চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (তিন)


image-1ছবি: Darwin in the Galapagos Islands, শিল্পী John Harrold এর আঁকা;

লেখাটির মুল সুত্র: Carl Zimmer এর Evolution, the triumph of an idea র প্রথম দুটি অধ্যায়; এছাড়াও কিছু বাড়তি তথ্য এসেছে বিভিন্ন সুত্র থেকে:

চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (এক)
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (দুই)

প্রথম পর্ব :
যে বিজয় এসেছে ধীরে, ডারউইন এবং ডারউইনবাদের উত্থান
এক:

একজন ভুতত্ত্ববিদের আত্মপ্রকাশ …

বীগলের সমুদ্রযাত্রার শুরুটা ভালোভাবে হয়নি, ১৮৩১ এর অক্টোবরে প্লীমথ বন্দরে এসেছিলেন ডারউইন জাহাজে চড়তে, কিন্তু বেশ কিছু সংস্কার মেরামত, কয়েকবার যাত্রা শুরুর প্রচেষ্টার পর অবশেষে ডিসেম্বর মাসের সাত তারিখের আগে বীগলের তার পাল খুলে দেয় একটি ঐতিহাসিক সমুদ্র যাত্রায়;  বন্দর ছাড়ার পর পরই ডারউইন  সি সিকনেসে কাবু হয়ে পড়েন, যা কিছু খাচ্ছিলেন , সবই তাকেই সমুদ্রের রেলিং এর উপর থেকে উগরে দিতে হয়েছে; যদিও ডারউইন পাচ বছর এই জাহাজেই ছিলেন, তারপরও সমুদ্রযাত্রায় পুরোপুরি ভাবে অভ্যস্ত হতে পারেননি কখনোই;

ডারউইন আবিষ্কার করলেন, ফিটজরয়কে সঙ্গ দেবার ব্যাপারটা খুব সহজ কাজ না, বিষয়টি বেশ কৌশলেরই মনে হয়েছে তার; ক্যাপ্টেন এর মেজাজ খুব রগচটা, এবং আগে থেকে আচ করার কোন উপায় নেই এবং তার অতিমাত্রায় শৃঙ্খলা ডার‌উইনকে হতবাক করেছিল; যেমন ক্রিসমাসের দিন কয়েকজন নাবিক মাতাল হয়েছিল, ফিটজরয় তাদের পরেরদিন সকালে চাবুক দিয়ে তাদের পেটানোর নির্দেশ দেন; প্রতিদিন  ফিটজরয় এর সাথে সকালের খাবার খেয়ে বের হলে, জুনিয়র অফিসাররা তার কাছে জানতে চাইতো, ”আজ কি বেশী কফি খাওয়া হয়েছে ?” এটি ছিল ক্যাপ্টেন এর মেজাজের অবস্থা বোঝার জন্য তাদের সাংকেতিক বার্তা; কিন্তু ডারউইন ফিটজয়ের শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব, তার কর্মস্পৃহা, বিজ্ঞানের প্রতি তার আন্তরিকতা, এবং খৃষ্টধর্মের প্রতি নিষ্ঠাকেও শ্রদ্ধা করতেন; প্রতি রবিবার ক্যাপ্টের এর সার্মনের সময় তিনি উপস্থিত থাকতেন;

ডারউইন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন, কখন জাহাজের কোন একটি বন্দরে ভিড়বে, তিনি ডাঙ্গায় পা রাখবেন; কিন্তু বহু সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাকে সে জন্য; ম্যাদেইরা তে স্রোত এর খারাপ ছিল যে ফিটজরয় সেখানে নোঙ্গর না করার সিদ্ধান্ত নেন, এবং এর পরের বন্দর, ক্যানারী দ্বীপে, কলেরা মহামারীর জন্য জাহাজ ভিড়িয়ে কোয়রানটাইনে আটকে থাকার জন্য আদৌ রাজী হলেন না ফিটজরয়;

বহুদিন পর প্রথম বারের মত বীগল এসে থামলো কেপ ভারদে দীপপুন্জে; সেইন্ট ইয়াগো ( এখন যার নাম সান্টিয়াগো) তে ডারইউইন জাহাজ থেকে নামলেন, নারিকেল গাছের নীচে ইতস্তত ঘোরাফেরা আর পাথর গাছ আর প্রানীদের মধ্যে তিনি ব্যস্ত থাকলেন; এখানে তিনি একটি অক্টোপাস খুজে পেয়েছিলেন যে তার রঙ বদলাতে পারে, বেগুনী থেকে ফরাসী ধুসর রঙ; এবং যখন তিনি এটি একটি কাচের জারে ভরে জাহাজের হোল্ডে রাখেন, তখন এটি অন্ধকারে আলোর আভা ছড়াচ্ছিল; কিন্তু দ্বীপের ভুতাত্ত্বিক গঠন, সেটাই ডারউইন বেশী করে দেখতে চাইছিলেন;

ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু হবার পর থেকেই ডারউইন পুরোপুরি মজে ছিলেন চার্লস লাইয়েল নামক একজন ইংলিশ আইনজীবির লেখা একটি নতুন বই এ, বইটির নাম Principles of Geology;  এই বইটি ডারউইন এর এই গ্রহ সম্বন্ধে এতদিনের ভাবনাটি চিরতরে বদলে দেয়, এবং একসময় যা চুড়ান্ত পরিণতি লাভ করে তার বিবর্তন তত্ত্ব ব্যাখ্যা করার মধ্যে; লাইয়েল মহাদুর্যোগ বা ক্যাটাস্ট্রোফে কেন্দ্রিক ভুতত্ত্ববিদ্যাকে আক্রমন করেন, যা সেই সময় জনপ্রিয় ছিল, যা নতুন করে পুণরজ্জীবিত করেছিল হাটনের ৫০ বছর পুরোনো সমানভাবে পরিবর্তিত পৃথিবীর তত্ত্বটিকে;


ছবি: চার্লস লাইয়েল (Charles Lyell: 1797 –  1875) পেশায় আইনজীবি লাইয়েল তার সময়ে একজন সেরা ভুতত্ত্ববিদ ছিলেন; জীববিজ্ঞানে গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কারটির আগে ডারউইন তার সুখ্যাতি পান ভুতত্ত্ববিদ হিসাবে; চার্লস লাইলের Principles of Geology বেশ প্রভাব ফেলেছিল ডারউইনের উপর, চার্লস লাইয়েল পরবর্তীতে ডারউইনের একজন বিশ্বস্ত এবং প্রভাবশালী সুহৃদ ছিলেন আমৃত্যু;

Principles of Geology শুধু হাটনের সেই ধারনাটির নতুন করে জাগিয়ে তোলায় মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, লাইয়েল আরো বৈজ্ঞানিকভাবে বিস্তারিত, সমৃদ্ধ একটি দৃশ্য রচনা করেন কেমন করে যে পরিবর্তনগুলোর স্বাক্ষী মানুষ ধীরে ধীরে গ্রহের আকৃতি দিয়েছে; তিনি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে দ্বীপ সৃষ্টির বা কিভাবে ভুমিকম্প কোন একটি ভুত্বকের অংশ উপরে ঠেলে উঠিয়ে দেয় ইত্যাদি বাস্তব উদহারণ দিয়েছিলেন; এর পর তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে ক্ষয়ীভবন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই প্রকাশ্যে উন্মোচিত এই ভুপৃষ্ঠের বৈশিষ্টগুলো আবারো মিশে যায়; ভুতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটেছে ধীরে, আমাদের বোধের আড়ালে, লাইয়েল যুক্তি দেন, এমন কি আমাদের মানব ইতিহাসের সময় জুড়েও;

Principles of Geology এর একটি মুল ছবি ছিল ইতালীতে অবস্থিত প্রাচীন সেরাপিসের রোমান মন্দিরের একটি রেখাচিত্র; যেখানে এর পিলারগুলোর উপরের প্রান্ত দাগাঙ্কিত ছিল গাঢ় নীল মোটা একটি ব্যান্ডের মত দাগ দিয়ে, যার কারন হচ্ছে মোলাস্ক জাতীয় প্রানীরা, যারা কোন একসময় এখানে ছিদ্র করেছিল; এই মন্দিরটির জীবদ্দশায় এটি পুরোপুরিভাবে নিমজ্জিত হয়েছিল পানির নীচে এবং পরে আবার সমুদ্র থেকে এটি উপরে উঠে  এসেছিল; হাটনের ব্যতিক্রম, লাইয়েল পৃথিবী কোন সৃষ্টি আর ধ্বংসের একটি নিরন্তর বিশ্বব্যাপী চক্রের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছে এমনটি ভাবেননি; বরং গ্রহটি পরিবর্তিত হয়েছে স্থানীয়ভাবে, কোথাও ক্ষয়, কোথাও আবার উদগীরনের মাধ্যমে জেগে উঠেছে, একটি নিরন্তর, নির্দেশনাহীন প্রবাহে, অকল্পনীয় দীর্ঘ একটি সময়ের পরিক্রমায়;


ছবি: ইতালীর সেরাপিস এর মন্দিরের ধ্বংশাবশেষ; এর কলামগুলোর উপরের অংশে নীলচে দাগগুলো করেছে সামুদ্রিক মোলাস্করা, চার্লস লাইয়েল তার বইতে এই বিষয়টি উল্লেখ করে দাবী করেন, পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে, কোন একসময় এটি পানিতে নিমজ্জিত ছিল, পরে এটি আবারো পানির উপরে উঠে আসে ভুত্বকের পরিবর্তনের কারনে:

প্রিন্সিপল অব জিওলজী ডারউইনকে ভীষন মুগ্ধ করেছিল, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই বইটি পৃথিবী ইতিহাসের শুধু একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাই দেয়নি, উপরন্তু একটি সুযোগ করে দিয়েছে এটিকে বাস্তব পৃথিবীতে পরীক্ষা করে দেখার জন্য; যখন তিনি সেন্ট ইয়াগো তে এসে নামেন,ঠিক সেটাই করার জন্য তার সুযোগটি এসেছিল; দীপের আগ্নেয় শিলার স্তর ঘেটে ঘুটে, তিনি প্রমান পেয়েছিলেন লাভা আসলে পানির নীচ থেকে বেরিয়ে এসেছে, প্রবাল এবং মোলাস্কদের শেল বা খোলশ পুড়িয়ে এটি অগ্রসর হয়েছে, বের হয়েছে পৃষ্ঠে; পৃথিবীর ভিতরে কোন শক্তি নিশ্চয়ই  এই পাথরগুলোকে সমুদ্র পৃষ্টের উপরে ঠেলে উঠিয়ে দিয়েছে; কিন্তু তারা অবশ্যই আবার পানিতে নিমজ্জিতও হয়েছে এবং আবার এটিকে উপরে তুলে দিয়েছে; আর ডারউইন বুঝতে পারলেন, কিছু এই ওঠা নামার ঘটনাও ঘটেছে সাম্প্রতিক কোন সময়েই; কারন পাহাড়ের ঢালে একটি ব্যান্ডে তিনি  কিছু সামুদ্রিক প্রানীর খোলশ বা শেল এর জীবাশ্ম খুজে পেয়েছিলেন, যা সেই দ্বীপে এখন বসবাস করছে এমন প্রজাতিদের সদৃশ; তাহলে পৃথিবী এমনকি  পরিবর্তিত হচ্ছে ১৮৩২ সালে, যেমনটা হয়েছে বহু বহু যুগ ধরে;

ডারউইন তার আত্মজীবনীতে পরে লিখেছিলেন, ” মুলত সেন্ট ইয়াগো দে কেপ ভার্দে দ্বীপপুন্জের প্রথম যে জায়গাটাকেই আমি পরীক্ষা করেছিলাম, সেটি স্পষ্ট এবং চমৎকারভাবে আমাকে প্রমান করে দিয়েছে অন্য যে কোন লেখকের তুলনায় লাইয়েল এর ভুতত্ত্ব সংক্রান্ত আলোচনা এবং তার প্রস্তাবগুলোর তুলনামুলক শ্রেষ্ঠত্বকে, যাদের অনেকের কাজ আমার কাছে ছিল, বা এমন কি পরে আমি যা পড়েছিলাম; তিনি লাইয়েল পদ্ধতি ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, এবং সেটি চমৎকারভাবে কাজ করেছিল;  আর সেই মুহুর্তে ডারউইনই রুপান্তরিত হয়েছিলেন একজন লাইয়েলীয়ান হিসাবে;

নিরাপত্তাহীনতার একটি অদ্ভুত অনুভুতি:

১৮৩২  সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষের দিকে বীগল দক্ষিন আমেরিকায় পৌছায়; ফিটজরয় তিন মাসের জন্য জাহাজটি রিও ডি জেনেরিও তে নোঙর করে রাখেন, এরপর যাত্রা শুরু করেন দক্ষিন আমেরিকার উপকুল ধরে যা স্থায়ী হয়েছিল পরবর্তী তিন বছর;  এই সময়টার বেশীর ভাগ অংশই ডারউইন কাটিয়েছিলেন মুলত স্থলে, ব্রাজিলে থাকার সময়, জঙ্গলের  মধ্যে একটি কটেজে থাকতেন ডারউইন, চারপাশে বিস্তৃত বিশাল জৈববৈজ্ঞানিক ইডেন তাকে অভিভুত করে রেখেছিল, পাতাগোনিয়ায় তিনি ঘোড়ার পিঠে চড়ে মাঝে মাঝে কয়েক সপ্তাহের জন্য আরো গভীরে চলে যেতেন মহাদেশের, এবং বীগলের পরের পর্যায়ে যাত্রা শুরু হবার আগে সবসময়ই ফিরে এসেছেন সময় মতন;  যা কিছু তিনি দেখেছিলেন, সব কিছুই তার নোটবুকে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন, নদী, পর্বতমালা, ক্রীতদাস, খামারীদের; তার খালি কাচের নমুনা রাখার পাত্রগুলো ক্রমেই পুর্ণ হতে থাকে বিচিত্র সব নমুনায়;


ছবি: এইচএমএস বীগল এর যাত্রা পথ;

আর্জেন্টিনার উপকুলে পুন্টা আল্টায় এরকম একটা অভিযানে, ডারউইন একটি ছোট টিলা পর্যবেক্ষন করতে গিয়ে তার  একপাশে কিছু জীবাশ্ম হাড় খুজে পান; বালি আর পাথর থেকে তাদের আলাদা করার , ডারউইন দেখেন সেগুলো আসলে বিশাল দাত আর উরুর হাড়, যা  বিলুপ্ত বিশালাকৃতির কোন স্তন্যপায়ী প্রানীর শরীরে ছিল; পরপর কয়েকদিন তিনি আবার সেখানে ফিরে জায়গাটা ভালোভাবে খনন করেন, সেই সময় পর্যন্ত, পুরো ইংল্যান্ডে সংগ্রহে মাত্র একটি বিলুপ্ত স্তন্যপ্রানীর জীবাশ্মর অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু পুন্টা আল্টাতে তিনি বেশ কয়েক টন জীবাশ্ম অস্থি খুজে পান; তখনও তিনি জানতেন না এগুলোর কি অর্থ হতে পারে, তবে তার অনুমান ছিল সেগুলো খুব সম্ভবত বিশালাকৃতির গন্ডার বা স্লথদের; কিন্তু তখনও পর্যন্ত ডারউইন কিন্তু শুধু একজন সংগ্রাহক; তিনি শুধু জীবাশ্মগুলো সংগ্রহ করে ইংল্যান্ডে পাঠাবার ব্যবস্থা করেন;

এই জীবাশ্মগুলোর মধ্যে একটা ধাধা ছিল, এই সমুদ্রযাত্রায় ডারউইনের মনে জন্ম দেয়া অনেকগুলো ধাধার প্রথমটি; কুভিয়ের এর একনিষ্ঠ ছাত্র হিসাবে, ডারউইন ধরে নিয়ে ছিলেন এগুলো অ্যান্টেডিল্যুভিয়ান পর্বের ( বাইবেলে বর্ণিত জেনেসিস বা সৃষ্টি এবং মহাপ্লাবনের পুর্ববর্তী সময় কাল, শব্দটি ভিক্টোরিয়ার যুগের বিজ্ঞান এবং আদি ভতত্ত্ববিদ্যায় প্রবেশ করেছিল) কোন দানবাকৃতির প্রজাতির চিহ্ন; কিন্তু তাদের হাড়গুলোর সাথে মিশে ছিল সামুদ্রিক প্রানীদের জীবাশ্ম খোলশদের সাথে, যারা প্রায় হুবুহু আর্জেন্টিনার উপকুলে তখনও জীবিত প্রজাতিদের মত; এই পাথরগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে এই দানবাকৃতির প্রানীগুলো যতটা প্রাচীন বলে মনে হচ্ছে, ততটা প্রাচীন নয় অবশ্যই;

ডিসেম্বর, ১৮৩২ এ বীগল তিয়েরা দেল ফুয়েগোর চারপাশে তার প্রদক্ষিন শেষ করে, ফিটজরয়ের জন্য এই মিশনে এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা হবার কথা ছিল; কারন তিনি এর আগে তার বন্দী করা নিয়ে যাওয়া তিন আদিবাসীদের তাদের গোত্রে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য সভ্যতার পরিবর্তন করার শক্তি প্রদর্শন করা; কিন্তু টিয়েরা ডেল ফুয়েগো তাকে আবার পরাজিত করে; ওলইয়া বে তে একটা মিশন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন ফিটজরয়, তিনি তিনটি উইগওয়াম (আমেরিকার আদীবাসীদের বানানো তাবুর মত ঘর) আর দুটি বাগান তৈরী করেন মিশনের জন্য; মিশনের জন্য লন্ডন থেকে নিয়ে আসা নানা দান করা জিনিস: পান করার পাত্র, চায়ের ট্রে, সুপ বানানোর টুরিন, সাদা কাপড় দিয়ে সেগুলো সাজান; কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পার যখন বীগল আবার সেখানে পরিদর্শন করতে আসেন, মিশনারীদের প্রানভয়ে দৌড়ে জাহাজের দিকে আসতে দেখেন তিনি; ফুয়েগাবাসীরা মিশনের সবকিছু চুরি করে ধ্বংস করে দিয়েছে জাহাজের ফিরে আসার সময় ফুয়েগাবাসীরা যাজকের দাড়ী ঝিনুকের খোলশ দিয়ে কেটে কেটে মজা করছিল তখন;

মনক্ষুন্ন বিষন্ন ফিটজরয় কেপ হর্ণ অতিক্রম করে দক্ষিন আমেরিকার পশ্চিম উপকুল বরাবর যাত্রা শুরু করেন; ডারউইন এই সুযোগে আন্দীজ পর্বতমালায় আহোরণ করেছিলেন,  লাইয়েল এর কথা ভেবে, তিনি কল্পনা করার চেষ্টা করেন এর উচু শৃঙ্গগুলোর সমুদ্রের মধ্য থেকে উপরে উঠে আসার সেই দৃশ্যটি; ভালপারাইসোতে তিনি বীগলে উঠেন আবার এর উত্তর অভিমুখে যাত্রায়; পুর্বদিকে মাউন্ট ওসোরণোকে রেখে, এর নিখুত কোনের মতো চুড়া; নাবিকরা যখন বৃষ্টির মধ্যে ঘড়ি ঠিক করছিলে তারা মাঝে মাঝে দেখছিলেন দেখছিলেন এর চুড়া থেকে ধোয়ার কুন্ডলী বের হবার দৃশ্য; জানুয়ারী এক রাতে ওসোরনো বিস্ফোরিত হলে অগ্ন্যুৎপাতে; পাথরের বিশাল টুকরো আর আগুনের শিখা ছড়িয়ে, এমনকি লাইয়েল নিজেও কোন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কখনো দেখেননি;

এই প্রচন্ড দুর্যোগে পৃথিবী শেষ হয়ে যায়নি, যদিও; ভালডিভিয়া শহরে বীগল নোঙ্গর করে কয়েক সপ্তাহ পর,  এবং ২০ ফেব্রুয়ারী ১৮৩৫ এ, সমস্ত পৃথিবী কেপে উঠে ডারউইনের চোখের সামনে, তখন কাছাকাছি একটি জঙ্গলে তিনি হাটছিলেন, হঠাৎ করে ঠিক করেন একটু বিশ্রাম নেবেন, আর যখন তিনি মাটিতে শুয়ে পড়েছিলেন, মাটিকে অনঢ় আর শক্ত মনে হচ্ছিল, কিন্তু কিছুক্ষন পর এটি কেপে ওঠে;

”খুবই হঠাৎ করেই ব্যাপারটা ঘটেছিল  এবং মাত্র দু মিনিট স্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু মনে হয়েছিল যেন এর স্থায়ীত্ব ছিল আরো দীর্ঘ সময়,”  পরে ডারউইন লিখেছিলেন; ভুতাত্ত্বিক দিক থেকে শান্ত ইংল্যান্ডে অভ্যস্ত ডারউইন এর কখনই ভুমিকম্প দেখার অভিজ্ঞতা হয়নি; ”সোজা হয়ে দাড়ানোর জন্য কোন সমস্যা ছিল না, তবে এই কম্পন আমাকে খানিকটা ভারসাম্যহীন করে ফেলেছিল; এটা অনেকটা কোন বীপরিত দিকে আসা ঢেউ এর সাথে কোন জাহাজের নড়াচড়া, বা আরো বলা যেতে পারে পাতলা বরফের উপর কেউ স্কেট করার সময় যেমন অনুভুতি হয়, যখন মনে হয় শরীরের ভারে তা ডেবে যাচ্ছে;”

বাতাসে গাছে নড়ে উঠেছিল,ভু কম্পন শেষ হয়ে যায়; এই অভিজ্ঞতা তিনি কখনোই ভুলতে পারেননি;  ”একটি ভয়ঙ্কর ভুমিকম্প এক মুহুর্তে রধ্বংশ করে পৃথিবী সব প্রাচীনতম সম্পর্ককে : এই পৃথিবী, যা কিছু দৃঢ় এমন সব কিছুর প্রতীক নড়ে উঠে আমাদের পায়ের নীচে যেন তরলের উপর ভাসা কোন স্তরের মত; সময়ের মাত্র একটা সেকেন্ডে তা আমাদের মনে জানান দিয়ে যায় নিরাপত্তাহীনতার একটি অদ্ভুত অনুভুতি, যা  বহু ঘন্টার গভীর চিন্তা হয়তো কখনো সৃষ্টি করতে পারেনা ; ”

ভুমিকম্প শেষ হবার পর, ডারউইন দ্রুত শহরে ফিরে আসেন, যা মোটামুটি অক্ষতই ছিল, কিন্তু কিছুটা দুরে কনসেপসিয়ন শহরটি পুরোপুরি ইট, কাঠের স্তুপে পরিণত হয়; শুধু ভুমিকম্প না এর ফলে সৃষ্ট সুনামীও আঘাত হেনেছিল, শহরের মুখের ক্যাথিড্রালটি ভেঙ্গে যায়,যেন কেউ ছেনী দিয়ে দালানগুলো ভেঙ্গেছে, ” খুব তিক্ত আর অপমানজনক একটি ব্যাপার,  যখন দেখতে হয়, যা কিছু তৈরী করতে মানুষের এত কষ্ট আর সময় ব্যায় হয়েছে তা এক মিনিটের মধ্যেই পুরোপুরি ধ্বংশ হয়েছে;”  মাটিতে দীর্ঘ ফাটল ধরেছে, পাথর দ্বিখন্ডিত হয়েছে, দুই মিনিটে, ভুমিকম্প অনেক বেশী ক্ষতি করেছে, ডারউইন অনুমান করতে পারলেন, এক শতাব্দীর সাধারন ভাঙ্গাগড়া আর ক্ষয় যা করতে পারে;

ভুমিকম্প এর উপকুল রেখা বরাবর আরো ব্যপক কিছু পরিবর্তন করেছিল, ভেঙ্গে পড়া সব বাড়ী ঘর বা ডুবে যাওয়া গবাদী পশুর ধ্বংসাবশেষ দেখে আমরা যত অনায়াসে বুঝতে পারি তার চেয়ে এই পরিবর্তনগুলো বোঝা বেশ কষ্টসাধ্য; অনেক জায়গা আগে কিনা যা পানির নীচে ছিল, এখন সেটি পানির উপরে উঠে উঠেছে, যা উপরে আবরণ করে আছে মরে যেতে থাকা সামুদ্রিক শেলফিশ দিয়ে; ফিটজরয় তার সার্ভে করার যন্ত্র দিয়ে পরিমাপ করে দেখিয়েছিলেন, উপকুলের কিছু অংশ ভুমিকম্পের সময় প্রায় আট ফুট ‍উপরে উঠে গেছে; দুমাস পরে আবার যখন তিনি কনসেপসিওনে ফিরে আসেন, তখনও দেখেছিলেন মাটি উপরে উঠে আছে ;

ডারউইন বুঝতে পারলেন যে, তিনি যা চাক্ষুষ দেখছেন তার ব্যাখ্যা তাকে লাইয়েল ইতিমধ্যেই দিয়েছেন; গলিত পাথরের চাপ নিশ্চয়ই ওসরনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারন, যা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল একটি ভুমিকম্পর সুচনা করার মত; নতুন গলিত লাভার এই বের হয়ে আসাটা সমুদ্র থেকে নতুন ভুমির সৃষ্টি করেছে; এবং যথেষ্ট পরিমান সময়ের ব্যবধানে এটি পুরো একটি পর্বতমালাকে অনেক উপরের দিকে তুল দিতে পারে;

এর কিছুদিন পর ডারউইন তার সবচেয়ে শেষ বড় কোন অভিযানে মহাদেশের ভিতরে যান, আন্দীজ পর্বতমালার ভিতরে আবারো; পর্বতের চুড়ায় যা উসপালাটা গিরিপথকে ঘিরে ছিল, ডারউইন সেখানে একই পাথরের স্তরকে শনাক্ত করেন যা তিনি কয়েকমাস আগে আরো পুর্বে সমতল এলাকায় দেখেছিলেন, যে পাথরগুলেো মুলত সৃষ্টি হয়েছে সাগরের সেডিমেন্ট বা পলি জমা হবার মাধ্যমে; তিনি একটি প্রস্তরীভুত হওয়া একটি বনাঞ্চল যা এখন দাড়িয়ে আছে খাড়া খুজে পেয়েছিলেন, পাতাগোনিয়ায় তার খুজে পাওয়া জীবাশ্মগুলোর মত;  ”এই গাছগুলো”, তিনি তার বোন সুসানকে লিখেছিলেন, ”ঢেকে ছিল অন্য বালি পাথর এবং গলিত লাভার স্তরের নীচে যার পুরুত্ব কয়েক হাজার ফুট; এই পাথরগুলো জমা হয়েছে পানির নীচে, অথচ স্পষ্ট যে জায়গাগুলোয় এই গাছগুলো বেড়ে উঠেছিল সেটি ছিল সমুদ্র পৃষ্ঠের উপরে , সুতরাং এটা নিশ্চিৎ এই ভুমি নিশ্চয়ই সেরকমই কয়েক হাজার ফুট পানির নীচে ছিল কোন একসময়, যেকারনে এর উপর জমা পাথরের স্তর এত পুরু;”

স্মৃতিতে সাম্প্রতিক ভুমিকম্প আর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনার অভিজ্ঞতা সহ, ডারউইনের উপসংহার ছিল অ্যান্দীজ পর্বতমালা অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কোন সময়ের সৃষ্টি, কোন এক সময় এই ১৪০০০ ফুট উচু চুড়া পুর্ব দিকের পাম্পাস এর মতই সমতল ছিল, সেখানে যে দানবাকৃতির স্তন্যপায়ীদের তিনি সেখানে খুজে পেয়েছিলেন, তারা একসময় এখানেও বাস করতো, এবং তারপর এই জায়গাটা পানীর নীচে ডুবে যায় এবং আবার পানির উপরে উঠে আসে, এর এর নীচের প্রবল শক্তি এটিকে এত উপরে ঠেলে দেয়; ডারউইন বুঝতে পারেন  এই পর্বতমালা হয়তো স্তন্যপায়ীদের চেয়েও কম প্রাচীন, হয়তো এখনও তার পায়ের নীচে এটি আরো উচু হচ্ছে;

খানিকটা পাখি সংগ্রহ:

উপকুলীয় অঞ্চলের প্রয়োজনীয় সার্ভে শেষ করার পর বীগল উত্তরে প্রথমে লীমায় এবং এরপর পশ্চিম দিকে যাত্রা শুরু করে, দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশকে পেছনে ফেলে; টিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রবল বাতাস আর আন্দীজের তীব্র ঠান্ডার পর, ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণতার জন্য ডারউইন অধীর আ্গ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন; সেখানে যাবার পথে তার প্রথম যাত্রা বিরতি হয়েছিল একটি অদ্ভুত দ্বীপপুন্জে :  যার নাম গালাপাগোস;

Galap_Map_000
ছবি: এইচ এম এস বীগলের ১৮৩৫ সালে গালাপাগোস দ্বীপপুন্জ সার্ভে করার রুট; ইংল্যান্ডে ফিরে আসার বেশ কিছু দিন পর ডারউইন এখান থেকে সংগ্রহ করা কিছু নমুনায় তার তত্ত্বের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা খুজে পান; গালাপাগোস সম্বন্ধে তিনি তার ডায়রীতে লিখেছিলেন: “The natural history of this archipelago is very remarkable: it seems to be a little world within itself; the greater number of its inhabitants, both vegetable and animal, being found nowhere else.”

ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের সুতিকাগার হিসাবে গালাপোগোস দ্বীপপুন্জের খ্যাতি আছে, কিন্তু এর গুরুত্বটা ডারউইন বুঝতে পেরেছিলেন  ইংল্যান্ডে ফেরার প্রায় দুই বছর পর; তিনি যখন গালাপোগোস এ প্রথম পা রাখেন, তার চিন্তায় ছিল মুলত: জীববিজ্ঞান না বরং প্রাধান্য ছিল ভুতত্ত্ব বিষয়ক তার কৌতুহলের, কারন তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, এখানেই হয়তো এমন কোন জায়গা তিনি খুজে পাবেন, যেখানে লাইয়েল যেভাবে প্রস্তাব করেছেন, নতুন ভুমি সৃষ্টির সেই প্রক্রিয়াটি তিনি স্বচক্ষে দেখতে পাবেন;

প্রথম যে দ্বীপে ডারউইন পা রাখেন, সেটি চ্যাটহাম দ্বীপ ( এখন পরিচিত সান ক্রিস্টোবাল নামে), একটি সদ্যসৃষ্ট আগ্নেয়শিলার স্তুপ যেখানে তখনও মাটি বা কোন উদ্ভিদ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে উঠতে পারেনি; কুৎসিত দর্শন ইগুয়ানা আর অসংখ্যা কাকড়া ‍তাকে সেখানে অভ্যর্থনা জানায়; ডারউইন পরে লিখেছিলেন, “এই দ্বীপপুন্জের প্রাকৃতিক ইতিহাস খুবই চোখে পড়ার মত, মনে হয় যেন এর নিজের মধ্যেই একটি ছোট জগত;” জগত বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, আমাদের বড় পৃথিবীটা থেকে ব্যতিক্রম;

সেখানে ছিল বিশাল আকারের কচ্ছপ, যা উপরের খোলস বা কারাপেইস এর ব্যাস প্রায় ৭ ফুট, এবং তাদের খাদ্য ছিল প্রিকলী পিয়ার, এবং ডারউইন যদি এদের পিঠেও চড়ে বসে তাহলেও এরা কিছু মনে করতো না; এছাড়াও সেখানে খুবই কুৎসিৎ দুটি প্রজাতির ইগুয়ানার বসবাস করে, একটি দ্বীপের মধ্যে স্থলেই তাদের খাওয়া খুজতো আর অন্যটি সাগরে ডুব দিয়ে সমুদ্র শৈবাল খেতো; গালাপাগোস এর পাখিরা এত শান্ত প্রকৃতির যে, ডারউইন তাদের খুব কাছাকাছি চলে যেতে পারতেন, তারা ভয়ে উড়ে যেতনা;


ছবি গালাপাগোস দ্বীপপুন্জের কচ্ছপ ( Galápagos giant tortoise (Chelonoidis nigra))

ডারউইন নিয়মমাফিক তাদের সম্বন্ধে সামান্য কিছু নোট নেয়া সহ এই পাখিদের নানা প্রজাতিগুলোকে তার জন্য সংগ্রহ করতে থাকেন; কারো কারো লম্বা ঠোট, বড় বীজ ভেঙ্গে খাবার উপযোগী; কারো কারো আবার ঠোট দেখতে সরু বাকানো নীডল নোজ প্লায়ারস এর মত, যারা ছোট এবং সহজে নাগাল পাওয়া যায় না এমন বীজ খেতে পারদর্শী; তাদের ঠোট দেখে ডারউইন ধারনা করেন, তাদের কোনটি হয়তো রেন, কোনটি ফিন্চ বা ওয়ার্বলার এবং ব্ল্যাক বার্ড; তবে তিনি কোন পাখিটি কোন দ্বীপ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন, সেটি নোট করে রাখার কোন প্রয়োজন বোধ করেননি তখন; কারন তিনি ধারনা করেই নিয়েছিলেন  এই পাখিগুলো দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশেরই কোন প্রজাতি, যারা কোন একসময় এই দ্বীপপুন্জে তাদের বসতি স্থাপন করে;


ছবি: গালাপাগোস এর ল্যান্ড ইগুয়ানা(Conolophus subcristatus)


ছবি: গালাপাগোস এর মেরিন ইগুয়ানা;

প্রানীদের নমুনা সংগ্রহ শেষ হবার পর, গ্যালাপাগোস দ্বীপ ছেড়ে বীগলের যাত্রা শুরু করার অল্প কিছু দিন আগে ডারউইনের মনে হয়েছিল, তার প্রজাতিদের নমুনা সংগ্রহ আর নোট নেবার ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন ছিল; এ সময়ে তার পরিচয় হয়েছিল নিকোলাস লসনের সাথে, যিরি চার্লস দ্বীপ ( এখন সান্টা মারিয়া) একটি পেনাল কলোনীর পরিচালক ছিলেন; লসন কচ্ছপের খোলস তার ফুলের বাগানে টব হিসাবে ব্যবহার করতেন; তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, প্রতিটি দ্বীপের কচ্ছপ একে অপরের থেকে  এত ভিন্ন বৈশিষ্ট সম্পন্ন যে তিনি খোলসের দাগ আর গড়ন দেখেই বলে দিতে পারবেন সেটির উৎপত্তি কোন দ্বীপে; অন্যভাবে বললে বলা যায়, প্রতিটি দ্বীপের কচ্ছপগুলো অনন্য বৈশিষ্ট সম্পন্ন অথবা তারা হয়তোবা  এমনকি স্বতন্ত্র  কোন প্রজাতির সদস্য; আর বিভিন্ন দ্বীপের উদ্ভিদগুলো, ডারউইন পরে বুঝতে পেরেছিলেন, একইভাবে স্বতন্ত্র;

হয়তো পাখীরাও সেরকম, কিন্তু তিনি যেহেতু ঠিক কোথা থেকে তার বেশীর ভাগ সংগ্রহ করা পাখিগুলো এসেছে, ডারউইনের সেটা জানার উপায় ছিল না; এবং তিনি সেটা বোঝেননি, যখন ইংল্যান্ডে ফেরার বহু দিন পর তিনি তার সংগ্রহ করে আনা পাখীগুলো নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন, কেবল তখনই তিনি বুঝতে শুরু করেছিলেন, কিভাবে জীবনের একটি রুপ অন্য একটি রুপে পরিবর্তিত হয়;

জীবন নিজেকে নিজেই তৈরী করে:

যখন বীগল গালাপাগোস এ তার কাজ শেষ করে, এটি যাত্রা শুরু করে শান্ত প্রশান্ত মহাসাগরে; বেশ দ্রুত, মাত্র তিন সপ্তাহে বীগল পৌছে যায় তাহিতিতে; আরো চার সপ্তাহ পর নিউজীল্যান্ড এবং তার দুসপ্তাহ পর অষ্ট্রেলিয়ায়; যখন বীগল ভারত মহাসাগর অতিক্রম করছে, তখন তার মিশন ছিল প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফ গুলো ম্যাপ করা; প্রবাল প্রাচীর নিজেই একটি জীবন্ত একটি ভুগোল, যার মানচিত্র প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, ক্ষুদ্রকায় প্রবাল পলিপের কলোনী দিয়ে তৈরী প্রাচীন গড়ে ওঠে যখন তারা তাদের শরীরের চারপাশে বহিকঙ্কাল বা এক্সোস্কেলিটন তৈরী করে; পলিপরা মুলত বাচতে পারে সমুদ্র পৃষ্ঠের কাছাকাছি যা পরবর্তীতে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছিলেন, কারন তারা একটি সাংলোকসংশ্লেষী শৈবালের উপর নির্ভর করে যারা তাদের শরীরে বসবাস করে; ভারত মহাসাগরে প্রবাল প্রাচীর অতিক্রম করার সময়, ডারউইন বিস্ময়ের সাথে ভাবছিলেন, কিভাবে তারা এরকম নিখুত গোলকার রীফ তৈরী করে;  কখনো কোনো দ্বীপের চারপাশে, বা কখনো শুধু সমুদ্রে; এবং কেনই এই প্রবাল প্রাচীর পানির উপরের পৃষ্ঠর খুব কাছাকাছি অবস্থান করতে দেখা যায়, যেখানেই কিনা ঠিক তাদের থাকা প্রয়োজন তাদের সঠিকভাবে বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সুর্যালোক পেতে;?

প্রিন্সিপলস অব জিওলজীতে ডারউইন প্রবাল প্রাচীর নিয়ে লাইয়েল এর হাইপোথিসিসটি পড়েছিলেন: তাদের শুধু পানিতে নিমজ্জিত আগ্নেয়গিরি জ্বালামুখে জন্ম হয়; প্রথমবারের মত ডারউইনের মনে হলো, এখানে লাইয়েল ভুল বলেছেন; জ্বালামুখের অনুকল্পটি কুৎসিৎ এবং ঠিক খাপ খায় না, কারন এর জন্য প্রতিটি প্রাচীরকে ঠিক এমন জ্বালামুখের উপর হতে হবে এবং সেই জ্বালামুখগুলো ঘটনাচক্রে ঠিক সেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কাছেই, বেশ অগভীরে অবস্থান করবে;  ফলে ডারউইন ভিন্ন একটি ব্যাখ্যা দিলেন:

যদি লাইয়েল এর ভুত্ত্ত্ব অনুযায়ী আন্দীজ এখনও উপরে ‌উঠতে থাকে, ডারউইনের যুক্তি দেন গ্রহের অন্য কোন অংশকে অবশ্যই নীচে নেমে যেতে হবে, ভারত মহাসাগরের মত এমন কোন জায়গায় এটি অবশ্যই হতে পারে; প্রবাল হয়তো তৈরী হয় অগভীর পানিতে, নতুন সৃষ্ট দ্বীপের চারপাশে অথবা মুল ভুখন্ডের উপকুলের কাছাকাছি কোথাও, তারপর এটি নিমজ্জিত হতে থাকে, ধীরে ধীরে যখন নীচের ভুমিটি আরো পানির নীচে ডুবে যেতে থাকে, প্রবালও তাদের সাথে নীচে নেমে যায় কিন্তু তারা হারিয়ে যায় না; ডারউইন যুক্তি দেন, যেহেতু নতুন প্রবাল প্রাচীরের উপরে পৃষ্ঠে ক্রমাগত সৃষ্টি হতে থাকে যখন এর নীচের মাটি অরো ডুবে যেতে থাকে; যখন প্রাচীন প্রবাল অন্ধকারে মারা যায়, প্রাচীর ঠিকই টিকে থাকে; এর কিছু কাল পরে যখন দ্বীপটি যখন নিজেই পুরোপুরি নীচ থেকে সরে যায় কিন্তু প্রাচীরটি পানির পৃষ্ঠের কাছাকাছি নিজেদের ধরে রাখতে সক্ষম হয়;

 

coral

 

ছবি: প্রবাল প্রাচীর তৈরীতে ডারউইনের প্রস্তাবিত হাইপোথিসিস; দেশে ফেরার আগেই ডারউইনের সুখ্যাতি পৌছেছিল লন্ডনে, একজন প্রতিশ্রুতিশীল ভুতত্ত্ববিদ হিসাবে;

প্রতিটি প্রবাল প্রাচীর যাদের বীগল সার্ভেকরেছে, তারা এর কোন না একটি পর্যায়ে আছে;  কিলিং দ্বীপপুন্জে ( এখন যেটি কোকোস দ্বীপপুন্জ) বীগলের সার্ভেয়ররা দেখলেন প্রবাল প্রাচীরের সমুদ্রমুখী প্রান্তে সাগর তল হঠাৎ করে খাড়া ভাবে গভীর হয়ে আছে; তারা যখন একেবারে নীচের থেকে প্রবাল সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখেন, তারা দেখেন সেগুলো আসলে মৃত প্রবাল; ঠিক যেমনটা ডারউইন আগেই ধারনা করেছিলেন;

ডারউইন আর লাইয়েল এর শুধু অনুসারী রইলেন না বরং তিনি এখন একজন স্বতন্ত্র, পুর্ণবিকশিত চিন্তাবিদ; তিনি লাইয়েল এর মুলনীতি ব্যবহার করেই লাইয়েল এর চেয়ে আরো ভালো একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন প্রবাল প্রাচীর সম্বন্ধে এবং তিনি সেই পন্থাটাও বের করেছিলেন কিভাবে তার এই ধারনাটি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমান করা যেতে পারে; বৈজ্ঞানিকভাবে কিভাবে ইতিহাস পড়তে হয় ডারউইন সেটা শিখছিলেন, এই ক্ষেত্রে পৃথিবীতে জীবনের ইতিহাস; তার পক্ষে হাজার বছর ধরে প্রবাল প্রাচীরে গড়ে ওঠা পুণরাবৃত্তি করে দেখানো সম্ভব ছিল না, কিন্তু যদি তার প্রস্তাব মতই ইতিহাস ঘটে থাকে, তিনি তার প্রাক ধারণাটি পরীক্ষা করে দেখতে পারবেন; তিনি পরে লিখেছিলেন, “একবার তাকালেই এই প্রক্রিয়াটি সম্বন্ধে আমাদের অন্তদৃষ্টি সমৃদ্ধ হয়ে উঠে, যেভাবে পৃথিবী পৃষ্ঠ ভেঙ্গে যায় এমন ভাবে যা কিছুটা সদৃশ্য তবে অবশ্যই নিখুত নয়, যেমনটি কোন ভুতত্ত্ববিদ হয়তো দেখতে পেতেন, যদি তিনি ১০০০০ বছর বেচে থাকতেন এবং যিনি এই সময়ের পরিক্রমায় সকল পরিবর্তন লিপিবদ্ধ করে রাখতেন;”

মনে হতে পারে এই গ্রহটি অপরিবর্তনীয় কিন্তু ডারউইন সময়কে মিলিয়ন বছরের মাত্রায় দেখতে শিখছিলেন এবং সেই দৃষ্টিকোন থেকে গ্রহটি জীবন্ত কম্পমান গোলকের মত, কোথাও এটি ফুলে উঠছে, কোথাও ডেবে যাচ্ছে ভিতরে, এর উপরের পৃষ্ঠ  ছিড়ে যাচ্ছে এই পরিবর্তনের চাপে; ডারউইন আরো শিখতে শুরু করেছিলেন, তাহলে জীবনও এই সময়ের মাত্রায় পরিবর্তিত হতে পারে; যথেষ্ট পরিমান সময়ে, প্রবাল প্রাচীর তাদের নীচে সমুদ্রের তলদেশের পুরো ডুবে যাওয়া থেকে নিজেদের ঠেকাতে পারে; তারা বিশাল দুর্গ তৈরী করতে পারে তাদের পুর্বসুরীদের শরীরের ধ্বংসা্বশেষ বা কঙ্কালের উপর;

উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে অ্যাজোরেস হয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে বীগলের সময় লাগে আরো ছয় মাস; তবে ডারউইনের সুখ্যাতি তার আগেই ইংল্যান্ড পৌছে গিয়েছিল; কেমব্রিজে তার শিক্ষক হেনসলো, তার কাছে লেখা ডারউইনের বেশ কিছু চিঠি থেকে তথ্য বাছাই করে একটি বৈজ্ঞানিক পেপার ও একটি প্যাম্ফলেট প্রকাশ করেছিলেন; তার পাঠানো স্তন্যপায়ী প্রানীর জীবাশ্ম নিরাপদে ইংল্যান্ডে পৌছেছিল, এবং তাদের বেশ কিছু বৃটেন এর সেরা বিজ্ঞানীদের নজর কেড়েছে ইতিমধ্যেই; এমনকি ডারউইনের আইডল, লাইয়েলও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন ডারউইনের ফিরে আসার;

প্লীমাউথ বন্দর ছেড়ে যাবার পাচ বছর পর একদিন প্রবল বৃষ্টির দিনে ইংলিশ চ্যানেল এ প্রবেশ করে বীগল; ১৮৩৬ সালে অক্টোবর মাসের দুই তারিখে ফিটজরয় তার শেষ সার্ভিসটি পরিচালনা করলেন, সেদিন দিনের শেষে বীগল ছেড়ে বাড়ির পথে রওয়ানা দেন ডারউইন;  এর পরে আর কখনোই তিনি ইংল্যান্ড ছেড়ে বের হননি, এমনকি তার নিজের বাসা ছেড়েই বের হয়েছিলেন কদাচিৎ;

ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রেখেই ডারউইন বুঝেছিলেন, তিনি গভীরভাবে, হয়তো আমুল বদলে গিয়েছেন; গ্রামের পাদ্রী হিসাবে এমন কোন জীবন তিনি যে আর সহ্য করতে পারবেন না সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, তিনি একজন পেশাজীবি প্রকৃতিবিজ্ঞানী হয়েছিলেন এবং তার বাকী জীবনে তিনি শুধু তাই ছিলেন; এছাড়াও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা চেয়ে বরং  শুধুমাত্র একজন স্বাধীন স্কলার হিসাবে, যেমন লাইয়েল, কাজ না করতে পারলে তিনি কোনদিন সুখী হতেও পারবেন না; কিন্তু তাকে যদি লাইয়েল এর মত কোন জীবন কাটাতে হয়, তাহলে তার বাবাকে কিছু অর্থ সাহায্য দিতে হবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য; এবং চিরকালের মতই ডারউইন চিন্তিত ছিলেন, তার এই পরিকল্পনা তার বাবা কিভাবে নেবেন;

অক্টোবরের চার তারিখ তার বাবার বাড়ি শ্রিউসবারী র দি মাউন্টে এসে পৌছান; পরিবারের সবাইকে দেখার জন্য উদগ্রীব ডারউইন, যথেষ্ট ভদ্র ছিলেন মধ্যরাতে সবাইকে ঘুম থেকে উঠিয়ে বিরক্ত না করার জন্য, সেই রাতটি তিনি স্থানীয় একটি সরাইখানায় কাটান, পরদিন সকালে যখন কেবল তার বাবা এবং বোনরা সকালের নাস্তার জন্য টেবিলে বসেছেন, তিনি কাউকে না জানিয়ে মাউন্টে প্রবেশ করেন; তাকে দেখে তারা বোনেরা আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলেন, আর তার বাবা শুধু বললেন, ”বেশ, তার মাথার আকারতো পুরো বদলে গেছে;” তার কুকুরগুলো এমন আচরণ করলো যেন ডারউইন মাত্র একদিনের জন্য বাড়ি ছেড়েছিল, এবং এখন তারা প্রস্তুত তার সকালে হাটার সঙ্গী হতে;

পরে তার বাবার রেগে যাওয়ার ব্যপারে ডারউইনের শঙ্কা অমুলক প্রমানিত হয়েছিল; যখন ডারউইন প্রবাসে, তার ভাই ইরাসমাসও চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে একজন স্বাধীন স্কলারহিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, বড়ভাই ই তার ছোটভাই এর জন্য পথটা সুগম করে দিয়েছিলেন, ডারউইনের পরিকল্পনায় তারা বাবা কোন বাধা দিলেন না; যখন রবার্ট চার্লস এর প্যাম্ফলেটটি পড়েছিলেন, তিনি বেশ গর্বিত হয়েছিলেন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রকৃতি বিজ্ঞানী হিসাবে  শুধু খরগোস শিকার করে ডারউই্ন তার সময় নষ্ট করবেন না; তিনি তার ছেলের জন্য স্টক এবং বছরে ৪০০ পাউন্ড এর ভাতার ব্যবস্থা করে দিলেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যা ছিল যথেষ্ট;

এরপর চার্লস ডারউইন তার বাবাকে আর কোনদিনও ভয় পাননি, কিন্তু তার বাবার নিজের সন্মান রক্ষা করার ব্যাপারে বিশেষ নজর দেবার রুচিটি তিনি উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছিলেন, এবং যখনই সম্ভব হয়েছে তিনি যে কোন ধরণের সংঘর্ষ এড়িয়ে চলেছেন; কোন দিনই তিনি বিদ্রোহী ছিলেন না, এবং কখনো তা হতে চাননি; কিন্ত তাসত্ত্বে বাড়ী ফেরার কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি নিজেকেই শঙ্কিত করেছিলেন একটি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সুচনা করে;

 

__________________________ চলবে

Advertisements
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (তিন)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s