রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)



ছবি: স্টুয়ার্ট ব্র্যাডফোর্ডের একটি ইলাসট্রেশন (সুত্র, What defines a memeSmithsonian magazine, May 2011)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন :  পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব) ,  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব)

ধর্মের শিকড়

ধর্মর ক্ষেত্রে সত্যটি হচ্ছে শুধুমাত্র সেই মতামটি যা টিকে গেছে: অস্কার ওয়াইল্ড

সাবধানে হেটো, কারন তুমি আমার মীমদের উপর দিয়ে হাটছো:

এই অধ্যায়টি শুরু হয়েছিল একটি পর্যবেক্ষন দিয়ে: যেহেতু ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচন যে কোন ধরনের অপচয়কে সহ্য করতে পারেনা, সে কারনেই কোন প্রজাতির মধ্যে সর্বব্যাপী দৃশ্যমান কোন বৈশিষ্ট,যেমন ধর্ম, নিশ্চয়ই কিছু উপযোগিতা প্রদান করেছিল নতুবা এটি টিকে থাকতো না। কিন্তু আমি ইঙ্গিত করেছিলাম সেই উপযোগিতা বা সুবিধাটির, প্রজাতির কোন সদস্যর বেচে থাকা বা প্রজনন সাফল্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ অবদান থাকতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। আমরা যেমনটি দেখেছি, সর্দি জ্বরের ভাইরাসের জীনগুলোর প্রদর্শিত উপযোগিতাই  স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট, আমাদের প্রজাতির মধ্যে কেন এই কষ্টকর অসুস্থতার অভিযোগের সর্বব্যাপীতা। এবং আমাদের উপকার করা মতো কোন জীনে এর থাকতে হবে এমন কোন প্রয়োজনীয়তাও নেই। যে কোন একটা রেপ্লিকেটর বা অনুলিপি কারক হলেই চলে। রেপ্লিকেটরের সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদহারন হচ্ছে শুধুমাত্র জীনরা, তবে এই মর্যাদা পাবার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দীরা হচ্ছে, কম্পিউটার ভাইরাস এবং সাংস্কৃতিক বংশগতির বাহক মীম (Meme) ইউনিটগুলো এবং  যারা এই অংশের যেটা আলোচ্য বিষয় (মীম (Meme) হচ্ছে  কোন  ধারনা, আচরন বা রীতি যা কোন একটি সংস্কৃতিতে একজন ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে বিস্তার লাভ করে। মীম সাংস্কৃতিক ধারনা, রীতি বা প্রতীক বহনকারী একটি একক হিসাবে কাজ করে, যা একটি মন থেকে অন্য মনে বিস্তার লাভ করতে পারে,  লেখা, কথা, আচরন, আচার বা অন্য কোন অনুকরণ করা সম্ভব  এমন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। যারা মীম তত্ত্বের সমর্থক তারা  একে জীন এর সমতুল্য একটি রুপ হিসাবে দেখেন, যা রা নিজেদের অনুলিপি করতে পারে, পরিবর্তিত হতে পারে (মিউটেশন) এবং নির্বাচনী চাপের প্রতি সংবেদনশীল; মীম শব্দটি mimeme একটি সংক্ষিপ্ত রুপ ( জীন এর মত একই মডেলে) ( শব্দটির উৎপত্তি প্রাচীন গ্রীক  mīmēma শব্দ থেকে যার অর্থ কোন কিছুর অনুকরন করা); শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন বৃটিশ বিবর্তন জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স ১৯৭৬ সালে তার The Selfish Gene বইটিতে  বিভিন্ন আইডিয়া এবং সাংস্কৃতিক ফেনোমেনাগুলোর বিস্তারের ক্ষেত্রে বিবর্তনীয় ধারনাটি আলোচনা করার জন্য। কিছু মীম এর উদহারন যেমন সেখানে ছিল .. মেলোডি, কিছু বহুব্যবহৃত বাক্য, ফ্যাশন, এছাড়া আর্চ বা খিলান  বানানোর কৌশল ইত্যাদি।)

আমাদের যদি মীমদের বুঝতে হয়, আমাদের একটু বিশেষভাবে লক্ষ্য করতে হবে ঠিক কিভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন  তার কাজ করে থাকে। এর সবচেয়ে সাধারনতম রুপে, প্রাকৃতিক নির্বাচনকে অবশ্যই বিকল্প রেপ্লিকেটদের মধ্য থেকে কোন একটিকে বেছে নিতে হয়। একটি রেপ্লিকেটর হচ্ছে কোড কৃত তথ্যমালা যা ঠিক তার হুবুহু অনুলিপি সৃষ্টি করতে সক্ষম, তবে কখনো কখনো একেবারে হুবুহু না হয়ে সামান্য ভিন্ন অনুলিপির সৃষ্টি করে (মিউটেশন); এর একটি কারন হচ্ছে ডারউইনীয়, যে ধরনের রেপ্লিকেটরগুলো নিজেদের অনুলিপি তৈরী করার প্রক্রিয়ায় দক্ষ, তারা সংখ্যায় ক্রমশ বৃদ্ধি পাবে অনুলিপি সৃষ্টিতে অপেক্ষাকৃত অদক্ষ রেপ্লিকেটরদের তুলনায়। এটাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের একেবারে মুল কথা। সবচেয়ে আদর্শ রেপ্লিকেট হচ্ছে জীন (Gene), ডিএনএ এর বেস অনুক্রম একটি অংশ যার অনুলিপি সৃষ্টি হয় প্রায় সবসময় অত্যন্ত্য নিখুতভাবে, অসীম সংখ্যক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। মীম তত্ত্বের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, সাংস্কৃতিক অনুকরণেরও কি অনুরুপ কোন একক আছে , যারা সত্যিকারের রেপ্লিকেটর, যেমন জীনের মত আচরণ করে? আমি বলছি না যে, মীমরা অবশ্যেই  জীনের সবচেয়ে নিকটবর্তী অনুরুপ, শুধু, যতই তারা জীনদের মত আচরণ করে, মীম তত্ত্বটি ততই ভালো ভাবে কাজ করতে পারে;এবং এই অংশটির উদ্দেশ্য হচ্ছে এই প্রশ্নটাই জিজ্ঞাসা করা মীম তত্ত্বটি ধর্মের এই বিশেষ ক্ষেত্রে হয়তো কাজ করে কিনা?

জীনদের জগতে, অনুলিপি করার প্রক্রিয়ার মাঝে মাঝে ঘটা ক্রটি (মিউটেশন) যে দ্বায়িত্ব পালন করে তা হলো মুল জীন সম্ভার বা পুলে যে কোন জীনের বিকল্প রুপগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিৎ করা – ‘অ্যালীল‘ – সুতরাং যে বিকল্প রুপগুলোকে হয়তো মনে করা যেতে পারে একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দীতা করছে, কিন্তু কিসের জন্য সেই প্রতিদ্বন্দীতা;ক্রোমোজোমের একটি নির্দিষ্ট জায়গা বা লোকাসের জন্য কি যেখানে সেই সেট অ্যালীলগুলো অবস্থান করে; এবং  কিভাবে তারা প্রতিযোগিতা করে? সরাসরি একটি অনুর সাথে প্রতিদ্বন্দী অনুর যুদ্ধ নয়, তাদের প্রতিনিধি প্রক্সির মাধ্যমে। এই প্রক্সিটি হলো তাদের ফেনোটাইপিক ট্রেইট – কিছু বাহ্যিক দৃশ্যমান বৈশিষ্ট যেমন, পায়ের দৈর্ঘ বা লোমের রং: জীনের যে প্রকাশ প্রতিফলিত হয় গঠনগত, শরীরবৃত্তীয়, প্রাণ রসায়নিক কিংবা আচরনের মাধ্যমে। কোন জীনের নিয়তি নির্ভর করে সেই শরীরগুলোর উপর যেখানে তারা ধারাবাহিকভাবেই অবস্থান করে। শরীরের উপর তাদের প্রভাব কেমন, এই বিষয়টি প্রজাতির সামগ্রিক জীনপুলে তার টিকে থাকার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে; জীন পুলে অনেক প্রজন্মান্তরে জীনগুলোর উপস্থিতির হার বাড়ে কিংবা কমে মুলত তাদের ফেনোটাইপিক (বাহ্যিক বা প্রকাশিত বৈশিষ্টর) প্রক্সির কল্যানে;

মীমদের ক্ষেত্রেও কি এমন কিছু সত্য হতে পারে?  একটি ক্ষেত্রে তারা জীনদের মত না  কারন, এখানে সুস্পষ্টভাবে ক্রোমোজোম বা লোকাই বা অ্যালীল বা যৌন পুনর্বিন্যাস বা রিকম্বিনেশন এর অনুরুপ কিছু নেই। মীম পুলের গঠন জীন পুল অপেক্ষা সংগঠিত না । তাসত্ত্বেও  কোন একটি মীম পুলের কথা বলাটা খুব একটা অর্থহীন হবে বলে মনে হয়না, যেখানে কোন নির্দিষ্ট মীম  এর উপস্থিতির হার হয়তো পরিবর্তিত হতে পারে বিকল্প মীমগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দীতার ফলাফল হিসাবে।

অনেকেই মীম নির্ভর ব্যাখ্যার বিরোধীতা করেছেন; বিরোধীতার কারনও ভিন্ন, তবে মোটামুটি ভাবে সব কারনগুলো সাধারনত উদ্ভুত হয়েছে মীমরা আসলে পুরোপরিভাবে জীনদের মত না সেই সত্য থেকে। জীনের সঠিক ভৌত বৈশিষ্ট এবং প্রকৃতি এখন আমাদের জানা ( এটি ডিএনএ এর অনুক্রম), মীম দের সম্বন্ধে সেকরম কিছু জানা যায়নি। এবং বিভিন্ন মীমতত্ত্ববিদরাও কোন একটি ভৌত মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে মীমের উপস্থিতি পরিবর্তন করার মাধ্যেমেও একে অপরকে সংশয়ে ফেলে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আমাদের মস্তিষ্কে কি মীম দের অস্তিত্ব আছে? বা ধরা যাক, কোন একটি লিমেরিক এর প্রতিটি পেপার কপি এবং ইলেক্ট্রনিক কপিকেও কি মীম বলা যেতে পারে? তাছাড়া জীন তার অনুলিপি তৈরী করে যথেষ্ট নিখুত ভাবে, যদি মীমরা আদৌ তাদের অনুলিপি সৃষ্টি করতে পারে, তারা কি যথেষ্ট কম নিখুত ভাবে সেটা করবে না?

মীমদের নিয়ে প্রস্তাবিত এই সমস্যাগুলো খানিকটা অতিরন্জিত। মীম তত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত সকল অভিযোগগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে, ডারউইনীয় ’রেপ্লিকেটর’ হিসাবে কাজ করার জন্য মীমগুলো যথেষ্ট নিখুতভাবে তাদের অনুলিপিগুলো সৃষ্টি করতে পারেনা। মুল সন্দেহটা হচ্ছে,  যদি প্রতিটি প্রজন্মেই মিউটেশনের বা পরিবর্তনের হার গ্রহনযোগ্য সীমা অতিক্রম করে যায়, তাহলে মীম পুলে তাদের উপস্থিতির হারের উপর ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন প্রভাব ফেলার আগেই মীমরা মিউটেশনের মাধ্যমেই নিজেদের অস্তিত্ব বিলোপ করে ফেলবে; কিন্তু সমস্যাটা কাল্পনিক, একজন মাষ্টার কাঠের কারিগরের কথা ভাবুন কিংবা কোন প্রাগৈতিহাসিক কোন ফ্লিন্ট পাথরের হাতিয়ার তৈরীর কারিগর, যিনি তার নবীন শিক্ষার্থীকে কোন একটি বিশেষ কৌশল শেখাচ্ছেন হাতে কলমে তা দেখিয়ে, যদি শিক্ষার্থীটি সম্পুর্ণ নিষ্ঠার সাথে তার শিক্ষকের প্রতিটি হাতের কাজ পুণরাবৃত্তি করেন,  তারপরও সত্যিই আপনি আশা করতে পারেন যে, এই মীমটি পরিবর্তিত হবে পুরোপুরি, শিক্ষক/শিক্ষার্থীদের কয়েক প্রজন্মের মধ্য সেটি বিস্তারিত হবার পর। কিন্তু অবশ্যই শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের দেখানো হাতের প্রতিটি নাড়াচাড়াকে হুবুহু নকল করেন না। আর খুবই হাস্যকর হবে এমন করাটা, বরং সে লক্ষ্য করে ‍মুল সেই ফলাফলটা, যা তার শিক্ষক অর্জন করার চেষ্টা করছেন এবং সেটাকেই তিনি অনুকরণ করেন। যেমন, পেরেকটাকে হাতুড়ী দিয়ে ঠুকতে হবে যতক্ষন না পর্যন্ত সেটি পুরোপুরি ঢুকে যায়, যত সংখ্যক হাতুড়ীর আঘাত লাগুক না কেন, তার সেই সংখ্যাটি তার শিক্ষকের প্রদর্শিত সংখ্যার সাথে নাও মিলতে পারে। এই ধরনের নিয়মগুলোই যা অপরিবর্তিত হয়ে হস্তান্তর হয় অসীম সংখ্যক অনুকরন ’প্রজন্ম’ হিসাবে, তাদের কাজটি সম্পাদন করার প্রক্রিয়াটি ব্যাক্তি বিশেষে এবং কেস বিশেষে ভিন্ন হতে পারে। বোনার কাজের সময় সেলাই , দড়িতে বাধা গিট বা মাছ ধরার জাল, অরিগ্যামীর কাগজ ভাজ করা, কাঠের বা পটারী বা মৃৎশিল্পের নানা উপযোগী কৌশল, এই সব কিছুকে পৃথক উপাদান হিসাবে ভাবা সম্ভব যা আসলেই অসংখ্য সংখ্যক অনুকরণ প্রজন্ম হিসাবে অপরিবর্তিত অবস্থায় হন্তান্তরিত হতে পারে।  খুটিনাটি ‍ গুলো একক ব্যক্তি পর্যায়ে যতই বৈচিত্রময় হোক না কেন মুল বিষয়টি কিন্তুটি অপরিবর্তিত হয়ে বিস্তার লাভ করে এবং জীন এর সাথে  মীম এর সমরুপ ব্যাখ্যাটিকে কাজ করার জন্য আসলে শুধু সেটুকই প্রয়োজন।

সুসান ব্ল্যাকমোরের The Meme Machine এর মুখবন্ধ লেখার সময় আমি চীনা জাঙ্ক (Chinese Junk: প্রাচীন চীনা জাহাজ) এর মডেল বানানোর অরিগ্যামী প্রক্রিয়ার একটি উদহারন  বর্ণনা করেছিলাম;  প্রক্রিয়াটি এমনিতেই একটি জটিল পদ্ধতি, প্রায় ৩২ টি ভাজ (বা সে রকম কিছু ) ছিল। শেষ ফলাফল ( চাইনীজ জাঙ্ক কাগজের জাহাজটি)  এবয় সেই সাথে ক্রমবিকাশে মধ্যবর্তী কমপক্ষে এর তিনটি ধাপ  : ’কাটামারান’, ’দুটি ঢাকনী সহ একটি বাক্স’, এবং ’ ছবির ফ্রেম’ খুবই দৃষ্টিনন্দন; পুরো প্রক্রিয়াটি আসলেই মনে করিয়ে দেয়, নানা ভাজ আর খাজ সহ কোন ভ্রুণ যেন নিজেকে রুপান্তরিত ব্ল্যাস্টুলা থেকে গ্যাস্ট্রুলা থেকে নিউরালা; আমি চাইনীজ জাঙ্ক বানাতে শিখেছিলাম ছেলে বেলায়, আমার বাবার কাছ থেকে, যিনি ঠিক একই বয়সে সেই দক্ষতাটা অর্জন করেছিলেন তার বোর্ডিং স্কুলে পড়ার সময়; তিনি স্কুলে থাকার সময় চাইনীজ জাঙ্ক বানানো ধুম পড়ে গিয়েছিল যার সুচনা করেছিলেন স্কুলের মেট্রণ, পুরো স্কুলে এটি ছড়িয়ে পড়েছিল যেন হামের মহামারী, অবশ্য হামের মহামারী মতোই এই কাগজের জাঙ্ক বানানোর গন উৎসাহেও ভাটা পড়ে একসময়। ছাব্বিশ বছর পর, যখন সেই মেট্রণ রুপান্তরিত হয়েছেন পুরোনো স্মৃতিতে, আমিও সেই একই স্কুলে পড়তে গিয়েছিলাম, চাইনীজ জাঙ্ক বানানোর ধুমটা আমি আবার নতুন করে শুরু করি, এবং আবারো এটি ছড়িয়ে পড়ে, আরেকটি হামের মহামারীর মত এবং তার আবারো ম্লান হয়ে হারিয়ে যায়। এখানে মুল বিষয়টি হলো, এধরনে হাতে কলমে শেখানো সম্ভব কোন দক্ষতা মহামারীর মত যে ছড়িয়ে পড়তে পারে, এই বিষয়টা আমাদের কিছু মীম নির্ভর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টের বিস্তারের নিখুততা সম্বন্ধে্র কিছু ইঙ্গিত দেয়। আমরা নিশ্চিৎ  ভাবেই বলতে পারি, ১৯২০ এর দশকে আমার বাবার প্রজন্মের স্কুলের শিক্ষার্থীদের বানানো জাঙ্ক, আমার ১৯৫০ এর প্রজন্মের স্কুল ছাত্রদের বানানো জাঙ্ক থেকে সাধারন বৈশিষ্টে খুব একটা আলাদা কিছু ছিল না।

আমরা এই ফেনোমেননটা আরো একটু পদ্ধতিগতভাবে অনুসন্ধান করতে পারি একটি পরীক্ষার মাধ্যমে: শিশুতোষ একটি খেলা, চাইনীজ হুইসপারের (যুক্তরাষ্ট্রের শিশুরা যাকে টেলিফোন নামে চেনে) একটি ভিন্ন রুপের মাধ্যমে। প্রথমে দুইশ মানুষকে একত্র করুন যারা কোনদিনও চাইনীজ জাঙ্ক বানাননি, এবার প্রতি দশ জনকে নিয়ে একটি টিম করে মোট বিশটি টিম গঠন করুন। তারপর প্রতিটি টীমের যারা প্রধান, তাদেরকে একসাথে জড়ো করুন এবং তাদের সবার সামনে একটি চাইনীজ জাঙ্ক বানিয়ে হাতে কলমে শেখান কিভাবে চাইনীজ জাঙ্ক বানাতে হয়। এরপর তাদের নিজেদের টীমে ফেরত পাঠান এবং নির্দেশ দেন যেন তার প্রত্যেকে তাদের টীম থেকে নিজের বাছাই করা শুধু দ্বিতীয় আরেকজনকে ‍নির্বাচন করতে যাকে, যাকে সে চাইনীজ জাঙ্ক হাতে কলমে বানিয়ে দেখানোর  মাধ্যমে শেখাবে; প্রতিটি দ্বিতীয় প্রজন্মের শিক্ষার্থী তার টীমে এরপর তৃতীয় অন্য একজনকে শেখাবে কিভাবে চাইনীজ জাঙ্ক বানাতে হয়, এবং এভাবে প্রতিটি টীমের দশম সদস্যপর্যন্ত শেখাবে তার আগের প্রজন্মের শিক্ষকরা ধারাবাহিকভাবে; এই প্রশিক্ষনের সময় তৈরী করা প্রতিটি জাঙ্ক সঠিকভাবে চিহ্নিত  করে রাখতে হবে, টীম ও প্রজন্ম নং দিয়ে,পরবর্তী পর্যবেক্ষনের জন্য।

আমি নিজে এই পরীক্ষাটি করিনি (অবশ্যই আমি করতে চাই) , কিন্তু খুব দৃঢ়ভাবেই আমার মনে হয় যে, আমি পুর্বধারনা করতে পারি, এর ফলাফলটি কি হতে পারে। আমার ধারনা হচ্ছে, এই বিশটি টীমের সবকটি টীম তাদের টীমের দশম সদস্য পর্যন্ত এই কৌশলটি শেখাতে বা হস্তান্তর করতে সফল হবে না। তবে মোটামুটি একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেত্রে তারা সফল হবে; কোন কোন টীমে ভুল ভ্রান্তি হবে; হয়তো শিক্ষকদের ধারাবাহিকতায় কোনেএকটি  দুর্বল যোগসুত্রে কেউ হয়তো একটি গুরুত্বপুর্ণ ধাপ অনুকরণ করতে ভুলে যেতে পারেন  এবং তার পরবর্তী সবাই সেই একই ভুল করার মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য সফলে ব্যর্থ হবেন; যেমন, হয়তো টীম ৪ ’কাটামারান’ পর্যায় পৌছাতে পারে, তবে এরপর আর না। হয়তো ১৩ নং টীমের অষ্টম সদস্য একটি পরিবর্তিত বা মিউট্যান্ট রুপ, যা ’বক্স  উইথ টু লীডস’ এবং ’পিকচার ফ্রেম’ এর মাঝামাঝি কোন রুপ সৃষ্টি করে বসেন এবং তার টীমের নবম এবং দশম সদস্য এই পরিবর্তিত রুপটাই অনুকরনের মাধ্যমে সৃষ্টি করবেন।

এখন যে সব টীমে যেখানে শেখানো এই  দক্ষতাটি দশম প্রজন্ম পর্যন্ত হস্তান্তরিত হয়েছে সফল ভাবে, সেখানে আমি আরো একটি প্রাক ধারনা করতে চাই। আপনি যদি তাদের তৈরী জাঙ্কগুলোকে তাদের প্রজন্মানুযায়ী ’ক্রমানুসারে’ সাজান আপনি প্রজন্ম সংখ্যার সাথে ক্রমান্বয়ে পদ্ধতিগত কোন গুনগত অবনতি লক্ষ্য করতে পারবেন না। কিন্তু যদি আপনি এমন কোন একটি পরীক্ষা পরিচালনা করেন, যা সবদিক থেকে হুবুহু শুধু মাত্র যে দক্ষতা হস্তান্তরিত হয়েছে সটা কোন অরিগ্যামী নয় বরং জাঙ্ক এর ‘ড্রইং’ এর একটি অনুলিপি আকা, তাহলে সেখানে আপনি পদ্ধতিগতভাবেই অবশ্যই গুনগত মানের অবমুল্যায়ন দেখতে পাবেন এর নিখুততায়, যেভাবে  প্রজন্ম ১ থেকে প্রজন্ম ১০ অবধি টিকে যায় প্যাটার্ণটি।

পরীক্ষাটির ড্রইং সংস্করনে, প্রজন্ম ১০ এর সবকটি ড্রইং প্রজন্ম ১ এর সব ড্রইংগুলোর সাথে খানিকটা সদৃশ্যতা বহন করবে। এবং প্রতিটি টীমের মধ্যে এই সদৃশ্যতা কম স্থির ভাবে অবনতি হতে থাকে প্রজন্মান্তরে। এর থেকে ভিন্ন অরিগ্যামি সংস্করনের পরীক্ষায়, এই ভুলটি হয় হয় সম্পুর্ণ নয়তো একেবারে না। তাদের পরিবর্তনটা হবে ’ডিজিটাল’ মিউটেশনের মত। হয় কোন টীম কোন ভুলই করবে না এবং প্রজন্ম ১০ এর জাঙ্ক খুব খারাপও হবে না আবার ভালো হবে নাম গড়পড়তায় তা প্রজন্ম ৫ বা প্রজন্ম ১ এর বানানো জাঙ্কের মতই হবে বা হয়তো কোন একটি নির্দিষ্ট প্রজন্মে কোন একটি মিউটেশন হবে ফলে এর পরবর্তী প্রজন্মের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে পুরোপুরি, হুবুহু মিউটেশনটিকে অনুলিপি করার মাধ্যমে;

এই দুই দক্ষতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পার্থক্যটা কি? সেটা হচ্ছে, অরিগ্যামির ক্ষেত্রে দক্ষতাটা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে করতে হবে এমন কতগুলো সুনির্দিষ্ট ক্রিয়া, যাদের কোনটাই এককভাবে করা কোন কঠিন কাজ নয়, বেশীর ভাগই সেই ক্রিয়াগুলো যেমন, ’ঠিক মাঝখানে ভাজ করুন দুই পাশে’; টীমের কোন একটি নির্দিষ্ট সদস্য হয়তো এই ধাপটি অনুকরণ করেন অদক্ষভাবে, তবে পরবর্তী সদস্যটি যিনি শিখছেন তার কাছে  স্পষ্ট অনুভুত হবে, সে আসলে কি করার ’চেষ্টা’ করছে। অরিগ্যামী ধাপগুলো আসলে ’সেলফ নরমালাইজিং’, এবং এটাই একে ডিজিটাল বৈশিষ্ট দিয়েছে; এটা আমার  কাঠের মিস্ত্রির মাষ্টারের উদহারনটির মত, যার ’কাঠের মধ্যে পেরেকের মাথাটা পুরোপুরি ঢুকাতে হবে’ এই উদ্দেশ্যটা তার শীক্ষার্থীর কাছে পরিষ্কার,হাতুড়ী আঘাত এর খুটিনাটি যাই হোক না কেন। অরিগ্যামীর ক্ষেত্রে আপনি হয় কোন একটি ধাপ  ঠিকমত ধরতে পারবেন অথবা পারবেন না। অন্যদিকে আকার দক্ষতা ‍মুলত অ্যানালগ একটি দক্ষতা, প্রত্যেকেই একবার চেষ্ঠা করে দেখতে পারেন, তবে কোন কোন মানুষের অনুলিপি অপেক্ষাকৃত বেশী নিখুততর হবে অন্যদের তুলনায় এবং কেউ একেবারে সঠিকভাবে এর হুবুহ অনুলিপি তৈরী করতে পারবেন না। কোন একটি ড্রইং এর সংস্করণ এর নিখুততাও নির্ভর করে, কি পরিমান সময় এবং সাবধানতা অবলম্বন করা হয়েছে এর প্রতি এবং এটি ক্রমাগতভাবে পরিবর্তনশীল একটি নিয়ামক ।দলের কিছু সদস্য উপরন্তু আরো খানিকটা অলঙ্করণ এবং ’গুনগতমানের ’উন্নতি’ বৃদ্ধি করবে শুধুমাত্র এর আগের প্রতিলিপিটি হুবুহু নকল করতে দেবার বদলে।

শব্দ – অন্ততপক্ষে তাদের অর্থ যখন বোধগম্য হয় – তা সেলফ নরমালাইজিং হয়, যেমন অরিগ্যামি অপারেশনের ক্ষেত্রে হয়। চাইনীজ হুইসপারের (টেলিফোন) ‍মুল খেলায় প্রথম শিশুকে একটি গল্প বা বাক্য শোনানো হয়, এরপর তাকে বলা হয় সেটি তার পরবর্তী শিশুকে কানে কানে জানাতে এবং এভাবে খেলাটি অগ্রসর হয়; যদি বাক্যটি সাত শব্দের কম হয়, এবং প্রত্যেকটি শিশুদের মাতৃভাষায় হয়ে থাকে, খুবই সম্ভাবনা আছে শেষ অবধি বাক্যটি টিকে যাওয়ার, অপরিবর্তিত হয়ে দশটি প্রজন্ম অবধি। যদি সেটা অচেনা কোন ভীন দেশী ভাষার হয়ে থাকে এবং প্রতিটি শব্দ শব্দ হিসাবে উচ্চারণ না করে যদি শিশুরা বাধ্য হয় তাদের ধ্বণি অনুযায়ী বা ফোনেটিক মেরে উচ্চারণ করার জন্য, তাহলে বার্তাটি শেষ অবধি টিকতে পারেনা, প্রজন্মের ক্রমানুসারে এই অবনতি সেই ড্রইং এর মতই আরো অস্পষ্ট,অবোধ্য হয়ে যায়। যখন বার্তাটি শিশুর নিজের ভাষায় কোন অর্থ বহন করে এবং যদি কোন অপরিচিত শব্দ যেমন ’ফেনোটাইপ’বা ’অ্যালীল’ না থাকে, এটি টিকে থাকে, তখন শব্দগুরোকে তাদের ধ্বণি অনুযায়ী উচ্চারণ না করে, শিশুরা প্রতিটি শব্দকে তাদের সীমাবদ্ধ শব্দভান্ডারের সদস্য হিসাবে চিহ্নিত করে, এবং একই শব্দগুলাকে বাছাই করে, যদিও যখন তারা পরবর্তী শিশুর নিকট বার্তাটি হস্তান্তর করে, খুব সম্ভবত তারা তা উচ্চারণ করে ভিন্ন কোন বাচনভঙ্গীতে; লিখিত ভাষাও সেল্ফ নরমালাইজিং, কারন কাগজে লেখা নানা বর্ণ, তাদের খুটিনাটি বিষয়ে যতেই ভিন্নতা থাকুক না কেন, তাদের একটি সীমাবদ্ধ ( ধরা যাক) ছাব্বিশটি বর্ণের পরিবার থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে।

মীমরা কখনো কখনো তাদের অনুলিপি করন প্রক্রিয়ায় খুব বেশী মাত্রার নিখুততা প্রদর্শন করতে পারে এধরনের সেল্ফ নরমালাইজেশন প্রক্রিয়ার জন্য, এই সত্যটাই যথেষ্ট মীম/জীন সমরুপতা সংক্রান্ত কোন ধরনের অভিযোগের উত্তর দেবার জন্য। এছাড়া যাই হোক না কেন, এর বিকাশের এই আদি পর্যায়ে মীম তত্ত্বের মুল উদ্দেশ্য,ওয়াট ক্রিক এর জীনতত্ত্বের সমমানের সংস্কৃতি সংক্রান্ত কোন ধরণের বোধগম্য পুর্ণাঙ্গ তত্ত্ব প্রদান করা না; মীমকে সমর্থন করার আমার মুল উদ্দেশ্য ছিল, আসলে সেই ধারনাটির মোকাবেলা করা, যে জীনরাই শুধু একমাত্র ডারউইনীয় প্রভাবের বিষয়, যে ধারনাটি নয়তো The Selfish Gene প্রচার করছে এমন একটা ঝুকি থেকে যাবার সম্ভাবনা ছিল। পিটার রিচারসন ও রবার্ট বয়েড এই বিষয়টির উপর জোর দিয়েছিলেন তাদের মুল্যবান এবং চিন্তার খোরাক যোগানো বই Not by Genes Alone এর শিরোনামের মাধ্যমে। যদিও তারা তাদের কারন বলেছেন কেন তারা মীম শব্দটি গ্রহন করেননি, বরং কালচারাল ভ্যারিয়ান্ট শব্দটা পছন্দ করেছেন; স্টিফেল শেনান এর Genes, Memes and Human History আংশিক অনুপ্রেরণা বয়েড ও রিচারনসনের এর আগের একটি অসাধারণ বই Culture and the Evolutionary Process;  মীম নিয়ে আলোচনা করা অন্য পুর্ণাঙ্গ বইগুলো মধ্যে আছে রবার্ট আঙ্গার এর The Electric Meme, কেট ডাস্টিন এর The Selfish Meme এবং রিচার্ড ব্রডির Virus of the Mind: The New Science of the Meme;

কিন্তু সুসান ব্ল্যাকমোর তার The Meme Machine এ মেমেটিক তত্ত্বটি যে কোন কারোর চেয়েই বেশী বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তিনি বারবার  ব্রেন বা মস্তিষ্ক ( বা অন্য কোন গ্রহন বা ধারনকারী বা কোন চ্যানেল বা মাধ্যম) দিয়ে পুর্ণ একটি পৃথিবী এবং যেখানে মীমরা একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে সেই জায়গাগুলো দখল করার চেষ্টা করছে, এমন একটি দৃশ্যকল্পের কথা বলেছেন; জীনপুলের জীনদের মত, মীমরা যারা শেষ অবধি টিকে যাবে, সেগুলো আসলে  তারা, যারা কিনা নিজেদের অনুলিপি করতে দক্ষ। এর কারন হতে পারে তাদের একটি সরাসরি আবেদন আছে, যেমন, ধারনা করা যেতে পারে ’অমরত্বের’ মীম, কিছু মানুষের কাছে যেমন বিশেষ আবেদন আছে। অথবা হতে পারে তারা সবচেয়ে বেশী বিকশিত হয় অন্য কিছু মীমদের উপস্থিতিতে যারা ইতিমধ্যেই মীম পুলে অসংখ্য। এটি মীম পুলে মীম কমপ্লেক্স বা মীমপ্লেক্স এর সৃষ্টি করে । মীমদের ব্যাপারে যথারীতি আমরা আরো ভালো করে বুঝতে পারি  এর সাথে জীনতাত্ত্বিক তুলনার উৎসে ফেরত গিয়ে।

বোঝানোর জন্যই আমি জীনদের এমন ভাবে ব্যাখ্যা করেছি যেন, তারা স্বতন্ত্র একক, যারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম; কিন্তু অবশ্যই তারা পরস্পর থেকে স্বাধীন নয়, এই বিষয়টি প্রকাশ পায় দুটি উপায়ে: প্রথম, ক্রোমোজোমের উপর সরলরৈখিকভাবে জীনগুলো সাজানো থাকে, এবং প্রজন্মান্তরে তারা তাদের নিকটবর্তী ক্রোমোজমের লোকাই এর অন্যান্য জীনগুলোকে নিয়ে বিস্তার লাভ করে। আমরা যে যোগসুত্রকে বলি লিংকেজ এবং আমি এই বিষয়ে আর বলছি না কারন মীমদের জীনদের মত কোন ক্রোমোজোম কিংবা আলীল নেই বা যৌন পুণ:সন্নিবেশনও ঘটে না। অন্য আরেকটি ক্ষেত্রে জীনগুলো সে স্বাধীন নয় তা জেনেটিক লিংকেজ থেকে খুবই ভিন্ন এবং এখানে বেশ ভালো মেমেটিকের অনুরুপ একটি তুলনা আছে, এটি ভ্রুণতত্ত্ব বিষয়ক  –  এবং যে সত্যটি প্রায়ই ভুল বোঝা হয় –  এটি জীনতত্ত্ব থেকে সম্পুর্ণ ভিন্ন; আমাদের শরীর জিগশ’ পাজলের এর মত টুকরো টুকরো জোড়া লাগানো নানা ফেনোটাইপের অংশ না, যারা কিনা প্রত্যেকে আলাদা ভাবে ভিন্ন ভিন্ন জীনের অবদান; কোন সরাসরি একক ভাবে কোন জীনের সাথে সংযোগ নেই শরীরের গঠন বা আচরণগত বৈশিষ্টর;  আরো শতাধিক অন্যান্য জীনের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কোন একটি বিভিন্ন বিকাশ প্রক্রিয়া পরিচালনা করে যার ফলাফল পুর্ণ হয় – শরীর সৃষ্টির মাধ্যমে। ঠিক যেমন করে কোন রেসিপির নানা শব্দ রান্না করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি বিশেষ ডিশ তৈরী করে। রেসিপির প্রতিটি শব্দ ডিশটির নানা টুকরোকে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করছে, এমনটি কিন্তু না।

সুতরাং জীনরা আসলে দলবদ্ধ হয়ে  একসাথে সহযোগিতার মাধ্যমে শরীরকে তৈরী করে এবং এটি ভ্রুণতত্ত্বের একটি মুলনীতি। প্রাকৃতিক নির্বাচন এক দল  জীনকে সহায়তা করে অন্যান্য বিকল্প একদল জীনদের তুলনায় এমন ভাবে বলার একটা প্রলোভন এড়ানো কঠিন। এবং এখানেই সংশয়; আসলে যেটা ঘটে, তাহলো  জীনপুল অন্যান্য জীনরা সেই পরিবেশের একটি বড় অংশ তৈরী করে, যেখানে প্রতিটি জীন বনাম তার বিকল্প অ্যালীল নির্বাচিত হয়। যেহেতু প্রতিটি জীন নির্বাচিত হবার ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করে অন্য জীনদের উপস্থিতিতে – যারা নিজেরাও একই ভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়েছে – এভাবে সহযোগী জীনদের গুচ্ছ বা কার্টেল নির্বাচনের মাধ্যমে ’উদ্ভব’ হয়।  আমাদের যেটা আছে সেটা পরিকল্পিত নিয়মিত অর্থনীতির তুলনায় বরং অনেকটাই মুক্ত বাজার অর্থনীতির মত। এখানে কসাই আছে একজন, বেকার আছে একজন,কিন্তু বাজারে একটি শুন্যস্থান হয়তো আছে একজন মোমবাতির কারিগরের। প্রাকৃতিক নির্বাচনের অদৃশ্য হাত সেই শুন্যস্থান পুর্ণ করে। এটি কিন্তু  একজন কেন্দ্রিয় পরিকল্পনাকারীর উপস্থিতির ধারনা থেকে ভিন্ন, যিনি কসাই-বেকার আর  মোমবাতির কারিগরের এই ত্রিমুখী সহযোগী গ্রুপগুলোকে সমর্থন করেন; পরস্পর সহযোগিতা পুর্ণ জীন গুচ্ছ বা কার্টেল  অদৃশ্য হাত দিয়ে এক জায়গায় জড়ো করার ধারনাটি ধর্মের মীমগুলো এবং কিভাবে তারা কাজ করে বুঝতে আমাদের সাহায্য করে;

বিভিন্ন ধরনের জীনদের গ্রুপ বা কার্টেল এর উদ্ভব হয় বিভিন্ন জীন পুলে। মাংশাসী জীন পুলে এমন জীন থাকবে যা শিকার ধরার ইন্দ্রিয়, শিকার ধরার মত নখর, মাংশাসী দাত, মাংশ হজম করার জন্য প্রয়োজনী উৎসেচক এবং আরো অন্যান্য  জীন, সবাই বিশেষভাবে একে অপরের সাথে সহযোগীতা করবে প্রয়োজনী অঙ্গ এবং নানা শারীরবৃত্তীয় পরিবেশ সৃষ্টি করেতে। এবং একই সাথে, নিরামিশভোজীদের প্রানীদের জীন পুলে ভিন্ন পারস্পরিক সামন্জষ্যপুর্ণ জীনগুলো সহায়তা পাবে তাদের নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা করার জন্য। আমরা সেই ধারনার সাথে  পরিচিত যে, একটি জীন প্রজাতির বহিঃপরিবেশের সাথে এর প্রকাশ বা ফেনোটাইপ এর পারস্পরিক সামন্জষ্যতার কারনে বিশেষ সহায়তার জন্য নির্বাচিত হয়: মরুভুমি, বনভুমি বা সেটা যেখানে হোক না কেন। আমি যে বিষয়টা এখানে উল্লেখ করতে চাইছি তা হলো, এছাড়াও সহায়তার জন্য এটি নির্বাচিত হয়  কোন একটি নির্দিষ্ট জীনপুলে অন্যান্য জীনের সাথে এর পারস্পরিক সামন্জষ্যতার উপরেও ভিত্তি করে। কোন মাংশাসী জীন নিরামিশভোজী প্রানীদের জীনপুলে টিকতে পারবেনা এবং এর উল্টোটাই ঘটে মাংশাসী জীন পুলে কোন নিরামিশাষী জীনগুলোর ক্ষেত্রে। যদি জীনের দীর্ঘদৃষ্টি দিয়ে ব্যাপারটা দেখা হয়, কোন প্রজাতির জীন পুল – জীনদের সেই সেট যা বারবার বিন্যাস এবং পুনর্বিন্যাস হচ্ছে যৌন প্রজণনের মাধ্যমে – তারা সেই জীনতাত্ত্বিক পরিবেশ তৈরী করে  যেখানে প্রতিটি জীন নির্বাচিত হয় তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা করার ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। যদিও মীমদের পুল  জীনপুলের মত এতো নিয়ম নির্ভর বা গোছানো নয়, তাসত্ত্বেও আমরা একটি মীম পুলের কথা বলতে পারি মীমপ্লেক্স এর প্রতিটি মীম এর জন্য গুরুত্বপুর্ণ ’পরিবেশ’ হিসাবে।

মীমপ্লেক্স হচ্ছে এক সেট  মীম যারা, নিজেরা এককভাবে টিকে থাকতে তেমন দক্ষ না হলেও, মীমপ্লেক্স এর অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিতে এরা সফলভাবে টিকে থাকতে সক্ষম। এর আগের সেকশনে আমি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম ভাষার বিবর্তনের খুটিনাটি ক্ষেত্রগুলো বিশেষ কোন সুবিধা পায়না একধরনের প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। আমার ধারনা যে ভাষার বিবর্তন বরং নিয়ন্ত্রণ করে র‌্যানডোম ড্রিফট;  অনুমান করা  সম্ভব যে কিছু স্বরবর্ণ বা ব্যাজ্ঞন বর্ণ পাহাড়ী পরিবেশে অন্য  স্বরবর্ণ বা ব্যাজ্ঞন বর্ণ অপেক্ষা বেশী প্রযোজ্য এবং সেকারনে সেগুলো বৈশিষ্টমুলক যেমন, সুইস, তীব্বতীয় এবং আন্দেজ পর্বতাঞ্চলের ভাষার ডায়ালেক্ট। অন্যদিকে যেমন কিছু শব্দ ফিসফিস করে বলার জন্য উপযুক্ত, যেমন গভীর জঙ্গলে, একারনে বৈশিষ্টমুলক পিগমী বা আমাজনীয় ভাষায়। কিন্তু ভাষা নিয়ে যে উদহারণ আমি উল্লেখ করেছিলাম সেগুলো প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে – গ্রেট ভাওয়েল শিফট  এর তত্ত্বটি হয়তো একটি ব্যাখ্যা আছে – যদি সেই ব্যাখ্যাটি এই ধরণের না হতে পারে। বরং এটি হতে পারে পারস্পরিক সামন্জষ্যপুর্ণ মীমপ্লেক্সে এ মীমদের উপযুক্ত জায়গা খুজে নেবার মাধ্যমে। একটি স্বরবর্ণ প্রথমে শিফট হয়, অজানা কোন কারণে – হয়তো কোন প্রশংসার পাত্র বা শক্তিশালী কোন ব্যাক্তির মত করে ফ্যাশন দুরস্ত উচ্চারন অনুকরণের মাধ্যমে, যেমনটা বলা হয় স্প্যানীশ লিস্প এর কারণ হিসাবে;  কিভাবে গ্রেট ভাওয়েল শিফট হলো সেটা যাই হোক না কেন: এই তত্ত্বানুযায়ী একবার যখন প্রথম স্বরবর্ণটি পরিবর্তিত হয়, অন্য স্বরবর্ণগুলো সেটি পালাক্রমে অনুসরণ করে যে কোন ধরনের অস্পষ্টতাকে হ্রাস করার প্রচেষ্টায়, এভাবে ধাপে ধাপে পর্যায়ক্রমে। এবং দ্বিতীয় পর্বে ইতিমধ্যে বিদ্যমান মিমপুল থেকে মীম রা নির্বাচিত হয়, যারা পারস্পরিক সামন্জষ্যপুর্ণ মীমদের নিয়ে মীমপ্লেক্স তৈরী করে।

অবশেষে ধর্মের মেমেটিক তত্ত্বটি  নিয়ে আলোচনা করার জন্য এখন আমরা যথেষ্ট উপকরণ সংগ্রহ করেছি;  কিছু ধর্মীয় ধারনা , কিছু জীনের মতই হয়তো টিকে সাথে শুধুমাত্র এর নিজের যোগ্যতায়। এই মীমগুলো টিকে থাকতে পারে যে কোন মীম পুলে, তাদের চারপাশে যে মীমরা ই থাকুক না কেন (এই গুরুত্বপুর্ণ বিষয়টি নিয়ে আমি অবশ্যই আবার বলছি যে যোগ্যতা বা মেরিট এই অর্থে মীম পুলে টিকে থাকার ’যোগ্যতা’ মাত্র, এর বাইরে এই শব্দটির বিশেষ চুড়ান্ত কোন মুল্য বিচার নেই); কিছু ধর্মীয় ধারনা টিকে যায় কারন তারা অন্য মীমগুলোর সাথে সামন্জষ্যপুর্ণ হবার কারনে এবং ইতিমধ্যেই মীমপুলে যাদের সংখ্যাও অনেক মীম কমপ্লেক্স বা মীমপ্লেক্স এর অংশ হিসাবে। নীচে আমি ধর্মীয় মীমদের একটি আংশিক তালিকা উল্লেখ করলাম, যা সম্ভবত মীম পুলে টিকে থাকার বিশেষ যোগ্যতা আছে , হয় সম্পুর্ণ তাদের একক ’যোগ্যতা’ অথবা বিদ্যমান মীমপ্লেক্সগুলোর সাথে এর সামন্জষ্যতার কারনে।

  • আপনার মৃত্যুর পরও আপনি বেচে থাকবেন।
  • যদি আপনি শহীদ হিসাবে মৃত্যুবরণ করেন তবে আপনার জায়গা হবে বেহেশতের বিশেষ একটি স্থানে যেখানে আপনি বাহাওরটি কুমারী নারী ভোগ করতে পারবেন ( সেই দুর্ভাগা কুমারীর জন্য একটু ভেবে দেখুন)
  • ধর্মীয় ভিন্নমতাবলম্বী বা হেরেটিক, অবমাননাকারী এবং স্বধর্মত্যাগীদের হত্যা করা উচিৎ ( বা তাদের অন্য কোনোভাবে শাস্তি প্রদান করা উচিৎ যেমন তাদের পরিবার থেকে তাদের সম্পর্কচ্যুত করা ইত্যাদি)
  • ঈশ্বরে বিশ্বাস করা হচ্ছে সবচে বড় গুন বা ভার্চু। আপনি যদি কখনো অনুভব করেন যে, আপনার বিশ্বাস দোদ্যুল্যমান, তবে সেটিকে স্থির ও দৃঢ় করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করুন এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন আপনার অবিশ্বাসের দ্বন্দে তিনি যেন আপনাকে সাহায্য করেন ( পাসকালের বাজী সম্বন্ধে আলোচনার সময় আমি উল্লেখ করেছিলাম, সেই অদ্ভুত ধারনাটি কথা, যে ঈশ্বর আমাদের কাছে আসলে যে জিনিসটা চান সেটা হচ্ছে তার উপর আমাদের বিশ্বাস। সেই সময় আমি এটাকে একটি ব্যতিক্রম হিসাবে চিহ্নিত  করেছিলাম, তবে এখন এর জন্য একটি কারন আছে আমাদের);
  • আস্থা বা ফেইথ( কোন ধরনের প্রমান ছাড়াই যে বিশ্বাস) হচ্ছে একটি উত্তম গুন। আপনার বিশ্বাস যত বেশী প্রমানকে উপেক্ষা করবে , ততবেশী ধর্মীয় গুনে গুনান্বিত হবেন আপনি। একনিষ্ঠ গুনবান বিশ্বাসীরা যত বেশী অদ্ভুত কিছু বিশ্বাস করতে সক্ষম হন, যা অসমর্থিত এবং কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য না কোন প্রমানের নীরিখে বা যুক্তিতে, তারা তাদের এই অন্ধবিশ্বাসের জন্য বিশেষভাবে পুরষ্কৃত হবেন।
  • প্রত্যেকেই, এমনকি যাদের কোন ধর্মীয় বিশ্বাস নেই, ধর্ম বিশ্বাসীদের বিশ্বাসকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এবং প্রশ্নাতীতভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে, এবং অন্য ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি সাধারনত যা করা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশী মাত্রায় তাদের সেই বিশ্বাসের প্রতি সন্মান দেখাতে হবে ( অধ্যায় ১ এ বিষয়টি আলোচনায় এসেছে);
  • বেশ অদ্ভুত কিছু বিষয় আছে (যেমন, ট্রিনিটি, ট্রান্সসাবস্টানশিয়েশন, ইনকারনেশন) যা আমাদের ’বোঝার’ জন্য না; এমনকি এসব কোন কিছু বোঝার কোন ’চেষ্টা‘ করারও দরকার নেই কারন বিষয়গুলো বোঝার প্রচেষ্টার প্রক্রিয়া সেগুলোকে ধ্বংশ করে দিতে পারে। বরং শিখুন এগুলোকে ’রহস্য’ হিসাবে চিহ্নিত করে কিভাবে পুর্ণতা এবং সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়;
  • সুন্দর সঙ্গীত, শিল্পকলা এবং ধর্মীয় গ্রন্হ হলো নিজেরাই স্বপ্রতিলিপিকারী ধর্মীয় ধারনার টোকেন।((( বিভিন্ন ঘরানা এবং জনরার শিল্পকর্মগুলো বিশ্লেষন করা যেতে পারে বিকল্প মীম কমপ্লেক্স বা মীমেপ্লেক্স হিসাবে, যেহেতু শিল্পীরা তাদের পুর্ববর্তী শিল্পীদের নানা আইডিয়া ও মোটিফ অনুসরণ ও অনুকরণ করেন এবং নতুন মোটিফগুলো শুধুমাত্র টিকে থাকতে পারে, যদি তারা অন্যগুলোর সাথে মিশে যেতে পারে। আসলেই শিল্পকলার ইতিহাসের পুরো শাখাটাই দেখা যেতে পারে মীমপ্লেক্সিটির একটি বিস্তারিত গবেষনা হিসাবে, বিশেষ করে তাদের সুক্ষ এবং নিয়মমাফিক নানা আইকোনোগ্রাফি বা সিম্বোলিজমের বিস্তারিত গবেষনাগুলো সেটারই ইঙ্গিত দেয়। যে খুটিনাটি বিষয়গুলো সমর্থিত হয়েছে বা সমর্থন হারিয়েছে মীম পুলে উপস্থিত অন্য সদস্যদের কারনে এবং যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় মীমগুলোর ভুমিকা ছিল।))))

উপরে তালিকায় বর্ণিত কিছু মীম এর সম্ভবত চুড়ান্ত সারভাইভাল মুল্য আছে এবং সেটি যে কোন মীমপ্লেক্স এ ভালোভাবেই টিকে থাকতে পারে সফলতার সাথে। কিন্তু, জীনের ক্ষেত্রে যেমন হয়, কিছু মীম টিকে থাকে অন্য বেশ কিছু মীমের উপস্থিতিতে সৃষ্ট একটি উপযুক্ত পরিবেশে, যা বিকল্প নানা মীমপ্লেক্সগুলো গড়ে উঠতে সহায়তা করে। দুটি ভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসকে দেখা যেতে পারে, দুটি বিকল্প মীমপ্লেক্স হিসাবে, যেমন হয়তো ইসলাম হচ্ছে মাংশাসী জীন কমপ্লেক্স এর অনুরুপ, এবং বৌদ্ধধর্মবাদ  যেমন নিরামিশাষী জীন কমপ্লেক্স এর অনুরুপ। চুড়ান্ত কোন অর্থে কিন্তু  কোন ধর্মের ‘ধারনাগুলো’ অন্য কোন একটি ধর্মের ’ধারনাগুলো’র চেয়ে উত্তম না; ঠিক যেমন মাংশাসী জীন নিরাষাশী জীন থেকে উত্তম না যে অর্থে। এধরনের ধর্মীয় মীমগুলোর চেয়ে চুড়ান্তভাবে টিকে থাকার থাকার কোন বিশেষ গুনাবলী থাকতেই হবে এমন কোন প্রয়োজনীয়তাও কিন্তু নেই। তাসত্ত্বেও, তারা টিকে থাকার ক্ষেত্রে দক্ষ এই অর্থে যে, তারা শুধূ তাদের ধর্মের অন্য মীমদের উপস্থিতিতে ভালোভাবেই তাদের জায়গা করে নিতে পারে, বিকশিত হতে পারে, যা অন্য ধর্মের মীমদের উপস্থিতিতে ঘটে না। এই মডেলে, রোমান ক্যাথোলিকবাদ ও ইসলাম, ধরুন অবশ্যই কোন একক ব্যাক্তির সৃষ্টি নয়, বরং তারা বিবর্তিত হয়েছে পৃথক পৃথক ভাবে বিকল্প মীমদের একটি গুচ্ছ হিসোবে যারা পুর্ণ বিকাশ হবার সুযোগ পেয়েছে একই মীমপ্লেক্স দের সহাবস্থানে।

সংগঠিত ধর্ম সংগঠিত হয়েছে মানুষের দ্বারাই: যাজক এবং বিশপ, রাবাই, ইমাম, আয়াতোল্লাহ দের দ্বারাই। কিন্তু আমি মার্টিন লুথারের সংক্রান্ত যে বিষয়টির অবতারণা করেছিলাম আগে, সেই বিষয়টির পুণরাবৃত্তি করেই বলছি, এর অর্থ কিন্তু এটা নয়, যে ধর্মের প্রথম ধারনার সুত্রপাত বা পরিকল্পনা করেছে কোন মানুষ; এমনকি যেখানে ধর্মকে অপব্যবহার ও নিয়ন্ত্রন করা হয়েছে ক্ষমতায় থাকা মানুষগুলোর স্বার্থে। প্রবল সম্ভাবনা আছে যে, প্রতিটি ধর্মের খুটিনাটি অনেক বিষেই মুলত তার আকৃতি পেয়েছে অচেতন বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়। কোন জীনতাত্ত্বিক প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে না,  কারন সেই প্রক্রিয়া খুবই ধীর, যা ধর্মের দ্রুত বিবর্তন ও এবং নানা বিভাজনকে ব্যাখ্যা করতে পারেনা। এই কাহিনীতে জীনতাত্ত্বিক প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভুমিকা হলো, প্রয়োজনীয় প্রাক-প্রবণতা এবং পক্ষপাতিত্ত্ব সহ সেই মস্তিষ্ককে সরবরাহ করা-একটি হার্ডওয়ার প্ল্যাটফর্ম ও লো লেভেল সিস্টেম সফটওয়্যারটি যা মেমেটিক বা মীম নির্ভর নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরী করে। এই প্রেক্ষাপটে আমার কাছে মনে হয় কোন একধরনের মীম নির্ভর প্রাকৃতিক নির্বাচনই ব্যাখ্যা করতে পারে কোন একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বিস্তারিত বিবর্তন প্রক্রিয়াটিকে। ধর্মীয় বিবর্তনের প্রাথমিক ধাপগুলোতে, এটি কোন সংগঠিত রুপ নেবার আগে, সাধারন মীমগুলো টিকে থাকে মানুষের মনস্তাত্ত্বিকতার প্রতি তাদের বিশেষ আবেদনের জন্য; এবং এখানেই ধর্মের মীম তত্ত্ব এবং মানসিক কোন প্রক্রিয়ার উপজাত হিসাবে ধর্মের উৎপত্তি তত্ত্বটি একে অপরের সাথে মিশে যায়। পরবর্তী পর্যায়ে যখন ধর্ম রুপান্তরিত হয়ে সংগঠনে, বিস্তারিত নানা ধরনের আচার এবং কাল্পনিক নানা নিয়মকানুনের মাধ্যমে ভিন্নতা পায় অন্যান্য ধর্মগুলো থেকে, সেই পর্যায়ের ধর্মের নানা বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করার জন্য মীমপ্লেক্স তত্ত্বটি বেশ যথেষ্ট – পারস্পরিক সামন্জষ্যপুর্ণ মীমদের কার্টেল বা গ্রুপ; এটি অবশ্য যাজক কিংবা অন্যদের পরিকল্পনা মাফিক বাড়তি কিছু ম্যানিপুলেশনের ভুমিকা থাকার সম্ভবনাকে বাতিল করেনা; ধর্ম সম্ভবত কিছুটা অংশ, ইন্টেলিজেন্টলি ডিজাইন করা হয়েছে, যেমন করে শিল্পকলার ক্ষেত্রে নানা স্কুল বা ঘরানা বা ফ্যাশনগুলো সৃষ্টি করা হয়ে থাকে।

প্রায় সম্পুর্ণ যে একটি ধর্ম ইন্টেলিজেন্টভাবে ‘ডিজাইন’ করা হয়েছে, তাহলো সায়েন্টোলজী (Scientology), কিন্তু আমার সন্দেহ এটি ধারার ব্যতিক্রম হবার সম্ভাবনাই বেশী। পুরোপুরি ডিজাইনকৃত ধর্মের খেতাব পাবার আরেকটি দাবীদার হচ্ছে মরমনিজম (Mormonism); জোসেফ স্মিথ, এই ধর্মটির অত্যন্ত বিশেষ প্রকৃতির সৃজনশীল ও মিথ্যাচারী আবিষ্কারক, এক অস্বাভাবিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্পুর্ণ নতুন একটি পবিত্র গ্রন্হ সৃষ্টি করেছিলেন, বুক অব মর্মন, যেখানে একেবারে শুন্য থেকে তিনি নতুন একটি আমেরিকার মিথ্যা ‍কাল্পনিক ইতিহাসের অবতারণা করেন ভুয়া সপ্তদশ শতকের ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করে। তাস্বত্ত্বেও উনবিংশ শতাব্দীতে এর সৃষ্টি হবার পর মর্মনবাদ বিবর্তিত হয়েছে বেশ এবং এখন এটি যুক্তরাষ্ট্রের মুলধারার সন্মানজনক একটি ধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত; আসলেই, দাবী করা হচ্ছে এটি সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্মগুলোর একটি এবং এখন কথা হচ্ছে তাদের ভবিষ্যত একজন প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেটকে খুজে বের করার ব্যাপারে।

সব ধর্মই বিবর্তিত হয়। ধর্মীয় বিবর্তনের যে তত্ত্বই আমরা গ্রহন করিনা কেন, সেই তত্ত্বটিকে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যে বিস্ময়কর হারে ধর্মীয় বিবর্তন প্রক্রিয়া অগ্রসর হতে পারে, সেটি ব্যাখ্যা করতে হবে।একটি কেস স্টাডি আলোচনা করা যাক:

চলবে _________________________________

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : পঞ্চম অধ্যায় (ষষ্ঠ পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s