কসমস এবং কার্ল সেগান : একটি অসাধারন প্রামান্য চিত্রের সংক্ষিপ্ত কাহিনী


কার্ল এডওয়ার্ড সেগান ( নভেম্বর ৯, ১৯৩৪ – ডিসেম্বর ১৯৯৬)  (ছবি সুত্র )

Science is more than a simple set of knowledge: is a way of thinking.  Carl Sagan

“The nitrogen in our DNA, the calcium in our teeth, the iron in our blood, the carbon in our apple pies were made in the interiors of collapsing stars. We are made of starstuff.  Carl Sagan

অনায়াসে আমি আমার জীবনকে দুটো ভাগে ভাগ করতে পারি, কার্ল সেগানের প্রামান্য চিত্র কসমস (Cosmos) দেখার আগে এবং পরে;

তথাকথিত শ্রেষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করার পরও আমার ভাগ্যে কোন ভালো বিজ্ঞান শিক্ষক মেলেনি, তাই হাইন্ডসাইটে অবলীলায় বলতে পারি, আমার প্রথম বিজ্ঞান শিক্ষক ছিলেন কার্ল সেগান। আর সেই শেখার সুযোগটা প্রথম  আসে এই Cosmos প্রামান্য চিত্রটি দেখার মাধ্যমে। যেখানে কার্ল সেগান সত্যিকারের পলিম্যাথের মত একই সাথে সভ্যতার জ্ঞানের সুত্রকে একটি ন্যারেটিভে গেথেছিলেন অসাধারন দক্ষতায়। তিনি পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন কেমন করে বিজ্ঞানের কথা সবার জন্য বলতে হয়।

ভীষন সৌভাগ্য বলতে হবে, কারন বাংলাদেশ টেলিভিশন আশির দশকেই এই প্রামান্য চিত্রটি প্রচার করেছিল; আর চোখ বন্ধ করলেই স্মৃতিতে স্পষ্ট দেখতে পাই, চট্রগ্রামের আমিন জুট মিলে আমাদের বাসার ড্রইং রুমের মেঝেতে বিস্ময় নিয়ে বসে আছি, আর ১৭  ইঞ্চির সাদা কালো ন্যাশনাল টিভির পর্দায় বাদামী (রংটা জেনেছি পরে) কর্ডুরয় জ্যাকেট পরা ক্যারিশমাটিক সুদর্শন কার্ল তার সম্মোহনী কন্ঠে সভ্যতার ইতিহাস, জীবনের উৎপত্তি , বিবর্তন, ছায়াপথ, গ্রহ, কুসংস্কার, মানব সভ্যতার ভবিষ্যত সবকিছু কিছু যাদুকরী দক্ষতায় সহজ ভাষায় বলে যাচ্ছেন। তখন আমার ইংরেজীর দৌড় খানিকটা বেড়েছে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের লাইব্রেরীর কল্যানে। আমি কৃতজ্ঞ বিটিভির সেই সময়ের অনুষ্ঠান যারা পরিকল্পনা করেছিলেন (আমি জানি না তারা কারা) , কারন তা না হলে আমার চিন্তার জগৎ হতে পারতো ভিন্ন।

মনে আছে আমি ১৩ টি পর্ব দেখিনি বা আদৌ সব প্রচারিত হয়েছিল কিনা ( কারন ছুটি শেষে হোস্টেলে ফিরে যেতে হয়েছিল) , তবে সে কাজটা শেষ করি ২০০৪ এ, এবার মেলবোর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর কল্যানে (লাইব্রেরীতে বই, পত্রিকার বাইরে সিনেমা, প্রামান্য চিত্র ইত্যাদি আরো কিছু থাকতে পারে সেই অভিজ্ঞতাও প্রথম); এর মাঝে অবশ্য ১৯৮৮ তে ঢাকায় আসার পর মুল Cosmos বইটি পড়ার  সুযোগ হয় (এর পারিশ্রমিক হিসাবে আমি এক বন্ধুর মামাতো ভাই এর বিয়েতে হলুদের স্টেজ এবং আল্পনা করেছিলাম 🙂 ) ;


কার্ল সেগানের কসমস বইটির প্রচ্ছদ (পেপারব্যাক এডিশন)

১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর ২৮ তারিখ, প্রথম বারের মত যুক্তরাষ্ট্রে পিবিএস চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছিল ১৩ পর্বের একটি যুগান্তকারী ধারাবাহিক প্রামান্যচিত্র, Cosmos: A Personal Voyage; যার প্রধান রুপকার এবং উপস্থাপক ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান; তার সাথে ছিলেন, অ্যান দ্রুইয়ান ( পরবর্তীতে সেগানের জীবন সঙ্গীনি) এবং কাল সেগানের মতই আরেকজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্টিভেন সটার। বিজ্ঞান প্রামান্যচিত্রে এর পুর্বসুরী ছিলো বিবিসি র এবং কেনেথ ক্লার্কের Civilisation: A Personal View by Kenneth Clark (১৯৬৯), জ্যাকব ব্রনোস্কির The Aascent of Man (১৯৭৩) এবং ডেভিড অ্যাটেনবুরোর Life on Earth (১৯৭৯); (পিবিএস এর সাথে প্রামান্যচিত্রটির সহপ্রযোজনা করেছিল বিবিসি);

বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে একজন কিংবদন্তী কার্ল সেগান ততদিনে সুপরিচিত আর সুপ্রতিষ্ঠিত, সেটা যেমন তার নিজস্ব পেশায়, তেমনি তার লেখনীতে। তার অসাধারন The Dragons of Eden: Speculations on the Evolution of Human Intelligence ইতিমধ্যেই পেয়েছে ১৯৭৭ এর পুলিৎজার পুরষ্কারের স্বীকৃতি, এছাড়া আরো পুরষ্কার তো আছেই। মুলত জ্যাকব ব্রনোস্কির  The Ascent of Man এর কাঠামোয় কার্ল সেগান প্রামান্য চিত্রটির মুল কাঠামো প্রাথমিক ভাবে পরিকল্পনা করেন, কিন্তুর বিষয়ের বৈচিত্রের কারনে তাকে বেছে নিতে হয় আভ্যন্তরীন সেট ও বহিদৃশ্যের একটি চমৎকার সংযোগ (ভিডিও এবং ফিল্ম এর সমন্বয়) ; এবং ৮০ সালের সবচেয়ে নতুন ধরনের স্পেশাল ইফেক্ট ব্যবহারের মাধ্যমে কার্ল সেগান ও তার সহযোগীরা প্রামান্য চিত্রটিকে দেন নতুন একটি মাত্রা, যেখানে আভ্যন্তরীন দৃশ্যগুলোর জন্য মডেল ব্যবহার করা হয় প্রচলিত পদ্ধতির পুর্ণাঙ্গ আকারের কোন ইনডোর সেটের পরিবর্তে।

Cosmos আরো একজন অসাধারন মানুষকে সারা বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দেয়, তিনি হচ্ছেন গ্রীক সঙ্গীত পরিচালক ভ্যানগেলিস (Vangelis); ভ্যানগেলিসের বেশ কিছু ট্র্যাক ব্যবহার করা হয়েছিল প্রামান্য চিত্রটিতে। কার্ল সেগান, স্টিভেন সটার, অ্যান দ্রুইয়ানের লেখনী, ভ্যানগেলিস ইলেক্ট্রনিক সঙ্গীত, স্পেশাল ইফেক্ট এবং পিবিএস (PBS) চ্যানেলেরে কিছু অসাধারন প্রডিউসার আর পরিচালকদের ( প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা প্রয়োজন, PBS তাদের সেই দক্ষতার ধারাবাহিকতা আজো অব্যাহত রেখেছে আটলান্টিকের দুই পাড়ের প্রতিভাবানদের সমন্বয়ে) প্রচেষ্টায় Cosmos হয়ে ওঠে একটি ব্যতিক্রমী প্রামান্য চিত্র।

ভ্যানগেলিসের কম্পোজ করা কসমস থিম

২০০৯ সালেও সারা পৃথিবীতে এটি সবচেয়ে বেশী দেখা হয়েছে এমন একটি প্রামান্য চিত্র ( ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এর রেকর্ডটি অতিক্রম করে পিবিএস এর আরেকটি প্রামান্যচিত্র The Civil War) ; মোট ৬০ টি দেশে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন দর্শক দেখেছেন বহু পুরষ্কার জেতা এই প্রামান্য চিত্রটি। ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বানিজ্যিক টিভির যাত্রা শুরু হয়ে এটি কিনে নেন টেড টার্ণার। এ সময় নতুন বিষয়গুলো নিয়ে কার্ল সেগানের সাথে টেড টার্ণারের একটি সাক্ষাৎকার সহ একটি ১৪ তম পর্ব তৈরী করা হয়। ২০০৫ এর Science Channel  নতুন করে ডিজিটাল নানা ইফেক্ট এবং কম্পিউটার গ্রাফিক্স যোগ করে পুণ:প্রচার করে প্রথম সম্প্রচারের ২৫ তম বার্ষিকীতে।

সম্প্রতি ফক্স টিভি ( ঠিক শুনেছেন ফক্স ) ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল Cosmos এর দ্বিতীয় অধ্যায়ের মোট ১৩ পর্বের একটি ধারাবাহিক বানানো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পুরোনো লেখকদের মধ্যে অ্যান দ্রুইয়ান থাকছেন ( এছাড়া সেথ ম্যাকফারলেন), কার্ল সেগানের গুরু দ্বায়িত্বটি এবার আরেকজন পরিচিত বিজ্ঞানী নীল ডিগ্রাসে টাইসন এর উপর; মুল কসমসের এই সিকুয়েলটির নাম দেয়া হয়েছে Cosmos: A Space-Time Odyssey;  ২০১৪ সালের প্রথম দিকে এটি যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নীচে Cosmos এর ১৩ ‍টি পর্বের ভিডিও লিঙ্ক :

প্রথম পর্ব :Episode 1: “The Shores of the Cosmic Ocean”

দ্বিতীয় পর্ব : Episode 2: “One Voice in the Cosmic Fugue”

তৃতীয় পর্ব: Episode 3: “The Harmony of the Worlds”

চতুর্থ পর্ব: Episode 4: “Heaven and Hell”

পঞ্চম পর্ব: Episode 5: “Blues for a Red Planet”

ষষ্ঠ পর্ব: Episode 6: “Traveler’s Tales”

সপ্তম পর্ব: Episode 7: “The Backbone of Night”

অষ্টম পর্ব :Episode 8: “Travels in Space and Time”

নবম পর্ব:Episode 9: “The Lives of the Stars”

দশম পর্ব:Episode 10: “The Edge of Forever”

একাদশ পর্ব:Episode 11: “The persistence of memory”

দ্বাদশ পর্ব:Episode 12 – “Encyclopædia Galactica”

ত্রয়োদশ পর্ব: Episode 13 – Who Speaks for Earth?

Advertisements
কসমস এবং কার্ল সেগান : একটি অসাধারন প্রামান্য চিত্রের সংক্ষিপ্ত কাহিনী

2 thoughts on “কসমস এবং কার্ল সেগান : একটি অসাধারন প্রামান্য চিত্রের সংক্ষিপ্ত কাহিনী

  1. দারুণ পোস্ট! অনেক আগের কথা মনে পড়ে গেলো। যদিও আমি টিভিতে দেখি নাই। দেখেছি পিসিতে। যখন টিভিতে দেখিয়েছে তখন আমার জন্মই হয় নাই। 😛 তবে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল বইটা পড়েছি আগে। পড়ে ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম!

    1. অনেক ধন্যবাদ.. প্রায়ই আমি এটি দেখি.. অপেক্ষা করছি নতুন করে এটি আবার বানানো হচ্ছে তার অপেক্ষায়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s