যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: শেষ পর্ব

শীর্ষ ছবি ১: পাকিস্থান ও মিশরে কিছু রহস্যময় প্রজাতির জীবাশ্ম আবিষ্কার করার আগ পর্যন্ত্য জীবাশ্মবিদ ফিলিপ গিঙরিচ (Philip Gingerich) এর তিমি র বিবর্তনে বিশেষ কোন আগ্রহই ছিল না; ১৯৭৮ সালে পাকিস্থানের উত্তরাঞ্চলে প্রথম ঘোড়ার সম্ভাব্য পুর্বসুরী প্রজাতির জীবাশ্ম খোজার সময় তার সহযোগীরা খুজে পান একটি নেকড়ে সদৃশ প্রানীর মাথার খুলি; পরে পুর্ণাঙ্গ জীবাশ্ম প্রজাতিটির নাম দেয়া হয় Pakicetus inachus যার ব্রেইন এর আকৃতি এবং কানের বিশেষ গঠন দেখেই তিনি এর সাথে তিমির প্রথম যোগসুত্রটি করেন। পরে আরো কিছু জীবাশ্ম (যেমন মিশরের মরুভুমিতে পাওয়া  Bacilosaurus এবং পাকিস্থানে Rhodocetus Maiacetus) এবং বিজ্ঞানের নানা শাখা থেকে সংগ্রহ করা প্রমান ও তার তিন দশকের গবেষনা প্রথম বারের মত সুস্পষ্টভাবে প্রমান করে প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর আগে েইকোসিন পর্বে স্থলবাসী স্তন্যপায়ী আর্টিওডাকটাইল বা Even-Toed Ungulates ( বা ইভেন টোড: যাদের জোড় সংখ্যার পায়ের আঙ্গুল থাকে ও শরীরের ভার তাদের তৃতীয় এবং চতুর্থ পায়ের আঙ্গুল সমানভাবে বহন করে, আর আঙ্গুলেটস বলতে সেই সব প্রানী যা যাদের পায়ের আঙ্গুলের নোখে কেরাটিন এর শক্ত একটি অংশ থাকে, যাকে Hoof বা খুর বলা হয়, যেমন গরু, উট, শুকর ইত্যাদি , ঘোড়ারাও আঙ্গুলেট তবে তারা অড টোড বা তাদের বেজোড় সংখ্যক পায়ের আঙ্গুল থাকে, শরীরের ভার মুলত বহন করে তৃতীয় আঙ্গুলটি , এছাড়াও আর্টিওডাকটাইলদের বেশ কিছু  বৈশিষ্ট আছে) পুর্বসুরী থেকে Cetacean ( তিমি,ডলফিন ও পরপয়েস) বর্গের স্তন্যপায়ীরা বিবর্তিত হয়েছিল। আজকের সিটাসিয়ান যেমন তিমি রা সম্পুর্ণ জলজ প্রানী তবে আদি সিটাসিয়ানরা ছিল উভচরী; ভারত এবং পাকিস্থান থেকে পাওয়া জীবাশ্মগুলো ধারাবাহিক এই বিবর্তনের অন্তর্বতী কালীন সবগুলো পর্যায়কে বর্ণনা করতে সহায়তা করেছে, কিভাবে িএকটি স্থলবাসী প্রানী ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত হয়ে তিমি ও সমগোত্রীয় জলজ প্রানীতে। (Photo: Eric Bronson, U-M Photo Services.)

শীর্ষ ছবি ২: সিটাসিয়ান (Cetacean) দের বিবর্তনের দুটি গুরুত্বপুর্ণ জীবাশ্ম খুজে পাওয়ার টিমটির নেতৃত্ব দেন জে জি এম থেউইসেন; উপরের ছবিটিতে পাকিস্থান থেকে খুজে পাওয়া ১৯৯২ সালের একটি ট্রানজিশনাল তিমি র জীবাশ্ম Ambulocetus natans , যা  স্থলবাসী আদি সিটাসিয়ানদের সাথে সম্পুর্ণ জলজ সিটাসিয়ানদের একটি যোগসুত্র; (মধ্য ইকোসিন পর্বে ,প্রায় ৪৮ -৫০ মিলিয়ন বছর আগে এরা বেচে ছিল,এদের পেছনের কর্মক্ষম পা ছিল ও তারা হাটতে পারতো এবং সাতারও কাটতে পারতো। জলবাসী হওয়া সত্ত্বেও এটা ডাঙ্গায় তাদের জীবনের একটি যোগসুত্র রক্ষা করতো) নীচের ছবিতে থেউইসেন এর খুজে পাওয়া আরেকটি গুরুত্বপর্ণ ফসিল, যাকে বলা যেতে পারে মিসিং লিঙ্ক, Indohyus ; সিটাসিয়ানদের প্রাচীনতম (“৪৮ মিলিয়ন বছর আগে) পুর্বসুরী প্রানী; আদি সিটাসিয়ান ( যেমন Pakicetus) দেরএকটি আত্মীয় গ্রুপ যা পুর্ববর্তী আর্টিওডাকটাইলদের থেকে আদি সিটাসিয়ানদের বিবর্তনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে। পরবর্তী ১০ মিলিয়ন বছরে মুলত স্থলবাসী স্তন্যপায়ীদের থেকে পুরোপুরি পানিতে বসবাসের উপযোগী হয়ে বিবর্তিত হয়  সিটাসিয়ানরা; কাশ্মিরের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ভারতীয় ভুতত্ববিদ এ রঙ্গা রাও এর সংগ্রহ করা পাথর থেকে থেউইসেন টীম উদ্ধার করেন এই প্রজাতির জীবাশ্মটিকে। Indohyus কে মিসিং লিঙ্ক বলতে নারাজ যারা যেমন ফিলিপ জিনজারিচ, তাদের মতে এই মিসিং লিঙ্কটি ৫৬ মিলিয়ন বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া মেসোনাইকিয়া পরিবার, যেমন তার টীমের খুজে পাওয়া একটি জীবাশ্ম প্রজাতি Sinonyx  (ছবি:ইন্টারনেট);

শীর্ষ ছবি ৩: Indohyus ;  শিল্পীর চোখে; (ছবি সুত্র)

শীর্ষ ছবি ৪: শিল্পী কার্ল ব্রুয়েল এর আকা Ambulocetus natans ( যার নামের অর্থ হাটতে ও সাতার কাটতে পারে  এমন একটি তিমি) (ছবি সুত্র)

তিমি র বিবর্তন নিয়ে একটি ভিডিও : 

শীর্ষ ছবি ৫:  তিমির বিবর্তন: প্রায় ৫০মিলিয়ন বছরের আগে িইকোসিন  ইপোকে বর্তমান স্পেন থেকে েইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অপেক্ষাকৃত অগভীর সমুদ্র ছিল। এই সময়েই সিটাসিয়ানরা যেমন বর্তমান তিমির পুর্বসুরী প্রজাতিরা জলে প্রত্যাবর্তন করে। তখনও ভারত একটি দ্বীপ, ইউরেশিয়ার ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হয়নি, তৈরী হয়নি হিমালয়, পাকিস্থান কেবল ভারতের একটি উপকুল অঞ্চল; আদি তিমিদের জীবাশ্মগুলোর অনেকগুলোই এখানেই সন্ধান পাওয়া গেছে। আদি তিমিদের তখন দেখলে বর্তমান বিশাল তিমিদের সাথে বাহ্যিক কোন মিল চোখে পড়তো না, তারা তাদের লেজ দিয়ে সাতার কাটতো না, পরিবর্তিত পা দিয়ে তারা সাতার কাটতে শিখেছিল এবং ক্রমেই তারা পেছনের পা হারায়, সামনের পা পরিনত হয় প্যাডেল, লেজ ফ্লুক বিবর্তন হয় সাতারের জন্য। এখনও তিমিরা তার বিবর্তনীয় অতীতের চিহ্ন বহন করছে। (ছবি সুত্র)

________________________

(এটি মুলত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন জীনতত্ত্বর অধ্যাপক জেরি কয়েন  ( Jerry A. Coyne) এর Why Evolution is true  বইটির দ্বিতীয় অধ্যায় Written in the Rocks এর একটি অনুবাদ প্রচেষ্টা; বইটির প্রথম অধ্যায় What is Evolution? এর অনুবাদ বিবর্তন কি? আছে এখানে))

 

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : প্রথম পর্ব
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : দ্বিতীয় পর্ব
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : তৃতীয় পর্ব
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : চতুর্থ পর্ব

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে :
((((শেষ পর্ব))))

জলে প্রত্যাবর্তন : তিমি’র বিবর্তন

ডুয়ান গিশ, যুক্তরাষ্ট্রের একজন সৃষ্টিবাদী, যিনি বিবর্তন  তত্ত্বকে আক্রমন করে দেয়া তার জনপ্রিয় এবং প্রানবন্ত ( যদিও অত্যন্ত ভ্রান্ত ধারনা প্রসুত) বক্তৃতাগুলোর জন্য খুবই পরিচিত ।আমি তার একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম একবার, যখন গিশ তিমি , গরুদের সাথে সম্পর্ক আছে এমন স্থলবাসী প্রানী থেকে বিবর্তিত হয়েছে জীববিজ্ঞানীদের প্রমান করা এই তত্ত্বটিকে নিয়ে উপহাস করছিলেন। কিন্তু কিভাবে? তিনি জানতে চেয়েছিলেন, এধরনের বিবর্তনীয় পরিবর্তন বা ট্রানজিশন আসলে হওয়া সম্ভব, কারন এর অন্তবর্তীকালীন সব প্রজাতিগুলো জলে কিংবা স্থলে কোথাও তো ভালো ভাবে অভিযোজিত বা খাপ খাওয়াতে পারার তো কথা না, সুতরাং প্রাকৃতিক নির্বাচন এ ধরনের কোন কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না (এটি পাখিদের বিবর্তনের বিরুদ্ধে সেই অর্ধেক ডানা’র যুক্তির মত) ?  তার বক্তব্য আরো ভালো করে বোঝানোর জন্য গিশ একটি মারমেইড বা মৎসকুমারীর মত একটি বিচিত্র প্রানীর কার্টুন করে আকা একটি স্লাইড প্রদর্শন করেন, যার সামনের অংশ ছোপ ছোপ দাগ ওয়ালা একটি গরু আর পেছনের অংশ মাছ ; স্পষ্টতই মনে হচ্ছে প্রানীটি তার বিবর্তনীয় নিয়তি নিয়ে হতভম্ব,অভিযোজনে সুস্পষ্টভাবেই  ব্যর্থ  এই প্রানীটি কোন সাগরের পানির প্রান্তে দাড়িয়ে আছে, আর তার মাথার উপর বড় করে আকা একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ।কার্টুনটি তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পুরনে সফল হয়েছিল: দর্শকদের মধ্যে তাৎক্ষনিক হাসির রোল পড়ে গেল, তারা ভাবলেন, কত বড় নির্বোধ  হতে পারে এই বিবর্তনবাদীরা?

Continue reading “যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: শেষ পর্ব”

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: শেষ পর্ব