রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : ষষ্ঠ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

 আপনি কি একটি মানুষকে খুন করবেন, যদি তার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো পাচ জন মুমূর্ষ রোগীর জীবন বাচায়? (ছবি: ম্যাট মাহুরিনের ইলাসট্রেশন, ডিসকভার, জুলাই/আগষ্ট ২০১১)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন :  ষষ্ঠ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ,  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব) ,পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)
ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

 এই পর্বের সাথে একটি সম্পুরক লেখা পড়তে পারেন :  নৈতিকতার স্নায়ুবৈজ্ঞানিক উৎসের সন্ধানে 

 নৈতিকতার শিকড়: কেন আমরা ভালো?

নৈতিকতার শিকড় সংক্রান্ত একটি কেস স্টাডি:

যদি আমাদের নৈতিকতাবোধ, যৌন কামনার মত, আসলেই আমাদের ডারউইনীয় অতীতের গভীরে প্রোথিত হয়ে থাকে, যা কিনা ধর্মের উৎপত্তিরও বহু আগে, যে মানুষের মনের উপর কোন গবেষনায় আমাদের  তাহলে আশা করা ‍ উচিৎ যে এমন কিছু মোরাল ইউনিভার্সাল বা নৈতিকভাবে কিছু  ধ্রুব বিষয়গুলো লক্ষ্য করা যাবে  যা কিনা সকল ভৌগলিক ও সাংস্কৃতিক এবং গুরুত্বপুর্ণভাবে ধর্মীয় পরিমন্ডলেও স্থির থাকবে; হার্ভার্ড এর জীববিজ্ঞানী মার্ক হাউসার, তার বই Moral Minds: How Nature Designed our Universal Sense of Right and Wrong এ একটি গুরুত্বপুর্ণ চিন্তার সুত্রকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, চিন্তার পরীক্ষা বা থট এক্সপেরিমেন্ট এর উপযোগী মাধ্যমে, যা মুলত প্রস্তাব করেছিলেন নৈতিকতাবাদের বা মোরাল দার্শনিকরা; হাউসারের গবেষনা আরো একটি বাড়তি উদ্দেশ্য পুরন করে, তাহলো মোরাল দার্শনিকরা কিভাবে চিন্তা করেন এটি সেটির একটি ভুমিকা দেয়; একটি কাল্পনিক বা হাইপোথেটিকালী নৈতিক দ্বন্দ বা উভয় সঙ্কটময় পরিস্থিতি উপস্থাপন করা হয় এবং সেই অবস্থার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার ক্ষেত্রে আমরা যে সমস্যার সন্মুখীন হই, সেটি আমাদের ভালো মন্দ বোঝার বোধ সম্বন্ধে কিছু ধারনা দেয়; যেখানে হাউসার দার্শনিকদের থেকে আরো বেশ খানিকটা এগিয়ে যান, তিনি মানুষের নৈতিকতাবোধ পরীক্ষা করার জন্য আসলেই পরিসংখ্যানগত সার্ভে এবং মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন, যেমন, ইন্টারনেটে করা প্রশ্নের মাধ্যমে আসল মানুষের নৈতিকতা বোধ নিয়ে গবেষনা করেন; বর্তমান আলোচনার  দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী, সবচেয়ে কৌতুহলোদ্দীপক ব্যপারটা হচ্ছে বেশীর ভাগ মানুষই একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যখন এই সব উভয় সঙ্কটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি তাদের করা হয়, এবং তারা তাদের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে সদৃশ্যতার সম্পর্ক তাদের সেই সিদ্ধান্তের পৌছানোর নেপথ্যে কারনগুলো ব্যাখ্যা করার ক্ষমতার অনেক বেশী শক্তিশালী এবং সেটাই আমরা আশা করতে পারি যদি আমাদের নৈতিকতা বোধ আমাদের মস্তিষ্কের ভিতর আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা বা দৃঢ়ভাবে গাথা থাকে, যেমন আমাদের সহজাত যৌনপ্রবৃত্তি বা আমাদের উচ্চতা সংক্রান্ত ভীতি বা হাউসারর নিজে যেভাবে বলতে শ্রেয় মনে করেন, আমাদের ভাষা ব্যবহারে দক্ষতা ( খুটিনাটি বিষয়গুলো সংস্কৃতি স্বাপেক্ষে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এর গভীরে মুল ব্যকরনের সুত্রগুলো সর্বজনীন); আমরা পরে যা দেখবো, মানুষরা এই সব নৈতিক পরীক্ষাগুলোর যেভাবে প্রত্যুত্তর করে এবং সেই উত্তরের কারনকে ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে তাদের অক্ষমতা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের ধর্মবিশ্বাস থাকা বা না থাকা উপর নির্ভরশীল নয় বলেই প্রতীয়মান হয়; হাউসার এর বই এর বার্তা তার নিজের শব্দে, যা আশা করতে পারি তা হোলো: আমাদের নৈতিকতা নির্ভর কোন কিছু বিচার করার ক্ষমতা হচ্ছে সর্বজনীন একটি নৈতিক ব্যকরনের মত, আমাদের মনের একটি ফ্যাকাল্টি বা ক্ষমতা যা বিবর্তিত হয়েছে মিলিয়ন বছর ধরে, যা একগুচ্ছ মুল নীতির উপর ভিত্তির উপর গড়ে তুলে সম্ভাব্য বেশ কিছু নৈতিক সিস্টেম এর রেন্জ; ভাষার মতই, মুলনীতিগুলো যা আমাদের নৈতিক ব্যকরনের মুলনীতিগুলোর ভিত্তি রচনা করে তা আমাদের সচেতনতার স্তরে ধরা পড়ে না; ‍

গবেষনাটিতে হাউজার এর ব্যবহৃত বৈশিষ্টসুচক নৈতিক উভয় সঙ্কটময় পরিস্থিতিগুলো রেললাইনের উপর লাগামহীন ছুটে চলা ( বা রানাওয়ে) ট্রাক বা ট্রলির দৃশ্যপটের যা বেশ কিছু মানুষের মৃত্যুর কারন হতে পারে এমন থীমেরই রকমফের; সবচেয়ে সরলতম কাহিনীটি কল্পনা করছে একজন ব্যক্তি, যার নাম ডেনিস, এমন কয়েকটি বিশেষ অবস্থানে দাড়িয়ে আছে, যে সে চাইলে জোরে ধেয়ে আসা ট্রলিটিকে ভিন্ন পার্শ্ববর্তী একটি ট্র্যাকে ঘুরিয়ে দিতে পারে, এবং তার মাধ্যমে মুল ট্র্যাক লাইনের উপর আটকে পড়া পাচ জন ব্যক্তির জীবন সে বাচাতে পারবে; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পাশের সেই লাইনের উপরও একজন মানুষ আটকে আছে, কিন্তু যেহেতু সে একা, মুল লাইনে আটকে থাকা বাকী পাচজন মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সে হেরে যায় এবং গবেষনায় অংশ নেয়া বেশীর ভাগ মানুষই মনে করেন ডেনিসের জন্য ট্রলীটির গতিপথ পরিবর্তন করার সুইচ নাড়ানো এবং পাশের লাইনে একজনের মৃত্যুর বদলে বাকী পাচ জনকে মৃত্যুর ‍হাত থেকে বাচানো নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য, যদিও কেউ মনে করেনটি কাজটি ডেনিস এর জন্য বাধ্যতামুলক; আমরা এখানে হাইপোথেটিক্যাল কিছু সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করেছি, যেমন যে মানুষটা সেই সাইড রেললাইনে দাড়িয়ে আছে,তিনি হতে পারেন বীটহোভেন কিংবা ডেনিসেরই কোন ঘনিষ্ট একজন বন্ধু;

ছবি: একটি এথিক্যাল থট প্রবলেম যা ট্রলী প্রবলেম নামে পরিচিত।  একটি ধেয়ে আসা বিকল ট্রলী থেকে কয়েকজন অচেনা মানুষের জীবন বাচাতে আপনি কি আর একজন অচেনা মানুষকে বিসর্জন দিতে পারবেন, (ছবি: ম্যাট মাহুরিনের ইলাসট্রেশন, ডিসকভার, জুলাই/আগষ্ট ২০১১)

চিন্তার এই এক্সপেরিমেন্টটির বিস্তারিত বিবরন ক্রমান্বয়ে ধারাবাহিকভাবে আমাদের আরো কঠিন নৈতিক উভয়সংকটময় পরিস্থিতিগুলো ও ধাধার মুখোমুখি করে; কি হতে পারে যদি, ধেয়ে আসা ট্রলিটাকে আমরা থামিয়ে দিতে পারি উপরের একটি ব্রীজ থেকে ভারী কোন বস্তু তার সামনে ফেলে? খুবই সহজ প্রশ্ন, অবশ্যই আমরা ভারী ওজনটা নীচে ফেলবো সেই কাজটি করার জন্য; কিন্তু কি হবে যদি ভারী ওজনদার কিছু বলতে ব্রীজের উপর বসে থাকা খুব মোটা একটা মানুষ ছাড়া আর কিছুই আমাদের কাছে না থাকে, যে মানুষটা সেখানে বসে সুর্যাস্তের শোভা উপভোগ করছে? গবেষনায় প্রায় সবাই একমত হয়েছেন, মোটা এই মানুষটাকে ব্রীজের উপর থেকে ধাক্কা দিয়ে নীচে ফেলে দিয়ে ট্রলিটি থামানো অনৈতিক বা নৈতিকভাবে গ্রহনযোগ্য নয়;  লক্ষ্য করে দেখুন, এমনকি একটি দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এই উভয় সংকটটি কিন্তু একটু আগেই উল্লেখ করা ডেনিসের সংকটের মতই; যেখানে সে ট্র্যাক পরিবর্তনের সুইচ নামালে একজন হয়তো মারা যাবেন, তবে বাকী পাচ জনের জীবন বাচবে; উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে, আমাদের বেশীরভাগ মানুষের  মনে একটি শক্তিশালী সহজাত ধারনাগত অন্তর্দৃষ্টি বা ইনটুইশন আছে, সেটা হলো, এই দুটি কেস বা দৃশ্যপটের মধ্যে অবশ্যই কিছু মৌলিক গুরুত্বপুর্ণ পার্থক্য আছে, যদিও আমরা হয়তো স্পষ্ট করে বলতে পারবো না সেটা পার্থক্যটা আসলে কি।

ব্রীজের উপর থেকে মোটা মানুষটাকে নীচে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার দৃশ্যপটটি  হাউসারের প্রস্তাবিত অন্য একটি উভয় সঙ্কটের কথা মনে করিয়ে দেয়; এই দৃশ্যপটে আমরা দেখি পাচ জন রোগী যারা হাসপাতালে ভর্তি এবং যারা মরণাপন্ন, প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ প্রয়োজন, যা নষ্ট হয়ে গেছে; প্রত্যেককে বাচানো যাবে যদি কোন দাতাকে খুজে পাওয়া যায় তাদের প্রত্যেকের প্রয়োজনীয় সেই নির্দিষ্ট অঙ্গটি দান করার জন্য, কিন্তু কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু  হঠাৎ করে চিকিৎসক সার্জন লক্ষ্য করলেন, হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে বসে আছেস একজন সুস্থ্য সবল মানুষ, যার মধ্যে এই পাচটি অঙ্গই ভালোভাবে কাজ করছে এবং সেগুলো প্রতিস্থাপন করার যোগ্য, এরকম একটি পরিস্থিতি সম্ভবত একজনকেও খুজে পাওয়া যাবে না, যারা বলবেন এই একজনকে মেরে বাকী পাচ জনকে বাচানো নৈতিক কোন কাজ হবে;

ব্রীজের উপর দাড়ানো মোটা মানুষটির দৃশ্যপটের সেই ক্ষেত্রের মতই যে সহজাত তাড়নাগত অন্তর্দৃষ্টি, যা আমরা সবাই অনুভব করি তা হলো, সেখানে উপস্থিত কোন নিরপরাধ কাউকে তার পুর্ব অনুমতি ছাড়া অন্যদের জন্য হঠাৎ করে কোন খারাপ পরিস্থিতিতে টেনে আনা উচিৎ না; ইমানুয়েল কান্ট বিখ্যাতভাবে এই মুলনীতিটাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এভাবে: কখনোই কোন পরিস্থিতিতেই যৌক্তিক বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন কোন সত্ত্বাকে, শুধুমাত্র সম্মতিহীন কোন একটি উপায় হিসাবে কোন উদ্দেশ্যপুরণের লক্ষ্যে ব্যবহার করা উচিৎ নয়, এমন কি অন্যদের উপকার করা স্বার্থেও না; এই বিষয়টি মনে হচ্ছে, তিনটি দৃশ্যপট,  ব্রীজের উপর বসা মোটা মানুষ ( বা হাসপাতালের ওয়েটিং রুমে বসা মানুষ) বা ডেনিসের ক্ষেত্রে সাইড লাইনে দাড়ানো মানুষের মধ্যে মুল পার্থক্যটা সৃষ্টি করছে;  ব্রীজের উপর বসা মোটা মানুষটিকে সরাসরি ব্যবহার করা হচ্ছে বেপরোয়াভাবে ধেয়ে আসা ট্রলীটির গতিরোধ করতে, এটি সরাসরি কান্টিয় মুলনীতিকে অস্বীকার করছে; পাশের সাইড লাইনে দাড়ানো মানুষটি কিন্তু সরাসরি ব্যবহার করা হচ্ছে না পাচ জন মানুষের জীবন বাচানোর স্বার্থে এবং সেখানে শুধু পাশের লাইনটি ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রলীর গতিপথ বদলে দেবার জন্য আর সেই লাইনে দাড়িয়ে থাকাটা তার জন্য দুর্ভাগ্য মাত্র; কিন্তু আপনি যখন এভাবে বিভেদ রেখাটা টানেন দুজনের মধ্যে, সেটা আসলে আমাদের কোন ইচ্ছাকে সন্তুষ্ট করছে? কান্টের জন্য এটি হচ্ছে একটি নৈতিক ধ্রুব বা মোরাল অ্যাবসল্যুট; আর হাউসারের মতে, এটি আমাদের ভিতর দৃঢ়ভাবে গেথে দিয়েছে আমাদের বিবর্তন প্রক্রিয়া;

বেপরোয়া ছুটে আসা ট্রলীর এই কাল্পনিক পরিস্থিতিটি ক্রমান্বয়ে আরো ব্যতিক্রমী জটিল রুপ ধারন করে এবং সেই সাথে সংশ্লিষ্ট নৈতিক উভয়সঙ্কটও আরো জটিলতর হয়ে উঠে, হাউসার দুজন কাল্পনিক ব্যাক্তি, নেড ও অস্কারের অনুভুত অর্ন্তদ্বন্দর পার্থক্যটা আমাদের প্রদর্শন করেন; ট্র্যাক বা রেলওয়ে লাইনের পাশে দাড়িয়ে আছে নেড, ডেনিসের মতো সে ধেয়ে আসা ট্রলীটাকে সম্পুর্ণ অন্য একটা পাশের লাইনে সরিয়ে দিতে পারে না ঠিকই তবে নেড এর সুইচ ট্রলীকে একটি সাইড লুপের দিকে সরিয়ে দেয় যা আবার কিছুটা দুরে মুল লাইনে ফিরে আসে ঠিক পাচ জন মানুষ যেখানে আটকে আছে তার আগে; সুতরাং এই  বিন্দুতে শুধু মাত্র সুইচ দিয়ে কিছু হচ্ছে না,  ট্রলী ঠিকই পাচ জনকে মাড়িয়ে চলে যাবে, যখন সেই বিকল্প লাইনটি আবার মেইন লাইনের সাথে যুক্ত হয়; তবে ঘটনাচক্রে সেই ডাইভারশন বা বিকল্প লাইনে একটি খুবই মোটা মানুষ দাড়িয়ে আছে যার ওজন ট্রলীটিকে থামানোর জন্য যথেষ্ট; এখানে নেড কি সুইচের পয়েন্টটা বদলাবে এবং ট্রেনটিকে বিকল্প পথের দিকে নিয়ে যাবে, বেশীরভাগ মানুষের সহজাত ইনটুইশনই বলবে বলে সেটা করা উচিৎ হবে না নেড এর; কিন্তু নেড এর উভয় সংকট বা নৈতিক দ্বন্দর সাথে ডেনিস এর দ্বন্দটির কি পার্থক্য আছে ? ধারনা করা যেতে পারে, মানুষ তার প্রবৃত্তিগত ভাবে কান্টিয় মুলনীতি প্রয়োগ করছে এখানে ; ডেনিস ট্রলীটির গতিপথ অন্য দিকে সরিয়ে দেয় পাচজন মানুষকে বাচাতে, এবং এর দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি হয় এর পাশের লাইনে দাড়ানো একজন, সেটি হচ্ছে কোল্যাটেরাল ক্ষতি, রামসফেল্ডীয় চটকদার শব্দ যদি ব্যবহার করা হয়, যে লোকটি চাপা পড়বে তাকে ডেনিস ইচ্ছা করে ব্যবহার করছে না, অন্যদের বাচানোর জন্য ; নেড আসলেই মোটা ‍মানুষটাকে ব্যবহার করছে ট্রলীটাকে থামানোর জন্য এবং বেশীভাগ মানুষই (কোন চিন্তা ছাড়াই হয়ত), কান্টের ( বিস্তারিত ভাবে যিনি তা ভেবেছেন) মতই এই দুটি ক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য করছে;

Trolley_1

trolley2

ছবি: উপরের দুটি দৃশ্যপটে কোন কাজটি  আপনি নৈতিক ভাবে সমর্থনযোগ্য মনে করেন?

এই পার্থক্যটা আবার দেখা যায় অস্কারের উভয় সংকটে;  অস্কারের পরিস্থিতিটা নেডের মতই একই রকম, শুধু সেখানে ডাইভারশন লুপের সেই লাইনে পাথরের একটি ভারী জিনিস আছে যা ট্রলীটাকে থামাতে পারবে, স্পষ্টতই অস্কারের কোন সমস্যা হবার কথা না, সুইচ টেনে ট্রলীটাকে বিকল্প পথের দিকে নিয়ে যাওয়া, শুধুমাত্র ঘটনাচক্রে সেখানে একজন পথচারী সেই লোহার ওজনের ভারটির সামনে হেটে এসে পড়ে, সে অবশ্য মারা পড়বে যদি অস্কার সুইচটা টানে, যেমন নেড এর ক্ষেত্রে মোটা মানুষটার মত, পার্থক্যটা হচ্ছে অস্কার এই পথচারীকে উদ্দেশ্যমুলকভাবে ব্যবহার করছে না ট্রলীটিকে থামানোর জন্য, সে হচ্ছে এই পরিস্থিতির কোল্যাটেরাল ক্ষতি, ডেনিসের দ্বন্দের মত; হাউসার ও তার গবেষনায় বেশীভাগ অংশগ্রহন কারীদের মত, আমিও মনে করি অস্কারকে অনুমতি দেয়া যায় সুইচ দেবার জন্য, কিন্তু নেডকে না; কিন্তু এই সহজাত চিন্তা বা ইনটু্ইশনকে ব্যাখ্যা করাও আমার জন্য কঠিন, হাউসারের বক্তব্য হচ্ছে, এধরনের নৈতিক অন্তর্দৃষ্টি প্রায়শই খুব ভালো করে করা কোন চিন্তার বহিপ্রকাশ না ঠিকই কিন্তু সেগুলো আমরা খুবই দৃঢ়ভাবে অনুভব করতে পারি, আমাদের বিবর্তনীয় ঐতিহ্যের কারনে;

নৃতত্ত্ববিদ্যা ক্ষেত্রে এই গবেষনাটি নিয়ে একটি কৌতুহলোদ্দীপক উদ্যোগ গ্রহন করেন হাউসার ও তার সহকর্মীরা; নৈতিকতার এই পরীক্ষাগুলো তারা উপযোগী করে প্রয়োগ করেন কুনা আদীবাসীদের উপর; কুনা একটি মধ্য আমেরিকার ক্ষুদ্র একটি নৃগোষ্ঠী, যারা প্রাতিষ্ঠানিক কোন ধর্ম এবং পশ্চিমাদের সংস্পর্শে খুব একটা আসেনি কখনো। গবেষকরা লাইনের উপর দিয়ে ধেয়ে আসা  ট্রলী বদলে স্থানীয়ভাবে বোধগম্য বিকল্প রুপক ব্যবহার করেন, যেমন নৌকার দিকে সাতার কেটে এগিয়ে আসা কুমীর; সংশিষ্ট কিছু সামান্য পার্থক্য ছাড়া, কুনা আদীবাসীরাও আমাদের মতই একই নৈতিক বিচার বিবেচনার প্রমান দেয় তাদের গবেষনায়;

সবচেয়ে বিশেষভাবে যে বিষয়টি চিন্তার উদ্রেক করে এই বইটিতে, তা হলো হাউসার এর একটি ভাবনা; তাহলো ধর্মবাদী মানুষরা কি তাদের নৈতিক অন্তর্দৃষ্টির দিক থেকে নীরিশ্বরবাদীদের থেকে ভিন্ন কিনা; নিশ্চয়ই, যদি আমরা আমাদের নৈতিকতাবোধ পাই ধর্ম থেকে, তাহলে তো তাদের মধ্যে পার্থক্যটা থাকাই উচিৎ; কিন্তু যা দেখা গেল তা হলো, তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই;  নৈতিক দার্শনিক পিটার সিংগারকে নিয়ে হাউসার তিনটি হাইপোথেটিকাল উভয় সংকটের উপর দৃষ্টি দেন এবং এই তিনটি পরিস্থিতিতে নীরিশ্বরবাদীদের রায়ের সাথে ধর্মবাদীদের রায়ের একটি তুলনামুলক পর্যালোচনা করেন;  প্রত্যেক ক্ষেত্রে অংশগ্রহনকারীদের জিজ্ঞাসা করা হয়, কোন একটি কাল্পনিক সিদ্ধান্ত বা কাজ নৈতিকভাবে ‘আবশ্যিক’, ’অনুমতিযোগ্য’ বা ’নিষিদ্ধ’ কিনা তা চিহ্নিত করা; তিনটি ডাইলেমা বা উভয় সঙ্কট ময় কাল্পনিক পরিস্তিতি গুলো হোলো:

(১) ডেনিসের ডাইলেমা বা দ্বন্দ: নব্বই শতাংশ মানুষ বলেছে ট্রলিটিকে বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেয়া অনুমতিযোগ্য, পাচ জনকে মৃত্যুর হাত থেকে বাচাতে এক জনকে মারা যেতে পারে;

(২) আপনি একজন বাচ্চাকে পুকুরে ডুবতে দেখছেন এবং আশে পাশে কেউ নেই যে তাকে বাচাতে পারে একমাত্র আপনি ছাড়া; আপনি বাচ্চাটাকে বাচাতে পারবেন, কিন্তু আপনার প্যান্টটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে; ৯৭ শতাংশ মানুষই মনে করেন আপনার বাচ্চাকে উদ্ধার করা উচিৎ ( আশ্চর্যজনকভাবে ৩ শতাংশ মানুষ মনে করে তাদের জন্য প্যান্ট বাচানোটা শ্রেয়তর!!);

(৩)  অঙ্গ প্রতিস্থাপনের দৃশ্যপটটা যা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে :  ৯৭ শতাংশ মানুষই মনে করেন ওয়েটিং রুমে বসা একটা সুস্থ মানুষকে হত্যা করে তার শরীরের অঙ্গগুলো সংগ্রহ করা অবশ্যই নৈতিকভাবে নিষিদ্ধ একটি কাজ; যা এমনকি আরো পাচ জনের জীবন বাচাতে পারবে;

হাউসার এবং সিঙ্গার এর গবেষনাটির মুল উপসংহার হলো, পরিসংখ্যানগত দিক থেকে ধর্মবাদী এবং নীরিশ্বরবাদীদের এই বিষয়গুলো নিয়ে মতামত  বা নৈতিক বিচারের মধ্যে কোন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই; ব্যাপারটা কিন্তু সেই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামন্জষ্যপুর্ণ, যা আমি সহ আরো অনেকের দৃষ্টিভঙ্গী, যে ভালো কিংবা খারাপ বা অশুভ হবার জন্য আমাদের ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই;

 ছবি: আপনি কি আপনার ক্রন্দনরত শিশুকে হত্যা করতে পারবেন আপনাকে সহ সবাইকে বাইরের শক্র সেনা থেকে রক্ষা করতে? (ছবি: ম্যাট মাহুরিনের ইলাসট্রেশন, ডিসকভার, জুলাই/আগষ্ট ২০১১)

____________________ চলবে

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : ষষ্ঠ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s