রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: চতুর্থ অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব)

ছবি: সিডনী হ্যারিসের একটি বিখ্যাত কার্টুন (সুত্র ইন্টারনেট)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন এর বাংলা অনুবাদ :
প্রথম , দ্বিতীয় ,তৃতীয়  , চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( দ্বিতীয় পর্ব) , চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) 

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : চতুর্থ অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব )
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

কেন প্রায় নিশ্চিৎভাবে বলা সম্ভব ঈশ্বরের কোন অস্তিত্ব নেই  

চতুর্থ অধ্যায় ( তৃতীয় পর্ব ) এর পরে:

অ্যানথ্রোপিক ‍মুলনীতি: কসমোলজীক্যাল সংস্করন।

শুধুমাত্র একটি মিত্র গ্রহেই আমরা বাস করিনা, একটি মিত্র মহাবিশ্বেও আমাদের বাস। এর কারন, আমাদের অস্তিত্বর সেই সত্যটি, পদার্থবিদ্যার মহাজাগতিক আইনগুলো অবশ্যই যথেষ্ট জীবন বান্ধব হতে হবে জীবনের উৎপত্তির জন্য। সুতরাং বিষয়টা কোন দুর্ঘটনা নয় যে, আমরা যখন রাতের  আকাশে তারাদের দেখি, সিংহভাগ রাসায়নিক মৌলর অস্তিত্বের জন্য এই নক্ষত্র অবশ্য প্রয়োজনীয়, আর এই সব মৌল এবং রাসায়নিক উপাদান ছাড়া জীবনের কোন অস্তিত্বই থাকার কথা না। পদার্থবিজ্ঞানীরা পরিমাপ করে দেখেছেন, যদি পদার্থবিদ্যার আইন এবং ধ্রুবগুলো যদি সামান্যতম ভিন্ন হত তাহলে এমন মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতো,যেখানে জীবনের উৎপত্তির ঘটনাটি হত অসম্ভব। বিভিন্ন পদার্থবিদরা এটিকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু উপসংহার সবসময়ই এক (পদার্থবিদ ভিক্টর স্টেঙ্গার (যেমন, তার God, The Failed Hypothesis) সাধারন ঐক্যমতের এ বিষয়ে দ্বিমত পোষন করেছেন। এবং ভৌতিক সব আইন এবং ধ্রুব যে বিশেষভোবে জীবন সহায়ক  এই বিষয়টি তিনি মানতে নারাজ। যাইহোক আমি একটু অতিমাত্রায় নমনীয় হয়ে বিষয়টি মেনে নেবো, শুধু যুক্তি দেখানোর জন্য যে, যাই হোক না কেন, এই ধারনাটি কোনভাবেই ঈশ্বরবাদীরা ব্যবহার করতে পারেননা যুক্তিসঙ্গত ভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে তাদের প্রস্তাবনায়); মার্টিন রীস (Martin Rees) তার বই, জাষ্ট সিক্স নাম্বার (Just Six Numbers) এ ছয়টি মৌলিক ধ্রুবর একটি তালিকা করেছিলেন, যা বিশ্বাস করা হয়, সমগ্র মহাবিশ্বে সঠিক। এই ছয়টি সংখ্যার প্রতিটি এমনই সুক্ষভাবে সাজানো যে, যে তারা যদি সামান্য ভিন্ন হয়, মহাবিশ্বও সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন হত এবং তা জীবন বৈরী হত। ( আমি বলবো ’সম্ভবত’ আংশিকভাবে যার কারন, আমাদের জানা নেই ভিনগ্রহী জীবনের আকার আকৃতি কতটা ভিন্ন আমাদের থেকে, এবং আংশিকভাবে এর অপর কারনটি হল, শুধু মাত্র একটি ধ্রুব এককভাবে পরিবর্তন করলে আমাদের ভুল হবার সম্ভাবনা থাকে বেশী। আসলে কি কয়েকটি ধ্রুবর একটি সমন্বয় থাকতে পারে না, যা হতে পারে জীবন বান্ধব? আমরা যে সমন্বয়টি এখনও আবিষ্কার করতে পারিনি, কারন আমরা ব্যস্ত এককভাবে ধ্রুবগুলোর মাত্রা নিয়ে। যাইহোক আমি আমার আলোচনা করে যাবো,  এমনভাবে যেন, আসলেই আপাতদৃষ্টিতে মৌলিক ধ্রুবগুলোর পরিমাপের সুক্ষ নিয়ন্ত্রন বা ফাইন টিউনিয় এর বিষয়টি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আসলেই আমাদের বড় একটি সমস্যা আছে)।

রীস এর ছয়টি সংখ্যার একটি উদহারন হচ্ছে, তথাকথিত শক্তিশালী বা স্ট্রং (strong) ফোর্সের মাত্রা, যে শক্তিটি কোন একটি পারমানুর নিউক্লিয়াসের উপাদানগুলোকে একসাথে ধরে রাখে: যে পারমানবিক শক্তিকে অতিক্রম করতে হয় আগে কোন অনুকে বিভাজিত করার আগে। এটি মাপা হয় E দিয়ে, হাইড্রোজেন এর একটি পরমানুর ভরের যে অংশ শক্তিতে রুপান্তরিত হয় যখন হাইড্রোজেন সন্নিবেশিত বা যুক্ত হয়ে হিলিয়াম অনু তৈরী করে। আমাদের মহাবিশ্বে এই সংখ্যার মান, ০.০০৭ এবং মনে করা হচ্ছে যে, কোন রসায়নের ( যা জীবনের উৎপত্তির জন্য অবশ্য শর্ত) অস্তিত্বের জন্য, এই E এর মান এই মাত্রার খুব কাছাকাছি হতে হবে। আমরা যে রসায়নের সাথে পরিচিত, তা মুলত, সন্নিবেশিত এবং পুণসন্নিবেশিত হওয়া মোট ৯০ টি বা সেরকম সংখ্যক প্রকৃতিতে উপস্থিত পর্যায় সারণীর মৌলগুলো ‍দিয়েই তৈরী। হাইড্রোজেন হচ্ছে সবচেয়ে সাধারন এবং সবচেয়ে বেশী মাত্রায় বিদ্যমান মৌল। মহাবিশ্বের সব অন্য মৌলই হাইড্রোজেন থেকেই তৈরী হয় নিউক্লিয়ার ফিউশনের ( Neuclear Fusion) মাধ্যমে। নিউক্লিয়ার ফিউশন কিন্তু খুবই কঠিন একটি প্রক্রিয়া, যা নক্ষত্রের অভ্যন্তরে খুবই উচু তাপামাত্রার পরিবেশে ঘটে ( এবং হাইড্রোজেন বোমায়); অপেক্ষাকৃত ছোট নক্ষত্রগুলো, যেমন আমাদের সুর্য এই প্রক্রিয়া শুধু মাত্র হালকা মৌল তৈরী করতে পারে, যেমন হিলিয়াম, হাইড্রোজেন এর পরেই পর্যায় সারনীয় দ্বিতীয় লঘুতম মৌল । আরো বড় আরো উত্তপ্ত নক্ষত্রর দরকার সেই তাপমাত্রার সৃষ্টি করার জন্য, যা বাকী প্রায় সব ভারী মৌল সৃষ্টি করতে পারে  নিউক্লিয়ার ফিউশনের ধারাবাহিক বিক্রিয়া প্রক্রিয়ায়, যার বিস্তারিত প্রক্রিয়াটি উৎঘাটন করেছিলেন ফ্রেড হয়েল এবং তার দুই সহকর্মী ( এই আবিষ্কারের স্বীকৃতি সরুপ,রহস্যজনকভাবে অন্য দুইজনের পাওয়া নোবেল পুরষ্কারের ভাগ হয়েলকে দেয়া হয়নি) ; এই বড় নক্ষত্র গুলো সুপারনোভা হয়ে বিস্ফোরিত হতে পারে  এবং  এভাবে মহাশুন্যে ছড়িয়ে দেয় তাদের তৈরী উপাদানগুলো, পর্যায় সারণীর মৌলগুলো সহ, ধুলার মেঘ হিসাবে। এই ধুলোর মেঘগুলো ঘনীভুত হয়ে তৈরী করে নতুন নক্ষত্র, আমাদের পৃথিবীর মত গ্রহ। একারনে পৃথিবী সর্ব ব্যাপী হাইড্রোজেন এর চেয়েও আরো  বেশী অন্য অনেক ধরনের মৌলে সমৃদ্ধ; যে মৌলগুলো ছাড়া রসায়ন, এবং জীবন হতো অসম্ভব।

এখানে প্রাসঙ্গিক বিষয়টি হচ্ছে, স্ট্রং ফোর্সের মান হচ্ছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ নিউক্লিয়ার ফিউশন এর ধারাবাহিক বিক্রিয়া পর্যায় সারণীর কোন মৌল অবধি তৈরী হবে তা নির্ণয় করার জন্য । যদি এর পরিমান হয় খুব সামান্য, ধরুন ০.০০৬, ০.০০৭ এর বদলে, মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন ছাড়া আর কিছুই থাকতো না, কোন ধরনের উপযোগী রসায়ন এর অস্তিত্বই থাকতো না। এবং এটি যদি খানিকটা বেশী হত, ধরুন ০.০০৮, তাহলে সব হাইড্রোজেন একসাথে ফিউজ হয়ে ভারী মৌলগুলো তৈরী করতো। হাইড্রোজেন ছাড়া কোন রসায়নই আমরা যে জীবনকে চিনি, তা সৃষ্টি করতে পারতো না। একটা কারন তো অবশ্যই কোন পানির অস্তিত্ব থাকতো না। গোল্ডিলকস পরিমাপ হলো ০.০০৭,  যা এই মাত্রায় একদম সঠিক, প্রয়োজনীয় মৌল সরবরাহ করার জন্য, একটি চমৎকার এবং জীবন সহায়ক রসায়নের ভিত্তি গড়ে দিতে যার প্রয়োজন।

রীস এর ৬ টি সংখ্যার বাকীগুলো নিয়ে আমি আলোচনা করবোনা। তবে প্রত্যেকটি সম্বন্ধে মুল উপসংহার একই। প্রতিটি সংখ্যার পরিমাপ ঠিক সেই গোল্ডিলকস অনুকুল সীমায় অবস্থান করছে, যার বাইরে জীবনের উৎপত্তি অসম্ভব একটি ব্যাপার। এ বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিৎ? আবারো, ঈশ্বরবাদীদের উত্তর আছে একদিকে, আর অন্যদিকে আছে অ্যানথ্রোপিক উত্তর। ঈশ্বরবাদীরা বলবেন, ঈশ্বর যখন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, এর মুল ধ্রুবগুলো তিনি নিজহাতে এমনভাবে সুক্ষতা দিয়েছেন, যে প্রত্যেকটি জীবনের উৎপত্তির গোল্ডিলক সীমানায় অবস্থান করে। যেমন, ঈশ্বরের কাছে ৬ টি নব বা সুইচ বা বোতাম ছিল, এবং তিনি সাবধানে সেটা নাড়াচাড়া করে এর গোল্ডিলকস সীমানার মানটি ঠিক করেছেন। সবসময়ে মতই, ঈশ্বরবাদীদের এই উত্তর খুব অসম্পুর্ণ এবং ভীষন অপুর্ণতার চিহ্ন বহন করে। কারন এটি ঈশ্বরের অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করার বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছে। একজন ঈশ্বর যিনি ৬ টি সংখ্যার জন্য সঠিক গোল্ডিলকস পরিমান পরিমাপ করতে পারেন , তাকেও অন্ততপক্ষে অবশ্যই সুক্ষভাবে নিয়ন্ত্রন করা সংখ্যাগুলোর মতই অসম্ভাব্য হতে হবে। এবং এই অসম্ভাব্যতাই আসলেই সেই প্রসঙ্গ, যার আলোচনা আমরা করছি। ঈশ্বরবাদীদের উত্তর সম্পুর্ন ব্যর্থ হয়েছে মুল সমস্যাটার সমাধানে উল্লেখযোগ্য কোন অবস্থানে পৌছাতে। আমি কোন বিকল্প দেখছি না এটিকে বাদ দেয়া ছাড়া,  এবং একই সাথে বিস্ময়বোধ করছি সেই বিশাল সংখ্যক মানুষদের দেখে, যারা এই সমস্যাটি আদৌ দেখতে পাচ্ছেন না এবং মনে হচ্ছে আন্তরিকভাবেই তারা সন্তুষ্ট, এই স্বগীয় কারো কলকব্জা নাড়িয়ে নিয়ন্ত্রন করার যুক্তিতে।

এ ধরনের বিস্ময়কর অন্ধত্বর মনস্তাত্ত্বিক কারন হয়তো হতে পারে, প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং অসম্ভাব্যতাকে এর পোষ মানানোর শক্তি দ্বারা জীববিজ্ঞানীদের মত অনেক মানুষের সচেতনতার স্তরটি আসলে বাড়েনি। জে অ্যান্ডারসন থমসন, বিবর্তন মনস্তাত্ত্বিকতায় তার দৃষ্টিভঙ্গীতে আমাকে দেখিয়েছেন অন্য আরেকটি কারন: সেটা হচ্ছে সকল অজৈব বস্তুকে কোন এজেন্ট বা প্রভাব ফেলতে এবং কাজ করতে সক্ষম  এমন কোন সত্ত্বার সাথে একাত্ম করে চিহ্নিত করার আমাদের মনস্তাত্তিক পক্ষপাতিত্ব এবং প্রবণতাটি। থমসন যেমনটি বলেছেন, কোন চোরকে ছায়া ভাবার চেয়ে কোন ছায়াকে চোর ভাবার প্রবণতাই আমাদের বেশী। একটি মিথ্যা পজিটিভ বা যা সত্য বলে ভাবছিলাম তা আসলে মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়াটা হয়তো সময় নষ্ট করে, তবে কোন মিথ্যা নেগেটিভ, বা যা মিথ্যা ভাবছেন তা আসলে সত্যি হলে, এর ফলাফল ভয়ঙ্কর হতে পারে। আমাকে লেখা তার একটি চিঠিতে তিনি প্রস্তাব করেন যে, আমাদের পুর্বপুরুষের অতীতে আমাদের চারপাশে আমাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জটা আসলে এসেছে আমাদের স্বগোত্রীয় একে অপরের কাছ থেকে: ‘ মানুষের উদ্দেশ্য নিয়ে সেই ধরে নেয়া বা ডিফল্ট ধারনাটির ফলাফল, প্রায়শই ’ভয়’; আমাদের খুবই কষ্ট হয়, মানুষের দ্বারা সৃষ্টি হয়নি এমন কোন কিছু ভাবতে’; আমরা প্রাকৃতিকভাবে সবকিছু গনহারে ঈশ্বরের উদ্দেশ্য বলে চিহ্নিত করি। এই কোন কিছু কারো দ্বারা সৃষ্ট বা এজেন্ট এর মোহময়তার ধারনায় আবার ফিরে আসবো পরে ৫ অধ্যায়ে।

জীববিজ্ঞানীরা, প্রাকৃতিক নির্বাচনের শক্তি দ্বারা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত তাদের সচেতনতা দিয়েই ব্যাখ্যা দিতে পারে অসম্ভাব্য জিনিসগুলোর উদ্ভবের, তাদের এমন কোন তত্ত্বতে সন্তষ্ট হবার কথা না যা অসম্ভাব্যতার সমস্যাকে সম্পুর্ণ এড়িয়ে যায়। ঈশ্বরবাদীদের এই অসম্ভাব্যতার ধাধার উত্তর হচ্ছে একটি বিশাল সত্যকে এড়িয়ে যাওয়া। যা সমস্যাটিকে নতুন করে তো ব্যাখ্যা করেই না বরং উদ্ভটভাবে বিষয়টি আরো বিশাল করে তোলে। তাহলে, এবার অ্যানথ্রোপিক বিকল্প ব্যাখ্যাটির দিকে দৃষ্টি ফেরাই। অ্যানথ্রোপিক উত্তর, এর সবচেয়ে সাধারন রুপে হলো, আমরা কেবল মাত্র সে ধরনের মহাবিশ্বে এই প্রশ্নগুলো আলোচনা করতে পারবো, যা কিনা আমাদেরকে তৈরী করতে সক্ষম। সুতরাং আমাদের অস্তিত্ব নির্ধারন করছে যে পদার্থবিদ্যার মৌলিক ধ্রুবগুলোকে থাকতে হবে তাদের সংশ্লিষ্ট গোল্ডিলকস জোনে, বিভিন্ন পদার্থবিদরা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অ্যানথ্রোপিক সমাধানকে সমর্থন করেন আমাদের অস্তিত্বের রহস্য ব্যাখ্যা করতে।

কট্টরপন্হী পদার্থবিদরা বলেন, এই ছয়টি ধ্রুবর সুইচ বা নবগুলো শুরুতেই তাদের নিজেদের ইচ্ছামত পরিবর্তন হবার মত স্বাধীন ছিল না; এবং আমরা যখন শেষ পর্যন্ত আমাদের দীর্ঘদিন আশায় থাকা ‘থিওরী অব এভরিথিং’ এ পৌছাতে পারবো, আমরা দেখবো যে এই ছয়টি প্রধান সংখ্যা একে অপরের উপর নির্ভরশীল বা এমন কিছুর উপর নির্ভরশীল যা এখনও অজানা বা এমনভাবে সম্পর্কযুক্ত যে আজ আমরা তা কল্পনাও করতে পারবো না। এই ছয়টি সংখ্যা হয়তো দেখা যাবে, বৃত্তের পরিধির সাথে তার ব্যাসের অনুপাতের যে ভিন্নতা থাকতে পারে তার চেয়ে বেশী স্বাধীন না। দেখা যাবে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবার আসলে একটাই উপায় ছিল। সেই ছয়টি নব নাড়া চাড়া করার জন্য ঈশ্বরের প্রয়োজন তো বহুদুরের কথা, কোন নবইতো ছিলনা নাড়াচাড়া করার।

অন্য পদার্থবিদরা (তাদের একজন উদহারন হতে পারেন মার্টিন রীস) মনে করেন, এই ব্যাখ্যাটি সন্তোষজনক না । এবং আমি মনে করি, আমি তাদের সাথে একমত। আসলে এটি যুক্তিযুক্তভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য যে মহাবিশ্ব হবার একটি পথই আছে, কিন্তু সেই একটি পথ বা উপায় কেনই বা এমন ভাবে সাজানো আছে যা ধীরে ধীরে আমাদের বিবর্তনের জন্য? কেনই বা এটাকে সেই ধরনের মহাবিশ্ব হতে হবে, যা মনে হয়- তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রিম্যান ডাইসন এর ভাষায়, মহাবিশ্ব যেন ‘অবশ্যই আগে থেকেই জানতো আমরা আসছি?’ দার্শনিক জন লেসলী ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত একজন মানুষের রুপক ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করেছেন, হতে পারে ফায়ারিং স্কোয়াড টিমের ১০ জনই তাদের বন্দুকের নিশানা ভুল করলো। পুর্বদৃষ্টি দিয়ে দেখলে, এমন অবস্থায় বেচে যাওয়া কেউ তার ভাগ্য নিয়ে আনন্দিত  বলতেই পারেন, ‘বেশ, নিশ্চয়ই তারা সবাই নিশানা ভুল করেছে নয়তো সে কথা ভাবার জন্য আমি এখানে থাকতাম না।’ কিন্তু তারপরও সে কিন্তু ক্ষমাযোগ্য কোন বিস্ময় নিয়ে ভাবতেই পারেন, কেন তারা সবাই নিশানা ভুল করলো, এবং নানা সম্ভাব্য হাইপোথিসিস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে পারেন, যেমন তাদের ঘুষ দেয়া হয়েছে অথবা তারা সবাই মাতাল ছিল ‍ইত্যাদি।

এর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আরো একটি প্রস্তাব দিয়ে উত্তর দেয়া যেতে পারে, যা মার্টিন রীস নিজেই সমর্থন করেছিলেন, তা হলো অনেক গুলো মহাবিশ্ব আছে, ফেনার বুদ্বুদের মত যারা সহাবস্থান করছে, কোন একটি মাল্টিভার্স বা বহুমহাবিশ্বে ( বা মেগাভার্স যেমন লিওনার্ড সাসকিন্ড বলতে পছন্দ করেন); ( সাসকিন্ড তার The Cosmic Landscape: String Theory and the Illusion of Intelligent Design এ অ্যানথ্রোপিক প্রিন্সিপালের একটি চমৎকার সমর্থন করেছিলেন মেগাভার্সে। তিনি বলেন, বেশীর ভাগ পদার্থবিদরাই এই ধারনাটি অপছ্ন্দ করেন। যদিও আমি বুঝতে পারিনা কেন. আমি মনে করি এটি দারুন সুন্দর একটি প্রস্তাব – হয়তো এর কারন ডারউইন আমার সচেতনতার স্তরটিকে উন্নীত করেছেন ); কোন একটি মহাবিশ্বে আইন এবং ধ্রুবগুলো, যেমন আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বে ,আসলে বহুমহাবিশ্ব বা মাল্টিভার্সে হচ্ছে উপআইন বা বাই ল। সম্পুর্ণ মাল্টিভার্সে স্পষ্টতই অসংখ্য সেট বিকল্প উপআইন বা বাই ল আছে। অ্যানথ্রোপিক মুলনীতি এখানে বলছে যে, সেই মহাবিশ্বগুলোর কোন একটিতে ( যা সংখ্যায় খুবই কম বলেই অনুমান করা হয়) আমরা অবশ্যই অবস্থান করছি, যেখানকার পদার্থবিদ্যার উপআইনগুলো ঘটনাক্রমে আমাদের ক্রমান্বয়ে বিবর্তনের পক্ষে উপযোগী এবং সেজন্যই আমরা সমস্যাটি নিয়ে ভাবতে পারছি।

মাল্টিভার্স তত্ত্বের একটি মজার সংস্করনের উৎপত্তি হয়েছে আমাদের মহাবিশ্বের সর্বশেষ পরিনতির কথা বিবেচনা করে। মার্টিন রীসের ৬ টি ধ্রুব সংখ্যার মানের উপর নির্ভর করে আমাদের মহাবিশ্ব হয়ত অনির্দিষ্ট কালের জন্য সম্প্রসারনশীল হতে পারে বা এটি একটি ভারসাম্যে স্থিতাবস্থায় পৌছাতে পারে বা এই ক্রমসম্প্রাসারনশীলতা বীপরিতমুখী হতে পারে এবং সৃষ্টি করতে পারে একটি মহাসংকোচন বা বিগ ক্রান্চ। কিছু বিগ ক্রান্চ মডেল এ মহাবিশ্ব আবার সম্প্রসারিত হওয়া শুরু করে এবং এভাবে অনির্দিষ্ট কালের জন্য , যেমন ধরুন ২০ বিলিয়ন বছরের একটি সময় চক্রে। আমাদের স্ট্যান্ডার্ড মডেল মহাবিশ্বে, সময় তার নিজের যাত্রা শুরু করে মহাবিস্ফোরন বা বিগ ব্যাঙ্গ এর সময়ে মহাশুন্যর সুচনার সাথেই  প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছর আগে। ধারাবাহিক বিগ ক্র্যান্চ মডেল হয়তো এই বাক্যটিকে পরিববর্তন করতে পারে এভাবে: আমাদের সময় এবং মহাশুন্যর আসলে সুচনা হয়েছিল আমাদের বিগ ব্যাঙ্গ  এর সময় কিন্তু অসংখ্য বিগব্যাঙ্গ এর সুদীর্ঘ ধারাবাহিকতায় সবচেয়ে সাম্প্রতিকতম; যাদের প্রত্যেকটির শুরু হয়েছিল আবার বিগ ক্রান্চের মাধ্যমে, যা এই ধারাবাহিকতায় এর আগের মহাবিশ্বটির সমাপ্তির কারন। কেউই বুঝতে পারেননি কি ঘটেছিল আসলে বিগ ব্যঙ্গ এর মত কোন সিঙ্গুলারিটি ঘটনার সময়। সুতরাং এটা ধারনা করা যায় যে সব আইন এবং ধ্রুবগুলো নতুন একটি মানে রিসেট হয়, প্রতিবারই এই চক্রে। যদি এভাবে ব্যাঙ্গ – সম্প্রসারন- সংকোচন- ক্র্যান্চ চক্র চলতেই থাকে মহাজাগতিক অ্যাকর্ডিয়নের মত, আমরা কোন সমান্তরাল কোন মাল্টিভার্সের সংস্করন পরিবর্তে পাবো ধারাবাহিক । আরো একবার অ্যানথ্রোপিক নীতি তার ব্যাখ্যার দ্বায়িত্ব পালন করে। ধারাবাহিক মহাবিশ্বের সবকয়টির মধ্যে হয়তো অল্প কয়েকটির ধ্রুব এবং আইনগুলো এমন করে সাজানো যে তারা জীবনের ‍উৎপত্তির জন্য সহায়ক। এবং অবশ্যই, বর্তমান  মহাবিশ্ব সেই সংখ্যালঘু মহাবিশ্বের একটি, কারন আমরা এখানে বসবাস করছি। এই মাল্টিভার্সের এই ধারাবাহিক সংস্করনটি একসময় যেমন ভাবার হতো এখন এর সম্ভাবনাকে সেভাবে ভাবা হয়না। কারন সাম্প্রতিক প্রমান আমাদের মহা সংকোচনের ধারনা থেকে অন্য দিকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে আমাদের মহাবিশ্বর নিয়তিতে চিরন্তন সম্প্রসারণই আছে।

লী স্মোলিন (Lee Smolin), আরেকজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ মাল্টিভার্স তত্ত্বটির একটি কৌতুহলোদ্দীপক ডারউইনীয় সংস্করনপ্রস্তাব করেছেন, যারা মধ্যে ধারাবাহিক এবং সমান্তরাল ‍দুটি মহাবিশ্বের ধারনাই বিদ্যমান। স্মোলিন এর ধারনাগুলো- যার বিশদ ব্যাখ্যা আছে ‘দি লাইফ অব দি কসমসে ( The life of the cosmos)’ এ – নির্ভর করে আছে সেই তত্ত্বের উপর, যা বলছে, কোন একটি মা মহাবিশ্ব বা ইউনিভার্স থেকে কন্যা ইউনিভার্স  সৃষ্টি হয় পুরোমাত্রার মহাসংকোচনের মাধ্যমে না বরং স্থানীয়ভাবে কোন কৃষ্ণ গহবর বা ব্ল্যাক হোল  এর মধ্যে। বংশগতির একটি অন্যকরম ধারনা স্মোলিন এখানে তার প্রস্তাবিত তত্ত্বে যোগ করেন: কন্যা মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় তাদের মৌলিক ধ্রুবগুলোও খানিকটা মিউটেশন বা পরিবর্তিত হয় মা মহাবিশ্ব থেকে। ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচনে এই হেরেডিটি হচ্ছে অপরিহার্য একটি উপাদান, আর স্মোলিন এর বাকী তত্ত্ব এখান থেকেই প্রাকৃতিকভাবেই অগ্রসর হয়। যে মহাবিশ্বগুলোর সেই বৈশিষ্ট আছে যা তাদের ’টিকে’ থাকতে এবং  আরো পরবর্তী ’প্রজন্ম’ সৃষ্টি করতে সহায়তা দেয়, মাল্টিভার্স এ সেই সব মহাবিশ্বগুলো ক্রমান্বয়ে প্রাধান্য বিস্তার করে। যেহেতু এই পরবর্তী প্রজন্মের মহাবিশ্ব তৈরীর প্রক্রিয়াটা ঘটে কৃষ্ণ গহবরে, সফল  সব মহাবিশ্বগুলোর কৃষ্ণগহবর তৈরী করার জন্য প্রয়োজনীয় গুনাবলী থাকে । এই দক্ষতা  ইঙ্গিত করছে, আরো বাড়তি কিছু বৈশিষ্ট্যের। যেমন, পদার্থর ঘনীভুত হয়ে মেঘ এবং নক্ষত্র সৃষ্টি করা ও পরবর্তীতে কৃষ্ণ গহবর সৃষ্টি করা; নক্ষত্রদেরও,যাদের আমরা দেখেছি  প্রয়োজনীয় রসায়ন সৃষ্টির এবং সেভাবেই জীবনেরও পুর্বসুরী। সুতরাং স্মোলিন এর প্রস্তাব, মাল্টিভার্সের মহাবিশ্বদের উপরও কাজ করছে একটি ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচন, যা সরাসরি কৃষ্ণ গহবর সমৃদ্ধ মহাবিশ্বর সৃষ্টি এবং পরোক্ষভাবে জীবনের উৎপত্তিকে বিশেষ সুযোগ করে দিয়েছে। অবশ্যই সব পদার্থবিদরা স্মোলিন এর প্রস্তাবের সাথে একমত নন, যদিও নোবেল জয়ী পদার্থবিদ মারে গেল-মানের এর উদ্ধৃতি, ‘স্মোলিন? সেই ক্ষ্যাপাটে চিন্তার অল্প বয়সী ছেলেটি না? তার ধারনা ভুল নাও হতে পারে।’ [২৪] একজন দুষ্ট জীববিজ্ঞানী হয়তো ভাবতেই পারেন, অন্য কোন পদার্থবিদদের ডারউইনীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করার দরকার আছে কিনা ।

খুব সহজ কিন্তু চিন্তা করা ( এবং অনেকেই এর স্বীকার) যে, এক গুচ্ছ মহাবিশ্বের ধারনার প্রস্তাব করা মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা এবং এ ধরনের চিন্তাকে প্রশ্রয় না দেয়াই উত্তম। এক্ষেত্রে তাদের যুক্তিটি হচ্ছে, যদি অসংখ্য মহাবিশ্বের এই বাহুল্যর ধারনাটিকে প্রশ্রয়ই দেয়া হয়, তাহলে আমরা কেনই বা আরেকটু বেশী ধারনা করি না কেন, কেনই বা তাহলে প্রশ্রয় দেই না ঈশ্বরের ধারনাটিকে। উভয় ধারনাদুটি কি সমানভাবে অমিতব্যায়ী না, যা বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত হাইপোথিসিস এবং সমানভাবে অসন্তোষজনক? যারা এভাবে ভাবেন তাদের সচেতনতার স্তর বৃদ্ধি হয়নি প্রাকৃতিক নির্বাচনের দ্বারা। সত্যিকারের বাহুল্যময় ঈশ্বর হাইপোথিসিস এবং আপাতদৃষ্টিতে বাহুল্যময় মাল্টিভার্স হাইপোথিসিস এর মধ্যে প্রধান পার্থক্যটি হচ্ছে মুলত: পরিসংখ্যানগত অসম্ভাব্যতা। মাল্টিভার্স তার সব বাহুল্য আড়ম্বর নিয়েও সরল। ঈশ্বর বা বুদ্ধিমান, সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা সম্পন্ন, গননাকারী কোন এজেন্ট, খুবই অসম্ভাব্য সেই একই পরিসংখ্যানগত পরিমাপের ধারনায় যে সত্ত্বাগুলোর অস্তিত্ব তার ব্যাখ্যা করা কথা। মাল্টিভার্সকে মনে হতে  পারে বাহুল্যময় মহাবিশ্বর সংখ্যার ‘সুবিশাল’ পরিমানে, কিন্তু এই প্রত্যেকটি মহাবিশ্ব কিন্তু তার মৌলিক সুত্রের ক্ষেত্রে সরল। আমরা কিন্তু এখানে এমন কিছু এখন প্রস্তাব করছি না যা খুব বেশী মাত্রায় অসম্ভাব্য। কিন্তু অন্য যে কোন বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তার ক্ষেত্রে এর ঠিক বীপরিতটাই বলতেই হবে।

কিছু পদার্থবিদ আছেন যারা সবার জানামতেই প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসী ( রাসেল স্ট্যানার্ড এবং জন পোলকিংহর্ণ, এই দুইজন ব্রিটিশ পদার্থবিদের উদহারন আমি আগেই উল্লেখ করেছি।); যেমনটা হবার কথা ছিল, তারা ভৌত  ধ্রুবগুলোর সবকয়টির  কম বেশী সংকীর্ণ  একটি গোল্ডিলকস সীমায় টিউন করার বিষয়টির অসম্ভাব্যতার বিষয়টি লুফে নিয়েছেন এবং প্রস্তাব করেছেন, নিশ্চয়ই কোন মহাজাগতিক বুদ্ধিমান সত্ত্বা এই টিউনিং এর কাজটি করেছে পরিকল্পিতভাবে। আমি আগেই এই ধারনার অসারতা প্রমান করেছি, কারন এটি যা সমাধান করছে, তারচেয়ে আরো বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। কিন্তু এর উত্তর হিসাবে প্রস্তাব করতে ঈশ্বরবাদীরা কি চেষ্টা করেছে? তারা কিভাবে এই যুক্তির সাথে সমঝোতা করতে পারে, যে কোন ঈশ্বর যিনি এই মহাবিশ্বকে ডিজাইন করতে পারেন,সাবধানে, পুর্বদৃষ্টি নিয়ে এর সব ধ্রুব গুলোকে  উপযোগী করে তুলেছেন আমাদের বিবর্তনের জন্য,  অবশ্যই তাকে খুবই জটিল এবং অসম্ভাব্য একটি সত্ত্বা হতে হবে, যার অস্তিত্বকে ব্যাখা দেবার জন্য তার যে ব্যাখ্যা প্রস্তাব করার কথা, তার চেয়ে আরো বেশী ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে?

ধর্মতাত্ত্বিক রিচার্ড সুইনবার্ণ (Richard Swinburn), আমরা যেমনটা আশা করতে শিখেছি ধর্মবাদীদের কাছে, ভাবেন এই  সমস্যার জন্য তার একটি সমাধান আছে।  তিনি তার বই ’ইস দেয়ার এ গড?’ (Is There a God ?’)  এ বিষয়টির বিশদ ব্যাখা দিয়েছেন। তিনি শুরু করেছিলেন, বিষয়টি ব্যাখ্যা করার ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই, কেন আমাদের সবসময় সবচেয়ে সরলতম হাইপোথিসিসটিকে বেছে নেয়া উচিৎ যা সব ফ্যাক্ট বা বাস্তবতার সাথে খাপ খায়। বিজ্ঞান সব জটিল জিনিস ব্যাখ্যা করে সরল জিনিসের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে, পরিশেষে  মৌলিক কনাদের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। আমি ( আমি সাহস করে বলতে পারি আপনিও) মনে করি এটি খুব সুন্দর সরল একটি ধারনা যে, সব কিছুই তৈরী হয় মৌলিক কিছু কনা দিয়ে, যা যত অগনিত সংখ্যকই হতে পারুক না কেন তাদের সৃষ্টি সীমিত সংখ্যক এক সেট মৌলিক কনা থেকেই উদ্ভুত। আমরা যদি ধারনাটিতে সংশয় বোধ করি তার কারন শুধু এটাকে খুবই সরল একটি ধারনা বলেই আমরা তা ভাবছি। কিন্তু সুইনবার্ণের জন্য, এটি আসলেই সরল কোন বিষয় একদমই না, বরং ঠিক এর বীপরিত।

কোন একটি নির্দিষ্ট টাইপের পার্টিকেল, যেমন ধরুন ইলেক্ট্রন, এর সংখ্যা এত বিশাল যে, সুইনবার্ণ মনে করেন বিষয়টা শুধু কাকতলীয় কোন ঘটনা হতে পারেনা যে, এদের সবার একই ধরনের বৈশিষ্ট থাকবে। একটি ইলেক্ট্রন তিনি হজম করতে পারবেন, তবে বিলিয়ন বিলিয়ন ইলেক্ট্রন, ‘সবার একই বৈশিষ্ট’, বিষয়টি তার অবিশ্বাসকে বেশ উত্তেজিত করে তোলে। তার মতে যদি সবগুলো ইলেকট্রন পরস্পর থেকে আলাদা হতো, সেই ব্যাখ্যাটা হত অনেক বেশী সরল, বেশী স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক, যথেষ্ট কম কষ্টসাধ্য  হত সেই ব্যাখ্যা। আরো খারাপ তার মতে, কোন ইলেকট্রনের উচিৎ না তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট একসাথে এক মুহুর্তের বেশী সময় ধরে স্থিতিশীল রাখা, তাদের প্রত্যেকের বৈশিষ্ট বদলানো উচিৎ, নিজের খেয়াল খুশী মত,  এলোমেলো, এই মুহুর্ত থেকে অন্য মুহুর্ত আলাদা, দ্রুত পরিবর্তনশীল। সুইনবার্ণের দৃষ্টিতে এটাই সরলাবস্থা, সবকিছুর আদি অবস্থা। সমবৈশিষ্টপুর্ণ ( যা আমি বা আপনি হয়তো বলবেন আরো বেশী সরল) কোন কিছুর জন্য দরকার বিশেষ ব্যাখ্যা। ’ শুধুমাত্র এর কারন হচ্ছে, ইলেক্ট্রন এবং তামা’র কনাগুলো এবং অন্যান্য সব পদার্থগুলোর বিংশ শতাব্দীতে শক্তি ধারন করে, সেই একই শক্তি তাদের ছিল উনবিংশ শতাব্দীতেও এবং সেই সবকিছুই  আগে যেমন ছিল এখনও তেমন আছে।’

এখানে ঈশ্বরের আগমন, ঈশ্বরের প্রবেশ হলো, এই ইচ্ছাকৃত এবং ‍নিরন্তর একই বৈশিষ্ট বজায় রাখার মাধ্যমে এই সব বিলিয়ন বিলিয়ন ইলেক্ট্রন, তামা’র টুকরাদের বুনো এলোমেলো আচরন ও বৈশিষ্ট পরিবর্তনের জন্য তাদের নিজস্ব অন্তর্গত প্রবনতাকে উদ্ধার করতে। এ কারনে আপনি যখন একটি  ইলেকট্রন দেখবেন, আপনার সব দেখা হয়ে যাবে. সে কারনেই তামা’র  টুকরাগুলো সবাই তামা টুকরার মত আচরন করে। একারনে প্রতিটি ইলেক্ট্রন এবং তামা’র প্রতিটি টুকরো ঠিক নিজের মত থাকে মাইক্রোসেকেন্ড থেকে মাইক্রোসেকেন্ড, শতাব্দীর পর শতাব্দী, এর কারন ঈশ্বর নাকি সারাক্ষনই প্রতিটি কনার উপর তার ঐশী আঙ্গুল দিয়ে রেখেছেন, কোন ধরনের স্বেচ্ছাচারী বাড়াবাড়ি আচরণ দমনের উদ্দেশ্যে এবং শাসন করে  যেন বেয়াড়া কণারা তাদের বাকী ইলেক্ট্রন সহকর্মীদের সাথে এক লাইনেই থাকে; যেন তারা সবাই ঠিক একই রকম আচরন করে।

কিন্তু সুইনবার্ণ পক্ষে কিভাবে সম্ভব হবে তার এই অদ্ভুত হাইপোথিসিসটাকে টিকিয়ে রাখা? যেখানে ঈশ্বর একই সাথে গ্যাজেলিয়ন (অগনিত) আঙ্গুল দিয়ে নিয়ম না মানা ইলেক্ট্রনগুলোকে নিয়ন্ত্রন করেন, এটা কিভাবে একটি ‘সরল’ হাইপোথিসিস হতে পারে? অবশ্যই এটা সরলের ঠিক বীপরিত। সুইনবার্ণ এখানে খেলা দেখালেন তার নিজের মনমত চমক দেখানো একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ’ঔদ্ধত্ব’ দেখিয়ে। কোন যৌক্তিকতা ছাড়াই তিনি দাবী করেন যে ঈশ্বর হচ্ছে ‘একক’ একটি বস্তু দিয়ে গঠিত। কি অসাধারন তার কার্যকারন ব্যাখ্যা করার এই অর্থনীতি, যদি তা তুলনা করা হয় ঐ গ্যাজেলিয়ন সংখ্যক ইলেক্ট্রন স্বতন্ত্রভাবে মুলত একই, সেই ধারনার সাথে!

ঈশ্বরবাদীরা দাবী করছেন, প্রতিটি জিনিস যার অস্তিত্ব আছে, তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কারন হচ্ছে মাত্র একটি বস্তু, ঈশ্বর। এবং এটি দাবী করা যে, প্রতিটি বৈশিষ্ট যা প্রতিটি জিনিসের আছে, তার হচ্ছে ঈশ্বরের কারনে বা তার অনুমতিতে শুধুমাত্র তারা অস্তিত্বশীল। এটি বেশ কিছু কারনকে ব্যাখ্যার জন্য সাধারন সরল একটি ব্যাখার বিশিষ্ট উদহারন। এই ক্ষেত্রে সম্ভাবনা আছে একটার বেশী সরলতম কোন ব্যাখ্যা না থাকার, শুধু সেটাই যা কেবল একটি কারনকেই প্রস্তাব করে। বহুঈশ্বরবাদ থেকে ঈশ্বরবাদ এ কারনে সরল।এবং ঈশ্বরবাদ এর জন্য একটি কারন প্রস্তাব করছে, একটি সত্ত্বা ( যার আছে) অসীম ক্ষমতাময় ( ঈশ্বর যৌক্তিকভাবে সম্ভব এমন সব কিছুই করতে পারেন), অসীম জ্ঞানের অধিকারী ( যৌক্তিকভাবে যা জানা সম্ভব তা সবকিছু জানেন ঈশ্বর), অসীম স্বাধীন।

সুইনবার্ণ দয়াপরবশ হয়ে মেনে নিয়েছেন, ঈশ্বর এমন কোন কিছু করতে পারেন না যা ‘যৌক্তিকভাবে’ অসম্ভব এবং তার এই সংযমের জন্য তার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। এটার মেনে নিয়েই বলছি, কোন কিছু ব্যাখ্যা করার উদ্দেশ্যে ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতার ব্যবহারের কোন সীমাবদ্ধতা ঈশ্বরবাদীরা অনুধাবন করেননি কখনোই। বিজ্ঞানের কি X ব্যাখ্যা করতে খানিকটা সমস্যা হচ্ছে? কোন অসুবিধা নেই , X নিয়ে আর সময় নষ্ট করার দরকার নেই, ঈশ্বরের অসীম ক্ষমতাকে টেনে নিয়ে আসা হয়ে X কে ব্যাখ্যা করতে ( সেই সাথে বাকী সবকিছুই), এবং এটাকে দাবী করা হবে সর্বশ্রেষ্ট সরলতম ব্যাখ্যা হিসাবে, কারন, সর্বোপরি ঈশ্বরতো শুধুমাত্র একজন। এর চেয়ে জটিলতামুক্ত আর কি হতে পারে?

বেশ, সত্যিকথা বলতে গেলে, প্রায় সবকিছুই। এমন একজন ঈশ্বর যিনি কিনা মহাবিশ্বের প্রতিটি কণাকে বিরামহীনভাবে পর্যবেক্ষন এবং নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তিনি তার যাই হোন না কেন সরল কোন সত্ত্বা হতেই পারেন না। তার নিজের অস্তিত্বটির বর্ণনা জন্যই তো প্রয়োজন আছে বিশাল একটি ব্যাখ্যার।আরো খারাপ ( সরলতার ‍দৃষ্টিকোন থেকে) ব্যাপার হচ্ছে, ঈশ্বরের অতিকায় চেতনার অন্য প্রান্তগুলোও একই সাথে প্রতিটি মানুষের কর্মকান্ড,তাদের আবেগ ও অনুভতি এবং প্রার্থনা নিয়ে ব্যস্ত ; এছাড়া ১০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সীর অন্যান্য গ্রহে যদি অন্য কোন বুদ্ধিমান ভীনগ্রহবাসী থাকে তারাতো আছেনই। সুইনবার্ণের মতে তিনি এমনকি নিরন্তরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন অলৌকিকভাবে হস্তক্ষেপ ‘না’ করার জন্য আমাদের রক্ষা করতে, যেমন যখন আমরা ক্যান্সারে আক্রান্ত হই। সেটা তিনি কখনই করবেন না, কারন, ‘ ঈশ্বর যদি কোন আক্রান্ত রোগীর স্বজনের বেশীর ভাগ প্রার্থনা মন্জুর করেন তাকে ক্যান্সার থেকে বাচানোর জন্য, তাহলে মানুষের জন্য ক্যান্সার কখনো সমস্যা থাকবে না সমাধানের জন্য।’ তাহলে আমরা আমাদের সময় নিয়ে কি করবো?

সব ধর্মতাত্ত্বিকরা আবার সুইনবার্ণের মত এত দুর যেতে চান না, তবে যাই হোক, ঈশ্বর হাইপোথিসিস যে সরল, এই অদ্ভুত দাবী কিন্তু বেশ কিছু আধুনিক ধর্মতাত্ত্বিকদের রচনায় দেখা যায়, যেমন কিথ ওয়ার্ড (Keith Ward), যখন তিনি অক্সফোর্ডের ডিভিনিটির রিজিয়াস (Regius) অধ্যাপক ছিলেন, তার লেখা ১৯৯৬ সালের একটি বই,  গড, চান্স অ্যান্ড নেসেসিটি (God, Chance and Necessity) তে এই বিষয়ে বেশ স্পষ্ট একটি বক্তব্য ছিলো:

আসল কথা হলো, ঈশ্বরবাদীরা দাবী করেন মহাবিশ্বর অস্তিত্বের জন্য ঈশ্বর হচ্ছেন অতি অসাধারন, সুন্দর, সু্বিধাজনক এবং কার্যকর একটি ব্যাখ্যা। এটি সহজসাধ্য উপযোগী কারন এটি মহাবিশ্বের সবকিছুর অস্তিত্ব এবং তাদের প্রকৃতির গুনাবলী আরোপ করেছে একটি মাত্র সত্ত্বার উপর, সেই চুড়ান্ত কারন, যা সবকিছুর অস্তিত্ত্বের কারন, এমনকি তার নিজের অস্তিত্ত্বেরও। ধারনাটি সুন্দর , কারন একটি প্রধান ধারনা থেকে, সম্ভবপর এমন কোন নিখুততম স্বত্ত্বা – ঈশ্বরের সম্পুর্ণ প্রকৃতি এবং সমগ্র মহাবিশ্বের অস্তিত্ত্বকে বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

সুইনবার্ণের মত, কোন কিছু ব্যাখ্যা করা বলতে কি বোঝায়, সে বোঝানো ক্ষেত্রেও ওয়ার্ডও একই ভুলটি করেন তার এই বক্তব্যে। এবং মনে হয় তিনি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, কোন কিছুকে যদি সরল বলা হয়, আসলে সেটা সম্বন্ধে কি বোঝাচ্ছে। আমি স্পষ্ট না ওয়ার্ড আসলেই কি ঈশ্বরকে সরল ভাবছেন কিনা? বা উপরের অনুচ্ছেদটি অস্থায়ী ’তর্কের খাতিরে বলা’ এমন কোন অনুশীলনীর প্রতিনিধিত্ব করছে ? স্যার জন পোলকিংহর্ণ, সায়েন্স অ্যান্ড ক্রিষ্টিয়ান বিলিফ এ ওয়ার্ডে’র টমাস অ্যাকোয়াইনাসের আগের সমালোচনার উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছিলেন,‘ এটা মৌলিক একটি ভুল, ঈশ্বরকে যৌক্তিকভাবে সরল মনে করা -সরল এখানে শুধুমাত্র এই অর্থে না  যে তার স্বত্ত্বা অবিভাজ্য বরং আরো বেশী দৃঢ় অর্থে যে, ঈশ্বরের কোন অংশ সত্যি হলে ঈশ্বর সম্পুর্ণভাবে সত্য। একারনে এটা খুবই যুক্তিসঙ্গত হবে মনে করা যে, ঈশ্বর, যখন অবিভাজ্য, অন্তর্গতভাবে জটিল।’ ওয়ার্ড কিন্তু এখানে ব্যাপারটা ঠিকই ধরতে পেরেছেন। আসলে, জীববিজ্ঞানী জুলিয়ান হাক্সলী, ১৯১২ সালে, জটিলতার সংজ্ঞা দিয়েছিলেন গঠনের নানা অংশের বৈসাদৃশ্যতা হিসাবে,  যা দিয়ে তিনি একটি বিশেষ ধরনের বৃত্তিগত বা প্রায়োগিক অবিভাজ্যতাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন [২৫]।

অন্য জায়গায় ওয়ার্ড কিন্তু যথেষ্ট প্রমান দিয়েছেন, কোথা থেকে জটিল জীবনের উদ্ভব  হয়েছে তা বোঝার জন্য ধর্মতাত্ত্বিক মানসিকতার বিশেষ পদ্ধতিগত সমস্যার । তিনি আরেকজন ধর্মবাদী বিজ্ঞানীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন, প্রাণরসায়নবিদ আর্থার পিকক ( আমার উল্লেক করা বৃটিশ ধর্মীয় বিজ্ঞানীত্রয়ের তৃতীয় সদস্য) জীবিত পদার্থের অস্তিত্বকে  ’ক্রমান্বয়ে জটিলতর হবার প্রবণতা’ হিসাবে প্রস্তাব করার সময়। ওয়ার্ড যাকে বিশেষায়িত করেছেন বিবর্তনীয় পরিবর্তনের কোন একটি অন্তর্নিহিত নির্দেশনা হিসাবে যা জটিলতাকে ক্রমান্বয়ে বাড়ার বিষয়টিকে বাড়তি সুযোগ দেয়। তিনি এরপর আরো প্রস্তাব করেন, এ ধরনের পক্ষপাতিত্ত্ব, ’হতে পারে কোন মিউটেশন প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেয়, যেন আরো জটিল মিউটেশনের উদ্ভব হতে পারে।’ ওয়ার্ডের এ বিষয়ে সংশয় ছিল,  তার যা হওয়া উচিৎ সঙ্গতকারনে। ক্রমশ: জটিলতর হবার পথে বিবর্তনীয় বিভক্তি যে সকল বংশধারায় আদৌ এসেছে, তা তাদের ক্রমান্বয়ে জটিল হবার  অন্তর্গত প্রবণতা থেকে না বা পক্ষপাতদুষ্ট কোন মিউটেশনের কারনেও না। এটি হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের কারনে: যে প্রক্রিয়া, আমরা যতটুকু জানি, এখনও একমাত্র প্রক্রিয়া, যা সরলাবস্থা থেকে জটিলতা সৃষ্টি করতে সক্ষম। প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ত্ব আসলেই খুবই সরল।  এবং যেখান থেকে এটি শুরু করে, সেটিও। কিন্তু অপরদিকে এটি যা ব্যাখ্যা করতে পারে, সেটি বর্ণনাতীতভাবে জটিল: আমরা কল্পনার চেয়েও জটিল, শুধুমাত্র ঈশ্বরবাদীদের প্রস্তাবিত ঈশ্বর ছাড়া যিনি এটি ডিজাইন করতে সক্ষম।

(চলবে) আগামী পর্বে সমাপ্য

পাদটীকা_________________________

[২৪]  Murray Gell-Mann, quoted by John Brockman on the ‘Edge’ website, http://www.edge.org/3rd_culture/bios/smolin.html.

[২৫]  Ward, K. God, Chance and Necessity. Oxford: Oneworld. (1996: 99); Polkinghorne, J. (1994). Science and Christian Belief: Theological Reflections of a Bottom-Up Thinker. London: SPCK (1994: 55).

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: চতুর্থ অধ্যায় (চতুর্থ পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s