রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : তৃতীয় অধ্যায়


The first principle is that you must not fool yourself—and you are the easiest person to fool. Richard Feynman (1974)
(ছবি: স্টিভ পিক্সোটো)

রিচার্ড  রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : প্রথম এবং দ্বিতীয় অধ্যায়

 রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : তৃতীয় অধ্যায় ( অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)
The God Delusion by Richard Dawkins 

:ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে প্রস্তাবিত কিছু যুক্তি:

ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপনার কোন জায়গা আমাদের কোন প্রতিষ্ঠানে থাকা উচিৎ নয়। টমাস জেফারসন

ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে যুক্তিগুলো বহু শতাব্দী ধরেই বিধি হিসাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংকলন করেছেন ধর্মতত্ত্ববিদরা, পরবর্তীতে যেখানে আরো সংযোজন করেছেন অন্যরা, এমনকি ভ্রান্ত ’সাধারন কান্ডজ্ঞান’ এর সরবরাহকারীরাও।

টমাস আকোয়াইনাস এর ’প্রমান সমুহ’:

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে টমাস আকোয়াইনাস (Thomas Aquinas) যে পাচটি ’প্রমান’এর দাবী করেছেন, আসলে তারা কিছুই প্রমান করে না এবং খুব সহজেই -(যদিও বলতে ইতস্ততবোধ করছি, বিশেষ করে তাঁর মতো এমন সুবিখ্যাত কোন কারো যুক্তি) -একে অন্তসারশুন্য প্রমান করা সম্ভব। প্রথম তিনটি  মুলত একই বিষয়কে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে – তাই এই তিনটি যুক্তি নিয়ে একসাথে আলোচনা করা যেতে পারে। প্রত্যেকটি মুলতঃ ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার একটি অনন্ত প্রক্রিয়া বা  ইনফিনিট রিগ্রেস – যেখানে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর আরেকটি পূববর্তী প্রশ্নের জন্ম দেয় -এভাবেই চলতে থাকে অনন্ত কাল।

১. আনমুভড মুভার বা স্থবির চালিকাশক্তি: কিছুই সচল হতে পারেনা আগে যদি কোন চালক না থাকে। যা আমাদের ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার একটি অনন্ত প্রক্রিয়ার দিকে নিয়ে যাবে, যার থেকে মুক্তি পাওয়ার একটাই উপায় – ঈশ্বর। কোন না কোন কিছুকে প্রথমে চালকের দ্বায়িত্ব নিতে হয়েছিল আর আমরা সেই প্রথম চালককে বলছি ঈশ্বর।

২. আনকসড কস বা পূর্বকারনহীন কারন: কোন কিছুই নিজে নিজে ঘটে না। প্রত্যেকটি পরিনতির একটি প্রাক কার্য্যকারন আছে, এবং এভাবে আবারো সেই ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার একটি অনন্ত প্রক্রিয়ায় দিকে ঠেলে দেয়া হবে আমাদের। তাই এটাকে শেষ করতে হবে একটি প্রথমতম কারন দিয়ে, যাকে আমরা বলছি ঈশ্বর।

৩. কসমোলজিকাল আর্গুমেন্ট বা মহাজাগতিক যুক্তি: এমন কোন একটা সময় অবশ্যই ছিল যখন কোন ধরনের ভৌতপদার্থেরই অস্তিত্ব ছিল না। যেহেতু বর্তমানে ভৌতপদার্থের অস্তিত্ব আছে সেহেতু নিশ্চয়ই কোন অভৌত কিছু ছিল যা বর্তমানে এসব কিছুর অস্তিত্ত্বের কারন,এবং সেই কোনকিছুকে আমরা বলছি ঈশ্বর।

এই তিনটি যুক্তিই নির্ভর করে আছে ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার ধারনা বা ইনফিনিট রিগ্রেস এর উপরে এবং যেখানে ঈশ্বরের নাম ব্যবহার করে এই ক্রমান্বয়ে পশ্চাদগমনকে থামানো হয়। এই যুক্তির সমর্থনকারীরা সম্পুর্ণ অনায্যভাবে যে পূর্বধারনাটি পোষন করেন, তা হলো, তাদের প্রস্তাবিত ’ঈশ্বর’ এই পশ্চাদগমনশীল যুক্তি প্রক্রিয়ার আওতামুক্ত। এমন কি যদি আমরা কাল্পনিকভাবেও কোন অসীম পশ্চাদগমনশীল একটি যুক্তি প্রক্রিয়ায় কাল্পনিকভাবে সৃষ্টিকরা একজন সমাপ্তকারীর অস্তিত্ত্ব সংক্রান্ত সন্দেহজনক বিলাসিতাকে শুধুমাত্র প্রয়োজনের খাতিরে পশ্রয়ও দেই, সেক্ষেত্রেও কিন্তু কোন কারনই নেই, সেই কাল্পনিক সমাপ্তকারীর উপর সেই সব গুনাবলীগুলো আরোপ করা, যা আমরা স্বাধারণতঃ ’ঈশ্বর’ এর উপর আরোপ করে থাকি: সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞতা, দয়াপরায়নতা, সৃষ্টির সৃজনশীলতা, এছাড়াও মানবিক ব্যপারগুলোতো আছেই যেমন, প্রার্থনা শোনা,পাপের ক্ষমা করা এবং যে কারো গোপন গভীরতম চিন্তা সম্বন্ধে সম্যক ধারনা রাখা। ঘটনাচক্রে যুক্তিবিদদের কিন্তু দৃষ্টি এড়ায়নি যে, সর্বশক্তিমান আর সর্বজ্ঞতা পরস্পর বিরুদ্ধ। যদি ঈশ্বর সর্বজ্ঞ হয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই আগে থেকেই তার জানা আছে যে, তিনি কিভাবে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে হস্তক্ষেপ করবেন তার অসীম শক্তি দ্বারা। কিন্তু তার মানে, তিনি তার হস্তক্ষেপ সম্বন্ধে কোনভাবেই তার নেয়া সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তন করতে পারবেন না, এর অর্থ দাড়ায় তিনি আসলে সর্বশক্তিমান নন। কারেন ওয়েনস (Karen Owens) এই বুদ্ধিদীপ্ত প্যারাডক্স বা ধাধাকে সমপর্যায়ের একটা আকর্ষনীয় কবিতায় প্রকাশ করেছেন:

সর্বজ্ঞ ঈশ্বর কি পারেন, যিনি
ভবিষ্যত জানেন, তার
অসীম শক্তি দিয়ে
তার ভবিষ্যত মনকে বদলাতে?

ক্রমান্বয়ে পূর্ববর্তী মতে ফিরে যাওয়ার অসীম প্রক্রিয়া আর কাল্পনিক ঈশ্বরকে সেটি শেষ করার কারন হিসাবে ব্যবহার করার করার অসারতা প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসি। বিষয়টা আরো অনেক মিতব্যায়ীতার মাধ্যমে করা যায়,যদি আমরা এর বদলে অন্য কিছু কল্পনা করে নেই , যেমন, ধরুন একটি ’বিগ ব্যাঙ্গ সিঙ্গুলারিটি’ অথবা অন্য কোন ভৌত ধারনা যা এখনো আমাদের অজানা। একে ঈশ্বর বলে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে এর সবচেয়ে ভালো পরিনতি হচ্ছে এর  উপযোগিতাহীনতা এবং সবচেয়ে খারাপ পরিনতি হলো, এটি অত্যন্ত ক্ষতিকারক একটি ছলনা।  এডওয়ার্ড লিয়ার  (Edward Lear) এর ’ক্রামববলিয়াস কাটলেট’ এর আবোলতাবোল অর্থহীন রেসিপি যেমন আমাদের আমন্ত্রন জানায়: ‘কয়েক টুকরো গরুর মাংশ যোগাড় করুন, এবার তাদের টুকরো টুকরো করে কাটুন, সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম আকারের টুকরো করে, এরপর এদের আরো ছোট করে কাটার চেষ্টা করুন, আট কিংবা সম্ভব হলে আরো নয় বার’, কিছু পশ্চাদগমনশীল যুক্তি প্রক্রিয়া বা রিগ্রেস প্রাকৃতিকভাবেই একটি জায়গায় শেষ হয়। বিজ্ঞানীরা কল্পনা করেছিলেন, কি হতে পারে, যদি আমরা কোন কিছুকে খুবই ক্ষুদ্রতম টুকরো করে কাটতে পারি, ধরুন, এক টুকরো সোনার খন্ডকে, প্রথমে দুইভাগ, তারপর ক্রমাগত ভাবে  আরো ক্ষুদ্রতম কোন সোনার খন্ডাংশে। এক্ষেত্রে রিগ্রেস অবশ্যই নি:সন্দেহে শেষ হবে  অ্যাটম বা পরমানুতে। সোনার টুকরার সম্ভাব্য সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অংশ হবে এর নিউক্লিয়াস, যেখানে উনআশিটি প্রোটন আছে এবং এর চেয়ে কিছু বেশী সংখ্যক নিউট্রন আছে,  যার চারপাশে ঘুরছে উনআশিটি ইলেক্ট্রন। কেউ যদি সোনাকে এর অ্যাটমের চেয়ে আরো  ‍ক্ষুদ্র অংশে কাটতে চান, সেখানে যা থাকবে, তা আর যাই হোক, সোনা নয়। পরমানু বা অ্যাটম হচ্ছে ‘ক্রামববলিয়াস কাটলেট’ ধরনের কোন রিগ্রেস এর প্রাকৃতিক শেষ বিন্দু। সুতরাং এটি আদৌ স্পষ্ট না, ঈশ্বর কিভাবে আকোয়াইনাসের প্রস্তাবিত রিগ্রেসের প্রাকৃতিক শেষ বিন্দু হতে পারেন, হালকা ভাবে যদি বলি; আমরা পরে আরো বিস্তারিত দেখবো। আপতত বরং আকোয়াইনাসের তালিকায় ফিরে যাই।

৪. ডিগ্রী বা মাত্রা থেকে যুক্তি বা আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিগ্রী:  আমরা লক্ষ্য করি যে পৃথিবী প্রতিটি জিনিসই ভিন্ন। আমরা জানি যে একটা মাত্রা আছে সবকিছুরই, যেমন, ভালোত্ত্ব এবং উৎকর্ষতার। কিন্তু আমরা সেই মাত্রা পরিমাপ বা বিচার করি, এই বৈশিষ্টগুলোর সর্ব্বোচ্চ কোন একটি মাত্রাকে আদর্শ হিসাবে ধরে নিয়ে। মানুষ ভালো খারাপ দুটোই হতে পারে, সুতরাং চুড়ান্ত মাত্রার ভালোত্ত্ব  মানুষের মধ্যে খুজে পাওয়া যায় না; সেকারনে নিশ্চয়ই  কোন সর্ব্বোচ্চর অস্তিত্ব আছে যা  উৎকর্ষতার একটি চুড়ান্ত মানদন্ড তৈরী করে, আমরা সেই চুড়ান্ত মানদন্ডকে বলছি ঈশ্বর।

এটা কি কোন যুক্তি হতে পারে? আপনি হয়তো বলতে পারেন, প্রত্যেকটা মানুষ তাদের গায়ের দুর্গন্ধের বিভিন্ন মাত্রা আছে, কিন্তু আমরা সেই মাত্রা মাপতে পারি, শুধু একটি নিখুত সর্ব্বোচ্চ মাত্রার দুগন্ধর একটি মানদন্ডের সাথে তুলনা করার মাধ্যমে। সুতরাং নিশ্চয়ই কিছুর অস্তিত্ব আছে যা তুলনাহীনভাবে দুর্গন্ধযুক্ত এবং আমরা তাকে বলছি ঈশ্বর। অথবা তুলনা করা জন্য অন্য যে কোন বৈশিষ্টকে ব্যবহার করুন না কেন, আপনি একই ভাবে এই ফাকা নির্বোধ কোন উপসংহারে পৌছাতে পারবেন।

৫. দি টেলিওলজিক্যাল বা পরমকারনবাদের যুক্তি বা ডিজাইন বা পরিকল্পনা থেকে যুক্তি বা আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইন:  এই পৃথিবীতে সবকিছু, বিশেষ করে জীবন আছে এমন সবকিছু, দেখলে দেখে মনে হয় যেন তাদের ডিজাইন বা পরিকল্পনা করে বানানো হয়েছে। যদি না তাদের আসলেই ডিজাইন করা হয়ে থাকে, কোন কিছুই কিন্তু আমাদের দেখে মনে হয় না  তা ডিজা্ইন করা হয়েছে, সেকারনে অবশ্যই কোন ডিজাইনারের অস্তিত্ব আছে এবং আমরা তাকে বলি ঈশ্বর [১]; আকোয়াইনাস নিজেই একটি তীরের নিশানার দিকে ধাবমান হবার রুপক ব্যবহার করেছিলেন, কিন্তু মনে হয় আধুনিক হিট-সিকিং অ্যান্টি এয়ার ক্র্যাফট মিসাইলের বা তাপ-সন্ধানী বিমান ধ্বংশকারী ক্ষেপনাস্ত্র তার উদ্দেশ্যর সাথে বেশী যথাযুক্ত হতো।

এই ‘আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইন’, তার এই একটি মাত্র যুক্তি যা আজো প্রায়ই ব্যবহৃত হচ্ছে। এবং অনেকের কাছে এটি চুড়ান্ত নকডাউন আর্গুমেন্ট বা তর্ক জয়কারী যুক্তির মত। কেমব্রিজে আন্ডারগ্রাজুয়েট ছাত্র থাকাকালীন তরুন চার্লস ডারউইনকেও একসময়  এই যুক্তিটি আকর্ষন করেছিল, যখন তিনি উইলিয়াম পেইলী’র (ন্যাচারাল থিওলজী বইটি পড়েছিলেন। পেইলীর জন্য দুর্ভাগ্য,কারন পরবর্তীতে পরিণত ডারউইন তার যুক্তি বাতাসে উড়িয়ে দিয়েছিল।  চার্লস ডারউইনের ’আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইন‘ বা ডিজাইন থেকে যুক্তিকে অযৌক্তিক প্রমান করে ধরাশায়ী করা ছাড়া  সম্ভবত বুদ্ধিমত্তাপুর্ণ যুক্তি দ্বারা কোন লোকপ্রিয় বিশ্বাসের  এভাবে ভয়াবহ পরাজয়ের নজির আর নেই; খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল ব্যাপারটা। ডারউইনের কল্যাণে, এই উক্তিটি আর সত্য নয় যে, আমরা এমন কিছু জানিনা, যা ডিজাইন করা হয়েছে, যদি না আসলেই তাদের  ডিজাইন করা হয়ে থাকে। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে  অসাধারন ডিজাইন সমতুল্য উদহারন, কল্পনাতীত জটিলতা আর আভিজাত্য। এবং এই সব বিখ্যাত সিউডো ডিজাইন( বা আপাত দৃষ্টিতে ডিজাইন মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ডিজাইন না) তালিকায় আছে স্নায়ুতন্ত্র, যে তন্ত্রের সামান্য কিছু অর্জনের মধ্যে যেমন আছে – গোল সিকিং ( কোন উদ্দেশ্য নির্ভর)আচরণ, যা এমনরকি ক্ষুদ্রতম কীট বা ইনসেক্টদের মধ্যে, মনে হতে পারে, সাধারন লক্ষ্যকে নিশানা করে যাওয়া কোন তীর অপেক্ষা আরো উন্নত জটিল হিট সিকিং ক্ষেপনাস্ত্রের মত। ৪ র্থ অধ্যায়ে আমি আবারো এই আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইনে ফিরে আসবো।

অনটোলজিক্যাল [২] যুক্তি এবং অন্যান্য এ প্রাইওরী [৩] বা  পুর্ববর্তী জ্ঞান নির্ভর যুক্তিসমুহ:

ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব সংক্রান্ত যুক্তিগুলো দুটো প্রধান ক্যাটেগরীতে ভাগ করা যায়, এ প্রাইওরী (a priori) এবং এ পোস্টেরিওরী (a posteriori)। টমাস আকোয়াইনাস এর পাচটি যুক্তি যেমন আ পোস্টেরিওরী ( যে জ্ঞানের উৎস কোন প্রাকধারনা না বরং অভিজ্ঞতা বা পরীক্ষা নির্ভর) , কারন তাদের ভিত্তি পৃথিবী নানা বিষয় সম্বন্ধে সরাসরি পর্যবেক্ষন;  এ প্রাইওরী ( যা অভিজ্ঞতা থেকে স্বাধীন, পুর্ববত জ্ঞান নির্ভর) যুক্তিগুলোর মধ্যে বিখ্যাত, যেগুলো নির্ভর করে আছে আর্মচেয়ারে বসে যুক্তি প্রদান করার প্রক্রিয়ার উপর, সেটি হলো অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট, যা প্রস্তাব করেছিলেন ১০৭৮ খৃষ্টাব্দে ক্যান্টারবেরীর সেইন্ট আনসেল্ম (St Anselm), এবং তারপর এটাকেই নানাভাবে বর্ননা করেছেন পরবর্তীতে অগনিত দার্শনিকরা। আনসেল্ম এর যুক্তির একটি অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এটি মুলত মানুষের প্রতি নির্দেশিত না বরং ঈশ্বরের প্রতি (আপনি ভাবতেই পারেন এমন কোন একটি সত্ত্বা বাএনটিটি, যিনি প্রার্থনা শোনার ক্ষমতা রাখেন, নিজের অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চয়ই  তাকে বিশ্বাস করানোর কোন প্রয়োজন পড়ে না);

অ্যানস্লেম বলছেন, এমন একটি সত্ত্বার অস্তিত্ত্ব আমাদের পক্ষে ধারনা করা সম্ভব, যার চেয়ে মহান আর কোন কিছুই ভাবা যায় না। এমনকি একজন নীরিশ্বরবাদীও এধরনের সর্ব্বোচ্চ কোন সত্ত্বার কথা ভাবতে পারবেন,যদিও তিনি তার অস্তিত্ব স্বীকার করবেন না বাস্তব পৃথিবীতে। কিন্তু ,…. যুক্তিটা এরপর এভাবে মোড় নেয়….. কোন একটি সত্ত্বা যার আদৌ কোন বাস্তব অস্তিত্ত্ব নেই, এই বিশেষ ফ্যাক্টটারই কারনে, সেটি চুড়ান্ত বা চরমতম নিখুতত্ত্বর গুনাবলী সম্পন্ন হতে পারেনা। সুতরাং আমরা  এখানে একটি অসঙ্গতি বা পরস্পরবিরোধীতা দেখতে পাচ্ছি এবং …..এভাবে ব্যাস হয়ে গেলা.. ছু মন্তর ছু…… ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব আছে !

আমি বরং এই শিশুতোষ যুক্তিটাকে  উপযুক্ত ভাষায়, তা হলো শিশুদের খেলার মাঠের ভাষাতে বরং,অনুবাদ করে দেই:

‘তোমার সাথে আমি বাজী রাখছি, আমি প্রমান করতে পারবো যে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব আছে’।
’আমিও বাজী রাখতে পারি যে, তুমি পারবে না’।
‘ঠিক আছে, তাহলে, এমন কিছু একটা কল্পনা করো, যা সবচেয়ে বেশী নিখুত, নিখুত, নিখুত, যতটা সম্ভব নিখুত কোন কিছুকে ভাবা যেতে পারে’।
‘ঠিক আছে, ভাবলাম, এরপর’?
’এখন বলোতো, এই যে সব চেয়ে নিখুত নিখুত নিখুত যে জিনিসটা তুমি ভেবেছো তা কি সত্যি? বাস্তবে কি তার কোন অস্তিত্ত্ব আছে’?
‘ না, নেই, এর অস্তিত্ব আছে শুধু আমার মনে’।
‘কিন্তু এটা যদি বাস্তবে অস্তিত্ব আছে এমন কিছু হত, তাহলে এটা আরো বেশী নিখুততর হতো, কারন সত্যি সত্যি বাস্তবে অস্তিত্ত্ব আছে এমন কিছুর অবশ্যই কল্পনার কোন তুচ্ছ জিনিসের চেয়ে আরো বেশী  উত্তম হতে বাধ্য । সুতরাং আমি প্রমান করলাম যে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে। নুর নুরনী নুর নুর (শিশুতোষ শব্দমালা), সব নাস্তিকরা আসলে বোকা’।

আমার কাল্পনিক এই গল্পে শিশু পন্ডিতটি দিয়ে আমি জেনেশুনে ’বোকা’ শব্দটি ব্যবহার করিয়েছি। আনস্লেম নিজেই সাম ১৪ (Psalm 14) এর প্রথম ভার্সের উদ্ধৃতি দিয়েছিলেন, ’বোকারাই তাদের অন্তরে উচ্চারণ করেছে যে, কোন ঈশ্বর নেই’; এবং তিনি তার হাইপোথেটিকাল নিরীশ্বরবাদীকে নির্বোধ (ল্যাটিন ইনসিপিয়েন্স) বলে সম্বোধন করার সাহস দেখিয়েছিলেন:

এভাবে এমনকি কোন নির্বোধও বিশ্বাস করে যে, নিদেনপক্ষে এমন কোন কিছু আমাদের বোধের জগতে বাস করে, যা তুলনায় আর মহান কোন কিছুকে ভাবা সম্ভব না।কারন যখন সে এটি শুনতে পারে, তখনি সে বুঝতে পারে। আর যেটা বোঝা সম্ভব হয়েছে, তা কেবল বোঝার ক্ষেত্রেই  অস্তিত্ত্বশীল। এবং নিশ্চিৎভাবে এমন কোন কিছু, যার চেয়ে আর মহান কিছু ভাবা সম্ভব না, তা শুধু মাত্র আমাদের বোঝার জগতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেনা। কারন ধরা যাক এটি শুধু আমাদের বোধের জগতে বাস করে তাহলে বাস্তবে এর অস্তিত্ত্ব ধারনা করা সম্ভব, যা আরো মহত্ত্বর।

এভাবে কোন শব্দকে ব্যবহার করে বা লোগোম্যাশিস্ট ছলচাতুরী  মাধ্যমে এধরনের বিশাল উপসংহারের দাবী কেউ করতে পারে, এই বিষয়টি আমাকে প্রথমত নান্দনিক দিক থেকে আহত করে। সুতরাং আমি অবশ্যই  সতর্ক থাকবো ’নির্বোধ’ শব্দটির অযথা ব্যবহার করা থেকে। উল্লেখযোগ্যভাবে বার্ট্রান্ড রাসেল ( অবশ্যই নির্বোধ নন) কিন্তু বলেছিলেন , ‘ভুলটা ঠিক কোথায় আছে সেটা খুজে বের করার চেয়ে, এই যুক্তিটি ( অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট) যে অবশ্যই ভুল এই সিদ্ধান্তে কিন্তু অপেক্ষাকৃত ভাবে সহজেই পৌছানো যায়’; রাসেল নিজেই, তার তরুন বয়সে, অল্পসময়ের জন্য এই যুক্তিটি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন:

আমার মনে  আছে সেই বিশেষ মুহুর্তটার কথা; ১৮৯৪ সালের একদিন, ট্রিনিটি লেন দিয়ে যখন হাটছিলাম আমি তখন হঠাৎ করে একঝলকের জন্য দেখতে যেন দেখতে পেলাম ( বা আমি মনে হয়েছিল দেখেছিলাম) যে অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্টটা সঠিক। আমি বের হয়েছিলাম এক টিন তামাক কেনার জন্য; এবং ফেরার পথে আমি হঠাৎ করে সেটা উপরের দিকে শুন্যে ছুড়ে দিয়ে বিস্ময়ে বলে উঠেছিলাম: গ্রেট স্কট..অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্টটি সঠিক;

কিন্তু আমি ভাবছি, রাসেল এমন কিছু কেন বলেননি: গ্রেট স্কট, অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্টটি মনে হচ্ছে সম্ভবত সঠিক হতে পারে।  কিন্তু ব্যপারটা একটু বেশী সহজ হয়ে গেল না যে, মহাবিশ্ব সম্বন্ধে এমন বিশাল একটি সত্য শুধুমাত্র এধরনের  কোন শব্দের খেলা থেকে আসতে পারে? আমি বরং এর অসারতা প্রমান করার চেষ্টা করি, আপাত দৃষ্টি যেটা প্যারাডক্স, যেমন জেনোর প্যারাডক্স  (Zeno’s paradox) [৪];গ্রীকদের বেশ কষ্ট হয়েছে জেনোর প্যারাডক্স এ দাবী করা ’প্রমান’, যে অ্যাকিলীস কখনোই কচ্ছপটিকে দৌড়ে ধরতে পারবেনা, এই বিষয়টির আসল রহস্যটা বুঝতে। কিন্তু তাদের যথেষ্ট বোধশক্তি ছিল এর থেকে সেই উপসংহারটি না মেনে নিতে, যে অ্যাকিলীস আসলেই কচ্ছপটি ধরতে পারবে না। বরং তারা এর নাম দিয়েছিল প্যারাডক্স, এবং পরবর্তী প্রজন্মের গনিতজ্ঞদের জন্য তারা অপেক্ষা করেছিল এর একটি ব্যাখ্যা দেবার জন্য।রাসেল নিজেও, অবশ্য, যে কোন কারো চেয়ে কোন অংশেই কম যোগ্য ছিলেন না, যে বুঝতে, কেন তামাকের টিনটি খুশীতে উপরে ছুড়ে মারা উচিৎ হবেনা, অ্যাকিলীস কচ্ছপটি ধরতে পারবে না সেই আনন্দে; ‍তিনি কেন সেন্ট অ্যানসেল্ম এর যুক্তির ক্ষেত্রে একই  সাবধানতা অবলম্বন করেননি? আমার মনে হয়, রাসেল ছিলেন অতিমাত্রার পক্ষপাতহীন একজন নিরীশ্বরবাদী, অতি উৎসাহী ছিলেন মোহভঙ্গর জন্য, যদি তার জন্য কোন যুক্তির প্রয়োজন হয়ে থাকে [৫]; অথবা হয়তো এর উত্তর আছে রাসেলের ১৯৪৬ সালে নিজের একটি লেখায় অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্টকে  অসার প্রমাণ করার বহুদিন পরে:

আসল প্রশ্নটি হলো,: এমন কিছু কি আছে যা আমরা চিন্তা করতে পারি, এবং সেটি, শুধুমাত্র আমরা যে সেটি চিন্তা করতে পারছি, সেই সত্যর উপর ভিত্তি করে, আমাদের চিন্তার বাইরে তার অস্তিত্ত্ব আছে বলে দেখাতে পারি? যে কোন দার্শনিক হয়তো  চাইবেন, হ্যা বলতে, কারন দার্শনিক এর কাজ পৃথিবী সম্বন্ধে কোন কিছু বোঝা তার চিন্তার মাধ্যমে, কোন কিছু পর্যবেক্ষন করার মাধ্যমে নয়। যদি হ্যা সঠিক উত্তর হয়ে থাকে, তাহলে বিশুদ্ধ চিন্তার অস্তিত্ব আছে  এমন কিছুর মধ্যে একটা সেতু্বন্ধন আছে। যদি না, তবে কোন যোগসুত্রও নেই।

আমার নিজের অনুভুতি, কিন্তু  ঠিক এর বীপরিত,  স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গভীর সন্দেহ হত যে কোন যুক্তি বাস্তব পৃথিবী থেকে সামান্যতম কোন উপাত্ত ছাড়াই, কিভাবে এধরনের একটি উপসংহারে পৌছাতে পারে।  হয়ত এই বিষয়টি  ইঙ্গিত করছে, আমি দার্শনিক না বরং একজন বিজ্ঞানী। বহুশতাব্দী ধরে দার্শনিকরা অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্টটির বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন, এর পক্ষে এবং বিপক্ষে। নীরিশ্বরবাদী দার্শনিক জে এল ম্যাকি ( J. L. Mackie) এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে আলোচনা করেছিলেন  তার দি মিরাকল অব থেইজম (The miracle of Theism) ‌এ।  প্রশংসাসুচক অর্থেই বলছি, যখন আমি বলছি, যে আমরা কোন দার্শনিককে প্রায় সংজ্ঞায়িত করতে পারি এমন একজন মানুষ হিসাবে যিনি সাধারন কান্ডজ্ঞান বা কমন সেন্সকে কোন কিছুর উত্তর হিসাবে গ্রহন করেন না।

সবচেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্টটিকে ভিত্তিহীন প্রমান করার কৃতিত্ত্ব দেয়া হয়,দুইজন দার্শনিক: ডেভিড হিউম (David Hume)(১৭১১-৭৬) এবং ইমানুয়েল কান্ট  (Immanuel Kant)(১৭২৪-১৮০৪) কে; কান্ট আনসেল্ম এর যুক্তির চালাকীর ফাদটা শনাক্ত করেছিলেন, অনেকটা যাদুকরদের কাপড়ের ভাজে রাখা লুকানো কার্ড এর মতন;  আনসেল্ম এর এই যুক্তির ক্ষেত্রে কান্টের মতে সেটি হলো, তার পিচ্ছিল প্রাকধারনাটি: যে ’অস্তিত্ত্ব’ অনস্তিত্ত্ব অপেক্ষা বেশী ’পারফেক্ট’ বা নিখুত। যুক্তরাষ্ট্রের দার্শনিক নরমান ম্যালকম (Normal Malcolm)  বিষয়টি  ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এভাবে:  যে মতবাদ দাবী করছে অস্তিত্ত্ব হলো ক্রটিহীন, তা আসলেই খু্ব বেশী মাত্রায় অদ্ভুত, যেমন আপনি যদি বলেন, যে আমার ভবিষ্যৎ বাড়ীটি অপেক্ষাকৃত বেশী ভালো হবে যদি তা ইনসুলেটেড বা অন্তরিত না হবার চেয়ে বরং  ইনসুলেটেড হয়, এটির একটি অর্থ হয় এবং বাক্যটি সত্যতাও বহন করে; কিন্তু এর কি অর্থ হতে পারে, যদি বলা হয়, এটি একটি ভালো বাসা হবে, যদি এর অস্তিত্ত্ব না থাকার চেয়ে অস্তিত্ত্ব থাকে? [৬];  অষ্ট্রেলিয়ীয় দার্শনিক ডগলাস গাসকিঙ্গ (Douglas Gasking), আনসেল্ম এর যুক্তিটা নিয়ে আয়রনিক প্যারোডি তৈরী করেছিলেন, যিনি বিষয়টি অবশ্য লিপিবদ্ধ করেননি, তবে কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের  উইলিয়াম গ্রে ( William Grey)  সেটিকে পুননির্মান করেছিলেন এভাবে:

১. এই মহাবিশ্বর সৃষ্টি, কল্পনাতীতভাবে অসাধারণ বিস্ময়কর একটি অর্জন।
২. আর কোন একটি অর্জনের গুনগত বৈশিষ্ট হচ্ছে  (ক) এর অন্তর্নিহিত গুনাবলী এবং (খ) এর স্রষ্টার যোগ্যতা বা ক্ষমতার একটি যৌথ ফসল।
৩.  স্রষ্টার অক্ষমতা ( বা প্রতিবন্ধীতা) যত বেশী হবে, ততই আকর্ষনীয়  হবে সেই অর্জন।
৪. একজন স্রষ্টার জন্য সবচেয়ে বড় অক্ষমতা ( বা প্রতিবন্ধীতা) হবে তার অস্তিত্ত্বহীনতা।
৫. সুতরাং আমরা যদি ভাবি যে এই মহাবিশ্ব একজন অস্তিত্ত্বশীল সৃষ্টিকর্তারই সৃষ্টি, আমরা সেক্ষেত্রে আরো মহান একটি সত্ত্বার কথা কল্পনা করতে পারি, যিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন তার নিজের কোন অস্তিত্ত্ব  না রেখেই।
৬. সুতরাং অস্তিত্ত্ব আছে এমন কোন স্রষ্টা অবশ্যই সবচেয়ে মহান হতে পারেনা, যার চেয়ে আর মহান কিছুই ভাবা সম্ভব না কারন আরো বেশী শক্তিশালী এবং অবিশ্বাস্য স্রষ্টা হবে সেই ঈশ্বর, যার কোন অস্তিত্ত্বই নেই।

অতএব …

৭. ‌ঈশ্বর এর অস্তিত্ত্ব নেই।

বলাবাহুল্য, যে গাসকিঙ্গ কিন্তু আসলে প্রমান করেননি যে  ঈশ্বরের কোন অস্তিত্ত্ব নেই। একই ভাবে আনসেল্মও প্রমান করতে পারেননি তার কোন অস্তিত্ত্ব আছে। পার্থক্য শুধু একটা, গাসকিঙ্গ বিষয়টি নিয়ে মজা করেছেন ইচ্ছাকৃতভাবে। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন,ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব আছে কিনা নেই এই  প্রশ্নটি যথেষ্ট বিশাল এবং শুধুমাত্র ‘দ্বান্দ্বিক ছলচাতুরী’ দিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে না। এবং আমি মনে করিনা নিখুতত্ত্ব বা পারফেকশনের এর সুচক হিসাবে অস্তিত্ত্ব র পিচ্ছিল ব্যবহার এই যুক্তির সবচেয়ে খারাপ অংশ। আমার ঠিক বিস্তারিত মনে নেই কিন্তু একবার ধর্মতাত্ত্বিক এবং দার্শনিকদের একটা সমাবেশে তাদের খোচা দিয়েছিলাম, অনটোলজিক্যাল যুক্তি ব্যবহার করে শুকররা উড়তে পারে তা প্রমান করে। তাদের মনে হয়েছিল, তারা মোডাল লজিকের আশ্রয় নিতে পারেন আমাকে ভুল প্রমান করানোর জন্য।

ঈশ্বরের স্বপক্ষে প্রস্তাবিত অন্যান্য সব এ প্রাইওরী যুক্তির মতই, অনটোলজিক্যাল আর্গুমেন্ট আমাকে আলডস হাক্সলী  (Aldous Huxley) এর পয়েন্ট কাউন্টার পয়েন্টের (Point Counter Point) বইয়ের এর সেই বৃদ্ধর কথা মনে করিয়ে দেয়, যে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে একটি গানিতীক প্রমান আবিষ্কার করেছিলেন:

আপনারা তো সেই সুত্র জানেন, শুন্যর মান যদি m হয় তাহলে তা অসীমের সমান, যেখানে m হচ্ছে যে কোন ধনাত্মক একটি সংখ্যা। বেশ, আমরা এই সমীকরণটিকে আরেকটু সরল করি না কেন, সমীকরনের দুই পাশে শুন্য দিয়ে গুন করে। সেক্ষেত্রে আপনি পাচ্ছেন m যা অসীম এবং শুন্যর গুনফলের সমান। বা বলা যায়, একটি ধনাত্মক সংখ্যা অসীম এবং শুন্যর গুনফলের সমান। সেটা কি প্রমান করেনা  একেবারে শুন্য থেকে কোন অসীম শক্তিমান এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতে পারেন? পারেন না তিনি?

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দিদোরো (Diderot) এনলাইটেন্টমেন্ট যুগের বিশ্বকোষ রচয়িতা এবং সুইস গনিতজ্ঞ ইউলার (Euler) এর বিখ্যাত কাহিনী আদৌ ঘটেছিল কিনা সন্দেহ আছে। তবে প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, ক্যাথেরিন দ্য গ্রেট, তাদের দুজনের মধ্যে একটি বিতর্কের আয়োজন করেছিলেন, যেখানে ধার্মিক ‌ইউলার নিরীশ্বরবাদী দিদেরোকে চুড়ান্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে তার চ্যালেন্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন এভাবে: ’ (a+bn)/n =x  সুতরাং ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব আছে, উত্তর দিন! এই কাহিনীর মুল বিষয়টা  হলো দিদেরো গনিতজ্ঞ ছিলেন না সুতরাং সংশয় নিয়ে তিনি এই বিতর্কে আর অগ্রসর হননি। তবে বি এইচ ব্রাউন এর অ্যামেরিক্যান ম্যাথমেটিক্যাল মান্হলী (১৯৪২) তে উল্লেখ করেছিলেন, দিদেরো আসলে একজন বেশ দক্ষ গনিতজ্ঞ,  এবং ইউলার এর ধরনের যুক্তিতে ধরাশায়ী হবার মত মানুষ তিনি ছিলেন না, ইউলার যা করেছিলেন তা সম্ভবত বলা যায়  ব্লাইন্ডিং  উইথ সায়েন্স থেকে যুক্তি  (এখানে গনিত); ডেভিড মিলস, তার অ্যাথিষ্ট ‌ ইউনিভার্স এ তার সাথে একজন ধর্মীয় মুখপাত্রের রেডিও সাক্ষাৎকারের বর্ণনা লিপিব্দ্ধ করেছিলেন: যেখানে সেই ধর্মীয় মুখপাত্রটি ভর ও শক্তির অবিনশ্বরতার সুত্র বা ল অব কনসারভেশন অব মাস-এনার্জি ব্যবহার করেছিলেন একটা অদ্ভুতভাবে অকার্যকর বিজ্ঞানের অন্ধ ধারনার যুক্তি প্রয়োগের কৌশল হিসাবে: যেহেতু আমরা সবাই বস্তু আর শক্তি দিয়ে তৈরী, এই বৈজ্ঞানিক মৌলিক নীতিটি  কি  অনন্ত জীবনের প্রতি বিশ্বাসকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয় না? আমি যেভাবে এর উত্তর দিতাম মিলস তার চেয়ে অনেক ভদ্র ভাবে এবং ধৈর্য সহকারে এর উত্তর দিয়েছিলেন, কারন এই সাক্ষাতকারগ্রহনকারী যা বলছিলেন, বোধগম্য ইংরেজীতে এর অনুবাদ করলে দাড়ায়: আমরা যখন মৃত্যুবরণ করবো, আমাদের শরীরের একটি অ্যাটমও ( এবং কোন শক্তিও না) হারিয়ে যায় না। সেকারনে আমরা অমর’।

এমনকি আমিও, আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এমন ছেলেমানুষী খেয়ালী ভাবনার মুখোমুখি হইনি। আমি যদিও আরো বিস্ময়কর সব প্রমান দেখেছি, যা সংগ্রহাকারে আছে http://www.godlessgeeks.com/ LINKS/ GodProof.htm ওয়েবসাইটে যেখানে অত্যান্ত মজার একটি তালিকা আছে যার নাম  ’তিনশ’র বেশী প্রমান যে ঈশ্বর এর অস্তিত্ব আছে ’ ;এখানে খুবই হাস্যকর আধাডজন প্রমানের একটি তালিকা, শুরু হয়েছে প্রমান নং ৩৬ দিয়ে:

৩৬. অসম্পুর্ন ধ্বংশ বা ইনকমপ্লিট ডিভাসস্টেশন থেকে  যুক্তি: একটি প্লেন ক্র্যাশ করার পর ১৪৩ জন প্যাসেন্জার এবং বিমানের ক্র নিহন হস, কিন্তু একটি মাত্র শিশু বেচে যায়, যদিও তৃতীয় ডিগ্রীর পোড়া নিয়ে, সুতরাং  ঈশ্বর আছেন।

৩৭.  সম্ভাব্য পৃথিবীদের বা পসিবল ওয়ার্ল্ডস থেকে আর্গুমেন্ট: যদি সব কিছু ভিন্ন হয়ে থাকতো তবে সব কিছুই্ ভিন্ন হতো; সেটা ভালো হতো না। সুতরাং  ঈশ্বর আছেন।

৩৮.  তীব্র ইচ্ছা শক্তি বা শিয়ার উইল থেকে আর্গুমেন্ট: আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি! আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি! আমি করি, আমি করি আমি করি। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি! সুতরাং  ঈশ্বর আছেন।

৩৯.  অবিশ্বাস থেকে আর্গুমেন্ট: বিশ্বের বেশীর ভাগ মানুষই খৃষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করেনা, সেটাই শয়তানের ইচ্ছা। সুতরাং  ঈশ্বর আছেন।

৪০. মৃত্যু পরবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে আর্গুমেন্ট:  ক নামক ব্যক্তি নিরীশ্বরবাদী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি তার ভুল বুঝতে পেরেছেন। সুতরাং  ঈশ্বর আছেন।

৪১. ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল থেকে আর্গুমেন্ট:  ঈশ্বর আপনাকে ভালবাসে। আপনি কিভাবে তাকে বিশ্বাস করতে না পারার মত এত নির্মম হতে পারলেন ? সুতরাং  ঈশ্বর আছেন।

সৌন্দর্য থেকে যুক্তি বা আর্গুমেন্ট ফ্রম বিউটি:

কিছুক্ষন আগে উল্লেখ করা অ্যালডস হাক্সলীর উপন্যাসটিতে আরো একটি চরিত্র আছে, যিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে প্রমান দিয়েছেন গ্রামোফোনে বীটহোভেন এর স্ট্রীং কোয়ার্ট্রেট নং ১৫ ইন এ মাইনর বাজিয়ে (‘heiliger Dankgesang’); শুনতে তেমন বিশ্বাসযোগ্য মনে না হলেও, এটি কিন্তু বেশ জনপ্রিয় একটি আর্গুমেন্ট। আমি গোনা বন্ধ করে দিয়েছি যে কতবার আমি এই প্রসঙ্গে কম বেশী শক্ত চ্যালেন্জ এর মুখোমুখি হয়েছি:  বেশ, কেমন করে আপনি শেক্সপিয়ারকে ব্যাখ্যা করবেন? ( এই বাক্যে আপনার আপনার পছন্দ মত শুবার্ট, মাইকেলেন্জেলো ইত্যাদি যে কাউকে দিয়ে শেকসপিয়ারকে প্রতিস্থাপিত করতে পারেন); এই যুক্তি একই রকমই থাকবে, আমার আর সেটা ব্যাখ্যা দেবার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এর পেছনের মুল যুক্তিটা কখনো সুস্পষ্টভাবে বলা হয়নি, আপনি যত বেশী ভাববেন ততই যুক্তিটির অসারতাটা স্পষ্ট হবে আপনার কাছে। কোন সন্দেহ নেই বীটহোভেন এর শেষের কোয়ার্ট্রেটগুলোর আছে স্বর্গীয় সৌন্দর্য, শেকসপিয়ারের সনেটগুলোও তা। ঈশ্বর থাকা বা না থাকার উপর তাদের অসাধারন সৌন্দর্যর কোনই হের ফের হয় না। অবশ্যই তারা ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব প্রমান করেনা; তারা বীটহোভেন এবং শেকসপিয়ারের অস্তিত্ব প্রমান করে। একজন বিখ্যাত কন্ডাক্টর সম্ভবত বলেছিলেন, ‘আপনি যদি শোনার জন্য মোজার্টকে পান তাহলে আপনার  ঈশ্বরকে কেন প্রয়োজন? ডেজার্ট আইল্যান্ড ডিস্ক নামের একটি বিবিসি রেডিও শোতে আমি একবার অতিথি হয়েছিলাম; সেখানে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যদি কোন মরুদ্বীপে আটকা পড়ে যাই তাহলে সেখানে নেবার জন্য আমাকে যে কোন আটটা রেকর্ড পছন্দ করতে হবে। আমার পছন্দের মধ্যে ছিল বাখ এর  St MatthewPassion থেকে  ‘Mache dich mein Herze rein’ ; আমার সাক্ষাৎকার গ্রহনকারী বুঝতে পারছিলেন না, আমি ধার্মিক না হয়েও কিভাবে ধর্মীয় সঙ্গীত পছন্দ করলাম। আপনি হয়তো অন্যভাবে বলতে পারেন এই একই কথা, কেন আপনি  Wuthering Heights পড়ে আনন্দ পাবেন যখন ভালো করেই আপনার জানা আছে ক্যাথী এবং হিথক্লিফ এর আসলেই কোন অস্তিত্ত্ব নেই?

আমার মনে হয় আমি আরো একটি বিষয় উল্লেখ করেছিলাম এবং  যেটা আসলে উল্লেখ করতেই হবে বিশেষ করে যখন ধর্মকে বিশেষ কোন সৃষ্টির জন্য কৃতিত্ব দেয়া হয়, যেমন, মাইকেলেন্জেলোর সিস্টিন চ্যাপেল বা রাফ্যায়েল এর Annunciation । এমন কি বড় মাপের শিল্পীদেরও জীবন বাচাতে আয় করতে হয়। যেখানে কাজ পাওয়া যায় তাদের সেই সুযোগ নিতে হয়; আমার কোন সন্দেহ নেই মাইকেলেন্জলো বা রাফায়েল দুজনেই খৃষ্ঠ ধর্মাবলম্বী, তাদের সময়ে শুধু মাত্র ‌ এটাই হবার সুযোগই ছিল, কিন্তু এই সত্যটা প্রায় কাকতালীয় একটা ব্যাপার কারন সে সময় বিপুল পরিমানে অর্থের মালিক ছিল শুধু চার্চই, তারাই তখন শিল্পের প্রধান সমঝদার ছিল। যদি ইতিহাস অন্যরকম হত, তাহলে মাইকেলেন্জেলো বিশাল বিজ্ঞান যাদুঘরের ছাদে কাজ করার কমিশন পেতেন; তিনি কি তখন তার সিস্টিন চ্যাপেলের মত অসাধারণ কাজ করতেন না? দুঃখজনক ব্যপার আমরা কোনদিনও বীটহোভেন এর Mesozoic Symphony বা মোজার্ট এর অপেরা The Expanding Universe শুনতে পারবো না। একই ভাবে আমরা হাডিন এর Evolution Oratorio শোনা থেকেও বঞ্চিত হয়েছি, কিন্তু তিনি আমাদের তার Creation শোনা থেকে বঞ্চিত করেননি। এই যুক্তিটাকে অন্যদিক থেকে দেখলে কেমন হয়; আমার স্ত্রী যে ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাটার কথা প্রস্তাব করেছিল তা হলো, যদি শেকসপিয়ারকে চার্চের জন্য কাজ করতে বাধ্য হতে হত? আমরা নি:সন্দেহে হ্যামলেন, কিং লিয়ার আর ম্যাকবেথ  পেতাম না আর এর বদলে  কি পেতাম আমরা? স্বপ্ন তৈরী করে এমন সব কিছু? স্বপ্ন দেখে যান তাহলে।

মহান কোন শিল্পকর্মকে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের সাথে সংযুক্ত করে এমন যদি কোন যৌক্তিক যুক্তি থাকে, সেটা কিন্তু  এই যুক্তির প্রস্তাবকরা স্পষ্ট করে বলছেন না। শুধু ধরে নেয়া হয়েছে,এমনই হবার কথা বা স্বপ্রমানিত কোন একটি বিষয় হিসাবে। অবশ্যই সেটা না। হয়তো এটা আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিজাইনের আরো একটি সংস্করণ হিসাবে দেখতে হবে: শুবার্ট এর সঙ্গীত প্রতিভার মস্তিষ্ক নিজেই একটি অসম্ভাব্যতার বিস্ময়, এমন কি মেরুদন্ডী প্রানীদের চোখের তুলনায়। অথবা আরো খারাপ অর্থে, এই যুক্তি কি দাবী করছে, হয়তো প্রতিভাবানদের প্রতি ঈর্ষা, কি সাহস, অন্য একজন মানুষ এত সুন্দর সঙ্গীত/কবিতা/শিল্পকর্ম সৃষ্টি করছে, যখন আমি পারছি না? সুতরাং নিশ্চয়ই ঈশ্বরই এসব করছেন।

ব্যাক্তিগত ‘অভিজ্ঞতা’ থেকে আর্গুমেন্ট :

আন্ডারগ্রাজুয়েট থাকাকালীন আমার সমকালীনদের মধ্যে অন্যতম একজন বুদ্ধিমান এবং বেশ প্রাপ্তবয়স্ক  মানসিকতা সম্পন্ন, যে আবার খুবই ধার্মিকও বটে, একবার স্কটল্যান্ডের কোন একটি দ্বীপে ক্যাম্পিং করতে গিয়েছিল, মাঝরাতে সে এবং তার বান্ধবী তাদের তাবুতে হঠাৎ করে ঘুম থেকে জেগে উঠে, শয়তানের কন্ঠস্বর শুনে- শয়তানের নিজের গলা। তাদের ভাষ্যানুযায়ী এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই:  সেই শব্দটি নি:সন্দেহে ভীতিকারক কিংবা যাকে বলা হয় ডায়াবলিক্যাল; আমার এই বন্ধু কোনদিনও ভুলতে পারেনি তার এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। এবং এটাই অন্যতম একটি কারন ছিল পরবর্তীতে তার পাদ্রী হিসাবে দীক্ষা নেবার জন্য। আমার তরুন মনকে খুব নাড়া দিয়েছিল এই গল্পটি। পরে কোন একসময় আমি এই গল্পটি প্রানীবিজ্ঞানীদের একটি সমাবেশের এক পর্যায়ে, যখন তারা অক্সফোর্ড এর রোজ এবং ক্রাউন ইনে অবসর সময় কাটাচ্ছিলেন তখন তাদেরকে এই কাহিনীটা বলি। এদের মধ্যে দুজন ছিলেন অভিজ্ঞ পাখী বিশেষজ্ঞ, তারা দুজনেই স্বশব্দে হেসে ওঠেন, আনন্দের সাথে তারা একসাথে চিৎকার করে বলে  উঠেন ‘Manx Shearwater!’ এদের একজন যোগ করেন, শয়তানের সাথে তুলনা করার মত চিৎকার এবং আওয়াজ এই প্রজাতির পাখিদের বিশেষ বৈশিষ্ট,  একারনে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ও বিভিন্ন ভাষায় এদের স্থানীয় নাম ’ডেভিল বার্ড’ বা ’শয়তান পাখি’।

অনেক মানুষই ঈশ্বরে বিশ্বাস করে কারন তারা বিশ্বাস করে তারা তার একটি ভিশন দেখেছে বা কোন ফেরেশতা বা অ্যান্জেল বা কোন নীল কাপড় পরা কুমারীকে -তারা স্বচক্ষে দেখেছে, অথবা ঈশ্বর তাদের মস্তিষ্কের মধ্যে সরাসরি কথা বলেছে। এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার যুক্তি, তাদের কাছেই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, যারা দাবী করেন এই ধরনের অভিজ্ঞতা তাদের আছে। কিন্তু বাকী সবার কাছে এবং যারা মনোবিজ্ঞান সমন্ধে কাজ চালানোর মত জ্ঞান আছে, তাদের কাছে এই যুক্তির ভিত আদৌ মজবুত না।

আপনি  বলছেন সরাসরি আপনার ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা আছে? বেশ, কিছু মানুষ এর অভিজ্ঞতা আছে গোলাপী হাতির;কিন্তু ব্যপারটা আপনার কাছে হয়তো  ব্যাপারটা তেমন গুরুত্বপুর্ণ  কিছু না। পিটার সাটক্লিফ, ইয়র্কশায়ার রিপার, যে সুস্পষ্টভাবে দাবী করেছিল, সে যীশুর নির্দেশ শুনতে পেয়েছিল যে মহিলাদের হত্যা করতে হবে এবং এর জন্য তার যাবজ্জীবন কারাদন্ডও হয়েছিল। জর্জ ডাবলিউ বুশ দাবী করেছিলেন, ঈশ্বর তাকে ইরাক আক্রমন করতে নির্দেশ ‍দিয়েছেন (ব্যাপারটা দু:খজনক ঈশ্বর তাকে নিশ্চিৎ করে সেই দিব্যজ্ঞান দেয়া থেকে বিরত থেকেছেন: যে সেখানে তিনি উইপন অব মাস ডেস্ট্রাকশন খুজে পাবেন না)। মানসিক আশ্রমে অনেক ব্যক্তিকে পাওয়া যায় যারা নিজেদের নেপোলিয়ন বা চার্লি চ্যাপলিন মনে করেন বা মনে করেন সারা পৃথিবী তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, কিংবা তারা তাদের চিন্তা আরেক জনের মস্তিষ্কে সম্প্রচার করতে পারে। আমরা তাদের কথা শুনি ঠিকই, কিন্তু গুরুত্ব সহকারে তাদের অন্তস্থল থেকে উদ্ভব এই দাবীগুলোতে বিবেচনা করিনা, কারন এই ধরনের ধারনার সাথে খুব বেশী মানুষ সহমত পোষন করেন না। ধর্মীয় অভিজ্ঞতার ব্যাপারটা ভিন্ন কারন এধরনের অভিজ্ঞতার দাবীদার মানুষের সংখ্যা অগনিত। স্যাম হ্যারিস মোটেও অতিমাত্রায় নিরাশাবাদী অবস্থান নেননি যখন তার The End of Faith তিনি লিখেছিলেন:

যাদের অনেক ধরনের বিশ্বাস আছে যাদের কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই, এই সব মানুষদের ডাকার জন্য আমাদের কাছে একটা নাম আছে,  যখন তাদের এই বিশ্বাস যখন খুব বেশী মাত্রায় সর্বব্যাপী প্রচলিত হয়, তখন আমরা তার নাম দেই ধর্মীয় বিশ্বাস, কিন্তু তা না হলে,এদের সম্ভাব্য নাম জোটে  উন্মাদ, মানসিক রোগাক্রান্ত কিংবা বিভ্রান্ত। স্পষ্টতই সংখ্যার হিসাবে সাথে মানসিক সুস্থতা। এবং তারপরও এটি শুধুমাত্র ইতিহাসের একটি দুর্ঘটনা, যে আমরা সমাজ এই বিশ্বাসটিকেই স্বাভাবিক মনে করে, যে মহাবিশ্বের একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ত্ব আছে, যিনি আপনার চিন্তাকে পড়তে পারেন। যদিও এটা মানসিক অসুস্থতার লক্ষন যে বিশ্বাস করা, যে তিনি আপনার সাথে যোগাযোগ করছেন আপনার শোবার ঘরের জানালার কাচে বৃষ্টির ফোটার মোর্স কোড ব্যবহার করে। এবং সুতরাং, যদিও ধর্মবিশ্বাসী মানুষ সাধারনত: উন্মাদ না তবে তাদের মুল বিশ্বাসগুলো অবশ্যই তার লক্ষণ বহন করছে।

হ্যালুসিনেশনের ব্যপারটায় আমি পরে আবার আসাবে অধ্যায় ১০ এ। মানুষের মস্তিষ্ক অতি অসাধারন সিমুলেশন বা কাল্পনিক পরিস্থিতির কোন সফটওয়ারের মত প্রোগ্রাম চালাতে পারদর্শী। আমাদের চোখ কিন্তু আমাদের ব্রেনকে কোন বিশ্বস্থ ফটোগ্রাফ দেখায়না, যা আসলে চোখের সামনে বিদ্যমান বা সঠিক সেই চলমান দৃশ্য, যা ঠিক সেই সময়ই ঘটছে, তার বিশ্বস্ত হুবুহু ফটোগ্রাফটি দেখায়না। আমাদের ব্রেন যেটা করে তা হলো বিরামহীন ভাবে আপডেটেড মডেল তৈরী করে। অপটিক স্নায়ুপথে আসার অসংখ্য সংকেত দিয়ে আপডেটেড হতে থাকে, তবে তা ঠিকই দৃশ্যের একটি মডেল তৈরী করে নেয়। অপটিক্যাল ইল্যুশন বা দৃষ্টি বিভ্রম আমাদের জন্য এ বিষয়টির একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত। প্রধান ধরনের দৃষ্টিবিভ্রম বা ইল্যূশনের-, যার একটি বিশেষ উদহারন হচ্ছে নেকার কিউব- উদ্ভব হবার কারন ইন্দ্রিয়দের থেকে যে ডাটা ব্রেন পাচ্ছে তা আসলে বাস্তবতার দুটি আলাদা বা সমন্বয়যোগ্য বিকল্প মডেল [৭];ব্রেন এর পক্ষে এই দুটির মধ্যে কোন একটিকে বেছে নেবার জন্য স্বতন্ত্র কোন ভিত্তি নেই, তাই সে পালাক্রমে এদের বেছে নেয়। আমরাও অভিজ্ঞতা লাভ করি একটি অন্তস্থ মডেল থেকে অন্য মডেলের মধ্যে ধারাবাহিক পালা পরিবর্তন। যে ছবির দিকে তাকিয়ে আছি বলে মনে করি আক্ষরিক অর্থে উল্টে যায় এবং রুপান্তরিত হয় সম্পুর্ণ অন্যকিছুতে।

ব্রেনের সিমুলেশন সফটওয়্যার সবচেয়ে বেশী দক্ষ চেহারা এবং কন্ঠস্বরকে তৈরী করতে। আমার জানালার উপরই একটা আইনস্টাইনের প্লাষ্টিক মুখোশ আছে;সামনে থেকে দেখলে, এটি একটি ঘন পুর্ণ মুখের মত মনে হয়,এটি বিস্ময়কর  কিছু নয়,তবে যেটা বিস্ময়কর সেটা হল পেছন থেকে, ফাকা জায়গার দিক থেকে,তখনও এটিকে ঘন বা সলিড একটি মুখের মত মন হয় এবং জিনিসটি বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের পারসেপশনটাও আসলে খুব অদ্ভুত। দর্শক যখনই নাড়াচাড়া করছে মুখটাও যেন তা অনুসরণ করছে এবং এটি কিন্তু  সেই  দুর্বল,তেমন বেশী বিশ্বাসযোগ্য না অর্থে, মোনা লিসার চোখ আপনাকে অনুসরণ করছে বিষয়টির মতই। এই ফাপা মুখোশটা যেন আসলেই তাকাচ্ছে, নাড়াচাড়া করছে। যারা এই দৃষ্টিবিভ্রমটি আগে দেখেননি তারা বেশ চমকে যাবেন । আরো বিস্ময়কর, যদি মুখোশটিকে একটি ধীরে ঘুর্নায়মান কোন টেবিলের উপর রাখা যায়,দেখা যায় এটি ঠিক সঠিক দিকেই তাকিয়ে আছে,যখন আপনি এটি ঘন বা পুর্ণদিক থেকে দেখছেন, কিন্তু এটা যেন বীপরিত দিকে তাকায় যখন ফাপা দিকটা দৃষ্টির সামনে আসে।  এর ফলাফলটা হচ্ছে যখন আপনি দেখবেন একপাশ থেকে অন্যপাশের এই দিক পরিবর্তন হচ্ছে,যেদিকটা আসছে অর্থাৎ কামিং সাইডটি, যে দিকটা চলে যাচ্ছে বা গোয়িং সাইডকে মনে হচ্ছে যে খেয়ে ফেলছে। এটি একটি অসাধারন দৃষ্টি বিভ্রম, একটু ঝামেলা সহ্য করে দেখার যোগ্য একটি বিষয়। কখনো কখনো আপনি বিস্ময়করভাবে কাছাকাছি চলে আসতে পারেন ফাপা মুখের কাছে এবং তারপরও আপনি দেখতে ব্যর্থ হতে পারেন, যে এটা আসলেই ফাপা কিনা? যখন আপনি দেখতে পাবেন, আবার তখন আরেকটি পরিবর্তন বা মডেলটির ফ্লিপ ঘটে যায়, যা আবার পরিবর্তনযোগ্য। কেন এটা হচ্ছে? এই মুখোশ তৈরী করার মধ্যে  কিন্তু কোন কৌশল নেই। যে কোন ফাপা মুখোশ‌ এই কাজটা করতে পারে। যে দেখবে তার ব্রেনেই এই চালাকীটা ঘটে। ভিতরের সিমুলেটিং সফটওয়্যার যা ডাটা পায়, যা ইঙ্গিত করে হয়তো একটি মুখের অস্তিত্ত্ব, হয়তো একজোড়া চোখ ছাড়া আর বেশী কিছু না, নাক বা একটি মুখ মোটামুটি যে জায়গায় তাদের থাকার কথা সেখানে। এধরনের বিচ্ছিন্ন কিছু ক্লু পাবার পর ব্রেণ তার বাকী কাজটা নিজেই করে নেয়। মুখের সিমুলেশন সফটওয়্যার কাজ শুরু করে এবং মুখের একটি সম্পুর্ন সলিড বা ঘন মডেল তৈরী করে, এমনকি যখন প্রকৃত বাস্তবতা যে দেখাচ্ছে চোখকে তা হলো মুখের ফাপা একটি মডেল। এই ভুল দিকে আবর্তনের বিভ্রমটা আসে কারন ( কঠিন বিষয়টি, কিন্তু আপনি যদি সতর্ক হয়ে ব্যপারটি নিয়ে চিন্তা করেন আপনি এটা নিশ্চিৎ করতে পারবেন) বীপরিতমুখী আবর্তন হচ্ছে অপটিক্যাল ডাটাগুলোর কোন একটা বোধগম্য অর্থ করার একমাত্র উপায়, যখন ফাকা মুখোশ আবর্তনের সময় যে দেখছে তা মনে হবে ঘন। অনেকটা ঘুর্ণায়মান রাডার ডিশের মায়ার মত, যা আপনি এয়ারপোর্টে দেখে থাকবেন, ‍মাঝে মাঝে যতক্ষন না ব্রেন রাডার ডিশটির সঠিক মডেল বদলে নেয়, আপনি একটি ভুল মডেলকে ঘুরতে দেখবেন ভুল দিকে তবে খুব আজব একটা বিভ্রান্তির সাথে।

আমি এটা উল্লেখ করলাম আমাদের ব্রেণের শক্তিশালী সিমুলেটিং সফটওয়্যার সম্বন্ধে একটি ধারনা দেবার জন্য।  এটি বিশেষভাব দক্ষ, ভিশন (কোন দৃশ্য) বা ভিজিটেশন বা কারো আবির্ভাব সম্বন্ধে চুড়ান্তভাবে বিশ্বাসযোগ্য সত্যিকার একটি ধারনা দিতে। কোন অশরীরি আত্মা বা ফেরেশতা বা একটি ভার্জিন মেরী র একটি কাল্পনিক উপস্থিতিকে বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে সিমুলেট করা ক্ষমতা আমাদের ব্রেনের এই ধরনের কোন উন্নত সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে ছেলেখেলা মাত্র। একই জিনিসই আবার ঘটে মাঝে মাঝে কিছু শোনার ক্ষেত্রে। আমরা যখন কিছু শুনি এটি হুবুহু অবিকলভাবে আমাদের অডিটরী স্নায়ু বহন করেনা, এই স্নায়ুটি শব্দ সংকেতগুলো আমাদের ব্রেনে পৌছে দেয় না কোন হাই-ফিডেলিটি ব্যাঙ্গ অ্যান্ড ওলুফসেন এর সাউন্ড সিস্টেম এর মত। দৃষ্টির মতই আমাদের ব্রেনও শব্দের মডেল তৈরী করে, বিরামহীন ভাবে আসা অডিটরী স্নায়ু সংকেত এর ‍ মাধ্যমে। সে কারনে যখন কোন ট্রাম্পেট ব্লাস্ট এর শব্দ শুনি আমরা একটি নোট হিসাবে, বিশুদ্ধ কোন যৌগিক টোনের হারমনিকস হিসাবে না যা এর সাথে ব্র্যাসি একটা চাপা গর্জন যোগ করে দেয়। কোন ক্ল্যারিনেট যদি সেই একই নোট বাজায় তাহলে শুনতে কাঠের খানিকটা ভরাট আওয়াজ  এবং একটি ওবোর আওয়াজ আরো রিডি বা সুতীক্ষ্, কারন বিভিন্ন নোটদের একটি হারমোনিকস এর ভারসাম্য এটা নির্ধারন করে। আপনি যদি সতর্কতার সাথে সাইন্ড সিনথেসাইজারের   প্রত্যেকটা হারমনিকস আলাদা আলাদা ভাবে বাজান, আপনার মস্তিষ্ক  কিছুক্ষনের জন্য এই শব্দগুলোকে বিশুদ্ধ টোনের একটি কম্বিনেশনে শুনতে পায়, যতক্ষন না পর্যন্ত  আমাদের ব্রেনের সিমুলেশন সফটওয়ার ব্যাপারটা ’ধরতে’ পারে এবং এর পর থেকে আমরা শুধুমাত্র একটি বিশুদ্ধ নোট,হয় ট্রাম্পেট বা ওবো,যাই হোক না কেন শুনতে পাই। আমাদের কথায় উচ্চারিত স্বরবর্ণ বা ব্যান্জ্ঞনবর্ণ  আমদের মস্তিষ্কের মধ্যে এভাবে তৈরী হয় এবং সুতরাং অন্য একটি পর্যায়ে, আরো উচু অর্ডারের ফোনেম এবং শব্দগুলোও তৈরী হয়।

শৈশবে, একবার আমি ভুতের গলার আওয়াজ শুনেছিলাম: একটা পুরুষ কন্ঠ, বিড়বিড় করে কি যেন বলছে,মনে হচ্ছে কিছু পড়ছে বা প্রার্থনা করছে; আমি প্রায় পুরোটাই, যদিও সবটা না, কি বলছিল, সেই শব্দগুলো বুঝতে পারছিলাম, আমার কাছে মনে হয়েছিল যা খুব স্বতন্ত্র একটি গম্ভীর কন্ঠস্বর। পুরোনো বাড়ীর যাজকদের ঘর বা প্রিষ্ট হোল সম্বন্ধে আমাকে নানা গল্প বলা হয়েছিল। এবং এ জন্য আমি কিছুটা ভয়ও পেয়েছিলাম;কিন্তু তারপরও কৌতুহলবশত শব্দটার উৎস খোজার জন্য আমি বিছানা থেকে উঠেছিলাম; যতই কাছে যাচ্ছিলাম, শব্দটার তীব্রতা বাড়ছিল এবং তারপর হঠাৎ করেই আমার মাথার মধ্যে এটি উল্টে গেল, আমি শব্দের আসল উৎসটা স্পষ্ট বোঝার মত অবশেষে যথেষ্ট কাছাকাছি পৌছালাম; দরজার চাবির ছিদ্র দিয়ে বাতাস দ্রুত আসা যাওয়া করার প্রক্রিয়ায় শব্দটি তৈরী হচ্ছিল, এবং এটি যে শব্দ তৈরী করছিল তা আমার মস্তিষ্কের সিম্যুলেশন সফটওয়ারটি একটি মডেল তৈরী করে কোন পুরুষের গভীর কন্ঠস্বরের কথামালার। আমি যদি সহজে প্রভাবিত করা যায় এমন  শিশু হতাম, তাহলে সম্ভবত আঅস্পষ্ট অবোধ্য কথা শোনার বদলে হয়ত আমি শুনতে পেতাম সুনির্দিষ্ট শব্দ এবং এমন কি বাক্যগুলো। আর একইসাথে আমি যদি সহজে প্রভাবিত হবার মত এবং ধর্মীয় ভাবে প্রতিপালিত হতাম, আমি ভাবতাম, বাতাস কি বলছে ।

অন্য আরেকটি ঘটনায়, প্রায় একই বয়স তখন আমার, আমি একটা দানবীয় আকারের মুখকে দেখেছিলাম, অবর্ণনীয় অশুভদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে, সমুদ্রের পাশে একটা সাধারন গ্রামের খুবই সাধারণ বাসার জানালা দিয়ে। একটু ভয় নিয়ে আমি সেই মুখের দিকে অগ্রসর হতে থাকি, যতক্ষন না পর্যন্ত খুব কাছাকাছি পৌছে বুঝতে পারি, আসলে এটি কি:  কাকতলীয়ভাবে একটা অস্পষ্ট মুখের মত সজ্জা তৈরী করেছে জানালার পর্দাগুলো এলোমেলোভাবে ভাজ হয়ে। এই মুখ এবং তার অশুভ বলয়, একটি ভীত শিশুর মস্তিষ্ক কল্পনা করে তৈরী করে নিয়েছে। সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ সালে সন্ত্রাসী হামলায় বিধ্বস্ত টুইন সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসা ধোয়ার কুন্ডলীর মধ্যে অনেক ধার্মিকই খোদ শয়তানের চেহারা আদল দেখতে পেয়েছিলেন: একটি কুসংস্কার যাকে উস্কে দিয়েছে একটি ফটোগ্রাফ যা ‌ ইন্টারনেটে ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।

কোন মডেল তৈরী করার ব্যাপারে মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত দক্ষ। আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি, তখন একে বলি স্বপ্ন আর যখন জেগে থাকি, আমরা বলি কল্পনা বা যখন তারা খুবই বেশী স্পষ্ট,  তখন বলি হ্যালুসিনেশন ( ভ্রম); দশম অ্ধ্যায়ে আমরা দেখবো, শিশুরা যাদের কাল্পনিক বন্ধু আছে, তারা তাদের স্পষ্টই দেখতে পায়, যেন আসলেই বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব আছে। আমরা যদি সরল বিশ্বাসপ্রবন হয়ে থাকি, আমরা হ্যালুসিনেশন বা জেগে দেখা স্বপ্ন বা লুসিড স্বপ্নকে শনাক্ত করতে পারিনা, বিষয়টা আসলে কি, বরং আমরা দাবী করি আমরা কোন ভুত দেখলাম বা শুনলাম বা কোন ফেরেশতা, বা ঈশ্বর; অথবা, আমাদের বয়স যদি অল্প হয় এবং আমরা মহিলা ও ক্যাথলিক হই, সেক্ষেত্রে কুমারী মাতা মেরীকে। এধরনের কোন ভিশন বা আপাত প্রকাশ অবশ্যই ভুত, ফেরেশতা, ঈশ্বর কিংবা কুমারীদের অস্তিত্বে বিশ্বাস করার জন্য শক্ত কোন কারণ নয়। এর উপর আবার আছে গন হারে এই সব দৃষ্টি বিভ্রম দেখার কাহিনী। পর্তুগালের ফাতিমায় ১৯১৭ সালে প্রায় সত্তর হাজার তীর্থ যাত্রী যেমন দাবী করে তারা দেখেছিল, সুর্য আকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, উপস্থিত মানুষের জমায়েত এর উপর ভেঙ্গে পড়ছে [৮], এই গন বিভ্রমটাকে বাতিল করা স্পষ্টতই কঠিন। খুব সহজ না কিন্তু ব্যাখ্যা করা কেমন করে সত্তর হাজার মানুষ একই হ্যালুসিনেশন দেখেছিল। কিন্তু এটা যে ঘটেছে সেটা মেনে নেয়া আরো কঠিন  যে ফাতিমার বাইরে সারা পৃথিবীর দৃষ্টির অগোচরে এমন কিছু আসলেই ঘটেছিল। শুধু দেখাই না, সৌরজগতের সেই ভয়াবহ ধ্বংশ অনুভব করা, যার প্রবল ত্বরণগতি যথেষ্ট সবকিছুরই মহাশুন্যে ছিটকে পড়ার জন্য। ডেভিড হিউমের মিরাকল বা অতিপ্রাকৃত ঘটনার পিথি (Pithy) টেষ্টটি কথা মনে পড়ে যেতে বাধ্য:  `কোন ধরনের স্বাক্ষ্যপ্রমানই একটি মিরাকল বা দৈব বা অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যথেষ্ট না, যদিনা সেই স্বাক্ষ্যপ্রমানটিই এমন কোন প্রকৃতির হয়ে থাকে যে তার অসত্যতাও সেটা যে সত্যকে প্রমান করার চেষ্টা করছে তারচেয়েও আরো বেশী অতিপ্রাকৃত’।

অসম্ভব মনে হতে পারে যে সত্তর ‍হাজার মানুষ একই সাথে বিভ্রান্ত হয়ে বা তারা একই সাথে নিজেদের মধ্যে যোগসাজশ করে একটি গণ মিথ্যার সৃষ্টি করতে পারে।  সত্তর হাজার ‍মানুষ সুর্যকে নাচতে দেখেছে এই বিষয়টি হয়তো ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে ভুল করেছে। অথবা তারা সবাই একসাথে মরীচিকা দেখেছে ( তাদের সবাইকে একসাথে সুর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে অনুরোধ করা হয়েছিল, দৃষ্টি ক্ষমতার জন্য বিষয়টা নিশ্চয়ই খুব একটা ভালো অভিজ্ঞতা ছিল না); কিন্তু এই সব প্রায় অসম্ভব ব্যাপারগুলো অনেক বেশী সম্ভাব্য এর বিকল্প ঘটনাটি থেকে: পৃথিবী হঠাৎ করে তার কক্ষপথে একদিকে বেকে যাওয়া এবং সৌরজগত ধ্বংস হবার ঘটনাটি, যা ফাতিমার বাইরে কেউ লক্ষ্য করেনি। আমি বোঝাতে চাইছি, পর্তুগালতো পৃথিবী থেকে সেরকম বিচ্ছিন্ন কোন দেশ না। আসলেই ঈশ্বর এবং ধর্মীয় অলৌকিক ঘটনাগুলোর ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে এর চেয়ে বেশী কিছু বলার প্রয়োজন আর নেই।আপনার যদি এধরনের কোন অভিজ্ঞতা থেকে থাকে, আপনি সম্ভবত সেটা সত্যি একটি ঘটনা এমন বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে পারেন। কিন্তু আপনার আশা করা উচিৎ না বাকী আমরা সবাই আমরা কথাই সত্য বলে ধরে নেব, বিশেষ করে যদি আমাদের ব্রেন এবং এর শক্তিশালী কার্য্যপদ্ধতি সম্বন্ধে সামান্যতম ধারনাও থেকে থাকে।

স্ক্রিপচার বা ধর্ম গ্রন্থ থেকে আর্গুমেন্ট:

এখনও বেশ কিছু মানুষ আছেন যারা ধর্মগ্রন্হে বর্নিত প্রমানের দ্বারা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে প্ররোচিত হন। খুব প্রচলিত যে যুক্তি, যার উৎস অনেকেই, যাদের মধ্যে অন্যতম সি এস লুইস ( তার বিষয়টি আরো স্পষ্ট বোঝা উচিৎ ছিল), যা দাবী করে, যেহেতু জীসাস বা যীশু নিজেকে ঈশ্বরের পুত্র বলে দাবী করেছেন, তিনি অবশ্য হয় সঠিক অথবা একজন মিথ্যাবাদী পাগল: পাগল, খারাপ লোক বা ঈশ্বর; বা খানিকটা স্থুল অনুপ্রাস, উন্মাদ, মিথ্যাবাদী বা প্রভু (লুন্যাটিক, লায়ার অর লর্ড); যীশু যে এধরনের কোন স্বর্গীয় পদমর্যাদা দাবী করেছিলেন তার স্বপক্ষে ঐতিহাসিক প্রমান খুব নগন্য। কিন্তু যদি যীশু যে এমন দাবী করেছিলেন তার প্রমান থাকে, আর সেই প্রমান জোরালো হয়, তাসত্ত্বে  প্রস্তাবটি সংক্রান্ত এই  ট্রাইলেমাটি (তিনটি অপছন্দনীয় বক্তব্যর মধ্যে একটিকে বেছে নেবার দ্বন্দ) হাস্যকরভাবে অপ্রতুল হতো। চতুর্থ সম্ভাবনা, যা এত স্পষ্ট যে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই, তা হলো আসলেই যীশু ভুল করেছেন। সেই সাথে বহু মানুষও। যাই হোক না কেন আমি আগেও বলেছি, ঐতিহাসিকভাবে এমন কোন ভালো প্রমান নেই যে যীশু আসলেই নিজেকে কখনো স্বর্গীয় ভেবেছিলেন।

কোন একটি বিষয় সম্বন্ধে  কিছু লেখা আছে, এই বিষয়টাই যথেষ্ট সেই সব মানুষদেরকে সহজেই প্ররোচিত করার জন্য, যারা সাধারণত এধরনের প্রশ্নের সাথে খুব একটা  অভ্যস্থ না: কে লিখেছে এটি এবং কখন? কেমন করে তারা জেনেছিল কি লিখতে হবে? তারা কি, তাদের সময়ে যা সত্যি বোঝাতে চেয়েছে, আমাদের সময়ে আমরা সেটাকে যা মনে করছি, তারা কি আসলেই তা বলতে চেয়েছিল? তারা কি পক্ষপাতহীন পর্যবেক্ষক ছিলেন?, বা তাদের নিজস্ব কিছু অ্যাজেন্ডা ছিল, যা তাদের লেখার প্রকৃতি নির্ধারণ করেছিল? উনবিংশ শতাব্দী থেকে বিজ্ঞ ধর্মতাত্ত্বিকরা নি:সন্দেহে প্রমান জড়ো করেছেন যে গসপেল আদৌ বিশ্বাসযোগ্য না সেই সময়ের প্রকৃত বাস্তবতায় ইতিহাসে আসলেই কি ঘটেছিল তার বর্ণনা হিসাবে। সবকিছু লেখা হয়েছে যীশু মারা যাবার বহুদিন পরে এবং এমনকি পলের এপিষ্টল (epistle) রচনার পরে, যেখানে আদৌ যীশুর জীবনে ঘটা পরবর্তীতে প্রস্তাবিত তথাকথিত ঘটনাগুলোর প্রায় কোনটারই উল্লেখ করা হয়নি।  এই সবগুলোরই অনুলিপি, পুনঃ অনুলিপি হয়েছে বহু  ’চাইনীজ হুইজপারস জেনেরাশনের’  (৫ অধ্যায দ্রষ্টব্য) ভ্রমপ্রবন অনুলিপিকারদের মাধ্যমে, যাদের ভুল না হওয়াটাই অস্বাভাবিক, তাদেরও নিজেদের ধর্মীয় অ্যাজেন্ডা আছে;

ধর্মৗয় উদ্দেশ্য প্রনোদিত ভাবে রং চড়ানোর একটি ভালো উদহারন হলো বেথলেহেমে যীশুর হৃদয়স্পর্শ করা জন্মকাহিনী, এরপরই  নীরিহ মানুষদের উপর পরিচালিত হেরডের ভয়াবহ নৃশংস গণহত্যার কাহিনী। যখন যীশুর মৃত্যুর বহু বছর পরে গসপেলগুলো সংকলিত হয়েছিল, কেউই জানতো না তার জন্ম আসলে কোথায় হয়েছে। কিন্তু ওল্ড টেষ্টামেন্টে বর্ণিত একটি প্রফেসি বা ভবিষ্যদ্বানীর ( Micah 5:2) উপর নির্ভর করে ইহুদী মতাবলম্বীরা ধারনা করতেন তাদের বহু প্রতীক্ষিত মেসিয়া বা  ত্রাণকর্তার জন্ম হবে বেথলেহেম এ। এই প্রফেসির আলোকে, জন (John) এর গসপেল সুস্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে, যীশুর অনুসারীরা অবাক হয়েছিলেন, তিনি বেথলেহেম এ জন্ম নেননি: ‘অন্যরা বলেন, এই হচ্ছে যীশু খৃষ্ঠ। কিন্তু কেউ কেউ বলেছিল, খৃষ্ঠর কি গ্যালীলি থেকে আসার কথা? ধর্মগ্রন্হ কি বলেনি, ডেভিডে বীজে জন্ম হবে খৃষ্টের, বেথলেহেম শহরে, যেখানে ডেভিড বসবাস করতেন’।

ম্যাথিউ (Matthew)  এবং লিউক (Luke) যীশুর জন্ম সমস্যাটার সমাধান করেছিলেন ভিন্ন ভাবে, সর্বোপরি যীশুর যে অবশ্যই  বেথলেহেম এ জন্ম হয়েছে এই সিদ্ধান্ত নেবার মাধ্যমে; কিন্তু তারা দুজনই তাদের কাহিনীতে তাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন ভিন্ন ভিন্ন পথে। ম্যাথিউ যেমন মেরী এবং জোসেফকে বেথলেহেমের বাসিন্দা বলেই উল্লেখ করেছেন, যীশুর জন্মের পর শুধু মাত্র তারা নাজারেথে বসবাস শুরু করেছিলেন এই বলে, সেটা মিসর থেকে ফেরার পর, যেখানে তারা রাজা হেরডের নীরিহ মানুষদের গনহত্যা থেকে বাচার জন্য পালিয়েছিলেন। কিন্তু লুক, এর ঠিক বিপরীত, অর্থাৎ যীশুর জন্মের আগেই মেরী এবং জোসেফ এর বসবাস ছিল নাজারেথ এ, সুতরাং তিনি কিভাবে সেই প্রফেসি মেলানোর জন্য তাদের সেই বিশেষ মুহুর্তে বেথলেহেম এ নিয়ে আসবেন?এজন্য ল্যুক বললেন যে, যে সময় সাইরেনিয়াস (কিরিনিয়াস) সিরিয়ার গভর্ণর ছিলেন, সীজার অগাষ্টাস কর আদায়ের উদ্দেশ্যে একটি সাম্রাজ্যব্যাপী আদম শুমারীর নির্দেশ দেন। তার নির্দেশ ছিল প্রত্যেককে তাদের জন্ম যে শহরে শুমারীর জন্য সেখানে ফিরে যেতে হবে। জোসেফ ছিল আবার ডেভিডের বংশধারার, এবং সে কারনে তাকে ডেভিডের সেই শহরে যেতে হবে, যার নাম বেথলেহেম। এই সমাধানাটাকে অবশ্যই মনে হয়েছিল সবচেয়ে উত্তম। কিন্তু ঐতিহাসিক ভাবে বিষয়টি সম্পুর্ন ভিত্তিহীন, এ এন উইলসন (A. N. Wilson) তার জীসাস (Jesus) এবং রবিন লেইন ফক্স (Robin Lane Fox) তার দি আনঅথোরাইজড ভার্সন (The unauthorized version) ( এছাড়া আরো অনেক সুত্র) এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন, ডেভিড, যদি তার অস্তিত্ব থেকে থাকে, তিনি বেচে ছিলেন মেরী এবং জোসেফের চেয়ে প্রায় ১০০০ বছর আগে। এছাড়া রোমানদের  কিই বা এমন কারন ছিল, যার জন্য জোসেফকে তার হাজার বছর আগে দুসম্পর্কের কোন পুর্বপুরুষের শহরে আসতে হবে, এছাড়া তারা এমনটা চাইবেই বা কেন। অনেকটা যেমন শুমারীরে ফর্মে  আমার ক্ষেত্রে  প্রয়োজন আছে নির্দিষ্ট করে বলা, অ্যাশবী- দ্য- লা- জোউখ হচ্ছে আমার জন্ম শহর, যদি আমি আমার পুর্বপুরুষের প্রাচীন ইতিহাস ঘেটে  আমি  সেইনোর দ্য ডাকেইন অবধি যেতে পারি, যিনি সেই শহরে উইলিয়াম দ্য কনকেররের সাথে এসেছিলেন এবং সেখানে বসতি গড়েছিলেন।

এছাড়াও লিউক যাচাই না করে সেই সব ঘটনার বিবরন দিয়ে সময়ের হিসাবেও গোলমাল করেছেন, যার সত্যতা ঐতিহাসিকরা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। গর্ভনর কিরিনিয়াসের সময় সত্যি একটি শুমারী হয়েছিল – একটি স্থানীয় শুমারী, সিজার অগাষ্টাসের ডিক্রি করা সাম্রাজ্যব্যাপী কোন শুমারী ছিল না সেটা, লিউকের বর্ণিত সময়ে না, সেটা হয়েছিল আরো অনেক পরে, ৬ খৃষ্টাব্দে, হেরোড এর মৃত্যুর বহুদিন পর। লেন ফক্স উপসংহার টানেন এই বলে যে, লিউক এর গল্প ঐতিহাসিকভাবেই অসম্ভব এবং অন্তর্গতভাবেই অসংলগ্ন, কিন্তু তিনি লিউক এর সমস্যা এবং তার ওল্ড টেস্টামেন্ট এ বর্ণিত মিকাহ এর প্রফেসির পুর্ন করার ঐকান্তিক ইচ্ছার সাথে সমবেদনাও প্রকাশ করেছেন।

২০০৪ এর ডিসেম্বরে ফ্রি ইনকোয়ারী তে (Free Inquiry), টম ফ্লিন (Tom Flyn), এই অসাধারন প্রত্রিকাটির সম্পাদক, এসব পাল্টা যুক্তি, এবং লোকপ্রিয় ক্রিসমাস এর গল্পের কিছু অসংলগ্ন অংশ নিয়ে লেখা বেশ কিছু নিবন্ধ এক জায়গায় করেছিলেন; ফ্লিন নিজেও অনেক অসঙ্গতির তালিকা করেছিলেন ম্যাথিউ এবং লিউকের মধ্যে, শুধুমাত্র যে দুই জন ইভানজেলিস্ট, যারা যীশুর জন্ম নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন[৯];  রবার্ট গিলুলী (Robert Gillooly) দেখিয়েছেন, কেমন করে যীশু কিংবদন্তীর গুরুত্বপুর্ণ বৈশিষ্টগুলো: পুর্ব দিকের নক্ষত্র, কুমারী মার সন্তান প্রসব, সদ্যজাত শিশুর প্রতি রাজাবাদশাদের উপঢৌকন এবং শ্রদ্ধান্জলি, পুনরুত্থান বা রেজারেকশন, স্বর্গে আরোহন, একেবারে প্রত্যেকটি বিষয় ধার করা হয়েছে ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এবং নিকট প্রাচ্যে প্রচলিত অন্যান্য  নানা ধর্ম থেকে। ফ্লিনের প্রস্তাব ছিল, ইহুদী পাঠকদের সুবিধার লক্ষ্যে মেসিয়ানিক প্রফেসি পুর্ণ করার জন্য ম্যাথিউর ( ডেভিডের বংশধর, বেথলেহেম এ জন্ম) ইচ্ছা মুখোমুখি হয় ইহুদী নয় এমন সমাজের জন্য খৃষ্টধর্মকে খাপ খাওয়ানোর জন্য লিউকের প্রচেষ্টার সাথে, সেজন্য প্যাগান হেলেনিষ্টিক ধর্মগুলোর নানা পছন্দের বিষয়গুলোর যোগ ( কুমারী মার সন্তান প্রসব, রাজাদের ভক্তি প্রদর্শন ইত্যাদি) করা হয়; এর ফলাফলে অসঙ্গতিগুলো খুবই সুস্পষ্ট, কিন্তু বিশ্বাসীরা এসব চিরন্তনভাবে উপেক্ষা করতে কখনো ভুল করেনি।

শিক্ষিত আর বোধসম্পন্ন খৃষ্টধর্মীদের অবশ্য বিষয়টি বোঝার জন্য আইরা গ্রেসউইনের (Ira Greshwin) এর মত কারো প্রয়োজন নেই: ‘বাইবেলে আমরা যা পড়তে বাধ্য হই /সেটা আসলে সেকরম নয়’, কিন্তু বহু স্বল্প জানা খৃষ্টানরা আছেন, যারা বাইবেলের কথা অক্ষরে অক্ষরেই চুড়ান্ত সত্য মনে করেন- যারা বাইবেলকে এত গুরুত্বের সাথে গ্রহন করেন যে তাদের কাছে এটি ইতিহাসের আক্ষরিক এবং নির্ভুল রেকর্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠিত এবং সেকারনে এটি তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সমর্থনে মুল ভিত্তি রচনা করেছে। এই মানুষগুলো কি কখনো এই বইটা খুলে পড়েনি যা তারা আক্ষরিক অর্থেই পুর্ন সত্য বলে বিশ্বাস করেন? কেনই বা তারা লক্ষ্য করেননি এই সব চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর মত স্পষ্ট অসঙ্গতিগুলো? যারা একে আক্ষরিক অর্থে সত্য বলে বিশ্বাস করেন তাদের কি চিন্তা হয়না যে, ম্যাথিউ জোসেফের বংশসুত্র রাজা ডেভিডের বংশের সাথে জোড়া লাগিয়েছেন মধ্যবর্তী ২৮ টি প্রজন্ম দিয়ে, যা লিউক করেছেন ৪১ টি প্রজন্ম দিয়ে? আরো খারাপ ব্যপার হলো, এই দুই তালিকায় নামের প্রায় কোন পুনরাবৃত্তি নেই! কিন্তু যাই হোক না কেন, যদি যীশুর জন্ম আসলেই কুমারী মার গর্ভে হয়, সেখানে জোসেফের বংশপরিচয়ই তো অপ্রাসঙ্গিক, এবং সেটা, যীশু স্বপক্ষে, ওল্ড টেষ্টামেন্ট এর সেই ভবিষ্যদ্বানী, ডেভিডের বংশে মেসিয়ার জন্ম হবে, সে বিষয়টি তো আর পুর্ণ করে না।

বার্ট এহরম্যান (Bart Ehrman) যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বাইবেল স্কলার একটি বইয়ে, যার শিরোনাম, দি স্টোরী বিহাইন্ড হু চেন্জ্ড দি নিউ টেষ্টামেন্ট অ্যান্ড হোয়াই ( The story behind who changed the new testament) উন্মোচন করেছেন, কি বিশাল অনিশ্চয়তা নিউ টেষ্টামেন্ট এর টেক্সকে অস্পষ্ট করে রেখেছে [১০]; এই বইয়ের ভুমিকায় অধ্যাপক এহরম্যান আবেগঘনভাবে   বাইবেল বিশ্বাসী মৌলবাদী থেকে তার চিন্তাশীল সন্দেহবাদী হবার ব্যাক্তিগত শিক্ষামুলক যাত্রার কথা উল্লেখ করেন। যে যাত্রা পরিচালিত হয়েছিল ধর্ম গ্রন্থের বিশালাকার ভুলগুলো অনুধাবন করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। উল্লেখযোগ্যভাবে, তিনি যখন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পদমর্যাদায় ক্রমশ উপরে উঠছিলেন একেবারে তলানির মুডি বাইবেল ইন্সস্টিটিউট থেকে হুইটন কলেজের মাধ্যমে ( এই তালিকার একটু উপরে, কিন্তু তারপরও বিলি গ্রাহামের আলমা ম্যাটার) সেখান থেকে প্রিন্সটন এ দুনিয়ার সেরাদের শীর্ষে, প্রতিটা ধাপে তাকে সতর্কবানী শুনতে হয়েছে, ক্রমবর্ধমান প্রগতিশীলতার ধারায় তার গোড়া মৌলবাদী খৃষ্টধর্মীয় মানসিকতা বজায় রাখা সহজ হবে না। এবং সেটাই সত্য প্রমানিত হলো,  এবং আমরা তার পাঠকরা এর উপকার পেলাম। বাইবেল সমালোচনা অন্যান্য যুগান্তকারী বইয়ের মধ্যে আছে রবিন লেন ফক্স (Robin Lane Fox) এর দি আনঅথোরাইজড ভার্সন (The unauthorized version), যার কথা এর আগেই বলেছি। এবং জাক বার্লিনারব্লাউ ( Jaques Berlinerblau)  এর দি সেকুলার বাইবেল : হোয়াই ননবিলিভারস মাস্ট টেক রেলিজিয়ন সিরিয়াসলী ( The secular bible:why nonbelievers should take religion seriously)।

চারটি গসপেল যাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্যানন বা ধর্মগ্রন্হের জন্য কম বেশী আনুমানিকভাবেই বাছাই করা হয়েছে, তাদের বেশ অনেকগুলো, কমপক্ষে ডজনখানেক নমুনা থেকে, যেমন, গসপেল অব টমাস, পিটার,নিকোডেমাস, ফিলিপ, বার্থোলোমিউ এবং মেরী ম্যাগডালেন ইত্যাদি [১১]; এই সব গসপেলদের কয়েকটি যারা সেই সময় পরিচিত ছিল অ্যাপোক্রিফা (Apocrypha) হিসাবে, এই বাড়তি গসপেলগুলোর কথাই টমাস জেফারসন উল্লেখ করেছিলেন, তার ভাইপোর কাছে লেখা একটি চিঠিতে:

নিউ টেষ্টামেন্ট বলার সময়, আমি ভুলে গেছি উল্লেখ করতে যে, তোমরা উচিৎ হবে খৃষ্টের প্রত্যেকটি ইতিহাসই পড়ে দেখা। এমনকি সেগুলোও যেগুলো একটি কাউন্সিল অব একলেসিয়াসটিক (ecclesiastic) এর সদস্যরা আমাদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে এদের চিহ্নিত করেছেন মিথ্যা বা সিউডো ইভানজেলিষ্ট হিসাবে, বাকীদের যেমন তারা চিহ্নিত করেছেন ইভানজেলিষ্ট হিসাবে; যেহেতু এই সব সিউডো ইভানজেলিষ্টদের গসপেল অন্যদের মতই একই মাত্রায় আমাদের অনুপ্রানিত করার দাবী করছে, তাদের এই দাবীটাকে তোমার নিজস্ব যুক্তি দিয়েই বিচার করতে হবে, ঐসব একলেসিয়াসটিকদের প্রদত্ত যুক্তি দিয়ে না।

ঐসব একলেসিয়াসটিকদের দ্বারা যে গসপেল গুলো বাতিল হয়েছে, তার কারন সম্ভবত  অন্য চারটি ক্যানোনিক্যাল গসপেলের কাহিনীর তুলনায় সেখানে এমন কিছু গল্প আছে যা বিব্রতকরভাবে ব্যাখ্যার অযোগ্য। টমাসের গসপেলে যেমন, যীশুর শৈশবের অসংখ্য ঘটনার বিবরণ আছে, যেখানে শিশু যীশু তার ম্যাজিক ক্ষমতাকে অপব্যবহার করেছে নানা দুষ্টামীতে, যেমন  খেলার সাথীদের ছাগলে রুপান্তরিত করেছে বা খেলাচ্ছলে বা কাদা মাটিকে রুপান্তর করেছে চড়ুই পাখিতে, কিংবা তার বাবাকে কাঠের কাজে সাহায্য করেছে রহস্যজনকভাবে কাঠের দৈর্ঘ বাড়িয়ে দিয়ে[১২];বলা হবে কেউ এই ধরনের মোটাদাগের অলৌকিক কাহিনী বিশ্বাস করে না যা টমাসের গসপেলে আছে, কিন্তু কোন কম বেশী বিশেষ কারনও কিন্তু নেই, চারটি ক্যানোনিক্যাল গসপেলকে বিশ্বাস করার জন্য। তাদের সবার স্ট্যাটাসই কিংবদন্তীর রুপকথার মত, রাজা আর্থার  এবং তার রাউন্ড টেবিলের নাইটদের গল্পের মত সন্দেহজনক তথ্যপুর্ন। এই চারটি ক্যানোনিক্যাল গসপেলের প্রত্যেকটির সিংহভাগ সংগৃহীত হয়েছে একটি সাধারন উৎস থেকে, হয় মার্কের গসপেল বা প্রাচীন হারিয়ে যাওয়া কোন কাজ যার সবচেয়ে আদি উত্তরসুরী ছিলেন মার্ক; কেউ জানেনা কারা ছিলেন সেই চার ইভানজেলিষ্ট, তবে তারা ব্যাক্তিগতভাবে কেউই যীশুর সাথে সাক্ষাৎ করেননি। বেশীর ভাগ বিষয় যা তারা লিখেছেন তা কোন অর্থেই ইতিহাসের সত্যভাষনের সামান্যতম প্রচেষ্ঠা না বরং যা শুধুমাত্র ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে ধার করে নতুন করে লেখা। কারন গসপেল তৈরী কারকরা খুব ভক্তির সাথে বিশ্বাস করতেন যে যীশুর জীবন যেন ওল্ড টেষ্টামেন্টের ভবিষ্যদ্বানীর সাথে মিলে যায়। এমন কি একটা ঐতিহাসিক কেসও তৈরী করা সম্ভব, যদিও বেশীর ভাগ মানুষ তা সমর্থন করবেনা, যে যীশু বলে আসলে কারো কোন অস্তিত্বই কোনদিনও ছিলনা, বেশ কয়েকজন সেটা করেছেনও ইতিমধ্যে , এর মধ্যে অন্যতম যেমন, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জি এ ওয়েলস (G A Wells) তার বেশ কিছু বইয়ে, যেমন ডিড জীসাস এক্সিস্ট (Did Jesus exist)?

যদি যীশুর সম্ভবত অস্তিত্ব ছিল, কোন সন্মান জনক বাইবেল বিশেষজ্ঞরা কেউই সাধারনত নিউ টেষ্টামেন্ট (এবং অবশ্যই ওল্ড টেষ্টামেন্ট) ইতিহাসে আসলে কি ঘটেছিল তার বিশ্বাসযোগ্য কোন রেকর্ড হিসাবে হিসাবে গ্রহন করেননা, এবং আমিও আর বাইবেলকে কোন ধরনের ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে প্রমান হিসাবে আর আলোচনায় আনবোনা। তার পুর্বসুরী জন অ্যাডামকে লেখা চিঠিতে টমাস জেফারসনের দুরদৃষ্টিপুর্ণ মন্তব্য, ‘একদিন আসবে যখন সর্ব শক্তিমান ঈশ্বরের দ্বারা কুমারী মাতার গর্ভে যীশুর রহস্যময় জন্ম কাহিনী, জুপিটারের মস্তিষ্কে মিনার্ভার সৃষ্টির মত রুপকথার সাথে একই শ্রেনীতে আলোচিত হবে’।

ড্যান ব্রাউনের (Dan Brown) উপন্যাস দি দা ভিন্চি কোড (The Vinci Code) এবং এর উপর আশ্রিত চলচ্চিত্রটি, চার্চ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। খৃষ্ট ধর্মাবলম্বীদের এই চলচ্চিত্রটি বয়কট করার জন্যও উৎসাহিত করা হয়েছিল, এমনটি যেখানে এটি প্রদর্শিত হয়েছিল সেখানে এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভও করা হয়েছে। পুরো ঘটনাটি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটি মনগড়া, বানানো, লেখকের কল্পনাপ্রসুত একটি কাহিনী। এই অর্থে, এটা ঠিক গসপেলের মতই। দি দা ভিন্চি কোড এবং গসপেল এর মধ্যে পার্থক্য শুধু, গসপেলগুলো হচ্ছে প্রাচীন কাহিনী আর দা ভিন্চি কোড  হচ্ছে আধুনিক একটি কাহিনী।

শ্রদ্ধেয় ধার্মিক বিজ্ঞানীদের থেকে আসা যুক্তি:

’বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে প্রখ্যাত মানুষদের বিশাল একটি অংশ খৃষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু তারা বিষয়টি জনসমক্ষে লুকিয়ে রাখেন, কারন তারা তাদের রোজগার হারাতে চান না’। বার্ট্রান্ড রাসেল

’নিউটন ধার্মিক ছিলেন, আপনি কে বলুন তো, নিজেকে নিউটন, গ্যালিলিও, কেপলার ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদিদের থেকে উৎকৃষ্ট মনে করেন থেকে? যদি তাদের জন্য ঈশ্বর যথেষ্ট হতে পারে, আপনি নিজেকে ঠিক কি মনে করছেন? এমনিতেই এটা  নিজে  যথেষ্ঠ পরিমান বাজে একটা যুক্তি, তেমন কোন কিছুই আসে যায় যদিও, তারপরও কোন কোন র্ধ্মবাদীরা  এমন কি এর সাথে ডারউইনের নাম যুক্ত করেছে, যার বিরুদ্ধে স্থায়ী এবং সহজে প্রমান করা সম্ভব এমন মিথ্যা গুজব যে, মৃত্যুশয্যায় তিনি ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, বিষয়টি নিরন্তরভাবে বার বার ফিরে আসে দুর্গন্ধের মত [১৩], যখন থেকে এর শুরু করেছিল জনৈক লেডি হোপ, যিনি একটা আবেগময় গল্প বুনেছিলেন এভাবে: অসুস্থ ডারউইন সন্ধ্যার আলোয় বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে আছেন, ‍নিউ টেষ্টামেন্টের পাতা উল্টাচ্ছেন এবং স্বীকারোক্তি করছেন যে বিবর্তন তত্ত্ব সম্পুর্ণ ভুল। এই অংশে আমি মুলত মনোযোগ দেব বিজ্ঞানীদের উপর, কারনটা- যা হয়ত খুব বেশী কষ্টসাধ্য না কল্পনা করা- যারা শ্রদ্ধেয় ব্যাক্তিদের ধর্মপ্রান হিসাবে জাহির করতে চান,তারা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই পছন্দ করেন বিজ্ঞানীদের উদহারন দিতে।

নিউটন সত্যিই নিজেকে ধার্মিক বলে দাবী করেছিলেন, আমার মনে হয়,  প্রায় সবাই তেমনটি করেছেন, উল্লেখযোগ্যভাবে উনবিংশ শতাব্দীর পর্যন্ত, কারন এ সময়ের পর বাধ্যতামুলকভাবে ধর্মবিশ্বাস প্রকাশের উপর সামজিক এবং আইনগত চাপ এর আগের শতকগুলো থেকে বহুলাংশে শিথিল হয়ে পড়েছিল এবং ধর্ম পরিত্যাগের  স্বপক্ষে বৈজ্ঞানিক সমর্থনও ছিল অপেক্ষাকৃতভাবে বেশী। অবশ্যই এই সময়ের দুই দিকেই এর ব্যতিক্রম ছিল। এমনকি ডারউইনের আগেও, সবাই কিন্তু ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন না, যেমন জেমস হট (James Haught) তার টু থাইজ্যান্ড ইয়ারস অব ডিসবিলিফ: ফেমাস পিপল উইথ দা কারেজ টু ডাউট ( 2000 years of disbelief: Famous people with the courage to doubt) বইয়ে দেখিয়েছেন এবং  তেমনি অনেক প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ডারউইনের পরেও তাদের ঈশ্বর বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। কারো পক্ষেই খৃষ্টান হিসাবে মাইকেল ফ্যারাডের ধর্মবিশ্বাসকে আন্তরিক না ভাবার কোন অবকাশ নেই, এমনকি সেই সময়ে পরেও যখন তিনি নিশ্চয়ই ডারউইনের কাজ সম্বন্ধে অবশ্যই কিছু জানতেন। তিনি সান্ডেম্যানিয়ান সেক্ট এর সদস্য ছিলেন, যারা ( অতীত অর্থে কারন বর্তমানে তারা একরকম বিলুপ্ত বর্তমানে) বাইবেলের আক্ষরিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাসী ছিলেন, এবং আচার অনুষ্ঠান করে তারা নতুন সদস্যদের পা ধুইয়ে দিতেন এবং ঈশ্বরের ইচ্ছা বোঝার জন্য লটারী করতেন। ১৮৬০ সালে ফ্যারাডে এই সেক্ট এর একজন গুরুজন বা এল্ডার হয়েছিলেন, যার একবছর আগেই অরিজিন অব স্পিসিস প্রকাশিত হয়েছিল এবং তিনি স্যান্ডেম্যানিয়ান হিসাবে ১৮৬৭ সালে মারা যান। পরীক্ষক ফ্যারাডে এর তাত্ত্বিক অপরপক্ষ, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, একই মাত্রায় নিবেদিত প্রান খৃষ্ঠান ছিলেন। তেমনি ছিলেন, উনবিংশ শতাব্দীর বৃটিশ পদার্থবিদ্যার আরেক স্তম্ভ উইলিয়াম থমসন। লর্ড কেলভিন, যিনি চেষ্টা করেছিলেন প্রমান করতে, যে সময়ের অভাবেই বিবর্তন সম্ভব না। এই মহান থার্মোডিনামিষ্ট ভুল সময়ের হিসাব অনুযায়ী, সুর্য হচ্ছে  এক ধরনের আগুন, যা জ্বালানী পোড়াচ্ছে, যে জ্বালানী কয়েশ মিলিয়ন বছরে শেষ হয়ে যাবে, কয়েক হাজার মিলিয়ন বছর নয়। কেলভিনের অবশ্যই পারমানবিক শক্তি সম্বন্ধে অবশ্যই কোন ধারনা ছিল না। সন্তোষজনক ব্যাপার হচ্ছে, ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন এর সভায়, দ্বায়িত্ব পড়ে ডারউইনের দ্বিতীয় ছেলে, স্যার জর্জ ডারউইনের উপর , তার স্যার উপাধি না পাওয়া বাবার ধারনা স্বপক্ষে প্রমান হিসাবে মাদাম কুরীর রেডিয়াম আবিষ্কারের বিষয়টি ব্যবহার করে তখনও জীবিত লর্ড কেলভিনের সময়ের পরিমাপকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য। বিংশ শতাব্দী জুড়ে, ক্রমশ বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকরা, যারা নাকি ধর্ম বিশ্বাস প্রচার করেছেন, তাদের খুজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তারা একেবারে দুষ্প্রাপ্য তা কিন্তু না। আমার সন্দেহ সাম্প্রতিককালের বেশীর ভাগ সেধরনের বিজ্ঞানীরা আসলে আইনস্টাইনীয় অর্থেই কেবল ধার্মিক, যা আমি প্রথম অধ্যায়ে (দি গড ডিল্যুশন) যা যুক্তি দিয়েছিলাম ধর্ম শব্দটির একটি অপব্যবহার হিসাবে। যাই হোক, অবশ্যই অনেক ভালো বিজ্ঞানীদের উদহারন আছে যারা আন্তরিকভাবেই প্রচলিত অর্থে ধার্মিক। সমসাময়িক বৃটিশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনটি নাম প্রথমেই নজর কাড়ে, ডিকেন্সীয় উপন্যাসে বর্ণিত আইনজীবিদের  কোন ফার্মের উর্ধতন সহযোগীদের নামের সাথে পছন্দনীয় একটি সদৃশ্যতা সহ: পিকক, স্ট্যানার্ড এবং পোলকিংহোম। এরা তিনজনই হয় টেম্পলটন পুরষ্কার জিতেছেন অথবা টেম্পলটন ফাউন্ডেশনের ট্রাষ্টি বোর্ডে আছেন। তাদের প্রত্যকের সাথে ব্যাক্তিগত এবং জনসমক্ষে হৃদ্যতাপুর্ণ আলোচনা পরও আমি বিস্মিত হয়েছি, বিস্ময়ের কারন কিন্তু কোন এক ধরনের মহাজাগতিক আইনপ্রণেতার উপর তাদের স্থাপিত বিশ্বাস না, বরং তাদের খৃষ্ট ধর্মের নানা বিস্তারিত বিষয়গুলোর প্রতি তাদের বিশ্বাস:  রেজারেকশন বা পুনরুত্থান, পাপের জন্য ক্ষমা ইত্যাদি নানা কিছু।

যুক্তরাষ্ট্রের এধরনের সমতুল্য কিছু উদহারন আছে, যেমন ফ্রান্সিস কলিন্স, মুল বা অফিসিয়াল হিউমান জীনোম প্রোজেক্ট এর যুক্তরাষ্ট্র অংশের প্রশাসনিক প্রধান [১৪]; কিন্তু ব্রিটেনের মতই, তারা চিহ্নিত দুর্লভ একটি ব্যাতিক্রম হিসাবে, এবং তারা তাদের সহকর্মী এবং অ্যাকাডেমিক সমাজে কৌতুকময় বিস্ময়ের কারন। ১৯৯৬ সালে, কেমব্রিজে ক্লেয়ারে তার পুরোনো কলেজের বাগানে আমি আমার বন্ধু হিউম্যান জীনোম প্রোজেক্টের একজন প্রতিষ্ঠাতা প্রতিভা জিম ওয়াটসনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম বিবিসি একটি প্রমান্য চিত্রর জন্য, যা আমি তৈরী করেছিলাম খোদ জেনেটিকস বিষয়টির প্রতিষ্ঠাতা প্রতিভা হিসাবে চিহ্নিত গ্রেগর মেন্ডেলকে নিয়ে।  অবশ্যই মেন্ডেল ধার্মিক ছিলেন, অগাষ্টানিয়ান অর্ডারের একজন মন্ক ; কিন্তু মনে রাখতে হবে, সেটা উনবিংশ শতাব্দী, যখন তরুন মেন্ডেলের জন্য এই মন্ক হওয়াটাই সহজতম উপায় ছিল  তার বিজ্ঞান চর্চা করার জন্য। তার জন্য এটি গবেষনা অনুদান বা রিসার্চ গ্র্যান্টের সমতুল্য। আমি ওয়াটসনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কি অনেক ধর্ম বিশ্বাসী বিজ্ঞানীদের চেনেন কিনা?  তার উত্তর ছিল: ‘প্রকৃত পক্ষে একজনও না, কদাচিৎ কারো কারো সাথে  দেখা হয়েছে, আমি বিব্রত বোধ করেছি (হাসি), তুমি তো জানো, ব্যাক্তিগত বা গুপ্তভাবে পাওয়া কোন সত্যকে যারা মেনে নেয় তাদের আমি বিশ্বাস করতে পারিনা’;মলিক্যুলার জেনেটিকস বিল্পবের ওয়াটসনের সহপ্রতিষ্ঠাতা, ফ্রান্সিস ক্রিক কেমব্রিজের চার্চিল কলেজে তার ফেলোশীপের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন কারন একজন দাতার অনুরোধের প্রেক্ষিতে কলেজটির কর্তৃপক্ষ একটি চ্যাপেল বানানো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ক্লেয়ারে ওয়াটসনের সাক্ষাৎকারের সময় আমি সচেতনভাবে তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি এবং ক্রিক এর থেকে ব্যাতিক্রম কিছু মানুষ কিন্তু বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে কোন সংঘাত দেখেন , কারন তাদের দাবী বিজ্ঞান হচ্ছে কেমন করে কোন কিছু কাজ করে এবং ধর্ম হচ্ছে এসব কিসের জন্য। ওয়াটসনের মন্তব্য: ‘বেশ, আমি মনে করিনা আমরা কোন কিছু জন্য সৃষ্ট, আমরা বিবর্তনের একটি ফলাফল মাত্র’।  ‘আপনি বলতে পারেন, তাহলে তো আপনার জীবন নিশ্চয়ই ভীষন হতাশার, যদি আপনার জীবনের কোন উদ্দেশ্য না থাকে’;কিন্তু তখন আমি একটা ভালো লান্চএর আশা করছিলাম। আমরা  সেদিন চমৎকার একটি লান্চও করেছিলাম।

ধর্মীয় অ্যাপোলজিষ্ট বা সমর্থনকারীদের সত্যিকার অর্থে একজন খাটি প্রখ্যাত ধার্মিক বিজ্ঞানীকে খুজে করে বের করার চেষ্ঠার মধ্যে হতাশার সুস্পষ্ট, যা আসলেই  খালি কলসীর তলে হাতড়ানোর মত ফাকার আওয়াজ তৈরী করে। যে একমাত্র ওয়েবসাইট আমি খুজে পেয়েছি, যারা দাবী করে নোবেল জয়ী খৃষ্টান বিজ্ঞানীদের তালিকা আছে বলে, তারা সেই তালিকায় কয়েক শত নোবেল জয়ী বিজ্ঞানিদের মধ্যে ছয় জনের নাম উল্লেখ করেছেন ।  এই ছয়জনের মধ্যে আবার চারজন নোবেল পুরষ্কারই পাননি আদৌ; এবং অন্তত একজন, আমি নিশ্চিৎভাবে জানি, অবিশ্বাসী, যিনি চার্চে যান শুধুমাত্র সামাজিক কারনে। বেনজামিন বেইট-হালাহমির (Benjamin Beit-Hallahmi) আরো বেশী পদ্ধতিগত গবেষনা প্রমান করে যে, বিজ্ঞানে নোবেল জয়ীরা, এমন কি যারা সাহিত্যে নোবেল জিতেছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমানে ধর্মবিশ্বাসহীনতার হার সুস্পষ্টভাবে বেশী, যখন তারা যে জনগোষ্ঠী থেকে এসেছে, তার সাথে তুলনা করা হয় [১৫]।  ১৯৯৮ সালে প্রথম সারির জার্ণাল নেচার এ লারসন (Larson) এবং হুইথাম (Witham) তাদের একটি গবেষনায় দেখিয়েছেন, যে সব আমেরিকার বিজ্ঞানীদেরকে তাদের সহকর্মীরা বিশেষভাবে প্রতিভাবান হিসাবে গন্য করেছেন এবং তাদের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমী অব সায়েন্স এর সদস্য নির্বাচিত করেছেন ( ব্রিটেনের ফেলো অব রয়্যাল সোসাইটির সমতুল্য), তাদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ বিজ্ঞানী ব্যক্তিগত ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন [১৬]; এই বিশাল পরিমান নীরিশ্বরবাদীদের তুলনামুলক আধিক্যর প্রায় ঠিক বীপরিত চিত্রটা প্রকাশ পায় বৃহত্তর আমেরিকার জনগনের মধ্যে, যেখানে ৯০ শতাংশের অধিক মানুষ কোন না কোন একটি অতিপ্রাকৃত সত্ত্বায় বিশ্বাস করেন। এই সংখ্যাটি অবশ্য মাঝামাঝি,খানিকটা কম প্রখ্যাত  বিজ্ঞানীদের মধ্যে, যারা ন্যাশনাল অ্যাকাডেমীর সদস্য নন। প্রখ্যাত বিজ্ঞানীদের নমুনার মতই ধর্ম বিশ্বাসীরা এখানেও সংখ্যা লঘু, কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম নাটকীয় পরিমান, প্রায় ৪০ শতাংশ। পুরোপুরিভাবে আমি যা আশা করেছিলাম, যুক্তরাষ্টের বিজ্ঞানীরা সাধারনত যুক্তরাষ্ট্রের জনগন অপেক্ষা কম ধর্মপরায়ন। এবং সবচেয়ে প্রখ্যাত বিজ্ঞানীরা বাকী সবার চেয়ে কম ধার্মিক। লক্ষ্য করার মত বিষয় হচ্ছে, বৃহত্তর আমেরিকার জনগোষ্ঠীর ধার্মিকতার একেবারে বীপরিত অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্টের বুদ্ধিজীবি সমাজের উপরের সারির নীরিশ্বরবাদিতা [১৭]।

একটা হালকা মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রথম সারির ক্রিয়েশনিষ্টদের ওয়েবসাইট আনসারস ইন জেনেসিস (Answers in Genesis) লারসন এবং হুইথামের এই গবেষনাটি উল্লেখ করেছে, কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের যে কিছু গলদ থাকতে পারে সেটা প্রমান করার জন্য না বরং তাদের আভ্যন্তরীন সংগ্রামের একটি অস্ত্র হিসাবে প্রতিদ্বন্দী ধর্মীয় আত্মপক্ষ সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধে, যারা দাবী করছে বিবর্তন ধর্মের সাথে কোন সংঘর্ষ সৃষ্টি করছে না। ’ন্যাশনাল অ্যাকাডেমী অব সায়েন্স পুরোপুরি ভাবে ঈশ্বর অবিশ্বাসীদের দখলে’ এ ধরনের একটি শিরোনামে  আনসারস ইন জেনেসিস, বেশ তৃপ্তি সহকারে  নেচার পত্রিকার সম্পাদককে লেখা লারসন এবং হুইথামে চিঠিটির শেষ অনুচ্ছেদটির উদ্ধৃতি দেয়:

‘আমরা যখন আমাদের গবেষনার ফলাফল প্রকাশের জন্য তৈরী করছি, ন্যাস (NAS বা ন্যাশনাল অ্যাকাডেমী অব সায়েন্স)  একটি বুকলেট প্রকাশ করে পাবলিক স্কুল গুলোতে বিবর্তন পড়ানোর উৎসাহ দিয়ে, যা দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক সমাজ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রক্ষনশীল খৃষ্টান গ্রুপের মধ্যে চলমান বিতর্কর কারন। এই বুকলেটটি পাঠকদের আশ্বস্ত করে এই বলে :‘ ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি নেই এই প্রশ্নের ব্যাপারে বিজ্ঞানের অবস্থান নিরপেক্ষ‘; ন্যাস প্রেসিডেন্ট ব্রুস অ্যালবার্ট বলেন, এই অ্যাকাডেমীর অনেক বিখ্যাত সদস্য খুবই ধার্মিক ব্যাক্তি, যারা বিবর্তনে বিশ্বাস করেন, এবং তাদের অনেকেই জীববিজ্ঞানী, তবে আমাদের এই সার্ভে অন্য কথা বলছে’।

অ্যালবার্ট, যে কেউ বুঝতে পারবেন, নোমা’কে (NOMA) মেনে নিয়েছেন, যে কারনে বিষয়টি আমি ২য় অধ্যায়ে আলোচনা করেছি, ’দি নেভিল চেম্বারলেইন স্কুল অব ইভোল্যুশনিষ্ট’ অংশে। ’অ্যানসারস ইন জেনেসিস’ এর আসলে ভিন্ন অ্যাজেন্ডা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাকাডেমী অব সায়েন্স এর সমতুল্য ব্রিটেনে ( এবং কমনওয়েলথ দেশগুলোর জন্য যেমন, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্থান এবং ইংরেজীভাষী আফ্রিকা ইত্যাদি, আছে রয়্যাল সোসাইটি। এই বইটা যখন প্রেসে আমার সহকর্মী আর. এলিসাবেথ কর্ণওয়েল (R. Elisabeth Cornwell) এবং মাইকেল স্টিরাট (Michael Stirrat) তখন রয়্যাল সোসাইটির ফেলোদের ধর্মীয় মতামত নিয়ে তাদের গবেষনা পত্রটি লিখছিলেন, লেখকদের পুরো উপসংহার প্রকাশিত হবে পরে, কিন্তু তারা আন্তরিকভাবে আমাকে অনুমতি দিয়েছেন প্রাথমিক ফলাফলটি এখানে প্রকাশ করার জন্য। তারা যে টুলটি ব্যবহার করেছিলেন মতামত কে স্কেল বা পরিমাপ করতে, তাহলো লাইকার্ট টাইপ এর সাত পয়েন্টের একটি স্কেল। সব, ১০৭৪ জন রয়্যাল সোসাইটির ফেলোদের মধ্যে যাদের একটি ইমেইল আছে (বেশীর ভাগেরই তা ছিল) তাদের উপর জরিপটি চালানো হয়, এবং প্রায় ২৩ শতাংশ এর উত্তর দেন (এ ধরনের গবেষনা  এটি বেশ বড় একটি সংখ্যা);  ‍তাদের কাছে বেশ কয়েকটি  প্রোপোজিশন প্রস্তাব করা হয়। যেমন, আমি ব্যক্তিগত ‌ঈশ্বরে বিশ্বাস করি,  অর্থাৎ যিনি প্রতিটি একক ব্যাক্তির ব্যাপারে খোজ খবর করেন, প্রার্থনা শোনেন এবং জবাব দেন, নানা ধরনের পাপ এবং খারাপ কাজের ব্যাপারে নজর রাখেন এবং বিচার করেন, এ ধরনের প্রতিটি প্রস্তাবের জন্য অংশগ্রহনকারীদের ১ ( সম্পুর্ন ভিন্নমত) থেকে ৭ ( সম্পুর্ন একমত) পর্যন্ত একটি সংখ্যাকে বেছে নিতে বলা হয় তাদের মতামত অনুযায়ী। এই গবেষনার ফলাফলটি লারসন এবং হুইথামে স্টাডিটির ফলাফলের সাথে তুলনা করা কঠিন, কারন তারা (লারসন এবং হুইথাম) তাদের অংশগ্রহনকারীদের ৩ পয়েন্টের একটি স্কেল দিয়েছিলেন, এটির মত ৭ পয়েন্ট স্কেল নয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও সার্বিক প্রবণতাটা কিন্তু ছিল একই রকম। রয়্যাল সোসাইটির ফেলোদের বিশাল একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাবিদ বিজ্ঞানীদের মতই  মাত্র ৩.৩ শতাংশ সদস্য মতামত দিয়েছেন ব্যাক্তিগত ঈশ্বরের অস্তিত্বের পক্ষে তাদের জোরালো সমর্থনের ( অর্থাৎ তারা এই স্কেলের ৭ পছন্দ করেছেন), অন্যদিকে ৭৮.৮ শতাংশ জোরালো ভাবে কোন ব্যাক্তিগত ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাপারে তাদের ভিন্নমত পোষন করেছেন ( বা তারা এই স্কেলের ১ পছন্দ করেছেন);  আপনি যদি এই স্কেলে যারা ৬ এবং ৭ পছন্দ করেছে তাদের বিশ্বাসী হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন এবং যারা ১ ও ২ পছন্দ করেছে তাদের অবিশ্বাসী হিসাবে সংজ্ঞায়িত করেন, তাহলে ২১৩ জনের একটা বড় অংশ দেখা যাচ্ছে অবিশ্বাসী আর মাত্র ১২ জনকে দেখা যাচ্ছে বিশ্বাসী হিসাবে। লারসন এবং হুইথামের মত বা বেইট হালাহমী এবং আরজাইলের গবেষনায় বা কর্ণওয়েল এবং স্টিরাট এর গবেষনায় যা প্রতীয়মান হয়েছে, তাহলো যদিও সামান্য কিন্ত গুরুত্বপুর্ণ একটি প্রবণতা আছে অন্যান্য শাখার বিজ্ঞানীদের তুলনায় অপেক্ষাকৃতভাবে জীববিজ্ঞানীদের মধ্যে নিরীশ্বরবাদীদের সংখ্যায় বেশী হবার ক্ষেত্রে। বিস্তারিত আরো কিছু এবং কৌতুলহদ্দেীপক উপসংহার জানার জন্য তাদের গবেষনা প্রকাশ হলে পড়ে দেখতে পারেন আগ্রহীরা [১৯]।

ন্যাশনাল অ্যাকাডেমী বা রয়্যাল সোসাইটির প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের থেকে এবার অন্যদিকে নজর দেই, এমন কোন কি প্রমান আছে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতে নীরিশ্বরবাদীরা সাধারনত বেশী শিক্ষিত এবং বেশী মেধা সম্পন্ন জনগোষ্ঠী থেকেই আসছে ? বেশ কিছু গবেষনাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, ধার্মিকতা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার ও আই কিউ বা বুদ্ধাঙ্কর মধ্যে পরিসংখানগত সম্পর্ক নিয়ে। মাইকেল শেরমার (Michael Shermer) তার হাউ ‌উই বিলিভ: দি সার্চ ফর গড ইন অ্যান এজ অব সায়েন্স (How we believe: The search for God in an age of Science) এ বর্ণনা দিয়েছেন একটি বড় আকারের সার্ভের, যেখানে রানডোমভাবে বাছাই করা যুক্তরাষ্ট্রের জনগোষ্ঠী মাঝে গবেষনা করেছিলেন শেরমার এবং তার সহযোগী ফ্র্যাঙ্ক সুলোওয়ে; তাদের পাওয়া চমকপ্রদ সব ফলাফলের মধ্যে ছিল ধর্মপ্রিয়তার আসলেই ৠণাত্মক বা নেগেটিভ একটি সম্পর্ক আছে উচ্চ শিক্ষার সাথে, অর্থাৎ ধার্মিকতা ক্রমশ কমতে থাকে শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়ার সাথে সাথে; উচ্চ শিক্ষিত মানুষদের ধর্মপ্রীতি থাকার সম্ভাবনা সাধারনত কম। বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহের এবং রাজনৈতিক উদারপন্থিতার (খুব জোরালো) সাথে ধার্মিকতারও ৠণাত্মক সম্পর্ক আছে। এর কোনটাই বিস্ময়কর ফলাফল যেমন নয় তেমনি, এই সত্যটা অবাক করে না যেমন পিতামাতা ধার্মিকতার সাথে সন্তানদের ধার্মিকতার ধনাত্মক একটি সম্পর্ক বিদ্যমান। সমাজবিজ্ঞানী বৃটিশ শিশুদের উপর গবেষনায় দেখেছেন, শুধুমাত্র প্রতি ১২ জনে একজন তাদের পিতামাতার ধর্মবিশ্বাস থেকে নিজেকে বের করে আনতে পারে।

স্পষ্টতই বিভিন্ন গবেষকদের পরিমাপের পদ্ধতিটি ভিন্ন, সুতরাং বিভিন্ন গবেষনার ফলাফল পারস্পরিক তুলনা করা সহজসাধ্য কাজ না। মেটা অ্যানালাইসিস হচ্ছে একটা পদ্ধতি, যেখানে গবেষকরা কোন একটি বিষয়ে প্রকাশিত সবগুলো গবেষনাপত্র নিয়ে দেখেন কতগুলো গবেষনা একই রকম উপসংহারে পৌছেছে আর কতগুলোই বা ভিন্ন কোন একটা উপসংহারে উপনীত হয়েছে। ধর্ম এবং আই কিউ উপর আমার জানা একমাত্র মেটা অ্যানালাইসিসটি প্রকাশ করেছিলেন পল বেল (Paul Bell), ২০০২ সালে মেনসা (Mensa) ম্যাগাজিনে ( মেনসা হচ্ছে উচ্চ বুদ্ধাঙ্ক বা আই কিউ সম্পন্ন মানুষদের একটি সোসাইটি, এবং আশ্চর্য হবার কোন কারন নেই যে তাদের ম্যাগাজিন এমন কিছু বিষয়ে প্রবন্ধ ছাপায় যা তাদের মধ্যে সংহতি বৃদ্ধি করে) [২০]। বেল এর মতে, ১৯২৭ থেকে শুরু করে  ৪৩ টা স্টাডি করা হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, বুদ্ধিমত্তা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার সম্পর্ক নিয়ে। মাত্র চারটি ছাড়া বাকী সবকয়টি একটি বীপরিত সম্পর্ক খুজে পেয়েছে। অর্থাৎ বুদ্ধিমত্তা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার  স্তর যত বেশী হবে, সেই মানুষগুলোর ধার্মিক হবার সম্ভাবনা বা কোন ধরণের ’বিশ্বাস’ ধারন করার সম্ভাবনাও হ্রাস পাবে।

যে কোন মেটা অ্যানালাইসিস অবশ্যই  অনেক কম সুনির্দিষ্ট হয়, এই বিষয়ে যে কোন একটি নির্দিষ্ট স্টাডির তুলনায় যেগুলো সাধারনত এই মেটা অ্যানালাইসিসের অংশ হয়। এই ধরনের আরো বেশী স্টাডি হলে ভালো, এমনকি সেরা প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন ন্যাশনাল অ্যাকাডেমীগুলো বা প্রধান প্রধান পুরষ্কারগুলোর বিজয়ীদের, যেমন নোবেল, ক্র্যাফুর্ড, ফিল্ড, কিয়োটো, কসমস এবং অন্যান্যগুলো, মধ্যে আরো গবেষনা পরিচালনা করা প্রয়োজন। আমি আশা করছি এই বইটির ভবিষ্যৎ সংস্করনে সেই সব উপাত্তগুলো সংযুক্ত হবে। বর্তমান স্টাডিগুলোর থেকে যুক্তিসঙ্গত উপসংহার , জননন্দিত রোল মডেল, বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে ধর্মীয় পক্ষ সমর্থনকারীদের জন্য হয়ত মঙ্গল হবে তাদের স্বভাব বিরুদ্ধভাবেই চুপ থাকাটা ।

পাসকালের বাজী:

বিখ্যাত ফরাসী গনিতজ্ঞ ব্লেইজ পাসকাল (Blaise Pascal) মনে করতেন, ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিপক্ষে যত বড়ই সম্ভাবনা থাকুক না কেন, তার চেয়ে অনেক বেশী খেসারত দিতে হবে, যদি এ বিষয়ে কোন ধরনের ভুল অনুমান করলে; তাই ঈশ্বরে বিশ্বাস করাই আপনার জন্য মঙ্গলজনক, কারন আপনি যদি সঠিক হন, আপনি অনন্ত সুখের অধিকারী হবেন এবং আর আপনি যদি ভুলও করেন, সে ক্ষেত্রে আপনার কোন ক্ষতিও হচ্ছেনা। কিন্তু অন্যদিকে যদি আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেন, এবং যদি দেখা যায় আপনার ধারনাটা ভুল, সেক্ষেত্রে আপনার জন্য আছে অনন্ত নরক যন্ত্রণা, আবার আপনি যদি সঠিকও হন, সে ক্ষেত্রে আপনার কিছু আসবে যাবে না। এরকম একটি উভয়সংকটে সি‌দ্ধান্ত নিতে কি খুব বেশী মাথা খাটাতে হবে ?  সুতরাং ঈশ্বরে বিশ্বাস করুন।

কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে,  এই যুক্তিটাকে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু অদ্ভুত ব্যাপার আছে। কোন কিছুকে ’বিশ্বাস’ করাকে কিন্তু আপনি কোন পলিসি বা নীতি হিসাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না, নিদেনপক্ষে বিশ্বাস এমন কোন কিছু না যে, আমি তা করার সিদ্ধান্ত নিতে পারি নিজের একটি ইচ্ছা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আমি চার্চে যাবার সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং আমি নিসেন ক্রিড পাঠ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারি, আমি এক থাক বাইবেলের উপর হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি এই বলে যে, এর ভিতরের সব শব্দকে আমি মনে প্রানে বিশ্বাস করি। কিন্তু এসব কোন কিছুই আমাকে আসলে সেটাকে ‘বিশ্বাস’ করাবে না যদি আমি নিজে ’বিশ্বাস’ না করি। পাসকালের বাজী তাই শুধু ‘যুক্তি’ হতে পারে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করার ’ভান’ করার ক্ষেত্রে। এবং যে ঈশ্বরে আপনি বিশ্বাস করছেন বলে দাবী করছেন, ভালো হয় সে যেন সর্বজ্ঞ ধরনের কোন ঈশ্বর না হয়,  এর ব্যতিক্রম হলে তিনি এই ছলনার ব্যাপারটা সহজে ধরে ফেলার কথা। আমি সিদ্ধান্ত নেবার মাধ্যমে কিছু  বিশ্বাস করতে পারবেন এমন  হাস্যকর ধারনাটিকে বেশ সুন্দর ভাবে ঠাট্টা করেছিলেন ডগলাস অ্যাডামস (Douglas Adams) তার ডার্ক জেন্টলীস হলিস্টিক ডিটেকটিভ এজেন্সি (Dirk Gently’s Holistic Detective Agency) বইটিতে, যেখানে আমাদের সাথে দেখা হয়, একটি রবোটিক ইলেক্ট্রিক পুরোহিতের সাথে, শ্রম কমানোর যে যন্ত্রটি আপনি কিনতে পারবেন, যে ’আপনার পক্ষ হয়ে আপনার বিশ্বাস’ করার কাজটি করে দেবে। এর ডি ল্যাক্স মডেলটির বিজ্ঞাপন করা হয়েছে, ’এরা সল্ট লেক সিটিতে আপনি যা কখনো বিশ্বাস করতে পারবেননা, এরা সেটা বিশ্বাস করতে সক্ষম’।

যাই হোক, কিন্তু কেন, আমাদের এই ধারনাটাকে সহজে গ্রহন করতে হবে যে, আপনি যদি ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে চান, আপনাকে অবশ্যই একটা জিনিস করতে , তাহলো তাকে বিশ্বাস করতে হবে? বিশ্বাস করার মধ্যে কি বিশেষত্ব আছে?  ঈশ্বররের কি দয়াশীলতা বা উদারতা বা নম্রতাকে পুরষ্ক‍ৃত করার কথা না? অথবা আন্তরিকতাকে?  কি হবে, যদি ঈশ্বর একজন বিজ্ঞানী,  যিনি সততার সাথে সত্যের অনুসন্ধানকে সবচেয়ে শ্রেষ্ট মানবীয় গুন বলে মনে করেন? আসলেই তো, এই মহাবিশ্বের ডিজাইনার হিসাবে যাকে দাবী করা হয়, তাকে নিশ্চয়ই বৈজ্ঞানিক হতে হবে? বার্ট্রান্ড রাসেলকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যদি তার মৃত্যুর পর তিনি যদি ঈশ্বরের মুখোমুখি হন, এবং ঈশ্বর যদি জানতে চান, কেন রাসেল তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন না? রাসেলের উত্তর ছিলো ( আমি বলবো প্রায় অমর), ’যথেষ্ট প্রমান ছিল না ঈশ্বর, যথেষ্ট প্রমান ছিল না’; ঈশ্বরের কি পাসকালের কাপুরুষোচিত সুবিধাবাদী বাজীর চেয়ে রাসেলকে তার সাহসী সন্দেহবাদিতার জন্য বেশী শ্রদ্ধা করার কথা না ( বাদ দিলাম তার রাসেলের সেই সাহসী শান্তিবাদিতা, যার কারনে তাকে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় কারাভোগ করতে হয়েছিল)? এবং যদিও আমাদের জানার উপায় নেই, ঈশ্বর কোন দিকে সমর্থন দেবেন এবং জানার প্রয়োজনও আসলে নেই পাসকালের বাজীর যুক্তিকে প্রত্যখান করার জন্য। মনে রাখতে হবে আমরা একটা বাজির কথা বলছি এবং পাসকাল কিন্তু বাজীর স্বপক্ষে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ ‍ছাড়া আর বেশী কিছু দাবী করেননি; আপনি কি বাজী রাখবেন যে ঈশ্বর অসৎভাবে ভান করা বিশ্বাসকে ( বা এমনকি সৎভাবে করা বিশ্বাসকে) আন্তরিক সৎ সন্দেহবাদীতার চেয়ে বেশী মুল্য দেন? এবং তারপরও ধরুন, আপনি মারা যাবার পর যে, ঈশ্বরের মুখোমুখি হলেন দেখা গেল তিনি বা‘ল (Baal)‌ এবং তার পুরোনো প্রতিদ্বন্দী ইয়াওয়ে (জিহোভা) থেকে কোন অংশে কম হিংসুটে না। পাসকালের জন্য ভুল কোন ঈশ্বরের উপর বাজি রাখার চেয়ে কোন ধরনের উপর ঈশ্বরের উপর না বাজি রাখাটাই কি উত্তম না ?  সম্ভাব্য অসংখ্য ঈশ্বর, দেব বা দেবীদের যে কোন কারোর উপর বাজি রাখতে পারার সম্ভাবনাটি পাসকালের পুরো যুক্তিটাকে কি প্রশ্নবিদ্ধ করে না? পাসকাল সম্ভবত ঠাট্টা করছিলেন, যখন তিনি তার বাজীর  স্বপক্ষে প্রচারনা করেছিলেন, ঠিক যেমন আমি এখন ঠাট্টাচ্ছলে একে বর্জন করছি। কিন্তু আমার সাথে মানুষের দেখা হয়েছে, যেমন কোন লেকচারের পরে প্রশ্নোত্তর পর্বে, যারা খুবই গুরুত্বের সাথে পাসকালের এই বাজীকে দাবী করেছে ঈশ্বর বিশ্বাসের স্বপক্ষে যুক্তি হিসাবে, সুতরাং একারনেই এটিকে খানিকটা আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা ছিল।

সবশেষে,  পাসকালের বাজীর ঠিক বীপরিত কোন বাজীর স্বপক্ষে কি যুক্তি প্রস্তাব করা সম্ভব? ধরা যাক, আমরা মেনে নেই, আসলে খুব সামান্য পরিমান সম্ভাবনা আছে ‌ঈশ্বরের অস্তিত্ব এর। তাসত্ত্বেও বলা যেতে পারে আপনি একটি উত্তম এবং পরিপুর্ণ জীবন কাটাতে পারবেন তার অস্তিত্বের উপর বাজি রাখার চেয়ে তার অস্তিত্বহীন উপর বাজী রাখার মাধ্যমে এবং এভাবে আপনার মুল্যবান সময়, তাকে উপাসনা করার পেছনে অপচয় না করে, তার জন্য আত্মত্যাগ না করে, বা তার জন্য যুদ্ধ করে বা না মৃত্যু বরন করে ইত্যাদি। ‍আমি এখানে এই প্রশ্নটা নিয়ে আর আগে বাড়বো না, কিন্তু পাঠকরা মনে রাখতে পারেন বিশেষ করে যখন আমরা ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচার পালনের প্রক্রিয়ার কি ধরনের অশুভ পরিনতি হতে পারে সেই সংক্রান্ত পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আলোচনা করবো।

বায়েসিয়ান যুক্তিগুলো:

আমার মনে হয় ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমান করার সবচে আজব কেসটি আমি দেখেছি বায়েসিয়ান যুক্তির ব্যবহারে, সম্প্রতি স্টিফেন আনউইন (Stephen Unwin) এই যুক্তিগুলো প্রস্তাব করেছেন তার দি প্রোবাবিলিটি অব গড (The probability of God) বইটিতে। আমি প্রথমে খানিকটা ইতস্তত বোধ করছিলাম এই যুক্তিগুলো এখানে  যোগ করার কথা ভেবে। যা শুধুমাত্র দুর্বলই না, এবং বহুকাল আগে থেকেই অপেক্ষাকৃত কম শ্রদ্ধা কুড়িয়েছে। যদিও আনউইনের বইটি উল্লেখযোগ্যভাবে সাংবাদিকদের নজর কেড়েছিল যখন ২০০৩ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয় এবং এছাড়াও এই যুক্তিটি আমার বেশ কিছু আলোচনার সুত্র একত্র করার একটা সুযোগ দিয়েছে। তার লক্ষ্য নিয়ে আমার খানিকটা সহমর্মিতা আছে , কারন ২ নং অধ্যায়ে আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিশ্বাস একটি বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস এবং অন্ততপক্ষে নীতিগতভাবে পরীক্ষাযোগ্য। আনউইন কুইকজোটিক বা অতিমাত্রায় আদর্শবাদী বাস্তবাজ্ঞান বর্জিত একটি প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনাটির একটি সংখ্যাগত রুপ দিতে, যা আসলেই হাস্যকর।

বইটির সাবটাইটেলটি, ’এ সিম্পল ক্যালকুলেশন দ্যাট প্রুভস দ্য আল্টিমেট ট্রুথ ( A simple calculatio that proves the ultimate truth), যে শেষ সংস্করণে প্রকাশকের সংযোজন তা স্পষ্ট বোঝা যায়, কারন এই অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস আনউইনের মুল বই্ এর  টেক্সট এ পাওয়া যায়না। বইটাকে বলা যায়, একটি হাউ টু ম্যানুয়াল, এক ধরনের বায়েস এর থিওরেম ফর ডামিস গোছের কিছু, যা কিনা হালকা বিদ্রুপাত্মক ভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে কেস স্টাডি হিসাবে ব্যবহার করেছে। আনউইন অনায়াসে একই ভাবে কোন কাল্পনিক খুনকে টেষ্ট কেস স্টাডি ব্যবহার করতে পারতেন বায়েস এর থিওরেম বোঝাতে: গোয়েন্দা তদন্ত কর্মকর্তা প্রথমে নানা আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখলেন; রিভলভারে আঙ্গুলের ছাপ ইঙ্গিত করছে, মিসেস পিকক এই হত্যা করেছেন। এখন এই সন্দেহটাকে গানিতীকভাবে পরিমাপ করুন তার উপর একটি সম্ভাবনার সম্ভাব্য সংখ্যা দিয়ে। কিন্তু প্রফেসর প্লুম এর উদ্দেশ্য ছিল মিসেস পিকককে দোষী হিসাবে ফাসানোর জন্য। সুতারাং এর আগের সম্ভাবনার পরিমাপের থেকে একটি সংখ্যা পরিমান হ্রাস করুন; ফরেনসিক প্রমান বলেছে শতকরা ৭০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে,  বেশ দুর থেকে রিভলভারটি থেকে নির্ভুল নিশানায় গুলি বের হবার, যা দাবী করছে হত্যাকারী সম্ভবত সামরিক প্রশিক্ষন প্রাপ্ত, সুতরাং কর্নেল মাষ্টার্ডকে নিয়ে আমাদের বাড়তি সন্দেহটাকে একটা সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করুন। দেখা যাচ্ছে রেভারেন্ড গ্রীন এর খুন করার সবচে সম্ভাব্য মোটিভ আছে ; সুতরাং তার ক্ষেত্রে আমাদের গানিতীক সম্ভাবনার পরিমাপটা বাড়ানো হোক।  কিন্তু লম্বা সোনালী যে চুল এর নমুনা নিহতের পরনের জ্যাকেটে পাওয়া গেছে  সেটা মিস স্কারলেট এর এবং … এভাবে আরো। এরকম সাবজেক্টিভ বা আত্মগত ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভাবনার নানা গানিতীক পরিমাপ গোয়েন্দা কর্মকর্তার মনে ঘুরপাক খেতে থাকে, বার বার নানা সম্ভাবনা তাকে নানা দিকে টেনে নেবার চেষ্টা করতে থাকে। বায়েস এর থিওরেম এর তাকে উপসংহারে উপনীত হতে সহায়তা করার কথা। এটি হচ্ছে গানিতীক একটি ইন্জিন যা নানা সম্ভাব্য সংখ্যাকে যুক্ত করে একটি চুড়ান্ত রায় দেয়, যার আবার সম্পুর্ণ নিজস্ব একটি সম্ভাবনার পরিমাপ আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে চুড়ান্ত সংখ্যাটি কতটুকু উত্তম হবে তা নির্ভর করবে ইন্জিনে ইনপুট করা মুল সংখ্যাগুলোর উপর। এগুলো সাধারনত আত্মগতভাবে বিচার করা বা সাবজেকটিভ এবং সে কারনে  এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল সন্দেহগুলোও এই হিসাবে প্রবেশ করে। সেই  GIGO  নীতিও ( Garbage In Garbage Out) এখানে প্রযোজ্য, এবং আনউইনের ঈশ্বর উদহারনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র প্রযোজ্য বললে খুব বেশী লঘুকরন করা হয়ে যায়।

আনউইন একজন ঝুকি ব্যাবস্থাপনা পরামর্শক যার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দী পরিসংখ্যানের পদ্ধতির তুলনায় বিশেষ দুর্বলতা আছে বায়েসিয়ান পদ্ধতিতে উপসংহারে উপনীত হবার।তিনি বায়েসীয় থিওরেমটি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, কোন হত্যাকান্ডের কেস স্টাডি না বরং সবচেয়ে বড় যে টেষ্ট কেস, ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়টিকে। তার পরিকল্পনা হলো সম্পুর্ন অনিশ্চয়তা দিয়ে বিষয়টি শুরু করা, যা তিনি পরিমাপ করার চেষ্টা করেছেন ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্ব উভয়ের শতকরা ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা দিয়ে। তারপর তিনি তালিকা করেছেন মোট ৬ টি ফ্যাক্ট এর যাদের এই বিষয়ের উপর প্রভাব থাকার সম্ভাবনা আছে, এবং প্রত্যেকটির একটি করে পরিমাপগত সংখ্যা ভাগ করে দেয়া হয়েছে, এবং এরপর সব সংখ্যাগুলোকে বায়েসীয় থিওরেম এর ইন্জিনে ইনপুট করার পর তিনি লক্ষ্য করেছেন কোন সংখ্যাটি বের হয়ে আসে। সমস্যা হচ্ছে ( আবার পুনরাবৃত্তি করছি) এই ৬ টি সংখ্যা যা প্রত্যেকটি নিয়ামক ফ্যাক্টের সাথে প্রদান করা হয়েছে, তা আসলে পরিমাপ করা নয়, এটি সম্পুর্ন ভাবে স্টিফেন আনউইনের ব্যাক্তিগত বিচার বিবেচনার দ্বারা প্রদত্ত, যা এই অনুশীলনের খাতিরে সংখ্যায় রুপান্তরিত করা হয়েছে। এই ৬ টি ফ্যাক্ট হচ্ছে:

১. আমাদের ভালোমন্দ বোঝার একটি ক্ষমতা আছে

২. মানুষ অনেক অশুভ কাজ করে (হিটলার, স্টালিন, সাদ্দাম হুসেইন)

৩. প্রকৃতিও অশুভ কাজ করে ( ভুমিকম্প, সুনামি, হারিকেন)

৪. ছোটখাট অলৌকিক ঘটনা ঘটতে পারে ( আমি আমার চাবি হারিয়ে ফেলেছিলাম এবং আবার তা আমি খুজে পেলাম)

৫. বড় মাপের অলৌকিক ঘটনা ঘটতে পারে ( যীশু মৃত্যুর পরে পুনরুজ্জীবিত হয়েছিলেন)

৬. মানুষের নানা ধর্মীয় অভিজ্ঞতা আছে ;

এইসব কিছুর অবশেষে যা প্রমান করে ( আমার মতে, কোন কিছুই না) তা হলো, দোদুল্যমান বায়েসীয় দৌড়ে যেখানে ঈশ্বর আগে থেকে বাজীতে এগিয়ে ছিলেন, খানিকটা পিছিয়ে পড়েন, তারপর আবার ধীরে ধীরে তার ৫০ শতাংশ জায়গায় ফিরে যান, যেখান থেকে তিনি শুরু করেছিলেন, অবশেষে শেষ পর্যন্ত তিনি আনউইনের হিসাব মতন ৬৭ শতাংশ সম্ভাবনা অর্জন করেন তার অস্তিত্বের স্বপক্ষে। এখানে আনউইন সন্তুষ্ট হতে পারেননি বায়েসীয় ফলাফলের উপর, তার কাছে এই ৬৭ শতাংশ যথেষ্ট বেশী মনে হয়নি, সুতরাং তিনি একটা অদ্ভুত একটি ধাপের শরণাপন্ন হন, জরুরী ভাবে তিনি ‘বিশ্বাস’কে এর মধ্যে ইনজেক্ট করে এই সম্ভাবনাকে নিয়ে যান ৯৫ শতাংশর কাছে। স্পষ্টত এটা মনে হতে পারে একটা ঠাট্টা, কিন্তু আসলে ঠিক এভাবেই তিনি কাজটি করেছেন; ঠিক কেন এভাবে কাজটি করেছেন সেটার ব্যাখ্যা আমি যদি দিতে পারতাম ভালো হতো, কিন্তু আসলে আমারও আর কিছুই বলার নেই এ বিষয়ে। এই ধরনের উদ্ভট দাবী আমি আগেও দেখেছি অন্য ক্ষেত্রে, যখন আমি ধার্মিক কিন্তু বুদ্ধিমান বিজ্ঞানীদের চ্যালেন্জ করেছি তাদের বিশ্বাসের স্বপক্ষে তাদের যুক্তি ব্যাখা করার জন্য, বিশেষ করে তারা যখন নিজেরাই স্বীকার করেন তাদের বিশ্বাসের স্বপক্ষে কোন প্রমান নেই: ‘আমি স্বীকার করছি কোন প্রমান নেই। এজন্য কারন আছে কেন একটাকে ’বিশ্বাস’ বা ফেইথ বলা হয়’ ( এই শেষ বাক্যটি উচ্চারন করা হয় প্রায় সুস্পষ্ট আত্মবিশ্বাসের সাথে, কোন ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থন মুলক এমন বক্তব্যর জন্য নুন্যতম অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইবার নমনীয়তার চিহ্ন ছাড়াই)।

আশ্চর্যজনকভাবেই আনউইনের ৬ টি প্রস্তাবনার তালিকায় ডিজাইন থেকে যুক্তি নেই, এছাড়া অ্যাকোয়াইনাস এর পাচটি প্রমানের একটিও এখানে নেই, এ ছাড়াও বাকী অনটোলজিক্যাল যুক্তিগুলোও নেই। এ্সব যুক্তিগুলোর সাথে আনউইনের যুক্তির কোন লেনদেন নেই এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্ভাবনা প্রশ্নে তার গানিতীক পরিমাপে ক্ষেত্রে এদের সামান্য অবদান ও প্রভাব নেই। ভালো পরিসংখ্যানবিদের মতই তিনি এগুলো ব্যাখ্যা করেছেন এবং ফাপা যুক্তি বলে এগুলো বাতিল করেছেন। আমি এজন্য তাকে ক্রেডিট দেবো, যদিও তার ’ডিজাইন যুক্তি’ বাতিল করার কারন আমার থেকে ভিন্ন। কিন্তু তার বায়েসীয় দরজা দিয়ে যে যুক্তিকে তিনি প্রবেশাধিকার দিয়েছেন, সেটাও একই রকম দুর্বল বলে আমার মনে হয়েছে। এ্টা বলার একমাত্র কারন যে আত্মগত বা সাবজেকটিভ গানিতীক সংখ্যা তিনি তার ফ্যাক্টদের উপর আরোপ করেছেন, কাজটা আমি করলে সেটি তার থেকে ভিন্ন হত। কিন্তু সাবজেকটিভ জাজমেন্ট দিয়ে কার এত মাথাব্যাথা আছে ? তার ধারনা আমাদের ভাল মন্দ পার্থক্য করার ক্ষমতা আছে এই বিষয়টি ঈশ্বরের অস্তিত্বের স্বপক্ষে জোরালো প্রমান এবং যেখানে আমি মনে করি বিষয়টা তাকে কোন দিকেই সমর্থন করছে না, তার প্রাথমিক প্রাকধারনা থেকে (ঈশ্বরের অস্তিত্ব ৫০/৫০)। ৬ এবং ৭ অধ্যায় স্পষ্ট হবে যে একটি জোরালো কেস তৈরী করা যাবে যে আমাদের ভালো মন্দ বোঝার ক্ষমতার ব্যাপারটায় আসলেই কোন অতিপ্রাকৃত ঈশ্বরের কোন স্পষ্ট যোগাযোগ নেই। যেমন বীটহোভেন এর কোয়ারর্ট্রেট বোঝার জন্য, আমাদের এই ভালোমন্দ বোঝার অনুভুতিটা ( অবশ্যই এর অর্থ এই অনুভুতিকে অনুগমন করার আমাদের প্রবনতাটি না) ঈশ্বর থাকলেও যেমন থাকতো না থাকলেও তেমনই  থাকতো।

অন্যদিকে আনউইন অশুভর উপস্থিতি বিশ্বাস করেন, বিশেষ করে প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন ভুমিকম্প, সুনামি ইত্যাদি  ঈশ্বরের অস্তিত্বের বীপরিত দিকেই জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখানে আনউইনের বিচার আমার বিচারের বীপরিতে অবস্থান নিয়েছে যা অনেক ধর্মতাত্ত্বিকেরও অস্বস্তির কারন। থিওডিসি (অশুভর উপস্থিতির মুখে স্বগীয় সত্ত্বার উপস্থিতি এবং জয়ের প্রমান) বহু ধর্মতাত্ত্বিককের অনিদ্রার কারন। প্রভাবশালী অক্সফোর্ড কমপ্যানিয়ন টু ফিলোসফি এই অশুভর সমস্যাকে চিহ্নিত করেছেন প্রচলিত ঈশ্বরবাদিতার সবচেয়ে শক্তিশালী চ্যালন্জ হিসাবে। কিন্তু এই যুক্তিটা শুধুমাত্র একজন ’ভালো ঈশ্বরের’ অস্তিত্বের বিরুদ্ধে মা্ত্র। এই ভালোমন্দ যাচাই করার ক্ষমতা ঈশ্বর হাইপোথেসিসের কোন অংশ না, শুধু মাত্র পছন্দনীয় একটি উপরি মাত্র।

স্পষ্টতই ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন মানুষগুলো সাধারনত সবসময়ই কোনটা আসলে সত্যি এবং কোন তারা সত্যি বলে ভাবতে ভালোবাসেন, এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে অক্ষম । কিন্তু, অতিপ্রাকৃত বুদ্ধিমত্তায় বিশ্বাস করে এমন খানিকটা বেশী শিক্ষিত বিশ্বাসীদের জন্য, এই অশুভ শক্তি সমস্যাটা অতিক্রম করা শিশুসুলভ সহজ একটি কাজ। সেক্ষেত্রে তাদের শুধুমাত্র একটি খারাপ ঈশ্বরকে কল্পনা করতে হবে, যেমন একজন ওল্ড টেষ্টামেন্টের পাতায় পাতায় বিরাজমান অথবা, আপনি যদি সেটা করতে পছন্দ না করেন, একটা আলাদা অশুভ দেবতাকে আবিষ্কার করুন, আর তার নাম দেন শয়তান বা স্যাটান, বিশ্বের যত অশুভ কাজের জন্য ভালো ঈশ্বরের সাথে তার মহাজাগতি যুদ্ধের উপর এবার সব দোষ চাপিয়ে দিন। অথবা আরো বেশী অভিজাত সমাধান –এমন ঈশ্বরের কল্পনা করুন, যার মানুষের দৈনন্দিন হাহাকার নিয়ে ব্যস্ত হবার চেয়ে আরো অনেক মহান কাজ করার আছে  বা এমন একজন ঈশ্বর যিনি মানুষের কষ্ট সম্পর্কে নির্বিকার না, তবে তার কাছে, এই যন্ত্রনা সহ্য করার মানে হচ্ছে একটি তার গোছানো আইন মেনে চলা এই মহাবিশ্বে স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি বা ফ্রি উইল এর জন্য মুল্য পরিশোধ করা। ধর্মতাত্ত্বিকদের দেখা যায় এইসব যুক্তিগুলো বিনা বাক্য ব্যায়ে মেনে নিয়েছেন।

এ কারনেই যদি আমি নিজে আবার নতুন করে আনউইনের বায়েসীয় অনুশীলনটি করি, তাহলে অশুভ শক্তির উপস্থিতির সমস্যাটি কিংবা সামগ্রিকভাবে নৈতিকতার বিষয়টি আমাকে খুব বেশী পরিবর্তন করাবে না নাল হাইপোথিসিস (Nullhypothesis)থেকে,যে কোন একটি দিকে (আনউইনের ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা থেকে)। কিন্তু আমি এই পয়েন্টটা আর তর্ক করতে চাচ্ছি না কারন কোনভাবেই আমি ব্যাক্তিগত মতামত নিয়ে উৎসাহ বোধ করতে পারিনা, সেটা আমার বা আনউইনের যার হোক না কেন।

এরচেয়ে অনেক শক্তিশালী যুক্তিটি হলো, যা কোন ব্যাক্তিগত অনুধাবন বা মতামতের উপর প্রতিষ্ঠিত না, এবং  সেটা হলো অসম্ভাব্যতা থেকে নেয়া যুক্তিটি। যা আমাদের আসলেই ৫০ শতাংশ অজ্ঞেয়বাদ থেকে নাটকীয় ভাবে দুরে নিয়ে যায়, অনেক ঈশ্বরবাদীদের চোখে যা চরম ঈশ্বরবাদী অবস্থানের প্রান্তে, আমার দৃষ্টিতে চরম নীরিশ্বরবাদীতার প্রান্তে। আমি বিষয়টি বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছি ইতিমধ্যে, আসলে পুরো বিতর্কটা একটা পরিচিত প্রশ্নের আশে পাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘ঈশ্বরকে কে তৈরী করেছে‘? যারা চিন্তা করতে পারেন, তারা ইতিমধ্যেই এর উত্তর নিজেরাই খুজে নিতে পেরেছেন। একজন পরিকল্পক বা ডিজাইনার ঈশ্বর, কোন সংগঠিত জটিলতা বা অর্গানাইজড কমপ্লেক্সিটি আসলেই ব্যাখ্যা করতে পারেনা, কারন কোন ঈশ্বর, যিনি যথেষ্ট পরিমানে জটিল এমন কিছু  ডিজাইন করতে পারেন, তার নিজের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম ব্যাখ্যার দাবী করে। ঈশ্বর এমন একটি অসীম রিগ্রেস এর পরিস্থিতি আমাদের উপস্থাপন করেন, যেখান থেকে মুক্তি পাবার ব্যাপারে তিনি আমাদের কোন সাহায্য করতে অক্ষম। এই যুক্তিটা, পরবর্তী অধ্যায়ে আমি যা ব্যাখ্যা আরো করবো, দেখাচ্ছে যে ঈশ্বর, যদিও টেকনিক্যালি অপ্রমানযোগ্য না, তবে অবশ্যই খুবই খুবই অসম্ভাব্য।

___________________ পাদটীকা: 

[১] আমি এখানে না মনে করে থাকতে পারছি না, একসাথে জ্যামিতি পড়ার সময় আমার এক স্কুল বন্ধুর ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির প্রমান হিসাবে অমন সিলোগজিমের ব্যবহার: ত্রিভুজ এবিসি দেখতে সমবাহু ত্রিভুজের মত, সুতরাং।

[২] Ontology: the branch of metaphysics that studies the nature of existence or being as such.

[৩] The terms a priori (“from the earlier”) and a posteriori (“from the later”) are used in philosophy (epistemology) to distinguish two types of knowledge, justifications or arguments. A priori knowledge or justification is independent of experience (for example “All bachelors are unmarried”); a posteriori knowledge or justification is dependent on experience or empirical evidence (for example “Some bachelors are very happy”).

[৪] জেনোর প্যারাডক্স ( Zeno’s paradox) এর বিস্তারিত সবা‌র ভালোই জানা আছে বিধায় আমি ফুটনোট ছাড়া এর আর পুনরাবৃত্তি করলাম না। অ্যাকিলীস একটি কচ্ছপ থেকে দশগুন জোরে দৌড়াতে পারে, সুতরাং সে কচ্ছপকে ১০০ গজ দুরত্ব সামনে থেকে শুরু করার সুযোগ দিল। অ্যাকিলীস ১০০ গজ দৌড়ায় এবং কচ্ছপ এখন ১০ গজ আগে, অ্যাকিলীস ১০ গজ দৌড়ায় এবং কচ্ছপ ১ গজ আগে, ।অ্যাকিলীস আরো একগজ দৌড়ায়, কচ্ছপ তখনও এক গজের ১০ ভাগের একভাগ আগে… এবং এভাবে অনন্তকাল চলতে থাকবে, সুতরাং অ্যাকিলীস কচ্ছপ কখনোই ধরতে পারবে না।

[৫]আমরা এমন কিছু বিষয় দেখতে পাই, ইদানীং দার্শনিক অ্যান্থনী ফ্লিউ এর বহুলপ্রচারিত পুরানো মতবাদের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শনের ঘটনায়, যিনি তার বৃদ্ধ বয়সে ঘোষনা দেন কোন এক ধরনের দৈবত্বের প্রতি তিনি বিশ্বাসীতে রুপান্তরিত হয়েছেন (যা  সমস্ত ইন্টারনেট জুড়ে  অতি উৎসাহের সাথে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে); অন্যদিকে রাসেল একজন মহান দার্শনিক, নোবেল পুরষ্কার পেয়েছিলেন, হয়তো ফ্লিউর এই তথাকথিত রুপান্তরও টেম্পলটন পুরষ্কার অর্জন করতে পারে। সেদিকে তার যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ তার সেই কুখ্যাত সিদ্ধান্ত, ২০০৬ সালে ফিলিপ ই জনসন পুরষ্কার (‘Phillip E. Johnson Award for Liberty and Truth’) গ্রহন। প্রথম এই ফিলিপ ই জনসন পুরষ্কার গ্রহন করেন ফিলিপ ই জনসন নিজেই, যে আইনজীবি ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের বিখ্যাত ওয়েজ স্ট্রাটেজীর আবিষ্কার করেছিলেন। ফ্লিউ হবেন এর দ্বিতীয় গ্রহীতা। এই পুরষ্কারটি প্রদান করে বায়োলা বা BIOLOA বা the Bible Institute of Los Angeles ; না ভেবে আসলে পারা যায় না, ফ্লিউ কি বুঝতে পারছেন, তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভিক্টর স্টেনগার এর ‘Flew’s flawed science’, Free Inquiry 25: 2, 2005, 17-18; http://www.secularhumanism.org/ index.php? section= library & page= stenger_25_2  দেখুন।

[৬] http://www.iep.utm.edU/o/ont-arg.htm. Gasking’s ‘proof is at http://www.uq.edu.au/~pdwgrey/pubs/gasking.html.

[৭] The whole subject of illusions is discussed by Richard Gregory in a series of books including in Gregory, R. L. (1997). Eye and Brain. Princeton:PrincetonUniversity Press.

[৮]http://www.sofc.org/Spirituality/s-of-fatima.htm.

[৯]Tom Flynn, ‘Matthew vs. Luke’, Free Inquiry 25: 1, 2004, 34-45;Robert Gillooly, ‘Shedding light on the light of the world’, Free Inquiry 25: 1, 2004, 27-30.

[১০] আমি সাবটাইটেলটা উল্লেখ করলাম, কার এই নামটার ব্যাপারে আমি আত্মবিশ্বাসী। লন্ডনের কন্টিনিউয়াম থেকে প্রকাশিত বইটার যে কপি আমার কাছে আছে সেটা নাম  Whose word is it?  আমি এই সংস্করনের কোথাও দেখলাম না এটি হার্পার সান ফ্রান্সিসকো থেকে প্রকাশিত সংস্করনটি একই, যেটা আমি দেখিনি, যারা প্রধান শিরোনাম Misquoting Jesus; আমার ধারনা তারা একই বই; কিন্তু প্রকাশকরা এই ধরনের সংশয় কেন সৃষ্টি করে।

[১১] Ehrman, B. D. (2003). Lost Christianities: The Battles for Scripture

and the Faiths We Never Knew.Oxford:OxfordUniversityPress. Ehrman, B. D. (2003). Lost Scriptures: Books that Did Not Make It into the New Testament.Oxford:OxfordUniversityPress. Ehrman, B. D. (2006). Whose Word Is It?London: Continuum.

[১২] এ এন উইলসন, তার যীশুর জীবনকাহিনীতে, জোসেফ একজন কাঠমিস্ত্রি ছিলেন এই তথ্যটিকে সংশয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন।গ্রীক শব্দ Tekton এর আসল অর্থ কার্পেন্টার বা কাঠমিস্ত্রি, কিন্তু এটি অনুদিত হয়েঠে আরমায়িক শব্দ Naggar থেকে, যার অর্থ হতে পারে মিস্ত্রি এবং জ্ঞানী ব্যাক্তি।বাইবেলকে কলুষিত করেছে এমন বেশ কিছু ভুল শব্দানুবাদের একটি এটি। সবচেয়ে বিখ্যাত অবশ্যেই  ইসাইয়াহ (Isaiah) এর তরুন রমনীর হিব্রু (almah) থেকে গ্রীক শব্দ কুমারী ( Parthenos) ভ্রান্ত অনুবাদ।খুব সহজেই ভুল হতে পারে (চিন্তা করুন ইংরেজী maid আর maiden, এ ধরনের ভুল কেমন করে হতে পারে সেটা বোঝার জন্য); অনুবাদকের এই সামান্য একটু ভুল কিভাবে স্ফীত হয়ে যীশুর মা কুমারী ছিলেন বলে একটা বিশাল কাহিনী তৈরী করা হয়েছে। এ ধরনের আরেকটি কাহিনী কেবল এর সাথে তুলনা হতে পারে, সেটাও অনুবাদ বিভ্রাট এবং এর কেন্দ্রেও আছে কুমারী। ইবন ওয়ারাক এবিষয়ে দারুন মজার আলোচনা করেছিলেন, প্রত্যেকটি ইসলামী শহীদদের বিখ্যাত প্রতিশ্রুতি দেয়া আছে তারা মৃত্যুর পর বেহেশতে ৭২ জন কুমারী বা Virgin হুরপরী পাবে উপহার হিসাবে, এখানে এই কুমারী শব্দটা একটি ভ্রান্ত অনুবাদ ’ স্ফটিক স্বচ্ছ সাদা আঙ্গুর বা White raisin of crystal clarity ’ শব্দটির। শুধু এই বিষয়টা যদি আরো বেশী মানুষ জানতো, কত নিরীহ আত্মঘাতী বোমাহামলাকারীর জীবন বাচতো? (ইবন ওয়ারাক, Virgins? What virgins? Free Inquiry 26:1,2006,45-6);

[১৩] এমন কি আমাকে সন্মানিত করা হয়েছে মৃত্যুসজ্জায় ধর্মে ফিরে আসার ভবিষ্যদ্বানী দিয়ে। আসলে এটা ঘটেছে একঘেয়ে নিয়মিতভাবে। প্রতিটি পুনরাবৃত্তি সেই একই ভ্রমের ধোয়া তুলে যাচ্ছে, আমার সম্ভবত সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে মরার সময় টেপরেকর্ডার এর ব্যবস্থা করতে হবে যেন আমার মরনোত্তর সন্মানটা বজায় থাকে; লালা ওয়ার্ড (রিচার্ড ডকিন্সের এর স্ত্রী) এর সাথে যোগ করেছেন: মৃত্যুশয্যা নিয়ে এত লাফালাফি কেন? নিজেকে যদি বিক্রি করতেই চাও তুমি, সময় থাকতে করা কি ভালো না, যাতে টেম্পলটন পুরষ্কারটি পাওয়া যায় আর দোষটা বার্ধক্যের জরাগ্রস্থতার উপর চাপানো যায়’

[১৪] আনঅফিসিয়াল হিউম্যান জীনোম প্রোজেক্ট এর সাথে মিলিয়ে ফেলা যাবেনা, যার নেতুত্বে ছিলেন অসাধারন প্রতিভাবান ( এবং ধার্মিক নন), সাহসী, যাকে বিজ্ঞানের বাক্কানিয়ার বা দু:সাহসী অভিযাত্রী বলা হয়: ক্রেইগ ভেন্টার (Craig Venter);

[১৫] Beit-Hallahmi and Argyle (1997).

[১৬]  E. J. Larson and L. Witham, ‘Leading scientists still reject God’, Nature 394, 1998, 313.

[১৭] http://www.leaderu.com/ftissues/ft9610/reeves.html gives a particularly interesting analysis of historical trends in American religious opinion by Thomas C. Reeves, Professor of History at the University of Wisconsin, based on Reeves (1996).

[১৮] http://www.answersingenesis.org/docs/3506.asp.

[১৯] R. Elisabeth Cornwell and Michael Stirrat, manuscript in preparation, 2006.

[২০] P. Bell, ‘Would you believe it?’, Mensa Magazine, Feb. 2002, 12-13.

Advertisements
রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : তৃতীয় অধ্যায়

2 thoughts on “রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : তৃতীয় অধ্যায়

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s