চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (দুই)

 charles-darwin
ইলাসট্রেশন: Kenn Brown, Mondolithic Studios;  Scientific American’s special issue on theory of evolution (January 2009)

লেখাটির মুল সুত্র: Carl Zimmer এর Evolution, the triumph of an idea র প্রথম দুটি অধ্যায়; এছাড়াও কিছু বাড়তি তথ্য এসেছে বিভিন্ন সুত্র থেকে:
প্রথম পর্বের প্রথম অংশর লিঙ্ক নীচে

চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (এক)

প্রথম পর্ব :
যে বিজয় এসেছে ধীরে, ডারউইন এবং ডারউইনবাদের উত্থান

এক:

পৃথিবীর গড়ে ওঠা…

অক্টোবর ১৮৩১ সালে যখন ডারউইন প্লীমথ পৌছেছিলেন তার ট্রাঙ্ক ভর্তি বই আর বৈজ্ঞানিক সরন্জাম নিয়ে, তিনি পৃথিবী এবং জীব জগত সম্বন্ধে তৎকালীন ধারনাকে সাথে নিয়ে এসেছিলেন; কেমব্রিজে তার শিক্ষকরা শিখিয়েছিলেন, পৃথিবী সম্বন্ধে জানার মাধ্যমেই আমরা ঈশ্বরের ইচ্ছার কথা জানতে পারি;  কিন্তু তা সত্ত্বেও  বৃটিশ বিজ্ঞানীরা যতই আবিষ্কার করতে লাগলেন, ততই  বাইবেলকে নির্ভুল একটি গাইড হিসাবে বিশ্বাস করাও কঠিন হয়ে উঠতে শুরু করেছিল;

বৃটিশ ভুতত্ত্ববিদরা যেমন, আর মেনে নিতে রাজী ছিলেন না যে, পৃথিবী মাত্র কয়েক হাজার বছর প্রাচীন; কোন এক সময় হয়তো যথেষ্ট ছিল বাইবেল এর কথা আক্ষরিক অর্থে মেনে নেয়া, যেমন মানবজাতির সৃষ্টি হয়েছে  মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রথম সপ্তাহে; ১৬৫৮ সালে জেমস আশার, আরমাঘ এর আর্চ বিশপ বাইবেল এবং কিছু ঐহিহাসিক রেকর্ড ঘেটে গ্রহর বয়স নির্দিষ্ট করেন;


ছবি: জেমস আশার (James Ussher: 1581 –1656); আয়ারল্যান্ডের এই আর্চ বিশপ পৃথিবীর বয়স মেপেছিলেন, তার মতে ৪০০৪ খৃষ্টপুর্বাব্দে ২২ অক্টোবর ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন; বিস্ময়কর হলে সত্য এখনও অনেকে ইয়ং আর্থ ক্রিয়েশনিষ্ট আছেন, যারা জেনেসিসে বর্ণিত সময়কাল অনুযায়ী পৃথিবীর বয়স মনে করেন মাত্র কয়েক হাজার বছর;

তিনি ঘোষনা দেন, ঈশ্বর নাকি ৪০০৪ খৃষ্টপুর্বাব্দে অক্টোবর মাসের ২২ তারিখে পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু শীঘ্রই স্পষ্ট হয়ে যায় সৃষ্টির শুরুর সেই সময় থেকে পৃথিবী বদলে গেছে অনেকটাই, ভুতত্ত্ববিদরা সামুদ্রিক মোলাস্কদের শেলস বা খোলস এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রানীদের জীবাশ্ম খুজে পান খাড়া পাহাড়ের উন্মুক্ত মুখে পাথরের স্তরে স্তরে; নিশ্চয়ই ঈশ্বর তাদের সেখানে রেখে দেননি পৃথিবী সৃষ্টির সময়, আগের ভুতত্ত্ববিদরা এধরনের জীবাশ্মকে ব্যাখ্যা করতেন বাইবেলে বর্ণিত নোয়ার (নুহ নবী) সময়কালে ঘটা পৃথিবী ব্যাপী প্লাবনে মৃত প্রানীদের অবশিষ্ঠাংশ হিসাবে, যখন সমুদ্র পুরো পৃথিবীকে ঢেকে রেখেছিল, তারা কাদার নীচে ডুবে গিয়েছিল সমুদ্র তলে, এই কাদার স্তরই সমুদ্রের তলদেশে পাথরের স্তর তৈরী করেছিল এবং যখন বণ্যার পানি সরে গিয়েছিল, বেশ কিছু স্তর ভেঙ্গে পরে, যে প্রক্রিয়ায় জীবাশ্ম পুর্ণ খাড়া পাহাড় আর নানা পর্বতমালা সৃষ্টি করে;

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষেও, যদিও বেশীর ভাগ ভুতত্ত্ববিদই পৃথিবীর ইতিহাসকে কয়েক হাজার বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে ,  এমন পৃথিবীর পরির্বতন হবার একমাত্র সুযোগ হিসাবে একটি সর্বব্যাপী বিশাল বন্যার ধারনায় সব কিছুকে ব্যাখা  করার প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করেন; কেউ কেউ প্রস্তাব করেন যখন এই গ্রহটি সৃষ্টি হয়েছিল পুরোটাই নিমজ্জিত ছিল এর বিশ্বব্যাপী সমুদ্রে, যা ধীরে ধীরে গ্রানাইট এবং তার উপর স্তরে স্তরে অন্য পাথরেরও স্তর সৃষ্টি করেছিল, পরে যখন সমুদ্র সরে যেতে থাকে, এটি সেই পাথরের কিছু অংশ উম্মোচিত করে, যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে আরো স্তরের সৃষ্টি করে;

অন্য ভুতত্ববিদরা দাবী করেন, পৃথিবীর ভুত্বককে পরিবর্তন করার মুল শক্তি  এসছে পৃথিবীর কেন্দ্র থেকেই, জেমস হাটন, একজন স্কটল্যান্ডীয় কৃষিবিদ, ভুতত্ত্ববিদ প্রস্তাব করেন পৃথিবীর কেন্দ্রের গলিত লাভাই নীচ থেকে গ্রানাইটদের উপরে ঠেলে দেয়, কোন জায়গায় তা আগ্নেয় গিরির সৃষ্টি করে, কোথাও তা পৃথিবী পৃষ্টের বিশাল অংশকে অনেক উপরে ঠেলে উঠিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করে পর্বতমালা; বৃষ্টি এবং বাতাস পর্বত আর অন্যান্য উচু জায়গাগুলোকে ক্ষয় করে, এবং এই তলানী গুলোই সমুদ্রে বয়ে নিয়ে যায় পানি, যেখানে আবার সে পাথর তৈরী করে এবং পরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে উঠে আসে সৃষ্টি আর ধ্বংশর বিশ্বব্যাপী একটি চক্রে; হাটন পৃথিবীকে দেখেছিল চমৎকার ভাবে তৈরী করা ক্রমশ চলতে থাকা গতিময় একটি যন্ত্র হিসাবে, যা সবসময় মানুষের জন্য একে বাসযোগ্য রাখে;


ছবি: জেমস হাটন James Hutton (1726-1797); যার গবেষনা আধুনিক ভুতত্ত্ববিদ্যার ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল;  জিওলজিকাল টাইম বা ডীপ টাইমের ধারনাটিও তার;

হাটন তার তত্ত্বের স্বপক্ষে প্রমান খুজে পেয়েছিলেন স্কটল্যান্ডের শিলাস্তরের গঠনেই; তিনি দেখেছিলেন গ্রানাইট পাথরের শিরা কিভাবে বিস্তৃত হয়ে আছে উপরের পাললিক শিলার স্তরের ভিতরে; তিনি ভুপৃষ্ঠের কিছু  খোলা জায়গায় দেখতে পান উপরের পাললিক শিলার স্তর সঠিক আনুভুমিকভাবে একের পর এক সাজানো রয়েছে কিন্তু ঠিক এর নীচেই অন্য স্তরগুলো সাজানো আসলেই উল্লম্ব ভাবে, সবচেয়ে নীচের স্তরটি ,হাটন যুক্তি দেন, হয়তো সৃষ্টি হয়েছিল প্রাচীন কোন জলাশয়ে, এবং এরপর এটি একপাশে হেলে বা কাৎ হয়ে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উপরে একে ঠেলে উঠিয়ে দিয়েছিল পৃথিবীর ভিতরের কিছু শক্তি, এবং পরে তা ধীরে ধীরে বৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষয় হতে থাকে; পরে এই হেলানো স্তরগুলো আবার পানির নীচে ঢাকা পড়ে, এবং এর উপর নতুন এক সেট আনুভুমিক পাললিক শিলার স্তর সৃষ্টি হয় এবং অবশেষে আবারো পুরো স্তরটি পানির উপরে উঠে আসে এমন একটি ভুতাত্ত্বিক কাঠামোর সৃষ্টি করেছিল;


ছবি: স্কটল্যান্ডে হাটনের বর্ণিত শিলাস্তরের Unconformity;

‘একটা প্রশ্ন এখানে স্বাভাবিকভাবেই আসে, তাহলো এরকম কিছু হবার জন্য প্রয়োজনীয় সময়কাল নিয়ে”.. হাটন মন্তব্য করেছিলেন যখন তিনি তার এই তত্ত্বটি সর্বসাধারনের জন্য প্রস্তাব করেন, কতটুকু সময়কালের প্রয়োজন ছিল এই বিশাল কাজটি করার জন্য?

তার উত্তর ছিল, অনেক..অনেক দীর্ঘ সময়; বাস্তবিকভাবে তিনি কল্পনা করেছিলে, অসীম সময়ের;

কিভাবে পৃথিবীর পরিবর্তন হচ্ছে সে বিষয়ে হাটন একটি মৌলিক নীতি আবিষ্কার করেছিলেন: আমাদের বোধগম্যতার বাইরে ধীর সেই শক্তি আজো কাজ যা করে যাচ্ছে এই গ্রহকে এর পুরো ইতিহাস জুড়ে নতুন রুপ দিতে; সেকারনেই আজকের যুগে অনেক ভুতত্ববিদের কাছে তিনি স্মরনীয়; কিন্তু তার সময়ে তাকে সরাসরি বিরোধিতার মুখোমুখি হয়ে হয়েছিল সবক্ষেত্রেই; তার কিছু সমালোচক অভিযোগ করেছিলেন, তার তত্ত্ব বাইবেলে বর্ণিত জেনেসিস বিরোধী; কিন্তু বেশীর ভাগ ভুতত্ত্ববিদই তার সেই ধারনাটি, পৃথিবীর ইতিহাসের যে কোন দিক নির্দেশনা নেই, এবং এটি স্বয়ংসম্পুর্ণ সৃষ্টি আর ধ্বংশের একটি চক্রর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় যার কোন শুরু বা শেষ নেই… এই বিষয়টির বিরোধীতা করেছিলেন; কিন্তু তারা যত মনোযোগ দিয়ে ভুতাত্ত্বিক রেকর্ড দেখতে শুরু করেন, স্পষ্টতই তারা দেখতে পেলেন পৃথিবী সবসময় একই রকম ছিল না;

আর এর সবচেয়ে ভালো প্রমান এসেছিল পাথর থেকে না, পাথরের মধ্যে বন্দী হয়ে  থাকা জীবাশ্মদের কাছ থেকে; ফ্রান্সে যেমন একজন তরুন প্রত্নতত্ত্ববিদ জর্জ কুভিয়ের জীবিত হাতিদের মাথার খুলির সাথে সাইবেরিয়া,ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ( যেখানে এখন আর কোন হাতি দেখতে পাওয়া যায় না) থেকে উদ্ধার করা জীবাশ্ম হাতির খুলির সাথে একটি তুলনামুলক আলোচনা করেন; কুইভিয়ের তাদের বিশাল চোয়ালের রেখাচিত্র আকেন, তাদের দাত একটার সাথে একটা মিশে আছে করুগেটেড স্ল্যাবের বা ঢেউ খেলানো পাথরের টুকরোর মত; তিনি প্রমান করে দেখান যে এই জীবাশ্ম হাতি ( যাদের ম্যামথ বলা হয়) বর্তমানে জীবিত হাতিদের দিয়ে থকে মৌলিকভাবে ভিন্ন;


ছবি: Jean Léopold Nicolas Frédéric Cuvier (1769 – 1832) , যিনি পরিচিত ছিলেন জর্জ কুভিয়ের হিসাবে; িফরাসী কুভিয়ের উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে অত্যন্ত বিখ্যাত একজন প্রানীবিজ্ঞানী ছিলেন;  তুলনামুলক অ্যানাটোমী ও জীবাশ্মবিদ্যা  তার দেখানো পথে িশুরু হয়েছিল; তিনি প্রথম জীবাশ্ম কংকালের সাথে জীবিত প্রানীর কংকালের তুলনামুলক আলোচনা করেছিলেন; তিনি প্রমান করেছিলেন প্রজাতির বিলুপ্তি একটি ফ্যাক্ট এবং পৃথিবীব্যাপী মহাদুর্যোগ ঘটেছিল, যা বহু প্রজাতির বিলুপ্তির কারন (Catastrophism); জীবাশ্মবিদ হলেও তিনি বিবর্তনের ধারনার বিরোধী ছিলেন; লামার্ক  ও পরে জিওফরয় সন্ত ইলিয়ারের বিবর্তনের ধারনাকে বিরোধিতায় নের্তৃত্ব দিয়েছিলেন;

”যেমনটা কুকুর ভিন্ন শিয়াল বা হায়েনা থেকে, বা তারো বেশী”; তিনি লিখেছিলেন; খুবই কঠিন হবে এমনটা দাবী করা যে এই সুস্পষ্ট সুবিশাল প্রানীটি ঘুরে বেড়িয়েছে অথচ কারো চোখে পড়েনি; প্রথম বারের মত একজন প্রকৃতি বিজ্ঞানীরা দেখালেন অতীতে কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে;

কুইভিয়ের পরে আরো প্রমান করে দেখিয়েছিলেন যে, অনেক স্তন্যপায়ী প্রানীও বিলুপ্ত হয়েছে; তার আবিষ্কার সম্বন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ”আমার মনে হয় তারা প্রমান করে আমাদের আগে অন্য এক পৃথিবীর অস্তিত্ত্ব ছিল, যা ধ্বংশ হয়েছে কোন ধরনের মহাদুর্যোগের কারনে; কিন্তু এই কি ছিল সেই প্রাচীন পৃথিবী? কি সেই প্রকৃতি যা মানুষের কর্তৃত্ত্বের বাইরে? এবং এটি বিলুপ্ত করার মত বৈপ্লবিক ঘটনাটাই বা কি, যা কিছু ক্ষয়ে যাওয়া হাড় ছাড়া আর কোন চিহ্ন অবশিষ্ট রাখেনি?”;

কুভিয়ের এমন কি আরো বলেছিলেন যে, কেবল মাত্র একটিই মহাদুর্যোগ হয়নি, যেখানে মামথ আর স্তন্যপায়ী বিলুপ্ত হয়েছে, বরং ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলো এমন ঘটনা ঘটেছে; বিভিন্ন যুগের জীবাশ্মগুলোও এত বেশী বৈশিষ্টসুচক যে কুভিয়ের এমনকি তাদের ব্যবহার করতে পারতেন কোন পাথরের ফরমেশনে তারা পাওয়া গেছে তা চিহ্নিত করতে; মহাদুর্যোগের সঠিক কারনটি কি ছিল তা নিশ্চয়ই কুভিয়ের এর জানা ছিল না; তিনি ধারনা করেছিলেন, হঠাৎ করে বেড়ে ওঠা সমুদ্রপৃষ্ঠর উচ্চতা বা কোন হঠাৎ তুষার যুগ হয়তো বা এর কারণ হতে পারে; পরবর্তীতে নতুন প্রানী আর উদ্ভিদ আবির্ভুত হয়েছিল গ্রহের অন্য কোন স্থান থেকে সেখানে অভিপ্রয়ানের মাধ্যমে বা কোন না কোন ভাবে সেখানেই সৃষ্টি হয়েছিল তাদেরনতুন করে; কিন্তু কুভিয়ের একটা ব্যপারে নিশ্চিত ছিলেন, এধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন পৃথিবীর ইতিহাসে খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা; যদি নোয়া র প্লাবন সত্যি হয়ে থাকে, সেটি ছিল এধরনের ধারাবাহিক ভাবে ঘটে আসা দুর্যোগের সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা মাত্র ; প্রতিটি দুর্যোগই অসংখ্য প্রজাতির বিলুপ্তির কারন ছিল, এবং বেশীর ভাগ এধরনের ঘটনাগুলো ঘটেছে মানুষের আবির্ভাবের বহু আগেই;

জীবনের ইতিহাসের সত্যিকারের গতিটা নির্ণয়ের জন্য, বৃটিশ ভুতত্ত্ববিদরা যেমন, অ্যাডাম সেজউইক সমস্ত গ্রহের ভুতাত্ত্বিক রেকর্ড তৈরীর একটি কাজ হাতে নেন, স্তর বিন্যাস অনুযায়ী, তারা শিলা স্তরের ফরমেশনকে যে নাম দিয়ে গিয়েছিলেন, তার কিছু এখনও প্রচলিত আছে, যেমন ডেভোনিয়ান এবং ক্যামব্রিয়ান, যদিও বৃটিশ ভুতত্ত্ববিদরা ১৮০০ র শুরু দিকে আক্ষরিকভাবে বাইবেল থেকে বহুদুরে অবস্থান নিয়েছিলেন ঠিকই, তবে তারা তাদের কাজকে দেখতেন ধর্মীয় কর্তব্য হিসাবে;তারা বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানই ঈশ্বরের সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন করবে, এমনকি তার উদ্দেশ্যগুলোকে; সেজউইক নিজে প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতেন, ঈশ্বরের শক্তি, জ্ঞান এবং মাহাত্ম্যর প্রতিচ্ছবি;

ঐশ্বরিক পরিকল্পনা বা ডিজাইনের প্রকাশ:

‌বৃটিশ গবেষকরা যেমন, সেজউইক, ভাবতেন ঈশ্বরের মহত্ব দৃশ্যমান শুধু কিভাবে তিনি পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় বরং কিভাবে তিনি জীবন সৃষ্টি করেছেন, প্রতিটি প্রজাতি সৃষ্টি হয়েছে পৃথক প্রথক ভাবে, এবং সৃষ্টির পর থেকেই তারা অপরিবর্তিত আছে; তারপরও সব প্রজাতিকে বিভিন্ন শ্রেনীতে বিন্যস্ত করা সম্ভব –যেমন প্রানী এবং উদ্ভিদ এবং তার মধ্যেই আরো অনেক ক্ষুদ্র উপশ্রেনীতে যেমন, অ্যাশ এবং স্তন্যপায়ী;  এই বিন্যাস বৃটিশ প্রকৃতবিদরা বিশ্বাস করতেন পৃথিবীতে এটি ঈশ্বরের কল্যানময় পরিকল্পনারই একটি রুপ; এটি বিন্যস্ত একটি ক্রমানুসারে, যা শুরু নির্জীব বস্তু এবং জীবনের আঠালো বা স্লাইমী নানা রুপ থেকে বিস্তৃত আরো জটিল এবং উচ্চ সংগঠনের জীবদের দিকে;


ছবি: অ্যাডাম সেজউইক, Adam Sedgwick (785 – 1873);  আধুনিক ভুতত্ত্ববিদ্যার অন্যতম অগ্রদুত; ‍যিনি দুটো গুরুত্বপুর্ণ ভুতাত্ত্বিক সময় পর্ব ডেভোনিয়ান ও ক্যামব্রিয়ান পর্ব ব্যাখ্যা করেছিলেন; ডারউইনের শিক্ষক ছিলেন ভুতত্ত্বে, ওয়েলস এ তার অধীনে হাতে কলমে ভুতত্ত্ববিদ্যার কাজ শিখেছিলেন ডারউইন; ঐশ্বরিক ভাবে প্রজাতি সৃষ্টি হচ্ছে ধাপে ধাপে এমন  ধারনায় তার বিশ্বাস ছিল দৃঢ়;  ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনার তীব্র বিরোধীতা করেছিলেন;

এই ‘উচ্চমানে’র অর্থ অবশ্যই বোঝাচ্ছে মানুষের সদৃশ হয়ে ওঠাকে; এই জীবনের মহাশৃঙ্খলের একটি সংযোগও সৃষ্টির আদি থেকে পরিবর্তিত হতে পারেনা কখনো; কারন তেমন কোন পরিবর্তনের অর্থই হবে ঈশ্বরের সৃষ্টি নিখুত ছিল না;  আলেক্সান্ডার পোপ যেমন লিখেছিলেন,” প্রকৃতির শৃঙ্খলে যে সংযোগেই আঘাত করুন না কেন/ দশ বা হাজার টুকরোই হোক না কোন, সবই একই হবে”;  এই মহা জীবনের শৃঙ্খল শুধু ঈশ্বরের কল্যানময় সৃজনশীলতাকেই প্রকাশ করেনা, প্রতিটি প্রজাতির অতুলনীয় নিখুত সুক্ষ ডিজাইনও প্রকাশ করে; মানুষের চোখ বলুন কিংবা পাখির ডানা;

উইলিয়াম প্যালে, একজন ইংরেজ যাজক, এই যুক্তিটাই তার বইয়ে প্রকাশ করেছিলেন, যা ডারউইন ও  অন্যান্য প্রকৃতিবিদ বা ধর্মবিদ হবার ইচ্ছা পোষনকারী যে কোন কারোর জনই বাধ্যতামুলক একটি পাঠ্য ছিল;


ছবি:  উইলিয়াম প্যালী; William Paley (1743 –1805); প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বে এই প্রণেতা ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমান হিসাবে টেলিওলজিক বা ডিজাইন আর্গুমেন্টটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তার ঘড়ি নির্মাতার রুপক ব্যবহার করার মাধ্যমে;

প্যালের যুক্তি একটি আকর্ষনীয় তুলনার উপর ভিত্তি করে দাড়িয়ে আছে; ”যদি কোন জঙ্গল অতিক্রম করার সময়”, তিনি লিখেছিলেন,” ধরুন কোন একটা পাথরের টুকরোর সাথে আমার পা হোচট খায় এবং জিজ্ঞাসা করা হয় কেমন করে পাথরটা সেখানে এলো”, হয়তো সেটি, যেমন প্যালীর যতটুকু জানেন, সেখানেই চিরকাল পড়ে ছিল, ”কিন্তু ধরুন আমি মাটিতে পড়ে থাকা একটি ঘড়ি দেখতে পেলাম, এবং তখন জিজ্ঞাসা করা উচিৎ কেমন করে সেটা সেখানে আসল “,এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি খুবই ভিন্ন একটি উপসংহারে উপনীত হবেন, পাথরের ব্যতিক্রম, কোন একটি ঘড়ি তৈরী হয় বেশ কয়েকটি যন্ত্রাংশের সন্মিলনে, যারা সম্মিলিতভাবে কাজ করে একটি উদ্দেশ্যে : তা হলো সময় নির্ণয়ে; এবং এই সব অংশগুলো কেবল কাজ করতে পারে যদি তারা সবাই একসাথে কাজ করে, অর্ধেক ঘড়ি তো আর সময় নির্নয় করতে পারে না;

প্যালে যুক্তি দেন, সেকারনে এই ঘড়িটি অবশ্যই কোন পরিকল্পনাকারী বা ডিজাইনারের সৃষ্টি; প্যালে এমনকি যদি নাও জানেন কেমন করে একটি ঘড়ি বানাতে হয়, তারপরও তিনি একই কথা বলবেন, এমনকি তার খুজে পাওয়া ঘড়িটি যদি অকেজো বা ভাঙ্গা হয়; এটাকে অসংখ্য ধাতব টুকরার নানা সম্ভাব্য কম্বিনেশনের  শুধুমাত্র একটি বলা অর্থহীন হবে তার মতে;

প্যালীর যুক্তি দেন, আমরা যখন প্রকৃতির দিকে তাকাই, আমরা এই ঘড়ির তুলনায় অগনিত আরো জটিল ও সুক্ষভাবে তৈরী  সৃষ্টি দেখতে পাই;  টেলিস্কোপ আর চোখ একই মুলনীতি অনুযায়ী বানানো হয়েছে, যেখানে লেন্সটি আলোক রশ্মিদের বাকা করে একটি ইমেজ বা দৃশ্য তৈরী করে; পানিতে আলোকে বাকা করতে আরো বেশী উত্তলাকার লেন্সের প্রয়োজন, বাতাসের তুলনায়;  একারনে দেখুন, সামুদ্রিক প্রানীদের চোখে লেন্স আরো গোলাকার থাকে স্থলবাসী প্রানীদের তুলনায়; প্যালী তাই জিজ্ঞাসা করেন”এই পার্থক্যের তুলনা আর কি কোন সহজতর উদহারন আছে যা কিনা প্রমান করে স্বর্গীয় একজন ডিজাইনারের উপস্থিতির?” ;

একটি ঝিনুক, স্পুনবিল বা একটি কিডনী, যা কিছু প্যালী পরীক্ষা করে দেখেছেন তাই তাকে বিশ্বাস যুগিয়েছে প্রকৃতির সবকিছুরই একটি ডিজাইনার বা পরিকল্পক আছে;  পদার্থবিদ্যার নানা সুত্র, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন ১৭০০ এর শেষ দিকে, গ্রহের কক্ষপথকে ব্যাখ্যা করতে, তা হয়তো ঈশ্বরের মহিমা খানিকটা হ্রাস করেছিল ( “জ্যোতির্বিজ্ঞান”, প্যালী স্বীকার করেছিলেন, “খুব ভালো কোন মাধ্যম নয়, যা দিয়ে বুদ্ধিমান কোন সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি প্রমান করা যায়”); কিন্তু ধর্মতত্ত্ব এই ক্ষেত্রে এখনও খুবই উর্বর ক্ষেত্র;

প্রকৃতি থেকে, প্যালী সিদ্ধান্তে আসেন যে কোন স্রষ্টা ডিজাইনারের অস্তিত্ব আছে তাই শুধু না, তিনি কল্যানময়; তিনি যুক্তি দেন, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে  ঈশ্বরের সৃষ্ট সব কিছুই উপকারী; পৃথিবীতে যা খারাপ কিছু আছে তা দুর্ভাগ্যজনক পার্শপ্রতিক্রিয়া; একজন মানুষ তার দাত ব্যবহার করতেই পারেন কাউকে কামড়ানোর জন্য, কিন্তু দাত পরিকল্পনা করা হয়েছে মুলত খাদ্য খাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য; যদি ঈশ্বর চাইতেন আমরা একে অপরের ক্ষতি করি, তাহলে তিনি এর চেয়ে আরো ভালো অস্ত্র ডিজাইন করে আমাদের মুখের মধ্যে দিতেন; এধরনের কোন কালো ছায়া জীবনের সুর্যালোক থেকে প্যালীর মনযোগ নষ্ট করতে পারেনি, ” সর্বোপরি অবশ্যই আনন্দের পৃথিবী এটি, বাতাস, মাটি এবং পানি পরিপুর্ণ হয়ে আছে তৃপ্ত জীবনের অস্তিত্বে ”;

কেমন করে জিরাফ তার এক লম্বা ঘাঢ় পেল:

ডারউইন মুগ্ধ হয়েছিলেন প্যালীর যুক্তির বাঙময়তায়, কিন্তু একই সাথে জীবনের বর্তমান রুপে কিভাবে পেল,  সে সম্বন্ধে অপেক্ষাকৃত কম সম্মানজনক কিছু ধারনা সম্বন্ধেও তিনি কিছুটা জানতেন; এর কয়েকটি এসেছিল তার নিজের পরিবার থেকেই, তার দাদা ইরাসমাস ডারউইন, চার্লস জন্ম নেবার সাত বছর আগেই যিনি মারা যান, কিন্তু এমনকি তার মৃত্যুতে তাকে উপেক্ষা করা অসম্ভব; পেশায় চিকিৎসক ইরাসমাস একজন প্রকৃতিবিদও ছিলেন, এছাড়া  ছিলেন একজন আবিষ্কারক, উদ্ভিদবিদ এবং বেশ জনপ্রিয় একজন কবি;


ছবি: ইরাসমাস ডারউইন (Erasmus Darwin (12 December 1731 – 18 April 1802); চার্লস ডারউইনের পিতামহ: ইরাসমাস ডারউইন (Erasmus Darwin) (১৭৩১-১৮০২).. চার্লস ডারউইনের পিতামহ, তার জন্মের সাত বছর আগে তিনি মারা যান; ভীষন বর্ণিল চরিত্রের এই মানুষটিকে নিয়ে ডারউইনের বাবা রবার্ট ডারউইন বেশ বিব্রত ছিলেন সবসময়, আর ডারউইনও তার সম্বন্ধে তেমন কোন স্পষ্ট ধারনাও পাননি শৈশবে; কিন্তু এডিনবরাতে ডাক্তারী পড়ার সময় ডারউইন যখন পালাবার উপায় খুজছিলেন এই অপছন্দের বিষয় থেকে, তখন প্রকৃতি বিজ্ঞানে তাকে মেন্টরিং এর দ্বায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রাণী বিজ্ঞানী রবার্ট গ্রান্ট; গ্রান্ট ইরাসমাস ডারউইনকে শ্রদ্ধা করতেন, তার নানা লেখার সাথে পরিচিত ছিলেন; তার কাছ থেকেই দাদার কথা শুনেছিলেন ডারউইন; ইরাসমাস ডারউইন পেশায় চিকিৎসক ছিলেন, কিন্তু তার আগ্রহের ক্ষেত্র ছিল ব্যপক, তিনি ছিলেন দার্শনিক, কবি, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, অনুবাদক, সমাজ সংস্কারক; তার কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ট্রান্সমিউটেশন বা এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির উদ্ভবের তার নিজস্ব ধারনাগুলো, যা ল্যামার্ক এবং পরবর্তীতে ডারউইনের বিবর্তনের ধারনারই পুর্বসুরী; তার সবচেয়ে বিখ্যাত কাজটি ছিল Zoomania (১৭৯৪-১৭৯৬), চার্লস ডারউইন পরবর্তীতে বইটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন আরেকটু বড় পরিসরে; এই বইটিতে ইরাসমাস বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং সারভাইভাল অব দি ফিটেষ্ট সম্বন্ধে মন্তব্য করেছিলেন; বইটিতে স্পষ্টভাবে তিনি এর আগের বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারনার উৎস হিসাবে স্কটিশ দার্শনিক James Burnett এর লেখার কথাও উল্লেখ করেছিলেন; এছাড়া ক্যারোলাস লিনিয়াস এর লেখা তিনি ল্যাটিন থেকে ইংরেজীতে অনুবাদ করেছিলেন প্রায় সাত বছর ধরে; ইরাসমাস ডারউইনের কবিতার মুল বিষয় ছিল প্রকৃতি বিজ্ঞান ; তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত একটি দীর্ঘ কবিতা টেম্পল অব নেচার প্রকাশিত হয়, সেখানে তিনি অনুজীব থেকে সভ্য সমাজের উদ্ভবের ব্যাপারে তার নিজস্ব ধারনাটি উল্লেখ করেছিলেন; এছাড়াও বিবর্তনের ধারনা  নিয়ে তার আরো একটি দীর্ঘ কবিতা যেমন : The Loves of the Plants (১৭৮৯) ; ১৭৯১ সালে তার The Botanic Garden, A Poem in Two Parts: Part 1, The Economy of Vegetation এ বিগ ব্যাঙ সম্বন্ধে একটি কল্পনার কথা আছে, যে ধারনাটির মুলত দানা বেধেছিল উনবিংশ আর বিংশ শতাব্দীতে; নারী শিক্ষার সমর্থনকারী, দাস বাণিজ্য বিলুপ্ত করার স্বপক্ষে আন্দোলনকারী ইরাসমাস ডারউইন বেশ কিছু আবিষ্কারও করেছিলেন, তার ১৭৭৯ সালের নোটবুকে প্রথম হাইড্রোজেন অক্সিজেন মিশ্রনের গ্যাস চেম্বার সহ একটি সম্ভাব্য রকেট ইন্জিনের ধারনার কথা লিখেছিলেন; স্ট্যাফোর্ডশায়ারের লিচফিল্ডের বীকন স্ট্রীটে বিবর্তন তত্ত্ব এবং ডারউইনের পিতামহ হিসাবে পরিচিত ইরাসমাস ডারউইনের বাসাটি এখন তার সন্মানে একটি মিউজিয়াম;

তারই একটি কবিতায়, দি টেম্পল অব নেচার, তিনি প্রস্তাব করেছিলেন বর্তমানে জীবিত সব প্রানী এবং উদ্ভিদ বিবর্তিত হয়েছে আনুবীক্ষনীক রুপ থেকে;

Organic Life beneath the shoreless waves
Was born and nurs’d in Ocean’s pearly caves;
First forms minute, unseen by spheric glass,
Move on the mud, or pierce the watery mass;
Then as successive generations bloom,
New powers acquire and larger limbs assume.

((জৈব জীবন সীমাহীন ঢেউ এর নীচে জন্ম নিয়েছিল, যা সাগরের মুক্তোখচিত গুহায় প্রতিপালিত হয়েছে;
খুবই ক্ষুদ্র প্রথম সেই রুপগুলো, আতশ কাচের নীচেও যারা অদৃশ্য; কাদায় পাড়ি জমিয়েছিল বা ছিদ্র করেছিল পানির আবরণ; এর পর এসেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর, নতুন শক্তি অর্জন আর দীর্ঘাকার হাতপা ধারন করেছে;))

তার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীর মতই ইরাসমাস ডারউইনের ব্যাক্তিগত জীবনও বেশ আলোচিত ছিল; তার প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর, বিবাহ বহির্ভুত দুটি সন্তানের পিতা হন; তার ছেলে রবার্টের কাছে তার বাবা খানিকটা বিব্রতকর একটি চরিত্র ছিল এবং দৌহিত্র চার্লস, শান্ত ভদ্র মাউন্টে বেড়ে ওঠার সময় তার সম্বন্ধে তেমন কিছু জানতে পারেননি;

কিন্তু চার্লস ডারউইন যখন এডিনবরায় গিয়েছিলেন, যে শহরে সব ধরনের বৈপ্লবিক ধারনা অনুকুল পরিবেশ পেয়েছিল, সেখানে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন তারা পিতামহের অনেক ভক্ত আছে;

যাদের একজন ছিলেন রবার্ট গ্রান্ট, চিকিৎসক এবং প্রানীবিজ্ঞানী যিনি ডারউইনের মেন্টর ছিলেন; গ্রান্ট স্পন্জ কিংবা সি পেন নিয়ে গবেষনা শুরু করেছিলেন কোন অলস কৌতুহল থেকে না, বরং তিনি ভাবতেন তারা জীবজগতের একেবারে শিকড়ের দিকে অবস্থান করছে, তাদের মত প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়ে উদ্ভব হয়েছে পৃথিবীর সকল প্রানী; যখন গ্রান্ট এবং ডারউইন সমুদ্র পারের টাইড পুল থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে যেতেন, গ্রান্ট তার তরুন শিষ্য ডারউইনকে ব্যাখ্যা করতেন কেন তিনি ইরাসমাস ডারউইন ও তার ট্রান্সমিউটেশন বা প্রজাতির বিবর্তনের বা যে প্রক্রিয়ায় এক প্রজাতির প্রানী অন্য প্রজাতির প্রানীতে রুপান্তরিত হয়,ধারনার ভক্ত ছিলেন।এছাড়া গ্রান্ট ইরাসমাসের দৌহিত্রকে  ফরাসী প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের কথা বলতেন, যারা ভাববার সাহস পেয়েছিল, যে জীবন অপরিবর্তনশীল না হবার সম্ভাবনা আছে, জীবন বিবর্তিত হয়েছে;

গ্রান্ট প্যারিসের ন্যাশনাল মিউজিয়ামে কুভিয়ের এর একজন সহকর্মীর কথা বলেছিলেন, যার নাম জা ব্যাপ্টিস্ট পিয়ের আন্তোয়ান দ্য মনেট, শেভালিয়ার দ্য লামার্ক; ১৮০০ সালে লামার্ক কুভিয়ের এবং পুরো ইউরোপকে চমকে দিয়েছিলেন প্রস্তাব করে যে প্রজাতির অপরিবর্তনশীলতার ধারনাটি একটি বিভ্রম মাত্র, সময়ের সুচনায় প্রজাতিরা আদৌ তাদের বর্তমান রুপে সৃষ্ট হয়নি; পৃথিবীর সমস্ত  ইতিহাস জুড়ে, স্বত:স্ফুর্ত সৃষ্টির মাধ্যমে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে; প্রত্যেকটি প্রজাতির জন্ম হয়েছে ”নার্ভাস ফ্লুইড” সহ যা তাদের ধীরে ধীরে রুপান্তরিত করেছে, প্রজন্মান্তরে নতুন রুপে, অন্য প্রজাতিতে; প্রজাতি যখন রুপান্তরিত হয়, তারা ধীরে ধীরে আরো বেশী জটিল হতে থাকে; এই নিরন্তর প্রজাতির আবির্ভাব এবং তাদের ক্রমশ চলমান রুপান্তর প্রক্রিয়া  জীবনের মহান সেই চেইন বা শৃঙ্খলটি সৃষ্টি করে: এই শৃঙ্খলের নীম্ন স্তরের সদস্যরা শুধুমাত্র তাদের উচু স্তরের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল উচ্চশ্রেনীর সদস্যদের থেকে বিলম্বে;


ছবি: পরিচিত ছিলেন লামার্ক নামে, Jean-Baptiste Pierre Antoine de Monet, Chevalier de Lamarck (1744 – 1829); ফরাসী এই প্রকৃতি বিজ্ঞানী প্রাকৃতিক নিয়মে বিবর্তন হয়েছে এমন ধারনার একজন প্রথম দিককার প্রস্তাবক  ছিলেন;

জীবন পরিবর্তিত হতে পারে অন্য আরেকটি উপায়ে, লামার্ক দাবী করেন:  একটি প্রজাতি তার নিজের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, জিরাফ, যেমন, এমন একটি জায়গায় বাস করে সেখানে তাদের খাদ্য গাছের পাতাদের অবস্থান মাটি থেকে বেশ উপরে;  বর্তমান জীরাফদের আদি পুর্বসুরীদের হয়তো খাটো ঘাড় ছিল, যারা তাদের ঘাড় উচু করে পাতা খাবার চেষ্টা করতো; আর যত বেশী একটি জিরাফ এমন ঘাড় টান টান করেছে পাতা খাবার জন্য, তার সেই “নার্ভাস ফ্লুইড” ঘাড়ের মধ্যে প্রবেশ করেছে, এবং ফলাফলে তার ঘাড়টিও লম্বা হতে থাকে, এবং যখন এটি বাচ্চা জিরাফের জন্ম দেয়, এটিও তার লম্বা ঘাড়ের বৈশিষ্টও তার মধ্যে হস্তান্তর করে; ল্যামার্ক প্রস্তাব করেন মানুষও হয়তো কোন নরবানর বা এইপদের থেকে বিবর্তিত হয়েছিল, যারা সোজা হয়ে দাড়িয়ে সমতলের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল গাছ থেকে নেমে,  দুই পায়ে হাটার সেই প্রচেষ্টাটি ধীরে ধীরে তাদের শরীরের কাঠামোটাকে বদলে দিয়েছিল আমাদের মত করে;

ফ্রান্স এবং প্রবাসে বেশীর ভাগ প্রকৃতিবিদরা ল্যামার্কের ধারনায় আৎকে উঠেছিলেন বিতৃষ্ণায়; আক্রমনের নেতৃত্বে ছিলেন কুভিয়ের, যিনি ল্যামার্ককে তার ধারনা স্বপক্ষে প্রমান দেবার বিরুদ্ধে চ্যালেন্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন; যে “নার্ভাস ফ্লুইড” যা কিনা বিবর্তনকে সম্ভব করছে, হচ্ছে সম্পুর্ণ  কাল্পনিক একটি ধারনা, এবং কোন জীবাশ্ম রেকর্ড তাকে এ বিষয়ে সহায়তা করবে না; যদি ল্যামার্ক সঠিক হন.. তাহলে সবচেয়ে প্রাচীনতম জীবাশ্মকে অবশ্যই অপেক্ষাকৃত অনেক কম জটিলতর হতে হবে বর্তমানে জীবিত প্রজাতির তুলনায়; কারন আর যাই হোক তারা তো অনেক কম সময় পেয়েছে তাদর সাংগঠনিক জটিলতা বাড়ানোর এই ধারাবাহিকতায়; কিন্তু তাসত্ত্বে ১৮০০ র সেই সময়ে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন জীবাশ্মও বর্তমানে জীবিত প্রানীদের মতই জটিলতা প্রদর্শন করে;

কুভিয়ের আরো একটা সুযোগ পেলেন ল্যামার্ককে আক্রমন করার জন্য, যখন নেপোলিয়নের সৈন্যরা মিসরে প্রবেশ করে এবং ফারাওদের কবরে সমাহিত করা মমিকৃত নানা প্রানীদের আবিষ্কার করে; সেখানে পাওয়া স্যাকরেড আইবিস এর কংকাল, যা বহু হাজার বছর পুরোনো, সেটি মিসরে বর্তমানে পাওয়া সাকরেড আইবিসের মতই দেখতে;

গ্রেট বৃটেনের বেশীর ভাগ প্রকৃতিবিদ, মজে ছিলেন প্যালীর প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বে, এবং তারা কুভিয়ের এর চেয়ে আরো বেশী বিতৃষ্ণা প্রকাশ করলেন ল্যামার্কের প্রস্তাবের প্রতি; কারন ল্যামার্ক মানুষকে একবারে প্রকৃতির বাকী সদস্যদের স্তরে নামিয়ে দিয়েছিলেন, অনিয়ন্ত্রিত কোন নির্দেশনাহীন জাগতিক শক্তির সৃষ্ট একটি সৃষ্টি হিসাবে; অল্প কিছু মুলধারার বীপরিত বিজ্ঞানী, যেমন গ্রান্ট ল্যামার্ক এবং তার বিবর্তনের ধারনাকে বিশেষ প্রশংসা করেছিলেন, এবং এই বিরুদ্ধাচারনের কারনেই তারা বৃটেনের বিজ্ঞানীদের মুল বলয় থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন;  ল্যামার্কের প্রতি গ্রান্টের বিশেষ প্রশংসা বেশ অবাক করেছিলে তরুন ডারউইনেকে,’ তিনি একদিন, আমরা যখন একসাথে হাটছিলাম, হঠাৎ করেই ল্যামার্ক এবং বিবর্তনের সংক্রান্ত তার ধারনার প্রতি উচ্ছসিত প্রশংসায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন;”  পরে ডারউইন তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন; ”আমি নীরব বিস্ময়ে তার কথা শুনেছিলাম, যতদুর আমি মনে করতে পারি, আমার মনে সে বিষয়ে কোন রেখাপাত করা ছাড়াই;”

এর চার বছর পর যখন ডারউইন বীগলে আহোরণ করার জন্য প্লীমথ আসেন, সমুদ্র যাত্রা শুরু করতে, বিবর্তনের বিষয়টি উপস্থিতি তার চিন্তায় আদৌ ছিল না, শুধুমাত্র তার সমুদ্র যাত্রা থেকে ফিরে আসার পর, বিষয়টি তার চিন্তার স্তরে উঠে এসছিল সম্পুর্ণ ভিন্ন আর বৈপ্লবিক একটি রুপ নিয়ে;

__________________________ চলবে

Advertisements
চার্লস ডারউইন এবং একটি ধারনার বিজয়…. : প্রথম পর্ব (দুই)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s