রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : তৃতীয় অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)


ছবি: মাদাগাস্কার স্টার অর্কিড ( অর্কিড টির দীর্ঘ মধুর থলিটি লক্ষ্য করুন)

ছবি: অ্যানগ্রেকাম সেসকিপেডালী’র দীর্ঘ স্পার আর লম্বা জিহবার জ্যানথোপ্যান মরগানী প্রেডিক্টা মথ (ডারউইন হক মথ)

ছবি: জ্যানথোপ্যান মরগানী প্রেডিক্টা মথ,অর্কিডটির পরাগায়নের জন্য একমাত্র এই প্রাণীটি সক্ষম

শরুর আগের কিছু কথা: ডারউইনের ধারনাগুলোর মধ্যে সবগুলোই যে বড় পরিসরের বা পৃথিবী কাপানো, তা কিন্তু না, কিছু কিছু ছিল খুব সাধারন ভবিষ্যদ্বানী। মাদাগাস্কারের অ্যানগ্রেকাম সেসকিপেডালী (Angraecum sesquipedale) নামের অর্কিড প্রজাতির কথাই ধরুন  ( যা মাদাগাস্কার স্টার অর্কিড নামেও পরিচিত)। ১৮৬২ সালে তিনি যখন এই অর্কিডটি প্রথম দেখেন, আর সবার মত এর স্পারটির দৈর্ঘ্য দেখে অবাক হয়ে যান (ছবিতে পেছনে সরু সবুজ নালীটিকে দেখুন); এই অর্কিডটি তার ফুলের পেছনে একটা লম্বা স্পার বা মধুথলি তৈরী করে যার দৈর্ঘ্য এক ফুটেরও বেশী (২০-৩৫ সেমি) (ল্যাটিন ভাষায় সেসকিপেডাল মানে দেড় ফুট) এবং এই স্পারের একেবারে তলদেশে এটি নেক্টার বা ফুলের মধু তৈরী করে। ‘আশ্চর্য্য’, তিনি লিখেছিলেন, ‘কোন পতঙ্গ  এই মধুথলীর মধু পান করতে পারে?’ মন্তব্য করেন, এখনো আবিষ্কার হয়নি এমন কোন পতঙ্গ নিশ্চই আছে যার এক ফুট দীর্ঘ জিহবা আছে, যা দিয়ে এই লম্বা মধুথলীর মধু খেতে পারে। তার সমসাময়িক কীটপতঙ্গবিদরা সন্দিহান ছিলেন বিষয়টি নিয়ে, কারন ‍সেরকম কোন পতঙ্গতো পাওয়া যায়নি। ডারউইন বিশ্বাস করতেন যে ফুলের অতিআড়ম্বরপুর্ণ রং কিংবা আকার বিবর্তিত হয়েছে মানুষের সন্তুষ্টির জন্য না বরং পরাগায়নের জন্য পতঙ্গদের আকর্ষন এবং তাদের নিজেদের সফল বংশবিস্তারের কৌশল হিসাবে। যে পরিচিত কৌশল ডারউইন শনাক্ত করেছিলেন, তা হলো ফুলের মধু খাওয়ার সময় ফুল পতঙ্গের পায়ে ফুলের আঠালো রেণু লাগিয়ে দেয়া। সুতরাং ডারউইন প্রস্তাব করেছিলেন, মাদাগাস্কারের জঙ্গলে কোথাও না কোথাও কোন এমন কোন পতঙ্গ বাস করে যার জিহবা যথেষ্ট পরিমান দীর্ঘ,অ্যানগ্রেকাম সেসকিপেডালী’ এর লুকোনো মধু পান করার জন্য। যখনই এই রহস্যময় পতঙ্গটি তার দীর্ঘ জিহবা প্রবেশ করে ফুলের গায়ে চেপে বসে মধু পান করে, ফুলের রেণু তখন তার শরীরে মেখে যায়, যা ফুলটি পরাগায়নে সহায়তা করে। তার মৃত্যুর একুশ বছর পর তার ভবিষ্যদ্বানী সত্য প্রমানিত হয়, যখন মাদাকাস্কারের জঙ্গলে বিজ্ঞানীরা খুজে পান দীর্ঘ জিহবার সেই পতঙ্গ, ডারউইনের ভবিষ্যদ্বানীকে সন্মান করে এটির নামকরন করা হয় জ্যানথোপ্যান মরগানী প্রেডিক্টা (ছবি ১৪ -১৫), একমাত্র এই মথটি পারে এই অর্কিডের পরাগায়ন করতে। ( নীচে আরো আলোচনা আছে এ বিষয়ে) ;এটি রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ (The Greatest Show on Earth: The evidence for evolution) বইটির তৃতীয় অধ্যায় The primrose path to macroevolution এর অনুবাদ প্রচেষ্টা; এই অধ্যায়টি বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের একটি ধারাবাহিকতা; পাঠকদের দ্বিতীয় অধ্যায় এবং তৃতীয় অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে পড়ার জন্য অনুরোধ থাকলো)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ :  তৃতীয় অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

The Greatest Show on Earth: The evidence for evolution by Richard Dawkins

 প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়

There is grandeur in this view of life, with its several powers, having been originally breathed into a few forms or into one; and that, whilst this planet has gone cycling on according to the fixed law of gravity, from so simple a beginning endless forms most beautiful and most wonderful have been, and are being, evolved. Charles Darwin 

 ম্যাক্রোইভোল্যুশনের* দিকে মসৃন পথ …..

____________

দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা দেখেছি, কিভাবে মানুষের চোখ, বহু প্রজন্মের উপর সিলেকটিভ ব্রিডিং বা বাছাইকৃত প্রজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কুকুরের শরীরের মাংসকে যেন ময়দার তালের ছেনে, ভাস্করের মতে গড়ে পিটে,বিস্ময়কর রকম বিচিত্র রুপ দিয়েছে আকার, রং আর আচরনে; কিন্তু আমরা তো মানুষ,পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যমুলকভাবে পছন্দ অপছন্দ করার ব্যাপারে আমরা অভ্যস্থ ; অন্য এমন কোন প্রানী কি আছে,যারা মানুষ ‍ ব্রীডারদের মত একই কাজ করতে পারে, হয়তো  কোন উদ্দেশ্য বা বিস্তারিত পুর্বপরিকল্পনা ছাড়াই এবং যার ফলাফলও একই করম?  এর উত্তর অবশ্যই হ্যা, এবং তারাই এই বইটির প্রাকৃতিক নির্বাচনকে বোঝার সহজীকরন প্রক্রিয়াটি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে; এই অধ্যায়টি যাত্রা শুরু করেছে ধাপে ধাপে পাঠকের মনকে প্ররোচিত করার প্রক্রিয়ায়, যখন কুকুরদের ব্রীডিং ও কৃত্রিম নির্বাচনের পরিচিত ক্ষেত্র থেকে কিছু বর্ণিল অন্তবর্তীকালীন পর্যায় পেরিয়ে, ডারউইনের ‍সুবিশাল আবিষ্কার প্রাকৃতিক নির্বাচনের জগতে আমরা প্রবেশ করবো; মন ভোলানোর এই অন্তবর্তীকালীন পর্বগুলোর প্রথম ধাপটি ( একে প্রিমরোজ পাথ বা মসৃন সহজ পথ বললে কি বেশী বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে? ) আমাদের নিয়ে যাবে ফুলদের মধূময় জগতে।


ছবি: আলবার্টা ওয়াইল্ড রোজ বা বুনো গোলাপ

বুনো গোলাপ ভালো লাগার মতই ছোট আকারের একটি ফুল, যথেষ্ট সুন্দর,কিন্তু আহমরি এমন কিছু না যে তাকে নানা নজরকাড়া নামের বিশেষন আরোপ করা যেতে পারে; যেমন ধরুন,পিস (Peace),বা লাভলী লেডি (Lovely lady) বা ওফেলিয়া (Ophelia) ; নিঃসন্দেহে বুনো গোলাপের একটা সুক্ষ্ম সুগন্ধ আছে, কিন্তু তা জ্ঞান হারাবার মত নয়, যেমন মেমোরিয়াল ডে (Memorial day) বা এলিজাবেথ হার্কনেস( Elizabeth Harkness) বা ফ্রাগরান্ট ক্লাউড (Fragrant cloud) ; মানুষের নাক আর চোখ বুনো গোলাপের উপর তার প্রভাব খাটিয়েছে, তার এদের আকারে বড় করেছে, ভিন্ন করেছে গঠন, পাপড়ির ঘনত্ব আর সংখ্যা বাড়িয়েছে দ্বিগুন হারে, নানা রঙ এর ছোয়ায় বর্ণিল করেছে,সংখ্যা বেড়েছে ফুলের, আর নিয়ন্ত্রন করেছে এদের ফুল ফোটার সময়; প্রাকৃতিক হালকা সুবাস থেকে মাথা ঝিম ধরিয়ে দেবার মত তীব্র সুবাস সৃষ্টি করেছে,প্রয়োজনের সাথে সামন্জষ্যপুর্ণ করে খাপ খাইয়ে নিয়েছে তাদের বেড়ে উঠার প্রকৃতি, অবশেষে জটিল অভিজাত হাইব্রিড প্রক্রিয়ায় ‍মাধ্যমে এত বেশী পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে গোলাপের, যে আজ, সেই বহু দশকের দক্ষ সিলেকটিভ বা বাছাইকৃত প্রজনন প্রক্রিয়া ফসল হচ্ছে শত শত নন্দিত প্রকারের গোলাপ, যাদের প্রত্যেকের অর্থময় বা কোন স্মৃতিস্মারক নাম রয়েছে; কেই বা চাইবে না তার নামে একটি গোলাপের নামকরণ হোক?

ছবি: বুনো গোলাপ থেকে ব্রীডিং করা নানা জাতের গোলাপের একাংশ ( উপরে বা দিক থেকে, Peace, Lovely Lady, Memorial day, ‍Sunflare, Elizabeth Harkness, Fragrant cloud, Geranium ‘Black Rose’, Sterling, Ophelia, Julia’s)

গৃহপালিতকরণ বা ডোমেষ্টিকেশন প্রক্রিয়াটি প্রথম শুরু করেছিল কীট পতঙ্গরাই:

কুকুরদের মত গোলাপের কাহিনীও একই রকম, তবে শুধু একটি পার্থক্য ছাড়া, যে বিষয়টি আমাদের প্রাকৃতিক নির্বাচন বোঝার লক্ষ্যে সহজীকরন কৌশলের সাথে প্রাসঙ্গিক; গোলাপ গাছের ফুল, এর উপর মানুষের চোখ আর নাকের জীনতাত্ত্বিক খোদাই এর কাজ শুরু করার বহু আগেই, তারা তাদের মিলিয়ন বছরের অস্তিত্ত্বের জন্য ‍ঋণী কীটপতঙ্গদের চোখ আর নাকের (অ্যান্টেনী, বলাই ঠিক হবে কারন এর মাধ্যমেই কীটপতঙ্গরা গন্ধ শোকে) একই রকম খোদাই করার প্রক্রিয়ার কাছে, ‍আর  আমাদের বাগানকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে এমন সব ফুলের ক্ষেত্রেও একই ভাবে এটি সত্যি।


ছবি: বুনো সুর্যমুখী


ছবি: জায়ান্ট সুর্যমুখী ( ফটোগ্রাফ: আসমা সুলতানা মিতা)

সুর্যমুখী, Helianthus annuus উত্তর আমেরিকার একটি উদ্ভিদ, যার বন্য রুপটি দেখতে অ্যাস্টার কিংবা বড় আকারের ডেইজীর মত; কিন্তু এটি চাষাবাদের মাধ্যমে মানুষের হাতে গৃহপালিত হয়ে এমন একটি পর্যায়ে পৌছেছে যে এর ফুলের আকার এখন একটি বড় ডিনার প্লেটের সমান (ডেইজী পরিবারের সব সদস্যদের মতই, প্রতিটি ‘ফুল’ আসলে অসংখ্য ছোট ছোট ফুল ( ফ্লোরেট) এর সমষ্টি, যেগুণো মাঝখানের একটি গাঢ় রঙের ডিস্ক বা চাকতী মধ্যে গুচ্ছাকারে বাধা, যে হলুদ পাপড়িগুলো যারা সুর্যমুখীর চারপাশে ঘিরে আছে আসলে তারা হচ্ছে একেবারে প্রান্তে সাজানো ছোট ফুল বা ফ্লোরেট গুলোর পাপড়ি; ডিস্কের বাকী ফ্লোরেটগুলোরও পাপড়ি আছে, তবে তারা খুব ছোট সহজে লক্ষ্য করা  যায় না) ;  ‘ম্যামথ’ সুর্যমুখী, জাতটি মুলত জন্ম হয়েছিল রাশিয়ায়, প্রায় ১২ থেকে ১৭ ফুট লম্বা দীর্ঘ এই গাছাটির ফুলের মাথার ব্যাস এক ফুটের কাছাকাছি, যা এর বুনো সুর্যমুখীর ফুলের আকারের চেয়ে প্রায় দশগুন বড়; এবং বুনো সুর্যমুখী গাছে যেমন একসাথে অনেকগুলো ফুলের জন্ম হয়, মানুষের ব্রীড করা  এই সুর্যমুখীতে সাধারনত প্রতিটি গাছে একটি ফুলই ফোটে; প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা দরকার, রুশরা কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্ভিদটির চাষাবাদ শুরু করেছিল প্রধানত ধর্মীয় কারনে, লেন্ট এবং অ্যাডভেন্ট এর সময় খৃষ্টীয় অর্থোডক্স চার্চের নিশেষাজ্ঞা আছে যে তেল দিয়ে কোন কিছু রান্না করা যাবেনা এবং বেশ সুবিধাজনকভাবেই – ধর্মীতত্ত্বীয় ভাবগম্ভীর বিষয়ে যেহেতু আমি প্রশিক্ষিত হয়নি, আর তাই সেই ‍কারনটি বোঝার কোন চেষ্টাই করতে যাবো না-সুর্যমুখীর বীজের তেল এই নিষেধাজ্ঞার আওতা বহির্ভুত ছিল (কারনটি হয়তো, নতুন পৃথিবী বা নিউ ওয়ার্ল্ড, যেমন উত্তর আমেরিকার উদ্ভিদ হিসাবে, সুর্যমুখীর কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি বাইবেল এ; ধর্মতাত্ত্বিক মন সাধারনত খাদ্য সংক্রান্ত নানা বিধিনিষেধ নিয়ে খুটিনাটি এবং কিভাবে তা ফাকি দেয়া যাবে সে বিষয়ে আলোচনায় বেশ তৃপ্তি অনুভব করে ; আরেকটি উদহারণ হচ্ছে দক্ষিন আমেরিকায়, ক্যাপিবারা ( এক  ধরনের গিনিপিগ) দের শুক্রবারে ’সন্মানিত’ মাছ হিসাবে গন্য করা হয় ক্যাথলিকদের খাদ্য বিধির প্রয়োজনে, সম্ভবত তারা পানিতে বাস করে সেই ধরনের যুক্তি উপস্থাপনার মাধ্যমে; খাদ্য সমালোচক লেখক ডরিস রেনল্ড এর মতে, ফরাসী ক্যাথলিকরা তাদের খাদ্যতালিকায় একটি ছিদ্র খুজে বের করেছিলেন, যা তাদের জন্য শুক্রবারে মাংশ খাওয়া জায়েজ করেছে; সেটা হচ্ছে ভেড়ার পা কোন কুয়ায় ফেলে দিয়ে তারপর সেটা ’মাছের’ মত খুজে বের করুন; তারা নিশ্চয়েই ভাবেন, ঈশ্বরকে কত সহজেই বোকা বানানো যেতে পারে); এই বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক প্রণোদনা যুগিয়েছিল সুর্যমুখীর সিলেকটিভ প্রজননের ক্ষেত্রে। তবে আধুনিক সময়ের বহু আগে থেকেই, আমেরিকার আদিবাসীরা এই পুষ্টিকর, চমৎকার এই ফুলটিকে চাষাবাদ করা শুরু করে খাদ্য, রঙ এবং নানা ধরনের সাজসজ্জায় ব্যবহারের জন্য এবং তারা তাদের সেই প্রচেষ্টায় বুনো সুর্যমুখী এবং আধুনিক চাষীদের সুবিশাল সুর্যমুখীর মাঝামাঝি একটি রুপ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু তারও বহু আগে আবারও, সুর্যমুখীরা তাদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ঋনী কীটপতঙ্গদের দ্বারা পরিচালিত সিলেকটিভ ব্রীডিং এর প্রতি;


ছবি: মানুষের চাষ করা জায়ান্ট সুর্যমুখী ( রাশিয়ার জায়ান্ট ম্যামথ সানফ্লাওয়ার)

ছবি: বুনো সুর্যমুখী থেকে শস্য সুর্যমুখী (Helianthus annus); খৃষ্টপুর্ব প্রায় ২৬০০ বছর আগে মধ্য আমেরিকার (মেক্সিকো) ইন্ডিয়ানরা এই ফুলটি গৃহপালিতকরন করেছিল।

আর এই কথাটা প্রযোজ্য আমাদের জানা প্রায় সব ফুলের ক্ষেত্রেই – সম্ভবত সব ফূলের ক্ষেত্রেই যাদের রং সবুজ ছাড়া অন্য কোন কিছু বা উদ্ভিদের নিজস্ব অস্পষ্ট একটি গন্ধ ছাড়া যাদের ভিন্ন কোন গন্ধ আছে; এই সব কাজ কীটপতঙ্গরা একা করেনি, কিছু কিছু উদ্ভিদের ক্ষেত্রে প্রথম সিলেকটিভ ব্রিডীং এর ভুমিকা পালন করেছিল অন্য পরাগায়নকারীরা, যেমন হামিংবার্ড, বাদুড় এমন কি ব্যাঙ -কিন্তু সবক্ষেত্রেই প্রক্রিয়াটির মুলনীতি মুলত এক; আমরা বাগানের ফুলগুলোকে আরো সুন্দর করে গড়ে তুলেছি, কিন্তু বুনো ফুলগুলো প্রথমেই যে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছিল, তার কারন কিন্তু কীটপতঙ্গ এবং অন্যান্য নির্বাচনী এজেন্টরা, যারা সেখানে আমাদের আগেই তার  কাজ করেছে; পুর্বপুরুষ ফুলদের বহু প্রজন্মকে বাছাই বা নির্বাচন করেছে বহু পুর্বপুরুষ প্রজন্মের কীটপতঙ্গবা হামিংবার্ড রা  কিংবা অন্য কোন প্রাকৃতিক পরাগায়নকারীরা;  এটি সিলেকটিভ বা বাছাইকৃত প্রজনন এর একটি চমৎকার উদহারণ, পার্থক্যটা সামান্যই, শুধুমাত্র প্রজনন নিয়ন্ত্রনকারী জীবগুলো মানুষ নয় বরং কীটপতঙ্গ বা হামিং বার্ড;  অন্ততপক্ষে,আমি মনে করি এই পার্থক্যটা নগন্য, আপনার কাছে হয়তোবা তা না, সেক্ষেত্রে, বিষয়টি আরো খানিকটা সহজীকরণ করতে হবে আমাকে।

কোন বিষয়টি তবে আমাদের প্রলুব্ধ করছে পার্থক্যটিকে বিশাল বড় করে দেখার জন্য? একটা কারন হতে পারে মানুষরা ‘সচেতনভাবে’ বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এ্ই ব্রীডিং করা শুরু করেছে, যেমন ধরুন, সবচেয়ে গাঢ়, সবচেয়ে কালচে বেগুনী গোলাপ সৃষ্টি করতে, যতটুকু করা সম্ভব, করার উদ্দেশ্যটা তাদের নন্দনতাত্ত্বিক একটি সখকে সন্তুষ্ট করার জন্য বা হতে পারে এর কারন অর্থনৈতিক, এটি সংগ্রহ করার জন্য কেউ না কেউ হয়তো অর্থ ব্যয় করবে; আর কীটপতঙ্গরা অবশ্যই কোন নন্দনতাত্ত্বিক উদ্দেশ্যে কাজটি করেনি বরং তারা কাজটি করেছে কারন …………., বেশ এখানে আলোচনায় আমাদের একটু পেছন দিকে ফিরতে হবে, ফুল আর পরাগায়নকারীর মধ্যে পুরো সম্পর্কটাকে আমাদের আসলে বুঝতে হবে;  আমি এখানে সেই প্রেক্ষাপটটি বর্ণনা করবো। বেশ কিছু কারনে, যাদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আমি এই মুহুর্তে করবো না, যৌন প্রজননের প্রধানতম বিষয়টি হচ্ছে, আপনার নিজেকে নিজেই ফার্টিলাইজ বা নিষিক্ত করা উচিৎ না। আর আপনি যদি সেটা করেনই, তাহলে আসলে আর এই যৌন প্রজনন নিয়ে প্রথমেই মাথা ঘামানোর কোন অর্থ নেই; পরাগরেণুকে কোন না কোনভাবে এক উদ্ভিদ খেকে অন্য উদ্ভিদে স্থানান্তরিত হতে হবে;   উভলিঙ্গ উদ্ভিদগুলো, যাদের একই ফুলের মধ্যে পুরুষ এবং স্ত্রী উভয় অংশই থাকে, তারা প্রত্যেকেই বিস্তারিত নানা ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নিশ্চিৎ করে, যেন ফুলের পুরুষ অংশ যেন কোনভাবেই একই ফুলের স্ত্রী অংশকে নিষিক্ত করতে না পারে; ডারউইন নিজে গবেষনা করেছিলেন, কি বিস্ময়কর অসাধারন উপায়ে সেকাজটি করে থাকে প্রিমরোজ ফুলের ক্ষেত্রে;

যৌন প্রজননের বাস্তবতায় বিষম নিষিক্তকরন বা ক্রস ফার্টিলাইজেশন যেখানে অবশ্য প্রয়োজনীয়, বিভিন্ন প্রজাতির ফুলরা তাহলে কেমন করে স্বপ্রজাতির অন্য একটি ফুল পর্যন্ত মধ্যবর্তী দুরত্ব অতিক্রম করে পরাগরেনু স্থানান্তর করার কৌশল অর্জন করেছে? একটি উপায়, নি:সন্দেহে বাতাস এবং বহু উদ্ভিদ সেটাই ব্যবহার করে; পরাগরেনুগুলো সুক্ষ্ম, হালকা পাউডারের মত, বেশ বাতাস হচ্ছে এমন কোন দিনে যথেষ্ট পরিমান রেনু ‍আপনি বাতাসে ছড়িয়ে দিতে পারেন, তাহলে  অল্প কিছু রেনুর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতে পারে, সঠিক প্রজাতির কোন ফুলের সঠিক জাগয়ায় অবতরণ করার; কিন্তু বায়ুপরাগায়ন স্পষ্টতই অপচয়মুলক; প্রচুর পরিমানে বাড়তি রেণু আপনাকে সৃষ্টি করতে হবে, হে ফিভার (hay fever) এ আক্রান্তরা সেটা ভালো করেই জানেন; এই বিশাল পরিমানে উৎপাদিত রেনুর বদ একটি অংশরই তাদের যেখানে অবতরণ করার কথা তা না করে বরং ভিন্ন কোথাও অবতরণ করে এবং এগুলো উৎপাদনের সাথে জড়িত শক্তি এবং নানা মুল্যবান উপাদানের অপচয়ও ঘটে; কিন্তু পরাগরেনুকে তার নিশানা মত পৌছে দিতে আরো তো সরাসরি কিছু উপায় আছে;

উদ্ভিদরা কেন প্রানীদের মত পথ বেছে নেয়না, এবং হেটে হেটে স্বপ্রজাতির অন্য উদ্ভিদ খুজে বের করে তাদের সাথে সঙ্গম করার মাধ্যমে? এই প্রশ্নটা আপনি যা ভাবছেন, সঠিক প্রত্যুত্তর দেয়া তার চেয়েও আসলে কঠিন; সুতরাং আপাতত সহজভাবে ( সার্কুলার যুক্তি হিসাবে) স্পষ্ট করে অন্তত এটা বলা যায়, উদ্ভিদরা তো আর হাটতে পারেনা, আমার মনে হয় আপাতত এরচেয়ে বেশী এ বিষয়ে আলোচনা যেতে পারছিনা (অলিভার মর্টন এটি ও  প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন, তার চিন্তা জাগানো কাব্যিক  বইটি Eating the Sun নিয়ে); বাস্তব্তাটা হচ্ছে উদ্ভিদরা হাটতে জানেনা,কিন্ত‍ু প্রানীরা পারে, এবং প্রানীরা উড়তেও পারে, এবং তাদের একটি নির্দিষ্ট নিশানা বরাবর, যেমন তাদের পছন্দনীয় আকার, আকৃতি বা রঙ এর দিকে যাতায়াত করার নির্দেশনা দেবার মত একটি স্নায়ুতন্ত্রও আছে; সুতরাং শুধুমাত্র যদি এই প্রানীগুলোকে কোন ভাবে রাজী করানো যায়, যেন তারা তাদের গায়ে পরাগরেনুগুলো ভালো করে মেখে নিয়ে, হেটে বা আরো বেশী ভালো হয় যদি উড়ে গিয়ে সঠিক প্রজাতির অন্য ফুলে পৌছে দেয়;

বেশ, এর উত্তর তো সবারই জানা আছে; এবং ঠিক সেটাই ঘটছে; কোন কোন ক্ষেত্রে সেই গল্পটি খু্বই জটিল তকে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তা আমাদের বিস্মিত করে; অনেক ফুলই তাদের এই গুরুত্বপুর্ণ কাজটি করে দেয়ার জন্য প্রানীদের ’উৎকোচ’ হিসাবে নিবেদন করে খাদ্য, সাধারণত মধু বা নেকটার; হয়তো উৎকোচ শব্দটা আগে থেকেই ভিন্নার্থে ভারাক্রান্ত;  তারচেয় বরং আপনারা কি ‘সেবার বিনিময়ে পরিশোধিত মুল্য’ বলাটাই শ্রেয়তর মনে করবেন? দুটো শব্দর কোনটির ক্ষেত্রেই আমার কোন অসুবিধা নেই, যতক্ষন না আমরা শব্দগুলো মানুষের দৃষ্টিকোন থেকে দেখে তার থেকে ভুল অর্থ না করি। নেকটার হচ্ছে শর্করা ( বা চিনির) সিরাপের মত একটি তরল এবং উদ্ভিদরা এটি শুধুমাত্র বিশেষভাবে তৈরী করে, মৌমাছি, প্রজাপতি, হামিংবার্ড, বাদুড় ও তাদের ভাড়া করা অন্যান্য বাহনের মুল্য পরিশোধ এবং জ্বালানী সরবরাহ করার জন্য; এই মধু বা নেকটার তৈরী করা উদ্ভিদের জন্য খুবই শ্রমসাধ্য একটা ব্যাপার; পাতা – যারা গাছের নিজস্ব সোলার প্যানেল- র মাধ্যমে ধারন করা সুর্যের আলোর শক্তির একটি অংশ নেকটার বা মধু তৈরী করার প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়; মৌমাছি বা হামিংবার্ডের দৃষ্টি ভঙ্গীতে ফুলের মধূ হচ্ছে উচ্চ শক্তি সম্পন্ন ‘অ্যাভিয়েশন’ জ্বালানী; মধুর উপাদান শর্করা বা চিনির মধ্যে বন্দী থাকা শক্তি, গাছের নিজস্ব অর্থনীতিতে অন্য কোথাও ব্যবহার হতে পারতো, যেমন মুল বা শিকড় তৈরীর কাজে, মাটির নিচের খাদ্যগুদাম, যেমন টিউবার, বাল্ব বা কর্ম তৈরীতে কিংবা চারদিকে বাতাসে ছড়ানোর জন্য এমন কি প্রচুর পরিমানে ফুলের পরাগরেনু তৈরী করার কাজে; স্পষ্টতই অর্থনীতির এই টানটান সমীকরনে বেশীর ভাগ উদ্ভিদের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে  যে কীটপতঙ্গ বা পাখিদের ডানা এবং উড়বার জন্য ব্যবহৃত মাংশপেশীকে শর্করা সরবরাহ করার পক্ষেই পাল্লা ভারী থাকে; আবার উদ্ভিদের এধরনের সিদ্ধান্তে যে শুধু নিজেদের জন্য নিরঙ্কুশ সুবিধা থাকে তাও কিন্ত‍ু না, কারন এমনও উদ্ভিদদের সংখ্যা কম নয় যারা বাতাসের মাধ্যমে পরাগায়ন ঘটায়, সম্ভবত তাদের নিজস্ব শক্তি বরাদ্দ করার অর্থনীতিতে ভারসাম্যটা সেদিকেই ভারী; প্রতিটি উদ্ভিদের নিজস্ব একটি শক্তি ব্যবহারের অর্থনীতি আছে এবং যে কোন অর্থনীতির মতই, ট্রেড অফ গুলো (কোন কিছু ত্যাগ করার বিনিময়ে কিছু পাওয়া) ভিন্ন ভিন্ন পন্থাগুলোকে বিভিন্ন পরিস্থিতি অনুযায়ী সহায়তা করে:  বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপুর্ণ শিক্ষা আছে কিন্তু এখানে; বিভিন্ন প্রজাতি বিভিন্ন উপায়ে তাদের কাজগুলো সমাধান করে, প্রায়ই আমরা এই পার্থক্যটা বুঝতে পারিনা যতক্ষন না পর্যন্ত আমরা পুরো প্রজাতির অর্থনীতিকে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখি;

যদি বায়ু পরাগায়ন নানা ধরনের ক্রশ ফার্টিলাইজেশন প্রক্রিয়ার একটি ধারাবাহিক স্পেকট্রামের এক প্রান্ত হয়ে থাকে – চলুন আমরা এই প্রান্তকে বলি অতিমাত্রায় অমিতব্যায়ী প্রান্ত? তাহলে এর অন্য প্রান্তে কি আছে, সেই লাগসই ‘ম্যাজিক বুলেট’ প্রান্তে? খুব কম কীটপতঙ্গ আছে যাদের উপর ভরসা করা যেতে পারে, যারা কিনা ম্যাজিক বুলেটের মত পরাগরেনু সংগ্রহ করার ফুল থেকে সরাসরি একেবারে সঠিক প্রজাতির অন্য ফুলে গিয়ে বসবে;  কেউ কেউ হয়ত অন্য যে কোন ফুলে গিয়ে বসতে পারে, বা সম্ভবত যা প্রায় একই রঙ এর কোন ফুলে গিয়ে বসে, সুতরাং বিষয়টি পুরোপুরি ভাগ্য ছাড়া আর কিছু না যে,পতঙ্গটি ঠিক সেই একই প্রজাতির কোন ফুলে গিয়ে বসবে, যে প্রজাতির অন্য একটি ফুল তাকে কিছুক্ষন আগেই মধু বা নেকটার দিয়ে তার কাজের অগ্রিম মুল্য পরিশোধ করেছে;  তাসত্ত্বে বেশ চমৎকার উদহারন আছে কিছু ফুলের, যারা স্প্রেকট্রাম এর এই ধারাবাহিকতায় ’ম্যাজিক বুলেট’ প্রান্তর কাছাকাছি অবস্থান করে; এই তালিকায় শীর্ষে আছে অর্কিডরা; কোন সন্দেহ নেই, কেন ডারউইন তার পুরো একটি বই লিখেছিলেন তাদের নিয়ে;


ছবি: Angraecum eburneum var. longicalcar,  এর মথু থলিটি আরো দীর্ঘ, ধারনা করা হচ্ছে এটি পরাগায়ন করার জন্য একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মথ আছে; যেমনটি Angraecum sesquipedale  এর ক্ষেত্রে ঘটেছে;

ডারউইন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের তার সহ উদ্ভাবক, ওয়ালেস, দুজনেই দৃষ্টি আকর্ষন করেছিলেন মাদাগাষ্কারে খুজে পাওয়া একটি অপুর্ব অর্কিড Angraecum sesquipedale  এর দিকে এবং দুজনেই একই রকম একটি অসাধারন প্রেডিকশন বা পুর্বধারনা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে সত্য প্রমানিত হয়েছিল; এই অর্কিডটির  লম্বা টিউবের মত মধুর থলিটি (nectarie/spur) ডারউইনের নিজের স্কেলের মাপেই ১১ ইন্চির বেশী দীর্ঘ ছিল, যা প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার, নিকটাত্মীয় অন্য প্রজাতি Angraecum longicalcar, এর এই স্পার বা মধুর থলিটি এমনকি আরো লম্বা প্রায় ৪০ সেমি (১৫ ইন্চিরও বেশী); শুধু মাত্র মাদাগাস্কারে A. sesquipedale পাওয়া যায় এই তথ্যটির উপর ভর করে ডারউইন ১৮৬২ সালের তার অর্কিড বিষয়ক বইটিতে  ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন, অবশ্যই এমন কোন মথ আছে যার জিহবা ১০ থেকে ১১ ইন্চি লম্বায় দীর্ঘায়িত হতে পারে’; ওয়ালেস, এর পাচ বছর পর ( বিষয়টি স্পষ্ট নয় তিনি ডারউইনের  বইটি  পড়েছিলেন কিনা) উল্লেখ করেন যে, কয়েকটি মথ এর প্রবসেস (probosces বা দীর্ঘ নমনীয় একটি উপাঙ্গ যা খাদ্যগ্রহন এর কাজে ব্যবহৃত হয়)  প্রায় এধরনের অর্কিডের স্পারের সমান যথেষ্ট দীর্ঘ:

আমি খুবই সতর্কতার সাথে বৃটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত দক্ষিন আমেরিকার Macrosila cluentius প্রজাতির নমুনাটির প্রোবসিস এর দৈর্ঘ পরিমাপ করে দেখেছি এবং দেখেছি এটির  দৈর্ঘ প্রায় সোয়া নয় ইন্চি! আফ্রিকার ক্রান্তীয় অঞ্চলের একটি প্রজাতি Macrosila morganii র ক্ষেত্রে  এর দৈর্ঘ সাড় সাত ইন্চি, কোন একটি প্রজাতি যার প্রবোসিস আর দুই বা তিন ইন্চি দীর্ঘ হলেই Angræcum sesquipedale সবচেয়ে বড় ফুলগুলোর মধু স্পর্শ করতে পারবে, যার মধুর থলিটি দশ থেকে চৌদ্দ ইন্চির মধ্যে হের ফের হতে পারে, এরকম কোন একটি মথ যে মাদাগাষ্কারে আছে সেটার নিরাপদভাবেই ভবিষ্যদ্বানী করা যেতে পারে; এবং প্রকৃতিবিজ্ঞানী যারাই এই দ্বীপটিতে অনুসন্ধান করতে যাবেন তাদের এই মথটার অনুসন্ধান করা উচিৎ, নেপচুন গ্রহ খোজার ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে আত্মবিশ্বাস প্রদর্শন করেছিলেন, সেই সমপরিমান আত্মবিশ্বাসের সাথে -এবং তারা ঠিক একই ভাবে সফল হবেন !

১৯০৩ সালে ডারউইনের মৃত্যুর পর কিন্তু ওয়ালেস এর দীর্ঘ জীবনকালের মধ্যেই, সেই সময় পর্যন্ত অজানা একটি মথ প্রজাতিকে খুজে পাওয়া যায়, যেটি ডারউইন ওয়ালেস দুজনের ভবিষ্যদ্বানী সত্য প্রমান করে  এবং তাদের সেই ভবিষ্যদ্বানীকে যথাযোগ্য সন্মান প্রদর্শন করে এর সাব-স্পেসিফিক নাম দেয়া হয়, praedicta ; কিন্তু এমনকি Xanthopan morgani praedicta, বা ’Darwin’s hawk moth’  এর প্রোবোসিসও  A. longicalcar এর ফুলকে পরাগায়ন করার মত যথেষ্ঠ দীর্ঘ না; এবং এই ফুলটি অস্তিত্ব আমাদের প্রেরণা দেয় আরো দীর্ঘ জীহবার কোন মথের অস্তিত্ব থাকতে পারে এমন সন্দেহ পোষন করতে, এবং সেই একই আত্মবিশ্বাসের সাথে, যেমন ওয়ালেস নেপচুন গ্রহ আবিষ্কার সম্বন্ধে পুর্বধারনার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছিলেন, যাই হোক এই ছোট উদহারনটি আবারো সেই অভিযোগটি মিথ্যা প্রমানিত করলো যে, বিবর্তন বিজ্ঞান কোন ভবিষ্যদ্বানী করতে পারেনা কারন এর বিষয় অতীতের  ইতিহাস; ডারউইন/ওয়ালেস পুর্বধারনা এখনো পুরোপুরি সঠিক, যদিও তাদের ভবিষ্যদ্বানী করার আগে praedicta মথ প্রজাতিদের অবশ্যই অস্তিত্ব ছিল,  তারা ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন, ভবিষ্যতের কোন এক সময়ে কেউ একটি মথ খুজে পাবেন যাদের A. sesquipedale মধু খাবার মত দীর্ঘ জিহবা থাকবে;

ছবি: Angraecum sesquipedale  মাদাগাস্কার স্টার অর্কিড ও এর পরাগায়নকারী  Xanthopan morgani praedicta, বা ’Darwin’s hawk moth’

ফিল দে ভ্রিস এর একটি অসাধারন ভিডিও, তিনি প্রথম ইনফ্রারেড ক্যামেরা ব্যবহার করে বন্য পরিবেশ হক মথ পরাগায়ন করছে তার ভিডিও করেছিলেন)

কীটপতঙ্গদের রঙ্গীন কিছু দেখতে পাবার ক্ষমতা  বা কালার ভিশন বেশ ভালো, তবে তাদের পুরো স্পেকট্রামটা মুলত লাল থেকে দুরে  অতিবেগুনী রশ্মির দিকেই বেশী ঘেষা, আমাদের মতই তারা হলুদ,সবুজ,নীল এবং বেগুনী দেখতে পারে, তবে আমাদের সাথে তাদের ব্যতিক্রম হলো তারা অতিবেগুনী রশ্মির সীমার আলোক তরঙ্গও দেখতে পারে এবং’আমাদের’ দৃষ্টিক্ষমতার সীমা লাল এর দিকের অংশটি তারা দেখতে পায়না; আপনি যদি কোন একটি লাল টিউব বা চোঙ্গাকৃতির কোন ফুলকে আপনার বাগানে দেখেন, তাহলে আপনি বেশ নিরাপদের সাথে বাজি রাখতে পারেন, যদিও একবারে নিশ্চিৎ ভবিষ্যদ্বানী নয়, যে এই ফুলটির বন্য পরিবেশে কীট পতঙ্গ না বরং পাখির মাধ্যমে পরাগায়ন সংঘটিত হয়; যারা কিনা আলোক তরঙ্গ সীমার লাল প্রান্ত শনাক্ত করতে পারে; হয়তো হামিং বার্ড, যদি এরা নিউ ওয়ার্ল্ড ( উত্তর ও দক্ষিন আমেরিকা) প্রজাতি হয়, যদি ওল্ড ওয়ার্ল্ড ( যেমন আফ্রিকা) প্রজাতি হলে সানবার্ড; যে ফুল গুলো আমাদের কাছে সাদা মাটা বর্ণহীন মনে হতে পারে, তারা হয়তো আসলে নানা ধরনের স্পট, দাগ কাটা ইত্যাদি দিয়ে বিশেষভাবে অলঙ্কৃত থাকে কীটপতেঙ্গদের সুবিধার জন্য, এই অলঙ্করন আমরা দেখতে পারিনা কারন অতিবেগুনী রশ্মি দেখার ক্ষেত্রে আমদের দৃষ্টি অন্ধ; অনেক ফুলই মৌমাছিদের দিক নির্দেশনা দেয় তাদের পাপড়িতে অতিবেগুনী রঙের নানা চিহ্ন দিয়ে সজ্জিত করে, তারা যেন রানওয়েতে অবতরণ করছে;


ছবি: উপরের ছবিটি ইভনিং প্রিমরোজ, বায়ে আমরা যেভাবে ফুলটাকে দেখি, হলুদ রঙের একটি ফুল; ডানে মৌমাছিরা দেখে অন্যরকম,  মাঝখানের প্যাটার্নটা েমৌমাছিদের জন্য এয়ার স্ট্রিপের কাজ করে যেন তারা ঠিক জায়গামত বসতে পারে মধু খেতে; নীচের ছবিটি ড্যান্ডেলিয়নের, বাদিকে আমরা যেভাবে দেখি, ডানে মৌমাছিরা যেভাবে দেখে:

ইভনিং প্রিমরোজ (Oenothera) আমাদের চোখে দেখতে হলুদ রঙের, কিন্তু আল্ট্রাভায়োলেট ফিল্টার ব্যবহার করে যদি একটা ফটোগ্রাফ নেয়া যায় তবে দেখবো, মৌমাছিদের সুবিধার জন্য সেখানে একটি প্যাটার্ণ বা নকশা কাটা আছে, যা আমাদের স্বাভাবিক দৃষ্টি ক্ষমতা দিয়ে কখনোই দেখতে পাইনা (ছবি);  এধরনের ছবিতে প্যাটার্ণটি আমরা দেখি লাল রঙ এর; কিন্তু এটা আসলে মিথ্যা রঙ, ফটোগ্রাফিক প্রক্রিয়ায় বাছাইকৃত একটি কাল্পনিক রঙ, এর অর্থ এই না যে মৌমাছিরাও একে লাল হিসাবে দেখছে, কেউই জানে না অতিবেগুনী ( বা হলুদ বা অন্য যে কোন রঙ) আসলে মৌমাছিদের কাছে দেখতে কেমন ( আমি এমন কি জানিনা আপনার কাছে লাল রঙের অনুভুতিটাই বা কেমন – একটি প্রাচীন ফিলোসফিকাল চেষ্টনাট -যে প্রশ্নের উত্তর সহজে মিলবে না);

একটি মাঠ ভরা ফুল হচ্ছে প্রকৃতির ’টাইমস স্কোয়ার’, বা প্রকৃতির ’পিকাডিলী সার্কাস’; একটি ধীরগতিতে চলা নিওন সাইন, যা সপ্তাহ সপ্তাহে বদলে যায়, যখন নতুন ফুলগুলো সেই  ঋতুতে ফুটতে শুরু করে, যারা খুব সতর্কভাবে তাদের নির্দেশ পায়, যেমন দিনের দৈর্ঘর তারতম্য যা তারা তাদের নিজস্ব প্রজাতির অন্যান্য সদস্যদের সাথে সামন্জষ্য করে নেয়; এইফ ফুলের মহাসমারোহ, সবুজ দিগন্তের ক্যানভাসে ছড়িয়ে থাকে, যাদের গঠন ও আকার, রং সবকিছুই পরিবর্ধিত আর আরো উন্নতি সাধন করেছে, যা নির্দেশিত হয়েছে প্রানী চোখের অতীতের পছন্দর উপর ভিত্তি করে: মৌমাছির চোখ, প্রজাপতির চোখ, হোভার ফ্লাই এর চোখ; নিউ ওয়ার্ল্ড ফরেস্টে আপনাকে এই তালিকায় যোগ করতে হবে হামিংবার্ড, অথবা আফ্রিকার জঙ্গলের ক্ষেত্রে সানবার্ডের নাম);

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা দরকার যে, হামিংবার্ড আর সানবার্ড কিন্তু পরস্পর ঘনিষ্ট সম্পর্কযুক্ত প্রজাতি নয়; তারা দেখতে আর আচরনগত ভাবে পরস্পর সদৃশ কারন এই ধরনের জীবনধারায় তারা বিবর্তিত হয়েছে; মুলত যে জীবনটা ফুল এবং আর ফুলের মধু বা নেকটারকে কেন্দ্র করে (যদি নেকটার ছাড়াও এরা কিন্তু কীটপতঙ্গও খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে); ফুলের মধু খাবার জন্য এদের লম্বা বীক বা ঠোট আছে, যা আরো দীর্ঘায়িত করা সম্ভব দীর্ঘতর জিহবা ব্যবহার করে; সানবার্ড অবশ্য হামিং বার্ডের তুলনায় উড়তে তেমন দক্ষ না, বিশেষ করে হোভারিং বা ওড়ার সময় একজায়গায় ভেসে থাকার দক্ষতার  (হেলিকপ্টারের মত) ক্ষেত্রে, হামিংবার্ড পেছন দিকেও উড়তে পারে হেলিকপ্টারের মত; যদিও কনভারজেন্ট (এক বিন্দু অভিমুখে,প্রানী জগতে অনেক দুরবর্তী কোন একটি অবস্থান থেকে,আরেকটি প্রানী হচ্ছে হামিংবার্ড হক মথ,হামিংবার্ডের মত তারাও অত্যন্ত দক্ষ একই স্থানে স্থির হয়ে উড়তে,এবং যাদের আশ্চর্যজনক লম্বা জিহবা আছে (ছবি);

কনভারজেন্ট বিবর্তন নিয়ে এই বইটিতে পরে আমরা আবার ফিরে আসবো আলোচনায়,প্রাকৃতিক নির্বাচন বিষয়টি ঠিক মত বোঝার পর;তবে আপাতত এখানে, এই অধ্যায়ে ফুল আমাদের সম্মোহিত করছে,ধীরে ধীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ধাপে ধাপে,আমার বোঝার পথ আলোকিত করছে;হামিংবার্ড এর চোখ,হক মথের চোখ,প্রজাপতির চোখ,হোভারফ্লাইদের চোখ, মৌমাছিদের চোখ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বুনো ফুলের দিকে তাদের দৃষ্টি দিয়েছে উন্নতি সাধন করতে;তাদের গঠন ও আকৃতিকে করেছে প্রভাবিত, নানা রঙে বর্ণিল করেছে,নানা নকশা আর ছোট ছোট বিন্দুর দাগ দিয়ে অলঙ্কৃত করেছে, প্রায় সেই একই ভাবে যেমন করে মানুষের পরবর্তীতে চোখ বাগানের নানা জাতের ফুলের সাথে করেছে,কিংবা কুকুর, গরু,বাধাকপি আর ভুট্টার সাথে করেছে;

ফুলের জন্য, কোন সন্দেহ নেই পতঙ্গ পরাগায়ন বায়ু পরাগায়নের অপচয় মুলক বাতাসে ছড়িয়ে প্রক্রিয়ার চেয়ে এর শক্তির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক,এমনকি যদি মৌমাছিরা কোন বাছবাছবিচার না করে নানা ফুলে ঘুরে বেড়ায়ও,যেমন কোন বাটারকাপ থেকে কর্ণফ্লাওয়ার,পপি থেকে কেলানডিন,তারপরও এর লোমশ পেটের সাথে লেগে থাকা পরাগরেণূর অনেক বেশী সম্ভাবনা থাকে তাদের সঠিক নিশানা খুজে পাওয়ার -একই প্রজাতির দ্বিতীয় কোন ফুল -বাতাসে ছড়িয়ে দেয়া পরাগরেনুদের সফল হবার সম্ভাবনার সাথে যদি তুলনা করা হয়;প্রক্রিয়াটি আরো খানিকটা ভালো হয় যখন মৌমাছিদের নির্দিষ্ট কোন রঙের প্রতি পছন্দ থাকে,যেমন ধরা যাক নীল;অথবা কোন মৌমাছি,যার হয়তো কোন দীর্ঘমেয়াদী রঙ পছন্দ নেই তবে,তার একটি রঙ এর পছন্দ করার অভ্যাস গড়ে উঠার সম্ভাবনা থাকে,সুতরাং এটি নিজস্ব নিয়মমাফিক রঙ পছন্দ করতে শুরু করে; এবং আরো ভালো হয় যদি এমন কোন একটি পতঙ্গ যে শুধু একটি প্রজাতির ফুলেই মধু খেতে আসে; হ্যা এরকম ফুলও আছে,যেমন মাদাগাষ্কারের অর্কিড, যা ডারউইন/ওয়ালেসকে ভবিষ্যদ্বানী করতে অনুপ্রাণিত করেছিল,যাদের মধূ বা নেকটার আছে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট প্রজাতির পতঙ্গর জন্য;যারা এই ফুলের মধু খাবার জন্য  যারা বিশেষায়িত হয়ে বিবর্তিত হয়েছে  এবং এই ফুলের উপর তাদের মনোপলির জন্য উপকৃতও হয়; এই মাদাগাষ্কার মথগুলো আসলেই পরাগায়নের জন্য সত্যিকারের আল্টিমেট ম্যাজিক বুলেট সমাধান;

মথদের দৃষ্টিভঙ্গীতে,যে ফুলগুলো নির্ভরযোগ্যভাবে তাদের মধু বা নেকটার সরবরাহ করবে, তারা অনেকটাই নীরিহ, নিয়মিত দুধ সরবরাহ করা গাভীর মত;আর ফুলদের দৃষ্টিভঙ্গীতে মথরা হচ্ছে নির্ভরযোগ্যভাবে তাদের পরাগরেণু একই প্রজাতির অন্য ফুলে নিয়ে যাবার একটি বাহন,অনেকটা উপযুক্ত মুল্য পরিশোধ করা ফেডারেল এক্সপ্রেস সার্ভিস বা খুব ভালো করে প্রশিক্ষন দেয় ঘরে ফিরে আসা হোমিং কবুতরদের মত;দুই পক্ষকেই বলা যেতে পারে, একে আরেক পক্ষকে গৃহপালিত করেছে তাদের নিজস্ব প্রয়োজনের খাতিরে,বাছাইকৃত প্রজনন এর মাধ্যমে যেন তারা আগের চেয়ে আরো ভালোভাবে কাজটি করতে পারে;বিশেষভাবে কাঙ্খিত গোলাপের ব্রীডগুলোর মানুষ ব্রীডারাও ফুলের উপর সেই একই প্রভাব ফেলে, যেমন করে পতঙ্গরা প্রভাব ফেলে, খানিকটা তাদের কাঙ্খিত বৈশিষ্টগুলোকেই পরিবর্ধিত করার মাধ্যমে; পতঙ্গরা যারা বহু প্রজন্ম ধরে সেই ফুলগুলোকে ব্রীড করেছিল রঙ্গীন এবং চোখের পড়া মত নানা বৈশিষ্টপুর্ণ করে, আর মানুষ  ব্রীডারা তার উপরে আরো বাড়তি কাজ করে তাকে করে তোলে আরো রঙ্গীনতর ও আরো বেশী দৃষ্টিনন্দন আকর্ষনীয়; পতঙ্গরা কিন্তু গোলাপকে চমৎকারভাবে সুগন্ধী করে তুলেছিল আগেই, এরপর মানুষরা এটিকে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আরো বেশী সুগন্ধিকর করে তুলেছে গোলাপকে; এবং ঘটনাচক্রে এটি একটা সৌভাগ্যজনক দৈবঘটনা বলকেই হবে, যে মৌমাছি আর প্রজাপতিদের পছন্দ করা সুগন্ধটি আমাদের কাছেও একই আবেদন রেখেছিল; কিছু ফুল যেমন স্টিঙ্কিং বেনজামিন (Trillium erectum) বা কর্পস ফ্লাওয়ার (Amorphophallus titanum) যারা ফ্লেশ ফ্লাই বা ক্যারিওন বিটলদের পরাগায়নকারী হিসাবে ব্যবহার করে, তাদের গন্ধ আমাদের জন্য এর বমির ভাব জাগায়, ‍কারন তা পচে যাওয়া মাংশের গন্ধর মত; এই ফুলগুলো, আমরা সহজে অনুমান করতে পারি, তাদের গন্ধ পরিবর্ধিত করার কোন চেষ্টাই করেনি মানুষ গৃহপালিতকরণকারীরা;

অবশ্যই, ফুলের সাথে পতঙ্গের সম্পর্ক উভমুখী, এবং বিষয়টি দুই দিকেই দেখার ক্ষেত্রে আমাদেরও অবহেলা করা উচিৎ না; পতঙ্গরা হয়তো কোন ফুলকে ব্রীড করতে পারে যেন তারা আরো সুন্দর ও আকর্ষনীয় হয়ে উঠে তবে এর কারন এই না যে তারা সেই সৌন্দর্যকে উপভোগ করে (অন্ততপক্ষে কোন কারনই নেই চিন্তা করার যে তারা সেটা করে বা যে অর্থে আমরা বুঝি সেভাবেই তারা তা উপভোগ করে;অধ্যায় ১২ তে আমি এভাবে চিন্তা করার সেই দীর্ঘস্থায়ী প্রলোভনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো); বরং কোন ফুল সুবিধা পায় পতঙ্গদের দৃষ্টিতে আকর্ষনীয় হবার কারনে, এবং পত্ঙ্গরা, মধু খোজার জন্য সবচেয়ে সুন্দর আকর্ষনীয় ফুলটি পছন্দ করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, তাদের অজান্তেই কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই ফুলের সৌন্দর্যর জন্য তাদের ব্রীড করে; এবং একই সাথে ফুলও পতঙ্গদের ব্রীড করে তাদের পরাগায়ন করার দক্ষতার উপর ভিত্তি করে; তারপরও আবারো, আমি বোঝাতে চাইছি যে, পতঙ্গরা সেই সব ফুলকে ব্রীড করে যাদের মধু বা নেকটারের পরিমান অনেক বেশী, যেমন করে ডেয়ারী ফার্মের কোন খামারী বিশাল মাথান সম্পন্ন ফ্রিজিয়ান গাভীদের ব্রিডীং করেন; কিন্তু ফুলদের স্বার্থ আছে,  ঠিক ‍‍কি পরিমান নেকটার সে তৈরী করবে, অর্থাৎ তার একটি রেশনিং সিস্টেম আছে; যদি কোন পতঙ্গ পুর্ণ তৃপ্তি মিটিয়ে মধু খাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়, তাহলে সে আর কোন তাড়নাই বোধ করবে আরেকটি দ্বিতীয় ফুল খুজে বের করার জন্য, আর প্রথম ফুলের জন্য সেটা মোটেও ভালো খবর না, কারন তার কাছে পরাগায়নের উদ্দেশ্যে যা দরকার অর্থাৎ দ্বিতীয় ফুলটার কাছে যাওয়াটা নিশ্চিৎ করাই এই মধু বানানোর নানা অনুশীলনীর মুল উদ্দেশ্য,; ফুলের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে অবশ্যই তাকে খুব সুক্ষ্ম একটা ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়, বেশী পরিমান নেকটার বা মধুর ব্যবস্থা না করা ( কারন সেক্ষেত্রে দ্বিতীয় ফুলে যাবার কোন তাড়না পরাগায়নকারী বোধ করবে না), বা খুব সামান্য পরিমান নেকটার সরবরাহ করা( যেক্ষেত্রে প্রথম ফুলে বসার কোন তাড়না অনুভব করবে না পরাগায়নকারী), এ দুটির মধ্যে;

পতঙ্গরা ফুল থেকে তাদের মধু নিংড়ে নেয়, এবং তাদের ব্রীডিং প্রক্রিয়ায় তারা বেশী নেকটার সমৃদ্ধ ফুলের সৃষ্টি করে- সম্ভবত ফুলদের কাছ থেকে তারো তাদের এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বাধার মুখোমুখি হয়, যেমন আমরা দেখলাম এই মাত্র; মৌমাছি চাষীরা কি (বা কোন উদ্যানবিদ যার মনে মৌমাছি চাষ করার প্রতি আকর্ষন আছে) এমন ফুলের ব্রীড করে যা আরো বেশী মধু বা নেকটার তৈরী করবে, যেমন করে ডেয়ারী খামারিরা ফ্রিজিয়ান বা জার্সি গাভীদের ব্রীড করে বেশী দুধ পাবার জন্য?  এই প্রশ্নের উত্তর জানার কৌতুহল আছে আমার, তবে, আপাতত, কোন সন্দেহ নেই, যে সুন্দর আর সুগন্ধী ফুলের ব্রিডার হিসাবে উদ্যানবিদরা যা করেন আর মৌমাছি,প্রজাপতি, হামিংবার্ড আর সানবার্ড রা যা করছে তার একটি পারস্পরিক সদৃশ্যতা রয়েছে;

______________________ চলবে

* বিবর্তন জীববিজ্ঞানে বর্তমানে ম্যাক্রোইভোল্যুশন বলতে বোঝায়, প্রজাতি পর্যায়ে এবং এর উপরে যে কোন ধরনের বিবর্তনীয় পরিবর্তন; এর অর্থ নিদেনপক্ষে এটি প্রজাতির দ্বিবিভক্ত হওয়া   ( স্পিসিয়েশন বা ক্ল্যাডোজেনেসিস) বা সময়ের ধারাবাহিকতায় কোন একটি প্রজাতির অন্য প্রজাতিতে রুপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া ( অ্যানাজেনেটিক স্পেশিয়েশন); যে কোন বিবর্তনীয় পরিবর্তন যা ঘটে উপরের পর্যায়ে যেমন নতুন ফ্যামিলি, ফাইলা বা জীনাস পর্যায়ে সেগুলো ম্যাক্রোইভ্যোলুশন;  এর একটা উদহারন যেমন হতে পারে পাখিদের বিবর্তনের সময় থেরোপড ডায়নোসরদের পালকের আগমন; আরেটি প্র্যাকটিকালভাবে এর বোঝানো জন্য বলা যেতে পারে, ম্যাক্রোইভ্যোলুশন হচ্ছে ভুতাত্ত্বিক সময় স্কেলে, যা মাইক্রোইভ্যোলুশন থেকে ভিন্ন, যা হয় কোন আরো একটি প্রজাতির জীবনকাল, েযেমন মানুষের জীবনকাল)

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : তৃতীয় অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)

6 thoughts on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ : তৃতীয় অধ্যায় ( প্রথম পর্ব)

  1. মাহবুব ভাই, অনেকদিন পর আপনার ব্লগে এলাম। আপনি করছেনটা কি! এতোগুলো বই একসাথে এভাবে অনুবাদ করে ফেলছেন! এ তো বিশাল কর্ম। আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো ভাষা জানা নেই। একে তো অনুবাদ প্রক্রিয়া, তার উপর ব্লগে উন্মুক্ত। এটা বাংলাভাষায় বিজ্ঞানচর্চার এক সম্পদ হয়ে থাকবে। ভালো থাকুন।

  2. চমৎকার! অতি চমৎকার!!!
    যেমন ছবি, তেমনই আকর্ষণীয় বিষয়বস্তু। অনুবাদও বেশ ভালো।
    বিরতিহীন হোক এই পথচলা।
    শুভ কামনা, ভাই মাহবুব হাসান।
    [এই পোস্ট থেকে কয়েকটা ছবি নিজের সংগ্রহে নিলাম। আশা করি বিনাঅনুমতিতে নেবার জন্য মনঃক্ষুন্ন হবেন না।]

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s