রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

https://i2.wp.com/discovermagazine.com/~/media/Images/Issues/2012/dec/Evolution-Cooperation_Dec.jpg

ছবি: ষাটের দশকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী বিল হ্যামিলটন প্রথম প্রজাতির সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার গানিতীক মডেলটি প্রস্তাব করেছিলেন, তিনি প্রথম ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন নিজের ক্ষতি করেও অন্যের উপকার করার মানসিকতাটির, যে পরোপকারী মানসিকতার জন্ম হয় যখন প্রজাতির কোন সদস্য তার জীনগত আত্মীয়দের জীন রক্ষার্থে নিজেকে ঝুকির মধ্যে ফেলে; এমনকি যদি সেও মৃত্যুবরণ করে, তার সুফল ভোগ করবে তারই নিকটবর্তী জীনগত আত্মীয়, তারই পারিবারিক বংশধারা, তাদের সামগ্রিক ডিএনএ – সেই সাথে তার নিজেরটাও; এভাবেই জন্ম হয়েছিল ইনক্লুসিভ ফিটনেস এর তত্ত্বটি;  প্রানীদের প্রবনতা আছে নিজেদের আত্মীয় বা জীনগত কিনদের দেখাশোনা করার,  বিপদ থেকে রক্ষা করার, সম্পদ ভাগাভাগি, বিপদের সতর্ক করার বা কোন না কোন ভাবে নি:স্বার্থ ব্যবহার করার কারন স্পষ্টতই পরিসংখ্যানগতভাবে সম্ভাবনা থাকে তাদের আত্মীয়রা তাদের মত একই জীনের কপি বহন করে; কোন জীন যা কোন অর্গানিজম বা জীবদের একক কোন সদস্যদের প্রোগ্রাম করে তাদের জীনগত আত্মীয় বা জেনেটিক কিন দের সহায়তা করার জন্য পরিসংখ্যাগতভাবে সেই জীন এর অনুলিপি হবার সুবিধা পাবার সম্ভাবনাও বেশী; এই ধরনের জীনের সংখ্যা প্রজাতির জীনপুলে বেড়ে যেতে পারে এমন হারে যে যেখানে জীনগত আত্মীয় বা কিন পরার্থবাদীতা বা অ্যালট্রুইজম খুব স্বাভাবিক হয়ে দাড়াতে পারে; নিজেদের সন্তানদের প্রতি উপকারী হওয়া এর একটি স্পষ্ট উদহারন, কিন্তু এটাই একমাত্র এমন উদহারন নয়; মৌমাছি, ওয়াস্প, পিপড়া, টারমাইট এবং খানিকটা, কিছু নির্দিষ্ট মেরুদন্ডী যেমন ন্যাকেড মোল র‌্যাটস, মীরকাটস এবং অ্যাকর্ণ উডপেকাররা এমন একটি সমাজের বিবর্তন ঘটিয়েছে যেমন বড় ভাইবোনরা তাদের ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করে ( যাদের সাথে তারা তাদের জীনগুলোকে শেয়ার করার সম্ভাবনা থাকে); (Illustration by Asaf Hanuka)

 

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন :  ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ,  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব) ,পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)

 

নৈতিকতার শিকড়: কেন আমরা ভালো?

এই পৃথিবীতে আমাদের পরিস্থিতি খুবই অদ্ভুত; এখানে প্রত্যেকেই আমরা স্বল্প সময়ের অতিথি, আর আমাদের জানাও নেই কেন, তারপরও, মাঝে মাঝে আপাতদৃষ্টিতে স্বর্গীয় রুপ দিয়ে  সৃষ্টি করি কোন একটি উদ্দেশ্য। যদিও, দৈনন্দিন জীবনের দৃষ্টিকোন থেকে অন্তত একটা বিষয় আমাদের জানা আছে তা হলো: আমরা মানুষরা এখানে, অন্য মানুষের জন্য –আর সবার উপরে, বিশেষ করে তাদের জন্য, যাদের মুখের হাসি এবং ভালো থাকার উপরে আমাদের নিজেদের সুখী হবার বিষয়টি নির্ভরশীল;  আলবার্ট আইনস্টাইন 

অনেক ধার্মিক মানুষের জন্য কল্পনা করা বেশ কঠিন, কিভাবে, ধর্ম ছাড়া, কোন একজন মানুষ ভালো হতে পারে বা ভালো হবার জন্য আদৌ কোন ইচ্ছা বোধ করতে পারে। আমি এ ধরনের প্রশ্নগুলোই আলোচনা করবো এই অধ্যায়ে;  কিন্তু সন্দেহ আসলে আরো সর্বব্যপী এবং কিছু ধার্মিক মানুষ, তাদের বিশ্বাসকে ’বিশ্বাস’ করেন না যারা, প্রায়শই তাদের প্রতি তীব্র ঘৃনায় আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। এটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ, কারন অন্যান্য বিষয়গুলোর প্রতি ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীর পেছনে যে নৈতিকতার বিবেচ্য বিষয়গুলি লুকিয়ে থাকে, তাদের আসলেই নৈতিকতার সাথে কোন সত্যিকারের যোগসুত্র নেই; বিবর্তনের বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষাদান করার বিরোধীতার একটি বিশাল অংশরই আসলে বিবর্তনের সাথে বা কোন বৈজ্ঞানিক কিছূর সাথে কোন সম্পর্ক নেই, এটি উস্কে দিয়েছে দিয়ে নৈতিকতা নির্ভর তীব্র কিছু ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া, যা হতে পারে একেবারে সরল বুঝতে না পারা থেকে উদ্ভুত, যেমন, ’আপনি যদি ‍আপনার সন্তানকে শেখান যে, তারা বানর থেকে বিবর্তিত হয়েছে, তাহলে তারা সবাই বানরের মতই আচরণ করবে’ থেকে আরো জটিল অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য যেখানে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন এর ওয়েজ বা কাঠের গোজ স্ট্রাটেজী ( যেখানে  সৃষ্টিবাদী বা ক্রিয়েশনিষ্টরা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন এর ওয়েজ বা কাঠের গোজ স্ট্রাটেজী ব্যবহার করে বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যে প্রবেশ করতে চাইছে), যে অশুভ উদ্দেশ্যটির বিষয় নির্দয়ভাবে উন্মোচন করেছে বারবারা ফরেষ্ট এবং পল গ্রস তাদের Creationism’s Trojan Horse: The Wedge of Intelligent Design বইটিতে;

আমার বইগুলোর জন্য আমি পাঠকদের কাছ থেকে অসংখ্য চিঠি পাই, যাদের বেশীর ভাই অত্যন্ত্য উৎসাহব্যজ্ঞক ভাবে বন্ধুভাবাপন্ন, তাদের কিছু গঠনমুলক সমালোচনাপুর্ণ, কিছু খুবই নোংরা মানসিকতার এবং এমনকি খুবই হিংস্র; এবং আমি দু:খের সাথে বলছি সবচেয়ে নোংরা মানসিকতার চিঠিগুলোর মুল প্রণোদনা দায়ক বিষয়টি হচ্ছে ধর্ম; এধরনের অখৃষ্টসুলভ দুর্ব্যবহার সচরাচরই মুখোমুখি হতে হয় তাদের যাদেরকে খৃষ্ট ধর্মের শত্রু হিসাবে মনে করা হয়;  উদহারন হিসাবে একটি চিঠি, যা ইন্টারনেটে পোষ্ট করা হয়েছিল ব্রায়ান ফ্লেমিং কে উদ্দেশ্য করে, যিনি নীরিশ্বরবাদকে সমর্থন করে চমৎকার হৃদয়স্পর্শী এবং আন্তরিক একটি চলচ্চিত্র The God Who Wasn’t There এর লেখক এবং পরিচালক;  ‘Burn while we laugh’ শিরোনামে ব্রায়ান এর উদ্দেশ্যে লেখা এই চিঠিটির সময়কাল ২১ ডিসেম্বর ২০০৫, এবং যার ভাষা ছিল এরকম:

আপনার যে যথেষ্ট পরিমান সাহস আছে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিৎ; আমি খুবই চাই একটি ছুরি নিয়ে আপনাদের মত নির্বোধদের নাড়ি ভুড়ি বের করে দেই এবং আনন্দে চিৎকার করি, যখন আপনাদের সামনেই আপনাদের নাড়িভুড়িগুলো বের হয়ে আসতে থাকবে। আপনি সেই পবিত্র যুদ্ধটি শুরু করার চেষ্টা করছেন, যখন কোন একদিন আমি এবং আমার মত অনেকেই উপরে বর্নিত কাজটি করতে আনন্দের সাথে দায়িত্ব নেবে;

চিঠির এই পর্যায়ে লেখক হয়তো দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছিলেন, ‍তার ভাষাটা আদৌ খুব খৃষ্ট সুলভ না, কারন এর পর খানিকটা উদারতার সুরে তিনি উল্লেখ করতে থাকেন,

যদিও ঈশ্বর আমাদের প্রতিশোধ না নেবার, বরং , আপনাদের মত সবার জন্য প্রার্থনা করার জন্যই শিক্ষা দেন;

অবশ্য তার এই দয়াশীলতা খুবই স্বল্পমেয়াদী:

তবে আমি শান্তি পাবো এই জেনে যে, আপনার উপর ঈশ্বর যে শাস্তি আরোপ করবেন, তা আমার দেয়া যে কোন শাস্তির তুলণায় আপনি ১০০০ গুন বেশী যন্ত্রনা ভোগ করবেন; সবচেয়ে ভালো ব্যপারটা হচ্ছে আপনি অনন্তকাল ধরে নরক যন্ত্রণা ভোগ করবেন এই সব পাপের জন্য, যা সম্বন্ধে আপনি সম্পুর্ণ অজ্ঞ; ঈশ্বরের ক্রোধ কোন দয়া প্রদর্শন করেনা; আপনার জন্যই, আমি আশা করি, সত্যটা আপনার কাছে উন্মোচিত হোক, ছুরি আপনার মাংশে স্পর্শ করার আগেই; শুভ বড়দিন!

পুনশ্চ: আপনার মতো মানুষদের আসলে কোন ধারনা নেই কি আপনাদের কপালে আছে,  ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাই… আমি আপনি না;

আমার কাছে আসলেই ধাধার মত মনে হয়, ধর্মীয় চিন্তাধারার সামান্যতম মতপার্থক্য কি পরিমান বিষাক্ততার জন্ম দিতে পারে; আরো একটি উদহারন দেয়া এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, Freethought today (ফ্রিথট টুডে) শীর্ষক একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদকের পোষ্টব্যাগ থেকে যা সংগৃহিত;  ফ্রিথট টুডে প্রকাশ করে Freedom from Religion Foundation (FFRF), যারা শান্তিপুর্ণভাবে প্রতিবাদ করে আসছেন, চার্চ ও রাষ্ট্রর মধ্যে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত পৃথক অবস্থানকে যখন উপেক্ষা করা হচ্ছে;

হ্যালো, পনির খাওয়া জঘন্য ব্যক্তিরা, তোমাদের মত অপদার্থদের তুলনায় আমরা খৃষ্টানদের সংখ্যা বহু বেশী; চার্চ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে কোন পৃথকীকরন হবে না এবং তোমরা নরকের কীটরা অবশ্য হার স্বীকার করবে…. ;

পনিরের ব্যপারটা আসলে কি? আমার আমেরিকান বন্ধুরা অবশ্য প্রস্তাব করেছেন, কুখ্যাত ভাবে উদারপন্হী অঙ্গরাজ্য উইসকনসিন সাথে এর একটা সম্পর্ক থাকতে পারে;  Freedom from Religion Foundation (FFRF) এর কার্যালয় এবং ডেয়ারী শিল্পর কেন্দ্র হচ্ছে উইসকনসিন; কিন্তু নিশ্চয়ই ব্যাখ্যাটা এত সরল নয়..এবং তাহলে ঐসব ফরাসী পনির খেকো আত্মসমপর্নকারী বানররা তাহলে কি? এখানে পনির এর ভাষায় ব্যবহারে শব্দগত আইকনোগ্রাফীটি কি?

চিঠিটার ভাষায় ফিরে আসা যাক আবার…

শয়তান পুজারী অপদার্থ…. দয়া করে মরো এবং নরকে যাও….. আমি আশা করি যেন মলনালীতে ক্যান্সারের মত খুব কষ্টদায়ক কোন অসুখ হয়  এবং ধীরে ধীরে খুব কষ্ট ভোগ করে যেন মৃত্যু হয়, তাহলে আপনি আপনার ঈশ্বর, শয়তানের সাথে দেখা করতে পারবেন…… এই ধর্ম থেকে স্বাধীনতা খুবই খারাপ একটা বিষয়, সুতরাং  আপনারা ফ্যাগ ( Fag:পুরুষ সমকামী অবজ্ঞাসুচক শব্দ) এবং ডাইকসদের (dykes: নারী সমকামী অবজ্ঞাসুচক শব্দ) বেশী উত্তেজিত হবার কোন কারন নেই বরং চিন্তা করেন কোথায় আপনারা যাচ্ছেন, কারন যখন আপনারা আদৌ খেয়াল করবেন না ঠিক তখনই ঈশ্বর আপনাদের শায়েস্তা করবে, যদি আপনাদের এই দেশ  বা এই দেশ যা কিছুর উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটা ভালো না লাগে, তাহলে আপনার কৃষ্ণাঙ্গ পশ্চাৎদেশটি এখনই থেকে দুর হয়ে যান এই দেশ থেকে;

পুনশ্চ: কমিউনিষ্ট বেশ্যা,আপনার কৃষ্ণাঙ্গ পশ্চাৎদেশটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুর হয়ে যান; তোমাদের কোন অজুহাত আর নেই; সৃষ্টি যথেষ্ট প্রমান মহান যীশু খৃষ্টর সর্বময় ক্ষমতার;

কেন আল্লাহ র সর্বময় ক্ষমতা না? বা ব্রহ্মারই বা না কেন? বা এমন কি ইয়াওয়ের?

আমরা নীরবে সরে যাবো না, ভবিষ্যতে যদি সহিংসতার প্রয়োজন হয়, মনে রাখবেন এর জন্য আপনারাই দায়ী; আমার রাইফেলে গুলি ভরা আছে,

কেন ? আমি না ভেবে থাকতে পারছি না, কেন এই ঈশ্বরের এধরনের ভয়ঙ্কর হিংস্রতার সাথে প্রতিরক্ষা প্রয়োজন আছে বলে মনে করা হয়?  যে কারোরই তো মনে হবার কথা তিনি নিজেকে সুরক্ষা করার জন্য যথেষ্ট পরিমানে যোগ্য; মনে রাখতে হবে, এই সব কুৎসিত হিংস্র বাক্যর অপমান আর হুমকির নিশানা কিন্ত শান্ত শিষ্ট ভদ্র, চমৎকার একজন তরুনী;

হয়তো আমি আমেরিকায় বসবাস করিনা, আমাকে লেখা বেশীর ভাগ ঘৃনার চিঠির ভাষা পুরোপুরি এই স্তরের না, তবে তারা সেই দয়া প্রদর্শনের সুবিধার কথাও বলেনা, যে দয়াশীলতার জন্য খৃষ্ট ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা বিশেষভাবে সুপরিচিত; মে ২০০৫ এর তারিখ সহ পরের চিঠিটির লেখক একজন বৃটিশ মেডিকেল ডাক্তার; যদিও এটি নি:সন্দেহে ঘৃনা সমৃদ্ধ, তবে পুরোপুরি নোংরা হবার চেয়ে বরং আমার কাছে মনে হয়েছে পত্র লেখকের অন্তর্দ্বন্দের কষ্ট এবং যা তিনি প্রকাশ করেছেন কেমন করে নৈতিকতার পুরো বিষয়টি নীরিশ্বরবাদীতার বিরুদ্ধে সকল সহিংসতার উৎস;  শুরুতেই বেশ কিছু অনুচ্ছেদে বিবর্তনকে ব্যবচ্ছেদ করার পর ( এবং শ্লেষাত্মকভাবে জিজ্ঞাসা সহ যে তাহলে নিগ্রো কি এখনও বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় আছে?), ব্যাক্তিগত পর্যায়ে ডারউইনকে অপমান করে, ভ্রান্তভাবে হাক্সলীকে বিবর্তন বিরোধী হিসাবে উল্লেখ করার পর এবং আমাকে একটি বিশেষ বই পড়ার জন্য উৎসাহ প্রদান করে ( যা আমি পড়েছি), যা যুক্তি দেখিয়েছে পৃথিবী মাত্র আট হাজার বছর প্রাচীন ( তিনি কি আসলেই চিকিৎসক হতে পারেন?), তিনি পরিশেষে লিখেছিলেন:

আপনার নিজের বইগুলো, অক্সফোর্ডে আপনার সন্মান, যা কিছু আপনি জীবনে ভালোবাসেন, এবং অর্জন করেছেন, সবই ব্যর্থ প্রচেষ্টা …… কামু’র প্রশ্ন -চ্যালেন্জ এখানে এড়ানো অসম্ভব, কেন আমরা সবাই আত্মহত্যা করি না? সত্যি, আপনার বিশ্বধারনা ছাত্রদের এবং আরো অনেকের উপর এই ধরনের প্রভাব ফেলে, যে আমরা সবাই বিবর্তিত হয়েছি অন্ধ আপতন বা চান্সের মাধ্যমে, কোন কিছু থেকে না, কোন কিছুতেই প্রত্যাবর্তন করবো না, এমন কি ধর্ম যদি সত্যিও না হয়, তাও উত্তম, অনেক বেশী উত্তম, একটি মহান পুরাণ কাহিনীকে বিশ্বাস করা, প্লেটোর মত, যদি তা কারো মনে শান্তি দিতে পারে আমাদের এই জীবনকালে; কিন্তু আপনার বিশ্ব ধারনা সৃষ্টি করে দুশ্চিন্তা মাদকাসক্তি, হিংস্রতা, নৈরাজ্যবাদ, ভোগবাদীতা, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনীয় বিজ্ঞান এবং পৃথিবীতে নরক ও তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ; আমি ভাবছি আপনি আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কতটা সুখী? তালাকপ্রাপ্ত? বিপত্নীক? সমকামী? আপনাদের মত মানুষরা কখনো সুখী হতে পারেনা; বা তারা খুবই চেষ্টা করে প্রমান করতে কোন সুখ নেই বা কোন কিছুরই কোন অর্থ নেই;

এই চিঠির আবেগ, যদিও এর ভাষা নয়, অন্য অনেক চিঠির মতই বৈশিষ্টমুলক; এই ব্যক্তিটি বিশ্বাস করেন ডারউইনিজম, অন্তর্গতভাবেই এর প্রকৃতিতে নৈরাশ্যবাদী, যা শিক্ষা দেয় আমরা বিবর্তিত হয়েছি অন্ধ চান্স বা আপতনের মাধ্যমে (অসংখ্যবারের মত আবারও বলছি, প্রাকৃতিক নির্বাচন চান্স বা আপতন প্রক্রিয়ার ঠিক বীপরিত) এবং নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে আমরা যখন মারা যাবো; এধরনের অভিযোগকৃত নেবিবাচকতার সরাসরি ফলাফল হিসাবে সব ধরনের অশুভ জিনিস প্রবাহিত হয়; ধরে নেয়া যেতে পারে, তিনি সত্যি বলতে চাননি যে বৈধব্য আমার ডারউইনিজমের সরাসরি ফলাফল হতে পারে; কিন্তু তার চিঠি, এই বিষয়টি ধরে, উন্মত্ত অশুভ কামনার রুপের সেই পর্যায় আমি শনাক্ত করেছি  বার বার আমার খৃষ্ঠীয় পত্র লেখকদের; আমি আমার পুরো একটি বই উৎসর্গ করেছি (Unweaving the Rainbow) সেই জীবনের মুল অর্থ, বিজ্ঞানের কাব্যময়তার প্রতি, এবং যুক্তি খন্ডন করেছি হালকা এবং বিস্তারিতভাবে এই নৈরাশ্যবাদী নেতিবাচকতার অভিযোগটির, সুতরাং এখানে আমি নিজেকে সংযত করছি; এই অধ্যায়টি খারাপ এবং এর বীপরিত, ভালো বিষয় নিয়ে; নৈতিকতা বিষয়ে: কোথা থেকে এটি এসেছে, কেন আমাদের এটিকে সাদরে গ্রহন করা উচিৎ এবং তা করতে কি আমাদের ধর্মের কি কোন প্রয়োজন আছে কিনা;

আমাদের নৈতিকতাবোধের কি কোন ডারউইনীয় উৎস আছে?

বেশ কিছু বই যেমন রবার্ট হিন্ড এর Why Good is Good, মাইকেল শেরমার এর The Science of Good and Evil, রবার্ট বাকমানের Can We Be Good Without God? এবং মার্ক হাউসার এর Moral Minds, যুক্তি দেখিয়েছে যে, আমাদের ভালো ও মন্দ বোঝার ক্ষমতার উৎপত্তি হয়েছে আমাদের ডারউইনীয় অতীতে; এই অংশে আমি সেই যুক্তিগুলোর নিজস্ব সংস্করণ উপস্থাপন করবো:

বাহ্যিক দিক থেকে ডারউইনীয় ধারনাটি, প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা পরিচালিত বিবর্তন প্রক্রিয়াকে মনে হয় আমাদের ধারনা করা ভালোত্ব বৈশিষ্টটি বা আমাদের নৈতিকতা, শ্লীলতা, সমমর্মিতা এবং করুনা সংক্রান্ত আমাদের অনুভুতিগুলো ব্যাখ্যা করার অনুপোযুক্ত; প্রাকৃতিক নির্বাচন খুব সহজেই ব্যাখ্যা করতে পারে ক্ষুধা, ভয়, এবং যৌন তাড়না; যেগুলো সরাসরি আমাদের বেচে থাকা এবং আমাদের জীনের সুরক্ষা করার ক্ষেত্রে ভুমিকা পালন করে; কিন্তু সেই হৃদয় নিংড়ানো সহানুভুতির ব্যাখ্যা কি, যা আমরা অনুভব করি যখন কোন এতিম শিশুকে কাদতে , বা বৃদ্ধ বিধবার একাকীত্বের হতাশা বা যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকা কোন প্রানীকে দেখে? কোন জিনিসটি বা কি আমাদের তীব্রভাবে তাড়িত করে বেনামে পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে ঘটা সুনামীর শিকারদের অর্থ সাহায্য বা কাপড় পাঠাতে যাদের কারোর সাথেই আমাদের কোনদিনও দেখা হবে এবং যারা খুব সম্ভবত কোনদিনও এই সহায়তার কোন প্রতিদানও দিতে পারবে না? আমাদের মধ্যে এই ভালো পরোপকারী বা সামারিটান বৈশিষ্টগুলো কোথা থেকে আসলো?  ভালোত্ব এই বৈশিষ্টগুলো কি স্বার্থপর জীন তত্ত্বের সাথে সামন্জষ্যপুর্ণ হওয়ার কথা না, তাই নয় কি?  না, এই তত্ত্বটি সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারনাগুলোর মধ্যে এটি সবচে সুপরিচিত, হতাশাব্যঞ্জক ( এবং পুর্বধারনা স্বাপেক্ষে পুর্বপ্রত্যাশিত) ভুল ধারনা*; সঠিক শব্দটির উপর জোর দেয়া এখানে প্রয়োজনীয়; সেলফিশ  বা স্বার্থপন ’জীন’ শব্দটার উপর জোর দেয়া ঠিক হবে, কারন এটি স্বার্থপর কোন ’জীব’ বা ধরা যাক, প্রজাতি ধারনাটির সাথে পার্থক্য সৃষ্টি করে; আমি বিষয়টি ব্যাখ্যা করছি। (আমি রীতিমত শঙ্কিত হয়েছিলাম গার্ডিয়ান পত্রিকায় ( অ্যানিমাল ইনস্টিঙ্কটস, ২৭ মে ২০০৬) পড়ে যে, কুখ্যাত এনরন কর্পোরেশনের সিইও জেফ স্কিলিং এর প্রিয় বই হচ্ছে দি সেলফিশ জীন এবং এর সোস্যাল ডারউইনিজমের একটি রুপ  থেকে তিনি  নাকি অনুপ্রাণিত হয়েছেন’; গার্ডিয়ানের সাংবাদিক রিচার্ড কনিফ এই ভুল বোঝাবুঝির একটি ভালো ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন (http://money.guardian.co.uk/workweekly/story/0,,1783900,00.html.); আমিও ভবিষ্যতে এধরনের ভুল বোঝার সম্ভাবনাকে প্রতিহত করার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসের সম্প্রতি The Selfish Gene এর ত্রিশ তম প্রকাশনা বার্ষিকী সংস্করণের ভুমিকায় এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছি);

ডারউইনবাদের এর যুক্তি বলছে যে একক টি জীবনের হায়ারার্কি বা প্রাধান্যপরম্পরায় টিকে থাকে এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাকুনী অতিক্রম করতে পারে তার স্বার্থপর হবার প্রবণতা থাকারই কথা; এই পৃথিবীতে টিকে থাকবে সেই একক বা ইউনিট গুলো যারা তাদের নিজস্ব স্তরে প্রাধান্যপরম্পরায় অন্যান্য প্রতিদ্বন্দী ইউনিটগুলোর সাথে প্রতিদ্বন্দিতায় সফল হয়েছে; এই প্রাসঙ্গিকতায় স্বার্থপর বলতে ঠিক এটাকেই বোঝায়; এখন প্রশ্ন হলো, এই প্রক্রিয়াটি ঠিক কোন পর্যায়ে বা স্তরে বা লেভেলে ঘটছে? স্বার্থপর জীনের পুরো ধারনাটি – ‘জীন শব্দটির উপর যথাযোগ্য গুরুত্ব আরোপ করা সাপেক্ষে‘ – হচ্ছে যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের একক ( বা আত্মস্বার্থের একক) কোন স্বার্থপর অর্গানিজম বা জীব নয়, স্বার্থপর কোন গ্রুপ না বা স্বার্থপর প্রজাতি না বা স্বার্থপর কোন ইকোসিস্টেম বা পরিবেশমন্ডল না, বরং স্বার্থপর ‘‘জীন‘‘; এবং এই জীনটি, যা তথ্য রুপে, হয় বহু প্রজন্ম ধরে টিকে থাকে, নয়তো না; জীনের মত করে ( এবং তর্কসাপেক্ষে মীম) কোন অর্গানিজম বা জীব, গ্রুপ কিংবা প্রজাতি সেই অর্থে একক হিসাবে কাজ করতে পারেনা, কারন তারা তাদের হুবুহু প্রতিলিপি তৈরী করতে পারেনা, এবং এ ধরনের স্বঅনুলিপিকারী সত্ত্বা বা এনটিটিদের পুলে তারা প্রতিদ্বন্দীতাও করতে পারে না; এবং জীনরা ঠিক সেটাই করে এবং সেটাই – মুলতঃ যৌক্তিক – ডারউইনীয় বিশেষ স্বার্থপর অর্থে জীনকে স্বার্থপরতার একক হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য বেছে নেবার স্বপক্ষে যৌক্তিকতা;

সবচেয়ে সুস্পষ্ট যে উপায়ে জীনগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থপর বেচে থাকাটা নিশ্চিৎ করে অন্যান্য জীনের সাপেক্ষে তাহলো তাদের বহনকারী কোন একক অর্গানিজমকে স্বার্থপর করে তোলার মাধ্যমে; আসলেই এমন বহু পরিস্থিতি আছে যেখানে কোন একটি অর্গানিজমের টিকে থাকার মাধ্যমে তার বহন করা জীনগুলোকে টিকে থাকতে সহায়তা করে; কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রাধান্য পায়, কিছু পরিস্থিতি আছে -খুব বেশী দুর্লভ নয় – যেখানে জীন তাদের নিজেদের স্বার্থপর টিকে থাকাটা নিশ্চিৎ করে তাদের বহনকারী জীবদের নিঃস্বার্থভাবে, পরোপকারী বা পরার্থে আচরন করানোর মাধ্যমে; এই পরিস্থিতিগুলো সম্বন্ধে আমাদের এখন ভালো ধারনা আছে এবং এদের মুল দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: কোন জীন যা কোন অর্গানিজম বা জীবদের একক কোন সদস্যদের প্রোগ্রাম করে তাদের জীনগত আত্মীয় বা জেনেটিক কিন দের সহায়তা করার জন্য পরিসংখ্যাগতভাবে সেই জীন এর অনুলিপি হবার সুবিধা পাবার সম্ভাবনাও বেশী; এই ধরনের জীনের সংখ্যা প্রজাতির জীনপুলে বেড়ে যেতে পারে এমন হারে যে যেখানে জীনগত আত্মীয় বা কিন পরার্থবাদীতা বা অ্যালট্রুইজম খুব স্বাভাবিক হয়ে দাড়াতে পারে; নিজেদের সন্তানদের প্রতি উপকারী হওয়া এর একটি স্পষ্ট উদহারন, কিন্তু এটাই একমাত্র এমন উদহারন নয়; মৌমাছি, ওয়াস্প, পিপড়া, টারমাইট এবং খানিকটা, কিছু নির্দিষ্ট মেরুদন্ডী যেমন ন্যাকেড মোল র‌্যাটস, মীরকাটস এবং অ্যাকর্ণ উডপেকাররা এমন একটি সমাজের বিবর্তন ঘটিয়েছে যেমন বড় ভাইবোনরা তাদের ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করে ( যাদের সাথে তারা তাদের জীনগুলোকে শেয়ার করার সম্ভাবনা থাকে); সাধারণত যা আমার প্রয়াত সহকর্মী ডাবলিউ ডি হ্যামিলটন দেখিয়েছিলেন, প্রানীদের প্রবনতা আছে নিজেদের আত্মীয় বা জীনগত কিনদের দেখাশোনা করার,  বিপদ থেকে রক্ষা করার, সম্পদ ভাগাভাগি, বিপদের সতর্ক করার বা কোন না কোন ভাবে নি:স্বার্থ ব্যবহার করার কারন স্পষ্টতই পরিসংখ্যানগতভাবে সম্ভাবনা থাকে তাদের আত্মীয়রা তাদের মত একই জীনের কপি বহন করে;

অ্যালট্রুইজম বা পরার্থবাদিতার অন্য প্রধান প্রকারটি, যার জন্য আমাদের খুব ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা ডারউইনীয় যুক্তি আছে, তা হলো পারস্পরিক বা রেসিপ্রকাল পরার্থবাদিতা ( তুমি আমার পিঠ চুলকিয়ে দাও আমি তোমার পিঠ চুলকিয়ে দেবো); এই তত্ত্বটি বিবর্তন জীববিজ্ঞানে প্রথম উপস্থাপন করেন রবার্ট ট্রিভারস এবং প্রায়ই এটিকে প্রকাশ করা হয় গেম থিওরীর গানিতীক ভাষায়, এবং এটি শেয়ার করা বা একই জীন ভাগাভাগি করার মত কোন পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে না; আসলেই এটা একই ভাবে কাজ করে, সম্ভবত আরো ভালোভাবে, পুরোপুরি ভিন্ন প্রজাতিদের মধ্যে, যখন অনেক সময় এদের বলা হয় সিমবায়োসিস বা মিথোজীবিতা; একই নীতি মানুষেরও সকল বানিজ্য এবং আদান প্রদান কর্মকান্ডের ভিত্তি; শিকারীর প্রয়োজন বর্শা আর কুমারের প্রয়োজন মাংশ, চাহিদার এই অসাম্যতা একটা বানিজ্যের ভিত্তি হিসাবে চুক্তি রচনা করে, মৌমাছির দরকার মধু আর ফুলের দরকার পরাগায়ন; ফুল যেহেতু উড়তে পারেনা, তারা নেকটার এর মাধ্যমে মৌমাছিকে অর্থ মুল্য পরিশোধ করে তাদের পাখনার ভাড়া হিসাবে; হানিগাইড নামের পাখি মধু কোথায় খুজে পাওয়া যাবে তা জানে ‍কারন তারা’মৌচাক খুজে বের করে জানে, তবে মৌচাক তারা ভাঙ্গতে পারেনা; কিন্তু হানি ব্যাজার ( রাটেল) মৌচাক ভাঙ্গতে পারে, তবে পাখিদের মত তাদের ডানা নেই যে তারা মৌচাক খুজে বের করতে পারবে; হানিগাইডরা রাটেলদের ( এবং কখনও মানুষদেরও) মধুর উৎসের দিকে নিয়ে যায় একটি বিশেষ প্রলুদ্ধকর ওড়ার কৌশল ব্যবহার করার মাধ্যমে, যে কৌশল হানিগাইড শুধুমাত্র  এই কাজটির জন্যই ব্যবহার করে থাকে; উভয় পক্ষই এই আদান প্রদানের মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্ত হয়; একটি বড় পাথরের নীচে হয়তো সোনার একটি বড় খন্ড চাপা দেয়া্ আছে, আর পাথরটা খুবই ভারী যে কারোর একার পক্ষে সেটি সরানো সম্ভব নয়, সে তখন অন্যদের সাহায্য নেয় কাজটা করার জন্য, যদিও এজন্য তাকে ভাগ দিতে হয় সেই সোনার, কারন তা না করলে সে তো কিছুই পাবেনা; জীবজগতে এধরনের পারস্পরিক সাহায্য নির্ভর সম্পর্কর সংখ্যা অগনিত; ষাঢ় এবং অক্সপেকারস, লাল টিউব্যুলার ফুল এবং হামিংবার্ড, গ্রুপার এবং ক্লিনার ওয়ারাসেস, গরু এবং তাদের পেটের অনুজীবরা; পারস্পরিক পরহিতকারী বা পরার্থবাদী সম্পর্ক কাজ করে কারন তাদের নিজস্ব প্রয়োজন এবং এবং সেই প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে এককভাবে তাদের নিজেদের দক্ষতা বা ক্ষমতায় ভিন্নতা বা অসাম্যতা আছে;  একারনে এটি বিশেষভাবে কার্যকরী হয় দুটি ভিন্ন প্রজাতির জীবের মধ্যে: যেখানে দুটি প্রজাতির প্রয়োজন বা চাহিদায় অসাম্যতাও অনেক বেশী।

https://i1.wp.com/webecoist.com/wp-content/uploads/2009/02/plover-crocodile-symbiosis.jpg
ছবি: কুমির আর প্লোভার ( কুমিরের দাত থেকে মাংশর টুকরো ছাড়িয়ে খায় এরা, কুমিরের দাত পরিষ্কার হয় আর পাখিদের খাওয়াও মেলে (সুত্র)

https://i0.wp.com/webecoist.com/wp-content/uploads/2009/02/honeyguide-ratel-bees-symbiosis.jpg

ছবি: হানিব্যাজার বা র‌্যাটেল আর হানিগাইড পাখি ( হানিগাইডরা এদের চিনিয়ে দেয় কোথাও মৌচাক আছে, মৌচাক ভাঙ্গার পর মধুর ভাগও তাদের জোটে (সুত্র)

https://i0.wp.com/webecoist.com/wp-content/uploads/2009/02/zebra-oxpecker-symbiosis.jpg
ছবি: অক্সপেকার আর জেবরা; অক্সপেকাররা এদের গা থেকে এরা উকুর, টিক, ছোটখাট কিছু পরজীবি প্রানী খেয়ে পরিষ্কার রাখে (সুত্র)

মানুষের ক্ষেত্রে ঋণপত্র বা আওউ (IOU) এবং অর্থ হচ্ছে সে রকম কিছু উপকরণ যা কোন কিছু আদান প্রদানের ক্ষেত্রে বিলম্ব সৃষ্টি করে; বানিজ্য করছে এমন পক্ষগুলো কিন্তু সাথেই সাথেই তাদের দ্রব্য একে অপরকে হস্তান্তর করছে না কিন্তু  তারা ঋণ সে গচ্ছিত রাখতে পারে ভবিষ্যতের জন্য বা এমনকি ঋনটি অন্য বানিজ্যের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করতে পারে; আমি যতদুর জানি, মানুষ ছাড়া আর অন্য কোন বন্য প্রানী সরাসরি টাকার অনুরুপ কোন মাধ্যম ব্যবহার করে না; কিন্তু এককভাবে কোন সদস্যর পরিচয় সম্পর্কে স্মৃতি খানিকটা অনানুষ্ঠানিকভাবে সেই একই দায়িত্ব এখানে পালন করে;  ভ্যাম্পায়ার ব্যাটরা শিখে নেয় তাদের সামাজিক গ্রুপের কোন সদস্যর উপর নির্ভর করা যেতে পারে, যারা কিনা  তাদের ঋণ শোধ করবে ( রিগার্জিটেটেড রক্ত বা গিলে ফেলা আংশিক পরিপাক হওয়া রক্ত পুনরায় গলা দিয়ে বের করে আনা) এবং কারা তাদের সাথে প্রতারনা করবে; প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব জীনগুলোকে টিকে থাকতে সহায়তা করে, যা কোন জীবের একক সদস্যদের, যারা একটি অপ্রতিসম ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজন ও সুযোগ এর পারস্পরিক সম্পর্কে বজায় রাখছে, তাদের কোন কিছু দান করতে বা দিতে যখন তারা পারে বা সক্ষম হয় এবং যখন তারা তা পারেনা তখন তারা সেই রকমই প্রতিদানের জন্য অন্য সদস্যদের কাছে অনুরোধ করার বা চেয়ে নেবার প্রবনতার কারন হয়; এটি কোন দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য মনে রাখা, কোন বিদ্বেষ মনে রাখা, পারস্পরিক আদান প্রদানের সম্পর্কটি নজরদারি করার, এবং যারা নেয় কিন্তু  তাদের সময় হলে বিনিময়ে কিছু দেয় না এমন প্রতারকদের শাস্তি দেবার প্রবনাটাকে গড়ে উঠতে সহায়তা করে;

যেহেতু সবসময়ই প্রতারকরা থাকবে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার গেম তত্ত্বের এই ধাধা বা কোনানড্রামটির স্থায়ী সমাধানে সব সময় এমন কিছু থাকে যা প্রতারকদের শাস্তির ব্যপারটা নিশ্চিৎ করে; গানিতীক তত্ত্ব দুটি বড় শ্রেনীর স্থায়ী সমাধানের অনুমতি দেয়  এ ধরনের ‘গেম‘ এর ক্ষেত্রে, সবসময় ‘খারাপ‘ হতে হবে, এটি স্থায়ী এই অর্থে যে, যদি সবাই একই কাজ করে তাহলে একজন ভালো কোন সদস্যর একার পক্ষে তার চেয়ে ভালো কিছু করতে পারেনা; কিন্তু এছাড়া আরেকটি সুস্থির সমাধান বা কৌশল হচ্ছে ( এখানে সুস্থির অর্থ যখন কোন জনসংখ্যায় এটি একটি নির্দিষ্ট সীমার হার অতিক্রম করবে, এর কোন বিকল্প তার চেয়ে ভালো কিছু করতে পারেনা); এই কৌশলটা হলো, প্রথমে সবার সাথে ভালো ভাবে লেনদেন শুরু করা, অন্যদের বিশ্বাস করে  কিছু সুযোগ দেয়া, এরপর ভালো কাজের প্রতিদান ভালো কাজের মাধ্যমে শোধ করা, তবে খারাপ কাজের জন্য যথাযথ প্রতিশোধ নেয়া; গেম থিওরীর ভাষায় এই কৌশল ( বা একই ধরনে কৌশলগুলোর সমষ্ঠী) এর নানা নাম আছে, যেমন টিট ফর ট্যাট ( ইটের বদলে পাটকেল), সমুচিত পাল্টা জবাব এবং পারস্পরিক দেয়া নেয়া; কিছু কিছু পরিস্থিতিতে এটি বিবর্তনীয়ভাবে স্থিতিশীল এই অর্থে যে, যদি কোন জনসংখ্যায় পারস্পরিক দেয়া নেয়া কারীদের সংখ্যা প্রাধাণ্য বিস্তার করে, যেখানে কোন খারাপ যেমন কেউ নেই এবং একজনও নিঃশর্তভাবে ভালো সদস্য নেই, বেশ ভালো ভাবে কাজ করবে; আরো একটা বেশ জটিল টির ফর ট্যাট এর ভিন্নরুপ আছে,, যা কোন কোন পরিস্থিতিতে আরো ভালো ব্যাখ্যার কাজ করে;

আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, আত্মীয়তা বা কিনশিপ এবং পারস্পরিক দেয়া নেয়ার সম্পর্কটি ডারউইনীয় বিশ্বে আলট্রুইজম বা পরার্থবাদিতার দুটি স্তম্ভ; কিন্তু এছাড়া আরো কিছু কাঠামো এই দুই প্রধান স্তম্ভের  উপর ভর করে আছে; বিশেষ করে মানুষের সমাজে, ভাষা এবং কথোপকথন গল্পগুজবের ব্যপকতা যেখানে প্রকট, সেখানে সুনাম খুবই গুরুত্বপুর্ণ; কোন এক ব্যক্তির হয়তো সুখ্যাতি আছে তার দয়াশীলতা ও উদারতার বৈশিষ্টের, অন্য কারো হয়তো কুখ্যাতি আছে অবিশ্বস্ততার জন্য, প্রতারনার জন্য, কোন চুক্তিকে অসন্মান করার জন্য; আবার অন্য কারো হয়তো সুখ্যাতি আছে দয়াশীলতার যখন পারস্পরিক বিশ্বাসর ভিত্তিটা গড়ে উঠে সম্পর্কে, তবে কোন ধরনের প্রতারণার নিষ্ঠুর শাস্তি দিতে যে ইতস্তত বোধ করেনা; পারস্পরিক পরার্থবাদিতার অনাড়ম্বর তত্ত্বটি আশা করছে যে, কোন প্রজাতির সদস্যরা তাদের স্বপ্রজাতির অন্যান্য সদস্যদের এ ধরনের বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতি সৃষ্ট অচেতন একটি প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করে তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রন করবে; ‍ মানুষের সমাজগুলোয় আমরা ভাষার শক্তি যুক্ত করেছি, যে ভাষা কারো সুনাম বা দুর্ণাম ছড়িয়ে দেয়, সাধারন গসিপ বা গালগল্পের আকারে; ধরুন, জনাব এক্স যখন কোন পানশালায় বা পাবে সবাইকে পান করানোর জন্য তার রাউন্ডটা এড়িয়ে গিয়েছিল, সে সময় আপনার সেখানে থাকার দরকার নেই, বা আপনার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হবারও দরকার নেই তার আচরণে, কারন আপনি, লতায় পাতায় কিংবা বাতাসে ভেসে আসা নানা গুজবে তার সম্বন্ধে জানতে পারবেন, এক্স খুবই কৃপন বা একটি বিরুপ প্রতিক্রিয়া এই উদহারনে যোগ হতে পারে – যে জনাব ওয়াই হচ্ছে মিথ্যা গল্পবাজ, এক্স সম্বন্ধে এসব কথা ছড়িয়েছে, কারো জন্য তার খ্যাতি খুবই গুরুত্বপুর্ণ এবং শুধমাত্র একজন ভালো রেসিপ্রকেটর বা যে কোন কিছুর পাওয়ার বিনিময়ে কিছু দিতে প্রস্তুত এমন হওয়াটাই যথেষ্ট না উপরন্তু এই দেয়া নেয়ার ব্যাপারে তার সততা সংক্রান্ত একটি সুনামও লালন করার মধ্যে যে একটি ডারউইনীয় টিকে থাকার মুল্যবান বিষয় আছে তা  জীববিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন; ম্যাট রিডলীর The Origins of Virtue বইটি ডারউইনীয় নৈতিকতাবোধের পুরো ক্ষেত্রটির  চমৎকার স্পষ্ট একটি বিবরণ ছাড়াও, ‌ এটি বিশেষ দক্ষতার সাথে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে, সুনাম বা দুর্নাম বা খ্যাতির বিষয়টি;

https://i2.wp.com/images.sciencedaily.com/2008/10/081027115429-large.jpg
ছবি: একজোড়া ক্লিনার ফিশ Labroides dimidiatus ,  Acanthurus mata কে পরিষ্কার করছে (Credit: Photo by Gerry Allen, Image courtesy of The Swedish Research Council)

রেপুটেশন বা খ্যাতি শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; সম্প্রতি দেখা গেছে এটি প্রানী জগতে পারস্পরিক উপকারীতার অন্যতম ‍একটি ধ্রুপদী উদহারনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়; ক্ষুদ্র ক্লিনার ফিস এবং তাদের খদ্দের বড় মাছের পারস্পরিক মিথোজীবি সম্পর্কে; একটি অসাধারন বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষকরা  লক্ষ্য করেছেন যে, একক কোন ক্লিনার ওয়ারাসকে ( Labroides dimidiatus) যখন কোন সম্ভাব্য খদ্দের লক্ষ্য করে যে সে খুব ভালোভাবে তার কাজটি করছে আর তার অন্য কোন প্রতিদ্বন্দী Labroides dimidiatus, তার কাজে অবহেলা করছে, এদের দুজনের মধ্য থেকে পরিশ্রমী Labroides dimidiatus কে বেছে নেবার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায় তাদের খদ্দের বড় মাছগুলোর; R. Bshary and A. S. Grutter, ‘Image scoring and cooperation in a cleaner fishmutualism’, Nature 441, 22 June 2006, 975-8.

নরওয়েজীয় অর্থনীতিবিদ থরস্টেইন ভেবলেন এবং খানিকটা ভিন্নভাবে ইসরায়েলীয় প্রানীবিজ্ঞানী আমোৎজ জাহাবী আরো একটি চমৎকর ধারনা এর সাথে যুক্ত করেছিলেন, পরহিতকর কোন কাজে বা পরার্থে কোন কিছু দেয়া হতে পারে প্রাধান্য বিস্তার বা নিজের শ্রেষ্ঠশীলতা প্রমানের জন্য একটি বিজ্ঞাপন; নৃতত্ত্ববিদদের কাছে এটি পরিচিত Potlatch বা পটল্যাচ Effect হিসাবে, এর নামটি এসেছে একটি সামাজিক প্রথা থেকে, উত্তর পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপবাসী নানা গোত্রগুলোর প্রতিদ্বন্দী গোত্র প্রধানরা একে অপরের সাথে দ্বন্দরত হয় খু্বই উদারতার সাথে নিজেদের ধ্বংস করে দেবার মত বিশাল ভোজসভার আয়োজন করার মাধ্যমে; কিছু চরম ক্ষেত্রে এই পাল্টা ভোজ সভা চলতে থাকে যতক্ষন না পর্যন্ত একপক্ষ সর্বস্বান্ত হয়, আর অন্যপক্ষ কিন্তু তারচেয়ে খুব একটা ভালো অবস্থায় থাকে না; ভেবলেন এর ‘conspicuous consumption’  বা দৃষ্টিগ্রাহ্য বা লোকদেখানো ভোগ করার ধারনাটি আধুনিক গবেষনার দৃশ্যপটে অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষন করেছে; জাহাভীর অবদান, যা জীববিজ্ঞানীরা বহুবছর ধরেই তেমন কোন গুরুত্ব দেননি অতিসাম্প্রতিক কাল অবধি যখন তার প্রস্তাবটির সত্যতা প্রমানিত হয়েছে তাত্ত্বিক অ্যালান গ্রাফেন এর অসাধারন গানিতীক মডেল এর মাধ্যমে, যা আমাদের potlatch idea র একটি বিবর্তনীয় সংস্করণ প্রদান করেছে। জাহাভীর গবেষনার বিষয় ছিল অ্যারাবিয়ান ব্যবলার, ছোট বাদামী পাখি যারা সমাজবদ্ধ গোষ্ঠী হিসাবে বসবাস করে এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমবায়ের মাধ্যমে প্রজনন, বংশবিস্তার ও প্রজন্ম প্রতিপালন করে; অন্য অনেক ছোট পাখিদের মতই ব্যাবলাররা বিপদের হুশিয়ারী সংকেত হিসাবে চিৎকার করে অন্যদের সতর্ক করে এবং তারা একে অন্যকে খাবারও দান করে; এ ধরনের পরার্থে বা পরোপকারিতার লক্ষ্যে করা কোন কাজকে একটি মানসম্পন্ন ডারউইনীয় নীরিক্ষা যদি পর্যালোচনা করতে হয়, তাহলে দেখা উচিৎ প্রথমত,পাখিদের মধ্যে পারস্পরিক আদান প্রদান ও জীনগত আত্মীয়তার সম্পর্কটিকে, যখন কোন ব্যাবলার তার সঙ্গীকে তার নিজের সংগ্রহ করা খাদ্য খাওয়ায়, তার কারনটি এই আশায় যে ভবিষ্যতে তাকেও কোনদিন একইভাবে এভাবে খাদ্য খাওয়ানো হবে? নাকি যারা এই সাহায্য পাচ্ছে তাদের সাথে সাহায্য দাতার আছে কোন নিকটবর্তী জীনগত সম্পর্ক? বা তারা জীনগত আত্মীয়? এবিষয়ে জাহাবীর ব্যাখ্যাটি ছিল ভীষন ভাবে অপ্রত্যাশিত; প্রধান বা প্রাধান্য বিস্তারকারী ব্যবলাররা সামাজিক অবস্থানে তাদের প্রাধান্যটাকে দৃঢ় করে তাদের অধীনস্থদের খাওয়ানোর মাধ্যমে, জাহাবীর প্রিয় ’মানুষের ভাষায়’ এই্ আচরণকে নরাত্বরোপ করলে বলা যায়, প্রধান পাখিটি হয়তো সমতুল্য এধরনের কিছু বলে, দেখো, ’আমি তোমার চেয়ে কত শ্রেষ্ঠ, আমি তোমাকে খাওয়া দান করতে পারি’ বা ’আমি তোমার চেয়ে কত শ্রেষ্ঠ, আমি উচু ডালে বনে বাজপাখীর সামনে নিজের জীবনের ঝুকি নিয়ে পাহারাদারের মতো মাটিতে খেতে থাকা তোমাদের দলকে সতর্ক করতে পারি’; জাহাবী ও তার সহকর্মীদের পর্যবেক্ষন প্রস্তাব করছে যে, ব্যবলাররা নিজেদের মধ্যে সক্রিয়ভাবে প্রতিযোগিতা করে, কে ঝুকিপুর্ণ এই পাহারাদারের কাজটি করবে; এবং যখনই কোন অধীনস্থ কেউ প্রাধান্য বিস্তারকারী কোন ব্যবলারকে খাদ্য দান করার চেষ্টা করে, আপাতদৃষ্টিতে তার এই দানশীলতাকে হিংস্রভাবে প্রত্যাখান করা হয়; জাহাভীর ধারনার মুল বিষয়টি হলো, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান বা প্রদর্শনের এই বিজ্ঞাপন সত্যায়িত হয় এর জন্য পরিশোধিত মুল্যে মাধ্যমে, শুধুমাত্র  একজন সত্যিকারের শ্রেষ্ঠ সদস্যই পারে সেই সত্যের বিজ্ঞাপন করতে কোন মুল্যবান উপহার দান করার মাধ্যমে; প্রজাতির সদস্যরা সাফল্য কেনে, যেমন, প্রজনন সঙ্গী আকর্ষন করতে, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানের ব্যয়সাপেক্ষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে, যার মধ্যে আছে সুস্পষ্টভাবে অতিমাত্রায় প্রদর্শন করা দানশীলতা এবং প্রকাশ্যে সবাইকে দেখিয়ে করে ঝুকি নেয়ার মাধ্যমে;

তাহলে আমাদের কাছে এখন চারটি জোরালো ডারউইনীয় কারন আছে, কেন প্রজাতির কোন সদস্য পরোপকারী, অন্যান্য সদস্যদের প্রতি দয়াশীল ও দানশীল হয় ও  নৈতিক আচরণ প্রদর্শন করে, তা ব্যাখ্যা করার জন্য;  প্রথম, জীনগত আত্মীয়তা বা কিনশীপের একটি বিশেষ ব্যাপারতো আছেই; দ্বিতীয়, রেসিপ্রোকেশন, বা কোন কিছু পাওয়ার বিনিময়ে কিছু দেয়া, পারস্পরিক আদার প্রদান: কোন উপকারের প্রতিদান দেয়া এবং ভবিষ্যতে প্রতিদান পাওয়ার সম্ভাবনার কথা মনে রেখেই উপকার করতে সচেষ্ট হওয়া; এখান থেকে শুরু করে আসছে তৃতীয় কারনটি: দয়াশীলতার ও দানশীলতার সুনাম অর্জন করার বিশেষ ডারউইনীয় সুবিধা, চতুর্থত, যদি জাহাভীর ধারনা সঠিক হয়, এই বিশেষ প্রদর্শন মুলক বা সবাইকে দেখানো দানশীলতা বা দয়াশীলতার বাড়তি সুবিধা হচ্ছে একেবারে খাটি অনুকরণযোগ্য নয় এমন বিজ্ঞাপন ক্রয় করা;

আমাদের প্রাগৈতিহাসিক সময়ের বিশাল একট অংশ জুড়ে, মানুষ এমন পরিস্থিতিতে বসবাস করেছে যা খুব দৃঢ়ভাবে এই চার ধরনেরই পরার্থবাদীতার বিবর্তনে সহায়তা করেছে;  আমরা গ্রামে বসবাস করতাম বা তার আরো আগে বেবুনদের মত আলাদা আলাদা যাযাবর দল হিসাবে, যারা পার্শ্ববর্তী কোন দল বা গ্রাম থেকে আংশিকভাবে বিচ্ছিন্ন ছিল;  তখন দলের সদস্যদের বেশীরভাগই হয়তো পরস্পরের নিকটাত্মীয়; পার্শ্ববর্তী কোন আলাদা দলের সদস্যদের চেয়ে, নিজ দলের সদস্যদের সাথে সেই দলের যে কোন সদস্য অবশ্যই বেশী ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল –আর এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিন বা আত্মীয়দের প্রতি পরোপকারিতা বা পরার্থবাদীতা বিবর্তনের প্রচুর সুযোগও ছিল; এবং আত্মীয় হোক বা না হোক, সেই দলের যে কোন সদস্য দলের অন্য একজন সদস্যকে বার বার বহুবারই, সারাজীবন ধরেই সাক্ষাৎ করবেন – পারস্পরিক পরার্থবাদীতা বা রেসিপ্রকাল অ্যালট্রুইজিম বিবর্তন হবার জন্য যা অত্যন্ত আদর্শ একটি পরিস্থিতি;  এবং এই পরিস্থিতিগুলো অবশ্যই পরোপকারিতার সুনাম গড়ে তোলার জন্যও আদর্শ পরিস্থিতি; এবং এটা অবশ্যই একই ভাবে সেরকমই একটি আদর্শ পরিস্থিতি যেখানে সবার দৃষ্টি আকর্ষন করা বা প্রদর্শন করার মত দয়াশীলতা ও উদারতা বিজ্ঞাপন করার জন্য;  এই চারটি উপায়ের যে কোন একটি কিংবা সবগুলো উপায়ে পরার্থবাদীতার প্রতি আদি মানুষের  জীনগত প্রবনতা বিশেষ সহায়তা পেয়েছিল প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাকুনীতে; খুব সহজেই বোঝা যায়, কেন আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পুর্বপুরুষরা তাদের নিজেদের গ্রুপের সদস্যদের প্রতি সদয় এবং উপকারী ছিল তাদের আচরনে কিন্তু প্রায় জেনোফোবিয়া ( ভীনদেশীদের প্রতি অহেতুক ভয় বা সন্দেহ প্রবণতা) মতই ভিন্ন গ্রুপদের প্রতি অবিশ্বাস আর সন্দেহপুর্ণ ছিল তাদের আচরণ; কিন্তু কেন – এখন যখন আমরা বেশীর ভাগ মানুষ বড় শহরগুলোতে বাস করি, যেখানে চারপাশে আমরা আমাদের নিজেদের আত্মীয় দ্বারা আর পরিবেষ্টিত নেই, এবং যেখানে প্রতিদিন আমাদের বহু বিভিন্ন মানুষের সাথে দেখা হয়; যাদের সাথে আর কখনোই আমাদের আর দেখা হবে না; তাহলে কেন আমরা একে অপরের সাথে ভালো আচরণ করি, এমনকি কখনো এমন কারো সাথে যাকে ভাবা যেতে পারে আমাদের গ্রুপের বহিরাগত?

প্রাকৃতিক নির্বাচনের নাগাল সম্বন্ধে ভুল কথা না বলা খুব জরুরী; নির্বাচন আপনার জীনের জন্য কি ভালো সে বিষয়ে কগনিটিভ বা অবধারনগত সচেতনতা বিবর্তনে কোন সহায়তা করেনি; সেই সচেতনাকেকগনিটিভ পর্যায় পর্যন্ত পৌছাতে করতে হয়েছে অপেক্ষা বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এবং এখনও পুরো বিষয়টি সম্বন্ধে জ্ঞান সীমাবদ্ধ আছে অল্প কিছু বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের কাছেই; প্রাকৃতিক নির্বাচন যেটিকে গড়ে উঠতে এবং টিকে ‍থাকতে সহায়তা করে সেটি হলো একটি রুলস অব থাম্ব বা গড়পড়তা একটি নিয়ম, যা আসলে কাজ করে সেই সব জীনগুলোকে প্রোমোট করার মাধ্যমে যারা তাদের বা সেই নিয়মগুলোকেই তৈরী করে; কিন্তু তাদের বৈশিষ্টগত কারনেই এই সব ‘রুলস অব থাম্ব’ মাঝে মাঝে ভুল করে বসে; যেমন পাখিদের মস্তিষ্কে, সেই নিয়ম বা রুল অব থাম্ব, ”তোমার বাসায় চিৎকার করা ছোট ছোট জীবগুলোকে ভালো করে দেখা শুনা করতে হবে এবং তাদের হা করা লাল মুখের গর্তে খাওয়া ফেলতে হবে”, এটির বৈশিষ্টসুচকভাবে প্রভাব পড়ছে সেই সব জীনগুলোকে রক্ষা করার মাধ্যমে যারা এই রুলটি তৈরী করেছে, কারন কোন পুর্নবয়স্ক পাখির নীড়ে এই চিৎকার করতে থাকা ও হা করে থাকা লাল গর্তসহ জিনিসগুলো সাধারনত তার নিজের সন্তান, এই রুলটি মিসফায়ার বা ভুল করে বসে, যখন অন্য কোন পাখির বাচ্চা কোনভাবে এই নীড়ে ঢুকে পড়ে ( যেমন ব্রুড প্যারাসাইট কিছু পাখির ক্ষেত্রে),  এরকম একটি পরিস্থিতি  তৈরী করে তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে কোকিলরা;  তাহলে আমাদের এই ভালো মানুষী পরোপকার করার প্রবণতাটি কি এরকমই কোন মিসফায়ারিং হতে পারে, যা রীড ওয়ার্বলার মাতাপিতাসুলভ সহজাত প্রবৃত্তির মিসফায়ারিং এর অনুরুপ, যখন এই প্রবৃত্তির তাড়নায় এই পাখিগুলো অমানুষিক প্ররিশ্রম করে না জেনেই কোকিলের বাচ্চাকে পেলে পুষে বড় করে?  কিংবা আরো একটি নিকটবর্তী অনুরুপ দৃষ্টান্ত হতে পারে কোন শিশুকে দত্তক নেবার ব্যপারে মানুষদের নিজস্ব সেই তাড়নাটি;  অতিসত্ত্বর আমাকে অবশ্যই এখানে যোগ করতে হবে যে এই ‘মিসফায়ারিং’ বিষয়টির অবতারনার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র ডারউইনীয় অর্থে; কোন নিন্দাসুচক অর্থে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে না;

https://kmhb.files.wordpress.com/2011/08/2jpg.jpg
ছবি:  কাউ বার্ডের ছানা (ডানে), বোঝাই যাচ্ছে পালক রেন পাখির ছানাদের এরা খাওয়া পাবার প্রতিযোগিতায় টিকতেই দেবে না ( সুত্র:  cowbird and wren nestlings© Rolf Nussbaumer/imagebroker.net/NOVA)

https://kmhb.files.wordpress.com/2011/08/6jpg1.jpg
ছবি: সাইজ দেখে ভুল ভাববেন না, রেন (Wren) (বায়ে), ডান দিকে কোকিল ছানাটার কিন্তু পালক মা, দেখেন কেমন আদর করে খাওয়াচ্ছে (সুত্র : wren and cuckoo © Bildagentur/TIPS Italia/NOVA)

এই ’ভুল’ বা উপজাত বা ’বাইপ্রোডাক্ট’ ধারনা যা আমি সমর্থন করছি,  এভাবেই কাজ করে; পুর্বসুরীদের সেই আদি কালে, যখন আমরা বেবুনদের মত ক্ষুদ্র কিন্তু স্থিতিশীল গ্রুপ বা গোষ্ঠী হিসাবে বসবাস করতাম, প্রাকৃতিক নির্বাচন আমাদের মস্তিষ্কে পরোপকারিতা বা পরার্থবাদীতার তাড়নাকে প্রোগ্রাম করেছিল, অন্যান্য আরো প্রয়োজনীয় তাড়নাদের সাথে, যেমন যৌন কামনা, ক্ষুধা, ভীনদেশীদের প্রতি সন্দেহপ্রবণতা  ইত্যাদি সহ আরো অনেক তাড়না; একটি বুদ্ধিমান দম্পতি, তারা ডারউইন পড়তে থাকতে পারেন এবং তারা হয়তো জানেন, তাদের যৌনতাড়নার মুল কারনটি হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টি করা, তারা এটাও জানেন নারীটি গর্ভধারন করতে পারবে না কারন সে জন্মনিয়ন্ত্রন পিল খাচ্ছে, তারপরও তারা আবিষ্কার করেন তাদের যৌন ইচ্ছাগুলো সেটা জানার কারনে কোন অংশেই কমে যাচ্ছে না; যৌন কামনা হচ্ছে যৌন কামনা এবং এর শক্তি, কোন একটি ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক স্তরে, সেই মুল ডারউইনীয় চাপ যা এটি পরিচালিত করে, তার থেকে স্বাধীন; এটি একটি তীব্র শক্তিশালী তাড়না যা তার মুল যৌক্তিক কারন ছাড়াই স্বাধীনভাবে অস্তিত্বশীল হতে পারে।

আমি প্রস্তাব করছি দয়াশীলতার তাড়না বা কারো প্রতি দয়াশীল হবার প্রবৃত্তিটাও একই ভাবে সত্য – পরার্থবাদীতা, বা পরোপকার করার তাড়না, উদারতা, সহমর্মিতা প্রকাশ করা, করুণা করা ইত্যাদিও; পুর্বসুরীদের সেই অতীতে, আমাদের সুযোগ ছিল শুধু কাছের আত্মীয় বা সম্ভাব্য যারা আমাদের দানের প্রতিদান দিতে পারবে শুধু তাদের প্রতি পরোপকারী মনোভাবাপন্ন হবার; কিন্তু পরবর্তীতে কিংবা এই বিধিনিষেধ আর নেই, তবে সেই গড়পড়তা নিয়মটি টিকে আছে; আর কেনইবা তা থাকবে না? এটিও ঠিক যৌন তাড়নার মতই, আমরা আমাদের অন্য লিঙ্গের সদস্যদের প্রতি যৌন কামনার উদ্রেক হওয়া থেকে যতটুকু নিজেদের রক্ষা করতে পারি ( সে অনুর্বর বা বন্ধ্য হতে পারে, অথবা অন্য কোন কারনে প্রজননে অক্ষমও হতে পারে) , কোন ক্রন্দনরত দুর্ভাগার প্রতি করুনার উদ্রেক হওয়া থেকে তারচেয়ে বেশী কোনভাবে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারিনা ( যার সাথে আমাদের কোন সম্পর্কই নেই এবং আমাদের দানের  প্রতিদান দেবার কোন সম্ভাবনাও নেই যখন তাদের); এই দুটোই মিসফায়ারিং; ডারউইনীয় ভুল: আশীর্বাদপুষ্ট, কাঙ্খিত মহামুল্যবান সেই ভ্রান্তি; একমুহুর্তের জন্য দয়া করে চিন্তা করবেন না এধরনের ডারউইনীয় বিবরণ বা ব্যাখ্যা সহমর্মিতা এবং উদারতার মত মহান অনুভুতি আর আবেগকে মর্যাদাহীন করছে বা লঘু করছে; যৌনকামনাকেও না; যৌনকামনা যখন ভাষাগত সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেটি প্রকাশ পায় অসাধারন কবিতা আর নাটকের মাধ্যমে, জন ডানের প্রেমের কবিতা, কিংবা রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট; এবং অবশ্যই একই ঘটনা করে মিসফায়ার হওয়া আত্মীয় প্রতি পরার্থবাদীতা বা দান প্রতিদান নির্ভর সহমর্মিতার ক্ষেত্রে; ঋনগ্রস্থ কারোর প্রতি দয়া, যখন মুল প্রাসঙ্গিকতার বাইরে দেখা হয়, অন্যকারো শিশু দত্তক নেবার মতই সেটাকেও অ-ডারউইনীয় মনে হয়; ( দি মার্চেন্ট অব ভেনিস এ যেমন পোর্শিয়া উচ্চারণ করে )

The quality of mercy is not strained.
It droppeth as the gentle rain from heaven
Upon the place beneath.

(কিন্তু দয়ার গুনাবলী অক্ষুন্ন থাকে, শান্ত বৃষ্টির ধারার মতই এটি স্বর্গ থেকে মর্তে নেমে আসে;

যৌন কামনা মানবিক উচ্চাশা আর সংগ্রামের একটি সিংহভাগ অংশের চালিকা শক্তি এবং এর বেশীর ভাগ অংশই মুলত মিসফায়ারিং ( যা জন্য এটি বিবর্তিত হয়নি) ; একই ভাবে উদার এবং সহমর্মি হতে চাইবার কামনার ক্ষেত্রে সত্যি না হবারও কোন কারনই নেই; যদি এটি আমাদের পুর্বসুরীদের গ্রামীন জীবনের মিসফায়ার থেকে সৃষ্ট ফলাফল হয়ে থাকে; আমাদের পুর্বসুরীদের সেই অতীতে এই দুই ধরনের কামনার তাড়না গড়ে তুলতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে একটি ধরা বাধা নিয়ম বা রুল অব থাম্ব গেথে দেয়া, আর সেই নিয়মগুলো এখনও আমাদের প্রভাবিত করে চলছে, এমন কি যখন অবস্থা বা পরিস্থিতি তাদের মুল কাজগুলোর জন্য যখন অপ্রযোজ্য হয়ে গেছে;

এই সব রুল অব থাম্ব বা ধরা বাধা নিয়মগুলো এখনও আমাদের প্রভাবিত করছে; তবে ক্যালিভীনিয় ডিটারমিনিষ্টিক উপায়ে না, বরং সামাজিক প্রথা এবং সাহিত্যে, আইন এবং ঐতিহ্যগত নানা প্রথার সভ্যতা সৃষ্টিকারী প্রভাবের ছাকুনীর মধ্য দিয়ে – এবং অবশ্যই ধর্ম; ঠিক যেমন করে আদিম মস্তিষ্কের যৌন কামনার আইনটি সভ্যতার ছাকুনি দিয়ে অতিক্রম করে রোমিও ও জুলিয়েট এর ভালোবাসার দৃশ্যে আবির্ভুত হয়েছে, একই ভাবে আদিম মস্তিষ্কের সেই আমরা বনাম অন্যরা সংক্রান্ত ভেনদেত্তা বা পুর্বপুরুষদের প্রতিহিংসারও পুনরাবির্ভাব ঘটে ক্যাপুলেট ও মন্টেগুদের চলমান যুদ্ধ রুপে; যখন আদিম মস্তিষ্কের সেই পরার্থবাদীতা এবং সহমর্মিতার নিয়মের মিসফায়ার ঘটে,আমাদের তা আনন্দিত করে শেক্সপিয়ারের শেষ দৃশ্যে বিশুদ্ধ পুনমিত্রতা দেখে;

____________________ চলবে

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

4 thoughts on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : ষষ্ঠ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s