রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : তৃতীয় অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)


ছবি এবং শুরুর কিছু কথা: উপরের ছবিগুলো ভালোভাবে খেয়াল করুন, ছবিগুলো জাপান এর সাগরে বসবাসকারী Heikea japonica নামের একটি ক্র্যাব বা কাকড়া প্রজাতির, এর খোলশ, যাকে ক্যারাপেস বলা হয়, সেটা খেয়াল করুন, ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন এদের খোলসে কাবুকি মুখোশ পরা ক্রদ্ধ সামুরাই যোদ্ধার মুখ, (প্রথম ছবিটির ইনসেটে পোষাকী সামুরাই যোদ্ধাদের কাবুকি মুখোশ এর সাথে মিলিয়ে দেখুন);  এই Heikea  জীনাসের নামকরণ করা হয়েছে অতীতের একটি সামুরাই গোত্র Heike থেকে; জাপানী লোককথায় এরা প্রতিনিধিত্ব করছে হাজার বছর আগে এক সমুদ্র যুদ্ধে মৃত হেইকে সামুরাইদের অশরীরি আত্মা, যারা এখন সাগর তলায় বেচে আছে  এই কাকড়াদের শরীরে; ১১৮৫ সালের ২৫ এপ্রিল,  ইতিহাসে একটি অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ যুদ্ধ হয়েছিল জাপানের সমুদ্রসীমায়, ডানো-উরা র এই যুদ্ধ নির্ধারণ করেছিল পরবর্তী প্রায় ৭০০ বছর (১৮৬৮ সাল পর্যন্ত্য) কারা জাপান শাসন করবে; প্রথমবারের জাপানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল সামরিক একনায়করা, সামুরাই যোদ্ধারা, শোগুনরা, রাজতন্ত্র থেকে জাপান রুপান্তরিত হয় সামন্ততন্ত্রে; জাপানের  সংস্কৃতির এই নাটকীয় পরিবর্তন রচনা করেছিল ডানো উরার যুদ্ধ, আর সেকারনে একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লোককাহিনী এখনও টিকে আছে; হেইকে কাকড়ার নিয়ে কিংবদন্তী শুরু হয়েছিল এখান থেকেই;  এই যুদ্ধে মুখোমুখি হয়েছিল দুটি গোত্র, মিনামোটো (গেনজী) আর টাইরা(হেইকে), হেইকেদের সাথে ছিল তাদের বালক সম্রাট ও তার পরিবার, কিন্তু তাদের একজন গুরুত্বপুর্ণ জেনারেল বিশ্বাসঘাতকতা করে প্রতিপক্ষ গোত্র গেনজীদের চিনিয়ে দেয় সম্রাটকে বহন করা যুদ্ধজাহাজটি; পরাজয় অবশ্যম্ভাবী জেনে শিশু সম্রাট ও তার পিতামহী, পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন, এবং পরাজয়ের অপমান এড়াতে তাদের অনুসরণ করে আত্মাহুতি দেয় অনুগত হেইকে সামুরাই যোদ্ধারা, ধারনা করা হয় সেই থেকে জনশ্রুতিতে প্রচলিত হেইকে সামুরাই আর রাজ পরিবারের অতৃপ্ত আত্মা সমুদ্রে তলদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে; এই জনশ্রুতি আরো জনপ্রিয়তা পায় যখন একটি বিশেষ প্রজাতির কাকড়ার খোলসে মানুষের মুখের অদ্ভুত স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখতে শুরু করে স্থানীয় জেলেরা; তবে কেউ জানে না কবে থেকে এই কল্পকথা শুরু হয়েছিল, ডানো উরার আগে থেকেই এই প্রজাতির কাকড়ার বাস জাপানের সমুদ্রে থাকাটা প্রায় নিশ্চিৎ, তাহলে? কিংবদন্তী এই গল্পটি খানিকটা সত্যি,কিছুটা পুরান, কিছুটা অশরীরি আত্মার কাহিনী, তবে বৈজ্ঞানিক সমাজে দীর্ঘদিন ধরে এটি বিতর্কের কেন্দ্রে, ঠিক কিভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন এখানে কাজ করেছে সে বিষয়ে নানা মত আছে; পঞ্চাশের দশকে বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী স্যার জুলিয়ান হাক্সলী এই অদ্ভুত সদৃশ্যতাকে আকস্মিক দৈবক্রমে ঘটা একটি ঘটনা বলে মানতে চাননি কারন সদৃশ্যতার মাত্রা অনেক বেশী, কৃত্রিম এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি মিশ্রন প্রস্তাব করেছিলেন তিনি, বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসেন কার্ল সেগান তার কসমস প্রামান্য চিত্রটিতে; হাক্সলি/সেগান তত্ত্বটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়, তাদের তত্ত্বটি বলছে, বহু দিন আগে স্থানীয় জেলেরা হয়তো এই প্রজাতির কাকড়ার খোলসে মানুষের মুখের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় (আমাদের মস্তিষ্কের প্রতিসাম্য কোন কিছুর মধ্যে মানুষের মুখচ্ছবি দেখার প্রবনতা আছে); কুসংস্কারাচ্ছন্ন জেলেরা যারা হেইকে সামুরাই দের লোককথা জানতো তারা এই কাকড়াগুলোকে না খেয়ে পানিতে ছুড়ে ফেলে দেয়া ‍শুরু করেছিলো এগুলোকে সামুরাইদের অতৃপ্ত আত্মার বাহনকারী হিসাবে চিহ্নিত করে, আর এভাবেই তারা একটি বিবর্তনীয় প্রক্রিয়া নিজেদের অজান্তে শুরু করেছিল, ধীরে ধীরে মানুষের মুখচ্ছবির সাথে সদৃশ্য থাকা কাকড়া গুলো বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত হয়েছিল, বেচে থাকা এবং প্রজননের ক্ষেত্রে, এই কৃত্রিম নির্বাচন কাকড়াদের বহুপ্রজন্মের ব্যবধানে খোলশ শুধুমাত্র মানুষের মুখ নয়, আরো নির্দিষ্টভাবে সামুরাই যোদ্ধার ক্রুদ্ধ মুখচ্ছবি সদৃশ হয়;  তবে বিষয়টি নিয়ে যুক্তিসঙ্গত সংশয় প্রকাশ করেছেন বহু জীববিজ্ঞানী;সংশয়বাদীরা বলছেন, আমাদের প্রাকৃতিক নির্বাচনের আওতার বাইরে আসার কোন দরকার নেই, প্রতিসম শরীরের এই কাকড়াটির খোলসের দাগ আসলে তার মাংশপেশীর সংযোগস্থল, তার শরীরের নানা প্রকোষ্ঠকে প্রতিনিধিত্ব করে, এই সদৃশ্যটা আকস্মিক, আর সেখানে সামুরাই যোদ্ধার মুখ দেখা সম্ভবত প্যারেডলিয়া র উদহারন (প্যারেডলিয়া, আমাদের মস্তিষ্কের প্রবনতা, অনেক কিছুর মধ্যে মানুষের মুখ বা আকৃতি দেখা); এছাড়া আরো কয়েকটি প্রজাতির কাকড়া আছে যাদের খোলশে মানুষের মুখের প্রতিচ্ছবি চাইলে দেখা যাবে (যেমন Dorippidae), মানুষের কৃত্রিম নির্বাচনের কোন প্রভাবই নেই যাদের উপরে ;  এছাড়া আকারে খুব ছোট এই কাকড়াগুলো তেমন খাদ্য উপযোগীও নয় (এ বিষয়ে আরো আলোচনা আছে নীচে)

 
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ :  তৃতীয় অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

The Greatest Show on Earth: The evidence for evolution by Richard Dawkins

 প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)

 ম্যাক্রোইভোল্যুশনের দিকে মসৃন পথ …..

____________

 তুমি আমার প্রাকৃতিক নির্বাচন ..

মানুষ নয় এমন চোখের সিলেকটিভ ব্রিডিং বা বাছাইকৃত প্রজননের আর কি কোন উদহারন আছে? অবশ্যই আছে; চিন্তা করে দেখুন স্ত্রী বা হেন ফিজান্টদের (Pheasant)বর্ণহীন, ক্যামোফ্লেজ করা পালকের কথা,একই প্রজাতির পুরষ সদস্যদের বর্ণময় সুন্দর পালকগুচ্ছর সাথে সেটি তুলনা করে দেখুন (ছবি); আমার মনে হয়না সন্দেহর কোন অবকাশ আছে, যদি শুধু নিজের জন্যই তাদের বেচে থাকাটাই মুখ্য হতো, পুরুষ সোনালী ফিজান্টরা (Golden Pheasant) তাদের প্রজাতির বিপরীত লিঙ্গর সদস্যদের মতই বর্ণহীন পালক বেছে নিতে চাইতো বা যখন তারা ছোট ছিল তখন যেমন পালক ছিল, তারই একটি সাদামাটা প্রাপ্তবয়স্ক সংস্করণ হলেও তাদের চলতো;  স্ত্রী এবং শিশু বা চিক ফিজান্টরা অবশ্যই ‍তাদের পালকের বর্ণ ও বিন্যাসে অবশ্যই খুব ভালোভাবে ক্যামোফ্লেজকৃত এবং পুরুষ ফিজান্টদের ক্ষেত্রেও সেটাই তারা চাইতো শুধুমাত্র যদি তাদের ব্যক্তিগত বেচে থাকাটাই একমাত্র উদ্দেশ্য হত; এবং একই ভাবে বিষয়টি সত্য হতো অন্য প্রকার ফিজান্টদের মধ্যে, যেমন লেডি অ্যামহার্ষ্ট (Lady Amherst’s) এবং সুপরিচিত রিং নেকড ফিজান্ট (ring-necked); পুরুষ ফিজান্টরা দৃষ্টি আকর্ষন করার মতই চোখ ধাধানো এবং যে কারনে শিকারী প্রানীদের কাছে বিপজ্জনকভাবে আকৃষ্ট, কিন্তু প্রতিটি প্রজাতিতে তা ঘটে খুবই ভিন্ন ভিন্নভাবে; কিন্তু দেখা যাচ্ছে সব প্রজাতির স্ত্রী সদস্যদের রঙ মলিন এবং ক্যামেফ্লেজকৃত, আর প্রতিটি প্রজাতিতে প্রা্য় একই রকম ঘটছে; কি হচ্ছে তাহলে এখানে, এর অর্থটাই বা কি?

Continue reading “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : তৃতীয় অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)”

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : তৃতীয় অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)