রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)


কার্টুন সুত্র:  ইন্টারনেট

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন এর বাংলা অনুবাদ :
প্রথম , দ্বিতীয় ,তৃতীয়  এবং চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব ) 
( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

কেন প্রায় নিশ্চিৎভাবে বলা সম্ভব ঈশ্বরের কোন অস্তিত্ব নেই 

 চতুর্থ অধ্যায় দ্বিতীয় পর্বের পর: 

শুন্যস্থানের উপাসনা:

সামনে অগ্রসর হবার জন্য  ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি বা অবিভাজ্য জটিলতার  সুনির্দিষ্ট উদহারন অনুসন্ধান করা অবশ্যই মৌলিকভাবে বিজ্ঞানসম্মত কোন উপায় না: সেটা হবে বর্তমান অজ্ঞতা থেকে নেয়া যুক্তির বিশেষ দৃষ্টান্ত। এর আবেদন সেই ভ্রান্ত যুক্তি ঘিরে, যা পরিচিত ’The God of the gaps’  (বা শুন্যস্থানের ঈশ্বর) স্ট্র্যাটেজী, যার বিশেষ নিন্দা করেছিলেন প্রখ্যাত ধর্মত্ত্ববিদ ডিয়েট্রিশ বনহোয়েফার। সৃষ্টিবাদীরা দারুন উৎসাহে বর্তমান সময়ে আমাদের জ্ঞানের শুন্যস্থানগুলোর সন্ধান করে, যদি আপাতদৃষ্টিতে কোন শুন্যস্থান পাওয়া যায়, ধরে নেয়া হয় এটাই ঈশ্বর  আমোঘ নিয়মানুযায়ী অবশ্যই পুর্ণ করবেন। চিন্তাশীল ধর্মতত্ত্ববিদদের, যেমন বনহোয়েফার, যেটা ভাবায়, তা হলো বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে এই শুন্যস্থানগুলোও ক্রমশ: সংকুচিত হয়ে আসছে, এবং ঈশ্বর ধীরে ধীরে কর্মহীন হয়ে যাবার কিংবা লুকিয়ে থাকার মত জায়গার অভাবের হুমকির মুখোমুখি হচ্ছেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ভাবায় অন্যকিছু। বিজ্ঞানের সাথে জড়িত সকল কর্মকান্ডের প্রয়োজনীয় একটি অংশ হচ্ছে অজ্ঞতাকে স্বীকার করা, এমনকি ভবিষ্যতের জয়ের জন্য একটি চ্যালেন্জ্ঞ হিসাবে  এই অজ্ঞতায়  উল্লসিত হওয়া । আমার বন্ধু ম্যাট রিডলী যেমন লিখেছিলেন, ‘বেশীর ভাগ বিজ্ঞানীরাই, তারা যা আবিষ্কার করে ফেলেছেন, সে বিষয়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। নতুন অজানা বা অজ্ঞতাই তাদের সামনে এগিয়ে চলার প্রেরণা।’ আধ্যাত্মবাদীরা রহস্যে উল্লসিত হয় এবং রহস্যময়তাকে টিকিয়ে রাখতেই তারা চান, বিজ্ঞানীরা রহস্যর মুখোমুখি আনন্দিত হয় অন্য কারনে: কারন এটা তাদের কিছু করার সুযোগ করে দেয়; খুব সাধারনভাবে, আমি অধ্যায় ৮ এ বিষয়টির পুনরাবৃত্তি করবো, ধর্মের সবচেয়ে ক্ষতিকর একটি দিক হলো, এটি আমাদের শিক্ষা দেয়, কোন কিছু না বুঝে সন্তুষ্ট থাকাটাই হচ্ছে একটি ভালো গুন।

অজ্ঞতাকে স্বীকার করে নেয়া এবং এর সাময়িক রহস্যময়তা ভালো বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপর্ণ অংশ। নিদেনপক্ষে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়,  বিষয়টা একারনে দুর্ভাগ্যজনক , সৃষ্টিবাদী প্রচারনাকারীদের প্রধান কৌশলটিই নেতিবাচক, যা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে আপাতত শুন্যস্থানগুলো খুজে বের করা এবং তা সাধারনভাবেই ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন দিয়ে পুর্ণ করা। পরের উদহারনটা যদিও হাইপোথেটিক্যাল তবে এটাই সচরাচর দেখা যায়:  একজন সৃষ্টিবাদী বলছেন, ‘লেসার স্পটের উইজেল ব্যাঙের (Lesser spot Weasel frog) কনুই এর অস্থিসন্ধি হচ্ছে  ইররিডিউসিবল বা অবিভাজ্যভাবে জটিল। এর কোন অংশই একক ভাবে কার্যকর নয়, যতক্ষন না সবগুলো অংশ একসাথে যুক্ত না হয়। বাজী রাখছি আপনি কোনভাবেই এমন কোন উপায় দেখাতে পারবেননা, যেখানে উইজেল ব্যাঙ এর কনুই ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হতে পারে।’ যদি বিজ্ঞানীরা এর একটি তাৎক্ষনিক এবং বোধগম্য উত্তর দিতে ব্যর্থ হন, সাথে সাথেই সৃষ্টিবাদীরা তাদের সেই একটাই বহুব্যবহৃত উপসংহার টানেন: ‘বেশ তাহলে সেক্ষেত্রে বিকল্প তত্ত্ব, ‘ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ স্বভাবতই বিজয় লাভ করেছে।’ এখানে পক্ষপাতদুষ্ট যুক্তিটা খেয়াল করুন: যদি তত্ত্ব ‘এ’ কোন ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়, তাহলে তত্ত্ব ’বি’ অবশ্যই সঠিক হবে । বলার প্রয়োজন নেই, যে ব্যপারটা কিন্তু বীপরিত ক্ষেত্রে সেভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। আমাদেরকে বিকল্প তত্ত্বে ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দেবার জন্য উৎসাহ দেয়া হচ্ছে, যখন এটি যে তত্ত্বকে প্রতিস্থাপন করার প্রস্তাব দিচ্ছে, সেই তত্ত্বের মত সেই বিশেষ ক্ষেত্রে এই তত্ত্বটিও ব্যর্থ হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে কোন অনুসন্ধান ছাড়া। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন – আইডি (ID) কে সবকিছু থেকেই নি:শর্ত ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে, বিবর্তন তত্ত্বকে যে সুকঠিন প্রমানের দাবীর মুখোমুখি হতে হয়,  তা থেকে একে দেয়া হয়েছে লোভনীয় একটি সুরক্ষা, যেন কোন যাদুর রক্ষা বলয়।

কিন্তু এখানে আমার বর্তমান বক্তব্যটি হচ্ছে, সৃষ্টিবাদীদের চাতুরীর কারনে, অনিশ্চয়তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের স্বাভাবিক – যা আসলেই প্রয়োজনীয় – আনন্দকে তুচ্ছ করে যে দেখা হয়, সে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করা। শুধুমাত্র খাটি রাজনৈতিক কারনে আজকের বিজ্ঞানীরা বলতে হয়তো ইতস্তত করেন: ‘ হুম, বেশ কৌতুহলের একটি বিষয়তো, আমিও ভাবছি কেমন করে উইজেল ব্যাঙের পুর্বসুরীদের মধ্যে এই কনুই এর অস্থিসন্ধিটা বিবর্তিত হয়েছিল। আমি উইজেল ব্যাঙ বিশেষজ্ঞ না, আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীতে যেতে হবে এবং ব্যাপারটা অনুসন্ধান করে দেখতে হবে, হয়তো কোন গ্রাজুয়েট ছাত্রর জন্য এটি চমৎকার একটি প্রোজেক্ট হতে পারে‘, যে মুহুর্তে একজন বিজ্ঞানী এভাবে উত্তর দেবেন, এবং কোন ছাত্রর এই প্রোজেক্ট শুরু করা বহু আগেই – সেই একই সুপরিচিত শিরোনাম দেখা যাবে সৃষ্টিবাদীদের প্রচারনাপত্রে: ‘উইজেল ব্যাঙ এর ডিজাইন একমাত্র ঈশ্বরই করতে পারেন’।

এখানে সেই দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গবেষনার দিক নির্দেশনায় অজ্ঞাত বিষয়গুলোকে অনুসন্ধান করতে বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত প্রয়োজনীয়তা এবং আইডি মতামতধারীদের সেই অজ্ঞাত স্থানগুলোকে খুজে বের করে বিজয় দাবী করার প্রবণতা যুক্ত হয়ে আছে। আইডি র যে নিজস্ব কোন প্রমান নেই, এবং বিজ্ঞানের আপতত না জানা শুন্যস্থানগুলোয়  এটি যে আগাছার মত বৃদ্ধি পায়, ঠিক এই সত্যটাই, খানিকটা অস্বস্তির সাথেই সহাবস্থন করে বিজ্ঞানের  এই সব শুন্যস্থানগুলোকে শনাক্ত এবং সেই একই শুন্যস্থানগুলোকে গবেষনার সুচনা বলে দাবী করার প্রয়োজনীয়তার সাথে। এই অর্থে, বিজ্ঞান তার মিত্র খুজে পায় মুক্তবুদ্ধির প্রজ্ঞাসম্পন্ন ধর্মতত্ত্ববিদদের সাথে, যেমন বনহয়েফার, তাদের  এই কৌশলগত ঐক্য হতে পারে নির্বোধ, জনতুষ্ঠকারী ধর্মতত্ত্ব এবং ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের এর শুন্যস্থান পুজারী নামের যৌথ  শত্রুর মুখোমুখি।

জীবাশ্ম রেকর্ডে ‘শুন্যস্থানগুলো’র সাথে সৃষ্টিবাদীদের প্রেম তাদের পুরো শুন্যস্থান পুজারী ধর্মতত্ত্বের প্রতীক। আমি একবার ক্যামব্রিয়ান এক্সপোশন নিয়ে একটি অধ্যায় শুরু করেছিলাম এই বাক্যটি দিয়ে: ‘যেন বিবর্তনের কোন ইতিহাস ছাড়াই জীবাশ্মগুলো সেখানে কেউ সাজিয়ে রেখেছে।’ কিন্তু, সেটা ছিল একটি অধ্যায় সুচনা করার লক্ষ্যে ভাষার আড়ম্বরপুর্ণ ব্যবহার, যার উদ্দেশ্য ছিল পাঠকের ক্ষুধাকে তীব্র করে তোলা পুরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবার আগে। বিষন্নভাবে এখন ভাবছি, কত বেশী সহজ ছিল ব্যপারটা বোঝা যে, সেখান থেকে ধৈর্যর সাথে বর্নিত আমার বিস্তারিত ব্যাখ্যা সযত্নে ছেটে ফেলে দেয়া হবে আর অপ্রাসঙ্গিকভাবে আনন্দের সাথে উদ্ধৃতি দেয়া হবে ভুমিকার সেই ছোট বাক্যটিকে । সৃষ্টিবাদীরা জীবাশ্ম রেকর্ডে ‘শুন্যস্থান’ দারুন ভালোবাসে, যেমন সাধারনত: যে কোন জ্ঞানের শুন্যস্থানগুলো তাদের খুব পছন্দের।

অনেক বিবর্তনীয় পরিবর্তন অসাধারন সুন্দর ভাবে  কম বেশী অবিচ্ছিন্ন এবং ক্রমান্বয়ে ধীরগতিতে পরিবর্তন হওয়া ক্রান্তিকালীন জীবাশ্মর মাধ্যমে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। কিছু আবার নেই,  এবং সেটাই সেই বিখ্যাত শুন্যস্থান। মাইকেল শেরমার তার তীক্ষ্ম বুদ্ধির সাথে মন্তব্য করেছিলেন, যদি নতুন কোন জীবাশ্ম খুজে পাওয়া যায়, যা ঠিক মাঝখান থেকে কোন জীবাশ্মর শুন্যস্থানকে দ্বিধাবিভক্ত করে, তারপরও সৃষ্টিবাদীরা ঘোষনা দিতে দ্বিধা করবে না যে, এখন তাহলে দ্বিগুন শুন্যস্থান ! যাই হোক না কেন, লক্ষ্য করুন  সেই আবারো প্রচলিত ধারনার অযাচিত ব্যবহার। যদি প্রস্তাবিত বিবর্তনীয় পরিবর্তনের কোন ফসিল না পাওয়া যায়, সৃষ্টিবাদীদের গতানুগতিক ধারনাটি হলো, কোন বিবর্তনীয় পরিবর্তন হয়নি, সুতরাং ঈশ্বর নিশ্চয়ই কোন হস্তক্ষেপ করেছেন।

বিবর্তন বা বিজ্ঞান,যেটাই হোক না কেন, এর কোন কিছুর ব্যাখ্যার  প্রতিটি ধাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রমান দাবী করাটা হবে পুরোপুরি অযৌক্তিক ; এরকম দাবী করার মানে যেন, কাউকে খুনী হিসাবে অভিযুক্ত করার জন্য চলচ্চিত্রের মতো সম্পুর্ণ ঘটনাটির, অর্থাৎ হত্যা করার আগে খুনির প্রতিটা পদক্ষেপের রেকর্ড দাবী করা, যেখানে একটা ফ্রেমও বাদ পড়া চলবে না।জীব মৃতদেহদের অতি ক্ষুদ্র এটা অংশ আসলে জীবাশ্মীভুত হয়েছে, আমরা আসলেই ভাগ্যবান, যতটুকু পাওয়ার কথা ছিল, তারচেয়ে অনেক বেশী অন্তবর্তীকালীন প্রানীদের ফসিল আমরা খুজে পেয়েছি। কোন জীবাশ্মই তো না পাওয়ার সম্ভাবনাই ছিল বেশী, কিন্তু তারপরও বিবর্তনের  প্রমান আমরা পেতাম অন্য উৎস থেকে, যেমন মলিক্যুলার জেনেটিক্স এবং ভৌগলিক বিস্তার থেকে, এবং সেগুলোই যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। অপরদিকে বিবর্তন দৃঢ়ভাবে ভবিষ্যদ্বানী করছে যদি একটা জীবাশ্মও ভুত্বকের কোন প্রস্তাবিত স্তর ছাড়া অন্য কোন ভুল স্তরে পাওয়া যায়, পুরো তত্ত্বই আসলে ভিত্তিহীন হয়ে যাবে। জে বি এস হ্যালডেনকে যখন একজন অতি উৎসাহী পপারিয়ান [১০] চ্যালেন্জ্ঞ করেছিল বলতে, কিভাবে বিবর্তনকে ভুল প্রমান করা যেতে পারে, তিনি তার বিখ্যাত গর্জন করে বলেছিলেন, প্রি ক্যামব্রিয়ান স্তরে যদি খরগোশের জীবাশ্ম খুজে পাওয়া যায়; এ ধরনের কোন সময়বীপরিত জীবাশ্ম আজও প্রকৃতঅর্থে খুজে পাওয়া যায়নি, যদিও সম্পুর্ণ মিথ্যা প্রমানিত হওয়া সৃষ্টিবাদীদের কয়লার স্তরে মানুষের খুলি  বা ডায়নোসরদের সাথে মানুষের পায়ে চিহ্ন পাওয়ার কাহিনী সত্ত্বে।

শুন্যস্থানগুলো সৃষ্টিবাদীদের মনে প্রথাসিদ্ধভাবেই ঈশ্বর পুরন করেন। একই নীতি প্রয়োগ করা হয় সেই অসম্ভাব্যতার পর্বত চুড়ায় ওঠার আপাতদৃষ্টিতে সেই খাড়া উচু পাশটির ক্ষেত্রে, যেখানে ধীরে ধীরে চুড়ায় ওঠার ঢাল সাথে সাথে চোখে পড়ে না কিংবা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে উপেক্ষা করা হয়। যে সমস্ত ক্ষেত্রে উপাত্তর ঘাটতি আছে বা বোঝার এখনও ঘাটতি আছে, সেই জায়গাগুলো  স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঈশ্বরের কৃপায় ছেড়ে দেয়া হয়। খুব দ্রুত নাটকীয়ভাবে কোন কিছুকে ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি বা অবিভাজ্য জটিলতা দাবী করে ঘোষনা দেয়ার এই আশ্রয় নেয়ার কৌশল তাদের কল্পনাশক্তির অভাবকেই ইঙ্গিত করে। কিছু জৈব অঙ্গ, যদি চোখ না হয়, তাহলে বাকটেরিয়া ফ্ল্যাজেলার মটর বা কোন জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া, কোন অতিরিক্ত ব্যাখ্যা কিংবা যুক্তি ছাড়াই অবিভাজ্যভাবে জটিল বলে ঘোষনা দেয়া হয়। কোন ’প্রচেষ্ঠা’ই করা হয়নি এই জটিলতাকে ব্যাখ্যা দেবার জন্য। চোখ, পাখা এবং আরো অনেক কিছুর সতর্কতামুলক কাহিনী সত্ত্বেও এই সন্দেহজনক প্রশংসার প্রতিটি নতুন প্রার্থীকে ধরে নেয়া হয় সুস্পষ্টভাবে স্বপ্রমানিত অবিভাজ্য জটিলতা হিসাবে, এবং এর সেই পদমর্যাদা আরোপিত করা হয়, যেন কোন ঐশী ডিক্রি বা ফিয়াট এর মাধ্যমে [১১]; কিন্তু ব্যাপারটা একটু ভেবে দেখুন। যেহেতু অসরলযোগ্য জটিলতা ব্যবহার করা হচ্ছে ডিজাইনের পক্ষে একটি জোরালো যুক্তি হিসাবে, সুতরাং ডিজাইন এর চেয়ে কিন্ত বেশী  এটি ফিয়াট বা  ডিক্রির এর দাবী করতে পারেনা। এর চেয়ে আপনি বরং সরাসরি আরোপ করে দাবী করুন, যে উইজেল ব্যাঙ ডিজাইনের চিহ্ন বহন করে (বোমবার্ডিয়ের বীটল ইত্যাদি) কোন যুক্তি বা সাক্ষ্যপ্রমান ছাড়াই, কিন্তু সেটা বিজ্ঞানের পথ নয়।

এবং যুক্তিও দেখা যায় বেশী বিশ্বাসযোগ্য হয়না এর চেয়ে যেমন:  আমি [ এখানে নিজের নাম যোগ করুন] ব্যাক্তিগতভাবে চিন্তা করে আর কোন উপায় দেখছি না, যে কিভাবে  ধাপে ধাপে [এখানে বায়োলজিকাল ফেনোমেনার নামটি যোগ করুন] তৈরী হতে পারে। সুতরাং এটি অবিভাজ্যভাবে জটিল। এর মানে হচ্ছে এটি ঈশ্বর পরিকল্পিত বা ডিজাইন করা।’ এভাবে আপনি বিষয়টি প্রকাশ করে দেখুন এবং তাৎক্ষনিকভাবে আপনি দেখতে পাবেন এটি কোন বিজ্ঞানীর একটি অন্তবর্তীকালীন রুপ খুজে বের করার বা অন্ততপক্ষে কল্পনা করার ঝুকির মুখে পড়ে গেছে। এমনকি যদি কোন বিজ্ঞানী কোন ব্যাখ্যা নিয়ে এগিয়ে না আসেনও, এর শুধুমাত্র কোন কিছু ‘ডিজাইন’ মনে করার বাজে যুক্তির কারনে এটি কোন সুবিধা করতে পারবে না। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন ভিত্তির যুক্তি অলস এবং পরাজয়বাদী – সেই প্রথাগত ‘শুন্যস্থান পুর্ণ করা ঈশ্বরের’ যুক্তি। আমি অতীতে এটিকে নাম দিয়েছিলাম ব্যক্তিগত অবিশ্বাস থেকে আসা যুক্তি।

কল্পনা করুন আপনি আসলেই একটি অসাধারন ম্যাজিক কৌশল দেখছেন। যাদুকর জুটি পেন এবং টেলার এর একটা প্রচলিত যাদু ছিল, তারা একই সাথে মঞ্চে এসে একে অপরকে পিস্তল দিয়ে গুলি করবে এবং দুজনেই সেই বুলেট দাত দিয়ে আটকে দিচ্ছে। প্রথমেই বেশ সতর্কতার সাথে দুটি বুলেটে শনাক্তকারী চিহ্ন দেয়া হয় পিস্তলে ঢোকানোর আগে, পুরো প্রক্রিয়াটা কাছ থেকে দেখানো হয় দর্শকদের মধ্য থেকে নেয়া ভলান্টিয়ারদের, যাদের আগ্নেয়াস্ত্র সম্বন্ধে জ্ঞান আছে এবং আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সব ধরনের ছলচাতুরীর সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। দেখা গেল টেলারের দাগ দেয়া বুলেট পেনের মুখে, পেনের দাগ দেয় বুলেট টেলারের মুখে;  আমি [রিচার্ড ডকিন্স] সম্পুর্নভাবে অন্য কোন উপায় কিন্তু ভাবতে পারছি না, এটা যে একটা চালাকি হতে পারে। ব্যাক্তিগত অবিশ্বাস থেকে আসা যুক্তি আমার প্রাকবৈজ্ঞানিক মস্তিষ্কর কেন্দ্র থেকে চিৎকার করে বলছে এবং আমাকেও প্রায় বাধ্য করছে  বলতে যে, ‘এটাতো একটি অলৌকিক ঘটনা, এর কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, এটি অতিপ্রাকৃত হতে বাধ্য।’ কিন্তু আমার মধ্যে এখন বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষুদ্র একটি আওয়াজ বলছে অন্য কথা। পেন এবং টেলার বিশ্বসেরা যাদুকর জুটি। নিশ্চয়ই এর একটা সঠিক ভালো ব্যাখ্যা আছে। আমি শুধু এ বিষয়ে কম জানি বা বেশী ভালো করে লক্ষ্য করিনি বা কল্পনাশক্তির দুর্বলতার কারনে বিষয়টি ভেবে উঠতে পারছি না এই যা। এটাই যাদুকরী কোন কৌশলের উচিৎ জবাব হতে পারে। এবং এটিও জীববিজ্ঞানের নানা ফেনোফেনা বা ঘটনার, যা আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্স, তার ক্ষেত্রেও সঠিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যে মানুষগুলো প্রাকৃতিক কোন ঘটনার প্রতি ব্যাক্তিগত হতভম্বতা থেকে দ্রুত অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার শরণাপন্ন হন, তারা ঐসব নির্বোধদের তুলনায় কোন অংশেই কম না, যারা এই ধরনের যাদুকরদের  চামচ বাকাতে দেখেএবং এদের ‘প্যারানর্মাল’ বা অতিপ্রাকৃত বলে আখ্যা দেন।

স্কটিশ রসায়নবিদ এ জি কেয়ার্ণ স্মিথ তার Seven Clues to Origin of Life বইটিতে একটি আর্চ এর উদহারন ব্যবহার করে আরো একটি অতিরিক্ত বিষয় উল্লেখ করেছিলেন, অমসৃনভাবে কাটা পাথর দিয়ে তৈরী, কোন সিমেন্ট ছাড়া, স্বাধীনভাবে দাড়ানো কোন আর্চ ( বা ধনুকাকৃতির খিলান) কিন্তু একটি ভারসাম্যপুর্ণ স্থায়ী স্হাপনা হতে পারে; তবে এটি ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্স বা অবিভাজ্যভাবে জটিল, কারন একটা পাথর যদি মুল কাঠামো থেকে সরানো হয় তবে পুরো আর্চটাই  ধ্বসে পড়বে। তাহলে প্রথমেই বা এটা কিভাবে তৈরী হলো। একটা উপায় হলো একসাথে অনেকগুলো পাথর একসাথে জড়ো করে একটা একটা করে পাথর সরানো। সাধারনত: অনেক এমন অনেক কাঠামোর উদহারন আছে তারা অসরলযোগ্য সেই অর্থে যে, এদের কোন অংশ বাদ দিলে এটি আর তার কাঠামোগত ঐক্য টিকিয়ে রাখতে পারেনা। কিন্তু তারা তৈরী হয়েছিল একটি কাঠামোর উপর ভিত্তি করেই, যা পরবর্তীতে সরিয়ে ফেলা হয় এবং এখন যা আর দৃশ্যমান নয়। বিবর্তনেও একই ঘটনা ঘটে, কোন অঙ্গ বা কোন স্ট্রাকচার যা আপনি দেখছেন তারও এমন একটি কাঠামো হয়তো ছিল তার পুর্বসুরী প্রানীদের শরীরে,  যা এর পরবর্তী প্রজন্মে অপসারিত হয়েছে।

ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি (Irreducible complexity) নতুন কোন ধারনা না, কিন্তু এই বাক্যটি আবিষ্কার করেছেন সৃষ্টিবাদী বিজ্ঞানী মাইকেল বেহে, ১৯৯৬ সালে [১২]। তাকে কৃতিত্ব দেয়া হয় ( অবশ্য যদি কৃতিত্ব এখানে সঠিক শব্দ হয়ে থাকে) সৃষ্টিবাদকে জীববিজ্ঞানের নতুন শাখার দিকে নিয়ে যাবার জন্য, তা হলো: প্রাণরসায়ন এবং কোষ বিজ্ঞান, সম্ভবত তার দৃষ্টিতে চোখ কিংবা পাখার চেয়ে এই ক্ষেত্রগুলোয় শুন্যস্থান বা গ্যাপ শিকার করা বেশ সহজ মনে হয়েছিল। ভালো উদহারন হিসাবে তার সেরা প্রচেষ্টা ( যদিও খারাপ একটা উদহারন) হলো ব্যাক্টেরিয়ার ফ্ল্যাজেলার মটর।

প্রকৃতির একটি অসাধারন উদ্ভাবনী শক্তির নমুনা হলো ফ্ল্যাজেলার মটর। মানুষের আবিষ্কৃত প্রযুক্তি বাদ দিলে, এটি প্রকৃতিতে আমাদের জানা একটি মাত্র উদহারন, যা একটি স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারে এমন একটি অ্যাক্সল (Axle) এ গতি দেয়। আমার মনে হয়, এর চেয়ে বিশালাকার প্রানীদের জন্য চাকা হতে পারতো সত্যিকারে ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি  উদহারন হত, আর সম্ভবত এজন্যই প্রকৃতিতে এদের কোন অস্তিত্ব নেই। কেমন করে স্নায়ু বা রক্ত নালী বিয়ারিং এর স্তর পার হতো [১২]।

ফ্ল্যাজেলাম হলো ‍সুতার মত একটি প্রপেলার, যার মাধ্যমে কিছু  ব্যাক্টেরিয়া পানির মধ্যে চলাফেরা করে অনেকটা গর্ত খুড়ে খুড়ে, আমি গর্তে খুড়ে বলছি, সাতার বলছিনা, কারন ব্যাক্টেরিয়ার পর্যায়ে তার অস্তিত্বে পানিকে আমাদের মত তরল মনে হবে না, তাদের কাছে মনে হবে, জেলী বা তরল গুড় বা  এমনকি বালির মত কোন মাধ্যম। এবং ব্যাক্টেরিয়ার মনে হবে সে তার মধ্য দিয়ে সুড়ঙ্গর মত গর্ত করে চলাফেরা করছে, সাতার নয়। আরেকটু বড় কোন অর্গানিজম এর ফ্লাজেলাম এর মত যেমন প্রোটোজোয়া, ব্যাকটেরিয়ার ফ্ল্যাজেলাম চাবুকের মত ঢেউ তোলেনা বা বৈঠার মত দাড় টানার মত আচরন করে না। সত্যি সত্যি এর একটি স্বাধীনভাবে ঘুর্ণায়ক্ষম অ্যাক্সল যা ক্রমাগত ভাবে ঘুরতে থাকে একটি বিয়ারিং এর মধ্যে, এটিকে গতিশীল রাখে খুব ছোট একটি অসাধারন মটর। আনবিক পর্যায়ে এই মটর মাংশপেশীর মত একই মুল নীতি ব্যবহার করে, তবে  সবিরাম বা থেমে থেমে সংকোচনের বদলে এটি ঘুরতে পারে ( ঘুর্ণনক্ষম) [১৩]; বেশ আনন্দের সাথে এটি বর্ণনা করা হয়েছে ক্ষুদ্র আউটবোর্ড মটর হিসাবে, যেমন মটরবোট এর বাইরে থাকা ইন্জিনের মত ( যদিও প্রকৌশলগত দিক থেকে এবং ব্যতিক্রমী একটি জৈব সিস্টেম হিসেবেও এটি খুব বেশী মাত্রায় একটি অদক্ষ মটর)।

কোন যুক্তিযুক্ত স্বাক্ষ্যপ্রমানের একটি শব্দ ছাড়াই, ব্যাখ্যা বা বিস্তারিত কোন আলোচনা ছাড়াই বেহে এটিকে এক কথায় দাবী করেন, যে ব্যাকটেরিয়ার ফ্ল্যাজেলার মটর হচ্ছে অবিভাজ্যভাবে জটিল। যেহেতু তার দাবীর স্বপক্ষে তিনি কোন যুক্তি দিতে পারেননি, আমরা শুরু করতে পারি, তার কল্পনাশক্তির ব্যর্থতা দিয়ে। তিনি আরো দাবী করেন, বিশেষায়িত জীববিজ্ঞানের গবেষনাপত্র গুলো নাকি ব্যাপারটা উপেক্ষা করেছে; তার এই অভিযোগের অসত্যতার প্রমান করতে  বেহের জন্য ‍ ভয়াবহ রকম বিব্রতকর  বিশালকায় প্রমান ভান্ডার পেনসিলভ্যানিয়ায় ২০০৫ সালে বিচারপতি জন ই জোনস এর আদালতে দাখিল করা হয়েছিল, যেখানে বেহে একজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী ছিলেন একটি ক্রিয়েশনিষ্ট গ্রুপের পক্ষে, যারা  স্থানীয় পাবলিক স্কুলের বিজ্ঞান কারিকুলামে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন মোড়কে সৃষ্টিবাদকে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল। বিচারপতি জোনস এর ভাষায় তাদের সেই পদক্ষেপ হচ্ছে, অবিশ্বাস্যরকম নির্বুদ্ধিতার একটি পদক্ষেপ ( বিচারপতি জোনস এর এই বাক্য এবং তিনি নিজে নি:সন্দেহে স্মরনীয় হয়ে থাকবেন); এই বিচারের সময়ই বেহে শুধু এই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়েননি, আমরা অচিরেই তা দেখবো।

কোন কিছুকে অবিভাজ্য জটিল হিসাবে প্রমান করার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়টি হলো, প্রমান করে দেখানো যে, এর কোন অংশই একক ভাবে কর্ম উপযোগী নয়। এদের একক ভাবে কাজ করার পুর্বশর্ত হলো, তাদের প্রত্যেকটি অংশকে এক জায়গায় জড়ো হতে হবে (বেহের প্রিয় উদহারণ ছিল মাউস ট্র্যাপ); বাস্তবে আনবিক জীববিজ্ঞানীদের  বেশী পরিশ্রম করতে হয়নি প্রমান করে দেখাতে যে, পুরো একটি একক ছাড়াও স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারা এর নানা অংশগুলোকে,  যেমন ফ্ল্যাজেলার মটর এবং বেহের  অন্যন্য অসরলযোগ্য জটিল হিসাবে দাবী করা উদহারনের ক্ষেত্রে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালেয়ের কেনেথ মিলার ভালো বলেছিলেন, আমি যদি বাজি রাখতে চাই, তবে এটাই ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের সবচেয়ে সফল প্ররোচনাদায়ী  শত্রু,  সবচেয়ে কম না কারন তিনি একজন নিবেদিত প্রাণ খৃষ্টান। আমি প্রায়ই ধর্মবিশ্বাসীদের মিলার এর বই পড়ার জন্য ‍উৎসাহ দেই, যারা নিজেদের বেহের ধোকাবাজির শিকার বলে মনে করেন, যেমন Finding Darwin’s God ।

ব্যাকটেরিয়ার ঘুর্ণনক্ষম বা রোটারী ইন্জিন এর ক্ষেত্রে, মিলার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করেন আরেকটি মেকানিজমের প্রতি, টাইপ থ্রি সিক্রেটরি সিস্টেম বা TTSS (Type Three Secretory System) এর প্রতি [১৪]। TTSS  ঘুর্ণায়মান গতির জন্য ব্যবহৃত হয়না। এটি পরজীবি ব্যাকটেরিয়াদের ব্যবহার করা অনেকগুলো পদ্ধতির  একটি, যা ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে বিষাক্ত পদার্থ তাদের শরীর থেকে ক্ষতির উদ্দেশ্যে পোষকের শরীরে মধ্যে তাদের কোষপর্দার মধ্য দিয়ে পাম্প করার জন্য। মানুষের মাত্রায় ভাবলে , আমরা ভাবতে পারি, কোন ছিদ্রর মধ্য দিয়ে তরল কিছু ঢেলে দেয়ার মত বা চেপে ঠেলে বের করে দেবার মত পাম্প। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার পর্যায়ে বিষয়টি অন্যরকম, নি:সরিত প্রতিটি অনু আকারে এবং ত্রিমাত্রিক গঠনে TTSS এর অনুদের মতই: বলা হয় ঘণ একটি কাঠামোর অনু, তরল নয়; প্রতিটি অনু এককভাবে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করে বাইরে বের করে দেয়া হয়, যেন স্বয়ংক্রিয় কোন স্লট মেশিন, যা খেলনা বা বোতল সরবরাহ করে। সুতরাং সাধারন কোন ছিদ্র তারা  যার মধ্য দিয়ে কোন অনু ‘প্রবাহিত’ হয় শুধু। কোষীয় দ্রব্য-সরবরাহকারী নিজেই অনেক ছোট ছোট প্রোটিন অনু দিয়ে তৈরী, প্রত্যেকটির আকারে এবং গঠনগত জটিলতায় তারা যে অনুগুলো কোষের ভিতর থেকে বাইরে সরবরাহ করে, তাদের সমতুল্য। মজার ব্যপার হলো, ব্যাকটেরিয়াদের এই স্লট মেশিনগুলো কখনো কখনো সম্পর্কযুক্ত নয় এমন ব্যাকটেরিয়াদের মধ্যে প্রায় একই রকম দেখা যায়। তাদের তৈরী করার জীন যেন, কপি এবং পেষ্ট করা হয়েছে অন্য ব্যাকটেরিয়া থেকে: যে কাজটা করতে ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত দক্ষ, সেটা নিজ অধিকারেই একটা অসাধারন বিষয়, তবে আমাকে অন্য বিষয়ে  বলার তাড়া আছে।

TTSS তৈরী করে যে প্রোটিন অনুগুলো ব্যাকটেরিয়ার ফ্ল্যাজেলার মটরের নানা গঠন উপাদানের  সদৃশ। বিবর্তনবাদীদের কাছে সুস্পষ্ট যে TTSS এর নানা অংশগুলো, একটা নতুন, তবে পুরোপুরি না, খানিকটা পরিবর্তিত হয়ে পুরোপুরি অন্য কাজের জন্য নির্বাচিত হয়েছে, যখন ফ্ল্যাজেলার মটরটি বিবর্তিত হয়েছিল। যখন TTSS  টাগিং বা কোন অনুকে জোরে টেনে নেয় নিজের ভিতর থেকে, তখন ( বিস্মিত হবার তেমন কোন কারন নেই যে) এটি ফ্ল্যাজেলার মটরের ব্যবহার করা মুলনীতির একটি আদি সংস্করন ব্যবহার করে, যা অ্যাক্সল হিসাবে কাজ করা অনুটিকে টেনে ধরে ঘোরাতে থাকে। স্পষ্টতই, ফ্ল্যাজেলার মটরের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ অংশ আগে থেকেই সেখানে কর্মক্ষম ছিল ফ্ল্যাজেলার মটর বিবর্তিত হবার আগে।বিদ্যমান কোন প্রক্রিয়াকে ভিন্ন কাজের জন্য পুণ:নির্দেশনা দেয়া ‍ আপাতদৃষ্টিতে অবিভাজ্য জটিল কোন যন্ত্রর অসম্ভাব্যতার পাহাড় চুড়ায় উঠার একটি সুস্পষ্ট উপায়।

অনেক বেশী কাজ করার প্রয়োজন আছে, অবশ্যই, আমি নিশ্চিৎ, সেই গবেষনা হবে। এধরনের কাজ কখনোই শেষ হবে না, যদি বিজ্ঞানীরা  ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন তত্ত্ব যে অলস ডিফল্ট অবস্থান নেবার জন্য প্ররোচিত করে তাতে সন্তুষ্ট না  হন। একজন কাল্পনিক ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন তাত্ত্বিক এর বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে প্রেরিত বার্তা হতে পারে এমন: ‘আপনি যদি না বুঝতে পারেন কিভাবে কোন একটা কিছু কাজ করছে, কোন অসুবিধা নেই :সাথে সাথে এটার বোঝার সব চেষ্টা ছেড়ে দিতে হবে এবং বলতে হবে ঈশ্বরের কাজ এটি। আপনি জানের না স্নায়ু সংকেত কিভাবে কাজ করছে? ভালো, আপনি জানেন না আমাদের মস্তিষ্কে স্মৃতি কিভাবে সংরক্ষিত হয়। চমৎকার! সালোক সংশ্লেষন প্রক্রিয়া খুবই জটিল? দারুন, দয়া করে সমস্যা সমাধান করার দরকার নেই, হাল ছেড়ে দেন, ঈশ্বরের কৃপা ভিক্ষা করুন। প্রিয় বিজ্ঞানীগন দয়া করে আপনাদের অজানা ‘রহস্য‘ নিয়ে কোন কাজ করার দরকার নেই, বরং আমাদের কাছে আপনার রহস্যগুলো নিয়ে আসুন, কারন আমরা তা ব্যবহার করতে পারবো। খামোকা গবেষনা করে মুল্যবান অজ্ঞতার অপচয় করা থেকে বিরত থাকুন। ঈশ্বরের শেষ ভরসা হিসাবে  এই সব মহান শুন্যস্থানগুলো আমাদের প্রয়োজন।’ সেন্ট অগাষ্টিন কোন রাখ ঢাক ছাড়াই বলেছেন, ‘আরো এক ধরনের প্রলোভন আছে, আরো বেশী বিপদসঙ্কুল. সেটা হচ্ছে কৌতুহলের অসুখ, এটাই আমাদের  পরিচালনা করে প্রকৃতির গোপন রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করতে। যে গোপন রহস্য আমাদের বোধের বাইরে, যা আমাদের কোন কাজে আসেনা, যা মানুষের শেখার আকাঙ্খা করাও উচিৎ না (Freeman 2002 এ উদ্ধৃত)’;

ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটির ক্ষেত্রে বেহের অন্য আরেকটি প্রিয় উদহারন হলো আমাদের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ তন্ত্র। বিচারপতি জোনস এর ভাষায় সেই কাহিনী শোনা যাক:

’প্রকৃতপক্ষে, পাল্টা প্রশ্নোত্তরের সময় অধ্যাপক বেহে তার ১৯৯৬ সালে তার দাবী, বিজ্ঞান কখনোই রোগপ্রতিরোধ তন্ত্রের বিবর্তনীয় ব্যাখ্যা দিতে পারবে না, এর বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাকে ৫৮টি পিয়ার রিভিউ প্রকাশনা, নয়টি বই এবং বেশ কয়েকটি ইমিউনোলজী পাঠ্যপুস্তক অধ্যায় দেখানো হয়েছিল ইমিউন সিস্টেম এর বিবর্তনের ব্যাখ্যা হিসাবে। কিন্তু তিনি শুধু দাবী করেন, এগুলো বিবর্তনের পক্ষে প্রমান হিসাবে যথেষ্ট যেমন না যেমন তেমনি শক্তিশালীও না।’

বেহে , পাল্টা প্রশ্নোত্তর পর্বে, বাদী পক্ষের প্রধান কৌশুলী এরিক রথসচাইল্ড প্রশ্নের উত্তরে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, তিনি সেই ৫৮টি গবেষনা পত্রের বেশীর ভাগই পড়েননি। অবশ্য এটি বিস্ময়কর না, কারন ইমিউনোলজী অনেক কঠিন পরিশ্রমের ব্যাপার ।একারনে বেহের অবজ্ঞাসুচক ‘অর্থহীন’ বলে এসব প্রত্যাখান করা আরো বেশী ক্ষমার অযোগ্য। এটা অবশ্যই অর্থহীন, সত্যিকারের পৃথিবী সম্বন্ধে গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কারের বদলে যদি আপনার লক্ষ্য থাকে সহজে বিশ্বাসপ্রবন সাধারন মানুষ এবং রাজনীতিবিদদের জন্য প্রচারণা চালানো; বেহের কথা শোনার পর, রথসচাইল্ড সুন্দরভাবে পুরোব্যাপারটার সারাংশ করেন যা সেদিন  সেই আলাদতে উপস্থিত সকল সৎ মানুষ অনুভব করেছিলেন:

আমাদের সৌভাগ্য এবং আমরা কৃতজ্ঞ যে কিছু বিজ্ঞানী আছেন যারা ইমিউন সিস্টেমের উৎপত্তির প্রশ্নের উত্তরটি খোজার চেষ্টা করেছেন…. এটি আমাদের ভয়ঙ্কর এবং ক্ষতিকর অসুখের বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ, যে বিজ্ঞানীরা এই সব বই লিখেছেন, বা নিবন্ধ লিখেছেন তারা সবার চোখের অন্তরালেই পরিশ্রম করে গেছেন, বই এর জন্য বা বক্তৃতার জন্য কোন পারিশ্রমিক ছাড়াই। তাদের পরিশ্রম আমাদের সহায়তা করেছে অনেক গুরুত্বপুর্ণ অসুখের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং চিকিৎসা করতে। তার ঠিক বীপরিতে, অধ্যাপক বেহে এবং পুরো ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন আন্দোলন বিজ্ঞান বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞানকে সামনে অগ্রসর হবার ক্ষেত্রে কোন অবদানই রাখছেন না, এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের বলছেন, এসব নিয়ে মাথা না ঘামাতে [১৫]।

আমেরিকার জীনতত্ত্ববিদ জেরী কয়েন বেহের বইটি সম্বন্ধে তার রিভিউতে লিখেছিলেন,‘ যদি বিজ্ঞানের ইতিহাস আমাদের কিছু শিখিয়ে থাকে, তা হলো আমাদের অজ্ঞতাকে ‘ঈশ্বর’ হিসাবে চিহ্নিত আমরা কিছুই করতে পারবো না, বা একজন বাঙময় ব্লগারের ভাষায়, গার্ডিয়ান পত্রিকায় কয়েন এবং আমার ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন সম্বন্ধে একটি নিবন্ধে যিনি মন্তব্য করেছিলেন:

কেন ঈশ্বর কে সবকিছুর ব্যাখ্যা হিসাবে গন্য করা হয়?  এটি অবশ্যই তা নয়, এটি ব্যাখ্যা করার ব্যার্থতা, কাধ ঝাকানো একটি ‘আমি জানিনা‘ যা কিনা নিজেকে সাজিয়েছে আধ্যাত্মিকতার পোষাক ও আচারের মাধ্যমে। কেউ যদি কোন কিছুর জন্য ঈশ্বরকে কৃতিত্ত্ব দিতে চায়, সাধারনত এর অর্থ হলো তারা এ সম্বন্ধে কিছু জানেন না, সুতরাং তারা  এর কারন হিসাবে আরোপ করে ধরাছোয়ার বাইরে, জানা অসম্ভব আকাশ পরীর উপর। এখন আপনি যদি ব্যাখ্যা দাবী করুন ঐ ভদ্রলোক কোথা থেকে আসলেন, খুব সম্ভবত এর উত্তর হিসাবে আমি একটা অস্পষ্ট মিথ্যা দার্শনিক উত্তর পাবেন তার চির অস্তিত্বময়তা বা প্রকৃতির বাইরে তার অবস্থান সম্বন্ধে। যা অবশ্যই কোন কিছুরই ব্যাখ্যা করেনা [১৬]।

ডারউইনিজম আমাদের সচেতনাতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে অন্যভাবে, বিবর্তিত অঙ্গ, যারা অসাধারন এবং দক্ষ সাধারনত যেমনটি হয়,তবে তাদের অনেক ক্রুটিও আছে, ঠিক যেমনটা আপনি আশা করতে পারেন, যখন তাদের কোন বিবর্তনের ইতিহাস থাকে এবং যদি তাদের কেউ ডিজাইন করে থাকতো তাহলে ঠিক আপনি এসব ক্রুটি আশা করতেন না। আমি বেশ কিছু উদহারনটা আগেও আলোচনা করেছি অন্য বইতে: যেমন একটি স্নায়ু, রিকারেন্ট ল্যারিন্জিয়াল নার্ভ, এটি যে নির্দিষ্ট অঙ্গকে স্নায়ুসংযোগ দেয়, সেই অঙ্গের প্রতি উৎস থেকে তার যাত্রাপথের অতিমাত্রায়, অপব্যায়ী ঘুরপথ  চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বিবর্তনের ইতিহাস। আমাদের অনেকগুলো অসুস্থতা, পিঠের নীচের দিকে ব্যাথা  বা ব্যাক পেইন থেকে হার্নিয়া, জরায়ুর প্রোলাপ্স এবং আমাদের সাইনাস সংক্রমনের প্রবণতা  এর সবকিছুর কারন সরাসরিভাবে আমাদের দুই পায়ে হাটার বিষয়টি, আমরা যে এখন যে শরীরটা নিয়ে দুই পায়ে হাটছি তা শত মিলিয়ন বছর ধরে আকারে পেয়েছিল চার পায়ে হাটার উপর নির্ভর করে। আমাদের সচেতনতা আরো বাড়ে প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিষ্ঠুরতা এবং অপচয় প্রবনতা দেখে। শিকারী প্রানী মনে হয় সমান সুন্দরভাবে ডিজাইন করা তার শিকার প্রানীটিকে ধরবার জন্য, অন্যদিকে আবার শিকার প্রানীর ঠিক সেই একই সুন্দরভাবে ডিজাইন করা, আক্রমনকারী শিকারী প্রানীর কবল থেকে রক্ষা পাবার সকল উপায় সহ; তাহলে ঈশ্বর আসলে কোন পক্ষে [১৭]।

(চলবে)

পাদটীকা/নোটস ______________________________

[১০] POPPERIAN relating to, or characteristic of the theories of Karl Popper; esp : of or relating to the theory that a hypothesis can be falsified by observed exceptions but never absolutely proven to be true.
[১১]  Fiat: a command or act of will that creates something without or as if without further effort
[১২] রিচার্ড ডকিন্সের নোট:  কল্পকাহিনীতে একটি উদহারন দিতে পারি এর, লেখক ফিলিপ পুলম্যান তার Dark materials এ কল্পনা করেছিলেন এক প্রজাতির প্রানীর, মুলেফা, যা সহাবস্থান ছিল বৃক্ষর সাথে যারা মাঝখানে ছিদ্রযুক্ত গোলাকৃতি বীজবাহী পড তৈরী করতো; এই পডগুলো মুলেফা ব্যবহার করতো চাকা হিসাবে।চাকাগুলো যেহেতু শরীরের অংশ ছিলনা, সে কারনে তাদের স্নায়ু বা রক্ত সংযোগও  ছিলনা যারা মুলেফার অ্যাক্সল ( শিং এর বাকানো নোখ, হাড় ) মধ্যে পেচিয়ে যেতো। পুলম্যান দুরদৃষ্টিপুর্ণ একটি পর্যবেক্ষন ছিল, এটি  সিস্টেমটি কাজ করতো কারন গ্রহটিতে প্রাকৃতিক ভাবে ব্যাসল্ট  এর ফিতা বেছানো  রাস্তা ছিল, যা রাস্তা হিসাবে কাজ করতো। রাস্তাহীন অমসৃন ভুমিতে চাকা খুব একটা উপকারী নয়।
[১৩]রিচার্ড ডকিন্সের নোট: (বিস্ময়করভাবে, মাংশপেশীল মুলনীতি আরো  একটি তৃতীয় মোডে ব্যবহৃত হয়, কিছু কীটপতঙ্গ, যেমন মৌমাছি, মাছি; যেখানে ওড়ার মাংশপেশীটি মুলত অসিলেটরী, যা রেসিপ্রেকেটিং ইনজিনের মত কাজ করে। অন্য পতঙ্গ যেমন লোকাষ্টরা  প্রতিটি পাখনা নাড়ানোর জন্য স্নায়ু সংকেত প্রেরন করে (যেমন পাখীরা), মৌমাছিরা একবারই সংকেত পাঠায় অসিলেটরী মটোরকে সক্রিয় করে ( বা নিষ্ক্রিয়); ব্যাকটেরিয়ার যে মেকানিজমটি আছে সেটি সাধারন সংকোচন শীল কিছু (যেমন পাখীদের) নয় বা রেসিপ্রকেটর নয় (যেমন মৌমাছি) বরং একটি সত্যিকারের ঘুর্ণায়মান বা রোটেটর। সেই ক্ষেত্রে  এটি বৈদ্যুতিক মটর বা ওয়াঙ্কেল ইন্জিনের মত।)
[১৪] http://www.millerandlevine.com/km/evol/design2/article.html.
[১৫] This account of the Dover trial, including the quotations, is from A. Bottaro, M. A. Inlay and N. J. Matzke, ‘Immunology in the spotlight at the Dover “Intelligent Design” trial’, Nature Immunology 7, 2006, 433-5.
[১৬]  J. Coyne, ‘God in the details: the biochemical challenge to evolution’, Nature 383, 1996, 227-8. The article by Coyne and me, ‘One side can be wrong’, was published in the Guardian,1 Sept. 2005: http://www.guardian.co.uk/life/feature/story/0,13026,1559743,00.html. The quotation from the ‘eloquent blogger’ is at http://www.religionisbullshit.net/blog/2005_09_01_archive.php.
[১৭]Dawkins, R. (1995). River Out of Eden. London: Weidenfeld & Nicolson.

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

3 thoughts on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: চতুর্থ অধ্যায় (দ্বিতীয় পর্ব)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s