জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : তৃতীয় অধ্যায়( শেষ পর্ব)

ছবি: রেটিনা: আমাদের চোখের পেছনে স্নায়ুকোষ, ফটোরিসেপ্টর ও নানা সহযোগী কোষের একটি স্তর। এটি আলোক সংকেতকে স্নায়ুসংকেতে রুপান্তরিত করে অপটিক নার্ভের মাধ্যমে আমাদের ব্রেনে ভিজুয়াল ইনফরমেশন প্রেরণ করে, যা আমাদের দেখার অনুভুতি সৃষ্টি করে।  রঙ্গীন কোন দৃশ্য দেখাটা নির্ভর করে কোন ( CONE) নামের একধরনের ফটোরিসেপ্টরের উপরে, যারা কোনের মতোই দেখতে এবং আলোক সংবেদী বিশেষ পিগমেন্ট বহন করে, যা আলোর সংস্পর্শে আসলে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্য যে ফটোরিসেপ্টরগুলো আমাদের কম আলোয় (যেমন রাতে) দেখতে সাহায্য করে তাদের নাম রড (ROD); এই রড এবং কোন কোষগুলো রেটিনার একদম পেছনের স্তরে, অন্য অনেক সহযোগী কোষের পিছনে অবস্থান করে যারা সবাই আমাদের দৃষ্টি ক্ষমতার জন্য দায়ী। (ছবিসুত্র ANDREW SWIFT (retina illustrations); Scientific American); মেরুদন্ডী প্রানীদের চোখের মধ্যে বিবর্তন যত অসাধারন সুক্ষতম বৈশিষ্টই যোগ করুক না কেন, এর বেশ কিছু বড় মাপের ডিজাইন সমস্যাও আছে; যেমন আমাদের চোখের রেটিনাটা আসলে উল্টোভাবে সাজানো, অর্থাৎ ভেতরের দিকটা বাইরে আর বাইরের দিকটা ভেতরে। সুতরাং আলোকে রেটিনার আলোক সংবেদী পিগমেন্টের কাছে পৌছাতে রেটিনার পুরো প্রস্থটা পাড়ি দিতে হয়, যে পথে আছে স্নায়ুকোষের অসংখ্য প্রসেস দিয়ে তৈরী জালিকা, মধ্যবর্তী বাইপোলার কোষের স্তর, এছাড়া কোষ দেহ; যারা আলোকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের পথে প্রতবিন্ধকতা তৈরী করে এবং ফলে ইমেজ বা ছবির গুনগত মানও কমে যায়। অসংখ্য রক্তনালীকাও থাকে রেটিনার ভেতরের স্তরে, যারা অনাকাঙ্খিত ছায়া ফেলে রেটিনার ফটোরিসেপ্টর স্তরের উপর। এছাড়ার রেটিনার একটা ব্লাইন্ড স্পটও আছে (যেখানে কোন ফটোরিসেপ্টর কোষ থাকেনা), রেটিনার উপরের স্তর দিয়ে  সাজানো বিস্তৃত নার্ভ ফাইবারগুলো এই ব্লাইন্ড স্পটে এসে একসাথে জড়ো হয়ে রেটিনার ভিতর দিয়ে একটি সুড়ঙ্গর মত পথ করে রেটিনা পেছন দিয়ে অপটিক নার্ভ হয়ে বের হয়ে যায়; এই ধরনের  ডিজাইন সমস্যার তালিকা আরো দীর্ঘ।

3_final
ছবি: বিবর্তনের চিহ্ন : মেরুদন্ডী প্রানীদের চোখ ভালো করলেই লক্ষ্য করা যায়, এটি আদৌ কোন ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের নমুনা নয়, বরং এর মধ্যে অসংখ্য ক্রটি আছে, যা এর বিবর্তনের স্বাক্ষ্য বহন করে। এর কিছু ক্রটি আমাদের চোখের ইমেজ বা ছবি তৈরীর গুনগত মান কমিয়ে দেয়, যেমন তাদের মধ্যে আছে উল্টো করে সাজানো রেটিনা ( যার ভিতরের দিকটি বাইরে এবং  বাইরের দিকটি ভিতরে), এ কারনে আলো কে একেবারে পেছনের স্তরে অবস্থিত ফটোরিসেপ্টরে পৌছাতে নানা ধরনের কোষ দেহ আর স্নায়ু ফাইবারের জালিকার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়(১); রেটিনার উপর রক্তনালীকারা রেটিনার উপর অনাকাঙ্খিত ছায়া ফেলে (৩);  সব স্নায়ু ফাইবারগুলো রেটিনা উপর দিয়ে এসে একজায়গায় জড়ো হয়ে রেটিনার মধ্য দিয়ে একটা ছিদ্র দিয়ে ঢুকে রেটিনার পিছনে অপটিক নার্ভ হিসাবে বের হয়ে যায়, এভাবে রেটিনার মধ্যে এটি একটি ব্লাইন্ড স্পট তৈরী করে (২); সুত্র:  Illustration by Don Foley / ‍Scientific American)

কিংবা এই লেখাটিও দেখতে পারেন : আমাদের প্রাচীন শরীর বা চোখের বিবর্তন

জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : তৃতীয় অধ্যায় (শেষ পর্ব)
(অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
Why Evolution Is True: Jerry A. Coyne

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায় : প্রথম পর্ব ;  দ্বিতীয় পর্ব ; তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্বশেষ পর্ব
তৃতীয় অধ্যায়: প্রথম পর্ব , দ্বিতীয় পর্ব , তৃতীয় পর্ব

অবশিষ্টাংশ: ভেস্টিজ, ভ্রূণ এবং খারাপ ডিজাইন

If a designer did  have discernible motives when creating species, one of them must surely have been to fool biologists by making organisms look as though they evolved. Jerry Coyne

খারাপ ডিজাইন

নানা কারনে ভুলে যাবার মত সিনেমা Man of the Year  এ কমেডিয়ান রবিন উইলিয়ামস অভিনয় করেছিলেন একজন টেলিভিশন টক শো উপস্থাপকের ভুমিকায়, যিনি অদ্ভুত সব ঘটনার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তার নির্বাচন পুর্ববর্তী বিতর্কে, উইলিয়ামস এই চরিত্রটির কাছে জানতে চাওয়া হয় ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন সম্বন্ধে তার মতামত কি; তার উত্তর ছিল, ”সবাই বলছে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন – আমাদের ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন নাকি অবশ্যই শেখাতে হবে- মানুষের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখুন, এটা টি কোন ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন হতে পারে?  আপনার বর্জ পদার্থ নিষ্কাষন করার প্ল্যান্ট আছে ঠিক আপনার বিনোদন কেন্দ্রর পাশে!”

এটা কিন্তু একটি ভালো যুক্তি, যদিও জীবদের তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেবার মত করে ভালোভাবে ডিজাইন করা হয়েছে বলেই মনে হয়, কিন্তু পারফেক্ট বা নিখুততম পুরোপুরি ক্রটিমুক্ত ডিজাইনের ধারনাটি আসলে একটি বিভ্রম মাত্র।প্রতিটি প্রজাতি ত্রুটিপুর্ণ নানা উপায়ে, কিউইদের অপ্রয়োজনীয় ডানা আছে, তিমি মাছের ভেস্টিজিয়াল কাজে লাগে না এমন পেলভিস আছে, আমাদের অ্যাপেনডিক্সও দুষ্ট একটি অঙ্গ।

আমি “ব্যাড ডিজাইন” বলতে যা বোঝাচ্ছি তা হলো সেই ধারনাটি, কোন একজন ডিজাইনার বা সৃষ্টিকর্তা যদি জীবদের সৃষ্টি করতেন একেবারে শুরু থেকে – যিনি স্নায়ু, মাংশপেশী, অস্থি র জৈববৈজ্ঞানিক বিল্ডিং ব্লক ব্যবহার করেছেন  – তাহলে তো তাদের কোন ক্রটি থাকার কথা না।নিখুত কোন ডিজাইন সত্যিই কোন দক্ষ এবং বুদ্ধিমান ডিজাইনারের চিহ্ন।আর নিখুত নয় ক্রটিপুর্ণ এমন ডিজাইনই বিবর্তন প্রক্রিয়ার চিহ্ন।আসলে ঠিক সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি বিবর্তনের কাছে। আমরা জেনেছি যে বিবর্তন একেবারে শুন্য বা গোড়া থেকে  শুরু করে না, পুরানো অংশ থেকেই বিবর্তিত হয় নতুন অংশ, এবং তাদের অন্যান্য অংশের সাথে ঠিক মত তার কাজটি করতে হয় সেই সব অংশগুলোর সাথে, যারা ইতিমধ্যেই বিবর্তিত হয়েছে।একারনেই বিবর্তনে আমাদের নানা ধরনের সমঝোতা প্রত্যাশা করাই উচিৎ: কিছু বৈশিষ্ট যা কাজ করে মোটামুটি, কিন্তু ততটা ভালো না যতটা করা উচিৎ বা কিছু বৈশিষ্ট যেমন কিউইদের ডানা কোন কাজই যা করে না কিন্তু তারা বিবর্তনের ফেলে যাওয়া চিহ্ন।

ছবি: ফ্লাউন্ডার বা ফ্ল্যাট ফিশ


ছবি: flounder, a typical flatfish

খারাপ ডিজাইনের একটি ভালো উদহারণ হলো ফ্লাউন্ডার (Flounder), খাবার উপযোগী মাছ হিসাবে যার জনপ্রিয়তা ( যেমন ডোভার সোল, Dover sole), মুলত এসেছে এদের চ্যাপ্টা শরীরের জন্য, সহজে কাটা ছাড়ানোর জন্য যে বৈশিষ্ট বেশ উপযোগী; আসলে প্রায় ৫০০ প্রজাতির ফ্ল্যাট ফিস আছে – হ্যালিবাট, টারবট, ফ্লাউন্ডার এবং তাদের আত্মীয়রা – সবাইকে শ্রেনীভুক্ত করা হয়েছে Pleuronectiformes বর্গের অধীনে; শব্দটির অর্থ এক পাশে কাত হয়ে যারা সাতার কাটে। এই বিবরণটি তাদের তাদের খারাপ ডিজাইনটি বোঝার জন্য গুরুত্বপুর্ণ।ফ্ল্যাট ফিসদের জন্ম হয় সাধারন দেখতে আর অন্য সব মাছদের মত, যারা খাড়া হয়ে বা ভার্টিকালী সাতার কাটে, যাদের প্যানকেক বা রুটির মত চ্যাপ্টা এর মত দেখতে শরীরের দুপাশে দুটি চোখ থাকে। কিন্তু এর একমাস পর, এটা অদ্ভুত বিষয় ঘটে: এদের একটা চোখ উপরের দিকে সরতে থাকে, এটি মাথার খুলির উপর দিয়ে মাইগ্রেট করে অন্য পাশের চোখটির পাশাপাশি এবং শরীরের একপাশে একজোড়া চোখ হিসাবে অবস্থান করে;  শরীরের ডানে কিংবা বায়ে, প্রজাতির উপর নির্ভর করে সে ব্যাপারটা।   সাথে সাথে মাথার খুলিও তার আকারে পরিবর্তিত হয় চোখের এই অবস্থান পরিবর্তনকে সহায়তা করতে, সেই সাথে এর ফিনগুলো এবং রঙ এর কিছু পরিবর্তন হয়। সব মিলিয়ে ফ্লাট ফিস এরপর তার নতুন সৃষ্ট চোখহীন শরীরের দিকে কাত হয়ে যায়, যাতে দুটি চোখই শরীরের উপরের দিকে অবস্থান নেয়। এবং এটি পরিণত হয় ক্যামোফ্লেজ নেয়া, ছদ্মবেশী সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী মাছ, যা অন্য মাছদের শিকার করে।যখন তাদের সাতার কাটতে হয়, তারা এক পাশ ফিরে সাতার কাটে। ফ্ল্যাট ফিস পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রতিসম মেরুদন্ডী প্রানী। এর পর মাছের বাজারে গেলে একটা নমুনা লক্ষ্য করে দেখতে পারেন;

আপনি যদি কোন ফ্ল্যাট ফিশ ডিজাইন করতেন তাহলে এভাবে সেটা করতেন না। আপনি স্কেট এর মত চ্যাপটা  একটা মাছ বানাতেন, যারা জন্ম থেকেই চ্যাপটা স্কেট এর মত এবং যা তার পেটের উপর শোয়, এমন কোন কিছু না যার এই চ্যাপ্টাত্ব অর্জন করার জন্য এর পাশে কাৎ হয়ে শুতে হয় , মাথার খুলির আকার পাল্টিয়ে, চোখকে নড়িয়ে চড়িয়েও না। ফ্ল্যাট ফিসরা খুবই খারাপ ভাবে ডিজাইন করা। কিন্তু এই খারাপ ডিজাইন এসেছে বিবর্তনের বংশ পরম্পরায়;  আমরা ফ্ল্যাউন্ডারদের পারিবারিক বৃক্ষ থেকে জানি, অন্য সব ফ্ল্যাট ফিশের মত তারা সাধারন প্রতিসম ডিজাইনের মাছ থেকেই বিবর্তিত হয়েছে, স্পষ্টতই, তারা একপাশে কাৎ হয়ে সমুদ্রের তলদেশে শুয়ে থাকতে  সুবিধাজনক মনে করে, শিকারী প্রানী ও শিকার উভয়ে কাছ থেকে লুকিয়ে থাকা যায় সেভাবে। এবং সেটা অবশ্যই একটা সমস্যার সৃষ্টি করে: কারন এভাবে নিচের চোখটা কোন কাজেই লাগবে না এবং সহজে আঘাত প্রাপ্ত হবে, এটি সমাধানের জন্য চোখটাকে সরিয়ে নিতে প্রাকৃতিক নির্বাচনকে বাকা কিন্তু হাতে কাছে পাওয়া যাওয়া এমন পথই বেছে নিতে হয়েছে, এবং একই সাথে শরীরের অঙ্গ আরো বিকৃত করার মাধ্যমে।

প্রকৃতির অন্যতম খারাপ ডিজাইনের একটি হচ্ছে স্তন্যপায়ী প্রানীদের রিকারেন্ট ল্যারিনজিয়াল নার্ভটি। যা ব্রেন থেকে আমাদের স্বরযন্ত্র বা ল্যারিঙ্কস কে সংযোগ করে।এই নার্ভ বা স্নায়ু আমাদের কথা বলতে এবং খাদ্য গিলতে সাহায্য করে। অদ্ভুত ব্যাপারটি হচ্ছে এটি যতটুকু প্রয়োজন তারচেয়ে অনেক বড়, ব্রেইন থেকে স্বরযন্ত্র বরাবর এটি সরাসরি সোজা পথ না নিয়ে, মানুষের ক্ষেত্রে  যা কিনা প্রায় ১ ফুট, নার্ভটি ব্রেইন থেকে প্রথমে আমাদের বুকের মধ্যে নেমে আসে, মহাধমনী বা অ্যাওর্টা এবং  এর থেকে আসা লিগামেন্ট এর নীচে একটা প্যাচ খেয়ে আবার উপরে দিকে উঠে যায়, যেদিকে দিয়ে এটি নীচে নেমেছিল ( রিকার বা recur), স্বরযন্ত্র বা ল্যারিঙ্কস কে সংযোগ করতে,  এবং এভাবে ঘুরপথে এটি দৈর্ঘ দাড়ায় প্রায় ৩ ফুট; জীরাফের ক্ষেত্রেও নার্ভটি একই ধরনের পথ নেয়, কিন্তু  সেই একই প্রথমে এটি একেবারে নীচে নেমে আসে এবং তারপর আবার উপরে উঠে আসে লম্বা ঘাড় বেয়ে, যা সরাসরি পথের চেয়ে প্রায় ১৫ ফুট লম্বা বেশী ! আমি যখন প্রথম এই অদ্ভুত নার্ভটির কথা শুনি, আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছিল, নিজের চোখে দেখার জন্য ইচ্ছা হয়েছিল, অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে অ্যানাটমি ল্যাবে যাই এবং আমার প্রথম লাশটি পরীক্ষা করে দেখি।একজন সদয় প্রফেসর একটি পেন্সিল দিয়ে আমাকে নার্ভটির পুরো পথ দেখিয়েছিলেন যা আমাদের বুকের মধ্যে নেমে যা আবার গলা পর্যন্ত উঠে যায়।

good-recurrent-laryngeal-nerve

ছবি: আমাদের রিকারেন্ট ল্যারিনজিয়াল নার্ভ ( বাম দিকের)

picture-13
ছবি: রিকারেন্ট ল্যারিনজীয়াল নার্ভ এর এই ঘুর পথ ( মানুষ, জিরাফ… এবং ডায়নোসরদের)

রিকারেন্ট ল্যারিনজীয়াল নার্ভ এর এই ঘুর পথ শুধু মাত্র বাজে ডিজাইনই না, এমনকি সঠিক অভিযোজনীয় না হবার সম্ভাবনা আছে।এই বাড়তি দীর্ঘ পথ তাদের সহজে ক্ষতিগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।যেমন বুকের মধ্যে কোন জোর ধাক্কায় এটি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে, যা কোন কিছু গিলতে বা কথা বলার কাজটা আমাদের জন্য কঠিন করে তুলতে পারে; কিন্তু এই আকাবাকা পথ এর রহস্য স্পষ্ট হয় যখন আমরা বুঝতে পারি কিভাবে এই নার্ভটি বিবর্তিত হয়েছে। স্তন্যপায়ী মহাধমনীর মতই এটি আমাদের মাছ সদৃশ্য পুর্বসুরীদের মত ব্র্যাঙ্কিয়াল আর্চ থেকে নীচে নেমে আসে; সব মেরুদন্ডী প্রানীদের প্রাথমিক পর্যায়ের মাছ সদৃশ ভ্রুণে এই নার্ভটি  ৬নং ব্র্যাঙ্কিয়াল আর্চ এর রক্তনালীর পাশাপাশি উপর থেকে নীচে নেমে আসে।এটি অপেক্ষাকৃত বড় লার্জার ভ্যাগাস নার্ভের একটি শাখা, যা ব্রেইন থেকে পেছনের দিক দিয়ে নীচে নেমে আসে এবং পুর্ণবয়স্ক মাছের শরীরে এটি সেই একই অবস্থানেই থাকে, যা ব্রেইনকে ফুলকার সাথে যুক্ত করে পানি পাম্প করে বের করে দেবার জন্য সহায়তা করে।

আমাদের বিবর্তনের সময়, ৫ম ব্রাঙ্কিয়াল আর্চ এর রক্ত নালী অপসৃত হয়ে যায়, ৪র্থ এবং ৬ষ্ঠ আর্চ থেকে রক্তনালীগুলো নীচে নেমে আসে ভবিষ্যতের শরীরের উপরের অংশ, বুকে, যেখানে তারা মহাধমনী বা অ্যাওর্টা এবং একটি লিগামেন্ট এর পরিনত হয়,  যে লিগামেন্টটি অ্যাওর্টা আর পালমোনারী আর্টারীকে সংযুক্ত রাখে। কিন্তু ল্যারিনজিয়াল নার্ভ কিন্তু তখনো ৬ নং আর্চের পেছনে, সেই ভ্রুণতাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে সংযুক্তাবস্থায় থাকতে হয়, যা পরবর্তীতে স্বরযন্ত্র তৈরী করে এবং সেই সব কাঠামোর সাথে যাদের অবস্থান ব্রেনের কাছাকাছি।যখন ভবিষ্যৎ মহাধমনী পেছন দিকে বিবর্তিত হয় হৃৎপিন্ডর দিকে, ল্যারিনজীয়াল নার্ভও বাধ্য হয় এর সাথে সাথে পেছনের দিকে সরে যেতে, অনেক বেশী উপযোগী হতো যদি এটি মহাধমনীকে পাশ কাটিয়ে যেত, প্রথমে ভেঙ্গে এর পর আবার যুক্ত হয়ে আরো সরাসরি একটি পথ বেছে নিতে, কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন  সেটা করতে পারেনি, কোন নার্ভকে কেটে আবার পরে সুবিধামত জোড়া লাগিয়ে দেবার ধাপটি আসলে ফিটনেস কমিয়ে দেয়।

পেছন দিক বরাবর অ্যাওর্টার বিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে ল্যারিনজিয়াল নার্ভ অনেক লম্বা এবং রিকারেন্ট বা যে দিক থেকে এটি নীচে নামে আবার সেই পথে এটি ঘুরে উপরে উঠে যায় তার গন্তব্যে। এবং সেই বিবর্তনীয় ধাপটির পুণরাবৃত্তি হয় ভ্রুণতাত্ত্বিক বিকাশের সময়, কারন ভ্রুণ হিসাবে আমরা পুর্বসুরী মাছের মত প্যাটার্ণ এর নার্ভ এবং রক্তনালী নিয়ে যাত্রা শুরু করি; এবং ফলাফল আমাদের শরীরের বহন করি খারাপ ডিজাইন।

16-12-2012 10-43-34 PM
ছবি: মানুষের বাম রিকারেন্ট ল্যারিনজিয়াল নার্ভের ঘুর পথ মাছ পুর্বসুরী থেকে তাদের বিবর্তনের চিহ্ন। মাছের ক্ষেত্রে ৬ষ্ঠ ব্র্যাঙ্কিয়াল আর্চ  যা পরবর্তীতে একটি ফুলকা তৈরী করে, যাকে রক্ত সরবরাহ করে ৬ ষষ্ঠ অ্যাওর্টিক আর্চ; ভ্যাগাস নার্ভের ৪র্থ শাখাটি এই আর্চের পেছনে থাকে। এই কাঠামোগুলো পুর্ণবয়স্ক মাছের ফুলকার বা গিল অ্যাপারাটাস এর অংশ হয়, এখানে স্নায়ু সংযোগ এবং রক্ত সরবরাহ করে এরা; কিন্তু স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এই ব্র্যাঙ্কিয়াল আর্চ এর কিছু অংশ বিবর্তিত হয় স্বরযন্ত্র বা ল্যারিঙ্কস এ, ল্যারিঙ্কস এবং এর নার্ভ এই প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত থাকে, কিন্তু শরীরের বা দিকের ৬ষ্ঠ আওর্টিক আর্চ বুকের মধ্যে নেমে আসে এবং রুপান্তরিত হয় অকার্যকর অবশিষ্ঠাংশে ligamentum arteriosum  এ;  যেহেতু আর্চের পেছনে নার্ভটি থাকে এবং সেটি তখনও গলার একটি অঙ্গের সাথে তখনও যুক্ত থাকে, এটিকে বাধ্য করা হয়েছে এমন একটি পথ বেছে নিতে, যেখানে এটি বুকের মধ্যে নেমে আসে, তারপর অ্যাওর্টা আর ৬ ষষ্ঠ ব্র্যাঙ্কিয়াল আর্চের অবশিষ্টাংশর নীচে একটি লুপ তৈরী করে তারপর আবার পুরোনো পথে ফিরে যায় উপরে গলায় ল্যারিঙ্কস এর কাছে। নার্ভটির এই পরোক্ষ ঘুর পথটি কোন ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনকে প্রতিফলিত করেনা, এবং এটা বোঝা সম্ভব হতে পারে শুধুমাত্র খুবই ভিন্ন শারীরিক কাঠামোযুক্ত পুর্বসুরীদের বিবর্তনের ফসল হিসাবে।

ছবি: হেচকির কথা ধরুন, সাধারনতঃ বিরক্ত উৎপাদনকারী হেচকি, যা কয়েক সেকেন্ড বা বড়জোর মিনিট ব্যাপী স্থায়ী থাকে, বা কখনও সমস্যার কারণ হতে পারে মাসব্যাপী স্থায়ী হয়ে , কদাচিৎ স্থায়ী হতে পারে এক বছর। গলা আর বুকের পেশী সংকোচনের কারনেই মুলতঃ হেচকি উৎপত্তি হয়। এর বৈশিষ্ট্যসুচক ‘‘‘হিক’ শব্দটি হয় যখন আমরা খুব দ্রুত নিঃশ্বাস নেই এবং আমাদের গলার পেছনে একটি মাংসের পর্দার মত অঙ্গ, এপিগ্লটিস’টা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সমস্ত ব্যাপারটি ঘটে এক ধরনের রিফ্লেক্স এর কারনে, যার উপর আমাদের সচেতন মনের কোন নিয়ন্ত্রন নেই। অনেক কারনেই ব্যাপারটা হতে পারে, যেমন, অতি দ্রুত খেতে থাকলে অথবা অতিরিক্ত বেশী খেয়ে ফেললে, কখনও আরো কঠিন অসুস্থ্যতা যেমন, বুকের কোন টিউমর হলেও ব্যাপারটা হতে পারে। হেচকি আমাদের বিবর্তনের দুটি স্তরের ইতিহাসের স্বাক্ষী, একটি মাছের সাথে আমাদের সম্পৃক্ততা, অপরটি উভচর প্রানীদের সাথে। আমাদের প্রধান স্নায়ুগুলো যা আমরা শ্বাস প্রশ্বাসের ক্ষেত্রে প্রধানতঃ ব্যবহার করি, তার প্রত্যেকটি আমরা পেয়েছি মাছ থেকে। এক জোড়া স্নায়ু যার নাম ফ্রেনিক (Phrenic) নার্ভ, আমাদের মস্তিষ্কের মগজের তলদেশ থেকে যা নেমে এসে আমাদের বুকের খাচা আর পেটে মাঝখানে ডায়াফ্রাম বা মধ্যচ্ছদা পর্দা পযন্ত্য বিস্তৃত (ছবি),এই আকা বাকা পথের জন্য সমস্যাও কিছু আছে। এই লম্বা পথে যে কোন জায়গায় যদি কোন ধরনের সমস্য হয়, তা আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস প্রক্রিয়াকে ব্যহত করে। এই স্নায়ুর যে কোন অংশের কোন ধরনের সমস্যাও হেচকির কারণ হতে পারে। যুক্তিসঙ্গত ভাবে পরিকল্পিত হলে অবশ্যই এই নার্ভটি মস্তিষ্ক থেকে না নেমে সরাসরি ডায়াফ্রামের কাছে স্নায়ু রজ্জু থেকে উৎপত্তি হতে পারতো। কিন্ত যেহেতু আমরা দুর অতীতে বিবর্তিত হয়েছি, আর এই ধরনের নকশা উত্তরাধিকার সুত্রে আমরা পেয়েছি আমাদের মৎস পুর্বসুরী থেকে, যাদের শ্বাসযন্ত্র ফুলকার অবস্হান ছিল মাথার কাছে ঘাড়ে, অনেক নীচে থাকা ডায়াফ্রাম বিশিষ্ট কোন প্রাণীর কাছ থেকে না।


ছবি: পুরুষদের শুক্রনালী বা স্পার্মাটিক কর্ডের (উপরের প্রথম ছবি ) কথা ধরা যাক। এই নালীটা ‍অন্ডকোষের থলিতে থাকা অন্ডকোষ এবং পুংলিঙ্গের মুত্রনালীর সাথে সংযোগ সৃষ্টি করে এবং অন্ডকোষ থেকে শুক্রানুদের ‍শরীরের বাইরে বের হবার একটা পথ তৈরী করে। অন্ডকোষের থলি বা স্ক্রোটাম কিন্তু পুংলিঙ্গের নীচেই থাকে, স্বভাবতই আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে,ডিজাইনটা নিঃসন্দেহে ভালো হতো যদি এতোটা ঘুরে না গিয়ে সরাসরি এই দুইটি অঙ্গের মধ্যে সংক্ষিপ্ত একটা সংযোগ স্থাপন করতো নালীটা। কিন্ত ব্যাপারটা সেরকম হয়নি, শুক্রনালী অন্ডকোষ থেকে প্রথমে উপরে উঠে আমাদের কোমরের পিউবিক অস্থির মধ্যে একটা প্যাচ খেয়ে কোমরের অস্থিসন্ধির নীচের ফাঁকা জায়গা দিয়ে অবশেষে পুংলিঙ্গের মুত্রনালীর সাথে যোগ হয় (ছবি ১ দেখুন),এই ঘোরানো পথ-যা বেছে নেবার পেছনে ইতিহাস আছে -মেডিকেল শিক্ষার্থীদের শেখার জন্য বিরক্তিকরতো বটেই, এছাড়া যারা এই কারনে ‍বিশেষ ধরনের হার্নিয়ার শিকার হন তাদের জন্যও বিশেষ যন্ত্রনাদায়ক। শুক্রনালীর এই বাকা পথ বেছে নেবার ইতিহাস মানব যৌনগ্রন্থির বৃদ্ধি আর ক্রমবিকাশের সাথে সম্পৃক্ত; শুক্রনালীর এই বাকা পথ বেছে নেবার ইতিহাস পুরুষদের যৌনগ্রন্থির বৃদ্ধি আর ক্রমবিকাশের সাথে সম্পৃক্ত। হাঙ্গর,মাছ এবং অন্যান্য অস্থিবিশিষ্ট প্রানীদের মতই মানুষেরও যৌনগ্রন্থির বৃদ্ধি আর ক্রমবিকাশ ঘটে। গোনাড বা যৌনগ্রন্থি :পুরুষদের অণ্ডকোষ এবং মহিলাদের ডিম্বাশয়,উভয় ক্ষেত্রেই ভ্রুণাবস্থায় তাদের অবস্থান থাকে শরীরের উপরের অংশে, যকৃত বা লিভারের কাছাকাছি, কারণ যে সকল কোষ সমুহের পারস্পরিক অবস্থান এবং সহযোগিতা থেকে এসব গ্রন্থির সৃষ্টি হয়, তাদের অবস্থান সম্ভবত এখানে বলে ধারনা করা হয়। পুর্নবয়স্ক হাঙ্গর বা মাছের যৌনগ্রন্থি সাধারনত: শরীরের উপরিভাগে যকৃতের কাছাকাছি থাকে এবং তারা তাদের এই আদি অবস্থানেই থাকে কারণ তাদের শুক্রাণু শরীরের অভ্যন্তরেই ক্রমবিকাশ এবং পূর্ণতা লাভ করতে পারে। আমাদের মত স্তন্যপায়ী প্রানীদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। পুরুষ ভ্রুন যখন বেড়ে উঠতে থাকে, তাদের যৌনগ্রন্থিও ধীরে ধীরে নীচে নামতে থাকে, স্ত্রী ভ্রুনদের ক্ষেত্রে এই নেমে আসাটা শরীরের ভিতরে নীচে অবস্থিত জরায়ু এবং ফেলোপিয়ান টিউবের কাছে এসে থেমে যায়, যা নিশ্চিৎ করে ডিম্বানুকে যেন জরায়ু গহবরে নিষিক্ত হবার জন্য বেশী দুরত্ব অতিক্রম না করতে হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে আরো নীচের দিকে নেমে আসে অন্ডকোষ, একেবারে স্ক্রোটাম বা অন্ডকোষের থলিতে, যা দেহের সামনে ঝুলে থাকে। কার্য্যক্ষম শুক্রানু তৈরী করার জন্য এই নেমে আসার বিষয়টা অত্যন্ত্য গুরুত্বপুর্ণ। এর একটা সম্ভাব্য কারণ হিসাবে মনে করা হয় যে, স্তন্যপায়ীরা উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট এবং শুক্রানুর সংখ্যা ও এর গুনগত মান দুটোই নির্ভর করে আমাদের মুল শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা অপেক্ষা কম কোন তাপমাত্রা বিশিষ্ট কোন স্থানে ক্রমবিকশিত হওয়ার উপর। সেকারনেই স্তন্যপায়ীদের অন্ডকোষ, শরীরের ভিতরের উষ্ণতা থেকে অপেক্ষাকৃত কম উষ্ণ শরীরের বাইরের অন্ডকোষের থলিতে অবস্থান করে, এই থলিটি তাপমাত্রা বাড়া কমার সাথে ওঠানামা (থলির গায়ের পেশীর সংকোচন এবং প্রসারনের মাধ্যমে) করে শুক্রানুর সুষ্ঠু বৃদ্ধিকে ‍নিশ্চিৎ করে;

বিবর্তনের কল্যানে, মানুষের প্রজনন তন্ত্রও বহু জোড়াতালির কাজ চালানোর উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে এমন উদহারনে পুর্ণ।আমরা ইতিমধ্যেই পুরুষদের গোনাড বা অন্ডকোষের নীচে নেমে আসার কথা জানি, মাছের জননেন্দ্রিয় থেকে তাদের বিবর্তনের ফসল, যা আমাদের পেটের দেয়ালে দুর্বল একটি জায়গার সৃষ্টি করে, যেখানে ছিদ্র দিয়ে অন্ত্রনালী বের হয়ে আসতে পারে, যা হার্ণিয়া বলে আমরা চিনি এমন রোগের কারন হতে পারে। পুরুষদের বাড়দি আরো একটি সমস্যা হলো মুত্রনালীর খারাপ ডিজাইন, যা ঠিক প্রোস্টেট গ্রন্থির একেবারে মধ্যে দিয়ে যায়, যেখানে আমাদের বীর্য বা সেমিনাল ফ্লুইডের প্রয়োজনীয় কিছু অংশ তৈরী হয়, কমেডিয়ান রবিন  উইলিয়ামের কথা ধরে বললে, বিনোদনের জায়গার মধ্যে দিয়ে সরাসরি পয়ো:নিষ্কাশনের নল স্থাপনা করা হয়েছে; পুরুষদের বেশ বড় একটি অংশ জীবনের শেষের দিকে এসে প্রষ্টেট গ্রন্থির আকার বড় হবার রোগে আক্রান্ত হতে পারেন ( কিংবা ক্যান্সার); যা এর মধ্য দিয়ে যাওয়া মুত্রনালীকে চেপে ধরে, প্রশ্রাব করা তখন কষ্টকর ও যন্ত্রনাদায়ক একটি কাজে পরিণত হয়। (সম্ভবত এই  সমস্যটা মানব বিবর্তনে বেশীর ভাগ সময় জুড়েই ছিল না, কারন খুব কম পুরুষই সেই সময় তখন ত্রিশের বেশী বেচে থাকার সুযোগ পেত); কোন বুদ্ধিমান পরিকল্পনাকারীর পক্ষে সম্ভব না একটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন কোন কলাপসিবল নল এধরনের কোন অঙ্গর মধ্যে স্থাপন করবেন,যখন সেই অঙ্গটি সংক্রমন এবং আকারে স্ফীত হবার প্রবণতা থাকে।এই ঘটনাটা ঘটে কারন স্তন্যপায়ীদের প্রোস্টেট গ্রন্থি বিবর্তিত হয় মুত্রথলীর দেয়ালে টিস্যু থেকে।

মানব মহিলাদের অবস্থাও খুব একটা ভালো না, তাদের পেলভিস বা শ্রোনীচক্রের এর ভিতর দিয়ে শিশুর জন্ম দিতে হয়, অত্যন্ত্য যন্ত্রনাদায়ক এবং অকার্যকর, অনুপোযোগী  একটি প্রক্রিয়া, যেখানে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আগে, উল্লেখযোগ্য পরিমান মা এবং শিশুর মৃত্যুর কারণ হতো ( অনেক দেশে এখনও যা বাস্তব); সমস্যাটা হচ্ছে আমরা একটি বড় আকারের ব্রেইন বা মস্তিষ্ক বিবর্তন করেছি, নবজাতকের মাথা অপেক্ষাকৃত বেশ বড়, মানব পেলভিস এর ছিদ্র দিয়ে বের হবার জন্য, যেটাকে আবারো যথেষ্ট পরিমান সংকীর্ণও হতে হবে দুই পায়ে কার্যকরভাবে হাটার উপযোগী হবার জন্য।  এই সমঝোতার ফলাফলই হচ্ছে মানব মা দের অতিমাত্রায় যন্ত্রনাদায়ক প্রসব বেদনা। আপনি যদি কোন মানুষ রমনী ডিজাইন করতেন, আপনি কি স্ত্রী প্রজনন তন্ত্রকে কি ভিন্ন পথে ঘুরিয়ে দিতেন না, যেমন তলপেটের দিকে, পেলভিসের বদলে? কল্পনা করুন শিশুর জন্ম দেয়া কত সহজ হতো, কিন্তু মানুষ বিবর্তিত হয়েছে সেই সব প্রানী থেকে যারা ডিম পাড়ে বা অনেক কম যন্ত্রনা সহ বাচ্চা প্রসব করে – পেলভিস এর মধ্য দিয়ে; আমাদের সীমাবদ্ধতা আমাদের বিবর্তনীয় অতীতে।


ছবি: পেলভিস বা শ্রোণীচক্রের মধ্য দিয়ে নবজাতকে জন্ম, বায়ে খেয়াল করুন আমাদের নিকটাত্মীয় প্রজাতি শিম্পান্জীদের, মধ্যখানে একটি সম্ভাব্য মানব আদি পুর্বসুরী, সর্বডানে মানুষ; লক্ষ্য করুন নবজাতকে মস্তিষ্কর আকৃতি, শিম্পান্জিদের পেলভিক এই অপেনিং কত জায়গা থাকে, কিন্তু মানব নবজাতকের জন্য জায়গাটা কত সংকীর্ণ, বিবর্তনের কারনে আমাদের মস্তিষ্ক বৃদ্ধি পেয়েছে, আর দুপায়ে হাটার উপযোগী হয়ে পেলভিসকে তার আকার কিছুটা সংকীর্ণ রাখতে হয়েছে, ফলাফল, মানব জন্মের জন্য মায়েদের বাড়তি প্রসববেদনা।

ছবি: ওভারী বা ডিম্বাশয় ও ফেলোপিয়ান টিউব ( জরায়ু নালীর মধ্যে শুন্য স্থানটি লক্ষ্য করুন), ডিম্বানুকে এই শুন্য স্থানটি পার হয়ে জরায়ুতে প্রবেশ করতে হয়

এবং কোন বুদ্ধিমান ডিজাইনার মানব রমনীদের ডিম্বাশয় আর ফেলোপিয়ান টিউব বা জরায়ু নালীর মধ্যে কি কোন ছোট একটি শুন্যস্থান রাখতেন? যে শুন্যস্থানটি ডিম্বানুদের অবশ্যই পার হতে হতো জরায়ু নালীতে প্রবেশ করার জন্য এবং জরায়ুর দেয়ালে তার জায়গা করে নেবার জন্য? মাঝে মাঝে কোন শুক্রানু নিষিক্ত ডিম্বানু জরায়ুতে ঠিক জায়গা মত তার শিকড় বসাতে পারে না, তার যাত্রা শুরু করে পেটের মধ্যে, যাকে বলে অ্যাবডোমিনাল প্রেগন্যান্সি, যা বাচ্চার জন্য অবশ্যম্ভাবীভাবে এবং সার্জারী ছাড়া মায়ের জন্য  মৃত্যুদন্ড; এই জয়ায়ুনালীর খোলা প্রান্ত আমাদের মাছ এবং সরীসৃপ পুর্বসুরী অতীতের অবশিষ্টাংশ, যা সরাসরি তাদের ডিম্বাশয় থেকে ডিম শরীরের বাইরে বের করে দেয়, ফেলোপিয়ান টিউব বা জরায়ু নালী একটি ত্রুটিপুর্ণ সংযোগ কারন এটি বিবর্তিত হয়েছে পরে, স্তন্যপায়ী শরীরে একটি বাড়তি অঙ্গ হিসাবে।

বেশ কিছু সৃষ্টিবাদীদের এর প্রত্যুত্তর হলো, এই খারাপ ডিজাইন বিবর্তনের স্বপক্ষে কোন যুক্তি না – এবং একটি অতিপ্রাকৃত বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তা তাসত্ত্বেও  ক্রটিপুর্ণ বৈশিষ্ট সৃষ্টি করতেই পারেন।তার বই Darwin’s Black Box এ ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন এর  প্রবক্তা মাইকেল বেহে দাবী করে যে, ”যে সমস্ত বৈশিষ্ট আমাদের  ডিজাইনের দিক থেকে অদ্ভুত লাগে, হয়তো নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা সেভাবে সেখানেই তা সৃষ্টি করেছেন কোন কারনে – নন্দনতাত্ত্বিক কারনে, বা বৈচিত্রময়তার কারনে বা অনুমান করা সম্ভব নয় এমন কোন কারনে – বা হয়তো কোন কারনই নেই;” কিন্তু এটি মুল বিষয়টিকে এড়িয়ে যায়, হ্যা, একজন ডিজাইনারের হয়তো উদ্দেশ্য আছে, তবে সেটা বোধগম্য নয়; কিন্তু যে নির্দিষ্ট সব খারাপ ডিজাইন আমরা দেখি তারা অর্থবহ হয় শুধুমাত্র যদি সেগুলো পুর্বসুরীদের বৈশিষ্টগুলো থেকে বিবর্তিত হয়ে থাকে। যখন  প্রজাতি সৃষ্টি করেছিলেন,তখন যদি সৃষ্টিকর্তার বোধগম্য কোন উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তার একটি অবশ্যই জীববিজ্ঞানীদের বোকা বানানো, আর সেটা তিনি করেছিলেন সকল জীবগুলো এমন ভাবে সৃষ্টি করার মাধ্যমে যেন তাদের দেখে মনে হয় তারা আসলে বিবর্তিত হয়েছে।

_____________________ সমাপ্ত

 

Advertisements
জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : তৃতীয় অধ্যায়( শেষ পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s