রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)


ছবি: ডেভিড কাটলার  (David Cutler) এর একটি ইলাসট্রেশন

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন :  পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব)
 পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)পঞ্চম অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব)

ধর্মের শিকড়

It only raises the question of why a mind would evolve to find comfort in beliefs it can plainly see are false. A freezing person finds no comfort in believing he is warm; a person face-to-face with a lion is not put at ease by the conviction that it is a rabbit. Steve Pinker (How the Mind Works) 

গ্রুপ সিলেকশন:

কিছু প্রস্তাবিত আল্টিমেট ব্যাখ্যা আসলে দেখা যাচ্ছে প্রায় অথবা পুরোপুরিভাবেই গ্রুপ সিলেকশন তত্ত্ব নির্ভর। ’গ্রুপ সিলেকশন’ একটি বিতর্কিত ধারনা যা দাবী করে, ডার‌উইনীয় নির্বাচন বিভিন্ন প্রজাতিদের মধ্যে বা অন্য কোন জীবসদস্যদের ’গ্রুপ’ বা গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বাছাই করে। কেমব্রিজের প্রত্নতত্ত্ববিদ কলিন রেনফ্রিউ প্রস্তাব করেছিলেন যে, খৃষ্ট ধর্ম এক ধরনের গ্রুপ সিলেকশনের মাধ্যমেই তার অস্তিত্ব রক্ষা করেছে কারন এটি গ্রুপের মধ্যে বা অন্ত:গ্রুপ আনুগত্য ও ভাতৃপ্রতিম ভালোবাসাকে প্রতিপালন করেছিল, যা বেশী ধার্মিক গোষ্ঠীগুলোকে অপেক্ষাকৃত কম ধার্মিক গ্রুপগুলো থেকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রুপ সিলেকশন তত্ত্বের অন্যতম প্রচারক ডি এস উইলসন স্বতন্ত্রভাবে একই ধরেনের একটি প্রস্তাব দাড় করিয়েছিলেন আরো বিস্তারিতভাবে, তার ডার‌উইনস ক্যাথিড্রাল (Darwin’s Cathedral) বইটিতে।

ধর্মের গ্রুপ সিলেকশন তত্ত্ব আসলে কি বলছে,তা বোঝানোর জন্য একটি কল্পিত উদহারণ দেয়া যাক: একটি গোত্র, যারা অতিমাত্রায় এক যুদ্ধবাজ ‘যুদ্ধের দেবতা’র উপাসনা করে, তারা শান্তি আর ঐক্যর তাগিদ দেয় এমন দেবতাদের পুজারী প্রতিদ্বন্দী গোত্রর বা কোন দেবতারই পুজা করে না এমন কোন গোত্রর সাথে সংঘটিত যুদ্ধে জয় লাভ করে; যোদ্ধারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে,যুদ্ধে শহীদ হিসাবে তাদের মৃত্যু তাদেরকে সরাসরি স্বর্গে জায়গা করে দেবে, তারা অত্যন্ত সাহসের সাথে যুদ্ধ করে এবং নিজের জীবন উৎসর্গ করে স্বেচ্ছায় দ্বিধাহীন ভাবে। সুতরাং এমন ধর্ম বিশ্বাসে বিশ্বাসী গোত্রদের আন্ত‍ঃগোত্র যুদ্ধ বিগ্রহে জয়ী হয়ে টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশী, তারা তাদের প্রতিপক্ষ গোত্রের গবাদীপশু দখল ও তাদের নারীদের অপহরণ করে উপপত্নী বানাবে। এধরনের গোত্র আরো সমমনা কন্যা গোত্রের জন্ম দেবে দ্রুত উৎপাদনশীল হারে,যারা সবাই একই গোত্র দেবতার পুজা করবে। এই গ্রুপের অন্য কন্যা গ্রুপের জন্ম দেয়ার ধারনাটি, অনেকটা কোন মৌচাক থেকে একগুচ্ছ মৌমাছিকে ছুড়ে ফেলা দেবার মত, একেবারে অসম্ভব, নয় যদিও। নৃতত্ত্ববিদ নেপোলিয়ন শ্যানন,এধরনের বিভিন্ন গ্রামের সংযুক্তিকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার দক্ষিন আমেরিকার জঙ্গলে ইয়ানোমামো আদিবাসী, হিংস্র বা Fierce people গবেষনায় (৩);

শ্যানন গ্রুপ সিলেকশনের সমর্থক ছিলেন না, আমিও না। কারন এর বিরুদ্ধে বেশ শক্ত কিছু যুক্তি আছে। এই বিতর্কের একজন যোদ্ধা হিসাবে আমাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এটি নিয়ে আলোচনা করার সময় যেন এই বইটির মুল বিষয়ের অনেক বাইরে যেন চলে না যাই। অনেক জীববিজ্ঞানীর সংশয় আছে ‘সত্যিকারের’ গ্রুপ সিলেকশন, যা আমি আমার যুদ্ধের দেবতা পুজারী গোত্রের কাল্পনিক উদহারনের ব্যাখ্যা করেছি এবং অন্য একটি বিষয়ের মধ্যে, যাদের তারা ভ্রান্তভাবেই গ্রুপ সিলেকশন ’বলছেন’, অথচ ভালো করে যা লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে সেটি আসলে হয় ’কিন সিলেকশন’ কিংবা ’রেসিপ্রোকাল আলট্রুইজম বা পারস্পরিক পরোপকারিতা (অধ্যায় ৬ যা ব্যাখ্যা করবো বিশেষ ভাবে);

আমরা যারা গ্রুপ সিলেকশনকে খাটো করে দেখি তারা স্বীকার করি নীতিগতভাবে এটা হতেও পারে। তবে আসল প্রশ্নটি হচ্ছে ,সেটি বিবর্তনের একটি গুরুত্বপুর্ণ চালিকা শক্তি হতে পারে কিনা? যখন এটি আরো নীচের স্তরের নির্বাচনে সাথে তুলনা করা হয় – যেমন যখন গ্রুপ সিলেকশনকে ব্যাক্তিগত আত্মবিসর্জনের ব্যাখ্যা হিসাবে তুলনামুলক প্রস্তাব করা হয় – তখন নীচের স্তরের নির্বাচনই প্রমানিত হয় আরো শক্তিশালী হিসাবে; আমাদের কাল্পনিক সেই গোত্রে কল্পনা করুন একজন স্বার্থপর যোদ্ধাকে, যেখানে মুলত প্রাধান্য বিস্তার করে আছে গোত্রের জন্য শহীদ হয়ে স্বর্গীয় পুরষ্কার পেতে উৎসুক যোদ্ধারা; নিজের গা বাচানো প্রচেষ্ঠায় যুদ্ধে পেছনের দিকে সাবধানে থাকার কারনে তার জয়ী দলে শেষ পর্যন্ত বেচে থাকার সম্ভাবনা খানিকটা বেশী হবে মাত্র। গড়পড়তা তাদের সবার যতটুকু উপকার করার কথা, তার সহযোদ্ধাদের আত্মদান তাকেই খানিকটা বেশী উপকার করবে, কারন সে ছাড়া বাকী তখন মৃত। সুতরাং মৃত সহযোদ্ধাদের তুলনায় তার প্রজনন সুযোগ ও পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টি করার সম্ভাবনাও বেশী, সুতরাং এই আত্মত্যাগের প্রবণতার হার ক্রমান্বয়ে কমে যাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মেগুলোর মধ্যে।

এট একটি সরলীকৃত খেলনা সুলভ উদহারন, কিন্তু এটি ব্যাখ্যা দিচ্ছে গ্রুপ সিলেকশন সম্বন্ধে একটি চিরন্তন সমস্যার। ব্যাক্তিগত আত্মত্যাগের  গ্রুপ সিলেকশন তত্ত্বটি সবসময়ই এর ভিতর থেকে ব্যার্থ হবার সম্ভাবনায় থাকে; পুরো গ্রুপের বিলুপ্তি বা সংযুক্তির তুলনায়,ব্যাক্তিগত মৃত্যু ও প্রজনন সময়ের মাপকাঠিতে বেশ দ্রুত ঘটে: গানিতীক মডেলও তৈরী করা যেতে পারে কিছু বিশেষ পরিস্থিতির যেখানে গ্রুপ সিলেকশন শক্তিশালী বিবর্তনীয় চালিকা শক্তি হিসাবে দেখানো যায়।  এই বিশেষ পরিস্থিতিগুলো সাধারণত: পকৃতিতে কল্পনা করাটা খানিকটা বাস্তবতা বিবর্জিত, কিন্তু যুক্তি দেখানো যেতে পারে মানুষের গোত্রগত দলবদ্ধতায় ধর্মগুলো সেই বাস্তবতা বিবর্জিত বিশেষ পরিস্থিতিগুলো প্রতিপালন করতে পারে। এটি একটি কৌতুহলোদ্দীপক তত্ত্ব , আমি বিষয়টি নিয়ে আর বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না, শুধু মেনে নেয়া ছাড়া যে ডারউইন নিজেই, যদিও তিনি প্রজাতির একক সদস্যর ক্ষেত্রে নির্বাচন কাজ করে এমন ধারনার দৃঢ় সমর্থক ছিলেন, তিনিও গ্রুপ সিলেকশন ধারনার যতটুকু কাছে আসা সম্ভব, ততটুকুই এসেছিলেন, মানুষের গোত্র বা ট্রাইব নিয়ে আলোচনার সময়:

 যখন একই দেশে বসবাসকারী আদি মানবদের দুটি গোত্র বা গোষ্ঠী পারস্পরিক কোন প্রতিদ্বন্দীতায় আসে, যদি  একটি গ্রুপে ( অন্য সব পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকবে এমন শর্তে) বেশী সংখ্যক সাহসী,সহানুভুতিশীল এবং অনুগত বিশ্বাসী সদস্য থাকে,যারা সবসময় একে অপরকে বিপদ থেকে সতর্ক করতে সাহায্য করতে এবং একে অপরকে রক্ষা করতে প্রস্তুত,তাহলে সন্দেহ নেই এই গোত্রটি সবচেয়ে সফল হবে এবং অন্য গোত্রদের জয় করতে সক্ষম হবে;স্বার্থপর আর বিবাদপ্রিয় মানুষরা একসাথে জোট বাধতে বা সহাবস্থান করতে পারেনা,আর সহযোগিতা ছাড়া কোন কিছুরই ফলাফল মেলে না। কোন গোত্র যাদের সদস্যদের উপরে বর্নিত সব গুনাবলী সব্বোচ্চভাবে বিদ্যমান তারা দ্রুত সম্প্রসারিত হবে আকারে এবং অন্য সব গোত্রকে জয় করে নেবে। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায়,এই গোত্রটিও,অতীতের সকল ইতিহাস যা বলে,আরো উন্নত গুনাবলী সম্পন্ন কোন গোত্র দ্বারা বিজিত হবে (৪)।

জীববিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ যারা হয়তো এই বইটি পড়তে পারেন,তাদের আশ্বস্ত করার জন্য আমার উচিৎ হবে যোগ করা যে,ডারউইনের এই ধারনাটি পুরোপরি গ্রুপ সিলেকশন নয়. সফল গ্রুপ সিলেকশন সত্যিকার অর্থে যা বোঝায়, সফল গ্রুপ গুলো কন্যা গ্রুপ সৃষ্টি করবে,যাদের হার গননা করা যাবে নানা গ্রুপের একটি মেটাপপুলেশনে বা জনসংখ্যায় ;বরং ডারউইন গোত্রগুলোকে দেখেছেন অ্যালট্রুইস্টিক্যালী বা নিঃস্বার্থ পরোপকারী পরস্পর সহযোগিতাকারী সদস্যদের বিস্তার এবং সদস্যদের সংখ্যায় ক্রমেই বেড়ে যাবার দৃষ্টিকোন থেকে;ডারউইনের মডেল,ব্রিটেনে অনেকটা লাল কাঠবিড়ালীদের জায়গায় ধুসর কাঠবিড়ালীর বিস্তারের মত:পরিবেশগত প্রতিস্থাপন বা ইকোলজিক্যাল রিপ্লেসমেন্ট,সত্যিকারের গ্রুপ সিলেকশন নয়।

চলবে___________________________________

তথ্যসুত্র:

(৩)  N. A. Chagnon, ‘Terminological kinship, genealogical relatedness and village fissioning among the Yanomamo Indians’, in Alexander and Tinkle (1981: ch. 28).
(৪) C. Darwin, The Descent of Man (New York: Appleton, 1871),vol. 1, 156

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : পঞ্চম অধ্যায় (তৃতীয় পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s