যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: চতুর্থ পর্ব


শীর্ষছবি ১:  কোন জীবাশ্মকে যদি সেলিব্রিটির মর্যাদা দেয়ার কথা ভাবা হয় তবে তার প্রথম দাবীদার অনায়াসে হতে পারে Archaeopteryx lithographica (উপরের ছবিটি আর্কিওপটেরিক্স এর বার্লিন স্পেসিমেন) জীবাশ্ম রেকর্ডে আপাতত খুজে পাওয়া এটি আদিমতম পাখি (তবে তার সেই অবস্থান এখন চ্যালেন্জ এর মুখে); ১৮৬১ সালে জার্মানীর শনহোফেন লাইমস্টোন কোয়ারীতে খুজে পাওয়া আর্কিওপটেরিক্স আকারে প্রায় ১.৬ ফুট মত লম্বা হত।  জীবাশ্মটির বয়স প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর, জুরাসিক পর্বের ঠিক শেষ দিকে; পাখির মত পালক সহ ডানা অথচ ডায়নোসরের মত দাতযুক্ত চোয়াল, দীর্ঘ লেজ প্রথম ইঙ্গিত দিয়েছিল পাখিরা ডায়নোসরদের থেকে বিবর্তিত হয়েছে। যদিও সেই সময়ের বিজ্ঞানীরা প্রস্তুত ছিলেন না সেই যোগাযোগটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তবে সেই ১৮৭০ সালে টমাস হাক্সলি, প্রথম এর পাখি আর ডায়নোসরের মধ্যে যোগসুত্রটি িউল্লেখ করেন, পরে ৭০ এর দশকে, প্রায় ১০০ বছর পর আবার বিষয়টি আলোচনায় নিয়ে আসেন ইয়েল বিশ্বাবদ্যালয়ের জন এইচ ওস্ট্রম। সেই বিতর্কটি অমীমাংসিত থেকে নব্বই এর দশকের মাঝামাঝি অবধি, এরপর চীনে জীবাশ্মবিদরা একের পর এক অসাধারন সব জীবাশ্ম খুজে বের করেন, যা পরবর্তীতে আরো দৃঢ়ভাবে প্রমান করে স্থলবাসী,ক্ষিপ্রগতির, মাংশাসী থেরোপড ডায়নোসরদেরই বংশধর আজকের পাখিরা। তবে এটাও প্রমান হয়, পাখিদের বিশেষ বৈশিষ্টগুলোও আসলে পাখিদের বিবর্তনের অনেক আগে বিবর্তিত হয়েছিল থেরোপড ডায়নোসরদের মধ্যে। আর পাখিদের বিবর্তনের সাথে তাদের উড়বার ক্ষমতার বিবর্তন ঘটেছিল তারও পরে।  (ছবিসুত্র:  উইকিপেডিয়া);


শীর্ষ ছবি ২: ২০১১ সালে চীনে খুজে পাওয়া জীবাশ্ম  Xiaotingia zhengi  প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন বছর আগে; আর্কিওপটেরিক্স এর মত এর কিছু বৈশিষ্ট আছে আবার পালকযুক্ত অন্য ডায়নোসরদের সাথে  এর বেশ মিল আছে। এটি আবিষ্কারের পুর্বে প্রথমদিককার পাখি হিসাবে আর্কিওপটেরিক্স এর অবস্থানটি খানিকটা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। কারন সিস্টেম্যাটিক্স এ  আর্কিওপটেরিক্স এর অবস্থান ছিল প্রাচীন তম পাখি সদৃশ অ্যাভিয়ালান হিসাবে ( যদিও আর্কিওপটেরিক্স কিংবা িএটি সরাসরি পাখিদের পুর্বসুরী প্রানী হয়, তবে এরা ট্রানজিশনাল প্রজাতির চমৎকার উদহারণ), এটির ডাটা যোগ হবার পর এর অবস্থান পাখিদের থেকে খানিকটা দুরে  Deinonychosaurs দিকে নিয়ে এসেছে আর সেই সাথে এটিও আর্কিওপটেরিক্সকেও বের করে এনেছে তাদের গ্রুপে। (সুত্র : Nature);


শীর্ষ ছবি ৩: ১৯৯৫/৯৬ সালে চীনে খুজে পাওয়া Sinosauropteryx ( যার অর্থ Chinese reptilian wing বা চীনা সরীসৃপের ডানা কিংবা পালক) একটি জীবাশ্ম; এটাই প্রথম পাখি ও তাদের নিকট প্রজাতিগুলো বা Avialae গোষ্ঠীর বাইরে খুজে পাওয়া প্রজাতি, যাদের পালক বা এর আদি একটি সংস্করণ ছিল। এটি প্রমান করেছিল, পাখিদের বিবর্তনের পুর্বেই পাখিদের বেশ কিছু বৈশিষ্ট ও আচরন থেরোপড ডাইনোসরদের প্রজাতিদের মধ্যে বিবর্তিত হয়েছিল। (উইকিপেডিয়া)
______________________

(এটি মুলত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন জীনতত্ত্বর অধ্যাপক জেরি কয়েন  ( Jerry A. Coyne) এর Why Evolution is true  বইটির দ্বিতীয় অধ্যায় Written in the Rocks এর একটি অনুবাদ প্রচেষ্টা; বইটির প্রথম অধ্যায় What is Evolution? এর অনুবাদ বিবর্তন কি? আছে এখানে))

There is no reasonable doubt, however, that all groups of birds, living and extinct, are descended from small, meat-eating theropod dinosaurs, as Huxley’s work intimated more than a century ago. In fact, living birds are nothing less than small, feathered, short-tailed theropod dinosaurs. (K. Padian and Luis  M. Chiappe)

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : প্রথম পর্ব
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : দ্বিতীয় পর্ব
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : তৃতীয় পর্ব

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে :
((((চতুর্থ পর্ব))))

ডায়নোসরদের আকাশ জয় : পাখিদের উদ্ভব

অর্ধেকটা ডানা কিইবা কাজ করতে পারে? সেই ডারউইনের সময় থেকে এই প্রশ্নটি বার বার উত্থাপিত হয়েছে, বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন বিষয়টির দিকে সন্দেহর প্রশ্ন ছুড়ে দিতে।জীববিজ্ঞানীরা আমাদের বলছেন যে, আদি সরীসৃপ থেকে বিবর্তিত হয়েছে পাখীরা, কিন্তু কিভাবে আকাশে ওড়ার ক্ষমতা বিবর্তিত হয়েছে স্থলবাসী একটি প্রানী থেকে? সৃষ্টিবাদীরার যুক্তি দেখান যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন এই ধরনের ট্রানজিশনকে ব্যাখ্যা করতে পারেনা।কারন প্রাকৃতিক নির্বাচন যদি কাজ করে তাহলে তার জন্য প্রয়োজন অন্তর্বর্তীকালীন কিছু পর্যায়, যখন এই প্রানী শুধু মাত্র আংশিক ডানা থাকার কথা, যা সেই প্রানীটিকে বিশেষ নির্বাচনী সুবিধা দেবার বদলে বরং বড় এতটি প্রতিবন্ধকতার বোঝা চাপিয়ে দেবার কথা। কিন্তু আপনি যদি একটু চিন্তা করেন বিষয়টি নিয়ে, তাহলে কিন্তু কঠিন হবে না উড্ডয়নের নানা অন্তর্বতীকালীন ধাপগুলোর কথা কল্পনা করা, যে ধাপগুলো এর ধারনকারী প্রানীদের কিছুটা হলেও উপকৃত করেছে।

গ্লাইডিং বা বাতাসে ভর করে কিছুটা ওড়া অবশ্যই প্রথম একটি ধাপ এবং গ্লাইডিং স্বতন্ত্রভাবে বিবর্তিত হয়েছে বেশ কয়েকবারই : প্ল্যাসেন্টাযুক্ত স্তন্যপায়ীদের কেউ কেউ, মারসুপিয়ালদের কিছু সদস্য এবং এমনকি লিজার্ডদের মধ্যেও।আর উড়ুক্কু কাঠবিড়ালী একাজটা খুবই ভালো পারে শরীরের দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা পাতলা চামড়ার একটি বাড়তি উপাঙ্গের সাহায্যে –  যা  খুবই ভালো একটি উপায় তাদের জন্য এক গাছ থেকে অন্য গাছে যাবার জন্য, বিশেষ করে শিকারী প্রানীদের হাত থেকে বাচতে বা খাদ্যর সন্ধানে। এছাড়াও আছে আরো বিস্ময়কর, উড়ন্ত লেমুর বা কোলুগো , দক্ষিনপুর্ব এশিয়ার, যাদের বেশ দেখার মত লম্বা চামড়ার পর্দা আছে মাথা থেকে একেবারে লেজ পর্যন্ত।কোন  একটি কোলাগোকে দেখা গেছে প্রায় ৪৫০ ফুট দুরত্ব গ্লাইডিং করে অতিক্রম করতে,(যা প্রায় ৬ টি টেনিস কোর্ট সমান লম্বা) মাত্র ৪০ ফুট উচ্চতা হারিয়ে! খুব কিন্তু কঠিন না বিবর্তনের পরবর্তী ধাপটি ভেবে নেয়া:  কোলুগোদের মত লিম্বগুলো ঝাপটানোর মাধ্যমে সত্যিকারের উড্ডয়ন সৃষ্টি করা, যেমন আমরা বাদুড়দের মধ্যে দেখি।কিন্তু আমাদের আর এই ধাপগুলো শুধু কল্পনা করার দরকার নেই: আমাদের কাছ এখন জীবাশ্মর সন্ধান আছে যা স্পষ্টভাবেই দেখাচ্ছে কিভাবে পাখির উড্ডয়ন বিবর্তিত হয়েছিল।

ছবি: ফ্লাইং লেমুর বা কোলুগো (Colugo); মা লেমুর তার শিশুকে নিয়ে গ্লাইডিং করছে। (উইকিপেডিয়া)

উনবিংশ শতাব্দী থেকেই, পাখীদের ও কিছু ডায়নোসরদের কংকালের সদৃশ্যতা জীবাশ্মবিদদের বেশ বিশ্বাসযোগ্যভাবেই প্ররোচিত করেছিল এই দুই গোষ্ঠীর একটি কমন বা সাধারণ পুর্বপুরুষ আছে, এমন একটি তত্ত্ব প্রস্তাব করতে। বিশেষ করে , থেরোপডদের (Theropaud) সাথে,  অত্যন্ত ক্ষিপ্রগতির, মাংশাসী এই ডায়নোসোররা, দুপায়ে ভর করে হাটতো।প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর আগে জীবাশ্ম রেকর্ড এ দেখা যায় অসংখ্য থেরোপড প্রজাতির অস্তিত্ব, তবে  তারাদের কোনটিই এমনকি অস্পষ্টভাবেও পাখি সদৃশ নয়।কিন্তু ৭০ মিলিয়ন বছর আগে, আমরা পাখিদের জীবাশ্ম দেখি এবং যারা বেশ আধুনিক পাখির মতেই দেখতে। যদি বিবর্তন সত্য হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের সরীসৃপ থেকে পাখির ট্রানজিশনটা জীবাশ্ম রেকর্ডে খুজে পাওয়া উচিৎ ৭০ থেকে ২০০ মিলিয়ন বছর পুরোনো শিলা স্তরের কোথাও।

এবং ঠিক সেখানেই তাদের পাওয়া গেছে।পাখি ও সরীসৃপদের মধ্যে প্রথম সংযোগ বা যোগসুত্রকারী প্রজাতিটির জীবাশ্ম সম্বন্ধে কিন্তু আসলেই ডারউইনের জানা ছিল এবং আশ্চর্যজনকভাবে খুব সংক্ষিপ্ত করে তিনি এর বিবরণ দিয়েছিল অরিজিন অব স্পিসিজ এর পরবর্তী সংস্করণগুলোয় এবং তাও শুধু একটি অদ্ভুত ব্যতিক্রম হিসাবে।এটি হয়তো সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রানজিশনাল ফর্ম প্রজাতির উদহারণ: প্রায় একটি কাকের সম আকৃতির জীবাশ্ম প্রজাতি Archaeopteryx lithographica , ১৮৬০ সালে জার্মানীর একটি চুনাপাথরের খনিতে যে জীবাশ্মটিকে খুজে পাওয়া গিয়েছিল (আর্কিওপটেরিক্স নামের অর্থ প্রাচীন ডানা এবং লিথোগ্রাফিকা নামটি এসেছে শনহোফেন লাইমস্টোন থেকে, যা এতো বেশী সুক্ষ্ম দানার যে নরম পালকেরও ছাপও এটি সংরক্ষন করেছে লিথোগ্রাফিক প্লেটে ছাপচিত্রের মত); আর্কিওপটেরিক্স এর মিশ্র বৈশিষ্ট ছিল যেমনটি কোন ট্রানজিশনাল প্রজাতিতে আশা করা যায় এবং এর বয়স, প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন বছর, সময়ের সঠিক পর্বেও এর অবস্থান,যেমনটা আমরা আশা করতে পারি।

আর্কিওপটেরিক্স আসলে পাখীর চেয়ে সরীসৃপ বা রেপটাইলই বেশী, এর কংকাল প্রায় হুবুহু থেরোপড(Theropod) ডাইনোসরদের মত। এবং আসলেই কিছু জীববিজ্ঞানী, যারা খু্ব ভালো করে আর্কিওপটেরিক্স এর জীবাশ্মটি লক্ষ্য করেননি তারা সবাই এর পালকগুলো খেয়াল করতে পারেননি এবং ভুল করে এটিকে থেরোপড হিসাবেই শ্রেণীবিন্যাস করেছিলেন ( ছবি ৯ এ দুটি প্রজাতির মধ্যে পার্থক্যগুলো দেখানো হয়েছে); এর সরীসৃপ বৈশিষ্টর মধ্যে আছে দাত সহ চোয়াল, দীর্ঘ লম্বা হাড় দিয়ে তৈরী একটি লেজ, ধারালো নখর বা ক্ল, ডানায় থাকা আঙ্গুলগুলো আলাদা আলাদা (আধুনিক পাখিদের ক্ষেত্রে যেগুলো একসাথে মিশে যুক্ত হয়ে যায়, যে কোন মুরুগীর পেচিয়ে থাকা ডানা বা উইং কে একটু ভালো লক্ষ্য করলে যা আপনি দেখতে পারবেন) এবং এর কাধটি মাথার খুলির ঠিক পেছন থেকে যুক্ত, নীচ থেকে নয় (আধুনিক পাখিদের যেমন); আর  এর পাখীদের মত বৈশিষ্ট মাত্র ২টি: বড় বড় পালক এবং বীপরিত মুখোমুখি করা যায় এমন পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল, সম্ভবত গাছের উচু ডালে বসার জন্য।এটা এখনও কিন্তু স্পষ্ট নয় যে পুরোপুরি পালক বিশিষ্ট এই প্রানীটি আসলেই উড়তে পারতো কিনা? কিন্তু এদের অসম দৈর্ঘর পালকগুলো – যে পালকের একটি পাশ ছিল অন্য পাশ থেকে বেশী প্রশস্ত ছিল – ইঙ্গিত করছে এটি উড়তে পারতো। অসম পালক, উড়োজাহাজে এর ডানার মত, একটি ’এয়ার ফয়েল’ এর মত আকার সৃষ্টি করতো যা অ্যারোডিনামিক্স বা বায়ুগতিবিদ্যা নির্ভর উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু এমনকি যদিও এটি উড়তে পারতো, আর্কিওপটেরিক্স ছিল মুলত ডায়নোসর। এটা হচ্ছে এমন একটি প্রজাতি যাদের বিবর্তনবিদরা বলেন ’মোজাইক’; পাখী আর সরীসৃপের সব বৈশিষ্ট্যের মাঝামাঝি না হয়ে বরং আর্কিওপটেরিক্স এর কিছু অংশ শুধু পাখির মত, তবে বেশীর ভাগ অংশই ছিল সরীসৃপদের মত।

ছবি ৯ : একটি আধুনিক পাখির (মুরগী), একটি ট্রানজিশনাল প্রজাতি (আর্কিওপটেরিক্স) এবং একটি ছোট দুপেয়ে মাংশাসী থেরোপড ডায়নোসর, Compsognathus  (যা Archaeopteryx  কোন একটি পুর্বপুরুষের মত) এর কংকাল এর তুলনামুলক ডায়াগ্রাম;  Archaeopteryx এর আধুনিক পাখির মত কিছু বৈশিষ্ট আছে ( যেমন পালক এবং বীপরিত মুখোমুখি করা যায় এমন বৃদ্ধাঙ্গুল।কিন্তু এর কংকাল প্রায় ডায়নোসরদের মত, দাত, সরীসৃপের মত কোমর এবং লম্বা হাড়ের লেজ।বড় ধরনের কাকের মত আকার ছিল আর্কিওপটেরিক্সদের, তবে Compsognathus  ছিল আরো  একটু বড়। (সুত্র: Jerry A. Coyne এর Why Evolution is true)

আর্কিওপটেরিক্সদের আবিষ্কারের পর বহু বছর পাখি আর সরীসৃপের মধ্যবর্তী  আর কোন প্রজাতি খুজে পাওয়া যায়নি, ফলে বিশাল একটি শুন্যস্থান ছিল আধুনিক পাখী এবং তাদের পুর্বসুরী প্রানীদের মধ্যখানে। কিন্তু নব্বই দশকে মাঝামাঝি চীনে খুজে পাওয়া অসংখ্য অসাধারণ জীবাশ্ম এই শুন্যস্থানটিকে পুর্ণ করতে সাহায্য করেছে। এই সব জীবাশ্মগুলো পাওয়া গিয়েছিল প্রাচীন হ্রদের পাললিক শিলার স্তরে, যারা এর অস্থি ছাড়াও অন্যান্য নরম কিছু অঙ্গানুকেও সংরক্ষন করেছে সুক্ষভাবে, এই জীবাশ্মগুলো প্রত্যেকটিই চমক লাগানো পালকযুক্ত থেরোপড ডায়নোসরদের গুরুত্বপুর্ণ সংগ্রহ, যা অবশেষে পাখিদের বিবর্তনের বেশ কিছু রহস্যর সমাধান করেছে। এদের মধ্যে কারো শরীর ছিল খুব ছোট ছোট ফিলামেন্টাস বা সুতার মত কিছু গঠন দিয়ে সারা গায়ে যা ঢাকা, এরাই সম্ভবত আদি পালক ।এর মধ্যে একটি বিস্ময়কর প্রজাতি  Sinornithosaurus millenii  (Sinornithosaurus এর অর্থ চীনা পাখি-লিজার্ড), যার সারা শরীর ঢাকা লম্বা পাতলা পালকে, যে পালকগুলো এত ছোট যে, তারা খুব সম্ভবত এটিকে উড়তে কোন সাহায্য করেছে বলে মনে হয় না ( ছবি ১০ ক)।এবং এর দাত, নোখ, লম্বা হাড়ের লেজই বলে দিচ্ছে আধুনিক পাখির সাথে এর সদৃশ্যতা প্রায় নেই।অন্য ডায়নোসরদের মাঝারী আকারের পালক ছিল মাথায় এবং সামনের লিম্ব এ, কারো কারো আবার বড় পালক ছিল সামনের লিম্বে এবং লেজে, অনেকটাই আধুনিক পাখিদের মত।এদের মধ্যে সবচেয়ে নজরকাড়া Microraptor gui  বা “চার পাখা বিশিষ্ট” ডায়নোসর।আধুনিক যে কোন পাখির ব্যতিক্রম  এই অদ্ভুত ৩০ ইন্চি লম্বা প্রানীটি হাতে পায়ে পালক ভরা ছিল, যখন এটি তার দুপাশে এই পালকে ঢাকা লিম্বগুলো ছড়িয়ে ধরতো সম্ভবত এটি তাকে গ্লাইডিং এ সহায়তা করতো (ছবি ১০ খ)।

 ছবি ১০ ক : পালকসহ ডায়নোসর Sinornithosaurus millenii, মুল জীবাশ্ম ( প্রায় ১২৫ মিলিয়ন বছর পুরোনো) চীন থেকে এবং শিল্পীর চোখে এর সম্ভাব্য রুপ। জীবাশ্মতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সুতার মত বা ফিলামেন্টাস পালকের ছাপ, বিশেষ করে মাথায় ও সামনের পায়ে।(সুত্র: Jerry A. Coyne এর Why Evolution is true)


ছবি: Sinornithosaurus millenii  এর জীবাশ্ম (উইকিপেডিয়া)

ছবি ১০ খ: বি অদ্ভুত চার ডানা বিশিষ্ট ডায়নোসর Microraptor gui, যার সামনের ও পিছনের পায়ে লম্বা পালক ছিল; জীবাশ্মতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পালকের ছাপ ( প্রায় ১২০ মিলিয়ন বছর পুরোনো); এখনও স্পষ্ট নয় এই প্রানীকি উড়তে পারতো, নাকি গ্লাইড বা বাসাতে ভর করে খানিকটা উড়তে পারতো, এর পেছনের পাখা, প্রায় নিশ্চিৎভাবে বলা সম্ভব একে মাটিতে অবতরন করতে সাহায্য করতো, যেমনটি ড্রইং এ দেখানো হয়েছে।(সুত্র: Jerry A. Coyne এর Why Evolution is true)

ছবি: Microraptor gui  এর ফসিল ( তীর চিহ্ন দিয়ে পালক গুলো দেখানো হয়েছে);

ছবি: শিল্পীর কল্পনায় Microraptor gui 

থেরোপড ডায়নোসরদেরআদিম পাখির মত বৈশিষ্টই  শধু ছিল না, ধারনা করা হয় তারা এমনকি আচরণও করতো পাখির মত।আমেরিকার জীবাশ্মবিদ মার্ক নোরেল এবং তার টীম দুটি জীবাশ্মর বর্ণনা দিয়েছেন, যা তাদের সেই প্রাচীন আচরণটি প্রদর্শন করছে – এবং যদি কখনো কোন জীবাশ্মকে ’হৃদয়স্পর্শী’ হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে, এই জীবাশ্মগুলো অবশ্যই সেই বিশেষনের যোগ্য হতে পারে – একটি হচ্ছে খুব ছোট পালক বিশিষ্ট ডায়নোসর যে তার ডানার মত কনুই এর ভাজে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, ঠিক যেমন করে আধুনিক পাখিরা ঘুমায় (ছবি ১১); এর বৈজ্ঞানিক নাম দেয়া হয়েছে Mei long  ( চীনাভাষায় যার অর্থ গভীর ঘুমে নিমগ্ন ড্রাগন), নিশ্চয়ই ঘুমন্ত অবস্থায় এটি মারা গিয়েছিল, অন্য জীবাশ্মটি হলো একটি স্ত্রী থেরোপড যে তার জীবনের শেষ মুহুর্তর মুখোমুখি হয়েছিল তার বানানো ছোট বাসায়, যেখানে সে তার ২২টি ডিমের উপর বসে আছে, যা আধুনিক পাখিদের মতই  ব্রুডিং (Brooding) এর আচরণ।

ছবি ১১ : জীবাশ্ম আচরণ: পালকযুক্ত থেরোপড ডায়নোসর Mei long  (উপরে) জীবাশ্মীভুত হয়েছে পাখির মত রুষ্টিং  বা পাখির ঘুমানোন অবস্থানে, এটি ঘুমাচ্ছে তার সামনের লিম্ব নীচে মাথা গুজে; ( মাঝে) জীবাশ্ম থেকে Mei long  এর পুণঃগঠিত রুপ, (নীচে) একটি আধুনিক পাখি ((juvenile house sparrow) ঠিক একই ভঙ্গিমায় ঘুমাচ্ছে।(সুত্র: Jerry A. Coyne এর Why Evolution is true)


ছবি: Citipati osmolskae প্রজাতির এই ফসিলটিকে ডাকা হয় বিগ মামা;  কিছু  মানিরাপটরান থেরোপড ডায়নোসরদের সাথে পাখিদের ব্রুডিং আচরনের সম্পর্কটি এই জীবাশ্মে সুস্পষ্ট। এই জীবাশ্ম বলছে, মানিরাপটোরান থেরোপড প্রজাতিটি যারা বিবর্তিত হয়েছিল পাখিদের আগেই তারা তাদের বানানো বাসা বা নেষ্ট এর উপর বসে তাদের ডিমগুলোকে রক্ষা করতো (এর নখরগুলোর অবস্থান বলে দিচ্ছে এটি তার ডিমগুলোকে কিভাবে রক্ষা করছে); যা ঠিক বর্তমানের পাখিদের ব্রুডিং আচরনের সাথে মিলে যায়। এটি প্রমান করে পাখিদের বৈশিষ্টসুচক ব্রুডিং এর আচরণ আসলে বিবর্তিত হয়েছিল পাখিদের বিবর্তনের আগেই।

ছবি: ভ্রুণ সহ Citipati osmolskae এর ডিম

উড্ডয়ন ক্ষমতাহীন সব পালকসহ ডায়নোসরদের জীবাশ্মগুলোর সময়কাল ১৩৫ থেকে ১১০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে – ১৪৫ মিলিয়ন বছর পুরোনো আর্কিওপটেরিক্স এর পরে এদের অবস্থান; এর অর্থ, তারা আর্কিওপটেরিক্সদের সরাসরি পুর্বসুরী হতে পারেনা, কিন্তু তার সাথে সম্পর্কযুক্ত আত্মীয় হতে পারে। পালক সহ ডায়নোসরদের সম্ভবত অস্তিত্ব ছিল তাদেরই কোন একটি সম্পর্কযুক্ত ধারা থেকে পাখিদের বিবর্তন হবার পরও। আমাদের তাহলে আরো পুরোনো পালকযুক্ত ডাইনোসরদের খুজে পাবার কথা যারা আর্কিওপটেরিক্স এর পুর্বসুরী হতে পারে।সমস্যা হলো শুধু মাত্র বিশেষ পলল বা সেডিমেন্টই পারে পালকদের সংরক্ষন করতে, যেমন মিহি দানার পলল, কোন স্থির শান্ত পরিবেশে, যেমন কোন হ্রদের তলদেশ বা লেগুন।এই সব পরিস্থিতি দুষ্প্রাপ্য, কিন্তু আমরা আরেকটি পরীক্ষাযোগ্য বিবর্তনীয় ভবিষ্যদ্বানী করতে পারি: কোন একদিন আমরা পালকযুক্ত ডায়নোসরদের জীবাশ্ম খুজে পাবো যারা আর্কিওপটেরিক্স এর চেয়ে পুরোনো।

আমরা নিশ্চিৎ নই যে, Archaeopteryx  কি একটি একক প্রজাতি কিনা, যা সব আধুনিক পাখির পুর্বসুরী। মনে করা হচ্ছে, সম্ভবত ব্যাপারটা খানিকটা ভিন্ন, এটির মিসিং লিঙ্ক না হবার সম্ভাবনাই বেশী।কিন্ত তা সত্ত্বেও এটি সেই দীর্ঘ জীবাশ্ম প্রজাতিদের ধারাবাহিকতায় একটি অন্যতম জীবাশ্ম, যা আধুনিক পাখির আবির্ভাবের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবেই লিপিবদ্ধ করেছে ( এর বেশ  কিছুর অনুসন্ধানকারী সাহসী পল সেরেনো) ; এই জীবাশ্মগুলো যতই সাম্প্রতিক হতে থাকে, আমরা দেখতে পাই এর সরীসৃপ লেজ ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে যাচ্ছে, অপসৃত হচ্ছে চোয়ালের দাত, পাখের নখর বা ক্লগুলো মিশে যাচ্ছে একে অপরের সাথে, এবং ধীরে ধীরে আগমন ঘটছে বড় বুকের হাড়, যেখানে সংযুক্ত হয়ে নোঙ্গর করে থাকে উড়বার জন্য প্রয়োজনীয় মাংশপেশীগুলো।

সবগুলো একসাথে করলে, জীবাশ্মগুলো প্রদর্শন করে পাখিদের মুল কংকাল কাঠামোর বিবর্তন এবং সেই প্রয়োজনীয় পালকগুলো, যা বিবর্তিত হয়েছে পাখিদের ওড়ার বেশ আগে।অনেক পালকযুক্ত ডায়নোসর কিন্তু ছিল এবং তাদের পালকগুলো সরাসরি আধুনিক পাখিদের পালকের সাথে সম্পর্কযুক্ত।যদি পালকরা উড়বার ক্ষমতার সাথে অভিযোজনীয় অনুসঙ্গ হিসাবে না বিবর্তিত হয়ে থাকে, তাহলে তারা কিসের জন্য আবির্ভুত হয়েছে? আবারো আমরা এখনো জানিনা।তারা হতে পারে অলঙ্করণ, যা সঙ্গী আকর্ষনের জন্য প্রদর্শনীর লক্ষ্যে বিবর্তিত হয়েছিল, সেটার সম্ভাবনাই হয়তো বেশী, যদিও স্পষ্টতই পালক তাদের শরীরের তাপমাত্রাকে সংরক্ষনকারী ইনসুলেটর হিসাবে কাজ করতো।আধুনিক সরীসৃপদের ব্যতিক্রম, থেরোপডরা সম্ভবত আংশিক উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট প্রানী ছিল, এমনকি যদিও তারা তা নাও হয়ে থাকে, পালকরা হয়তো সাহায্য করতো শরীরের তাপমাত্রা বজায় রাখতে। আর পালকই বা ’কোথা’ থেকে বিবর্তিত হয়েছে, সেটাও  আরো বেশী রহস্যজনক ।তবে বিজ্ঞানীদের সবচে সেরা অনুমানটি হলো, যে কোষগুলো সরীসৃপদের শরীরে স্কেল বা আশ তৈরী করে, সেই একই কোষ থেকে এদের সৃষ্টি হয়, কিন্তু সবাই একমত না বিষয়টিতে।

ছবি: পাখির (Aves) বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় কয়েকটি থেরোপড প্রতিনিধি। ছবিতে তাদের স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট দেখানো হয়েছে যা গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করেছে পাখিদের ডায়নোসরীয় অতীত। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় অন্যান্য বৈশিষ্টর সাথে তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট উপরের ডায়াগ্রামটি দেখানো হয়েছে, তিনটি কর্মক্ষম পায়ের আঙ্গুল (বেগুনী রং), তিন আঙ্গুল বিশিষ্ট হাত ( সবুজ রং), অর্ধচন্দ্রাকৃতির কব্জির হাড় (লাল রং); আর্কিওপটেরিক্সে  বিজ্ঞানীদের জানামতে প্রাচীনতম পাখিদের অন্যতম। এর কিছু নতুন বৈশিষ্ট ছিল, যেমন একটা ধারালো বাকা নোখ ( ক্ল) যা অন্যআঙ্গুলের দিতে ঘোরানো। পরবর্তী পাখিরা বিবর্তিত হবার সময় বেশ অনেক বৈশিষ্ট ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়েছে, বিশেষকরে হাতের আঙ্গুলগুলো একসাথে মিশে গেছে, সাধারন লেজটি রুপান্তরিত হয়েছে মেরুদন্ডের হাড়ের সংযুক্ত হয়ে সংক্ষিপ্ত পিজোস্টাইল, পেছনের পায়ের আঙ্গুলটা বিলুপ্ত হয়েছে, যাতে পাখিদের পা গাছের ডাল শক্ত করে ধরবার জন্য। (K. Padian ও Luis M. Chiappe, The Origin of Birds and Their Flight, Scientific American,1998); ((বড় করে দেখার জন্য ছবির  উপর ক্লিক করুন))

ছবি: উপরের ডায়াগ্রামটিও পাখিদের একটি পারিবারিক বৃক্ষ, যা পাখিদের ডায়নোসর পুর্বসুরীদের সাথে সম্পর্ক দেখাচ্ছে ( এটিও একটি ক্ল্যাডোগ্রাম), ক্ল্যাডোগ্রাম তৈরী করার জন্য ক্ল্যাডিস্টিক পদ্ধতির ব্যবহার করেন বিবর্তন জীববিজ্ঞানীরা। ক্ল্যাডিস্টিক বিশেষজ্ঞরা কোন একটি জীবগ্রুপের বিবর্তনীয় ইতিহাসের বিবরণ দেন, বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যর তুলনামুলক পর্যালোচনা করার মাধ্যমে। বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়ে কিছু জীব জীন নির্দেশিত কিছু নতুন বৈশিষ্ট  যা পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে প্রবাহমান হয়। সেকারনের জীবাশ্মবিদরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে, যখন শুধুমাত্র দুটি জীবগোষ্ঠী স্বতন্ত্রভাবে একই ধরনের এসব নতুন বা পরিবর্তিত অর্জিত কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট ধারন করে, সেই বৈশিষ্ট্যগুলো নেই এমন কোন জীবগোষ্ঠী থেকে তারা পরস্পরের সাথে বেশী সম্পর্কযুক্ত; ক্ল্যাডোগ্রামে নোড বা ব্রান্চিং পয়েন্ট ( ছবি ডট) গুলো চিহ্নিত করছে নতুন লিনিয়েজ এর সুচনার যাদের নতুন কিছু অর্জিত বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাদের পুর্বসুরী প্রজাতির নেই। এই ক্ল্যাডোগ্রামে দেখানো হচ্ছে, কোন ডায়নোসরীয় পুর্বপুরুষ থেকেই সব থেরোপড ডায়নোসরদের উদ্ভব হয়েছিল, যারা নতুন করে অর্জন করেছিল ফাপা হাড় এবং তিনটি কর্মক্ষম পায়ের আঙ্গুল এর বৈশিষ্ট। এই ধারাবাহিকতায় থেরোপডরা তখনও ডায়নোসর, তারা শুধু Saurischian  ডায়নোসরদের একটি সাবসেট। প্রতিটি লিনিয়েজ বা ক্ল্যাড এর আবার অবস্থান করছে  একটি অপেক্ষাকৃত বড় ক্ল্যাডের মধ্যে ( ছবিতে রঙ্গীন আয়তাকার ঘর); সেই অনুযায়ী পাখিরা (Aves) হচ্ছে মানিরাপটোরান (Maniraptoran), টেটানিউরান (Tetanuran) এবং থেরোপড (Theropd) ডায়নোসর। (K. Padian ও Luis M. Chiappe, The Origin of Birds and Their Flight, Scientific American,1998) ((বড় করে দেখার জন্য ছবির  উপর ক্লিক করুন));


ছবি: কিছু হাড়ের তুলনামুলক পর্যবেক্ষন শুধু পাখিদের থেরোপড ডায়নোসরদের সাথে সম্পর্ককেই যুক্ত করেনি, বিজ্ঞানীদের বুঝতেও সহায়তা করেছে কিভাবে এই হাড়ের বৈশিষ্টগুলো বদলে গেছে যখন ডায়নোসর ক্রমান্বয়ে আরো বেশী পাখি সদৃশ হয়েছিল, পেলভিস বা কোমরে হাড় (পাশ থেকে দেখা), সেখানে পিউবিক হাড় (ছবিতে বাদামী রং) প্রথমে ছিল লম্বা সুচালো ( ডান দিকের ডায়াগ্রাম উপরের সারি), তারপর যা ক্রমশ উল্লম্ব  বা পশ্চাৎমুখী হয়েছে ( যেমন আধুনিক পাখি); পেলভিসের তিনটি হাড়ের তুলনামুলক আকৃতির তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি আদি পাখি অবধি। তবে কব্জির পরিবর্তন হয়েছে বিশেষভাবে; মানিরাপটোরার কব্জির চাকতির মত হাড় (লাল রং) অর্ধচন্দ্রাকৃতি আকার নিয়েছে যা পাখিদের ফ্ল্যাপিং ফ্লাইটে ( ডানা ঝাপটিয়ে ওড়া) সহায়তা করে। টেটানিউরানদের মত যুক্ত হয়ে যাওয়া বুমেরাং এর মত কলার বোন বা ক্ল্যাভিকল বা উইশবোন প্রাচীন পাখির সাথে সহজেই তুলনা করা যায়, তবে আধুনিক পাখিতে এটি আরো সরু, আরো গভীর U আকৃতি নিয়েছে যা উড়বার সময় খুবই গুরুত্বপুর্ণ। (K. Padian ও Luis M. Chiappe, The Origin of Birds and Their Flight, Scientific American,1998) ((বড় করে দেখার জন্য ছবির  উপর ক্লিক করুন));

অনেক কিছু অজ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও আমরা কিছু অনুমান করতে পারি, কিভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন আধুনিক পাখি গড়ে তুলেছিল এর ডায়নোসর পুর্বসুরী প্রজাতিদের থেকে।আদি মাংশাসী ডায়নোসরদের লম্বাকৃতি সামনের লিম্ব ও  হাত বিবর্তিত হয়েছিল, যা সম্ভবত তাদের শিকার ধরতে ও তাদের নড়াচড়া করার জন্য সাহায্য করতো।এই ধরনের শিকার ধরার কাজটি সুযোগ করে দিয়েছিল সেই মাংশগুলোর বিশেষ বিবর্তনে যারা দ্রুত সামনের পা বা লিম্ব দু পাথে ছড়িয়ে দিয়ে এবং দ্রুত তাদের ভিতর দিকে টেনে আনার কাজ করতো : সত্যিকার উড্ডয়নের সময়ে নিচের দিকে ডানা যেভাবে  ঝাপটা দেয়, ঠিক সেই গতির মতই।এরপর এর উপর আসে পালকের আবরণ, সম্ভবত ইনসুলেশন বা পৃথকীকারক একটি পর্দা হিসাবে।এই সব নতুনত্বের উপস্থিতিতে কমপক্ষে দুটি উপায়ে উড্ডয়নের ব্যাপারটা বিবর্তিত হতে পারে। প্রথমটাকে বলা হয় ট্রিস ডাউন সিনারিও ( Trees down scenario) বা গাছ থেকে নীচে দৃশ্যপট; কিছু প্রমান বলছে কোন কোন থেরোপড ডায়নোসর কমপক্ষে কিছুটা সময় গাছে বসবাস করতো। পালকে ডাকা সামনের পা হয়তো তাদের এক গাছ থেকে অন্য গাছে বা গাছ থেকে মাটিতে গ্লাইড বা বাতাসে ভর করে খানিকটা ভেসে ওড়ার মাধ্যমে যাতায়াত করতে সাহায্য করতো। যা হয়তোবা তাদের শিকারী প্রানী থেকে আত্মরক্ষা করতে, দ্রুত খাদ্য সংগ্রহ এবং তাদের অবতরনকে সহজ করতে সাহায্য করতো।

একটি ভিন্ন এবং খুব সম্ভাব্য দৃশ্যপট যা হলো গ্রাউন্ডস আপ (Grounds up) বা নীচ থেকে উপরে, যে তত্ত্ব বলছে উড়বার ব্যাপারটা সম্ভবত এসছে দুই হাত ছড়িয়ে দৌড়ানোর এবং শিকার ধরার জন্য পালকযুক্ত ডায়নোসরদের লাফ দেবার প্রক্রিয়ার হয়তো এর একটি বাড়তি অংশ বা এক্সটেনশন হিসাবে।লম্বা ডানাও বিবর্তিত হতে পারে দ্রুত দৌড়াবার সহায়ক হিসাবে।চুকার পারট্রিজ (Chukar Partridge), -প্রায় শিকার করা হয় এই পাখিটি নিয়ে গবেষনা করেছেন মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেথ ডায়াল – এই পাখিটি এই ধাপের একটি জীবন্ত উদহারণ। এই পারট্রিজরা প্রায় কখনোই উড়ে না, কিন্তু তারা তাদের ডানা ঝাপটায় যখন তারা পাহাড় পেয়ে উপরের দিকে দৌড়ায়।এই ডানা ঝাপটানো তাদের শুধু বাড়তি গতিই দেয় না, মাটির বিরুদ্ধে যোগ করে বাড়তি  ট্র্যাকশন শক্তির।সদ্যজাত মুরগী ছানারা ৪৫ ডিগ্রি ঢাল বেয়ে দৌড়ে উঠতে পারে, পুর্ণবয়স্ক মুরগী উঠতে পারে ১০৫ ডিগ্রী ঢাল – ভুমি থেকে খাড়া ৯০ ডিগ্রীরও বেশী যা বাড়তি ঝুলে থাকে – শুধুমাত্র দৌড়ে এবং তাদের ডানা ঝাপটে তারা কাজটা সম্পন্ন করে।এই খাড়া ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে পারার একটা সুস্পষ্ট সুবিধা শিকারী প্রানীদের হাত থেকে নিজেদের বাচানো। উড়বার ক্ষমতা বিবর্তনের দিবে এর পরের ধাপ সম্ভবত বাতাসে খানিকটা ভাসমান হয়ে সংক্ষিপ্ত লাফ বা হপিং করা, যা বিপদ থেকে পালানোর সময় টার্কি এবং কোয়েলরা করে থাকে।

’ট্রিস ডাউন’ কিংবা ’গ্রাউন্ডস আপ’ দুটি দৃশ্যপটেই প্রাকৃতিক নির্বাচন সেই সব প্রানী সদস্যদের সয়াহতা করেছিল যারা শুধুমাত্র গ্লাইডিং, লাফানো, অল্প দুরত্ব খানিকা উড়তে পারার চেয়ে খানিকটা বেশী দুর উড়ে যেতে পারে।এরপর আসে আরো নতুন কিছু অভিনবত্ব যা সব আধুনিক পাখিরই বৈশিষ্ট, যেমন হালকা হবার জন্য ফাপা হাড়,  কিংবা বুকের চওড়া হাড়।

ছবি: পাখির বিবর্তনের একটি ক্ল্যাডোগ্রাম: এটি ক্রমান্বয়ে দেখাচ্ছে কিভাবে প্রায় ১৫০ মিলিয়ন বছর আগে বিবর্তিত হওয়া পাখি ও তাদের পুর্বসুরীরা কিভাবে তাদের ফ্লাইট স্ট্রোক বা উড়বার জন্য ডানা ঝাপটানোর প্রক্রিয়াটি নিখুত করেছিল। আরেবোরিয়াল বা গাছে বসবাস করার উপযোগী হয়েছিল তারা বেশ আগেই। পাখিদের ওড়ার ক্ষমতা বিবর্তনের  ব্যাপারটি পাখিদের বিবর্তনের থেকে যদিও সম্পর্কযুক্ত তবে আলাদা একটি বিষয়। পাখিদের পালকের বিবর্তন আগেই হয়েছিল অন্য কাজের জন্য উড়তে পারার ক্ষমতা বিবর্তন হবার আগেই। আর আর্কিওপটেরিক্সও সম্ভবত প্রথম উড্ডয়নক্ষম থেরোপড ছিল না, কিন্তু আপাতত এর আগের কোন জীবাশ্ম আমরা এখনও খুজে পাইনি। সাধারন উড়বার ক্ষমতা বিবর্তনের ক্ষে্ত্রে দুটি সিনারিও বা হাইপোথিসিস প্রস্তাব করা হয়েছে,  একটি হচ্ছে আরবোরিয়াল বা ট্রিস ডাউন, যেখানে প্রস্তাব করা হয়েছে পাখিরা উড়তে শিখেছে আগে গাছ বেয়েওঠা ও তাদের অপরিপক্ক পালক ব্যবহার করে গাছের ডাল থেকে গ্লাইডিং করে নামার মাধ্যমে; সময়ের সাথে পালকের আকার যখন বেড়েছে, ডানা ঝাপটানোর মাধ্যমে ফ্ল্যাপিং ফ্লাইটও বিবর্তিত হয়েছে, পাখিরা সত্যিকারের উড়বার ক্ষমতাকেও আয়ত্বে এনেছিল। (বিষয়টি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা আছে, এই লেখার পরিসরে সেটি সম্ভব না); অন্য প্রস্তা্বটি হচ্ছে কারসোরিয়াল ( গ্রাউন্ডস আপ)  বা রানিং হাইপোথিসিস যা বলছে ছোট ডায়নোসররা যখন মাটি বেয়ে দৌড়াতো তাদের দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে রাখতো ভারসাম্য রাখতে, হয়তো তারা এভাবে উড়ন্ত কীটপতঙ্গ ধরার জন্য বা শিকারী প্রানীর হাত থেকে বাচার জন্য লাফ দিয়ে ভাসমান হত, তখন এমনকি পালকের আদি সংস্করণও ছড়ানো হাতের পৃষ্ঠক্ষেত্র বাড়িয়ে দিত তুলনামুলক ভাবে যা বাতাসে লাফিয়ে উঠতে সাহায্য করতো। পালক যত বড় হয়েছে, সম্ভবত ততবেশী উপরে ‍ওঠার বাড়তি ধাক্কা আয়ত্বে এসেছে, এভাবে ক্রমান্বয়ে বেশী সময় ধরে ভাসমান হবার ক্ষমতা অর্জন করেছিল; গাছ থেকে নীচে পড়ার সময় যে ত্বরন প্রথম লিফট অফকে সহজ করে, মাটি থেকে উপরে এই প্রয়োজনীয় উপরের ওঠার শক্তিটা আসে দ্রুত গতির দৌড়ের মাধ্যমে; আপাতত প্রয়োজনীয় বিতর্ক অব্যাহত আছে, বেশ কিছু বিজ্ঞানী অবশ্য মনে করছেন আসলে দুটোর মিশ্রনেই ‍উড়বার ক্ষমতা এসেছে, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ যে প্রশ্নটি তারা প্রস্তাব করেছেন তাহলো  ফ্লাইট স্ট্রোক এর বিবর্তন নিয়ে। ;(K. Padian ও Luis M. Chiappe, The Origin of Birds and Their Flight, Scientific American,1998) ((বড় করে দেখার জন্য ছবির  উপর ক্লিক করুন))

আমরা জটিল খুটিনাটি বিষয় নিয়ে যতই জল্পনা কল্পনা করতে পারি না কেন, ট্রানজিশনাল জীবাশ্মদের অস্তিত্ব এবং সরীসৃপ থেকে পাখিদের বিবর্তন প্রমানিত একটি সত্য। আর্কিওপটেরিক্স এর মত জীবাশ্ম এবং এর পরবর্তী আত্মীয়রা স্পষ্টতই পাখির এবং আদি সরীসৃপদের মিশ্র বৈশিষ্ট বহন করেছে, এবং তাদের অবস্থানও জীবাশ্ম রেকর্ডের সঠিক সময়ে সঠিক স্তরে । বিজ্ঞানীরা পুর্বধারনা করেছিলেন, যে পাখিরা বিবর্তিত হয়েছে থেরোপড ডায়নোসরদের থেকে এবং সঠিক ভাবেই আমরা পালক সহ থেরোপড ডায়রোসরদের খুজে পেয়েছি।আমরা সময়ের সাথে পরিবর্তন দেখেছি, পাতলা সুতার মত শরীরের আবরন সহ আদি থেরোপড থেকে পরবর্তীদের যাদের সুস্পষ্ট পালক ছিল, সম্ভবত দক্ষ গ্লাইডার ছিল তারা।পাখির বিবর্তনে আমরা যেটা দেখতে পাই, তা হলো পুরোনো বিদ্যমান বৈশিষ্টগুলোকে ( আঙ্গুল সহ সামনের লিম্ব এবং চামড়ায় সুতার মত সরু ফিলামেন্ট) নতুন রুপ দেয়া ( আঙ্গুল বিহীন ডানা ও পালক) – ঠিক যেমনটা বিবর্তন তত্ত্ব ভবিষ্যদ্বানী করেছিল।

________________ চলবে______________________

Advertisements
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: চতুর্থ পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s