রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)


Richard Wilkinson এর একটি ইলাসট্রেশন, সুত্র: The God Issue, Born Believers (NewScientist ,17 March 2012)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

প্রথম অধ্যায়
দ্বিতীয় অধ্যায়
তৃতীয় অধ্যায়
চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) ,
চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( চতুর্থ পর্ব ) , চতুর্থ অধ্যায় ( শেষ পর্ব) 

ধর্মের শিকড়

একজন বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সর্বজনীন আড়ম্বরময় বাহুল্যতা এবং  সময়, সম্পদ, কষ্ট এবং আত্মবিসর্জনের মানদন্ডে তাদের মুল্য, মানড্রিল এর পশ্চাৎদেশের মতই  সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়া উচিৎ যে, ধর্ম হয়তো অভিযোজনীয় একটি কৌশল ‍- মারেক কোন

ডারউইনীয় আবশ্যিকতা:

ধর্ম কোথা থেকে আসলো এবং কেন প্রতিটি মানব সংস্কৃতিতে বিষয়টি বিদ্যমান এ বিষয়ে সবারই নিজস্ব কোন না কোন পছন্দের তত্ত্ব আছে। এটি আমাদের স্বান্তনা দেয়, স্বস্তি দেয়; গোষ্ঠী অভ্যন্তরের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগীতা আর নৈকট্যকে লালন করে। কেন আমরা বেচে আছি? এটি অস্তিত্বের এই প্রশ্নের উত্তরকে বোঝার জন্য আমাদের তীব্র আকাঙ্খাকে সন্তুষ্ট করে। আমি কিছুক্ষন পরেই এই সব তত্ত্বগুলোর ব্যাখ্যা দেবো, কিন্তু তার আগে আমি একটি পুর্ববর্তী প্রশ্ন দিয়েই শুরু করতে চাই, যে প্রশ্নটি অগ্রাধিকার পাবে বিভিন্ন কারনে, যা আমরা পরবর্তী আলোচনায় দেখবো: প্রাকৃতিক নির্বাচন সংক্রান্ত একটি ডারউইনীয় প্রশ্ন।

আমরা যে ডারউইনীয় বিবর্তনের ফলে ফসল সেই বিষয়টি মনে রেখেই, আমাদের প্রশ্ন করা উচিৎ,  প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আরোপিত কোন চাপ বা চাপসমুহ মুলত ধর্মের প্রতি আমাদের তাড়নাকে উৎসাহিত করেছে। এই প্রশ্নটা আরো গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে স্বীকৃত ডারউইনীয় বিবেচনায়  মিতব্যায়ীতা অর্থাৎ অর্থনীতির পেক্ষাপটে। ধর্ম এত বেশী অপচয়পুর্ণ, বাহুল্যময় এবং ডারউইনীয় নির্বাচন স্বভাবগত প্রক্রিয়ায় যে কোন ধরনের অমিতব্যায়ীতা নিশানা করে ও তাকে নির্মুল করে। প্রকৃতি খুবই কৃপন স্বভাবের একজন হিসাব রক্ষকের মত,যে প্রতিটি পয়সা যেন টিপে টিপে খরচ করে, সময়ের দিকে নজর রেখে,সামান্যতম বাহুল্যতাকে যে শাস্তি দেয়;যেমন ডারউইন ব্যাখ্যা করেছিলেন, `অবধারিত এবং অবিরামভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রতি দিন, প্রতি ঘন্টায় সারা বিশ্বজুড়ে তার নজরদারী অব্যাহত রাখে , প্রতিটি বৈচিত্রতা, তা যত সামান্যই হোক না কেন; যা ক্ষতিকর সেগুলো বর্জন করে, এবং রক্ষা ও ক্রমশ জমা করতে থাকে যা কিছু উপকারী; নীরবে, অনুভুতিহীন ভাবে সে কাজ করে যাচ্ছে, যেখানে এবং যখনই সেই সুযোগ আসছে, প্রতিটি জীবের উন্নতির লক্ষ্য ’; যদি কোন বন্য জীব স্বভাববশত প্রতিদিনই অর্থহীন কোন কর্মকান্ড করে যেতে থাকে, প্রাকৃতিক নির্বাচন তার প্রতিদ্বন্দী সদস্যদের সহায়তা করবে যারা তাদের সময় এবং শক্তি ও শ্রম, অর্থহীন কোন কর্মকান্ডর পরিবর্তে বরং ব্যায় করে বেচে থাকা ও বংশ বিস্তারের জন্য। প্রকৃতির উপায় নেই কোন খামখেয়ালী অপ্রয়োজনীয় কাজ বা Jeux d’espirit কে  প্রশ্রয় দেবার। নিষ্ঠুর উপযোগিতাবাদেরই জয় হয়, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে বহু ক্ষেত্রে যখন সেরকম কিছু হচ্ছে বলে আমাদের মনে হয় না।


ছবি: পুরুষ বোয়ার পাখিদের বানানো বোয়ার ( ছবি সুত্র)

বোয়ার পাখিদের কিছু বোয়ার এর অসাধারন কিছু ছবি আছে টিম লামান এর  এই গ্যালারীটিতে)


ছবি: ব্লু জে পাখির অ্যান্টিং (ছবি সুত্র)

প্রথম দেখাতে মনে হবে, ময়ুরের পুচ্ছ হচ্ছে অন্যতম সেরা খামখেয়ালী ইচ্ছার একটি উদহারন;নিশ্চয়ই এটি এর বাহককে বেচে থাকার জন্য কোন বাড়তি সুবিধা প্রদান করছে না; কিন্তু এটি অবশ্যই সহায়তা করছে এর বাহকের জীনকে, কম দৃষ্টিনন্দন কিংবা বিশেষত্ব সম্পন্ন পুচ্ছসহ অন্য বাহক থেকে পৃথক করার মাধ্যমে। ময়ুরের এই পুচ্ছ আসলে বিজ্ঞাপন, যা তাকে তার প্রজনন সঙ্গীনিকে আকর্ষন করার জায়গাটা ক্রয় করার সুযোগ করে দেয় প্রকৃতির অর্থনীতিতে। এবং বিষয়টি ঠিক একই ভাবে সত্য পুরুষ বোয়ার (Bower) পাখিদের ক্ষেত্রে, যারা বিস্ময়কর পরিমান শ্রম ও সময় ব্যয় করে তাদের বোয়ার তৈরী করতে : বোয়ার হচ্ছে গাছের ডালপালা দিয়ে তৈরী একটি স্থাপনা, যাকে বলা যায় একধরনের শরীরের বাইরে তৈরী করা পুচ্ছ, যা পুরুষ বোয়ার পাখীরা গাছের ডাল, ঘাস, রঙ্গীন কোন ফল বা বেরী, এবং যদি পাওয়া যায় নানা রঙ্গের পুতি, বোতলে ছিপি বা কোন রঙ্গীন কোন কিছু দিয়ে সাজায় নারী বোয়ার পাখিকে আকর্ষন করার জন্য। বা আরো একটি উদহারন পছন্দ করা যেতে পারে, যা এরকম কোন বিজ্ঞাপন এর সাথে জড়িত না, যেমন অ্যান্টিং (anting), বেশ কিছু পাখিদের অদ্ভুত একটি অভ্যাস আছে সেটি হলো , হলো ’পিপড়ার ডিবি’তে ’গোছল’ করা ‍বা অন্য কোন উপায়ে পাখিগুলো তাদের নিজেদের পালকে পিপড়ার পাল ছড়িয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া। কেউই নিশ্চিৎ না এই কাজটা করার কি উপকারিতা আছে – হতে পারে এটি কোন ধরনের  স্বাস্থ্য রক্ষার একটি উপায়, পালক থেকে পরজীবি জীবানুগুলো পরিষ্কার করার একটি প্রক্রিয়া; আরো অনেক হাইপোথিসিস আছে এ বিষয়ে, কিন্তু কোনটারই স্বপক্ষে তেমন কোন জোরালো প্রমান আপাতত নেই। কিন্তু এধরনের কোন খুটিনাটি বিষয়ে অনিশ্চয়তা কখনোই (এবং কখনো উচিৎ ও না) কোন ডারউইনবাদীদের বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে ধারনা করতে কোন বাধা দেয়না যে, এই অ্যান্টিং এর অবশ্যই কোন কারন আছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের সাধারন কান্ডজ্ঞানও হয়তো একমত হবে,কিন্তু  ডারউইনীয় যুক্তির এভাবে চিন্তা করার কিছু নির্দিষ্ট কারন আছে, যেমন যদি পাখীরা এভাবে কাজটি না করে, তাহলে হয়তো দেখা যেতে পারে তাদের জীনগত সাফল্যের পরিসংখ্যানগত প্রত্যাশিত সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, এমন কি যদিও আমরা বর্তমানে জানিনা ঠিক কিভাবে এই ক্ষতিটি হতে পারে। কারন এই উপসংহারের ভিত্তি হলো, প্রাকৃতিক নির্বাচনের জোড় ভিত্তিটি যে, প্রাকৃতিক  নির্বাচন সময় এবং শক্তি, এ ‍দুটোর অপচয়কেই শাস্তি দেয় এবং এই সব পাখীদের সময় এবং শক্তি ব্যয় করে অ্যান্টিং করতে দেখা যায় নিয়মিতভাবেই। যদি কোন এক বাক্যের কোন ম্যানিফেষ্টো দিয়ে এই অ্যাডাপশনিষ্ট বা অভিযোজনবাদী মুলমন্ত্রকে প্রকাশ করা যায়, কোন সন্দেহ নেই এটিকে চুড়ান্ত এবং বাড়াবাড়ি রকমের গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন হার্ভার্ড এর বিখ্যাত জীনতত্ত্ববিদ রিচার্ড লিওনটিন: ’আমার মনে হয় এই বিষয়ে বিবর্তনবাদীরা সবাই একমত হবেন, যে তাদের নিজস্ব পরিবেশে কোন একটি জীব অভিযোজনের জন্য যা করছে তারচেয়ে ভালো কোনভাবে সেই কাজটি করা প্রায় অসম্ভব’(১); যদি অ্যান্টিং এর আচরনটি বেচে থাকা এবং প্রজনন এই দুটি ক্ষেত্রে কোন ইতিবাচক উপযোগিতা না রাখতো, বহু আগেই প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজাতির যে সদস্যরা এটি করছে না তাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখাতো। একজন ডারউইনবাদীও ধর্ম সম্বন্ধে সেভাবে বলার জন্য কোন তাড়না অনুভব করতে পারেন, আর সে কারনে এই আলোচনা।

একজন বিবর্তনবাদীর কাছে ধর্মী আচারগুলো সুর্যের আলোয় উদ্ভাভিত বনের কোন খোলা মাঠে ঝকমক করে দৃষ্টি আকর্ষন করা ময়ুরের পেখম ( ড্যান ডেনেট এর ভাষায়)  এর মতই মনে হতে পারে। ধর্মীয় আচরন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবেই পাখিদের অ্যান্টিং বা বোয়ার বানানো মত কাজগুলোর মনুষ্য সমতুল্য একটি কাজ। অবশ্যই এই কাজটি সময় সাপেক্ষ, শক্তি খরচকারী, প্রায়ই অতিমাত্রায় বাহুল্যপুর্ণ বা আলঙ্কারিক, বার্ড অব প্যারাডাইসের পালকপুঞ্জের মতই। কখনো ধর্ম, কোন ধার্মিক ব্যক্তির জন্য এবং এমন কি অন্যদের জন্যও জীবন নাশক হতে পারে;  লক্ষ হাজার মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার করা হয়েছে কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি তাদের প্রদর্শিত আনুগত্যর জন্য, অতি উৎসাহী ধর্মান্ধদের হাতে তাদের সহ্য করতে সীমাহীন নিপীড়ন হয়তো এমন কোন বিশ্বাসের জন্য যা প্রায় ক্ষেত্রেই বিকল্প অন্য বিশ্বাসটি ( যাদের অনুসারীদের হাতে নীপিড়নের শিকার হতে হচ্ছে) থেকে খুব সামান্যই আসলে ভিন্ন। ধর্ম অর্জিত সম্পদকে গ্রাস করে, এবং কখনো তার মাত্রা অতিরিক্ত। মধ্যযুগীয় কোন ক্যাথিড্রাল বানানোর জন্য শত মানুষের শতাব্দী কালের পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, অথচ সেই স্থাপনাটি যার পেছনে এত সময়, শ্রম আর সম্পদের ব্যবহার হচ্ছে, সেই স্থাপনাটি কখনোই বসবাসের জন্য বা  স্বীকৃত এমন কোন উপযোগী কারনেও বানানো হয় না। এটা তাহলে একধরনের স্থাপত্যকর্মের ময়ুর পুচ্ছ? যদি তাই হয়, তাহলে এর বিজ্ঞাপনটি কাদের প্রতি নির্দেশিত। পবিত্র ভক্তিসঙ্গীত এবং ভক্তিময় চিত্রকলা মধ্যযুগীয় এবং রেনেসার প্রতিভায় প্রায় একচেটিয়া প্রভাব ফেলেছিল। ভক্তিপুর্ণ ধর্মে নিবেদিত কোন মানুষ তার ঈশ্বরের জন্য যেমন মরতেও পারে, অন্যকেও অনায়াসে মারতেও পারে। তারা নিজেদের চাবুক দিয়ে পিটিয়ে শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে রক্তক্ষরন করে, বা কঠিন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় আজীবন কুমার হয়ে একাকী নির্জনতায় জীবন কাটাতে, সবই ধর্মের জন্য নিবেদিত। কেন ? কিসের জন্য এই সব? ধর্মের কি আসলেই কোন ‘উপকারিতা’ আছে?

এই ’উপকারিতা’ শব্দটি দিয়ে ডারউইনবাদীরা সাধারনত বোঝান কোন একক সদস্যর জীনের বেচে থাকার জন্য কোন ধরনের উপকারী ও উপযোগী পরিবর্ধন। আর এই ধারনার মধ্যে যে বিষয়টি অনুপস্থিত তা হলো  ডার‌উইনীয় কোন উপকারিতা কোন একক জীব সদস্যর জীনের প্রতি সীমাবদ্ধ নয়। উপকারিতার সম্ভাব্য আরো তিনটি বিকল্প নিশানাও থাকতে পারে। একটি আসছে গ্রুপ সিলেকশন (Group Selection) তত্ত্ব থেকে, আর সে বিষয়ে আমি পরে আলোচনায় আসছি। দ্বিতীয়টি আসছে সেই তত্ত্ব থেকে যা আমি ব্যাখ্যা ও সমর্থন করেছিলাম আমার The extended Phenotype (দি এক্সটেন্ডেড ফেনোটাইপ) বইটিতে: কোন একটি একক জীব যাকে আপনারা দেখছেন, সে হয়তো অন্য আরো একটি একক জীবের জীনের নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবের আওতায় কাজ করছে, হয়তো সেটা হতে পারে কোন পরজীবি। ড্যান ডেনেট আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, সাধারন সর্দিজ্বরের মতই ধর্মও সব মানুষের মধ্যে সর্বজনীন, তা স্বত্ত্বেও আমরা কিন্তু এমন প্রস্তাব করছি না যে, সর্দিজ্বর আমাদের কোনভাবে উপকার করছে। প্রানী জগতে এমন অনেক উদহারন আছে, যেখানে কোন পরজীবির এক পোষক থেকে অন্য পোষকে বিস্তার লাভ করার সুবিধার  জন্য তারা তাদের পোষক জীবটির আচরণগত পরিবর্তন ঘটাতে প্ররোচিত করতে  সক্ষম। আমি এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলাম আমার `দি এক্সটেন্ডেড ফেনোটাইপের কেন্দ্রীয় সুত্র’ হিসাবে: কোন জীবের আচরন সেই আচরনের ’জন্য’ নির্দিষ্ট জীনগুলোকে টিকিয়ে রাখার বিষয়টি  সর্ব্বোচ্চভাবে নিশ্চিৎ করার চেষ্টা করে, সেই জীনগুলো সেই আচরণ করা প্রানীর শরীরে থাকুক বা না থাকুক।

তৃতীয়, কেন্দ্রীয় তত্ত্বটি হয়ত জীন শব্দটিকে আরো সাধারণ বহুব্যবহৃত রেপ্লিকেটর শব্দটি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে পারে। একটি ফ্যাক্ট হলো ধর্মের সর্বব্যাপীতা সম্ভবত ইঙ্গিত করছে যে, ধর্মর কোন না কিছুর উপকারিতার জন্য বিষয়টি কাজ করছে কিন্তু সেটা আমাদের বা আমাদের জীনের জন্য নাও হতে পারে। হতে পারে এটি উপকারী শুধু ধর্মীয় ধারনাগুলোর নিজেদের জন্য; এবং তা এমন পর্যায় অবধি যে সেই অর্থে তাদের আচরণ অনেকটাই জীন বা রেপ্লিকেটর এর মত। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে আমি আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছি,  ’সাবধানে হাটুন, কারন আপনি আমার মীমের উপর দিয়ে হাটছেন’ এই শিরোনামের অধীনে। ‍তবে তার আগে আমি আরো বেশী ডারউ্ইনবাদের আরো বেশ ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যাটা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে চাই। যেখানে বেনিফিট বা উপকার বলতে মনে করা হয়েছে কোন একক জীব সদস্যর বেচে থাকা এবং প্রজনন ক্ষেত্রে  উপকার।

ধারনা করা হয় আদি পুর্বপুরুষরা যেভাবে বাস করতো অষ্ট্রেলিয়ার আদিবাসী শিকারী সংগ্রহকারী বা হান্টার গ্যাদারার মানবগোষ্ঠী খুব সম্ভবত সেরকম উপায়েই জীবন যাপন করে। নিউজিল্যান্ড/অষ্ট্রেলীয় বিজ্ঞানের দার্শনিক কিম স্টেরেলনাই তাদের জীবনের নাটকীয় কিছু স্ববিরোধীতা বা বৈপরিত্যকে তুলে ধরেছেন। একদিকে যেমন আদিবাসীরা বেচে থাকার জন্য দুর্দান্ত কৌশলী, বিশেষ করে যে বৈরী পরিবেশে ও পরিস্থিতিতে তাদের সকল ব্যবহারিক দক্ষতাকে চুড়ান্তভাবে পরীক্ষা দিতে হয়; কিন্তু স্টেরেলনাই আরো যোগ করেন, আমরা প্রজাতি  হিসাবে বুদ্ধিমান হতে পারি, তবে এই বুদ্ধিমত্তাটা বিকৃত। যে মানুষগুলো প্রাকৃতিক বিশ্ব সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান রাখে, জানে সেখানে কিভাবে বেচে থাকতে হয় তারাই আবার কি করে একই সাথে তাদের মনের ভিতরে নানা উদ্ভট বিশ্বাস দিয়ে এলোমেলো করে ভরে রাখে, যে বিশ্বাসগুলো একেবারে স্পষ্টভাবেই মিথ্যা, যার জন্য  ’অর্থহীন’ শব্দটিও হবে অতি মাত্রায় একটি স্বল্পভাষন।  কিম স্টেরেলনাই নিজে সুপরিচিত ছিলেন পাপুয়া নিউ গিনির আদিবাসীদের সম্বন্ধে। তারা বেচে থাকে ভীষন কঠিন একটি পরিবেশে যেখানে খাদ্যর সন্ধান পাওয়া খুবই কঠিন একটি বিষয়, আর সেটা সম্ভব হয় শুধুমাত্র তাদের চারপাশের জৈববৈজ্ঞানিক পরিবেশ সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান প্রয়োগ করার মাধ্যমেই কেবল, কিন্তু তারা তাদের এই প্রাকৃতিক জ্ঞানটার ‍সাথে যুক্ত করে রেখেছে নারীর মাসিক কালীন দুষিতকরণ এবং ডাকিনীবিদ্যা সম্বন্ধে তাদের গভীরভাবে ক্ষতিকর বদ্ধমুল কিছু ধারনা। অসংখ্য স্থানীয় গোত্র ম্যাজিক এবং ডাকিনীবিদ্যার ভয়ে এবং সেই ভয়ের সাথে জড়িত সহিংস অত্যাচারের শঙ্কায় শঙ্কিত। স্টেরেলনাই আমাদের সামনে চ্যালেন্জ ছুড়ে দেন, কেমন করে আমরা একই সাথে এত বুদ্ধিমান এবং এক নির্বোধ হতে পারি?(২);

খুটিনাটি বিষয়ে পার্থক্য হয়তো থাকতে পারে, কিন্তু সারা পৃথিবী জুড়ে  এমন কোন সংস্কৃতিতে নেই, যেখানে কোন না কোন এক সংস্করনের এ ধরনের সময় বিনষ্টকারী, সম্পদ নষ্টকারী, শক্রতার অনুভুতি উস্কে দেবার মত আচার ‍অনুষ্ঠান, অবাস্তব, অনুৎপাদনশীল ধর্মীয় কল্পকাহিনীর অস্তিত্ত্ব নেই। কিছু শিক্ষিত মানুষ হয়তো ধর্মকে ত্যাগ করেছেন, কিন্তু তারা সবাই প্রতিপালিত হয়েছেন কোন না কোন ধর্মীয় সংস্কৃতির পরিমন্ডলে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সাধারনতঃ তাদের সচেতনভাবেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেশ পুরোনো কৌতুকটি: ’বেশ ভালো কথা বুঝলাম আপনি নাস্তিক ,কিন্তু আপনি কি প্রটেষ্টান্ট নাস্তিক নাকি ক্যাথলিক নাস্তিক? এখানে কিন্তু মিশ্রিত আছে তিক্ত সত্যটি। বিষম লিঙ্গের ( হেটেরোসেক্সুয়াল) মধ্যে যৌনতার বিষয়টি যেমন সর্বজনীন বলা হয়, ধর্মীয় আচরনও তেমন মানুষের জন্য সর্বজনীন একটি আচরন বলা যেতে পারে। দুই সাধারণীকরনের মধ্যেই সুযোগ আছে এককভাবে ব্যক্তিগত এর থেকে ভিন্ন কোন আচরনের বিষয়টি মেনে নেবার, কিন্তু সেই সব ব্যতিক্রমকেও ব্যাখ্যা দেয়া হয় বা বোঝানো হয় যে, তারা আসলে মুল নিয়ম থেকে সরে এসেছে। আর কোন প্রজাতির মধ্য বিদ্যমান সর্বজনীন কোন বৈশিষ্ট অবশ্যই ডারউইনীয় ব্যাখ্যা দাবী করে।

অবশ্যই কোন জীবের যৌন আচরনের ডারউইনীয় উপযোগিতা ব্যাখ্যা করা তেমন কোন কঠিন কাজ না;এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সন্তান তৈরী করা, এমন কি যখন জন্মনিরোধক ব্যবহার বা সমকামিতা আপাতদৃষ্টিতে এ বিষয়টি মিথ্যা এমন একটি ধারনা দেয়। কিন্ত‍ু ধর্মীয় আচরন তাহলে কি? কেন মানুষ নিয়মমাফিক উপবাস করে, হাটু ভেঙ্গে মাথা নত করে, নিজেদের চাবুক দিয়ে পেটায়, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে পাগলের মত মাথা নাড়ায়, ধর্মযুদ্ধ করে বা অনথ্যায় এমন কিছু কষ্ট আর সময়সাপেক্ষ আচরনের ব্যস্ত হয়, যা তাদের সমস্ত জীবনকে অধিগ্রহন আর গ্রাস করে এবং চরম কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুও নিশ্চিৎ করে;

(চলবে)_______________________

তথ্য সুত্র:

(১) Dawkins, R. (1982). The Extended Phenotype. Oxford: W. H. Freeman.
(২) K. Sterelny, ‘The perverse primate’, in Grafen and Ridley (2006:213-23).

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

4 thoughts on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: পঞ্চম অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s