রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : সপ্তম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব)

a-fork-in-the-road-82007-432-648
শিশ্পী ড্যান গোল্ডেন (Dan Golden) ডিজাইন করা একটি কার্পেট

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন :  সপ্তম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ,  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব) ,পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)
ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; ষষ্ঠ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)ষষ্ঠ অধ্যায় (শেষ পর্ব)
সপ্তম অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; সপ্তম অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব) ; সপ্তম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

‘পবিত্র’ গ্রন্থ এবং যুগের সাথে বদলে যাওয়া নৈতিকতার জাইটগাইষ্ট বা যুগধর্ম 

 

মোরাল জাইটগাইস্ট (Zeitgeist*): নৈতিকতার যুগধর্ম

এই অধ্যায় শুরু হয়েছিলো যে বিষয়টি প্রদর্শন করে, তা হলো, আমরা নৈতিকতার ভিত্তি – এমনকি আমাদের মধ্যে যারা ধার্মিক- হিসাবে কোন পবিত্র গ্রন্হর উপর নির্ভরশীল নই, আমরা যতই সেটা কল্পনা করতে ভালোবাসি না কেন; তাহলে, কিভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নেই, কোন ঠিক আর কোনটা ভুল? আমরা যেভাবেই এই প্রশ্নের উত্তর দেই না কেন, অন্তত একটি ঐক্যমত আছে ভালো বা খারাপ বিবেচনা করে আমরা আসলেই  যা করছি সে বিষয়ে; যে ঐক্যমতটি বিস্ময়করভাবে সর্বজনীন; এবং এই ঐক্যমতটির কোন সুস্পষ্ট সম্পর্ক নেই ধর্মের সাথে; যদিও এটি সম্প্রসারিত করা সম্ভব ধার্মিকদের ক্ষেত্রেও, তারা তাদের নৈতিকতা ধর্ম থেকে এসেছে বা আসেনি, যাই ভাবুন না কেন; উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম অবশ্য যেমন, আফগান তালিবান এবং তাদের সমতুল্য যুক্তরাষ্ট্রের উগ্র খৃষ্টবাদীরা ছাড়া, বেশীর ভাগ মানুষই একটি উদার নৈতিকতার মুলনীতিগুলোর সাথে অন্ততপক্ষে মৌখিকভাবে তাদের সমর্থন প্রদান করে; আমরা বেশীর ভাগ মানুষই অপ্রয়োজনীয় কোন কষ্টের কারন নই; আমরা বিশ্বাস করি স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারে, এবং সেই অধিকারকে রক্ষা করাকে জরুরী মনে করি, এমনকি যখন সেটা আমাদের মতের সাথে মেলে না; আমরা আমাদের কর প্রদান করি, প্রতারণা করিনা,হত্যা করি না, ইনসেস্ট বা অজাচারে লিপ্ত নই, এমন কিছু অন্য কারো সাথেই করি না, যা আমরা চাইনা অন্যরাও আমাদের সাথে তা করুক; এই ভালো নৈতিক মুল নীতিগুলো পবিত্র গ্রন্হেও পাওয়া যাবে, তবে সেগুলো লুকিয়ে আছে আরো অনেক কিছুর সাথে , যা কোন ভদ্র সুশীল মানুষের পক্ষে মেনে নেয়া অসম্ভব; এবং পবিত্র কোন গ্রন্থই আমাদের এমন কোন নিয়ম নীতি বাতলে দেয় না, যা দিয়ে আমরা খারাপ কোন নীতির সাথে ভালো নীতির পার্থক্য করতে পারি;

আমাদের ঐক্যমতের মুলনীতিগুলো প্রকাশ করার একটি উপায় হচ্ছে নুতন বা নিউ টেন কম্যান্ডমেন্টস; বেশ কিছু মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান এটি করার প্রচেষ্টা করেছেন; যেটা উল্লেখযোগ্য সেটা হচ্ছে তারা সবাইই বরং  প্রায় একই রকম ফলাফলের পৌছে ছিলেন; তারা যেটা তৈরী করেছিলেন,তা তাদের সময়েরেই নৈতিকতার প্রতিচ্ছবি, তারা যে যুগে বেচে ছিলেন সেই সময়ের বৈশিষ্টসুচক; নীচে আমি এই যুগের দশটি কমান্ডমেন্ট এর একটি সেট উল্লেখ করলাম, যা একটি নীরিশ্বাদীদের ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা করেছি:

অন্য কারো সাথে এমন কোন আচরণ করা থেকে বিরত থাকুন, যে আচরণ অন্যদের কাছে আপনি প্রত্যাশা করেন না;

যেকোন কাজে, আন্তরিকভাবে সবসময় চেষ্টা করুন কোন ক্ষতি না করতে;

সকল মানুষ, জীবিত প্রানী এবং সাধারণভাবেই পুরো পৃথিবীর সবকিছুর সাথেই ভালোবাসা,সততা, বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করুন;

কখনোই কোন অশুভ কিছু দেখলে উপেক্ষা করবেন না বা ন্যায় বিচার করা থেকে কখনোই পিছিয়ে আসবেন না, কিন্তু সবসময় প্রস্তুত থাকবেন, কোন খারাপ কাজর জন্য অবলীলায় আন্তরিকভাবে দোষ স্বীকার এবং সততার সাথে করা কোন অনুশোচনাকে ক্ষমা করে দেবার জন্য;

জীবনে বাচুন আনন্দ আর অসীম বিস্ময়ের অনুভুতি নিয়ে;

সবসময় চেষ্টা করুন নতুন কিছু শেখার জন্য,

সবকিছুকে যাচাই করুন, বাস্তব তথ্যর সাথে সবসময় আপনার নিজস্ব ধারনাকে যাচাই করে দেখুন, দীর্ঘদিন ধরে লালন করা কোন বিশ্বাসকে পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকুন যদি  বাস্তব তথ্য প্রমানের সাথে তা অসামন্জষ্যপুর্ণ হয়;

কখনোই কাউকে বাধা দেবার চেষ্টা বা ভিন্ন মত থেকে নিজেকে দুরে সরিয়ে নেবেন না, সবসময় অন্যদের আপনার সাথে একমত না হবার অধিকারকে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন;

আপনার নিজস্ব যুক্তি এবং অভিজ্ঞতাগুলোকে ভিত্তি করে আপনার নিজস্ব মতামত গড়ে তুলুন, অন্যদের অন্ধভাবে অনুসরণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন;

সবকিছুকেই প্রশ্ন করুন;

এই ক্ষুদ্র তালিকাটি কোন মহান জ্ঞানী সাধু বা নবী বা পেশাজীবি কোন  নৈতিকতা বিশেষজ্ঞর লেখা নয়; খুব সাধারন একজন ওয়েব লগার হচ্ছেন এর রচয়িতা, বর্তমান যুগে একটি সুন্দর নৈতিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মুলনীতিগুলোকে সার সংক্ষেপ করে প্রকাশ করা আন্তরিক প্রচেষ্ঠা; একটি সার্চ ইন্জিনে নিউ টেন কমান্ডমেন্ট টাইপ করে আমি এটাই খুজে পেয়েছিলাম প্রথম, এবং ইচ্ছা করেই আমিও আর খুজিনি; মুল বিষয়টি হলো, এধরনের কোন তালিকা যে কোন সাধারন, ভদ্র মানুষই করবেন, সবাই যদিও ঠিক একই দশটির তালিকা করবেন না। দার্শনিক জন রলস (John Rawls) হয়তো এমন কিছু যোগ করতে পারেন তালিকায়: ‘সবসময় নিজের নিয়ম তৈরী করে নিন যেন আপনার জানা নেই, সামাজিক প্রাধান্য বিস্তারে আপনার অবস্থান কোথায়;’ ইনুইটদের (Inuit) একটি সামাজিক প্রথা, খাদ্য ভাগাভাগি করে নেবার একটি সিস্টেম আছে যা রলের এই নীতির প্র্যাকটিকাল একটি উদহারণ হতে পারে: যে ব্যক্তিটি খাদ্য কেটে ভাগাভাগি করে, সে সবচেয়ে শেষে তার অংশটি পছন্দ করার সুযোগ পাবে;

আমার নিজের সংশোধিত টেন কম্যান্ডমেন্টস উপররে তালিকা থেকে বেশ কয়টি নির্বাচন করবো এবং আরো কয়েকটি যোগ করার চেষ্টা করবো:

আপনার যৌন জীবন উপভোগ করার চেষ্টা করুন ( যতক্ষন এটি অন্য কারো ক্ষতি করছে না) এবং অন্যদেরকে তাদের জীবন উপভোগ করতে দিন ব্যক্তিগতভাবে তাদের যে ধরনের পছন্দ থাকুক না কেন; যা আপনার চিন্তার বিষয় নয়;

লিঙ্গ,বর্ণ ( এবং যতটুকু সম্ভব) প্রজাতির উপর ভিত্তি করে কাউকে নির্যাতন বা বৈষম্যমুলক আচরণ করা থেকে বিরত থাকুন

আপনার শিশুদের কোন মতবাদে দীক্ষিত করার থেকে বিরত থাকুন, তাদেরকে শেখান, নিজে কিভাবে চিন্তা করতে হবে, কিভাবে মুল্যায়ন করতে হবে উপস্থিত প্রমানকে এবং শেখান কিভাবে আপনার সাথে দ্বিমত পোষন করতে হবে;

ভবিষ্যতকে মুল্য দিন, আপনার নিজের জীবনের সময়কালের চেয়ে বেশী;

কোনটি অগ্রাধিকার পাচ্ছে সেই ছোট খাট বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই, মুল কথা হলো আমরা সবাই প্রায় সামনের দিকে এগিয়ে গেছি এবং সেই বাইবেলে বর্নিত সময় থেকে এই অগ্রসর হবার পরিমানটাও অনেক বিশাল; দাসত্ব, যা বাইবেলে এবং ইতিহাসের প্রায় পুরো সময় ধরেই স্বাভাবিক হিসাবেই ধরে নেয়া হয়েছে , সভ্য  সব দেশগুলো থেকেই বিলুপ্ত করা হয়েছে উনবিংশ শতাব্দীতে; প্রায় সব সভ্য দেশই স্বীকার করে নিয়েছে যা কিনা ১৯২০ সাল পর্যন্ত সর্বজনীনভাবে অস্বীকৃত ছিল.. যে কোন নারীদের ভোটাধিকার বা জুরি হিসাবে তাদের দ্বায়িত্ব পালনের অধিকার হচ্ছে যে কোন পুরুষের সমান; আজকের যুগে অগ্রসর জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত সমাজে বা কোন সভ্য দেশেই ( যে ক্যাটাগরীতে অবশ্যই কিছু দেশ, যেমন সৌদি আরব অন্তর্ভুক্ত নয়) নারীদের আর সম্পত্তি হিসাবে গণ্য করা হয় না, বাইবেলে বর্ণিত সময়ে স্পষ্টতই তারা যেভাবে গন্য হতেন; যে কোন আধুনিক আইন আলাদত আব্রাহামকে শিশু নির্যাতনের জন্য বিচার করতো এবং যদি সে আসলেই আইজাককে উৎসর্গ করার পরিকল্পনাটা শেষ পর্যন্ত কার্যকর করতো, তাহলে তার বিচার হতো প্রথম ডিগ্রী হত্যার জন্য; কিন্তু তার সময়ের নৈতিকতায়, তার আচরণ পুরোপুরিভাবে প্রশংসার দাবীদার, কারন ঈশ্বরের নির্দেশই মোতাবেক তিনি কাজ করেছিলেন; ধার্মিক হই বা না হই, আমরা সবাই বদলে গেছি ব্যপকভাবে কোনটা সঠিক আর কোন ভুল সে সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীতে; এই পরিবর্তনের প্রকৃতিটা আসলেই কি, আর এটি পরিচালিত করে কি?

line-drawing-somalian-famin

(ছবি সুত্র)

যে কোন সমাজে খানিকটা রহস্যময় একধরনের ঐক্যমতের অস্তিত্ত্ব আছে, যা পরিবর্তিত হয় কয়েক দশকের সময়ের পরিক্রমায় এবং যার জন্য একটি ধার করা জার্মান শব্দ জাইটগাইস্ট (Zeitgeist) ব্যবহার করা খুব একটা বাড়াবাড়ি হবে বলে মনে হয় না, শব্দটির অর্থ spirit of the times বা যুগ ধর্ম; আমি বলেছিলাম নারীদের ভোট দেবার অধিকার পৃথিবীর যে কোন গণতন্ত্রে এখন সর্বজনীন; কিন্তু এই সংস্কার কিন্তু অপেক্ষাকৃত বেশ সাম্প্রতিক, নীচে কিছু সময়কাল দেয়া হলো বিভিন্ন দেশের, যখন নারীরা তাদের ভোটাধিকার অর্জন করেছিলেন:

নিউজীল্যান্ড         ১৮৯৩
অষ্ট্রেলিয়া              ১৯০২
ফিনল্যান্ড             ১৯০৬
নরওয়ে                ১৯১৩
যুক্তরাষ্ট্র                ১৯২০
ব্রিটেন                  ১৯২৮
ফ্রান্স                    ১৯৪৫
বেলজিয়াম           ১৯৪৬
সুইজারল্যান্ড       ১৯৭১
কুয়েত                 ২০০৬

বিংশ শতাব্দী ধরে বিস্তৃত এই সময়গুলো পরিবর্তিত হতে থাকা জাইটগাইস্ট বা যুগধর্মের একটি পরিমাপক; আরেকটি উদহারন হলে জাতি বা বর্ণ বা রেস নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী; আজকের মানদন্ডে বিচার করলে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটেনের সবাইকে ( এবং অন্য অনেক দেশেও) বর্ণবাদী হিসাবে বিচার করা যেতে পারে; প্রায় বেশীর ভাগ সাদা চামড়ার মানুষরা বিশ্বাস করতেন কালো চামড়ার মানুষরা ( যে শ্রেনীতে তারা ভীষন বৈচিত্রময় আফ্রিকাবাসীদের, এবং তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয় এমন গোষ্টী, যেমন ভারতীয়, অষ্ট্রেলীয় এবং মেলানেশিয়া দ্বীপবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করতেন) তাদের তুলনায় সবদিক থেকে নীচু স্তরের, শুধুমাত্র – নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে জাহির করার লক্ষ্যে – তাদের ছন্দজ্ঞান ছাড়া; ১৯২০ সালে জেমস বন্ড সমতুল্য অনেকের শৈশবের হিরো ছিলেন কেতাদুরস্ত বুলডগ ড্রামন্ড; একটি উপন্যাসে, The Black Gang এ ড্রামন্ড ’ইহুদী বিদেশী এবং অন্যান্য অপরিষ্কার মানুষ’ এর কথা উল্লেখ করেছেন, The Female of the species এ এর চুড়ান্ত দৃশ্যে ড্রামন্ড খুব চালাকভাবে নিজেকে ছদ্মবেশে সাজিয়েছিল পেড্রো হিসাবে, প্রধান ভিলেন এর কৃষ্ণাঙ্গ চাকর হিসাবে; পাঠক এবং ভিলেনের কাছে নিজের নাটকীয় আত্মপ্রকাশের সময়, অর্থাৎ পেড্রো যে আসলে ড্রামন্ড নিজেই, তিনি কিন্তু বলতে পারতেন, ‘তুমি ভেবেছো আমি পেড্রো, কিন্তু তুমি বুঝতে পারোনি, আমি তোমার প্রধান শত্রু ড্রামন্ড,  কালো রঙ মেখেছি’; তার বদলে তিনি এই শব্দগুলো বাছাই করেছিলেন, ’সব দাড়ি মিথ্যা না, কিন্তু সব নিগারদের গায়ে গন্ধ আছে; এই দাড়ি মিথ্যা নয় আর এই নিগারের গায়ে কোন গন্ধ নেই; সুতরাং আমি ভাবছি কোথাও না কোথাও কিছু গন্ডগোল আছে;’ আমি এটি পড়েছি ১৯৫০ এর দশকে, প্রায় এটি লেখার তিন দশক পর এবং তখনও কোন অল্প বয়সী কিশোরের ( কোন মতে) এই বই পড়ে শিহরিত হওয়া সম্ভব এর নাটকীয়তায় এবং বর্ণবাদের দিকে নজর না দিয়ে;  এ যুগে এটা অকল্পনীয়;

টমাস হেনরী হাক্সলী (Tomas Henry Huxley), তার সময়ের মানদন্ডে একজন প্রগতিশীল, উদার পন্থী মানুষ; কিন্তু তার সময় আমাদের সময় না; এবং ১৮৭১ সালে তিনি লিখেছিলেন:

 কোন যুক্তিশীল মানুষ, সব তথ্য ভালোভেবে জেনে, বিশ্বাস করতে পারেন যে, একজন গড়পড়তা নিগ্রো একজন শেতাঙ্গর সমতুল্য বা আরো অসম্ভব, তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ হতে পারে; এবং যদি এটি সত্যি হয়, সত্যি স্পষ্টতই অবিশ্বাস্য যে, যখন তার সমস্ত অক্ষমতা অপসারণ করা হয় এবং আমাদের প্রোগন্যাথাস ( যাদের চোয়াল সামনের দিকে বেশী বেরিয়ে থাকে) আত্মীয়রা যদি নিরপেক্ষ একটি ক্ষেত্র পায় কোন ধরনের পক্ষপাতিত্ত্ব ছাড়া, সেই সাথে নির্যাতনকারী শোষকের অনুপস্থিতি, তারা  তাহলে সফলতার সাথে তাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় মস্তিষ্ক এবং ছোট চোয়াল বিশিষ্ট প্রতিদ্বন্দীদের সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করতে পারবে, এমন কোন প্রতিযোগিতায়, যেখানে চিন্তার লড়াই হবে, কামড়ের না; সভ্যতার প্রাধান্য পরম্পরায় সবচেয়ে উচু জায়গাটি অবশ্যই আমাদের গাড় চামড়ার স্বজনদের নাগালের অনেক বাইরে;

স্বাধারনত: ভালো ঐতিহাসিকরা অতীতের কোন বক্তব্যকে তাদর নিজেস্ব সময়ের মানদন্ডে বিচার করেন না; আব্রাহাম লিঙ্কন, হাক্সলীর মতই, তার সময়ের তুলনায় অনেক অগ্রসর ছিলেন; কিন্তু রেস বা বর্ণ সংক্রান্ত তার মতামত আমাদের সময়ে তুলনায় বর্ণবাদী মনে হতে পারে; ১৮৫৮ সালে স্টিফেন এ ডগলাসের সাথে তার বিতর্কর কিছু অংশ পড়া যাক:

 আমি বলবো, আমি এখন কিংবা কখনোই কোনভাবেই সাদা এবং কালো, এই দুটি রেস বা বর্ণের মধ্যে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমতা আনার লক্ষ্যে কোন পরিবর্তনের পক্ষে ছিলাম না, এবং আমি এখন কিংবা কখনই নিগ্রোদের ভোটার বা জুরির কাজের জন্য অধিকার প্রদানের পক্ষে ছিলাম না, এছাড়া তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব শীল দ্বায়িত্বে এবং সাদাদের সাথে তাদের অসবর্ণ বিবাহেরও সমর্থন করিনা; এবং উপরন্তু আমি বলবো, সাদা ও কালো বর্ণের মানুষদের মধ্যে শারীরিক পার্থক্য আছে, যা আমি বিশ্বাস করি চিরকালের মত দুটি জাতিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক সমতায় বাস করা থেকে বিরত রাখবে চিরকাল; এবং যেহেতু তারা এভাবে বসবাস করতে পারবে না, সুতরাং যতক্ষন তারা একসাথে সহাবস্থান করবে, উর্ধতন এবং অধস্তন এই দুটি অবস্থান অবশ্যই থাকতে হবে; এবং আমি আর যে কোন মানুষের মতই এই উর্ধতন অবস্থানটিকে শেতাঙ্গ বর্ণের মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করার স্বপক্ষে;

যদি হাক্সলী এবং লিংকন আমাদের সময়ে জন্মগ্রহন ও শিক্ষিত হতেন, আমাদের মধ্যে তারাই হয়তো সবার প্রথমে ঘৃণায় কুকড়ে উঠতেন আমাদের সবার সাথে তাদের নিজেদের ভিক্টোরিয়ান সময়কালের চিন্তাধারা এবং নৈতিকতায় ভারাক্রান্ত কন্ঠ শুনে;  আমি তাদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করলাম শুধু মাত্র বোঝাতে যে, কিভাবে আসলে যুগে যুগে  সময়ের পরিক্রমায় নৈতিকতার ধর্ম বা জাইটগাইষ্ট অগ্রসর হয়েছে সামনের দিকে; যদি এমনকি হাক্সলী যিনি তার সময়ের অন্যতম সেরা উদারপন্থী মানুষ ছিলেন এবং এমনকি লিঙ্কন, যিনি দাসদের মুক্ত করেছিলেন, এধরনের কথা বলতে পারেন, তাহলে চিন্তা করে দেখুন গড়পড়তা ভিক্টোরিয়ান যুগের মানুষরা কি ভাবতেন;  অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে গেলে, অবশ্যই সবার জানা যে, ওয়াশিংটন, জেফারসন এবং জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত যুগের প্রগতিশীল মানুষরা প্রত্যেকেই ক্রীতদাসের মালিক ছিলেন;  জাইটগাইষ্ট অগ্রসর হয়েছে, ক্রমাগত নিরবিচ্ছিন্নভাবে যে আমরা অনেক সময় ব্যপারটাকে স্বাভাবিক ধরে নেই এবং ভুলে যাই যে পরিবর্তন আসলেই একটি সত্যিকারের ফেনোমেনন তার নিজের যোগ্যতাতেই;

আরো অগনিত উদহারন আছে, যখন প্রথম নাবিকরা মরিশাস দ্বীপে পা রেখেছিলেন, এবং  নীরিহ প্রানী ডোডো পাখীদের দেখেছিলেন, তাদের কাছে আর কিছু মনে হয়নি শুধুমাত্র তাদের পিটিয়ে মারা ছাড়া; তারা এমনকি তাদের খাবারের জন্যও তারা হত্যা করেনি ( তাদের খাবার অযোগ্য বলে বর্ণনা করা হয়েছে);  স্পষ্টতই এই নীরিহ আত্মরক্ষায় অক্ষম, সহজে পোষ মানানো যায়, উড়তে অক্ষম পাখীটিতের মাথায় বাড়ি দিয়ে হত্যা করা তাদের জন্য কোন একটা কিছু করার মত কাজ ছিল হয়তো; আজকের যুগে এমন ব্যবহার অকল্পনীয়, ডোডোর মত কোন আধুনিক সমতুল্য প্রানীর বিলুপ্তি , এমনকি কোন দুর্ঘটনায়ও যদি তা ঘটে থাকে, বা ইচ্ছামুলকভাবে মানুষের দ্বারা হত হলে তো বটেই, তাকে ট্রাজেডি হিসাবে গন্য করা হয়;

আজকের সাংস্কৃতিক পরিবেশের মানদন্ডে বলা যেতে পারে এরকম একটি ট্রাজেডী, সাম্প্রতিক সময়ে Thylacinus বা তাসমানিয়ার উলফ (Tasmanian wolf) দের বিলুপ্তি হবার ঘটনাটিকে; ‍ বর্তমানে তাদের অবলুপ্তি নিয়ে বিলাপ করা হয় অথচ ১৯০৯ সাল পর্যন্ত তাদের হত্যা করলে মোটা অঙ্কের পুরষ্কারের ব্যবস্থা ছিল;  আফ্রিকা নিয়ে ভিক্টোরিয়ীয় যুগের উপন্যাসে ‘হাতি’, ’সিংহ’ এবং ’অ্যান্টিলোপ’ ( লক্ষ্য করুন বিশেষভাবে গুরুত্বপুর্ণ একবচনের ব্যবহার) ছিল গেম বা শিকার করার মত প্রানী;  এবং এদের সাথে কি করা হতো তখন, দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে তাদের হত্যা করা হতো গুলি করে; এই হত্যা খাদ্যের জন্য না, আত্মরক্ষার জন্য না; শুধু শিকারের খেলার রোমাঞ্চ অনুভব করার জন্য; কিন্তু সেই যুগ ধর্ম বা জাইটগাইস্টও বদলে গেছে; স্বীকার করতে হবে, এখনও ধনবান ব্যক্তিরা, সাধারণত:  বসে থাকার জীবনযাত্রায় অভ্যস্থ শিকারী খেলোয়াড়রা তাদের ল্যান্ড রোভার গাড়ীর নিরাপত্তায় বসে থেকে  হয়তো আফ্রিকার প্রানীদের হত্যা করতে পারেন এখনও এবং তাদের স্টাফ করা মাথা নিয়ে বাড়ী যেতে পারেন; কিন্তু তার জন্য তাদের চড়া মুল্য পরিশোধ করতে হয়, এবং নির্বিচারে সবার ঘৃণার পাত্র হন তারা; বন্য প্রানী সংরক্ষন এবং পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়টি একই নৈতিকতার গ্রহনযোগ্য মুল্যে পরিণত হয়েছে একসময় যেভাবে সাবাথের পবিত্রতা রক্ষা বা মুর্তি পুজা না করার কাজটিকে যেভাবে নৈতিকতার অব্স্থান হিসাবে গন্য করা হতো;

সুইঙ্গিং ষাটের দশক তারুণ্য আর উদারপন্থী আধুনিকতার জন্য কিংবদন্তীসম; কিন্তু সেই দশকের শুরুতেই একজন ব্যারিষ্টার, Lady Cbatterley’s Lover এর অশ্লীলতার বিরুদ্ধে করা মামলার সময় তখনও জুরিদের জিজ্ঞাসা করতে পারতেন, ‘আপনারা কি আপনাদের অল্পবয়সী পুত্র, কন্যাদের – কারন ছেলেদের মত মেয়েরাও পড়তে পারে ( আপনি কি বিশ্বাস করতে পারেন, তিনি সত্যি এই কথা বলেছেন) এই বই পড়তে সম্মতি দেবেন? এমন কোন বই কে কি আপনার ঘরে জায়গা দেবেন? এই বইটাকে এমন কি আপনি আপনার স্ত্রী কিংবা চাকরদের পড়ার অনুমতি দেবেন’? তার শেষ প্রশ্নটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি উদহারন, যা প্রদর্শন করছে কি দ্রুত যুগের ধর্মের বা জাইটগাইষ্টের পরিবর্তন হয়েছে;

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে সাধারন মানুষের হতাহতের ঘটনার জন্য সর্বব্যাপী নিন্দিত হয়েছে অথচ এই হত্যার সংখ্যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যার তুলনায় বহু গুনে কম; নৈতিকভাবে কোনটি গ্রহনযোগ্য তার মানদন্ডটি মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে স্থির একটি গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে দ্রুত;  ডোন্যাল্ড রামসফেল্ড এর কথা শুনতে আজ এত অসহ্য আর অসংবেদশীল মনে হয়, অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তার এই কথাগুলো শুনতে সংবেদনশীল পরদু:খে কাতর ‘ব্লিডিং হার্ট’ লিবারেল বলেই মনে হোত;  মধ্যবর্তী দশকগুলো কিছু পরিবর্তন হয়েছে; আমাদের সবার মধ্যেও সেই পরিবর্তন এসেছে; এবং এই পরিবর্তনের কারণ ধর্ম না; ধর্ম ছাড়াই এটাই ঘটেছে, ধর্মের কারণে নয়;

আর এই পরিবর্তনে একটি স্থিতিশীল দিকও শনাক্ত করা সম্ভব, যা আমরা বেশীর ভাগ মানুষই চিহ্নিত করবো উন্নতি হিসাবে;  এমনকি অ্যাডলফ হিটলার, ব্যপকভাবে মানুষের ধারনায় যে ব্যক্তিটিকে বলা হয় চুড়ান্ত অশুভ র অজানা একটি জগতের দিকে পৃথিবীকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনিও ক্যালিগুলা বা গেনজিস খানের এর সময়ে নিষ্ঠুরতায় আদৌ চোখে পড়ার মত কোন কিছু হবার যোগ্য হতেন না; কোন সন্দেহ নেই হিটলার গেনজিস খান এর চেয়ে বেশী মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছেন, কিন্তু তার কাছে সেটা করার জন্য বিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি ছিল; এবং হিটলার কি সবচেয়ে বেশী আনন্দ পেতেন, যেমন গেনজিস খান স্বীকার করেছিলেন, তার হত্যার শিকারদের ‘কাছের আর প্রিয় মানুষদের অশ্রু সিক্ত ’দেখাটা তার তীব্রতম আনন্দের কাজ ছিল;  আমরা হিটলারের অশুভ কাজের মাত্রার পরিমাপ করি আজকের এই যুগের মানদন্ডে, আর নৈতিকতার জাইটগাইষ্ট বা যুগ ধর্ম অনেকটুকু  এগিয়েছে সেই ক্যালিগুলার সময় থেকে, ঠিক যেমন করে প্রযুক্তিও এগিয়েছে; আমাদের সময়ের মানদন্ডেই হিটলারকে বিশেষ ভাবে অশুভ একটি চরিত্র মনে হয়;

আমার জীবনকালেই, বহু মানুষ কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই অবজ্ঞা আর অপমানসুচক নাম এবং জাতীয় স্টেরিওটাইপের আদান প্রদান করেছে: Frog, Wop, Dago, Hun, Yid, Coon, Nip, Wog ইত্যাদি; আমি দাবী করছি এধরনের শব্দগুলো ভাষা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে এখন, তবে ব্যপকভাবেই ভদ্র সভ্য মানুষের স্তরে ব্যপকভাবে এসব শব্দগুলো ব্যপকভাবে নিন্দনীয়; নিগ্রো শব্দটা, যদিও এটি ব্যবহৃত হতে শুরু হয় অপমানসুচক শব্দ হিসাবে নয়, তবে শব্দটির উপস্থিতি দিয়ে যে কোন ইংরেজী গদ্যের লেখার সময়কাল নির্ধারণ করা যেতে পারে; নানা ধরনের প্রেজুডিস এর উপস্থিতি হচ্ছে আসলেই কোন লেখার সময়কাল সমন্ধে ধারনা দিতে পারে; তার নিজের সময় কেমব্রিজের একজন শ্রদ্ধেয় ধর্মতত্ত্ববিদ এ সি বুকে (A. C. Bouquet)  তার Comparative Religion বইটিতে ইসলামের উপর তার অধ্যায়টি এভাবে শুরু করতে পারতেন, সেমাইট বা আরব প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিকভাবে একেশ্বরবাদী না, উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যা ভাবা হতো, সে আসলে অ্যানিমিষ্ট বা সর্বপ্রাণ মতবাদী;’

সংস্কৃতির ব্যতিক্রম বর্ণ বা জাত নিয়ে এই বাহুল্যতা এবং সুস্পষ্ট ভাবে একবাচনের ব্যবহার (‘The Semite . . . He is an animist’), যা সমগ্রজাতির বহুত্বতাকে কেবল একটি টাইপে এনে সীমাবদ্ধ করার প্রচেষ্টা হয়তো কোন মানদন্ডে চুড়ান্ত ঘৃণাকর না, তবে তারা পরিবর্তিত হতে থাকা জাইটগাইষ্ট বা যুগধর্মের ক্ষুদ্র সুচক; কেমব্রিজের ধর্মতত্ত্ব বা অন্য যে কোন বিষয়ের কোন অধ্যাপক আজ আর এই শব্দগুলো ব্যবহার করবেন না; পরিবর্তিত হতে থাকা নৈতিকতার যুগধর্মের এই সুক্ষ্ম আভাসগুলো আমাদের বলছে বুকে তার এই লেখাটি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কোন সময়েরও আগে লিখেছিলেন, এবং আসলে সেই সময়কাল ১৯৪১;

আরো চার দশক পেছনে যান, এই পরিবর্তিত মানদন্ড আরো নির্ভুলভাবে দৃশ্যমান হবে;  এর আগের একটি বইয়ে আমি ‌ এইচ জি ওয়েলস (H. G. Wells) এর ইউটোপিয়ান NewRepublic থেকে কিছু উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছিলাম; আমি আবারও তা করবো কারন এটি আমি যা বলতে চাচ্ছি তার একটি হতবাক করার মতই দৃষ্টান্ত হতে পারে:

এবং এই নিউ রিপাবলিক কিভাবে অধস্তন বর্ণ বা রেসের সদস্যদের সাথে আচরণ করবে? কেমন ভাবে এটি কৃষ্ণাঙ্গদের সাথে আচরণ করবে? …পীত বর্ণের মানুষদের সাথে? এবং ইহুদীদের সাথে? এই সব কালো,বাদামী, ময়লা সাদা আর পীত বর্ণের মানুষদের দঙ্গল, যার নতুন দায়িত্ব পালনের দক্ষতায় যারা কোন কাজে আসবে না? বেশ, পৃথিবী হচ্ছে পৃথিবী, এটি কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয় এবং আমি ধরে নিচ্ছি তাদের সেখানে কোন জায়গা নেই, সেখান থেকে তাদের বিদায় নিতে হবে…. এবং সেই সাথে নতুন রিপাবলিক থেকে বিদায় নিতে হবে এই সব মানুষদের নৈতিকতার পদ্ধতিগুলোকে; বিশ্বব্যাপী যে নৈতিকতার পদ্ধতিটি প্রাধান্য বিস্তার করবে, তা গঠন করা হবে মুলত মানবতার মধ্যে যা কিছু সুন্দর, ভালো এবং কর্মক্ষম, সুগঠিত বলবান শরীর এবং স্পষ্ট ও শক্তিশালী মন সৃষ্টি করার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবার লক্ষ্যে; এবং প্রকৃতি এতদিন যে প্রক্রিয়া কাজ করে এসেছে এই পৃথিবীকে সেই রুপ দেবার লক্ষ্যে, যেখানে কোন দুর্বলতাকে প্রতিহত করা হয় আরো দুর্বলতাকে জন্ম দেয়া থেকে .. তা হচ্ছে মৃত্যু…নতুন রিপাবলিকে মানুষদের … এমন একটি আদর্শ থাকবে যা এই লক্ষ্যে কোন হত্যাকে অর্থবহ করে তুলবে;

এটা লেখা হয়েছিল ১৯০২ সালে, এবং ওয়েলসকে তার সময় প্রগতিশীল হিসাবে গন্য করা হতো;  ১৯০২ সালে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী কিংবা মনোভাব, যদিও ব্যপকভাবে সমর্থিত ছিল না, তা সত্ত্বেও তখনও ডিনার পার্টির তর্কের বিষয় হিসাবে সহনীয় ও গ্রহনযোগ্য ছিল; আধুনিক পাঠকরা এর ব্যতিক্রম, আক্ষরিক অর্থেই এ ধরনের কোন লেখা পড়লে হতবাক হয়ে পড়বেন ; আমরা অনুধাবন করতে বাধ্য হবো, হিটলার যদিও জঘন্য ছিল, তা সত্ত্বেও সে কিন্তু তার সময়ের জাইটগাইষ্টের বাইরে ছিল না পুরোপুরি, যা আমাদের অবস্থান থেকে এখন যেমন তাকে মনে হয়; কত দ্রুত জাইটগাইষ্ট বা যুগের ধর্ম বদলে যায়; এটি সমান্তরালে এগিয়ে যায় একটি প্রশস্ত ফ্রন্ট হিসাবে সমস্ত শিক্ষিত পৃথিবীতে;

কোথা থেকে তাহলে এই সামাজিক চেতনায় এই সম্মিলিত আর স্থির গতিতে হতে থাকা পরিবর্তনগুলো আসে? এর ‍উত্তর দেবার দায়ভার আমার উপরে ন্যস্ত না; আমার উদ্দেশ্য পুরনে এটুকু্ যথেষ্ট যে, নিশ্চয়ই এই পরিবর্তন ধর্ম থেকে আসে না; যদি কোন একটি তত্ত্ব দেবার জন্য আমার উপর চাপ দেয়া হয়, আমি বিষয়টি নিয়ে এভাবে আগাতে চাই:  আমাদের ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন, কেন এই বদলে যেতে থাকা নৈতিক জাইটগাইষ্ট এত ব্যপক এবং প্রশস্তভাবে এই সাথে সংঘটিত হয় অগনিত মানুষের মধ্যে সারা বিশ্ব জুড়ে, একটি সর্বজনীন রুপ নিয়ে; এবং আমাদের ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন এর পরিবর্তনের স্থির দিকটিকেও;

প্রথমে, এত অসংখ্য মানুষের মধ্যে এটি একই সাথে বা সিনক্রোনাইজ বা সমন্বয় হয়ে কিভাবে ঘটে? এটি একটি মন থেকে অন্য একটি মনে বিস্তার লাভ করে বিভিন্ন বারের, বা ডিনার পার্টির কথপোকথনে, বই এবং বই সমালোচনার মাধ্যমে, খবরের কাগজ বা টিভি সম্প্রচারের মাধ্যমে এবং হাল সময়ে ইন্টারনেট এর মাধ্যমে; নৈতিকতার পরিবেশ পরিবর্তনের সংকেত পাওয়া যায় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয়তে, রেডিও টকশোতে, রাজনৈতিক বক্তৃতায়, কিংবা কমেডিয়ানদের কৌতুক নকশায়, সোপ অপেরার সংলাপে, পার্লামেন্টে ভোটের মাধ্যমে ‍আইন বানানোর প্রক্রিয়ায়,  এবং আইনব্যাখ্যা করে বিচারকের প্রদত্ত সিদ্ধান্তে; একভাবে এটিকে বলা যায় মীম পুলে মীম এর হারের রদবদলের মাধ্যমে কিন্তু সেই বিষয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না এখন;

আমাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিবর্তিত নৈতিকতার জাইটগাইষ্ট বা যুগ ধর্মের অগ্রসরমান ঢেউ এর খানিকটা পেছনে পড়ে আছে ‍আর কেউ খানিকটা এগিয়ে আছে;  কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে বেশীর ভাগই আমরা সবাই প্রায় একই জায়গায় দলবেধে অবস্থান করছি, যা মধ্যযুগের আমাদের মত মানুষদের তুলনায় অনেক সামনে; বা আব্রাহামের সেই সময় থেকে বা এই সাম্প্রতিক কালের ১৯২০ সালের চেয়েও; পুরো পরিবর্তনের এই ঢেউটা সামনের দিকে এগুচ্ছে এবং আগের শতাব্দীর সামনে সারির পথপ্রদর্শক বা ভ্যানগার্ডরা ( টি  এইচ হাক্সলী যেমন একটি স্পষ্ট উদহারণ) পরবর্তী শতাব্দীর বহু পেছনে থাকা মানুষগুলোরও পেছনে অবস্থান করে; অবশ্যই এই অগ্রসর যাত্রা কখনোই মসৃণ উত্থান না বরং আকাবাকা করাতের দাতের মত উচু নীচু; এছাড়া স্থানীয় এবং সাময়িক কিছু প্রতিবন্ধকতা বা সেটব্যাকও আছে, যেমন ২০০০ এর প্রথম দশকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সরকারের দ্বারা যেভাবে এর যাত্রা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে; কিন্তু সময়ের বড় পরিমাপে পরিবর্তনের প্রগতিশীল প্রবণতা সুস্পষ্ট এবং যা অব্যাহত থাকবেই;

এই স্থির দিক নির্দেশনায় মদদ জোগাচ্ছে কোন শক্তি? আমাদের অবশ্যই অবহেলা করা চলবে না, একক ব্যক্তি হিসাবে আমাদের কিছু নেতাদের চালিকা শক্তি হিসাবে ভুমিকার কথা, যারা সময়ে অনেক অগ্রসর ছিলেন, একটি অবস্থান নিয়ে আমাদের  বাকী সবাইকে প্রনোদনা যুগিয়েছেন তাদের সাথে সামনে  এগিয়ে যেতে: যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন রেস বা শেতাঙ্গ এবং কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বর্ণবৈষম্যর যুগে  সমতার কথা লালন করেছেন মার্টিন লুথার কিং এর মত যোগ্য রাজনৈতিক নেতারা এবং বিনোদন ও ক্রীড়া জগতের অনেক সদস্যরা যেমন পল রোবসন, সিডনী পোয়াটিয়ের, জেসি ওয়েন্স এবং জ্যাকী রবিনসন; ক্রীতদাস আর নারীদের মুক্তি এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মুল অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করেছে অনেক ক্যারিশমাটিক নেতা নেত্রীরা; এই সব নেতৃত্ব দানকারী মানুষরা  ছিলেন কেউ কেউ ধার্মিক, কেউ আবার ধার্মিক ছিলেন না;  যারা ধার্মিক ছিলেন তাদের কেউ ভালো কাজ করেছিলেন কারণ তারা ধার্মিক ছিলেন, আর অন্যান্য ক্ষেত্রে ধর্ম শুধু ঘটনাচক্রে তাদের সংশ্লিষ্ট ছিল; যদিও মার্টিন লুথার কিং খৃষ্টান ছিলেন একজন, তিনি তার অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্স বা সামাজিক প্রত্যাখান বা বয়কটের আন্দোলনের শিক্ষা নিয়েছিলেন সরাসরি মহাত্মা গান্ধী থেকে, যিনি খৃষ্টান ছিলেন না;

তারপরও, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে, অন্য ধর্ম আর বর্ণের এবং লিঙ্গের সব মানুষদের সাথে নিয়ে আমাদের এই বিশ্বমানবতা এই ধারনা সম্বন্ধে আমাদের বোধের আর জানার ব্যাপ্তি বাড়ার বিষয়টি  – এই দুটি গভীর, অনেকটাই নাড়ীর মত মুল ধারনার উৎস ছিলে জীববিজ্ঞান , বিশেষ করে বিবর্তন; কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ আর নারীরা এবং নাৎসী জার্মানীতে ইহুদী আর জিপসীরা খারাপ আচরনের শিকার হয়েছে তার একটি কারন ‍ছিল তাদের পুরোপুরি মানুষ হিসাবে মনে করা হতো না; দার্শনিক পিটার সিংগার তার Animal Liberation বইটিতে সবচেয়ে সুন্দর করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সে দৃষ্টিভঙ্গী সমর্থন করে যে আমাদের স্পেসিসইজম ( প্রজাতির উপর নির্ভর করে মানুষের বৈষম্যমুলক খারাপ আচরণ বিশেষ করে যা প্রকাশ হয় বিভিন্ন প্রানীদের অপব্যবহার ও তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শনের মাধ্যমে) এর পরবর্তী যুগে প্রবেশ করতে হবে যেখানে সকল প্রজাতি যাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতা আছে ভালো আচরণ বোঝা তাদের সাথে মানবিক আচরণ করতে হবে; হয়তো এটি আভাস দিচ্ছে ভবিষ্যতের শতাব্দীতে নৈতিকতার জাইটগাইষ্ট কোন দিকে দিক বরাবর পরিবর্তিত হবে; প্রাকৃতিক ভাবেই এটি আগের সংস্কারগুলো যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিলুপ্তি এবং নারীদের মুক্তির মতই একটি অবস্থান হবে;

আমার সখের মনোবিজ্ঞান বা সামাজিক বিজ্ঞানের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারনে মানতে হবে আমার পক্ষে ব্যাখ্যা করা সম্ভব না কেন নৈতিকতার জাইটগাইষ্ট ‌এভাবে প্রশস্ত ব্যপকভাবে একই সাথে সম্মিলিতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে;  আমার ব্যাখ্যার জন্য আপাতত এতটুকু যথেষ্ট যে, বিষয়টি  বাস্তব একটি সত্য, এটি পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এটি ধর্ম দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না এবং অবশ্যই ধর্মগ্রন্হ বা স্ক্রিপচারের মাধ্যমে তো নয়ই; হয়তো এটিও মধ্যাকর্ষনের মত কোন একক শক্তি নয় বরং জটিল বহুমাত্রিক শক্তিগুলো অন্তর্মিলনের একটি ফলাফল, যেমন সেই শক্তির মত যা মুরের সুত্রকে পরিচালিত করে, যা কম্পিউটারের ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করে; যে কারণই হোক না কেন, জাইটগাইষ্ট এর অগ্রগতির বিষয়টি যথেষ্ট সেই দাবীটির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে, আমাদের ঈশ্বরের প্রয়োজন আছে ভালো হবার জন্য বা কোনটা ভালো সেটা নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য;

_________________________ চলবে

* The Zeitgeist (spirit of the age or spirit of the time) is the intellectual fashion or dominant school of thought which typifies and influences the culture of a particular period in time. For example, the Zeitgeist of modernism typified and influenced architecture, art, and fashion during much of the 20th century

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : সপ্তম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s