রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : ষষ্ঠ অধ্যায় (শেষ পর্ব)

 Brad Holland
ব্র্যাড হল্যান্ড এর একটি ইলাসট্রেশন

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন :  ষষ্ঠ অধ্যায় (শেষ পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ,  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব) ,পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)
ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ; ষষ্ঠ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

 নৈতিকতার শিকড়: কেন আমরা ভালো?

People say we need religion when what they really mean is we need police. H.L. Mencken

যদি ঈশ্বরই না থাকে, তাহলে আমরাই বা কেন ভালো হবো?

এভাবে যদি উপস্থাপন করা হয়, উপরের এই প্রশ্নটা নিঃসন্দেহে আর মহান বা সন্মানজনক শোনায় না; যখন কোন ধর্মীয় ব্যক্তি আমার কাছে এভাবে প্রশ্নটি উত্থাপন করেন ( এবং অনেকেই তাই করেন), আমার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া হয় নীচের এই চ্যালেন্জ্ঞটি ছুড়ে দেবার জন্য : আপনি কি আসলেই আমাকে বলতে চাইছেন, আপনার ভালো হবার প্রচেষ্টার একমাত্র কারন ঈশ্বরের কৃপা আর পুরষ্কার অর্জন করা বা তার রোষানল বা শাস্তি এড়াতে? কিন্তু সেটা নৈতিকতা না, এটা পদলেহন করা, চাটুকারীতা করা, আকাশের মহান সার্ভেইলেন্স ক্যামেরার দিকে বার বার ঘাড় ফিরিয়ে দেখা , এখনও আপনার মাথার মধ্যে ছোট একটি আড়ি পাতা আছে , যা আপনার সমস্ত কর্মকান্ডকে পর্যবেক্ষন করছে, আপানার সকল খারাপ চিন্তা সম্বন্ধে তিনি সর্বজ্ঞ; আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন, ’যদি মানুষ শুধুমাত্র ভালো হয় কারন তারা শাস্তি ভয় পায় এবং পুরষ্কারেরআশা করে, তাহলে সত্যি আমরা বড়ই হতভাগ্য; মাইকেল শেরমার তার The Science of Good and Evil বইটিকে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন বিতর্ক সমাপনকারী যুক্তি হিসাবে; ”আপনি যদি একমত হন যে, ঈশ্বরের অনুপস্থিতিতে আপনি ডাকাতি, ধর্ষন আর খুন করতে পারবেন, আপনি তাহলে নিজেকে একজন অনৈতিক ব্যক্তি হিসাবে চিহ্নিত করলেন এবং আপনার থেকে যত দুরে থাকা সম্ভব ততদুরে থাকা উচিৎ এই উপদেশটি আমাদের অবশ্যই মেনে চলা প্রয়োজন, আবার অন্যদিকে যদি ঐশ্বরিক নিবিড় পর্যবেক্ষন আর নজরদারি ছাড়াও আপনি সত্যি ভালো  মানুষ হয়ে থাকেন,  তাহলে আপনি নিজেই ’আমাদের ভালো মানুষ হবার জন্য ঈশ্বর অবশ্য প্রয়োজনীয়’ এমন দাবীটিকে চুড়ান্তভাবে অবমুল্যায়ন করলেন‘; আমার সন্দেহ একটি বিশাল সংখ্যক ধার্মিক ব্যক্তিরা মনে করেন যে, তাদের ভালোমানুষ হবার জন্য ধর্মই মুল প্রণোদনাকারীর দায়িত্ব পালন করে, বিশেষ করে তারা যদি সেই সব বিশেষ ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী হয়ে থাকেন যে ধর্মগুলো পদ্ধতিগতভাবে ব্যক্তিগত অপরাধবোধকে ‌ উদ্দেশ্যমুলকভাবেই অপব্যবহার করে থাকে তাদের নিজেদের স্বার্থে;

আমার মনে হয়, বেশ অনেকটুকু পরিমান নীচু আত্মসন্মানবোধ এর প্রয়োজন আছে এমন কিছু ভাবতে পারার জন্য যে, যদি পৃথিবী থেকে হঠাৎ করেই ঈশ্বর বিশ্বাস সম্পুর্ণ উড়ে যায় আমরা সবাই উদাসীন, দয়ামায়াহীন, অনুদার স্বার্থপর ভোগবাদীতে রুপান্তরিত হবো, ভালো বা শুভ গনাবলীর কোন লেশ মাত্র থাকবে না; প্রচলিত ধারনা মতে দস্তয়েভস্কী এই ধরনের মতামত ধারন করতেন, সম্ভবত যার কারন তার সৃষ্ট চরিত্র ইভান কারামাজভ এর মুখে উচ্চারিত কিছু বাক্য:

(ইভান) গভীরভাবে পর্যবেক্ষন করে উপলব্ধি করেন যে, প্রকৃতিতে এমন কোন আইন নেই যা মানুষকে মানবতাকে ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সেই ভালোবাসাটার যদি অস্তিত্ব থাকে, বা আজ অবধি পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব থেকে থাকে, তাহলে এটি অবশ্যই কোন প্রাকৃতিক কারনে নয়, এর কারন সম্পুর্ণভাবে নিজেদের অমরত্বের প্রতি মানুষের ধারনকৃত বিশ্বাস; এর পাশাপাশি তিনি যোগ করেন যে, ঠিক সেই জিনিসটাই যা প্রাকৃতিক আইন গঠন করে, যেমন, নিজের অমরত্বের প্রতি মানুষের বিশ্বাস যখন ধ্বংস হয়ে যাবে, শুধুমাত্র তার ভালোবাসার ক্ষমতাই নিঃশ্বেষ হবে না এই পৃথিবীতে জীবনকে টিকিয়ে রাখার মুল প্রেরণাদায়ক শক্তিটিও নিঃশ্বেষ হয়ে যাবে; এবং উপরন্তু তখন কিছুই আর অনৈতিক বলে বিবেচিত হবে না, সবকিছুরই অনুমতি থাকবে এমন কি নর মাংস ভক্ষনও; এবং পরিশেষে, এটুকুই যেন যথেষ্ট না, তিনি ঘোষনা দেন, প্রতিটি মানুষ, যেমন আপনি এবং আমি, যেমন যারা ঈশ্বর বা তার নিজের অমরত্বে বিশ্বাস করেন না, প্রাকৃতিক নিয়মাবলী তাৎক্ষনিকভাবে ধর্ম ভিত্তিক আইন যার এর আগে ছিল ‍তার সম্পুর্ণ বীপরিত হতে বাধ্য এবং এই ইগোইজম এমনকি সম্প্রসারিত হয় নানা অপরাধ ঘটানোর প্রেরণাদায়ক হিসাবে, তা শুধু অনুমতিই পাবে না, বরং চিহ্নিত হবে অবশ্য প্রয়োজনীয় হিসাবে, সবচেয়ে যৌক্তিক, এমনকি মানুষের অবস্থার অস্তিত্বের সবচেয়ে মহত্ত্বতম কারন হিসাবে;

হয়তো অবুঝভাবেই, ইভান কারামাজভের চেয়ে আমি মানব প্রকৃতি সম্বন্ধে অপেক্ষাকৃত কম নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী পোষন করি; আমাদের কি সত্যি সত্যি নজরদারীর প্রয়োজন আছে,  ঈশ্বরের কিংবা একে অপরের – যা আমাদের স্বার্থপর এবং অপরাধী সুলভ আচরণ থেকে বিরত রাখতে ? আমি তীব্রভাবে বিশ্বাস করতে চাই যে আমার জন্য এ ধরনের কোন নজরদারী প্রয়োজন নেই; এবং প্রিয় পাঠকরা, আপনাদেরও প্রয়োজন নেই; আবার অন্যদিকে, আমাদের আত্মবিশ্বাসে খানিকটা ফাটল ধরিয়ে দুর্বল করতে, স্টিফেন পিংকারের মন্ট্রিয়লে পুলিশ ধর্মঘটের মোহমুক্তির অভিজ্ঞতা যা তিনি তার  The Blank Slate বইটিতে বর্ণনা করেছিলেন:

গর্বিতভাবে শান্তিপ্রিয় কানাডায় রোমান্টিক ৬০ এর দশকে অল্পবয়সী কিশোর হিসাবে আমি বাকুনিন এর অ্যানর্কিজমের একনিষ্ট বিশ্বাসী ছিলাম; আমি আমার বাবা মার যুক্তি,  যদি সরকার কোনদিন তার অস্ত্র সমর্পন করে তাহলে ভয়াবহ নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে, হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম; আমাদের প্রতিদ্বন্দী ভবিষ্যদ্বানী দুটির পরীক্ষার সন্মুখীন হয় ১৯৬৯ সালের ১৭ অক্টোবর সকাল ৮ টায়, যখন মন্ট্রিয়লের পুলিশ বাহিনী ধর্মঘট শুরু করে; ১১;২০ মিনিটে, প্রথম ব্যাঙ্ক ডাকাতিটি হয়, দুপুরের মধ্যে শহরের সব দোকান পাট বন্ধ হয়ে যায় বেপরোয়া লুটতরাজের ভয়ে; আর কয়েক ঘন্টার মধ্যে ট্যাক্সি ড্রাইভাররা একটি লিমোজিন সার্ভিসের গ্যারেজে আগুন জালিয়ে দেয়, যারা তাদের সাথে বিমান বন্দরের খদ্দের নিয়ে দ্বন্দরত ছিল; ছাদের উপরে লুকিয়ে থাকা এক বন্দুকধারী একজন পুলিশ অফিসারকে খুন করে, দাঙ্গাবাজরা বেশ কিছু হোটেল আর রেস্টুরেন্ট ভাঙ্গচুর করে, উপশহরে নিজের বাসায় অনুপ্রবেশ করা এক আগান্তুককে গুলি করে হত্যা করে একজন ডাক্তার; দিনের শেষে দেখা যায় মোট ছয়টি ব্যাঙ্ক লুন্ঠন করা হয়েছে, শতাধিক দোকানে লুট করা হয়েছে, বারোটি জায়গায় আগুন ধরানো হয়েছে, চল্লিশটি গাড়ি ভর্তি দোকানের সামনের কাচ ভাঙ্গা হয়েছে, সম্পদ ধ্বংশের হিসাবের পরিমান প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার ছুয়েছে, নগর কর্মকর্তাদের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের জন্য আর্মি এবং অবশ্যই কেন্দ্রীয় পুলিশকে তলব করার আগে, এবং তারা যথারীতি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে;  এই সুস্পষ্ট চাক্ষুষ পরীক্ষা আমার রাজনৈতিক চিন্তাধারনাকে এলোমেলো করে দিয়েছিল…….

হয়তো আমিও , একজন পলিয়ানা, ঈশ্বরের পর্যবেক্ষন আর নজরদারী নিয়ন্ত্রন ছাড়া মানুষ ভালো থাকতে পারবে এমনটাই বিশ্বাস করে যে; কিন্তু অন্যদিকে মন্ট্রিয়লের বেশীর ভাগ জনগোষ্ঠী মুলত ধর্মবিশ্বাসী, তাহলে ঈশ্বর ভয় কেন তাদেরকে এসব কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি, যখন পৃথিবী মানুষ পুলিশরা সাময়িকভাবে দৃশ্য থেকে বিদায় নিয়েছিল? মন্ট্রিয়লের এই পুলিশ ধর্মঘট কি খুব ভালো একটি প্রাকৃতিক পরীক্ষা ছিলনা, যা আমাদের ঈশ্বর বিশ্বাস আমাদের ভালো মানুষ বানায় এমন হাইপোথিসিসটি টেস্ট করার সুযোগ করে দেয়? বা নৈরাশ্যবাদী এইচ এল মেনকেন ঠিক বলেছিলেন, যখন তিনি তার তীর্যক পর্যবেক্ষন করেছিলেন, ’মানুষ বলে আমাদের ধর্ম প্রয়োজন যখন তারা আসলে বোঝাতে চায় আমাদের প্রয়োজন আসলে পুলিশের’;

স্পষ্টতই মন্ট্রিয়লের সবাই কিন্তু সেদিন খারাপ ভাবে আচরণ করেননি যখনই দৃশ্য থেকে পুলিশ চলে যায়; একটি বিষয় জানা খুব কৌতুহলোদ্দীপক হবে  যদি দেখা সম্ভব হয়- সেখানে কোন ধরনের পরিসংখ্যানগত প্রবণতা আছে কিনা- তা যত সামান্য হোক না কেন-অবিশ্বাসীদের ধর্মবিশ্বাসীওদর তুলনায় বেশী লুটপাট এবং ধ্বংশযজ্ঞ চালিয়েছিল কিন?;  তবে এ বিষয়ে আমার তথ্যপুষ্টহীন ভবিষ্যদ্বানী হচ্ছে, ঠিক এর বীপরিতটাই ঘটেছে; নৈরাশ্যবাদী সুরে প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে ফক্সহোলে কোন নীরিশ্বরবাদী নেই ( এটি একটি প্রচলিত প্রবাদ,There are no atheists in foxholes, যা প্রায়শই যুক্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয় এই বলে যে, প্রচন্ড বিপদের মুখে, বা চাপে, যেমন বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে, প্রত্যেকেই কোন না কোন স্বর্গীয় শক্তিতে বিশ্বাস করে বা আশা করে এমন কোন শক্তির উপস্থিতি আছে) ; তবে আমি সন্দেহ করতে ইচ্ছা পোষন করছি ( কিছুটা প্রমান সহ, যদিও সেখান থেকে উপসংহার টানা বেশী সরলীকরণ হয়ে যাবে) জেলখানায় খুব কমই নাস্তিক আছেন; আমি অবশ্যই দাবী করছিনা নিরীশ্বরবাদিতা নৈতিকতা বৃদ্ধি করে, যদিও হিউম্যানিজম বা মানবতাবাদ – যে এথিকাল বা নীতিগত দর্শনটি নীরিশ্বরবাদীদের সাথে প্রায়ই যুগপৎ অবস্থান করে – সম্ভবত সেই কাজটি করে; আরেকটি ভালো সম্ভাবনা হতে পারে যে নীরিশ্ববাদীতা  আরো একটি তৃতীয় নিয়ামকের সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেমন, উচ্চ শিক্ষা, বুদ্ধিমত্তা এবং কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করার প্রবণতা, যা অপরাধ করার প্রবণতাকে প্রতিরোধ করতে পারে; এই ধরনের গবেষনাগত প্রমান যতটুকু আছে, সেগুলো অবশ্যই ধর্মীয় বিশ্বাস এর সাথে নৈতিকতার কোন ইতিবাচক বা ধনাত্মক সম্পর্ক আছে  এমনস কোন সাধারন ধারনাকে সমর্থন করেনা; কোরিলেশন বা পারস্পরিক সম্পর্কের প্রমান কখনই চুড়ান্ত নয় ঠিকই তবে নীচের উপাত্তগুলো, যা স্যাম হ্যারিস তার Letter to a Christian Nation এ বর্ণনা দিয়েছিলেন সেগুলো নি:সন্দেহে নজরকাড়া;

যদিও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা সংশ্লিষ্টতা ধর্মীয় মানসিকতার একেবারে নির্ভুল সুচক হিসাবে গ্রহন করা যাবে না, তবে বিষয়টি আদৌ গোপন না যে, লাল বা রেড (রিপাবলিকান) অঙ্গরাজ্যগুলো প্রধানত রেড কারন বিশেষভাবে  রক্ষনশীল খৃষ্টানদের সংখ্যাগরিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য; যদি খৃষ্টীয় রক্ষনশীলতা ও সামাজিক স্বাস্থ্য সুচকগুলোর মধ্যে কোন শক্তিশালী সম্পর্ক থাকতো, তবে রেড-স্টেট যুক্তরাষ্ট্রে তার নির্দশন আমাদের দেখতে পারার কথা; যা আমরা কিন্তু দেখি না; যে ২৫ টি শহর, যেখানে ভয়ঙ্কর অপরাধের হার সর্বনিন্ম, তার শতকরা ৬২ শতাংশ অবস্থিত নীল ( ডেমোক্র্যাটিক প্রধান) আর ৩৮ শতাংশ লাল ( রিপাবিলিকান প্রধান ) অঙ্গরাজ্যগুলোতে; আর যে পচিশটি শহর যেখানে ভয়ঙ্কর অপরাধের হার সবচেয়ে বেশী, সেই তালিকার শহরগুলোর ৭৬ শতাংশ লাল ও ২৪ শতাংশ নীল অঙ্গরাজ্যগুলোতে অবস্থিত; বাস্তবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের পাচটি সবচেয়ে অপরাধ প্রবণ শহরের তিনটি অবস্থিত বিশেষভাবে ধার্মিক অঙ্গরাজ্য টেক্সাসে; গৃহ অনুপ্রবেশ ও চুরির হার বেশী এমন শীর্ষ বারোটি অঙ্গরাজ্যে লা বা রিপাবলিকান প্রধান; এছাড়া চুরির হার বেশী এমন ২৯ টি রাজ্যের ২৪টি লাল; খুনের হারের দিক থেকে শীর্ষে থাকা মোট ২২ টি রাজ্যের মধ্যে ১৭টি লাল ((লক্ষ্য করুন এই লাল আর নীল রঙ এর বন্টন যা অ্যামেরিকায় আমরা দেখি, ব্রিটেন এ কিন্তু তা ঠিক এর বীপরিত, যেখানে নীল হচ্ছে কনজারভেটিভ পার্টির রঙ, এবং লাল, সারা পৃথিবীর মতই ঐতিহ্যগত ভাবে রাজনৈতিক বাম মতাদর্শদের সাথে সম্পর্কযুক্ত));

পদ্ধতিগত গবেষনা যদি কিছু থাকে সেটাও এই সম্পর্কগুলোকে সমর্থন করারই প্রবনতা প্রদর্শন করে; গ্রেগরী এন পল, জার্ণাল অব রেলিজিয়ন অ্যান্ড সোসাইটি (২০০৫) এ তার প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ১৭ টি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের মধ্যে একটি তুলনামুলক আলোচনা করেন এবং ধর্মীয় দাবীকে পুরোপুরি ধ্বংশ করে দেবার মত  একটি উপসংহারে উপনীত হন:  উন্নত গণতন্ত্রর দেশগুলোতে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসের এবং উপাসনার উচ্চ হার  মানব হত্যা, শিশু, কিশোর এবং অল্প বয়সে মৃত্যুর উচ্চ হার, যৌনরোগের প্রাদুর্ভাবে উচ্চ হার, অল্পবয়সে গর্ভধারন, গর্ভপাতে উচ্চ হার এর সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত; ড্যান ডেনেট, তার Breaking the Spell, এ বিষয়ে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করেছিলেন, যদিও স্যাম হ্যারিসের এর নির্দিষ্ট এই বইটির প্রতি নয়, সাধারনভাবে এ ধরনের গবেষনা নিয়ে;

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন যে, এই ফলাফলগুলো, ধর্ম মনাদের মধ্যে নৈতিকতাবোধ অপেক্ষাকৃত বেশী এ ধরনের প্রচলিত দাবীকে এত দৃঢ়ভাবে আঘাত করেছিল যে, পরবর্তীতে  উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষনা হাতে নেয় ধর্মীয় সংস্থাগুলো এই উপসংহার খন্ডনের জন্য……একটা বিষয়ে আমরা নিশ্চিৎ হতে পারি যে, ’যদি’ নৈতিক আচরণ ও ধর্মীয় সংশ্লিষ্টতা, বিশ্বাস ও আচরণের মধ্যে গুরুত্বপর্ণ কোন সম্পর্ক থেকে থাকে খুব শীঘ্রই তা জানা যাবে; বিশেষ করে যখন অসংখ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান উৎসাহের সাথে তাদের এই প্রথাগত বিশ্বাসকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমান করার চেষ্টা করছেন (তারা সাধারণত বিজ্ঞানের সত্য সন্ধানের প্রক্রিয়াটি দেখে বেশ মুগ্ধ হন, যখন তারা যা ইতিমধ্যে বিশ্বাস করেন, সেটিকে বিজ্ঞান সমর্থন করে); প্রতিটি মাস যা অতিক্রান্ত হচ্ছে যখন এ ধরনের কিছু প্রমান উপস্থাপন ছাড়া, আসলে এই বিষয়টি সেই সন্দেহর দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে, আদৌ সে রকম কিছু হবে না;

চিন্তাক্ষম বেশীর ভাগ মানুষই স্বীকার করবেন, কোন ধরনের পুলিশের মত নজরদারী ছাড়া বিদ্যমান যে নৈতিকতাবোধ কোন না কোন ভাবে আসলেই সত্যিকারের নৈতিকতাবোধ, সেই মিথ্যা নৈতিকতাবোধের তুলনায় অনেক শ্রেয়, যে মিথ্যা নৈতিকতাবোধ উধাও হয়ে যায় যে মুহুর্তে পুলিশরা ধর্মঘটে যায় বা  লুকানো গোপন ক্যামেরা বন্ধ হয়; সেই স্পাই ক্যামেরা সত্যিকারের হোক, যা কিনা পুলিশ নজর রাখে কিংবা স্বর্গে থাকা কোন কাল্পনিক ক্যামেরাই হোক না কেন; কিন্তু হয়তো এটা পক্ষপাতমুক্ত না, নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে, যদি ঈশ্বর না থাকে তাহলে ভালো হবার কি প্রয়োজন এই প্রশ্নটি ব্যবচ্ছেদ করা (( এইচ এল মেনকেন, আবারও তার বৈশিষ্টসুচক নৈরাশ্যবাদীতায় বিবেককে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন, ভিতরের সেই কন্ঠস্বরকে যা আমাদের সাবধান করে দেয় কেউ হয়তো আপনাকে দেখছে))); কোন ধর্মীয় চিন্তাবিদ হয়তো আরো আন্তরিক কোন নৈতিকতা পুর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারবেন কাল্পনিক কোন ধর্মের পক্ষে সাফাই গাওয়া কোন অ্যাপোলজিষ্টের নীচের বক্তব্যের আদলে.. “আপনি যদি ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেন, তাহলে আপনি নৈতিকতার কোন চুড়ান্ত মানদন্ডে বিশ্বাস করেন না; পৃথিবী সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম সদিচ্ছা নিয়ে আমি হয়তো ভালো মানুষ হবার চেষ্টা করবেন, কিন্তু আপনি কিভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ? শুধু ধর্মই পারে আপনাকে সেই ভালো আর মন্দর চুড়ান্ত মানদন্ডটি দিতে; ধর্ম অনুপস্থিতিতে এটি আপনাকে প্রয়োজন মাফিক বানিয়ে নিতে হবে; সেই নৈতিকতা হবে কোন নিয়ম গ্রন্থহীন; যখন প্রয়োজন তখন তৈরী করা নৈতিকতা; যদি নৈতিকতা শুধু মাত্র পছন্দ অপছন্দের ব্যপার হয়, তাহলে হিটলারও নিজেকে নৈতিক বলেই দাবী করতে পারে তার নিজস্ব ভ্রান্ত জীনগত বিশুদ্ধতা ধারনাপুষ্ট চিন্তাধারার ধারা অনুপ্রানিত হয়ে; এবং সব নাস্তিকরা যা করতে পারে তা হলো একটি ব্যক্তিগত পছন্দ বেছে নিতে যা দিয়ে তারা ভিন্নভাবে জীবনযাপন করবে; খৃষ্টার, ইহুদী বা মুসলিমরা এর ব্যতিক্রম, তারা অশুভ কোন কিছুর একটি চুড়ান্ত অর্থ দিতে পারে, যা স্থান কাল পাত্র ভেদে অভিন্ন এবং সেটি অনুযায়ী হিটলার চুড়ান্তভাবে অশুভ একটি চরিত্র‘;

Brad Holland2
ছবি: ব্রাড হল্যান্ড এর আরেকটি ইলাসট্রেশন

এমন কি  যদি সত্যিও হয়, আমাদের নৈতিকতা সম্পন্ন হতে ঈশ্বরের প্রয়োজন আছে, সেটা অবশ্যই ঈশ্বরের অস্তিত্বর সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয় না, শুধু তার অস্তিত্ত্বকে বেশী কাঙ্খিত করে তোলে (বেশীর ভাগ মানুষই এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করতে পারেনা), কিন্তু সেটা বিবেচ্য বিষয় না এখানে; আমার কাল্পনিক ধর্ম সমর্থনকারী ব্যক্তিটির কোন প্রয়োজন নেই স্বীকার করার যে, ঈশ্বরের তোষামদ করা হচ্ছে তার জন্য ভালো কাজ করার জন্য ধর্মীয় প্রনোদনা; বরং  তিনি দাবী করছেন যে ভালো কিছু করার ‘উদ্দেশ্য‘যেখান থেকেই আসুক না কেন, ঈশ্বর ছাড়া কোন মানদন্ডই বা সিদ্ধান্তকারক নেই যা দিয়ে আমরা নির্ধারন করতে পারি কোনটি ভালো; আমরা প্রত্যেকেই ভালোর একটি নিজস্ব সংজ্ঞা তৈরী করে নিতে পারি এবং সেভাবে আচরন করতে পারি; শুধু ধর্মের উপর ভিত্তি করে থাকা নৈতিক মুলনীতি ( এর বীপরিতে ধরুন গোল্ডেন রুল, যা ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট করা হচ্ছে অহরহ  কিন্তু তাদের উৎপত্তি হতে পারে অন্য কোথাও) কে বলা যেতে পারে অ্যাবসল্যুটিষ্ট বা চুড়ান্তবাদী ; ভালো হচ্ছে ভালো আর খারাপ হচ্ছে খারাপ এবং আমরা কোন বিশেষ ক্ষেত্রে কি হবে যেমন কেউ কষ্ট সহ্য করছে, তা নিয়ে মাথা ঘামাই না, আমার ধর্মীয় সমর্থনকারী দাবী করবে যে শুধু ধর্মই পারে কোনটা ভালো তার সিদ্ধান্ত নেবার ভিত্তি রচনা করতে,

বেশ কয়েকজন দার্শনিক, উল্লেখযোগ্যভাবে কান্ট (Kant), চুড়ান্ত বা অ্যাবসোল্যুট নৈতিকতার উৎস খোজার চেষ্টা করেছিলেন ধর্মীয় পরিমন্ডলের বাইরে; যদিও নিজে একজন ধার্মিক মানুষ ছিলেন, তার সময়ে যা অবশ্যম্ভাবী ছিল ((( এটি কান্টের দৃষ্টিভঙ্গীগুলোর একটি মানসম্পন্ন ব্যাখ্যা; তবে বিখ্যাত ‍দার্শনিক এ সি গ্রেলিং ব্যাখ্যা সহ যুক্তি দিয়েছিলেন (নিউ হিউম্যানিষ্ট জুলাই-আগষ্ট ২০০৬)) যে, যদি কান্ট বাহ্যিকভাবে তার সময়ে ধর্মীয় প্রধান সব আচার অনুষ্ঠানই মেনে চলতেন তবে তিনি আসলে সত্যি একজন নাস্তিক ছিলেন))); কান্ট নৈতিকতাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন তার ঈশ্বরের উপর নয় বরং কর্তব্যর খাতিরে কর্তব্য সম্পাদনের উপর; তার বিখ্যাত ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পেরাটিভ (((কান্টের নৈতিক দর্শনে কেন্দ্রে আছে ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পেরাটিভ বা Categorical imperative, যা মুলত কোন কাজের উদ্দেশ্য বা মোটিভেশনকে মুল্যায়ন করার জন্য ব্যবহৃত হয়; তার ভাষায় ইম্পেরাটিভ হচ্ছে যে কোন একটি প্রস্তাব যা কোন কাজকে চিহ্নিত করে আবশ্যিক হিসাবে; দুই ধরনে ইম্পেরাটিভ এর প্রস্তাব করেছিলেন তিনি, Hypothetical imperatives যার প্রযোজ্য হয় যখন কেউ সেই কাজের উপর নির্ভর করে কোন একটি নির্দিষ্ট ফলাফল অর্জন করতে; যেমন আমি যদি আমার তৃষ্ণা পায়, আমাকে পান করতে হবে কিছু; কিন্তু ক্যাটেগরিক্যাল ইম্পেরাটিভ হচ্ছে কোন চুড়ান্ত বা অ্যাবসোল্যুট, নি:শর্ত প্রয়োজন যা যে কোন পরিস্থিতিতে যে কারো জন্য প্রযোজ্য, যা প্রয়োজনীয় এবং এর মুল উদ্দেশ্যও সেই কাজটির মধ্যে নিহিত; যে দাবীটির যৌক্তিকতা কোন উদ্দেশ্য বা ফলাফল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়; যেমন চুরি করা যাবে না, একটি ক্যাটেগরিকাল ইম্পেরাটিভ, যা Hypothetical imperative থেকে আলাদা, যেমন যদি জনপ্রিয় হতে চাও তাহলে চুরি করো না কান্টের সবচেয়ে বিখ্যাত Categorical imperative টি হলো Act only according to that maxim whereby you can, at the same time, will that it should become a universal law))) আমাদের নির্দেশ দেয়, শুধু মাত্র এমন বিধি অনুযায়ী আচরণ করো যেখানে আপনি একই সাথে পারবেন এবং ইচ্ছা করতে পারবেন যে সেটা সর্বজনীন আইনে রুপান্তরিত হয়; এটা বেশ ভালোভাবেই কাজ করে মিথ্যা কথা বলার উদহারনের সাথে;এমন একটি পৃথিবীর কথা কল্পনা করুন, যেখানে মানুষ নীতিগত কারনে মিথ্যা কথা বলে, যেখানে মিথ্যা বলার কাজটিকে একটি ভালো এবং নৈতিক গুন হিসাবে বিচার করা হয়, এই ধরনের পৃথিবীতে, মিথ্যা কথা বলার ব্যপারটারই কোন অর্থ থাকবে না একসময়; কারন মিথ্যা জন্য প্রয়োজন ‘সত্য‘ সম্বন্ধে পুর্বধারনার উপস্থিতি তার একেবারে সংজ্ঞার জন্য; যদি কোন নৈতিক মুলনীতি হচ্ছে এমন কিছু যা কিনা সবাই অনুসরণ করবে বলে আমরা ইচ্ছা পোষন করে থাকি, তাহলে মিথ্যা কথা বলা কখনোই নৈতিক মুলনীতি হতে পারবে না কারন এই মুলনীতিটি নিজেই এর অর্থহীনতার কারনে অকেজো হয়ে পড়বে; মিথ্যা কথা বলা, জীবনের একট আইন হিসাবে, অন্তর্গত ভাবেই অস্থিতিশীল; আরো সাধারন অর্থে, স্বার্থপরতা বা ফ্রি-রাইডিং বা বিনাশ্রমে আরেকজনের সদিচ্ছার উপর ভর করে নিজের উপকার আদায় করে নেয়া বা পরজীবিতা হয়তো আমার জন্য একা্র জন্য কাজ করবে, একজন একাকী স্বার্থপর ব্যক্তির হিসাবে এবং আমার নিজেকে ব্যাক্তিগত সন্তুষ্টি দেবে; কিন্তু নিশ্চয়ই আমি আশা করতে পারিনা যে নৈতিক মুলনীতি হিসাবে সবাই স্বার্থপর পরজীবিতার নীতি অনুসরণ করবে, এর কারন শুধুমাত্র একটি হলেও তাহলো, কারো উপর তাহলে আমি আমার পরজীবিতার জীবন চাপিয়ে দিতে পারবো না;

কান্টীয় ইম্পেরাটিভগুলো আপাতদৃষ্টিতে কাজ করে, সত্যি কথা বলা এবং অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে; খুব সহজ নয় এটা বোঝা যে এই ধারনাটিকে কিভাবে সামগ্রিকভাবে সাধারন নৈতিকতার ক্ষেত্রে্ও সম্প্রসারণ করা যায়; কান্ট সত্ত্বেও, আমার সেই কাল্পনিক ধর্মীয় অ্যাপোলজিষ্ট এর সাথে একমত হবার প্রতি একটি প্রলোভন কাজ করে তা হলো চরম বা অ্যাবসল্যুটিষ্ট নৈতিকতার বিষয়গুলো সাধারনত পরিচালনা করে থাকে ধর্ম;  কোন অনারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত মুমুর্ষ রোগীর নিজের অনুরোধের উপর ভিত্তি করে তাকে যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দেয়াটা কি আসলেই সবসময় ভুল হবে? আপনার নিজের লিঙ্গর কারো সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়াটি আসলেই কি সবসময় ভুল হবে? কোন একটি ভ্রুণকে হত্যা করা কি আসলেই সবসময় ভুল? অবশ্য এমন মানুষ আছেন যারা ঠিক তাই বিশ্বাস করেন এবং তারা এর বিরুদ্ধে কোন তর্ক বা যুক্তির জায়গা রাখেন না; তারা মনে করে, যারা এ বিষয়ে দ্বিমত পোষন করবেন তাদেরকে গুলি করে হত্যা করা যেতে পারে: অবশ্যই রুপকার্থে, আক্ষরিক অর্থে না– শুধু মাত্র আমেরিকার অ্যাবরশন ক্লিনিকের কিছু চিকিৎসক ছাড়া (পরবর্তী অধ্যায় দেখুন); সৌভাগ্যজনকভাবে যদিও নৈতিকতার কোন বিষয়কে যে চুড়ান্তই হতে হবে এমন কোন কারণ নেই;

মোরাল দার্শনিক হচ্ছে মুলত: পেশাজীবি, যারা কোন ভালো আর কোনটা খারাপ সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেন; রবার্ট হিন্ড চমৎকারভাবে যা বলেছিলেন, ’তারা একমত যে, নৈতিক ধারনা, দৃষ্টিভঙ্গীগুলোর যুক্তি দ্বারা তৈরী হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই, তবে তা যুক্তি দিয়ে রক্ষা করতে পারার মত অবশ্যই হতে হবে‘;মোরাল দার্শনিকরা নিজেদেরকে নানাভাবে শ্রেনীবিভাগ করে থাকেন, তবে আধুনিক শব্দমালায় মুল বিভাজনটি হচ্ছে:  ‘deontologists’ বা ডিওন্টোলজিষ্ট (যেমন কান্ট) এবং  ‘consequentialists’ বা কনসিকোয়েন্সালিষ্ট (যেমন উটিলিটারিয়ান, জেরেমি বেনথাম, ১৭৪৮ -১৮৩২);  ডিওন্টোলজী হচ্ছে সেই বিশ্বাসের একটি পোষাকী নাম, যা দাবী করে নৈতিকতা মুলত: বিধি বা নিয়ম মেনে চলা, আক্ষরিক অর্থে এটি কর্তব্যর বিজ্ঞান, শব্দটির গ্রীক অর্থ যা কিছুর শর্ত দেয়া আছে; ডিওন্টোলজী কিন্তু নৈতিক অ্যাবসল্যুটিজম মত একই জিনিস নয়, কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ম বিষয়ক কোন বইয়ে এই দুটির পার্থক্য নিয়ে সময় নষ্ট করার কোন প্রয়োজন নেই; অ্যাবসল্যুটিষ্টরা বিশ্বাস করেন, সঠিক এবং ভুলের একটি নিরঙ্কুশ বা চুড়ান্ত একটি অবস্থান আছে; যে অবশ্যকর্তব্য বা  ইম্পেরাটিভগুলো যাদের দৃঢ় আঁটসাঁট বাধুনী তাদের ফলাফল বা পরিণতি সম্পর্কে কোন ধরনের তথ্য দেয় না; পরিনতিবাদী বা কনসিকোয়েন্সশিয়ালিষ্টরা আরো প্রাগম্যাটিক বা প্রয়োগবাদী মানসিকতায় বিশ্বাস করে যে, কোন একটি কাজের নৈতিকতাকে বিচার করা যাবে তার পরিণতি বা ফলাফল বিচার করার মাধ্যমে; কনসিকোয়েন্সশিয়ালিষ্টদের একটি সংস্করণ হচ্ছে উপযোগিতাবাদ বা ইউটিলিটারিয়ানিজম, বেনথাম ও তার বন্ধু জেমস মিল (১৭৭৩-১৮৩৬) এর মিলস এর ছেলে জন স্টুয়ার্ট মিলস (১৮০৬-১৮৭৩) সাথে যে দর্শন সংশ্লিষ্ট। উপযোগিতাবাদের এর সারাংশটি দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রায়শই বেনথামের খানিকটা অসঠিক মন্তব্য দিয়ে প্রকাশ করা হয়: greatest happiness of the greatest number is the foundation of morals and legislation’ বা সবেচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষের জন্য সবেচেয়ে বেশী সুখ হচ্ছে  নৈতিকতা এবং আইনের মুল ভিত্তি ;

সব চুড়ান্তবাদ কিন্তু ধর্ম থেকে আসেনি; তাসত্ত্বেও, চরমবাদীদের নৈতিকতাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন ছাড়া অন্য কোন প্রেক্ষাপটে বিচার করাটা খুব কঠিন;একটি প্রতিদ্বন্দী যা আমি চিন্তা করতে পারি তা হলো দেশপ্রেম, বিশেষ করে যুদ্ধের সময়; বিখ্যাত স্পেনীয় চিত্রপরিচালক লুইস বুনুয়েল বলেছিলেন, ’ঈশ্বর এবং দেশ হচ্ছে অপরাজিত একটি টিম; তারা নিপীড়ন এবং রক্তপাতের সকল রেকর্ড ভঙ্গকারী’; সেনাবাহিনীর নিয়োগকর্তারা বিশেষভাবে নির্ভর করেন তাদের শিকারদের দেশপ্রেমের উপর; প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নারীরা যে সমস্ত তরুণরা সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়নি তাদের সাদা পালক বিতরণ করতো এই বলে যে:

ওহ, আমরা তোমাদের হারাতে চাইনা, কিন্তু  আমরা মনে করি তোমাদের যুদ্ধে যাওয়া উচিৎ, কারন রাজা এবং দেশ উভয়েরই প্রয়োজন আছে তোমরা যেন সেভাবে দ্বায়িত্ব নাও;

যারা কনসায়েনশাস অবজেক্টর বা বিবেকের তাড়নায় যুদ্ধে অংশগ্রহন করেনি, তাদের মানুষ ঘৃণা করেছিল, এমন কি যারা দেশের শক্র তাদের ক্ষেত্রেও ;  কারণ দেশপ্রেমকে চুড়ান্ত বা অ্যাবসল্যুট গুন হিসাবে মনে করা হয়, কোন পেশাগত সৈন্যর বিশ্বাস করা ‘সঠিক কিংবা ভুল হোক আমার দেশ’ এর চেয়ে চুড়ান্ত কিছু খুজে পাওয়া কঠিন; কারন এই শ্লোগান আপনাকে বাধ্য করবে যে কাউকে হত্যা করার জন্য, যাকে ভবিষ্যতে কোন রাজনীতিবিদরা হয়তো শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করবে; পরিনতিবাদী যুক্তিতর্ক হয়তো যুদ্ধে যাবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটিকে প্রভাবিত করতে পারে কিন্তু একবার যখন যুদ্ধ ঘোষনা হয়, চুড়ান্ত দেশপ্রেম তার দৃঢ় শক্তি দিয়ে সব কিছু অধিগ্রহন করে, যে ধরনের শক্তি সাধারনত ধর্মের বাইরে দেখা যায় না; একজন সৈন্য যে তার নিজস্ব পরিনতিবাদী চিন্তাকে অনুমতি দেয় বেশী বাড়াবাড়ি না করতে, তার নিজেকে কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি দেখবার ও এমনকি মৃত্যুদন্ডে প্রান হারাবার সম্ভবনা বেশী;

নৈতিক দর্শন নিয়ে এই আলোচনার সুত্র ছিল ধর্মবাদীদের একটি হাইপোথেটিক্যাল দাবী যে, ঈশ্বর ছাড়া, নৈতিকতা হচ্ছে আপেক্ষিক এবং কাল্পনিক; কান্ট এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত মোরাল দার্শনিকরা বাদে এবং দেশপ্রেমের অনুভুতির তীব্রতার প্রতি যথাযোগ্য নজর সহ, অ্যাবসল্যুট মোরালিটির শ্রেয়তর উৎস হচ্ছে সাধারণত কোন না কোন একটি পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ, যাদের ব্যাখ্যা করা হয় এমন কর্তৃত্বশালী হিসাবে যার কর্তৃত্ব ইতিহাসের যৌক্তিকতা প্রমানের তোয়াক্কা করে না; আসলেই ধর্মগ্রন্থের কর্তৃত্বের অনুসারীরা হতাশাজনকভাবে খুব সামান্যই কৌতুহল প্রদর্শন করে তাদের ধর্মগ্রন্থের ঐতিহাসিক উৎপত্তি সম্বন্ধে ( সাধরণত যা  খুবই সন্দেহজনক);

পরবর্তী অধ্যায়ে যে বিষয়টি প্রদর্শন করবে তাহলো যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন, যে মানুষগুলো দাবী করে তাদের নৈতিকতাবোধগুলো তারা পেয়েছে ধর্মগ্রন্থ থেকে, তারা আসলে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তা কিন্তু ব্যবহার করছে না; এবং সেটি অবশ্যই ভালো, যা তারা নিজেদেরও, বিষয়টি নিয়ে কিছুটা ভাবলে সত্যটি স্বীকার করে নেয়া উচিৎ;

_____________________________________ ষষ্ঠ অধ্যায় (শেষ পর্ব) সমাপ্ত

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : ষষ্ঠ অধ্যায় (শেষ পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s