বিদায় রে ব্র্যাডবুরি

You don’t have to burn books to destroy a culture. Just get people to stop reading them. Ray Bradbury

যারা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়তে ভালোবাসেন রে ব্র্যাডবুরির (Ray Douglas Bradbury ; August 22, 1920 – June 5, 2012) তাদের খুবই পরিচিত। গত ৫ জুন  ৯১ বছর বয়সে কল্পকাহিনীর এই অনন্য লেখক চিরবিদায় নিলেন । খবরটা আজ মিডিয়ায় এসেছে। রে ডগলাস ব্র্যাডবুরির সাথে আমার পরিচয় বেশী দিনের না।  তার সেরা সৃষ্টি Fahrenheit 451 এর মাধ্যমে তার সাথে প্রথম পরিচয়। তবে তার এই বইটির কাহিনী নিয়ে নির্মিত ফ্রাসোয়া ট্রুফোর চলচ্চিত্র  Fahrenheit 451 দেখেছিলাম মুল বইটি পড়ার আগে। ফারেনহাইট ৪৫১ ছাড়াও তার অসংখ্য সৃষ্টি আছে।

দি ফায়ারম্যান নামে এটি প্রথমে গল্প হিসাবে প্রকাশিত হয় গ্যালাক্সী সায়েন্স ফিকশন এর ফেব্রুয়ারী (১৯৫১) সংখ্যায়। এর দুবছর পরে আরো বড় আকারে ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় ফারেনহাইট ৪৫১;  ফারেনহাইট ৪৫১  আমাদের এক কল্পনার ভবিষ্যৎ আমেরিকার সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেয়, যেখানে বই পড়া নিষিদ্ধ, যে কোন লিখিত শব্দ যেখানে বেআইনি। আধা ঘন্টায় ১০ সেন্ট করে ভাড়া করা একটি টাইপরাইটারে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া লস এন্জেলেস এর পাওয়েল লাইব্রেরীর বেসমেন্টে বসে তিনি এই উপন্যাসটি শেষ করেন। ফ্যারেনহাইট ৪৫১ নামটির কারন হচ্ছে এই তাপমাত্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাগজে আগুন জ্বলে ওঠে ( autoignition temperature of paper.)।

খুব সংক্ষেপে ভবিষ্যতে ২৪ শতকের যুক্তরাষ্ট্রের পটভুমিতে ফারেনহাইট ৪৫১ একজন ফায়ারম্যান গী মনতাগ এর গল্প (  যে সময়ে ফায়ারম্যানরা আগুন নেভাতো না, আগুন জ্বালিয়ে বই পোড়াতো)। কাহিনীর শুরুতে আমরা একজন গী মনতাগ কে দেখি যে আপাত দৃষ্টিতে সুখী একজন মানুষ, যে তার পেশায় তৃপ্ত। ফায়ারম্যান হিসাবে তার কাজ হলো অবৈধভাবে সংগ্রহ করা বই তাদের সংগ্রহকারীদের বাসা তল্লাশী করে খুজে বের করে এর মালিকদের বাসা সহ বই পুড়িয়ে দেয়া। ভবিষ্যতের সেই সমাজে বই হলো বেআইনী নিষিদ্ধ একটি বস্তু,  রাষ্ট্রীয়ভাবেই কারো অধিকার নেই লিখিত কোন শব্দ পড়ার। মনতাগের জীবনে পরিবর্তন আসে যখন তার সাথে পরিচয় হয় তার প্রতিবেশী ক্ল্যারিস এর। ক্ল্যারিস তাকে তার জীবন নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখায়। গী মনতাগ প্রশ্ন করতে শুরু করে, তার পেশা, তার জীবন নিয়ে। সে জানতে কেন সমাজ বই কে এত ভয় পায়, কি আছে বই  এর মধ্যে? কিছু মানুষ কেন এভাবে বই এর জন্য নিজেদের জীবনের সবকিছু ত্যাগ করে। কি শক্তি আসলে আছে বই  এর মধ্যে। এই প্রশ্নের উত্তর খুজতেই মনতাগ একবার বই পোড়ানোর কাজের সময় লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু বই চুরি করে। বইগুলো ছিল একজন বৃদ্ধার, যে নিজেই তারগায়ে কেরেসিন ঢেলে আগুন জালিয়ে দেয়, মনতাগকে সেই দৃশ্য ভীষন নাড়া দেয়।মনতাগ বই এর জন্য এই বৃদ্ধার আত্মত্যাগ দেখে প্রশ্ন করে, তার জীবনে শুন্যতার উত্তর কি পাওয়া যাবে বই এ।ধীরে ধীরে মনতাগ বুঝতে পারে, গত দশ বছর একজন ফায়ারম্যান হিসাবে সে আসলে সমাজের কোন কাজেই আসেনি, বরং সে সমাজের নীপিড়নের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। মনতাগ সে রাতে অসুস্থ হয়ে পড়ে, পরদিন সে কাজে যায় না। মনতাগের ক্যাপ্টেন বীটি বুঝতে পারে মনতাগের অর্ন্তদ্বন্দটি এবং মনতাগের কাছে সম্ভবত কোন বই আছে।বীটি মনতাগকে বই মুক্ত বর্তমান সমাজের প্রশংসা করে বক্তৃতা দেয়। সে বলে পুরোনো সমাজে বই নানা মত, আর মুক্তচিন্তার জন্ম দিয়ে অশান্ত করে তুলেছিল দেখেই এই নতুন সমাজ, যেখানে সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত। মনতাগের বালিশের নীচ থেকে তার স্ত্রী মিলি বই খুজে পায়।মনতাগ প্রায় ২০ টি বই বের করে বীটি চলে যাবার পরে, বুঝতে পারেনা কোনটা আগে সে পড়বে। সে দেখা করে একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ফাবের এর সাথে, প্রথমে ভীত ফাবের তাকে ধীরে ধীরে সাহায্য করতে থাকে তার চিন্তার বিকাশে, তারা লুকিয়ে লুকিয়ে বই কপি করার ষড়যন্ত্র করে। মনতাগ তার জীবন, স্ত্রী এবং বন্ধুবান্ধব সবাই কে নিয়ে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে, কোন গভীর চিন্তা করতে না পারা এই মানুষগুলো সারাদিন টেলিভিশন দেখছে, গালগপ্পে মেতে আছে, স্বার্থপর মানুষের দলের মত সমাজ, আসন্ন পারমানবিক যুদ্ধ সব সম্বন্ধে উন্নাসিক নির্বিকার জীবন মনতাগের মনকে বিষিয়ে তোলে সমাজের উপর। ফাবের এর কথা না শুনে একবার মনতাগ তার স্ত্রীর ও তার বন্ধুদের সাথে পরিবার ও রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক করে। মনতাগ তাদের কবিতা আবৃত্তি করে শোনায়, মিলি ও তার বন্ধুরা আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাদের চোখের অশ্রুর কারন তার খুজে পায় না। মিলি মনতাগের নামে রিপোর্ট করে ফায়ার ম্যান অফিসে, ফায়ারম্যানরা তার ঘর পোড়াতে আসে।নিজের ঘর পোড়ানো হলে মনতাগের সাথে তার ক্যাপটেন এবং সহকর্মীদের সাথে তর্ক এবং হাতাহাতি হয়। এক পর্যায়ে মনতাগ বীটিকে হত্যা করে। নিজের বাগান থেকে বইগুলো উদ্ধার করে আহত মনতাগ পালায়। ফেরারী মনতাগকে সাহায্য করে ফাবের। মনতাগ তাড়া করে মেকানিকাল কুকুর। নিজের গন্ধ লুকিয়ে মনতাগ পালায়।পালানোর পথেই মনতাগের দেখা হয় একটি গ্রুপের সাথে, যে গ্রুপের সদস্য লেখক, শিক্ষক, পাদ্রী, যাদের নেতা গ্র্যানজার। মনতাগকে তিনি তার গ্রুপে স্বাগত জানান। গ্রানজার মনতাগকে জানায় তার ক্যাম্পের সবাই কোন না কোন সাহিত্য কর্ম মুখস্থ করে রেখেছে, ভবিষ্যতের কোন নিরাপদ সময় এলে তারা তাদের স্মৃতি থেকে বই গুলো প্রকাশ করবে। শেষে দেখা যায়, পুরো শহর পারমানবিক বোমায় বিধ্বস্থ হয়। এই মানুষগুলো আবার ফিরে আসে সেই সমাজ সৃষ্টি করতে যেখানে বই আর মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটবে।

আমার বিনম্র শ্রদ্ধা , বিদায় রে ব্র্যাডবুরী।

ফ্রাসোয়া ট্রুফো’র Fahrenheit 451

Ray Bradbury Talks Inspiration and Advice in a Fascinating 1963 Film

Advertisements
বিদায় রে ব্র্যাডবুরি

7 thoughts on “বিদায় রে ব্র্যাডবুরি

    1. আসমা সুলতানা মিতা একাই অনেক। অবশ্য তা আপনার হাসি মুখ দেখেও বোঝা যাচ্ছে। 😀
      শুভেচ্ছা।

  1. আমি লেখক ও তার লেখা সম্পর্কের জানতাম না। এর পেছনে স্বাভাবিক কারনও আছে, আপনি জানেন তা। ভাল লাগল লেখাটি পড়ে।
    রে ব্র্যাডবুরী প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
    শুভ কামনা।

  2. osomapthomeg বলেছেন:

    মানুষটা সম্পর্কে কম জানা আমার।
    এখন জানা হল।
    শ্রদ্ধা থাকলো।

    1. অনেক ধন্যবাদ ।
      ফারেনহাইট ৪৫১ সিনেমাটির একটি বাংলা সংস্করণ হলে মন্দ হত না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s