নুর ইনায়াত খান : দ্য স্পাই প্রিন্সেস


ছবি: নুর ইনায়াত খান ( ২ রা জানুয়ারী ১৯১৪- ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৪)

যুক্তরাজ্যে এই প্রথম বারের মত কোন এশীয় বংশোদ্ভুত নারীর একক ভাস্কর্য স্থাপিত হতে যাচ্ছে। ভাস্কর্যটি নুর ইনায়াত খানের।

11628_10153732657258136_8471180002224875091_n

১৯৪৩ সালে জুন মাসে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর একজন গুপ্তচর হিসাবে নুর ইনায়াত খান ফ্রান্সে প্রবেশ করেছিলেন ফরাসী প্রতিরোধ বাহিনীকে সহায়তা দেবার জন্য, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করে ধরিয়ে দেয়া হয় দখলদার নাৎসী জার্মান বাহিনীর হাতে; জার্মান এসএস রা তাকে গুলি করে হত্যা করে ডাকাউ কনসেন্ট্রন ক্যাম্পে;

নুর ইনায়াত খানের বয়স তখন মাত্র ৩০;

এই সাহসী আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসাবে  বৃটিশ সরকার তাকে মরনোত্তর জর্জ ক্রস ও ফরাসী সরকার ক্রোয়া দ্য গের প্রদান করেন। চার্চিলের গড়া সেই এলিট Secret Special Operations Executive (SOE) ‍নুর সহ আরো দুজনও George Cross পেয়েছিলেন; Violette Szabo এবং Odette Hallowes যারা দুজনেই অনেক আগেই আরো বেশী স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তাদের অবদানের জন্য; তবে নুর ইনায়াত খান ছিলেন  বিস্মৃতির আড়ালে;  তাকে  নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেন লেখক শ্রাবনী বসু তার জীবনের গল্প নিয়ে লেখা Spy Princess: Life of Noor Inayat Khan বইটির মাধ্যমে।


নুর ইনায়াত খানের বায়োগ্রাফির প্রচ্ছদ: লেখক শ্রাবনী বসু

কে ছিলেন নুর (নুরুন্নিসা ইনায়াত খান, কিংবা  নোরা বেকার কিংবা ম্যাডেলাইন ?


ছবি: মায়ের সাথে নুর

বংশসুত্রে রাজকুমারী নুরের জন্ম মস্কোতে, তার বাবা হযরত ইনায়াত খান ছিলেন মহীশুরের সুলতান টিপু সুলতানের প্রপৌত্র ; ইনায়াত খান ছিলেন মুলত সঙ্গীতজ্ঞ এবং সুফীবাদের একজন সুপরিচিত শিক্ষক এবং প্রচারক,  তার জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছিল প্রবাসে, মুলত ইউরোপে, নুরের মা অরা মীনা রে বেকার ( আমিনা বেগম) জন্মসুত্রে একজন আমেরিকান, যুক্তরাষ্ট্রেই নুরের বাবার সাথে তার পরিচয় এবং বিয়ে (মীনা রে বেকার কবিতা লিখতেন, তার ১০১টি কবিতার একটি সংকলন, A Rosary of one hundred and one beads)। নুরের দুই ভাই ই স্বনামে খ্যাত এবং আন্তর্জাতিক সুফী আন্দোলনের সাথে জড়িত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু হবার আগে  নুর এর বাবা রাশিয়া থেকে লন্ডনের ব্লুমসবারিতে এসে বসবাস করা শুরু করেন; নুরের শৈশবের কিছুটা সময় কেটেছে এখানে; ১৯২০ এ পুরো পরিবার পাড়ি জমায় ফ্রান্সে, প্যারিসের কাছাকাছি সুরেসনে তে; ১৯২৭ সালে বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর নুর দ্বায়িত্ব নেন সংসারের, তখন তার বয়স মাত্র ১৩; সোরবনে শিশু মনোবিজ্ঞান, এবং প্যারিস কনসারভেটরীতে সংগীতে শিক্ষা নেয়া নুর, তার পেশাগত জীবন শুরু করে কবিতা আর শিশু সাহিত্য রচনার মাধ্যমে, ১৯৩৯ সালে Twenty Jataka Tales শীর্ষক একটি গল্প গ্রন্হও প্রকাশিত হয় তার লন্ডন থেকে।


বাবা মা দুজনের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা

১৯৪০ এ নাৎসীরা যখন ফ্রান্স আক্রমন করে নুরের পুরো পরিবার ইংল্যান্ডে পালিয়ে আসেন আবার। বাবার পরম শান্তিবাদী সুফী আদর্শে দীক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নুর এবং তার ভাই সিদ্ধান্ত নেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেবার। ১৯৪০ এর নভেম্বর মাসে বৃটিশ Women’s Auxiliary Air Force এ যোগ দেন নুর, যেখানে তাকে ট্রেনিং দেয়া ওয়ারলেস অপারেটর হিসাবে;  সরাসরি যুদ্ধে যাবার জন্য নুরের আবেদনের প্রেক্ষিতে  ১৯৪৩ সালে তাকে চার্চিলের নির্দেশে বানানো Special Operations Executive এফ ( ফ্রান্স) সেকশনে তাকে পাঠানো হয় , এখানে ট্রেনিং নেবার সময় তিনি তার নাম বেছে নেন নোরা বেকার;

তাকে ফিল্ড অ্যাসাইনমেন্টে যেতে হয় গোপন সমর কৌশলের ট্রেনিং পুরোপুরি শেষ হবার আগেই, কারন, অনর্গল ফরাসী বলতে পারা এবং ওয়ারলেসে অপারেশনে তার দক্ষতা, এছাড়াও প্রয়োজনীয় এজেন্ট এর অভাব তো ছিলই। ১৯৪৩ সালে মধ্য জুনে  জার্মানী অধিকৃত ফ্রান্সে প্রবেশ করেন নুর ফরাসী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নেটওয়ার্কে যোগ দিতে;  নুর ইনায়াত তখন শুধু ম্যাডেলাইন ; কিন্তু দেড় মাসের মধ্যেই ফরাসী সেই নেটওয়ার্কটির অর্ধেক স্বাধীনতা যোদ্ধাই ধরা পড়ে যায় জার্মান গোয়েন্দাদের হাতে; নুরকে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়া সত্ত্বেও নুর স্বেচ্ছায় ফ্রান্সে তার কাজ অব্যাহত রাখতে চান; মিত্রবাহিনীর লন্ডন হেডকোয়ার্টার এবং প্যারিসের মধ্যে রেডিও সংযোগ এর গুরুত্বপুর্ণ  সুত্রটা অব্যাহত রেখেছিলেন নুর ;

ধারনা করা হয় নুরকে জার্মানদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন অরি দেরিকোর্ট নামে আরেকজন SOE অফিসার, ফরাসী বিমান বাহিনীর এই অফিসার জার্মান ডাবল এজেন্ট ছিলেন; এই সন্দেহের তালিকায় আরেকজন হচ্ছেন রেনে গ্যারী, যিনি নুর এর ফরাসী সংগ্রামীদের গোপন নেটওয়ার্কে অরগানাইজার এমিল গ্যারীর বোন; জার্মানদের হাতে ধরা পড়ার পর নম্র, শান্ত স্বভাবের নুর কে নিয়ে SOE র সবার চিন্তা থাকলেও, গেষ্টাপোরা নুরকে টানা একমাস জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোন তথ্য উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়, তবে নুর তার সব পাঠানো মেসেজ গোপন সংকেত এ তার নোটবুকে লিখে রাখতেন, আর তারা সেটা হাতে পেয়ে  যায় ; যদিও জার্মানরা সেটার অর্থ নুরের কাছ থেকে কোনভাবে উদ্ধার না করতে পারলেও, একই রকম মেসেজ পাঠিয়ে তারা বৃটিশদের বোকা বানাতে সক্ষম হয়েছিল কিছু দিনের জন্য, এভাবে তাদের হাতে ধরা পড়ে আরো চারজন বৃটিশ নারী গুপ্তচর।

জার্মান নৃশংস গোয়েন্দারা এই শান্ত, সঙ্গীতপ্রেমী, কবি মানুষটাকে তার দৃঢ়তার জন্য চিহ্নিত করেছিল একজন “highly dangerous”  বন্দী হিসাবে; বেশীর ভাগ সময়ই তাকে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হত;  বন্দী দশা থেকে পালাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন একবার, এরপর ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নুর সহ আরো তিন জন নারী গুপ্তচরকে Yolande Beekman, Eliane Plewman ও Madeleine Damerment, মাথায় গুলি করে হত্যা করে জার্মান এসএস সেনারা।

একই কনসেন্ট্রশন ক্যা্ম্পে থাকা একজন ডাচ বন্দীর বিবরনীতে জানা যায় একজন শীর্ষ স্থানীয় এসএস অফিসার  মৃত্যুর আগে নুরকে নির্যাতন করেছিলেন নৃশংসভাবে।

মৃত্যুর মুখোমুখি মাত্র ৩০ বছর বয়সী সুফী আদর্শে বিশ্বাসী নুরের শেষ শব্দটি ছিল ‘ Liberte’ , ফরাসী ভাষায় যার অর্থ স্বাধীনতা।


ছবি: অক্সিলারী এয়ারফোর্সের ইউনিফর্ম পরা নুর ইনায়াত খান

একটি ভিডিও:

বিবিসি এর প্রামাণ্য চিত্র, স্পাই প্রিন্সেস

Advertisements
নুর ইনায়াত খান : দ্য স্পাই প্রিন্সেস

2 thoughts on “নুর ইনায়াত খান : দ্য স্পাই প্রিন্সেস

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s