যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: দ্বিতীয় পর্ব


শীর্ষ ছবি: ১৯০৯ সালে স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডেরেক ডি ওয়ালকট কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় বার্জেস শেল (Burgess Shale) খুজে পেয়েছিলেন প্রথম। প্রায় অর্ধ বিলিয়ন বছর প্রাচীন এই শিলাস্তরে খুজে পাওয়া গেছে অসংখ্য বিচিত্র প্রজাতির জীবাশ্ম।বার্জেস শেল এর জীবাশ্মগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট হলো, জীবাশ্মগুলোর নরম শরীরের অংশগুলোও সংরক্ষিত হয়েছে প্রায় সম্পুর্ণভাবে, এছাড়া এদের গঠনগত জটিলতা প্রমান করেছে এরাই প্রি ক্যামব্রিয়ান সরল জীবন থেকে  জটিল জীবনের বিবর্তনের একটি অসাধারন স্ন্যাপশট;  এদের অনেকেই পরবর্তীতে নানা গ্রুপের প্রানীদের পুর্বসুরী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। উপরে দুটি বার্জেস শেল এর জীবাশ্মর উদহারন: প্রথমটি Marrella splendens, ২০ মিমি দীর্ঘ (অ্যান্টেনা বাদে) এই জীবাশ্মটির অ্যান্টেনা এবং অন্যান্য উপাঙ্গও চমৎকারভাবে সংরক্ষিত হয়েছে জীবাশ্মটিতে; নীচে এর একটি সম্ভাব্য থ্রি ডি মডেল। পরেরটি Anomalocaris canadensis এর,  প্রায় ২২২ মিমি, ক্যামব্রিয়ান পর্বের সবচেয়ে বড় শিকারী প্রজাতি বা প্রিডেটর, যার চোখ, লোব, পেছনের পাখার মত উপাঙ্গ সংরক্ষিত হয়েছে জীবাশ্মটিকে, নীচে সম্ভাব্য একটি মডেল (ছবি সুত্র:
Royal Ontario Museum, Toronto)

(এটি মুলত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন জীনতত্ত্বর অধ্যাপক জেরি কয়েন  ( Jerry A. Coyne) এর Why Evolution is true  বইটির দ্বিতীয় অধ্যায় Written in the Rocks এর একটি অনুবাদ প্রচেষ্টা; বইটির প্রথম অধ্যায় What is Evolution? এর অনুবাদ বিবর্তন কি? আছে এখানে))

Creationist are deeply enamoured of the fossil record, because they have been taught (by each other) to repeat, over and over, the mantra that it is full of ‘gaps’: ‘Show me your “intermediates”!’ They fondly (very fondly) imagine that these ‘gaps’ are an embarrassment to evolutionists. Actually, we are lucky to have any fossils at all, let alone the massive numbers that we now do have to document evolutionary history – large numbers of which, by any standards, constitute beautiful ‘intermediates’. (ed.) We don’t need fossils in order to demonstrate that evolution is a fact. The evidence for evolution would be entirely secure, even if not a single corpse had ever fossilized. It is a bonus that we do actually have rich seams of fossils to mine, and more are discovered every day. The fossil evidence for evolution in many major animal groups is wonderfully strong. Nevertheless there are, of course, gaps, and creationists love them obsessively. Richard Dawkins ( The Greatest Show on Earth)

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে : প্রথম পর্ব

যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে :
((((দ্বিতীয় পর্ব))))

কিছু ফ্যাক্টস

জীবাশ্ম রেকর্ডে আসলে  কি পাওয়া গেলে সেটা বিবর্তনের স্বপক্ষে প্রমান হবে? বেশ কয়েক ধরনেরই তা হতে পারে, প্রথমত, বিবর্তনের সামগ্রিক একটি ছবি: শিলার সময়ানুক্রমে সাজানো নানা স্তরগুলি সব পর্যবেক্ষন করলে আমাদের দেখতে পাওয়া উচিৎ যে, প্রাচীন জীবনের আকার ও প্রকৃতি ছিল বেশ সরল  এবং অপেক্ষাকৃত জটিল জীবের আগমন ঘটেছে সময়ের ব্যবধানে, পরবর্তীতে; এছাড়াও সবচেয়ে নবীনতম যে জীবাশ্মটি আমরা পাই, সেটির উচিৎ বর্তমান সমতুল্য কোন জীবিত প্রজাতির  সাথে সবচেয়ে সাদৃশ্যতা বহন করা।

এছাড়া আমাদের আরো দেখতে পাওয়া উচিৎ  যে, কোন একটি লিনিয়েজ বা বংশধারার মধ্যে বিবর্তনীয় পরিবর্তনের নানা উদহারন: অর্থাৎ প্রানী বা উদ্ভিদের কোন একটি প্রজাতি সময়ের ব্যবধানে অন্য একটি প্রজাতিতে রুপান্তরিত হবার প্রক্রিয়া।যাদের পরবর্তী পর্যায়ের প্রজাতিদের মধ্যে অবশ্যই এমন কিছু বৈশিষ্ট থাকা উচিৎ যেন তারা দেখতে তাদের পুর্বসুরী প্রানীদের বংশধরদের যেমন হওয়া উচিৎ তেমনই হয়।যেহেতু জীবনের ইতিহাসের অংশ হলো কোন একটি সাধারন বা কমন পুর্বসুরী প্রানী থেকে দুটি ভিন্ন প্রজাতিতে দ্বি বিভক্ত হওয়া, আমাদের এই দুই ভাগে ভাগ হবার ব্যপারটিও জীবাশ্ম রেকর্ডে দেখতে পাওয়া উচিৎ এবং সেই সব পুর্বসুরী প্রজাদিদের অস্তিত্ব খুজে পাওয়া উচিৎ – জীবাশ্ম রেকর্ডে। যেমন, উনবিংশ শতাব্দীতে এদের অ্যানাটমি বা শারীরিক গঠন, বৈশিষ্টগুরোর সদৃশ্যতা দেখে বিশেষজ্ঞরা ভবিষ্দ্বানী করেছিলেন যে, স্তন্যপায়ীরা বিবর্তিত হয়েছে আদি সরীসৃপ বা রেপটাইল থেকে, সুতরাং আমাদের সেই সব জীবাশ্ম খুজে পেতে সক্ষম হবার কথা কথা, যখন তারা অপেক্ষাকৃত বেশী স্তন্যপায়ী প্রানী সদৃশ ছিল। অবশ্যই যেহেতু জীবাশ্ম রেকর্ড অসম্পুর্ণ, আমরা প্রত্যেকটি পরিবর্তন এর প্রমান খুজে পাবো না ঠিকই তবে জীবনের প্রতিটি প্রধানতম ফর্মগুলোর মধ্যে,কিন্তু অন্তত কিছু আমাদের পাওয়া উচিৎ জীবাশ্ম রেকর্ডে।

দি অরিজিন অব স্পিসিস লেখার সময় ডারউইন আক্ষেপ করেছিলেন জীবাশ্ম রেকর্ড এর স্বল্পতার জন্য। সেসময় কোন ট্রানজিশনাল বা অন্তবর্তীকালীন প্রজাতির ( যারা  ভিন্ন দুটি প্রজাতির বৈশিষ্ট সম্পন্ন)  জীবাশ্ম সম্বন্ধে জানা ছিল না আমাদের, যারা প্রধান কোন দুটি প্রজাতির ধারার মধ্যে সেই অনুপস্থিত সম্পর্ক বা মিসিং লিঙ্ক তৈরী করে এবং যারা সেই বিবর্তনীয় পরিবর্তনের নানা চিহ্ন বহন করে। তখন কিছু প্রানী গ্রুপ, যেমন তিমি, হঠাৎ করেই শিলা স্তরে জীবাশ্ম রেকর্ড হিসাবে আবির্ভুত হয়েছিল, যেন কোন পরিচিত পুর্বসুরী প্রানী ছাড়াই।কিন্তু তারপরও বিবর্তনের প্রমান হিসাবে বেশ কিছু জীবাশ্ম রেকর্ড এর তথ্য ডারউইনের জানা ছিল ।যেমন, তিনি জানতেন প্রাচীন প্রানী বা উদ্ভিদ বর্তমানে জীবিত প্রানী বা উদ্ভিদ থেকে বেশ ভিন্ন ।তারা ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে বর্তমান প্রজাতির সাথে সাদৃশ্যমান হয়ে উঠে, যখন আমরা আরো বেশী নবীন শিলা স্তরে তাদের উপস্থিতি দেখি।তিনি আরো লক্ষ্য করেছিলেন পাশাপাশি শিলা স্তরে পাওয়া জীবাশ্ম প্রজাতিগুলো পরস্পর বেশী সদৃশ অপেক্ষাকৃত দুরবর্তী স্তরে পাওয়া প্রজাতিদের থেকে, যা প্রমান করে বিবর্তন এবং প্রজাতি বিভাজনেরএকটি  নিরন্তর ধীর প্রক্রিয়ার উপস্থিতিকে। ‍উপরন্তু কোন একটি নির্দিষ্ট এলাকায়, সবচেয়ে সাম্প্রতিক কালে তেরী হওয়া শিলা স্তরের মধ্যে খুজে পাওয়া জীবাশ্মগুলো পৃথিবীর অন্য যে কোন জায়গায় বিদ্যমান বর্তমান প্রজাতিদের তুলনায় সেই এলাকারই প্রজাতিদের সাথে বেশী সদৃশ্যতা বহন করে। যেমন, জীবাশ্ম মারসুপিয়ালদের ( স্তন্যপায়ী প্রানীদের একটি শ্রেনী যারা তাদের শরীরের বাইরে একটি পাউচে তার সদ্যজাত শিশুদের বহন করে) সবচেয়ে বেশী পাওয়া যায় শুধুমাত্র অষ্ট্রেলিয়ায় এবং আধুনিক মারসুপিয়ালদের বেশীর ভাগেরও যেখানে বসবাস , বিষয়টি ইঙ্গিত করে আধুনিক প্রজাতিরা এসেছে এই সব জীবাশ্ম প্রজাতিদের থেকেই বিবর্তনের মাধ্যমে (এই সব জীবাশ্ম মারসুপিয়ালদের মধ্যে আছে স্তন্যপায়ী পরিবারের সবচেয়ে অদ্ভুততম সদস্যদের। এদের মধ্যে যেমন ছিল প্রায় ১o ফুট লম্বা বিশালকায় ক্যাঙ্গারু. যাদের মুখ ছিল চ্যাপ্টা, ছিল বড় বড় নোখ এবং প্রতি পায়ে ছিল একটি মাত্র আঙ্গুল (Procoptodon goliah)।

কিন্তু ডারউইনের সমসাময়িক সময়ে যেটা ছিল না, সেটা হল যথেষ্ট পরিমান জীবাশ্ম , যা ‍কিনা কোন প্রজাতির মধ্যে স্পষ্ট প্রদর্শন করে বিবর্তনের ধীর প্রক্রিয়াটি বা কোন সাধারন বা কমন পুর্বসুরী প্রজাতির জীবাশ্ম, যা দুটি ভিন্ন প্রজাতির সুচনা করেছিল। কিন্তু তার সেই সময়ের পর থেকে আজ অবধি জীবাশ্ম বিদরা খুজে পেয়েছেন অজস্র জীবাশ্মর নমুনা, যা উপরে বর্ণিত সব ভবিষ্দ্বানী সত্য প্রমান করেছে ইতিমধ্যে। আমরা এখন কোনে একটি প্রজাতির বংশধারা বা লিনিয়েজের মধ্যে ক্রমশ পরিবর্তনের ক্রমাগত প্রক্রিয়াটি প্রদর্শন করতে পারবো।আর কমন বা সাধারন পুর্বসুরী প্রজাতিদের অনেক প্রমানও এখন আমাদের কাছে আছে, এছাড়াও বহু অন্তর্বর্তীকালীন বা ট্রানজিশনাল প্রজাতির জীবাশ্ম (যেমন সেই সব খুজে না পাওয়া তিমি র পুর্বসুরী প্রজাতিদের, যাদের সবাইকে এখন খুজে পাওয়া সম্ভব হয়েছে); আমরা ক্রমশ ভুত্বকের শিলা স্তরগুলো অনেক গভীরে অনুসন্ধান চালাতে সক্ষম হয়েছি, যা আমাদের সুযোগ করে দিয়েছে জটিলতর জীবনের সুচনা দেখার জন্য।

 বড় প্যাটার্ণ বা নক্সা 

এখন যেহেতু  ভুত্বকের সব স্তরকে ক্রমানুসারে আমরা সাজাতে পেরেছি এবং তাদের সময়কাল নির্ধারন করতে পেরেছি, আমরা এখন নীচ থেকে উপরে জীবাশ্ম রেকর্ড পড়তে পারবো। নীচের ৩ নং ছবিটা দেখাচ্ছে জীবনের ইতিহাসের একটি সরল সময় ক্রম, যেখানে দেখানো হয়েছে প্রধান প্রধান জীববৈজ্ঞানিক এবং ভুতাত্ত্বিক ঘটনাগুলো যা ঘটেছে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী প্রথম জীবনের সুচনা হবার পর থেকে।এই রেকর্ড পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রমান দিচ্ছে, যেখানে খুব সরল রুপ ও গঠনের জীবন ক্রমান্বয়ে জটিলতর হয়েছে নানা গঠন ও আকারে।যদিও নিচের ছবিটি দেখাচ্ছে যেমন সরীসৃপ বা স্তন্যপায়ী গ্রুপদের প্রথম আবির্ভাব, এর অর্থ কিন্ত এই না যে, আধুনিক ফর্মগুলোর জীবাশ্ম রেকর্ডে এসেছে হঠাৎ করে, বরং বেশীরভাগ গ্রুপেই আমরা দেখেছি আগের প্রজাতি থেকে ধীর বিবর্তনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতির উদ্ভবের ঘটনাটি।(পাখী এবং স্তন্যপায়ী প্রানীরা যেমন,  পুর্বসুরী আদি সরীসৃপ প্রানী থেকে বিবর্তিত হয়েছে বহু মিলিয়ন বছর ধরে); প্রধান প্রধান গ্রুপদের মধ্যে ধীর পরিবর্তনের অস্তিত্ব যা আমি পরবর্তীতে আলোচনা করতে যাচ্ছি, তার অর্থ হলো ’প্রথম আবির্ভাবের’ একটি সময় বেধে দেয়াটা খানিকটা কাল্পনিক।

প্রথম জীবন বা অর্গানিজম, সাধারণ সালোক সংশ্লেষন করতে সক্ষম ব্যাকটেরিয়া (প্রোক্যারিওট), প্রথম পাললীক শিলায় যা আবির্ভুত হয়েছে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে, আমাদের এই গ্রহ সৃষ্টি হবার মাত্র ১ বিলিয়ন বছর পরেই। এই এককোষী জীবনই পরবর্তী ২ বিলিয়ন বছর পৃথিবী দখল করে রেখেছিল, এর পরেই  আমরা প্রথম সহজ সরল প্রকৃত কোষী বা ’ইউক্যারিওট’ দের আগমন ঘটে, যারা যাদের নিউক্লিয়াস ও ক্রোমোজোম সহ ছিল প্রকৃত কোষী । এর পর প্রায় ৬০০ মিলিয়ন বছর আগে অংখ্য অপেক্ষাকৃত সরল কিন্তু বহুকোষী প্রানীদের আগমন ঘটে, যাদের মধ্যে আছে যেমন, কেচো বা ওয়ার্মরা, জেলী ফিস এবং স্পন্জ রা।এই গ্রুপগুলোই বেশ কয়েক মিলিয়ন বছর ধরে নানা প্রজাতিতে বৈচিত্রময় হয়, যেমন স্থলভুমির উদ্ভিদ,টেট্রাপড ( চার পা বা লিম্ব বিশিষ্ট প্রানীরা, যাদের মধ্যে সবচে পুরোনো হল লোব ফিন যুক্ত মাছ) এর আবির্ভাব হয় প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর আগে।আগের গ্রুপগুলোর কখনো অবশ্যই অস্তিত্ব টিকে ছিল: সালোকসংশ্লেষী ব্যাকটেরিয়া, স্পন্জ এবং ওয়ার্ম যারা পুরোনো জীবাশ্ম রেকর্ডে ছিল তারা আমাদের সাথে এখনও বিদ্যমান।

ছবি ৩: জীবাশ্ম রেকর্ড  এ দেখা যাচ্ছে প্রায় ৪৬০০ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী সৃষ্টি হবার পর থেকে বিভিন্ন আকার,প্রকৃতি ও গঠনের জীবনের প্রথম আবির্ভাব ।লক্ষ্য করুন বহুকোষী জীব এর ‍উৎপত্তি হয়েছে এবং ব্যপক হারে তাদের বৈচিত্রময়তা ঘটেছে নানা প্রজাতি রুপে, জীবনের ইতিহাসের মাত্র গত ১৫ শতাংশ সময় ব্যাপী।নানা গ্রুপের আবির্ভাব ঘটেছে  নিয়মিত ভাবে বিবর্তন প্রক্রিয়ায়, যাদের বেশীর ভাগের আগমন ঘটেছে আমাদের জানা পুর্বসুরী প্রজাতির জীবাশ্ম ট্রানজিশনের মাধ্যমে। এখানে যে ক্রমটি দেখানো হয়েছে এবং এর সাথে অন্তর্বর্তী কালীন প্রজাতির উপস্থিতি, সৃষ্টিবাদীদের সব আকারের জীবন একই সময়ে এবং হঠাৎ করে উৎপত্তি ঘটেছে এমন দাবীকে ভুল প্রমান করে। (সুত্র: জেরী কয়েন, হোয়াই ইভ্যুলেশন ইজ ট্রু)

প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর পর আমরা সত্যিকারের উভচরী প্রানীদের দেখা পাই এবং  এর আরো ৫০ মিলিয়ন বছর পর আবির্ভাব হয় সরীসৃপদের।প্রথম স্তন্যপায়ী প্রানীর দেখা মেলে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন বছর আগে ( যেমনটি আগেই ধারনা করা হয়েছিল, সরীসৃপ পুর্বসুরী প্রজাতি থেকে); এবং প্রথম পাখীরও উদ্ভব হয় সরীসৃপদের থেকেই বিবর্তিত হয়ে, আরো ৫০ মিলিয়ন বছর পর।প্রথম স্তন্যপায়ী প্রানী আবির্ভাবের পর, তারা স্থলজ উদ্ভিদ এবং পতঙ্গদের  সাথে আরো বেশী প্রজাতিতে বৈচিত্রময় হয়, যখন আমরা সবচেয়ে কম গভীর শিলা স্তরে জীবাশ্মদের দেখি, তারা ক্রমান্বয়ে জীবিত প্রজাতি সদৃশ হতে থাকে। আমরা মানুষরা এই দৃশ্যপটে নবাগত।আমাদের বংশধারাটি অন্য প্রাইমেটদের বংশধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে প্রায় ৭ মিলিয়ন বছর আগে, বিবর্তনের সময়ের প্রেক্ষাপটে সামান্য একটি মুহুর্ত আগে মাত্র।বেশ কিছু চমকপ্রদ অ্যানালজী ব্যবহার করা হয়েছে এই বিষয়টিকে ব্যাখা করার জন্য এবং এটি আবারো করা যেতে পারে যুক্তিসঙ্গত কারনেই। যদি বিবর্তনের সমস্ত সময়কালটি একটি মাত্র বছরে সময়ের পরিসীমায় চেপে ঢোকানো যায়, তাহলে, দেখা যাবে সবচেয়ে প্রথম ব্যাকরেটিয়ার আগমন ঘটেছে মার্চের শেষে, আমরা মানুষদের প্রথম পুর্বপুরুষ দেখা পাবো না ৩১ ডিসেম্বরের সকাল ৬ টার আগ পর্যন্ত, গ্রীসের স্বর্ণযুগ, প্রায় ৫০০ খৃষ্টপুর্বাব্দ হতো মধ্যরাতের ৩০ সেকেন্ড আগে।

যদিও উদ্ভিদের জীবাশ্ম রেকর্ড এর পরিমান খুব কম, সহজে জীবাশ্মীভুত হওয়া শক্ত অংশ তাদের কম, তারাও একই ধরনের বিবর্তনীয় প্যাটার্ণ প্রদর্শন করে।সবচে প্রাচীন মস এবং সমুদ্র শৈবাল,  এরপর ফার্ণ, তারপর কনিফার, এরপর ডিসাইডুয়াস এবং সবশেষে ফুল হয় এমন বৃক্ষদের আবির্ভাব ঘটে।

সুতরাং সময়ের ব্যাপ্তিতে প্রজাতিদের আগমন, জীবাশ্ম রেকর্ডে যেমন দেখা যায়, অবশ্য কোন এলোমেলো বা র‌্যানডোম ভাবে ঘটেনি। সাধারন জীবদের বিবর্তন হয়েছে আরো জটিল জীবদের বিবর্তনের আগে, পুর্বধারনাকৃত পুর্বসুরীদের আগমন ঘটেছে উত্তরসুরী প্রানীদের আগে। সবচেয়ে সাম্প্রতিক জীবাশ্মগুলোই সবচেয়ে বেশী সদৃশ জীবিত জীবদের সাথে এবং অন্তবর্তীকালীন জীবাশ্মগুলোও আমাদের কাছে এখন আছে, যারা প্রধান প্রধান জীবগোষ্ঠীর মধ্যে যোগসুত্র করে। বিশেষ সৃষ্টিবাদের কোন তত্ত্বই, শুধুমাত্র বিবর্তন ছাড়া আর কোন কিছুই  এই প্যটার্ণকে ব্যাখা করতে পারোনা।

 জীবাশ্মভুত বিবর্তন এবং প্রজাতিকরণ

ধীরে ধীরে কোন একটি বংশধারার মধ্যে ক্রমান্বয়ে বিবর্তনীয় পরিবর্তন দেখাতে হলে আপনার প্রয়োজন খুব ভালো ধারাবাহিকভাবে  সৃষ্টি হওয়া পাললিক শিলার স্তর, যা সুবিধাজনকভাবেই দ্রুত তৈরী হয়েছে ( সুতরাং প্রতিটি সময় পর্ব একটি বড় পাথরের স্তরকে প্রতিনিধিত্ব করছে, যা সহজ করে দেয় কোন ধরনের বিবর্তনীয় পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে); এবং যেখানে কোন মধ্যবর্তী স্তরের অনুপস্থিতি নেই ( মধ্যবর্তী কোন পর্যায়ে কোন স্তরের অনুপস্থিতি  মসৃণ কোন ধীর বিবর্তনীয় ট্রানজিশনকে রুপ দেয় যেমন হঠাৎ ‘লাফিয়ে’ হওয়া দ্রুত কোন পরিবর্তনের)।

খুব ছোট কোন জীব, সামুদ্রিক, যেমন প্ল্যাঙ্কটন, এজন্য আদর্শ ।সহস্র কোটি তারা সংখ্যায়,তাদের অনেকেরই শক্ত অংশ আছে, আর মারা যাবার পর সুবিধাজনকভাবেই সাগরের তলদেশে তারা জমা হয়; একের পর এক স্তর জমা হয়ে তৈরী করে একটি ক্রমাগত স্তরের ধারাবাহিকতা। এই ধারবাহিকতার ক্রমটি কোন নমুনা সংগ্রহ করা খূব সহজ: আপনি একটা লম্বা টিউব সাগরের তলদেশে ঢুকিয়ে, একটি কলাম আকৃতির কোর নমুনা (Core Sample) সংগ্রহ করে, তাদের ধারাবাহিক ভাবে পর্যবেক্ষন করে দেখতে পারেন ( এবং বয়স নির্ণয় সহ) নীচ থেকে ধারাবাহিকভাবে উপরের দিকে।

কোন একটি জীবাশ্ম প্রজাতিকে কোর নমুনার মধ্যে ধারাবাহিক ভাবে পর্যবেক্ষন করলে, আপনি মাঝে মাঝেই দেখতে পাবেন কিভাবে তারা বিবর্তিত হয়েছে। ছবি ৪ এ এরকম একটি উদহারনকে দেখানো হয়েছে, খুব ছোট, এককোষী সামুদ্রিক প্রোটোজোয়া যারা সর্পিলাকার একটি খোলস তৈরী করে, যত তারা বৃদ্ধি পায় তাদের খোলসের ঘরও বৃদ্ধি পায়।এই নমুনাগুলো এসেছে নিউ জীল্যান্ডের কাছাকাছি সমুদ্রের তলদেশ থেকে নেয়া প্রায় ২০০ মিটার লম্বা কোর নমুনা থেকে, যা প্রায় ৮ মিলিয়ন বছর সময়কালের বিবর্তনকে প্রতিনিধিত্ব করছে।এই ছবিটি দেখাছে সময়ের ব্যবধানে কেবল একটি প্রজাতিতে একটি বৈশিষ্টর বিবর্তন: খোলসের সবচে বাইরের প্যাচে কয়টি কক্ষ আছে ।এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি মসৃন এবং ধীর একটি পরিবর্তন ঘটছে সময়ের সাথে; প্রতিটি সদস্যর এই কক্ষের সংখ্যা শুরুতে ৪.৮ যা শেষে ৩.৩, অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পায়।বিবর্তন যদিও ধীর, কিন্তু সবসময় যে এটি মসৃনভাবে ঘটবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই।


ছবি ৪: একটি জীবাশ্ম রেকর্ড ( সমুদ্র তলদেশে যা সংরক্ষিত), যা দেখাচ্ছে প্রায় ৮ মিলিয়ন বছরের সময়ের ব্যাপ্তিতে একটি সামুদ্রিক ফোরামিনিফেরান প্রজাতি Globorotalia conoidea এর বিবর্তনীয় পরিবর্তন ।স্কেলটি দেখাচ্ছে খোলসের শেষ প্যাচটিকে মোট কয়টি ঘর আছে, যা গড় করা হয়েছে কোর নমুনার প্রতিটি প্রস্থচ্ছেদে উপস্থিত সকল Globorotalia conoidea ঘর সংখ্যা গড় করার মাধ্যমে (Malmgren and Kennett অনুসারে, ১৯৮১)। (সুত্র: জেরী কয়েন, হোয়াই ইভ্যুলেশন ইজ ট্রু)

পরের ছবিটি (ছবি ৫) দেখাছে এই পরিবর্তনের আরো একটি এলোমেলো রুপ, এবারও আরেকটি সামুদ্রিক প্রজাতি রেডিওলারিয়ান Pseudocubus vema  , এই ক্ষেত্রে ভুতত্ত্বদিরা একটি নির্দিষ্ট বিরতি পর পর ১৮ মিটার লম্বা একটি কোর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন, কোরটি সংগ্রহ করা হয়েছে অ্যান্টার্কটিকা থেকে। যা প্রায় ২ মিলিয়ন বছরের সেডিমেন্টকে যা প্রতিনিধিত্ব করেছে।যে বৈশিষ্টটি এখানে মাপা হয়েছে তা হলো প্রানীটির সিলিন্ডার আকৃতির বেস এর ব্যাস ( এটি থোরাক্স বা বুক ); যদিও আকৃতি বাড়ছে সময়ের সাথে প্রায় ৫০ শতাংশ, এই প্রবণতাটি মসৃণ নয়। কিছু পিরিয়ড আছে যেখানে আকার খুব একটা বাড়েনি, এবং যার মাঝে মাঝে বেশ কিছু সময় আছে যেখানে দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে।জীবাশ্মদের ক্ষেত্রে এই প্যাটার্ণটি খুবই কমন, এবং সম্পুর্ণ বোধগম্য যদি পরিবর্তন হিসাবে যা আমরা দেখছি তার পরিচালিত করে পরিবেশের কিছু শর্ত যেমন লবনক্ততার তারতম্য।পরিবেশ নিজেই পরিবর্তিত হতে পারে মাঝে মাঝে, এবং এই পরিবর্তন সুসম নয়ও সবসময়, সুতরাং প্রাকৃতিক নির্বাচনের শক্তি কখনো বাড়ে কখনো কমে।


ছবি ৫: রেডিওলারিয়ান প্রজাতি Pseudocubus vema  এর থোরাক্স বা বুকের আকারে বিবর্তনীয় পরিবর্তন, ২ মিলিয়ন বছর ধরে, স্কেলের মান, কোর নমুনার প্রতিটি প্রস্থচ্ছেদের মোট জনসংখ্যার গড়ের উপর ভিত্তি করে। (Kellogg and Hays অনুসারে, ১৯৭৫); (সুত্র: জেরী কয়েন, হোয়াই ইভ্যুলেশন ইজ ট্রু)

আরো খানিকটা জটিল একটি প্রানীর বিবর্তনের উদহারন দেয়া যাক: যেমন ট্রিলোবাইট। ট্রিলোবাইটরা হলো আর্থ্রোপড বা সন্ধিপদী প্রানীদের গোত্রে, কীট পতঙ্গ এবং মাকড়শারাও একই গ্রুপের সদস্য।যেহেতু ট্রিলোবাইটদের শক্ত খোলসের আবরন ছিল, প্রাচীন শিলা স্তরে ট্রিলোবাইটের জীবাশ্ম খুবই সহজপ্রাপ্য ( আপনি সম্ভবত এমন একটি কিনতেও পারবেন নিকটবর্তী কোন মিউজিয়ামের সুভেনিরের দোকান থেকে); পিটার শেলডন, তখন ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজ এ কর্মরত, প্রায় ৩ মিলিয়ন বছর ব্যাপী ওয়েলস শেল এর একটি শিলাস্তর থেকে ট্রিলোবাইট জীবাশ্ম সংগ্রহ করেছিলেন; এই পাথরের স্তরের মধ্যে তিনি ট্রিলোবাইটদের আটটি স্বতন্ত্র বংশধারা চিহ্নিত করেন এবং সময়ের বিবর্তনে প্রতিটি লিনিয়েজ  তাদের পিজিডিয়াল রিব (Pgydial ribs) বা শরীরের শেষ অংশের সেগমেন্টের সংখ্যার বিবর্তন প্রক্রিয়াটিকে দেখান।ছবি ৬ এ বেশ কয়েকটি লিনিয়েজে সেই পরিবর্তনটি দেখানো হয়েছে।যদিও নমুনা সংগ্রহের সে সময়সীমা প্রতিটি প্রজাতি সেগমেন্ট সংখ্যার নেট বৃদ্ধি প্রদর্শন করে, কিন্তু বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে পরিবর্তনগুলোর একই রকম না, বরং কখনো এই সময় পর্বে বীপরিতমুখী পরিবর্তনও দেখা যায়।


ছবি ৬: পাচটিগোষ্ঠীর অরডোভিসিয়ান ট্রিলোবাইটদের পিজিডিয়াল রিবস এর সংখ্যার বিবর্তনীয় পরিবর্তন ( টেইল বা লেজের অংশে সেগমেন্ট বা খন্ডের সংখ্যা); সংখ্যাটি নেয়া হয়ছে  ৩ মিলিয়ন বছরের শিলার নমুনায় প্রতিটি সেকশনে মোট জনগোষ্ঠীর পিডিজিয়াল রিবের গড় সংখ্যা; পাচটি প্রজাতি এবং আরো তিনটি যাদের দেখানো হয়নি – মোট রিব সংখ্যা বৃদ্ধি প্রদর্শন করে, যা ইঙ্গিত করে প্রাকৃতিক নির্বাচন অনেকদিন ধরে কাজ করেছে, কিন্তু সব প্রজাতিগুলো একই সমান্তরালে পরিবর্তিত হয়নি (শেলডন অনুসারে, ১৯৮৭);(সুত্র: জেরী কয়েন, হোয়াই ইভ্যুলেশন ইজ ট্রু)

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের কোন ধারনাই নেই ঠিক কোন নির্বাচনী চাপ আসলে প্ল্যাঙ্কটন এবং ট্রিলোবাইটদের মধ্যে পরিবর্তনের জন্য নিয়ামক ভুমিকা পালন করেছিল। সবসময়ই জীবাশ্ম রেকর্ডে বিবর্তন প্রক্রিয়া দেখানো যতটা সহজ, সেই বিবর্তন ঘটার কারনগুলো বোঝা কিন্তু ততটা সহজ না; কারন যদিও জীবাশ্ম সংরক্ষিত হয় পাথরের স্তরে, তাদের সমকালীন সেই পরিবেশটি  কিন্তু সেভাবে সংরক্ষিত হয়না।আমরা যা বলতে পারি তা হলো বিবর্তন হয়েছিল, ধীরে এবং যা, এর দিক এবং হার দুক্ষেত্রেই ভিন্নতা প্রদর্শন করে। সামুদ্রিক প্ল্যাঙ্কটন বংশধারাগুলোর বিভাজনের ক্ষেত্রে যেমন প্রমান দেয়. তেমনি একক বংশধারায় বিবর্তনের প্রমান দেয়। ছবি ৭ এ দেখানো হয়েছে পুর্বপুরুষ প্ল্যাঙ্কটন প্রজাতিরা দুটি বংশধারায় বিভক্ত হয়েছে , যা তাদের আকৃতি ও গঠন দিয়েই পৃথক করা সম্ভব। মজার ব্যাপার হলো, নতুন প্রজাতি Eucyrtidium matuyamai, প্রথম বিবর্তিত হয়েছে যে এলাকা থেকে কোর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, তার উত্তরের একটি জায়গা থেকে।শুধুমাত্র পরবর্তী কোন একটি সময়ে যেখানে তাদের পুর্বপুরুষ প্রজাতি ছিল সেই এলাকায় অনুপ্রবেশ করে। আমরা পরবর্তী অধ্যায় ৭ এ আলোচনায় দেখবো নতুন প্রজাতি সৃষ্টির সুচনা হয়, সাধারণত যখন জনগোষ্ঠীরা ভৌগলিক ভাবে আলাদা হয়ে পড়ে  একে অপরের থেকে।


ছবি ৭ দেখাচ্ছে দুটি প্ল্যাঙ্কটনিক রেডিওলারিয়ান প্রজাতি Eucyrtidium এর বিবর্তন ও প্রজাতিকরণ প্রক্রিয়া, যা  ৩.৫ মিলিয়ন বছরের বেশী সময়কালের একটি সেডিমেন্ট কোর থেকে সংগৃহীত। প্রতিটি বিন্দু প্রতিনিধিত্ব করছে চতুর্থ খন্ডকের প্রস্থ , যা প্রতিটি নমুনা কোরের প্রতিটি সেকশনে উপস্থিত প্রজাতিদের চতুর্থ খন্ডকের প্রস্থ র গড়; যেখান থেকে নমুনা নেয়া হয়েছিল তার উত্তরে E. calvertense  পুর্বপুরুষ প্রজাতির জনসংখ্যা আকারে বড় হয়েছে এবং E. matuyamai  নাম ধারন করেছে আকারে বড় হবার পর। E. matuyamai   এর পর এর তার আত্মীয় প্রজাতিদের এলাকায় পুন:প্রবেশ করে, এবং গ্রাফে যেমন দেখাচ্ছে দুই প্রজাতির এখন একই জায়গায় অবস্থান করছে এবং শরীরের আকারের ক্ষেত্রে বিভিন্নতা প্রদর্শন করছে। এই দ্বিবিভক্তি হতে পারে সেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপে যা দুই প্রজাতির মধ্যে খাদ্য নিয়ে প্রতিদ্বন্দীতা কমানোর উপর কাজ করেছে (Kellogg এবং Hayes ১৯৭৫)।(সুত্র: জেরী কয়েন, হোয়াই ইভ্যুলেশন ইজ ট্রু)

জীবাশ্ম রেকর্ডে বিবর্তনীয় পরিবর্তনের শত শত উদহারণ আছে – ধীরে ধীরে এবং বিচ্ছিন্নভাবে – নানা বিচিত্র প্রজাতি, যেমন মোলাস্ক, রডেন্ট এবং প্রাইমেট। আবার  উদহারনও আছে এমন সব প্রজাতিদের যারা সময়ের পরিক্রমায় খুবই সামান্য পরিবর্তিত হয়েছে ( মনে রাখতে হবে বিবর্তন তত্ত্ব কিন্তু বলছে না যে সব প্রজাতিকে অবশ্যই বিবর্তিত হতে হবে!); কিন্তু সেই সব প্রজাতিদের তালিকা কিন্তু আমার মুল বক্তব্যকে বদলে দেয়না : জীবাশ্ম রেকর্ড কোন ভাবেই ক্রিয়েশনিষ্ট বা সৃষ্টিবাদীদের পুর্বধারনা , সব প্রজাতির আবির্ভাব হয়েছে হঠাৎ করেই এবং তারা অপরিবর্তনশীলই রয়ে গেছে , এর স্বপক্ষে কোন প্রমান দেয় না।বরং জীবনের নানা আকার জীবাশ্ম রেকর্ডে এসেছে বিবর্তনীয় ধারাবাহিকতায় এবং তারা নিজেরাও বিবর্তিত হয়েছে এবং বিভাজিত হয়েছে।

 মিসিং লিঙ্কস:  

সামুদ্রিক প্রজাতিদের মধ্যে পরিবর্তন হয়তো বিবর্তন প্রক্রিয়ার প্রমান দেয়, কিন্তু জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে তা ছাড়াও আরো কিছু শিক্ষা নেবার আছে। আর  সবাইকে – জীববিজ্ঞানী ও জীবাশ্মবিদ সহ ,যে বিষয়টা উৎসাহিত করে তা হলো, সেটা হলো ট্রানজিশনাল ফর্মস বা ক্রান্তিকালীন বা অন্তর্বর্তীকালীন প্রজাতির যে জীবাশ্মগুলো দুটি খুবই ভিন্ন ধরনের প্রজাতির মধ্যবর্তী শুন্যস্থানটি সেতুর মতো সংযোগ করে থাকে। সরীসৃপ থেকে কি পাখীরা সত্যি বিবর্তিত হয়েছিল, আর স্থলজ প্রানীরা কি জলজ প্রানী থেকে এবং স্থলজ কোন প্রানী থেকে তিমি ? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে সেগুলোর জীবাশ্ম প্রমানগুলো কোথায়? এমন কি বেশ কিছু সৃষ্টিবাদী মেনে নিয়েছেন, আকারে ও গঠনে ছোট খাট কিছু পরিবর্তন হতেই পারে  সময়ের সাথে, যে প্রক্রিয়ার নাম ’মাইক্রো ইভ্যুলুশন’, কিন্তু  কোন একটি প্রানী বা উদ্ভিদের ভিন্ন কোন একটি প্রানী বা উদ্ভিদ থেকে বিবর্তিত হতে পারে ( বা ম্যাক্রো ইভ্যুলুশন) ,এটি তারা প্রত্যাখান করেছেন সম্পুর্ণভাবে। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন প্রস্তাবের সমর্থকরা বলেন, এই ধরনের বড় কোন পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন, কোন স্রষ্টার সরাসরি হস্তক্ষেপ।যদিও ডারউইন তার দি অরিজিন অব স্পিসিস বইটিতে  অন্তর্বর্তীকালীন কোন জীবাশ্মর কথা উল্লেখ করতে পারেননি, তবে তিনি নি:সন্দেহে খুবই খুশী হতেন, যে তার সেই পুর্বভাষন আধুনিক জীবাশ্মবিদ্যার পরিশ্রমের ফসলের মাধ্যমেই সত্যি প্রমানিত হয়েছে। এর মধ্যে আছে অসংখ্য প্রজাতি, যাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে বহু বছর আগেই ভবিষ্যদ্বানী করা হয়েছিল, মাত্র গত কয়েক দশকে কেবল তাদের জীবাশ্ম উত্তোলন করা হয়েছে।

কিন্তু জীবাশ্ম রেকর্ড এ কি পেলে আমরা তাকে গুরুত্বপুর্ণ বিবর্তনীয় ট্রানজিশন হিসাবে মনে করতে পারি? বিবর্তনের তত্ত্ব অনুযায়ী, যে কোন দুটি প্রজাতি, তারা যতটাই ভিন্ন হোক না কেন, কোন একসময় দুরঅতীতে তাদের দুজনের জন্যই একটি কমন বা সাধারন পুর্বসুরী প্রজাতির অস্তিত্ব ছিল।আমরা সেই একটি প্রজাতিকে বলতে পারি মিসিং লিঙ্ক বা হারানো যোগসুত্র।যেমনটা আমরা দেখেছি, শুধুমাত্র একটি আদি পুর্বপুরুষ প্রজাতিকে জীবাশ্ম রেকর্ডে খুজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শুন্য। তেমন কিছু আশা করার জন্য জীবাশ্ম রেকর্ড স্পষ্টত খুবই অসম্পুর্ণ, যেখানে ক্রমাগত ধারাবাহিকতা সচরাচর থাকে না।

কিন্তু তাই বলে আমাদের হাল ছেড়ে দেবার কোন প্রয়োজন নেই, আমরা কিছু অন্য প্রজাতি জীবাশ্ম রেকর্ডে খুজে পেতে পারি, যারা সত্যিকারের মিসিং লিঙ্ক প্রজাতিরই খুব নিকটাত্মীয়, যারা তাদের কমন বংশধারার প্রমানগুলো একই ভাবে প্রদর্শন করতে পারে। একটা উদহারন নেয়া যাক: ডারউইনের সময়, জীববিজ্ঞানী তথ্য নির্ভর একটি ধারনা করেছিলেন, শারীরবৃত্তীয় গঠনানুসারে যেমন হৃদপিন্ড এবং মাথার খুলি, পাখিরা সরীসৃপদের খুব কাছাকাছি একটি প্রজাতি। তারা ধারনা করেছিলেন, নিশ্চয়ই কোন সাধারন পুর্বসুরী প্রানী ছিল যা প্রজাতিকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুটি বংশধারা তৈরী করে যার একটি পর্যায়ক্রমে সব আধুনিক পাখির এবং অন্যটি সব আধুনিক সরিসৃপ প্রজাতির সৃষ্টি করেছিল।

এই কমন পুর্বসুরী প্রানীটি আসলে কেমন দেখতে ছিল? আমাদের ইনটুইশন বলছে, এটি আধুনিক সরীসৃপ এবং আধুনিক পাখির মাঝামাঝি দেখতে এমন কিছু ছিল, যার দুই ধরনের প্রানীদেরই বৈশিষ্ট ছিল কিন্তু এমন যে হতেই হবে তেমন কিন্তু না। ডারউইন নিজেই  দি অরিজিন এ বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা করেছিলেন:

যখন দুটি প্রজাতির দিকে তাকাই, আমার কাছ বেশ কঠিন মনে হয়েছে, এমন কোন একটি জীবকে মনে মনে কল্পনা না করে থাকতে পারাটা, যা ঠিক সরাসরি এদের মধ্যবর্তী ।কিন্তু এটি সম্পুর্ণ ভ্রান্ত ধারনা ; প্রতিটি প্রজাতির মধ্যবর্তী অন্তবর্তীকালীন প্রজাতি আমাদের সবসময় খোজা উচিৎ, একটি কমন বা সাধারন তবে অজানা কোন পুর্বসুরী প্রজাতি ; এবং সাধারনত এই পুর্বসুরী প্রানীটি তার থেকে উদ্ভব হওয়া সকল উত্তরসুরী প্রানী থেকে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সম্পুর্ণ ভিন্ন হবে।

যেহেতু সরীসৃপরা জীবাশ্ম রেকর্ডে পাখীর আগে আবির্ভুত হয়েছে, আমরা অনুমান করতে পারি, পাখী এবং সরীসৃপদের সাধারন পুর্বসুরী প্রানী কোন প্রাচীন প্রজাতির সরীসৃপ এবং তারা দেখতেও সরীসৃপদের মতই ছিল।আমরা এখন জানি এই প্রাচীন পুর্বসুরী প্রানীটি ছিল একটি ডায়নোসর।এর সার্বিক বৈশিষ্টগুলো আমাদের খুব সামান্যই ইঙ্গিত দেবে যে এটা আসলেই একটি মিসিং ‍লিঙ্ক – যার একটি বংশধারার উত্তরসুরী প্রাণীদের থেকেই পরে উদ্ভব হয়েছে আধুনিক পাখিরা এবং অন্যটি থেকে আরো অনেক ডায়নোসরদের। সত্যিকারের পাখিদের মত বৈশিষ্ট, যেমন ডানা, বড় প্রশস্ত বুকের হাড়, যা উড়তে সাহায্যকারী মাংশগুলোকে নোঙ্গর করতে সাহায্য করে, এসব বৈশিষ্টগুলো বিবর্বিত হয়েছিল আরো পরে সেই শাখায় যেখানে পাখিদের বিবর্তন হয়েছে।আর বংশধারাটি যখন সরীসৃপ থেকে পাখির দিকে অগ্রসর হয়েছে সেটিও আরো অনেক প্রজাতির জন্ম দিয়েছে যা সরীসৃপের এবং পাখীদের মত উভয় বৈশিষ্টর একটি মিশ্রন বহন করেছিল।সেসব প্রজাতির বেশ কিছু বিলুপ্ত হয়েছে, আর কিছু বিবর্তন অব্যাহত রেখে দিয়েছিল বর্তমানের সব আধুনিক পাখীদের।এই প্রাচীন প্রজাতির গ্রুপগুলোয়,এই বিচ্ছিন্ন হবার সেই পয়েন্টে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত প্রজাতিদের মধ্যে আমাদের অবশ্যেই  সাধারন পুর্বপুরুষ প্রজাতিদের বা বংশধারার সন্ধান করা উচিৎ।

দুটি গ্রুপের মধ্যে একটি সাধারন বংশধারা প্রমান করতে সেক্ষেত্রে ঠিক সেই একটি একক কমন আদিপুরুষ প্রজাতিকে উপস্থাপন করার দরকার নেই, এমনটি সরসরি পুর্বপুরুষ থেকে উত্তরপুরুষ প্রজাতিদের বংশধারার কোন প্রজাতিও না, বরং আমাদের এমন প্রজাতির জীবাশ্ম উপস্থাপন করতে হবে যাদের দুই গ্রুপকে সংযোগকারী কিছু সাধারন বৈশিষ্ট থাকতে হবে।এবং গুরুত্বপুর্ণভাবে আমাদের ডেটিং বা সময়ের হিসাবের প্রমানও দিতে হবে, যা প্রমান করবে এই জীবাশ্মগুলো একই সময়ের, অর্থাৎ তারা ভুতাত্ত্বিক রেকর্ডের সঠিক স্থানে এবং সঠিক সময়ে পাওয়া গেছে। একটি ট্রানজিশনাল বা অন্তবর্তীকালীন প্রজাতি কিন্তু একটি পুর্বসুরী প্রজাতির সমার্থক নয়, এটি শুধু মাত্র এমন একটি প্রজাতি যারা তাদের পুর্ববর্তী এবং পরবর্তী সকল প্রানীদের বৈশিষ্টের একটি মিশ্রন বহন করে।জীবাশ্ম রেকর্ডের অসম্পুর্ণতা কথা মনে রেখেই এ ধরনের কোন প্রজাতি সঠিক সময়ের ভুতাত্ত্বিকস্তরে খুজে পাওয়া অবশ্যই বাস্তবসম্মত একটি লক্ষ্য হতে পারে।সরীসৃপ থেকে পাখির ক্রমবিবর্তনে যেমন অন্তবর্তীকালীন প্রজাতি দেখতে আদি সরীসৃপদের মতই, শুধু কিছু পাখিদের মত বৈশিষ্ট ধারন করবে। এবং এই সব অন্তবর্তীকালীন প্রজাতিদের কোন জীবাশ্ম আমাদের খুজে পাওয়া ‍উচিৎ ভুত্বকের সেই সময়ের  স্তরে, যখন সরীসৃপদের বিবর্তন ইতিমধ্যে হয়ে গেছে কিন্তু আধুনিক পাখিদের আবির্ভাব তখনও হয়নি।উপরন্তু  ট্রানজিশনাল ফর্ম রা কিন্তু পুর্বসুরী কোন প্রজাতি থেকে জীবিত উত্তরসুরীর সরাসরি বংশধারায় নাও থাকতে পারে, তারা তাদের বিবর্তনীয় আত্মীয় হতে পারে, হয়তো যারা বিলুপ্ত হয়েছে। আমরা পরে দেখবো যে ডায়নোসররা পাখিদের বিবর্তনের সুচনা করেছে তাদের পালক ছিল, এবং পালকসহ কিছু প্রজাতির ডায়নোসররা পাখীর মত প্রানীদের উদ্ভব হবার অনেক পর পর্যন্ত টিকেও ছিল। এই সব পরবর্তী পালকসহ ডায়নোসররাই পাখিদের বিবর্তনের স্বপক্ষে প্রমান দিচ্ছে, কারন তারাই আমাদের বুঝতে সাহায্য করছে পাখীরা কোথা থেকে এসেছে।

সম্ভাব্য সময়ের পরিমাপ বা ডেটিং এবং  অন্তবর্তীকালীন প্রজাতির খানিকটা শারীরিক বৈশিষ্ট সম্বন্ধে তাহলে ভবিষ্যদ্বানী করা যেতে পারে বিবর্তন তত্ত্ব থেকেই। আর সেরকমই কিছু সাম্প্রতিক এবং নাটকীয় ভবিষ্যদ্বানী সত্য প্রমানিত হয়েছে আমাদের নিজেদের গ্রুপ – মেরুদন্ডী প্রানীদের ক্ষেত্রেই।

______ চলবে ____________________

Advertisements
যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: দ্বিতীয় পর্ব

One thought on “যে ইতিহাস লেখা আছে পাথরে: দ্বিতীয় পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s