রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)


শীর্ষ ছবি:  মিকেল্যান্জেলোর ক্রিয়েশন অব অ্যাডাম এর একটি  ভিন্ন রুপ ( ইন্টারনেট থেকে)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন  অনুবাদপ্রথম , দ্বিতীয়  এবং তৃতীয় অধ্যায়

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব) ( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins

কেন প্রায় নিশ্চিৎভাবে বলা সম্ভব ঈশ্বরের কোন অস্তিত্ব নেই

বিভিন্ন ধর্মীয় গোত্রের প্রচারকরা … বিজ্ঞানের অগ্রগতি নিয়ে সদা শঙ্কিত, যেমন কাহিনীর ডাইনীরা শঙ্কিত থাকে ভোরের আলোর আগমনের এবং তাদের ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে এই সব নিয়তি নির্ধারক অগ্রদুতদের প্রতি, যারা তাদের ছলছাতুরীর জীবিকার বিভক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। টমাস জেফারসন

দি আল্টিমেট বোয়িং ৭৪৭

যুক্তি হিসাবে ’অসম্ভাব্যতা থেকে নেয়া যুক্তি’ বা ’আর্গুমেন্ট ফ্রম ইমপ্রোবাবিলিটি’ বেশ শক্তিশালী। প্রচলিত আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইন বা পরিকল্পনা থেকে যুক্তির ছদ্মবেশে অনায়াসে এটি বর্তমানে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমানের স্বপক্ষে প্রস্তাবিত সবচেয়ে জনপ্রিয় যুক্তি  এবং যুক্তিটি বিস্ময়কর সংখ্যক ঈশ্বরবাদীদের দৃষ্টিতে স্বয়ংসম্পুর্ন ও পুরোপুরিভাবে বিশ্বাসযোগ্য । অবশ্যই যুক্তিটি খুব শক্তিশালী এবং আমার ধারনা, উত্তর করা সম্ভব না বা উত্তরের অযোগ্য এমন একটি যুক্তি – কিন্তু সেটা ঈশ্বরবাদীরা যা বোঝাতে চাইছেন, ঠিক এর বীপরিত অর্থে। অসম্ভাব্যতা থেকে নেয়া যুক্তি  যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে এটাই  ‌ঈশ্বরের যে অস্তিত্ব নেই তা প্রমান করার ক্ষেত্রে সবচে কাছাকাছি পৌছানো যায়। প্রায় নিশ্চিৎভাবেই ঈশ্বরের যে কোন অস্তিত্ব , সে বিষয়ে পরিসংখ্যানগত প্রমান প্রদর্শনকে আমি নাম দিয়েছিল: ‍দি আলটিমেট বোয়িং ৭৪৭ গামবিট (১)।

নামটার উৎপত্তি ফ্রেড হয়েল (Fred Hoyle) এর মজার সেই বোয়িং ৭৪৭  এবং স্ক্র্যাপইয়ার্ড  (পরিত্যক্ত কিংবা অবাঞ্ছিত লোহা লক্কড়ের টুকরো যেখানে ফেলে রাখা হয়) এর সেই রুপক চিত্রটি; আমি অবশ্য নিশ্চিৎ না, বিষয়টি হয়েল নিজে কোথাও লিখেছিলেন কিনা, কিন্তু এটি যে তার মন্তব্য, সেটি সত্যায়িত করেছিলেন তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী চান্দ্রা বিক্রমাসিংহে এবং ধারনা করা হয় হয়েলই এই মন্তব্যটা করেছিলেন (২); হয়েল বলেছিলেন, পৃথিবীতে জীবন এর  উৎপত্তি হবার সম্ভাবনা, কোন একটা স্ক্র্যাপইয়ার্ড এর মধ্য দিয়ে ঘুর্ণিঝড় বয়ে গেলে, সেখানে ভাগ্যক্রমে নিজে নিজে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ যুক্ত হয়ে একটা আস্ত বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজ তৈরীর হবার যে সম্ভাবনা, তার চেয়ে খুব একটা বেশী না। অন্যরা এই রুপকটি ধার করেছেন বিবর্তনের পরের পর্যায়ে জটিল জীবদেহের উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করতে, যেখানে এর একটি মিথ্যা আপাত-গ্রাহ্যতা আছে। এলোমেলো ভাবে বিভিন্ন অংশ নাড়া চাড়া করে যোগ বিয়োগ করে পুরোপুরি কর্মক্ষম একটি ঘোড়া, গুবরে পোকা বা অস্ট্রিচ পাখী গঠন করার সম্ভাবনাটা সেই স্ক্র্যাপইয়ার্ড এ ঘুর্ণিঝড়ের বোয়িং ৭৪৭ তৈরী করার মত বেশ উচু মাত্রায় অসম্ভাব্যতার পর্যায়ে পড়ে। এটাই, মোটামুটি সংক্ষেপে সৃষ্টিবাদীদের সবচেয়ে প্রিয় যুক্তি –  আর এ ধরনের একটি যুক্তি শুধুমাত্র এমন কারো পক্ষেই প্রস্তাব করা সম্ভব, যার প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্বন্ধে সামান্যতম কোন ধারনা নেই :  এমন কেউ যে মনে করে প্রাকৃতিক নির্বাচন হচ্ছে একটা চান্স বা  আপতন বা দৈবক্রমে ঘটা বিবর্তনীয় পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করে এমন একটি তত্ত্ব  অথচ আপতন বা দৈবক্রমে ঘটা বিবর্তনীয় পরিবর্তনের প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে এটি সম্পুর্ন এই ধারনা বীপরিত।

সৃষ্টিবাদীদের আত্মসাৎ কৃত  অসম্ভাব্যতা থেকে নেয়া যুক্ত টির রুপ সবসময়ই একই সাধারন  রুপ ধারণ করে থাকে এবং সৃষ্টিবাদীরা একে যতই  রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক  ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন (ID) ( ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনকে অনেক সময় নির্দয়ভাবে বলা হয় সস্তা সুট বা টাক্সেডো পরা সৃষ্টিবাদ) এর চমক দেখানো পোষাকে সজ্জিত করুক না কেন, কোন গুনগত পার্থক্য ঘটেনা।  কিছু পর্যবেক্ষনকৃত বিষয় – কখনো একটি জীবিত প্রানী বা এর কোন একটি জটিল অঙ্গ, কিন্তু যে কোন কিছুই হতে পারে, কোন একটি অনু থেকে শুরু করে পুরো মহাবিশ্বটাই – আসলেই সঠিকভাবে অতি প্রশংসায় মহিমান্বিত করা হয় পরিসংখ্যানগতভাবে অসম্ভাব্য একটি বিষয় হিসাবে। কখনো তথ্য তত্ত্বের ভাষা ব্যবহৃত হয়:   জীবিত পদার্থের মধ্যে বিদ্যমান  সকল তথ্যের উৎস ব্যাখ্যা দেবার জন্য চ্যালেন্জ্ঞ ছুড়ে দেয়া হয় ডারউইনবাদীদের প্রতি। টেকনিক্যাল অর্থে, তথ্য ভান্ডার আসলে অসম্ভাব্যতার একটি পরিমাপ বা ’সারপ্রাইজ ভ্যালু’; বা যুক্তিটি হয়তো প্রস্তাবনা করে অর্থনীতিবিদদের  বহুব্যবহৃত মন্ত্র: কোন কিছুই বিনামুল্যে পাওয়া যায় না – এবং কোন কিছু না করার বিনিময়ে, অনেক কিছুর জন্য কৃতিত্ব দাবী করার জন্য ডারউইনবাদকে অভিযুক্ত করা হয় । আসলে,  এই অধ্যায়ে আমি প্রমান করবো, ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচনই হচ্ছে আমাদের জানা আছে এমন একটি মাত্র  সমাধান যা কিনা, কোথা থেকে তথ্যগুলো এসেছে – এই  অন্যথায় সমাধান অযোগ্য ধাধাটির।দেখা যাচ্ছে ঈশ্বর হাইপোথিসিসটি চেষ্টা করছেকোন কিছু না করেই সব কিছু পাবার জন্য । ঈশ্বর নিজেই বিনামুলেই কিছু পেতে চাইছেন এবং বেশ তাই হোক। তবে যত বড় পরিসংখ্যানের হিসাবে অসম্ভাব্য হোক না কেন. এই সত্ত্বা যা আপনি খুজছেন , একটি মহান পরিকল্পনাকারী বা ডিজাইনারের অস্তিত্ব কল্পনা করার মাধ্যমে, কমপক্ষে সেই ডিজাইনারের নিজেকেও অবশ্যই সেই পরিমানে অসম্ভাব্য হতে হবে। ঈশ্বরই হচ্ছেন সেই আল্টিমেট বোয়িং ৭৪৭।

অসম্ভাব্যতা থেকে নেয়া যুক্তি দাবী করছে, শুধু চান্স বা আপতনের মাধ্যমে কোন জটিল কিছুর সৃষ্টি হতে পারে না (বিজ্ঞানের প্রেক্ষিতে চান্স (chance) শব্দটার অর্থ ভিন্ন। বিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্ট নন অনেকেই মনে করেন বিবর্তন হচ্ছে চান্সের মাধ্যমে। এই শব্দটা ব্যবহার করে তারা যেটা বোঝাতে চাইছেন, বিবর্তন হচ্ছে কোন কারন বা কোন লক্ষ্য ছাড়াই। সেই সুত্রানুযায়ী প্রকৃতিতে সবকিছুই – রাসায়নিক বিক্রিয়া, আবহাওয়া, গ্রহের গতি, ভুমিক্ম্প সবকিছু হচ্ছে চান্সের মাধ্যমে, এইসব কিছু কোনটারই কোন উদ্দেশ্য বা পারপাস নেই। আসলে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে এই উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য ,এই বিষয়গুলোর মানুষের চিন্তাতেই শুধু অস্তিত্ত্ব আছে, তারা কোন প্রাকৃতিক ঘটনাকে উদ্দেশ্যপুর্ণ মনে করেন না। কিন্তু বিজ্ঞানীরাও রাসায়নিক বিক্রিয়া বা গ্রহদের গতি এসব কিছুকেও কোন চান্স জনিত ঘটনা মনে করেন না। কারন বিজ্ঞানে, চান্স শব্দটার ভিন্ন অর্থ আছে। যদিও চান্স এর অর্থ হতে পারে জটিল কোন দর্শনের বিষয়, কিন্তু বিজ্ঞানীরা চান্স বা র‌্যানডমনেস শব্দকে ব্যবহার করেন এই অর্থে: যখন কোন ভৌত কারন বেশ কয়েকটি ফলাফল সৃষ্টি করতে পারে, আমরা আগে থেকে যা  অনুমান করতে পারিনা যে, কোন একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ফলাফল কি হবে। যাই হোক, আমরা হয়তো নির্দিষ্ট করতে পারি, এদের কোন একটি ফলাফলের সম্ভাবনা বা প্রোবাবিলিটি এবং এভাবে তাদের হার বা ফ্রিকোয়েন্সি; যেমন আমরা কোন দম্পতির পরবর্তী শিশুর লিঙ্গ কি হবে বলতে পারিনা, তবে যথেষ্ট নিশ্চয়তার সাথে আমরা এটা বলতে পারি, পরর্ব্তীতে তাদের মেয়ে শিশু হবার সম্ভবনা প্রায় ০.৫ বা ৫০ শতাংশ; প্রায় সবকিছুতে একই সাথে দুটি জিনিসের প্রভাব দেখা যায়, চান্স ( অনুমান করা যায় না) এবং ননর‌্যানডোম বা ডিটারমিনিষ্টিক বা অনুমানযোগ্য কারনগুলো। আমাদের মধ্যে যে কারোই গাড়ী অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে অন্য কোন ড্রাইভাবে অনুমান করা সম্ভব না বা আনপ্রেডিকটেবল আচরনের জন্য, এবং আমাদের এই সম্ভাবনাকে আমরা অনুমান করা যায় এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি যদি আমরা মাতাল হয়ে গাড়ী চালাই। বিবর্তনের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটছে, প্রাকৃতিক নির্বাচন হচ্ছে ডিটারমিনিষ্টিক (deterministic বা predictable) , ননর‌্যানডোম একটি প্রক্রিয়া। এবং সেই একই সাথে বিবর্তনে গুরুত্বপর্ণ র‌্যানডোম প্রক্রিয়াও আছে, যেমন মিউটেশণ এবং জেনেটিক অ্যালীল বা হ্যাপ্লোটাইপদের র‌্যানডোম কমবেশী নানা হার হওয়া (random genetic drift))) কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষই এই  ‘চান্স বা আপতনের মাধ্যমে সৃষ্ট’ বক্তব্যটি ‘ কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পক বা ডিজাইনারের পরিকল্পনা বা ডিজাইন ব্যতীত সৃষ্ট’ বক্তব্যটার সমার্থক হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সে কারনেই অবাক হবার কিছু নেই, যে তারা অসম্ভাব্যতাকে ডিজাইনের স্বপক্ষে প্রমান হিসাবে মনে করেন। ডারউইনীয় প্রাকৃতিক নির্বাচন দেখায় যে,  জীববিজ্ঞানীয় অসম্ভাব্যতার প্রেক্ষাপটে এই ব্যাখ্যা কতটুকু ভ্রান্ত। এবং যদিও ডারউইনবাদ সরাসরি অজৈব জগত – যেমন কসমোলজী – এর সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয় – তবে এটি আমাদের সচেতনতার স্তরকে উচ্চ একটি স্তরে নিয়ে যায়, এর মুল ক্ষেত্র জীববিজ্ঞানের বাইরেও।

ডারউইনবাদ সম্বন্ধে গভীর ধারনা আমাদেরকে  চান্স বা আপতনের একমাত্র বিকল্প হিসাবে প্রস্তাবিত ডিজাইন বা পরিকল্পনার সহজ ধারনা থেকে সতর্ক থাকতে শেখায়। এবং আমাদের ধীরে ধীরে  বৃদ্ধি পাওয়া জটিলতার ক্রমানুসারে সাজানো পথ গুলোর শেখায় অনুসন্ধান করতে শেখায়। ডারউইনের আগে দার্শনিক যেমন হিউম বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের অসম্ভাব্যতা মানে কিন্তু এই না  একে অবশ্যই ডিজাইনকৃত বা পরিকল্পিত হতে হবে, কিন্তু তারা এর বিকল্প কোন কিছুর কল্পনা করতে পারেননি। ডারউইনের পর, ডিজাইনের ধারনাটি সম্বন্ধে আমাদের সবারই, একেবারে অন্তস্থল থেকে,সন্দেহ অনুভব করা উচিৎ। ডিজাইনের এই বিভ্রম বা মায়া আসলেই একটা ফাদ, যা এর আগেও আমাদের বোকা বানিয়েছিল, এবং আমাদের সচেতনাকে জাগিয়ে তুলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা ডারউইনের; যদি তাই হতো, তাহলে আমাদের সবার ক্ষেত্রেই তিনি সফল হতেন।

সচেতনতা বৃদ্ধি কারক হিসাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন:

কোন একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর স্টারশীপে, নভোচারীরা পৃথিবীর জন্য আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন, ’পৃথিবীতে এখন বসন্তকাল, শুধু এটা ভাবলেই !’, আপনি হয়তো সাথে সাথে  এই বাক্যের ভুলটা ধরতে পারবেন না, কারন উত্তর গোলার্ধের শভিনিজম বা নিজেদের সবকিছুর কেন্দ্রে মনে করার প্রবণতা, এখানে আমরা যারা বাস করি তাদের অবচেতন মনে গভীরভাবে খোদাই করা আছে;  এমনকি যারা এখানে বাস করেনা তাদের অনেকেরও। ‘অবচেতন’ কথাটাই পুরোপুরি ঠিক আছে। এখানেই সচেতনতা বাড়াবার বিষয়টি আসে। শুধুমাত্র লোক দেখানো মজা করা ছাড়াও, আরো গুরুত্বপুর্ণ কিছু কারনে, অষ্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে আপনি পৃথিবীর মানচিত্র কিনতে পারবেন যেখানে দক্ষিন মেরু উপরের দিকে অবস্থিত। সচেতনতা বাড়াতে এই ম্যাপগুলো কতইনা চমৎকার হতে পারতো, যদি উত্তর গোলার্ধের ক্লাসরুমগুলোর দেয়ালে এদের আটকিয়ে রাখা যেত। দিনের পর দিন, সেটি শিশুদের মনে করিয়ে দিত ‘উত্তর‘ একটি কাল্পনিক পোলারিটি বা মেরুকরণ, শুধুমাত্র যার একার  সবসময় ‘উপরে‘ থাকার একচেটিয়া অধিকার নেই। মানচিত্রটি যেমন তাদের জানতে উৎসাহী করে তুলতো, তেমনি তাদের সচেতনতাও বৃদ্ধি করতো। তারা বাসায় ফিরে তাদের বাবা মা দের তা বলতো – প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, শিশুদের এমন কিছু শেখানো যা দিয়ে তারা তাদের বাবা মা দের বিস্মিত করতে পারে, সম্ভবত একজন শিক্ষকের পক্ষ থেকে  এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠতম উপহার।

নারীবাদীরাই সচেতনতা বৃদ্ধির শক্তি সম্বন্ধে আমার সচেতনতাকে বৃদ্ধি করেছিল। History না Herstory অবশ্যই হাস্যকর,  এমনকি  শুধুমাত্র  এই কারনে, যে history শব্দটির মধ্যে His  শব্দাংশটির উৎপত্তিগত কোন সম্পর্কই নেই পুরুষ বাচক সর্বনামের সাথে। শব্দের উৎপত্তিগত দিক থেকে এটিও হাস্যকর  ১৯৯৯ সালে  ওয়াশিংটনের একজন সরকারী কর্মকর্তার বরখাস্ত হবার ঘটনার মত। যার Niggardly শব্দটি ব্যবহার বর্ণবাদী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল (Niggardly শব্দের আভিধানিক অর্থ কৃপন, এবং শব্দটার উৎপত্তি কিন্তু কোন ধরনের বর্ণবাদ ইঙ্গিত করেনা); এমনকি নির্বোধের মত উদহারনও, যেমন Niggardly বা Herstory কিন্তু আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। যখন আমাদের দার্শনিক ক্রোধটা প্রশমিত করে এবং হাসি থামাতে পারবো, Herstory  আসলেই আমাদের History কে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখতে শেখাবে।  এ ধরনের সচেতনা বৃদ্ধিতে কুখ্যাতভাবে লিঙ্গভিত্তিক সর্বনামগুলোর অবস্থান সবসময় সামনের কাতারে। He বা ‍She অবশ্যেই Himself বা Herself কে জিজ্ঞাসা করবে, His বা Her তার স্টাইল সেন্স কখনো  Himself বা Herself কে এভাবে কোন কিছু লেখার ব্যাপারে সম্মতি দেয় কিনা। কিন্তু আমরা যদি ভাষার এই অস্বস্তিকর ধ্বণির সমস্যাটা কাটিয়ে উঠতে পারি, এটা আমাদের মানব জাতির অর্ধেক অংশের সংবেদনশীলতার প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি করবে। Man বা মানুষ, Mankind বা মানবজাতি, Rights of Man বা মানুষের অধিকার, সব Man বা মানুষ সৃষ্টি হয়েছে সমানভাবে, একজন Man বা মানুষ একটি ভোট – ইংরেজী ভাষা প্রায়শই মনে হয় Woman বা নারীদের বর্জন করেছে [ ধ্রুপদী ল্যাটিন কিংবা গ্রীকে সেটা তেম ঘটেনি, ল্যাটিন Homo ( গ্রীক Anthropo-) অর্থ মানুষ, যেমন Vir (Andro-) অর্থ পুরুষ, এবং Femina (Gyne-)v অর্থ হচ্ছে নারী। সেকারনে Athropology  র বিষয় হচ্ছে সমস্ত মানব জাতি। যেখানে Andrology ও  Gynecology চিকিৎসাবিজ্ঞানের  লিঙ্গ ভিত্তিক স্বতন্ত্র দুটি শাখা]; আমার যখন অল্পবয়স ছিল, আমার কখনো মনে হয়নি কোন নারী ‘ The Future of Man বা মানুষের ভবিষ্যৎ’ বাক্যটি দ্বারা অপমানিত বোধ করতে পারেন। এরপরের মধ্যবর্তী দশকগুলোতে, আমাদের সবারই এ বিষয়ে সচেতনতার স্তর বৃদ্ধি পেয়েছে, এমনকি যারা Human এর পরিবর্তে Man ব্যাবহার করেন, তারাও সেটা করেন একটি আত্মসচেতন ক্ষমাপ্রার্থনার ভাব ধারন করে – অথবা কেউ সেটা সচেতন আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে, প্রচলিত ভাষার স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহন করে, এমনকি পরিকল্পিতভাবে নারীবাদীদের উত্যক্ত করতে। সময়ের স্পিরিট বা Zeitgeist এর সকল অংশগ্রহন কারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি হয়েছে। এমনকি যারা এর বিরুদ্ধে নেতিবাচক অবস্থান নিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের অবস্থানে অনঢ় আছেন এবং তাদের আক্রমনও দ্বিগুন করেছেন।

নারীবাদ বা ফেমিনিজিম আমাদের দেখিয়েছে এর সচেতনতা বৃদ্ধি করার শক্তিময় ক্ষমতা, এবং আমি সেই কৌশলগুলো ধার করতে চাই প্রাকৃতিক নির্বাচনের জন্যে। প্রাকৃতিক নির্বাচন পুরো জীবনটাকেই শুধু ব্যাখ্যা করেনা, এটি আমাদের সচেতনতাকেও বাড়িয়ে দেয় বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা করার ক্ষমতার উপর : কিভাবে  প্রত্যক্ষ দিক নির্দেশনা ছাড়াই সংগঠিত জটিলতার উদ্ভব হতে পারে খুব সরল কোন সুচনা থেকে । প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্বন্ধে পুর্ণ ধারনা আমাদের সাহস যোগায় অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোতেও  সেই ব্যাখ্যা প্রয়োগ করতে। এই সব অন্য ক্ষেত্রেও আমাদের বিশ্লেষনী সংশয়কে এটি বাড়িয়ে দেয়, সেই সব মিথ্যা অপ্রমানযোগ্য বিকল্প মতামতগুলো সম্বন্ধে, যা প্রাক-ডারউইন পর্বে একসময় জীববিজ্ঞানকে প্রতারিত ও দিকভ্রষ্ট করেছিল। ডারউইনের আগে, কেইবা, অনুমান করতে পেরেছিল, ডাগ্রন ফ্লাই এর পাখনা বা ঈগল পাখির চোখ যা আপাতদৃষ্টিতে পরিকল্পিত বা ডিজাইন করা মনে হলেও এটি আসলে এলোমেলো বা র‌্যানডম নয় (নন র‌্যানডোম)  এমন কোন প্রক্রিয়ায় কিন্তু সম্পুর্ন প্রাকৃতিক একটি সুদীর্ঘ ক্রমবিন্যাসের শেষ পরিনতি মাত্র?

ডগলাস অ্যাডামস এর নিজের রাডিক্যাল নাস্তিকতাবাদে রুপান্তরিত হকার মজার এবং হৃদয়স্পর্শী কাহিনীর বিবরন –রাডিক্যাল শব্দটার উপর তিনি জোর দিয়েছেন, যেন আবার কেউ তাকে ভুল করে অজ্ঞেয়বাদী বা অ্যাগনষ্টিক মনে না করে বসে –ডারউইনিজমের সচেতনতা বৃদ্ধি করার ক্ষমতার একটি সাক্ষ্যপ্রমান, আমি আশা করি আমাকে আমার এই আত্মপ্রশ্রয়ের জন্য, যা পরবর্তী উদ্ধৃতিতে স্পষ্ট হবে –ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হবে। আমার অজুহাত হলো যে, আমার আগের বইগুলোর মাধ্যমে ডগলাসের রুপান্তর , যেগুলো অবশ্যই কা‌উকে রুপান্তরের প্রচেষ্টা ছিল না – আমাকে অনুপ্রানিত করেছে তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই বইটি নিবেদন করার জন্য-  কিন্তু সেটি তাই  করেছিল!  একটি সাক্ষাৎকারে, যা দি স্যামন অব ডাউট (The Salmon of Doubt) এ পুণমূদ্রিত হয়েছে, ডগলাসকে একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেমন করে তিনি নাস্তিক হয়েছিলেন, তিনি তার উত্তর শুরু করেছিলেন প্রথমে কিভাবে অ্যাগনষ্টিক হয়েছিলেন সেটা ব্যাখ্যা করে, তারপর তিনি বলেছিলেন:

এবং এরপর আমি ভাবতে শুরু করলাম বিরামহীনভাবে, কিন্তু আমার কাছে এভাবে ক্রমাগত চিন্তা করার যাবার মত যথেষ্ট পরিমান কিছু ছিল না, সুতরাং আমি কোন মতামতেও পৌছাতে পারিনি। ঈশ্বর এর ধারনাটি সম্পর্কে আমার তীব্র একটা সন্দেহ ছিল, কিন্তু কোন কিছু সম্বন্ধেই আমার যথেষ্ট পরিমান জানা ছিল না, যা একটা কাজ চালানোর মত মডেল হতে পারে ব্যাখ্যা করার জন্য, যেমন, জীবন, মহাবিশ্ব এবং সবকিছু যা বর্তমানে যেভাবে যে অবস্থানে আছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি, আমি আমার পড়া এবং চিন্তা দুটোই অব্যাহত রেখেছিলাম।  আমার বয়স যখন ত্রিশের শুরুর দিকে  হঠাৎ করেই বিবর্তন জীববিজ্ঞান পড়ার সুযোগ হয়, বিশেষ করে, রিচার্ড ডকিন্সের বই রুপে, দি সেলফিশ জীন এবং পরে দি ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার এবং হঠাৎ করে ( আমার মনে হয়ম দি সেলফিশ জীন দ্বিতীয় বার পড়ার সময়) সব কিছু আমার মনে স্পষ্ট হয়ে যায়। সেই ধারনা যে কি বিস্ময়করভাবে সহজ সরল, কিন্তু সেটাই প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি করে অসীম সংখ্যক এবং হতবাক করে দেবার মত জীবনের নানা জটিল রুপগুলো। যে শ্রদ্ধা  আমার মধ্যে এটি জাগিয়ে  তুলেছিল, সেটির তুলনায়, মানুষ  ধর্মীয় অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গে যে শ্রদ্ধার কথা বলে,স্পষ্টতই তা হাস্যকর মনে হয়েছিল। কোন অজ্ঞতাপুর্ণ বিস্ময়কে গ্রহন করার চেয়ে, কোন কিছু অনুধাবন করার বিস্ময়  গ্রহন করতে আমি সদা প্রস্তুত [৪]।

যে বিস্ময়কর সহজ সরল ধারনাটির কথা ডগলাস বলছিলেন, তা অবশ্যই, আমার কোন বিষয় না। সেটি ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচানের মাধ্যমে বিবর্তন তত্ত্ব  – সেই চুড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সচেতনতা বৃদ্ধিকারক । ডগলাস, তোমার অনুপস্থিতি ভীষনভাবে অনুভব করছি, তুমি ছিলে আমার সবচেয়ে বুদ্ধিমান, কৌতুকময়, সবচেয়ে খোলা মনের, তীক্ষ মেধার, সবচেয়ে বড় এবং সম্ভবত সাত্র একজন রুপান্তরিত অবিশ্বাসী। আমি আশা করছি এই বইটা তোমাবে হাসাবে, অবশ্য তুমি যতটা আমাকে হাসিয়েছ ততটা নয় ।

বিজ্ঞানমনষ্ক দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেট উল্লেখ করেছিলেন, বিবর্তন আমাদের অন্যতম একটি প্রাচীন ধারনাকে বিরোধিতা করে: ‘সে ধারনাটি হলো, অপেক্ষাকৃত ছোট কোন কিছু সৃষ্টি করতে কোন বড় বিশাল বুদ্ধিমান কিছুর প্রয়োজন হয়, আমি একে বলবো ‘ট্রিকল ডাউন থিওরী অব ক্রিয়েশন’ বা চুইয়ে পড়া সৃষ্টিবাদের তত্ত্ব। আপনারা কখনোই দেখবেন না যে একটা বর্শ‍া আরেক বর্শাকে তৈরী করছে, কিংবা কোন হর্স শু কে দেখবেন আস্ত কামারকে সে বানাচ্ছে বা কোন পাত্র বানাচ্ছে কুমারকে’[৫] ; ডারউইনের একটি কার্যকরী প্রক্রিয়ার আবিষ্কার ঠিক সেই প্রচলিত ইনটুইশন বা আমাদের অর্ন্তদৃষ্টি নির্ভর ধারনার বীপরিত কাজটাই করেছিল, সেকারনেই মানুষের চিন্তার ক্ষেত্রে তার  অবদান এত বেশী বৈপ্লবিক এবং সচেতনতার স্তর বাড়ানোয় অনেক বেশী ক্ষমতাপুষ্ট।

খুব বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, কত বেশী প্রয়োজন এই সচেতনতা বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি, এমনকি জীববিজ্ঞান ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে অসাধারন বিজ্ঞানীদের চিন্তার ক্ষেত্রেও। ফ্রেড হয়েল একজন দুর্দান্ত মেধাবী পদার্থবিজ্ঞানী এবং কসমোলজিষ্ট কিন্তু তার বোয়িং ৭৪৭ এর ভুল অনুধাবন, এছাড়া জীববিজ্ঞানে তার করা আরো কিছু ভুল যেমন, আর্কিওপটেরিক্স এর জীবাশ্মকে ভেলকিবাজী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা স্পষ্টতই ইঙ্গিত দিচ্ছে,  সচেতনার স্তর বাড়ানোর জন্য বেশ ভালোভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের জগত সম্বন্ধে একটি ধারনার তার একান্ত প্রয়োজন ছিল । আমি মনে করি, একটা বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে তিনি প্রাকৃতিক নির্বাচনকে বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু আসলে প্রাকৃতিক নির্বাচনের নির্যাসের মধ্যে ঢুকে বিষয়টিকে বুঝতে হবে, পুরোপুরি অবগাহন করতে হবে, এর মধ্যে সাতার কাটতে হবে, তারপর এর আসল শক্তি সম্বন্ধে একটি স্পষ্ট ধারনা হবে।

অন্য বিজ্ঞানও আমাদের সচেতনার স্তরকে উন্নীত করে ভিন্ন ভিন্ন ‍উপায়ে। ফ্রেড হয়েল এর নিজের জ্যোর্তিবিজ্ঞানের বিজ্ঞান আমাদের অবস্থান নিশ্চিৎ করেছে এই মহাবিশ্বে, রুপকার্থে এবং আক্ষরিকার্থে, আমাদের দম্ভর আকৃতিকে হ্রাস করে একে বসিয়ে দিয়েছে  খুবই ছোট একটা মঞ্চে যেখানে আমরা আমাদের জীবনের নাটক করে যাচ্ছি  – মহাজাগতিক বিস্ফোরনের আমাদের একটি ক্ষুদ্র ধ্বংশাবশেষে। ভুতত্ত্ববিদ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোন একক প্রানী এবং প্রজাতি হিসাবে আমাদের অস্তিত্বকালের ব্যাপ্তি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। বিষয়টি জন রাসকিন এর সচেতনাকে বৃদ্ধি করেছিল  এবং উদ্বুদ্ধ করেছিল তার স্মরনীয় হৃদয়গ্রাহী ১৮৫১ সালের উদ্ধৃতিটিকে :‘ যদি এই ভুতত্ববিদরা আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিত। আমি ভালোই করতে পারতাম, কিন্তু ঐসব ভয়াবহ হাতুড়ী, বাইবেলের প্রতিটি অনুচ্ছেদের ছন্দের শেষে আমি তাদের শব্দ শুনি’ ; বিবর্তনও ঠিক সেই  একই কাজ করে  সময় সংক্রান্ত আমাদের ধারনার সাথে। ব্যাপারটা বিস্ময়কর না, যেহেতু এটি ভুতাত্ত্বিক সময়ের মাপকাঠিতেই তার কাজ করে।  কিন্তু ডারউইনীয় বিবর্তন, বিশেষ করে প্রাকৃতিক নির্বাচন আরো বেশী কিছু করে। এটি ডিজাইন বা পরিকল্পনার মায়াকে চুর্ণবিচুর্ণ করে দিয়েছে জীববিজ্ঞানের পুরো সীমানায়  এবং আমাদের শিখিয়েছে যে পদার্থবিদ্যা বা কসমোলজী বিষয়েও  যে কোন ধরনের ডিজাইন বা পরিকল্পনার হাইপোথিসিসকে সন্দেহের চোখে দেখতে। আমি মনে করি পদার্থবিদ লিওনার্ড সাসকিন্ড এই কথাগুলো ভেবেই লিখেছিলেন:  ’ ইতিহাসবিদ নই, তবে আমি আমার একটি মতামত দেবো, আধুনিক কসমোলজীর যাত্রার আসল সুচনা হয়েছিল ডারউইন এবং ওয়ালেসের মাধ্যমে। তাদের মত করে আগে কেউই, আমাদের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দিতে পারেনি, যেখানে পুরোপুরিভাবে অতিপ্রাকৃত কোন শক্তি বা এজেন্টদের উপস্থিতিকে অস্বীকার করা হয়েছে। ডারউইন এবং ওয়ালেস শুধুমাত্র জীববিজ্ঞানের জন্যই একটি মানদন্ড দিয়ে যান নি, কসমোলজির জন্য তা দিয়ে গেছেন’[৬]; অন্যান্য ভৌত বিজ্ঞানীদের মধ্যে যাদের এ ধরনের কোন সচেতনতার স্তর বৃদ্ধির কোন প্রয়োজন নেই তাদের অন্যতম ভিক্টর স্টেঙ্গার, যার বই Has Sciece Found God? ( বা বিজ্ঞান কি ঈশ্বরকে খুজে পেয়েছে?) ( এর উত্তর হচ্ছে না), আমি সবাইকে পড়ার জন্য উৎসাহিত করছি এবং পিটার অ্যাটকিন্স, যার Creation revisited ( বা ফিরে দেখা সৃষ্টিতত্ত্ব) যা আমার সবচেয়ে প্রিয় বৈজ্ঞানিক কাব্যিক গদ্য।

আমি সারাক্ষনই সেই সব ঈশ্বরবাদীদের দেখে অবাক হই, আমি যেভাবে প্রস্তাব করেছি, সেভাবে তাদের সচেতনতার স্তর বৃদ্ধি করার বদলে, তারা বরং আনন্দিত  এই ভেবে যে  প্রাকৃতিক নির্বাচন হচ্ছে ’ তার সৃষ্টিকে এই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঈশ্বরের একটি পন্থা’; তাদের দৃষ্টিতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন হচ্ছে, খুবই সহজ এবং চমৎকার একটি উপায় পৃথিবী ভরা বিভিন্ন জীবের সমারোহ সৃষ্টিতে। ঈশ্বরের কিছুই করা লাগবে না ! পিটার অ্যাটকিন্স, তার কিছুক্ষন আগে উল্লেখ করা বইটি ঠিক এই চিন্তা সুত্রটি নিয়ে শুরু করে একটি যুক্তিগ্রাহ্য ঈশ্বরহীন উপসংহারে উপনীত হয়েছিলেন, যখন তিনি প্রস্তাব করেন, একজন কল্পিত অলস ঈশ্বর যিনি চেষ্টা করেছেন যত সহজে কম কষ্টে  জীবনের উপস্থিতি সহ একটি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা যায়। অ্যাটকিনস এর অলস ঈশ্বর অষ্টাদশ শতাব্দীর এনলাইটেন্টমেন্ট বা নকজাগরনের  যুগের দেইস্ট বা  একাত্মবাদীদের ঈশ্বরের তুলনায় আরো বেশী অলস: deus otosius –  আক্ষরিক অর্থে বিশ্রামরত ঈশ্বর, ব্যস্ততাহীন, কর্মহীন, অপ্রয়োজনীয়, বাড়তি। ধীরে ধীরে অ্যাটকিন্স অলস ঈশ্বরের করনীয় কাজকে এমন একটা পর্যায়ে কমিয়ে আনতে সফল হন, যে পরিশেষে দেখা যায়, তার আসলেই কোন কাজ নেই ; সেক্ষেত্রে  বরং তার কোন অস্তিত্ব থাকারই কি বা  দরকার । আমি আমার স্মৃতিতে স্পষ্ট শুনতে পাই উডি অ্যালেনএর গভীর অনুধ্যানের সেই বিলাপ: ‘ অবশেষে যদি দেখা যায়, আসলেই কোন ঈশ্বর আছেন, আমি মনে করি না তিনি খুব অশুভ একটি চরিত্র, কিন্তু সবচেয়ে খারাপ যেটা আপনি তার সম্বন্ধে বলতে পারেন তা হলো, আসলে তার যতটুকু অর্জন করার কথা ছিল, সেটা করতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন’।

ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি (Irreducible complexity) বা অবিভাজ্য জটিলতা

বড় মাপের একটি  সমস্যা , যা  আসলেই অতিরন্জ্ঞন করা প্রায় অসম্ভব, তার  সমাধানই করেছিলেন ডারউইন এবং ওয়ালেস । আমি অ্যানাটমি, কোষের গঠন, প্রাণরসায়ন এবং আক্ষরিক অর্থে যে কোন জীবিত প্রানীর আচরন থেকে আমি উদহারন দিতে পারি,   তবে সৃষ্টিবাদী লেখকরা আপাতদৃষ্টিতে ডিজাইন বা পরিকল্পনার সবচেয়ে চমৎকার কীর্তি হিসাবে যেসব সাফল্যগুলো বেছে নেয়া নিয়েছে (এবং অবশ্যই সুস্পষ্ট কারনে) এবং খানিকটা হালকা আইরনির মাধ্যমে আমিও আমারগুলো ‍খুজে পেয়েছি সৃষ্টিবাদীদের একটি বই থেকে, যার নাম: Life – How Did It Get Here ( বা  জীবন- কেমন করে এটি এখানে এল) ;  কোন নাম নেই লেখকের তবে বইটি প্রকাশ করেছে দি ওয়াচটাওয়ার বাইবেল এবং ট্র্যাক্ট সোসাইটি, মোট ১৬ টি ভাষায়, প্রায় ১১ মিলিয়ন কপি,  এবং স্পষ্টতই বেশ জনপ্রিয়, কারনএই এগারো মিলিয়ন কপির  কমপক্ষে ছয়টি আমাকে অযাচিত উপহার হিসাবে প্রেরণ করছেন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে শুভাকাঙ্খীরা।


ছবি: পরিফেরা পর্বের একটি স্পন্জ Euplectella aspergillum (Venus’ Flower Basket) ;


ছবি: Euplectella aspergillum (Venus’ Flower Basket)  এর স্কেলিটন।

এই বেনামী লেখকের বিপুল সংখ্যক সংখ্যায় প্রকাশিত এবং ব্যাপক প্রচারিত এই বইটির যে কোন পৃষ্ঠা এলোমেলোভাবে উল্টালেই, আমরা খুজে পাই একটি স্পন্জ (Sponge), যার আরেক নাম ‘ভেনাস ফ্লাওয়ার বাস্কেট (Euplectella), এর সাথে আবার, যার তার , খোদ স্যার ডেভিড অ্যাটেনবুরোর উদ্ধৃতি যোগ করা হয়েছে: ‘আপনি যখন স্পন্জদের জটিল কংকালের দিকে নজর দেন, যেমন যেগুলো তৈরী সিলিকার স্পিকিউল বা সুচের মত সরু কনা দিয়ে, যা ভেনাস ফ্লাওয়ার বাস্কেট নামে পরিচিত, কল্পনাও হতবাক হয়ে যায়। কেমন করে  প্রায় স্বাধীন আনুবীক্ষনীক এক গুচ্ছ কোষ একে অপরের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ কাচের (সিলিকা) কাঠামো বা স্প্লিন্টার নি:সরণ করে এবং এরকম একটি জটিল ও সুন্দর জাফরি বা ল্যাটিস তৈরী করেছে? আমরা জানিনা’ ; ওয়াচটাওয়ারের লেখকরা এখানে তাদের তীর্যক মন্তব্য জুড়ে দিতে কালক্ষেপন করেননি: কিন্তু আমরা একটা জিনিস জানি, ’চান্স বা আপতন খুব সম্ভবত এর ডিজাইনার না’; এই একটা বিষয়ে আমরা সবাই একমত হতে পারি। এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি ঘটার পরিসংখ্যানগত অসম্ভাব্যতা যেমন  ইউপ্লেকটেলার (Euplectella) কংকাল হচ্ছে সেই কেন্দ্রীয় সমস্যাটির উদাহারন,  জীবনের যে কোন তত্ত্বকে সেটার সমাধান করতে হবে; আর যত বেশী পরিসংখ্যানগত অসম্ভাব্যতা থাকবে, এর সমাধান হিসাবে চান্স বা আপতন ততই তা ব্যাখ্যা করতে ব্যার্থ হবে: অসম্ভাব্যতার অর্থ বলতে সেটাই বোঝায়। কিন্তু অসম্ভাব্যতার এই ধাধার সম্ভাব্য সমাধান দুটি কিন্তু ডিজাইন এবং চান্স না, যা ভুলভাবেই দাবী করা হয়ে থাকে, বরং  তারা হলো ডিজাইন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন। চান্স অবশ্যই কোন সমাধান নয় যখন উচু মাপের অসম্ভাব্যতা আমরা দেখি জীবিত প্রানীদের মধ্যে। কোন সুস্থ জীববিজ্ঞানী কখনো এটা প্রস্তাব করেননি সমাধান হিসাবে, ডিজাইনও আসল সমাধান নয়, কেন নয় আমরা পরেই দেখবো। কিন্তু  আপাতত আমি, জীবন সংক্রান্ত যে কোন থিওরীর বা তত্ত্বে সে সমস্যার সমাধান করতে হবে, চান্স থেকে কিভাবে পালানো যেতে পারে -সেই সমস্যাটা নিয়ে আলোচনাঅব্যাহত রাখতে চাচ্ছি।


ছবি: ডাচম্যানস পাইপ (Dutchman’s pipe: Aristolochia trilobata)

ওয়াচটাওয়ারের পাতা উল্টাতে গিয়ে আমরা আরো একটা দারুণ গাছ সম্বন্ধে জানতে পারি, যা পরিচিত ডাচম্যানস পাইপ ( Aristolochia trilobata) নামে। এর প্রতিটি অংশ দেখে মনে হয়, সুক্ষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে পোকামাকড় আকর্ষন করার জন্য, যাদের আকৃষ্ট করে ধরার পর তাদের গায়ে রেণূ মাখিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় অন্য ডাচম্যানস পাইপ ফুলের পরাগায়নের জন্য। ফুলটির  অসাধারন সুক্ষ্ম জটিলতা ওয়াচটাওয়ারের লেখকদের বেশ আন্দোলিত করেছে একটি প্রশ্ন করতে : এসব কি ঘটেছে চান্স বা আপতনের মাধ্যমে? নাকি, এটা ঘটেছে কোন বুদ্ধিমান সত্ত্বার ডিজাইন (Intelligent design) বা পরিকল্পনা মাধ্যমে? আরো একবার আমি পুনরাবৃত্তি করছি, অবশ্যই চান্সের মাধ্যমে এটা ঘটেনি। এবং আবারো, ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন চান্সের কোন সঠিক বিকল্প না। প্রাকৃতিক নির্বাচন শুধুমাত্র যে একটা বাহুল্যবর্জিত তাই নয়, একটি ব্যাখ্যা উপযোগী এবং অসাধারন সুন্দর একটি সমাধান; এটি একমাত্র কর্মক্ষম প্রক্রিয়া, যা চান্সের বিকল্প  হিসাবে প্রস্তাব করা হয়েছে।  শুধু একমাত্র কর্মক্ষম বিকল্প চান্সের যা প্রস্তাব করা হয়েছে। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনও চান্সের মতই একই সমস্যার মুখোমুখি;  কোনভাবেই এটি পরিসংখ্যানগত অসম্ভাব্যতার ধাধার ব্যাখ্যা দেবার মত সমাধান নয়। যত বেশী অসম্ভাব্যতা তত বেশী ব্যাখ্যার অযোগ্য হতে থাকে ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন। স্পষ্টভাবে দেখলে, ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন সমস্যাটিকে দ্বিগুনে রুপান্তরিত করে। আরো একবার, এর কারন ডিজাইনার নিজে  (Himself/Herself/itself) তাৎক্ষনিকভাবে  তার নিজের উৎপত্তি কিভাবে হলো, সেই বৃহত্তর সমস্যাটা তৈরী করে। যে কোন একটি বুদ্ধিমান সত্ত্বা, যার কিনা ডাচম্যানস পাইপের ( বা মহাবিশ্ব) মত কোন অসম্ভাব্য কিছু পরিকল্পনা করার ক্ষমতা আছে, তাহলে সেই সত্ত্বাটি নিজেই ডাচম্যানস পাইপের তুলনায় আরো বেশী অসম্ভাব্য হবে। এই ভয়ঙ্কর পশ্চাৎমুখী ক্রমান্বয়ে পুর্ববর্তী কারনে ফিরে যাবার রিগ্রেস প্রক্রিয়াকে থামানোর বদলে, ঈশ্বর এটি উস্কে দেন আরো তীব্র প্রতিহিংসায়।


ছবি:  জায়ান্ট সেকোয়াইয়া ট্রি (Sequoiadendron giganteum : giant sequoia, giant redwood) (উইকিপেডিয়া)

ওয়াচটাওয়ারের আরেকটা পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখুন, জায়ান্ট রেড উড ( Sequoiadendron giganteum) সম্বন্ধে প্রানবন্ত একটা বিবরন পাওয়া যাবে। এই গাছটার প্রতি আমার একটা বাড়তি দুর্বলতা আছে কারন আমার বাগানে এই গাছটি আছে – অবশ্য সেটি শুধু শিশুমাত্র, বড়জোর এক শতাব্দী বয়স হবে, কিন্তু তারপরও এটি এই এলাকায় সবচেয়ে দীর্ঘতম গাছ। ‘একজন সামান্য মানুষ, সেকোইয়ার  নীচে দাড়িয়ে উপরের দিকে তাকালে নীরব বিস্ময়ে অভিভুত হয় এর সুবিশাল  বিশালত্ব দেখে; একমাত্র সুপরিকল্পিত ডিজাইন ছাড়া অন্য আর কোন বিশ্বাস কি অর্থবহ হতে পারে, এই রাজকীয় দানবাকৃতির বৃক্ষ এবং এর ছোট বীজের ক্ষেত্রে, যা এর আকৃতি ধারন করে’; আবারো, আপনি যদি মনে করেন ডিজাইন এর একমাত্র বিকল্প হচ্ছে চান্স, তাহলে না, এটি কোন অর্থ বহন করেনা। কিন্তু এখানে লেখকরা সত্যিকারের বিকল্প ব্যাখ্যাটিকে উহ্য রেখেছেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন, হয় এর কারন, তারা সত্যি সত্যি এটি বোঝেন না বা তারা সেটা চান না।

যে প্রক্রিয়ায় কোন  উদ্ভিদ, তা সে ছোট পিম্পারনেল বা সুবিশাল ওয়েলিংটোনিয়া হোক না কেন, তাদের তৈরী করা জন্য শক্তি  তৈরী করে, তা হলো সালোক সংশ্লেষন। ওয়াচটাওয়ার আবারো: `প্রায় ৭০ টি পৃথক রাসায়নিক বিক্রিয়া আছে সালোক সংশ্লেষন প্রক্রিয়ায়, একজন জীববিজ্ঞানীর ভাষায়, ’সত্যিকারের অলৌকিক একটি ঘটনা’;সবুজ গাছদের বলা হয় প্রকৃতির ফ্যাক্টরী – সুন্দর শান্ত দুষনহীণ, অক্সিজেন উৎপাদনকারী, পানি চক্রকে গতিশীল রাখা, সারা পৃথিবীর খাদ্যের যোগান দেয়া। তাদের কি আসলেই ‍উদ্ভব হয়েছে চান্সের মাধ্যমে? সত্যিই কি কথাটা বিশ্বাসযোগ্য’? না, অবশ্যই তা বিশ্বাসযোগ্য না। কিন্তু বার বার নানা উদহারনের পুনরাবৃত্তি করে কোন আলোচনাই আসলে সামনে আগায় না। সৃষ্টিবাদী ‘যুক্তি’  সবসময়ই  একই। কিছু প্রাকৃতিক ঘটনা পরিসংখ্যানগত দিক থেকে আসলে অসম্ভাব্য, অনেক জটিল, অনেক সুন্দর, অনেক বেশী বিস্ময়কর, শুধু মাত্র চান্সের মাধ্যমে তাদের সৃষ্টি হবার জন্য। চান্সের একমাত্র বিকল্প ডিজাইনকে শুধু এই লেখকরা কল্পনা করতে পারেন। সুতরাং একজন ডিজাইনার বা পরিকল্পনাকারী নিশ্চয়ই এসব করেছেন। এই ভ্রান্ত যুক্তির প্রতি বিজ্ঞানের উত্তরও সবসময় এক। চান্সের এর একমাত্র বিকল্প ডিজাইন নয়। এর চেয়ে উত্তম বিকল্পটি হলো প্রাকৃতিক নির্বাচন।  ডিজাইন আসলেই সত্যিকারের কোন বিকল্প না, কারন এটি যে সমস্যার সমাধান করছে, তার চেয়ে আরো বড় একটি সমস্যারও সৃষ্টি করছে: ডিজাইনারকে কে ডিজাইন করেছে? চান্স  এবং ডিজাইন দুটোই ব্যার্থ  পরিসংখ্যানগত অসম্ভাব্যতাকে ব্যাখ্যা করতে। কারন, একটি হচ্ছে সমস্যা  এবং আরেকটি প্রথম সমস্যার দিকে ক্রমান্বয়ে পশ্চাৎমুখী পুর্ব ধারনায়  ফিরে যাবার নিরন্তর প্রক্রিয়া। প্রাকৃতিক নির্বাচনই হচ্ছে সত্যিকারের সমাধান। এখন পর্যন্ত প্রস্তাবিত সমাধানগুলোর মধ্যে এটি একমাত্র পরীক্ষা করা সম্ভব এমন কার্যকরী একটি সমাধান। শুধুমাত্র কর্মক্ষম সমাধানই নয়, বিস্ময়কর সুন্দর এবং শক্তিশালী একটি সমাধান।

তাহলে কোন বিষয়টি প্রাকৃতিক নির্বাচনকে সফল করেছে এই অসম্ভাব্যতার সমস্যার সফল সমাধান হিসাবে, যেখানে চান্স এবং ডিজাইন দুটোই ব্যার্থ একেবারে শুরুতে। উত্তর হচ্ছে, প্রাকৃতিক নির্বাচন হচ্ছে একটি একটি কুমুলেটিভ বা ক্রমবর্ধমান একটি প্রক্রিয়া, যা অসম্ভাব্যতার সমস্যাটিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে ফেলে। প্রতিটি ছোট টুকরো কিছুটা অসম্ভাব্য হতে পারে, তবে চুড়ান্তভাবে অসম্ভব নয়। যখন অনেক সংখ্যক এই খানিকটা অসম্ভব ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে একের পর এক যখন সজ্জিত হয়, এই সমষ্টিগত ক্রম উত্তরনের শেষ প্রোডাক্টটি আসলেই খুবই বেশী অসম্ভাব্য মনে হতে পারে; চান্সের সীমানার বাইরে সেই অসম্ভাব্যতা। এই সব চুড়ান্ত রুপগুলো সৃষ্টিবাদীর ক্লান্তিকর বহুব্যবহৃত যুক্তির বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একজন সৃষ্টিবাদী মুল বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, কারন এই ব্যাক্তিটি বা He ( আমি পুরুষবাচক সর্বনাম ব্যবহার করছি, অন্তত এখানে মহিলারা সর্বনাম দ্বারা নিজেদের বঞ্চিত হবার জন্য কিছু মনে করবেন না) বার বার জোর করছেন পরিসংখ্যানগত অসম্ভব ব্যাপারটার সৃষ্টিকে একটি একক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে,তিনি ক্রমান্বয়ে পুন্জীভুত হবার বা অ্যাকুমুলেশন এর শক্তি বোঝেন না।

আমি Climbing mount improbable  বইটিতে  একটি রুপক আকারে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলাম: পর্বতের একপাশটা একেবারে খাড়া,  সেদিক থেকে বেয়ে ওঠা অসম্ভব কিন্তু অন্য দিকে একটা ঢালু পাশ ধীরে ধীরে চুড়ায় গিয়ে মিশেছে। ধরা যাক এই চুড়ায় আছে জটিল কোন অঙ্গ, যেমন একটি চোখ বা ব্যাক্টেরিয়ার ফ্ল্যাজেলাকে চলনশক্তি দেয়া মটর। এখানে উদ্ভট ধারনাটা হচ্ছে এটা মনে করা যে, এই ধরনের জটিলতা পুর্ণ কোন অঙ্গ, যেন স্বত:স্ফুর্তভাবে স্বেচ্ছায় নিজেদের তৈরী করে ফেলে, যাকে তুলনা করা যায়  নীচ থেকে এক লাফে পাহাড়ের চুড়োয় উঠার মত। বিবর্তন ঠিক এর বীপরিত, পাহাড়ের খাড়া দিক ফেলে এর অন্যপাশের ঢালু দিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড় চুড়ায় ওঠে: সহজ! হালকা ঢাল বেয়ে পাহাড় চুড়ায় ওঠার মুলনীতি, একলাফে নীচ থেকে পাহাড় চুড়ায় ওঠার মুলনীতি থেকে অনেক বেশী সরল। যে কারো বিস্মিত হবার সম্ভাবনা থাকে, কেন একজন ডারউইনের এই দৃশ্যে আসতে এবং বিষয়টি আবিষ্কার করতে এত সময় লাগলো ।যখন তিনি কাজটা শেষ করেন, ততদিনে প্রায় তিন শতাব্দী পেরিয়ে গেছে নিউটনের অ্যানাস মিরাবিলিস বা চমৎকার বছরের, যদিও তার কীর্তি সুস্পষ্টভাবে ডারউইনের কীর্তির চেয়ে বেশ কঠিন ছিল।

চুড়ান্ত অসম্ভাব্যতার আরেকটি প্রিয় রুপক হচ্ছে ব্যাঙ্কের ভল্টের কম্বিনেশন লক। তাত্ত্বিকভাবে, একজন ব্যাঙ্ক ডাকাত ভাগ্যক্রমে সেই  সংখ্যাগুলো চান্সের এর মাধ্যমে পেতে পারেন. কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কের কম্বিনেশন লক যথেষ্ট সতর্কতার সাথে ডিজাইন করা হয় এর অসম্ভাব্যতাকে যথেষ্ট পরিমান বৃদ্ধি করার মাধ্যমে, প্রায় অসম্ভব ফ্রেড হয়েল এর বোয়িং ৭৪৭ এর মত। কিন্তু এর বদলে কল্পনা করুন একটি খানিকটা বাজে ভাবে ডিজাইন করা একটি কম্বিনেশন লক, যা ধীরে ধীরে তার গোপন সংখ্যাগুলো প্রকাশ করে, শিশুদের হান্ট দি স্লিপার (Hunt The Slipper) খেলার শুরুর অনুশীলনের মত [৭];  মনে করুন যখনই লকটি প্রত্যেকটি ডায়াল তাদের সঠিক সেটিং এ আসে দরজা খুব সামান্য একটু খোলে, এবং ভল্ট থেকে কিছু টাকা  গড়িয়ে পড়ে সেই ফাক দিয়ে, চোর এভাবেই খুব তাড়াতাড়ি তার মুল লক্ষ্যে পৌছে যায়।

সৃষ্টিবাদীরা যারা তাদের অবস্থানের স্বপক্ষে অসম্ভাব্যতা থেকে যুক্তি ব্যবহার করে তারা  সবসময় ধরে নেন জীববিজ্ঞানের অভিযোজন অনেকটা লটারীতে ’জ্যাকপট’ জেতা নয়তো কোনটাই না। এই হয় ‘জ্যাকপট নয়তো কোন কিছু না’, এই ভ্রান্ত ধারনাটির অন্য নাম ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি (IC); হয় একটি চোখ তার দেখার কাজ করবে নয়তো না, হয় পাখনা বা ডানা উড়তে সাহায্য করবে নয়তো না, কৌশলে ধারনা করে নেয়া হয়েছে এদের মধ্যবর্তী কোন উপযোগী অবস্থার অস্তিত্বই নেই। কিন্তু  তাদের এই ধারনা পুরোপুরি ভুল। এ ধরনের ইন্টারমিডিয়েট বা অন্তবর্তীকালীন প্রকৃতির অবস্থার উদহারন অসংখ্য – এবং ঠিক সেটাই কোন তত্ত্বে আমাদের আশাকরা উচিৎ। জীবনের কম্বিনেশন লক হচ্ছে, ‘খানিকটা গরম হওয়া, তারপর ঠান্ডা আবার গরম হওয়ার’ হান্ট দি স্লীপার খেলার সেই কৌশল বা ডিভাইস এর মত[৮]; আসল জীবন সেই অসম্ভাব্যতার  পর্বত চুড়ায় পৌছাতে  বেছে নেয় পর্বতের অপরদিকের সেই ঢালু পথ, অন্য দিকে সৃষ্টিবাদীরা অন্ধ তাদের সামনের পর্বতের উচু খাড়া  পিঠ ছাড়া।

ডারউইন তার অরিজিন অব স্পিসিস বইটি এর একটি পুরো অধ্যায় উৎসর্গ করেছিলেন ’পরিবর্তনের সাথে বংশক্রমাগমের তত্ত্বের সমস্যাগুলো’ সম্বন্ধে। পক্ষপাতহীন ভাবে বলা যায় এই সংক্ষিপ্ত অধ্যায়টি, আজ অবধি প্রস্তাব করা হয়েছে এমন সব প্রতিটি তথাকথিত সমস্যাই আগে থেকেই আশা করেছিল এবং এটি তা  খন্ডন করছে।সবচে বড় যে সমস্যাগুলো ছিল, ডারউইনের ’অতি নিখুত সুক্ষ্ম এবং জটিলতম অঙ্গগুলো’, যা কখনো কখনো ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করা হয় ইররিডিউসিবলী কমপ্লেক্স বা অভবিভাজ্যভাবে জটিল অঙ্গ হিসাবে। ডারউইন সুনির্দিষ্টভাবে চোখের কথা উল্লেখ করেছিলেন, বিশেষ চ্যালেন্জ্ঞ হিসাবে: ‘এটা মনে করা যে, বিভিন্ন দুরত্বে দেখার জন্য ফোকাস ঠিক করার চোখের ভিতর প্রবেশ করা আলোর পরিমান নিয়ন্ত্রন, আলোর এবং লেন্সের নানা  অসঙ্গতিগুলোকে খাপ খাইয়ে নিয়ে সংশোধন করার জন্য চোখের সব অননুকরনীয় নানা কৌশলগুলো, তারা সব তৈরী হতে পারে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, আমি দ্বিধাহীন ভাবে স্বীকার করে নিচ্ছি, মনে হতেই পারে, খুবই বড় মাত্রার কোন উদ্ভট ভাবনা’; সৃষ্টিবাদী তীব্র আনন্দের সাথে এই বাক্যটি উদ্ধৃতি দেয় বার বার। বলাবাহুল্য, তারা এর পরের কথাগুলো কখনোই উদ্ধৃতি দেয়না। অতি বিগলিত হয়ে ডারউইনের এধরনের অকপট স্বীকারোক্তি আসলে উপস্থাপনার একটি  কৌশল  ছিল মাত্র। তিনি এই কথা দিয়ে তার বিরোধীদের তার  দিকে টেনে নিচ্ছিলেন, কারন তিনি চাচ্ছিলেন যখন আসল কথাটা বলবেন, তখন যেন কথাগুলো ঠিক জায়গামত আঘাত করে। এই আঘাতটা অবশই, ডারউইনের অনায়াসে দেয়া সেই ব্যাখ্যা কিভাবে ধীরে ধীরে ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে চোখের বিবর্তন ঘটে। ডারউইন হয়তো ’ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি’ বা অবিভাজ্য জটিলতা কিংবা ’ধীরে ধাপে ধাপে ধাপে  অসম্ভাব্যতার চুড়ায় ওঠা’ এসব বাক্যগুলো ব্যবহার করেননি, কিন্তু তিনি স্পষ্টতই দুটোর মুলনীতি বুঝেছিলেন।

’অর্ধেকটা চোখের কি উপকার আছে?’ এবং ’অর্ধেকটা পাখনারই বা কি উপকার আছে?’ এই দুই ক্ষেত্রেই যুক্তিটা এসেছে  ’ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি’ থেকে। স্বয়ংসম্পুর্ণভাবে কাজ করতে পারে এমন কোন একটি একক কিছুকে কোন কিছুকে ’ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্স’ বলা হয় তখনই, যখন এর কোন একটি অংশ যদি অপসারন করা হয়, তখন আর এটি কাজ করতে পারেনা [৯]; চোখ এবং পাখার ক্ষেত্রে,ধারনা করে আসা হয়েছে এই ব্যাপারটা স্বপ্রমানিত। কিন্তু যখনই আপনি এই ধারনাটি নিয়ে কয়েক মুহুর্ত ভাববেন, আপনি সাথে সাথে এর ভুলটা বুঝতে পারবেন। চোখে ছানি বা ক্যাটারাক্ট হবার পর সেই লেন্সটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সরানোর পরে চশমা ছাড়া কেউই স্পষ্ট করে কিছু দেখতে পারেন না। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তাদের যে দৃষ্টি ক্ষমতা থাকে সেটি তাদের কোন গাছের সাথে ধাক্কা খাওয়া বা পাহাড়ের খাদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়া থেকে কিন্তু রক্ষা করতে পারে। অর্ধেকটা ডানা অবশ্যই কোন ডানা না থেকে উপকারী। অর্ধেকটা ডানা কিন্তু কারো জীবন বাচাতে পারে , একটি নির্দিষ্ট পরিমান উচু কোন গাছ থেকে তার নিচে পড়াটা খানিকটা মসৃন করে। প্রায় ৫১ শতকারা পাখা আরো খানিকটা উচু থেকে পড়াটা সহজ করবে, যে পরিমান পাখাই আপনার থাকুক না কেন, সেই অনুযায়ী কোন একটি উচ্চতা থেকে পড়ার সময় সেটা কাজে দেবে, যেখানে তার চেয়ে ছোট কোন আংশিক পাখা কোন কাজে আসবে না। এই বিভিন্ন উচ্চতার  চিন্তার পরীক্ষাটি, যেখান থেকে কেউ পড়ে যেতে পারেন, হচ্ছে একটি উপায়ে বিষয়টি দেখা, যে তাত্ত্বিকভাবেই অবশ্যই ক্রমবর্ধমান সুবিধার একটি স্কেল আছে ,শতকরা ১ ভাগ ডানা থেকে পুরোপুরি শতকরা ১০০ ভাগ ডানার। বনে জঙ্গলে ভরা এ ধরনের গ্লাইডিং বা প্যারাশুট করে আংশিক উড়তে পারা প্রানীদের দিয়ে, যারা বাস্তবে অসম্ভবের সেই পর্বত চুড়ায় দিকে প্রতিটি ধাপের প্রতিনিধিত্ব করছে।

বিভিন্ন উচ্চতার গাছের সাথে তুলনা করলে কল্পনা করতে সহজ হবে, সেই পরিস্থিতিগুলো ভাবা যখন অর্ধেক (৫০%) চোখ কোন প্রানীর জীবন বাচাবে এমন কোন পরিস্থিতিতে যেখানে ৪৯% চোখ ব্যর্থ হবে। মসৃন একটি ক্রমবিন্যাস সৃষ্টি করা যদি হয় আলোর তীব্রতার মাত্রাকে পরিবর্তন করে,  কোন শিকারকে বা আপনাকে শিকার করবে এমন কোন শিকারীকে, যে দুরত্ব থেকে চোখে পড়তে পারে তার তারতম্য সৃষ্টি করার মাধ্যমে, পাখার মতই বা উড়ার উচ্চতার মত সম্ভাব্য নানা অন্তবর্তীকালীন অবস্থা কঠিন হবে না কল্পনা করা: এবং প্রানী জগতে তাদের সংখ্যার কোন কমতি নেই। কোন একটি ফ্ল্যাট ওয়ার্মের যে চোখ  আছে , যে কোন যুক্তিগ্রাহ্য হিসাবে, তা মানুষের চোখের অর্ধেক এরও কম। নটিলাস ( এবং হয়ত এর বিলুপ্ত আমোনাইট পরিবারের অন্যান্য জ্ঞাতি প্রানীরা, যারা প্যালেওজোয়িক এবং মেসোজোয়িক সাগরে প্রাধান্য বিস্তার করতো) তাদের একটা চোখ মানুষ এবং ফ্ল্যাটওয়ার্মের মাঝামাছি একটা অবস্থান হতে পারে। ফ্ল্যাট ওয়ার্মের চোখ, যা আলো এবং ছায়া শনাক্ত করতে পারে কিন্তু কোন ছবি নয়, তার থেকে আলাদা  নটিলাসের চোখ, পিনহোল ক্যামেরার মত যা আসল দৃশ্যর প্রতিচ্ছবি তৈরী করতে পারে।কিন্তু আমাদের চোখের তুলনায় যা ঝাপসা এবং অস্পষ্ট। এই ক্রমশ উন্নতিকে কোন সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করাটা মিথ্যা পরিমাপ হবে, তবে সুস্থ মনের কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না যে এই অমেরুদন্ডীদের চোখ এবং আরো অনেক ধরনের চোখ, অবশ্যই কোন চোখ না থাকার চেয়ে অনেক বেশী উত্তম। এবং এদের সবার অবস্থান অসম্ভাব্যতার চুড়ার দিকে একটি অবিচ্ছিন্ন, ক্রমশ উপরে উঠতে থাকা ঢালে। প্রায় চুড়ার কাছাকাছি আমাদের চোখ – অবশ্যই একেবারে চুড়ায় না তবে যথেষ্ট সুউচ্চে যার অবস্থান। আমি Climbing Mount Improbable বইটিতে একটি পুরো অধ্যায় আলাদা আলাদা করে ব্যাখ্যা করেছি চোখ এবং ডানা নিয়ে, দেখিয়েছি আসলে কত সহজ তাদের জন্য ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে বিবর্তিত হওয়া (বা এমনকি হয়তো অত বেশী ধীরেও না); এবং এখানে এ বিষয়ে বক্তব্য আর বেশী দীর্ঘায়িত করবো না।

সুতরাং আমরা দেখেছি যে, চোখ কিংবা পাখা, কোনটাই অবশ্যই ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্স বা অবিভাজ্যভাবে জটিল অঙ্গ না, কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ সেটা হলো : এই উদহারন থেকে আমরা সাধারন কোন শিক্ষাটা পাচ্ছি। এবং  বাস্তবতা হচ্ছে যে, কত বেশী মানুষ যে স্পষ্ট এই বিষয়টা সম্বন্ধে সম্পুর্ণ ভুল পোষন করেন, তা যেন আমাদের জন্য একটা সাবধান বানী হয় এর চেয়ে খানিকটা অস্পষ্ট অন্যান্য উদহারনগুলো বোঝার ক্ষেত্রে, যেমন কোষের বা প্রাণরাসায়নিক উদহারনগুলোর ক্ষেত্রে, যার দালালী করছেন ঐসব সৃষ্টিবাদীরা, যারা রাজনৈতিকভাবে ‍সুবিধাজনক সুভাষন শব্দ  ’ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন’ তাত্ত্বিকের আড়ালে এখন আশ্রয় নিয়েছেন।

একটি সতর্কমুলক কাহিনী আছে এখানে, যা আমাদের বলছে:  কোন কিছুকেই ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্স বা অবিভাজ্যভাবে জটিল বলে ঘোষনা দেবেন না; সম্ভাবনা আছে যে, আপনি আসলেই যথেষ্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এর খুটিনাটি বিষয়গুলো বিস্তারিত পর্যবেক্ষন করে দেখেননি, অন্যদিকে, আমরা যারা বিজ্ঞানের পক্ষে, আমাদেরও পুরোপুরি অন্ধ আত্মবিশ্বাসী হবারও অবশ্যই দরকার নেই, হয়তো প্রকৃতিতে এমন কিছু আছে যা তার সত্যিকারের ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্স বা অবিভাজ্য জটিলতার মাধ্যমে আসলেই  অসম্ভাব্যতার পর্বত চুড়ার দিকে মসৃন ক্রমউন্নতির ধারাবাহিকতাকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। সৃষ্টিবাদী ঠিকই বলেন, যদি সত্যিকারের ইররিডিসিউবল কমপ্লেক্সিটি স্পষ্টভাবে প্রমান করে তারা দেখাতে পারেন, এটি ডারউইনের তত্ত্বকে ভিত্তিহীন প্রমান করবে। ডারউইন নিজেও বলেছেন:  ’যদি প্রমান করে দেখানো সম্ভব হয় এমন কোন জটিল অঙ্গের অস্তিত্ব আছে, যা কোনভাবেই অসংখ্য, ধারাবাহিক, সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভব হওয়া  সম্ভব হয়নি, আমার তত্ত্বর ভিত্তি পুরোপুরিভাবে ভেঙ্গে পড়বে, কিন্তু আমি এমন কোন উদহারন পাইনি’; ডারউইন এমন কোন উদহারন পাননি, অনেক কষ্টকর, প্রায় মরিয়া হয়ে চেষ্টা করার পরও আর কেউই তা পাননি সেই ডারউইনের সময় থেকে;  ’সৃষ্টিবাদীদের এই ’হলি গ্রেইল’ হিসাবে অনেক উদহারনকে  অবিভাজ্য জটিলতার যোগ্য প্রার্থী হিসাবে প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু কোনটাই বিজ্ঞানীদের নীরিক্ষার সামনে টিকতে পারেনি।

যাই হোক না কেন,  যদি  সত্যিকারের ইররিডিউসিবলী কমপ্লেক্স বা অবিভাজ্যভাবে জটিল কোন কিছুর  উদহারন কখনোও খুজে পাওয়া যায়, সেটি ডারউইনের তত্ত্বকে ধ্বংশ করবে; তাহলে কার বলার উপায় আছে যে, এটি ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন তত্ত্বকে ধ্বংশ করতে পারবে না? আসলেই, এটি ইতিমধ্যেই ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন তত্ত্বকে ভিত্তিহীন প্রমান করেছে, কারন যা আমি বলে আসছি এবং বলতে থাকবো আবার, ঈশ্বর সম্বন্ধে আমরা যত সামান্যই জানিনা কেন, একটা ব্যাপারে আমরা নিশ্চিৎ, তাকে খুব, খু্ব বেশী মাত্রায় জটিল হতে হবে এবং অনুমেয়ভাবে ইররিডিউসিবল  বা অবিভাজ্যভাবেই জটিল।

(চলবে)

পাদটীকা _________________________________________________

[১] গামবিট (Gambit): A gambit (from ancient Italian gambetto, meaning tripping) is a chess opening in which a player, most often White, sacrifices material, usually a pawn, with the hope of achieving a resulting advantageous position

[২] An exhaustive review of the provenance, usages and quotations of this analogy is given, from a creationist point of view, by Gert Korthof, at http://home.wxs.nl/~gkorthof/kortho46a.htm.
[৩] ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনকে অনেক সময় নির্দয়ভাবে বলা হয় সস্তা সুট বা টাক্সেডো পরা সৃষ্টিবাদ (রিচার্ড ডকিন্স)।
[৪]Adams, D. (2003). The Salmon of Doubt. London: p. 99. My ‘Lament for Douglas’, written the day after his death, is reprinted as the Epilogue to The Salmon of  Doubt, and also in A Devil’s Chaplain, which also has my eulogy at his memorial meeting in the Church of St Martin-in-the-Fields.
[৫]Interview in Der Spiegel, 26 Dec. 2005.
[৬]Susskind, L. (2006). The Cosmic Landscape: String Theory and the Illusion of Intelligent Design. New York: Little, Brown. Susskind (2006: 17).
[৭]Hunt The Slipper: Bluffing game, All of the players but one sit in a circle with the feet drawn up and knees raised so that a slipper may be passed from hand to hand of each player under his knees. Where both boys and girls are playing it is desirable to have the girls alternate as much as possible with the boys as the slipper is more readily hidden under their skirts. The players pass the slipper or bean bag around the circle under the knees the object being on their part to evade the vigilance of the odd player who runs around on the outside of the circle trying to touch the person who holds the slipper. Many devices may be resorted to for deceiving the hunter such as appearing to pass the slipper when it is not in ones hands or holding it for quite a while as though the hands are idle although it is not considered good sport to do this for very long or often. The players will use every means of tantalizing the hunter for instance when he is at a safe distance they will hold the slipper up with a shout or even throw it to some other person in the circle or tap the floor with it. When the hunter succeeds in catching the player with the slipper he changes places with that player. When the circle of players is very large the odd player may take his place in the center instead of outside the circle.
[৮] Often, especially when there is only one seeker, the game is played using “hot or cold,” where the hider informs the seeker how near he is to the object, telling him he is cold when he is far from the object (or freezing or if he is extremely far off), and hot when he is extremely close to the object. If the seeker is moving farther from the object, he is told he is getting colder, and if the seeker is moving closer to the object, he is told he is getting warmer.
[৯] ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি (Irreducible Complexity) হচ্ছে  ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন তত্ত্বের প্রস্তাবকদের একটি যুক্তি যা বলছে, কোন কোন জীববিজ্ঞানীয় তন্ত্র এতবেশী সুক্ষ এবং জটিল যা কিনা কোন সরলতর বা অধিক অসম্পুর্ন কোন পুর্বসুরী থেকে বিবর্তিত হতে পারে না, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে, যে প্রক্রিয়াটি কিছু সুবিধাজনক প্রাকৃতিকভাবে ঘটিত ধারাবাহিক চান্স বা আপতনের মাধ্যমে ‍সৃষ্ট মিউটেশনেরর উপর কাজ করে। এই যুক্তিটি ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের কেন্দ্রীয় প্রস্তাবের একটি, এবং বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক সমাজে এটি প্রত্যাখ্যাত, সংখ্যাগরিষ্ট বিজ্ঞানীরা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনকে ছদ্মবিজ্ঞান হিসাবে মনে করেন। প্রানরসায়নবিজ্ঞানী মাইকেল বেহে এই ধারনাটির উদ্ভাবক, তিনি একে সংজ্ঞায়িত করেন, কোন একটি ইররিডিউসিবল কমপ্লেক্সিটি (Irreducible Complexity) সিস্টেম হচ্ছে এমন কোন একটি সিস্টেম যা তৈরী করে বেশ কিছু পারস্পরিক সুসামন্জষ্যপুর্ণ অংশদের সমন্বয়ে, পারস্পরিক ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়াশীল এই অংশগুলো প্রত্যেকেই মুল কিছু কাজের সাথে জড়িত, এবং এদের যে কোন একটিকে যদি সরিয়ে ফেলা হয় পুরো সিস্টেমটাই কার্যকরীভাবে কাজ করা স্থগিত করে দেয়। তবে বিবর্তন জীববিজ্ঞানী প্রমান করে দেখিয়েছেন, এ ধরনের কোন সিস্টেমও বিবর্তিত হতে পারে।

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

3 thoughts on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন: চতুর্থ অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

  1. mohshin habib বলেছেন:

    ইংল্যান্ড থেকে এক বন্ধু আমার জন্য ডকিন্সের দি গড ডেল্যুসন বইটি নিয়ে এল। কয়েক বছর আগের কথা। আমি গোগ্রাসে পড়লাম। এ নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলাম যা সাহিত্য পকত্রকা শালুকের কোনো এক বর্ষ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। দীর্ঘদিন আমার মনে হয়েছে বইটি অনুবাদ করা আমার একটি দায়িত্ব। সময় করে উঠতে পারছিলাম না পেটের দায়ে। ধর্মকারীতে প্রথম দেখতে পেলাম এই মহামুল্যবান গ্রন্থটির অনুবাদ। এখন বইটির বেশ ভাল অনুবাদ দেখে আনন্দ লাগে। অনেক অসাধারণ মেধাবী বাঙালি পাঠক আছেন যারা ইংরেজি ভাষায় পড়তে পারেন না। তাদের পক্ষ থেকে কাজী মাহবুব হোসেনকে আমার প্রানঢালা শুভেচ্ছ এবং কৃতজ্ঞতা। তিনি এক মহান দায়িত্ব পালন কররছেন। অভিনন্দন সমাজ নির্মানের সৈনিক কাজী মাহবুব হোসেনকে
    মহসীন হাবিব
    গল্পকার, নিবন্ধকার, অনুবাদক
    ঢাকা

    1. আপনাকে অনেক ধন্যবাদ চমৎকার মন্তব্যর জন্য । আরো অনেক বই অনুবাদের প্রয়োজন। আমি চাই অনুবাদের একটি গ্রুপ হোক।
      সবাই মিলে অনুবাদ করলে বেশ দ্রুত হত ‍অনেক কাজ । সে রকম কোন ইচ্ছা থাকলে আমাকে জানাবেন। আমি স্যাম হ্যারিসের বই এর অনুবাদের জন্য সহযোগী খুজছি।
      আমি বেশ কয়েকজনকে পিডিএফ পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তারা আর যোগাযোগ করেননি। ধন্যবাদ।

      1. ধর্মকারীর অনুবাদটি আমার চোথে পড়েনি,তবে মুক্তমনায় দি গড ডিল্যুশনের প্রথম অধ্যায়টির অনুবাদ পড়েছিলাম শ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড: অজয় রায় এর করা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s