রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব)


ব্র্যাড হল্যান্ড (Brad Holland) এর একটি ইলাসট্রেশন

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন :  পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
পঞ্চম অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব)

ধর্মের শিকড়

Our innate dualism prepares us to believe in a ‘soul’ which inhabits the body rather than being integrally part of the body. Such a disembodied  spirit can easily be imagined to move on somewhere else after the death of the body. We can also easily imagine the  existence of a deity as pure spirit, not an emergent property of complex matter but existing independently of matter. (Richard Dawkins)

ধর্মবিশ্বাসী হবার জন্য মনস্তাত্ত্বিক পুর্বপ্রস্তুতি:

মনস্তাত্ত্বিক উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট এর ধারনাটি খুব স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠেছে গুরুত্বপুর্ণ ও ক্রমবর্ধমান বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে। বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেন যে, চোখ যেমন দেখার জন্য বিবর্তিত একটি অঙ্গ, ডানা যেমন উড়বার জন্য বিবর্তিত একটি অঙ্গ, আমাদের মস্তিষ্ক বা ব্রেইনও এ গুচ্ছ প্রতঙ্গ ( বা মডিউল) এর একটি সমষ্টি, যাদের মুল কাজ হচ্ছে বিশেষায়িত তথ্য ও উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ । সেখানে একটি মডিউল আছে, যা আত্মীয়তা বা কিনশীপের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে, একটি মডিউলের কাজ যেমন পারস্পরিক ‍আদান প্রদান (রেসিপ্রোকাল এক্সচেন্জ্ঞ),একটি মডিউলের কাজ সমবেদনা বা এমপ্যাথী নিয়ে এবং এভাবে আরো বেশ কিছু মডিউলের সমন্বয়। এবং ধর্মকে  ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, এধরনের একাধিক মডিউলের মিসফায়ারিং (বা যা করা তার মুল উদ্দেশ্য না) এর ‍উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট ফলাফল হিসাবে। যেমন, থিওরী অব আদার মাইন্ড ( বা মানসিক অবস্থা আরোপ করার ক্ষমতা, যেমন বিশ্বাস, উদ্দেশ্য, আকাঙ্খা, ভান করা বা জ্ঞান ই্ত্যাদি, নিজের উপর কিংবা অন্যদের – এবং বুঝতে পারার ক্ষমতা যে, অন্যদেরও বিশ্বাস, আকাঙ্খা কিংবা উদ্দেশ্য কারো নিজের থেকে ভিন্ন হতে পারে) তৈরীর মডিউল, কোয়ালিশন বা সহযোগী জোট তৈরী করার জন্য মডিউল,আগান্তুকদের তুলনায় একই গ্রুপের সদস্যদের সহযোগীতা করা পক্ষপাতমুলক আচরনের মডিউল; এর যে কোনোটি মথদের তারা কিংবা চাদের আলো ব্যবহার করে দিক নির্দেশনা দেবার মানবীয় একটি সংস্করণ হতে পারে, যার মিসফায়ারিং হবার স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, শৈশবের অতি বিশ্বাসপ্রবণতার ক্ষেত্রে আমি যেমন করে ব্যাখ্যা দিয়েছি। মনোবিজ্ঞানী পল ব্লুম, বাই প্রোডাক্ট হিসাবে ধর্মের উৎপত্তি সংক্রান্ত ধারনার আরো একজন প্রস্তাবক সেই বিষয়টিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা হলো, শিশুদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে ’মনের দ্বৈততা বা ডুয়ালিস্টিক’ তত্ত্বের জন্য। ধর্ম তার মতে, এই সহজাত দ্বৈততার একটি বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত। তার প্রস্তাব অনুযায়ী আমরা মানুষরা, বিশেষকরে শিশুরা, জন্মগতভাবেই দ্বৈতবাদী;

একজন দ্বৈতবাদী মন এবং বস্তুর মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য স্বীকার করে নেন. মোনিষ্ট বা একাত্মবাদীরা বিশ্বাস করেন মন হচ্ছে বস্তুর বা ম্যাটারের – মস্তিষ্কের কোন অংশ, বা হয়তো বা একটি কম্পিউটারের – একটি প্রকাশ,এবং বস্তু থেকে এর আলাদা কোন অস্তিত্ব নেই। দ্বৈতবাদী বা ডুলালিস্টরা বিশ্বাস করেন, মন হচ্ছে এক ধরনের শরীর বিচ্ছিন্ন কোন আত্মা যা শরীরের মধ্যে বসবাস করে এবং সুতরাং বোধগম্য কারনে এটি শরীরকে ত্যাগ করতে পারে এবং অন্য কোথাও থাকতে পারে। ডুয়ালিষ্টরা মানসিক অসুখকে খুব সহজে ব্যাখ্যা করে, ’অশুভ শয়তানের দ্বারা আচ্ছন্ন’ হওয়া একটি অবস্থা হিসাবে। এই শয়তানগুলো যেহেতু ’আত্মা’, শরীরে তাই তাদের অবস্থান সাময়িক, এবং সেকারনে তাদের শরীর থেকে ’বিতাড়িত’ করাও সম্ভব। দ্বৈতবাদীরা সুযোগ পেলেই প্রাণহীন যে কোন ভৌত বস্তুকে পারসোনিফাই বা মানবীয় কোন বৈশিষ্ট আরোপ করেন, তারা জলপ্রপাত কিংবা মেঘে আত্মা এবং দানবের উপস্থিতি দেখতে পান।

এফ আন্সটে র ১৮৮২ সালের উপন্যাস Vice Versa  যে কোন দ্বৈতবাদীর কাছেই অর্থবহ মনে হতে পারে,কিন্তু বিষয়টি আমার মত খাটি একাত্মবাদী বা মোনিষ্টদের কাছে অবোধ্য হওয়া উচিৎ। জনাব বাল্টিটুড এবং তার পুত্র রহস্যজনকভাবে লক্ষ্য করেন, তাদের শরীরের অদল বদল ঘটেছে। পুত্রের বিশেষ আনন্দ যেহেতু, বাবাকে পুত্রের শরীরে স্কুলে যেতে হচ্ছে এবং অন্যদিকে পুত্র বাবা শরীরের তার অপরিপক্ক সিদ্ধান্তের জন্য বাবার ব্যবসাকে প্রায় ধ্বংস হবার উপক্রম করে। পি জি উডহাউস Laughing Gas  এ প্রায় একই ধরনের একটি কাহিনীসুত্র ব্যবহার করেছিলেন, যেখানে হ্যাভারশটের আর্ল এবং একজন শিশু চলচ্চিত্র তারকা একই সাথে পাশাপাশি দাতের ডাক্তারের চেম্বারে অজ্ঞান করার ঔষধ পান এবং একে অপরের শরীরে তাদের ঘুম ভাঙ্গে; আবারো  এই গল্পের প্লট অর্থবহ হতে পারে শুধু দ্বৈতবাদীদের কাছে,লর্ড হ্যাভারশটের এমন কিছু আছে যা তার শরীরের অংশ নয়,নতুবা কি করে তিনি শিশু অভিনেতা শরীরে জেগে উঠতে পারেন।

বেশীর ভাগ বিজ্ঞানীদের মতই আমি ডুয়ালিষ্ট নই,কিন্তু তাসত্ত্বেও Vice Versa ও Laughing Gas এর মজা আমি সহজেই উপভোগ করতে পারি। এ বিষয়ে পল ব্লুম যা বলবেন তা হলো, যদিও আমি বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে মোনিষ্ট বা একাত্মবাদী হতে শিখেছি,আমি যেহেতু একজন মানুষ প্রানী সুতরাং সহজাতভাবে দ্বৈতবাদী বা ডুয়ালিষ্ট হিসাবে বিবর্তিত হয়েছি। আমার চোখের পেছনে একটা ‘আমি’ যে ঘাপটি মেরে বসে আছে এবং নিদেনপক্ষে যে কিনা অন্ততপক্ষে গল্পে আরেকজনের মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে- এই ধারনাটি আমার এবং অন্য যেকোন মানব মস্তিষ্কের অনেক গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে, একাত্মবাদ বা মোনিজম এর প্রতি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক যে অবস্থানই থাকুক না কেন;ব্লুম তার এই দাবীর স্বপক্ষে বেশ কিছু পরীক্ষামুলক প্রমানও প্রস্তাব করেন,তিনি দেখান যে, শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় আরো বেশী দ্বৈতবাদী,বিশেষ করে খুবই অল্প বয়সের শিশুরা। এটাই ইঙ্গিত করে যে দ্বৈতবাদ বা ডুয়ালিজমের একটি প্রবণতা আছে আমাদের মস্তিষ্কের অন্তর্গত একটি সহজাত প্রক্রিয়া হিসাবে তার পুর্বাপস্থিতি বজায় রাখা এবং ব্লুমের মতে যা আমাদের ধর্মীয় ধারনাকে সাদরে গ্রহন করার জন্য স্বাভাবিক একটি পরিস্থিতি ও প্রাকপ্রস্তুতিমুলক অবস্থা সৃষ্টি করেই রাখে।

ব্লুম আরো প্রস্তাব করেন যে,জন্মগতভাবেই আমাদের সৃষ্টিবাদী হবার প্রবণতা থাকে। প্রাকৃতিক নির্বাচন ইনটুইটিভ বা সহজাতভাবেই অর্থবহ হয়না আমাদের কাছে; শিশুরা, বিশেষ করে সবকিছুর উপরে কারন বা উদ্দেশ্য আরোপ করে, যা  মনোবিজ্ঞানী ডেবোরাহ কেলেমান তার প্রবন্ধ ‘Are children intuitive theists?’ এ আমাদের জানিয়েছেন; ’বৃষ্টির’ জন্য মেঘ,পাথরের সুচালো কোনা থাকে কারন ‘কোন জন্তুর যখন গা চুলকায় তারা সেখানে গা ঘষে চুলকিয়ে নিতে পারে’; সবকিছুর পেছনের কোন উদ্দেশ্য আরোপ করাকে বলে টেলিওলজী বা পুর্বকারনবাদ। শিশুরা জন্মগতভাবেই টেলিওলজিষ্ট এবং অনেকেই এর থেকে আর বের হতে পারেনা;

এই জন্মগত ডুয়ালিজম এবং টেলিওলজী,উপযুক্ত শর্তাবলীর উপস্থিতিতে আমাদের ধর্মে প্রতি আকৃষ্ট হবার প্রবনতা সৃষ্টি করে,ঠিক যেমন করে আমার ইতিপুর্বে উদহারন দেয় মথদের আলো-কম্পাসের প্রতি প্রতিক্রিয়া যেমন তাদের ভুল অনিচ্ছাকৃত তথাকথিত ’আত্মহত্যা’র প্রবণতা বৃদ্ধি করে। আমাদের সহজাত দ্বৈতবাদ আমাদেরকে ’আত্মা’র ধারনায় বিশ্বাস করতে প্রস্তুত করে,যা শরীরের প্রত্যক্ষ অংশ হবার বদলে আমাদের ভিতরে বসবাস করে।এই ধরনের শরীর বিচ্ছিন্ন আত্মাকে নিয়ে খুব সহজেই কিন্তু ভাবা যায়,আমাদের মৃত্যুর পর এটি অন্য কোথায় চলে যায়; এছাড়া কোন জটিল কোন বস্তুর বিকশিত কোন বৈশিষ্ট হিসাবে না বরং বন্তু থেকে স্বাধীন হিসাবে আমরা খুব সহজে ’বিশুদ্ধ আত্মা‘ হিসাবে ঈশ্বরকে বা দেবদেবীদের কল্পনা করতে পারি এবং আরো স্পষ্টভাবে,শিশুসুলভ টেলিওলজী ধর্মের জন্য আমাদের প্রস্তুত করে। যদি সবকিছুরই কোন কারণ বা উদ্দেশ্য থাকে,তাহলে সেগুলো কার উদ্দেশ্য? অবশ্যই ঈশ্বরের।

কিন্তু মথদের আলোক কম্পাসের যে ’উপযোগিতা’ এখানে তার সমতুল্য কি? তাহলে প্রাকৃতিক নির্বাচন কেন দ্বৈতবাদ এবং পুর্বকারনবাদকে সহায়তা করেছে আমাদের পুর্বপুরুষ ও তাদের সন্তানদের মস্তিষ্কে? আপাতত,‘জন্মগত ডুয়ালিষ্ট’ তত্ত্ব সম্বন্ধে আমার ব্যাখ্যা প্রস্তাব করছে যে,মানুষ হচ্ছে জন্মগত ভাবেই ডুয়ালিষ্ট এবং টেলিওলজিষ্ট,কিন্তু এর ডারউইনীয় সুবিধাটি কি হতে পারে? আমাদের চারপাশের জগতে উপস্থিত নানা এনটিটি বা সত্ত্বার আচরণ সম্বন্ধে পুর্ব ধারনা আমাদের বেচে থাকার জন্য গুরুত্বপুর্ণ এবং আমরা প্রত্যাশা হয়তো করতে পারি যে প্রাকৃতিক নির্বাচন আমাদের মস্তিষ্কের গঠনটাকে এই কাজটি দ্রুত ও দক্ষতার সাথে করার উপযোগী করে গড়ে তুলেছে। ডুয়ালিজম আর টেলিওলজী কি আমাদের এই ক্ষমতায় কোন সহায়তা করে? এই হাইপোথিসিসটাকে আমরা হয়তো ভালো বুঝতে পারি দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেট যাকে বলেছেন intentional stance বা উদ্দেশ্যমুলক দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে।

ডেনেট স্ট্যান্স (Stance) বা দৃষ্টিভঙ্গীর ত্রিমুখী শ্রেনীবিভাগের একটি বোধগম্য প্রস্তাব করেছেন,যে স্ট্যান্স আমরা অবলম্বন করি বুঝবার চেষ্টা করার জন্য এবং সেকারনেই নানা সত্ত্বার আচরণ সম্বন্ধে পুর্বধারনা করতে পারি,যেমন কোন প্রানী বা যন্ত্র বা একে অন্যেরে।এই স্ট্যান্সগুলো হচ্ছে,ভৌতিক বা ফিজিক্যাল স্ট্যান্স,ডিজাইন স্ট্যান্স এবং ইনটেশনাল স্ট্যান্স। ভৌতিক বা ’ফিজিক্যাল স্ট্যান্স’ সবসময় নীতি মেনে কাজ করে,কারন সবকিছুই পদার্থবিদ্যার সুত্র মেনে চলে। কিন্তু ফিজিকাল স্ট্যান্স ব্যবহার করে কোন কিছুর ব্যাখ্যা করার পক্রিয়া বেশ মন্থর গতির হতে পারে; যতক্ষনে আমরা কোন একটি জটিল বস্তুর নানা চলমান অংশগুলোর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াগুলো হিসাব নিকেশ শেষ করবো, ততক্ষনে  এর আচরণ সংক্রান্ত কোন পুর্বধারনা সম্ভবত আমাদের জন্য বেশ দেরী হয়ে যাবে। কোন একটি বস্তু যা আসলেই ডিজাইন করা হয়েছে,যেমন ওয়াশিং মেশিন বা একটি ক্রশবো,ডিজাইন স্ট্যান্স একটি মিতব্যায়ী শর্টকার্ট হতে পারে; আমরা পদার্থবিদ্যার ব্যাখ্যা একপাশে সরিয়ে রেখে কিন্তু অনুমান করতে পারে বস্তুটির আচরন কি হতে পারে,সরাসরি এর ডিজাইন বা পরিকল্পনার দিকে নজর দিয়ে। যেমন ডেনেট বলেছেন,

এর বাইরের দিকটাকে একটু ভালো করে পর্যবেক্ষন করলেই প্রায় যে কোন কেউ ভবিষ্যদ্বানী করতে পারে একটি অ্যালার্ম ঘড়ি কখন শব্দ করবে; এটা কি স্প্রিং প্যাচানে,নাকি ব্যাটারী চালিত,নাকি সুর্যালোক,তামার চাকা নাকি রত্নের বিয়ারিং বা সিলিকন চিপস এ বিষয় নিয়ে কারো এত মাথাব্যাথা নেই – শুধু ধারনা করে নেয়া যায়,এমনভাবে এটি ডিজাইন করা যে  ঠিক তখনই অ্যালার্মের শব্দ বাজবে ঠিক যখন বাজবার জন্য এটি সেট করা হয়েছে।

জীবিত প্রানীরা ডিজাইন বা পরিকল্পিত নয়,কিন্তু ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচন ডিজাইন দৃষ্টিভঙ্গীর একটি সংস্করণকে এখানে অনুমতি দেয় তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য;  এভাবেই আমরা আমাদের হৃৎপিন্ডকে বোঝার জন্য একটি শর্টকাট পাই,যদি আমরা ধরে নেই এটি ডিজাইন করা হয়েছে রক্তকে পাম্প করার জন্য। কার্ল ভন ফ্রিশ মৌমাছিদের কালার ভিশন নিয়ে একটি গবেষনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন (বিশেষ করে যখন মুলত সবার ধারনা ছিল মৌমাছিরা রঙ দেখতে পারেনা বা তারা কালার ব্লাইন্ড)কারন তিনি ধারনা করেছিলে ফুলদের উজ্জ্বল রং আসলে ’পরিকল্পিত’ হয়েছে মৌমাছিদের আকর্ষন করার জন্য। পরিকল্পিত বা ডিজাইন শব্দটিকে উদ্ধৃতির চিহ্ন দিয়ে আবদ্ধ করার উদ্দেশ্য মিথ্যাচারী সৃষ্টিবাদীদের খানিকটা ভয় দেখিয়ে দুরে সরিয়ে দেবার জন্য,নয়তো তারা হয়তো দাবী করে বসবেন বিখ্যাত অষ্ট্রিয় প্রাণীবিজ্ঞানী তাদের মতই একজন সৃষ্টিবাদী ছিলেন। বলাবাহুল্য তিনি পুরোপুরি দক্ষ ছিলেন ডিজাইন দৃষ্টিভঙ্গীটাকে সঠিক ডারউইনীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করার জন্য।

ইনটেশনাল স্ট্যান্স (উদ্দেশ্যমুলক দৃষ্টিভঙ্গী) হচ্ছে আরেকটি শর্টকাট এবং এটি ডিজাইন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আরো একধাপ উপরে:কোন এনটিটি বা সত্ত্বাকে ধরে নেয়া হয় শুধু বিশেষ কোন উদ্দেশ্যেই তাদের ডিজাইনই শুধু করা হয়নি,উপরন্তু এরা হচ্ছে ’এজেন্ট’ বা কোনে ’এজেন্ট’ ধারন করে,তাদের সব কর্ম উদ্দেশ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করার লক্ষ্যে। আপনি যখন কোন বাঘকে দেখেন,আপনার তখন দেরী করা উচিৎ হবে না তার সম্ভাব্য আচরণ সম্বন্ধে অনুমান করতে।  এর অনুপরমানুর পদার্থবিদ্যা নিয়ে বা এর পা,নোখ,দাতের আকৃতির ডিজাইন সম্বন্ধে তখন আর কোন চিন্তার অবকাশ নেই;বাঘ আপনাকে খেতে চাইছে,এবং এটি তার পা,নোখ এবং দাত অত্যন্ত দক্ষতা আর সাবলীলতার সাথে ব্যবহার করতে পারে তার সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে;সবচে দ্রুত এর সম্ভাব্য আচরণ অনুমান করার একমাত্র উপায় হল, পদার্থবিদ্যা আর শরীরবৃত্তীয় কোন ভুল সরাসরি এর উদ্দেশ্য বা ইনটেনশন সম্বন্ধে ধারন করে নেয়া; লক্ষ্য করতে হবে,ডিজাইন দৃষ্টিভঙ্গী ডিজাইন করা এমন কিছুর ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য তেমনি কাজে লাগানো যায় ডিজাইন করা নয় এমন কিছুর ক্ষেত্রেও সুতরাং এই উদ্দেশ্যমুলক দৃষ্টিভঙ্গীও সেভাবে কাজ করে,যাদের কোন সুনির্দিষ্ট সচেতন কোন উদ্দেশ্য নেই সেই সব জিনিসের ক্ষেত্রেও, যাদের তা আছে তাদের ক্ষেত্রে যেমন কাজ করে;

আমার মনে হয় এটা খুবই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে, যে বেচে থাকার জন্য এই ইনটেনশনাল বা উদ্দেশ্যমুলক ‍দৃষ্টিভঙ্গীর একটা গুরুত্ব আছে, যা একটি ব্রেন মেকানিজম হিসাবে সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়াটি দ্রুততর করে যে কোন বিপজ্জনক এবং গুরুত্বপুর্ণ সামাজিক পরিস্থিতিতে। সহজেই কিন্তু স্পষ্ট হয়না যে দ্বৈতবাদী উদ্দেশ্যমুলক ‍দৃষ্টিভঙ্গীর এরই একট অপরিহার্য অনুসঙ্গ। আমি ব্যাপারটা এখানে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করত যাবো না, কিন্তু আমি মনে করি কোন এক ধরনের ’থিওরী অব আদার মাইন্ড’ সংক্রান্ত একটি কেস এখানে গড়ে তোলা যেতে পারে ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে, যাকে অনায়াসে বর্ণনা করা যেতে পারে ডুয়ালিস্টিক বা দ্বৈতবাদী, যা ইনটেনশনাল স্ট্যান্সের বা উদ্দেশ্যমুলক ‍দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তি গড়তে পারে -বিশেষ করে জটিল কোন সামাজিক পরিস্থিতিতে,এমন কি বিশেষকরে যেখানে আরো উচু পর্যায়ের ইনটেনশনালাটির বা উদ্দেশ্যময়তার ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়।

ডেনেট তৃতীয় মাত্রার ইনটেনশনালটি ( থার্ড অর্ডার ইনটেনশনালটি) বা উদ্দেশ্যমুলকতার (পুরুষটি বিশ্বাস করে যে, নারীটি জানে সে তাকে কামনা করছে); চতুর্থ মাত্রার বা ফোর্থ অর্ডার(নারীটি বুঝতে পারছেন যে,পুরুষটি বিশ্বাস করে নারীটি জানে সে তাকে কামনা করে); এমনকি পঞ্চম মাত্রার উদ্দেশ্যমুলকতারও (শামান অনুমান করছেন যে নারীটি বুঝতে পেরেছে,পুরুষটি বিশ্বাস করে যে নারীটি জানে সে তাকে কামনা করছে)কথা উল্লেখ করেছেন; খুব বেশী মাত্রার ইনটেনশনালিটি সম্ভবত সীমাবদ্ধ কল্পকাহিনীতে, মাইকেল ফ্রায়ান তার অত্যন্ত্য কৌতুকপ্রদ উপন্যাস The Tin Man এ যেমন শ্লেষাত্মক ভাষায় লিখেছিলেন,’নুনোপুলোস কে দেখে,রিক জানতো যে সে প্রায় নিশ্চিৎ যে, অ্যানা তীব্র ঘৃণা অনুভব করেছিল ফিডলিংচাইল্ড এর তার অনুভুতিগুলো বুঝতে না পারার ব্যর্থতার প্রতি এবং সে (অ্যানা) জানতো যে, নীনা আগে থেকেই জানতো যে সে (অ্যানা) জানে নুনোপুলোস এর এ বিষয়ে ধারনা …; ’ কিন্তু ফ্যাক্টটি হলো, আমরা এই অন্য কারো মন সম্বন্ধে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে একরম জটিল প্যাচ দেখে যে হাসতে পারছি সম্ভবত এটি আমাদের গুরুত্বপুর্ণ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেমন আমাদের মন কেমন করে বাস্তব জগতে কাজ করার জন্য প্রাকৃতিকভাবে নির্বাচিত হয়েছে;

নিদেনপক্ষে  কম মাত্রায় ইনটেনশনাল স্ট্যান্স,ডিজাইন স্ট্যান্স এর মত সময় বাচায়,যা বাচার জন্য অত্যন্ত্ গুরুত্বপুর্ণ হতে পারে। ফলাফলে  প্রাকৃতিক নির্বাচন শর্টকাট হিসাবে ইনটেনশনাল স্ট্যান্সকে ব্যবহার করার উপযোগি করে আমাদের মস্তিষ্ককে গড়ে তুলেছে; আমরা জৈববৈজ্ঞানিকভাবেই প্রোগ্রাম করা, যে কোন সত্ত্বা উপর উদ্দেশ্য আরোপ করা যাদের আচরণ আমাদের কাছে গুরুত্বপুর্ণ। আরো একবার,পল ব্লুম শিশুদের মধ্যে এর পরীক্ষামুলক প্রমান উল্লেখ করে বলেছেন, যে শিশুরা বিশেষভাবে ইনটেনশনাল স্ট্যান্সটিকেই বেছে নেয়। যখন ছোট শিশুরা কোন বস্তু দেখে অপর একটি বস্তুকে অনুসরণ করছে(যেমন কোন কম্পিউটার স্ক্রিন),তারা ধরে নেয় সক্রিয় ভাবে একটি আরেকটির পিছু নিচ্ছে, আর এই অনুগমন একটি উদ্দেশ্য সহ এজেন্ট এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তারা সত্যিকারের বিস্ময় প্রকাশ করে যখন কাল্পনিক সেই এজেন্টটি ব্যার্থ হয় তার এই ধাওয়া করে ধরার প্রচেষ্টায়।

ডিজাইন স্ট্যান্স ও ইনটেনশনাল স্ট্যান্স খুব উপকারী দুটি ব্রেন মেকানিজম, কোন সত্ত্বা সম্বন্ধের ধারনার প্রক্রিয়াটিকে এরা দ্রুত করে,যা সার্ভাইভাল বা বাচার জন্য বিশেষ গুরুত্বপুর্ণ, যেমন আক্রমন করতে পারে  এমন শিকারী প্রানী বা সম্ভাব্য প্রজনন সঙ্গী। কিন্তু অন্য ব্রেন মেকানিজমের মত এই স্ট্যান্সগুলো ভুল করতে পারে। শিশুরা ও আদি মানুষরা আবহাওয়ার,ঢেউ,স্রোত,গড়িয়ে পড়া পাথরের উপর উদ্দেশ্য আরোপ করে আমাদের সবারই যন্ত্রের সাথে সেই একই কাজ করার প্রবণতা আছে,বিশেষ করে যখন তারা ঠিক মত কাজ না করে আমাদের হতাশ করে। অনেকেই হয়তো খানিকটা ভালোলাগার সাথে মনে রাখতে পারেন, যেদিন বাসিল ফল্টির  ( বৃটিশ টেলিভিশন কমেডি The Faulty Towers এ) গাড়ী নষ্ট হয়ে গিয়েছিল বিশেষ একটি রাতের ভোজসভার আয়োজন বাচানোর প্রচেষ্টায় নেয়া গুরুত্বপুর্ণ একটি মিশনের সময়  তার গাড়ী হঠাৎ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তিনি গাড়ীটিকে প্রথমে সাবধার বাণী শোনান,তিন পর্যন্ত গণনা করেন,এরপর গাড়ী থেকে বের হয়ে একটা গাছের ডাল যোগাড় করেন,সমানে গাড়ীটিকে পেটাতে থাকেন যেন প্রায় মেরে ফেলবার অভিপ্রায়ে; আমাদের অনেকের জীবনে এই পরিস্থিতি হয়েছে,ক্ষনকালের জন্য হলেও,সে অভিজ্ঞতা গাড়ী নিয়ে না হলে হয়তো কম্পিউটার নিয়ে। জাস্টিন ব্যারেট একটি সংক্ষিপ্ত রুপ প্রস্তাব করেছিলেন, hyperactive agent detection device এর জন্য, HADD; আমরা অতিসক্রিয় হয়ে কোন এজেন্টকে খুজে বের করি,যখন সেখানে কোন এজেন্টরই অস্তিত্ব আসলে নেই এবং এটাই আমাদের সন্দেহ প্রবণ করে তোলে এমন কোথাও খারাপ বা ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে,যেখানে আসলে প্রকৃতি শুধুমাত্র নির্বিকার। আমি আমাকে ক্ষনিকের জন্য হলেও লক্ষ্য করেছি মনে তীব্র বুনো বিতৃষ্ণা পোষন করতে, কোন নির্দোষ প্রানহীন বস্তুর প্রতি, যেমন আমার সাইকেলের চেইন; একটি দুঃখজনক সাম্প্রতিক ঘটনা জানাচ্ছে, এক ব্যক্তি তার ঠিকমত বাধা ‍না থাকা জুতোর ফিতায় জড়িয়ে সিড়ি বেয়ে নীচে গড়িয়ে পড়েছিলেন, কেমব্রিজের ফিট্জউইলিয়াম মিউজিয়ামে,এই নীচে গড়িয়ে পড়ার সময় তিনি দুর্লভ এবং অমুল্য একটি কিং (Quing)ডায়ন্যাষ্টির সময়কালের একটি ভাসের উপর এসে পড়েন, যা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে যায়। মিউজিয়াম কর্মচারী সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান ব্যাক্তিটি সেই ভেঙ্গে যাওয়া ভাসটির অজস্র টুকরোর ঠিক মাঝখানে বসে আছেন হতবাক হয়ে, যেন তীব্র শকে তারা বাকরুদ্ধ হয়ে চারদিকে সবাই যখন গভীর নীরবতায় চুপ করে আছেন,ব্যক্তিটি বার বার তার জুতার ফিতার দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলছিল,‘এই যে, এটাই আসল অপরাধী’।

ধর্মের অন্য বাই-প্রোডাক্ট ব্যাখ্যাগুলো প্রস্তাব করেছিলেন হিন্দ (Hinde),শেরমার (Shermer), বয়ের (Boyer), ডেনেট (Dennett), আটরান (Atran), ব্লুম (Bloom), কেলেম্যান (Keleman) সহ অনেকে। একটি বিশেষ কৌতুহলোদ্দীপক সম্ভবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন ডেনেট, ধর্মের অযৌক্তিকতা হচ্ছে আমাদের ব্রেইনের একটি নির্দিষ্ট ইনবিল্ট বা অন্তর্গত অযৌক্তিকতারই একটি বাই-প্রোডাক্ট বা উপজাত:সেটি হচ্ছে আমাদের প্রেমে পড়ার প্রবণতা,যার সম্ভবত জীনগত কিছু সুবিধা আছে;

নৃতত্ত্ববিদ হেলেন ফিশার,তার Why We Love এ রোমান্টিক ভালোবাসার উন্মত্ত পাগলামোটাকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছিলেন এবং কিভাবে একে অতি মাত্রায় তুলনা করা হয় এমন কিছুর সাথে, যা মনে হতে পারে অবশ্যই প্রয়োজনীয়। বিষয়টি এভাবে লক্ষ্য করুন: কোন পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গীতে তার পরিচিতদের মধ্যে শুধু মাত্র একজন নারী অন্যান্য নিকটতম প্রতিদ্বন্দী অপেক্ষা শতগুন বেশী ভালোবাসার যোগ্য হবার সম্ভাবনা কিন্তু খুবই কম। কিন্তু তারপরেও  পুরুষটি এভাবেই তার ভালোবাসার পাত্রীকে বর্ণনা করে থাকে যখন সে তার ‘প্রেমে’ পড়ে। এই উন্মত্ত গোড়া একগামী আনুগত্যর প্রবণতা যার শিকার হবার সম্ভাবনা আমাদের সবারই,তার তুলনা কিন্তু একধরনের পলিআমোরী বা বহুপ্রেম এর চেয়ে বেশী যৌক্তিক মনে হতে পারে (পলিঅ্যামোরী,হচ্ছে সেই বিশ্বাস, যে কেউ একই সাথে বীপরিত লিঙ্গর কয়েকজন সদস্যকে ভালোবাসতে পারে,ঠিক যেমন করে কেউ একাধিক মদ,সুরকার,বই কিংবা খেলা ভালোবাসতে পারে);আমরা আনন্দের সাথে মেনে নেই যে,আমরা একাধিক শিশু,পিতামাতা,ভাইবোন,শিক্ষক,বন্ধু কিংবা পোষা প্রানীদের ভালোবাসতে পারি;আপনি যখন বিষয়টা এভাবে ভাবেন,তখন এই স্পাউজাল বা স্বামী স্ত্রী বা সঙ্গী,সঙ্গীনির ভালোবাসার মধ্যে আমরা যে একচেটিয়া অধিকার দাবী করি সেটা কি অবশ্যই বেশ অদ্ভুত মনে হয় না ? তারপরও আমরা ঠিক ‘সেটাই’ প্রত্যাশা করি এবং সেটা অর্জন করার জন্য জন্যই আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে; নিশ্চয়ই কোন একটি কারণ আছে এর পেছনে।

হেলেন ফিশার এবং অন্যান্যরা আমাদের দেখিয়েছেন যে, ভালোবাসায় আপ্লুত থাকার সাথে সংশ্লিষ্ট আমাদের মস্তিষ্কের অন্যন্য কিছু পরিস্থিতি,যেমন কিছু স্নায়বিক প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্য (যাদের আসলে প্রাকৃতিক মাদক দ্রব্য) যারা এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট এবং বৈশিষ্টপুর্ণ। বিবর্তনী মনোবিজ্ঞানীরা একমত তার (ফিশার) সাথে,এই অযৌক্তিক বজ্রাঘাত (Coup de foudre) হতে পারে অপর সহ-মাতা বা সহ-পিতার প্রতি আনুগত্যকে নিশ্চিৎ করার একটি প্রক্রিয়া,যা যথেষ্ট দীর্ঘ হয় যেন তারা একসাথে একটি সন্তানের প্রতিপালন করতে পারেন। ডারউইনীয় দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখলে,কোন সন্দেহ নেই,একজন ভালো জীবন সঙ্গী বা সঙ্গীনি নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপুর্ণ,নানাবিধ কারনে। কিন্তু একবার নির্বাচন করে ফেলার পর- এমনকি সেটা খারাপ হোক- এবং একটি সন্তান ধারন করার পর,যে কোন পরিস্থিতিতে  একে অপরের সাথে থাকাটা আরো বেশী প্রয়োজনীয়,কমপক্ষে শিশুটি যতদিন মায়ের বুকের দুধ না ছাড়ে।

অযৌক্তিক ধর্ম বিশ্বাস কি সেই অযৌক্তিকতা মেকানিজমের একটি বাই-প্রোডাক্ট, যা প্রাকৃতিক নির্বাচন মুলত আমাদের ব্রেইনের একটি অন্তর্গত প্রক্রিয়া হিসাবে সৃষ্টি করেছে প্রেমে পড়ার জন্য? নিশ্চয়ই, ধর্মীয় বিশ্বাস এর বেশ কিছু বৈশিষ্ট আছে যা প্রেমের পড়ার মতই(দুই অবস্থারই অনেকগুলো বৈশিষ্ট মনে হতে পারে মাদকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে থাকার মতই); নিউরোসাইক্রিয়াটিষ্ট জন স্মিথিস আমাদের সতর্ক করেছেন যে,ব্রেনের যে এলাকাগুলো এই দুই ম্যানিয়া বা উন্মত্ততায় সক্রিয় হয় তার মধ্যে স্পষ্ট কিছু তারতম্য আছে,তবে তাসত্ত্বেও বেশ কিছু মিলও আছে তাদের মধ্যে:

ধর্মের বহু রুপের একটি রুপ হচ্ছে, একটি অকিপ্রাকৃত সত্ত্বার প্রতি নিবেদিত তীব্র ভালোবাসা,যেমন, ঈশ্বর; এছাড়া এই সত্ত্বার নানা আইকন বা নিদর্শনের প্রতি তীব্র শ্রদ্ধা।মানুষের জীবন প্রধানত পরিচালিত হয় আমাদের স্বার্থপর জীনগুলো এবং রিইনফোর্সমেন্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে; ইতিবাচক বা পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট এর অনেকটাই আসে ধর্ম থেকে:ভালোবাসা পাবার সেই উষ্ণ এবং স্বস্তি জাগানো অনুভুতি এবং বিপদজ্জনক এই পৃথিবী থেকে সুরক্ষিত বোধ করার সেই অনুভুতি,মৃত্যুভয়কে হারানো, খারাপ সময়ে সেই পাহাড়ের চুড়া (I will lift up my eyes to the hills, from where comes my help: Psalm 121:1) থেকে প্রার্থনার উত্তরে আসা সহযোহিতা ইত্যাদি। ঠিক সেভাবেই বাস্তবে উপস্থিত সত্যিকার কোন মানুষের প্রতি (সাধারনত অন্য ‍লিঙ্গের) রোমান্টিক ভালোবাসা সেই একই গভীর মনোসংযোগের উপস্থিতি নিদর্শন বহন করে এবং এটাও পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্টর সাথে যুক্ত। এই অনুভুতি গুলো সুচনা করতে পারে অন্যজনের কোন নির্দশন এর দেখার মাধ্যমে,যেমন,চিঠি,ফটোগ্রাফ,আর সেই ভিক্টোরিয়ার যুগে এক গোছা চুল,ভালোবাসায় নিমজ্জিত হয়ে থাকার সেই অবস্থায় অনেক শরীরবৃত্তীয় অনুসঙ্গ আছে,যেমন,ফার্নেসের মত দীর্ঘশ্বাস ফেলা;

১৯৯৩ সালে আমি ভালোবাসায় নিমজ্জিত হওয়া এবং ধর্মের মধ্যে তুলনামুলক একটি আলোচনা করেছিলাম,যেখানে আমি উল্লেখ করেছিলাম,খুব বিস্ময়করভাবে ধর্ম দ্বারা সংক্রমিত হওয়া কোন ব্যক্তির উপসর্গগুলো,সাধারনত যৌন ভালোবাসার সাথে সংশ্লিষ্ট উপসর্গগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। আমাদের ব্রেনে এটি অত্যন্ত জোরালো একটি শক্তি এবং আদৌ বিস্ময়কর কোন ব্যাপার না যে কিছু ’ভাইরাস’ বিবর্তিত হতেই পারে এটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারার ক্ষমতা অর্জন করার ক্ষেত্রে (’ভাইরাস‘ এখানে ধর্মের রুপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে:আমার সেই নিবন্ধের নাম ছিল ‘Viruses of the mind’);St Teresa of Avila  র সেই তীব্র যৌনসুখানুভুতি বা অর্গাজম এর মত বিখ্যাত ভিশন তো যথেষ্ট কুখ্যাত এখানে পুনরায় উল্লেখ করার জন্য। তবে আরো গুরুত্বের সাথে এবং আরো খানিকটা কম স্থুল ইন্দ্রিয়পরায়নতার পর্যায়ে,দার্শনিক অ্যান্থনী কেনী চমৎকার কিছু সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করেছেন যে কি বিশুদ্ধ তীব্র আনন্দ অপেক্ষা করছে তাদের জন্য,যারা ট্রান্সসাবস্টানশিয়েশন ( রোমান ক্যাথলিক ধর্মমতে ট্রান্সসাবস্টানশিয়েশন হচ্ছে একটি মতবাদ যা প্রস্তাব করছে, ইউক্যারিষ্ট এর সময় বা হলি কমিউনিয়ন এর সময়, গমের রুটি এবং আঙ্গুরের রসের মদ রুপান্তরিত হয় যীশু খৃষ্টের শরীর এবং রক্তে) এর রহস্যটিতে কোনভাবে তাদের বিশ্বাস স্থাপন করতে পারবেন;রোমান ক্যাথলিক যাজক হিসাবে তার দীক্ষা নেবার এবং মাস অনুষ্ঠান পরিচালনা করার তাকে বিশেষ ক্ষমতায়ন করেছিলো কিভাবে তা ব্যাখ্যা করে তিনি বেশ জীবন্ত ভাবে তার স্মৃতিচারন করেন:

প্রথম মাসগুলোর সেই তীব্র আনন্দের কথা যখন আমার ক্ষমতা ছিল মাস পরিচালনা করার;সাধারনত দেরী করে ধীরে সুস্থ্যে উঠতে অভ্যস্ত আমি সকালে প্রায় লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠতাম,পুরোপুরি সজাগ এবং তীব্র উত্তেজনা অনুভব করতাম,যে গুরুত্বপুর্ণ কাজটি করার জন্য সুযোগ আমি পেয়েছি সেটা চিন্তা করে। খৃষ্টের শরীর স্পর্শ করার সুযোগ, যীশুর যাজকদের কাছাকাছি আসার সুযোগ,আমাকে ভীষন আন্দোলিত করতো। আমি হোস্ট এর দিকে তাকাতাম, কনসেক্রেশন এর শব্দগুলো উচ্চারন করার পর,শান্ত দৃষ্টি মেলে যেমন করে কোন কোন প্রেমিক বা প্রেমিকা তাদের ভালোবাসার মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকে ….. সেই যাজক জীবনের শুরুর দিনগুলো আমার স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়েছে পুর্ণতৃপ্তি আর তীব্র সুখের দিন হিসাবে, যা অমুল্য এবং দীর্ঘস্থায়ী হবার নয় এমন ভঙ্গুরও, যেমন কোন রোমান্টিক ভালোবাসা যার সমাপ্তি ঘটে কোন অসামন্জষ্যপুর্ণ বিবাহের বাস্তবতায়।

মথদের আলো-কম্পাসের প্রতিক্রিয়ার সমতুল্য হচ্ছে আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক তবে একজন এবং শুধু মাত্র বীপরিত লিঙ্গের একজন মাত্র সদস্যর সাথে প্রেমে পড়ার উপযোগী কার্যকর আচরণটি। মিস ফায়ারিং বা ভুল প্রতিক্রিয়ার উপজাত যেমন মোমবাতির আগুনে ‍উড়ে আত্মাহুতি দেবার সমতুল্য – হচ্ছে ইয়াওয়ের বা ‌ঈশ্বরের প্রেমে পড়া (বা কুমারী মেরী বা আল্লাহ) এবং এধরনের ভালোবাসা দ্বারা তাড়িত হয়ে অযৌক্তিক আচরন করা;

জীববিজ্ঞানী লুইস ওলপার্ট,তার Six Impossible Things Before Breakfast এ একটি প্রস্তাব করেছিলেন যা গঠনমুলক অযৌক্তিকতার ধারনাটির একটি সাধারনীকরণ রুপ হিসাবে দেখা যেতে পারে। তার বক্তব্য ছিল অযৌক্তিকভাবে ধারন করা কোন দৃঢ় বিশ্বাস মনের প্রায়শ দ্রুত পরিবর্তনশীলতার বিরুদ্ধে রক্ষা করে: যদি যে বিশ্বাসগুলো জীবন বাচিয়েছিল তাদের দৃঢ়ভাবে ধারন করা না হত,সেটা আদি মানুষের বিবর্তনের জন্য সুবিধাজনক হতো না। বরং খুবই অসুবিধার কারন হতো সেটি,যেমন, শিকার করার সময় বা টুল বা হাতিয়ার তৈরীর সময়,দ্রুত মন পরিবর্তন করা। ওলপার্টের যুক্তির একটি  অর্থ হলো নিদেনপক্ষে কোন কোন পরিস্থিতিতে,দোদুল্যমান অনিশ্চয়তায় না বরং অযৌক্তিক বিশ্বাসে অটল থাকা শ্রেয়,এমনকি যখন নতুন প্রমান বা যুক্তি পরিবর্তনের স্বপক্ষে অবস্থান করে। খুবই সহজ কিন্তু প্রেমে পড়ার যুক্তিটি একটি বিশেষ কেস হিসাবেদেখা এবং একই ভাবে খুব সহজ এটি দেখা যে ওলপার্টের এই ’অযৌক্তিক স্থিতিশীলতা’ আরো একটি উপযোগী মানসিক প্রবণতা যা অযৌক্তিক ধর্মীয় আচরনের গুরুত্বপুর্ণ কিছু বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারে:আরো একটি উপজাত বা বাইপ্রোডাক্ট।

রবার্ট ট্রিভারস তার Social Evolution বইটিতে ১৯৭৬ সালের আত্ম প্রবঞ্চনার বিবর্তনীয় তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করেন বিস্তারিতভাবে:

আত্ম প্রবঞ্চনা হলো সচেতন মন থেকে সত্যকে লুকিয়ে রাখা, যেন সেটি অন্যদের কাছ থেকেও লুকিয়ে রাখা যায় উত্তমভাবে। আমাদের প্রজাতিতে আমরা সেটা শনাক্ত করতে পারি, দৃষ্টি এড়ানোর প্রচেষ্টা, ঘেমে ওঠা হাতের তালু এবং ফেটে যাওয়া গলার আওয়াজ হয়তো সেই ছলনা করার সচেতন জ্ঞান থেকে উদ্ভুত চাপের বহিঃপ্রকাশ। এই ছলনার ব্যপারটিকে সচেতন স্তরে উপেক্ষা করার মাধ্যমে, ছলনাকারী এই সব চিহ্ন একজন পর্যবেক্ষককারীর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে পারে; সেই ব্যক্তিটি অনায়াসে মিথ্যা কথা বলতে পারে ছলনার সংশ্লিষ্ট উত্তেজনা, অস্থিরতা ছাড়াই।

নৃতত্ত্ববিদ লায়োনেল টাইগার এধরনের কিছু কথা বলেছেন তার Optimism: The Biology of Hope বইটিতে। গঠনমুলক অযৌক্তিকতা যা আমরা আলোচনা করছিলাম সেটা দেখা যাবে ট্রিভার্স এর ‘ উপলদ্ধিগত প্রতিরক্ষা’ বিষয়ক একটি অনুচ্ছেদে:

মানুষের একটি প্রবণতা আছে, সচেতনভাবে তারা যা চায় তা দেখতে পারে। নেতিবাচক কোন কিছু দেখতে তাদের আক্ষরিক অর্থেই কষ্ট হয় যেমন ঠিক ততটাই সহজে তারা  ইতিবাচক বিষয়গুলো দেখতে পায়। যেমন যে শব্দগুলো চিন্তার উদ্রেক করে, হয়তো এর সাথে সংশ্লিষ্ট কারো ব্যক্তিগত ইতিহাস বা পরীক্ষামুলক কোন ম্যানিপুলেশন, সেগুলোবোধগম্য হবার আগেই প্রয়োজন আরো বিষদ ব্যাখ্যা;

ধর্মের খামখেয়ালী চিন্তার সাথে এর প্রাসঙ্গিকতা বিষদ ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন পড়ে না।

দুর্ঘটনাবশত সৃষ্ট উপজাত হিসাবে ধর্ম – কোন উপযোগী কিছুর মিসফায়ারিং এই সাধারন তত্ত্বটি আমি স্বপক্ষে আমার অবস্থান। এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা বহুরুপের, জটিল এবং বিতর্কিত। উদহারণ দেবার খাতিরে, আমি আমার ’অতি বিশ্বাসপ্রবণ’ শিশুর তত্ত্বটি সাধারন বাই-প্রোডাক্ট তত্ত্বের একটি প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে ধরে আলোচনায় অগ্রসর হবো। এই তত্ত্বটি যে, শিশুর মস্তিষ্ক, কিছু উত্তম কারনেই, মানসিক ভাইরাস দিয়ে আক্রান্ত হবার প্রবনতা থাকে – পাঠকদের কাছে হয়তো অসমাপ্ত মনে হতে পারে। হতে পারে মন আক্রম্য, সহজেই যে আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু কেন এটি ’এই’ ভাইরাস দিয়েই, অন্য কিছু না, আক্রান্ত হবে? কোন কোন ভাইরাস কি বিশেষভাবে দক্ষ এধরনের সহজে আক্রম্য কোন মনকে সংক্রমিত করার জন্য? কেন এই ‘সংক্রমন’ আত্মপ্রকাশ করে ধর্ম হিসাবে, অন্য কোন ভাবে না কেন? আমি যা বলতে চাইছি তার অংশ বিশেষ হচ্ছে, বিশেষ কোন ধরনের অর্থহীনতা শিশুর মস্তিষ্কে আক্রান্ত করে তাতে কিছু যায় আসেনা, একবার সংক্রমিত হলে, শিশুটি বড় হবার পর তার পরবর্তী প্রজন্মকে সংক্রমিত করে একটি অর্থহীনতা দিয়ে, সেটা যাই হোক না কেন?

নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষন যেমন ফ্রেজারের Golden Bough আমাদের চমৎকৃত করে মানুষের বৈচিত্রময় অযৌক্তিক বিশ্বাস সমুহের  বিবরণ। একবার যখন সংস্কৃতির গভীরে এরা প্রোথিত হয়, তারা টিকে থাকে, বিবর্তিত হয় এবং নানা ধারায় বিভাজিত হয়, জীববিজ্ঞানের বিবর্তনের কথা মনে করিয়ে দেয় তাদের বিবর্তনের প্রক্রিয়া। তারপরও ফ্রেজার কিছু সাধারন নীতিমালা চিহ্নিত করেছেন, যেমন, ’হোমিওপ্যাথীর ম্যাজিক’; যেখানে নানা মন্ত্র বাস্তব পৃথিবীর কোন কিছুর প্রতীকি রুপকে ধার করে যাকে তারা প্রভাবিত করতে চাইছে। এধরনের বিশ্বাসের দৃঃখজনক ফলাফলের একটি উদহারণ হচ্ছে, গন্ডারে শিং এর গুড়া যৌনউত্তেজনা বৃদ্ধি করার গুণাবলী আছে;  অসার তো বটেই, এই ভ্রান্ত ধারনার জন্ম  দৃঢ় উত্থিত পুরুষাঙ্গর সাথে গন্ডারের শিং (যদি এটি শিং নয়) এর সাদৃশ্য। হোমিওপ্যাথীর যাদুময়তার সর্বব্যাপিতা প্রস্তাব করে যে, এই অর্থহীনতা যা আক্রম্য মস্তিষ্ককে সংক্রমন করে আসলে পুরোপুরিভাবে র‌্যানডোম বা এলোমেলো, কাল্পনিক অর্থহীনতা নয়।

একটি জীববিজ্ঞানীয় সমতুল্য কিছুর কল্পনা করাটা বেশ লোভনীয়, যেমন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতো কি কোন কিছু কি এখানে কাজ করছে? কিছু ধারনা কি আসলেই অন্য ধারনাদের চেয়ে বেশী দ্রুত বিস্তার লাভ করে, এর অন্তর্নিহিত আবেদন বা গুন বা বিদ্যমান মানসিক গঠনের সাথে সামন্জষ্য হবার কারনে, আর এটা কি সত্যিকার ধর্মর, আমরা তাদের যেভাবে দেখি, তার  প্রকৃতি বা বৈশিষ্টর ব্যাখ্যা দিতে পারে, যেমন প্রাকৃতিক নির্বাচন যেমন সকল জীবের বৈশিষ্ট ও প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে পারে?  গুরুত্বপুর্ণ বিষয় যেটি মনে রাখতে হবে সেটা হলো: এর ’গুন বা মেরিট’ এর অর্থ এখানে শুধু বেচে থাকা আর বিস্তার লাভ করা; এর অর্থ এই না যে এটি ইতিবাচক মানের বিচার প্রত্যাশা করে –  এমন কোন কিছু যা নিয়ে আমরা মানবিকভাবে গর্ব করতে পারি।

এমনকি কোন বিবর্তনীয় মডেলে, সেখানে কোন প্রাকৃতিক নির্বাচন থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। জীববিজ্ঞানী মেনে নিয়েছেন যে কোন একটি জীন জনসংখ্যার মধ্যে বিস্তার লাভ করতে পারে, কারন যে এটা কোন ভালো জীন তাই না বরং শুধু এর কারন  ভাগ্য; আমরা একে জেনেটিক ড্রিফ্ট বলি; প্রাকৃতিক নির্বাচন এর মুখোমুখি এটি কতটুকু গুরুত্বপুর্ণ তা বিতর্কিত। কিন্তু বর্তমানে এটি ব্যপকভাবে গ্রহনযোগ্য তথাকথিত নিউট্রাল থিওরী অব মলিক্যুলার জেনেটিক্স এর একটি রুপ হিসাবে। যদি কোন জিন মিউটেশন হয়ে তার নিজেরই একটি ভিন্ন সংস্করণ সৃষ্টি করে যা ঠিক একই ধরনের প্রভাব আছে, তখন এই পার্থক্যটা নিউট্রাল বা নিরপেক্ষ; প্রাকৃতিক নির্বাচন কোনটার প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব করতে পারেনা। যাই হোক পরিসংখ্যানবিদদের ভাষায় যাকে বলা হয় ’সাম্পলিং এরর’ বহু প্রজন্ম ধরে; নতুন মিউট্যান্ট জনসংখ্যায় জীন পুলে এই জীনটি  ধীরে ধীরে মুল রুপটিকে প্রতিস্থাপিত করবে। পরমানুর পর্যায়ে এটা সত্যিকারে বিবর্তনীয় পরিবর্তন (এমনকি  পুরো প্রানীর পর্যায়ে কোন পরিবর্তন যদি লক্ষ্য করাও না যায়); এটি একটি নিরপেক্ষ বিবর্তনীয় পরিবর্তন যার উপর নির্বাচনী চাপ বা সুবিধার কোন প্রভাব নেই।

জেনেটিক ড্রিফট এর সাংস্কৃতিক সমতুল্য একটি জোরালো সম্ভাবনা যা আমরা উপেক্ষা করতে পারিনা যখন ধর্মের বিবর্তন নিয়ে আমরা চিন্তা করি।

ভাষা বিবর্তিত হয় একটি প্রায়-জৈববৈজ্ঞানিক একটি উপায়ে এবং এর বিবর্তনে যে দিকটি সে অনুসরণ করে মনে হতে পারে তা অনির্দিষ্ট, অনেকটা র‌্যানডোম ড্রিফট এর মত; জেনেটিক এর একটি সাংস্কৃতিক অনুরুপ এর মাধ্যমে এটি হস্তান্তরিত হয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয় যতক্ষন না পর্যন্ত্য প্রতিটি সুত্রই এতোটাই বদলে যায়, পারস্পরিক বোধগম্যতা আর থাকে না। সম্ভব হতে পারে যে, ভাষার বিবর্তনের কিছু অংশ এক ধরনের প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে পরিচালিত হয়। কিন্তু এর স্বপক্ষে যুক্তিগুলো তেমন জোরালো নয়। আমি নীচে ব্যাখ্যা দেব, এধরনের কিছু ধারনা যা প্রস্তাব করা হয়েছে ভাষা প্রধান ধারাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে, যেমন দি গ্রেট ভাওয়েল শিফট, যা ইংরেজী ভাষায় ঘটেছে পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যে। কিন্তু এধরনের ‘ফাঙ্কশনাল হাইপোথিসিস’ যথেষ্ট না আমরা যা দেখি তা ব্যাখ্যা করার জন্য। সম্ভবত মনে হতে পারে যে ভাষা সাধারণত বিবর্তিত হয়েছে র‌্যানডোম জেনেটিক ড্রিফট  এর কোন সাংস্কৃতিক সমরুপ প্রক্রিয়ায়; ইউরোপের বিভিন্ন অংশে ল্যাটিন ভাষা বদলে হয়েছে স্প্যানিশ, পর্তুগীজ, ইতালীয়, ফরাসী, রোমানশ এবং এই ভাষাগুলোর নানা ডায়ালেক্ট এ। নিদেনপক্ষে বলতেই হবে, এইসব বিবর্তনীয় পরিবর্তন স্থানীয় সুবিধা বা কোন ’নির্বাচনী চাপ’কে প্রতিফলিত করছে সেই বিষয়টি কিন্তু স্পষ্ট না ।

আমি সারাংশ করবো যে, ধর্ম, ভাষার মত, বিবর্তিত হয়েছে যথেষ্ট  র‌্যানডোমনেস নিয়ে, যার শুরুটা ছিল যথেষ্ট কাল্পনিক যা জন্ম দিয়েছে হতবাক করা -এবং কখনো বিপজ্জনক -বৈচিত্রময়তার সমাহার যা আমরা দেখছি। এবং একই সাথে সম্ভবত  প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতো কোন একটি কিছু, মানব মনস্তাত্ত্বিকতার মৌলিক সমরুপতার সাথে যা যুক্ত হয়ে নিশ্চিৎ করেছে, বৈচিত্রময় বিভিন্ন ধর্মগুলোর গুরুত্বপুর্ণ কিছু বিষয়ে যেন সাদৃশ্যতা থাকে। অনেক ধর্ম, যেমন, শিক্ষা দেয় নৈব্যাক্তিকভাবে অসম্ভব, ব্যাখ্যার অতীত, তবে নিজস্ব ধারণাগতভাবে আকর্ষনীয় সেই মতবাদ যে, আমাদের ব্যাক্তিত্ব শরীরের মুত্যুর পরও বেচে থাকে। অমরত্বের ধারনা নিজেই টিকে থাকে এবং বিস্তার লাভ করে কারন এটি পছন্দনীয় অভিলাষী চিন্তাকে প্রশ্রয় দেয়। এবং এই সব চিন্তারও গুরুত্ব আছে, কারন মানুষের মনোজগত প্রায় সর্বজনীন প্রবণতা আছে বিশ্বাসকে তাদের নানা আকাঙ্খার রঙে রন্জিত করার (’হ্যারী,তোমার ইচ্ছাটাই হচ্ছে সেই চিন্তার জনক’, ‍শেক্সপিয়ার এর হেনরী ফোর্থ পার্ট ২, তার পুত্রের উদ্দেশ্যে )।

মনে হয় এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, ধর্মের অনেক বৈশিষ্টই আসলে ধর্মের নিজের এবং  মানুষের সংস্কৃতির মিশ্রনে সেই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্টগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উপযোগি; এখন প্রশ্ন যে তাহলে এই ভালো সামন্জষ্যতাটি কি অর্জিত হয়েছে ’ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ দিয়ে নাকি ’প্রাকৃতিক নির্বাচন’ দিয়ে। উত্তর সম্ভবত দুটোই। ডিজাইনের পক্ষে ধর্মী নেতারা সম্পুর্ণভাবে দক্ষ ধর্মকে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনী শব্দাবলী, আচার এবং কৌশল ব্যবহার করার ক্ষেত্রে।  মার্টিন লুথার খুব ভালো করে জানতেন যুক্তি হচ্ছে ধর্মের সবচেয়ে বড় শক্র। এবং তিনি প্রায়শই যুক্তির বিপজ্জনক রুপটি নিয়ে  সাবধান বানী উচ্চারণ করে গেছেন: ’যুক্তি হচ্ছে বিশ্বাসের সবচেয়ে বড় শত্রু, আত্মিক কোন বিষয়ে এটি কখনোই সাহায্যে আসেনা এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এটি স্বর্গীয় জগতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম  করে, এবং ঈশ্বরের কাছ থেকে যা কিছু এসেছে সব কিছুর প্রতি এটি অবজ্ঞা পোষন করে। আবার যেমন বলেছেন:’ যারাই ক্রিষ্টান হতে চান, তাদের চোখ সরাতে হবে তার যুক্তির বাইরে। এবং আবারো, যেমন: ’সব খৃষ্ঠীয় ধর্মাবলম্বী সবার মধ্যে যুক্তিকে নিশ্চিহ্ন করা উচিৎ’; লুথারের কোন সমস্যাই হোত না ধর্মকে টিকে থাকতে সাহায্য করার এর বুদ্ধিমত্ত্বাহীন অংশটিকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ডিজাইন করতে। কিন্তু তার অর্থ এই না যে, তিনি বা অন্য কেউ এটি ডিজাইন করেছেন। এটি বিবর্তিত হতে পারে একটি (জেনেটিক বা জীননির্ভর ) নয় এমন কোন প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি রুপের মাধ্যমে, যা ডিজাইনার লুথার নন , তবে তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমান যিনি এর কার্য্যকারীতা ভালোভাবে লক্ষ্য করেছিলেন।

যদিও প্রথাভিত্তিক জীনদের ডারউইনীয় নির্বাচন হয়তো সহায়তা করেছে সেই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোগুলোকে তৈরী করতে যা উপজাত বা বাইপ্রোডাক্ট হিসাবে ধর্মকে সৃষ্টি করেছে, তবে এর খুটিনাটি বিষয়গুরোর আকার দেবার ব্যাপারে এর ভুমিকা না থাকারই কথা। আমি এর আগেই এ ব্যাপারে কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিলাম যে, যদি আমার কোন এধরনের নির্বাচনী তত্ত্ব এর খুটিনাটি বিস্তারিত বিষয়গুলোর ‍উপর প্রয়োগ করার বিষয়টি ভাবতে চাই, আমাদের জীনের দিকে না বরং তাদের সাংস্কৃতিক কোন সমতুল্যর দিকে তাকানো উচিৎ; ধর্মগুলো মিমদের (meme) মতই এমন কিছু?

 

চলবে ________________________

তথ্যসুত্র:

Deborah Keleman, ‘Are children “intuitive theists”?’, Psychological Science 15: 5, 2004, 295-301.

Dennett, D. C. (1987). The Intentional Stance. Cambridge, MA: MIT Press.

Smythies, J. (2006). Bitter Fruit. Charleston, SC: Booksurge.

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : পঞ্চম অধ্যায় (পঞ্চম পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s