জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : তৃতীয় অধ্যায়( দ্বিতীয় পর্ব)


ছবি: প্লাটিপাস (Ornithorhynchus anatinus); হাসের মত ঠোট, মোটা চ্যাপ্টা লেজ, পুরুষদের পেছনের পায়ে বিষ মাখানো কাটার  মত স্পার এবং স্ত্রী প্লাটিপাসদের ডিম পাড়ার ক্ষমতা সহ অষ্ট্রেলিয়ার প্লাটিপাস বহু ভাবে অদ্ভুত বিচিত্র একটি প্রানী। যদি কোন প্রানীকে অবুদ্ধিমত্তাপুর্ণ উপায়ে পরিকল্পনা বা সৃষ্টিকর্তার নিজের খামখেয়ালী মজার উপাদান হিসাবে সৃষ্টি করেছেন বলে মনে করা হয়ে থাকে –সন্দেহ নেই সেটা হবে প্লাটিপাস। কিন্তু প্লাটিপাসের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট আছে: অন্য সব মেরুদন্ডী প্রানীদের যেমন থলির মত পাকস্থলী থাকে, যেখানে খাদ্য পরিপাকের জন্য পক্রিয়াকরন হয় বিভিন্ন এনজাইমের দ্বারা -, এদের তা থাকে না। প্লাটিপাসের পাকস্থলী হচ্ছে তাদের খাদ্যনালীর একটি হালকা স্ফীতকায় অংশ যা  সরাসরি অন্ত্রের সাথে সংযুক্ত। এই পাকস্থলীতে মেরুদন্ডী প্রানীদের মত এনজাইম তৈরীর কোন গ্রন্থি থাকে না। আমরা এখনও নিশ্চিৎ না কেন বিবর্তন তাদের এই পাকস্থলীটিকে অপসারন করেছে –হয়তো প্লাটিপাসের খাদ্য মুলত নরম শরীরের পোকামাকড় যাদের হজম করার জন্য বেশী প্রক্রিয়াকরণ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমরা জানি প্লাটিপাস বিবর্তিত হয়েছে পাকস্থলী আছে এমন পুর্বসুরী প্রানীদের থেকে; এর একটি কারন হলো প্লাটিপাসের জীনোমে দুটি সিউডোজীনের অস্তিত্ব আছে, যারা হজমে ব্যবহৃত হবার এনজাইম তৈরী করে, যেহেতু তাদের প্রয়োজন নেই আর তারা মিউটেশনের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে, কিন্তু এখনও তারা এই অদ্ভুত প্রানীটির বিবর্তনের চিহ্ন বহন করে চলেছে।

জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : তৃতীয় অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)
(অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
Why Evolution Is True: Jerry A. Coyne

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায় : প্রথম পর্ব ;  দ্বিতীয় পর্ব ; তৃতীয় পর্ব চতুর্থ পর্বশেষ পর্ব
তৃতীয় অধ্যায়: প্রথম পর্ব

অবশিষ্টাংশ: ভেস্টিজ, ভ্রূণ এবং খারাপ ডিজাইন

অ্যাটাভিজম (Atavisms) বা
বেশ কয়েক প্রজন্মর মধ্যে দেখা যায় নি এমন কোন একটি বৈশিষ্ট্যর পুনরাবির্ভাব

মাঝে মাঝে প্রজাতির কোন একজন সদস্যর আবির্ভাব ঘটে কিছু অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট নিয়ে যা দেখলে মনে হয় পুর্বসুরীদের কোন বৈশিষ্টের পুনরাবির্ভাব ঘটেছে। যেমন কোন সময় একটি ঘোড়ার জন্ম হতে পারে বাড়তি পায়ের আঙ্গুল সহ  বা লেজ সহ কোন মানুষের বাচ্চা। এই মাঝে মাঝে পুর্বপুরুষের কোন বৈশিষ্টর প্রায় অবশিষ্টাংশ বা রেমন্যান্ট হিসাবে প্রকাশ পাওয়াকে বলে অ্যাটাভিজমস; শব্দটির উৎপত্তি ল্যাটিন অ্যাটাভাস বা পুর্বপুরুষ।কোন ভেস্টিজিয়াল বৈশিষ্ট থেকে তারা আলাদা কারন তাদের দেখা যায় কদাচিৎ, প্রজাতির সব সদস্যদের মধ্যে না।

সত্যিকারের অ্যাটাভিজম হতে হলে পুনরাবির্ভাব হওয়া বৈশিষ্টগুলোকে অবশ্যই পুরুসুরী বা অ্যানসেস্ট্রাল বৈশিষ্ট হতে হবে এবং সেটিকে বেশ সদৃশ্যতাও বহন করতে হবে প্রাচীন বৈশিষ্টটির। তারা কেবল কোন বিকট অস্বাভাবিক কোন বৈশিষ্ট না ; যেমন, কোন একজন মানুষ একটি বাড়তি পা সহ জন্ম নিতে পারে, তবে এটি কোন অ্যাটাভিজম নয় কারন আমাদের কোন উত্তরসুরীরই পাচটি হাত পা বা লিম্ব ছিল না; সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকৃত অ্যাটাভিজম সম্ভবত তিমি মাছের পা। আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, কিছু তিমির প্রজাতি তাদের শরীরে ভেস্টিজিয়াল অঙ্গ হিসাবে পেলভিস (শ্রোনীচক্র) এবং পেছনের পায়ের কিছু হাড় বহন করে কিন্তু প্রতি ৫০০ তিমির ১ টি কিন্তু আসলেই জন্ম নেয় পেছনের পা সহ যা তাদের শরীরের বাইরে বের হয়ে থাকে। এই পা গুলোর পায়ের অন্য সব বৈশিষ্টই থাকে এবং অনেকগুলোই স্পষ্টভাবে স্থলবাসী স্তন্যপায়ীদের প্রধান প্রধান পায়ের হাড়গুলো বিদ্যমান থাকে – ফিমার, টিবিয়া এবং ফিবুলা, কারো পায়ের নীচের অংশ এবং আঙ্গুলও থাকে!

এধরনের অ্যাটাভিজম আসলে আদৌ ঘটে কেন? আমাদের সবচেয়ে শ্রেষ্ট হাইপোথিসিসটি হলো, তাদের পুনরাবির্ভাবের কারন নতুন করে যখন সেই জীনগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠে যা পুর্বসুরী প্রানীদের শরীরে সক্রিয় ছিল এক সময়, কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন তাদের নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল যখন তাদের আর প্রয়োজন ছিল না। তারপরও এই সব সু্প্তাবস্থায় থাকা জীনগুলো কখনো কখনো পুনর্জাগরিত হতে পারে যখন ক্রম বিকাশ প্রক্রিয়ায় গোলমেলে কোন কিছু ঘটে যায়।  তিমি  এখনও কিছু জেনেটিক তথ্য বহন করে তাদের পা তৈরী করার জন্য –যদি একেবারে নিখুত পা নয়, কারন বহু মিলিয়ন বছর জীনোমে অব্যবহৃত থাকা এই তথ্যগুলো মানগত অবক্ষয় হয়েছে – তবে সেটি এখনও কোন রকম একটি পা- যদিও ত্রুটিহীন না – তৈরীর তথ্য বহন করে ঠিকই। এবং সেই তথ্যটি তিমির জীনোমে অবস্থান করছে কারন তিমিরা বিবর্তিত হয়েছে স্থলবাসী  চার পেয়ে পুর্বসুরীদের থেকে। সর্বব্যপী দৃষ্ট তিমির পেলভিসের মতই, এই দুর্লভ বা কদাচিৎ দেখা তিমির পাও বিবর্তনের স্বপক্ষে প্রমান।


ছবি: ঘোড়ার বিবর্তন

আধুনিক ঘোড়া যারা এসেছে অপেক্ষাকৃত ছোট পায়ের পাচ আঙ্গুল বিশিষ্ট পুর্বসুরীদের থেকে, তারা একই ধরনের অ্যাটাভিজম প্রদর্শন করে। জীবাশ্ম রেকর্ড সেই ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া পায়ের আঙ্গুলের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। সুতরাং আধুনিক ঘোড়ার শুধু মাঝের আঙ্গুলই অবশিষ্ট থাকে – ক্ষুর বা হুফ। দেখা গেছে ঘোড়ার ভ্রুণ তিনটি আঙ্গুল দিয়ে যাত্রা শুরু করে, যা একই হারে বাড়তে থাকে; পরবর্তীতে মাঝের আঙ্গুলটি বাকী দুটির তুলনায় আরো তাড়াতাড়ি বাড়ে যে দুটি জন্মের সময় পাতলা স্প্লিন্ট বোন হয়ে পায়ের দুপাশে টিকে থাকে। (এই স্প্লিন্ট বোনগুলো সত্যিকারের প্রায় অবলুপ্ত বা ভেস্টিজিয়াল বৈশিষ্টর উদহারন। যখন তাদের প্রদাহ হয়, ঘোড়ার স্প্লিন্ট হয়েছে বলা হয়।); কদাচিৎ কখনো কোন পরিস্থিতিতে যদিও এই বাড়তি আঙ্গুল ক্রমেই  বাড়তে থাকে, যতক্ষন না পর্যন্ত তারা একটি বাড়তি পায়ের আঙ্গুলে পরিণত না হয়, ক্ষুর বা হুফ সহ। কখনো এসব অ্যাটাভিস্টিক পায়ের আঙ্গুল ঘোড়া যখন দৌড়ায় তখন মাটি স্পর্শ করে না। এবং ১৫ মিলিয়ন বছর আগে প্রাচীন ঘোড়া Merychippus ঠিক এমনই দেখতে ছিল। বাড়তি আঙ্গুল সহ ঘোড়া এক সময় অতিপ্রাকৃত বিস্ময় হিসাবে মনে করা হত: বলা হয় জুলিয়াস সিজার এবং আলেক্সজান্ডার দি গ্রেট দুজনেই এধরনের ঘোড়ায় চড়েছেন। অবশ্যই তারা একধরনের বিস্ময় ঠিকই, সেটা বিবর্তনের বিস্ময় – কারন তারা স্পষ্টভাবেই প্রাচীন এবং আধুনিক ঘোড়ার মধ্যে জীনগত আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রদর্শন করে।


ছবি: ভেস্টিজিয়াল এবং অ্যাটাভিস্টিক লেজ এর পার্থক্য: উপরে বায়ে: আমাদের আত্মীয় প্রাণীদের যাদের লেজ আছে যেমন, রাফড লেমুর (Varecia variegata), যাদের লেজের বা কড্যাল (Caudal) মেরুদন্ডের হাড় বা ভার্টিব্রাগুলো বিচ্ছিন্ন (প্রথম চারটি C1-C4) ; কিন্তু মানুষের ”লেজ” বা কক্সিক্স (উপরে ডানে), মেরুদন্ডর কড্যাল হাড়গুলো পরস্পরের সংযুক্ত হয়ে ভেস্টিজিয়াল এই বৈশিষ্টটি সৃষ্টি করে। নীচে: তিন মাস বয়সী একটি ইজরায়েলী শিশুর অ্যাটাভিস্টিক লেজ; নীচে ডানদিকে লেজটি এক্সরে দেখাচ্ছে তিনটি কড্যাল মেরুদন্ডর হাড় আকারে বেশ বড় এবং আরো বেশী সুগঠিত এবং পরস্পর সংযুক্ত নয় এবং যাদের আকার প্রায় স্যাকরাল (Sacral) ভার্টিব্রীদের সমান ( S1-S5); শিশুটির এই লেজটি পরবর্তীতে অপারেশনের মাধ্যমে অপসারন করা হয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর অ্যাটাজিম আমাদের প্রজাতিতে হলো, ‘কক্সিজিয়াল প্রজেক্শন’ বা যা সুপরিচিত ’মানুষের লেজ’ হিসাবে। আমরা কিছুক্ষনের মধ্যে দেখবো, ভ্রুণ বিকাশের শুরুতে মানব ভ্রুণ এ একটি ভালো মাপের মাছের মত লেজ থাকে, যা ৭ সপ্তাহর মাথায় ধীরে ধীরে অদৃশ্য হওয়া শুরু করে (এর সব হাড় এবং টিস্যু শরীরে আবার মিশে যায়); কদাচিৎ যদিও এটি পুরোপুরি অপসারিত হয় না এবং শিশু জন্ম নেয় একটি লেজ সহ যা মেরুদন্ডর নীচ থেকে ঝুলে থাকে। এই লেজগুলো খুব ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হয়, কোন খুব নরম হাড় ছাড়া, আর কোনটায় মেরুদন্ডের হাড় থাকে , সেই একই মেরুদন্ডের হাড় যা সাধারন মিশে গিয়ে লেজের হাড় তৈরী করে। কোন হাড় এক ইন্চি লম্বা কোনটা আবার প্রায় ১ ফুট। এবং তারা শুধু চামড়ার অংশ না, সেখানে চুলও থাকতে পারে, এছাড়া মাংশপেশী, রক্তনালী এবং স্নায়ু। কোনটা আবার নাড়াচড়াও করে! সৌভাগ্যক্রমে এই অদ্ভুত বেড়ে থাকা লেজটি সার্জারীর মাধ্যমে অপসারন করা হয়।

আমরা এখনও লেজ বানাবার জীনগত প্রোগ্রাম বহন করছি ছাড়া এর অর্থ কি হতে পারে? আসলেই সম্প্রতি জীনগত গবেষনা দেখিয়েছে আমরা ঠিক একই জীন বহন করি যা ইদুরের মত প্রানীদের লেজ তৈরী করে, কিন্তু ভ্রুণ থাকা কালীন মানুষের ক্ষে্ত্রে এরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। দেখা যায় লেজ হচ্ছে  প্রকৃত অ্যাটাভিজমই।

কিছু অ্যাটাভিজম ল্যাবরেটরীতে সৃষ্টি করা যেতে পারে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর উদহারনটি হলো, সেই দুষ্প্রাপ্যতার সেরা উদহারণ, মুরগীর দাত। কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে ই জে কোলার এবং সি ফিসার দুটি প্রজাতির কোষ সমন্বয় করার মাধ্যমে মুরগী ভ্রুনের মুখের টিস্যু ক্রমবিকাশরত ভ্রুণ ইদুরের চোয়ালের টিস্যুর উপর গ্র্যাফট করে দেখান যে, সেই মুরগীর কোষ স্তর থেকে দাতের মত কিছু কাঠামো তৈরী হয়েছে, যাদের কারো স্পষ্ট শিকড় এবং ক্রাউনও আছে। যেহেতু নীচে স্তরে থাকা ইদুরের কোষগুলোর একার পক্ষে এই দাত তৈরী সম্ভব না, কোলার এবং ফিসার ধারনা করেন, ইদুরের কোন অনু  মুরগীদের দাত তৈরী করার মত সু্প্ত কোন গঠনগত জীনকে সক্রিয় করেছে;  যার অর্থ হচ্ছে মুরগীদের দাত তৈরীর জন্য সব প্রয়োজনীয় জীন আছে, কিন্তু সেটা কার্যকরী হবার জন্য সে সুইচটা দরকার সেটা ইদুরের চোয়ালের কোষ থেকে এসেছে। এর ২০ বছর পর বিজ্ঞানীরা মলিকুল্যার বায়োলজীর গবেষনায় দেখান যে, কোলার ও ফিসারের প্রস্তাব ঠিকই ছিল: পাখিদের আসলেই জীনগত তথ্যাদি আছে যা দিয়ে দাত তৈরী করা যায়, কিন্তু তারা তা তৈরী করে না, কারন শুধুমাত্র একটি গুরুত্বপুর্ণ প্রোটিন তাদের শরীরে তৈরী হয়না। যখনই সেই প্রোটিনটি ভ্রুনে বাইরে থেকে সরবরাহ করা হয়, দাতের মত কিছু কাঠামো তাদের ঠোট থেকে তৈরী হয়। আপনারা হয়তো মনে করতে পারবেন, পাখিরা বিবর্তিত হয়েছে দাতবিশিষ্ট সরীসৃপদের থেকেই; তারা তাদের দাত হারিয়েছে ৬০ মিলিয়ন বছর আগে ঠিকই তবে তারা সেগুলো তৈরী করার মত কিছু জীন স্পষ্টতই এখনও বহন করে, যে জীনগুলো তাদের সরীসৃপ বংশ ধারার চিহ্নবহনকারী অবশিষ্টাংশ।

মৃত জীনগুলো

অ্যাটাভিজম এবং ভেস্টিজিয়াল বৈশিষ্টগুলো আমাদের দেখাচ্ছে যখন কোন বৈশিষ্ট আর ব্যবহৃত হয় না বা হ্রস্বকায় হয়ে যায়, যে জীনগুলো তাদের তৈরী করে তারা কিন্তু সাথে সাথে অপসারিত হয়ে যায় না জীনোম থেকে: বিবর্তন তাদের কাজ করা থেকে বিরত রাখে তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে দেবার মাধ্যমে, তাদের ডিএনএর থেকে একেবারে কেটে বাদ দেয়ার মাধ্যমে কিন্তু না; সুতরাং এখান থেকে আমরা একটা ভবিষ্যদ্বানী করতে পারি; আমরা প্রত্যাশা করতে পারি যে, আমরা বহু প্রজাতির জীনোমে এধরনের নীরব বা নিষ্ক্রিয় করে রাখা বা মৃত জীনগুলোকে খুজে  পাবো। যে জীনগুলো একসময় উপযোগী ছিল কিন্তু এখন আর আগের মত গঠনগত এবং কাজের দিক থেকে ঠিক অবস্থায় নেই এবং  তারা সক্রিয়ও না।অন্য ভাবে বলা যায়, অবশ্যই আমাদের কিছু প্রায় বলুপ্ত বা ভেস্টজিয়াল জীন পাওয়া উচিৎ। কিন্তু এর বীপরিত সেই ধারনাটি যা দাবী করছে, প্রতিটি প্রজাতি একেবারে শুরু থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাহলে কিন্তু এধরনের কোন জীনের অস্তিত্ব থাকারই কথা না, কারন সেক্ষেত্রে  কোন কমন বা সাধারণ পুর্বসুরী বলে কোন জীবের  অস্তিত্ত্ব থাকবে না, যাদের মধ্যে এই জীনগুলো কোন সময় সক্রিয় ছিল।

ত্রিশ বছর আগে আমরা এই প্রেডিকশনগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারতাম না, কারন আমাদের ডিএনএ কোড পড়ার কোন পদ্ধতি জানা ছিলনা। তবে এখন, খুব সহজ ব্যাপার কোন প্রজাতির সমস্ত জীনোমের অনুক্রম উদঘাটন করা এবং মানুষ সহ অনেক প্রজাতির ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই করা হয়েছে; যা আমাদের একটি অসাধারন টুল বা কৌশল দিয়েছে বিবর্তন সম্বন্ধে গবেষনা করার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যখন আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি জীনের সাধারন কাজ হচ্ছে প্রোটিন তৈরী করা – যে প্রোটিন এর অ্যামাইনো অ্যাসিডের অনুক্রম কি হবে তা নির্ধারন করে ডিএনএ নিউক্লিওটাইডের  বা বেসগুলোর অনুক্রম এর উপর; এবং যখনই আমরা কোন একটি জীন এর ডিএনএ অনুক্রম জানতে পারি, আমরা সাধারনত বলতে পারি  এটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে কিনা – অর্থাৎ তারা কি কোন কার্যকরী প্রোটিন তৈরী করছে কিনা বা তারা কি নীরব বা নিষ্ক্রিয়ে এবং কোন কিছুই তৈরী করে না। আমরা দেখতে পারি, যেমন, কোন মিউটেশন কি জীনটিকে যথেষ্ট পরিবর্তন করেছে যে সেটি দ্বারা আর ব্যবহারযোগ্য কোন প্রোটিন তৈরী করা সম্ভব হবে না বা যে কন্ট্রোল এলাকা জীনটি সক্রিয় করে তা হয়তো নিষ্ক্রিয় করে রাখা আছে। যখন কোন জীন কাজ করে না তাকে বলা হয় সিউডোজীন(Pseudogene);

এবং বিবর্তনীয় ভবিষ্যদ্বানী যে, আমরা অনেক সিউডোজীন খুজে পাবো ইতিমধ্যে সত্য প্রমানিত হয়েছে যথেষ্ঠভাবে। প্রায় প্রতিটি প্রজাতি মৃত জীন বহন করে, যাদের অনেকেই তাদের বিবর্তনীয় আত্মীয় প্রানীদের মধ্যে এখনও কার্যকরী; অর্থাৎ এই জীনগুলো কমন পুর্বসুরীদের মধ্যেও সক্রিয় ছিল,  যা তাদের কিছু উত্তরসুরী প্রানীদের মধ্যে নিষ্ক্রিয় হয়েছে কিন্তু অন্য উত্তরসুরীদের মধ্যে না। প্রায় ৩০০০০ জীনের মধ্যে আমরা মানুষরা যেমন ২০০০ এর বেশী সিউডোজীন বা মৃতজীন বহন করছি আমাদের জীনোমে। আমাদের জীনোম – এবং অন্য প্রজাতিদেরও জীনোম – এই সব মৃত জীনদের একটি জনবহুল সমাধি ক্ষেত্র। ((আমার জানা মনে সিউডোজীনগুলো আবার কখনো নতুন করে পুণর্জাগরিত করা যায় না, যখনই একে নিষ্ক্রিয় করে কোন মিউটেশন, আরো মিউটেশণ এখানে জড়ো হয় এবং প্রোটিন বানানোর তথ্যটি আরো ক্ষতিগ্রস্থ হয়, এই সব মিউটেশনের সবগুলো পরিবর্তিত হয়ে ঠিক আগের মত হয়ে জীনটিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলার সম্ভাবনা প্রায় শুন্যের কাছাকাছি))

মানুষের জীনোমে সবচেয়ে বিখ্যাত সিউডোজীনটি হলো GLO,  এ নামে ডাকার কারন মানুষ ছাড়া অন্য প্রজাতিতে তারা একটি এনজাইম তৈরী করে, L-gulono-µ-lactone oxidase ; যে এনজাইমটি সাধারন সুগার বা শর্করা গ্লুকোজ থেকে ভিটামিন সি ( বা অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) তৈরী করে । সঠিক বিপাক প্রক্রিয়ার জন্য ভিটামিন সি অপরিহার্য একটি উপাদান এবং প্রায় সব স্তন্যপায়ীদের শরীরে নিজস্ব উপায় বা প্রক্রিয়া আছে এটি তৈরী করার জন্য; সব স্তন্যপায়ী মানে প্রাইমেট, বাদুড় ( ফ্রুট ব্যাট) এবং গিনি পিগরা ছাড়া, এই সব প্রানীদের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি আসে খাদ্য থেকে এবং সাধারন খাদ্যই যথেষ্ট প্রয়োজনীয় পরিমান ভিটামিন সি সরবরাহ করার জন্য। আমরা যদি প্রয়োজনমত ভিটামিন সি না গ্রহন না করি, আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি;  উনবিংশ শতাব্দীতে ফল খেতে না পাওয়া নাবিকদের মধ্যে স্কার্ভি রোগের প্রকোপ ছিল খুবই বেশী;  কেন প্রাইমেটরা এবং কিছু অন্য স্তন্যপায়ীরা তাদের নিজেদের শরীরে ভিটামিন সি বানায় না, তার কারন হলো তাদের আসলে প্রয়োজন নেই সেটা তৈরী করার। তারপরও ডিএনএ অনুক্রম আমাদের বলছে যে, প্রাইমেটরা এখনও সমস্ত জেনেটিক তথ্য বহন করে  ভিটামিনটি তৈরী করার জন্য।

দেখা গেছে যে গ্লুকোজ থেকে ভিটামিন সি তৈরীর পথটির চারটি পর্যায়ক্রমিক ধাপ আছে, যা আলাদা আলাদা জীন দিয়ে তৈরী প্রোটিন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রাইমেট এবং গিনি পিগদের এখনও সক্রিয় জীন আছে প্রথম তিনটি ধাপের জন্য, কিন্তু শেষ ধাপটি যেখানে GLO এনজাইমটি লাগে, সেটি শুধু কাজ করে না। GLO জীনটি নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে মিউটেশন দ্বারা, এবং এটি রুপান্তরিত হয়েছে একটি সিউডোজীন এ, যাকে বলে ψ GLO (ψ গ্রীক সাই (psi) যা ইঙ্গিত করছে pseudo); ψGLO কাজ করেনা মাত্র একটি মিউটেশনের জন্য, একটি নিউক্লিওটাইড জীনটির ডিএনএ অনুক্রমে অনুপস্থিত থাকে, এবং ঠিক সেই একই নিউক্লিওটাইডটি অন্যান্য প্রাইমেটদের মধ্যেও অনুপস্থিত;  আর এটাই প্রদর্শন করছে, যে মিউটেশনটি আমাদের ভিটামিন সি বানানো ক্ষমতাকে নষ্ট করেছে তা সব প্রাইমেটদের পুর্বসুরীদের মধ্যে উপস্থিত এবং যে মিউটেশনটি তাদের উত্তরসুরীদের মধ্যে তা বিস্তার লাভ করেছে। এই GLO জীনটি গিনিপিগের মধ্যে নিষ্ক্রিয় হয়েছে স্বতন্ত্র উপায়ে, কারন এর মিউটেশনটি ভিন্ন। খুব সম্ভাবনা আছে যেহেতু  ফ্রুট ব্যাট (ফল খাওয়া বাদুড়), গিন পিগ এবং প্রাইমেটরা তাদের খাদ্যে যথেষ্ট পরিমান ভিটামিন সি পায়,  সেখানে ভিটামিনটি তৈরীর প্রক্রিয়াটির জন্য যে জীন দায়ী তাকে অকেজো করার জন্য কোন খেসারত দিতে হয় না; বরং এটি উপকারেই আসেই কারন এর ফলে কষ্টসাধ্য উপায়ে একটি বিশেষ প্রোটিন তৈরী করতে হয়না।

কোন একটি প্রজাতিতে পাওয়া মৃত জীন যা তার আত্মীয় প্রজাতির মধ্যে সক্রিয়, হচ্ছে বিবর্তনের স্বপক্ষে একটি প্রমান। কিন্তু আরো বিষয় আছে এখানে, যখন আপনি জীবিত প্রাইমেটদের মধ্যে এই ψGLO জীনটি পরীক্ষা করে দেখবেন, সেখানে দেখা যাবে এর অনুক্রমটি সাথে প্রাইমেটদের কাছের আত্মীয়দের জীনটির অনুক্রমের সদৃশ্যতা  অপেক্ষাকৃত বেশী তাদের দুরবর্তী আত্মীয়দের জীনটির অনুক্রমের তুলনায়; মানুষ এবং শিম্পান্জি দের এই জীন যেমন বেশ মিল, তবে ওরাং উটানের এই জীন থেকে খানিকটা কম মিল, যারা আমাদের দুরের আত্মীয়, উপরন্তু গিনিপিগদের এই সিকোয়েন্স এর তুলনা প্রাইমেটদের জীন সিকোয়েন্সটি অনেক বেশী আলাদা।

শুধুমাত্র বিবর্তন এবং সাধারন বংশধারার ব্যাপারটি কেবল এটি ব্যাখ্যা করতে পারে। সকল স্তন্যপায়ী প্রানী GLO জীনের একটি করে কার্যকরী কপি উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছে; কিন্তু প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর আগে, সকল প্রাইমেটদের কমন পুর্বসুরী প্রানীর শরীরে, জীনটি, যার আর কোন দরকার নেই সেটি একটি মিউটেশনের দ্বারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং সকল প্রাইমেটরা এই নিষ্ক্রিয় জীনটি তাদের জীনোমে উত্তরাধিকার সুত্রে পায় ঠিক সেই একই মিউটেশণ সহ। GLO জীনটি নিষ্ক্রিয় হবার পর, আরো মিউটেশন ঘটে জীনটির মধ্যে ধীরে ধীরে সময়ের পরিক্রমায় এবং সেই মিউটেশনগুলো ক্ষতিকর না কারন তারা ঘটছে ইতিমধ্যে মৃত একটি জীনের মধ্যে –যা পরবর্তী উত্তরসুরী প্রানীদের মধ্যে বিস্তার লাভ করে; যেহেতু কাছের আত্মীয়রা বেশী সম্প্রতি কোন সময়ে একটি কমন পুর্বপুরুষ থেকে উদ্ভব হয়েছে, যে সমস্ত জীন সময় নির্ভর উপায়ে এভাবে পরিবর্তিত হয় তারা এধরনের একটি বংশধারার প্যাটার্ণ অনুসরণ করে থাকে, যার ফলে কাছাকাছি আত্মীয় প্রানীদের জীন এর ডিএনএ বেস অনুক্রমের মিল দুরবর্তী আত্মীয় প্রানীদের তুলনায় বেশী সদৃশ হয়। এবং এটাই ঘটে সব জীনের ক্ষেত্রেই ‍তা মৃত হোক বা না হোক। গিনিপিগে GLO জীনটির অনুক্রম এত বেশী আলাদা কারন এটি নিষ্ক্রিয় হয়েছিল স্বতন্ত্রভাবে, এমন একটি বংশধারায় যা আগেই প্রাইমেটদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। এবং GLO জীনটি শুধু মাত্র এককভাবে অনন্য না যারা এ ধরনের প্যাটার্ণ প্রদর্শন করে: এ ধরনের আরো অনেক সিউডোজীন আছে।

কিন্তু আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে প্রাইমেট এবং গিনিপিগরা বিশেষ ভাবে স্বতন্ত্র প্রজাতি হিসাবে শুরু থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তাহলে এই সত্যগুলো কোন অর্থবহ  হয়না। কেনই বা একজন সৃষ্টিকর্তা ভিটামিন সি বানানো প্রক্রিয়া সৃষ্টিকারী জীন দেবেন এই সব প্রজাতিদের মধ্যে এবং তারপর তা নিষ্ক্রিয় করে দেবেন? তার জন্য কি ব্যপারটা সহজ হতো না পুরো জীনটাই গোড়া থেকে বাদ দিয়ে দিলে? কেনই্ বা সেই একই নিষ্ক্রিয়কারী মিউটেশন সব প্রাইমেটদের মধ্যে পাওয়া যাবে এবং গিনিপিগদের মধ্যে যেটি ভিন্ন? কেনই বা কোন একটি মৃত জীনের অনুক্রমের সদৃশ্যতার প্যাটার্ণ এই সব প্রজাতিদের জ্ঞাত বংশধারা থেকে অনুমান করা সম্ভব হবে? মানুষদেরই বা কেন হাজারেরও বেশী সিউডোজীন থাকবে?

আমরা এমনকি অন্য প্রজাতির মৃত জীনও আমাদের জীনোমে বহন করি, যেমন ভাইরাস। কিছু, যাদের বলা হয় এ্ন্ডোজেনাস রেট্রোভাইরাস, যারা তাদের জীনোমকে কপি করে আক্রান্ত কোষের ডিএনএ এর সাথে তা জোড়া লাগিয়ে দেয় (HIV যেমন একটি রেট্রোভাইরাস); যদি  এধরনের ভাইরাসগুলো এমন কোন কোষকে আক্রান্ত করে যারা ডিম্বানু বা শুক্রানু বানায়, এরা ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে; মানুষের জীনোম এরকম ভাইরাস এর হাজার হাজার কপি বহন করে, যার প্রত্যেকটি মিউটেশনের কারনে তাদের ক্ষতিকারতা হারিয়েছে। তারা প্রাচীন সংক্রমনের অবশিষ্টাংশ, চিহ্ন বহন করছে। কিন্তু কিছু এই সব জীন অবশিষ্টাংশ মানুষ আর শিম্পান্জির ক্রোমোজোমের ঠিক একই জায়গায় অবস্থান করছে। এগুলো নি:সন্দেহে সেই সব রেট্রো ভাইরাস যারা আমাদের কমন পুর্বসুরী প্রানীদের একসময় সংক্রমন করেছিল এবং যা পরবর্তী দুটি বংশধারার উত্তরসুরীদের মধ্যে প্রবেশ করে। যেহেতু ভাইরাসগুলোর আদৌ কোন সম্ভাবনাই নাই যে ‍তাদের নিজেদের জীনোমকে স্বতন্ত্রভাবে দুটি প্রজাতির জীনোমের ঠিক একই জায়গায় যুক্ত করবে,  এই বিষয়টি আমাদের কমন বংশধারার বিষয়টিকে জোরালোভাবে প্রমান করে।

মৃত জীনদের নিয়ে আরেকটি মজার  গল্প আমাদের গন্ধ শোকার ক্ষমতা নিয়ে বা বলা যায় আমাদের দুর্বল গন্ধ শোকার ক্ষমতা নিয়ে। কারন স্থলবাসী স্তন্যপায়ীদের মধ্যে গন্ধ শোকার ক্ষেত্রে মানুষরা আসলেই অনেক পিছিয়ে; যাই হোক তারপরও আমরা প্রায় ১০০০০ স্বতন্ত্র গন্ধ শুকতে পারি; কিন্তু কিভাবে আমরা এই ক্ষমতা অর্জন করলাম? খুব সম্প্রতি ছাড়া,  এটি ছিল সম্পুর্ণ রহস্যময়। আমাদের ডিএনএ তে এর উত্তর আছে -আমার অসংখ্য অলফ্যাক্টরী রিসেপ্টর বা OR জীনে।

এই OR জীনের গল্প প্রথম ব্যাখ্যা করেন লিন্ডা বাক এবং রিচার্ড অ্যাক্সেল, যারা নোবেল পুরষ্কার জিতেছিলেন তাদের ‍এই অসাধারন কাজটি জন্য ২০০৪ সালে। যারা গন্ধ শোকায় ওস্তাদ বা সুপার স্নিফার যেমন ইদুরের OR জীনের এর কথা আলোচনা করা যাক।

ইদুররা তাদের গন্ধ শোকার ক্ষমতার উপর ভীষনভাবে নির্ভরশীল, শুধু খাবার খোজার বা শিকারী প্রানী থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যই না, নিজেদের পারস্পরিক ফেরোমেন শনাক্ত করার জন্যও;  ইদুরের সেন্সরী বা অনুভব করার জগত আমাদের তুলনায় ভীষনভাবে আলাদা; গন্ধ শোকার ক্ষমতার চেয়েও আমরা বেশী নির্ভর করি আমাদের দৃষ্টিশক্তির উপর। ইদুরদের প্রায় ১০০০ এর মত সক্রিয় OR জীন ( অলফ্যাক্টরী রিসেপ্টর) আছে, যাদের সবগুলোই এসেছে একটি মাত্র পুর্বসুরী জীন থেকে যা বহু মিলিয়ন বছর আগে আবির্ভুত হয়েছিল এবং বহুবার সেই জীনটি ডুপ্লিকেট বা দ্বিঅনুলিপিকৃত হয়েছে। প্রতিটি জীন অন্য জীন থেকে সামান্য একটু আলাদা এবং প্রত্যেকেই একটি ভিন্ন প্রোটিন বা অলফ্যাক্টরী রিসেপ্টর তৈরী করে –যা বাতাসে ভেসে থাকা ভিন্ন ভিন্ন অনু শনাক্ত করতে পারে। প্রত্যেকটি OR প্রোটিন নাকের ভিন্ন ভিন্ন রিসেপ্টর কোষের পর্দায় নিজেদের প্রকাশ করে। বিভিন্ন গন্ধ তৈরী হয় ভিন্ন ভিন্ন অনুর সংমিশ্রনে এবং প্রতিটি কম্বিনেশন ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপের কোষকে উত্তেজিত করে। এই কোষগুলো মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়, যা বিভিন্ন সংকেত মিশ্রন করার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন সংকেতকে ডিকোড করে।  এভাবে ইদুর পনিরের গন্ধ থেকে বিড়ালের গন্ধকে আলাদা করতে পারে। সংকেত এর একটি মিশ্রনকে ব্যবহার করে তারা ( এবং অন্য স্তন্যপায়ীরা) তাদের OR জীনের অপেক্ষায় অনেক বেশী গন্ধ শনাক্ত করতে পারে।

ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ শনাক্ত করার ক্ষমতা খুব উপকারী: এটি আত্মীয় আর অনাত্মীয়র মধ্যে পার্থক্য করতে, সঙ্গী খুজে পেতে, খাদ্য খুজতে, শিকারী প্রানী চিনতে এবং কে আমাদের  এলাকায় অনুপ্রবেশ করতে তা শনাক্ত করতে সহায়তা করে। বেচে থাকার জন্য এই দক্ষতা খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু কিভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন কিভাবে এই দক্ষতাটিকে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল? প্রথম একটি আদি জীন, যার দুটি কপি হয় বেশ কয়েকবার। এই ডুপ্লিকেশন কোষ বিভাজনের সময় মাঝে মাঝেই ঘটনাচক্রে আকস্মিকভাবে ঘটে। ধীরে ধীরে এই ডুপ্লিকেটকৃত কপি গুলো একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, প্রত্যেকেই একটি ভিন্ন ভিন্ন গন্ধের অনুর সাথে যুক্ত হবার ক্ষমতা অর্জন করে। এবং এই ১০০০ টি OR জীনের প্রতিটির জন্য আলাদা আলাদা কোষের বিবর্তন ঘটে। এবং একই সাথে আমাদের মস্তিষ্কে নানা নিউরোনাল সংযোগ ঘটে নুতন করে এই সব ভিন্ন ভিন্ন কোষ থেকে আগত সংকেত প্রক্রিয়াজাত করে ভিন্ন ভিন্ন গন্ধের অনুভুতি সৃষ্টির জন্য। এটি আসলে বিবর্তনের বিস্ময়কর একটি অর্জন যা পরিচালিত হয়েছে গন্ধ দিয়ে পার্থক্য করার ক্ষমতাটির বেচে থাকার ক্ষেত্রে ‍উপকারীতার মুল্য হিসাবে।

আমাদের নিজেদের গন্ধ শোকার ক্ষমতা অবশ্য ইদুরদের ধারে কাছে কোথাও নেই। একটি কারন হলো আমরা অপেক্ষাকৃত অনেক কম OR জীন প্রকাশ করে থাকি – কেবল মাত্র ৪০০ র কাছাকাছি; কিন্তু আমরা সর্বমোট ৮০০ টি OR জীন বহন করি যা আমাদের জীনোমের প্রায় শতকরা ৩ ভাগ জায়গা দখল করে আছে। এবং এর পুরোপুরি অর্ধেক জীনই হচ্ছে সিউডোজীন, যারা মিউটেশনের মাধ্যমেস্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয়। অন্য প্রায় সব প্রাইমেটদের মধ্যেও একই ভাবে ব্যপারটা ঘটেছে। কিন্তু কিভাবে এটি ঘটলো?  সম্ভবত এর কারন, আমরা প্রাইমেটরা যারা মুলত দিনের বেলায় বেশী সক্রিয় থাকি, তারা গন্ধ শোকার ক্ষমতার চেয়ে দৃষ্টি ক্ষমতার উপর ভরসা করি বেশী, সুতরাং আমাদের এত ভিন্ন ভিন্ন গন্ধ আলাদা করে শনাক্ত করার কোন প্রয়োজন নেই। অপ্রয়োজনীয় জীনগুলো সাধারনত ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে মিউটেশনের মাধ্যমে। প্রতাশ্য মতই, রঙ দেখার ক্ষমতা সম্পন্ন বা কালার ভিশন সহ প্রাইমেটরা তাদের পরিবেশকে আরো ভালোভাবে যাচাই করে দেখতে পারে, আর সে কারনেই আরো বেশী মৃত আমাদের OR জীন।

আপনি যদি মানুষের OR জীনদের অনুক্রম লক্ষ্য করে দেখেন, সক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় দুটোই, তারা অন্য প্রাইমেটদের এই জীনের সাথে সবচেয়ে বেশী সদৃশ, এবং অপেক্ষাকৃত কম সদৃশ অন্য প্রাচীন স্তন্যপায়ী যেমন প্লাটিপাসদের এই জীনের তুলনায় এবং  আরো বেশী ভিন্ন আমাদের দুরবর্তী আত্মীয়, যেমন সরীসৃপদের OR জীনের তুলনায়। কেন মৃত জীনরা এধরনের সম্পর্ক দেখায়, বিবর্তন ছাড়া কি এর অন্য কোন কারন আছে?  আমরা সে এত বেশী নিষ্ক্রিয় জীন বহন করি এই সত্যটি বিবর্তনের স্বপক্ষে একটি বড় প্রমান: আমরা এই জীনগত বোঝা বহন করি কারন আমাদের অতীতের পুর্বসুরী প্রানীদের তাদের প্রয়োজন ছিল যারা তাদের তীক্ষ্ম গন্ধ শোকার ক্ষমতার উপর নির্ভর করতো সফলভাবে বেচে থাকার জন্য।

কিন্তু বিবর্তনের সবচেয়ে সেরা উদহারন বা ডি-ইভোল্যুশন হলো ডলফিন দের OR জীন। বাতাসে থাকা কোন উদ্বায়ী গন্ধ শোকার কোন প্রয়োজন নেই ডলফিনদের, কারন তাদের সব কাজ পানির নীচে এবং পানির নীচে থাকা অনু শনাক্ত করার জন্য তাদের একগুচ্ছ ভিন্ন জীন আছে;  এবং স্বভাবতই কেউ প্রত্যাশা করতে পারেন, ডলফিনদের OR জীন নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে। এবং আসলেই তাদের ৮০ শতাংশ OR জীনই নিষ্ক্রিয়। শত শত এমন জীন এখনও নীরবে ডলফিনের জীনোমে বসে আসে, বিবর্তনের নীরব স্বাক্ষী হয়ে। আপনি যদি এই সব মৃত ডলফিন জীনদের ডিএনএ অনুক্রম এর দিকে তাকিয়ে দেখেন, দেখবেন তারা দেখতে স্থলবাসী স্তন্যপায়ী প্রানীদের জীনের মত। এমনই হবার কথা এবং এর কারনটা আমরা  বুঝতে পারি, ডলফিনরা বিবর্তিত হয়েছে স্তলবাসী স্তন্যপায়ী প্রানীদের থেকে যাদের OR জীনগুলো অনুপযোগী হয়ে পড়ে যখন তারা পানিতে বসবাস শুরু করেছিল। এবং যদি কেউ বলেন ডলফিনদের বিশেষভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে তাহলে এই সব মৃত জীন এর কোন অর্থই হয়না।

ভেস্টিজিয়াল অঙ্গের সাথে সাথেই থাকে ভেস্টিজিয়াল জীনগুলো। আমরা স্তন্যপায়ীরা সরীসৃপ পুর্বসুরীদের থেকে বিবর্তিত হয়েছি যারা ডিম পাড়ে। মনোট্রিমদের ( এরা হচ্ছে স্তন্যপায়ী প্রানীদের একটি বর্গ, যার মধ্যে আছে অস্ট্রেলিয়ার স্পাইনী অ্যান্টইটার এবং ডাক বিলড প্লাটিপাস)  ব্যতিক্রম ছাড়া স্তন্যপায়ীরা ডিম পাড়া বাদ দিয়েছে এবং মায়েরা তাদের শিশুদের প্লাসেন্টার মাধ্যমে সরাসরি পুষ্টি যোগায়, ডিমের কুসুমের মত রসদভান্ডার সরবরাহ না করে। এবং স্তন্যপায়ীরা তিনটি জীন বহন করে যা পাখি এবং সরীসৃপে , পুষ্টিকর প্রোটিন vitellogenin তৈরী করে, যা ডিমের কুসুম  থলি বা  ইয়োক স্যাকটি পুর্ণ করে। কিন্তু প্রায় সব স্তন্যপায়ী প্রানীদের ক্ষেত্রে এই জীনগুলো মৃত, মিউটেশনের মাধ্যমে সম্পুর্ণ নিষ্ক্রিয়। শুধুমাত্র ডিম পাড়া মনোট্রিমরাই এখনও vitellogenin তৈরী করে, যাদের একটি সক্রিয় ও দুটি মৃত জীন আছে। এছাড়া আমাদের মত স্তন্যপায়ীরা এখনও ইয়োক স্যাক তৈরী করে – কিন্তু  সেটি ভেস্টিজিয়াল এবং কোন ইয়োক সেখানে থাকে না, একটি বিশাল তরল পুর্ণ বেলুন যা ভ্রুনের অন্ত্রের সাথে যুক্ত থাকে (ছবি); মানুষের গর্ভকালীন সময়ে দ্বিতীয় মাসে এটি ভ্রুন থেকে আলাদা হয়ে যায়।

16-12-2012 10-42-00 PM
ছবি: স্বাভাবিক ও ভেস্টিজিয়াল ইয়োক স্যাক। উপরের ছবি: ভ্রুন জেবরা ফিস Danio rerio এর স্বাভাবিক ইয়োক স্যাক, ডিম খোলস থেকে থেকে দু দিনের মাথায় সরিয়ে, ঠিক ডিম ফোটার আগে। নীচের ছবি: মানুষের ভ্রুনের খালি ভেস্টিজিয়াল ইয়োক স্যাক ভ্রুণের প্রায় ৪ সপ্তাহ বয়সে; মানুষের ভ্রুন ডানদিকের ছবিতে ব্রাঙ্কিয়াল আর্চগুলো, পেছনের পা এবং পায়ে পেছনে লেজ দেখা যাচ্ছে।

হাসের মত ঠোট, মোটা চ্যাপ্টা লেজ, পুরুষদের পেছনের পায়ে বিষ মাখানো কাটার  মত স্পার এবং স্ত্রীদের ডিম পাড়ার ক্ষমতা সহ অষ্ট্রেলিয়ার প্লাটিপাস বহু ভাবে অদ্ভুত বিচিত্র একটি প্রানী। যদি কোন প্রানীকে অবুদ্ধিমত্তাপুর্ণ উপায়ে পরিকল্পনা বা সৃষ্টি কর্তার নিজের খামখেয়ালী মজার উপাদান হিসাবে সৃষ্টি করেছেন বলে মনে করা হয়ে থাকে –সন্দেহ নেই সেটা হবে প্লাটিপাস। কিন্তু প্লাটিপাসের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট আছে: অন্য সব মেরুদন্ডী প্রানীদের যেমন থলির মত পাকস্থলী থাকে, যেখানে খাদ্য পরিপাকের জন্য পক্রিয়াকরন হয় বিভিন্ন এনজাইমের দ্বারা -, এদের তা থাকে না। প্লাটিপাসের পাকস্থলী হচ্ছে তাদের খাদ্যনালীর একটি হালকা স্ফীতকায় অংশ যা  সরাসরি অন্ত্রের সাথে সংযুক্ত। এই পাকস্থলীতে মেরুদন্ডী প্রানীদের মত এনজাইম তৈরীর কোন গ্রন্থি থাকে না। আমরা এখনও নিশ্চিৎ না কেন বিবর্তন তাদের এই পাকস্থলীটিকে অপসারন করেছে – হয়তো প্লাটিপাসের খাদ্য মুলত নরম শরীরের পোকামাকড় যাদের হজম করার জন্য হয়তো বেশী প্রক্রিয়া করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমরা জানি প্লাটিপাস বিবর্তিত হয়েছে পাকস্থলী আছে এমন পুর্বসুরী প্রানীদের থেকে; এর একটি কারন হলো প্লাটিপাসের জীনোমে দুটি সিউডোজীনের অস্তিত্ব আছে, যারা হজমে ব্যবহৃত হবার এনজাইম তৈরী করে, যেহেতু তাদের প্রয়োজন নেই আর তারা মিউটেশনের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে, কিন্তু এখনও তারা এই অদ্ভুত প্রানীটির বিবর্তনের চিহ্ন বহন করে চলেছে।

________________________________________________ চলবে

Advertisements
জেরী কয়েন এর হোয়াই ইভোল্যুশন ইজ ট্রু : তৃতীয় অধ্যায়( দ্বিতীয় পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s