্কার করেছিলেন তারা আসলে অল্পবয়সী চিংড়ীর মত; যখন বার্ণাকল লার্ভাগুলোকে সমুদ্রের পানিতে ছেড়ে দেয়া হয়, তারা কোন একটি জায়গা খুজতে থাকে যেখানে তারা স্থির হতে পারবে, সেটা জাহাজের ‍হাল বা কোন ক্ল্যামের খোলশ যাই হোক না কেন; এবং পছন্দ মত কোন কিছুর উপরে তারা প্রথমে মাথা দিয়ে থিতু হয়; এরপরই তারা তাদের ক্রাষ্টাশিয়ান শারীরিক কাঠামোটি হারিয়ে ফেলে, তার বদলে চারপাশে তৈরী করে কোনাকৃতির একটি খোলস, তার ভিতর থেকে তারা তাদের পালকের মত পাগুলো বের করে রাখে খাদ্য ছাকাই করার জন্য;


ছবি: রক বার্ণাকল


ছবি বার্ণাকল লার্ভা

ছবি গুজনেক বার্ণাকল

১৮৩৫ সালে চিলির উপকুলে ডারউইন আলপিনের মাথার সমান একটি বার্ণাকল প্রজাতি সংগ্রহ করেন যা একটি কঙ্খ বা সামুদ্রিক শামুকের (Conch) খোলসের ভিতরে আটকে ছিল; এখন তার আনুবীক্ষনীক যন্ত্রের নীচে তা দেখে ডারউইন বুঝতে পারলেন যে প্রতিটি বার্ণাকল আছে দুটি বার্ণাকল সদস্য – একটি আকারে বড় স্ত্রী বার্ণাকল সাথে খুবই ক্ষুদ্র পুরুষ, যে তার সাথে আটকে আছে; সেই সময় বিজ্ঞানীরা পরিচিত ছিলেন শুধু উভলিঙ্গ বার্ণাকলের সাথে যাদের স্ত্রী ও পুরুষ দুটি জননাঙ্গই থাকে;  পিনহেড বার্নাকল এত অদ্ভুত যে ডারউইন নিশ্চিৎ ছিলেন এরা হয়তো ভিন্ন নতুন কোন জীনাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; ‍

বার্ণাকলদের নিয়ে ডারউইন আরো একটি দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক যাত্রা শুরু করলেন, প্রথমে তিনি শুধু একটি ছোট নিবন্ধ লিখতে চেয়েছিলেন তার আবিষ্কারের বর্ণনা দিয়ে, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে, তাকে আগে নির্ধারন করতে হবে অনেকগুলো বার্ণাকল প্রজাতির মধ্যে এই পিন হেড বার্ণাকলের অবস্থানটা কোথায় হবে যদি এর শ্রেনীবিন্যাস করতে চান;  তিনি ওয়েন এর কাছে অনুরোধ করেন তাকে যেন কিছু বার্ণাকলের নমুনা ধার দেয়া হয়, এবং কাজটা ভালোভাবে কিভাবে করা যায় এ বিষয়ে তাকে যেন তিনি কিছু উপদেশ দেন; ওয়েন ডারউইনকে জানান যে তার আবিষ্কৃত বার্ণাকলটিকে, সেটা যতই অদ্ভুত হোক না কেন, মুল ক্রাষ্টাসিয়ান আদিরুপ বা আর্কিটাইপের সাথে একটি সংযোগ খুজে বের করার চেষ্টা তাকে অবশ্যই করতে হবে; কারন ১৮৪০ নাগাদ ওয়েন সিদ্ধান্ত নেন আর্কিটাইপ বা আদিরুপই হচ্ছে প্রানীবিজ্ঞানের মুল চাবিকাঠি;

ওয়েন নিজেও মেরুদন্ডী প্রানীদের একটি আর্কিটাইপ তৈরী করা চেষ্টা করেছিলেন, যা তিনি কল্পনা করেছিলেন মেরুদন্ড, পাজর, মুখ সহ সামান্য কিছু বেশী; এই শারীরিক গঠনের কোন অস্তিত্ব প্রকৃতিতে নেই, ওয়েন দা্বী করেন, এটি শুধু মাত্র ঈশ্বরের মনে বিদ্যমান একটি নীল নকশা , যার উপরে নির্ভর করে তিনি আরো বিস্তারিত শারীরিক গঠন তৈরী করেছেন; কেউ যদি ভিন্ন ভিন্ন মেরুদন্ডী প্রানীদের তুলনা করেন তাহলে এই আর্কিটাইপের সাথে সম্পর্ক এবং সদৃশ্যতা স্পষ্ট হবে;

যেমন উদহারন সরুপ একটি বাদুড়, একটি ম্যানাতি এবং একটি পাখি তুলনা করেন, বাদুড়ের ডানা তৈরী হয়েছে তার দীর্ঘায়িত হওয়া আঙ্গুলগুলো যুক্ত করা একটি চামড়ার পর্দা দিয়ে, ম্যানাতির আছে একটি প্যাডেল এর মত অঙ্গ যা তাদের পানিতে সাতার কাটতে সহায়তা করে; পাখীদের আছে ডানা, কিন্তু সেটা তৈরী হাতের হাড়ের মধ্যে আটকে থাকা পালক সহ, যারা একীভুত হয়ে তৈরী করেছে একটি হিন্জ বা কবজার সহ দীর্ঘ একটি দন্ড; প্রত্যেকটি মেরুদন্ডী প্রানীর হাত পা আছে যারা তাদের জীবনের প্রয়োজনে খাপ খাইয়ে নিয়েছে গঠনে ও কাজে ; এবং তারা একের অপরের সাথে সমরুপী বিস্ময়করভাবেই, প্রতিটি অস্থির ক্ষেত্রে; তাদের সবার আঙ্গুল আছে মার্বেল সদৃশ একটি কব্জির হাড়ের সাথে যুক্ত হয়ে, যারা সংযুক্ত আবার দুটি লম্বা হাড়ের সাথে যার কনুইতে এসে একটি মাত্র লম্বা হাড়ের সাথে যুক্ত হচ্ছে; এই সদৃশ্যতাই ওয়েন এর একটি সাধারন বা কমন শারীরিক কাঠামোর প্লানের বিষয়টি প্রমান করে ( বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন হোমোলগ বা সমরুপতা);

ওয়েন ডারউইনকে তাড়া দেন বার্ণাকল এবং অন্যান্য ক্রাষ্টাসিয়ানদের মধ্যে এমন কোন হোমোলজি তিনি খুজে বের করতে; ব্যাক্তিগত ভাবে ডারউইন ওয়েন এর আর্কিটাইপের ধারণাটিকে অর্থহীনই মনে করতেন; তিনি ভাবতেন বিভিন্ন মেরুদন্ডী প্রানীদের মধ্যে সদৃশ্যতাগুলো একটি কমন বা সাধারণ পুর্বসুরী প্রানীদের বংশধর হিসাবে তাদের বিবর্তনের মাধ্যমেই উদ্ভবেরই চিহ্ন; কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম অদ্ভুত ক্রাষ্টাশিয়ানদের থেকে বার্ণাকলদের বিবর্তন বুঝতে হলে ডারউইনকে অনেকগুলো আসলে বার্ণাকল নিয়ে গবেষনা করতে হবে ( প্রায় ১২০০ প্রজাতি আজ পর্যন্ত চিহ্নিত হয়েছে); তিনি অন্য প্রকৃতিবিদদের সংগ্রহ থেকে আরো বার্ণাকল জোগাড় করলেন, তিনি জীবাশ্ম বার্ণাকল নিয়ে গবেষনা করেন এমনকি বৃটিশ মিউজিয়ামের পুরো সংগ্রহ তিনি কোন না কোন ভাবে যোগাড় করেছিলেন তার গবেষনার জন্য; প্রায় ৮ বছর ধরে ডারউইন বার্ণাকল নিয়ে গবেষনা করেন, এই পুরোটা সময় বিবর্তনের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত তার তত্ত্বটি যা কোপার্নিকাসের সুর্য কেন্দ্রীক কসমোলজীর ধারনার মতই বৈপ্লবিক, তার বুক শেলফের তাকেই বসে ছিল সিল করা একটি খামে;

কেন এত দেরী করেছিলেন ডারউইন? ভয় হয়তো ডারউইনের দীর্ঘসুত্রিতার একটি কারন হতে পারে, বিশেষ করে তার শিক্ষকদের সাথে সরাসরি দ্বন্দে যাবার অবশ্যম্ভাব্যতা, যা তিনি এড়াতে চেয়েছিলেন; অন্য একটা কারন হয়তো হতে পারে ডারউইন খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন;  পাচ বছরের একটি কষ্টকর সমুদ্র যাত্রা, এর পরে বই আর প্রবন্ধ লেখার ব্যস্ত হয়ে আটটি বছর তিনি কাটিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডে আসার পর থেকে তিনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, প্রায়ই তিনি আক্রান্ত হতে্ন ক্রমাগত হতে থাকা বমির দ্বারা; কেবল মধ্য ত্রিশে ডারউইন হয়তো কিছুটা শান্তি খুজছিলেন কোন অস্থিরতা ছাড়া; এবং আরো একটি দীর্ঘসুত্রিতার কারনের অংশ তার শোক; তার প্রিয় মেয়ে অ্যানী, মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৮৫১ সালে মৃত্যুবরণ করেন, তার এই নিষ্পাপ কন্যাটির মৃতুযন্ত্রনা তিনি নিজ চোখে দেখেছিলেন. তার ভেঙ্গে চুরে যাওয়া বিশ্বাস নিয়ে তিনি এমার সাথে কোন কথা বলারও সুযোগ পাননি; বার্ণাকল নিয়ে কষ্টসাধ্য গবেষণা তার সেই তীব্র কষ্টকে ঢাকার একটি উপায় হিসাবে হয়তো বেছে নিয়েছিলেন;


ছবি: অ্যানী , ডারউইন ও এমার দ্বিতীয় সন্তান এবং বড় মেয়ে (Anne Elizabeth “Annie” Darwin  1841 – 1851); দশ বছর বয়সে তিনি মারা যান স্কারলেট ফিভার এ; ডারউইনের খুবই আদরের মেয়ে ছিল অ্যানী; অ্যানীর কষ্টকর মৃত্যু ডারউইনকে বিধ্বস্থ করেছিল; তার ডায়রীতে ডারউইন লিখেছিলেন We have lost the joy of the household, and the solace of our old age…. Oh that she could now know how deeply, how tenderly we do still & and shall ever love her dear joyous face. ক্ষীন হয়ে আসা তার ধর্মবিশ্বাসকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেন ডারউইন অ্যানীর মৃত্যুর পর।

কিন্তু ভয়, ক্লান্তি আর শোক বাদ দিয়েও, বার্ণাকল ডারউইনকে পুরোপুরি মোহাবিষ্ট করে রেখেছিল; পরবর্তীতে দেখা গেল কিভাবে বিবর্তন কাজ করে সেটা বোঝার জন্য এই গ্রুপের প্রানীরা আসলেই উপযোগী; ডারউইন যেমন দেখতে পেলেন, কিভাবে তার চিলিতে আবিষ্কৃত বার্ণাকলরা উদ্ভব হয়েছে তাদের উভলিঙ্গ পুর্বসুরীদের থেকে; তারা বিবর্তিত হয়েছিল অন্তর্বতীকালীন কিছু ফর্মের মধ্য দিয়ে, যতক্ষন পর্যন্ত তারা স্ত্রী এবং পুরুষ লিঙ্গের  আলাদা বার্ণাকল সৃষ্টি না করে; প্রতিটি প্রজাতির বার্ণাকলদের মধ্যে প্রকরণ বা ভ্যারিয়েশনও ডারউইনের দৃষ্টি আকর্ষন করে, বার্ণাকল অ্যানাটোমির কোন অংশই সুষম নয়, এখানে ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের কাজ করার জন্য প্রচুর কাচা মাল আছে; প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো কোন একটি নির্দিষ্ট সময়েই কেবল প্রজাতির উপর কাজ করে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়াটি, যেমন যখন কোন দ্বীপের উত্থান বা মহাদেশ পানিতে ডুবে যেতে শুরু করে, যেমন; কিন্তু এত ভ্যারিয়েশন বা প্রকরণ থাকার কারনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচন আসলেই কাজ করতে পারে সবসময়ই;

কিন্তু এসব কোন ধারনাই ডারউইন তার বার্ণাকল বিষয়ক কোন লেখায় সরাসরি নিয়ে আসেননি, তিনি প্রায় ১০০০ পাতার বিশাল একটি একটি বিশাল বই (A monograph on the sub-class Cirripedia, with figures of all the species 1854) লেখেন, যার জন্য তিনি প্রশংসা, পুরষ্কার এবং প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে যে শ্রদ্ধা তিনি আশা করেছিলেন সেটা পেয়েছিলেন;

১৮৫৪ সলে, ডারউইন আবার প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে তার চিন্তায় ফিরে যান;

 

__________________________ চলবে

Advertisements
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : দ্বিতীয় পর্ব (চার)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s