বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: দ্বিতীয় পর্ব

ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

ভুমিকা: মিলান কুন্দেরা’র ( Milan Kundera) উপন্যাস Nesnesitelná lehkost bytí এর চেক ভাষা থেকে মাইকেল হেনরী হাইম এর ইংরেজী অনুবাদ The Unbearable Lightness of Being এর বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা।
(প্রথম পর্ব)
_________________________________________________

 দ্বিতীয় পর্ব: আত্মা এবং শরীর
_______________

লেখকের পক্ষে পাঠকদের মনে বিশ্বাস জন্মানোর চেষ্ঠা সম্ভবত অর্থহীন হবে যে, তার চরিত্রগুলো আসলেই কোন একসময় জীবিত ছিল। কোন মাতৃগর্ভে জন্ম হয়নি তাদের, তাদের জন্ম হয়েছে একটি কিংবা দুটি উদ্দীপক বাক্য বা কোন একটি সাধারন মৌলিক পরিস্থিতি থেকে। টমাসের জন্ম হয়েছে ’আইনমাল ইস্ট কাইনমাল’ (Einmal ist keinmal’), এই প্রবাদ বাক্যটি থেকে।তেরেজার জন্ম হয়েছে একটি পেটের গুড়গুড় শব্দ থেকে।

প্রথম বারের মত যখন তেরেজা টমাসের ফ্ল্যাটে যায়,তার পেটের ভেতরে গুড়গুড় করে শব্দ শুরু হয়েছিল; আর এমন হওয়াটা আশ্চর্যের কিছু ছিল না, কারন সেই সকালের খাবারের পর সে আর কিছু খায়নি; ট্রেনে উঠে বসার আগে প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে শুধু একটা স্যান্ডউইচ খেয়েছিল । তার সমস্ত চিন্তা জুড়ে ছিল ভবিষ্যতের দিকে তার এই দু:সাহসী যাত্রার কথা, খাওয়ার কথা তার মনেই ছিল না। কিন্তু যখন আমরা আমাদের শরীরকে উপেক্ষা করি, খুব সহজেই আমরা তার শিকারে পরিণত হই। খুবই খারাপ লাগছিল তার, পেটের মধ্যে এই অস্বস্তিকর শব্দ নিয়ে টমাসের সামনে দাড়িয়ে থাকতে। মনে হচ্ছিল তখনই সে কেদে ফেলবে। সৌভাগ্যজনকভাবে, প্রথম দশ সেকেন্ড পরই টমাস তাকে আলিঙ্গন করে, এবং তেরেজাকে তার শরীরের গভীর থেকে আসা বিব্রতকর শব্দগুলোর কথা ভুলিয়ে দেয়।

সুতরাং তেরেজার জন্ম হয়েছে সেই পরিস্থিতিতে, যা খুব নিষ্ঠুরভাবে প্রকাশ করে শরীর এবং আত্মার অসমন্বয়যোগ্য দ্বৈততা, সেই মৌলিক মানবিক অভিজ্ঞতাটি।

বহুদিন আগে, মানুষ বিস্ময়ের সাথে তার বুকের ভিতর  ছন্দময় স্পন্দনের শব্দ শুনতে পেত, কখনো বুঝতে পারেনি শব্দগুলো আসলে কি। শরীরের মত অনাত্মীয় আর অচেনা একটি জিনিসের সাথে মানুষ পারেনি নিজেকে একাত্ম করে ভাবতে। শরীরটা ছিল যেন একটি খাচার মত, আর সেই খাচার ভিতরে ছিল কিছু একটা জিনিস,যা দেখতো, শুনতো, ভয় পেতো, ভাবতো এবং বিস্মিত হতো, সেই কিছু বিষয়টি হলো -যা রয়ে যায় শরীরের সব হিসাব নিকাশ শেষ হলে – আত্মা।

আজ অবশ্য, আমাদের শরীর আর অচেনা কিছু নয়: আমরা জানি আমাদের বুকের মধ্যে ছন্দময় স্পন্দন আসলে হৃদপিন্ড, নাক হচ্ছে একটা পাইপের মুখ যা শরীরের বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে,ফুসফুসে অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যাবার জন্য। আমাদের চেহারা আর কিছুই না, শুধু একটা ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেল, যা শরীরের নানা কর্মকান্ড কেমন চলছে তার জানান দেয়: পরিপাক,দৃষ্টি, শ্রবণ ক্ষমতা, শ্বাস, চিন্তা।

যেদিন থেকেই মানুষ তার শরীরের নানা অংশকে নাম দিতে শিখেছে, শরীর তাকে কম সমস্যায় ফেলেছে। মানুষ এটাও জেনেছে, আত্মা আসলে  তার মস্তিষ্কের কর্মরত গ্রে ম্যাটার ছাড়া আর কিছু না। শরীর এবং আত্মার প্রাচীন দ্বৈততা এখন ঢাকা পড়ে গেছে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এবং  হাসতেও পারি আমরা একে শুধুমাত্র সেকেলে একটি কুসংস্কার মনে করে।

কিন্তু শুধু প্রেমে পড়েছে এমন কাউকে তার পেটের গুড়গুড় শব্দ শোনানো হোক, আত্মা এবং শরীরের একাত্মতা, বিজ্ঞানের যুগে  সেই ক্যাব্যিক মায়াময়তা সাথে সাথেই ম্লান হয়ে যায়।

তেরেজা তার নিজেকে তার শরীর দিয়েই দেখার চেষ্টা করে। একারনেই, কৈশোর থেকেই সে বার বার আয়নার সামনে দাড়াতো, এবং যেহেতু তার ভয় ছিল তার মা এভাবে তার আয়নায় উকি মারাটা দেখে ফেলতে পারে, সেকারনেই প্রতিবার আয়নায় চোখ রাখার কাজটায় মিশ্রিত ছিল গোপনীয় কোন পাপ।

কোন অহংকার কিন্তু তাকে আয়নার সামনে টানেনি; তেরেজা তার নিজের ’আমিকে’ দেখারই তীব্র বিস্ময় আর আনন্দ ছিল মুখ্য। সে ভুলে যেত, সে শুধু তার শরীরের নানা যন্ত্রের ইন্সট্রুমেন্ট প্যানেলটির দিকে তাকিয়ে আছে মাত্র; সে ভাবতো তার মুখায়ববের মধ্য দিয়ে উজ্জ্বল আলো হয়ে বেরিয়ে আসা তার আত্মাকে যেন দেখছে। সে ভুলে যেত, নাক হচ্ছে সেই পাইপের মুখ যা অক্সিজেন নিয়ে যায় ফুসফুসে;সে দেখতো তার নিজস্ব প্রকৃতির নিখুত এবং সত্যিকারের প্রতিচ্ছবি।

অনেক দীর্ঘ সময় ধরেই আয়নায় নিজেকে দেখতো তেরেজা, মাঝে মাঝে বিচলিত হত সে, চেহারায় তার মায়ের বৈশিষ্টগুলো লক্ষ্য করে। সেই বৈশিষ্টগুলোকে সরিয়ে দেবার ইচ্ছায় এবং শুধু তার নিজের টুকু ধরে রাখার চেষ্টায় সে আরো বেশী গভীর মনোযোগ দিয়ে তার প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতো; আর যখনই সে সফল হতো,অদ্ভুত এক আনন্দের মত্ততা অনুভব করতো তেরেজা সেই সময়: তার শরীরের ভিতর থেকে উঠে আসতো তার আত্মা, যেমন করে কোন জাহাজের গভীর থেকে  বের হয়ে আসে নাবিকরা দল বেধে, ছড়িয়ে পরে ডেকের উপর, আকাশের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ায় আর বিজয়ের আনন্দ উল্লাসে গান গায়।

তেরেজার তার মায়ের মতই হয়েছিল, এবং সেটা শুধুমাত্র দেখতেই না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে, তেরেজার সমস্ত জীবনটাই হয়তো ছিল তার মায়ের জীবনের একটি ধারাবাহিকতা মাত্র; বিলিয়ার্ড টেবিলে কোন একটি বলের গতিপথ যেমন শুধুমাত্র একটি খেলোয়াড়ের বাহুর সুনির্দিষ্ট অবস্থান পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা, অনেকটাই সেরকম।

কোথায় এবং কখন এটি শুরু হয়েছিল, যে গতিময়তা একসময় রুপান্তরিত হয় তেরেজার জীবনে?

হয়তো সেই সময়ে,যখন তেরেজার নানা, প্রাহার একজন ব্যবসায়ী,তার কন্যা, তেরেজার মার সৌন্দর্য নিয়ে একটু বেশী মাত্রায় প্রশংসা করতে শুরু করেছিলেন সবাইকে শোনানোর জন্য।তখন তার বয়স তিন অথবা চার, তার বাবা হয়তো বলতেন তাকে তার চেহারা রাফায়েল এর ম্যাডোনার মত। তেরেজার চার বছর বয়সী মা বিষয়টি কোনদিনও ভুলতে পারেনি।কৈশোরে স্কুলে তার ডেস্কে বসে সে শিক্ষকদের কোন কথাই শুনতো না; বরং সে ভাবতো কোন চিত্রকর্মের মত দেখতে তার চেহারা।

তারপর তার বিয়ের সময় এলো একসময়। তেরেজার মা’র পানীপ্রার্থী ছিলো মোট নয়জন।তারা সবাই তার চারপাশে নতজানু হয়ে তাকে বৃত্তাকারে ঘিরে থাকতো, মাঝখানে রাজকুমারী মত দাড়িয়ে তেরেজার মা, সে জানতোনা এদের মধ্যে কাকে সে বেছে নেবে। একজন সবচেয়ে সুন্দর, অন্য একজন হয়তো সবচেয়ে বুদ্ধিমান, তৃতীয় একজন হয়তো ছিলো সবচেয়ে ধনী, চতুর্থ জন হয়তোবা সবচে ভালো খেলোয়াড়, পঞ্চম জন হয়তো সেরা কোন পরিবারে ছেলে,ষষ্ঠ জন ভালো আবৃত্তিকার, সপ্তম জন অনেক দেশ ঘুরে বেরিয়েছে, অষ্টম জন বেহালা বাজাতে জানে,নবম জন ছিলো সবচেয়ে পুরুষালী। কিন্তু তারা সবাই একভাবে তার জন্য নতজানু হয়ে অপেক্ষা করেছে,তাদের হাটুতে সবারই ঠিক একই জায়গায় চামড়া গিয়েছিল শক্ত হয়ে।

এবং অবশেষে নবম জনকে যে কারনে সে নির্বাচন করেছিল, তার কারন সে এদের সবার মধ্যে ছিল সবচেয়ে পুরুষালী, তা কিন্তু না, বরং যখন তেরেজার মা তাদের সঙ্গমের সময় কানে কানে বার বার বলেছিল, ’সাবধানে, খুব সাবধানে’, সে উদ্দেশ্যমুলকভাবেই অসাবধানী আচরণ করেছিল এবং অবশেষে যখন কোন চিকিৎসককে খুজে পাওয়া গেল না, যে কিনা গর্ভপাত করাতে রাজী আছে, তেরেজার মা তখন তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল। সুতরাং তেরেজারও জন্ম হয়েছিল। অগনিত আত্মীয় স্বজন যখন দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসে তার বিছানার চারপাশে জড়ো হয়ে ঝুকে পড়ে তাকে দেখে আহলাদিত শিশুদের মত স্বরে কথা বলছিল; তেরেজার মার মনে কিন্তু  কোন আনন্দই ছিল না, তার স্বরে কোন আহলাদ ছিল না। তেরেজার মা শুধু বাকী আট জন সম্ভাব্য প্রার্থীর কথাই ভাবছিল, যাদের সবাই হয়তোবা তার নবম পছন্দের চেয়ে আরো বেশী উত্তম হতে পারতো।

তার মেয়ের মতই, তেরেজার মাও প্রায়ই আয়নার দিকে তাকাতো। একদিন এভাবে অকস্মাৎ তার চোখের নীচে চামড়ার কুচকানো ভাজ নজরে পড়ে তার এবং সিদ্ধান্ত নেন, তার এই বিয়ের কোন অর্থ নেই আসলে। এই সময়টাতে তেরেজার মার সাথে পরিচয় হয় একজন অপুরুষালী এক পুরুষ এর সাথে, যে  ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রতারনার দায়ে অভিযুক্ত হিসাবে প্রমানিত হয়েছে, এছাড়া দুটো ব্যর্থ বিবাহ তো আছেই। তখন তেরেজার মার ঘৃনার বিষয় ছিল হাটুতে চামড়া শক্ত হয়ে যাওয়া সেই সব প্রাক্তন পানিপ্রার্থীরা। তার তখন তীব্র আবেগময় বাসনা  একটাই, অন্যদের পরিবর্তে এবার না হয় নিজের নতজানু হওয়াই জরুরী। সে যথারীতি নতজানু হয় তার এই প্রতারক বন্ধুর কাছে এবং তার স্বামী এবং তেরেজাকে ফেলে সে তার সংসার ত্যাগ করে এই লোকটি হাত ধরে।

সব পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে পুরুষালী তার সেই পরিত্যক্ত স্বামী খু্বই মর্মাহত হন। তিনি  এতই মর্মাহত হন যে তার কাছে কোনকিছুরই অর্থ আর আগের মত ছিল না। সুতরাং কোনকিছুকে পরোয়া না করে, তার মনে যখনই যা আসতো তাই তিনি বলতে শুরু করেন। এবং কমিউনিষ্ট পুলিশরা, তার মন্তব্য করার দুঃসাহস দেখে বিস্মিত হয়ে প্রথামত তাকে গ্রেফতার করে, বিচার করা হয় এবং বেশ লম্বা সময়ের কারাদন্ডে তাকে দন্ডিতও করা হয়। কমিউনিষ্ট পুলিশ তার ফ্ল্যাটটি দখলে নেয় এবং শিশু তেরেজাকে তার মায়ের কাছে পাঠানো হয় থাকবার জন্য।

এই বিষন্নতম মানুষটি কারাগারে কিছুদিন থাকার পর হঠাৎ করেই মারা যান এবং তেরেজা ও তার মা এরপর একটি পাহাড়ী  ছোট শহরে সেই প্রতারক বন্ধুর সাথে বসবাস করা শুরু করেন। এই লোকটি একটা অফিসে চাকরী নেয় প্রথম, এবং তার মা জোগাড় করে একটি দোকানের চাকরী। তেরেজার মা আরো তিনটি সন্তান প্রসব করেন। তারপর আবার তেরেজার মা আয়নায় নিজেকে আবার লক্ষ্য করে দেখেছিলেন, তবে এবার তিনি আবিষ্কার করেন তিনি বৃদ্ধ এবং কুৎসিৎ।

তেরেজার মা যখন বুঝতে পারে, সব কিছুই তিনি হারিয়েছেন, তার নিজের সর্বনাশের জন্য দায়ী একজন দোষীকে খোজার প্রক্রিয়াটা শুরু করে সে। যে কেউই সেটা হতে পারে: তার প্রথম স্বামী, পুরুষালী তবে ভালোবাসা বঞ্চিত,যে তার ফিস ফিস করে বলা সাবধানবানী একদিন উপেক্ষা করেছিল; তার দ্বিতীয় স্বামী, অপুরুষালী এবং যথেষ্ট ভালোবাসায় সিক্ত, যে তাকে প্রাহা থেকে টেনে নিয়ে  এসেছে এই ছোট মফস্বল শহরে এবং তাকে একটি অবিচ্ছিন্ন স্থায়ী ঈর্ষার অবস্থার মধ্যে রেখেছে একটার পর একটা রমনী সাথে সম্পর্ক গড়ে যাবার মাধ্যমে। কিন্তু  এদের দুজনের বিরুদ্ধেই সে শক্তিহীন। যে একটি মাত্র মানুষ সম্পুর্ণ তার এবং যার কোন পালাবার উপায়ই নেই, তার যে বন্দী এই অপরাধীদের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে পারবে, সে ছিল তার তেরেজা।

আসলেই, তেরেজাই কি মুল দোষী ছিল না তার মায়ের নিয়তি নির্ধারনের জন্য? তেরেজা , যে কিনা খুব সুন্দরী এক নারীর ডিম্বানু আর খুব পুরুষালী এক পুরুষের শুক্রাণুর এক অর্থহীন মিলন? হ্যা, নিয়তি নির্ধারক সেই সেকেন্ডটিতে, যার নাম দেয়া হয়েছিল তেরেজা, তার মার জীবনে নষ্ট হয়ে যাওয়া দুরপাল্লার দৌড়টি শুরু হয়েছিল।

তেরেজা’র মা কখনোই ভুলে যায়নি তার মেয়েকে মনে করিয়ে দিতে যে, মা হওয়া মানে সব কিছুকেই বিসর্জন দেয়া। তার কথায় সত্যতার একটা হালকা গন্ধ ছিল, যার ভিত্তি ছিল এক রমনীর অভিজ্ঞতা যে সবকিছু হারিয়েছিল তার সন্তানের জন্য। তেরেজা শুনতো এবং বিশ্বাস করতো, মা হওয়াটা জীবনের সবচেয়ে মুল্যবান কিছুকে অর্জন করা এবং মা হওয়ার অর্থ একটি মহান আত্মত্যাগ। আর যদি কোন মা আত্মত্যাগেরই প্রতিভু হয়, তবে একজন  কন্যা হবে অপরাধবোধের, যার  সমাধান হবার কোন সম্ভাবনা নেই।

অবশ্যই তেরেজার জানা নেই সেই রাতের কাহিনী, যখন তার মা তার বাবার কানে ফিসফিস করে বলেছিল, ’সাবধানে’; তার অপরাধী বিবেক সেই আদি পাপের মতই অস্পষ্ট। কিন্তু এর থেকে তার মুক্তি পাবার জন্য যা কিছু করার দরকার সে তা করেছে। পনেরো বছর বয়সেই তার মা তাকে স্কুল ছাড়িয়েছিল এবং ওয়েট্রেস হিসাবে কাজ শুরু করেছিল তখন থেকেই, তার আয়ের সবটুকু তার মার হাতে তুলে দিতে হয়েছে। তার মায়ের ভালোবাসা পাবার জন্য যা করার দরকার সবকিছু করার জন্য প্রস্তুত ছিল সে। পুরো সংসারের দেখাশোনা করেছে,তার ভাইবোনের যত্ন নিয়েছে, প্রতি রবিবার সারাটা দিন সে পার করেছে ঘর পরিষ্কার করে আর সবার কাপড় ধুয়ে। খুবই দু:খজনক বিষয়, কারন তার ক্লাসে সেই সবচেয়ে ছিল মেধাবী। আরো বেশী কিছু হবার ইচ্ছা ছিল তেরেজার, কিন্তু সেই ছোট্ট শহরে তার জন্য এর চেয়ে বেশী কিছু ছিল না। যখনই সে কাপড় ধুতে যেত,  টাবের পাশে একটি বই রাখতো সে, যখন সে পাতা উল্টাতো, কাপড় ধোয়ার পানি উপচে পড়ে প্রায়ই সেই বই ভিজিয়ে দিত।

তেরেজাদের বাসায়, লজ্জা বলে এমন কিছুরই অস্তিত্ব ছিলনা। ছোট ফ্ল্যাটে তার মা অর্ন্তবাস পরেই হাটা চলা করতো, কখনো ব্রা ছাড়া, কিংবা কখনো খু্ব গরমের দিনে,পুরো নগ্ন হয়ে। তার সৎ বাবা অবশ্যই নগ্ন হয়ে ঘুরতো না, কিন্তু যখনই তেরেজা গোছল করতে ঢুকতো, সেও প্রতিবার বাথরুমে ঢুকত। একবার তেরেজা বাথরুমের দরজা লাগিয়ে গোছল করেছিল শুধু এবং তার মা খুবই রেগে যায়, ‘তুমি নিজে কি মনে করছো, শুনি? মনে করেছো তোমার সৌন্দর্য সে কামড় দিয়ে খেয়ে নেবে?’

( এই বাদানুবাদ স্পষ্টতই প্রমান করে মেয়ের প্রতি তার ঘৃনা আসলে তার স্বামীর প্রতি সন্দেহ থেকে অনেক বেশী। তার কন্যার অপরাধ অসীম এবং সেটা তার স্বামীর অবিশ্বস্ততাও তার অংশ। তেরেজা নিজেকে মুক্ত করার ইচ্ছা, তার অধিকারের প্রতি জোর দাবী – যেমন গোছল করার সময় দরজা বন্ধ করার অধিকার – তেরেজার মার কাছে বেশী  অসহ্য ছিল, এমনকি তার স্বামীর তেরেজার প্রতি দুর্গন্ধময় পঙ্কিল কোন নজর দেবার সম্ভাবনার চেয়েও বেশী)।

একবার তেরেজার মা, শীতকালে, ঘরে যখন আলো জ্বলছে, তখন নগ্ন হয়ে  থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তেরেজা দৌড়ে গিয়ে খুব দ্রুত সব জানালার সব পর্দা টেনে দেয়, যেন রাস্তা থেকে কেউ কিছু না দেখতে পারে। এ কাজ করার সময়ই সে তার মা’র অট্টহাসি শুনতে পায়। পরের দিন যখনতার মার কয়েকজন বন্ধু বেড়াতে এসেছিল:একজন প্রতিবেশী, একজন মহিলা যার সাথে তার মা কাজ করে, একজন স্থানীয় স্কুল শিক্ষিকা, এছাড়া আরো দু তিন জন মহিলা,যারা প্রায়ই একসাথে জড়ো হতো। তেরেজা এবং তাদের কোন একজনের ষোল বছরের ছেলে কোন একটা পর্যায়ে সেই ঘরে ঢুকেছিল তাদের সম্ভাষন জানাতে;আর তার মা বন্ধুদের উপস্থিতিতে  সাথেই ‍সাথেই সুযোগ নেয় বর্ণনা করতে কেমন করে তেরেজা তার সম্ভ্রম রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল সেদিন; তার মা হাসছিল, এবং অন্য মহিলারাও তার সেই হাসিতে যোগ দেয়।  তার মা অভিযোগ করে বলে,তেরেজা কিছুতেই মানতে পারেনা,যে মানুষের শরীর প্রস্রাব করে, বায়ু ত্যাগ করে। লজ্জায় লাল হয়ে যায় তেরেজা, কিন্তু তার মা থামে না,’এতে এত লজ্জা পাবার কি আছে’?  নিজের করা এই প্রশ্নের উত্তরেই  যেন তার মা শব্দ করে বায়ুত্যাগ করে। সব মহিলারা আবারো একসাথে হেসে উঠে।

তেরেজার মা বেশ শব্দ করেই তার নাক পরিষ্কার করে, তার নিজের যৌন জীবন নিয়ে জনসমক্ষে কথা বলে, এবং সে তার বাধানো দাত খুলে সবাইকে দেখাতেও  দারুন পছন্দ করে এবং জিভ দিয়ে সেই বাধানো দাতগুলো আলগা করার ব্যাপারে তার ছিল দারুন দক্ষতা।  এবং সাধারনত হাসির মাঝখানে সে উপরের দাতের পাটিটিকে নিচের পাটির সাথে এমন ভাবে ফেলে রাখতো,  যে তার চেহারায় ফুটে উঠতো ভয়ঙ্কর একটি অভিব্যক্তি।

তেরেজার মায়ের এই আচরণগুলো মুলত তার  নিজস্ব মতামতের একটি বিশাল  প্রকাশ কিংবা ইঙ্গিত; তা হলো সৌন্দর্য আর যৌবনকে পরিত্যাগ করার ঘোষনা। কোন এক সময় যখন নয়জন প্রেমিক তার চারপাশে ঘিরে নতজানু হয়ে প্রেম ভিক্ষা করতো, তখন সে তার নগ্নতাকে আতঙ্কের সাথেই পাহারা দিত, যেন সে তার দেহের মুল্যকে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে এর প্রতি প্রদর্শিত তার নম্রতা বা লজ্জার মানদন্ডে। এখন ভদ্রতা বা লজ্জাবোধই সে শুধু হারিয়ে ফেলেনি, যেন চুড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘোষনা করেছে তাদের সাথে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সে নতুন এই নির্লজ্জতাকে ব্যবহার করে  তার জীবনে নতুন একটি বিচ্ছেদরেখা সে অংকন করেছে, এবং ঘোষনা করেছে যে যৌবন এবং সৌন্দর্য  আসলে মুল্যহীন, যাকে অতিমুল্যায়ন করা হয়।

আমার কাছে তেরেজাকে মনে হয়, তার মায়ের এই মানসিকতারই ধারাবাহিকতা, যার মাধ্যমে তার মা নিজের কোন এক সময়ের একজন সুন্দরী যুবতীর জীবনকে পরিত্যাগ করেছে,অনেক দুর অতীতেই ।

(এবং যদি তেরেজার কোন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ বা ইত্স্তত আচরণ চোখে পড়ে,তার অন্যান্য আচরনে যদি সহজ সৌন্দর্যর কোন অভাব থেকে থাকে, আমরা যেন অবশ্যই অবাক না হই। তার মায়ের বড়দাগের, উন্মত্ত ‍, আত্মবিনাশী আচরণ তেরেজার উপর অমোচনীয় একটি প্রভাবের চিহ্ন রেখে গেছে।)

তেরেজার  মার দাবী তার প্রতি ঘটা প্রতিটি অবিচারের  সুবিচার করা হোক। সে চেয়েছিল অপরাধী যেন শাস্তি পায়। সে কারনেই সে তার মেয়েকে তারই সাথে  তার নির্লজ্জতার জগতে থাকতে সে বাধ্য করেছিল, যেখানে যৌবন আর সৌন্দর্যর কোন অর্থই নেই, যেখানে পৃথিবী একই রকম দেখতে অগনিত শরীরের বিশাল কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ছাড়া আর কিছুই না, যেখানে আত্মারা অদৃশ্য।

এখন আমরা ভালো করে বুঝতে পারবো তেরেজার গোপন পাপের অর্থ আসলে কি, আয়নার দিকে তার দীর্ঘ দৃষ্টি বা দ্রুত চাহনীর কারন। আসলে এটি তার মার সাথে তার একটি যুদ্ধ। অন্য সব শরীর থেকে আলাদা অনন্য একটি শরীর হবার তীব্র কামনা; খুজে পাওয়ার চেষ্টা করা,যে তার চেহারা প্রতিফলিত করছে খুব গভীর থেকে উপরে উঠে আসা আত্মার উপস্থিতি । খুব সহজ  কিন্তু না সে কাজটি: তার আত্মা-তার বিষন্ন, নীরিহ, আত্মপ্রচার বিমুখ আত্মাটি – যে তার শরীরের অনেক গভীরে লুকিয়ে আছে এবং নিজেকে প্রকাশ করতে যে লজ্জা পায়।

সুতরাং যেদিন  টমাসকে সে প্রথমবারের মত দেখছিল, রেষ্টুরেন্টের মদ্যপ লোকগুলোর মধ্য দিয়ে নিজেকে বাচিয়ে, বিয়ারের বোতলের ভারে ক্লান্ত শরীরে তার আত্মা আসলে ছিল তার পাকস্হলী বা অগ্নাশয় স্তরে। তারপর যখন টমাস তাকে ডাকে, সেই ডাকটি তার কাছে ছিল অনেক অর্থবহ, কারন এই ডাকটি এসেছে এমন কারো কাছ থেকে যে তার মাকে চেনে না বা এমন কোন মাতাল কাছ থেকেও না, যারা  প্রতিদিনই অশ্লীল মন্তব্য করে। টমাসের বহিরাগত পরিচয়টি তাকে সবার চেয়ে পৃথক অন্য একটি স্তরে নিয়ে যায়।

তেরেজার চোখে, আরো একটি বিষয়, টমাসকে তার পরিচিত সবার চেয়ে উপরের স্তরে নিয়ে গিয়েছিল: সেটির কারন হলো,টমাসের টেবিলে উপর একটা খোলা বই ছিল। এই রেস্টুরেন্টের ভিতর এর আগে কেউই কোনদিনও বই খোলেনি এর আগে। তেরেজার চোখে বই হচ্ছে গোপন একটি ভ্রাতৃত্ত্বের পরিচয় চিহ্ন। কারন তাকে ঘিরে থাকা বাস্তব সেই স্থুল ও অশ্লীল পৃথিবীর বিরুদ্ধে  তেরেজার একটাই অস্ত্র ছিল: মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরী থেকে ধার করা বই এবং বিশেষ করে উপন্যাস। যে কোন উপন্যাসই সে সাগ্রহে পড়তো,ফিল্ডিং থেকে টমাস মান। তারা তাকে শুধুমাত্র  স্বস্তিহীন অপুর্ন একটি জীবন থেকে কাল্পনিক একটি মুক্তির পথের সম্ভবনাই দেখায়নি,   স্পর্শ করা যায় এমন কোন বস্তু হিসাবেও তার কাছে বইয়ের অর্থ ছিল খানিকটা ভিন্ন: রাস্তায় বগলের নীচে বই নিয়ে হাটতে ভালোবাসতো তেরেজা। এক শতাব্দী আগে ফ্যাশনদুরস্ত কারো কাছে অভিজাত ছড়ির যেমন অবস্থান ছিল, তেরেজার কাছে বইও একই অর্থ বহন করতো। সবার কাছ থেকে যা আলাদা করতো তেরেজাকে।

(বইএর সাথে অতীতের ফ্যাশন দৃরস্ত কারো হাতের অভিজাত ছড়ির তুলনা করার পুরোপুরি সঠিক না। অতীতের  ফ্যাশনপ্রিয় কারো জন্য অভিজাত ছড়ি তাকে সবার থেকে আলাদা করা ছাড়াও তাকে আধুনিক বা ‍হাল ফ্যাশনের মানুষেও রুপান্তরিত করতো। বইও তেরেজাকে ভিন্ন করতো সবার চেয়ে, কিন্তু অতীতমুখী ফ্যাশনের চিহ্ন হিসাবে। অবশ্যই তার বয়স এতো অল্প ছিল যে, সে বুঝতেই পারেনি অন্যদের চোখে সে আসলে কত পুরোনো ফ্যাশনের একজন ছিল। তরুনরা, যারা কানের মধ্যে একটি ট্রানজিস্টর রেডিও চেপে ঘুরে বেড়াতো, তেরেজার কাছে  এসব খুবই ছেলেমানুষী মনে হত, তার কাছে কখনো মনে হয়নি তারা আসলে হাল ফ্যাশনের ধারাতেই আছে);

সুতরাং যে মানুষটা তাকে সেদিন তার টেবিলে খাবারে অর্ডার দিতে ডেকেছিল, সে ছিল একই সাথে আগান্তুক এবং গোপন ভ্রাতৃত্বের সংঘের একজন সদস্য। বেশ দয়ালু কন্ঠস্বরে টমাস তাকে ডেকেছিল এবং তেরেজা অনুভব করেছিল তার রক্তনালী এবং চামড়ার অদৃশ্য অগনিত ছিদ্র দিয়ে যেন তাড়াহুড়া করে দ্রুত বেরিয়ে আসছিল তার আত্মা এই আগান্তুকটিকে নিজেকে দেখানো জন্য।

জুরিখ থেকে  প্রাহাতে ফিরে আসার পর, তেরেজার সাথে তার দেখা হবার ঘটনাটি যে, ছয়টি প্রায় অসম্ভব দৈবক্রমে ঘটা ঘটনার ফলাফল, টমাসকে সেই ভাবনাটি বেশ অস্বস্তিতে রেখেছিল ।

কিন্তু কোন একটি ঘটনা কি আসলে আরো বেশী গুরুত্বপুর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে না, যখন অপেক্ষাকৃতভাবে বেশী সংখ্যক দৈব ঘটনার প্রয়োজন হয় তা ঘটানোর জন্য ?

দৈবাৎ এবং শুধুমাত্র আকস্মিক দৈবক্রমে ঘটা ঘটনাগুলোই আমাদের জন্য কোন বার্তা বহন করে। সবকিছুই যা ঘটে প্রয়োজনের খাতিরে, যা সবকিছু আমরা জানি ঘটতে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত যাদের পুণরাবৃত্তি হয়, তারা নির্বাক। শুধু দৈবাৎ ঘটা ঘটনাগুলোই আমাদের সাথে কথা বলতে পারে। আমরা এর বার্তাটা পড়ি অনেকটাই যেমন করে কোন জীপসি কফি কাপের নীচে পড়ে থাকা কফির গুড়ার নক্সা পড়ে।

হোটেলের রেস্টুরেন্টে তেরেজার সামনে টমাসের আবির্ভাব হয়েছিল চুড়ান্তভাবে অদৃষ্টক্রমে ঘটা একটি ঘটনার মাধ্যমে। সেখানে সে বসে ছিল, সামনে খোলা একটা বইয়ের দিকে তাকিয়ে সে তখন পড়ছে, যখন হঠাৎ করেই টমাস বই থেকে চোখ সরিয়ে তেরেজার দিকে তাকায়, এবং হেসে বলে, ‘দয়া করে একটা কনিয়াক’।

সেই মুহুর্তে ঘটনাক্রমে রেডিওতেও বাজছিল সঙ্গীত, কাউন্টারের পেছনে কনিয়াক ঢালতে যাবার পথে তেরেজা রেডিওর আওয়াজটা বাড়িয়ে দিয়েছিল, সে চিনতে পারে, এটা বীটহোভেনের সঙ্গীত। তার চেনার কারন, সেই ছোট শহরে একবার  প্রাহা থেকে বেড়াতে আসা একটি স্ট্রিং কোয়ার্টেট দলের বাজানো এই সঙ্গীতটি সে আগেও শুনেছিল। তেরেজা ( আমরা জানি, সবসময় সে কামনা করতো মহৎ কোন কিছুর) তাদের কনসার্টে গিয়েছিল; হল ছিল প্রায় পুরো খালি। বাকী দর্শকের মধ্যে ছিল স্হানীয় একজন ফার্মাসিস্ট এবং তার স্ত্রী। এবং যদিও কোয়ার্টেট এর সদস্যরা মাত্র তিনজন দর্শক পেয়েছিলেন, নীচে বসা, তাসত্ত্বেও তারা যথেষ্ট দয়াশীলতার পরিচয় দিয়েছিল কনসার্টটি বাতিল না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে।  এবং তারা বীটহোভেন এর শেষ তিনটি কোয়ার্টট  এই তিন শ্রোতাকে বাজিয়ে শোনান।

এরপর ফার্মাসিস্ট কোয়ার্টট এর সদস্যদের ডিনারের নিমন্ত্রন দেন, তারা  এই তরুনী শ্রোতাকেও তাদের সাথে যোগ দিতে অনুরোধ করেছিলেন। তখন থেকেই বীটহোভেন তার কাছে, অন্যদিকের সেই পৃথিবীর প্রতীকে রুপান্তরিত হয়, যে পৃথিবীর জন্য ছিল তার তীব্র বাসনা। টমাসের জন্য কনিয়াক নিয়ে কাউন্টার ঘুরে আসতে আসতে, তেরেজা অদৃষ্টক্রমে ঘটা এই ঘটনা দুটির দেয়া বার্তাটি পড়ার চেষ্টা করে। কেমন করে সম্ভব হলো ঘটনাগুলো: ঠিক সেই মুহুর্তে সে একজন আগান্তুকের কাছে তার চাহিদার কনিয়াক নিয়ে যাচ্ছে, যাকে তার খুবই আকর্ষনীয় মনে হচ্ছে; আর ঠিক সেই মুহুর্তেই  সে বীটহোভেন শুনলো?

প্রয়োজন কোন ম্যাজিক ফর্মুলা জানে না -সবকিছু  হঠাৎ দৈবক্রমে ঘটা ঘটনার সম্ভাবনার উপর অর্পিত। যদি কোন ভালোবাসাকে অবিস্মরণীয় হতে হয়, সুযোগ আর দৈবাৎ ঘটনাগুলো অবশই তাড়াতাড়ি এর উপর অস্থিরভাবে হয়ে নেমে আসে, অ্যাসিসির সেন্ট ফ্রান্সিসের কাধে ডানা ঝাপটিয়ে নেমে আসা পাখীগুলোর মত [২]।

১০

টমাস তাকে আবার ডাকে কনিয়াকের ‍মুল্য পরিশোধ করতে। সে তার বইটি বন্ধ করে ( গোপন ভ্রাতৃসংঘের প্রতীক) এবং তেরেজা ভাবে তাকে জিজ্ঞাসা করবে, সে কি পড়ছিল।

টমাস জিজ্ঞাসা করে, ’এর দামটা কি আমার রুমের বিলের সাথে তুমি যোগ করে দিতে পারবে ’।

’হ্যা’, তেরেজা বলে, ’তোমার রুম নাম্বারটা কত’?

টমাস তাকে তার চাবিটা দেখায়, চাবিটা আটকানো এক টুকরো কাঠের সাথে, যার উপর লাল রঙ দিয়ে লেখা ছিল ছয় সংখ্যাটি।

‘অদ্ভুত তো’, তেরেজা বলে, ’ছয়’।

টমাস জানতে চায়,  ’ অদ্ভুত কেন ব্যাপারটা’?

তেরেজার হঠাৎ করেই মনে পড়েছিল, তার বাবা মার ছাড়াছাড়ি হবার আগে, প্রাহাতে যে বাসায় তারা থাকতো, তার নাম্বারও ছিল ছয়। কিন্তু সে ভিন্ন একটি উত্তর দিয়েছিল ( যার কৃতিত্ব আমরা তার  কুটকৌশলকে দিতে পারি): ‘তোমার রুম নম্বর ছয় আর আমার কাজও শেষ ছটায়’।

আগান্তুক বলে, ‘বেশ, আমার ট্রেন ছাড়ছে সাতটায়’।

তেরেজা জানতো না, এই প্রশ্নের সে কিভাবে দেবে, তাই সই এর জন্য সে বিলটা এগিয়ে দেয় এবং সেটা নিয়ে রিসেপশন ডেস্কে ফিরে আসে। যখন তার কাজ শেষ হয়, আগান্তুকটি আর সেই টেবিলে দেখা যায়না। সে কি তেরেজার সতর্ক গোপন বার্তাটি বুঝতে পেরেছিল? একটা উত্তেজনার রেশ নিয়েই তেরেজা রেষ্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আসে।

হোটেলের উল্টোদিকেই ছিল প্রায় খালি ছোট একটা পার্ক, অপরিষ্কার ছোট শহরে কোন অবহেলিত পার্ক যেমন হতে পারে, কিন্তু তেরেজার জন্য এটি সবসময়ই ছিল সৌন্দর্যর  ছোট একটি দ্বীপের মত: এখানে ঘাস ছিল, চারটা পপলার গাছ, বেন্চ, একটা উইপিং উইলো আর কিছু ফরসাইথিয়ার ঝোপ।

সে একটা হলুদ বেন্চ এ বসেছিল, যেখান থেকে হোটেলটির রেষ্টুরেন্টে ঢোকার দরজা স্পষ্ট দেখা যায়। এই বেন্চে একদিন আগেই তেরেজা বসেছিল তার কোলে একটা বই নিয়ে! সে তখনই বুঝতে পারে ( দৈব ঘটনার পাখিগুলো তার কাধের অবতরন করতে শুরু করে) এই  আগান্তুকটি আসলে তার নিয়তি ; আগান্তুকটি তাকে ডাকে, এবং তার পাশে বসার জন্য নিমন্ত্রন করে। তার আত্নার বাহিনীরা তার শরীরের উপরে দৌড়ে আসে)। এর পর তার সাথে সে হেটে স্টেশন পর্যন্ত যা গিয়েছিল এবং টমাস তাকে তার বিদায় ইঙ্গিত হিসাবে তার একটি ভিজিটিং কার্ড দেয়, ‘যদি তুমি কখনো প্রাহাতে বেড়াতে আসো….’ ।

১১

সেই শেষ মিনিটে সেদিন কার্ডের চেয়ে আরো অনেক বেশী কিছু টমাস তার হাতে তুলে দিয়েছিল, তা হলো সেই সব দৈবক্রমে ঘটা ঘটনাগুলোর ডাক ( বই, বীটহোভেন, ছয় নম্বর, হলুদ পার্কের বেন্চ), যা তেরেজাকে সাহস যুগিয়েছিল তার বাসা থেকে বের হবার জন্য এবং তার নিয়তিকে বদলে দেবার জন্য। হতে পারে এই সব অল্প কিছু দৈব ঘটনাই ( যাই হোক, খুব সাদামাটা, এমনকি অনাকর্ষনীয়, যেমনটা কেউ এরকম কোন নিষ্প্রভ শহরে আশা করতে পারে) হয়তো তার ভালোবাসার সুচনা করেছিল  এবং  সেই প্রানশক্তি তাকে দিয়েছিল, যা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল।

আমাদের দৈনন্দিন জীবন এরকম অসংখ্য দৈবঘটনার নীরব স্বাক্ষী বা আরো সঠিকভাবে বলতে চাইলে, নানা মানুষের সাথে আকস্মিক দেখা হওয়া বা নানা ঘটনায় ভরা,যাদের আমরা কো ইনসিডেন্স বা যুগপৎ ঘটা ঘটনা হিসাবে চিহ্নিত করি। যুগপৎ ঘটনা মানে, দুটো ঘটনা অকস্মাৎ একই সাথে যখন ঘটে; তাদের দেখা হলো: টমাস হোটেলটির রেস্টুরেন্ট এ যখন আবির্ভুত হলো, ঠিক সেই সময় রেডিওতে বীটহোভেন বাজছে। বেশীর ভাগ এধরনের যুগপৎ ঘটনা আমরা খেয়ালই করিনা; যদি যে টেবিলে টমাস বসেছিল সেখানে যদি স্থানীয় কসাই এসে বসতো তেরেজা হয়তো খেয়াল করতো না রেডিওতে বীটহোভেন এর সঙ্গীত বাজছে ( এখানে বীটহোভেন এবং শহরের কসাই এর সাক্ষাৎকারও  একটা কৌতুহলোদ্দীপক যুগপ‍ৎ ঘটনা হতো নিশ্চয়ই)। কিন্তু তার অঙ্কুরিত ভালোবাসা, তার সৌন্দর্য অনুভব করার ক্ষমতাকে আরো বেশী সংবেদনশীল করে তুলেছিল এবং সে কখনোই এই সংগীতটাকে ভুলতে পারবে না। যখনই সে শুনেছে, এটি ‍তাকে স্পর্শ করেছে। তার চারপাশে যা ঘটছিল সেই মুহুর্তে সবকিছু সংগীতের মুর্ছনায় আর এর সৌন্দর্যকে ধারন করে উদ্ভাসিত হয়েছিল।

প্রাহাতে টমাসের সাথে দেখা করতে যাবার সময়, তেরেজা তার বাহুর নীচে যে উপন্যাসটি ছিল, তার শুরুতে আনা এবং ভ্রনস্কির প্রথম দেখাও হয়েছিল খানিকটা অদ্ভুত একটা পরিস্থিতিতে: তারা দুজনেই রেলওয়ে স্টেশনে উপস্থিত ছিল, যখন ট্রেনের নীচে পড়ে কেউ মৃতুবরন করে। উপন্যাসের শেষে, আনা ট্রেনে সামনে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছিল। এই সিমেট্রিক্যাল  প্রতিসাম্যময় কম্পোজিশন- একই মোটিফ উপন্যাসের শুরুতে এবং শেষে আবির্ভুত হওয়া – আপনাদের কাছে এটি বেশ ’উপন্যাসীয়’ চরিত্রের মনে হতে পারে এবং আমিও একমত হতে রাজী আছি, কিন্তু শুধমাত্র একটি শর্তে, আপনারা এই ‘উপন্যাসীয়’ বা নোভেলিষ্টিক চরিত্রে শব্দটি ‘কাল্পনিক’, ‘বানানো’ বা জীবন ’অঘনিষ্ঠ’ এধরনের কোন ধারনা নিয়ে পড়ার চেষ্ঠা থেকে বিরত থাকবেন। কারন মানুষের জীবন ঠিক এই ধাচেই সাজানো থাকে।

সংগীতের মতই তারা কমপোজ করা। তার নিজস্ব সৌন্দর্যবোধ দিয়ে পরিচালিত হয়ে, কেউ একটি দৈবক্রমে ঘটা কোন ঘটনাকে (বীটহোভেন এর সংগীত, ট্রেনের নীচে মৃত্যু) রুপান্তরিত করে একটি মোটিফ এ [৩], যে মোটিফটি পরবর্তী কারো জীবনের কম্পোজিশনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। ‍আনা কারেনিনার আনা, অন্য যে কোন ভাবে আত্মহত্যা করতে পারতো, কিন্তু মৃত্যুর মোটিফ আর রেলওয়ে স্টেশন, অবিস্মরনীয়ভাবে যুক্ত হয়ে আছে আনার ভালোবাসার জন্মের সাথে, যা তার জীবনের দু:সময়ে যা তাকে তার অন্ধকার সৌন্দর্য দিয়ে প্রলোভিত করেছিল। বিষয়টি অনুধাবন না করেই, একজন ব্যাক্তি তার জীবনটাকে কম্পোজ করে সৌন্দর্যের সুত্র মেনেই, এমন  কি তার চরম দুঃসময়ে।

এজন্যই, রহস্যময় সব যুগপৎ ঘটনাগুলোর প্রতি উপন্যাসের অতি আকর্ষনকে, জন্য তিরষ্কার করাটা আসলে ভুল (যেমন আনা, ভ্রনস্কির দেখা হওয়াটা, রেলওয়ে স্টেশন এবং মৃত্যু বা বীটহোভেন, টমাস, তেরেজা আর কনিয়্যাক) তবে এটা ঠিক মানুষেকে তার দৈনিন্দিন জীবনে এসব ঘটনাগুলোর প্রতি অন্ধ থাকার জন্য তিরষ্কার করা ঠিকই আছে। কারন এভাবে সে তার জীবনকে  সৌন্দর্যের একটি নতুন মাত্রা থেকে বঞ্চিত করছে।

১২

কাধের উপর ডানা ঝাপটানো দৈবাৎ ঘটনার পাখীদের অস্থিরতায় বাধ্য হয়ে তেরেজা এক সপ্তাহের ছুটি নেয় এবং তার মাকে কিছু না বলেই প্রাহা অভিমুখে একটি ট্রেনে উঠে বসে। সারাটা পথে তাকে বার বার টয়লেটে যেতে হয়েছিল, আয়নায় নিজেকে দেখতে এবং তার আত্মার কাছে প্রার্থনা করতে তার শরীরের উপর থেকে যেন তারা প্রস্থান না করে, বিশেষ করে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন এমন একটা দিনে। এরকম কোন একবার আয়নার সামনে দাড়িয়ে সে খানিকটা ভীত হয়ে পড়ে: কারন গলায় খুশখুশ একটা অনুভুতি সে টের পায়, এই গুরুত্বপুর্ন দিনে কি তার কোন অসুখ করে বসলো?

কিন্তু ফিরে যাবার আর উপায় নেই তার। সুতরাং প্রাহাতে পৌছে সে টমাসকে স্টেশন থেকে ফোন করে, এবং যেই মুহুর্তে টমাস তার ফ্ল্যাটের দরজা খোলে, তার পেটের মধ্যে অস্বস্তিকর একটি গুঢ় গুঢ় শব্দ শুরু হয় বেশ জোরে শোরে। ভীষন বিব্রত হয়েছিল তেরেজা। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন তার মাকে তার পেটের মধ্যে বহন করে এনেছে এবং এ্টা তার মায়ের সেই তিক্ত হাসির শব্দ, যেন টমাসের সাথে এই দেখা হওয়ার মুহুর্তগুলো নষ্ট হয়।

প্রথম কয়েক সেকেন্ডে তার ভয় হচ্ছিল সে হয়ত বমি করে তার মাকে পেটের ভিতর থেকে বের করে দেবে এই ক্রমাগত স্থুল শব্দ করার জন্য, কিন্তু তখনই টমাস তাকে এগিয়ে এসে আলিঙ্গন করে। তার প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করে তেরেজা তার পেটের শব্দগুলোকে উপেক্ষা করার জন্য এবং তীব্র আবেগের সাথে সে টমাসকে চুমু খায়, তার চোখ তখন অশ্রুতে ভেজা। এক মিনিট শেষ না হতেই তারা সঙ্গম শুরু করে, মিলনের সময় তেরেজা চিৎকার করছিল, ততক্ষনে তার গায়ে জ্বর এসে গেছে, তার জমাট আর লাল হয়ে যাওয়া ফুসফুসে তার শরীরের বাইরের নলের মুখ অক্সিজেন সরবরাহ করছিল।

দ্বিতীয়বার যখন সে প্রাহাতে আসে, তার সাথে তখন ভারী একটি সুটকেস ছিল।  সমস্ত জিনিস সে গুছিয়ে নিয়ে এসেছিল সেটাতে করে, সেই ছোট শহরে আর কোনদিনও ফিরে না যাবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। পরের দিন সন্ধ্যাবেলায় টমাস তাকে তার বাসায় নিমন্ত্রন করে; প্রথম রাতটা সে কাটিয়েছিল একটা সস্তা হোটেলে। সকাল বেলা সে তার ভারী সুটকেসটা নিয়ে যায় স্টেশনে, সেখানেই রেখে আসে। বাহুর নীচে ’আনা কারেনিনা’ নিয়ে সে সারাদিন প্রাহার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছিল। এমনকি যখন টমাসের দরজায় ঘন্টি বাজায়,  টমাস দরজা খোলে, তখনও বইটা সে তার কাছ থেকে আলাদা করেনা। যেন টমাসে জগতে ঢোকার জন্য সেটি একটি টিকেট। সে বুঝতে পারে যে, এই হতভাগা টিকিটটা ছাড়া তার আর কিছুই নেই।এবং সেই ভাবনাটা তার চোখে প্রায় অশ্রু নিয়ে আসে। যেন কাদতে না হয়, সে বেশী এবং জোরে জোরে কথা বলে, এবং আবারও টমাস তাকে আলিঙ্গন করে বুকে টেনে নেয় এবং প্রায় সাথে সাথেই তারা মিলিত হয়। সে এমন একটা কুয়াশার মধ্যে প্রবেশ করে যেখানে কিছুই দেখা যায় না, শুধু তার চিৎকার এর শব্দ শোনা যায়।

১৩

না দীর্ঘশ্বাস, না গোঙ্গানী, আসলে সেটা তীব্র চিৎকার। এত জোরে তেরেজা চিৎকার করছিল, যে টমাস তার মুখের কাছ থেকে মাথা সরিয়ে ফেলেছিল; ভয় পেয়েছিল তার কানের এত কাছে তেরেজার কন্ঠস্বর, যে  কানের পর্দা না ছিড়ে যায়। এই চিৎকার তার ইন্দ্রিয় সুখানুভুতির প্রকাশ নয়। কারন ইন্দ্রিয় সুখানুভুতির হচ্ছে সব ইন্দ্রিয়গুলোর একই সাথে অংশগ্রহন: কেউ তার সঙ্গীকে লক্ষ্য করে গভীর মনোযোগে, প্রতিটি শব্দ শোনার তীব্র প্রচেষ্টায়। কিন্তু তার চিৎকারের লক্ষ্য যেন সব বোধকে অসাঢ় করে দেয়া, যা সব দেখা আর শোনাকে প্রতিহত করে। তেরেজার এই চিৎকারটা আসলে, তার ভালোবাসার অবোধ আদর্শবাদীতার সকল দ্বন্দকে নির্বাসন দেবার একটি প্রচেষ্টা, শরীর এবং আত্মার দ্বৈত্বতাকে মুছে ফেলার প্রচেষ্টা, হয়তো এমনকি সময়কেও মুছে ফেলার চেষ্টা।

তেরেজার চোখ কি বন্ধ ছিল এসময়? না, কিন্তু তারা কোন দিকে তাকিয়েও ছিল না। মাথার উপর ছাদের কোন একটা শুন্যতায় তার দৃষ্টি স্থির হয়ে ছিল। মাঝে মাঝে সে তার মাথাকে জোরে জোরে এপাশ ওপাশ নাড়িয়েছে শুধু।

যখন চিৎকার কমে যায়, সে টমাসের হাত ধরে তার পাশে ঘুমিয়ে পড়ে, সারা রাত তেরেজা টমাসের হাত ধরেই রাখে।

এমনকি তার আট বছর বয়সেও, সে একহাত অন্যহাতের মধ্যে জোর করে চেপে ধরে ঘুমাতো, যে মানুষটাকে ভালোবাসে যেন তার হাত ধরে আছে সে, এই বিশ্বাসে, তার জীবনের সেই পুরুষ। সুতরাং ঘুমের মধ্যেও কেন তেরেজা এত জোরে টমাসের হাত ধরে রাখতো, তার কারনটা আমরা বুঝতে পারি: ছোটবেলা থেকেই সে এর প্রশিক্ষন পেয়েছে।

১৪

একজন তরুনী – আরো বিশাল কিছু করার চেষ্টার সুযোগগুলোকে অনুসরণ করার  বদলে যাকে বাধ্য করা হতো মাতালদের মদ এবং ভাইবোনদের পরিষ্কার কাপড় সরবরাহ করার জন্য-বিশাল পরিমান প্রান শক্তি সে সঞ্চিত করে রেখেছিল, যে প্রানশক্তি বইয়ের উপর হাই তোলা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবে না। তেরেজা তাদের চেয়ে অনেক বেশী পড়েছে, এবং জীবন সম্বন্ধে শিখেছে তাদের চেয়ে অনেক বেশী। কিন্তু কোনদিনও এই ব্যাপারটা তেরেজা অনুধাবন করতে পারেনি। এজন বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েট এবং স্বশিক্ষিতদের মধ্যে পার্থক্য, তাদের জ্ঞানের পরিধি না বরং তাদের প্রানশক্তি এবং আত্মবিশ্বাস এর পরিমানে। তেরেজা যেভাবে প্রাহার নতুন জীবনের সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েছিল, তা এই সাথে উ্ন্মত্ত আর বিপজ্জনক। যেন সে মনে করেছিল, যে কোন দিন, হয়ত কেউ তার দিকে এগিয়ে এসে বলবে, ‘তুমি এখানে কি করছো? যেখান থেকে এসেছো সেখানে ফিরে যাও’! শুধুমাত্র একটি সুতোয় যেন ঝুলছিল তার জীবনের সব আকাঙ্খা: টমাসে গলার স্বর। কারন টমাসে গলার স্বরই তার লাজুক আত্মাকে তার অন্ত্রের গভীরে লুকোনো জায়গা থেকে প্ররোচিত করে বের করে এনেছিল।

ফটোগ্রাফি ডার্ক রুমে তেরেজা কাজ পেয়েছিল, কিন্তু সেটা তার জন্য ছিল অপ্রতুল।  সে ছবি তুলতে চাইতো, কারো ছবি ডেভোলপ করতে না। টমাসের বন্ধু সাবিনা তাকে ধার দিয়েছিল তিন বা ‍চারটি বিখ্যাত ফটোগ্রাফারের মনোগ্রাফের বই, তারপর একদিন একটি ক্যাফেতে, এই বইগুলো খুলে সে তেরেজাকে প্রত্যেকটা ছবি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছিল, কোন বিষয়গুলো সাধারন অন্য যে কোন ফটোগ্রাফের তুলনায় এদের ব্যতিক্রম করেছে। তেরেজা নীরব এবং গভীর মনোযোগের সাথে সাবিনার কথাগুলো শুনেছিল, যে মনোযোগ খুব কম শিক্ষকই তাদের শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে দেখে থাকেন।

সাবিনার কল্যানে, সে বুঝতে সক্ষম হয়েছিল ফটোগ্রাফী আর পেইন্টিং এর মধ্যে যোগসুত্রটা এবং টমাস কে সে বাধ্য করেছিল প্রাহায় উদ্বোধন হওয়া সব প্রদর্শনীগুলোতে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এর কিছু দিনের মধ্যে তেরেজার নিজের তোলা ছবি যে প্রত্রিকায় সে কাজ করতো, তার পাতায় আসতে শুরু করে। এবং অবশেষে ডার্করুম ছেড়ে সে পেশাজীবি ফটোগ্রাফার স্টাফদের দলে যোগ দেয়।

সেই দিন সন্ধ্যায়, সে আর টমাস, তাদের কয়েকজন বন্ধুদের সাথে একটি বারে যায়, তার পদো্ন্নতির বিষয়টি উদযাপন করার জন্য।সবাই সেখানে নেচেছিল। শুধু টমাস বিষন্ন হয়ে পড়তে শুরু করেছিল; এরপর বাসায় ফিরে, তেরেজার বেশ কিছুক্ষন জেরার মুখে, সে স্বীকার করে, তার এক সহকর্মীর সাথে তাকে নাচতে দেখে তার ঈর্ষা হয়েছিল।

‘তুমি বলতে চাচ্ছো আসলেই তোমার হিংসা হচ্ছিল‘? তেরেজা তাকে প্রায় দশবার বা আরো বেশী অবিশ্বাসের সাথে জিজ্ঞাসা করেছিল, যেন ঠিক সেই মুহুর্তে তাকে কেউ সংবাদ দিয়েছে যে, সে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছে।

তারপর টমাসের কোমর হাত দিয়ে পেচিয়ে ধরে, তেরেজা সারা রুম জুড়ে নাচতে শুরু করে; বারে যেভাবে সে নেচেছিল ঠিক সেভাবে না, এবার অনেকটা গ্রামের পোলকা নাচের মতো, যেখানে উন্মত্ততা আছে, শুন্যে তার পা উঠছে, সারা ঘর জুড়ে তার শরীর লাফাচ্ছে, তার সাথে আটকে আছে টমাস।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অল্প কিছু দিনের মধ্যে তেরেজা নিজেই ঈর্ষার শিকার হতে শুরু করে এবং টমাসের কাছে তার ঈর্ষা নোবেল প্রাই্জের মত মনে হয়নি, বরং একটা বোঝার মত মনে হয়েছিল, যে বোঝার ভার তাকে বহন করতে হয়েছে প্রায় তার মৃত্যু অবধি।

১৫

স্বপ্নে যখন তেরেজা সুইমিং পুলের চারপাশে নগ্ন নারীদের একটা দলের সাথে নগ্ন হয়ে মার্চ করছিল, টমাস এই পুলের উপরের গুম্বুজের মত ছাদ থেকে ঝোলানো একটা ঝুড়িতে দাড়িয়ে তাদের তদারকি বরছিল এবং তাদের চিৎকার করে তাদেরকে গান গাইতে নির্দেশ দিচ্ছিল এবং হাটু ভাজ করে অনুশীলন করার জন্য বাধ্য করছিল; যে মুহুর্তে তাদের একজন হাটু ভাঙ্গার অনুশীলনে সামান্য ভুল করছিল, সে তাকে গুলি করছিল

তেরেজার দেখা সেই স্বপ্নটাতে আমি আবার ফিরে আসি। স্বপ্নটির বিভীষিকা কিন্তু টমাসের পিস্তল থেকে ছোড়া প্রথম গুলি থেকে শুরু হয়নি; একেবারে শুরু থকে এটা ভীতিকর তেরেজার জন্য। নগ্ন হয়ে একদল নগ্ন রমনীদের সাথে এভাবে মার্চ করাটা তেরেজার জন্য আতঙ্কের একটি অবধারিত প্রতিচ্ছবি। যখন সে তার নিজের বাসায় ছিল, তার মায়ের নিষেধ ছিল বাথরুমের দরজা বন্ধ করতে; এই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তার মা যা বোঝাতে চাইতো, তা হলো: তোমার শরীর আর অন্য সব শরীরের মতই, আলাদা কিছু নেই, লজ্জা পাবার কোন অধিকার তোমার নেই; তোমার কোন কারনই নেই এমন কিছু লুকিয়ে রাখা যার অসংখ্য লক্ষ লক্ষ হুবুহু প্রতিলিপির অস্তিত্ব আছে। তার মার জগতে সব শরীরই এক, একে অপরের পেছনে মার্চ করে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই তেরেজা তার নগ্নতাকে দেখেছে কনসেন্ট্রশন ক্যাম্পের সমরুপীতার চিহ্ন হিসাবে, অপমানের চিহ্ন হিসাবে।

তেরেজার জন্য এই স্বপ্নের শুরুতে আরো একটা আতঙ্কের ব্যাপার ছিল: নারীদের সবাইকে গান গাইকে হবে, শুধু যে তাদের শরীর একে অপরের হুবুহু প্রতিলিপি  এবং একই ভাবেই মুল্যহীন কিংবা শধু যে তাদের শরীর আত্মা বিবর্জিত শুন্য কোন যন্ত্র মাত্রই না –  স্বপ্নের সেই নারীদের দল এর জন্য উল্লসিত; আত্মা হীনদের এক আনন্দময় সৌহার্দময় একতায়।  এই নারীরা যেন সন্তুষ্ট তাদের আত্মার বোঝাটা ঝেড়ে ফেলে দিতে পারার জন্য – সেই হাস্যকর অহংকার, সেই স্বকীয়তার একটি বিভ্রম –তারা এখন রুপান্তরিত তাদের কাছের নারীটির মতাই, আরো একজন। তেরেজা তাদের সাথে গান গেয়েছিল, কিন্তু সে তাদের মত আনন্দিত হতে ব্যর্থ হয়েছিল। তার গান গাইবার কারন ছিল, তার ভয়, যদি সে গান না গায়, অন্যরা তাকে হত্যা করতে দ্বিধা করবেনা।

তাহলে এই স্বপ্নে টমাসের গুলি চালিয়ে তাদের একে একে হত্যা করা এবং সুইমিং পুলের পানির ছুড়ে ফেলার ব্যাপারটা তাহলে কি অর্থ বহন করছে?  মৃতদেহগুলো একের পর এক পুলের পানিতে ভেসে উঠছে।

নারীরা তাদের সমরুপীতায় তীব্রভাবে আনন্দিত, বৈচিত্রহীন, আসলেই তারা তাদের আসন্ন মৃত্যুকে উদযাপন করছে , যা তাদের সমরুপীতাকে সর্বশেষ এবং চুড়ান্ত একটি রুপ দেবে। সুতরাং টমাসের গুলি চালানোটা তাদের এই ভয়ঙ্কর মার্চের আনন্দময় একটা চুড়ান্ত অবস্থা। তার পিস্তলের প্রতিটি গুলির শব্দে তারা চিৎকার করে হেসে উঠছে এবং যখন তাদের মৃতদেহ পানি নীচে ডুবে যাচ্ছে তখন তারা আরো জোরে ‍গান গেয়ে উঠছে।

কিন্তু টমাসই বা কেন, যে গুলি করছে? কেন বাকীদের মত সে তেরেজাকেও খুজছে গুলি করার জন্য।

কারন সে নিজেই তেরেজাকে এই নারীদের সাথে যোগ দেবার জন্য পাঠিয়েছে। টমাসকে এই স্বপ্নটা সেটাই বলতে চাইছে, যা তেরেজারে নিজের বলতে পারার ক্ষমতা নেই। সে তার মায়ের পৃথিবী থেকে পালিয়ে তার কাছে এসেছে, যে মায়ের পৃথিবীতে সব শরীরই এক, সমরুপী। সে টমাসের কাছে এসেছে তার শরীরকে অনন্য করে তুলতে, যা অপ্রতিস্থাপনযোগ্য। কিন্তু টমাস, সেও, তার এবং বাকী সবার শরীরের মাঝখানে একটা সমান সমান চিহ্ন বসিয়ে দিয়েছে: সে সবাইকে একই ভাবে চুমো খায়, একই ভাবে আদর করে, এবং অন্য কোন শরীরের সাথে তেরেজার শরীরের একেবারে কোন ধরনের পার্থক্যই সে করে না। যে জগতটা থেকে সে পালিয়ে এসেছিল, টমাস তাকে আবার সেই জগতেই ঠেলে পাঠিয়ে দিয়েছে, অন্য নগ্ন রমনীদের মত নগ্ন হয়ে মার্চ করতে ।

১৬

পর পর তেরেজা তিনটি সিরিজের স্বপ্ন দেখতো: প্রথমটা ছিল, হঠাৎ করে ক্ষেপে হয়ে যাওয়া একটি বিড়াল, যা তার জীবনে পাওয়া সব কষ্টগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে; দ্বিতীয়টি, তার তার মৃত্যদন্ডের ছবি, যা অসংখ্য রুপে ফিরে আসে তার কাছে; তৃতীয় তার মৃত্যু পরবর্তী জীবন, যখন তার অপমান  একটি অসীম চিরন্তন রুপ পায়।

এই স্বপ্নগুলোয় আসলেই কিছুই বাকী থাকে আর অর্থ করার। টমাসের প্রতি এদের অভিযোগ এত স্পষ্ট যে, তার একটি মাত্র প্রতিক্রিয়া হলো মাথা ঝুকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে তেরেজার হাত ধরে বসে থাকা।

স্বপ্নগুলো খুব বাঙ্গময়, কিন্তু তারা সুন্দরও বটে। এই বিষয়টা মনে হয় তার স্বপ্ন তত্ত্বে ফ্রয়েড ধরতে পারেননি। স্বপ্নদেখা শুধুমাত্র যোগাযোগ (বা সাংকেতিক যোগাযোগ, আপনি যদি বলেন) করার একটি ক্রিয়াই শুধু না; এটা একটি নন্দনতাত্ত্বিক কর্মকান্ড বটে, কাল্পনারএকটি খেলা, যে খেলা শুধু খেলা হিসাবে একক ভাবেই মুল্যবান। আমাদের স্বপ্নগুলো প্রমান করে, কল্পনা করা -এমন কিছু নিয়ে স্বপ্ন দেখা যা কিনা এখনও ঘটেনি- মানবজাতির গভীরতম প্রয়োজনের একটি। এখানেই এর বিপদ। যদি স্বপ্ন সুন্দর না হয়, খুব দ্রুত তাদের ভুলে যাই আমরা। কিন্তু তেরেজা বার বার তার স্বপ্নগুলোয় ফিরে আসে, তার মনের মধ্যে বার বার সে তা দেখে, তাদের রুপান্তরিত করে তার কিংবদন্তীতে। টমাস বেচে থাকে তেরেজা স্বপ্নগুলোর তীব্র যন্ত্রনাদায়ক সৌন্দর্যের সন্মোহনী শক্তির অধীনে।

‘প্রিয় তেরেজা, মিষ্টি তেরেজা, আমি কি তোমাকে হারাচ্ছি‘? একটা ওয়াইন সেলারে মুখোমুখি বসে টমাস একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘প্রতি রাতে তুমি মৃত্যুর স্বপ্ন দেখো, যেন তুমি আসলেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইছো…….’।

দিনের বেলা , যুক্তি এবং ইচ্ছা শক্তি তখনও ঠিক জায়গাতেই ছিল। রেড ওয়াইনের এক ফোটা তার গ্লাস বেয়ে ধীরে নীচে নেমে যায় যখন সে উত্তর দেয়, ‘আমার কিছুই করার নেই, টমাস, ওহ, আমি বুঝি তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমি জানি তোমার অবিশ্বস্থতা এমন বড় কোন ট্র্যাজেডি না……’।

তার দুচোখ ভরা ভালোবাসা নিয়ে সে টমাসের দিকে তাকায়। কিন্তু আসন্ন রাত তাকে শঙ্কাগ্রস্থ করে তোলে, তার স্বপ্নই তার আতঙ্কের কারন। তার জীবন এখন দ্বিধাবিভক্ত, রাত এবং দিন দুটোই তাকে অধিগ্রহন করার প্রতিদ্বন্দিতায় ব্যস্ত দ্বন্দে।

১৭

যে কেউই, যাদের জীবনের উদ্দেশ্য ’কিছুটা উচুতে’, কোন না কোন একদিন তাদের অবশ্যই তাদের খানিকটা মাথা ঘোরার যন্ত্রনা বা ভার্টিগো সহ্য করতেই হবে। ভার্টিগো আসলে কি? পড়ে যাবার ভয়? তাহলে আমরা কেন এটা অনুভব করি, যখন সব অবসারভেশন টাওয়ারগুলো মজবুত হ্যান্ডরেল দিয়ে সুরক্ষিত থাকে? না, ভার্টিগো, মানে পড়ে যাবার ভয়ের চেয়ে ভিন্ন কিছু। এটি নীচের সেই শুন্যতা উঠে থেকে আসা আওয়াজ যা আমাদের প্ররোচিত করে, প্রলোভন দেখায়, এটা সেই গভীরে পড়ে যাবারই আকাঙ্খা, যার বিরুদ্ধে ভীত সন্তস্ত্র আমরা নিজেদের আত্মরক্ষা করি।

তেরেজার স্বপ্নে নগ্ন রমনীরা, যারা সুইমিং পুলের চারপাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিল, বা শববহনকারী গাড়ীতে মৃতদেহরা আনন্দ করছিল, কারন সেও,তাদের মত মৃত- এই সবের অবস্থান ‘গভীর নীচে’, যা সে ভয় করেছে সবসময় এবং একবার পালিয়েছিল এদের কাছ থেকে। কিন্তু রহস্যময় ভাবে এটি তাকে আবার হাতছানি দিয়ে ডাকে। এই সবই তার ভার্টিগো, সে খুব মিষ্টি ( প্রায় আনন্দময়) একটা আহবান শুনতে পায় তার আত্মা আর নিয়তিকে পরিত্যাগ করার জন্য। আত্মাবিহীনদের সৌহার্দ্য তাকে আহবান করে। এবং তার দুর্বল মুহুর্তে, সেই ডাকে সাড়া  দিয়ে এবং তার মায়ের কাছে ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুতও হয় । তার শরীরের উপরে আত্মার উপস্থিতি সে অনায়াসে উপেক্ষা করে এবং তার মায়ের বন্ধুদের মধ্যে যে কোন একটা জায়গায় নিজেকে নামিয়ে ফেলতে ও তাদের সাথে হাসতে প্রন্তুতও হয়েছিল যখন তাদের মধ্যে কেউ একজন বায়ু ত্যাগ করবে; তাদের সাথে নগ্ন হয়ে পুলের চারপাশে মার্চ করার জন্য ও গান গাইবার জন্য প্রস্তুত হয়।

১৮

সত্যি, তার বাড়ি ছাড়ার শেষ দিন পর্যন্ত তেরেজা তার মায়ের সাথে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না যে, তার মাকে ভালোবাসা সে বন্ধ করে দেয়নি কখনোই। তার মা ভালোবাসার স্বরে তার কাছে যা চাইতো, সে ঠিক তাইই করতে পারতো। তার সব কিছু ছেড়ে আসার শক্তি পাবার একমাত্র কারন সে কোনদিনও তার মায়ের সেই গলার স্বর শোনেনি।

যখন তেরেজার মা বুঝতে পেরেছে যে তার আক্রমনাত্মক আচরন তার মেয়ের উপর আর কোনই প্রভাব ফেলছে না, সে তাকে নালিশ করার সুরে চিঠি লিখতে শুরু করে, তার অভিযোগ, তার স্বামীকে নিয়ে, তার বস, তার স্বাস্থ্য, তার ছেলেমেয়েকে নিয়ে এবং সে আশ্বস্থ করার চেষ্টা করে তেরেজাকে তার জীবনে এখন শুধুমাত্র অবশিষ্ট আছে এমন একজন ভরসার মানুষ হিসাবে চিহ্নিত করে। তেরেজা ভাবে, অবশেষে বিশ বছর পর আবার সে তার মায়ের ভালোবাসার কন্ঠস্বর শুনতে শুরু করেছে এবং তার ফিরে যাবার কথা মনে হয়, এখন আরো বেশী করে মনে পড়ার কারন, সে নিজেকে দুর্বল,ক্ষমতাহীন অনুভব করে টমাসের অবিশ্বস্ততায়। এসব কিছুই উন্মোচন করে দেয় তার অসহায়ত্বকে, ক্রমান্বয়ে যা তাকে নিয়ে যায় সেই ভার্টিগোর দিকে, সেই অনতিক্রম্য পতনের আকাঙ্খায়।

একদিন তার মা ফোন করে তাকে জানায় তার ক্যান্সার হয়েছে, মাত্র কয়েক মাস সে বাচবে। টমাসের বিশ্বাসঘাতকার প্রতি তেরেজার মানসিক হতাশাটিকে এই খবর রুপান্তর করে বিদ্রোহে। ভাবে, সে তার মার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সে নিজেকে তিরষ্কার করে বলে, এমন একটা মানুষের জন্য, যে তাকে ভালোবাসেনা। তার মা তার সাথে যা কিছু করেছে, সে সব অত্যাচার সে সব ভুলে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে; এমন একটা পরিস্থিতিতে সে এখন আছে যে তার মাকে সে বুঝতে পারে: তার মাও তার সৎ বাবাকে তেরেজা যেমন টমাসকে ভালোবাসে, তেমন করে ভালোবেসেছিল এবং তার সৎ বাবা তার মাকে অত্যাচার করেছে তার অবিশ্বস্ততা দিয়ে, ঠিক টমাসও বিশ্বাসঘাতকতা যেমন তাকে তিক্ত করেছে। তার মায়ের প্রতিহিংসা আর তিক্ততার কারন সে অনেক বেশী যন্ত্রনা সহ্য করেছে।

তেরেজা টমাসকে জানায় তার মা অসুস্থ এবং সে এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে তাকে দেখতে যাবে। তার কন্ঠস্বরে ছিল তীব্র ঘৃনা।

তার মায়ের কাছে ফিরে যাওয়াটা তার ভার্টিগো হিসাবে বুঝতে পেরে, টমাস তাকে যেতে নিষেধ করে। ছোট শহরের সেই হাসপাতালে টমাস ফোন করে। সারাদেশ জুড়ে ক্যান্সারের নানা উপাত্ত সংগ্রহ করা হয় সযত্নে, সে কারনে তার খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি আসল সত্যটা খুজে বের করতে: আসলেই তেরেজার মার ক্যানসার হতে পারে এমন কোন সামান্যতম সন্দেহই করা হয়নি, উপরন্তু এমনকি গত এক বছরের বেশী সময় তাকে কোন ডাক্তারের কাছেই যেতে হয়নি।

তেরেজা অবশ্য টমাসের নির্দেশ মেনে নেয় এবং তার মাকে দেখতে যাবার সিদ্ধান্তটা বাতিল করে। এর কয়েক ঘন্টা পরই সে রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাটুতে বেশ ব্যাথা পায়। এরপর হাটার সময় সে ভারসাম্যহীন হতে শুরু করে, প্রায় প্রত্যেকদিনই রাস্তায় সে পড়ে যায়, বা কোন না কোন কিছুর সাথে ধাক্কা খায় বা কমপক্ষে তার হাত থেকে নানা জিনিস পড়তে শুরু করে।

সে আসলে তখন পতিত হবার অনতিক্রম্য সেই তীব্র ইচ্ছায় বন্দী, স্থির একটি ভার্টিগো অবস্থায় সে বেচে ছিল ।

‘আমাকে তোলার জন্য ধরো’ হলো বার বার পতনোন্মুখ কোন ব্যাক্তির বার্তা; টমাস তাকে বার বার তুলে ধরেছে ধৈর্য সহকারে।

১৯

‘আমি আমার স্টুডিওতে তোমার সাথে সঙ্গম করতে চাই, চারিদিকে মানুষে ঘেরা এটা মঞ্চের মত হবে তা, দর্শকদের কাছাকাছি আসতে ‍অনুমতি দেয়া হবে না, কিন্তু তারা আমাদের দিক থেকে চোখও ফেরাতে পারবে না…..’।

বেশ কিছু সময় পার হয়ে গেলে, এই দৃশ্যটি তার মুল নিষ্ঠুরতা বেশ খানিকটা হারিয়ে ফেলে এবং তেরেজাকে তা উত্তেজিত করে তুলতে শুরু করে। তাদের সঙ্গমের সময় সে টমাসের কানে কানে এই দৃশ্যটির বিস্তারিত বিবরণ দিত।

তারপর একদিন তার মনে হলো, টমাসের অবিশ্বস্ততাকে যে শাস্তি হিসাবে সে দেখে সেটা এড়াবার হয়তো একটা পথ আছে: টমাসের সে জন্য যেটা করতে হবে তা হলো, সে যখন তার রক্ষিতার সাথে গোপনে দেখা করতে যাবে, তেরেজাকেও তার সাথে নিয়ে যেতে হবে! হয়ত তখনই কেবল তেরেজার শরীর আবার প্রথম এবং অনন্য হয়ে উঠবে আর সবার মধ্যে। তার শরীর টমাসের ছায়ার মত হবে, তার সহকারী বা তার অল্টার ইগো বা দ্বিতীয় রুপ;

‘আমি তাদের নগ্ন করে দেব তোমার জন্য, তাদেরকে গোছল করাবো, তারপর তোমার কাছে নিয়ে আসবো….’ সঙ্গমের অন্তরঙ্গতায় সে অস্ফুষ্ট স্বরে টমাসকে বলতো। উভলিঙ্গ মানুষের মতো টমাসের সাথে পুরোপুরি মিশে যাবার তীব্র আকা্ঙ্খা অনুভব করে তেরেজা। তখন অন্য রমনীদের শরীর হবে তাদের দুজনেরই খেলার উপকরণ মাত্র।

২০

ওহ, তার বহুগামী জীবনের অল্টার ইগো হওয়া! না, টমাস বিষয়টা বুঝতে অস্বীকার করে, কিন্তু তেরেজা কিছুতেই বিষয়টি তার চিন্তা থেকে বাদ দিতে পারেনা এবং সাবিনার সাথে সে একটা বন্ধুত্ত্ব গড়ে তোলার চেষ্ঠা করে। সাবিনাকে তার একটা সিরিজ ফটোগ্রাফ তোলার প্রস্তাব দিয়ে তেরেজা শুরু করে।

সাবিনা তেরেজা তার স্টুডিওতে আমন্ত্রন করে, এবং অবশেষে সেই বেশ খোলামেলা ঘরটা আর এর কেন্দ্রের সেই বিশাল, চারকোনা, মঞ্চের প্ল্যাটফর্মের মত বিছানাটি দেখার সুযোগ হয় তেরেজার।

‘আমার খুবই খারাপ লাগছে তুমি এর আগে এখানে কখনো আসার সুযোগ পাওনি’, সাবিনা দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা তার ক্যানভাসগুলো তেরেজাকে দেখাতে দেখাতে বলে। এমনকি খুব পুরোনো একটা ক্যানভাসও বের করে, নির্মানাধীন কোন অট্টালিকার ধাতব কাঠামোর, যা সে তার আর্ট স্কুল জীবনে একেছিল। সে সময় যখন একবারে গোড়া রিয়ালিজমই শুধু আশা করা হতো শিক্ষার্থীদের কাছে ( বলা হতো যে শিল্পকর্ম রিয়েলিস্টিক নয়,সে সমাজতন্ত্রের ভিত্তিকে শুষে খায়);  সেই সময়ের দাবী অনুযায়ী, সে আরো কঠোর হবার চেষ্টা করে তার শিক্ষকদের থেকে, এবং সে তুলি আচড় ঢেকে দিয়ে একটি স্টাইলে পেইন্টিং করাকে বেছে নেয়; যেগুলো প্রায় রঙ্গীন ফটোগ্রাফীর মতই ছিল।

‘এই পেইন্টিং টিতে আমি হঠাৎ করে লাল রঙ এর ফোটা ফেলে দিয়েছিলাম। প্রথম, ভীষন খারাপ লেগেছিল, কিন্তু এর পরপরই বিষয়টা আমার ভালো লাগতে শুরু করে। এই গড়িয়ে পড়া রঙ এর ফোটাটা দেখতে মনে হচ্ছিল যেন, একটি ফাটল, পুরো দালান তৈরীর এই জায়গাটাকে এই ফাটলটা যেন রুপান্তরিত করেছে পুরোনো ধ্বংসাবশষের একটা প্রেক্ষাপটে, যে প্রেক্ষাপটের উপর দালানের এর জায়গাটি যেন পেইন্ট করা হয়েছে। আমি এই ফাটলটা নিয়ে কাজ করতে শুরু করি, এটাকে পুর্ণ করি, ভাবি এর পেছনে কি দৃশ্যমান হতে পারে। এবং এভাবে আমার প্রথম চক্রের পেইন্টিং এর কাজ করা হয়, আমি যাদের নাম দিয়েছিলাম বিহাইন্ড দি সিন, অবশ্যই আমি কাউকেই এটি দেখাতে পারিনি দেখালে আমাকে আর্ট অ্যাকাডেমি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হত নির্ঘাৎ। উপরের পৃষ্ঠে, এখানে সবসময়ই নিখুত বাস্তব রিয়েলিষ্টিক জগৎ, যার পিছনে লুকিয়ে থাকে ভিন্ন কোন কিছু,  কোন কিছু রহস্যময়, কোন কিছু বিমুর্ত।

কয়েক মুহুর্তের জন্য বিরতি নিয়ে, সাবিনা যোগ করে,’একটি বোধগম্য মিথ্যা,একটি অবোধ্য সত্যের নীচে’।

অসাধারন একটি মনোযোগ দিয়ে তেরেজা তার কথা শোনে, যা খুব কম শিক্ষকই তাদের শিক্ষার্থীদের চেহারায় কখনো দেখেছে এবং সে সাবিনার সব পেইন্টিংগুলো বুঝতে শুরু করে, অতীত এবং বর্তমানের, সেও এমন  ধারনাকে পোষন করে আসছে; তার প্রত্যেকটি আসলো ‍দুটি থিমের একটি সংযোগের সব বৈশিষ্ট ধারন করছে; দুটো পৃথিবী, বলা যায় যেন তারা প্রত্যেকটি ডাবল এক্সপোজার। একটা প্রাকৃতিক দৃশ্য যেখানে একটি পুরোনো ফ্যাশনের টেবিল ল্যাম্প এর পেছন থেকে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে। এটা আদর্শ স্টিল লাইফ, আপেল, বাদাম, এবং ক্ষুদ্র মোম আলো জ্বালা ক্রিস্টমাস ট্রি, একটি হাত ক্যানভাস ছিড়ে বের হয়ে আসছে।

সাবিনার জন্য তার মন শ্রদ্ধায় ভরে যায়, যেহেতু সাবিনা তাকে বন্ধু হিসাবে মর্যাদা দিয়েছে,এটি এমন একটি শ্রদ্ধা যা ভয় এবং সন্দেহ মুক্ত যা খুব দ্রুত রুপান্তরিত হয় বন্ধুত্বে।

সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, যে সে ছবি তুলতে এসেছিল। সাবিনা তাকে মনে করিয়ে দেয়। অবশেষে তেরেজা পেইন্টিং থেকে চোখ ফেরায়,তার  চোখে পড়ে ঘরের মধ্যে মঞ্চের মত পাতা বিশাল বিছানাটি।

২১

বিছানার পাশেই ছিল ছোট একটা টেবিল, টেবিলের উপর মানুষের মাথার একটি মডেল, যেমনটা হেয়ার ড্রেসারের দোকানে পরচুলা দিয়ে সাজানো থাকে। সাবিনার পরচুলা সাজানোর স্ট্যান্ডটিতে পরচুলার বদলে রাখা একটি বোওলার হ্যাট। সে হেসে বলে, ’এই হ্যাট টি আমার ‍দাদার’।

এই ধরনের টুপি-কালো,শক্ত, গোলাকৃতি, তেরেজা সিনেমাতে শুধু দেখছে এর আগে, চ্যাপলিন যে ধরনের টুপি পরতেন। সেও পাল্টা হাসে, তারপর হাতে নিয়ে কিছুক্ষন মনোযোগ দিয়ে দেখে বলে, ‘তুমি কি চাও ওটা পরে আমি তোমার একটা ছবি তুলে দেই’?

সাবিনা অনেকক্ষন ধরে এই কথা শুনে হাসে, তেরেজা বোওলার হ্যাটটা নামিয়ে রাখে, তার ক্যামেরাটা হাতে নেয় এবং ছবি তোলা শুরু করে।

প্রায় এক ঘন্টা ধরেই সে ছবি তোলায় মগ্ন থাকে, তারপর হঠাৎ করেই সে সাবিনাকে বলে, ‘তোমার কিছু নগ্ন ছবি তুললে কেমন হয়‘?

সাবিনা হাসে, ‘নগ্ন ছবি‘?

‘হ্যা’, তেরেজা বলে; তার প্রস্তাবটাকে আরো সাহসী স্বরে বলে, ’ন্যুড শট’।

’তাহলে তো কিছু পান করতে হবে’, সাবিনা একটি মদের বোতল খুলতে খুলতে বলে।

তেরেজা অনুভব করে তার শরীর অসাঢ় হয়ে আসছে; হঠাৎ করে সে কোন কথা বলতে পারেনা, ততক্ষনে সাবিনা মদের গ্লাস হাতে নিয়ে ঘরের মধ্যে হাটাহাটি করে, তার দাদার গল্প করে যাচ্ছিল, যিনি একটা ছোট শহরের মেয়র ছিলেন, সাবিনা তাকে কখনো দেখেনি, সাবিনার কাছ তার চিহ্ন হিসাবে তিনি শুধু রেখে গেছেন, তার এই বোওলার হ্যাটটা আর একটা ফটোগ্রাফ, যেখানে একটা উচু মঞ্চের উপর দাড়ানো শহরের কিছু গন্যমান্য ব্যাক্তিদের দেখা যাচ্ছে, যাদের একজন সাবিনার দাদা। যদিও স্পষ্ট না মঞ্চের উপর দাড়িয়ে তারা কি করছেন, হতে পারে, তারা কোন শহরের কোন উৎসবের উদ্বোধন করছেন, বা কোন একজন সন্মানিত ব্যাক্তির স্মৃতিসৌধ উন্মোচন করা হচ্ছে, যিনি একসময় এ ধরনের অনুষ্ঠানে বোওলার হ্যাট পরে উপস্থিত থাকতেন।

সাবিন অনবরত বোওলার হ্যাট আর তার পিতামহ নিয়ে কথা বলে যাচ্ছিল, যতক্ষন পর্যন্ত না তার তৃতীয় গ্লাস মদ্যপান শেষ না হয়, এরপর, ‘আমি এক্ষুনি আসছি‘ বলে সে বাথরুমে ঢুকে যায়। সাবিনা যখন বাথরুম থেকে বের হয় তার পরনে শুধু বাথ রোব, তেরেজা ক্যামেরায় চোখের সামনে তোলে, সাবরিনা তার রোবের সামনের অংশটা খুলে ফেলে।

২২

তেরেজার জন্য ক্যামেরা একই সাথে যান্ত্রিক চোখ, যা দিয়ে সে টমাসের রক্ষিতাকে পর্যবেক্ষন করে এবং একটা পর্দা, যা পেছনে তার মুখটাকে ঢেকে রাখে।

সাবিনার বেশ খানিকটা সময় লাগে বাথ রোব থেকে পুরোপুরি বের হয়ে আসার জন্য। সে যতটুকু  আশা করেছিল পরিস্থিতিটা তেরেজার জন্য আরো বেশী কঠিন প্রমানিত হয়েছিল;  বেশ কয়েক মিনিট ছবি তোলার জন্য নানা ভঙ্গী  দেবার পর , সাবিনা তেরেজার কাছে গিয়ে বললো, ‘এখন আমার পালা তোমার ছবি তুলবো; সব কাপড় খোল’!

টমাসের কাছ থেকে  সাবিনা এই নির্দেশটা এত বার শুনেছে, ’সব কাপড় খোল’, যে তার স্মৃতিতে এটি গেথে আছে। এভাবেই টমাসের প্রেমিকা রক্ষিতা টমাসের স্ত্রীকে এই মাত্র টমাসের নির্দেশটাই দিল। দুই রমনী একটি ম্যাজিক শব্দে বাধা পড়লো। এটাই টমাসের একটা পদ্ধতি, হঠাৎ করেই কোন নারীর সাথে চলমান সাদামাটা কথোপকথনকে একটি যৌনউদ্দীপক পরিস্থিতিতে রুপান্তরিত করার জন্য। কোন হালকা আদর, এলোমেলো প্রশংসা, বা কোনধরনের অনুরোধ না করেই সে একটা নির্দেশ ছুড়ে দেয়, খুব অকস্মাৎ, কেউ যখন আশা করেনা, মৃদু অথচ দৃঢ় স্বরে এবং কর্তৃত্বের সাথে এবং অবশ্যই দুর থেকে, এই সময়টাতে যে নারীকে সে নির্দেশ দিচ্ছে তাকে স্পর্শ করেনা টমাস। তেরেজার সাথেও মাঝে মাঝে এর প্রয়োগ করেছে টমাস এবং যদিও সেটা খুবই কোমলভাবে, যেন ফিস ফিস করে, তবু সেটা নির্দেশ, তার তেরেজার জন্য এই আদেশটা মান্য করার সময় যৌনউত্তেজিত হয়ে ওঠার ব্যপারটাতেও কোন ব্যতিক্রম হয়নি। এখন সেই শব্দটাই শুনে সেটা তার মান্য করতে আরো তীব্র ইচ্ছা হয়, কারন এক আগান্তুকের আদেশ মান্য এমনিতেই অন্যরকম পাগলামি, আর পাগলামীটা আরো বেশী তাকে নেশাগ্রস্থ করে কারন এই ক্ষেত্রে  আদেশটা এসেছে কোন পুরুষের কাছ থেকে না, একজন নারী কাছ থেকে।

সাবিনা তার কাছ থেকে ক্যামেরাটা নিজের হাতে নেয়, তেরেজা তার কাপড়গুলো খুলতে শুরু করে। সাবিনার সামনে নিরস্ত্র এবং নগ্ন সে দাড়িয়ে আছে। আক্ষরিক অর্থে ‘নিরস্ত্র’ :  তেরেজা এখন তার সেই যন্ত্রটি থেকে বঞ্চিত, যেটা সে ব্যাবহার করঠিল তার মুখ ঢাকার জন্য আর সাবিনার দিকে অস্ত্র হিসাবে নিশানা করার জন্য। সে এখন পুরোপুরি টমাসের রক্ষিতার দয়ার উপর ভর করে আছে। এই সুন্দর আত্মসমর্পন তেরেজাকেও মত্ত করে। সে কামনা করে সাবিনার মুখোমুখি নগ্ন হয়ে দাড়ানো এই মুহুর্তগুলো যেন কখনোই শেষ হবে না।

আমার মনে হয় সাবিনারও এমনটা মনে হয়েছিল, সেও পরিস্থিতিটার একটি অদ্ভুত মোহে আচ্ছন্ন থাকার অনুভুতিটা অনুভব করেছিল: তার প্রেমিকের স্ত্রী তার সামনে দাড়িয়ে, অনুগত, ভীত, খানিকটা সন্ত্রস্ত। কিন্তু দুই তিনবার শাটারে চাপ দেবার পরই, যেন পরিস্থিতির  সেই মুহুর্তের যাদুতে ভীত হয়ে এবং তার থেকে মুক্তি পাবার তীব্র ইচ্ছায়, বেশ জোরে সাবিনা হেসে উঠে।

তেরেজাও তার মত হেসে ওঠে এবং দুজনেই কাপড় পরতে শুরু করে।

২৩

রুশ সাম্রাজ্যের এর আগের সব অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছিল গোপন ছায়ার অন্তরালে; এক মিলিয়ন লিথুয়ানিয়াবাসীদের জোরপুর্বক দেশান্তর, শত হাজার পোলদের হ্ত্যা, ক্রিমিয়ার তাতারদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, এইসব কিছু অবশিষ্ট আছে শুধু আমাদের স্মৃতিতে, কিন্তু কোন ফটোগ্রাফি বা দৃশ্যমান রেকর্ড এর অস্তিত্ব নেই; সে কারনে আগে বা পরে কোন একসময় তারা দাবী করবেই, এসব মিথ্যা বানোয়াট। ১৯৬৮ সালের চেকোস্লোভাকিয়া আগ্রাসন কিন্ত‍ু তেমন নয়, সারা পৃথিবী জুড়ে নানা আর্কাইভে সেই ঘঠনার স্থির এবং চলচ্চিত্র সংরক্ষিত আছে।

চেক ফটোগ্রাফার এবং ক্যামেরাম্যান খুবই সচেতন ছিল, তারা জানতেনযে, রুশ আগ্রাসনের পর একটাই কাজ অবশিষ্ট আছে যা শুধুমাত্র তারাই ভালোভাবে করতে পারবেন: ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য এই সন্ত্রাসের চেহারাটিকে সংরক্ষন করা চেষ্টা করে যাওয়া। টানা সাত দিন, তেরেজা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে, নানা  বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রুশ সেনা ও তাদের অফিসারদের ছবি তোলার জন্য। রুশদের জানা ছিলনা তারা কি করবে এমন পরিস্থিতিতে। তারা খুব ভালোভাবে নির্দেশিত ছিল, কি করতে হবে, যদি কেউ তাদের লক্ষ্য করে বন্দুক তোলে, গুলি বা পাথর ছোড়ে, কিন্তু কোন নির্দেশই তারা পায়নি, কি করতে হবে যদি কেউ তাদের দিকে ক্যামেরা লেন্স তাক করে।

রোল এর পর রোল ফিল্ম সে ছবি তোলে, এর প্রায় অর্ধেকটা, ডেভোলপ না করেই সে বিদেশী সাংবাদিকদের হাতে তুলে দিয়েছিল ( তখনও চেক সীমানা বন্ধ হয়নি, এবং রিপোর্টাররা যারা সীমানা তখন অতিক্রম করছে, তারা এই ঘটনার যে কোন ধরনের ডকুমেন্ট পেলেই কৃতজ্ঞ ছিল); পশ্চিমা প্রেসে সে সময় তার তোলা অনেক ছবিও ছাপা হয়েছিল। সেগুলো ছিল রুশ ট্যাঙ্কের ছবি, ভয় দেখানো মুষ্ঠিবদ্ধ হাত, ধ্বংস হওয়া বাড়ীঘর, রক্তাক্ত লাল সাদা নীল চেক পতাকায় ঢাকা মৃতদেহ, মটোর সাইকেলে করে সজোরে ট্যাঙ্কের পাশ দিয়ে যাওয়া লম্বা লাঠিতে লাগানো পতাকা সহ চেক তরুনদের ছবি, অবিশ্বাস্য রকম ছোট স্কার্ট পরা চেক তরুনীদের, যারা ভীষনভাবে যৌনক্ষুধার্ত রুশ সেনাদের ক্ষেপিয়ে তুলছিল, রাস্তা ঘাটে যে কাউকে তাদের সামনে চুমু খেয়ে। আমি যেমনটা আগে বলেছিলাম, রুশ আগ্রাসন শুধু একটা ট্রাজেডি ছিলনা, এটা ছিল চেকদের চুড়ান্ত ঘৃনা প্রকাশের একটা কার্নিভাল ( এবং এখন যা ব্যাখ্যাতীত), যা মধ্যে একটা অদ্ভুত উল্লাস ছিল।

২৪

তেরেজা তার সাথে প্রায় পঞ্চাশটি প্রিন্ট সুইজারল্যান্ডে নিয়ে গিয়েছিল, যার প্রত্যেকটি তার নিজ হাতে সযত্নে ডেভেলপ করা তার সর্বোচ্চ দক্ষতার সাথে। সেগুলো সে সুইজারল্যান্ডের একটি বহুল প্রচারিত ছবির ম্যাগাজিনে প্রকাশ করার জন্য তাদের প্রস্তাব করে।পত্রিকাটির সম্পাদক তাকে সাদরে স্বাগত জানান ( সব চেকরা তখনও  দুর্ভাগ্যের জ্যোর্তিবলয় তাদের সাথে নিয়ে ঘুরছে , এবং দয়ালু সুইসদের যা সহজে স্পর্শ করে);  তিনি তেরেজাকে বসতে বলেন, তার ছবির প্রিন্টগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখেন, প্রশংসা করেন এবং তিনি ব্যাখ্যা করেন, সেই ঘটনার পর  নির্দিষ্ট বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে গেছে, আপাতত এই ছবিগুলো তাই তার পত্রিকায় প্রকাশের সামান্যতম সম্ভাবনাও নেই ( তার মানে এই না যে ছবিগুলো সুন্দর না)।

তেরেজা প্রতিবাদ করে বলে, ‘কিন্তু প্রাহাতে তো তা শেষ হয়ে যায়নি’, তার অস্পষ্ট জার্মান ভাষায়, সে তাকে ব্যাখ্যা দেবার চেষ্ঠা করে, যদিও এই মুহুর্তে যখন তার দেশ দখলীকৃত, যা ঘটছে তা সবকিছু তাদের বিরুদ্ধে, ফ্যাক্টরীতে ওয়ার্কারস কাউন্সিল তৈরী হচ্ছে, ছাত্ররা ধর্মঘট করছে, রুশ দের থেকে এই মুহুর্তে দেশ ছেড়ে চলে দাবার দাবীতে, তার সমস্ত দেশ স্বশব্দে একই কথা বলছে যা তারা চিন্তা করছে।

‘সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপার হচ্ছে ! এখানে আর কারো তাতে কিছু যায় আসে না’।

সম্পাদক স্পষ্টতই স্বস্তিবোধ করে যখন তার পত্রিকার একজন মহিলা ফটোগ্রাফার  তার অফিসে ঢোকেন এবং এই কথোপকথনটিতে বাধা পড়ে। মহিলাটি সম্পাদকের হাতে একটা ফোল্ডার এগিয়ে দিয়ে বলেন, ’এই যে নুডিষ্ট বীচ নিয়ে আর্টিকেলটা এখানে আছে’।

সম্পাদক যথেষ্ট সংবেদনশীল একজন মানুষ খানিকটা ভীত হবার জন্য যে, একজন চেক, যে কিনা ট্যাঙ্কের ছবি তুলেছে , তার কাছে বীচে নগ্ন নরনারীদের ফটোগ্রাফ অনেক হালকা মনে হবে। টেবিলের এক প্রান্তে সে সযত্নে ফোল্ডারটি সরিয়ে রাখে এবং দ্রুত মহিলাটিকে বলেন, ‘একজন চেক সহকর্মীর সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দেই. যে আমাদের জন্য বেশ কিছু অসাধারন চমৎকার ছবি তুলে এনেছে’।

মহিলা এরপর তেরেজা সাথে করমর্দন করেন, তারপর তার ফটোগ্রাফগুলো হাতে নিয়ে দেখতে শুরু করেন,  তিনি তেরেজাকে বলেন, ’আমার ঐ ছবিগুলো একবার দেখতে পারো’। তেরেজা ঝুকে পড়ে ফোল্ডারটি হাতে নেয় এবং ছবিগুলো বের করে। প্রায় ক্ষমা চাইবার ভঙ্গিতে সম্পাদক তেরেজাকে বলেন, অবশ্যই ছবিগুলো তোমার ছবি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

তেরেজা বলে, ‘মোটেও না,  সবই  একরকম’।

সম্পাদক এবং মহিলা ফটোগ্রাফার তারা দুজনেই কেউই তাকে বুঝতে পারেনা। এমন কি আমারও কষ্ট হচ্ছে ব্যাখ্যা করতে,তেরেজার মনে তখন আসলে কি ছিল, যখন সে একটা ন্যুড বীচের সাথে রুশ আগ্রাসনকে তুলনা করেছিল। ছবিগুলো দেখতে দেখতেই তেরেজা একটা ছবিতে খানিকটা বেশী সময় নিল, ছবিটা চারজনের একটা পরিবারের, সবাই বৃত্তাকারে দাড়িয়ে আছে: একজন নগ্ন মা তার সন্তানদের উপর ঝুকে আছে, তার বিশাল স্তনটি নীচের দিকে ঝুলছে ছাগল বা গরুর স্তনের মত। বাবাও অন্যদিকে একই রকমভাবে ঝুকে আছে, তার শীশ্ম এবং অন্ডকোষ দেখতেও ক্ষুদ্রাকৃতির গরু বা ছাগলের পালান বা স্তনের মত মনে হচ্ছে।

সম্পাদক তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমার ভালো লাগেনি ,তাইনা’?

‘খু্ব ভালো ফটোগ্রাফ এগুলো’ তেরেজা বলে।

মহিলাটি বলেন, ‘আমার মনে হয় বিষয়বস্তু দেখে সে শকড হয়ে গেছে, আমি তোমার দিকে তাকিয়ে বলতে পারি তুমি কখনোই ন্যুড বীচে পা রাখোনি’।

তেরেজাও বলে, ’না’।

সম্পাদক হেসে বললেন, ‘তুমি দেখেছো , কত সহজ অনুমান করা তুমি কোথা থেকে এসেছো? কমিউনিষ্ট দেশগুলো ভয়ঙ্কর গোড়া’।

খানিকটা  মাতৃসুলভ স্নেহ নিয়ে মহিলা ফটোগ্রাফারটি তেরেজাকে বলে, ’নগ্ন শরীরের কোন সমস্যা নেই, এটা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার আর সবকিছু যা স্বাভাবিক, তা সুন্দর’।

তেরেজার হঠাৎ মনে পড়ে যায়, তাদের ফ্ল্যাটের মধ্য দিয়ে তার মায়ের নগ্ন হাটাহাটি করার দৃশ্যটি;  যেন তখনও সে তার পিছনে তার মায়ের হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছিল, যখন সে দৌড়ে বাসার সব পর্দা টেনে দিচ্ছিল তার মার নগ্নতা যেন রাস্তা থেকে কেউ দেখতে না পায়।

২৫

মহিলা ফটোগ্রাফারটি তেরেজাকে ক্যাফেটেরিয়ায় কফির খাওয়ার জন্য নিমন্ত্রন করে। ‘ঐ ছবিগুলো তোমার, খুব চমৎকার, আমি লক্ষ্য না করে পারলাম যে, নারী দেহের ছবি তোলার ব্যাপারে তোমার অসাধারন শিল্পবোধ আছে। তুমি জানো আমি কি বলতে চাইছি, এই যে প্রলুব্ধ করার ভঙ্গিমায় তরুনীরা’।

‘যে ছবিতে তারা পথচারীদের চুমু খাচ্ছে তারা রুশ ট্যাঙ্কের সামনে দাড়িয়ে?

‘হ্যা, তুমি খুবই ভালো ফ্যাশন ফটোগ্রাফার হতে পারবে, তুমি কি জানো সেটা’? প্রথমে তোমার একজন মডেল জোগাড় করতে হবে, তোমার মত একজন যে একটা ভালো সুযোগ খুজছে; তারপর তুমি তোমার তোলা ফটোগ্রাফের একটা পোর্টফলিও তৈরী করবে এবং বিভিন্ন এজেন্সিতে দেখাবে। তোমার নাম হতে খানিকটা সময় লাগবে স্বাভাবিকভাবেই; এর মধ্যে আমি তোমার জন্য যেটা এখনই এখানে করতে পারি সেটা হলো, বাগান সেকশনের সম্পাদনার দায়িত্বে যিনি আছেন তার সাথে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি। তার কিছু ক্যাকটাস আর গোলাপে ইত্যাদির ছবি তোলা লাগবে’।

তেরেজা তাকে আন্তরিকভাবেই ধন্যবাদ জানায়, কারন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তার বীপরিতে বসা মহিলাটি আসলেই তার সদিচ্ছা থেকে কথাগুলো তাকে বলছে। কিন্তু তখনই সে নিজেকে আপনমনে বলে, কেন ক্যাকটাসের ছবি তুলতে হবে? প্রাহাতে সে যেভাবে তার ক্যারিয়ার তৈরী করেছিল, সেই প্রক্রিয়া জুরিখে পুনরাবৃত্তি করার মত কোন ‌ইচ্ছাই তার ছিল না: সেই কাজ, আর ক্যারিয়ার নিয়ে সংগ্রাম, প্রতিটা ছবি প্রকাশ করা নিয়ে যুদ্ধ। শুধুমাত্র অহঙ্কারের কারনে সে কখনো উচ্চাভিলাষী ছিল না। শুধুমাত্র একটি জিনিসই সে চেয়েছিল, তার মায়ের জগত থেকে পালাতে। এই বিষয়টি তার কাছে স্ফটিক স্বচ্ছ: ছবি তোলার ব্যাপারে যতই তার উৎসাহ থাকুক না কেন, খুব সহজেই সে এই একই ইচ্ছাটা অন্য যে কোন কাজের দিকে ফেরাতে পারতো। ফটোগ্রাফি তার জন্য শুধুমাত্র একটা ‘বড় কিছু’ পাবার চেষ্টা এবং টমাসে পাশে থেকে জীবনটা কাটানোর সুযোগ পাওয়া।

সে বলে, ‘আমার স্বামী একজন ডাক্তার, আমার ভরনপোষন সে করতে পারবে, আমার ছবি তোলার কোন দরকার নেই’।

মহিলা ফটোগ্রাফার উত্তর দেন, ‘আমি বুঝতে পারছি না, এত সুন্দর কাজ করার পর কিভাবে তুমি এই পেশাটাকে ছাড়ার কথা ভাবছো’।

হ্যা, আগ্রাসনের ছবি তোলা সম্পুর্ণ অন্য একটা ব্যাপার, সেটা সে টমাসের জন্য করেনি, নিজের তীব্র আবেগ   থেকেই করেছে। কিন্তু সেই আবেগটা ফটোগ্রাফীর জন্য না, সে কাজটা করেছে তীব্র ঘৃনা থেকে। সেই ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না; আর এই ফটোগ্রাফগুলো যা সে তার তীব্র আবেগ দিয়ে সৃষ্টি করেছে, শুধু সেগুলো আর কেউ চায়না কারন তাদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। শুধু ক্যাকটাসের বছর জুড়ে আবেদন আছে, আর ক্যাকটাসের প্রতি তার কোন আগ্রহই নেই।

সে বলে,‘ সত্যি তুমি খু্ব দয়ালু, কিন্তু আমি বরং বাসায় থাকবো, কোন কাজের দরকার নেই’।

মহিলা জিজ্ঞাস করে, ‘বাসায় বসে থাকলে কি তোমার জীবনের পুর্ণতা আসবে’;

তেরেজা বলে, ‘ক্যাকটাসের ছবি তোলার চাইতে পুর্ণতো বটেই’।

মহিলা বলে, ‘এমনকি যদিও তুমি ক্যাকটাসের ছবি তুলছো, তারপরও তো সেটা তোমার নিজের জীবন, তুমি তোমার স্বামীর জন্য যদি জীবন কাটাও, তাহলে তোমার নিজের বলে কোন জীবন থাকবে না’।

হঠাৎ করেই তেরেজার খুব বিরক্ত লাগলো: ‘আমার স্বামীতো আমার জীবন, ক্যাকটাসরা না’।

মহিলা ফটোগ্রাফ খানিকটা নরম স্বরে বলে, ‘তার মানে তুমি নিজেকে সুখী বলে মনে করছো’ ?

তেরেজা তখনও বিরক্ত বলে, ‘অবশ্যই, আমি ‍সুখী’।

মহিলা বলে,‘ শুধুমাত্র এক ধরনের মহিলারা আছেন, যারা এই কথা বলে তারা খু্বই……’ ,এখানেই কথা শেষ করে সে।

তেরেজা তার বাক্যটা শেষ করে দেয়, ‘…… সীমাবদ্ধ, সেটাই তুমি বোঝাতে চাইছো, তাইনা’?

মহিলা আবার তার কথা নিয়ন্ত্রনে নেয়, ‘সীমাবদ্ধ না, সময়ের জন্য বেমানান’;

‘তুমি ঠিক বলেছো’, তেরেজা বিষন্নতার সাথে উত্তর দেয়,’ ঠিক  এ কথাটা আমার স্বামী আমার সম্বন্ধে বলে’।

২৬

কিন্তু টমাসকে একটানা বহু সময় কাটাতে হয় হাসপাতালে, এবং তেরেজাকে বাসায় থাকতে হয় একা। নিদেনপক্ষে তেরেজার কাছে কারেনিন আছে, তাকে নিয়ে অনেক দুর হাটাতে যেতে পারে সে। তারপর আবার বাসায় ফিরলে সে ব্যস্ত হয় জার্মান এবং ফরাসী গ্রামার পড়া নিয়ে। কিন্তু বিষন্নতা তাকে গ্রাস করে, মনোযোগ দিতে পারে না সে। বারবার তার, মস্কো থেকে ফেরার পর দুবশেক [৪] এর ভাষনটার কথা মনে পড়ে; যদিও সে পুরোপুরি ভুলে গেছে সেই ভাষনের দুবশেক  কি কি বলেছিলেন, কিন্তু সে এখনও শুনতে পায়, তার কাপা কাপা গলার স্বর। সে ভাবে, কেমন করে একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, তার নিজের দেশেই তাকে ভীনদেশী সৈন্যরা গ্রেফতার করে, ইউক্রেনীয় কোন পর্বতমালার কোথাও তাকে  চারদিন বন্দী করে রাখা হয়, তাকে জানানো হয়, তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে, ঠিক যেমন করে এর দশ বছর আগে তারা তাদের হাঙ্গেরীয় প্রতিপক্ষ ইমরে নাগীকে[৫] হত্যা করেছিল- এরপর তাকে মস্কোতে পাঠানো হয়, তাকে আদেশ দেয়া হয়, গোছল করতে এবং দাড়ি গোফ কামাতে, তার কাপড় বদলে একটা টাই পরে নিতে এবং তাকে তারপর জানানো হয় তার মৃত্যুদন্ডাদেশ পরিবর্তন করা  হয়েছে, নির্দেশ দেয়া হয় আরো একবার নিজেকে চেক রাষ্ট্রপ্রধান ভাবতে, ব্রেজনেভের বীপরিতে টেবিলে তাকে বসানো হয় এবং  জোরপুর্বক তাকে দিয়ে কাজ করানো হয়।

অপমানিত, দুবশেক দেশে ফিরে এসে তার দেশের অপমানিত জনগনের উদ্দেশ্যে ভাষন দেন; এত বেশী অপমানিত হয়েছিলেন,যে কোন কথাই তিনি বলতে পারছিলেন না। তেরেজা কোনদিনও ভুলবে না, তার ভাষনে বাক্য মধ্যবর্তী দীর্ঘ বিরতিগুলোকে। তিনি কি খুবই ক্লান্ত ছিলেন? অসুস্থ? তাকে কি কোন ঔষধ খাওয়ানো হয়েছিল? নাকি, সেটা শুধু হতাশা ছিল ? দুবশেক এর যদি কোন কিছু অবশিষ্ট নাও থাকে, অন্ততপক্ষে ভাষনের সেই ভয়ঙ্কর দীর্ঘ বিরতিগুলো অবশিষ্ট থাকবে চিরকাল, যখন মনে হচ্ছিল তিনি শ্বাস নিতে পারছেননা, বাতাসের জন্য হাহাকার করছেন আর সমস্ত জাতির রেডিওতে কান পেতে অপেক্ষা করছিল। এই বিরতিগুলোর মধ্যেই নিহিত ছিল তাদের দেশ কি ভয়াবহ বিপর্যয়ের  মুখে পড়েছে।

রুশ আগ্রাসনের সপ্তম দিন সেটি। তেরেজা ভাষনটা শুনেছিল একটি পত্রিকার সম্পাদকের অফিসে, যা রাতারাতি রুপান্তরিত হয়েছিল রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধের অংশ হিসাবে। সেই মুহুর্তে সবাই দুবশেককে ঘৃনা করেছিল।সমঝোতা করার জন্য সবাই তাকে ভৎর্সনা করেছিল, তার অপমান দিয়েই সবাই অপমানিত বোধ করেছিল, তার দুর্বলতা তাদের আঘাত করেছিল।

জুরিখে বসে সেই দিনগুলোর কথা ভাবার সময়, তেরেজার সেই মানুষটাকে আর অসহ্য বোধ হয়না। ‘দুর্বল’ শব্দটা আর বিচারের অপরিবর্তনযোগ্য রায়ের মত শোনায় না। যে কোন মানুষ তার চেয়ে শক্তিশালী কারো মুখোমুখি দুর্বল, যতই  দুবশেকের মত পেটানো খেলোয়াড়ের শরীর থাকুক না কেন। সেই দুর্বলতাটা যে একসময় মনে হয়েছে দু:সহ আর ঘৃণ্য, যে দুর্বলতা তেরেজা আর টমাসকে দেশত্যাগ করতে প্ররোচিত করেছে, হঠাৎ করে তাকে তা আকর্ষন করে। সে বুঝতে পারে, সে আসলে দুর্বলদের দলেরই একজন, দুর্বলদের শিবিরে, দুর্বলদের দেশের একজন এবং তাকে এদের প্রতিই বিশ্বাসভাজন থাকতে হবে কারন তারা দুর্বল, বাক্যের মাঝামাঝি যারা শ্বাস নেবার জন্য বাতাস খোজে।

ভার্টিগোর মতই সে তাদের দুর্বলতার প্রতি আকর্ষন অনুভব করে। সে আকর্ষন বোধ করে কারন, সে নিজেকেও  দুর্বল ভাবে। আবার সে ঈর্ষায় আক্রান্ত হয়, তার হাত আাবার কাপতে শুরু করে। যখন টমাস ব্যাপারটা লক্ষ্য করে, সাধারনত সে যেটা করে তাই করে: সে তার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে , জোরে চাপ দিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। তার হাত থেকে তেরেজা হাত সরিয়ে নেয়।

সে জিজ্ঞাসা করে, ‘কি হয়েছে’?

‘কিছু না’।

’তোমার জন্য কি আমি কি করবো তুমি চাও’?

‘আমি চাই তুমি বুড়ো হয়ে যাও, আরো দশ বছর বেড়ে যাক, বিশ বছর!’; তেরেজা যেটা বোঝাতে চাইছিল তা হলো, ‘আমি চাই তুমি দুর্বল হও, আমার মত দুর্বল’।

২৭

তাদের কুকুর কারেনিনের সুইজারল্যান্ডে আসাটা একদম পছন্দ হয়নি, যে কোন ধরনের পরিবর্তন কারেনিন ঘৃনা করে। কুকুরের সময়তো সরলরৈখিকভাবে প্লট করা যাবেনা, এটা চলতেই থাকে না, একটা কিছু থেকে পরবর্তী অন্য কিছু। বরং এটা বৃত্তাকার ঘড়ির কাটার মত, যা – এবং তারাও, দ্রুত পাগলের মত সামনের দিকে দৌড়াতে অনিচ্ছুক – ফিরে আসে মুখ ঘুরিয়ে দিনের পর দিন একই পথ ধরে। প্রাহাতে টমাস আর তেরেজা যখন কোন নতুন চেয়ার কেনে বা ফুলের টব নাড়া চড়া করে, কারেনিন অসন্তুষ্টির চোখে তাকাতো, এটা তার সময়ের বোধকে এলোমেলো করে দিত, যেন তারা ঘড়ির কাটাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে এর উপরের সময় চিহ্নের সংখ্যা বদলে দিয়ে;

যাইহোক জুরিখের ফ্ল্যাটেও, খুব তাড়াতাড়ি সে আগের অবস্থা, আগের আচারও সে পুনপ্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রাহাতে থাকাকালীন সময়ের মতই খুব সকালে সে বিছানায় ঝাপিয়ে পড়ে নতুন দিনকে শুভেচ্ছা জানাতো, সকাল বেলা বাজারের সময় তেরেজার সঙ্গী হতো, এবং নিশ্চিৎ করতো তার ভাগের অন্যান্য হাটাগুলোও যেন ঠিক থাকে।

কারেনিনকে তাদের জীবনের ঘড়ি বলা যায়। হতাশার সময়, তেরেজা নিজেকে মনে করিয়ে দিত, কারেনিনকেও তার দেখে রাখতে হবে, কারন সে তার চেয়েও দুর্বল, হয়তো দুবশেক এবং তার পরিত্যক্ত জন্মভুমি থেকে।

একদিন বাইরে থেকে হেটে তেরেজা এবং ক্যারেনিন যখন ঘরে ফেরে, তখন ফোনটা বাজছিল, সে ফোনটা ধরে জিজ্ঞাসা করে, কে বলছেন;

অপরদিকে একটি নারীর কন্ঠস্বর, জার্মান ভাষায় জানায় সে টমাসকে খুজছে। অস্থির একটা গলার স্বর। তেরেজার মনে হলো খানিকটা অবজ্ঞা মেশানো ঠাট্টার আভাস ছিল সেই নারীকন্ঠে। যখন সে তাকে জানালো, টমাস বাসায় নেই এবং সে জানেনা কখন সে ফিরবে, লাইনের অপর প্রান্তের মহিলা হাসতে শুরু করে এবং কোন বিদায় সম্ভাষন ছাড়াই ফোনটা রেখে দেয়।

তেরেজা , এটা এমন কোন ব্যাপার না; নার্স হতে পারে, কোন রোগী বা সেক্রেটারী, কিংবা যে কেউই। কিন্তু তারপরও সে বিরক্ত হয়, কোন কাজে মন বসাতে পারেনা। এই সময় সে বুঝতে পারে তার বাড়িতে থাকার সময়কার সেই শক্তির শেষ  বিন্দুটি সে হারিয়ে ফেলেছে; চুড়ান্তরকম তুচ্ছ কোন কিছু সহ্য করার ক্ষমতাও তার এখন নেই। ভীন দেশে থাকা মানে নীচের রক্ষা জাল ছাড়াই শুন্যে টান টান করে বাধা দড়ির উপরে হাটার মত, নিজ দেশে যে রক্ষা জাল যোগায় স্বজন, সহকর্মী বা সুহৃদরা। যেখানে তার শৈশব থেকে পরিচিত ভাষায় সে সহজে যা বলতে চায়, বলতে পারে। প্রাহাতে শুধুমাত্র হৃদয়ের ব্যপারে সে টমাসের উপর নির্ভরশীল ‍ছিল, কিন্তু এখানে সে সবকিছুর জন্যই নির্ভরশীল টমাসের উপর। তার কি হবে এখানে যদি সে তাকে ছেড়ে চলে যায় ? সে কি তাকে হারানোর ভয় নিয়েই সারা জীবন কাটাবে।

নিজেকেই সে বলে: তাদের পরিচয় প্রথম থেকেই একটা ভুলের উপর প্রতিষ্ঠিত;  তার বাহুর নীচে ’আনা কারেনিনা’ বইটি অনেকটা জাল কাগজ পত্রের মত; টমাসকে যা একটা ভুল ধারনা দিয়েছিল তার সম্বন্ধে। তাদের ভালোবাসা সত্ত্বেও, একে অপরের জীবনকে তারা নারকীয় করে তুলেছে। তারা যে একে অপরকে ভালোবাসে, এই সত্যটা  শুধুমাত্র প্রমান করে যে, অপরাধটা আসলে তাদের মধ্যে কোন কিছুর নয়, তাদের আচরনে বা তাদের অনুভুতির অনিত্যতায় নয় বরং তাদের পারস্পরিক বিসঙ্গতিতে। টমাস শক্তিমান, তেরেজা দুর্বল। তেরেজা দুবশেকের মত, যে বাক্যের মধ্যে ত্রিশ সেকেন্ড বিরতি নেয়। সে তার দেশের মত, যে তোতলায়, একটু শ্বাস নেবার জন্য বাতাস খোজে, কথা বলতে পারেনা।

কিন্তু যখন শক্তিশালী এতই দুর্বল হয় যে দুর্বলকে আঘাত করতে পারেনা, দুর্বলের তখন শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন প্রস্থান করার জন্য।

নিজেকে এইসব কথা বলে, সে কারেনিনের লোমশ মাথায় তার মুখটা চেপে ধরে বলে, ‘দু:খিত কারেনিন, মনে হচ্ছে তোমাকে আবার অন্য কোথাও যেতে হবে’।

২৮

ট্রেন কম্পার্টমেন্টের এক কোনায় চাপাচাপি করে বসা, মাথার উপরে র‌্যাকে ভারী সুটকেস, দুই পায়ের মাঝখানে ক্যারেনিন, তেরেজা বার বার তার মায়ের সাথে থাকার সময় তার পুরাতন কর্মস্হলের সেই হোটেলের রেস্ট্যুরেন্টের বাবুর্চির কথাই ভাবতে থাকে ; সেই বাবুর্চিটা যখনই সুযোগ পেয়েছে, তেরেজার নিতম্বে হাত ছুইয়েছে এবং সবার সামনে কখনো জিজ্ঞাসা করতে ক্লান্ত হয়নি, কবে তেরেজা তার কথা মানবে এবং তার শয্যাসঙ্গিনী হবে। ব্যাপারটা অদ্ভুত, তেরেজার তার কথাই মনে আসলো; সবসময়ই তেরেজা যা কিছু মনে প্রানে ঘৃণা করে তার শ্রেষ্ঠতম উদহারন ছিল সেই লোকটি। আর এখন যে যা শুধু ভাবতে পারছে তা হলো, তাকে খুজে বের করে বলবে, ‘তুমি তো আমার সাথে শুতে চাইতে, বেশ, আমি এসেছি’।

এমনকিছু করার জন্য তার তীব্র ইচ্ছা হচ্ছিল, যা টমাসের কাছে তার ফিরে যাওয়াটা চিরতরে ঠেকাতে পারে। তেরেজা তার  জীবনের এই অতীত সাতটা বছর নৃশংসভাবে ধ্বংশ করতে চেয়েছিল। এটি ছিল সেই ভার্টিগো, সেই মত্ত, অনতিক্রম্য পতনের তীব্র ইচ্ছা।

আমরা এটাও হয়তো বলতে পারি, ভার্টিগো হচ্ছে দুর্বলদের জন্য নেশায় মত্ত হবার মত একটা অবস্থা। মানুষ তার দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, যুদ্ধ করার চেয়ে পরাজয় মেনে নেয়ার। তার দুর্বলতায় সে তখন নেশাগ্রস্থ, সে আরো দুর্বলতর হতে চায়, সবার সামনে প্রধান চত্ত্বরে সে পতিত হতে চায়, আরো নীচে, নীচ থেকেও আরো নীচে।

মনে মনে সে ঠিক করে প্রাহার বাইরে সে থাকবে, তার ফটোগ্রাফারের পেশাও সে ছেড়ে দেবে, সে তার সেই ছোট শহরে পালিয়ে যাবে, যেখান থেকে টমাসের কন্ঠস্বর একসময় প্রলোভন দেখিয়ে তাকে বের করে এনেছিল।

কিন্তু প্রাহাতে আসার পর সে বুঝতে পারলো, এখানে কিছু সময় তাকে থাকতেই হবে, বেশ কিছু বিষয়ের সমাধান করার জন্য। যা তার শহর থেকে প্রস্থানের ব্যাপারটা প্রলম্বিত করে যাচ্ছিল।

পঞ্চম দিনে, হঠাৎ করে টমাস এসে উপস্থিত, কারেনিন তারা গায়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল, সুতরাং বেশ কিছুক্ষন সময় লেগেছে, তাদের নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করতে।

অনুভব করেছে, তারা যেন বরফ ঢাকা কোন মাঠের মধ্যে দাড়িয়ে আছে, ঠান্ডায় কাপছে।

তারপর তারা দুজনে একসাথে এগুতে শুরু করে, এর আগে কোনদিনও চুমু খায়নি এমন প্রেমিক প্রেমিকা যুগলের মতো।

টমাস জানতে চায়, ‘সবকিছু ঠিক আছে তো?’

তেরেজার উত্তর ছিল, ’হ্যা’।

’তুমি তোমার আগের ম্যাগজিনের ওখানে গিয়েছিলে’?

’আমি ওদের ফোন দিয়েছিলাম’,

’তারপর?’

’না, এখনও উত্তর পাইনি, আমি অপেক্ষা করছি’।

‘কিসের জন্য’?।

তেরেজা এর কোন উত্তর দেয়নি। সে তো টমাসকে বলতে পারেনা যে, তার জন্য সে অপেক্ষা করছিল।

২৯

এবার আমরা ফিরে যাই সেই মুহুর্তে, যা আমরা আগেই জানি। টমাস হতাশাজনক ভাবে অসুখী এবং তার পেটে ব্যাথা করছিল। গভীর রাত না হওয়া অবধি সে ঘুমাতে পারেনি।

এর পর পরই তেরেজা জেগে যায়, ( প্রাহার আকাশে রুশ বিমানের পাহারা ছিল সেই সময়ে নৈমিত্তিক ব্যাপার, আর সেই বিকট শব্দের কারনে ঘুমানো প্রায় অসম্ভব ছিল); তার প্রথম চিন্তা ছিল, টমাস ফিরে এসেছে শুধু তার কারনেই, শুধু তারই কারনে, তেরেজা তার নিয়তিকে বদলে দিয়েছে, এখন টমাস আর তার জন্য দায়ী না, এখন তেরেজাই তার সবকিছুর জন্য দায়ী।

এই দ্বায়িত্ব, সে অনুভব করেছিল, তার যতটুকু শক্তি আছে, তার চেয়ে আরো বেশী শক্তির দরকার।

কিন্তু প্রায় এক সাথে তার মনে পড়লেো, আগের দিন তাদের ফ্ল্যাটের দরজায় টমাস এসে  উপস্থিত হবার আগে, চার্চের বেলে ছয়টা বাজার ধ্বনি। যেদিন তাদের প্রথমবারের মত দেখা হয়েছিল, তার কাজের শিফটও শেষ হয়েছিল ছয়টায়, হলুদ বেন্চের উপর তার সামনে বসে থাকতে সে দেখেছিল, তখনও সে শুনেছিল গীর্জার ঘন্টায়  ছয়টা বাজার সংকেত।

না,এটা কোন কুসংস্কার না, এটাই ছিল তার সৌন্দর্যবোধ, যা তার হতাশাকে নির্মুল করতে পেরেছিল এবং নতুন করে বাচার ইচ্ছায় তাকে পূর্ণ করে তুলেছিল। ডানা ঝাপটানো দৈব ঘটনার পাখিরা আরো একবার তার কাধে জায়গা নেয়। তার চোখে তখন অশ্রু এবং  পাশে শোয়া টমাসের নিশ্বাসের শব্দে সে ‍অনির্বচনীয়ভাবে সুখী।.

__________________

[১] Einmal ist keinmal:  একটি জার্মান প্রবাদ, যার  ইংরেজী অর্থ Once is never।
[২]  http://en.wikipedia.org/wiki/Francis_of_Assisi :  It is said that, one day, while Francis was traveling with some companions, they happened upon a place in the road where birds filled the trees on either side. Francis told his companions to “wait for me while I go to preach to my sisters the birds.” The birds surrounded him, intrigued by the power of his voice, and not one of them flew away.
[৩] mo·tif :১. a recurring subject, theme, idea, etc., especially in aliterary, artistic, or musical work. ২. distinctive and recurring form, shape, figure, etc., in adesign, as in  a painting or on wallpaper.
[৪] Alexander Dubček ; 27 November 1921 – 7 November 1992) was a Slovak politician and briefly leader of Czechoslovakia (1968–1969),
famous for his attempt to reform the communist regime during the Prague Spring. Later, after the overthrow of the government in 1989,
he was Chairman of the federal Czecho-Slovak parliament. (http://en.wikipedia.org/wiki/Alexander_Dub%C4%8Dek)
[৫] Imre Nagy (7 June 1896 – 16 June 1958) was a Hungarian communist politician who was appointed Chairman of the
Council of Ministers of the People’s Republic of Hungary on two occasions. Nagy’s second term ended when his non-Soviet-backed government was brought down by Soviet invasion in the failed Hungarian Revolution of 1956, resulting in Nagy’s execution on charges of treason two years later. (http://en.wikipedia.org/wiki/Imre_Nagy)

Advertisements
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: দ্বিতীয় পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s