যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: শেষ পর্ব

শীর্ষ ছবি ১: পাকিস্থান ও মিশরে কিছু রহস্যময় প্রজাতির জীবাশ্ম আবিষ্কার করার আগ পর্যন্ত্য জীবাশ্মবিদ ফিলিপ গিঙরিচ (Philip Gingerich) এর তিমি র বিবর্তনে বিশেষ কোন আগ্রহই ছিল না; ১৯৭৮ সালে পাকিস্থানের উত্তরাঞ্চলে প্রথম ঘোড়ার সম্ভাব্য পুর্বসুরী প্রজাতির জীবাশ্ম খোজার সময় তার সহযোগীরা খুজে পান একটি নেকড়ে সদৃশ প্রানীর মাথার খুলি; পরে পুর্ণাঙ্গ জীবাশ্ম প্রজাতিটির নাম দেয়া হয় Pakicetus inachus যার ব্রেইন এর আকৃতি এবং কানের বিশেষ গঠন দেখেই তিনি এর সাথে তিমির প্রথম যোগসুত্রটি করেন। পরে আরো কিছু জীবাশ্ম (যেমন মিশরের মরুভুমিতে পাওয়া  Bacilosaurus এবং পাকিস্থানে Rhodocetus Maiacetus) এবং বিজ্ঞানের নানা শাখা থেকে সংগ্রহ করা প্রমান ও তার তিন দশকের গবেষনা প্রথম বারের মত সুস্পষ্টভাবে প্রমান করে প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর আগে েইকোসিন পর্বে স্থলবাসী স্তন্যপায়ী আর্টিওডাকটাইল বা Even-Toed Ungulates ( বা ইভেন টোড: যাদের জোড় সংখ্যার পায়ের আঙ্গুল থাকে ও শরীরের ভার তাদের তৃতীয় এবং চতুর্থ পায়ের আঙ্গুল সমানভাবে বহন করে, আর আঙ্গুলেটস বলতে সেই সব প্রানী যা যাদের পায়ের আঙ্গুলের নোখে কেরাটিন এর শক্ত একটি অংশ থাকে, যাকে Hoof বা খুর বলা হয়, যেমন গরু, উট, শুকর ইত্যাদি , ঘোড়ারাও আঙ্গুলেট তবে তারা অড টোড বা তাদের বেজোড় সংখ্যক পায়ের আঙ্গুল থাকে, শরীরের ভার মুলত বহন করে তৃতীয় আঙ্গুলটি , এছাড়াও আর্টিওডাকটাইলদের বেশ কিছু  বৈশিষ্ট আছে) পুর্বসুরী থেকে Cetacean ( তিমি,ডলফিন ও পরপয়েস) বর্গের স্তন্যপায়ীরা বিবর্তিত হয়েছিল। আজকের সিটাসিয়ান যেমন তিমি রা সম্পুর্ণ জলজ প্রানী তবে আদি সিটাসিয়ানরা ছিল উভচরী; ভারত এবং পাকিস্থান থেকে পাওয়া জীবাশ্মগুলো ধারাবাহিক এই বিবর্তনের অন্তর্বতী কালীন সবগুলো পর্যায়কে বর্ণনা করতে সহায়তা করেছে, কিভাবে িএকটি স্থলবাসী প্রানী ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত হয়ে তিমি ও সমগোত্রীয় জলজ প্রানীতে। (Photo: Eric Bronson, U-M Photo Services.)

শীর্ষ ছবি ২: সিটাসিয়ান (Cetacean) দের বিবর্তনের দুটি গুরুত্বপুর্ণ জীবাশ্ম খুজে পাওয়ার টিমটির নেতৃত্ব দেন জে জি এম থেউইসেন; উপরের ছবিটিতে পাকিস্থান থেকে খুজে পাওয়া ১৯৯২ সালের একটি ট্রানজিশনাল তিমি র জীবাশ্ম Ambulocetus natans , যা  স্থলবাসী আদি সিটাসিয়ানদের সাথে সম্পুর্ণ জলজ সিটাসিয়ানদের একটি যোগসুত্র; (মধ্য ইকোসিন পর্বে ,প্রায় ৪৮ -৫০ মিলিয়ন বছর আগে এরা বেচে ছিল,এদের পেছনের কর্মক্ষম পা ছিল ও তারা হাটতে পারতো এবং সাতারও কাটতে পারতো। জলবাসী হওয়া সত্ত্বেও এটা ডাঙ্গায় তাদের জীবনের একটি যোগসুত্র রক্ষা করতো) নীচের ছবিতে থেউইসেন এর খুজে পাওয়া আরেকটি গুরুত্বপর্ণ ফসিল, যাকে বলা যেতে পারে মিসিং লিঙ্ক, Indohyus ; সিটাসিয়ানদের প্রাচীনতম (“৪৮ মিলিয়ন বছর আগে) পুর্বসুরী প্রানী; আদি সিটাসিয়ান ( যেমন Pakicetus) দেরএকটি আত্মীয় গ্রুপ যা পুর্ববর্তী আর্টিওডাকটাইলদের থেকে আদি সিটাসিয়ানদের বিবর্তনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে। পরবর্তী ১০ মিলিয়ন বছরে মুলত স্থলবাসী স্তন্যপায়ীদের থেকে পুরোপুরি পানিতে বসবাসের উপযোগী হয়ে বিবর্তিত হয়  সিটাসিয়ানরা; কাশ্মিরের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ভারতীয় ভুতত্ববিদ এ রঙ্গা রাও এর সংগ্রহ করা পাথর থেকে থেউইসেন টীম উদ্ধার করেন এই প্রজাতির জীবাশ্মটিকে। Indohyus কে মিসিং লিঙ্ক বলতে নারাজ যারা যেমন ফিলিপ জিনজারিচ, তাদের মতে এই মিসিং লিঙ্কটি ৫৬ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া মেসোনাইকিয়া পরিবার, যেমন তার টীমের খুজে পাওয়া একটি জীবাশ্ম প্রজাতি Sinonyx  (ছবি:ইন্টারনেট);

শীর্ষ ছবি ৩: Indohyus ;  শিল্পীর চোখে; (ছবি সুত্র)

শীর্ষ ছবি ৪: শিল্পী কার্ল ব্রুয়েল এর আকা Ambulocetus natans ( যার নামের অর্থ হাটতে ও সাতার কাটতে পারে  এমন একটি তিমি) (ছবি সুত্র)

তিমি র বিবর্তন নিয়ে একটি ভিডিও : 

শীর্ষ ছবি ৫:  তিমির বিবর্তন: প্রায় ৫০মিলিয়ন বছরের আগে িইকোসিন  ইপোকে বর্তমান স্পেন থেকে েইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অপেক্ষাকৃত অগভীর সমুদ্র ছিল। এই সময়েই সিটাসিয়ানরা যেমন বর্তমান তিমির পুর্বসুরী প্রজাতিরা জলে প্রত্যাবর্তন করে। তখনও ভারত একটি দ্বীপ, ইউরেশিয়ার ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হয়নি, তৈরী হয়নি হিমালয়, পাকিস্থান কেবল ভারতের একটি উপকুল অঞ্চল; আদি তিমিদের জীবাশ্মগুলোর অনেকগুলোই এখানেই সন্ধান পাওয়া গেছে। আদি তিমিদের তখন দেখলে বর্তমান বিশাল তিমিদের সাথে বাহ্যিক কোন মিল চোখে পড়তো না, তারা তাদের লেজ দিয়ে সাতার কাটতো না, পরিবর্তিত পা দিয়ে তারা সাতার কাটতে শিখেছিল এবং ক্রমেই তারা পেছনের পা হারায়, সামনের পা পরিনত হয় প্যাডেল, লেজ ফ্লুক বিবর্তন হয় সাতারের জন্য। এখনও তিমিরা তার বিবর্তনীয় অতীতের চিহ্ন বহন করছে। (ছবি সুত্র)

________________________

(এটি মুলত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন জীনতত্ত্বর অধ্যাপক জেরি কয়েন  ( Jerry A. Coyne) এর Why Evolution is true  বইটির দ্বিতীয় অধ্যায় Written in the Rocks এর একটি অনুবাদ প্রচেষ্টা; বইটির প্রথম অধ্যায় What is Evolution? এর অনুবাদ বিবর্তন কি? আছে এখানে))

 

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : প্রথম পর্ব
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : দ্বিতীয় পর্ব
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : তৃতীয় পর্ব
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : চতুর্থ পর্ব

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে :
((((শেষ পর্ব))))

জলে প্রত্যাবর্তন : তিমি’র বিবর্তন

ডুয়ান গিশ, যুক্তরাষ্ট্রের একজন সৃষ্টিবাদী, যিনি বিবর্তন  তত্ত্বকে আক্রমন করে দেয়া তার জনপ্রিয় এবং প্রানবন্ত ( যদিও অত্যন্ত ভ্রান্ত ধারনা প্রসুত) বক্তৃতাগুলোর জন্য খুবই পরিচিত ।আমি তার একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম একবার, যখন গিশ তিমি , গরুদের সাথে সম্পর্ক আছে এমন স্থলবাসী প্রানী থেকে বিবর্তিত হয়েছে জীববিজ্ঞানীদের প্রমান করা এই তত্ত্বটিকে নিয়ে উপহাস করছিলেন। কিন্তু কিভাবে? তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এধরনের বিবর্তনীয় পরিবর্তন বা ট্রানজিশন আসলে হওয়া সম্ভব, কারন এর অন্তবর্তীকালীন সব প্রজাতিগুলো জলে কিংবা স্থলে কোথাও তো ভালো ভাবে অভিযোজিত বা খাপ খাওয়াতে পারার তো কথা না, সুতরাং প্রাকৃতিক নির্বাচন এ ধরনের কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না (এটি পাখিদের বিবর্তনের বিরুদ্ধে সেই অর্ধেক ডানা’র যুক্তির মত) ?  তার বক্তব্য আরো ভালো করে বোঝানোর জন্য গিশ একটি মারমেইড বা মৎসকুমারীর মত একটি বিচিত্র প্রানীর কার্টুন করে আকা একটি স্লাইড প্রদর্শন করেন, যার সামনের অংশ ছোপ ছোপ দাগ ওয়ালা একটি গরু আর পেছনের অংশ মাছ ; স্পষ্টতই মনে হচ্ছে প্রানীটি তার বিবর্তনীয় নিয়তি নিয়ে হতভম্ব,অভিযোজনে সুস্পষ্টভাবেই  ব্যর্থ  এই প্রানীটি কোন সাগরের পানির প্রান্তে দাড়িয়ে আছে, আর তার মাথার উপর বড় করে আকা একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ।কার্টুনটি তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পুরনে সফল হয়েছিল: দর্শকদের মধ্যে তাৎক্ষনিক হাসির রোল পড়ে গেল, তারা ভাবলেন, কত বড় নির্বোধ  হতে পারে এই বিবর্তনবাদীরা?

এবং আসলেই এই ধরনের মৎসকন্যা -গরু বা Mer-cow কে স্থলবাসী এবং জলজ প্রানীদের মধ্যে ট্রানজিশনাল প্রজাতির উদহারন হিসাবে দাবী করা কত বড় নির্বোধ উদহারন – গিশের ভাষায় একটি Udder failure ( চুড়ান্ত ব্যার্থতাকে হাস্যকর করার জন্য utter শব্দটির জায়গায় udder বা গরুর স্তন বা পালান শব্দটির ব্যবহার করেছেন); কিন্তু আসুন গিশের মশকরা আর ভাষা মারপ্যাচের কথা ভুলে যাই বরং প্রকৃতির দিকেই তাকাই।আমরা কি এমন কোন স্তন্যপায়ী প্রানী খুজে পেতে পারি, যারা স্থলে ও পানিতে দু জায়গায় বসবাস করে, যে প্রানীর এই তথাকথিত সৃষ্টিবাদীদের দাবীতে বিবর্তিত হবার কথাই না ?

খুব সহজেই আমরা তা পারি। সবচেয়ে ভালো উদহারন হতে পারে হিপপোপটেমাস বা জলহস্তী, যদিও তারা স্থলবাসী স্তন্যপায়ীদের নিকটাত্মীয়, তবে কোন স্থলবাসী স্তন্যপায়ী প্রানীর পক্ষে যতটুকু বেশীমাত্রায় জলজ হওয়া সম্ভব তারা ততটুকু ( মোট দুটি প্রজাতি আছে হিপপোপটেমাস, একটি পিগমি হিপপো এবং আরেকটি সাধারন বা রেগুলার হিপপো, যার বৈজ্ঞানিক নাম, সঠিকভাবেই Hippopotamus amphibius (amphibius  বা উভচরী); হিপপোরা বেশীভাগ সময় ক্রান্তীয় অঞ্চলের নদী বা জলাশয়ে পানিতে তাদের শরীর ডুবিয়ে বসে থাকে এবং মাথার উপরে বসানো নাক চোখ আর কান দিয়ে তাদের চারপাশে নজর রাখে, যাদের প্রত্যেকটাই পানির নীচে পুরোপুরি বন্ধ করে রাখতে পারে হিপপোরা। হিপপো পানিতে তাদের প্রজনন সাথীর সাথে মিলিত হয়, আর হিপো বাচ্চারা হাটার আগেইসাতার কাটতে শেখে এবং পানীর নীচে এরা হিপপো মায়ের দুধ চুষেও খেতে পারে।যেহেতু তারা মুলত বেশী সময় পানিতেই কাটায়, তাই স্থলে উঠে এসে চরে বেড়িয়ে ঘাস খাওয়ার জন্য তারা বেশ কিছু অভিযোজনও আয়ত্ত্ব করে নিয়েছে: যেমন রাতে তারা ডাঙ্গায় উঠে আসে খাবার জন্য, যেহেতু সুর্যের আলোয় তাদের চামড়া পুড়ে যাবার প্রবণতা বেশী, তাদের চামড়া থেকে একধরনের লাল তৈলাক্ত তরল পদার্থ নি:সরিত হয়, যার মধ্যে একটি পিগমেন্ট বা রন্জ্ঞক পদার্থ থাকে hipposudoric acid , যা সানস্ক্রিণ হিসাবে কাজ করে এবং সম্ভবত এটি রোগজীবানু বিনাশ কারী বা অ্যান্টিবায়োটিক।এটাই জন্ম দিয়েছে সেই মিথ  এর, যে হিপোরা যখন ঘামে তখন তাদের চামড়া থেকে রক্ত বের হয়।হিপপোরা অবশ্যই তাদের পরিবেশের সাথে ভালোভাবেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে এবং খুব একটা কঠিন কিন্তু  না এটা ভাবা যে, তারা যদি পানিতে যথেষ্ট পরিমান খাবার পেত, হয়তো একসময় সম্পুর্ণ জলজ প্রানী হিসাবে বিবর্তিত হত তিমির মত কোন প্রানীতে।

কিন্তু কোন জীবিত প্রানী দেখেই তুলনামুলক ধারনা করার কোন দরকার নেই কিভাবে তিমিরা বিবর্তিত হয়েছে ; তাদের জলজ আচরন এবং দৃঢ় শক্ত সহজে জীবাশ্মীভুত অস্থির কল্যাণে তিমিদের বিবর্তনের স্বপক্ষে আছে চমৎকার ধারাবাহিক জীবাশ্ম রেকর্ড।এবং তাদের বিবর্তন আসলে কিভাবে ঘটেটে সে সম্বন্ধে বিজ্ঞানীরা জেনেছেন  এবং যথেষ্ট প্রমান সংগ্রহ করেছেন মুলত মাত্র এই গত বিশ বছরের গবেষনায়।আমাদের জানা আছে এমন সবগুলো বিবর্তনীয় পরিবর্তনের অন্যতম সেরা উদহারণটি হচ্ছে এটি কারন সময়ের ক্রমানুসারে আমাদের সংগ্রহে আছে সবগুলো ধারাবাহিক জীবাশ্মগুলো, যা সম্ভবত পুর্বসুরী এবং উত্তরসুরীদেরএকটি বংশধারা, স্থল থেকে পানি অভিমুখে তাদের যাত্রা লিপিবদ্ধ করে রেখেছে ।

সপ্তদশ শতাব্দী থেকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল যে তিমি ও তাদের সগোত্রীয় প্রানীরা যেমন ডলফিন ও পরপয়েস আসলে স্তন্যপায়ী।তারা উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট, সন্তানের জন্ম দেয়, যাদের তারা দুধ খাওয়ায় এবং তাদের ব্লোহোলের ( মাথার উপর নাকের ছিদ্র) মুখের চারপাশে চুল আছে।তিমির ডিএনএ থেকে নেয়া প্রমান এবং বর্তমানে কাজ করেনা এমন কিছু অঙ্গ বা ভেস্টিজিয়াল অঙ্গ ,যেমন আদি পেলভিস এবং পেছনের পায়ের উপস্থিতি প্রমান করছে তাদের পুর্বপুরুষ অবশ্যই ডাঙ্গায় বাস করতো। তিমিরা প্রায় নিশ্চিৎভাবে বিবর্তিত হয়েছে এক প্রজাতির আর্টিওডাকটাইল (Artiodactyl) থেকে: স্তন্যপায়ীদের একটি গ্রুপ যাদের জোড় সংখ্যক পায়ের আঙ্গুল আছে।যেমন উট এবং শুকর। জীববিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বাস করেন তিমির পুর্বসুরীদের সাথে সবচে কাছের সম্পর্ক আছে এমন জীবিত প্রানী হচ্ছে – জী আপনি ঠিকই অনুমান করতে পেরেছেন – হিপপোপটামাস। সুতরাং হিপপো থেকে তিমি র সেই পরিবর্তনের দৃশ্যপটটি খুবই অসম্ভব কোন ব্যাপার নয় মোটেও।

কিন্তু তিমির কিছু একান্ত বৈশিষ্ট আছে যা স্থলবাসী স্বগোত্রীয়দের থেকে তাদেরকে ভিন্ন করেছে। সেগুলোর মধ্যে আছে যেমন, পেছনের পায়ের অনুপস্থিতি, সামনের লিম্ব দেখতে ঠিক বৈঠা বা প্যাডেলের মত, চ্যাপটা ফ্লুক এর মত লেজ, একটি ব্লোহোল (মাথার ঠিক উপরে থাকা নাকের ছিদ্র); খাটো ঘাড়, সাধারন কোন আকৃতির দাত(স্থলবাসী প্রানীদের জটিল, কয়েকটি চুড়া বা কাস্প বিশিষ্ট দাত (মাল্টিকাসপিড) থেকে যা ব্যতিক্রম)), কানের বিশেষ গঠন যা তাদের পানির নীচে শব্দ শুনতে সাহায্য করে, মেরুদন্ডের উপরে শক্ত বিশেষ অংশ যা সাতারের জন্য ব্যবহৃত লেজের শক্তিশালী মাংশপেশীগুলো নোঙ্গর করে রাখে। মধ্যপ্রাচ্যে ( ? অনুবাদক: মুলত: ভারত ও পাকিস্থান) খুজে পাওয়া একগুচ্ছ বিস্ময়কর জীবাশ্ম প্রজাতির কল্যাণে, আমরা স্থলবাসী থেকে জলজ প্রতিটি পর্যায়ে এইসব বৈশিষ্টগুলোর প্রতিটির ক্রমবিবর্তন লক্ষ্য করতে পেরেছি (শুধুমাত্র হাড়বিহীন লেজ ছাড়া, যেটি জীবাশ্মীভুত হয় না)।

৬০ মিলিয়ন বছর আগের জীবাশ্ম রেকর্ডে বহু জীবাশ্ম স্তন্যপায়ী প্রজাতির প্রানীর উপস্থিতি থাকলেও, কিন্তু কোন জীবাশ্ম তিমি অস্তিত্ব ছিল না। আধুনিক তিমি সদৃশ কোন প্রানীর জীবাশ্ম রেকর্ডে আবির্ভুত হতে দেখা যায় আরো ৩০ মিলিয়ন বছর পর, সুতরাং এই মধ্যবর্তী সময়ে আমাদের ট্রানজিশনাল কোন প্রানী খুজে পাওয়া উচিৎ। এবং আবারো, ঠিক সেখানেই তাদের সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা। ৫২ থেকে ৪০ মিলিয়ন বছর পুর্বের সময়ের ব্যাপ্তিকালে, নীচের ছবি ১২ দেখাচ্ছে সময়ের ক্রমানুসারে কিছু প্রানীদের ডায়াগ্রাম, যারা তিমির ক্রমবিবর্তনের সাথে সম্পৃক্ত ছিল;

বিস্তারিতভাবে এই ক্রমবিবর্তন ব্যাখ্যা করার কোন প্রয়োজন নেই, ছবির ড্রয়িং গুলোই বলে দিচ্ছে স্পষ্ট, কেমন করে স্থলবাসী একটি প্রানী পানিতে বসবাসের জন্য উপযোগী হয়ে বিবর্তিত হয়েছিল। এই ধারাবাহিক ক্রম র শুরুতেই আছে সম্প্রতি আবিষ্কৃত একটি জীবাশ্ম প্রজাতি যারা তিমির নিকটাত্মীয়, রেকুন আকারের প্রানী Indohyus , যারা বাস করতো প্রায় ৪৮ মিলিয়ন বছর আগে, Indohyus  যেমনটা পুর্বধারনা করা হয়েছিল একটি artiodactyl পরিবারের প্রানী; Indohyus কে তিমির নিকটাত্মীয় বলা হচ্ছে কারন, ‍তাদের কান এবং দাতের কিছু বৈশিষ্ট আছে যা শুধু আধুনিক তিমি ও তার জলবাসী পুর্বসুরীদের মধ্যে দেখা যায়। যদিও Indohyus তিমির মুলত জলজ পুর্বসুরীদের আবির্ভাবে সামান্য কিছু সময় পরে জীবাশ্ম রেকর্ডে আবির্ভুত হয়েছিল, তাস্বত্তেও তিমির পুর্বসুরীরা কেমন ছিল, সম্ভবত এটি তাদের সবচেয়ে কাছের সদৃশ একটি প্রজাতি হবার সম্ভাবনাই বেশী। এবং এটি অন্ততপক্ষে আংশিক জলজ । আর আমরা সেটা জানি কারন পুর্ণবয়স্ক স্থলবাসী স্তন্যপায়ীদের তুলনায় এর হাড়ের ঘনত্ব অনেক বেশী, যা প্রানীটিকে পানীতে কর্কের মত ওঠানামা করা থেকে বিরত রাখতো। এবং এর দাত থেকে সংগ্রহ করা আইসোটোপ বলছে এটি পানি থেকে অনেক অক্সিজেন শোষন করতো। সম্ভবত এটি অগভীর ছোট পানির ধারায়, জলাশয় বা হ্রদের পানি ভেঙ্গে হাটাচলা করতো, খাবার জন্য ( মুলত উদ্ভিদ) বা শিকারী প্রানীর থেকে আত্মরক্ষার্থে, অনেকটাই বর্তমানে জীবিত সদৃশ্য একটি প্রাণীর মত, আফ্রিকান ওয়াটার শেভরোতেইন, তারা ঠিক যেভাবে এখন আচরন করে।এই পানিতে থাকা আংশিক জীবন সম্ভবত তিমির পুর্বসুরীদের পুরোপরি জলবাসী হবার পথের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

ছবি ১২ প্রাচীন আর্টিওডাকটাইল Indohyus  থেকে আধুনিক তিমির বিবর্তনে ট্রানজিশনাল ফর্মগুলো (Balaena  হচ্ছে আধুনিক বালিন তিমি, যার একটি ভেস্টিজিয়াল (অতীতে ব্যবহৃত হতো এমনি একটি অঙ্গ) কোমরের হাড় বা পেলভিস ও পেছনের পা আছে, অন্যগুলো সব ট্রানজিশনাল জীবাশ্ম); হালকা ধুসর শেডিং দিয়ে বোঝানো হয়েছে প্রজাতিগুলোর আপেক্ষিক আকার। (সুত্র: Jerry Coyne, Why Evolution is True)

Indohyus  তিমির পুর্বসুরী না, কিন্তু প্রায় নি:সন্দেহে তার নিকটাত্মীয়।কিন্তু আমরা যদি আরো ৪ মিলিয়ন বছর আগে ৫২ মিলিয়ন বছর আগে যাই, আমরা যা দেখতে পাই সেটাই খুব সম্ভবত তিমির পুর্বসুরী হতে পারে; প্রায় নেকড়ে সমান একটি প্রানী Pakicetus এর মাথার খুলির জী্বাশ;  যা Indohyus এর চেয়ে আরো বেশী তিমি সদৃশ; যাদের সাধারন সরল দাত ছিল এবং এবং তিমিদের সদৃশ শ্রবণাঙ্গ বা কান ছিল।তাসত্ত্বেও আধুনিক তিমিদের সাথে Pakicetus  এর চেহারার কোন মিল কিন্তু খুজে পাওয়া যাবেনা, সুতরাং যদি সেই সময় বেচে থাকতেন, আপনি নিজেও ধারনা করতে পারতেন না এই প্রানীটি বা অথবা এর কোন নিকটাত্মীয় প্রজাতি একসময় নাটকীয় একটি বিবর্তনীয় বিভাজনের জন্ম দেবে। এরপর, দ্রুত ধারাবাহিকভাবেই বেশ কিছু জীবাশ্ম প্রজাতির আমরা দেখা পাই যারা ক্রমান্বয়ে জলজ হয়েছে সময়ের সাথে। ৫০ মিলিয়ন বছর আগে যেমন ছিল, বিস্ময়কর আদি তিমি প্রজাতির Ambulocetus (এই নামের অর্থ হাটতে পারে এমন তিমি), যার লম্বাটে মাথার খুলি ও বেশ খানিকটা ছোট হয়ে আসা তবে তখনও শক্ত পা, যা শেষ প্রান্তে তখনও ছিল খুর, যা তাদের বংশপরিচয়ের (Archidactyl) ইঙ্গিত দেয়। এটি সম্ভবত বেশীর ভাগ সময়ই কাটাতো পানিতে, ডাঙ্গায় হাটতে পারতো তবে সম্ভবত সেটা খানিকটা বেকায়দায়, হয়তো অনেকটাই সীল মাছের মত। Rodhocetus ( ৪৭ মিলিয়ন বছর আগে) ছিল আরো বেশী জলজ, এর নাকের ফোটা পেছন দিকে সরে গিয়েছিল, (মাথার উপরের দিকে), এর মাথার খুলি ছিল আরো লম্বাটে, এছাড়া মেরুদন্ডের হাড়গুলো থেকে মোটা প্রক্ষেপন ছিল লেজের মাংশ পেশীগুলোকে (যারা সাতারে সাহায্য করতো) মজবুত একটা নোঙ্গর দেবার জন্য। Rodhocetus অবশ্যই ভালো সাতারু ছিল, কিন্তু স্থলে ছোট আকারের পেলভিস এবং  পায়ের জন্য এটি হাটা চলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা ছিল ।এই প্রানীটি অবশ্যই তাদের বেশীর ভাগ সময়ই কাটিয়েছে সমুদ্রে।অবশেষে ৪০ মিলিয়ন বছর আগে আমরা BasilosaurusDorudon এর জীবাশ্ম খুজে পাই, এদের খাটো ঘাড়, মাথার উপরে ব্লোহোল বা নাকের ছিদ্র সহ এরা স্পষ্টভাবে পুর্ণাঙ্গ জলবাসী স্তন্যপায়ী। পানির বাইরে এরা এরা কোন সময় কাটাতে পারার কথা না, কারন তাদের কোমর এর পেলভিস এবং পেছনের পা আরো হ্রস্বকায় ছিল ( ৫০ ফুট লম্বা Dorudon এর পায়ের দৈর্ঘ মাত্র ২ ফুট) এবং যা বাকী কংকাল কাঠামোর সাথে সংযুক্তও ছিল না।


ছবি: -Pakicetus এর একটি জীবাশ্ম কাষ্ট, ৪৮ মিলিয়ন বছর আগে এই স্থলবাসী মাংশাসী নেকড়ে সদৃশ প্রানীটি পানিতে শিকার করতো, এরাই তিমি দের পুর্বসুরী প্রানী। (উইকিপেডিয়া)


ছবি: Ambulocetus natans ; এটি িএকটি  ট্রানজিশনাল জীবাশ্ম , স্থলবাসী স্তন্যপায়ী থেকে জলজ আদি তিমি (সৃত্র: উইকিপেডিয়া)


ছবি: শিল্পীর চোখে রোডোসিটাস (৪৭ মিলিয়ন বছর পুরোনো এই বিলুপ্ত আদি তিমি প্রজাতির জীবাশ্মর সন্ধান মিলেছিল পাকিস্থানে বেলুচিস্থান প্রদেশে; (উইকিপেডিয়া)


ছবি: Dorudon atrox ( পেলভিস এবং পেছনের পা ভেস্টিজিয়াল) (উইকিপেডিয়া)


ছবি: Basilosaurus cetoides  লেট ইকোসিন পর্বে সমুদ্রের এই সুবিশাল আদি তিমির প্রজাতি লম্বায় প্রায় ৬০ ফিট হত। অনেকগুলো প্রজাতির জীবাশ্ম মিলেছে পাকিস্থান এবং মিশর থেকে, মিশরের বিখ্যাত ওয়াদি আল হিতান বা Valley of Whale থেকে খুজে পাওয়া গেছে Basilosaurus  সহ অসংখ্য তিমি প্রজাতির জীবাশ্ম, যা তিমির বিবর্তনকে বুঝতে সাহায্য করেছে জীবাশ্মবিদদের। জায়গাটি বর্তমানে UNESCO world heritage site হিসাবে স্বীকৃত। (উইকিপেডিয়া)

স্থলবাসী প্রানী থেকে তিমির বিবর্তন বিস্ময়কভাবেই দ্রুততায় ঘটেছে: বড় বড় সব ঘটনাগুলো গঠেছে মাত্র ১০ মিলিয়ন বছরের সময়কালের মধ্যে।শিম্পান্জিদের সাথে আমাদের কমন বা সাধারন পুর্বপুরুষ থেকে আলাদা হবার সময়কাল অপেক্ষা এই সময়কাল খুব একটা বেশী দীর্ঘ না, আর  এই ট্রানজিশনের সময় আমাদের দেহের পরিবর্তনের পরিমান তুলনামুলকভাবে বেশ কম।তারপরও সমুদ্রে জীবন যাপনের মত অভিযোজনের ব্যাপারটি কিন্তু একেবারে আনকোরা নতুন কোন বৈশিষ্টর উদ্ভবের কিন্তু দেখা যায়নি – যা হয়েছে তা হলো পুরোনো বৈশিষ্টগুলোর খানিকটা রদবদল ।

কিন্তু কেন কিছু প্রানী স্থল থেকে আবার পানিতে ফিরে গিয়েছিল? আর যাই হোক এর বহু মিলিয়ন বছর আগে তারাতো পানি থেকে ডাঙ্গায় আগ্রাসনের মাধ্যেমে স্থলবাসী হয়েছিল। বিষয়টি কারন সম্বন্ধে আমরা এখন নিশ্চিৎ নই, কেন এই পেছনমুখী প্রত্যাবর্তন, কিন্তু বেশ কিছু কারন প্রস্তাব করা হয়েছে ধারনাগত দৃষ্টিকোন থেকে।একটি সম্ভাবনা হলো ডায়নোসরদের বিলুপ্তি, বিশেষ করে তাদের ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক সদস্যরা , মাছভোজী মোসাসউর, ইকথাইওসোর এবং প্লেসিওসররা।জলজ স্তন্যপায়ী প্রানীদের  এই প্রানীগুলোর খাদ্য নিয়ে কোন প্রতিদ্বন্দীতাই শুধু করতো না এদেরও তাদের খাদ্য বানাতো।এই সরীসৃপদের সাথে প্রতিদ্বন্দীতা বিলুপ্ত হলে, তিমির পুর্বপুরুষরা হয়তো একটি চমৎকার জায়গা খুজে পেয়েছিল, যেখানে তাদের শিকারী কোন প্রানীর ভয়তো ছিলই না, এছাড়া ভরা ছিল খাদ্যে।সুতরাং সমুদ্র নতুন করে আগ্রাসিত হবার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল।সব সুবিধাই ছিল মাত্র কয়েকটি মিউটেশন দুরে।

পরিশেষে: জীবাশ্ম কি বলছে?

যদি এই পর্যায়ে আপনি জীবাশ্ম নিয়ে আলোচনায় বেশী ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে নিজেকে স্বান্তনা দিতে পারেন এই বলে যে, আমি আরো শত শত উদহারণ বাদ দিয়েছি আলোচনা থেকে, যারা বিবর্তন প্রক্রিয়াটি  প্রদর্শন করছে। সরীসৃপ থেকে স্তন্যপায়ীদের একটি ক্রমবিবর্তন হয়েছে, এবং এর স্বপক্ষে আগে অসংখ্য চিহ্নিত ও বর্ণিত জীবাশ্ম সিরিজ, যাদের অন্তর্বতীকালীন প্রজাতি হিসাবে আছে স্তন্যপায়ী প্রানী সদৃশ সরীসৃপ, তারা অনেক বই এর মুল বিষয়। এছাড়া আছে ঘোড়ারা, একটি বিবর্তনী শাখা যা সুচনা করেছিল ছোট, পাচটি পায়ের আঙ্গুল বিশিষ্ট পুর্বসুরী প্রানী প্রজাতি থেকে, সেখান থেকে ক্রমেই বিবর্তিত হয়েছে আজকের গর্বিত প্রজাতি হিসাবে।এবং এছাড়াও অবশ্যই আছে মানুষের জীবাশ্ম রেকর্ড, যা আমি বর্ণনা করেছি ৮ নং অধ্যায়ে, নি:সন্দেহে যা বিবর্তনী ভবিষ্যদ্বানীর সত্য প্রমানিত হবার উদহারণ।

ছবি ১৩ ট্রানজিশনাল পতঙ্গ বা ইনসেক্ট: একটি আদি পিপড়া, যা এর প্রাকধারনাকৃত বা প্রেডিক্টেড পুর্বসুরী প্রজাতি ওয়াস্প বা বোলতার প্রাচীন বৈশিষ্টগুলো ( ছবিতে খোল ত্রিভুজাকৃতির চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়েছে) এবং বিবর্তিত পিপড়ার বৈশিষ্টগুলো প্রদর্শন করছে ( পুর্ণ ত্রিভুজ); একটি মাত্র নমুনা এই Sphecomyrma freyi  প্রজাতির পাওয়া গেছে প্রায় ৯২ মিলিয়ন বছরের পুরোনো অ্যাম্বার এ সংরক্ষিত অবস্থায়। (সুত্র: Jerry Coyne, Why Evolution is True)

একটু বেশী মাত্রায় একই কাহিনী বলার ঝুকি নিয়ে আমি সংক্ষেপে উল্লেখ করছি আরো কিছু গুরুত্বপুর্ণ ট্রানজিশনাল ফর্ম। প্রথমটি একটি পতঙ্গ। গঠনগত অ্যানাটোমির সদৃশ্যতা দেখে পতঙ্গবিজ্ঞানীরা বহু দিন আগে থেকেই ধারনা করেছিলেন পিপড়া বিবর্তিত হয়েছে  ননসোস্যাল ওয়াস্প বা বোলতাদের থেকে। ১৯৬৭ সালে  ই ও উইলসন এবং তার সহযোগীরা একটি ট্রানজিশনাল পিপড়া খুজে পান, প্রাচীন অ্যাম্বারে সংরক্ষিত অবস্থায়। যা ঠিকই কীটতত্ত্ববিদদের ভবিষ্যদ্বানী করা বোলতার  ও পিপড়ার মত, উভয় প্রানী বৈশিষ্ট্যর একটি মিশ্রন বহন করছে। একই ভাবে বহুদিন আগেই ধারনা করা হয়েছিল সাপ বিবর্তিত হয়েছে লিজার্ড বা গিরগিটি সদৃশ সরীসৃপ থেকে যারা তাদের পা হারিয়ে ফেলেছে, কারন পা সহ সরীসৃপদের জীবাশ্ম রেকর্ডে দেখা গেছে সাপ আবির্ভুত হবার আগেই।২০০৬ সালে পাতাগোনিয়া জীবাশ্ম খননের সময় জীবাশ্মবিদরা আপাতত খুজে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীনতম সাপের জীবাশ্মটির সন্ধান পান, প্রায় ৯০ মিলিয়ন বছর প্রাচীন।ঠিক যেমনটা ভবিষ্যদ্বানী করা হয়েছিল, এর একটি ছোট পেলভিক বা শ্রোনী চক্র এবং হ্রস্বকায় পেছনের পা আছে; কিন্তু সবচেয়ে শিহরণ জাগানো আবিষ্কার সম্ভবত  চীনে খুজে পাওয়া  ৫০০ মিলিয়ন বছর পুরোনো একটি প্রাচীন জীবাশ্ম, যার নাম Haikouella lanceolata, যা দেখতে ছোট ঈল মাছের মত, যা  ফিতার মত পাতলা পিঠের উপর একটি ডর্সাল ফিন ছিল, কিন্তু এছাড়াও এর ছিল একটি মাথা, মগজ, হৃদপিন্ড এবং এর পিঠ বরাবর একটি তরুনাস্থির একটি সরু দন্ড – নটোকর্ড। যা এটিকে চিহ্নিত করেছে সম্ভবত সবচেয়ে পুরোনো কর্ডেট হিসাবে, যে গ্রুপটি পরবর্তীতে বিবর্তিত করেছে সকল মেরুদন্ডী প্রানী, আমরা সহ।এই জটিল সম্ভবত মাত্র ১ ইন্চি লম্বা প্রাণীর মধ্যেই হয়তো রয়েছে আমাদের নিজেদের বিবর্তনের শিকড়।

জীবাশ্ম থেকে পাওয়া তথ্যর রেকর্ড আমাদের তিনটি জিনিস শেখায়। প্রথমত, এরা স্বশব্দে সুস্পষ্টভাবে দ্বিধাহীনভাবে বিবর্তনের কথা বলে, পাথরের এই রেকর্ড বিবর্তন তত্ত্বর বেশ কিছু ভবিষ্যদ্বানীকে সত্য প্রমানিত করেছে : বংশধারায় বা কোন লিনিয়েজে ধীরে ধীরে পরিবর্তন, লিনিয়েজের দ্বি বিভক্ত হওয়া এবং খুবই ভিন্ন ধরনের প্রানীদের মধ্যে অন্তবর্তীকালীন বা ট্রানজিশনাল প্রজাতিদের অস্তিত্ব।এই প্রমানকে এড়ানো সম্ভব না, বাতিল করে দেয়া সম্ভব না। বিবর্তন ঘটেছিল, এবং অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পেরেছি কিভাবে সেটা ঘটেছে।

দ্বিতীয়ত: আমরা যখন ট্রানজিশনাল প্রজাতি খুজে পাই, তখন জীবাশ্ম রেকর্ডে তাদের যেখানে থাকার দরকার সেখানেই ঠিক তাদের সন্ধান মেলে, সবচেয়ে  প্রাচীন পাখির আবির্ভাব হয়েছিল ডায়নোসরদের বিবর্তনের পরে কিন্তু আধুনিক পাখির আবির্ভাবের আগে। আমরা দেখেছি আদি পুর্বসুরী তিমি প্রজাতিরা বিস্তার করে আছে সমুদ্র সম্বদ্ধে একেবারে অনভিজ্ঞ তাদের নিজস্ব পুর্বসুরী থেকে আধুনিক তিমিদের জীবাশ্ম রেকর্ডের সেই শুন্যস্থানে, যদি বিবর্তন না হত, তাহলে যে ক্রমানুসারে জীবাশ্ম পাওয়া গেছে সেটি ঘটতো না আদৌ। জীবাশ্ম রেকর্ড এমনভাবেই আছে যা বিবর্তন প্রক্রিয়াকে প্রমানিত করে । মেজাজী বিজ্ঞানী জে বি এস হ্যালডেন কে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,আমরা  ঠিক কি ধরনের পর্যবেক্ষনের সন্ধান পেলে  নি:সন্দেহে বিবর্তন প্রক্রিয়াকে ভুল প্রমান করতে পারবো, কথিত আছে তিনি প্রায় গর্জন করে উঠে বলেছিলেন, প্রিক্যামব্রিয়ান পর্বে খরগোশের জীবাশ্ম ( প্রি ক্যামব্রিয়ান হচ্ছে ভুতাত্ত্বিক পর্বে যা শেষ হয়েছে ৫৪২ মিলিয়ন বছর আগে); বলাবাহুল্য প্রিক্যামিব্রয়ান কোন খরগোশ বা অন্য কোন সময়ানুযায়ী বিষম  বা অ্যানাক্রোনিষ্টিক কোন জীবাশ্ম কখনোই পাওয়া যায়নি।

সবশেষে, বিবর্তনীয় পরিবর্তন, এমনকি কোন বড় ধরনের, প্রায় সবসময়ই পুরোনো বিদ্যমান বৈশিষ্টগুলোকে নতুন করে রিমেডেলিং এর মাধ্যমেই ঘটে থাকে, স্থলবাসী প্রানীদের পা পুর্বসুরী মাছদের মোটা লিম্ব এর একটি প্রকরণ। স্তন্যপায়ী প্রানীদের কানের মধ্যবর্তী অংশে ছোট ছোট হাড়গুলো তাদের সরীসৃপ পুর্বসুরীদের রুপান্তরিত চোয়ালের হাড়।পাখীদের ডানা তৈরী হয়েছে ডায়নোসরদের পাগুলোকে রিমডেল করার মাধ্যমে আর তিমিরা হচ্ছে যেন টেনে লম্বা করা স্থলবাসী প্রানী যাদের সামনের পা রুপান্তরিত হয়েছে প্যাডেল এ এবং নাকের ছিদ্র সরে এসে জায়গা নিয়েছে মাথার উপরে।

সেজন্য কোন কারনই নেই, কেন একজন স্বর্গীয় পরিকল্পনাকারী বা নকশাবিদ, কোন স্থপতির মত একেবারে শুরু থেকে আনকোরা নতুন করে দালান পরিকল্পনা করার বদলে, নতুন প্রজাতি তৈরী করবেন এর আগের প্রজাতিদের মধ্যে বিদ্যমান বৈশিষ্টগুলোকে খানিকটা রদবদল করে। প্রতিটি প্রজাতি গড়ে পিটে তৈরী করা যেতে পারে একেবারে শুরু থেকে; কিন্তু প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করতে পারে শুধুমাত্র বিদ্যমান বৈশিষ্টগুলোকেই পরিবর্তন বা রদবদল করার মাধ্যমে।নতুন কোন বৈশিষ্টকে এটি ম্যাজিকের মত শুন্য থেকে সৃষ্টি করতে পারেনা। সেকারনেই ডারউইনবাদ ভবিষ্যদ্বানী করে যে, নতুন প্রজাতিগুলো হবে পুরোনো প্রজাতিগুলোর রুপান্তরিত একটি সংস্করণ। আর জীবাশ্ম রেকর্ড, এই পুর্বধারনার পক্ষে সমর্থন যুগিয়েছে যথেষ্ট পরিমানে।

____ আপাতত সমাপ্ত____________

Advertisements
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: শেষ পর্ব

14 thoughts on “যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: শেষ পর্ব

  1. অসাধারণ মাহবুব ভাই। আরও বেশ কয়েকবার পড়তে হবে না হলে মাথায় ঢুকবে না। দুর্বল মস্তিষ্ক……;পি
    ভিডিওটা দেখতে পারলাম না। YouTube বন্ধ করে দিয়েছে মনে হয়। দেখা যায় না কিছু।
    বাকি পর্বও সবগুলো পড়া হয়নি। সব পড়তে হবে ছাড় নাই এখন।

    অনেক ধন্যবাদ।

  2. হাসান ভাই, আমি আপনার লেখার একজন ভক্ত। আপনার লেখার বিষয় বস্তু আমার অনেক অনেক ভাল লাগে।

    অনেক কিছুই বুঝতে পারি না, সত্য কিন্তু আপনার গবেষনা দেখে মুগ্ধ হই। আপনার প্রচেষ্টা চলুক।

    আপনার পড়াশুনা কোন বিষয়ে। সরি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম। জানতে ইচ্ছা হল।

    শুভেচ্ছা।

    1. অনেক অনেক ধন্যবাদ…. আমার পড়াশুনা প্রথমে চিকিৎসা বিজ্ঞান,এর পর ভাইরোলজী তার পর সংক্রামক ব্যাধী রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য, মোটামুটি একটু খিচুড়ী ধরনের, 🙂
      এখন অবশ্য গবেষনা ইনফ্লুয়েন্জা ভাইরাস নিয়ে;

  3. হাসান ভাই, এখানে দেখেন। আপনার প্রায় সব লেখা মেরে দিচ্ছে। কত নিলজ্জ দেখে আসুন। আমাদের অনেকের লেখা সে মেরেই যাচ্ছে।
    http://ontorebd.com/category/articles/
    আপনার অনেক লেখা দেখলাম।

    1. অনেক ধন্যবাদ, আমি বিভিন্ন জায়গায়, তাদের ফেসবুক পেজে প্রতিবাদ জানালাম। কষ্ট করে লেখা কোন কিছু যখন প্রয়োজনীয় রেফারেন্স ছাড়া কেউ ব্যবহার করে আরো কষ্ট হয় খুব।
      কিন্তু এধরনের মানুষের কাছে সামান্য নৈতিকতা আশা করাও কঠিন;

  4. হাসান ভাই, আপনার লেখা চুরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের অনেকের লেখা সে চুরি করেই যাচ্ছে।
    http://ontorebd.com/category/articles/
    দেখে আসুন।

    চোর নং ১ (মাঝে কিছুদিন অনেক কিছু মুছে ফেলেছিল, এখন দেখছি আবার)
    http://wp.me/P1KRVz-f5

  5. কত বড় বিবেখীন দেখেন, আমাদের সামান্য পারমিশন বা জানিয়েও সে কাজটা করছে না। রি ব্লগিং করলে আমাদের যে নাম উঠে তাও সে মুছে দিয়েছে। মানে মনে হয় সেই এই লেখার লেখক। এটা ডাইরেক্ট চুরি। লজ্জাহীন।

    আমাদের কিছু করার দেখছি না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s