রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : সপ্তম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

morality2
ছবি: ইন্টারনেট

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন :  সপ্তম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ,  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব) ,পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)
ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; ষষ্ঠ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)ষষ্ঠ অধ্যায় (শেষ পর্ব)

‘পবিত্র’ গ্রন্থ এবং যুগের সাথে বদলে যাওয়া নৈতিকতার জাইটগাইষ্ট বা যুগধর্ম

Politics has slain its thousands, but religion has slain its tens of thousands.
Sean O’ Casey

দুটো উপায়ে ধর্মগ্রন্থ বা স্ক্রিপচার নৈতিকতা আর জীবন যাপন করার প্রয়োজনীয় বিধির উৎস হতে পারে; একটি হচ্ছে সরাসরি নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে, যেমন, টেন কম্যান্ডমেন্টস (Ten commandments) এর মাধ্যমে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বুনডকস বা অনগ্রসর গ্রামাঞ্চলে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের তীব্র তর্ক বিতর্কের একটি অত্যন্ত তিক্ত বিষয়। অন্য উপায়টি হচ্ছে উদহারনের মাধ্যমে: যেমন ঈশ্বর বা বাইবেলের অন্য কোন চরিত্র হয়তো – যাকে আধুনিক ভাষায় বলা যায় – রোল মডেল- সেই দ্বায়িত্ব পালন করে; দুটোই ধর্মগ্রন্থ মোতাবেক নৈতিকতা শিক্ষা দানের পন্থা, যদি খুব ধার্মিকভাবে ( এই ক্রিয়াগুনটি ব্যবহার করা হয়েছে রুপাকার্থে তবে এর উৎসর প্রতি নজর রেখে) মেনে চলা যায়, সেটি এমন একটি নৈতিক সিস্টেমকে উৎসাহিত করে যা যে কোন সভ্য আধুনিক মানুষই , সে ধার্মিক হোক বা না হোক, মনে করতে পারেন, অত্যন্ত জঘন্য, আমি এর চেয়ে মৃদুভাবে বিষয়টি বলতে অক্ষম।

নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বললে বাইবেল এর বেশীর ভাগ অংশ কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে অশুভ নয় বরং বলা যায় স্পষ্টতই খুব অদ্ভুত, যেমনটা প্রত্যাশিত আসলে এধরনের কোন এলোমেলোভাবে জোড়া লাগানো পরস্পর বৈসাদৃশ্য কতগুলো ডকুমেন্ট এর একটি সংগ্রহর কাছে; প্রায় নয় শতাব্দী জুড়ে যা রচিত, সংযোজিত, পুণসংশোধিত, সম্পাদিত, অনুদিত, বিকৃত এবং ‘উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে শত শত নামহীন লেখক, সম্পাদক,অনুলিপিকারীদের দ্বারা, যারা আমাদের কাছে যেমন, তেমনি পরস্পরের কাছেও অচেনা; বাইবেল এর খুব বেশী অদ্ভুত ব্যাপারগুলো ব্যাখা হয়তো দিতে পারে এই ব্যপারটি। কিন্তু দু:খজনকভাবে এই একই অদ্ভুত বইটা ধার্মিক অতিউৎসাহীরা ব্যবহার করে আমাদের নৈতিকতার এবং জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় বিধির কখনোই ভুল হতে পারে না এমন কোন উৎস হিসাবে। যারা তাদের নৈতিকতাকে আক্ষরিক অর্থে বাইবেল ভিত্তিক করে তোলার ইচ্ছা পোষন করেন, তারা হয় বাইবেল পড়েননি বা তা আদৌ বোঝেননি, যেমন বিশপ জন শেলবী স্পঙ ( John Shelby Spong) তার The Sins of Scripture  সঠিকভাবে পর্যবেক্ষন করেছিলেন, প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি বিশপ স্পঙ, উদারপন্থী বিশপদের মধ্যে একটি চমৎকার উদহারন, যার বিশ্বাস যথেষ্ট পরিমান অগ্রসর এবং তা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যারা নিজেদের খৃষ্টান বলেন তাদের থেকে প্রায় সম্পুর্ণ ভিন্ন; তার বৃটিশ সমতুল্য হচ্ছেন রিচার্ড হলোওয়ে, এডিনবরা বিশপের দ্বায়িত্ব থেকে যিনি সম্প্রতি অবসর গ্রহন করেছেন।বিশপ হলওয়ে এমনকি নিজেকে বর্ণনা করেছেন আরোগ্য লাভের পথে একজন এক খৃষ্টান হিসাবে। তার সাথে একটি উন্মুক্ত আলোচনা করার সুযোগ হয়েছিল এডিনবরায়, যা অন্যতম একটি কৌতুলোদ্দীপক  সাক্ষাৎকার ছিল আমার জন্য।

TenCommandments

ওল্ড টেষ্টামেন্ট:

জেনেসিস বা সৃষ্টির কাহিনী দিয়ে শুরু হওয়া, নোয়া’র অত্যন্ত লোকপ্রিয় গল্প সহ, যার মুল উৎস ব্যাবিলনীয় উটা-নাপিসথিম ( Uta-Napisthim) এর পুরাণ কাহিনী এবং বেশ কয়েকটি সংস্কৃতির প্রাচীন  পুরাণেও যা পরিচিত; জোড় বেধে সব প্রানীদের নোয়ার আর্ক বা নৌকায় ওঠার পুরাণ কাহিনী বেশ আবেদনময় আর সুন্দর,তবে নোয়ার এই গল্পের নৈতিক শিক্ষাটা কিন্তু ভয়ঙ্কর; মানুষ সম্পর্কে ঈশ্বর নেতিবাচক ধারনা পোষন করেন, সুতরাং তিনি (একটি মাত্র পরিবার ছাড়া) বাকীদের সবাইকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেন, যাদের মধ্যে শিশুরাও ছিল, এবং সেই সাথে আর্কের মধ্যে আশ্রয় নেয়া প্রানীরা ছাড়া, বাকী সব প্রানীকেও হত্যা করেন( যারা স্পষ্টতই নির্দোষ)।

অবশ্য বিরক্ত ধর্মতত্ত্ববিদরা প্রতিবাদ করতে পারেন যে আমরা এখন আর জেনেসিসের বইটাকে আদৌ আক্ষরিকভাবে গ্রহন করিনা। আর সেটাই আমার মুল বক্তব্য; আমরা ধর্মগ্রন্থ থেকে বেছে বেছে ঠিক করি কোন অংশটা বিশ্বাস করবো আর কোন অংশটা প্রতীকি বা রুপক বলে চিহ্নিত করবো; এ ধরনের যাচাই বাছাই করার বিষয়টি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ব্যপার, যেমন কম বেশী নীরিশ্বরবাদীদের এই নৈতিক নির্দেশনা মান্য করার ক্ষেত্রে তাদের নেয়া সিদ্ধান্তর মত বা সেটা একটি ব্যাক্তিগত সিদ্ধান্ত  চুড়ান্ত কোন ভিত্তি ছাড়া; যদি এর মধ্যে কোনটি ” যখন যা প্রয়োজন সেই অনুযায়ী নৈতিকতা” হয়ে থাকে, তাহলে অন্যটিও তাই;

শিক্ষিত ধর্মতাত্ত্বিকদেন ভালো উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও, ভয়ঙ্কর রকম একটি বিশাল অংশের মানুষ নোয়ার গল্প সহ তাদের ধর্মগ্রন্থ আক্ষরিকভাবে মাণ্য করেন; গ্যালাপ পোল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইলেক্টরেটদের মধ্যে তাদের সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ; এছাড়া কোন সন্দেহ নেই বহু এশিয়ার সাধু সন্তরা যাদের অনেকেই ২০০৪ সালের ভয়াবহ সুনামির কারন হিসাবে চিহ্নিত করেছে, প্লেট টেকটোনিক এর নাড়াচড়া না বরং মানুষের পাপকর্ম যেমন মদ্যাপান থেকে শুরু করে, মদ্যশালায় নাচ থেকে সাবাথ ( জেনেসিস এ বর্ণিত সপ্তাহের বিশ্রামের দিন) এর কোন ছোটখাট বিধি না মানার পাপ ইত্যাদী; নোয়ার গল্পে আকন্ঠ নিমজ্জিতপুর্ণ, বাইবেল এর শিক্ষা ছাড়া আর সবকিছু সম্বন্ধে অজ্ঞ, এইসব মানুষদের কে দোষ দিতে পারে? তাদের পুরো শিক্ষাই তাদের শিখিয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের কর্মকান্ডের সাথেই যুক্ত, মানুষের পাপের ফলাফল, কখনোই প্লেট টেকটোনিক এর মত নৈর্ব্যাক্তিক কোন কিছুর কারনে হবার মত কিছু নয়।এছাড়া লক্ষনীয় যে কি পরিমান অহংকারী অন্ধ আত্মকেন্দ্রিকতা থাকলে বিশ্বাস করা সম্ভব যে, পৃথিবী কাপানো ঘটনাগুলো, যে মাত্রায় সাধারনত একজন ঈশ্বর ( বা একটি টেকটোনিক প্লেট) কাজ করতে পারে, তার সাথে অবশ্যই আমরা মানুষদের কোন সংযোগ আছে; কেনই বা একজন স্বর্গীয় সত্ত্বা, যিনি ব্যস্ত সৃষ্টি আর অনন্তকাল নিয়ে, মানুষের অপকর্মগুলো নিয়ে কেন মাথা ঘামাবেন? আমরা মানুষরাই আমাদের এই প্রবোধ দেই, নিজেদের তুচ্ছ ছোটখাট ’পাপগুলো’ এমনকি মহাজাগতিক বা কসমিক পর্যায়ে বিশাল, মহাগুরুত্বপুর্ণ করে তুলি একেবারে?

টেলিভিশনের জন্য আমি যখন রেভারেন্ড মাইকেল ব্রে, যুক্তরাষ্টেরএকজন সুপরিচিত  গর্ভপাত বিরোধী আন্দোলনের নেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেন ইভানেজেলিকাল খৃষ্টানরা  একজন মানুষের ব্যক্তিগত যৌন পছন্দ, যেমন সমকামীতা নিয়ে কেন এত মোহাবিষ্ট থাকে, যা অন্য কারো জীবনে কোন সমস্যা করছে না; তার উত্তর ছিল খানিকটা আত্মপক্ষ সমর্থন; ঈশ্বর যখন কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত হানেন কোন শহরের উপর, কারণ যেখানে পাপীদের বসবাস, তার প্বার্শ প্রতিক্রিয়া আর অনিচ্ছাকৃত ক্ষতির শিকার হয় নিষ্পাপ অবুঝ নাগরিকরাও; ২০০৫ সালে চমৎকার শহর নিউ অর্লিয়ন্স* হারিকেন কাতরিনা পরবর্তী ভয়ঙ্কর বন্যার কবলে আক্রান্ত হয়, রেভারেন্ড প্যাট রবার্ট, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে সুপরিচিত টেলিভ্যানজেলিষ্ট এবং একজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী, এই হারিকেন এর জন্য ঘটনাচক্রে নিউ অর্লিয়ন্স শহরে বসবাসকারী একজন লেসবিয়ান কমেডিয়ানকে দায়ী করে মন্তব্য করেছিলেন, আপনি ভাবতেই পারেন মহাক্ষমতাধর ঈশ্বর পাপীদের শায়েস্তা করতে খানিকটা সুনির্দিষ্ট নিশানা মাফিক কোন পথ বেছে নিতে পারতেন যেমন সময় মত হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা হয়তো বেছে নিতে পারতেন সমস্ত শহরকে নির্বিচারে ধ্বংশ করার বদলে, কারন সেই শহর ঘটনাচক্রে  একজন লেসবিয়ান কমেডিয়ানের বাসস্থান;

নভেম্বর ২০০৫ এ, পেনসিলভেনিয়ার ডোভারের নাগরিকরা পুরো স্থানীয় স্কুল বোর্ডকে ভোট দিয়ে বাদ দিয়ে দেন, পুরো মৌলবাদীদের পুরো একটি গ্রুপ যারা শহরটিকে কুখ্যাতি এনে দিয়েছিল, হাস্যকর না হয় বাদই দিলাম, স্কুলে জোর করে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন পড়ানোর প্রচেষ্টা করেছিলেন, যখন প্যাট রবার্টসন জানতে পারেন যে মৌলবাদীরা গণতান্ত্রিক উপারে ভোটে পরাজিত হয়েছে ব্যালট বক্সে, তিনি ডোভারের প্রতি  কঠিন একটি হুশিয়ারী বার্তা শোনান:

আমি ডোভারের সকল সুনাগরিকদের বলছি, যদি আপনাদের এলাকায় কোন মহাদুর্যোগ হয়, ঈশ্বরের কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনা করবেন না, আপনারা তাকে আপনাদের শহর থেকে বহিষ্কার করেছেন এইমাত্র এবং ভাববেন না যে কেন যখন বিপদ শুরু হলে, কেন তিনি আপনাদের সাহায্য করেননি।আমি বলছি না সেরকম কিছু হবে, কিন্তু যদি হয়, মনে রাখবেন, আপনারা ভোট দিয়ে তাকে শহর ছাড়া করেছেন মাত্র; সেক্ষেত্রে তাহলে তার সাহায্যর জন্য কোন প্রার্থনা করবেন না, কারন তিনি সেখানে নাও থাকতে পারেন;

প্যাট রবার্টসন নির্মল হাস্যরসের বিষয়বস্তু হতে পারতো, যদি না তিনি আজ যুক্তরাষ্ট্রে যারা ক্ষমতা আর প্রভাবের কেন্দ্রে অবস্থান করেন তাদের চেয়ে খানিকটা ভিন্ন হতেন;

ঈশ্বরের সডোম আর গমোরাহর ধ্বংশের সময়, নোয়ার সমতুল্য একজনকে তার পরিবারসহ বেছে নেন সেই মহা ধ্বংশযজ্ঞ থেকে রক্ষা করার জন্য কারন, কারন একমাত্র তিনি ছিলেন সেখানে বসবাসকারী একজন অন্যন্যতম সৎ ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি, আত্মীয়তার সুত্রে আব্রাহামের ভাইপো ছিলেন লট (Lot); দুজন পুরুষ ফেরেশতাকে সডোম এ লটের কাছে প্রেরণ করা হয় তাকে সতর্ক করে দিতে, সে যেন দ্রুত শহর তার পরিবার সহ চলে চায়, কারন শহরের উপর ঈশ্বরের শাস্তির স্বরুপ আগুনের পাথর বা বিব্লিকাল ব্রিমস্টোন নেমে আসছে; লট আথিতেয়তার সাথে ফেরেশতাদের তার বাসায় স্বাগত জানান; খবর পেয়ে সডোমের অন্য পুরুষরা একসাথে জড়ো হয়ে সেখানে এসে লটের কাছে দাবী করে, ফেরেশতা দুজনকে যেন তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়, যেন তারা তাদের পায়ু ধর্ষন করতে পারে ( ….আর কি?): আজ রাতে আপনার বাসায় যে মানুষ দুজন এসেছে তারা কোথায়? আমাদের সামনে তাদের নিয়ে আসুন, যেন আমরা তাদের জানতে পারি (জেনেসিস ১৯:৫); হ্যা,  এই ‘জানা” শব্দটি বাইবেল এর প্রামান্য স্বীকৃত সব সংস্করনে একটি  প্রচলিত সুভাষন; যা এই প্রসঙ্গে খুবই হাস্যকর;শহরবাসীদের দাবীকে অস্বীকার করার মধ্যে লটের সাহসিকতা প্রথমে মনে হতে পারে, হয়তো ঈশ্বর ঠিকই কোনেএকিটি ব্যাপার ধরতে পেরেছেন লটের মধ্যে, যখন তিনি তাকে আলাদা করেছিলের সডোমের একমাত্র ভালো মানুষ হিসাবে, কিন্তু লটের এই ভালোত্ব কলঙ্কময় হয়ে যা তার সেই অস্বীকার করার শর্তাবলীর দ্বারা: আমি আপনাদের কাছে প্রার্থনা করছি, আমার শহরবাসী ভাইগন, অশুভ কোন আচরন করা থেকে বিরত থাকুন; এখন দেখুন, আমার দুটি কন্যা আছে যারা কোন পুরুষকে কখনো জানেনি; আপনাদের কাছ মিনতি করছি, আমাকে তাদের ‍আপনাদের সামনে উপস্থিত করার অনুমতি দিন,আপনারা যা কিছু করতে চান তাদের সাথে করুন, এই দুইজনের সাথে কিছু করবেন না, কারন তারা আমার ছাদের ছায়ার নীচে আশ্রয় নিয়েছে (জেনেসিস ১৯;৭-৮);

এই আজব গল্পের যে অর্থই থাকুক না কেন, এটি নি:সন্দেহে তীব্রভাবে ধর্মীয় সংস্কৃতিগুলোয় নারীদের প্রতি যে ধরনের সন্মান প্রদর্শন করা হয় সে সম্বন্ধে একটি ধারনা দেয়; গল্পটি কিছুটা আগালেই দেখা যায়, নিজের মেয়েদের কুমারীত্বকে বিলিয়ে দেবার লটের এই প্রস্তাবের কোন প্রয়োজনীয়তা ছিল না, কারন ফেরেশতারা  সফল হয়েছিল আক্রমনরত জনতাকে ঠেকিয়ে দিতে ,অতিপ্রাকৃত উপায়ে শহরবাসী পুরুষদের অন্ধ করে দেবার মাধ্যমে; তারপর তারা লটকে দ্রুত তার পরিবার ও তার পোষা প্রানীদের নিয়ে শহর ছেড়ে যাবার জন্য তাড়া দেয়, কারন পুরো শহরটা কিছুক্ষনের মধ্যে ধ্বংশ হতে যাচ্ছে; লটের পুরো পরিবার পালাতে সক্ষম হয়, শুধু মাত্র লটের হতভাগ্য স্ত্রী ছাড়া, যাকে ঈশ্বর লবনের একটি স্তম্ভতে রুপান্তরিত করেন কারন তিনি একটি অপরাধ করেছিলেন – চিন্তা করলে দেখছে যা তুলনামুলকভাবে খুবই সামান্য – পেছন ফিলে তিনি সডম এর ধ্বংশলীলা বা ঈশ্বরের ফায়ার ওয়ার্ক দেখেছিলেন;

লটের দুই কন্যা সংক্ষিপ্তভাবে আবার গল্পে ফিরে আসে; তাদের মা লবনের পিলারে পরিনত হবার পর, তারা তাদের পিতার সাথে একটি গুহায় বসবাস করতো, পুরষসঙ্গ বঞ্চিত দুই বোন সিদ্ধান্ত নেয় তারা তাদের পিতাকে নেশাগ্রস্থ করে তার সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হবে, লট মাতাল অবস্থায় লক্ষ্যই করতে পারেননি যে তার বড় মেয়ে তার শয্যায় এসেছে বা কখন সে তার শয্যা ছেড়ে গেছে… কিন্তু স্পষ্টতই তিনি যথেষ্ট মাতাল ছিলেন না তার কন্যাকে অন্তসত্ত্বা করার জন্য, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এরপরের রাতে ছিল ছোট বোনের পালা, আবারো লট নাকি এমনই মাতাল যে লক্ষ্য করতে পারলেন না কি হয়েছে, এবং তাকেও অন্তসত্ত্বা করে ফেললেন( জেনেসিস ১৯:৩১-৬); এই অদ্ভুত সমস্যাপুর্ণ পরিবার যদি সডমের সেরা পরিবার হয় নৈতিকতার শিক্ষা দেবার জন্য, ঈশ্বর এবং তার বিচারের অস্ত্র ব্রিমস্টোন বা পাথরের আগুন দিয়ে পোড়ানোর শাস্তি ব্যপারে যে কেউই নির্দিষ্টভাবে খানিকটা সমবেদনা অনুভব করতে পারবেন;

লট এবং সডমবাসীদের গল্প বিস্ময়কর ভাবে ওল্ড টেষ্টামেন্ট এর ১৯ তম অধ্যায়, বুক অব জাজেস (Book of Judges) এ খানিকটা ভিন্নভাবে পুনরাবৃত্তি ঘটে, যেখানে একজন নামহীন লেভাইট ( যাজক) তার উপপত্নী নিয়ে গিবিয়াহ তে ভ্রমন করছিলেন, যাত্রার সময় তারা একজন সদয় অতিথিবৎসল বৃদ্ধের বাড়িতে একটি রাত কাটান; যখন তারা রাতের খাবার খাচ্ছিলেন, শহরের পুরুষরা জড়ো হয়ে সেই বাসার দরজায় কড়া নাড়ে, তারা বৃদ্ধের কাছে দাবী জানান, তার পুরুষ অতিথিকে তাদের হাতে তুলে দেবার জন্য, ’যেন আমরা তাকে ’জানতে’পারি;’ প্রায় লটের সেই বাক্য ব্যবহার করে বৃদ্ধ গৃহকর্তা বলেন, ’না, আমার ভাইরা, না, আপনাদের কাছে আমি প্রার্থনা করি, এতটা খারাপ আচরন করবেন না, এই মানুষটা আমার বাসায় এসেছে দেখে এই আচরন করবেন না, দেখুন আমার কন্য একজন কুমারী এবং তার উপপত্নী এখানে আছে, তাদের আমি নিয়ে আসছি, তাদেরকে আপনারা আপনাদের  অনুগত করে নেন …তাদের সাথে যা খুশি করুন..যেটা করতে ভালো লাগে আপনাদের, কিন্তু এই মানুষটার সাথে কোন খারাপ কিছু দয়া করে করবেন না (জাজেস ১৯:২৩-৪)‘; আবারো নারীবিদ্বেষী নৈতিকতার স্বরুপ দেখা গেল..সুস্পষ্টভাবে;  বিশেষ করে এই বাক্যটা  ‘humble ye them’ পড়লে আমি শিউরে উঠি; আমার মেয়ে আর যাজকের উপপত্নীকে নিয়ে ইচ্ছামত অপমান আর ধর্ষন করে আপনারা আনন্দ করুন, কিন্তু আমার অতিথির প্রতি যথাযথ সন্মান প্রদান করুন, কারন আর যাই হোক তিনি পুরুষ মানুষ; দুটো গল্পের মধ্যে সদৃশ থাকা সত্ত্বেও এখানে ঘটনার প্লটটি লটের কন্যাদের ভাগ্যে ঘটা ঘটনার চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম সুখকর লেভাইট এর উপপত্নীর জন্য;

কাহিনীতে দেখা যা লেভাইট তার উপপত্নীকে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেয়, যাকে সারারাত ধরে গণধর্ষন করা হয়: “তারা তাকে ‘জানে’ এবং সারারাত ধরে অত্যাচার করে সকাল অবধি, এবং যখন ভোরের আলো ফুটতে থাকে, তারা তাকে ছেড়ে দেয়; এরপর রমনীটি খুব ভোরে সেই মানুষটির ঘরের দরজার সামনে এসে শুয়ে পড়ে, যেখানে তার স্বামী অধিপতি অবস্থান করছেন, পুরোপুরি সকাল হবার আগে; (জাজেস ১৯: ২৫-৬);” সকালে ঘুম থেকে উঠে লেভাইট তার উপপত্নীকে দরজার সামনে শুয়ে থাকতে দেখেন এবং বলেন – যা আজ যে কোন কারো কাছে মনে হতে পারে চুড়ান্ত অসংবেদনশীল – ‘ওঠো, আমাদের এখুনি বেরিয়ে পড়তে হবে, কিন্তু তার উপপত্নী অনঢ়, কারন তার মৃত্যু হয়েছে,  সুতরাং লেভাইট একটি ধারালো ছুরি দিয়ে, তার তার উপপত্মীকে কেটে টুকরো টুকরো করে, তার হাড় সহ মোট ১২টি ভাগ করে টুকরোগুলো ইসরায়েল এর বিভিন্ন প্রান্তে প্রেরণ করে;‘ হ্যা আপনি ঠিকই পড়েছেন, জাজেস ১৯:২৯ দেখুন; খানিকটা করুনার সাথে এটিকে বাইবেলের সর্বব্যাপী উদ্ভট কিছু বিষয়ের একটি মনে করে নেই; এই গল্প আগে উল্লেখিত লটের গল্পর সাথে এতই মিল যে মনে হতে পারে,ভুল করে মুল পান্ডুলিপির কিছু পাতা প্রাচীন কোন স্ক্রিপটোরিয়াম বা পান্ডুলিপি রচনার ঘরে ওলটপালট হয়ে গেছে; পবিত্র টেক্সট এর অসামন্জষ্যপুর্ণ সব উৎপত্তির একটি উদহারণ।

লটের চাচা আব্রাহাম ছিলেন তিনটি প্রধান ও তথাকথিত ’মহান‘ একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রত্যেকটিরও প্রতিষ্ঠাতা পিতা; তার পৈতৃক অবস্থান তাকে ঈশ্বরের চেয়ে সামান্য খানিক নীচে রোল মডেল হিসাবে উপস্থাপন করেছে তার অনুসারীদের কাছে; কিন্তু আধুনিক যুগের কোন নীতিবান মানুষ কি আসলেই তাকে অনুসরন করার ইচ্ছা পোষন করেন? তার সুদীর্ঘ জীবনের শুরুর দিকে, আব্রাহাম মিসরে গিয়েছিলেন তার স্ত্রী সারাহকে নিয়ে দুর্ভিক্ষ ভয়াবহতা থেকে বাচতে; কিন্তু তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এমন সুন্দরী একজন সহচরী রমনী নিশ্চয়ই মিশরীয়দের কাছে কাঙ্খিত হবে, সুতরাং তার স্বামী হিসাবে তার নিজের জীবনটাও সারাক্ষন ঝুকির মধ্যে থাকতে পারে, সুতরাং তিনি তার স্ত্রীকে নিজের বোন হিসাবে পরিচয় দেন, আর সেই পরিচিতিতেই সারাহে ফারাও দের হারেম এ জায়গা দেয়া হয় এবং আব্রাহামও ফলাফলে ফারাওদের অনুগ্রহে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন, ঈশ্বর আব্রাহামের এই সুবিধাবাদী ব্যবস্থা পছন্দ করেননি সুতরাং তিনি ফারাও এর প্রাসাদে প্লেগ পাঠালেন ( মজার বিষয় হচ্ছে আব্রাহামের উপর না কেন), যথাযোগ্যকারনে ক্রুদ্ধ ফারাও আব্রাহামের কাছ জানতে চান কেন সে তাকে জানায়নি সারাহ তার স্ত্রী, এরপর তিনি সারাহকে আব্রাহামের কাছে ফিরিয়ে দেন এবং দুজনকে দেশ থেকে বের করে দেন (জেনেসিস ১২: ১৮-১৯); অদ্ভুতভাবে, এই দম্পতি সেই একই চালাকীর আশ্রয় নেবার চেষ্টা করে আবারো, এবার জেরার (Gerar) এর রাজা আবিমেলেখ এর কাছে, আব্রাহামের প্ররোচনায় তিনিও সারাহকে বিয়ে করার চেষ্টা করেন, কারন সারাহ তার বোন, স্ত্রী নয়, এমন একটি ধারনাই দিয়েছিল আব্রাহাম তাকে (জেনেসিস ২০:২-৫); পুরো ব্যাপারটা জানার পর তিনি তার তিনিও নিন্দা জানিয়েছেন, ফারাও এর মত সেই ঠিকই একই শব্দাবলী ব্যবহার করে; উভয় ক্ষেত্রেই এই দুটি নৃপতির জন্য সমবেদনা অনুভব করাটাই স্বাভাবিক; এই সদৃশ্যতা বাইবেলের তথ্যগত বিচ্যুতির আরেকটি ইঙ্গিত?

আব্রাহামের গল্পের এই সব অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো খুব মামুলী অপরাধ মনে হবে যদি তার পুত্র আইজাককে বিসর্জন দেবার সেই কুখ্যাত কাহিনীর সাথে তুলনা করা হয় ( মসুলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে আব্রাহামের অন্য পুত্র ইসমায়েলকে নিয়ে একই ঘটনার বিবরণ আছে); ঈশ্বর আব্রাহামকে একটি চুড়ান্ত আত্মত্যাগের পরীক্ষা হিসাবে তাকে তার বহুকাঙ্খিত পুত্রকে বিসর্জন করার নির্দেশ দেন, আব্রাহাম ঈশ্বরের নির্দেশ মোতাবেক বিসর্জনের বেদী তৈরী করেন, তার উপর জ্বালানী কাঠ সাজিয়ে আইজাককে শুইয়ে দেন; জবাই করার জন্য প্রস্তুত ছুরি হাতে ঠিক তখুনি নাটকীয়ভাবে একজন ফেরেশতা সেখানে আবির্ভুত হন, এবং শেষ মুহুর্তে ঈশ্বরের পরিকল্পনার কিছু পরিবর্তন হয়েছে সেটি তাকে জানান: ঈশ্বর তাহলে আসলেই ঠাট্টা করছিলেন, আব্রাহামকে প্ররোচনা দিচ্ছিলেন তার বিশ্বাস কতটা মজবুত তা পরীক্ষা করার জন্য। একজন আধুনিক নৈতিকতাবাদী কেউ বিষয়টি না ভেবে পারেন না যে, কোনদিনও কি এই শিশুটি এধরনের মনস্তাত্ত্বিক আঘাত থেকে নিজেকে নিরাময় করতে পারবে।আধুনিক নৈতিকতার মানদন্ড অনুযায়ী, এই ন্যাক্কারজনক গল্পের একই সাথে শিশু নির্যাতন এবং দুটি অসম শক্তির সম্পর্কের একপক্ষের বিশেষ জোর খাটানোর উদহারন আছে এবং এটি প্রথম বারের মত লিপিবদ্ধ হয়েছে নুরেমবার্গ ডিফেন্স এর ব্যবহার এর উদহারন…. ’আমি শুধু নির্দেশ অনুসরন করেছি’; তারপরও লিজেন্ড বা কিংবদন্তীর কাহিনী তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রত্যেকটির  সেই পুরাণ বা মিথ যা ভিত্তি রচনা করেছে;

আবারো আধুনিক ধর্মতত্ত্ববিদরা প্রতিবাদ করবেন এই বলে যে আব্রাহামের আইজাককে প্রায় বিসর্জন দেবার কাহিনী আক্ষরিকভাবে নেয়া উচিৎ হবে না।এবং আবারো এর উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দুইটি, প্রথমত এমনকি আজ অবধি বহু মানুষ পুরো ধর্মগ্রন্থ আক্ষরিকভাবে সত্য বলে মনে করেন এবং তাদের যথেষ্ট পরিমান রাজনৈতিক শক্তি আছে আমাদের বাকী সকলে উপর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামী বিশ্বে; দ্বিতীয়ত যদি আক্ষরিক সত্য হিসাবে গ্রহন না করি, তাহলে এই গল্পগুলো আমাদের কিভাবে নেয়া উচিৎ, রুপকার্থে? তাহলে কিসের রুপকার্থে? নিশ্চয়ই প্রশংসা যোগ্য কিছু নয়, নৈতিক শিক্ষা হিসাবে? এই ধরনের ভয়ঙ্কর গল্প থেকে কোন ধরনের নীতিবোধ এর শিক্ষা আমরা গ্রহন করতে পারি? পাঠকরা মনে রাখবেন, আমি মুহুর্তে যা চেষ্ঠা করছি তা হচ্ছে, আমরা আসলে আমাদের নীতিবোধ ধর্মগ্রন্থ থেকে গ্রহন করি না। অথবা যদি আমরা তা করি, আমরা ধর্মগ্রন্থ যাচাই বাছাই করে ভালো অংশগুলো খুজে বের করি আর খারাপ নোংরা অংশগুলো বর্জন করি, কিন্তু তারপর আমাদের অবশ্যই কোন না কোন স্বাধীন কিছু বৈশিষ্ট বা গুনাবলীর মানদন্ড থাকা উচিৎ কোনটি নৈতিক অংশ সেটি নির্ধারন করার জন্য, যে মানদন্ডটি আর যেখান থেকে তা আসুক না কেন, ধর্মগ্রন্থ থেকে আসবে না, এবং অবশ্যই যা আমাদের সবার কাছে স্পষ্টতই উন্মুক্ত গ্রহনযোগ্য হবে, আমরা ধর্ম মানি বা না মানি।

ধর্মীয় অ্যাপোলজিষ্ট বা সমর্থনকারীরা এমন কি এই নিন্দনীয় কাহিনীতে ঈশ্বর চরিত্রটির খানিকটা শ্লীলতা রক্ষা করার চেষ্টা করে থাকেন, শেষ মুহুর্তে আইজাকের জীবন বাচিয়ে ঈশ্বর কি ভালো করেননি? এধরনের বিশেষ অশ্লীল অনুরোধের দ্বারা আমার কোন পাঠক প্ররোচিত হতে পারেন এমন কোন অসম্ভাব্য পরিস্থিতিতে আমি তাদের ওল্ড টেষ্টামেন্ট এ আরেকটি মানব বিসর্জনের কাহিনী  সম্বন্ধে অবহিত করতে চাই, যার পরিণতি ছিল এরকম সুখকর ছিল না; জাজেস এ অধ্যায় ১১, সামরিক নেতা জেফথাহ (Jephthah), ঈশ্বরের সাথে একটি চুক্তি করেন, যদি ঈশ্বর অ্যামোনাইটদের (Ammonites) বিরুদ্ধে তাকে জয়যুক্ত করে, তাহলে জেফতাহ, অবশ্যই একটি চুড়ান্ত বিসর্জন দেবেন….”আমি যখন ফিরবো, আমার ঘরের দরজা দিয়ে প্রথম যে বেরিয়ে আসবে আমার সাথে দেখা করতে..“;  যথারীতি জেফতাহ সত্যি সত্যি  অ্যামোমাইটদের হারায় ( অসংখ্য হত্যার পর, বুক অব জাজের অন্য ঘটনার সাথে সমতুল্য হারে) এবং বিজয়ীর বেশে ঘরে ফেরেন, এবং আদৌ বিস্ময়কর না, তার কন্যা, একমাত্র সন্তান বাড়ীর বাইরে তাকে স্বাগত জানায় ( টিমব্রেল বাজিয়ে এবং নেচে); এবং হায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে .. সেই প্রথম দেখা করতে আসা জীবিত প্রানী, তার প্রিয় সন্তান – বোধগাম্য কারনে তীব্র দু:খ আর হতাশায় জেফতাহ তার কাপড় ছিড়েছে, কিন্তু তার কিছুই করার ছিল না; ঈশ্বর নিশ্চয়ই অধীর আগ্রহে ছিলেন তার প্রতিজ্ঞা করা বিসর্জন এর এই উপঢৌকনের, এবং এই পরিস্থিতিতে তার কন্যা কোন প্রতিবাদ না করেই রাজী হয় আত্মবিসর্জনে, তার একটাই দাবী ছিল তাকে যেন দুইমাসের জন্য পাহাড়ে যেতে দেয়া হয় যেন সে তার কুমারীত্বর জন্য শোক করতে পারে, দুই মাস পরে সে যথারীতি ফিরে আসে, এবং তার বাবা ঈশ্বরকে দেয়া তার প্রতিজ্ঞামত আগুনে পুড়িয়ে বিসর্জন দেন; এখানে কিন্তু ঈশ্বর আদৌ সঙ্গত মনে করেননি হস্তক্ষেপ করার জন্য।

যখনই তার বাছাইকৃত জনগোষ্ঠী প্রতিদ্বন্দী কোন ঈশ্বর বা দেবদেবীদের নিয়ে কৌতুহল দেখায়, ঈশ্বরের অতি তীব্রতম ক্রোধ যৌনঈর্ষার সবচেয়ে কুৎসিততম রুপের সদৃশ মনে হতে পারে; এবং আবারো কোন আধুনিক নৈতিকতাবাদীর কাছে সেটা কোন রোল মডেল এর রুপ হতে পারেনা; যৌন অবিশ্বস্ততার প্রলোভন খুব সহজে বোঝা সম্ভব এমনকি যারা এ ধরনের প্রলোভনে আক্রান্ত হন না তাদের পক্ষেও এবং নানা কাহিনী এবং নাটকের এটি মুল বিষয় ,শেক্সপিয়ার থেকে শুরু করে শয়নকক্ষের প্রহসনেও; কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে ভীনদেশী কোন দেবদেবীর নিবেদনে বেশ্যাবৃত্তি করার অপ্রতিরোধ্য প্রলোভন কখনো কখনো আমাদের আধুনিক মনে কোন সহমর্মিতার জায়গা করে নেয় না। আমার অবুঝ চোখে ’আমাকে ছাড়া তোমরা আর কোন ঈশ্বরের উপাসনা করবে না,’ মনে হতে পারে পালন করার জন্য খুব সহজ একটা নির্দেশ: ছেলেখেলা মাত্র,  যে কেউ তা ভাবতে পারেন, যদি তুলনা হয় অন্য আদেশগুলোর সাথে, যেমন, তোমরা কেউই  প্রতিবেশীর স্ত্রীকে বা তার গাধা বা ষাঢ় কামনা করবে না ; তারপরও ওল্ড টেষ্টামেন্ট এ সেই একই নিশ্চয়তার সাথে নিয়মিত ভাবে যেমনটা শয়নকক্ষের প্রহসনের ক্ষেত্রে হয়, ঈশ্বর শুধু অন্য দিকে তাকালেই হয় কয়েক মুহুর্তের জন্য এবং ইজরায়েলের সন্তানরা সব ভুলে বাল কিংবা অন্য কোন মুর্তি পুজায় লিপ্ত হয় বা একটি ভয়াবহ ঘটনায় যেমন সোনার তৈরী বাছুর …

মোজেস, যিনি আব্রাহামের চেয়ে আরো বেশী গ্রহন যোগ্য রোল মডেল তিনটি একেশ্বরবাদী ধর্মের অনুসারীদের কাছে; আব্রাহাম হতে পারেন আদি পিতা, যদি কাউকে চিহ্নিত করা হয় জুডাইজম এর থেকে উদ্ভুত ধর্মগুলোর মুল মতবাদের প্রবক্তা হিসাবে, তবে নিশ্চয়ই সে হবে মোজেস; সোনালী বাছুরের সেই ঘটনাটির সময়, মোজেস বেশ নিরাপদ দুরত্বে মাউন্ট সাইনাই এর উপরে ছিলেন, ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ এবং তার আদেশ সম্বলিত খোদাইকরা পাথরের ট্যাবলেটগুলো সংগ্রহ করছিলেন; পাহাড়ের নীচে ( যারা সেই পাহাড় ছোয়া পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল, কারন সেটি মৃত্যু যন্ত্রনার কারন হবে) তার অনুসারীরা কোন সময় নষ্ট করেননি:

যখন তারা দেখলো মোজেস এর দেরী হচ্ছে পাহাড় থেকে নীচে নেমে আসার জন্য, তারা সবাই মোজেস এর ভাই অ্যারন এর কাছে এসে তাকে বলেন, তাড়াতাড়ি আমাদের দেব দেবীর কোন মুর্তি বানিয়ে দাও,  যা আমরা অনুসরণ করতে পারবো থাকবে উপাসনার জন্য, আর মোজেস এর ব্যাপারে, যে মানুষটা আমাদের মিসর থেকে আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে, আমরা জানিনা তার কি পরিণতি হয়েছে ( এক্সসোডাস ৩২:১);

অ্যারন সবার কাছ থেকে সোনা সংগ্রহ করে, তা গলিয়ে একটি সোনার বাছুর তৈরী করে দেয়, যার জন্য তিনি একটি উপাসনার বেদী তৈরী করেন, যেখানে সবাই তাদের পুজা এবং বিসর্জনের উপঢৌকন রাখা শুরু করে।

বেশ, তাদের ভালো করেই জানার কথা ছিল, ঈশ্বরের পেছনে এধরনের কাজ করা তাদের উচিৎ হচ্ছে না, তিনি হয়তো পাহাড়ের উপর থাকতে পারেন, কিন্তু সর্বোপরি তিনি তো সর্বজ্ঞ অন্তর্যামী,  এবং দেরী করলেন না তিনি, দুত মোজেসকে দ্রুত সেখানে প্রেরণ করে তার আজ্ঞা পালন করতে, মোজেস দ্রুত বেগে পর্বত থেকে নীচে নেমে আসেন পাথরের ট্যাবলেটগুলো নিয়ে, যার উপর ঈশ্বর তার দশটি নির্দেশ বা টেন কম্যান্ডমেন্টস খোদাই করে দিয়েছিলেন; পৌছে যখন মোজেস দেখলেন, তার অনুসারীরা সোনালী বাছুরকে পুজা করছে, তিনি এত রেগে গেলেন যে সব ট্যাবলেট মাটিতে ফেলে দিয়ে ভেঙ্গে ফেললেন ( ঈশ্বর অবশ্য তাকে আরেক সেট পাঠিয়েছিলেন পরে), এরপর সোনালী বাছুর টিকে পুড়িয়ে,এরপর ভালো করে পিষে পাউডারের মত করে পানিতে মিশিয়ে সবাই বাধ্য করলেন গিলে খেতে, তারপর তিনি একটি যাজক গোত্র লিভাই দের বললেন তলোয়ার হাতে নিয়ে যে কয়জনকে হত্যা করা যায়, তাদের হত্যা করতে, যার ফলাফলে প্রায় ৩০০০ জনের মৃত্যু হলো; যা, অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন ঈশ্বরের অন্য দেবতাদের সাথে উগ্র ঈর্ষাকে শান্ত করার জন্য যথেষ্ট একটি সংখ্যা, কিন্তু না, ঈশ্বরের ক্রোধ শেষ হয়নি তখনও; এই ভয়ঙ্কর অধ্যায়ের শেষ অনুচ্ছেদে তার শেষ আঘাত দেখা যায়, যে কয়জন বেচে ছিল তাদের উপর কঠিন অসুখ ছড়িয়ে দেয়া, কারন ’তারা বাছুরকে দেবতা বানিয়েছে যা অ্যারন বানিয়ে দিয়েছিল;’

বুক অব নাম্বার (Book of Numbers) বলছে কিভাবে ঈশ্বর মোজেসকে উস্কে দেন মিডিয়ানাইটদের (Midianites) আক্রমন করতে; তার সৈন্যরা খুব সহজে মিডিয়ানাইটদের সব পুরুষদের হত্যা করে এবং তাদের সকল শহর পুড়িয়ে দেয় কিন্তু তারা নারী ও শিশুদের তখনও হত্যা করেনি, তার সৈন্যদের এই দয়াশীল আচরন মোজেসকে ক্ষুদ্ধ করে তোলে এবং তিনি আদেশ দেন সব ছেলে শিশুকে সব নারীকেও যারা কুমারী নয় হত্যা করতে হবে, কিন্তু সব নারী ও মেয়ে শিশু যারা এখন কোন পুরুষের শয্যাসঙ্গী হয়নি তাদের বাচিয়ে রাখো তোমাদের ভোগের জন্য ( নাম্বারস ৩১:১৮); নাহ, আধুনিক কোন নৈতিকতাবাদীর কাছে মোজেস কোন আদর্শ অনুকরণীয় চরিত্র হতে পারেনা।

আধুনিক ধর্মীয় লেখকরা যা আপাতত মিডিয়ানাইটদের গনহত্যার ব্যাপারে কোন ধরনের রুপক অর্থ যুক্ত করেছেন, সেই রুপক অর্থটি সংযুক্ত হয়েছে ভিন্ন দিক বরাবর; দুর্ভাগা মিডিয়ানাইটরা, বাইবেল এর কাহিনী অনুযায়ী যতটুকু বলা যায়, নিজের দেশেই গনহত্যার শিকার; তারপরও তাদের নাম খৃষ্টীয় রুপকথায় টিকে আছে একটি জনপ্রিয় হিম বা স্তব সঙ্গীতে ( যা আমি এখনও গাইতে পারবো আমার স্মৃতি থেকে প্রায় ৫০ বছর পরে, দুটি ভিন্ন সুরে যা প্রত্যেকে নীচের স্কেলে বেশ গম্ভীর ভারী সুরে)

Christian, dost thou see them
On the holy ground?
How the troops of Midian
Prowl and prowl around?

Christian, up and smite them,
Counting gain but loss;them by the merit
Of the holy cross.

হায়, হতভাগা অকারনে মিথ্যাভাবে কলঙ্ককৃত, হত্যাকৃত মিডিয়ানাইটদের শুধুমাত্র স্মরণ করা হবে ভিক্টোরিয়া যুগের একটি স্তবসঙ্গীতে কাব্যিক রুপক হিসাবে;

প্রতিদ্বন্দী দেবতা বা’ল সম্ভবত ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় এধরনের বিকল্প ঈশ্বর বিরোধী উপাসনার জন্য; নাম্বারস এ অধ্যায় ২৫ বলছে, বহু ইসরায়েলাইটদের মোবাইট রমনীরা প্রলুব্ধ করেছিল তাদের দেবতা বা’ল এর প্রতি বিসর্জন দেবার জন্য; এই ঘটনায় ঈশ্বর তার স্বভাবসুলভ ক্রোধ প্রদর্শন করার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।তিনি মোজেস কে নির্দেশ দেন, এই সব মানুষেদের মস্তক কর্তন করে তাদের ঈশ্বরের সন্মুখে সুর্যের মুখোমুখি ঝুলিয়ে রাখো, যেন ঈশ্বরের ভয়ঙ্কর ক্রোধ ইসরায়েলকে স্পর্শ না করে; আবারো বিস্মিত না হবার কোন কারন নেই কেন প্রতিদ্বন্দী কোন দেবতাকে পুজা করার পাপের ব্যপারে ঈশ্বর কেন এই ধরনের অস্বাভাবিক কঠোর দৃষ্টিভঙ্গী পোষন করেন; মুল্যবোধ আর ন্যায় বিচার সংক্রান্ত আমাদের আধুনিক বোধে মনে হতে খুব সামান্য একটি পাপ, নিজের কন্যাদের গণধর্ষনের জন্য নিবেদন করার সাথে যদি তুলনা করা হয়। এটি আরো একটি উদহারন ধর্মীয় গ্রন্থের আর আধুনিক ( যদি কেউ নিজেকে সভ্য বলে দাবী করেন) নৈতিকতার মধ্যকার বিশাল পার্থক্যগুলোর।অবশ্যই এটি যথেষ্ট সহজে বোঝা সম্ভব মিম থিওরীর আলোকে এবং কোন ঐশ্বরিক সত্ত্বার কি প্রকৃতির হতে হবে মিম পুলে টিকে থাকার জন্য;

বিকল্প দেবতাদের প্রতি ঈশ্বরের উন্মত্ত তীব্র প্রতিশোধ পরায়ন হিংসার ট্র্যাজিক প্রহসনের বার বার পুণরাবৃত্তি ঘটেছে ওল্ড টেষ্টামেন্ট এ; যা টেন কম্যান্ডমেন্ট বা ঈশ্বরের দশ নির্দেশিকার প্রথম নির্দেশটির প্রেরণা ( যা পাথরের উপর খোদাই করা ছিল, এবং মোজেস যা ভেঙ্গে ফেলেছিলেন, এক্সোডাস ২০, ডিউটেরোনমি ৫), এবং এটি আরো বেশী স্পষ্ট অন্য নির্দেশগুলোতে ( আপাতদৃষ্টে যদিও ভিন্ন), প্রতিস্থাপিত যে পাথরে নির্দেশগুলো যা ঈশ্বর মোজেস কে দিয়েছিলেন ভেঙ্গে যাওয়া পাথরের ট্যাবলেটগুলোর বদলে ( এক্সোডাস ৩৪); তাদের জন্মভুমি থেকে হতভাগা আমোরাইটস, কানানাইট, হিটাইট, পেরিজজাইট, হিভাইট এবং জেবুসাইট দের উৎখাত করার প্রতিজ্ঞা করার পর ঈশ্বর মুল বিষয়টাতে আসেন, যা তার কাছে গুরুত্বপুর্ণ: প্রতিদ্বন্দী দেবতারা….

তোমরা তাদের পুজার বেদী ধ্বংস করবে, তাদের মুর্তি আর প্রতিকৃতি ভাঙ্গবে, তাদের বোনা বাগান উৎপাটন করবে; কারন তোমরা আর কোন ঈশ্বরকে পুজা করবে না: কারন মহান ঈশ্বর… যার নাম হচ্ছে ঈর্ষা, এবং ঈর্ষান্বিত একজন ঈশ্বর। যদি তোমরা স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে চুক্তিতে আসো, এবং তারা তাদের দেবতাদের বেশ্যাবৃত্তি করে এবং অন্য দেবতাদের জন্য উৎসর্গ করে এবং তোমাদের আহবান করে, তোমরা তাদের বিসর্জন ভক্ষন করো এবং তোমরা তাদের কন্যাদের তোমার পুত্রদের সাথে বিবাহ দাও, এবং তাদের কন্যারা তাদের দেবতার বেশ্যাবৃত্তি অব্যাহত রাখে এবং তোমাদের পুত্রদেরও সেই দেবতারই বেশ্যাবৃত্তি করাবে, তোমরা তোমাদের জন্য কোন গলিত ধাতুর দেবতা সৃষ্টি করবে না ( এক্সোডাস ৩৪: ১৪-১৭);

আমি জানি হ্যা অবশ্যই অবশ্যই সময় বদলেছে আজকের দিনে কোন ধর্মীয় নেতা (  তালিবান বা তাদের সমতুল্য যুক্তরাষ্ট্রের খৃষ্টানরা ছাড়া) মোজেস এর মত চিন্তা করেন না; আর সেটাই আমার মুল বক্তব্য, আমি যেটা প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করছি যে, আধুনিক নৈতিকতা যেখান থেকেই আসুক না কেন বাইবেল থেকে সেটা আসেনি; ধর্মীয় তোষনবাদীদের দাবী যে ধর্ম তাদের অন্তর্গত একটি ধারনা দিয়েছে ভালো আর মন্দ র মধ্যে পার্থক্য করার জন্য …..যে বিশেষ সুবিধাজনক উৎসর প্রতি নীরিশ্বরবাদীদের কোন দাবী নেই… বলে নিস্তার পেতে পারেন না, এমনকি যদি যখন তারা তাদের পছন্দের ছলাকলাও ব্যবহার করেন নির্দিষ্ট নির্বাচিত ধর্মগ্রন্থ আক্ষরিক না বলে রুপকার্থে ব্যাখ্যা করার জন্য; কিন্ত কি মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে আপনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোন অংশটি প্রতীকি কোনটা আক্ষরিক?

যে জাতিগত বিশোধন শুরু হয়েছিল মোজেস এর সময় থেকে তা রক্তাক্ত পরিনতির দিকে পৌছায় বুক অব জোশুয়ায় (Book of Joshua), যে বইটি বিখ্যাত রক্তপিপাসু গনহত্যার লিপিবদ্ধ ইতিহাস এবং বর্ণবাদী জাতিগত ঘৃনার জোশে পরিপুর্ণ যা এই সব রক্তাক্ত গণহত্যার কারন; যেমন একটি পুরোনো গান প্রশংসার সাথে  যার আভাস দিয়েছে; জশুয়া জেরিকোর যুদ্ধে জয় হয় এবং সব দেয়াল ধ্বংশ হয়. সেই পুরোনো জশুয়ার মত আর কেউ নেই, জেরিকোর যুদ্ধে; প্রাচীন মহৎ জশুয়া বিশ্রাম নেননি যতক্ষন না পর্যন্ত তার সৈন্যরা শহরে যা আছে তা পুরোপুরি ধ্বংশ না করেছে, পুরুষ নারী উভয়ে বৃদ্ধ এবং শিশু, ষাড় এবং ভেড়া এবং গাধা তলোয়ারের ধারালো প্রান্ত দিয়ে; (জশুয়া ৬:২১);

আবারো ধর্মতত্ত্ববিদরা প্রতিবাদ করবেন, এমন কিছু ঘটেনি, বেশ কোন গল্পই বলে না, দেয়াল ভেঙ্গে পরে শুধু মানুষের চিৎকার আর শিঙ্গার আওয়াজে, সুতরাং আসলেই এটা ঘটেনি কিন্তু সেটা বিষয় না, বিষয়টি হলো সত্য হোক বা না হোক, বাইবেল এটিকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করছে আমাদের নৈতিকতার উৎস হিসাবে এবং জশুয়ার জেরিকোর ধ্বংশর বাইবেল এর কাহিনী এবং প্রতিশ্রুত ভুমিতে আগ্রাসন এর সাথে সাধারনভাবে নৈতিকভাবে হিটলারের পোল্যান্ড আগ্রাসনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই বা সাদ্দাম হোসেন এর কুর্দ এবং মার্শ আরবদের গনহত্যার  সাথে; বাইবেল হতে পারে আকর্ষনী এবং কাব্যিক কাহিনীর কোন নমুনা, তবে কখনোই এই বই আপনি আপনার সন্তানদের হাত তুলে দেবেন না নৈতিকতার শিক্ষা নেবার জন্য; ঘটনাচক্রে কিন্তু জশুয়ার জেরিকো অভিযান শিশু নৈতিকতার বিষয়ে একটি মজার পরীক্ষা হতে পারে, যে বিষয়টি এই অধ্যায়ের পরবর্তীতে  বিস্তারিত আলোচনায় আসবে;

যাই হোক, আপনি কি মনে করেন ,এই গল্পে ঈশ্বর চরিত্রটির মধ্যে প্রতিশ্রুত ভুমি অধিকারের জন্য যেকোন হত্যা কিংবা গনহত্যার আবশ্যিকতা সম্বন্ধে সামান্যতম সন্দেহ বা দ্বন্দ পোষন করেন? বরং এর বীপরিত, তার নির্দেশগুলো যেমন ডিউটেরোনোমী ২০ এ নিষ্টুরভাবে স্পষ্ট; তিনি সুস্পষ্টভাবে বিভাজন করেছেন, যে মানুষগুলো সেই দেশে বাস করে যা তার প্রয়োজন এবং সেই মানুষগুলো যারা বহু দুরে বসবাস করে সেই দেশ থেকে; তার প্রয়োজনীয় ভুমিতে বসবাস কারীদের আমন্ত্রণ জানাতে হবে প্রথমে শান্তিপুর্ণ আত্মসমর্পনের জন্য, তারা যদি অস্বীকার করে, সব পুরুষদের তাহলে হত্যা করতে হবে এবং তাদের নারীদের বন্দী করা হবে প্রজননের কাজে ব্যবহার করার জন্য;  এই আপেক্ষিক মানবিক আচরনের বীপরিত দেখুন কি ভাগ্যে আছে সেই সব হতভাগ্য গোত্রদের যারা দুর্ভাগ্যজনকভাবে নেই প্রতিশ্রুত ’লেবেনসরম’ (Lebensraum : নাৎসী জার্মানীর সেই প্রতিশ্রুত গনহত্যা মুলক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, যার অর্থ জার্মান জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আরো জায়গা সম্প্রাসারন) এত দিন বসবাস করে আসছিল: ’কিন্তু সেই সব গোত্রের মানুষদের শহরগুলো, যা তোমাদের প্রভু তোমাদের ঈশ্বর তোমাদের উত্তরাধিকার সুত্রে প্রদান করেছে, তোমরা এমন কিছুই বাচিয়ে রাখবে যা কিছু শ্বাস নেয়, তোমরা অবশ্যই তাদের সম্পুর্ণভাবে ধ্বংশ করবে, যেমন হিটাইট আর অ্যামোরাইট, ক্যানানাইট এবং পেরিজজাইট. হিভাইট এবং জেবুসাইটদের, যেমন তোমাদের প্রভু তোমাদের ঈশ্বর তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন’ ;

যে মানুষগুলো বাইবেল হাতে নিয়ে দাবী করে যে তাদের নৈতিক দৃঢ়তার অনুপ্রেরণা হচ্ছে সেই বই, তাদের কি সামান্যতম ধারনা আছে আসলে কি লেখা আছে সেখানে?’ নিম্নলিখিত অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদন্ড হবার দাবী রাখে, লেভিটিকাস ২০ মোতাবেক: পিতামাতাকে গালি দেয়া,ব্যভিচার করা,সৎমা এবং পুত্রবধুর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া, সমকামীতা, কোন নারী এবং তার কন্যাকে একই সাথে বিবাহ করা, পশুর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া ( এবং এখানে আবার সেই দুর্ভাগা পশুটিকে মেরে ফেলতে হবে); এছাড়াও মৃত্যুদন্ড দেয়া হতে পারে, সাবাথ বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কাজ করলে: এই বিষয়টি বার বার উল্লেখ করা হয়েছে ওল্ড টেষ্টামেন্ট এর জুড়ে; নাম্বার ১৫ তে, ইসরায়েলের শিশুরা জঙ্গলের মধ্যে একটি মানুষকে দেখতে পায় কাঠ কুড়াচ্ছে সেই কাজ করার জন্য নিষিদ্ধ দিনে, তারা তাকে আটক করে, তারপর ঈশ্বরকে জিজ্ঞাসা করে কি করা যেতে তার শাস্তি হিসাবে; স্পষ্টতই ঈশ্বর সেদিন কোন কাজ হালকা ভাবে করার মেজাজে ছিলেন না; এবং প্রভু মোজেসকে বললেন, নিশ্চয়ই মানুষটিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া যেতে পারে; উপস্থিত সবাই তাকে পাথর ছুড়ে আঘাত করবে নির্বিচারে এবং সবাই তাকে খোলা জায়গায় নিয়ে এসে পাথরের ছুড়ে মারতে লাগলো এবং সে মারা যায়; এই নীরিহ কাঠ কুড়ানো মানুষটার কি কোন স্ত্রী বা সন্তান ছিল, যারা তার জন্য শোক করবে? সেকি ভয়ে কুকড়ে উঠেছিল যখন প্রথম পাথরটি সে উড়ে আসতে দেখেছিল বা যন্ত্রনায় চিৎকার করেছিল যখন পাথরগুলো তার গায়ে এসে আঘাত করতে থাকে? আমাকে আজ বিষয়টি হতবাক করে এধরনের গল্পগুলোয় তা কিন্তু ঘটনাটি আদৌ ঘটেছিল কিনা তা নয়, হয়তো তা ঘটেনি, আমাকে যেটা বিস্মিত করে তাহলো আজকের যুগে মানুষ তাদের জীবন ভিত্তি হিসাবে বেছে নিয়েছে এধরনের ভয়ঙ্কর একজন রোল মডেল ইয়াওয়ে কে – এবং আরো জঘন্য, তারা গায়ের জোরে সেই একটি অশুভ বর্বর দৈত্যটাকে ( সত্য হোক বা কাহিনী হোক) আমাদের বাকী সবার উপর চাপিয়ে দিচ্ছে;

যুক্তরাষ্ট্রের টেন কম্যান্ডমেন্ট ট্যাবলেট ধারকদের রাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতার প্রাবল্য আসলেই হতাশাজনক বিশেষ করে যে মহান প্রজাতন্ত্রের সংবিধান লিখেছিলেন প্রগতিশীল জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত মানুষরা সুস্পষ্টভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শে; আমরা যদি টেন কম্যান্ডমেন্টস গুরুত্বের সাথে নিতাম, তাহলে আমরা ভুল ঈশ্বরদের উপাসনা করা এবং তেমন কোন উপসনার জন্য ছবি বা মুর্তি বানানোটাকে সব পাপের মধ্যে প্রথম এবং দ্বিতীয় পাপের পর্যায়ে বিবেচনা করতে হলো; আফগানিস্থানের পর্বতে ১৫০ ফুট উচু বামিয়ানের বুদ্ধমুর্তি ডিনামিইট দিয়ে ধ্বংশ করার তালিবানদের জঘন্য, অকথ্য বর্বরতাকে ধিক্কার জানাবার বদলে আমাদের তাদের সত্যিকারের ন্যায়ের ধর্মপ্রেমকে প্রশংসা করতাম; আমরা তাদের এই ধ্বংশলীলা কে ভাবতাম আন্তরিক ধর্মীয় উদ্দীপনার চিহ্ন হিসাবে;  এ বিষয়টিকে উজ্জ্বলভাবে  সত্যায়িত করেছে একটি সত্যি খুব অদ্ভুত কাহিনী, যা ২০০৫ সালের আগষ্ট মাসে লন্ডনের ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার শীর্ষ সংবাদ ছিল; প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম ‘The destruction of Mecca’ এর নীচে পত্রিকাটি রিপোর্ট করে:

ঐতিহাসিক মক্কা, ইসলাম ধর্মের সুতিকাগার, ধর্মীয় অতিউৎসাহীদের অপ্রত্যাশিত আক্রমনে এই পবিত্র শহরের সমৃদ্ধ ও বহুস্তর বিশিষ্ট ইতিহাসের প্রায় সবটাই বিনষ্ট হয়েছে..; এবং এখন নবী মোহাম্মদের সত্যিকারের জন্মস্থান এখন বুলডোজারের সামনে, সৌদী ধর্মীয় কর্তৃপক্ষদের যোগসংযোগে, যাদের ইসলামের কঠোর রুপী ব্যাখ্যা তাদের বাধ্য করেছে নিজেদের ঐতিহ্যকে মুছে ফেলতে. এই ধ্বংশ লীলার প্রেরণা হচ্ছে ওয়াহাবীবাদীদের উগ্র গোড়া ভয়, এ ধরনের নানা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বপুর্ণ জায়গাগুলো মুর্তিপুজা বা বহুঈশ্বরবাদের জন্ম দিতে পারে, যেখানে বহু এবং সম্ভাব্য সমক্ষমতা সম্পন্ন দেবতাদের পুজা করা হবে; সৌদি আরবে মুর্তিপুজোর শাস্তি এখনও নীতিগতভাবে মস্তিষ্ক কর্তন;

আমি বিশ্বাস করিনা, এমন কোন নীরিশ্বরবাদী আছেন পৃথিবীতে যারা মক্কা বা শাত্রের (Chartres) ক্যাথিড্রাল, ইয়র্ক মিনিষ্টার বা নটর দাম বা শেউই ড্রাগন, কিয়োটোর মন্দির এবং অবশ্যই বামিয়ানের বুদ্ধমুর্তি ধ্বংশ করতে চাইবেন; যেমনটি যুক্তরাষ্টের  নোবেল জয়ী পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিভেন ওয়াইনবার্গ বলেছিলেন, মানুষের সন্মানের উপর ধর্ম হচ্ছে একটি অপমান, এটি সহ বা ছাড়া, আপনি দেখবেন ভালো মানুষরা ভালো কাজই করছে এবং খারাপ মানুষ খারাপ কাজ করছে কিন্তু কোন ভালো মানুষকে দিয়ে যদি খারাপ কাজ করাতে চান তাহলে আপনার প্রয়োজন ধর্ম; ব্লেইস পাসকাল ( যিনি বিখ্যাত বাজী রেখেছিলেন) একই রকম মন্তব্য করেছিলেন, মানুষ কখনোই কোন চুড়ান্তভাবে কোন খারাপ কাজ আনন্দের সাথে করেনা শুধুমাত্র যখন তারা কাজটি করে ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে;

এখানে আমার মুল উদ্দেশ্য হচ্ছে  সেটা দেখানো না যে ধর্মগ্রন্থ থেকে আমাদের নৈতিকতা শিক্ষা নেয়া উচিৎ না (যদিও সেটা আমার মতামত); আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে দেখানো যে আমরা (এবং এর মধ্যে বেশীর ভাগ ধর্মীয় মানুষরাও আছেন), সত্যিকারভাবে আমাদের নৈতিকতা কিন্তু ধর্মগ্রন্থ থেকে পাইনা; আমরা যদি তাই করতাম, আহলে কঠোরভাবে সাবাথ মানতাম এবং ভাবতাম যারা সাবাথের নিয়ম ভাঙ্গছে তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দন্ডিত করাই সঠিক এবং ন্যায়সঙ্গত; আমরা যে কোন নবপরিনীতাকে পাথর ছুড়ে হত্যা করতাম যে তার কুমারীত্ব প্রমান করতে ব্যর্থ হয়, যদি তার স্বামী নিজে ঘোষনা দেয় সে সন্তুষ্ট হয়নি, বা আমরা অবাধ্য সন্তানদের হত্যা করতাম.. এবং আমরা হয়তো ………… কিন্তু একটু অপেক্ষা করুন, হয়তো আমি নিরপেক্ষ আচরণ করছি না; ভালো খৃষ্টান রা এই পুরো অনুচ্ছেদ জুড়ে প্রতিবাদ করবেন হয়তো : সবাই জানে ওল্ড টেষ্টামেন্ট স্পষ্টতই বেশ অপ্রীতিকর; জীসাসের নিউ টেষ্টামেন্টতো এর ক্ষতিকর দিকগুলো খানিকটা সামাল দিয়েছে, এটিকে গ্রহনযোগ্য করেছে, তাই না?

 

_____________________________________ চলবে

((((ব্যাপারটা স্পষ্ট নয় সেই কাহিনীটা, যার উৎস http://datelinehollywood.com/archives/2005/09/05/robertson-blames-hurricane-on-choice-of-ellen-deneres-to-hostemmys/, আসলেই সত্য কিনা, তবে সত্য বা মিথ্যা যাই হোক, ব্যপকভাবে এটি বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে, সন্দেহ নেই কারন এটি ইভানজেলিকাল ধর্মযাজকদের স্বভাবজাত বক্তব্যর মত, যাদের মধ্যে রবার্টসনও আছেন, যারা নানা দুর্যোগ যেমন কাটরিনা সম্বন্ধে এ ধরনের সাধারণত মন্তব্য করেন; উদহারন হিসাবে দেখুন: http://www.emediawire.com/releases/ 2005/9/emw281940.htm, যে ওয়েবসাইটটি বলছে কাটরিনা সংক্রান্ত এই গল্পটি মিথ্যা সেখানে রবার্টসনের আরো একটি উদ্ধৃতি আছে, একটি ওরলান্ডো, ফ্লোরিডায় একটি পুরোনো গে প্রাইড মার্চ সংক্রান্ত : আমি হুশিয়ার করে দিতে চাই ওরল্যান্ডোকে, যে আপনারা সরাসরি কোন একটি ভংঙ্কর হারিকেন এর আক্রান্ত হবার পথে আছেন, আমি মনে করিনা যদি আমি আপনাদের জায়গায় থাকতাম ঈশ্বরের মুখের সামনে ঐ সব ফ্লাগ দেখাতাম)))

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : সপ্তম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s