গভীরভাবে ধার্মিক একজন অবিশ্বাসী:


(ছবি সুত্র: নিউ সায়েন্টিষ্ট, ১৭ মার্চ, ২০১২ ইলাসট্রেশন: Richard Wilkinson)

(অনুবাদকের কথা: নীচে ধারাবাহিক খন্ডে খন্ডে লেখা প্রথম অধ্যায়টির অনুবাদ একসাথে পোষ্ট করলাম। একজায়গায় থাকলে অনুবাদের ভুলগুলো শুধরানো সহজ হবে। ইউনিকোড ফন্টে লেখা এটি আমার প্রথম লেখা ছিল। এছাড়া এটি রিচার্ড ডকিন্স এর ৭১ তম জন্মবার্ষিকীতে আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধান্জ্ঞলি)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : প্রথম অধ্যায়
The God Delusion by Richard Dawkins
(অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

:গভীরভাবে ধার্মিক একজন অবিশ্বাসী:

‘আমি কোন ব্যক্তিগত ঈশ্বরকে কল্পনা করার চেষ্টা করিনা; আমাদের অপর্যাপ্ত ইন্দ্রিয়গুলো যতটুকু বোঝার সুযোগ দেয়,সেটুকু দিয়েই এই মহাবিশ্বের গঠন দেখে বিস্ময়ে হতবাক হওয়াটাই যথেষ্ঠ।’  আলবার্ট  আইনস্টাইন

The gods worshipped by billions either exist, or they do not; if they exist they must have observable consequences (Victor J. Stenger)

: যে ‘শ্রদ্ধা’ পাওয়ার যোগ্য :

হাতের ‍উপর চিবুক রেখে, ঘাসের উপর ‍উপুড় হয়ে শুয়ে আছে ছেলেটি, জট পাকানো ঘাসের কান্ড আর শিকড় দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই তীব্র একটা অনুভূতিবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে: তার চোখের সামনে যেন ক্ষুদ্র কোন পৃথিবীর এক বনভূমি । রুপান্তরিত এক জগত, পিপড়া আর গুবরে পোকাদের এবং এমনকি – যদিও সেই সময় তার বিস্তারিত কিছু জানা ছিল না – লক্ষ কোটি ব্যাকটেরিয়ার, যারা নীরবে, সবার অগোচরে ক্ষুদ্র এই বিশ্বের অর্থনীতির গুরুদায়িত্ব বহন করে যাচ্ছে। হঠাৎ করে ঘাসের ক্ষুদ্রকায় এই বনভূমি  বিশালাকৃতি ধারণ করে এক হয়ে মিশে গেল মহাবিশ্ব আর ভাবনারত ছেলেটির মুদ্ধ বিমোহিত মনের সাথে। এই অভিজ্ঞতাকে সে ব্যখা করে ধর্মীয় দৃষ্টেকোন দিয়ে আর ‍পরবর্তীতে বেছে নেয় ধর্মযাজকের জীবন। অ্যাঙ্গলিকান পাদ্রী ‍হিসাবে দীক্ষা নেবার পর ‍তিনি আমার স্কুলে চ্যাপলেইন হিসাবে যোগ দেন। তার মত কয়েকজন ভদ্র, উদার ধর্মযাজকের জন্য কেউ কখনো দাবী করতে পারবে না, আমাকে জোর করে আমাকে ধর্ম শেখানো হয়েছে [১]।

অন্য কোন সময়ে আর স্হানে, তারা ভরা আকাশের নীচে, এই ছেলেটি হতে পারতাম আমি: ওরাইওন, ক্যাসিওপিয়া আর উরসা মেজরের চোখ ধাধানো সৌন্দর্যে  মুগ্ধ, মিল্কি ওয়ের অশ্রুত সঙ্গীতের মূর্ছণায় আবেগের অশ্রুভরা চোখ, আফ্রিকার বাগানে ফ্রাঙ্গিপানি আর  ট্রাম্পেট ফুলের রাতের গন্ধে মাতাল । কেন সেই একই আবেগ আমার চ্যাপলেইনকে নিয়ে গেছে একদিকে আর আমাকে অন্য আরেক দিকে, সে প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ নয়। প্রকৃতির প্রতি এধরনের প্রায়-আধ্যাত্মিক প্রতিক্রিয়া বিজ্ঞানী কিংবা যুক্তিবাদীদের প্রায়ই দেখা যায়। তার সাথে কিন্তু অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের  কোনই যোগসূত্র নেই। অনুমান করতে পারি, অন্ততঃ তার শৈশবে  চ্যাপলেইনের (এবং আমারও না) ‘ ‘দি অরিজিন অব স্পেসিস’’ এর শেষ পংক্তিগুলো জানা ছিল না – বিখ্যাত ‘‘দি এনট্যাঙ্গলড ব্যাঙ্ক’’ অনুচ্ছেদ, ‘‘ঝোপের মধ্যে গান গাচ্ছে পাখিরা, এদিক সেদিক উড়ছে নানা জাতের পোকা মাকড়, ভেজা মাটির মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে চলছে কেচো’’ ; যদি তার জানা থাকতো, তাহলে নিঃসন্দেহে সে তার অভিজ্ঞতার সাথে মিল খুজে পেতো, ধর্মযাজকের পেশার বদলে হয়তো ডারউইনের দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে একমত হতে পারতেন যে, সবকিছুরই‘ ‘সৃষ্টি আমাদের চারপাশে কাজ করে যাওয়া প্রাকৃতিক ‍নিয়মের মাধ্যমে’’:

এইভাবে, প্রকৃতির যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর মুত্যু থেকেই আমাদের পক্ষে ভাবা সম্ভব এমন সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন বস্তু, যেমন উন্নত প্রানীর সৃষ্টি, সরাসরি জড়িত। জীবনকে এইভাবে দেখার মধ্যে আছে একধরনের বিশালতা। ‍(জীবন)তার বহুমুখী  ক্ষমতা দিয়ে সে সুচনা করেছিল এক কিংবা কয়েকটি আকার নিয়ে;  খুব সাধারণ সেই সূচনা থেকে সেটাই,  এই গ্রহটি যখন মধ্যাকর্ষনের ধরাবাধা নিয়ম মেনে মহাকাশে চক্রাকারে ঘুরে চলেছে, বিবর্তিত হয়েছে যা কিছু ছিল আর বর্তমানে আছে এমন অগনিত সুন্দর আর বিস্ময়কর নানা আকার আর প্রকৃতির জীবনে।

কার্ল সাগান তার ‘‘পেল ব্লু  ডট’’ এ লিখেছিলেন:

কেন এরকম হলো যে, প্রধান ধর্মগুলোর প্রায় কোনটাই বিজ্ঞানকে  অন্ততঃ  সামান্য  হলেও একটু বোঝার চেষ্টা করেছে এবং এই সিদ্ধান্তে  আসতে পেরেছে , “আমরা যা ভেবেছিলাম এটাতো তার  চেয়েও অনেক ভালো! এই মহাবিশ্বতো আমাদের নবীরা যা বলে গেছেন তার চেয়েও অনেক বিশাল, আরো সুক্ষ আর অভিজাত”; বরং বলেছে, “না, না, না! আমার ইশ্বর হলো ছোট ইশ্বর আর আমরা চাই সে সেভাবেই থাকুক” ;  কোন ধর্ম, নতুন কিংবা পুরাতন যাই হোক, যা কিনা আধুনিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে  উন্মোচিত এই মহাবিশ্বের  অসাধারণত্বকে গুরুত্ব দিয়েছে, হয়তো চিরাচরিত বিশ্বাস যা পারেনি তার চেয়ে অনেক বেশী শ্রদ্ধার জন্ম দিতে পারতো।

কার্ল সাগান সব বইগুলোই আমাদের সর্ব্বোচ্চ বিস্ময়গুলোকে সরাসরি স্পর্শ করে, যার উপর গত শতাব্দীগুলোতে এক্চ্ছত্র দখল ছিল ধর্মগুলোর। আমার নিজের বইগুলো সেভাবে সবাইকে স্পর্শ করুক সেটা আমারো কাম্য। সম্ভবতঃ সে কারনে একজন গভীরভাবে ধার্মিক বলে আমাকে প্রায়ই বর্ণনা করা হয় বলে শুনেছি। একজন আমেরিকান ছাত্রী আমাকে লিখেছিল, তার এক অধ্যাপককে, আমার সম্বন্ধে কোন মতামত আছে কিনা জানতে চেয়েছিল। অবশ্যই”, তিনি উত্তর দিয়েছিলেনতার ইতিবাচক বিজ্ঞান ধর্মের সাথে সঙ্গতিপুর্ণ নয় ঠিকই, ‍কিন্তু, প্রকৃতি আর মহাবিশ্ব নিয়ে তিনি যেভাবে তিনি আবেগময় উচ্ছাস প্রকাশ করেন, আমার কাছে, সেটাইতো ধর্ম”’; কিন্তু ‘ধর্ম’ শব্দটা কি সঠিক এক্ষেত্রে ? আমি সেটা মনে করি না।  নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী (এবং একজন নীরিশ্বরবাদী) স্টীফেন ওয়াইনবার্গ ‍তার ‘‘ড্রিমস অব ফাইনাল থিওরী’’ অনেকের মতই এই প্রসঙ্গে লিখেছিলেন:

ঈশ্বর সম্বন্ধে কিছু মানুষের ধারনা এত ব্যপক আর নমনীয় যে, এটা অবশ্যম্ভাবী যে তারা যেদিকে খুজবে সেখানেই ইশ্বরকে খুজে পাবে। মাঝে মাঝে শোনা যায়, ‘ইশ্বরই চুড়ান্ত’ অথবা ‘ইশ্বর আমাদের ভালো অংশ’ বা ‘ইশ্বরই এই মহাজগত’; অবশ্যই, অন্য যে কোন শব্দের মতোই ইশ্বর শব্দটিকে আমরা আমাদের ইচ্ছামতন অর্থ করতে পারি। আপনি  যদি বলতে চান বলতে পারেন যে ‘ইশ্বরই শক্তি’, তাহলে আপনি ইশ্বরকে এক টুকরো কয়লার মধ্যে পেতে পারেন।

স্টীফেন ওয়াইনবার্গ ‍ অবশ্যই সঠিক, যদি ‘ইশ্বর’ শব্দটা আমরা পুরোপুরি অব্যবহারযোগ্য করে ফেলতে না চাই, তাহলে একে ব্যবহার করতে হবে ঠিক সেভাবে, যেভাবে বেশিরভাগ মানুষ সাধারণতঃ শব্দটা অর্থ করে: অর্থাৎএকজন অতিপ্রাকৃত সৃষ্টিকর্তাকে বোঝাতে, যিনি ‘আমাদের উপাসনার উপযুক্ত’।

অনেক দুর্ভাগ্যজনক জটিলতা সৃষ্টি হয় যখন আমরা আইনস্টাইনীয় ধর্ম আর অতিপ্রাকৃত ধর্ম,  এ‌ই দুটোর মধ্যে পার্থক্য করতে পারিনা। আইনস্টাইন মাঝে মাঝে ইশ্বর শব্দটা ব্যবহার করেছেন (এবং শব্দটা ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তি‍নিই একমাত্র নীরিশ্বরবাদী বিজ্ঞানী না), অতিপ্রাকৃতবাদীদের সুযোগ করে দিয়েছেন ভুল ব্যখা করার জন্য, যারা এমনিতেই বিশেষভাবে আগ্রহী এর অপব্যখা করার জন্য এবং এমন একজন বিখ্যাত মনীষিকে তাদের মতবাদী বলে দাবী করার জন্য। স্টিফেন হকিন্স এর ‘দি ব্রীফ হিষ্টরী অব টাইম’ এর নাটকীয় ( নাকি দুষ্টামী ?) শেষ বাক্য ‘এবং তখনই ‍আমরা ইশ্বরের মনের কথা জানতে পারবো’ ; উক্তিটি অপব্যখার জন্য বিশেষভাবে কুখ্যাত, অনেকের মনেই এটি হকিন্স একজন ‘ধার্মিক’ মানুষ, এমন ধারনার ( অবশ্যই ভুলভাবে) জন্ম দিয়েছে। কোষ জীববিজ্ঞানী উরসুলা গুডইনাফ এর ‘দি স্যাকরেড ডেপথ অফ নেচার’  আইনস্টাইন কিংবা হকিন্স ‍ এর চেয়েও  আরো বেশী ধার্মিকতার ভূল ধারনা দেয়, গীর্জা, মসজিদ আর মন্দির তার খুবই পছন্দের, তার লেখার অনেক অংশই অনায়াসে অপব্যখা করে অতিপ্রাকৃত ধর্মের পক্ষে ব্যবহার করা যেতে পারে। এমনকি নিজেকে একজন ধার্মিক প্রকৃতিবিজ্ঞানী হিসাবে পরিচয় দিতে ‍তিনি দ্বিধা করেননি। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে তার লেখা পড়লেই বোঝা যায়, তিনি আসলে আমার মতই একজন গোড়া নীরিশ্বরবাদী।

‘প্রকৃতিবিজ্ঞানী’ শব্দটি খুবই অস্পষ্ট।  আমার জন্য শব্দটি আমার ছোট বেলার নায়ক হিউ লফটিং এর ডক্টর ডুলিটল -এর কথা মনে করিয়ে দেয় ( যিনি কিন্তু কিছুটা এইচ এম এস বীগলের সেই দার্শনিক প্রকৃতিবিজ্ঞানীর মতন ছিলেন); অষ্টাদশ এবং উনবিংশ শতাব্দীতে প্রকৃতিবিজ্ঞানী বলতে যা বোঝাতো, এখনও আমাদের বেশীর ভাগ মানুষের কাছে সেটাই অপরিবর্তিত আছে : প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের (প্রানীবিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞান) শিক্ষার্থী। সেই গিলবার্ট হোয়াইট থেকে, প্রকৃতিবিজ্ঞানীরা অধিকাংশ সময়েই পেশায় ছিলেন ধর্মযাজক। তরুন ডারউইনেরও ধর্মযাজক হবার কথা ছিল, আশা ছিল কোন গ্রামের প্যারিশের পারসন বা যাজকের  ‍নির্ঝন্ঝাট একটা জীবন হবে তার, পছন্দের গুবরে পোকাদের নিয়ে গবেষনা করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু দার্শনিকরা ‘প্রকৃতিবিজ্ঞানী’ শব্দটা ব্যবহার করেন অন্য অর্থে, তা অবশ্যই অতিপ্রাকৃতবিজ্ঞানীর বিপরীতার্থে। জুলিয়ান ব্যাগ্গিনি তার ‘অ্যাথেইজম:  এ ভেরী শর্ট ইন্ট্রোডাকশন’ এ ব্যাখ্যা করেছিলেন, প্রকৃতিবাদের প্রতি নীরিশ্বরবাদীদের অঙ্গীকার:

‘‘নীরিশ্বরবাদীরা যা বিশ্বাস করে তা হলো, মহাবিশ্বে কেবল একটি জিনিষ আছে, যা ভৌতিক, এর থেকেই  উৎপত্তি হয়েছে, মন, সৌন্দর্য্য,অনুভূতি, ন্যায় অন্যায়বোধ – সংক্ষেপে সবকিছুই, সকল বিস্ময়কর বস্তু  যা মানব জীবনকে করেছে অসাধারণ’।

মানুষের চিন্তাশক্তি ‍এবং অনুভূতির উদ্ভব হয়েছে মস্তিষ্কের ভিতরে অবস্থিত  সত্যিকারের অস্তিত্ত্ব আছে,এমন কিছুর (নিউরোন) অতিজটিল পারস্পরিক সংযোগের মাধ্যমে। তাহলে দার্শনিক প্রকৃতিবিজ্ঞানী – এই অর্থে একজন নীরিশ্বরবাদী হচ্ছেন সেই জন যিনি  বিশ্বাস করেন এই প্রাকৃতিক বা ভৌত মহাবিশ্বের বাইরে আর কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই, আমাদের পর্যবেক্ষনক্ষম মহাবিশ্বের অন্তরালে অতিপ্রাকৃত সৃজনশীল, বুদ্ধিমান কোন সৃষ্টিকর্তা লুকিয়ে নেই, শরীরের মৃত্যুর পর কোন আত্মারই অস্তিত্ব থাকেনা এবং নেই কোন অলৌকিক ঘটনা –শুধুমাত্র তা প্রাকৃতিক কোন ঘটনা ছাড়া- যা এখনও ব্যখা করা সম্ভব হয়নি। যদি এমন কিছু থাকে যা মনে হচ্ছে প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে, তা ‍বর্তমানে আমাদের বোঝার সীমাবদ্ধতা মাত্র। আমরা আশা করি একদিন আমরা বুঝতে পারবো এবং প্রাকৃতিক কোন ঘটনা হিসাবে তা আমরা স্বীকার করে নেব । আমরা রংধনুর রহস্যকে ভেদ করেছি, সেজন্য রংধনুর মুগ্ধ করার ক্ষমতা কিন্তু কমে যায়নি।

আমাদের সময়ে অনেক বড় মাপের বিজ্ঞানীরা যাদের কথা শুনলে আপাতঃ দৃষ্টিতে ধার্মিক মনে হতে পারে ,  কিন্তু তাদের বিশ্বাসগুলি গভীরভাবে যাচাই করে দেখলে স্পষ্ট হয় ঠিক এর বীপরিতটাই। আইনস্টাইন এবং হকিন্স এর ক্ষেত্রে কথাটা বিশেষভাবে সত্যি। বর্তমান রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমার ‌ এবং রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি মার্টিন রিস আমাকে বলেছিলেন,  তিনি চার্চে যাতায়াত করেন একজন ‘অবিশ্বাসী অ্যাঙ্লিকান… স্বগোত্রের প্রতি ‍আনুগাত্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে’; তার কোন ধরনেরই ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই,  ‍ কিন্তু যে বিজ্ঞানীদের নাম আমি ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি, তাদের মতই, তার  মনেও এই মহাজগত এক ধরনের কাব্যিক, প্রকৃতিবাদী অনুভূতির জন্ম দেয়। সম্প্রতি টেলিভিশনে একটি টক শোতে আমি আমার বন্ধু রবার্ট উইনস্টোনকে, ্একজন প্রখ্যাত ধাত্রীবিশেষজ্ঞ, যিনি ব্রিটিশ ইহুদী সমাজের একজন নেত্রীস্থানীয় সদস্য, চ্যালেন্জ্ঞ করেছিলাম, স্বীকার করে নিতে যে, তার ইহুদীবাদ  ঠিক এধরনেরই এবং তিনি ‍আদৌ অতিপ্রাকৃত কোন কিছুতেই আসলে বিশ্বাস করেন না। প্রায় স্বীকার করতে করতে একেবারে শেষ পর্যন্ত এসে তিনি পিছিয়ে গেছেন ( মানতেই হবে, তার সাক্ষাতকার নেবার কথা আমাকে, উল্টোটা না)[৫]; আমি যখন তাকে জোর করলাম কিছু বলার জন্য, সে বলেছিল, ইহুদীবাদ তার জীবনকে ঠিকমত সাজাতে প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলা দিয়েছে । হয়তো সেটা ঠিক, কিন্তু অবশ্যই, শুধুমাত্র সেটাই, এর (ইহুদীবাদ) অতিপ্রাকৃত অবস্থানের সত্যতার পক্ষে দাবীদার হওয়ার জন্য ক্ষুদ্রতম কোন ভূমিকাই রাখেনা। অনেক বুদ্ধিজীবি ইহুদী আছেন যারা নিজেদের ইহুদী পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করেন এবং ধর্মীয় আচারও পালন করেন হয়ত প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে বা নিহত স্বজনদের স্মরণে। ‍ কিন্তু  এছাড়াও অন্য কারনটি হলো, ধর্মকে ‘সর্বেশ্বরবাদ’ হিসাবে চিহ্নিত করে বিশেষ শ্রদ্ধার একটা অবস্থান দেয়ার জন্য আমাদের কিছু বিভ্রান্তি বা বিভ্রান্তিকর ইচ্ছা বা প্রবণতা , যা এর সবচেয়ে বিশিষ্ট সমর্থক আলবার্ট আইনস্টাইন এর মত আমরা অনেকেই অনুভব করি। তারা হয়তো বিশ্বাস করেন না, কিন্তু দার্শনিক ড্যানিয়েল ডেনেট এর একটা উদ্ধৃতি ব্যবহার করে বলা যায়, তারা ‘‘ ‘একটি বিশ্বাসকে ‍বিশ্বাস করে’[৬]।

অতি আগ্রহের সাথে আইনস্টাইনের একটি উদ্ধৃতি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়, ‘বিজ্ঞান ধর্ম ছাড়া পঙ্গু, আর ধর্ম বিজ্ঞান ছাড়া অন্ধ’, ‍ কিন্তু আইনস্টাইন আরো বলেছিলেন:

আমার ধর্ম বিশ্বাস সম্বন্ধে, আপনারা যা পড়ে থাকবেন, তা অবশ্যই মিথ্যা। এই মিথ্যার বার বার একইভাবে পূনরাবৃত্তি হয়েছে। আমি কোন ব্যক্তিগত ঈশ্বরকে বিশ্বাস করিনা এবং আমি কখনোই এই কথাটা অস্বীকার করিনি বরং সুস্পষ্টভাবে ব্যখা করেছি। যদি আমার মধ্যে এমন কিছু থাকে যাকে বলা যেতে পারে ধর্মবোধ, সেটা নিঃসন্দেহে, বিজ্ঞান যতটুকু উম্মোচন করেছে ‍সেই মহাবিশ্বের গঠন এর প্রতি আমার অসীম মুগ্ধতা।

মনে হচ্ছে কি আইনস্টাইন স্ববিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন ? আর বিতর্কের উভয় পক্ষ সমর্থনের জন্য কি তার বক্তব্যকে বেছে বেছে ব্যবহার করা যেতে পারে?  না । সাধারনতঃ যে অর্থে ‘ধর্ম’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়, তিনি সেই অর্থে শব্দটিকে ব্যবহার করেননি। আমি যখন একদিকে অতিপ্রাকৃত ধর্ম আর অন্যদিকে আইনস্টাইনীয় ধর্মের মধ্যে পার্থক্য ব্যখা করছি, মনে রাখবেন, যে আমি ‘অতিপ্রাকৃত’ ইশ্বরদেরকেই কেবল বিভ্রান্তিকর বলছি।

আইনস্টাইনের ধর্মের স্বরুপ বোঝাতে আমি এখানে আরো কিছু আইনস্টাইনের উদ্ধৃতি উল্রেখ করছি :

আমি গভীরভাবে ধার্মিক একজন অবিশ্বাসী। ‍এটাই একটা নতুন কোন ধরনের ধর্ম।

আমি কখনই প্রকৃতির ‍উপর কোন উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য আরোপ করিনা অথবা এমন কিছু যা মানবিক গুনাবলী বলে মনে হতে পারে। আমি প্রকৃতিতে যা দেখি তা হলো এর অসাধারন গঠন, যা আমরা খুব সামান্যই বুঝতে পারি, যে কোন চিন্তাশীল মানুষকে যা বিনম্র হতে বাধ্য করে। এটা অবশ্যই ধর্মীয় একটা অনুভূতি কিন্তু এর মধ্যে কোন অতিপ্রাকৃত রহস্যময়তা নেই।

ব্যক্তিগত কোন ঈশ্বরের ধারনা আমার কাছে খুবই অপরিচিত আর এমনকি মনে হয় ছেলেমানুষী।

তার মৃত্যুর পর ধর্মীয় আত্মপক্ষসমর্থনকারীরা বোধগম্য কারনেই আরো বেশী বেশী করে আইনস্টাইনকে তাদের নিজেদের একজন বলে দাবী করেছে। তার সমসাময়িক ধর্ম সমর্থকরা কিন্তু তাকে দেখেছে ভিন্নভাবে। ‘আমি কোন ব্যক্তিগত ইশ্বরকে বিশ্বাস করিনা’ কথাটিতে ব্যখা করার জন্য, ১৯৪০ সালে তিনি  তার বিখ্যাত লেখাটি লেখেন। এটি এবং  এই ধরনের কিছু বক্তব্যের জন্য তাকে গোড়া ধর্ম সমর্থকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। সমালোচনা মুখর অসংখ্য চিঠি পান তিনি, যার অনেকগুলোতে তার ইহুদী জন্ম ইতিহাসের প্রতি সুষ্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। ম্যাক্স জ্যামার এর ‘আইনস্টাইন এবং ধর্ম’ বইটি থেকেই এখানে উল্লেখিত  তথ্যগুলো পাওয়া যায় (ধর্ম সম্বন্ধে আমার ব্যবহৃত আইনস্টাইনের বিভিন্ন ‌উদ্ধৃতির উৎসও এই বইটি) ; ক্যানসাস সিটির রোমান ক্যাথলিক বিশপ মন্তব্য করেছিলেন, ‘দুঃখজনক একটা ব্যপার, একটা মানুষ, যে কিনা ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্নিত জাতির সদস্য, সেই এই জাতির মহান ঐতিহ্যকে অস্বীকার করছে’; অন্য ক্যাথলিক ধর্মযাজকরাও যোগ দিয়েছিলেন সমালোচনায়: ‘ ব্যক্তিগত ঈশ্বর ছাড়া অন্য কোন ‍ঈশ্বর নেই…আইনস্টাইন নিজেই জানেন না কি বিষয়ে কথা বলছেন। পুরোটাই ভুল তিনি। কিছু মানুষ মনে করেন , কোন এক বিষয়ে সর্ব্বোচ্চ জ্ঞান অর্জন করলেই, সব বিষয়ে তারা মত প্রকাশের  যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছেন’, অর্থাৎ ধর্ম যেন একটা বিশেষ বিষয় আর কেউ এই বিশেষ বিষয়ে নিজেকে বিশেষজ্ঞ দাবী করতে পারেন, যিনি সব বিতর্কের উর্দ্ধে।  ধারনা করা যেতে পারে, ‍ ঐ পাদ্রী পরীদের পাখার সঠিক আকৃতি বা রং এর বিষয়ে কোন আত্মস্বীকৃত ‘পরীবিশেষজ্ঞ’ র পরামর্শ নিতে অপেক্ষা করেন না। তিনি এবং বিশপ দুজনই বলছেন, আইনস্টাইন যেহেতু ধর্মীয় তত্ত্বে প্রশিক্ষিত নয় সুতরাং ঈশ্বরের প্রকৃতি সম্বন্ধে তার ধারণা ভুল। কিন্তু আইনস্টাইন খুব ভালো ভাবে জানতেন ঠিক কোন বিষয়টিকে তিনি অস্বীকার করছেন।

একজন অ্যামেরিকান রোমান ক্যাথলিক আইনজীবি যিনি একটি একুমেনিকাল[৭] কোয়ালিশন এর পক্ষে কাজ করেন তিনি আইনস্টাইনকে লিখেছিলেন:

আমরা অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছি আপনার এধরনের একটি মন্তব্য করেছেন .. যেখানে আপনি  ব্যক্তিগত ঈশ্বরের ধারনাটিকে উপহাস করেছেন। বিগত দশ বছরে আপনার এই বক্তব্যের মত আর কোন কিছুই, মানুষকে এই চিন্তা করার সুযোগ দেয়নি যে, ইহুদীদের বহিষ্কার করার পেছনে হিটলারের নিশ্চয়ই কোন কারন ছিল। আপনার যে কোন কিছু বলার অধিকার আছে, এই কথা স্বীকার নিয়ে বলছি; এধরনের বক্তব্য আপনাকে অ্যামেরিকায় বিতর্কের অন্যতম প্রধান কারন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

নিউ ইয়র্কের একজন রাবাই বলেছিলেন, ‘আইনস্টাইন নিঃসন্দেহে একজন মহান বৈজ্ঞানিক, কিন্তু তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি  ইহুদীবাদের একেবারে বীপরিত’।
‘কিন্তু’ ? কিন্তু ?  ‘এবং’ কেন নয়।

নিউ জার্সী হিস্টোরিকাল সোসাইটির সভাপতি তার লেখা চিঠিটা পড়লে ধর্মীয় মানসিকতার দূর্বলতার স্বরুপটা এতই স্পষ্ট হয় যে, দ্বিতীয় বার পড়া যেতে পারে:

ডঃ আইনস্টাইন, ‍আমরা আপনার  প্রজ্ঞাকে সন্মান করি। কিন্তু মনে হচ্ছে একটা জিনিস আপনার শেখা হয়নি: ঈশ্বর হচ্ছে আত্মার মত, নিরাকার সত্ত্বা,যা কেউ টেলিস্কোপ বা মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুজে পাবেনা,  যেমন    মানুষের চিন্তা আর অনুভতি আবেগ মস্তিষ্ক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে পাওয়া যায়না। সবাই জানে ধর্মের ‍ভিত্তি হলো ‘বিশ্বাস’, যুক্তিনির্ভর জ্ঞান নয়। চিন্তাক্ষম সব মানুষই, হয়ত কোন না কোন  এক  সময়ে ধর্ম সংক্রান্ত সন্দেহে আক্রান্ত হয়। আমার নিজের বিশ্বাসই নাড়া খেয়েছে বেশ কয়েকবার । কিন্তু আমি কখনোই আমার এই বিশ্বাসের সংকটের কথা  কাউকে বলিনি দুটি কারনে: (১) আমার শঙ্কা ছিল এ বিষয়ে আমার সামান্যতম মন্তব্য কিছু মানুষের জীবন ও তাদের  আশাকে ক্ষতিগ্রস্থ  করবে। (২) কারন আমি সেই লেখকের সাথে একমত, যিনি বলেছিলেন ‘যারা অন্য কারো বিশ্বাসকে ধ্বংশ করে তাদের চরিত্রে অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা আছে’….. আশা করি ডঃ আইনস্টাইন, আপনার বক্তব্যটিকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি এবং আপনি নিশ্চয়ই অসংখ্য অ্যামেরিকানদের  উদ্দেশ্যে ভালো কিছু বলবেন, যারা আপনাকে সন্মান  জানানোর উদগ্রীব।

কি ভয়াবহ রকমের চারিত্রিক দুর্বলতা উন্মোচন করা একটি চিঠি, যার প্রতিটি পংক্তিতে নৈতিক আর বুদ্ধিবৃত্তিক ভীরুতা ও কাপুরুষতা ঝরে পড়ছে। আরেকটু কম কাপুরুষোচিত কিন্তু বেশী জঘন্য চিঠিটি লিখেছিলেন, ওকলাহোমার ক্যাভার্লী ট্যাবেরন্যাকল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা:

অধ্যাপক আইনস্টাইন, আমি বিশ্বাস করি অ্যামেরিকার প্রত্যেকটি খৃষ্টান আপনাকে উত্তর দেবে,‘আমরা আমদের ঈশ্বর আর তার পুত্র যীশু খৃষ্টর উপর বিশ্বাস পরিত্যাগ করবো না, কিন্তু আপনাকে আমন্ত্রন জানাচ্ছি, যদি আপনি ‍ এই জাতির ঈশ্বরকে বিশ্বাস না করেন, তাহলে যেখান থেকে আপনি এসেছেন সেখানে ফেরত চলে যান’;  ইসরায়েলের ভালোর জন্য যা করা সম্ভব আমি করেছি ‍, ধর্মকে অসন্মান করে আপনার মুখ  থেকে উচ্চারিত এই বক্তব্য নিয়ে আপনি বিতর্কে যোগ দিলেন। ইসরায়েলপ্রেমী খৃষ্টানদের এইদেশ থেকে ইহুদী-বিদ্বেষ নির্মূল করার সব প্রচেষ্ঠা সত্ত্বেও, এই বক্তব্য আপনার জাতির জন্য আরো বেশী ক্ষতিকর প্রমানিত হবে। অধ্যাপক আইনস্টাইন, অ্যামেরিকার প্রত্যেকটি খৃষ্টান আপনাকে তাৎক্ষনিক উত্তর দেবে, ‘আপনার এই সব বাতিকগ্রস্হ, বিবর্তনের ভুল তত্ত্ব নিয়ে জার্মানী চলে যান, যেখান থেকে আপনি এসেছেন অথবা  এই দেশের মানুষদের, যারা আপনি যখন নিজের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন, এই দেশে স্বাগত জানিয়েছিল আপনাকে, সেই সব মানুষদের বিশ্বাসকে আঘাত করার চেষ্ঠা বন্ধ করুন’।

তাঁর ঈশ্বরবাদী এবং ধর্মবিশ্বাসী সব সমালোচকরা একটা বিষয় ‍কিন্তু সঠিক ধরতে পেরেছিলেন, আইনস্টাইন, তাদের দলের কেউ নন। বার বার তিনি ক্ষুদ্ধ হয়েছেন যখনই তাকে থেইষ্ট বা ঈশ্বরবিশ্বাসী বলা হয়েছে। তাহলে তিনি কি ডেইষ্ট বা একাত্মবাদী, ভলতেয়ার আর দিদেরো’ র মতন ? কিংবা প্যানথেইষ্ট বা সর্বেশ্বরবাদী, স্পিনোজার মতন, যার দর্শনকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন: ‘আমি স্পিনোজার ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি, যিনি নিজেকে ‌উন্মোচন করেন অস্তিত্ব আছে এমন সকল কিছুর মধ্যে সুশৃঙ্খল সংহতিতে, কিন্তু সেই ঈশ্বরে নয়, যিনি মানুষের নিয়তি আর কর্ম নিয়ে ব্যতিব্যস্ত’?

কিছু শব্দের অর্থ আমরা আবার মনে করে নেই;  একজন থেইষ্ট বা ঈশ্বরবাদী সেই ব্যক্তি, যিনি অতিপ্রাকৃত, অতিবুদ্ধিমান কোন ইশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন,  যিনি তার প্রধান কাজ , প্রথমতঃ এ‌ই মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করা ছাড়াও, তার সেই সৃষ্টির দেখাশোনা এবং  পরবর্তীতে এর নিয়তিকে প্রভাবিত করার জন্য যিনি এখনও  সর্বশক্তিসহ বিরাজমান। ঈশ্বরবাদীদের বিশ্বাসের কাঠামোতে, মানুষের যাবতীয় কর্মকান্ডে এই ঈশ্বর ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।  তিনি প্রার্থনার জবাব দেন, পাপের শাস্তি দেন বা ক্ষমা করেন, অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে পৃথিবীর নানা কর্মকান্ডে হস্তক্ষেপ করেন, তার সৃষ্টির ভালো আর খারাপ কর্মকান্ড নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করেন এবং তিনি জানেন আমরা কখন এসব করছি ( অথবা এমনকি অর্ন্তযামী হিসাবে তিনি এও জানেন এমন কি কখন আমরা এসব করার চিন্তাভাবনা করছি); একজন দেইষ্ট বা একাত্মবাদীও , অতিপ্রাকৃত, অতিবুদ্ধিমান, সর্বশক্তিমান ‍ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন, তবে তার কর্মকান্ড সীমাবদ্ধ শুধুমাত্র সৃষ্টির আদিতে মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী নিয়মকানুনগুলো সুনির্দিষ্ট করার মধ্যেই। কিন্তু এরপর একাত্মবাদীদের ঈশ্বর তার সৃষ্টিতে আর কোন ধরনের হস্তক্ষেপ করেন না এবং অবশ্যই মানুষের কর্মকান্ডে তার কোন বিশেষ কোন আগ্রহও নেই। প্যানথেইষ্টরা বা সর্বেশ্বরবাদী কোন অতিপ্রাকৃত, অতিবুদ্ধিমান ইশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন না তবে ‘ঈশ্বর’ শব্দটি তারা ব্যবহার করেন একটি অলৌকিকতার ইঙ্গিতমুক্ত প্রতিশব্দ হিসাবে প্রকৃতি বা মহাজগত বা মহাজগতের সকল কর্মকান্ডগুলোকে নিয়ন্ত্রনকারী সুশৃঙ্খলতাকে বোঝাতে । একাত্মবাদীদের ঈশ্বরের সাথে ‍ঈশ্বরবাদীদের ঈশ্বরের পার্থক্য হলো, তাদের ঈশ্বর প্রার্থনার ‌উত্তর দেন না, পাপপুণ্য বা আমাদের পাপের স্বীকারোক্তি নিয়ে আদৌ মাথা ঘামান না, আমাদের মনের কথাও  জানার চেষ্টা করেন না, খেয়ালখুশী মত কোন অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে আমাদের জীবনে কোন হস্তক্ষেপ করেন না। একাত্মবাদীরা সর্বেশ্বরবাদী থেকে আলাদা কারন একাত্মবাদীদের ‘ঈশ্বর’ হল কোন এক ধরনের মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা, সর্বেশ্বরবাদীদের মত মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খল নিয়মকানুন এর রুপকধর্মী বা কাব্যিক কোন প্রতিশব্দ না। সর্বেশ্বরবাদ অনেকটা আকর্ষনীয় আর গ্রহনযোগ্য নিরীশ্বরবাদ অন্যদিকে একাত্মবাদ হল দূর্বল ঈশ্বরবাদ।

অবশ্যই চিন্তা করার যুক্তিসঙ্গত কারন আছে যে, কিছু বিখ্যাত ‘আইনস্টাইনবাদ’ যেমন: ‘‘ঈশ্বর সুক্ষ এবং চতুর কিন্তু তিনি কারো ক্ষতি করার মনোভাব পোষন করেন না’’ অথবা ‘‘তিনি কোন জুয়া খেলেননি’’ ‍বা ‘এই মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে ইশ্বরের কি কোন বিশেষ পছন্দ ছিল?’ গুলো সর্বেশ্বরবাদী, একাত্মবাদী নয়, আর ঈশ্বরবাদীতো অবশ্যই নয় ।  ‘ ঈশ্বর কোন জুয়া খেলেননি’-এর ব্যখা করা উচিত  ‘ মহাজগতের সব কিছুরই কেন্দ্র কিন্তু এলোমেলো লক্ষ্যহীন নয়’ – এইভাবে । ‘‘এই মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে কোন ঈশ্বরের কি  বিশেষ পছন্দ ছিল ?’’ এর মানে ‘‘মহাবিশ্ব কি আর অন্য কোনভাবে শুরু হতে পারতো?’’, আইনস্টাইন ‘ঈশ্বর’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন সম্পুর্নভাবে রুপক বা কাব্যিক অর্থে। স্টিফেন হকিং ও তাই করেছেন, এছাড়াও অন্য আরো অনেক পদার্থবিজ্ঞানী, যারা প্রায়ই ধর্মীয় রুপক ব্যবহার করেছেন তাদের ভাষায় । পল ডেভিস এর ‘‘দি মাইন্ড অফ গড’’, যে বইটার জন্য তিনি টেম্পলটন পুরষ্কার পেয়েছেন , অবস্থান করছে আইনস্টাইনীয় সর্বেশ্বরবাদ আর অস্পষ্ট একটা একাত্মবাদের মাঝামাঝি একটা অবস্থানে ( প্রতি বছর বেশ বড় অঙ্কের একটা অর্থ পুরষ্কার হিসাবে দিয়ে থাকে টেম্পলটন ফাউন্ডেশন, সাধারনতঃ  ধর্ম সম্পর্কে সুন্দর কিছু কথা বলার জন্য তৈরী কোন বিজ্ঞানীকে)।

আইনস্টাইনেরই আরেকটি উদ্ধৃতি দিয়ে আমি তার ধর্মভাবনা নিয়ে আলোচনা শেষ করতে চাই:  ‘সবকিছু যা আমরা অনুভব করতে পারি, পেছনে এমন কিছু আছে যা আমাদের বুদ্ধির ব্যখাতীত, যার সৌন্দর্য্য, বিশালতা আর মহিমময়তা আমাদেরকে স্পর্শ করে পরোক্ষভাবে, ক্ষীন কোন ভাবনা রুপে, সেটা বোঝা আর অর্থ খুজে বের করাটাই ধার্মিকতা; এই অর্থে আমি ধার্মিক’;  এই অর্থে আমিও ধার্মিক, তবে একটু আপত্তি সাপেক্ষে, ‘‘বুদ্ধির ব্যাখাতীত’’ এর অর্থ ‘’চিরকালই বুদ্ধির ব্যাখাতীত’  হতে হবে এমনটা না। কিন্তু আমি নিজেকে ধার্মিক বলে পরিচয় দিতে চাই না কারন ‍এর অপব্যখা হবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। অপব্যাখ্যাটা ক্ষতিকর কারন, অসংখ্য ‍মানুষের কাছে ধর্ম বলতে অতিপ্রাকৃত ধর্মকেই বোঝায় । কার্ল স্যাগান সুন্দর  ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন: ‘যদি ঈশ্বর বলতে কেউ যদি বোঝাতে চায় এক গুচ্ছ প্রাকৃতিক নিয়মাবলী যা মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করছে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই এরকম একজন ঈশ্বর আছেন। এই ঈশ্বর অবশ্যই আবেগগত দিক থেকে সন্তুষ্টি দিতে ব্যর্থ, মধ্যাকর্ষণ আইনের কাছে কিছু প্রার্থনা করার নিশ্চয়ই খুব একটা অর্থ হয়না’।

মজার ব্যপার হলো স্যাগান এর শেষ বক্তব্যটির পূর্বাভাস কিন্তু আগেই করেছিলেন, অ্যামেরিকান ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপক, রেভারেন্ড ডঃ ফুলটন জে শীন, ১৯৪০ সালে আইনস্টাইনের ব্যক্তিগত ইশ্বরের ধারনাকে অস্বীকার করার ঘটনার তীব্র সমালোচনার অংশ হিসাবে। তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় জানতে চেয়েছিলেন, এমন কি কেউ আছে, যে মিল্কি ওয়ের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারে? তিনি মনে করেছিলেন বক্তব্যটি তিনি আইনস্টাইনের বিপক্ষে বলছেন, পক্ষে না। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘তার এই ‘‘কসমিক্যাল বা Cosmical’’ ধর্মে একটি মাত্র ভুল আছে,তিনি কেবল একটি বাড়তি অক্ষর ব্যবহার করেছেন শব্দটিতে, “S“ হলো সেই অক্ষরটি ” [অর্থাৎ Cosmical না Comical] । আইনস্টাইনের বিশ্বাসের মধ্যে অবশ্যই কোন ‘‘কমিক্যাল’’  ব্যপার নেই। তাসত্ত্বেও,  আশা করি,পদার্থবিজ্ঞানীরা তাদের বিশেষ রুপকঅর্থে ‘ঈশ্বর’ শব্দটি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকবেন। পদার্থবিদদের রুপকার্থে ব্যবহৃত বা সর্বেশ্বরবাদের এ‌ই ‘ঈশ্বর’’’  , বাইবেলে বর্ণিত, সবকিছুতে সরাসরি হস্তক্ষেপকারী, অলৌকিক কর্মকান্ড ঘটানোতে পারদর্শী, অন্তর্যামী, পাপের শাস্তি প্রদানকারী, প্রার্থনার উত্তরদাতা, পাদ্রী, মোল্লাদের বা রাবাইদের বা সাধারন ভাষার  ‘ঈশ্বর’ থেকে বহু আলোকবর্ষ দুরে। ‍ আমার মতে, ইচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে‍ এই দুই পৃথক ‘ঈশ্বর’ এর ধারনার মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা একটি মারাত্মক বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাসঘাতকতা।

আলবার্ট আইনস্টাইন

: যে ‘শ্রদ্ধা’ পাওয়ার অযোগ্য :

আমার এই বইটির শিরোনাম ‘দি গড ডিল্যুশন’ এর গড বা ঈশ্বর ‍ আইনস্টাইনের বা আগের অনুচ্ছেদগুলোয় উল্লেখ করা কোন জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত বিজ্ঞানীদের ঈশ্বর নয়। বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার পুর্বপ্রমানিত ক্ষমতা আছে বিধায় আমি আগে ভাগেই আইনস্টাইনের ধর্ম ব্যাখ্যা করে নিলাম। এই বই এর বাকী অংশে আমি শুধু ‘অতিপ্রাকৃত’ ঈশ্বরদের কথা বলবো, এদের মধ্যে, আমার বেশীর ভাগ পাঠক যার সাথে পরিচিত, তিনি হলেন ওল্ড টেস্টামেন্টের ঈশ্বর ‘ইয়াওয়ে’; এ বিষয়ে কথা বলার আগে এবং এই প্রথম অধ্যায় শেষ করার আগে পাঠকদের সাথে আরেকটা বিষয় আমার স্পষ্ট করা উচিৎ, নয়ত পুরো বইটির অপব্যখা করার সুযোগ থেকে যাবে। এবারের বিষয়টি ভদ্রতার। আমি যা বলতে চেয়েছি তা সম্ভবতঃ ধর্মবিশ্বাসী অনেক পাঠককে আহত করবে। মনে হতে পারে বইটিতে তাদের নিজেদের বিশ্বাসের (হয়ত তাদের বিশ্বাস অন্য অনেকের কাছে মুল্যবান নাও হতে পারে) প্রতি অপর্যাপ্ত সন্মান দেখানো হয়েছে। খুবই দুঃখজনক হবে যদি সেকারনে তারা বইটি না পড়তে চান, সুতরাং শুরুতেই ব্যপারটার ব্যাখ্যা দিতে চাই।

একটি ব্যপকভাবে বিস্তৃত ধারণা, যা সমাজের প্রায় সবাই – যারা ধার্মিক না তারাও – মেনে নিয়েছেন, তা হলো, ধর্মীয় বিশ্বাস যে কোন ধরনের আক্রমনে খুব সহজেই ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এবং সেই জন্য শ্রদ্ধার মোটা দেয়াল ‍দিয়ে ধর্মকে সুরক্ষিত রাখা উচিৎ।   এই শ্রদ্ধার প্রকৃতি মানুষের প্রতি মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে সম্পুর্ন আলাদা শ্রেনীর। মৃত্যুবরণ করার কিছুদিন আগে কেমব্রিজ এ একটি ‍উপস্থিত বক্তৃতায় ডগলাস অ্যাডামস এর সুন্দর ব্যখা দিয়েছিলেন [৮]; তার বক্তব্য সবার সাথে ভাগ করে নেবার ব্যপারে আমি কখনই ক্লান্তি বোধ করিনা:

ধর্ম ..   এর কেন্দ্রে কিছু বিশেষ ধারনা আছে যা আমরা নাম দিয়েছি, পরম শ্রদ্ধেয় বা পবিত্রইত্যাদি। যার সার কথাটা হলো, ‘এই যে এটা হচ্ছে একটা ধারনা বা অভিমত, যার বিরুদ্ধে আপনার কোনই অনুমতি নেই খারাপ কিছু বলার’; আপনি বলতে পারবেন না ব্যস। কেন নাকি কারনে? -কারন  আপনি বলতে পারবেন না ! এটাই শেষ কথা। কেউ যদি এমন কোন দলকে ভোট দেয় যার সাথে আপনি একমত না। সেক্ষেত্রে আপনি কিন্তু যত খুশি তত তর্ক করতে পারবেন;  সবারই কোন না কোন নিজস্ব মতামত আছে, কেউই কিন্তু কোন রকম বিশেষ দুঃখ পায় না সেই বিতর্কে। কেউ যদি মনে করে ট্যাক্স বাড়ানো বা কমানো উচিৎ, সে বিষয়ে যে কোন ধরনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন বা মতামত প্রকাশের অধিকার আপনি আছে। কিন্তু কেউ যদি বলে, ‘শনিবারে আলো জালানো জন্য সুইচটাও আমার ধরা উচিৎ না, আপনি বলবেন, ‘আমি সেটা শ্রদ্ধা করি’;কেনইবা এটা সম্পুর্নভাবে ন্যায়সঙ্গত হবে  যেমন, লেবার পার্টি কিংবা কনসারভেটিভ পার্টিকে সমর্থন করা, কিংবা রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট দের, অর্থনীতির এই মডেল বা অন্যটাকে, উইনডোজ এর পরিবর্তে ম্যাকিনটশকে; কিন্তু যখনই কিভাবে মহাবিশ্বের শুরু হলো  আর কে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলো,এই বিষয়ে কোন মতামত পোষন করা হচ্ছে………না, কারন এটা পবিত্র একটা বিষয় ? …….সাধারণতঃ ধর্মীয় কোন বিষয়কে চ্যালেন্জ্ঞ না করাটাই আমাদের নিয়ম। কিন্তু  সত্যি বিষয়টা দারুন কৌতুহলের কারন হয়, যখন রিচার্ড এর সেই কাজটাই করার জন্য হৈ চৈ পড়ে যায়! প্রত্যেকে প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে যায়,  কারন এধরনের কোন কথা বলার আপনার অনুমতি নেই। অথচ যুক্তি মেনে বিষয়টা ভাবলেই দেখা যাবে, ঐ সব বিষয়গুলো নিয়ে অন্য যে কোন বিষয়ের মত কেন বিতর্ক করা যাবেনা, তার কিন্তু কোন কারনই নেই। শুধুমাত্র আমরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে কোনভাবে একমত হয়ে এটা ঠিক করেছি যে এটা করা যাবেনা।

ধর্মের প্রতি সমাজের অতিমাত্রায় শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটা গুরুত্বপূর্ন উদহারন দেই। যুদ্ধকালীন সময়ে সামরিক দ্বায়িত্ব পালন এড়াতে ‘বিবেকজনিত কারনে বিরোধিতা’[৯]  করার অবস্থান পাবার সবচেয়ে সহজ উপায় হল ‘ধর্মীয়’ কারন দেখানো। আপনি হতে পারেন একজন ‍বিখ্যাত নীতিশাস্ত্রবিদ দার্শনিক, হতে পারে আপনার পুরষ্কার পাওয়া নীরিক্ষাধর্মী কোন ডক্টরাল থিসিস আছে ‍ যুদ্ধের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে, তারপরও ড্রাফ্ট বোর্ড আপনার ‘বিবেকজনিত কারনে যুদ্ধের বিরোধিতা’ র মুল্যায়ণ করতে বেশ ঝামেলা করবে। কিন্তু আপনি যদি বলেন আপনার বাবা ও মা দুজন অথবা তাদের একজন কোয়েকার [১০], তাহলে ব্যপারটা ‍ পানির মত সহজ হয়ে যাবে আপনার জন্য । সেক্ষেত্রে শান্তিবাদ এর তত্ত্বের উপর বা  এমনকি কোয়েকারিজম এর উপরেও আপনার সামান্যতম জ্ঞান থাকুক বা না থাকুক।

শান্তিবাদের আবার একেবারে বীপরীতপ্রান্তে, পারস্পরিক যুদ্ধরত পক্ষগুলোর ধর্মীয় নাম ব্যবহার করার ভীরু অনীহা প্রায়শই লক্ষ করা যায়। যেমন উত্তর আয়ারল্যান্ডে, ক্যাথলিক আর প্রটেষ্টান্টরা নিজেদের নামকরন করেছে যথাক্রমে ‘ন্যাশনালিষ্ট‘ আর ‘লয়ালিষ্ট’; ‘ধর্ম’ শব্দটাই সুকৌশল সেন্সরশীপের মাধ্যমে পরিবর্তিত করে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘সমাজ’ বা ‘গোত্র’ শব্দের একার্থক হিসাবে, যেমন: ‘আন্তঃগোত্র যুদ্ধ; ২০০৩ সালে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনের পর ইরাকে শিয়া এবং সুন্নী মতাবলম্বী মুসলিমদের মধ্যেই গোত্রভিত্তিক গৃহযুদ্ধের সূচনা হয় – সুস্পষ্ট ভাবে ধর্মীয় মতাদর্শের সংঘাত – অথচ ২০০৬ সালের ২০ মে ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা তাদের প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম ও খবর, দুটোতেই গোত্রবিত্তিক গৃহযুদ্ধকে বর্ণনা করেছিল ‘‘জাতিগত বিশোধন’’ হিসাবে। এক্ষেত্রে জাতিগত শব্দটি আরেক সুভাষন বা গ্রহনযোগ্য  প্রতিশব্দ মাত্র। ইরাকে আমরা যা দেখছি, সেটা আসলে ধর্মীয় বিশোধন। ‘‘জাতিগত বিশোধন’’ , শব্দটির মুল ব্যবহারক্ষেত্র প্রাক্তন ইয়োস্লাভিয়ায়, তর্কসাপেক্ষে বলা যেতে পারে অর্থডক্স সার্ব, ক্যাথলিক ক্রোয়াট, মুসলিম বসনিয়ীয়দের ‘ধর্মীয় বিশোধন’ এর  একটি সুভাষন বা গ্রহনযোগ্য  প্রতিশব্দ।

গনমাধ্যম এবং সরকারের  সামাজিক নৈতিকতা বিষয়ে যে কোন ধরনের সাধারন আলোচনায় ধর্মকে বিশেষ সুযোগ দেয়া হয়ে থাকে, এই বিষয়টার প্রতি আমি আগেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছি[১১]; যখনই যৌন বা প্রজনন বিষয়ক ব্যক্তিগত নৈতিকতা সংক্রান্ত কোন ধরনের বিতর্ক হয়, আপনি বাজী রাখতে পারেন যে, বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী দলকে প্রতিনিধিত্বকারী ধর্মীয় নেতাদের সবসময়ই, প্রভাবশালী কমিটিগুলোতে, রেডিও বা টেলিভিশনের প্যানেল আলোচনায় গুরুত্বপুর্ণ পদে দেখা যায়। আমি বলতে চাচ্ছিনা যে, উদ্দেশ্যমুলকভাবে এদের মতামতগুলোকে আমাদের নিয়ন্ত্রন করা উচিৎ; কিন্তু আমার প্রশ্ন, কেন সমাজ মতামতের জন্য এদের দ্বারস্থ হয়, কেনই বা আমরা এমন ভাবি যে, নীতিশাস্ত্রীয় দার্শনিক, কিংবা পারিবারিক আইনে পারদর্শী আইনজীবি অথবা ‍একজন চিকিৎসকের সাথে তুলনা করা যেতে পারে এমন যোগ্যতা এদের আছে ?

ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দেবার আরেকটা আজব উদহারন দেই: ২০০৬ সালে ২০ ফেব্রুয়ারী যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রীম কোর্ট সংবিধান অনুযায়ী রুল জারী করে, নিউ মেক্সিকোর একটি চার্চ হ্যালুসিনোজেনিক মাদকদ্রব্য ব্যবহার সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় পড়বে না, যা বাকী সবার জন্য প্রযোজ্য [১২];‘সেন্ট্রো এসপিরিটা বেনেফিসিয়েন্টে উনিয়াও দো ভেজেটাল (ইউভিডি)’ এর বিশ্বাসী সদস্যরা মনে করেন ঈশ্বরকে বুঝতে হলে তাদের অবশ্যই হোয়াসকা চা [১৩] পান করতে হবে, যার মধ্যে অবৈধ হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগ ডাইমিথাইল ট্রিপ্টামিন আছে। লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তারা যে বিশ্বাস করে এটা তাদের ঈশ্বরকে বোঝার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সেই বিশ্বাসটাই যথেষ্ট, এর জন্য কোন আদালতে তাদের প্রমান দাখিল করতে হয়নি। আরেকদিকে ক্যানাবিস, কেমোথেরাপী পাচ্ছে এমন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের বমি বমি ভাব এবং কিছু অস্বস্তিকর উপসর্গ কমাতে সাহায্য করে তার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমান থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের এই সুপ্রীম কোর্টই ২০০৫ এ সংবিধান অনুযায়ী রুল জারী করেছিল, যারা চিকিৎসা হিসাবে ক্যানাবিস ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচার করা যেতে পারে (এমনকি সেই সব অঙ্গরাজ্যেও যেখানে বিশেষ ক্ষেত্রে ক্যানাবিসের ব্যবহার আইনসিদ্ধ); ধর্ম, সবসময়ের মতই এখানেও ট্রাম্প কার্ড। কল্পনা করুন তো কি  সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে, যদি কোন শিল্পকলা সমঝদার গ্রুপ এর সদস্যরা কোর্টে আবেদন করে, যে তারা ‘বিশ্বাস’ করেন, ইম্প্রেশনিষ্ট বা সুরিয়ালিষ্টদের শিল্পকর্ম ভালোভাবে বোঝার জন্য অবশ্যই তাদের হ্যালুসিনোজেনিক ড্রাগ ব্যবহার করা প্রয়োজন । অথচ যখন কোন চার্চ একই ধরনের প্রয়োজনের জন্য দাবী জানালো, তা সমর্থন করলো দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। এরকমই শক্তি ধারন করে ধর্ম, তাবিজের মতন।

ডগলাস অ্যাডামস

প্রায় আঠারো বছর আগে ছত্রিশ জন লেখক এবং শিল্পী দলের আমিও একজন ছিলাম, যাদের নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকা থেকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল প্রখ্যাত লেখক সালমান রুশদীর সমর্থনে কিছু লেখার জন্য [১৪]; একটি উপন্যাস লেখার জন্য তখন সালমান রুশদীর উপর মৃত্যুদন্ডের ফতোয়া । খৃষ্টান ধর্মীয় নেতাদের এবং বেশকিছু ধর্ম নিরেপক্ষ মতবাদীদের, মুসলিম জনগনের ধর্মবিশ্বাসে ‘‘আঘাত‘ আর ‘‘অপমান’‘ এর জন্য ‘সমবেদনা’ প্রকাশের ভাষা দেখে ক্ষুদ্ধ হয়ে এরকমই তুলনা করেছিলাম:

যদি বর্ণবাদের সমর্থকরা একটু বুদ্ধিমান হত, তারা যদি দাবী করতো, -আমি যেটা সত্যি বলে জানি-, মিশ্র বর্ণের জাতি তাদের ধর্মের বিরুদ্ধে। সেক্ষেত্রে  বর্ণবাদ বিরোধীদের বড় একটা অংশ শ্রদ্ধার সাথে নীরবে সরে যেত। এধরনের তুলনা করা সঠিক হবে না কারন বর্ণবাদের কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই-আমার মনে হয় এধরনের দাবী করাটা অর্থহীন হবে । ‘যৌক্তিক ভিত্তিহীনতা’ হল ধর্মীয় বিশ্বাসেরও সারকথা, এর শক্তি এবং প্রধানতম গৌরব।আমাদের সবাইকে আমাদের সকল সংস্কার বা প্রেজুডিসের ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয়, কিন্তু যখনই আপনি একজন ধর্মীয় ব্যক্তিকে তার বিশ্বাসের যৌক্তিক ভিত্তি ব্যখা করতে বলবেন, তখনই আপনি তার ‘ধর্মীয় স্বাধীনতায়’ হস্তক্ষেপ করার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন।

এরকমই কিছু একটা যে ঘটবে একবিংশ শতাব্দীতে তখন ,আমার জানা ছিল না । লস এন্জেলেস টাইমস (১০ এপ্রিল ২০০৬) রিপোর্ট প্রকাশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অসংখ্য ক্যাম্পাস নির্ভর খৃষ্টীয় সংগঠনগুলো তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করছে ‘সমকামীদের হয়রানি আর নির্যাতন’ নিষিদ্ধ করে প্রনীত ‘বৈষম্যবিরোধী আইন’ প্রয়োগ শুরু করার জন্য। এ ধরনের আদর্শ উদহারণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে: ২০০৪ সালে ওহাইও র ১২ বছরের একজন কিশোর, জেমস নিক্সন স্কুলে ‘‘সমকামীতা হচ্ছে পাপ’, ‍‘‘‘‘‘ইসলাম হলো মিথ্যা’ ‘গর্ভপাত মানে হত্যা’’ এবং ”কিছু কিছু বিষয় এমন স্পষ্ট সাদা আর কালো” – [১৫] লেখা টি-শার্ট পরে স্কুলে যাবার অধিকার জিতে নিয়েছিল আদালতে। স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে এধরনের বিদ্বেষ পোষন করা টি-শার্ট পরে স্কুলে আসা নিষিদ্ধ করলে তার বাবা মা স্কুল কর্তৃপক্ষর বিরুদ্ধে মামলা করেন। বিবেকের কাছে কিন্তু অনেক বেশী গ্রহনযোগ্য হত যদি তারা মামলা ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করতো সংবিধানের প্রথম সংশোধনী, যা স্বাধীন মতামত প্রকাশ করার অধিকার নিশ্চিৎ করে। কিন্তু তারা তা করেননি, বরং নিক্সনের আইনজীবি আদালতে আবেদন করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের যে ধারায় ‘ধর্ম পালনের স্বাধীনতার পুর্ণ অধিকার আছে’, সেই ধারায়। সফল এই মামলাটা পরিচালনায় পৃষ্টপোষকতা করেছিলো, অ্যালিয়ন্স ডিফেন্স ফান্ড অফ অ্যারিজোনা, যাদের অন্যতম প্রধান কাজ হলো ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য আইনী লড়াই চালিয়ে যাওয়া’।

রেভারেন্ড রিক স্কারবোরো, এধরনের অনেকগুলো খৃষ্টিয় ও ধর্মীয় মদদপুষ্ট আইনী লড়াই, যা ‘সমকামী’ ও অন্যান্য গ্রুপদের প্রতি বৈষম্যমুলক আচরনের আইনসম্মত যুক্তিযুক্ত কারন হিসাবে ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, সমর্থন করে এদেরকে চিহ্নিত করেছেন, ‘একবিংশ শতাব্দীর নাগরিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম’ হিসাবে: ‘খৃষ্ট ধর্মানুসারীরা খৃষ্টান হবার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে দৃঢ় অবস্থান নিবে’[১৬];  আবারো এই মানুষগুলো যদি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার দাবীতে তাদের ‍অবস্থান নিত, হয়ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেকেই সমর্থন জানাতো। কিন্তু ব্যপারটা সম্পুর্ণ ভিন্ন। ‘খৃষ্ঠান হবার অধিকার’ এই ক্ষেত্রে ’অন্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানোর অধিকার’; সমকামীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমুলক আচরনের পক্ষে মামলা এখন উল্টো ব্যবহার করা হচ্ছে  তথাকথিত ধর্মীয় বৈষম্যমুলক আচরনের মামলা হিসাবে !  আইনেরও সায় আছে বলে মনে হচ্ছে ব্যপারটায়। ‍আইনের হাত থেকে আপনি  রেহাই পাবেন না, যদি বলেন, ‘সমকামীদের অপমান করা থেকে আমাকে নিষেধ করার চেষ্টা করা মানে আমার সংস্কার বা ঘৃণা প্রকাশ করার অধিকারে হস্তক্ষেপ করা’; কিন্তু আপনি রেহাই পেতে পারেন যদি বলেন, ‘এটা আমার ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে’; যখন আপনি চিন্তা করবেন পার্থক্যটা আসলে কোথায়? এখানে আবারো, ধর্ম সবকিছুকেই ট্রাম্প করে।

একটি বিশেষ কেস স্টাডি দিয়ে এই অধ্যায়টি শেষ করছি, যা বিশেষ করে প্রমান করে ধর্মের প্রতি সাধারন মাত্রার মানবিক শ্রদ্ধার অনেক উপরে অবস্থান করছে  সমাজের মাত্রারিক্ত শ্রদ্ধা। ঘটনাটি বিশাল আকার ধারন করে বিস্ফোরিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারী ২০০৬  এ – হাস্যকর এই ঘটনা,যা চুড়ান্ত কমেডি আর  ট্রাজেডির মাঝে দিকপরিবর্তন করেছে অপ্রত্যাশিত উন্মত্ততায়;  এর আগের বছর সেপ্টেম্বর (২০০৫) মাসে, ড্যানিশ দৈনিক, জিল্যান্ডস পোস্টেন’, প্রফেট মোহাম্মদকে নিয়ে ১২টা কার্টুন প্রকাশ করে।  এর পরবর্তী তিন মাস ডেনমার্কে বসবাসকারী অল্প কিছু সংখ্যক মসুলমান, খুব সাবধানে ধীরে ধীরে পদ্ধতিগতভাবে পৃথিবীর প্রায় সকল মুসলিম দেশগুলোতে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। এদের নেতৃত্ব দেন দুই ইমাম, যাদের একসময় নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিল দেশটি [১৭]। ২০০৫ সালে অনিষ্ট করার মানসিকতা নিয়ে এই দুই  নির্বাসিত ইমাম ডেনমার্ক থেকে মিসর আসেন একটি ফাইল নিয়ে । সেখানে যা কপি করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া হয়, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ায়।  এই ফাইলে ছিল, ডেনমার্কে মসুলমানদের উপর তথাকথিত নির্যাতনের বানোয়াট বর্ণনা এবং একটি  উদ্দেশ্যমুলক মিথ্যাচার যেজিল্যান্ড পোস্টেন’ একটি ডেনিশ সরকার নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা।

এছাড়াও এর সাথে সেই ১২ টা কার্টুন তো ছিলই এবং সবচে গুরুত্বপুর্ন, ইমামরা এর সাথে যোগ করেন আরো ৩টা অতিরিক্ত কার্টুন, যার উৎপত্তি খুবই রহস্যজনক এবং অবশ্যই ডেনমার্কের সাথে তার কোনই যোগাযোগ নেই। মুল ১২ কার্টুনের চেয়ে এই ৩ টি কার্টুনগুলো আরো বেশী অপমানজনক ছিল বা হতে পারতো -‍ যদি- এই উৎসাহী প্রচারণাকারীদের অভিযোগ মতে -সেগুলো সত্যি সত্যি মোহাম্মদকে ব্যঙ্গ করে আকা হতো; এদের মধ্যে বিশেষ করে ক্ষতিকরটি আদৌ কোন কার্টুনই না. শুকরের নকল নাক ইলাস্টিক দিয়ে মুখে বাধা দাড়িওয়ালা মানুষের একটা ফ্যাক্স করে পাঠানো একটা ফটোগ্রাফ । পরবর্তীতে প্রমান হয়, ছবিটা আসলে অ্যাসোসিয়েট প্রেসের তোলা ফ্রান্সের একটা গ্রাম্য মেলায় ‘পিগ স্কু‍ইলিং’ প্রতিযোগীতায় অংশ নিতে আসা একজন ফরাসী ব্যক্তির ছবি[১৮]; ছবির সাথে মোহাম্মদের কোন ধরনের যোগাযোগ নেই, ইসলাম ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই আর ডেনমার্কেরও কোন সম্পর্ক তো নেই। কিন্তু মুসলিম অ্যাক্টিভিস্টরা তাদের ঝামেলা পাকানো কায়রো সফরে এই ছবির সাথে  এই তিনটি সম্পর্কই জোড়া লাগায় ….. ফলাফল যা ধারনা করা হয়েছিল তাই হলো।

মুল ১২ কার্টুনের প্রকাশের পাচ মাস পর খুব সাবধানে সাজানো এই ’‘আঘাত’’ এবং ‘‘আক্রমন’’ এর ব্যপক বিস্ফোরণ ঘটে সারা বিশ্বব্যপী। পাকিস্থান আর ইন্দোনেশিয়ায় বিক্ষোভকারীরা ডেনমার্কের পতাকা পোড়ায় ( কার কাছ থেকে তারা জোগাড় করেছিল সেই পতাকা?) ;  ডেনিশ সরকারের প্রতি উন্মত্ত দাবী জানানো হল, ক্ষমা চাইবার জন্য ( কিসের জন্য ক্ষমা চাইবে, ডেনিশ সরকারতো কার্টুনগুলো আকেনি বা প্রকাশও করেনি। শুধু ডেনিশ নাগরিকরা এমন একটা দেশে বসবাস করে, যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে, যা অনেক  ইসলামী দেশের বসবাসকারীদের পক্ষে খুব সহজে বোঝা সম্ভব না); নরওয়ে,জার্মানী, ফ্রান্স এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও ( কিন্তু উল্লেখযোগ্য ভাবে ব্রিটেনে না) বেশ কিছু দৈনিক জিল্যান্ড পোষ্টেন এর সাথে একাত্মতা ঘোষনা করে কার্টুন গুলো পূনপ্রকাশ করে বিক্ষোভের আগুন আরো উসকে দেয়। দুতাবাস ভাংচুর, ড্যানিশ দ্রব্য বয়কট, ডেনিশ নাগরিকদের, মুলতঃ সকল পশ্চিমাদের শারীরিক আক্রমনের ভয় দেখানো হয়। পাকিস্থানে খৃষ্টানদের গীর্জা পোড়ানোর ঘটনা ঘটে, যাদের সাথে ইউরোপিয়ান বা ডেনিশদের কোন সম্পর্কই নেই। লিবিয়ার বেনগাজীতে ইতালিয়ান কনসুলেট এ দাঙ্গাকারীদের আক্রমনের সময় মারা যায় নয় জন। জেরমাইন গ্রীয়ার লিখেছিলেন  ‘এই মানুষগুলো যা করতে পছন্দ করে আর যেটা ভালো করতে পারে তা হলো, বিশৃঙ্খলা’[১৯] ।

ডেনিশ কার্টুনিষ্টকে হত্যা করার জন্য এক পাকিস্থানী ইমান ১ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কারও ঘোষনা করে-বোঝাই যাচ্ছে কোন ধারনা ছিল না যে, একজন না, ১২ জন কার্টুনিষ্টর আকা ছিল সেই কার্টুনগুলো আর অবশ্যই কোন ধারনা ছিল না যে, তিনটি বিশেষভাবে আপত্তিজনক ছবিগুলো কিন্তু আদৌ ডেনিশ না (আর, প্রসঙ্গক্রমে, ঐ মিলিয়ন ডলার যোগাড় হবে কোথা থেকে?); নাইজেরিয়াতে ডেনিশ কার্টুনের বিরুদ্ধে মুসলিম বিক্ষোভকারী বেশ কিছু চার্চ ধ্বংশ করে  এবং ম্যাশেটে (এক ধরনের ছুরি) দিয়ে রাস্তায় খৃষ্টানদের (কালো নাইজেরীয়) আক্রমন ও হত্যা করে। একজন খৃষ্টানকে রাবারের টায়ারে মধ্যে বেধে রেখে তার গায়ে পেট্রল ঢেলে জীবন্ত দগ্ধ করা হয়। ব্রিটেনে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদের ছবি সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হলে দেখা যায় ‘‘হত্যা করো যারা ইসলামকে অপমান করে’’, ‘‘জবাই করো যারা ইসলামকে ব্যঙ্গ করে’’, ‘‘ইউরোপকে এর শাস্তি পেতে হবে’’; লেখা ব্যনার হাতে বিক্ষোভকারীদের ছবি। সৌভাগ্য যে, ইসলাম যে শান্তি আর দয়ার ধর্ম সেটা আমাদের মনে করিয়ে দেবার জন্য রাজনীতিবিদরা বেশ তৎপর ছিলেন।

এই সব ঘটনার পরবর্তীতে সাংবাদিক অ্যান্ড্রু মুয়েলার ব্রিটেনের নেতৃত্বস্থানীয় ‘মধ্যপন্থি’ বা মডারেট মুসলিম নেতা স্যার ইকবাল স্যাকরানির সাক্ষাৎকার নেন [২০]; আজকের ইসলামের মাপকাঠিতে হয়ত তিনি ‘মধ্যপন্থি’ হতে পারেন, কিন্ত অ্যান্ড্রু মুয়েলার ‍এর সাক্ষাৎ অনুযায়ী তিনি এখনও তার, সালমান রুশদীকে মৃত্যুদন্ডর ফতোয়া দেয়ার সময় করা সেই মন্তব্য থেকে সরে আসেননি : ‘মৃত্যুদন্ড তার জন্য হয়ত অনেক সহজ শাস্তি’ ; এই মন্তব্য তাকে অসন্মানের সাথে পৃথক করে দেয় তার সাহসী পুর্বসুরী প্রয়াত ডঃ জাকী বাদাওয়ী থেকে, যিনি তার নিজের বাসায় সালমান রুশদীকে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সাকরানী মুয়েলারকে মন্তব্য করেছিলেন, তিনি ডেনিশ কার্টুন নিয়ে খুবই চিন্তিত, মুয়েলার নিজেও চিন্তিত, কিন্তু ভিন্ন কারনে: ‘আমি চিন্তাগ্রস্থ কারন অখ্যাত কোন এক স্ক্যান্ডিনিভিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এই সব  আদৌ হাস্যকর নয় এমন কতগুলো কার্টুন যে ভাবে অদ্ভুতরকমের মাত্রা ছাড়ানো প্রতিক্রিয়া ঘটিয়েছে তা স্পষ্ট করে দেয়……. ইসলাম এবং পশ্চিম আসলে মুলভাবগতভাবেই অসমন্বয়যোগ্য’; স্যাকরানি অপরদিকে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রশংসা করেছে কার্টুনগুলো পুনঃপ্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে, প্রত্যুত্তরে মুয়েলার ব্রিটেনের অধিকাংশ মানুষের সন্দেহকে কন্ঠ দিয়ে বলেছেন, ‘কার্টুনগুলো পুনপ্রকাশ না করার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পত্রিকাগুলোর সংযম প্রদর্শনের কারন মুসলিমদের প্রতি সমমর্মিতা নয়, বরং তারা কেউ তাদের জানালা ভাঙ্গুক সেটা আসলে তারা সেটা চাননি’।

স্যাকরানি ব্যখা করেন, ‘নবীকে ( তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক), সমস্ত মুসলিম জগত গভীর ভাবে শ্রদ্ধা করে, যে ভালোবাসা কোন শব্দ দিয়ে ব্যখা করা যায় না। যা পিতামাতা, প্রিয়জন, সন্তান থেকেও বেশী। এটা বিশ্বাসেরই অঙ্গ। এছাড়াও সুস্পষ্টভাবে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা আছে নবীর কোন প্রতিকৃতি আকার ব্যপারে’; এর মানে মুয়েলারের ভাষায়:

ইসলামের মুল্যবোধ অন্য যে কারোর মুল্যবোধের উপরে অবস্থান করে -অন্য যে ‍কোন ধর্মের অনুসারীরা যেমন করে বিশ্বাস করেন, তাদেরটাই একমাত্র পথ, সত্য আর আলোকময়, সেভাবে ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসীরাও সেটাই মনে করেন । যদি কেউ ৭ম শতাব্দীর একজন ধর্মপ্রচারককে তাদের নিজেদের পরিবারের সদস্যদের চেয়ে বেশী ভালোবাসতে ইচ্ছা পোষন করেন, সেটা শুধুমাত্র তাদের ব্যপার; বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবার জন্য অন্য আর কেউ বাধ্য নয় ।

শুধুমাত্র পার্থক্য, আপনি যদি ব্যপারটা গুরুত্বর সাথে না নেন, এবং প্রয়োজনীয় সন্মান না দেখান সেক্ষেত্রে আপনাকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করার হুমকি দেয়া হবে, এবং সেটা এমন এক ‍মাত্রায় যা মধ্যযুগ পরবর্তী আর কোন ধর্মেই আর কখনো দেখা যায়নি। যে কাউকেই বিষয়টা চিন্তা করতে বাধ্য করে, কেন এ‌ই ধরনের সহিংসতা প্রয়োজন, কারন, মুয়েলারের পর্যবেক্ষন: ‘যদি আপনাদের মধ্যে কোন ভাড়, যদি সত্যি হন ধর্মের ব্যপারে, সেক্ষেত্রে  এই কার্টুনিষ্টরাতো নরকেই যাবে, সেটাই কি যশেষ্ট না ? আর ততক্ষন মুসলিমদের উপর নির্যাতনের ব্যপারে যদি আপনাদের উত্তেজিত হতে একান্ত ইচ্ছাই করে,  ‍ তাহলে সিরিয়া আর সৌদি আরবের উপর  অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টটা পড়লেই হয়’।

অনেক মানুষই বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করেছে, স্নায়ুবিকারগ্রস্থের মত ‘ধর্মীয় বিশ্বাসে ‘আঘাত’ এর কথা বলা মুসলিম আর আরব মিডিয়ায় ‍গৎবাধা ইহুদী বিরোধী কার্টুন ছাপানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উৎসাহ প্রদর্শনের মধ্যকার পার্থক্যটা। পাকিস্থানে ডেনিশ কার্টুনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের একটা ছবিতে দেখা যায়, কালো বোরখা পরা একজন মহিলার হাতে ব্যনার, তাতে লেখা, ‘ঈশ্বর হিটলারকে আশীর্বাদ করুন’।

এইসব বিশ্বব্যাপী উন্মত্ত বিশৃঙ্খলার প্রতিক্রিয়ায়, ভদ্র উদারপন্থী দৈনিকগুলো সহিংসতাকে নিন্দা আর বাকস্বাধীনতার উপর দায়সারা গোছের মন্তব্য করেছে মাত্র। কিন্তু  একই সাথে তারা তাদের ‘শ্রদ্ধা’ আর ‘সমবেদনা’ প্রকাশ করেছে মসুলমানদের এই গভীর ‘আঘাত’ ‍ও ‘অপমান’ সহ্য করবার জন্য। মনে রাখতে হবে  এই ‘আঘাত’ এবং ’কষ্ট’ ‍কিন্তু কোন ব্যক্তিদের না, যারা সহিংসতা সহ্য করেছে বা কোন ধরনের সত্যিকার যন্ত্রনা সহ্য করেছে : বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির লক্ষ্যে  উদ্দেশ্যমুলকভাবে প্রচারনা ছাড়া, ডেনমার্কের বাইরে কেউই কোনদিন নামই শুনতো না এমন অখ্যাত এক খবরের কাগজে  ছাপা কয়েক ফোটা কালি দাগে ছাড়া যা আর কিছুই নয়।

আমি কাউকে অপমান বা আঘাত করার খাতিরে অপমান বা আঘাত করার পক্ষপাতী নই। কিন্ত খুবই অবাক হই আর রহস্যময় মনে হয়, আমাদের  ‌এই অন্য প্রায় সব অর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ সমাজগুলোয় ধর্মকে কেন এই মাত্রাতিরিক্ত  সুযোগ দেয়া হয়।  সব রাজনীতিবিদরাই হেয় করা কার্টুনের শিকার হয়, কিন্তু তাদের সমর্থনে তো কোন দাঙ্গা হয় না। ধর্মর কি এমন যোগ্যতা আছে যে তাকে  এই বিশেষ মর্যাদা দিতে হবে। যেমন, এইচ এল মেনকেন বলেছিলেন, ‘অন্য কারো ধর্মকে অবশ্যই আমাদের শ্রদ্ধা করতে হবে কিন্তু সেটা শুধুমাত্র তার স্ত্রী সুন্দরী এবং তার ছেলেমেয়েরা বেশী বুদ্ধিমান, তার নিজস্ব এই তত্ত্বটিকে যে অর্থে এবং যতটুকু আমরা শ্রদ্ধা করি ঠিক সেটুকুই’।

‘ধর্মের প্রতি ‌ সমাজে এধরনের অতুলনীয় শ্রদ্ধা বিদ্যমান’ [২১] এই পূর্বধারনার আলোকেই  আমি এই বইয়ের জন্য আমার নিজস্ব দ্বায়দ্বায়িত্বের সীমা নির্ধারন করে নিচ্ছি। আমি কাউকে আঘাত করার জন্য এই বই লেখার মুল উদ্দেশ্যর বাইরে যেমন যাবো না, তেমনি আমি ধর্ম নিয়ে আলোচনা করার সময় আর অন্য যে কোন বিষয় নিয়ে  যেভাবে আলোচনা করতাম তার চেয়ে হালকাভাবেও করবো না।


[১] আমাদের জন্য মজার  একটা খেলা ছিল, ক্লাসে পড়ানোর সময় তাকে বাইবেল থেকে সরিয়ে ফাইটার কম্যান্ড আর দি ফিউ’’‘ র** ‍শিহরন জাগানো গল্পের দিকে নিয়ে যাওয়া। যুদ্ধের সময় ‍তিনি রয়্যাল এয়ার ফোর্সে কাজ করেছিলেন। কিছুটা পরিচিত আর স্নেহর মত কোন একটা অনুভুতি দিয়ে আমি আজও চার্চ অফ ইংল্যান্ডকে মনে রেখেছি ( অন্ততপক্ষে অন্য সব প্রতিপক্ষদের তুলনায়)।
পরবর্তীতে আমি জন বেটজামিন এর কবিতায় পড়েছিলাম:
Our padre is an old sky pilot;
Severely now they’ve clipped his wings’
But still the flagstaff in the rec’try garden
points to higher things … 
** The Few is a term used to describe the Allied airmen of the British Royal Air Force (RAF) who fought the Battle of Britain in the Second World War. It comes from Winston Churchill’s phrase “never was so much owed by so many to so few”.

[২] It is interesting to contemplate an entangled bank, clothed with many plants of many kinds, with birds singing on the bushes, with various insects flitting about, and with worms crawling through the damp earth, and to reflect that these elaborately constructed forms, so different from each other, and dependent on each other in so complex a manner, have all been produced by laws acting around us. These laws, taken in the largest sense, being Growth with Reproduction; inheritance which is almost implied by reproduction; Variability from the indirect and direct action of the external conditions of life, and from use and disuse; a Ratio of Increase so high as to lead to a Struggle for Life, and as a consequence to Natural Selection, entailing Divergence of Character and the Extinction of less-improved forms. Thus, from the war of nature, from famine and death, the most exalted object which we are capable of conceiving, namely, the production of the higher animals, directly follows. There is grandeur in this view of life, with its several powers, having been originally breathed into a few forms or into one; and that, whilst this planet has gone cycling on according to the fixed law of gravity, from so simple a beginning endless forms most beautiful and most wonderful have been, and are being, evolved. (An Entangled Bank. From the conclusion of Darwin’s Origin of Species First Edition, 1859)

[৩] However, if we discover a complete theory, it should in time be understandable by everyone, not just by a few scientists. Then we shall all, philosophers, scientists and just ordinary people, be able to take part in the discussion of the question of why it is that we and the universe exist. If we find the answer to that, it would be the ultimate triumph of human reason — for then we should know the mind of God. (A Brief History of Time, Stephen Hawkins, p.193)

[৪] Parson : An Anglican cleric with full legal control of a parish under ecclesiastical law; a rector
[৫]    টেলিভিশন ডকুমেন্টরী, ইন্টারভিউ যার একটা অংশ। Winstone R (2005). The Story of God. London. Transworld/BBC.
[৬]    Dennett DC (2006), Breaking The Spell: Religion as Natural Phenomenon. London:  Viking.
[৭]    Ecumenical: promoting or tending toward worldwide Christian unity or cooperation

[৮] পুরো বক্তৃতা টা আছে অ্যাডামস (২০০৩) ‘ ‘কৃত্রিম ঈশ্বর বলে কেউ কি আছে’” শিরোনামে। Adams, D.(2003). The Salmon of Doubt.London.Pan

[৯] A conscientious objector (CO) is an “individual [who has] claimed the right to refuse to perform military service” on the grounds of freedom of thought, conscience, or religion.

[১০]   QUAKERS, A Christian sect founded by George Fox about 1660; commonly called Quakers, also known as The Religious Society of Friends. The name is used by a range of independent religious organizations which all trace their origins to a Christian movement in mid-17 century England and Wales. A central belief was that ordinary people could have a direct experience of the eternal Christ. Today, the theological beliefs among the different organizations vary, but include broadly evangelical Christian, liberal Protestant, Christian Universalist and non-Christian Universalist beliefs. Some of these organizations also use the name Quaker or Friends Church.

[১১]  ‘Dolly and the clothes head’ : A Devil’s Chaplain: Selected essays. London: Weidenfeld and Nickolson.

[১২]    http://www.oyez.org/cases/2000-2009/2005/2005-04-1084/. In early November 2005, justices of the US Supreme Court heard arguments for and against the importation of hoasca tea. Hoasca contains dimethyltryptamine (DMT), an illegal, hallucinogenic drug. The tea is used by members of the Brazil-based church called O Centro Espirita Beneficiente Uniao do Vegetal (UDV) during religious ceremonies. There are only 130 members of the church in the United States (http://faculty.washington.edu/chudler/hoas.html )

[১৩]    Hoasca tea is made by brewing two Amazonian plants called Psychotria viridis and Banisteriopsis caapi. The plants are considered to be sacred to the UDV and the tea is used for religious purposes only. In May 1999, US Custom agents seized three drums of hoasca tea sent from Brazil to the UDV in the US. After lower courts debated the legality of the seizure, the US Supreme Court heard arguments about whether the Religious Freedom Restoration Act of 1993 should permit the importation, distribution, possession, and use of hoasca by the UDV (http://faculty.washington.edu/chudler/hoas.html ).
[১৪]   R. Dawkins, ‘The irrationality of faith’, New Statesman (London), 31 March 1989
[১৫]   Columbus Dispatch, 19 Aug. 2005.
[১৬]   Los Angeles Times, 10 April 2006.
[১৭]   http://gatewaypundit.blogspot.com/2006/02/islamic-society-used-fake.html.
[১৮]   http://news.bbc.co.uk/2/hi/south_asia/4686536.stm;
[১৮]   http://www.neandernews.com/?cat=6.

[১৯]    The Independent, 5 Feb, 2006.
[২০]   Andrew Mueller. `An Argument with Sir Iqbal’, Independent on Sunday, 2 April 2006, Sunday Review Section, 12-16
[২১] এই পেপারব্যাক এর যখন প্রুফ দেখা হচ্ছে, তখন নিউ ইয়র্ক টাইমস এই ধরনের বিশেষ সন্মান প্রদর্শনের একটা ঘটনা প্রকাশ করে। ২০০৭ এর জানুয়ারীতে, এক জার্মান মহিলা দ্রুত বিবাহ  বিচ্ছেদের আবেদন জানায় আদালতে, তার অভিযোগ ‍ছিল তার স্বামী তাদের বৈবাহিক জীবনের শুরুর থেকেই তাকে প্রায়ই ভয়ঙ্কর রকমের মারধোর করে। এই ঘটনা মেনে নিয়েই বিচারক ক্রিষ্টা দাট-ভিন্টার কোরানের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে তার আবেদন নাকচ করে দেন। ‍ এধরনের অভূতপুর্ব রায়ের মাধ্যমে মুসলিম প্রথা আর ইউরোপিয়ান আইনের মধ্যকার দন্দ্বকে প্রকাশ করে। বিচারক ক্রিষ্টা দাট-ভিন্টার বলেন   এই দম্পতিরা মরোক্কর সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের, যে সংস্কৃতিতে তার মতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রহার স্বাভাবিক একটি ঘটনা। তার ভাষায় কোরান এধরনের শারীরিক নির্যাতনের অনুমতি ‍দিয়েছে (নিউ ইয়র্ক টাইমস, ২৩ জানুয়ারী, ২০০৭)।   এই অবিশ্বাস্য ঘটনা প্রকাশ পায় মার্চে যখন মহিলার আইনজীবি বিষয়টি প্রকাশ করেন গণমাধ্যমে। দ্রুততার সাথেই ফ্র্যাঙ্কফুর্ট কোর্ট এই বিচারককে এই কেস থেকে অপসারন করে। তাসত্ত্বেও, নিউ ইয়র্ক টাইমস এর প্রতিবেদনটি মন্তব্য করে, এই ঘটনা অন্যান্য নির্যাতনের শিকার মুসলিম মহিলাদের জন্য ব্যপক ক্ষতি করবে: ‍যারা অনেকেই  স্বামীর ‍বিরুদ্ধে আদালতে যেতে এমনিতেই ভয় পায়। সেখানে বেশকিছু ‘ পারিবারিক সন্মানের জন্য হত্যার’ ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে তুর্কী পুরুষদের হাতে নিহত হয়েছে মহিলারা। বিচারক ক্রিষ্টা দাট-ভিন্টার এর উদ্দেশ্য ব্যখা করা হয়েছে ‘সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা’ হিসাবে, কিন্তু আরেকভাবে একে বলা যায় ‘অপমানের পৃষ্ঠপোষকতা’ করা । ‘অবশ্যই আমরা ইউরোপিয়ানরা ‍‌এধরনের ব্যবহার করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা, কিন্তু বৌ-পেটানো ‘‘‘তাদের সংস্কৃতির’’ একটা অংশ, ‘‘তাদের ধর্মে’’এর অনুমতি আছে, আমাদের সেটা ‘‘শ্রদ্ধা’’ করা উচিৎ।

 

Advertisements
গভীরভাবে ধার্মিক একজন অবিশ্বাসী:

One thought on “গভীরভাবে ধার্মিক একজন অবিশ্বাসী:

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s