ঈশ্বর হাইপোথিসিস


পিটার ইয়াঙ এর তোলা রিচার্ড ডকিন্স এর একটি প্রোর্টেট। ( জন্ম: ২৬ শে মার্চ, ১৯৪১);
এই বৃটিশ বিবর্তন জীববিজ্ঞানী আমাদের চিন্তা করার প্রক্রিয়াটি আমুল বদলে দিয়েছেন।

(অনুবাদকের কথা: নীচে ধারাবাহিক খন্ডে খন্ডে লেখা দ্বিতীয় অধ্যায়টির অনুবাদ একসাথে পোষ্ট করলাম। একজায়গায় থাকলে অনুবাদের ভুলগুলো শুধরানো সহজ হবে)

রিচার্ড ডকিন্স এর দি গড ডিল্যুশন : দ্বিতীয় অধ্যায়
The God Delusion by Richard Dawkins
(অনুবাদ প্রচেষ্টা: কাজী মাহবুব হাসান)

  :ঈশ্বর হাইপোথিসিস:

 ‘‘এক যুগের ধর্ম পরবর্তী যুগের আনন্দদানকারী সাহিত্যকর্ম’ – রালফ ওয়ালদো এমারসন

 সকল কাহিনীর মধ্যে ওল্ড টেষ্টামেন্টের ঈশ্বরই হলো তর্কসাপেক্ষে সবচেয়ে বেশী অপ্রীতিকর একটা চরিত্র: হিংসুটে এবং এর জন্য গর্বিত, সংকীর্ণমনা,অন্যায়কারী, ক্ষমা প্রদর্শনে অক্ষম, সবকিছু নিয়ন্ত্রন করার মানসিক দোষে দুষ্ট; একজন প্রতিহিংসা পরায়ন, রক্তপিপাসু জাতিগত বিশোধনকারী; একজন নারী বিদ্বেষী, সমকামীদের প্রতি ঘৃনা পোষনকারী (হোমোফোবিক), বর্ণবাদী, শিশুহত্যাকারী, গনহত্যাকারী, সন্তানহত্যাকারী, বিশ্রী রকমের বিরক্তকর, নিজেকে অতি বড় ভাবার প্রবণতা বা  অতিআত্মম্মন্যতায় আক্রান্ত , স্যাডোম্যাসোকিস্ট (ধর্ষ-মর্ষকামী); খামখেয়ালী পরশ্রীকাতর, দূর্বলের উপর অত্যাচারকারী। আমরা যারা শৈশব থেকে তার কাহিনীর সাথে পরিচিত, এসব ভীতিকর ঘটনার প্রতি তাদের সংবেদনশীলতা হ্রাস পেতে পারার সম্ভাবনা আছে। একজন অবুঝ, যে একটি নিষ্পাপ দৃষ্টিভঙ্গীর দ্বারা আশীর্বাদপুষ্ট, এই বিষয়ে সে একটা অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ এবং সুষ্পষ্ট ধারনা পোষন করতে সক্ষম। উইনস্টোন চার্চিল এর পুত্র রানডলফ সুকৌশলে বাইবেল সম্বন্ধে নিজেকে পুরোপুরি অজ্ঞাত রাখতে পেরেছিল, যতক্ষন না পর্যন্ত, ইভলিন ওয়াহ ও অন্য একজন বন্ধু সামরিক অফিসার, যারা তার সাথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় একই জায়গায় কর্মরত ছিলেন- তারা চার্চিলকে চুপ রাখার জন্য ব্যর্থ প্রচেষ্ঠা হিসাবে তার সাথে বাজী রেখেছিলেন, তিনি পনেরো দিনের মধ্যে বাইবেল পড়ে শেষ করতে পারবেন না: ‘দুর্ভাগ্যজকভাবে যা ঘটলো তা আমরা আশা করিনি। যেহেতু  এটা আগে সে একটুও পড়েনি এবং পড়া মাত্রই ভয়াবহ আনন্দিত হয়েছিল; এবং বারবার বিভিন্ন উদ্ধৃতি জোরে জোরে পড়ে শোনানো শুরু করলো, ‘আমি নিশ্চিৎ, তোমরা জানতে না এই কথাটা বাইবেল থেকে এসেছে’ অথবা শুধু শুধু হাসি আর তালি বাজিয়ে স্বগোতক্তি করতো: ‘ঈশ্বর! ঈশ্বর কি যাচ্ছেতাই রকমের জঘন্য, তাই না!’[১] টমাস জেফারসন-আরো বেশী পড়াশুনা ছিল তার , একই মতামত পোষন করতেন, মোজেস এর ঈশ্বরকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন, ‘ভয়ানক এক চরিত্র– নিষ্ঠুর, প্রতিহিংসাপরায়ন,খামখেয়ালী, অন্যায়কারী’ ।

এরকম একটা সহজ নিশানাকে আক্রমন করা হয়তো সঠিক হচ্ছে না। ঈশ্বর হাইপোথেসিস প্রমান হবে কি, হবে না, তা এর সবচাইতে অপ্রিয় উদহারন, ‍ইয়াওয়ে বা ‍ ‍এর নীরস  বিপরীত খৃষ্টীয় রুপ , ‘ ভদ্র, নম্র ও নরম স্বভাবের জেসাস’ এর  উপর নির্ভর করা উচিৎ না।  ( মানতে হবে এই নীরিহ গোবেচারাব্যাক্তিত্বটি’, জেসাসের চেয়েও তার ভিক্টোরিয়ান অনুসারীদের কাছে বেশী ৠণী); মিসেস সি এফ আলেক্সান্ডার এর ‘ খৃষ্টান সব শিশুরা সবাই তার মত অবশ্যই নম্র, অনুগত, ভালো হতে হবে’ এর চেয়ে বিরক্তিকর ভাবপ্রবন কি কিছু হতে পারে?) আমি ইয়াওয়ে বা জেসাস বা আল্লাহ, বা নির্দিষ্ট কোন দেবতা যেমন, বা’ল, জিউস বা ওটান এর বিশেষ কোন গুনাবলীকে আঘাত করছি না। তার পরিবর্তে ঈশ্বর হাইপোথেসিসকে সঙ্গায়িত করব এমন ভাবে যার পক্ষে আরো খানিকটা বেশী বিতর্ক করা সম্ভব, সেভাবে: এমন একজন অতিমানবীয়, অতিপ্রাকৃত বুদ্ধিমত্তার অস্তিত্ব আছে, যিনি তার ইচ্ছামত এই মহাজগত পরিকল্পনা এবং আমাদের সহ, এর মধ্যে অস্তিত্বশীল সব কিছু সৃষ্টি করেছেন।এই বইটি এর একটি বিকল্প ‍ দৃষ্টিভঙ্গীর স্বপক্ষে আলোচনা করবে। ‘যে কোন সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তা, যা যথেষ্ট পরিমান জটিল এবং সবকিছু পরিকল্পনা ও সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে, তার নিজেরই সৃষ্টি হওয়া সম্ভব শুধুমাত্র  একটি সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার ক্রম বিবর্তনের শেষ উৎপন্ন হিসাবে।  সৃজনশীল বুদ্ধিমত্তা একটি ক্রম বিবর্তন উৎপাদন বিধায় মহাবিশ্বে তার আগমন ঘটবে অবশ্যই  অনেক পরে, সুতরাং সে কোনভাবেই বাকী সবকিছুর পরিকল্পনা ও সৃষ্টি করার জন্য দায়ী হতে পারে না। ঈশ্বর, যে অর্থে সঙ্গায়িত করা হয়েছে তা হচ্ছে: একটি বিভ্রান্তি বা ডিল্যুশন; এবং পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে ক্রমান্বয়ে আরো সুষ্পষ্ট হবে, একটি ভয়ানক ক্ষতিকর  বিভ্রান্তি ।

আশ্চর্য্য হবার কিছু নেই, যার ভিত্তি সুস্পষ্ট প্রমানহীন ব্যক্তিগত কোন গুপ্ত আবিষ্কারের স্থানীয় লোকাচারে, ঈশ্বর হাইপোথেসিসও এর নানা রুপে বিদ্যমান। ধর্মের ইতিহাসবিদরা চিহ্নিত করেছেন এর বিবর্তন , আদিম অ্যানিমিজম বা সর্বপ্রাণবাদ থেকে বহুঈশ্বরবাদ, যেমন, গ্রীক, রোমান, নরওয়েজীয়রা, ও তার থেকে একেশ্বরবাদ যেমন: জুডাইজম ও তার উপজাত খৃষ্টধর্ম ও ইসলাম।

বহুঈশ্বরবাদ বা পলিথেইজম:

ব্যপারটা স্পষ্ট নয়, কেন বহুঈশ্বরবাদ থেকে একেশ্বরবাদ কে ধরে নেয়া উচিৎ একটি স্বতঃসিদ্ধ ক্রম উন্নয়ন হিসাবে। কিন্তু এরকমই একটা ধারনা ব্যাপকভাবে প্রচলিত,  ইবনে ওয়ারাক ( ‘হোয়াই আই অ্যাম নট এ মুসলিম’ এর লেখক) যে কারনেই বুদ্ধিদীপ্ত অনুমান করেছিলেন যে, একেশ্বরবাদ ও শেষ পর্যন্ত তার উত্তরণের পথে আরো একটি ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে নিরীশ্বরবাদে পরিণত হবে। ক্যাথলিক এনসাইক্লোপেডিয়া  বহুঈশ্বরবাদ এবং নিরীশ্বরবাদকে নির্বিকারে একই কাতারে দাড় করিয়ে ভিত্তিহীন আখ্যা প্রদান করেছে : ‘ আনুষ্ঠানিক গোড়া নিরীশ্বরবাদ স্ববিরোধী এবং বাস্তবে কখনোই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারেনি, বহুঈশ্বরবাদও পারেনি একই ভাবে, যদিও সাধারন মানুষের কল্পনাকে তা আলোড়িত করেছে, কিন্তু একজন দার্শনিকের মনকে কখনোই পারেনি সন্তুষ্ট করতে’ [২]।

একেশ্বরবাদীদের উগ্র আত্ম অহংকার অতি-সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত্য ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের চ্যারিটি আইনেও সুস্পষ্ট ছিল, করের আওতামুক্ত অবস্থানের জন্য যা বহুঈশ্বরবাদী সংগঠনগুলোর সাথে বৈষম্যমুলক আচরন করেছে, ফলাফলে একচেটিয়া সুযোগ পেয়েছে একেশ্বরবাদীদের ধর্ম প্রচারণার দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো; এমনকি তারা সুকৌশলে এড়াতেও পেরেছে সরকারের কঠিন তদারকী যা যে কোন ধর্মনিরেপক্ষ সংগঠনগুলোর জন্য বাধ্যতামুলক।আমার একটা বিশেষ লক্ষ্য ছিল, ব্রিটেনের সন্মানজনক হিন্দু সমাজের কোন সদস্যকে রাজী করাবো বহুঈশ্বরবাদীদের বিরুদ্ধে এধরনের অবজ্ঞাসুলভ বৈষম্যকারী আইনের বিরুদ্ধে নাগরিক অধিকার আইনে মামলা করতে।

অবশ্যই তার থেকে অনেক বেশী উত্তম কাজটি হবে, দাতব্য সংস্থার করের আওতামুক্ত অবস্থানের কারন হিসাবে ধর্মীয় প্রচারণার কাজটি সম্পুর্নরুপে পরিত্যাগ করা। এধরনের কর্মকান্ড বন্ধ হলে অনেক উপকার পাবে সমাজ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে, সেখানে যে পরিমান করমুক্ত অর্থ চার্চগুলো শুষে নেয়, এবং সেই অর্থ এমনিতেই ধনী সব টেলিভ্যানজেলিষ্টদের সম্পদ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে চলেছে, অনায়াসে বলা যেতে পারে তার মাত্রা অশ্লীল পর্যায়ে পৌছেছে। উপযুক্তভাবে নামকৃত ওরাল রবার্টস একবার তার টেলিভিশন দর্শকদের বলেছিল যে, ঈশ্বর তাকে হত্যা করবে যদিনা তারা তাকে ৮ মিলিয়ন ডলার না দেন। প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে, তার মুখের কথায় কাজও হয়েছিল, করমুক্ত !  রবার্টস এখন খুবই ভালো আছেন, তুলসা অ্যারিজোনায় ‘ওরাল রবার্টস বিশ্ববিদ্যালয়’ ও ভালো আছে। যার বিভিন্ন ভবনগুলো, মুল্য হবে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার, সরাসরি ইশ্বরের এই নির্দেশনায় নির্মিত হয়েছে: ‘আমার কন্ঠ শোনার জন্য তোমার শিক্ষার্থীদের  গড়ে তোল, আমার কন্ঠ শোনার জন্য, যেখানে, আমার আলো যেখানে ক্ষীন, আমার কন্ঠ দুর্বল, আমার আরোগ্যদানের শক্তি অজানা, পৃথিবীর সর্বশেষ সীমা পর্যন্ত্য, সেখানে যাওয়ার জন্য তাদের প্রস্তুত করো। তাদের কর্ম তোমার কর্মকেও ছাড়িয়ে যাবে এবং এতেই আমি মহাসন্তুষ্ট’।

বিষয়টা নিয়ে ভাবলে দেখা যাবে, আমার কাল্পনিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী সম্ভবত ‘যদি তাদের হারাতে না পারো, তাহলে ‍তাদের সাথে যোগ দাও’ এই ‍যুক্তিটা তার পক্ষে কাজ করাতে উৎসাহী হবেন। তার বহুঈশ্বরবাদ আসলে তো বহুঈশ্বরবাদ না, বরং ছদ্মবেশে একেশ্বরবাদ। সেখানেও কেবল একজনই ঈশ্বর – দেবতা ব্রহ্ম, যিনি সৃষ্টিকর্তা, দেবতা বিষ্ণু, যিনি রক্ষক, দেবতা শিব, যিনি ধ্বংশকারী, দেবী সরস্বতী, লক্ষী, পার্বতী (ব্রহ্ম, বিষ্ণু ও শিব-এর সহধর্মিনী), দেবতা গনেশ (হাতি দেবতা) এবং আরো শত শত দেবদেবী, সবাই একই ঈশ্বরের বহুরুপ বা অবতার।

খৃষ্ট ধর্মানুসারীদের বিষয়টার প্রতি সহমর্মী হওয়া উচিৎ। মধ্যযুগে, রক্তের কথাতো বাদই দিলাম, কয়েকটা নদী সমান কলমের কালি, অপচয় করা হয়েছে ‘ট্রিনিটি’র ‘রহস্য’ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে আর এর ব্যাতিক্রমের ভিন্নমতকে দমন করতে, যেমন, এরিয়ান হেরেসি বা ভিন্নমত। খৃষ্ট জন্ম পরবর্তী চতুর্থ শতাব্দীতে আলেক্সান্দ্রিয়ার ‍এরিয়াস, অস্বীকার করেন, জেসাস ঈশ্বরের ‘কনসাবস্ট্যানশিয়াল’ ( অর্থাৎ একই সাবস্টান্স বা এসেন্স দিয়ে তৈরী)। আশ্চর্য্য ! এর  সম্ভাব্য কি অর্থ হতে পারে, আপনি সম্ভবত জিজ্ঞাসা করতে পারেন? পদার্থ বা সাবস্টান্স ?    ‍কি ‘সাবস্টান্স’? এই মুল বা এসেন্স বলতে কি আসলে আপনি ‍কি বোঝাতে  চাচ্ছেন? ‘খুব সামান্য’ সম্ভবতঃ মোটামুটি একটা উত্তর হতে পারে। তারপরও এই বিতর্ক এক শতাব্দী ধরে খৃষ্টধর্মকে  বিভক্ত করে রেখেছিল। এবং সম্রাট কনস্টান্টিন এরিয়াসের বই এর সব কপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। খৃষ্টধর্মকে বিভক্ত করা এমন তুচ্ছ অযৌক্তিক বিতর্কে –ধর্মতত্ত্বেরনিয়ম চিরকালই এরকম ছিল।

আমাদের (খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী)তাহলে, তিন অংশে বিভক্ত এক ঈশ্বর আছেন নাকি  একের মধ্যে তিন ঈশ্বর ?ক্যাথলিক এনসাইক্লোপেডিয়া  আমাদের জন্য ব্যাপারটা স্পষ্ট করেছে ধর্মতত্ত্বের একটি অসাধারন উৎকৃষ্ট আবদ্ধ যুক্তি বা ক্লোস রিজনিং মাধ্যমে:

ঈশ্বরের একাত্মতায় তিনটি সত্ত্বার অবস্থান, পিতা,পুত্র এবং পবিত্র আত্মা, তিনটি সত্ত্বাই  পরস্পর থেকে সত্যিকার অর্থে পৃথক। ‍ এভাবেই অ্যাথানেসিয়ার ক্রীড এর ভাষা অনুযায়ী : ‘ পিতা ঈশ্বর, পুত্র ঈশ্বর এবং পবিত্র আত্মা ‍ঈশ্বর কিন্তু তা সত্ত্বেও তিন জন ঈশ্বর নেই, একজনই ঈশ্বর।’

যেন  বিষয়টি এতেই যথেষ্ঠ স্পষ্ট হয়নি, ‍ এনসাইক্লোপেডিয়া তৃতীয় শতাব্দীর ধর্মতাত্ত্বিক সেইন্ট গ্রেগরী, দি মিরাকল ওয়ার্কার এর উদ্ধৃতি  উল্লেখ করেছে:

সুতরাং কোন কিছুর সৃষ্টি হয়নি, ‘ট্রিনিটি’র কেউ কারো পরাধীন নয়, এমন কোন কিছু এর  সাথে সন্নিবিষ্টও  হয়নি, যার আগে কোন অস্তিত্ত্ব ছিল না কিন্তু পরবর্তীতে যোগ হয়েছে : সেকারনে পিতা কখনো পুত্র ব্যাতীত ছিল না তেমনই পুত্র ছিল না কখনো পবিত্র আত্মা ছাড়া। এবং এই ট্রিনিটি রুপান্তরিত হয়না এবং সবসময়ই অপরিবর্তনশীল।

যে অলৌকিক কর্মকান্ড ঘটানোর জন্য সেইন্ট গ্রেগরী তার উপাধিটা অর্জন করুক না কেন,আর যাই হোক সেই ‍অলৌকিক ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্তত সত্যিকারের মানসিক সুস্থতা ছিলনা। তার শব্দগুলো সুস্পষ্টভাবে ধর্মতত্ত্বের অস্পষ্টতাপ্রীতি প্রকাশ করে, যা, বিজ্ঞান কিংবা মানুষের জ্ঞানের অন্য যে কোন শাখার মত, গত আঠারো শতাব্দী ধরে একটুও অগ্রসর হয়নি। টমাস জেফারসন প্রায়ই এই ঠিক কথাটা বলতেন, ‘কোন নির্বোধ ধারনার বিরুদ্ধে একমাত্র যে অস্ত্রটি ব্যবহার করা যেতে পারে তা হল ব্যাঙ্গ। যুক্তি প্রয়োগের পূর্বে ধারণাটাকে অবশ্যই সুস্পষ্ট হতে হবে; এবং কোন মানুষেরই ট্রিনিটি সম্বন্ধে সুস্পষ্ট কোন ধারণাই কখনো ছিল না। এটা শুধুমাত্র ধাপ্পাবাজদের ছলচাতুরী যারা নিজেদের জেসাসের ‍পুরোহিত বলে ডাকে’ ’ ।

আরেকটা বিষয় নিয়ে মন্তব্য না করে পারছিনা তা হলো, ধার্মিকরা অতি সুক্ষতম বিষয়ে ‍অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসের সাথে মন্তব্য করে, যে বিষয়ে তাদের কোন প্রমান নেই এবং কোন প্রমানই থাকতে পারেনা। ধর্মেতত্ত্বের মতামতের পক্ষে কোন প্রমান নেই যা তার ভিত্তি হতে পারে, এই সত্যটাই হয়তো সামান্যতম ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ধর্মের স্বভাবসুলভ কঠোর অসহিষ্ণুতা পোষন করার কারন। বিশেষকরে এটা দেখা যায় ট্রিনিটারিয়াজমের ক্ষেত্রে।

জেফারসন এই মতবাদ নিয়ে অনেক ব্যাঙ্গ করেছেন, ক্যালভানিজম এর সমালোচনা করার সময় মন্তব্য করেন: ‘এখানে তিন জন ঈশ্বর বিদ্যমান’; খৃষ্টধর্মের রোমান ক্যাথলিক শাখা এই বহুঈশ্বরবাদ এর নিয়ে ‍বার বার নাড়াচাড়া করে বিষয়টিকে অনেক বেশী ফাপিয়ে ফেলেছে।  ট্রিনিটি র (দের?) সাথে যোগ দিয়েছেন মেরী, ‘স্বর্গের রাণী’, শুধুমাত্র নাম ছাড়া পুরো অর্থে একজন দেবী, যিনি মানুষের প্রার্থনার নিশানা হিসাবে ঈশ্বরকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছেন নিকটবর্তী দ্বিতীয় স্থানে । প্রায় দেবদেবীর সম্ভার আরো স্ফীত হয়েছে বহু সেইন্টের যোগদানে, যাদের আছে অন্যের পক্ষ হয়ে ঈশ্বরের কাছে আবেদন করার বিশেষ ক্ষমতা।যা তাদের যদি অর্ধদেবতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত যদি না করেও থাকে,তারা তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হিসাবে ভক্তদের কাছে বিশেষ মর্যাদা আদায় করে নিয়েছেন। ক্যাথলিক কমিউনিটি ফোরাম আমাদের সাহায্যকল্পে প্রায় ৫১২০ জন সেইন্টের নাম, তাদের বিশেষ বিশেষ ক্ষমতার ক্ষেত্র অনুযায়ী  ‍তালিকাভুক্ত করেছে [৩], তাদের মধ্যে আছে,পেটে ব্যাথা হলে, নির্যাতনের শিকার মানুষদের জন্য, ক্ষুধাহীনতা, অস্ত্রব্যাবসায়ী, কামার, হাড় ভাঙ্গলে, বোমার কারিগর,পেটের অসুখ, এর বেশী আপাতত আর আগানো গেল না। এছাড়া আমাদের নয়টি অর্ডারে সাজানো চার স্তরের এনজেলিক (ফেরেশতাগন) হোষ্টরাও আছেন: সেরাফিম, চেরুবীম, থ্রোনস, ডমিনিয়নস, ভার্চু, পাওয়ারস, প্রিন্সিপালিটিস, আর্কঅ্যান্জ্ঞেলস (সবার প্রধান যারা) এবং আছে সাধারন ফেরেশতার দল, যার মধ্যে আছে আমাদের প্রিয় বন্ধু, সদাজাগ্রত, গার্ডিয়ান অ্যান্জ্ঞেলস বা অভিভাবক ফেরেশতা। ক্যাথলিকদের পুরাণ কাহিনীর যে জিনিসটা আমাকে মনে দাগ কাটে সেটা কিছুটা এর রুচিহীন অসারতার জন্য, ‍কিন্তু মুলতঃ যে কপট নির্লিপ্ততার সাথে এই সব মানুষগুলো ক্রমান্বয়ে বানোয়াট খুটিনাটিগুলো যোগ করেছে । সব কিছু অতি নির্লজ্জভাবে উদ্ভাবিত।

গত বেশ কয়েকটা শতাব্দী যোগ করলে দেখা যায়, দ্বিতীয় পোপ জন পল  একাই তার সব পূর্বসুরীদের সবার চেয়ে বেশী সেইন্ট তৈরী করেছিলেন। কুমারী মাতা মেরীর বিশেষ ভক্ত ছিলেন তিনি।  বহুঈশ্বরবাদের প্রতি তার বিশেষ আকর্ষন নাটকীয়ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, যখন ১৯৮১ সালে রোমে তাকে একজন  আততায়ী হত্যার চেষ্টা করে। মৃত্যুর হাত থেকে তার বেচে আসার জন্য তিনি মনে করেন, আওয়ার লেডী অফ ফাতিমার প্রত্যক্ষ অবদান ছিল (পর্তুগালের ফাতিমায় মা মেরীর অশরীরি রুপ দেখা গিয়েছিল বলে দাবী করে তিন জন স্থানীয় মেষপালক শিশু):  মাতৃসুলভ হাত বুলেটটির গতিপথ ‍নিয়ন্ত্রন করেছিল।একটা বিষয় অবশ্য না ভেবে পারা যাচ্ছে না, তিনি কেন বুলেটটা পুরোপুরি লক্ষভ্রষ্ট করে দিলেন না। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, যে শল্যচিকিৎসকের দলটি তার শরীরে ছয় ঘন্টা অস্ত্রোপচার করেছে তারাও আংশিকভাবে এই কৃতিত্বের দ্বাবীদার; কিন্তু হয়তো অস্ত্রোপচারের সময় তাদের হাতকে নিয়ন্ত্রন করেছেন তার মাতৃসুলভ হাত। কিন্তু উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, পোপের মতে, তিনি শুধুই ‘আমাদের লেডী’ কুমারী মেরী নন, যিনি এই বুলেটের গতিপথ বদলে দিয়েছেন, বরং সুনির্দিষ্টভাবে ‘আওয়ার লেডী অফ ফাতিমা’; ধরে নেয়া যাতে পারে, ‘আওয়ার লেডী অফ লুর্ডস’, ‘আওয়ার লেডী অফ গুয়াদালুপ’, ‘আওয়ার লেডী অফ মেডজুগরজে’, ‘আওয়ার লেডী অফ জেইতুন’, ‘আওয়ার লেডী অফ গারাবানডাল’ এবং ‘আওয়ার লেডী অফ নকস’ এসময়ে অন্য কাজে ব্যাস্ত ছিলেন।

গ্রীক, রোমান আর ভাইকিং রা কেমন করে এই বহুধর্মতত্ত্বীয় ধাঁধার সাথে সমঝোতা করেছিল? ভেনাস কি আফ্রোদাইতির আরেকটি নাম শুধু নাকি তারা আলাদা দুইজন প্রেমের দেবী? হাতুড়ী সহ থর কি ওটান এরই অবতার নাকি আলাদা দেবতা? কার কি আসে যায়  এতে?   এক কল্পকাহিনী থেকে বহু কল্পকাহিনীর মধ্যে পার্থক্য নিয়ে মাথা ঘামানোর জন্য জীবনটা অনেক ছোট। বহুঈশ্বর নিয়ে ইঙ্গিত করার পর, কোন বিশেষ একজনকে অবজ্ঞা করার অভিযোগ এড়াতে এ বিষয়ে আমি আর বেশী কিছু বলবো না। সংক্ষিপ্ত করার স্বার্থে, আমি সব দেবদেবীদের , তা সেটা বহু বা এক ঈশ্বরবাদ, যাই হোক না কেন, আমি শুধু ‘ঈশ্বর’ বলেই সম্বোধন করবো। আরেকটা বিষয়েও আমি সচেতন আছি তা হলো আব্রাহাম এর ঈশ্বর ( একটু রেখে ঢেকে বলতে গেলে), আগ্রাসী পুরুষ, ‍আর সে কারনে   সর্বনাম ব্যবহার করার অর্থে ‍আমি ঈশ্বরকে পুংলিঙ্গ হিসাবে ধরে নেব। অনেক পরিনত আর জটিল ধর্মতাত্ত্বিকরা দাবী করেন ঈশ্বরের কোন লিঙ্গ নেই, অপরদিকে নারীবাদী ধর্মতাত্ত্বিকরা  ঐতিহাসিক অবিচারকে সঠিক করার লক্ষ্যে তাকে নারী হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু অস্তিত্বই নেই এমন কিছু নারী না পুরুষ কি আসে যায় তাতে? আমার মনে হয়, ধর্মতত্ত্ব আর নারীবাদের খামখেয়ালী বোকামীর অবাস্তব মিলনক্ষেত্রে সত্যি সত্যি অস্তিত্ত্ব হয়তো বা লিঙ্গ অপেক্ষা কম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট হতে পারে।

আমার অজানা নেই, যে ধর্মের সমালোচকরা, ধর্মীয় ঐতিহ্যর আর বিশ্ব-দর্শন এর উর্বর বৈচিত্রময়তা যাকে ধার্মিকতা বলে, তার সঠিক মুল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন এমন অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন। নৃতত্ত্ববিদ্যার উল্লেখযোগ্য কাজ, স্যার জেমস ফ্রেজারের ‘গোল্ডেন বোহ’ থেকে প্যাসকাল বয়েরের ‘রেলিজিয়ন এক্সপ্লেইনড’ অথবা স্কট আটরানের ‘ ইন গডস উই ট্রাস্ট’ চমৎকারভাবে লিপিবদ্ধ করেছে অদ্ভুত কুসংস্কারের আর আচারের ফেনোমেনোলজী[৫]।  এই বইগুলো পড়ুন আর বিস্মিত হোন মানুষের সহজ বিশ্বাসপ্রবণতার ব্যপকতা দেখে।

কিন্তু  এই বইয়ের উদ্দেশ্য ভিন্ন। যে কোন রুপের অতিপ্রাকৃততাকে আমি খুবই অপছন্দ করি,  কিন্তু আলোচনাকে প্রাসঙ্গিক রেখে অগ্রসর হবার সবচেয়ে কার্য্যকর পথ হবে, অতিপ্রাকৃততার যে রুপটার সাথে আমার পাঠকদের পরিচিত হবার সম্ভাবনা বেশী, যা আমাদের সবধরনের সমাজের উপর ভয়াবহ প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে, সেটার উপরই বেশী গুরুত্ব দেয়া। আমার বেশীরভাগ পাঠকই এসময়ের তিনটি ‘মহান’ একেশ্বরবাদী ধর্মের (চারটি, যদি মর্মনিজমকে ধরা হয়)  মধ্যে কোন না কোন একটিতে প্রতিপালিত হয়েছেন। এই ধর্ম তিনটির প্রত্যেকটি তাদের উৎসে‍ সেই পূরাণের মহাপিতা আব্রাহামকে খুজে পাবে। এবং এই পারিবারিক ঐতিহ্যেগুলোর ধারা মনে রাখতে পারলে  এই বইটার বাকী অংশ পড়তে সুবিধা হবে।

এখানে  একটা উপযুক্ত মুহুর্ত হতে পারে একটা আগাম প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়া, নাহলে, দিনের পর যেমন রাত্রি আসে তেমনই আমি নিশ্চিৎ অবশ্যই কেউ না কেউ কোন পর্যালোচনায় এই বইটার প্রতি অবশ্যম্ভাবী কিছু দ্রুত মন্তব্য করতে পারে : ‘ ডকিন্স যে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন না, সেই ঈশ্বরকে আমিও বিশ্বাস করিনা। আকাশের মধ্যে বসবাসকারী লম্বা দাড়িওয়ালা বুড়ো মানুষকে আমি বিশ্বাস করিনা’; ঐ বুড়ো মানুষটা অপ্রাসঙ্গিক একটি মুল বিষয় থেকে মনোযোগটাকে সরানোর কৌশল, এবং তার দাড়ি যেমনই লম্বা তেমন বিরক্তিকর। সত্যি, মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করাটা অপ্রাসঙ্গিকতা থেকে আরো অসহনীয়। এর সেই গুরুত্বহীন তুচ্ছতা সুপরিকল্পিতভাবে পাঠকের মনোযোগ কে আসল সত্য থেকে বিক্ষিপ্ত করবে, তা হলো এই বক্তা আসলে যেটা বিশ্বাস করে তা কিন্তু অনেক কম তুচ্ছ। আমি জানি আপনি মেঘের উপর বসে থাকা কোন দাড়িওয়ালা বুড়োকে বিশ্বাস করেন না, সুতরাং এটা নিয়ে কোন সময় নষ্ট করার দরকারই নেই। আমি ঈশ্বর বা ঈশ্বরদের কোন বিশেষ একটি রুপকে আক্রমন করছিনা, আমি ঈশ্বর, সকল ঈশ্বরদেরকে আক্রমন করেছি, যেকোনকিছু এবং সবকিছু যা অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক, যেখানে বা যে সময়েই তারা ছিলেন বা ভবিষ্যতে তৈরী হবেন’।

একেশ্বরবাদ বা  মনোথেইজম

আমাদের সংস্কৃতির/সভ্যতার কেন্দ্রে সবচেয়ে বড় অনুল্লেখযোগ্য ক্ষতিকারক বিষয়টি হলো একেশ্বরবাদ। বর্বর সেই ব্রোন্জ্ঞ যুগের বই যার নাম ‘ওল্ড টেষ্টামেন্ট’, এর থেকেই তিনটি মানবতা বিরোধী ধর্মের বিবর্তন হয়েছে।   এই সবগুলোই  ‘‘ আকাশ-দেবতা’ র ধর্ম। প্রত্যেকটি আক্ষরিকভাবে ‍পিতৃতান্ত্রিক – ঈশ্বর মহান অসীমক্ষমতাধর পিতা –  একারনেই আকাশ-দেবতা ও তার পুরুষ প্রতিনিধি দ্বারা আক্রান্ত সকল দেশে ২০০০ বছর ধরে নারীবিদ্বেষ বিদ্যমান। – গোর ভিদাল

 তিনটি আব্রাহামীয় ধর্মের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন এবং সুস্পষ্টভাবে বাকী দুটির পূর্বসুরী, হলো জুডাইজম বা ইহুদীবাদ: আদিতে মুলতঃ কাল্ট বা গোত্র যারা একজন ভয়ঙ্কর বিরক্তিকর ঈশ্বর, যে যৌনতা সংক্রান্ত নানাবিধ বাধানিষেধ নিয়ে মানসিক বিকারগ্রস্থ, পোড়া মাংশের গন্ধযুক্ত, প্রতিদ্বন্দী অন্য ঈশ্বরদের উপর নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে সদা তটস্থ, যিনি শুধু মাত্র একটি নির্বাচিত মরু জাতির পৃষ্ঠপোষক। প্যালেষ্টাইনে রোমের শাসনামলে টারসাসের পল খৃষ্টধর্মের পত্তন করেন, এর চেয়ে কম নিষ্ঠুর, আরেকটু সার্বজনীন ইহুদীবাদের একটি একেশ্বরবাদী অংশ রুপে। ‍

নতুন এ‌ই ধর্ম ইহুদীদের থেকে আরো বাকী সারা বিশ্বব্যাপী বহির্মুখী ছিল। কয়েক শতাব্দী পরে মোহাম্মদ ও তার অনুসারীরা আবারো মুল ইহুদীবাদের আপোষহীন একেশ্বরবাদীতায় ফিরে যায়,  ‍কিন্তু  এর নির্দিষ্ট গোত্রকেন্দ্রিকতাকে পরিত্যাগ করে প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম, নতুন প্রবিত্র গ্রন্থ কোরান উপর ভিত্তি করে, যা বিশ্বাসের প্রসারে সামরিক শক্তি প্রয়োগের শক্তিশালী মতবাদ যোগ করে। খৃষ্টধর্মও প্রচারিত হয়েছিল তলোয়ারের সাহায্যে, প্রথমতঃ রোমানদের হাতে, যখন সম্রাট কনস্টান্টিন একে একটি অদ্ভুত গোষ্ঠির আচার থেকে উত্তীর্ণ করে রাষ্ট্রীয় ধর্মের মর্যাদা দেন। পরবর্তীতে তলোয়ার ধরে ক্রসেডাররা এবং তাদের পর কনকুইস্টাডোররা, ও অন্যান্য ইউরোপীয় আগ্রাসনকারী ও বসতি স্থাপনকারীরা, মিশনারীদের সহায়তায় । আমার প্রায় সব ব্যাখার জন্য, তিনটি আব্রাহামীয় ধর্মকে একই রকম ধরে নেয়া যেতে পারে। আলাদাভাবে উল্লেখ না করলে,এখানে আমি মুলতঃ খৃষ্টধর্ম নিয়ে কথা বলবো, কিন্তু শুধুমাত্র এর সাথে আমি একটু বেশী পরিচিত সে কারনে। আমার উদ্দেশ্য অনুযায়ী মিলটাই বেশী জরুরী অমিল অপেক্ষা। অন্য ধর্মগুলো যেমন, বুদ্ধধর্ম, কনফুসিয়ানবাদ নিয়ে কোন আলোচনায় যেতে চাইনা। আসলে, এই সব ধর্মগুলো আসলে ধর্ম হিসাবে না চিন্তা করে এদেরকে বরং কোন নৈতিক ব্যবস্থা বা জীবন দর্শন হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য কিছু বলা যেতে পারে।

ঈশ্বর হাইপোথেসিস এর খুব সরল যে সংজ্ঞা দিয়ে আমি শুরু করেছি, সেখানে আব্রাহামীয় ঈশ্বরকে খাপ খাওয়াতে হলে আমাক এর সাথে আরো বিস্তারিক ব্যাখ্যা যোগ করতে হবে।  তিনি শুধু এই মহাবিশ্ব সৃষ্টিই করেননি, তিনি তারমধ্যে  বা হয়তো এর বাইরে ( এটা বলতে যা বোঝাতে চায় ধর্ম) ব্যক্তিগত ঈশ্বর হিসাবে বসবাসও করছেন, এবং  ইতিপুর্বে উল্লেখিত করা হয়েছে এমন অনেক অপছন্দনীয় মানবিক গুনাবলীও ধারন করেন।

ব্যক্তিগত গুনাবলী, তা ভালো কিংবা খারাপ যাই হোক না কেন, তা ভলতেয়ার এবং টমাস পেইনের ডেইস্ট বা একাত্মবাদী ঈশ্বরের কোন অংশ না। ওল্ড টেষ্টামেন্টে বর্ণিত মানসিক বিকারগ্রস্থ দুষ্কৃতকারীর তুলনায় উনবিংশ শতাব্দীর এনলাইটেনমেন্ট এর সময় একাত্মবাদী বা ডেইস্টদের ঈশ্বর পুরোপুরি আরো মহান একটি সত্ত্বা: তার মহাজাগতিক সৃষ্টির সুযোগ্য সৃষ্টিকর্তা, মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন নিয়ে যার কোন মাথাব্যাথা নেই, আমাদের ব্যক্তিগত চিন্তা, আশা আকাঙ্খা থেকে তিনি সম্পুর্নভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছেন বা আমাদের নোংরা পাপ এবং অস্পষ্ট নিজমরে বিড়বিড় করে বলা অনুশোচনা নিয়ে আদৌ চিন্তিত নন। একাত্মবাদীদের ঈশ্বর একজন পদার্থবিজ্ঞানী, তার হাতেই পদার্থবিদ্যার শুরু ও শেষ, শীর্যতম, আলফা এবং ওমেগা গনিতজ্ঞ, মহিমান্বিত পরিকল্পনাকারী এবং শিল্পী, এখন অতি দক্ষ প্রকৌশলী যিনি মহাবিশ্বের সকল আইন এবং ধ্রুব নির্দিষ্ট করেছেন, এবং তাদের অতি অসাধারন দক্ষতায় এমন সুক্ষ মাত্রায় সাজিয়েছেন এবং প্রাকধারনা নিয়ে বিস্ফারিত করেছেন, যাকে আমরা এখন অতি উষ্ণ বিগ ব্যাং বলছি। এরপর তিনি অবসর গ্রহন করেন এবং তার সৃষ্টির সাথে আর কোন যোগাযোগই রাখেননি। যখন শক্ত বিশ্বাসের প্রশ্ন আসে একাত্মবাদীরা নীরিশ্বরবাদীদের থেকে আলাদা কিছুনা  বলে অভিযুক্ত হন।  ফ্রি থিংকার: এ হিস্টোরী অব আমেরিকার সেকুলারিজম এ সুজান জ্যাকোবী দুর্ভাগা টম পেইনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত কতগুলো দুর্নাম এর তালিকা করেছিলেন:  জুডাস, সরীসৃপ, শুকর, পাগলা কুত্তা, মহা জানোয়ার, অসভ্য এবং অবশ্যই অবিশ্বাসী। তার একসময়ের রাজনৈতিক সুহৃদরা তার অ খৃষ্টীয় মনোভাবের জন্য বিব্রত হতেন। অসহায় অবস্থায় হয়ে মারা যান টম পেইন, শুধু ব্যতিক্রমী জেফারসন ছাড়া আর কেউ তার পাশে ছিল না। ইদানীং এত বেশী পট পরিবর্তন হয়েছে যে, আগের মত আর কেউই ডেইষ্টদের নীরিশ্বরবাদীদের সাথে এক কাতারে দাড় করাবে না বরং ঈশ্বরবাদীদের সাথেই তাদের একই ভাবে দেখবে। কারন, সর্বোপরি তারাও তো ঈশ্বরবাদীদের মত সর্ব্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তার একজন সত্ত্বায় বিশ্বাস করে, যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন।

ধর্মনিরপেক্ষবাদ বা সেক্যুলারিজম, যুক্তরাষ্ট্রের জাতির পিতারা এবং ধর্ম

অনেকটা প্রথাসিদ্ধ ভাবে অনুমান করা হয় অ্যামেরিকা প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতারা ছিলেন ডেইষ্ট বা একাত্মবাদী। সন্দেহ নেই অনেকেও তাই ছিলেন, যদিও বিতর্ক আছে, এদের মধ্যে সবচেয়ে মহান ছিলেন যারা, তারা হয়তো ছিলেন নিরীশ্বরবাদী । সমসাময়িক সময়ের প্রেক্ষাপটে ধর্ম নিয়ে তাদের লেখা পড়লে কোন সন্দেহর অবকাশ থাকে না, যে তাদের বেশীর ভাগই এই সময়ে নিরীশ্বরবাদী‍ চিহ্নিত হতেন।  কিন্তু সেই সময়ে তাদের নিজেদের ধর্মবিশ্বাস যাই হোক না কেন, তারা গোষ্ঠিগত ভাবে নিসন্দেহে ধর্মনিরপেক্ষবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।  এই অংশে আমি এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো। শরু করছি ১৯৮১ সালে সিনেটর ব্যারী গোল্ডওয়াটার এর হয়ত একটা চমক লাগানো উদ্ধৃতি দিয়ে, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এই অ্যামেরিকার রক্ষণশীলতার নেতা প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী কত দৃঢ় তার বিশ্বাসে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার ধর্মনিরেপেক্ষতান ঐতিহ্য সম্মুন্নত রাখার প্রত্যয়ে:

 নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসের মত মানুষের আর তেমন কোন অনঢ় অবস্থান নেই। যীশু অথবা ঈশ্বর অথবা আল্লাহ্ অথবা যে নামেই পরিচিত হোক এই মহাশক্তিশালী সত্ত্বা, যে কোন বিতর্কে  এদের মত ক্ষমতাশালী আর কিছুকে  মিত্র বলে কেউ দাবী করতে পারেনা। কিন্তু অনেক শক্তিশালী অস্ত্রের মত ঈশ্বরের নাম নিজের পক্ষে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া উচিৎ। আমাদের সারা দেশজুড়ে যে ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিস্তার লাভ করছে তারা তাদের ধর্মীয় প্রভাব খুব একটা বিচক্ষনের মত ব্যবহার করছে না। তারা দেশ পরিচালনাকারী নেতাদের শতকরা একশত ভাগ তাদের অবস্থান অনুসরন করার জন্য জোর খাটাচ্ছে। কারো যদি এইসব ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সাথে নির্দিষ্ট কোন নৈতিক বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হয়, তারা অভিযোগ করে; ভোট কিংবা অর্থ সাহায্য দুটোই প্রত্যাহার করার হুমকি দেয় । আমি আসলেই সারা দেশজুড়ে এইসব রাজনৈতিক ধর্মপ্রচারকদের উপর বিরক্তির চরম সীমায় পৌছে গেছি, যারা নাগরিক হিসাবে আমাকে বলছে, আমাকে নীতিবান মানুষ হতে গেলে আমাকে অবশ্যই এ বি সি এবং ডি কে বিশ্বাস করতে হবে। এরা আসলে নিজেদের কি মনে করে?  এবং কেমন করেই বা তারা মনে করে,আমার উপর তারা তাদের নৈতিক মুল্যবোধ চাপিয়ে দেবার অধিকার আছে বলে দাবী করতে পারে; একজন আইনপ্রণেতা হিসাবে আমি আরো ক্ষুদ্ধ হই যখন প্রত্যেকটা ধর্মগোষ্ঠীর হুমকি সহ্য করতে বাধ্য হই, যারা ভাবে তাদের কোন ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকার আছে সিনেটের যে কোন অধিবেশনে আমার ভোট নিয়ন্ত্রন করার। আমি তাদের সতর্ক করে দিতে চাই আজ; আমি তাদের সর্বত্র প্রতিরোধ করবো যদি তারা তাদের নৈতিক বিশ্বাস সকল আমেরিকানদের উপর চাপিয়ে দেয় রক্ষণশীলতার দোহাই দিয়ে।(৬)

নিজেদের স্বপক্ষে ইতিহাসকে স্বাক্ষী করার প্রচেষ্ঠায় জাতির পিতাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বর্তমানে আমেরিকায় দক্ষিনপন্হীদের প্রচারকদের কাছে বেশ উৎসাহব্যাজ্ঞক একটি বিষয়। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতটা আসলে সত্যি, আমেরিকা খৃষ্টানদের দেশ হিসাবে পত্তন হয়নি, প্রথম তা সুষ্পষ্ট উল্লেখিত হয় ত্রিপোলী চুক্তিতে (ট্রিটি অব ত্রিপোলী) , ১৭৯৬ তে যা জর্জ ওয়াশিংটন সময়ে  রচনা করা হয়, ১৭৯৭ সালে জন অ্যাডামস যা স্বাক্ষর করেন:

যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রের সরকার কোন অর্থেই খৃষ্ট ধর্মের উপর ভিত্তি করে স্থাপিত হয়নি, এবং যেহেতু এর মধ্যে মসুলমানদের আইন, ধর্ম, শান্তির বিরুদ্ধে কোন ধরনের শত্রুতা নেই, এবং পূর্বেই বলা হয়েছে  মোহাম্মদের অনুসারী কোন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোন সময়ই কোন যুদ্ধ বা শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করেনি; উভয় পক্ষ ঘোষনা করছে যে,ধর্মীয় মতামতের কারনে উদ্ভুত কোন ঘটনাই দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপুর্ণ সম্পর্কে কখনই কোন বিঘ্নতা সৃষ্টি করবে না।

এই উদ্ধৃতির প্রথমাংশ ওয়াশিংটনের বর্তমান ক্ষমতাশীনদের মধ্যে রীতিমত শোরগোল ফেলে দিত সন্দেহ নেই কোন, কিন্তু এড বাকনার বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রমান করেছেন,সেই সময় এ বিষয় নিয়ে না রাজনীতিবিদ  কিংবা জনগন,কারো মধ্যে কোন মতবিরোধ দেখা যায়নি [৭]; যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের প্যারাডক্স এবং বিপরীতমুখীতা প্রায়ই দেখা যায়,ধর্মনিরপেক্ষবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা  এই দেশটি এখন খৃষ্টজগতের সবচেয়ে বেশী ধর্মনির্ভর রাষ্ট্র, অপরদিকে ইংল্যান্ড, যেখানে প্রতিষ্ঠিত চার্চ-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র, সবচাইতে কম ধর্মনির্ভর রাষ্ট্রর মধ্যে একটি । আামি প্রায়ই প্রশ্নটা করি, কেন এমন হলো?  এবং এর উত্তর আমার জানা নেই। আমার মনে হয়, সম্ভবত এই পরিস্থিতি  হতে পারে: ইংল্যান্ড, ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, তার আন্তবিশ্বাস এবং গোত্রগত ধর্মীয় সহিংসতার ভয়ঙ্কর ইতিহাসে, প্রটেষ্টান্ট আর ক্যাথলিকরা পালাক্রমে প্রাধান্য বিস্তার করে পরস্পরকে হত্যা করেছে। আরেকটি ব্যাখার উৎপত্তি হলো একটি পর্যবেক্ষন, আমেরিকা প্রধানতঃ অভিবাসীদের সৃষ্টি একটি জাতি, এক সহকর্মী আমাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, অভিবাসীরা, ইউরোপে তাদের সম্প্রসারিত পরিবার, সামাজিক নিরাপত্তা আর স্থিতিশীলতা থেকে শিকড়চ্যুত হয়ে প্রবাসে ফেলে আসা স্বজনদের বিকল্প হিসাবে হয়তো চার্চকেই বেশী আপন করে নিতে পারে; অবশ্যই কৌতুহলোদ্দীপক একটা ধারনা যা আরো গবেষনার দাবীদার। কোন সন্দেহ নেই আমেরিকায় অনেকেই তাদের চার্চকে স্থানীয় ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসাবে মনে করে, যার আসলেই সম্প্রসারিত পরিবারের মত বেশ কিছু গুনাবলী আছে। আরো একটি হাইপোথেসিস হলো প্যারাডক্সীয়ভাবে আমেরিকার ধর্মীয় উদ্দীপনার উৎস দেশটির সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। যেহেতু আমেরিকা আইনগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, ধর্ম সম্পুর্নভাবে পরিনত হয়েছে স্বাধীন উদ্যোগে; প্রতিদ্বন্দী চার্চগুলো একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে কংগ্রেগেশনের আকৃতি বা সদস্য সংখ্যা বাড়াতে, বলাবাহুল্য সেই সাথে মোটা উপার্জনের ও কোন অংশেই কম নয়। এই প্রতিযোগীতা চলে বাজারের আক্রমনাত্মক ক্রয়-বিক্রয়ের বা মার্কেটিং কৌশলের মতই। সাবানের গুড়া বিক্রী যেমন করে চলে, ঈশ্বরের ক্ষেত্রেও তেমন। আর এর ফলাফল বর্তমানে প্রায় কম শিক্ষিত শ্রেনীর মধ্যে বিস্তৃত ব্যপক আকারের ধর্মীয় উন্মাদনা। অপরদিকে  ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত চার্চের অভিরক্ষনে ধর্ম সামাজিক আচারের চেয়ে খুব বেশী কিছু না, আদৌ একে ধর্মীয় একটি বিষয় হিসাবে সহজে চিহ্নিত করা যাবে না। গাইলস ফ্রেজার একজন অ্যাংলিক্যান ভাইকার (ধর্মযাজক) ও  একই সাথে অক্সফোর্ডে দর্শনের টিউটর, এই ইংরেজ আচারের সুন্দর ব্যাখা দিয়েছিলেন গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি লেখায়, যার শিরোনাম, দি এস্টাবলিশমেন্ট অফ দি চার্চ অব ইংল্যান্ড টুক গড আউট অ্ফ দি রেলিজিয়ন বাট দেয়ার আর রিস্ক ইন মোর ভিগোরাস অ্যাপ্রোচ টু ফেথ:

একটা সময় ছিল যখন গ্রামের ভাইকার ইংরেজী নাটকের নিয়মিত চরিত্র ছিল, এই চা-পানকারী, নীরিহ, ক্ষ্যাপাটে, পালিশ করা জুতা পরা মানুষটা তার ভদ্র ব্যবহার সহ এমন একটি ধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করত, যা আদৌ ধর্মপরায়ন না এমন ধরনের মানুষরা তেমন কোন অসস্তি বোধ করত না। তিনি আদৌ ধর্মনাশ হচ্ছে বলে অতিরিক্ত চিন্তিত হতেন না বা আপনাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে জিজ্ঞেস করতেন না, আপনি কি রক্ষা পেতে চান। কোন সর্বশক্তিমান এর পক্ষে চার্চের পালপিট থেকে ধর্মযুদ্ধ শুরু করা বা রাস্তার পাশে বোমা পেতে রাখাতো বহু দুরের কথা।

(বেটজেমান এর ‘আমাদের পাদ্রী’ র ছায়া আছে এই বর্ণনায়, প্রথম অধ্যায়ের শুরুতে আমি যে উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম); ফ্রেজার আরো বলেন যে, এই ভদ্র ভাইকার আসলে এক বিশাল প্রকৃতঅর্থে বিশাল সংখ্যক ইংরেজদের জন্য খৃষ্টধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করেছে। তিনি তার রচনাটি শেষ করেন দুঃখ প্রকাশ করে যে  ইদানীং ধর্মকে পুনরায় বেশী গুরুত্ব দেবার প্রবণতা লক্ষ্য করা করা যাচ্ছে এবং তার শেষ বাক্যটি ছিল সাবধানবানী: ‘চিন্তার বিষয় হল, কয়েক শতাব্দী ধরে সুপ্ত ইংরেজদের ধর্মীয় উন্মাদনার দানবটাকে না আমরা আবার প্রাতিষ্ঠানিক বাক্স থেকে মুক্ত করে দেই।’

বর্তমান সময়ের  এই আমেরিকায় ধর্মীয় উন্মত্ততার দানবের প্রতাপ সর্বত্র এবং যা অবশ্যই জাতির পিতাদের ভীত সন্ত্রস্ত করতো।   এই বৈপরীত্যকে মেনে নেয়া কিংবা তাদের সৃষ্ট সংবিধানকে অভিযুক্ত করা সঠিক না ভুল, যাই হোক না কোন, যুক্তরাষ্ট্রের জাতির পিতারা সন্দেহাতীতভাবে ধর্মনিরপেক্ষবাদী ছিলেন, যারা বিশ্বাস করতেন ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক রাখা উচিৎ, আর এটাই তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে, যারা এর ব্যতিক্রমকে প্রতিবাদ করছে তাদের পক্ষে; যেমন, সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে টেন কমান্ডমেন্ডের উদ্দেশ্য প্রনোদিত প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে। ধারনা করতে ইচ্ছা হয়, প্রতিষ্ঠাতাদের কেউ কেউ হয়ত একাত্মবাদ বা ডেইজম এর বিশ্বাসকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন, হয়তো তারা ছিলেন অ্যাগনষ্টিক বা অজ্ঞেয়বাদী অথবা এমনকি পুরোপুরি নিরীশ্বরবাদী? যাকে আজকের যুগে আমরা অ্যাগনোষ্টিকবাদ বলি, জেফারসনের নীচের লেখাটির সাথে তার কোন পার্থক্য করা যায় না।

নিরাবয়ব বায়বীয় কোন কিছুর অস্তিত্ত্ব নিয়ে কথা বলাই অর্থহীন।  মানুষের আত্মা,ফেরেশতা,ঈশ্বর আবয়বহীন বলাই মানে বলা এর অস্তিত্ত্বহীনতাকে মেনে নেয়া অর্থাৎ আসলেই কোন ঈশ্বর নেই, নেই কোন ফেরেশতা বা আত্মা। আর কোনভাবেই এর পক্ষে যুক্তি দাড় করানো সম্ভব না যদি না, স্বপ্ন আর ভৌতিক জগতের অতল গহবরে নিজেকে নিমজ্জিত না করি। যাদের অস্তিত্ত্ব থাকতে পারে কিন্তু আমার কাছে যার কোন প্রমান নেই, এমন কিছু নিয়ে নিজেকে যন্ত্রণা আর দুর্ভোগ দেয়া ছাড়াই, আমি সন্তুষ্ট আর যথেষ্ট ব্যস্ত আছি অন্য অনেক বিষয় নিয়ে।

ক্রিষ্টোফার হিচেন্স, তার রচিত জেফারসনের জীবনী, ’থমাস জেফারসন:অথর অফ অ্যামেরিকা’ তে ধারনা করেন, সম্ভবতঃ জেফারসন নাস্তিক ছিলেন, এমনকি তার সময়েও যে বিশ্বাস ধারন করা আরো বেশী কঠিন ছিল।

 তিনি নাস্তিক ছিলেন কিনা, তার বিচার করতে আমাদের অবশ্যই সংযত হতে হবে, শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক জীবনে তাকে যে বিচক্ষণতার এবং ভদ্রতার পরিচয় দিতে বাধ্য করেছে, সেজন্যই। কিন্তু সেই ১৭৮৭ সালে তার ভাইপো পিটার কার-কে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন: কারোরই উচিৎ হবে না, শুধুমাত্র ফলাফলের কথা চিন্তা করে এমন কোন প্রশ্নতে ভয় পাওয়া, ‘যদি এর শেষ হয় এমন কোন বিশ্বাসে যে ঈশ্বর নেই, তুমি অবশ্যই উদ্দীপ্ত হবে, এধরনের অনুশীলনের মধ্যে সুখ আর স্বস্তি  এবং অন্যদের ভালোবাসা অর্জন করার গুনাবলী অন্বেষনে।

পিটার কার কে লেখা এই উপদেশটা আমাকে আরো বেশী নাড়া দেয়:

ঝেড়ে ফেল সব দাসোচিত যত সংস্কারের ভীতি, যার ভারে ক্রীতদাসের মত নত হয়ে থাকে দুর্বল সব মন। যুক্তিকে দৃঢ়ভাবে তার আসনে বসাও, তার উপর বিচারের ভার ছেড়ে দাও সকল তথ্য আর প্রত্যেকটি মতামতের। সাহসের সাথে প্রশ্ন করো এমনকি ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব নিয়েও, কারন যদি এমন কেউ থাকে, তিনিও অন্ধ ভীতির চেয়ে যুক্তির প্রতি এধরনের শ্রদ্ধা প্রদর্শনকে অনুমোদন করবেন।

জেফারসনের কিছু মন্তব্য যেমন,‘ খৃষ্টধর্ম হলো মানুষের উপর চাপানো সবচেয়ে বিকৃত একটি পদ্ধতি’ , যেমন দেইজম বা একাত্মবাদের সাথে সামন্জস্যপুর্ন, তেমনি নিরীশ্বরবাদের সাথে। জেমস ম্যাডিসনের শক্ত অ্যান্টি-ক্লারিকালিজমও ( ধর্মীয় যাজকদের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিরোধীতা)  তেমন: ‘ প্রায় পনের শতাব্দী ধরে খৃষ্টীয় আইনী প্রতিষ্ঠান বিচারাধীন, কি সুফল তারা দিতে পেরেছে? কমবেশী সব জায়গায় পাদ্রীদের অহংকার আর অলসতা; সাধারন জনগনের অজ্ঞতা আর অন্ধ দাসত্ব, উভয় পক্ষের কুসংস্কার, গোড়ামী আর নীপিড়ন’, একই কথা বলা যেতে পারে বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন এর ’বাতিঘরগুলোও চার্চ থেকে অনেক বেশী কার্য্যকরী’; জন অ্যাডামস সম্ভবত কঠিন ক্লারিকালিজম বিরোধী একাত্মবাদী ( ’এক্লেসিয়াসটিকাল কাউন্সিলে ভয়ঙ্কর যন্ত্র….’) এবং তিনি নিজেও খৃষ্টীয় ধর্মে বিরুদ্ধে অনেক দীর্ঘ বক্তৃতা প্রদান করেছে, বিশেষ করে : ‘’ খৃষ্টধর্ম সম্বন্ধে আমি যেটুকু বুঝি,  এটা এখন এবং আগেও বলা হয় ঈশ্বরের প্রকাশ, কিন্তু কেমন করে লক্ষ লক্ষ উপকথা,কাহিনী,কিংবদন্তী মিশ্রিত হয়েছে ইহুদী এবং খৃষ্টধর্ম উভয়ের তথাকতি ঐশী প্রকাশে, এবং তাদের পরিনত করেছে  এযাবৎকালের সবচেয়ে রক্তাক্ত ধর্ম হিসাবে?’ এবং জেফারসনকে লেখা একটা চিঠিতে: ’আমি রীতিমত কেপে উঠি, মানবজাতির  ইতিহাসে সুরক্ষিত করেছে এমন একটি শোকের অপব্যবহারে সবচেয়ে ভয়াবহ উদহারনটির ঈঙ্গিত দিতে – ক্রস।  চিন্তা করে দেখুন শোকের এই যন্ত্র কত বিপর্যয়ের কারন”।

জেফারসন এবং তার সহযোগীরা ঈশ্বরবাদী, একাত্মবাদী, অ্যাগনস্টিক বা নিরীশ্বরবাদী যাই হোক না কেন তারা প্রত্যেকেই প্রবলভাবে ধর্মনিরপেক্ষবাদী, যারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, প্রেসিডেন্ট এর ধর্মবিশ্বাস বা বিশ্বাসহীনতা  তার একান্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার। জাতির পিতাদের প্রত্যেকের যার যা ধর্মবিশ্বাস থাকুক না কেন, তারা, জর্জ বুশ সিনিয়র এর উত্তরের উপর সাংবাদিক রবার্ট শেরমান রিপোর্টটি পড়ে অবশ্যই বিস্মিত হতেন, যখন শেরমান তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি কি অন্য আমেরিকানদের মত নিরীশ্বরবাদীদেরও একই রকম নাগরিক অধিকার বা দেশপ্রেম আছে বলে মনে করেন কিনা?: ’না, আমি জানিনা নাস্তিকদের এদেশের নাগরিক বা দেশপ্রেমিক বিবেচনা করা উচিৎ হবে কিনা? [৮] আমেরিকা ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি’; ধরে নেই শেরমানের বিবরণ সঠিক, (দুঃখজনকভাবে তিনি টেপরেকর্ডার ব্যবহার করেননি,এবং অন্য কোন  সংবাদ পত্রিকা এ সংক্রান্ত কোন খবরও ছাপায়নি), আগের বাক্যে নাস্তিক শব্দটি ইহুদী বা মুসলিম বা কৃষ্ণাঙ্গ শব্দগুলো দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে একটা পরীক্ষা করা যায়। এর মাধ্যমে পরিমাপ করা সম্ভব আমেরিকার নিরীশ্বরবাদীদের কি ধরনের সংস্কার আর বৈষম্য সহ্য করতে হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস এ প্রকাশিত নাতালী আনজিয়ার্স এর কনফেশনস অব দ্য লোনলি এথিষ্ট,বর্তমান আমেরিকায় একজন নাস্তিক হিসাবে তার বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির একটি বেদনাদায়ক আর মর্মস্পর্শী বিবরণ [৯]; কিন্তু আমেরিকায় নাস্তিকদের বিচ্ছিন্নতা কিন্তু একটি বিভ্রান্তি, যা অত্যন্ত্ পরিশ্রমের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছে এর বিরুদ্ধের পুর্বসংস্কার। বেশীর ভাগ মানুষ যা ধারনা করেন, আমেরিকায় নাস্তিকদের সংখ্যা তার চেয়ে আরো অনেক বেশী। যেমনটি আমি ভূমিকায় উল্লেখ করেছি, আমেরিকায় নাস্তিকদের সংখ্যা ধার্মিক ইহুদীদের চেয়ে অনেক বেশী, তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনে ইহুদীদের লবী  শক্তিশালীদের একটি। আমেরিকার নাস্তিকরা যদি নিজেদের ঠিক সেরকম ভাবে সংগঠিত করতে পারতো তারা কি না অর্জন করতে পারত?  এই বিষয়টি নিয়ে ফ্রি এনকোয়ারী পত্রিকার সম্পাদক টম ফ্লিন জোরালো যুক্তি দিয়েছিলেন, তার সেকুলারিজমস ব্রেকথ্রু মোমেন্ট শীর্ষক একটি নিবন্ধে: যদি নীরিশ্বরবাদীরা একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং বিষন্নতায় ভোগেন, সেটার জন্য দায়ী আমরাই (নীরিশ্বরবাদীরা); সংখ্যা বিচারে আমরা অনেক শক্তিশালী, আসুন আমাদের শক্তির প্রমান দেয়া শুরু করি’।

ডেভিড মিলস তার প্রশংসনীয় বই এথিষ্ট ইউনিভার্স একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন, যা কোন কাহিনী হলে আপনি অনায়াসে পুলিশের অজ্ঞতার  একটি অবাস্তব কৌতুক কাহিনী হিসাবে প্রত্যাখান করতে দেরী করতেন না।  একজন খৃষ্টীয় ফেইথ হিলার (বিশ্বাসের মাধ্যমে  নিরাময় করেন বলে যারা দাবী করে), যিনি মিরাকল ক্রসেড নামে একাট সংস্থা পরিচালনা করেন, বছরে একবার মিলস এর শহরে আসেন। অন্য অনেক কর্মকান্ডের মধ্যে এই ফেইথ হিলার যারা ডায়াবেটিস এ ভুগছেন তাদের ইনসুলিন ফেলে দিতে উৎসাহ দেন, কিংবা যারা ক্যান্সারে আক্রান্ত তাদের কেমোথেরাপি নেবার বদলে প্রার্থনার মাধ্যমে অলৌকিকভাবে রোগমুক্ত হবার উপদেশ দেন। যুক্তিসংঙ্গত কারনেই মিলস জনসাধারনকে সচেতন করার লক্ষ্যে এর বিরুদ্ধে একটি শান্তিপুর্ন সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মিলস ভুল করে বসেন পুলিশের কাছে তার উদ্দেশ্য বর্ননা  এবং ফেইথ হিলার এর সমর্থকদের সম্ভাব্য আক্রমন থেকে পুলিশের সূরক্ষার আবেদন করে। প্রথম যে পুলিশ অফিসারের সাথে তার কথা হয়, তার প্রশ্ন ছিল: তুমি তার পক্ষে না বিপক্ষে সমাবেশ করবে? যখন মিলস তার উত্তরে বললো: তার বিপক্ষে, পুলিশ অফিসার এর উত্তরে বলছিল, সে ফেইথ হিলার এর র‌্যালিতে যোগ দেবে এবং  তার সমাবেশের সামনে দিয়ে যাবার সময় ব্যক্তিগতভাবে মিলসের মুখে থুতু মারার ইচ্ছা পোষন করে।

মিলস তার ভাগ্য পরীক্ষার জন্য দ্বিতীয় আরেকজন পুলিশ অফিসারের কাছে যান। দ্বিতীয়জন উত্তর দেয়,  ফেইথ হিলার এর সমর্থকদের কেউ যদি হিংসাত্মকভাবে মিলসকে আক্রমন করে, সেক্ষেত্রে সে মিলসকেই গ্রেফতার করবে কারন সে ঈশ্বরের কাজে বিঘ্নতা সৃষ্টি করছে। মিলস বাসায় ফিরে টেলিফোনের মাধ্যমে পুলিশ স্টেশনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, যেন কোন সিনিয়র অফিসারের সহানুভুতি পাওয়া যায়। অবশেষে যখন সার্জেন্ট এর সাথে যোগাযোগ হল, যার বক্তব্য ছিল: ’নরকে যাও বন্ধু, কোন পুলিশই নাস্তিকদের রক্ষা করতে চায়না, আশাকরি তোমাকে কেউ যেন ভালমত রক্তাক্ত করতে পারে’; স্পষ্টতই এই পুলিশ স্টেশনে মানুষের স্বাভাবিক সহমর্মিতা, দয়া, কর্তব্যজ্ঞানের সাথে সাথে ক্রিয়াবিশেষনের সরবরাহেরও ঘাটতি আছে। মিলস সেদিন সাত অথবা আটজন পুলিশ অফিসারের সাথে কথা বলার বিবরণ দেন,যাদের কেউই সাহায্য করার কোন ইচ্ছাই প্রকাশতো করেইনি বরং বেশীর ভাগই সরাসরি মিলসতে হুমকি ‍দিয়েছে হিংসাত্মক আক্রমনের।

নিরীশ্বরবাদীদের বিরুদ্ধে এধরনের সংস্কারের ঘটনার সংখ্যা অগনিত; কিন্তু অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন সাপোর্ট নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা, মার্গারেট ডাওনী, ফ্রি থট সোসাইটি অব ফিলাডেলফিয়ার [১০] মাধ্যমে এধরনের ঘটনাগুলো পদ্ধতিগতভাবে সংরক্ষন করে যাচ্ছেন; তার সংগৃহীত ঘটনাগুলোর ডাটাবেস, কমিউনিটি,স্কুল, কাজের জায়গা, গণমাধ্যম,পরিবার এবং সরকার ইত্যাদি বিভিন্ন শ্রেনীতে বিভক্ত, যার মধ্যে উদহারন আছে হয়রানি, কর্মচ্যুতি, পরিবার কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়া এমনকি হত্যা [১১];  নিরীশ্বরবাদীদের প্রতি ডাওনীর লিপিবদ্ধ এসব ঘৃনা আর অসহিষ্ণুতার প্রমান আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন একজন সৎ নিরীশ্বরবাদীরৈ পক্ষে আমেরিকার কোন নির্বাচনে জয়ী হওয়া প্রায় অসম্ভব। হাউস অব রিপ্রেজেন্টটেটিভস এর সদস্য সংখ্যা ৪৩৫, সিনেটে আরো ১০০ জন, ধরে নেই এই ৫৩৫ জন ব্যাক্তি সমগ্র শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর নমুনা, আমেরিকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যানগত হিসাব অনুযায়ী, এদের প্রায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবশ্যই নিরীশ্বরবাদী। তাদের অবশ্যই মিথ্যাচার করতে হয়েছে, অথবা তাদের প্রকৃত অনুভুতিটাকে লুকিয়ে রাখতে হয়েছে, নির্বাচনে জেতার জন্য। কে তাদের দোষ দেবে এই মিথ্যাচারের, যদি  ভোটারদের বিশ্বাস তাদের অর্জন করতে হয়? এটা সর্বজনস্বীকৃত যে, নিরীশ্বরবাদী হিসাবে নিজেকে স্বীকার করে নেয়া, একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্ধীর জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যা। ( এখানে উল্লেখ করতে হবে, মার্চ ২০০৭ এ ক্যালিফোর্নিয়ার ১৩তম ডিস্ট্রিক্ট এ কংগ্রেস ম্যান পিট স্টার্ক, জনসমক্ষে স্বীকার করে নিয়েছেন তার যে কোন ঈশ্বরবাদী বিশ্বাস নেই [১২]।

বর্তমানে ‍যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আবহাওয়ার এধরনের বাস্তবতা এবং এই অবস্থা যা ইঙ্গিত করে, তা দেখলে নিসন্দেহে  আতঙ্কিত হতেন জেফারসন, ওয়াশিংটন,ম্যাডিসন, অ্যাডামস এবং তাদের সকল বন্ধুরা। তারা  ঈশ্বরবাদী, একাত্মবাদী, অ্যাগনস্টিক বা নিরীশ্বরবাদী যাই হোন না কেন প্রাকএকবিংশ শতাব্দীর ওয়াশিংটনের এইসব থিওক্র্যাটদের দেখে ভয়ে পিছু হটতেন। তারা হয়তো  একাত্মতা বোধ করতেন উপনিবেশ পরবর্তী ভারতের ধর্মনিরপেক্ষবাদী জাতির পিতাদের সাথে, বিশেষ করে ধার্মিক গান্ধী ( আমি একজন হিন্দু,আমি একজন মসুলমান,আমি একজন ইহুদী, আমি একজন খৃষ্টান, আমি একজন বৌদ্ধ) এবং নিরীশ্বরবাদী নেহরুর সাথে:

এই যে প্রদর্শনী যার নাম ধর্ম বা আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে সংগঠিত ধর্ম, ভারতে কিংবা পৃথিবী যে কোন জায়গায়, আমাকে আতঙ্কগ্রস্থ করে। আমি প্রায়ই এর নিন্দা করেছি এবং ইচ্ছা পোষন করেছি একে পুরোপুরি ভাবে পরিচ্ছন্ন করার। এবং প্রায় প্রতিবারই মনে হয়েছে এটির ভিত্তি, অন্ধবিশ্বাস এবং প্রতিক্রিয়াশীলতা, গোড়া মতবাদ আর সংকীর্নতা, কুসংস্কার, শোষন আর কায়েমি স্বার্থ রক্ষা করা।

গান্ধীর স্বপ্নের ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে ব্যাখা করে নেহরুর বর্ণনা ( যদি না রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে তাদের দেশটা বিভক্ত না হত হয়ত বাস্তবে তা পরিণত হতে পারতো) পড়ে মনে হতে পারে তা যেন জেফারসনেরই নিজের লেখা [১৩]।

আমরা ধর্মনিরপেক্ষ  এক ভারতের কথা বলছি … কিছু মানুষের ধারনা এর অর্থ হলো ধর্মের বিরুদ্ধে কোনকিছু। অবশ্যই  এধরনের ধারনা সঠিক না। এর অর্থ হলো এটা এমন একটি রাষ্ট্র হবে যা সকল ধর্মবিশ্বাসকে সমান মর্যাদা আর সুযোগ দেবে। ভারতের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ইতিহাস অনেক প্রাচীন… ভারতের মত একটি দেশে, যেখানে অনেক ধরনের ধর্ম  আর বিশ্বাস বিদ্যমান, সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি ছাড়া অন্য কোনভাবে সত্যিকারের জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি করা সম্ভব না।

দেইষ্টদের বা একাত্মবাদীদের ঈশ্বর, যা প্রায়শঃই জাতির পিতাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়, অবশ্যই সেটি বাইবেলে বর্ণিত দানব অপেক্ষা অনেক উন্নতি। দুঃখজনকভাবে ধারনা করা খুবই কঠিন যে তার অস্তিত্ব আছে বা কখনো ছিল। যে কোন রুপেই ঈশ্বর হাইপোথেসিস আসলেই অপ্রয়োজনীয়। ঈশ্বর হাইপোথেসিস সম্ভাবনার সুত্রানুযায়ী প্রায় বাতিল হবার উপক্রম। ’সন্মানিত মহাশয়, আমার এই হাইপোথেসিসের প্রয়োজন নেই” ,  এই বিখ্যাত উত্তরটি দিয়েছিলেন লাপ্লাস নেপোলিয়নকে, যখন তিনি বিস্মিত হয়ে এই বিখ্যাত গনিতজ্ঞর কাছে জানতে চেয়েছিলেন কেমন করে তিনি তার বই লিখতে সক্ষম হয়েছিলেন একবারো ঈশ্বরের নাম উল্লেখ না করে।  চতুর্থ অধ্যায়ে আমি তার ব্যাখা দেব, তার আগে আমি তৃতীয় অধ্যায়ে ঈশ্বরের অস্তিত্বের তথাকথিত প্রমাণ নিয়ে আলোচনা করবো। আপাতত আমি বরং অ্যাগনষ্টিসিজম বা অজ্ঞেয়বাদ এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অস্তিত্বহীনতা চিরকালই ‍বিজ্ঞানের ধরা ছোয়ার বাইরে একটি অস্পৃশ্য প্রশ্ন, এমন ভ্রান্ত ধারনার দিকে দৃষ্টি ফেরাই।

অ্যাগনষ্টিসিজম বা অজ্ঞেয়বাদ-এর দৈন্যতা:

আমার পুরোনো স্কুলের চ্যাপেলের পালপিট থেকে আমাদের সাথে গলাবাজী করা বলিষ্ঠ, পেশীবহুল খৃষ্টান ব্যাক্তিটি কিন্তু নিরীশ্বরবাদীদের প্রতি একধরনের গোপন শ্রদ্ধা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। অন্ততপক্ষে তাদের সৎসাহস আছে নিজেদের বিশ্বাসের উপর, তা ভ্রান্ত বিশ্বাসই হোক না কেন? এই ধর্মযাজক যা পছন্দ করতেন না তা হলো  অজ্ঞেয়বাদীদের: দুর্বল, নরম, আগাছা, ভীতু, সিদ্ধান্তহীনতায় আক্রান্ত। তিনি কিছুটা ঠিক, তবে কিন্তু সম্পুর্ন ভুল কারনে। একই সুরে, কোয়েন্টিন দো বেদোয়ের এর লেখা অনুযায়ী ক্যাথলিক ঐতিহাসিক হিউ রস উলিয়ামসন শ্রদ্ধা করেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ধার্মিক এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নাস্তিকদেরও। তার ঘৃনা সংরক্ষিত শুধুমাত্র দুর্বল প্রকৃতির ভীরু মেরুদন্ডহীন সাধারন মাপের মানুষগুলো যারা বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝামাঝি অবস্থান করে [১৪]।

অ্যাগনষ্টিক হওয়া আদৌ দোষের না, বরং যুক্তিসঙ্গত একটি অবস্থান, যদি সে বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমানের অভাব থাকে।  কার্ল সাগান অ্যাগনষ্টিক অবস্থান নিতে গর্ব বোধ করেছিলেন, যখন তাকে মহাবিশ্বে কোথাও জীবনের অস্তিত্ব আছে কিনা জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। যখন তিনি হ্যা অথবা না জাতীয় কোন উত্তর দিতে অস্বীকার করেন, সাক্ষাৎকার গ্রহনকারী যখন তাকে জোর করছিল এ বিষয়ে তার  ‘‘গাট ফিলিংস’ কি, তিনি এর স্মরনীয় জবাব দিয়েছিলেন: ’কিন্তু আমিতো আমার ’গাট’ দিয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করিনা’; সত্যিই, প্রমান না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের মতামত সংরক্ষন করা যেতেই পারে [১৫]; মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্বের প্রশ্নটি উন্মুক্ত; পক্ষে এবং বিপক্ষে জোরালো যুক্তি আছে এবং যে কোন এক দিকে এই সম্ভাবনাটিকে প্রভাবিত করার মত যথেষ্ট প্রমানের অভাব আছে।  এক ধরণের অ্যাগনষ্টিসিজম অনেক বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের ক্ষেত্রেও যুক্তিযুক্ত অবস্থান হতে পারে, যেমন পারমিয়ান যুগের শেষে ঘটা মহাবিলুপ্তির কারন কি? জীবাশ্ম ইতিহাসে সবচেয়ে যা বড় ধরনের অবলুপ্তি। বর্তমানে সংগৃহীত প্রমানের ভিত্তিতে এর কারণ হতে পারে পৃথিবীর সাথে কোন উল্কাপিন্ডের সংঘর্ষ, যেমনটি পরবর্তী সময়ে ডায়নোসরদেরও বিলুপ্তির কারন হয়েছিল। কিন্ত অন্যান্য সম্ভাব্য একক বা মিশ্র কোন কারনও হতে পারে। এই দুই মহাবিলুপ্তির কারন সংক্রান্ত প্রশ্নে অ্যাগনষ্টিসিজম কিন্তু অযৌক্তিক না। ঈশ্বর সংক্রান্ত প্রশ্নে তাহলে কি? তার অস্তিত্বের ব্যাপারেও কি অ্যাগনষ্টিসিজম যুক্তিযুক্ত? অনেকেই হয়তো বলবে অবশ্যই হ্যা, প্রায়শই দৃঢ় বিশ্বাসের আদলে এই বক্তব্য অনেকটাই অতিরিক্ত প্রতিবাদের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু তারা কি সঠিক?

আমি শুরু করবো দুই ধরনের অ্যাগনষ্টিসিজমকে পৃথক করার মাধ্যমে। TAP বা টেম্পরারী অ্যাগনষ্টিসিজম ইন প্র্যাকটিস, যা যুক্তিসঙ্গত মধ্যবর্তী অবস্থান, যেখানে পক্ষে বা বিপক্ষে সত্যিই সুনির্দিষ্ট উত্তর আছে, কিন্তু আপাততঃ প্রমানের অভাবে সেই উত্তরে আমরা এখনও পৌছাতে পারিনি ( অথবা প্রমান থাকলেও ব্যাখ্যা করা যায়নি এখনও বোঝার ঘাটতির কারনে বা  যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়নি প্রমানগুলো বোঝার জন্য); টেম্পরারী অ্যাগনষ্টিসিজম ইন প্র্যাকটিস বা ট্যাপ অবশ্যই পারমিয়ান মহাবিলুপ্তির কারনের ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত অবস্থান হতে পারে। অবশ্যই পারমিয়ান মহাবিলুপ্তির একটি কারণ আছে, যদিও এই মুহুর্তে সত্যটি আমাদের জানা নেই, কিন্তু  আশা করি একদিন আমরা অবশ্যই জানতে পারবো।

এছাড়াও কিন্তু আরেক ধরনের মধ্যবর্তী অবস্থান আছে, আমি তার নাম দেব, PAP বা পার্মানেন্ট অ্যাগনষ্টিসিজম ইন প্র্যাকটিস, শব্দসংক্ষেপটি যে শব্দটি বানান করে তার সাথে আমার প্রাক্তন স্কুলের ধর্মযাজকের উচ্চারিত একটি শব্দের মিল (প্রায়) একটি দুর্ঘটনা মাত্র। প্যাপ ধরনের অ্যাগনষ্টিসিজম যুক্তিযুক্ত সেই সব প্রশ্নের ক্ষেত্রে যার উত্তর কোনদিনও পাওয়া যাবেনা, যতই প্রমান আমরা পক্ষে বিপক্ষে যোগাড় করি না কেন, কারণ প্রমান এক্ষেত্রে প্রযোজ্যই হবেনা।  এই প্রশ্নের অবস্থান ভিন্ন এক স্তরে অথবা ভিন্ন কোন মাত্রায়, প্রমানের ধরা ছো্ওয়ার বাইরে। একটা উদহারন হতে পারে সেই পুরোনো ফিলোসফিক্যাল “চেষ্টনাট”টি [১৬];  আমার মত লাল কি আপনিও দেখেন। হয়তো আপনার লাল আমার কাছে সবুজ অথবা আমার পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব এমন কোন রং  থেকে সম্পুর্ন ভিন্ন । দার্শনিকরা এই প্রশ্নের উল্লেখ করেন, এমন একটা প্রশ্ন হিসাবে যার কোন উত্তর দেয়া সম্ভব না, পরবর্তীতে যতই নতুন প্রমান যোগাড় হোক না কেন। কিছু সংখ্যক বিজ্ঞানী আর অন্যান্য চিন্তাবিদ নিঃসন্দেহ হয়েছেন যে – আমার মতে অতি উৎসাহে -ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বর প্রশ্নটি চিরকালের জন্য উত্তরহীন থেকে যাবে এই ধরা ছোয়ার বাইরে প্যাপ শ্রেনীতে। এখান থেকেই, যা আমরা পরে দেখব, তারা অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ঈশ্বরের অস্তিত্বের বা অনস্তিত্বের হাইপোথেসিস, দুটোই সঠিক হবার সমান সম্ভাবনা আছে। যে দৃষ্টিভঙ্গিটা আমি সমর্থন করবো তা খুবই আলাদা: ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের ব্যাপারে অ্যাগনষ্টিসিজম নিশ্চিৎভাবে সাময়িক বা ট্যাপ শ্রেনীভুক্ত। হয় তার অন্তিত্ত্ব আছে বা নেই, এটা অবশ্যই বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। একদিন আমরা এর উত্তর জানতে পারবো। আপততঃ আমরা এর সম্ভাবনা নিয়ে জোরালো যুক্তি দিতে পারি।

বিভিন্ন ধরনের মতবাদ বা ধারণার ইতিহাসে, পরে উত্তর পাওয়া গেছে এমন অনেক প্রশ্নের উদহারন আছে, যা কোন এক সময় ধরে নেয়া হয়েছিল চিরকালই বিজ্ঞানের আওতার বাইরে থেকে যাবে । ১৮৩৫ সালে বিখ্যাত ফরাসী দার্শনিক অগুষ্ট কোম্ত নক্ষত্র নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, যে কোন পদ্ধতিতেই হোক না কেন,  আমার কোনদিনও, তাদের রাসায়নিক গঠন বা ধাতব প্রকৃতি নিয়ে গবেষনা করতে পারব না। অথচ কোম্ত এ কথাগুলো বলার আগে ফ্রাউনহফার তার স্পেক্ট্রোস্কোপ ব্যবহার করে  সুর্যের রাসায়নিক গঠন নিয়ে গবেষনা শুরু করেছিলেন। এখন স্পেক্ট্রোস্কোপ বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিনই কোম্ত এর অ্যাগনষ্টিসিজমকে ভুল প্রমান করে যাচ্ছেন, এমনকি বহু দুরের তারাদের রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে সঠিক বিশ্লেষনের মাধ্যমে [১৭]; কোম্ত এর নভোবিজ্ঞানীয় অ্যাগনষ্টিসিজম এর  সঠিক যে অবস্থাই থাকুক না কেন, এই সতর্কতামুলক কাহিনীর বক্তব্য হল, অন্ততঃপক্ষে, অ্যাগনষ্টিসিজম এর চিরন্তন সত্যতার পক্ষে জোরালো কোন যুক্তি দেবার আগে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিৎ। তাসত্ত্বেও যখনই ঈশ্বরের বিষয় আসে, এই শব্দটির প্রথম আবিষ্কারক, টি এইচ হাক্সলী থেকে শরু করে, অনেক মহান দার্শনিক আর বিজ্ঞানীরা, খুবই খুশী মনে কাজটি করে থাকেন[১৮]।

হাক্সলী শব্দটির উদ্ভাবন সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যখন সেটি একটি ব্যাক্তিগত আক্রমনের কারন হয়ে দাড়িয়েছিল। লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যক্ষ রেভারেন্ড ডঃ ওয়েইস হাক্সলীর  কাপুরুষোচিত অ্যাগনষ্টিসিজম তীব্র সমালোচনা করেছিলেন:

তিনি হয়ত নিজেকে অ্যাগনষ্টিসিজমবাদী হিসাবে চিহ্নিত করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন, কিন্তু তার প্রকৃত নাম আসলে আরো প্রাচীন, তিনি আসলে নাস্তিক, অর্থাৎ অবিশ্বাসী। অবিশ্বাসী শব্দটির সাথে হয়তো একটি অপ্রীতিকর অর্থ জড়িয়ে আছে, এটাই হওয়া হয়ত স্বাভাবিক। কোন মানুষের পক্ষে, এবং সেটা হওয়াই উচিৎ, যীশু খৃষ্টকে সে বিশ্বাস করে না, এই কথাটা স্পষ্ট করে বলাটা অবশ্যই সুখকর কোন বিষয় নয়।

হাক্সলী অবশ্য সে ধরনের মানুষ ছিলেন না  যিনি সহজে এধরনের উস্কানিমুলক বক্তব্য অগ্রাহ্য করবেন এবং সবাই যেমনটি আশা করেছিল, ১৮৮৯ সালে,তার প্রত্যুত্তর ছিল খুবই তীব্রভাবে সমালোচনামুলক (যদিও তিনি তার স্বভাব সুলভ সতর্ক নম্রতার কোন ব্যতিক্রম না ঘটিয়ে: ডারউইনের বুলডগ হিসাবে তিনি ইতিমধ্যেই দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন শহুরে ভিক্টোরিয়ান তীর্যক কথাবার্তায়); অবশেষে, ডঃ ওয়েইসকে তার উচিৎ প্রাপ্য শাস্তি দিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত্ সবটুকু কবর দিয়ে, হাক্সলী ফিরে আসেন ‘ অ্যাগনষ্টিক‘ শব্দটির কাছে এবং বর্ণনা দেন কেমন করে তিনি এটি পেলেন। অন্যরা, তিনি বলেন,

নিশ্চিৎ যে, তারা ‘নসিস’ বা অন্তর্গত তত্ত্বজ্ঞান অর্জন করতে পেরেছেন- এবং কমবেশী সাফল্যের সাথে  আস্তিত্বের  প্রশ্নটি সমাধান করতে পেরেছেন; কিন্তু আমি নিশ্চিৎ আমি পারিনি এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই প্রশ্ন সমাধানযোগ্য নয়। হিউম এবং কান্টকে আমার পাশে নিয়ে বলছি, আমি আমার নিজেকে এধরনের মতামত শক্ত করে আকড়ে থাকার মত এত অহঙ্কারী ভাবতে পারিনা…… সুতরাং আমি চিন্তা করলাম এবং আবিষ্কার করলাম ‘অ্যাগনস্টিক’ শীর্ষক শিরোনামটি, যা আমার মতে যথাযথ।

পরবর্তীতে তার বক্তৃতায়, হাক্সলী আরো বিষদ ব্যাখ্যা দেন যে, ‘অ্যাগনস্টিকদের কোন মতবাদ নেই, এমনকি নেতিবাচক কোন কিছু।

অ্যাগনস্টিসিজম, আসলে কোন মতবাদ না বরং একটি পদ্ধতি। যার সার কথা হলো, একটি আদর্শকে   দৃঢ়ভাবে প্রয়োগ করা…….ইতিবাচকভাবে,  সেই আদর্শকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে: বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে, আর     কোন কিছুর কথা না ভেবে, যতটুকু পর্যন্ত্য সম্ভব নিজের যুক্তিকে সর্বদা অনুসরন করা। এবং নেতিবাচকভাবে: বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে, উপসংহার যে নিশ্চিৎ এমন ভান না করা যখন তা প্রমান করা যাবেনা বা প্রমানযোগ্য নয়। আমি এটাকেই অ্যাগনস্টিক বিশ্বাস বলি, যা কেউ যদি পুরোটা মানে এবং হালকা করে না ফেলে, পৃাথবীর মুখোমুখি হতে তাকে নির্লজ্জ হতে হবেনা, ভবিষ্যতে যা কিছুই ঘটুক না কেন।

একজন বিজ্ঞানীর কাছে এগুলো অনেক মহৎ কথা এবং টি এইচ হাক্সলীকে হালকাভাবে সমালোচনা করা যায়না। কিন্তু হাক্সলী  ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব বা অনস্তিত্ত্ব প্রমান অসম্ভবতার দিকে তার মনোযোগ দেয়ার ফলে তিনি সম্ভাবনার বিষয়টির দিকে গুরুত্ব দেননি। আমাদের পক্ষে কোন কিছুর অস্তিত্ত্ব প্রমান করতে পারা বা না পারার এই সত্যটা কিন্তু অস্তিত্ত্ব আর অনস্তিত্ত্বকে একই শ্রেনীতে ফেলে না। আমি মনে করিনা টি এইচ হাক্সলী এব্যাপারে দ্বিমত পোষন করতে পারেন এবং সন্দেহ হয়, তিনি যখন আপাতঃ দৃষ্টিতে কাজটি করেছেন, আসলে তিনি খুশি করার জন্য বেশীমাত্রায় সচেষ্ট হয়েছেন বিষয়কে মেনে নিতে. শুধুমাত্র অন্য আরেকটি বিষয়ের খাতিরে।  আমরা সবাই কাজটি কোন না কোন একসময় করেছি।

হাক্সলীর সাথে দ্বিমত পোষন করে আমি বলতে চাই, ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের প্রশ্নটি অবশ্যই একটি বৈজ্ঞানিক হাইপোথেসিস, অন্য অনেক বিষয়ের মত। যদিও বিষয়টি কঠিন, ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে এটি পরীক্ষা করা, এটির অবস্থান পারমিয়ান এবং ক্রেটাসিয়াস মহাবিলুপ্তি নিয়ে বিতর্কের সাথে একই ট্যাপ বা বা টেম্পরারী অ্যাগনষ্টিসিজম ইন প্র্যাকটিস শ্রেনীতে। ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব  বা অনস্তিত্ত্ব মহাবিশ্ব সংক্রান্ত একটি বৈজ্ঞানিক সত্য, তাত্ত্বিকভাবে আবিষ্কারযোগ্য যদিও ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সহজ নয়। যদি ঈশ্বর সত্যিই থাকেন এবং তিনি নিজে যদি চান, ঈশ্বর নিজেই  তার স্বপক্ষে এই বিতর্ক চিরকালের মত স্বশব্দে এবং সুষ্পষ্টভাবে থামিয়ে দিতে পারেন। এবং এমনকি যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব যদি নিশ্চিৎভাবে প্রমান বা খন্ডানো নাও যায়, বর্তমানে প্রাপ্য সব প্রমান আর যুক্তি সম্ভাবনার পরিমাপের অংকটি নিয়ে গেছে শতকরা ৫০ ভাগ থেকে আরো অনেক দুরে।

তাহলে, আমরা গুরুত্বের সাথে সম্ভাবনার স্পেকট্রামের ধারনাটিকে গ্রহন করি, এবং দুটি চুড়ান্ত বীপরিত নিশ্চিৎ অবস্থানের মাঝে আরোপ করি ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে মানুষের ভাবনাকে। এই স্পেকট্রাম যদিও অবিচ্ছিন্ন, তা সত্ত্বেও দুই চুড়ান্ত অবস্থানের মধ্যে নিম্নলিখিত সাতটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক বিদ্যমান:

১. পুরোপুরি ঈশ্বরবাদী। শতকরা ১০০ ভাগ সম্ভাবনা ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বে। সি জি ইয়াং এর ভাষায়: আমি বিশ্বাস করিনা,আমি জানি।

২. অনেক বেশী সম্ভাবনা কিস্তু শতকরা ১০০ ভাগের নীচে। কার্যতঃ ঈশ্বরবাদী। ‘আমি নিশ্চিৎভাবে জানি না কিন্তু আমি দৃঢ়ভাবে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি এবং তার অস্তিত্ত্ব আছে এটাকে সত্য মনে করে আমার জীবন যাপন করি।’

৩. শতকরা ৫০ ভাগের উপরে তবে সম্ভাবনা এর খুব একটা বেশী উপরে নয় । কৌশলগতভাবে অ্যাগনষ্টিক কিন্তু ঈশ্বরবাদ ঘেষা। ‘আমি খুবই অনিশ্চিৎ কিন্তু আমি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছুক।’

৪. সম্ভাবনা ঠিক শতকরা ৫০ ভাগ। পুরোপুরি পক্ষপাতহীন অ্যাগনষ্টিক।‘ ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব বা অস্তিত্ত্বহীনতা দুটোই সমানভাবে সম্ভাব্য।’

৫. শতকরা ৫০ ভাগের নীচে তবে সম্ভাবনা এর খুব একটা বেশী নীচে নয়। কৌশলগতভাবে অ্যাগনষ্টিক কিন্তু নিরীশ্বরবাদ ঘেষা। আমি জানিনা ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব আছে কিনা কিন্তু আমি সংশয়বাদী হতে ইচ্ছুক ।

৬.খুবই কম সম্ভাবনা কিন্তু শুন্যের উপরে।কার্যতঃ  নিরীশ্বরবাদী। আমি নিশ্চিৎভাবে জানিনা কিন্তু আমি মনে করি ঈশ্বর খুবই অসম্ভব একটি ব্যাপার এবং তার  নেই এটা মনে করে আমার জীবন যাপন করি।’

৭. পুরোপুরি নিরীশ্বরবাদী। যেমন ইয়াং ‘‘জানেন’ একজন আছেন ঠিক তেমন বিশ্বাসের সাথে আমি জানি কোন ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব নেই।

আমি অবাকই হবো যদি বেশী মানুষকে ক্যাটেগরী ৭ এ পাওয়া যায়, তারপরও যেখানে বেশীর ভাগ মানুষ, সেই ক্যাটেগরী ১ এর সাথে সামন্জ্ঞস্য রাখার খাতিরে আমি এটা যোগ করেছি। বিশ্বাসের প্রকৃতিই হচ্ছে, ইয়াং (C. Jung) এর মতই , একজন বিশ্বাসী কোন যৌক্তিক কারন ছাড়াই তার বিশ্বাসকে আকড়ে ধরে রাখতে সক্ষম (ইয়াং অবশ্য বিশ্বাস করতেন তার বুক সেলফের নির্দিষ্ট কিছু বই স্বতঃস্ফুর্তভাবে স্বশব্দে বিস্ফোরিত হতে পারে); নিরীশ্বরবাদীদের কোন বিশ্বাস নেই,আর শুধুমাত্র যুক্তি দিয়ে কোন কিছুর অস্তিত্ত্ব নেই এধরনের বিশ্বাসে কেউ পৌছাতে পারেনা। সেকারনে ক্যাটেগরী ৭  ব্যবহারিকভাবে শুন্য তার বীপরিত মেরুর ক্যাটেগরী ১ থেকে, যেখানে অনেক অনুগত মানুষের সমাবেশ। আমি নিজেকে ক্যাটেগরী ৬ এ, কিন্ত ৭ দিকে ঘেষা মনে করি। আমি অ্যাগনষ্টিক, তবে তা শুধুমাত্র, বাগানে গাছের নীচে পরীদের ব্যাপারে আমি যেমন অ্যাগনষ্টিক ঠিক ততটুকু।

সম্ভাবনার  এই স্পেক্ট্রামটি ট্যাপ বা ‘টেম্পরারী অ্যাগনষ্টিসিজম ইন প্র্যাকটিস’ এর ক্ষেত্রে বেশ প্রযাজ্য। ‘পার্মানেন্ট অ্যাগনষ্টিসিজম ইন প্র্যাকটিস’ বা প্যাপকে এই স্পেক্ট্রামটির মাঝামাঝি, ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বর সম্ভাবনা যেখানে শতকরা ৫০ ভাগ, সেখানে রাখার একটা হালকা প্রলোভন হতে পারে, কিস্তু সেটা সঠিক হবে না। প্যাপ অ্যাগনষ্টিসিজমবাদীরা দৃঢ়তার সংগে দাবী করেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব আছে, কি নেই,  এই প্রশ্নে আমাদের পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলা সম্ভব না। এই প্রশ্নটি, প্যাপবাদীদের মতে, নীতিগতভাবে সমাধানযোগ্য নয় এবং তাদের উচিৎ হবে এই স্পেক্ট্রামটির কোন স্তরে নিজেদের শ্রেনীভুক্ত করার যে কোন প্রস্তাব  প্রত্যাখ্যান করা। আমার পক্ষে জানা সম্ভব না যে, আপনার লাল কি আমার সবুজের মত-এই সত্যটা কিন্তু শতকরা ৫০ ভাগ সম্ভাবনার সমান না। এধরনের প্রস্তাব এতটাই অর্থহীন যে, একে কোন ধরনের সম্ভাবনার মর্যাদা দেয়া সম্ভব না। তাসত্ত্বেও, এটা খুব সাধারন একটা ভুল, যা আমরা পরবর্তীতে আবার লক্ষ্য করব, নীতিগতভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বর প্রশ্নটি সমাধানযোগ্য নয় এমন ধারনা থেকে, তার অস্তিত্ত্ব এবং তার অস্তিত্ত্বহীনতা দুটোই সমানভাবে সম্ভাব্য, এমন কোন একটা উপসংহারে লাফ দেয়া।

অন্য আরেক ভাবে এই ভুলটি বোঝানো যেতে পারে, প্রমানের দায়ভারের মাধ্যমে, যা বার্ট্রান্ড রাসেল চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন স্বর্গীয় চা এর পটের রুপকের মাধ্যমে[১৯]।

অনেক গোড়া মানুষ কথা বলেন যেন, প্রাপ্ত ধর্মমতকে প্রমান করার দায়িত্ব ধর্মমতাবলম্বীদের নয় বরং সংশয়বাদীদেরই দায়িত্ব যেন প্রাপ্ত ধর্মমতকে মিথ্যা প্রমান করার। এটা অবশ্য একটি ভুল। আমি যদি প্রস্তাব করি যে, পৃথিবী আর মঙ্গল গ্রহের মাঝে চীনামাটির তৈরী একটি চা এর পট আছে, যা সুর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রদক্ষিন করছে, কারো পক্ষে কিন্তু আমার দাবীকে মিথ্যা প্রমান করা সম্ভব না, বিশেষ করে আমি যদি একটু সতর্ক হয়ে আরো উল্লেখ করি যে,  চায়ের পটটি এত ক্ষুদ্রকায় যে, আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়ে তা দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি যদি আরো বলি, আমার দাবীকে যেহেতু মিথ্যা প্রমান করা যাবে না, অতএব একে সন্দেহ করা কোন মানবিক যুক্তির পক্ষে  অসহ্য একটি ধৃষ্টতা হবে; তবে আমি যে আবোলতাবোল কথা বলছি এমনটি ভাবা কারো জন্য ভুল হবে না। কিন্তু যদি  এধরনের একাট চায়ের পটের অস্তিত্ত্ব যদি সুনিশ্চিৎভাবে ঘোষনা করা হতো প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থে, প্রতি রোববারে পবিত্র উদ্ধৃতি হিসাবে তা শেখানো হত, স্কুলে শিশুদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হত, তাহলে এর অস্তিত্ত্ব সম্বন্ধে কোন ধরনের দ্বিধাদ্ন্দ বা ইতস্ততা চিহ্নিত হত বরং অস্বাভাবিকতা হিসাবে, এবং  এর সংশয়বাদীরা নজরে পড়তেন আধুনিক যুগে মনোচিকিৎসকদের এবং অতীতের ইনক্যুইজিটরদের নজরে ।

আমাদের এ বিষয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না, আমি যতটুকু জানি কেউই চায়ের পটের উপাসনা করে না [২০]; কিন্তু যদি জোর করা হয়, সেক্ষেত্রে আমরা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করবো না যে, অবশ্যই কোন ঘুর্ণায়মান চায়ের পট এর অস্তিত্ত্ব নেই। তারপরও  মুলতঃ নিয়মানুযায়ী আমাদের  সবাইকে চায়ের পট অ্যাগনষ্টিক হিসাবে ধরে নিতে হবে:  আমরা প্রমান করতে পারব না, সুনিশ্চিৎভাবে, যে কোন স্বর্গীয় চা এর পটের কোর অস্তিত্ব নেই। ব্যবহারিক সব ক্ষেত্রে, চায়ের পট অ্যাগনষ্টিকবাদ থেকে আমরা সরে আসব চা এর পট অবিশ্বাসী মতবাদে।

একজন বন্ধু, যিনি প্রতিপালিত হয়েছেন একজন ই্হুদী হিসাবে এবং নিজ ঐতিহ্যর প্রতি অনুগত হয়ে এখনও সাবাথ বা অন্যান্য ইহুদী ধর্মী আচার পালন করেন, নিজেকে বর্ণনা দেন একজন ’টুথ ফেয়ারী অ্যাগনস্টিক’ হিসাবে। তিনি ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বর সম্ভাবনাকে ’টুথ ফেয়ারীর’ অস্তিত্ত্বর সম্ভাবনার থেকে আদৌ বেশী মনে করেন না। কোন হাইপোথিসিসই প্রমান করা সম্ভব না, এবং দুটোই সমানভাবে অসম্ভব। প্রায় ঠিক যতটুকু তিনি ফেয়ারী অবিশ্বাসী ততটুকু ঈশ্বর অবিশ্বাসী, এবং উভয় ক্ষেত্রেই একই রকম সামান্য মাত্রায় অ্যাগনষ্টিক

রাসেলের চা এর পট, অবশ্যই অগনিত জিনিসের প্রতীক, যাদের অস্তিত্ব কল্পনা করা সম্ভব, কিন্তু মিথ্যা প্রমান করা অসম্ভব। আমেরিকার বিখ্যাত আইনজীবি, চার্লস ড্যারো বলেছিলেন, ’আমি ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি না যেমন মাদার গুজকেও বিশ্বাস করিনা’; সাংবাদিক অ্যান্ড্রু মুয়েলার মত হল, নিজেকে কোন বিশেষ একটি ধর্মবিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট করার মানে হলো, ’কোন অংশে কম বা বেশী অদ্ভুত না, বিশ্বাসের জন্য বেছে নেয়া যে পৃথিবী হচ্ছে রম্বস আকৃতির এবং এসমেরেল্ডা আর কীথ নামের দুই অতিবিশাল সবুজ লবস্টার তাদের সাড়াশীর মত দুই হাতে মহাবিশ্বর মধ্য দিয়ে পৃথিবীটাকে বহণ করে নিয়ে চলছে’ [২১] ; দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সবচেয়ে প্রিয়, অদৃশ্য,অস্পৃশ্য, অশ্রবনযোগ্য ইউনিকর্ণ, যা প্রতিবছর ক্যাম্প কোয়েষ্টে [২২] শিশুরা মিথ্যা প্রমান করার চেষ্টা করে। বর্তমানে ইন্টারনেটে সবচেয়ে জনপ্রিয় দেবতা যা ইয়াওয়ে বা অন্য যে কোনটার মতই মিথ্যা প্রমান করা সম্ভব নয়, হল উড়ন্ত স্প্যাগেটি মনস্টার, যিনি, অনেকেই দাবী করে, তাদেরকে স্পর্শ করেছে নুডলস এর মত শরীরের অংশ দিয়ে [২৩]; আমি খুবই আনন্দিত হয়েছে যে, ’গসপেল অব ফ্লাইং স্প্যাগেটি মনস্টার’ ইতিমধ্যেই বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রশংসিত হয়েছে [২৪]; আমি যদিও এখনওপড়িনি, কিন্ত গসপেল পড়ার কি দরকার, যদি আপনি জানেন, এটা সত্যি ? প্রসঙ্গক্রমে যা হবার কথা ছিল, বড় মাপের মতবিভেদ ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে,ফলে তৈরী হয়েছে,রিফর্মড ’ চার্চ  অব দ্য ফ্লাইং স্প্যাগেটি মনস্টার’ [২৫]।

এসব ব্যতিক্রমী উদহারন নিয়ে আলোচনার  উদ্দেশ্য হলো, এদের মিথ্যা প্রমান করা সম্ভব না, তারপরও কেউ চিন্তা করেনা, তাদের অস্তিত্ত্বের আর অস্তিত্ত্বহীনতার হাইপোথিসিস একই সমমানের। রাসেলের বক্তব্য হল, প্রমান করার দায়ভার বিশ্বাসীদের, অবিশ্বাসীদের নয়। আমার বক্তব্যও কিছুটা সেধরনের,  উড়ন্ত চা এর পটের অস্তিত্ত্বের পক্ষে সম্ভাবনা (বা স্প্যাগেটি মনস্টার/এসমেরেল্ডা আর কীথ/ ইউনিকর্ণ  ইত্যাদি) কিন্তু এর বিপক্ষে সম্ভাবনার সমান না।

কক্ষপথে প্রদক্ষিনরত কোন চা এর পট বা টুথ ফেয়ারী মিথ্যা প্রমান করার অযোগ্য, এই বিষয়টিকে সত্য হিসাবে কোন যুক্তিবাদী মানুষেই অনুভব করেন না যে, এটি এমন কোন একটি বিষয়, যা আগ্রোহদ্দীপক যুক্তিতর্কর মাধ্যমে মীমাংসা করা সম্ভব। আমরা কেউই, উর্বর আর ছলনাময়ী কল্পনা তৈরী করতে পারে এমন লক্ষ লক্ষ আবস্তব বিষয়গুলোকে মিথ্যা প্রমান করাটা নিজেদের দায়িত্ব মনে করি না।  যখন জিজ্ঞেস করা হয় আমি নীরিশ্বরবাদী কিনা, আমার এটাকে মজার একটা কৌশল মনে হয়, যে আমিও প্রশ্নকারীর দৃষ্টি আকর্ষন করে বোঝাতে চাই যে, জিউস,  অ্যাপোলো, আমন রা, মিথরাস, বাল, থর, ওটান, সোনালী বাছুর এবং ফ্লাইং স্প্যাগেটি মনস্টার এর ক্ষেত্রে তিনি নিজেও একজন নীরিশ্বরবাদী, আমি কেবল আরেকটি বেশী ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করি মাত্র।

আমরা প্রায় সবাই পুরোপুরি অবিশ্বাসের কাছাকাছি এক ধরনের সন্দেহ প্রকাশ করার অধিকার রাখি- শুধুমাত্র ইউনিকর্ণ, টুথফেয়ারী, প্রাচীন গ্রীস, রোম, মিশর এবং ভাইকিংদের দেবদেবীদের ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কোন মাথাব্যাথা  নেই। কিন্তু আব্রাহামীয় ঈশ্বর এর ক্ষেত্রে চিন্তার প্রয়োজন আছে, কারন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ যাদের সাথে আমরা এই পৃথিবীতে বাস করি তারা তার অস্তিত্ত্বে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। রাসেল এর চা এর পটে টি যা প্রদর্শন করছে, তা হলো ঈশ্বর বিশ্বাসের সার্বজনীনতা; স্বর্গীয় চা এর পটে বিশ্বাসের সাথে তুলনা করলে কিন্তু যুক্তির মাধ্যমে প্রমান করার দায়ভারটা কাদের অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে;  যদিও ব্যবহারিক রাজনীতির স্তরে মনে হতে পারে দায়ভার পরিবর্তিত হয়েছে অবিশ্বাসীদের দিকে। ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বহীনতা যে আমরা প্রমান করতে পারব না তা গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে, এবং রুপান্তরিত হয়েছে যেন খুবই তুচ্ছ একটি ব্যপারে, এমনকি শুধুমাত্র এই অর্থে যে, আমরা কখনেই চুড়ান্তভাবে কোনকিছুর অস্তিত্ত্বহীনতাকে প্রমান করতে পারব না। আসল ব্যাপারটা হল য, ঈশ্বরকে কি অপ্রমান করা যায় কিনা ( তিনি অবশ্যই তা না) সেটা কিন্তু না বরং তার অস্তিত্ত্ব কি আদৌ ’’সম্ভব’ কিনা, সেটাই। এবং সেটা ভিন্ন একটি ব্যাপার। কিছু প্রমানঅযোগ্য বিষয় যুক্তিসঙ্গতভাবেই  বিচার করা হয়, অন্য আরো কিছু প্রমানঅযোগ্য বিষয় থেকে, অনেক কম ’সম্ভাব্য’ হিসাবে। কোন কারনই নেই ঈশ্বরকে সম্ভাবনার স্পেকট্রামের নীরিখে পরীক্ষাযোগ্য না ভাবা।  এবং অবশ্যই কোন কারন নেই এটা ভাববার যে, শুধুমাত্র ঈশ্বর এর অস্তিত্ত্ব প্রমান করা বা মিথ্যা প্রমান করা যাবে না বলেই তার অস্তিত্ত্বের সম্ভাবনা শতকরা ৫০ ভাগ। বরং এর বীপরিতটাই সম্ভব,যা আমরা পরবর্তীতে দেখব।

নোমা (NOMA):

সম্পুর্ণভাবে পক্ষপাতহীন অ্যাগনষ্টিসিজম বা অজ্ঞেয়বাদের এর প্রতি টমাস হাক্সলী যেভাবে আন্তরিকতাহীন সমর্থন জানাতে  বেশীমাত্রায় সচেষ্ট হয়েছিলেন, আমার সাত স্তরের সম্ভাবনা স্পেক্ট্রামের মধ্যবর্তী স্তরের ঈশ্বরবাদীরাও ঠিক একই ধরনের কারনে কাজটি অন্যদিক বরাবর করে থাকেন। ধর্মতত্ত্ববিদ অ্যালিষ্টার ম্যাকগ্রাথ তার ’ডকিন্স’স গড: জীনস,মীমস অ্যান্ড দ্য অরিজিন অব লাইফ’ বইতে এটাকেই মুল বক্তব্য হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। সত্যি, আমার বৈজ্ঞানিক গবেষনার একটি সপ্রশংস পক্ষপাতহীন সারাংশ শেষে মনে হযেছে, যুক্তি খন্ডানোর লক্ষ্যে তিনি কেবলমাত্র একটি মাত্র বিষয়েরই শুধু উল্লেখ করেছেন: সেই অনস্বীকার্য এবং অসম্মানজনক দুর্বল যুক্তি, ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বকে কেউ মিথ্যা প্রমান করতে পারবে না। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ম্যাকগ্রাথ পড়ার সময় আমি মার্জিনে ’চা এর পট’ লিখে গেছি। টি এইচ হাক্সলীর বক্তব্য তার সমর্থনে উল্লেখ করে তিনি বলেন: ’চরম বিরক্ত হই যখন ঈশ্বরবাদী আর নিরীশ্বরবাদী, উভয়পক্ষই অপর্যাপ্ত পরিমান প্রায়োগিক প্রমানের উপর নির্ভরশীল হয়ে নৈরাশ্যজনকভাবে অযৌক্তিক গোঁড়া মতবাদ বা বক্তব্য প্রদান করেন, হাক্সলী ঘোষনা করেছিলেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে ঈশ্বর প্রশ্নের কোন সুরাহা হবেনা’।

ম্যাকগ্রাথ পরে স্টিফেন জে গুলড এর উদ্ধৃতি দেন একই ধারাবাহিকতায়:’’আমার সহকর্মীদের জন্য আর অসংখ্য মিলিয়নবার যা বলেছি (কলেজের ঘরোয়া আলোচনা থেকে গবেষনামুলক সেমিনার):বিজ্ঞান কোনভাবেই (এরঅন্তর্গত বৈধ উপায়ে) প্রকৃতির উপর ঈশ্বরের সম্ভাব্য তদারকীর বিষয়টি মিমাংসা করতে পারবেনা। আমরা না পারবো একে সত্যাপন করতে, না পারবো অস্বীকার করতে। বিজ্ঞানী হিসাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতেই আমরা পারবোনা’; গুলড এর দাবীর মধ্যে প্রত্যয়ী,প্রায় জোরজবরদস্তিমুলক আওয়াজ থাকা সত্ত্বেও, আসলেই তার এই কথার যৌক্তিকতাটা কি? কেন বিজ্ঞানী হিসাবে আমরা ঈশ্বরের বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব না ? আর কেনইবা রাসেলের চা এর পট অথবা ফ্লাইং স্প্যাগেটি মনস্টার সমানভাবে বৈজ্ঞানিক সন্দেহের উর্ধে থাকবে। কিছুক্ষনের মধ্যে আমি যুক্তি উপস্থাপন করব যে, সৃষ্টিকর্তার তদারকীতে চলমান একটি মহাবিশ্ব অবশ্যই সৃষ্টিকর্তাবিহীন কোন মহাবিশ্ব থেকে পৃথক হবে। আর কেনইবা তা বৈজ্ঞানিক বিষয় হিসাবে গ্রাহ্য করা হবে না ?

খুশী করার জন্য অতিরিক্ত নত হবার চেষ্টার শিল্পটিকে আক্ষরিক অর্থে মাটিতে শুয়ে পড়ার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন গুলড তার কম প্রশংসিত বই ’রকস অব এজেস’ এ। এখানেই তিনি উদ্ভাবন করেন নোমা (NOMA), যা ‘নন ওভারল্যাপিং ম্যাজিষ্টেরিয়া’ র শব্দসংক্ষেপ:

বিজ্ঞানের জাল বা ম্যাজিষ্টেরিয়াম বিস্তৃত প্রায়োগিক জগতে: বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কি দিয়ে তৈরী (বাস্তব তথ্য) এবং কেন এটি এভাবে কাজ করে (তত্ত্ব); কিন্তু ধর্মের ম্যাজিষ্টেরিয়াম বিস্তৃত এসব কিছুর সর্বশেষ অর্থ এবং নৈতিক মুল্যবোধ সংক্রান্ত প্রশ্নসমুহে।  এই দুই ম্যাজিষ্টেরিয়া একে অপরকে অধিক্রমণ করে না, এবং তারা সকল জিজ্ঞাসাকেও ধারন করেনা ( উদহারন হিসাবে ধরা যাক, শিল্পের ম্যাজিষ্টেরিয়াম এবং সৌন্দর্য্যর অর্থ); পুরোনো বহুল ব্যবহৃত কথা উল্লেখ করে বললে, বিজ্ঞান জানে কিভাবে পাথরের অতিক্রান্ত সময় নির্ণয় করা যায় (age of rocks), আর ধর্ম জানে যুগযুগান্তের বিশ্বাসের প্রতীক রুপী পাথরকে ( rock of ages) ; বিজ্ঞান গবেষনা করে কিভাবে স্বর্গলোক চলছে (how the heaven goes), আর ধর্ম কেমন করে স্বর্গ যাওয়া যায় (how to go to heaven)।

বিষয়টা নিয়ে আপনি চিন্তা করার আগ পর্যন্ত শুনতে ভালোই লাগবে উপরের কথাগুলো। কোনগুলো সেই সব চুড়ান্ত প্রশ্নাবলী যার সামনে ধর্ম সন্মানিত অতিথি আর বিজ্ঞানকে শ্রদ্ধা সহকারে চুপিসারে সরে পড়তে হবে?

মার্টিন রিস,  কেমব্রীজের  প্রখ্যাত নভোবিজ্ঞানী, যার কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি, তার বই ’আওয়ার কসমিক হ্যাবিট্যাট’ শুরু করেছেন দুটি সম্ভাব্য চুড়ান্ত প্রশ্ন প্রস্তাব এবং নোমা-বান্ধব উত্তর দেয়ার মাধ্যমে । ‘সবচেয়ে প্রধান রহস্যটা হলো, যে কোন কিছুর আদৌ কেন অস্তিত্ত্ব আছে এবং  এই সমীকরনে কে বা কি জীবনের স্পর্শ দিয় এই মহাবিশ্বে তাদের বাস্তবতা দিয়েছে? এধরনের প্রশ্নগুলো বিজ্ঞানের আওতার বাইরে, কিন্তু তারা দর্শন আর ধর্মতত্ত্বর এখতিয়ারে অবস্থিত।’ আমি বরং বলতাম যে, যদি সত্যি তারা বিজ্ঞানের নাগালের বাইরে অবস্থান করে থাকে,  অবশ্যই ধর্মতত্ত্বর আওতার বাইরেও তাদের অবস্থান ( আমার সন্দেহ আছে দার্শনিকরা তাদেরকে ধর্মতাত্ত্বিকদের সাথে একত্রে করার করার জন্য মার্টিন রিস এর উপর সন্তুষ্ট হবে); আমি আরেকটু আগ বাড়িয়ে ভাবার চেষ্টা করছি ‍যে, কোন অর্থে বলা সম্ভব যে, ধর্মতাত্ত্বিকদের একটি পৃথক এখতিয়ার বা সীমানা আছে।  আমার অক্সফোর্ড কলেজের ওয়ার্ডেন (প্রধান) এর  মন্তব্যটা মনে পড়লে হাসি পায়। একজন তরুন ধর্মতত্ত্ববিদ জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশীপের জন্য আবেদন করেছিল, এবং খৃষ্ঠীয় ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তার ডক্টরাল থিসিস ওয়ার্ডেনকে মন্তব্য করতে প্ররোচনা করেছিল :  ’আমার গভীর সন্দেহ আছে আদৌ এটা কোন বিষয় কিনা।’

গভীর মহাজাগতিক প্রশ্নের সমাধানে ধর্মতাত্ত্বিকরা কি এমন বিশেষ দক্ষতা দেখাবেন, যা বিজ্ঞানীরা পারবেন না? আরেকটি লেখায় আমি অক্সফোর্ডের একজন নভোবিজ্ঞানীর কথা উল্লেখ করেছিলাম, যখন আমি তাকে এই গভীর প্রশ্নগুলোর একটি করেছিলাম, তার উত্তর ছিল: ‘’আহ, এখন আমরা বিজ্ঞানের সীমানার বাইরে চলে যাচ্ছি; এখন এর উত্তর দেবার দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছি আমাদের ভালো বন্ধু চ্যাপলেইনের (ধর্মযাজক) উপর।’ আমি খুব দ্রুত এর উত্তর দিতে পারিনি, যা আমি পরে লিখেছিলাম: ’কিন্তু কেন চ্যাপলেইন? কেন বাগানের মালী বা বাবুর্চি না?’’ ’‘ কেন বিজ্ঞানীরা কাপুরুষের মত ধর্মতত্ত্ববিদদের উচ্চাশার প্রতি ভক্তিশীল, যখন এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য তারা অব্শ্যই বিজ্ঞানীদের নিজেদের থেকে বেশী যোগ্য না?

এটা বিরক্তিকর ক্লিশে বা বহুব্যবহৃত উক্তি ( আর, অন্য অনেক ক্লিশে থেকে এর পার্থক্য, এটা এমনকি সত্য না), তা হলো, বিজ্ঞান ব্যস্ত থাকে ‘’কিভাবে’ (how) প্রশ্ন নিয়ে কিন্ত একমাত্র ধর্মতত্ত্ব যথেষ্ট প্রস্তুত ‘কেন’ (why) প্রশ্নের উত্তর দিতে। এই ‘কেন’ প্রশ্নটা আসলেই বা কি?  প্রত্যেকটা ইংরেজী বাক্য ‘কেন’ দিয়ে শুরু হলেই  সেটা যুক্তিসঙ্গত বৈধ প্রশ্ন হয়ে যায়না: ইউনিকর্ন এর ভেতরটা ফাপা বা শুন্য কেন? কিছু প্রশ্ন কোন উত্তর পাবার যোগ্যতা রাখেনা, চিন্তার রং কেমন?আশার গন্ধ কেমন? কোন প্রশ্ন ব্যকরনগত শুদ্ধ হলেই অর্থবহ বাক্য হয় না বা তার জন্য সময় নষ্ট করা যুক্তিযুক্ত হয়না।  এমনকি প্রশ্নটা যদি বাস্তব সম্মতও হয়, বিজ্ঞান পারবে না বলে এর অর্থ এমন না যে, ধর্ম পারবে।

হয়ত এমন কিছু সত্যিকারের এবং গভীর প্রশ্ন আছে চিরকালই বিজ্ঞানের আওতার বাইরে থেকে যাবে। হয়ত কোয়ান্টাম তত্ত্ব ইতিমধ্যে আমাদের বোঝার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার দরজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু যদি বিজ্ঞান না পারে কোন সর্বশেষ প্রশ্নের উত্তর দিতে, তাহলে ধর্ম পারবে এমন কথা কেমন করে ভাবা সম্ভব? আমি বিশ্বাস করি,  না কেমব্রীজ  বা অক্সফোর্ডের নভোবিজ্ঞানী, কেউই বিশ্বাস করতে পারেন না, বিজ্ঞানের পক্ষে উত্তর দেবার জন্য কঠিন সব গভীরতম প্রশ্নের উত্তর দেবার মত,কোন বিশেষ দক্ষতা ধর্মতত্ত্ববিদদের আছে। আমি সন্দেহ করছি, দুই নভোবিজ্ঞানী, আবারো নম্র হবার জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করেছেন: ধর্মতাত্ত্বিকদের কোন কিছুর সম্বন্ধেই গুরুত্বপুর্ণ কোন কিছু বলার নেই। সুতরাং ঠিক আছে আমরা বরং তাদের একটু ছাড় দেই, তারা চিন্তা করতে থাকুক কতগুলো প্রশ্ন নিয়ে যা কেউ কোনদিনও পারবে না উত্তর দিতে। আমার নভোবিজ্ঞানী বন্ধুদের মত আমি কিন্তু মনে করিনা, আমাদের আদৌ তাদের কোন সুযোগ দেয়ার প্রয়োজন আছে। আমি এখনো কোন জোরালো কারন দেখিনি ধর্মতত্ত্ব (বিবলিক্যাল ইতিহাস, সাহিত্য এর পরিবর্তে) আসলে কোন একটি বিষয় হতে পারে।

বাড়িয়ে না বললেও, একইভাবে, আমরা সবাই একমত হতে পারি যে, নৈতিক মুল্যবোধের উপর আমাদের উপদেশ দেবার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অধিকারের বিষয়টি অবশ্যই জটিল। কিন্তু গুলড আসলেই চান কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ সেটা নির্ধারন করার অধিকার ধর্মের উপর ছেড়ে দিতে। মানুষের জ্ঞানে যার নতুন আর কিছু দেবার নেই, এই সত্যটা নিশ্চয়ই কোন কারন হতে পারে না, আমাদের করনীয় সম্বন্ধে নির্দেশ দেবার জন্য ধর্মকে পুর্ন স্বাধীনতা দেয়া। তাছাড়া, কোন ধর্ম? সেই ধর্ম, যে ধর্মে ঘটনাচক্রে আমরা প্রতিপালিত হয়েছি? তাহলে, কোন অধ্যায়, বাইবেলের কোন বইটার পাতা আমরা উল্টাবো – কারন কোন বইই একমত পোষন করেনা, আর কয়েকটা তো রীতিমত কদর্য, যে কোন যুক্তিসঙ্গতার মাপকাঠিতে। কত জন আসলে যথেষ্ঠ পরিমান বাইবেল পড়েছে যে জানে ব্যভিচারের বা সাবাথের দিনে কাঠ কুড়ানো বা পিতামাতার সাথে বেয়াদবীর শাস্তি মৃত্যদন্ড ঘোষনা করা হয়েছে। আমরা যদি ডিউটেরোনমী  এবং লেভিকটাসকে বাদ দেই ( আধুনিক আলোকিত সব মানুষ যেটা করেন), কোন মানদন্ডের উপর ভিত্তি করেই বা আমরা  সিদ্ধাস্ত নেব, ধর্মের কোন নৈতিক মুলবোধ  আমরা ’গ্রহন’ করব? নাকি আমরা সারা পৃথিবীর সব ধর্মগুলো খুজে বেছে দেখব যতক্ষন না পর্যন্ত্য আমরা আমাদের জন্য খাপ খায় এমন কোন নৈতিক শিক্ষা খুজে পাই। সেটাই যদি হয়, তাহলে আবার প্রশ্ন ওঠে, কোন মানদন্ডের উপর ভিত্তি করে তা আমরা বাছাই করবো। ধর্মীয় নৈতিকতা বাছাই এর ক্ষেত্রে আমাদের কাছে  যদি স্বতন্ত্র কোন মানদন্ড থেকেই থাকে, তাহলে কেন আমরা মধ্যসত্ত্বভোগীদের বাদ দিয়ে অর্থাৎ ধর্ম ছাড়াই সরাসরি নৈতিক মুল্যবোধ বেছে নিতে পারি না? প্রশ্নগুলোতে আমি আবার ফিরে আসব সপ্তম অধ্যায়ে।

আমি সত্যি বিশ্বাস করিনা, গুলড তার ’রক অব এ্যাজেস’ এ যা লিখেছেন তা আসলেই তিনি তা বোঝাতে চাইছেন। আমি যেমনটা বলেছি আগে, আমরা প্রত্যেকেই মাঝে মাঝে, অযোগ্য কিন্তু শক্তিশালী প্রতিপক্ষর প্রতি নম্র হতে অতিরিক্ত সচেষ্ট হবার অপরাধে অপরাধী, এবং গুলড এসব করার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আমি শুধু এটুকুই ভাবতে পারি । কিন্তু কল্পনা করা যেতে পারে যে, তিনি  তার সুস্পষ্ট শক্তিশালী বক্তব্য দিয়ে আসলেই বোঝাতে চেয়েছিলেন, ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বর প্রশ্নে বিজ্ঞানের কোন কিছু বলার নেই:  ’আমরা না পারবো প্রমান করতে, না পারবো অস্বীকার করতে; বিজ্ঞানী হিসাবে আমরা এ বিষয়ে কোন রকম মন্তব্যই করতে পারবো না’ ; বক্তব্যটা শুনতে অ্যাগনোষ্টিকবাদের মত শোনাচ্ছে, স্থায়ী আর অপরিবর্তনশীল, পুরোপুরি প্যাপ বা পার্মানেন্ট অ্যাগনষ্টিসিজম ইন প্র্যাকটিস। এর অর্থই হচ্ছে এই প্রশ্ন সম্বন্ধে বিজ্ঞান এমন কি ‘ ‘ ‘‘সম্ভাবনা’ সংক্রান্ত কোন মন্তব্যও করতে পারবে না। এই লক্ষনীয় সর্বত্রব্যাপী মিথ্যা ধারনাটি – অনেকেই যা যপ করেন মন্ত্রের মতন, কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ, আমার সন্দেহ, ভালোমত ভেবেছেন ব্যাপারটা নিয়ে,  আমি যাকে বলছি অ্যাগনষ্টিসিক বা অজ্ঞেয়বাদের দৈন্যতা। গুলড কিন্তু পক্ষপাতহীন অ্যাগনষ্টিক না বরং বেশ তীব্রভাবে কার্যত নিরীশ্বরবাদী। যদি ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব আছে কিনা এ বিষয়ে আর কিছুই বলার নাই থাকে তাহলে কিসের উপর ভিত্তি করে তিনি এমন রায় দিলেন?

ঈশ্বর হাইপোথেসিসের বক্তব্য হল, যে বাস্তবতায় আমাদের বসবাস সেখানে একজন অতিপ্রাকৃত সত্ত্বারও বসবাস, যিনি  এই মহাবিশ্বর পরিকল্পক এবং সৃষ্টিকারী- নিদেনপক্ষে এই হাইপোথেসিসের বেশ কিছু সংস্করনে, তিনি এর রক্ষনাবেক্ষন করেন এবং এমনকি অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করে থাকেন, যা তার নিজের তৈরী অতিবিশাল চিরঅপরিবর্তনশীল আইনেরই  সাময়িক লঙ্ঘন। রিচার্ড সুইনবার্ণ, ব্রিটেনের নেতৃস্থানীয় ধর্মতত্ত্ববিদ এ বিষয়ে স্পষ্ট তার বই ’ইস দেয়ার এ গড’ এ?:

ঈশ্বরবাদীরা ঈশ্বর সম্বন্ধে যা দাবী করে তা হল, তার ক্ষমতা আছে ছোট কিংবা বড় যে কোন কিছু সৃষ্টি, রক্ষনাবেক্ষন এবং ধ্বংস করার। এবং তিনি যে কোন বস্তুকে নাড়ান অথবা এর দ্বারা যে কোন কিছু করাতে পারেন। তিনি গ্রহদের এমনভাবে নাড়ান যে, কেপলার আবিষ্কার করেছিলেন তারা স্থির নয়, অথবা বারুদকে বিস্ফোরিত করেন যদি তা আমরা জলন্ত দিয়াশলাই কাঠির সংস্পর্শে নিয়ে আসি; অথবা তিনি গ্রহদের গতিপথ নাড়াতে পারেন অন্য কোন ভাবে, এবং নিয়ন্ত্রন করেন বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থসমুহ বিস্ফোরিত হবে কি হবে না, তাদের প্রকৃতি নিয়ন্ত্রনকারী পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে সম্পুর্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে। প্রকৃতির নিয়মকানুন দিয়ে ঈশ্বর সীমাবদ্ধ নন, তিনি তাদের তৈরী করেন, যদি ইচ্ছা পোষন করেন তিনি তাদের স্থগিত করতে পারেন।

যেন কত সহজ, তাই না, এটা যাই হোক না কেন, নোমা (NOMA) থেকে এটা অনেক আলাদা একটা প্রস্তাব। এবং তারা যা কিছু বলুক না কেন, যে সমস্ত বিজ্ঞানীরা  এই ’পৃথক ম্যাজিস্টিরিয়া বা ক্ষমতার বলয়’ তত্ত্বটির অনুগত তাদের উচিৎ হবে মেনে নেয়া যে, অতিপ্রাকৃত এবং বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তা সহ একটি মহাবিশ্ব অবশ্যই অনেক পৃথক হবে  সৃষ্টিকর্তাহীন কোন মহাবিশ্ব থেকে।  এই দুটি হাইপোথিটিকাল মহাজগতের মধ্যে পার্থক্য নীতিগতভাবে তেমন মৌলিক না, যদিও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে তা পরীক্ষা করা কঠিন। এবং এটা দুর্বল করে দেয় এই আত্মতুষ্টি প্রদানকারী চিত্তাকর্ষক বাণীটিকে: বিজ্ঞানকে অবশ্যই সম্পুর্ন নীরব থাকতে হবে ধর্মের মুল অস্তিত্ত্ব সংশ্লিষ্ট দাবী প্রসঙ্গে। সৃজনশীল একজন অতিবুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি প্রশ্নাতীতভাবে একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন  এবং, যদিও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে যার আপাতত – এখনও পর্যন্ত্য -মিমাংসা হয়নি। তেমনি সকল অলৌকিক কাহিনীগুলো, যার উপর ধর্ম নির্ভর করে অসংখ্য বিশ্বাসীদের চমক দিতে, তাদের সত্যতা বা মিথ্যার বিষয়টিও বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন ।

জিসাস এর কি মানব কোন পিতা ছিলেন অথবা তার জন্মের সময় তার মা কি কুমারী ছিলেন?  এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার মত  যথেষ্ট  পরিমান প্রমান এখনও অবশিষ্ট থাকুক বা না থাকুক, এখনও এই প্রশ্নগুলো সুনির্দিষ্টভাবে বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন, যার নীতিগতভাবে নির্দিষ্ট একটি উত্তর আছে: হ্যা অথবা না। জিসাস কি ল্যাজারাসকে মৃত্যুশয্যা থেকে জাগিয়ে তুলেছিলেন,  ক্রশবিদ্ধ হবার তিন দিন পর তিনি নিজে কি মৃত্যু থেকে পুনরায় জীবিত হয়ে উঠেছিলেন? এধরনের প্রত্যেকটি প্রশ্নের একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর আছে, আমরা সেই উত্তর ব্যবহারিক ক্ষেত্রে খুজে পাই কিংবা না পাই এবং  এটি কঠোরভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক উত্তর। যদি প্রাসঙ্গিক প্রমানাদি জোগাড় হবার অসম্ভব ঘটনা ঘটে কোনদিন, তবে এ বিষয়গুলো সমাধানের জন্য আমরা যে পদ্ধতি অবলম্বন করবো তা সম্পুর্নভাবে এবং বিশুদ্ধভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক হবে। প্রসঙ্গটিকে একটু নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা যাক, কল্পনা করুন, কোন অসাধারন ঘটনাচক্রে ফরেনসিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা ডিএনএ প্রমান সংগ্রহ করতে সক্ষম হলেন, যা প্রমান করে, আসলে জিসাসের কোন জৈব মানুষ পিতা ছিল না। আপনি কি কল্পনা করতে পারবেন ধর্মীয় আত্মপক্ষসমর্থনকারীরা পুরো ব্যাপারটা তুচ্ছ বলে উড়িয়ে দেবে, সম্ভাব্য এমন কিছু বলে, যেমন,’‘কার কি এতে আসে যায়, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমান ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নে সম্পুর্নরুপে অপ্রাসঙ্গিক। ভুল ম্যাজিষ্টারিয়াম! আমাদের ভাববার বিষয় হল চুড়ান্ত প্রশ্ন আর নৈতিক মুল্যবোধ। ডিএনএ কিংবা অন্য যে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমানের এ বিষয়ে কোনভাবেই কোন ধরনের প্রভাব নেই।’

এই ধারনাটাই হাস্যকর। আপনি আপনার জীবন বাজী রাখতে পারেন, বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্যপ্রমান যদি কোনটা পাওয়া যায়, তাহলে সেগুলো জোর করে দখল করে অনুকীর্তন করে তারা আকাশে উঠিয়ে দেবে। নোমার  জনপ্রিয়তার কারন হচ্ছে শুধু মাত্র ঈশ্বর হাইপোথেসিস  এর পক্ষে কোন প্রমান নেই বলেই। যে মুহুর্তে কোন ক্ষুদ্রতম প্রস্তাব বা প্রমান ধর্মবিশ্বাসের পক্ষে সাফাই গাইবে, ধর্মীয় আত্মপক্ষসমর্থনকারীরা নোমাকে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলতে একমুহুর্তও দেরী করবে না। কিছু জ্ঞানী ধর্মতাত্ত্বিকদের বাদ দিলে (এবং এমন কি তারাও সাধারন মানুষদের অলৌকিক কাহিনী বলতে ভালোবাসেন তাদের সমাবেশের আকৃতি স্ফীত করতে),  আমার সন্দেহ যে,এই কথিত অলৌকিক ঘটনাগুলো অনেক বিশ্বাসীদের তাদের বিশ্বাসকে ধরে রাখার পেছনে শক্তিশালী কারন। এবং অলৌকিক ঘটনাগুলো, সংজ্ঞানুযায়ীই বিজ্ঞানের নীতি ভঙ্গ করে।

রোমান ক্যাথলিক চার্চ একদিকে যেমন কখনও মনে হয় নোমা হবার উচ্চাকাঙ্খা, কিন্তু আবার অন্যদিকে অলৌকিক ঘটনা ঘটানোকে সেইন্ট হবার জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় নিয়ম বেধে দেয়। গর্ভপাতের বিরুদ্ধে তার অবস্থানের জন্য বেলজিয়ানদের প্রয়াত রাজা সেইন্ট হবার একজন প্রার্থী। বর্তমানে আন্তরিক অনুসন্ধান চলছে,  মৃত্যুর পর তার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা দোয়াকে কোন অলৌকিক নিরাময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট করা যায় কিনা। আমি ঠাট্টা করছি না কিন্তু।  এটাই হচ্ছে ঘটনা,  সেইন্টদের কাহিনীগুলো কিন্তু এধরনেরই। আমার মনে হয় চার্চের মধ্যে বিজ্ঞ কারো কারো কাছে ব্যাপারটা বিব্রতকর। কেনই বা বিজ্ঞ বলে পরিচিত চার্চের কেউ চার্চের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে কেন এটাই রহস্যজনক, অনেকটা ধর্মতাত্ত্বিকরা যে রহস্য উপভোগ করে সেরকম।

অলৌকিক ঘটনা সংক্রান্ত বিষয়ের মুখোমুখি হলে, অনুমান করা যায় গুলড এর মন্তব্য হবে এধরনের। নোমার মুল ব্যাপারটি হল যে, এটি একটা দুমুখো দরকষাকষি। যে মুহুর্তে ধর্ম বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পা ফেলবে এবং বাস্তব পৃথিবীতে অলৌকিক ঘটনা দিয়ে অনধিকারচর্চা করা শুরু করবে, তখন গুলড যে ধর্মের পক্ষে ওকালতী করছে, ধর্মের আর সেই অর্থ থাকে না এবং তার অ্যামিকাবিলিস কনকর্ডিয়া বা বন্ধুসুলভ চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। লক্ষ্য করুন, যদিও অলৌকিক ঘটনাহীন ধর্ম যা গুলড সমর্থন করছেন, তা কিন্তু বেশীর ভাগই চার্চের পিউ বা পার্থনার মাদুরে বসা ধর্মপালনকারী ঈশ্বরবাদীরা আদৌ মানেন না। আসলেই এটা তাদের জন্য হবে বড় ধরনের হতাশাব্যান্জ্ঞক। ওয়ান্ডারল্যান্ডে পড়ে যাবার আগে তার বোনের বই নিয়ে অ্যালিস এর মন্তব্যটা একটু খাপ খাইয়ে নিয়ে বললে, ’কি দরকার এমন ঈশ্বরের, যে কোন অলৌকিক ঘটনা ঘটায় না আর প্রার্থনার জবাব দেয়না’; মনে আছে অ্যাম্ব্রোজ বিয়ের্স  এর ’প্রার্থনা করা’ ক্রিয়াপদের বুদ্ধিদীপ্ত সংঙ্গাটি: ’শুধুমাত্র একজন আবেদনকারীর স্বার্থে, যে আত্মস্বীকৃত অযোগ্য, মহাজগতের সমস্ত আইন বাতিল করার জন্য আবেদন’; অনেক অ্যাথলেট আছেন যারা মনে করেন ঈশ্বর তাদের সাহায্য করেছে জয় লাভ করার জন্য -এমন প্রতিপক্ষর বিরুদ্ধে, যাকে দেখে মনে হতেই পারে ঈশ্বরের সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে সে কোন অংশে কম যোগ্য নয়। অনেক গাড়ীচালক বিশ্বাস করেন ঈশ্বর তাদের জন্য পার্কিং এর জায়গা সংরক্ষন করেছেন – স্পষ্টতই আরেকজনকে বঞ্চিত করে। এ ধরনের ঈশ্বরবাদ বিব্রতকরভাবে জনপ্রিয়, নোমার মত  যুক্তিসঙ্গত ( যদি উপরি উপরি) কিছু তাদের মনে দাগ কাটাবে এমন সম্ভাবনা কম।

তা সত্ত্বেও চলুন আমরা গুলডকে অনুসরণ করে এবং আমাদের ধর্মকে খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে একেবারে কোন ধরনের হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতাহীন ন্যুনতম পর্যায়ে নিয়ে যাই: কোন অলৌকিক ঘটনা না, ঈশ্বর এবং আমাদের মধ্যে উভয় দিকে কোন ধরনের ব্যক্তিগত যোগাযোগ না, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ে কোন খেলাধুলা না, বিজ্ঞানের এলাকায় কোন অবৈধ প্রবেশ না। বড়জোর, একটু একাত্মবাদী ঈশ্বরের মত মহাবিশ্বের জন্মলগ্নে কিছু অবদান রাখা, যা পরবর্তীতে সময়ের পুর্নতার সাথে সাথে, নক্ষত্র, মৌলিক উপাদান,রসায়ন, গ্রহ সম্পুর্নতা পায় এবং জীবনের উদ্ভব এবং বিবর্তন হয়; নিঃসন্দেহে এটা যথেষ্ট পৃথকীকরন, নিশ্চই নোমা টিকে থাকতে পারবে এই পরিমিত এবং ভনিতামুক্ত ধর্ম নিয়ে।

বেশ, আপনি হয়ত তাই ভাববেন। কিন্তু আমার প্রস্তাব হল, এমনকি একজন হস্তক্ষেপ ক্ষমতাহীন, নোমা ঈশ্বর, ‍যদিও সে আব্রাহামীয় ঈশ্বর অপেক্ষা অনেক কম হিংস্র এবং অমার্জিত, তা সত্ত্বেও যখন আপনি তাকে সস্পুর্ন পক্ষপাতহীন হিসাবে দেখবেন, দেখবেন এটি একটি বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস। আমি সেই প্রসঙ্গেই ফিরে আসি: যে মহাবিশ্বে আমরা নিসঙ্গ শধু অন্যান্য ধীরে বিবর্তনমান বুদ্ধিমত্তা ছাড়া, তা অবশ্যই অনেক আলাদা, সেই মহাজগত থেকে, যেখানে একজন মূল পথপ্রদর্শক ছিলেন, যার বুদ্ধিদীপ্ত সৃষ্টিশীলতা সব অস্তিত্ত্বের জন্য দায়ী। আমি মানছি, ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে এমন দুটি মহাবিশ্বের মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করা কঠিন। তাসত্ত্বেও, সম্পুর্নভাবে নির্দিষ্ট কিছু আছে  সৃষ্টিকর্তার মৌলিক ডিজাইন হাইপোথিসিসে এবং সমান ভাবে বিশেষ কিছু আছে এর একমাত্র বিকল্প হাইপোথিসিসে: একটু বিশাল অর্থে যা ক্রম বিবর্তন। দুটি হাইপোথিসিস আবার প্রায় অসমন্বয়যোগ্যভাবে পৃথক। অন্য আর কিছু যা পারে নি, একমাত্র বিবর্তন আসলেই সক্ষম হয়েছে, কোন কিছুর অস্তিত্ত্বকে ব্যাখ্যা দিতে, যার অসম্ভবতা এত বেশী যে, প্রায়োগিক দিক থেকে ভাবলে হয়ত অস্তিত্ত্বই থাকা কথা ছিল না। এবং তর্কের উপসংহার, যা আমি ৪র্থ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি,  ঈশ্বর হাইপোথেসিস এর জন্য যা চুড়ান্তরুপে প্রাণনাশক।

দি গ্রেট প্রেয়ার এক্সপেরিমেন্ট:

অলৌকিক ঘটনার কেস স্টাডির একটা কৌতুকপ্রদ, যদিও হতাশাব্যান্জ্ঞক উদহারন হল, বিখ্যাত মহান প্রার্থনার পরীক্ষা: রোগীদের জন্য দোয়া করলে কি তা তাদের রোগ নিরাময়ে সহায়তা করে। রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের জন্য আরোগ্য লাভের উদ্দেশ্যে ব্যাক্তিগত ভাবে এবং আনুষ্ঠানিক উপাসনালয়ে সাধারনতঃ  প্রার্থনা করা হয়ে থাকে। ডারউইনের আত্মীয় ফ্রান্সিস গালটন প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষনা করেছিলেন প্রার্থনার কার্য্যকারিতা নিয়ে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন প্রতি রোববারে ইংল্যান্ডের সকল চার্চে, সমবেত সবাই প্রকাশ্যে রাজপরিবারের সুস্বাস্থ্যর জন্য প্রার্থন করে থাকে। সুতরাং স্বভাবতই তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী স্বাস্থ্যবান থাকা উচিৎ,আমাদের তুলনায়, যাদের জন্য শুধুমাত্র কাছের মানুষ ছাড়া আর কেউ প্রার্থনা করেনা। গালটন বিষয়টি বিশ্লেষন করেন, এবং পরিসংখ্যানগত ভাবে কোন পার্থক্যই খুজে পেতে ব্যর্থ হন। তার উদ্দেশ্য হয়ত ছিল ব্যঙ্গাত্মক, এরপর যখন তিনি নিজে কিছু ভাগ ভাগ করা জমির জন্য প্রার্থনা করেন, প্রার্থনা করা জমিতে লাগানো গাছ, প্রার্থনা করা হয়নি জমি গাছ থেকে দ্রুত বাড়ে কিনা তা দেখতে ( গাছ দ্রুত বাড়েনি); সাম্প্রতিক সময়ে, পদার্থবিদ রাসেল স্ট্যানার্ড (ব্রিটেনের সুপরিচিত তিন জন ধার্মিক বিজ্ঞানীর একজন)  এধরনের একটি গবেষনার উদ্যোগে নেন -অবশ্যই টেম্পলটন ফাউন্ডেশনের অর্থ সাহায্যে, অসুস্থ রোগীদের জন্য প্রার্থনা করলে তাদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটে,এই প্রস্তাবটিকে পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে যাচাই করার লক্ষ্যে[২৫]।

এধরনের গবেষনা নিয়মমাফিক করতে গেলে অবশ্যই ডাবল ব্লাইন্ড হতে হয়, এবং এই মানটা কঠোর ভাবে অনুসরন করতে হয়। বিভিন্ন গ্রুপে রোগীদের সম্পুর্ন  র‌্যান্ডমভাবে বন্টন করা হয়, একটি পরীক্ষাধীন গ্রুপ ( যারা প্রার্থনা পাবে), এবং একটি কন্ট্রোল গ্রুপ ( কোন প্রার্থনা যারা পাবে না), রোগী, চিকিৎসক, সেবাপ্রদানকারী, এমনকি গবেষক, কারোরই জানার অনুমতি থাকবে না, কোন রোগী প্রার্থনা পাচ্ছে আর কে পাচ্ছে না। যারা পরীক্ষা মুলক প্রার্থনা করবেন তাদের অবশ্য আলাদা আলাদা করে নাম জানতে হবে, তাদের নাম ধরে প্রার্থনা করতে। নয়ত তারা কিভাবে জানবেন,তারা কার জন্য প্রার্থনা করছে। কিন্তু বিশেষ নজর রাখা হয়েছে যেন প্রার্থনাকারী যার জন্য প্রার্থনা করছেন,তার নামের প্রথম অংশ আর পদবীর আদ্যাক্ষরটি শুধু জানতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, ঈশ্বরের পক্ষে্ এতটুকু তথ্যই যথেষ্ট, সঠিক হাসপাতালের শয্যা শনাক্ত করার জন্য।

এধরনের কোন গবেষনা করার পরিকল্পনার যথেষ্ট পরিমান ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্য আর বিদ্রুপের শিকার হওয়া স্বাভাবিক এবং যথেষ্ট পরিমান তা জুটেছিল এই প্রকল্পের ভাগ্য। আমি যতদুর জানি বব নিউহার্ট এটা নিয়ে কোন কৌতুক নক্সা করেননি, কিন্তু আমি তার কন্ঠ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি:

কি বললে তুমি, ঈশ্বর, তুমি আমার নিরাময় করতে পারবে না কারন আমি কন্ট্রোল গ্রুপ?… ওহ,  আমি বুঝেছি, আমার খালার দোয়া যথেষ্ট না। কিন্তু ঈশ্বর, আমার পাশের বিছানার মিঃ ইভান্স,… এটা কি ঈশ্বর, মিঃ ইভান্স প্রতি দিন এক হাজার প্রার্থনা পায়, কিন্তু ঈশ্বর মিঃ ইভান্স হাজার জনকে চেনেই না।…..ওহ, তারা শুধু জন ই বলে তাকে চেনে, কিন্ত ঈশ্বর কেমন করে তুমি বুঝলে তারা আসলে জন ইলসওয়ার্থীর জন্য দোয়া করছে না। ওহ ঠিক, তুমি তোমার অসীম জ্ঞান ব্যবহার করে বের করে ফেলেছ, কোন জন ই র জন্য দোয়া করা হচ্ছে। কিন্তু ঈশ্বর …….

সাহসের সাথে সব হাসি ঠাট্টা একপাশে সরিয়ে গবেষক দল তাদের কাজ করে গেলেন, বোস্টনের কাছে অবস্থিত মাইন্ড/বডি মেডিকেল ইন্সটিটিউটের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ হার্বার্ট বেনসন নেতৃত্বে টেম্পলটন ফাউন্ডেশনের ২.৪ মিলিয়ন ডলার খরচ করে। টেম্পলটন ফাউন্ডেশনের এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইতিপূর্বে ডাঃ বেনসন মন্তব্য করেছিলেন: ’ তিনি বিশ্বাস করেন চিকিৎসার ক্ষেত্রে ইন্টারসেশরী বা অপরের মঙ্গলের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা কার্যকারিতার উপযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে’ ; সেকারনে নিশ্চিতভাবে গবেষনার লাগাম ছিল উপযুক্ত মানুষের হাতেই, যা সন্দেহবাদীদের প্রভাবে ক্ষতি হবার সম্ভাবনা ছিল খুব ক্ষীন। ডাঃ বেনসন এবং তার গবেষক দল, ছয়টি হাসপাতালে মোট ১৮০২ জন রোগীকে পর্যবেক্ষন করেন, এদের প্রত্যেকেরই করোনারী বাইপাস সার্জারী হয়েছিল। রোগীদের মোট তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়, গ্রুপ ১: প্রার্থনা পায়, কিন্তু তারা তা জানতো না, গ্রুপ ২: (কন্ট্রোল গ্রুপ) কোন প্রার্থনা পায় না তারা এবং সেটা তাদের জানা ছিল না, গ্রুপ ৩: প্রার্থনা পায় এবং তারা তা জানতো। ইন্টারসেশরী প্রার্থনার কার্যকারিতা নিয়ে তুলনামুলক সমীক্ষা হয়, গ্রুপ ১ এবং ২ এর মধ্যে।গ্রুপ ৩ কে পরীক্ষা করা হয়  যেহেতু তারা জানত  মঙ্গল কামনা করে তাদের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে ,এই তথ্যটি তাদের উপর কোন মনোদৈহিক কোন প্রভাব ফেলেছে কিনা তা দেখবার জন্য।

প্রার্থনা করেন তিনটি চার্চের সদস্যরা, একটি মিসিসিপিতে, একাটি ম্যাসাচুসেটস এ, একটি মিসৌরিতে অবস্হিত, প্রত্যেকটিরই অবস্থান হাসপাতাল থেকে দুরে। ইতিপূর্বে যা ব্যাখ্যা করেছি, প্রার্থনাকারী ব্যাক্তিকে, সে যার জন্য প্রার্থনা করবে তার নামের প্রথমাংশ, এবং পদবীর প্রথম আদ্যাক্ষরটি জানানো হয়েছিল।  যত দুর সম্ভব ততদুর পর্যন্ত্য প্রতিটি গবেষনার বিভিন্ন পরিমাপের নির্দিষ্ট কিছু মানদ্ন্ড থাকা উচিৎ, সেকারনে প্রত্যেক প্রার্থনাকারীকে তাদের প্রার্থনায় ’সফল সার্জারীসহ কোন জটিলতা ছাড়াই দ্রুত আরোগ্য লাভ করুক’ বাক্যটি যোগ করে নিতে বলা হয়েছিল।

এপ্রিল ২০০৬ এ আমেরিকান হার্ট জার্ণালে এই গবেষনার ফলাফল প্রকাশ করা হয় এবং ফলাফল খুব সুস্পষ্ট। প্রার্থনা পেয়েছে আর পাইনি এই দুই গ্রুপের মধ্যে কোন পার্থক্যই পাওয়া যায়নি। অবাক হবার ব্যাপার, পার্থক্য পাওয়া গেছে যারা জানতো তাদের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে আর যারা কোনভাবে জানত না তাদের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে কিনা, কিন্ত প্রমানের মিলেছে উল্টোদিকে। যারা জানত তাদের দ্রুত আরোগ্যলাভের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে, তারা অনেক বেশী জটিলতায় ভুগেছে অন্য গ্রুপের তুলনায়। ঈশ্বর কি তার অপছন্দ জানিয়ে একটু ধাক্কা দিলেন, এরকম সম্পুর্ন পাগলামীর একটা গবেষনা পরিচালনা করার জন্য। আরো সম্ভাব্য কারন মনে হয় যে ঐ রোগীরা যারা আগেই জানতো তাদের জন্য প্রার্থনা করা হচ্ছে, তারা হয়ত একধরনের বাড়তি চাপ অনুভব করেছিল: গবেষকদের ভাষায় যা পারফরমেন্স দুশ্চিন্তা। গবেষকদের একজন, ডাঃ চার্লস বেথেয়ার ভাষায়, হয়ত তারা ভেবেছে, আমি কি এতই অসুস্থ্য যে তাদেরকে প্রার্থনাকারীদের শরনাপন্ন হতে হয়েছে। বর্তমান মামলাপ্রিয় সমাজে, আশা করা কি খুব অতিরিক্ত মনে হবে যে, ঐ রোগীগুলোর জটিলতা হওয়ার কারন হচেছ তারা জানত তারা পরীক্ষামুলক প্রার্থনা পাচ্ছে। টেম্পলটন ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে সবাই মিলে একটা ক্লাস অ্যাকশন মামলা করা সম্ভাবনা থেকে যায় ।

অবাক হবার কোন কারন ছিল না, যখন এই গবেষনা ধর্মতাত্ত্বিকরা আগেই বিরোধিতা করেছিলেন কারন হয়ত এমন গবেষনার সম্ভাবনা আছে ধর্মকে উপহাসের বস্তুতে পরিণত করার। অক্সফোর্ডের ধর্মতাত্ত্বিক রিচার্ড সুইনবার্ন, গবেষনার ফলাফল কাঙ্খিত না হবার পর, এর বিরোধিতা করে লিখেছিলেন এই যুক্তি দিয়ে, ঈশ্বর শধুমাত্র সেই সব প্রার্থনার জবাব দেন, যদি তা ভালো কোন উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় [২৬]; শুধুমাত্র ডাবল ব্লাইন্ড স্টাডির জুয়ার ছক্কার দানের মত কারো জন্য প্রার্থনা না করে বরং অন্য কারো জন্য প্রার্থনা করা , কোন ভাল কারন না। ঈশ্বর খুব ভালোই বুঝতে পারেন ব্যাপারটা। এটাই আমার বক্তব্য ছিল বল নিউহার্টের ব্যঙ্গরচনাটির। সুইনবার্নও ঠিক একই কথা বলেছেন। কিন্তু তার রচনার অন্য অংশে সুইনবার্ন নিজেই স্যাটায়ারের উর্ধে। যদিও প্রথমবারের মত নয়, তিনি ঈশ্বর নিয়ন্ত্রিত এই পৃথিবীর দুঃখ কষ্টের যথার্থতা প্রমান করার চেষ্টা করেছেন:

আমার কষ্ট আমাকে সুযোগ করে দেয় সাহস আর ধৈর্য্য প্রদর্শনের জন্য। আপনাকে সুযোগ করে দেয় সমবেদনা প্রকাশ এবং আমার কষ্ট লাঘবের উদ্দেশ্যে উদ্যোগী হবার জন্য। এবং সমাজকে সুযোগ করে দেয়, বেছে নেবার জন্য,প্রচুর পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করা হবে কি হবেনা, এটা কিংবা অন্য কোন একটা সুনির্দিষ্ট কষ্ট দুর করার উপায় আবিষ্কার করার উদ্দেশ্যে;যদিও মহান ঈশ্বর আমাদের দুঃখ সহ্য করতে পারেন না, তার বড় চিন্তার বিষয় হল, নিশ্চই আমরা প্রত্যেকে ধৈর্য্য, সমবেদনা, দয়া দেখাবো, এবং এভাবেই পবিত্র চরিত্র গঠন করবো। কিছু মানুষের অবশ্যই প্রয়োজন আছে তাদের নিজেদের সার্থেই অসুস্থ হবার জন্য আর কিছু মানুষের খুব বেশী আসলে প্রয়োজন আছে অসুস্থ হবার জন্য, যা অন্যদের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। একমাত্র এভাবেই কিছু মানুষ, তারা কি ধরনের মানুষ হতে চায়, সেই রকম হবার লক্ষ্যে গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অন্যদের জন্য, অসুস্থতা হয়ত তেমন কোন মুল্যবান বিষয় না।

এরকম অদ্ভুত যুক্তি,এত নিকৃষ্টভাবে ধর্মতাত্ত্বিক মনের নমুনার প্রমান, আমাকে মনে করিয়ে দিল আরেকটি ঘটনার, যখন আমি সুইনবার্ণের সাথে এবং আরো আমাদের অক্সফোর্ড এর আরেক সহকর্মী প্রফেসর পিটার এটকিনস এর সাথে একটি টেলিভিশন প্যানেলে আলোচনায় আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। এক পর্যায়ে সুইনবার্ণ হলোকষ্টের যথার্থতা প্রমান করার চেষ্টা করছিলেন, এই যুক্তিতে যে, হলোকস্ট নাকি ইহুদীদের সাহসী আর মহান হবার চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছে। পিটার এটকিনস দারুনভাবে গর্জে উঠেছিলেন, ‘আপনি যেন নরকে পচেন’; এই বাদানুবাদটি অবশ্য চুড়ান্ত সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান থেকে সম্পাদিত করা হয়েছিল। সুইনবার্ণের এই বক্তব্য তার স্বভাবসুলভ ধর্মতত্ত্বের চিহ্ন বহন করে; প্রায় একই রকম মন্তব্য তিনি হিরোশিমা নিয়ে করেছিলেন তার  ’দি এক্সিসটেন্স অব গড’ (২০০৪)বইটিতে ২৬৪ নং পৃষ্ঠায়,মনে করুন হিরোশিমার পারমানবিক বোমায় যদি একজন মানুষ কম পুড়তেন,তাহলে সেখানে সাহস এবং সমবেদনার সুযোগও খানিকটা কমে যেত…’

ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি প্রয়োগের আরেকটি উদহারন দেখা যায় সুইনবার্ণের লেখার তার আগের মন্তব্যের খানিকটা পরেই। তিনি ঠিকই প্রস্তাব করেছেন যে, ঈশ্বর যদি তার নিজের অস্তিত্ত্ব প্রমান দিতে চাইতেন, পরীক্ষাধীন বনাম কন্ট্রোল গ্রুপের হৃদরোগীদের নিরাময়ের পরিসংখ্যান সামান্য প্রভাবিত করা ছাড়া অবশ্যই আরো ভালো কোন পথ বেছে নিতেন। যদি ঈশ্বররে অস্তিত্ত্ব থাকে এবং আমাদেরকে তা তিনি প্রমান করে দেখাতে চাইতেন, তাহলে তিনি ’সারা পৃথিবী ভরে দিতেন নানা অলৌকিকতায়’; কিন্তু তারপরই সুইনবার্ণ তার তার পছন্দের কথাটা বললেন,’ ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বের স্বপক্ষে ইতিমধ্যেই অনেক প্রমান আছে,  অতিরিক্ত বেশী প্রমান আমাদের জন্য ভালো নাও হতে পারে’; অতিরিক্ত বেশী প্রমান আমাদের জন্য ভালো নাও হতে পারে,বাক্যটা আবার পড়ুন। ’অতিরিক্ত বেশী প্রমান আমাদের জন্য ভালো নাও হতে পারে’; রিচার্ড সুইনবার্ন ‍ব্রিটেনের সবচেয়ে সন্মানজনক ধর্মতত্ত্বর প্রফেসরশীপ থেকে সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন এবং ব্রিটিশ একাডেমীর একজন ফেলো। আপনি যদি ধর্মতাত্ত্বিক চান, তাহলে  এর চেয়ে বিশিষ্ট বেশী কেউ হতে পারে না। হয়ত আপনি চান না কোন ধর্মতাত্ত্বিক।

শুধুমাত্র সুইনবার্ন একমাত্র ধর্মতাত্ত্বিক নন যিনি এই গবেষনার আশানুরুপ ফলাফল না হবার কারনে এটি অস্বীকার করেছেন। রেভারেন্ড রেমন্ড জে লরেন্সকে নিউ ইয়র্ক টাইমস এ বেশ অনেকটুকু জায়গা দিয়েছিল মন্তব্য প্রতিবেদনের জন্য, কেন দায়িত্বশীল ধর্মীয় নেতারা ’স্বস্তির নিঃশ্বাস’ ফেলবেন, যে কারো জন্য বিশেষভাবে করা প্রার্থনা তার আরোগ্য লাভের উপর যে কোন প্রভাব নেই সে কারনে [২৭]; তিনি কি অন্য সুরে কথা বলতেন, যদি বেনসনের গবেষনা প্রার্থনার ক্ষমতা প্রমানে সফল হত। হয়ত না। কিন্তু আপনি নিশ্চিৎ থাকতে পারেন অনেক ধর্মতাত্ত্বিক বা পাস্টর তাই করতেন। রেভারেন্ড রেমন্ড জে লরেন্স এর লেখাটি প্রধানতঃ মনে রাখার মত কারন মুলতঃ নিম্নলিখিত ঘটনাটি তার লেখায় প্রকাশের জন্য: ‘সম্প্রতি, আমার এক সহকর্মী আমাকে বলেছিলেন, একজন নিষ্ঠাবান,শিক্ষিত মহিলা, ডাক্তারের বিরুদ্ধে তার স্বামীর চিকিৎসায় অবহেলা করেছেন বলে অভিযুক্ত করেছেন। মহিলার দাবী, তার স্বামী মুমুর্ষ থাকাকালীন ডাক্তার ব্যর্থ হয়েছে তার স্বামীর জন্য প্রার্থনা করতে’।

অন্য ধর্মতত্ত্ববিদরাও নোমা অনুপ্রানিত সন্দেহবাদীদের সাথে যোগ দিয়েছেন এই বলে যে, এধরনের প্রার্থনার কার্যকারিতা সংক্রান্ত গবেষনা অর্থের অপচয় মাত্র, কারন অতিপ্রাকৃত কোন কিছুর প্রভাব এর সংজ্ঞানুযায়ীই বিজ্ঞানের এখতিয়ারের বাইরে। কিন্তু  টেম্পলটন ফাউন্ডেশন যখন এই গবেষনা অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তারা কিন্তু মেনে নেয়,কারো মঙ্গলের জন্য প্রার্থনার কথিত ক্ষমতা প্রমানের বিষয়টা নীতিগতভাবে অন্ততঃপক্ষে বিজ্ঞানের আওতার পড়ছে। এ বিষয়ে ডাবল ব্লাইন্ড স্টাডি পরিকল্পনা করা হয়, গবেষনা করাও হয়। তাদের গবেষনায় এর স্বপক্ষে ফলাফল হতে পারতো। এবং যদি তাই হত, তাহলে কল্পনা করুন, ধর্মের পক্ষ সমর্থনকারী এমন কাউকে কি খুজে পাওয়া যেত, যারা  সেই ফলাফল প্রত্যাখান করতেন কারন ধর্মীয় ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক গবেষনার কোন সুযোগ নেই। অবশ্যই না।

বলাবাহুল্য, পরীক্ষাটির নেতিবাচক ফলাফল অবশ্যই বিশ্বাসীদের নাড়া দেবে না। বব বার্থ, মিসৌরির প্রেয়ার মিনিষ্ট্রির স্পিরিচুয়াল ডিরেক্টর, যিনি এই গবেষনায় প্রার্থনাকারী যোগান দিয়েছিলেন, বলেন: ‘বিশ্বাসী মানুষের কাছে এই গবেষনা অবশ্যই কৌতুহলোদ্দীপক,  কিন্তু আমরা অনেকদিন থেকেই প্রার্থনা করে আসছি  এবং আমরা দেখেছি প্রার্থনা কাজ করে এবং প্রার্থনা আর আধ্যাত্মিকতা বিষয়ে গবেষনাতো কেবল শুরু হলো’; হ্যা ঠিকই, সেটাই :আমরা আমাদের ’বিশ্বাস’ থেকেই জানি প্রার্থনা কাজ করে, যদি এর পক্ষে প্রমান না পাওয়া যায়, আমরা সাহসের সাথে এগিয়ে যাবো যতদিন পর্যন্ত না আমরা যে রকম ফলাফল চাই তেমনটি পাই।

 বিবর্তনবাদীদের ‘নেভিল  চেম্বারলেইন’  তোষনবাদী গোষ্ঠী:

যে সকল বিজ্ঞানীরা যারা দাবী করেন, নোমা (NOMA) -ঈশ্বর হাইপোথেসিস, বিজ্ঞান দ্বারা অনাক্রম্য একটি বিষয়, তাদের একটি সম্ভাব্য অভিসন্ধি – হলো বিশেষভাবে আমেরিকার রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বা কার্য্যক্রম, যা আসলে উস্কে দিয়েছে লোকরন্জ্ঞনবাদী বা পপুলিষ্ট ক্রিয়েশিনিজম বা সৃষ্টিবাদের হুমকি। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জায়গায় সুসংগঠিত, রাজনৈতিক যোগাযোগসম্পন্ন ও সর্বোপরি অর্থ সাহায্যপুষ্ট  শক্তিশালী প্রতিপক্ষ দ্বারা বিজ্ঞান এখন আক্রান্ত  এবং বিবর্তন শিক্ষা এ যুদ্ধের একবারে সামনের ট্রেন্চ এ অবস্থান করছে। বিজ্ঞানীরা সহানুভুতি পেতেই পারেন,কারন তারা ভীত, এছাড়া বেশীর ভাগ গবেষনার অর্থ যোগান দেয় মুলতঃ সরকার এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি করতে হয়, যেমন তাদের ভোট দেয়া ‍অজ্ঞ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে, ঠিক তেমনই শিক্ষিত সুবিদিত সমাজের কাছেও।

এধরনের হুমকির মুখে, একটি বিবর্তনবাদ রক্ষাকারী লবীও গড়ে উঠেছে, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যটির প্রতিনিধিত্ত্ব করে ন্যাশনাল সেন্টার ফর সাইন্স এডুকেশন (NCSE)। এর নেতৃত্বে আছেন ইউজেনি স্কট, বিজ্ঞানের জন্য অক্লান্ত কর্মী, ‍যিনি সম্প্রতি একটি বইও প্রকাশ করেছেন, এভল্যুশন ভারসাস ক্রিয়েশনিজম। এনসএসই র  অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হলো সুবুদ্ধিসম্পন্ন ধর্মীয় মতামত গুলোকে জয় করা এবং সংগঠিত করা । এরা হল মুলধারার চার্চে যাতায়াতকারী নারী এবং পুরুষ, যাদের বিবর্তনবাদের সাথে কোন বিরোধ নেই, এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারা বিষয়টিকে অপ্রাসঙ্গিক (অথবা কোন অদ্ভুত উপায়ে তাদের বিশ্বাসের সহায়ক) মনে করে ।   এই সব মুলধারার প্রাদ্রী, ধর্মতাত্ত্বিক, এবং উদার মনোভাবাপন্ন ধর্মবিশ্বাসীরা, যারা বিব্রত সৃষ্টিবাদ নিয়ে, কারন তা ধর্মের সনাম কলুষিত করেছে, এদের কাছে বিবর্তনবাদ রক্ষাকারী লবী চেষ্টা করছে এর পক্ষে মতামত গড়বার। এবং সেটা করার একটা উপায় হল, তাদের তুষ্ট করার অতিরিক্ত চেষ্ঠায় নোমাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা -স্বীকার করা বিজ্ঞান আদৌ ক্ষতিকর কিছু না, কারন ধর্মের দাবী থেকে বিজ্ঞান সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন।

এই গোষ্ঠীর, যাকে আমরা বিবর্তনবাদীদের ‘নেভিল চেম্বারলেইন’  গোষ্ঠী বলতে পারি,আরেকজন বিখ্যাত ব্যাক্তি হলেন দার্শনিক মাইকেল রুজ। সৃষ্টিবাদের বিপক্ষে রুজ একজন কার্য্যকর যোদ্ধা, কাগজে এবং আদালত, উভয় ক্ষেত্রে  [২৮]; তিনি নিজেকে একজন নাস্তিক হিসাবে দাবী করেন, কিন্তু প্লেবয় পত্রিকায় তার প্রকাশিত রচনায় তার মতামত প্রকাশ পায় এভাবে:

আমরা যারা বিজ্ঞানকে ভালোবাসি তাদের অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে আমাদের শত্রুর শত্রু কিন্তু আমাদের বন্ধু। প্রায়ই বিবর্তনবাদীরা সময় নষ্ট করে তাদের সম্ভাব্য মিত্র পক্ষকে অপমান করার লক্ষ্যে। ব্যপারটা বেশী সত্য ধর্মনিরেপক্ষ বিবর্তনবাদীদের ক্ষেত্রে। সৃষ্টিবাদীদের প্রতিরোধ করার চেয়ে নিরীশ্বরবাদীদের বেশী সময় কাটানো উচিৎ সহানুভুতিশীল খৃষ্টানদের বোঝাতে। যখন দ্বিতীয় পোপ জন পল ডারউইনবাদকে অনুমোদন করে চিঠি লিখেছিলেন, রিচার্ড ডকিন্স এর প্রত্যুত্তর ছিল পোপ ভন্ডামী করছেন এবং তিনি আসলেই বিজ্ঞানের ব্যাপারে এতটা সৎ হতেই পারেন না এবং এভাবে স্পষ্ট যে ডকিন্স নিজেই বরং পছন্দ করেন একজন সৎ মৌলবাদীকে।

শুধুমাত্র বিশুদ্ধ কৌশলগত দিক থেকে,  হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধজোট করার সাথে, রুজের অগভীর আবেদনটার তুলনাটি আমি বুঝতে পারি: উইনস্টোন চার্চিল বা ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট কেউই স্ট্যালিনকে বা কমিউনিজম পছন্দ করতেন না, কিন্তু তারা বুঝতে পেরেছিলেন, হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে তাদের সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে কাজ করতে হবে। সেরকমভাবে সব ধরনের বিবর্তনবাদীদের একসাথে কাজ করতে হবে সৃষ্টিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। কিন্তু আমি সবশেষে আমার সহকর্মী শিকাগোর জীনতত্ত্ববিদ জেরী কয়েনের সাথে একমত, যিনি লিখেছিলেন রুজ,

এই দ্বন্দের মুল কারনটাই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। এটা শুধুমাত্র বিবর্তনবাদ বনাম সৃষ্টিবাদ না। ডকিন্স বা উইলসনের (ই ও উইলসন, প্রখ্যাত হার্ভার্ড জীববিজ্ঞানী) মত বিজ্ঞানীদের কাছে, আসল যুদ্ধ হলো যুক্তিবাদ বনাম কুসংস্কার। বিজ্ঞান হচ্ছে যুক্তিবাদের একধরনের রুপ, অপরদিকে ধর্ম হচ্ছে কুসংস্কারের সবচেয়ে পরিচিত রুপ। তারা যাকে আরো বড় শত্রু হিসাবে দেখেন: ধর্ম, সৃষ্টিবাদ হচ্ছে ধর্মের একটা উপসর্গ মাত্র । ‍ধর্ম কিন্তু সৃষ্টিবাদ ছাড়াই ‍টিকে থাকতে পারবে, কিন্তু সৃষ্টিবাদ ধর্ম ছাড়া তার অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না [২৯]।

সৃষ্টিবাদীবাদীদের সাথে আমার একটা মিল আছে, তারা আমার মতই এবং ’চেম্বারলেইন গ্রুপের’ মত নয়,  নোমা কিংবা এর পৃথক ম্যাজিষ্টেরিয়াকে বর্জন করেছে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্র পৃথক এটা মানা তো দুরের কথা, তাদের সবচেয়ে পছন্দের কাজ এর মধ্যে নাক গলাতে। তাদের যুদ্ধ কৌশলও নোংরা। সৃষ্টিবাদীদের উকিলরা আমেরিকার গ্রাম আর মফস্বল শহরগুলোতে বিভিন্ন আদালতে বেছে বেছে সেই সব বিবর্তনবাদীদের খুজে বের করে যারা প্রকাশ্যে নাস্তিক। আমি জানি, যদিও বিরক্তকর, আমার নামও এভাবে ব্যবহার করা হয়। এটা বেশ কার্য্যকর একটা কৌশল কারন নির্বাচিত জুরীর মধ্যে এমন ব্যাক্তিরাদের থাকার সম্ভাবনা বেশী, যারা এমন বিশ্বাস নিয়ে প্রতিপালিত হয়েছেন যে, নাস্তিকরা যেন পুনর্জন্ম পাওয়া শয়তান, শিশুকামী বা ’সন্ত্রাসী’র মত তাদের অপরাধ ( সালেম এর ডাইনী এবং ম্যাকআর্থারের কমি (কমিউনিষ্টদের মত) আধুনিক সংস্করণ); যে কোন সৃষ্টিবাদীদের আইনজীবি যে আমাকে সাক্ষী হিসাবে দাড় করাবে, সাথে সাথেই সে জুরীদের মন জয় করে নেবেন, শুধু আমাকে জিজ্ঞেস করে: ’বিবর্তন সম্বন্ধে আপনার জ্ঞ্যানলাভ কি আপনাকে নাস্তিক হতে প্রভাবিত করেছে?’ আমাকে এর উত্তরে বলতে হবে হ্যা, ব্যাস ঐ এক কথাতে জুরীরা আমার বিপক্ষে চলে যাবে। কিন্তু এর বীপরিতে, ধর্মনিরপেক্ষ দিক থেকে আইনসিদ্ধ সঠিক উত্তর হবে: ’আমার ধর্ম বিশ্বাস, বা অবিশ্বাস আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, এটা আদালতের যেমন বিষয় না, তেমন বিজ্ঞানের সাথে কোনভাবে এর যোগসুত্র নেই।’ আমি সততার সাথে এভাবে কথাগুলো বলতে পারবো না, কারনগুলো, আমি  ৪র্থ অধ্যায়ে ব্যাখা করেছি।

গার্ডিয়ান পত্রিকার সাংবাদিক ম্যাডেলাইন বান্টিং  ‘হোয়াই দি ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন লবী থ্যাঙ্কস গড ফর রিচার্ড  ডকিন্স’ বা ’কেন ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন লবী রিচার্ড ডকিন্স এর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেবে’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন [৩০]; মাইকেল রুজ ছাড়া এটি লেখার সময় তিনি আরো কারো সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন এমন নিদর্শন লেখাটিতে পাওয়া যায় না; মনে হতে পারে আর্টিকেলটি ছায়ালেখক মাইকেল রুজ ( নিউ ইয়র্ক টাইমস এ ২২ জানুয়ারী ২০০৬ এ প্রকাশিত ‘হোয়েন কসমোলজী কোলাইড’ প্রবন্ধটি নিয়েও একই কথা বলা যেতে পারে; এটি লিখেছিল সন্মানিত (এবং ভালোভাবে যাকে এ বিষয়ে অবগত করা হয়েছিল) জুডিথ শুলেভিৎজ।জেনারেল মন্টোগোমারীর যুদ্ধের প্রথম রুল ছিল ’মস্কোর দিকে মার্চ না করা’. হয়তো বিজ্ঞান জার্নালিজমের  এরকম একটা প্রথম রুল থাকা দরকার: মাইকেল রুজ ছাড়া অন্ততপক্ষে একজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়া’; ড্যান ডেনেট এর জবাব দেন লাগসই ভাবে আংকেল রেমুস [৩১] এর লোককাহিনীর চতুর খরগোশের কথা উল্লেখ করে:

আমার কাছে মজার ব্যাপার হলো , দুইজন ব্রিট -ম্যাডেলাইন বান্টিং এবং মাইকেল রুজ -আমেরিকান লোকগাথার সবচেয়ে বিখ্যাত ছলচাতুরীর ফাদে পড়েছেন (কেন ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন লবী রিচার্ড ডকিন্স এর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেবে, মার্চ ২০০৭); যখন ব্রেয়ার খরগোশ শিয়ালের হাতে ধরা পড়লো, সে শিয়ালের কাছে মিনতি করলো, ’ওহ, দয়া করো ব্রেয়ার শিয়াল, যাই করো না কেন, আমাকে ঐ জঘন্য ব্রায়ার (এক ধরনের কাটাযুক্ত কান্ডের ছোট গাছ) ঝোপে ছুড়ে ফেল না’, শিয়াল ঠিক সেই কাজটা করার পর, খরগোশ নিরাপদে পালিয়ে গেল। যখন আমেরিকান প্রচারনাবিদ উইলিয়াম ডেম্বস্কী রিচার্ড ডকিন্সকে বিদ্রুপ করে লেখে এই বলে যে, তিনি যেন ভালো কাজ করে যেতে থাকেন ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন পক্ষে, বান্টিং আর রুজ সেই ফাদে পা দিয়েছেন, ওহ ! গলি, ব্রেয়ার শিয়াল, আপনার এই সুষ্পষ্ট দাবীটা -বিবর্তন সংক্রান্ত জীববিদ্যা,সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের ধারনাকে মিথ্যা প্রমান করেছে-কিন্তু ক্লাসরুমে বিজ্ঞান শিক্ষাকে হুমকির মুকে ঠেলে দেবে, কারন এ বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করলে আবার চার্চ আর রাষ্ট্রের পৃথকীকরন বিষয়টিকে লঙ্ঘন করা হবে! ঠিক, আপনাদের উচিৎ হবে শারীরবৃত্তীয় বিদ্যাকে একটু রেখে ঢেকে পড়াতে, কারন এটিতো আগেই প্রমান করেছে কুমারী কারো পক্ষে গর্ভধারন অসম্ভব….. [৩২]

এই পুরো ব্যপারটা, এমনকি স্বতন্ত্রভাবে ব্রায়ার প্যাচে ব্রেয়ার খরগোশ বিষয়টির অবতারনা করে বিষদ আলোচনা করেছেন জীববিজ্ঞানী পি যে মায়ারস, যার ফ্যারিঙ্গুলা ব্লগ থেকে আস্থার সাথে পরামর্শ নেয়া যেতে পারে তার সুতীক্ষ্ম প্রজ্ঞার জন্য [৩৩]।

আমি কিন্তু বোঝাতে চাইছি না, তোষনকারী লবীর  আমার সহকর্মীরা সবাই আবশ্যই অসৎ। তারা হয়ত আন্তরিকভাবেই নোমাতে বিশ্বাস করেন, যদিও আমি বাধ্য হই চিন্তা করতে, আসলে বিষয়টি নিয়ে তারা কতটা গভীরভাবে ভেবেছেন এবং তারা কিভাবে তাদের অর্ন্তদ্বন্দকে সামাল দিতে পেরেছেন।  আপাতত বিষয়টি নিয়ে আর নাই বা ভাবি কিন্ত কেউ যদি ধর্মসংক্রান্ত বিষয়ে বিজ্ঞানীদের প্রকাশিত বক্তব্য বোঝার চেষ্ঠা করেন, তারা এর পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটা যেন না ভুলে যান: একটা পরাবাস্তব সাংস্কৃতি যুদ্ধ এখন যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছে। নোমা ধরনের তোষনবাদ  আবার পরের অধ্যায়গুলোতে আলোচনায় আসবে। এখানে, আমি বরং আবার অ্যাগনষ্টিসিজমে এবং আমাদের অজ্ঞতাকে ধীরে ধীরে ভেঙ্গে ফেলে এবং পরিমাপসম্ভব এমন একটা স্তরে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্ব বা অনস্তিত্ব সংক্রান্ত অনিশ্চয়তাকে নিয়ে আসার সম্ভাবনায় ফিরে আসি।

ছোট সবুজ মানুষের দল:

ধরা যাক, বার্ট্রান্ড রাসেল এর  রুপক কাহিনীর বিষয় মহাশুন্যে চায়ের পট না বরং মহাশুন্যে জীবনের অস্তিত্ত্ব নিয়ে -কার্ল সাগানের সেই স্মরনীয় মন্তব্য ‘গাট দিয়ে চিন্তা করার প্রত্যাখানে’র বিষয়। আবারো আমরা বিষয়টিকে মিথ্যা প্রমান করতে পারবো না এবং একমাত্র যৌক্তিক অবস্থান হল অ্যাগনষ্টিসিজম বা অজ্ঞেয়বাদ। কিন্তু এই হাইপোথিসিসটি আর কোন হালকা বিষয় থাকে না আর। আমরা কিন্তু সাথে সাথেই একেবারে চুড়ান্ত অসম্ভাব্যতার ঘ্রান পাই না এখন। আমরা বেশ কৌতুহল উদ্দীপক একটা বিতর্ক অবতারনা করতে পারি অসমাপ্ত এই অবধি পাওয়া নানা সাক্ষ্যপ্রমানের ভিত্তিতে এবং আমরা সেই প্রমানগুলো লিপিবদ্ধ করতে পারি  যৌক্তিক উপায়ে যেগুলো আমাদের অনিশ্চয়তাকে কমাতে পারে। আমরা কিন্তু প্রচন্ড ক্ষুদ্ধ হবো, যদি আমাদের সরকার ব্যায়বহুল টেলিস্কোপের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করে যার একমাত্র কাজ হবে মহাশুন্যে চায়ের পটের সন্ধান করা। কিন্তু আমরা সেটি (SETI) বা সার্চ ফর এক্সট্রা টেরেস্টিয়াল ইন্টেলিজেন্স – ’যার মুল কাজ বুদ্ধিমান ভীনগ্রহবাসী বুদ্ধিমান সত্ত্বার কোন সংকেত খুজে পাওয়ার আশায় রেডিও টেলিস্কোপ দিয়ে মহাশুন্যর বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষন করা’ – এর ক্ষেত্রে অর্থ ব্যায় করার ব্যপারটাকে কিন্তু অন্যভাবে মুল্যায়ন করতে পারি।

আমি কার্ল সাগানের প্রশংসা করি ভীনগ্রহে প্রানের অস্তিত্বের ব্যাপারে আনুমানিক অনুভুতি নির্ভর কোন মন্তব্য করতে অস্বীকার করার জন্য। কিন্তু যে কারো পক্ষে (এবং সাগানও তাই করেছিলেন) এরকম একটা সম্ভাবনার পরিমাপ করার জন্য, আমাদের যা জানা দরকার, তার একটা সংযমী মুল্যায়ন করা সম্ভব। এটা শুরু হতে পারে আমাদের অজানা বিষয়গুলোর একটা তালিকা প্রস্তুত করার মাধ্যমে। যেমন, বিখ্যাত ড্রেক সমীকরন, যা পল ডেভিসের ভাষায় সম্ভাবনা সংগ্রহ করে। সমীকরনটির মুল বক্তব্য হল, স্বতন্ত্রভাবে বিবর্তিত সভ্যতার সংখ্যা পরিমাপের জন্য আমাদের অবশ্যই সাতটি সংখ্যাকে একসাথে পূরণ করতে হবে। এদের মধ্যে আছে, মোট নক্ষত্রর সংখ্যা, প্রতিটি নক্ষত্রের পৃথিবীর মত গ্রহর সংখ্যা এবং এর সম্ভাবনা, এগুলো এবং এছাড়া অন্য সংখ্যাগুলো যার তালিকা আমি উল্লেখ করার দরকার নেই কারন আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো এসবই অজানা অথবা পরিমাপ করা হয়েছে অনেক বেশী অনুমানের উপর ভিত্তি করে। যখন অনেকগুলো সংখ্যা হয় সম্পুর্ন অজানা অথবা পরিমাপ করা হয় অনেক বড় ভ্রান্তির মার্জিন রেখে, তার ফলাফল -ভীনগ্রহের সভ্যতার সম্ভাব্য সংখ্যায় -এতো বিশালাকৃতির ভুল থাকে যে, অ্যাগনষ্টিকতাবাদকে মনে হয় বেশী যুক্তিযুক্ত, যদিও তা একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য অবস্থান নয়।

১৯৬১ সালে প্রথম যখন তিনি সমীকরনটি লিখেছিলেন, তখনকার তুলনায় বর্তমানে  ড্রেক সমীকরনের কিছু সংখ্যা কিন্তু ইতিমধ্যে আমাদের জন্য কম অজানা এখন। সেই সময় আমাদের সৌরজগতই ছিল একমাত্র জানা গ্রহ মন্ডলী যা কেন্দ্রীয় একটি নক্ষত্রর চারপাশে ঘুরছে, এছাড়া ছিল বুহস্পতি আর শনির উপগ্রহ মন্ডল সাদৃশ্য কিছু উদহারন। মহাবিশ্বে এধরনের মন্ডলের সংখ্যা সম্বন্ধে আমাদের সবচেয়ে ভালো ধারনাটাটি ভিত্তি হল তাত্ত্বিক মডেলগুলো, যার সাথে সংযুক্ত আরেকটু বেশী অনানুষ্ঠানিক সাধারণত্বর মুলনীতি বা প্রিন্সিপাল অব মিডিওক্রিটি : আমরা ঘটনাক্রমে যেখানে বসবাস করি তার বিশেষ কোন অসাধারনত্ব নেই – এই অনুভুতিটা ( কোপার্নিকাস, হাবল, এবং অন্যান্যদের অস্বস্তিকর ইতিহাসের শিক্ষা থেকে জন্ম নেয়া); দুর্ভাগ্যজনক যে, প্রিন্সিপাল অব মিডিওক্রিটিকে আবার দুর্বল করে দিয়েছে অ্যানথ্রপিক তত্ত্ব (অধ্যায় ৪ দ্রষ্টব্য); যদি আমাদের সৌরজগত মহাবিশ্বে সত্যি একটি মাত্র হয়ে থাকে, তার সঠিক কারন হলো, সেখানে আমরা, যারা এসব বিষয় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে, সেই আমাদের বসবাস। আমাদের অস্তিত্বের গুঢ় সত্যটাই অতীতমুখী পর্যালোচনা সাপেক্ষে নির্ধারন করে দেয় যে, আমাদের বসবাস খুবই অসাধারন একটি স্থানে।

সৌরজগতের সর্বব্যাপিতা সম্বন্ধে বর্তমানে আমাদের পরিমাপ কিন্তু আর আগের মতন প্রিন্সিপাল অব মিডিওক্রিটির উপরে নির্ভর করে নেই; প্রত্যক্ষ প্রমানের দ্বারা তথ্যসম্মৃদ্ধ। কমতের এর পজিটিভিজমের উচিৎ প্রতিফল, স্পেক্ট্রোস্কোপ আবারও প্রমান করেছে। আমাদের টেলিস্কোপে এখনও এতটা শক্তিশালী হয়নি যে নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহদের সরাসরি দেখতে সক্ষম। নক্ষত্রের অবস্থান সুক্ষ পরিবর্তন হয় তার চতুর্দিকে ঘুর্ণায়মান গ্রহদের মধ্যাকর্ষনের টানে আর  নক্ষত্রের আলোর বর্ণালী বিশ্লেষনের মাধ্যমে ডপলার ইফেক্ট শনাক্ত করে স্পেক্ট্রোস্কোপ, অন্ততপক্ষে যেখানে মধ্যাকর্ষন টানের কারন গ্রহটির আকার অনেক বৃহৎ। বেশীরভাগ সময় এভাবেই, আমার এই লেখার সময়, আমরা সৌরজগতের বাইরে ১৪৭টি নক্ষত্রের কক্ষপথে ঘুর্ণায়মান ১৭০ টি গ্রহর সন্ধান পেয়েছি [৩৪]; এবং  এই সংখ্যা অবশ্যই বেড়ে যাবে যখন আপনারা এই বইটা পড়বেন। আপাতত এই গ্রহগুলো সব বড় আকারের ‘বৃহস্পতির মত; কারন বৃহস্পতির আকারের বড় গ্রহই কেবল পারে তাদের নক্ষত্রর আলোর বর্নালীতে পরিবর্তন আনতে যেটা শনাক্ত করার ক্ষমতা আছে বর্তমান সময়ের স্পেক্ট্রোস্কোপের। আমরা অন্ততপক্ষে পরিমানগত দিক থেকে ড্রেক সমীকরনের একটি অজানা সংখ্যার কিছুটা উন্নতি করেছি। এর ফলে এই সমীকরনের শেষ ফলাফল সম্বন্ধে আমাদের অ্যাগনষ্টিকবাদে সামান্য হলেও, গুরুত্বপুর্ন পরিবর্তন ঘটেছে। অন্য গ্রহে প্রানের অস্তিত্ব থাকা নিয়ে আমরা এখনও হয়তো অ্যাগনষ্টিক থাকতে বাধ্য – কিন্তু কিছুটা অবশ্যই কম অ্যাগনষ্টিক, কারন আমরা আগের চেয়ে আমাদের অজ্ঞতাকে একটু কমাতে পেরেছি। বিজ্ঞান ধীরে ধীরে অ্যাগনষ্টিকবাদের পরিমানকে কমিয়ে দিতে সক্ষম, যেমন করে হাক্সলী ঈশ্বরের বিশেষ অবস্থানটি অস্বীকার করেছিলেন সবাইকে তুষ্ট করার অতিরিক্ত প্রচেষ্ঠায়। আমার যুক্তি হলো, হাক্সলী, গুল্ড এবং অনেকের নম্র সংযম সত্ত্বেও , ঈশ্বর প্রশ্নটি  নীতিগতভাবে এবং চিরকালের মত বিজ্ঞানের আওতা বহির্ভুত না। কমতের ধারণার বীপরিতে যেমন নক্ষত্রের প্রকৃতি, আর তার চারপাশে কক্ষপথে জীবনের অস্তিত্ত্ব থাকার সম্ভাবনা, অন্ততপক্ষে বিজ্ঞান পারে  অ্যাগনষ্টিকতাবাদের ভুখন্ডে সম্ভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটাতে।

ঈশ্বর হাইপোথিসিস সম্বন্ধে আমার সংজ্ঞায় ‘অতিমানবীয়’, ’অতিপ্রাকৃত’ এসব শব্দগুলো সংযুক্ত। এদের মধ্যে পার্থক্যটা স্পষ্ট করতে, কল্পনা করুন যে একটি সেটি (SETI) রেডিও টেলিস্কোপ সত্যি সত্যি মহাশুন্য থেকে একটা সংকেত শনাক্ত করলো, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমান করলো, মহাবিশ্বে আমরা একা নই।  প্রসঙ্গক্রমে, কোন ধরনের সংকেত পেলে আমরা বিশ্বাস করবো যে তা আসলেই কোন বুদ্ধিমান প্রানীর সৃষ্টি?এটা কিন্তু তুচ্ছ প্রশ্ন নয়। একটা ভালো উপায় হচ্ছে, যদি প্রশ্নটাকে উল্টে নেই। আমরা বুদ্ধিমত্তার সাথে কি করতে পারি, পৃথিবীর বাইরে কোন বুদ্ধিমান প্রানীদের কাছে আমাদের অস্তিত্ত্ব প্রচার করার লক্ষ্যে? ছন্দময় পাল্স দিয়ে কাজটা করা হবে না। জোসেলীন বেল বার্ণেল, রেডিও জোতির্বিজ্ঞানী, যিনি ১৯৬৭ সালে প্রথম পালসার আবিষ্কার করেছিলেন, এর ঠিক ১.৩৩ সেকেন্ডের নিয়মিত পর্যায়ক্রমটি অবাক হয়ে নাম রেখেছিলেন, মজা করে, এলজিএম (LGM:little green man signal) সংকেত। পরবর্তীতে মহাশুণ্যের অন্য একটি জায়গায় তিনি দ্বিতীয় পালসারটি আবিষ্কার করেন, যার সংকেতের পর্যায়ক্রম ছিল ভিন্ন, যা ভালোভাবেই এলজিএম হাইপোথিসিসকে মিথ্যা প্রমান করে। অনেক বুদ্ধিমত্ত্বাহীন উৎস থেকে মেট্রোনমিক বা নিয়মিত ছন্দ বা পর্যায়ক্রমের সংকেতের উৎপত্তি হতে পারে, যেমন দোল খাওয়া গাছের ডাল, ফোটা ফোটা করে পড়া পানির বিন্দু থেকে,ঘুর্ণায়মান আর কক্ষপথে প্রদক্ষিনরত মহাজাগতিক বস্তু। আমাদের ছায়াপথে হাজারের বেশী পালসার পাওয়া গেছে, এবং এখন স্বীকৃত যে, এরা আসলে হচ্ছে ঘুর্ণায়মান নিউট্রন নক্ষত্র, যারা বাতিঘরের আলোর মত চারপাশে বেতার তরঙ্গ নিঃসরণ করে। কল্পনা করতে অবাক লাগে এমন নক্ষত্রের কথা যা কিনা সেকেন্ডের মধ্যে নিজ কক্ষে ঘুরছে (ভাবুন আমাদের দিনের দৈর্ঘ্য ২৪ ঘন্টার বদলে ১.৩৩ সেকেন্ড), নিউট্রন নক্ষত্র সম্বন্ধে আমরা যা জানি তার সবকিছু অবাক করার মত। আসল কথা হলো পালসার এর ব্যাপারটি সাধারন পদার্থবিদ্যার একটি ঘটনা, কোন বুদ্ধিমত্ত্বার সৃষ্টি নয়।

তাই শুধু নিয়মিত ছন্দময় কিছু অপেক্ষমান মহাবিশ্বের কাছে আমাদের বুদ্ধিদ্বীপ্ত উপস্থিতির জানান দেবে না। প্রাইম সংখ্যা অনেক সময় পছন্দের একটা ব্যাপার হয়ে আসে। কারন শুধুমাত্র কোন ভৌত উপায়ে  এ সংখ্যা তৈরী করা সম্ভব নয়। প্রাইম সংখ্যা শনাক্ত করে হোক বা অন্য কোন উপায়ে হোক, কল্পনা করুন ‍সেটি মহাশুন্যে বুদ্ধিমান প্রানীর উপস্থিতির অকাট্য প্রমান পেল , এর পরে হয়তো বিশাল আকারের তথ্য এবং জ্ঞানের আদান প্রদান হলো , বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, যেমন ফ্রেড হয়েলের ’এ ফর অ্যান্ড্রোমিডা’ বা কার্ল সাগানের ’কনটাক্ট’ এর মত। আমরা কিভাবে এর প্রত্যুত্তর দেব? ক্ষমার যোগ্য একটা প্রতিক্রিয়া হতে পারে এমন কিছু যা অনেকটাই উপাসনার মত,  যে সভ্যতার ক্ষমতা আছে এতো বিশাল দুরত্ব থেকে সংকেত পাঠাতে, সেই সভ্যতা আমাদের তুলনায় অনেক অগ্রবর্তী হওয়ারই সম্ভাবনা বেশী। এমনকি যদি ঐ সভ্যতা সংকেত পাঠানোর সময় আমাদের চেয়ে খুব একটা বেশী উন্নত না হয়েও থাকে,  এই অতিবিশাল দুরত্ব আমাদের হিসাব করতে বাধ্য করায়, যে সময় আমরা তাদের সংকেত শনাক্ত করছি তারা হয়তো কয়েক সহস্র বছর আমাদের থেকে এগিয়ে গেছে ( যদিনা অবশ্য তারা নিজেদেরকে ধ্বংশ না করে ফেলে, যা কিন্তু অসম্ভব না)।

আমরা তাদের সম্বন্ধে কখনো জানতে পারি বা না পারি,  সম্ভাবনা আছে, যে  ভীনগ্রহের সভ্যতা আছে যারা অতিমানবিক, অনেক দিক থেকে দেবতুল্য, যে কোন ধর্মতাত্ত্বিকের কল্পনাতীত। তাদের কারিগরী অগ্রগতি আমাদের কাছে অতিপ্রাকৃত মনে হবে, যেমন অন্ধকার যুগের কোন কৃষককে যদি একবিংশ শতাব্দীতে নিয়ে আসা যায়, কল্পনা করুন তার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে ল্যাপটপ বা  মোবাইল টেলিফোন, হাইড্রোজেন বোমা, জাম্বো জেট দেখে। আর্থার সি ক্লার্ক যেমন লিখেছিলেন, তার তৃতীয় আইনে: ’কোন যথেষ্ট পরিমান উন্নত কোন প্রযুক্তিকে আসলে  ম্যাজিক থেকে আলাদা করা যায়না’; আমাদের সভ্যতা যে প্রযুক্তি তৈরী করেছে, প্রাচীন মানুষের কাছে তা মোজেস এর সাগর দুই ভাগ করা বা যীশুর পানির উপর হাটা থেকে, কোন অংশে কম অলৌকিক মনে হবে না। আমাদের সেটি সংকেতের ভীনগ্রহবাসীরা আমাদের কাছে দেবতাদের মতই মনে হতে পারে, যেমন করে, মিশনারীদের মনে করেছিল ( এবং তারা যেভাবে তাদের অযোগ্য সন্মানকে অপব্যবহার করেছে চরমভাবে) প্রস্তর যুগীয় সভ্যতার মানুষরা যখন তারা তাদের দেশে এসেছিল অস্ত্র, টেলিস্কোপ, দিয়াশলাই আর পরবর্তী গ্রহনের তারিখ সেকেন্ড পর্যন্ত্য নির্ণয়ের জন্য পঞ্জিকা সাথে নিয়ে।

তাহলে কোন অর্থে, অতি উন্নত সেটি ভীনগ্রহীরা দেবতা হবে না? তাহলে কোন অর্থে তারা অতিমানবীয় হবে, তবে অতিপ্রাকৃত হবে না? খুব গুরুত্বপুর্ন  একটি অর্থে, যা এই বইটির অন্তর্নিহিত বক্তব্য। দেবতা আর দেবতাতুল্য ভীনগ্রহীদের মধ্যে পার্থক্য তাদের গুনাবলীতে না,তাদের উৎপত্তিতে। যে কোন প্রানী যা এত জটিল যে তার বুদ্ধিমত্তা আছে, সে একটি বিবর্তন পক্রিয়ার ফসল। যখন তাদের সাথে আমাদের দেখা হবে তখন যতই তাদের দেবতাতুল্য মনে হোক না কেন, তাদের শুরুটা কিন্তু এভাবে হয়নি। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর লেখক যেমন, ড্যানিয়েল এফ গালোউয়ে, ‘কাউন্টারফিট ওয়ার্ল্ড’ এ এমনকি প্রস্তাব করেছেন ( আমি চিন্তা করতে পারছি না  কিভাবে তা ভুল প্রমান করব) যে আমরা কম্পিউটারের সৃষ্ট কাল্পনিক জগতে বাস করছি যা নিয়ন্ত্রন করছে অতি উন্নত একটি সভ্যতা। কিন্তু যারা এই জগতটা তৈরী করেছে তাদেরও কোন এক জায়গা থেকে আসতে হবে। সম্ভাবনার নীতি অনুযায়ী সরল  সাধারন পুর্বসুরী ছাড়া তাদের স্বতঃস্ফুর্তভাবে সৃষ্ট হবার সকল ধারনা নাকচ হয়ে যায়। তারাও সম্ভবতঃ তাদের অস্বিত্ত্বের জন্য এক ধরনের( হয়ত অপরিচিত এবং ভিন্ন) ডারউইনবাদের কাছের ঋণী: ড্যানিয়েল ডেনেটের শব্দ ব্যবহার করে বলা যায় ’স্কাইহুকের’ ‘ পরিবর্তে একধরনের ক্রমবর্ধমান (একদিকে ঘুরতে পারে এমন)  হুক সমৃদ্ধ দাঁতালো চাকাযুক্ত ‘’’ক্রেইন’ [৩৫] ; স্কাইহুক – সব দেবতাসহ -শুধুমাত্র যাদুর খেলা। তারা প্রকৃতার্থে আন্তরিকভাবে কোন কিছুর ব্যাখ্যা করে না, এবং তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যার চেয়ে আরো বেশী ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থেকে যায়। ক্রেইন হলো সেই ব্যাখ্যাকারী যন্ত্র, যা আসলে পূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম। আর প্রাকৃতিক নির্বাচন হলো সর্বকালের সেরা ক্রেইন। যা জীবনকে আদিমতম সরলতা থেকে জটিলতা, সৌন্দর্য্য আর সুস্পষ্টরুপে প্রতীয়মান নকশার সুউচ্চ শিখরে নিয়ে গেছে যা আমাদের বিস্মিত করে আজ। চতুর্থ অধ্যায়ে ‘’কেন প্রায় নিশ্চিৎভাবে কোন ঈশ্বর নেই’ এর এটাই হবে মুল ভাব । কিন্তু প্রথমে, সক্রিয়ভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ত্বকে অবিশ্বাস করার আমার মুল কারনে প্রবেশের আগে, আমার দ্বায়িত্ব হল  বিশ্বাসের স্বপক্ষে ঐতিহাসিক সময় থেকে প্রস্তাবিত সকল ইতিবাচক যুক্তিগুলো খন্ডন করা।

((((((( দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত))))))

_____________________________________

[১] Mitford and Waugh (2001) : The Letters of Nancy Mitford and Evelyn Waugh. New York: Houghton Mifflin.
[২] http://www.newadvent.org/cathen/06608b.htm.
[৩] http://www.catholic-forum.com/saints/indexsnt.htm?NF=l.
[৫] Phenomenology is the study of structures of consciousness as experienced from the first-person point of view. The central structure of an experience is its intentionality, its being directed toward something, as it is an experience of or about some object. An experience is directed toward an object by virtue of its content or meaning (which represents the object) together with appropriate enabling conditions.
[৬]Congressional Record, 16 Sept. 1981.
[৭]http://www.stephenjaygould.org/ctrl/buckner_tripoli.html.

[০৮]   Robert I. Sherman, in Free Inquiry 8: 4, Fall 1988, 16.
[০৯]  N. Angier, ‘Confessions of a lonely atheist’, New York Times Magazine, 14 Jan. 2001:http://www.geocities.com/mindstuff/Angier.html.
[১০]  http://www.fsgp.org/adsn.html.
[১১]  An especially bizarre case of a man being murdered simply because he was an atheist is recounted  in the newsletter of the Free  thought Society of Greater Philadelphia for March/Apri 2006. Go to http://www.fsgp.org/newsletters/newsletter_ 2006_0304.pdf and scroll down to ‘The murder of Larry Hooper’.
[১২] http://www.secular.org/news/pete_stark_070312.html
[১৩] http://www.hinduonnet.com/thehindu/mag/2001/ll/18/stories/2001111800

[১৪] Quentin de la Bedoyere, Catholic Herald, 3 Feb. 2006
[১৫] Carl Sagan, ‘The burden of skepticism’, Skeptical Inquirer 12, Fall.1987.
[১৬] A question that has been around for a long time. It is also a question that can produce heated discussion since there seems to be good reasons for anwering it either way.  for example, does a tree make a sound if it falls in a forest with no one around. – yes, the tree will make a sound; no, the tree will not make a sound.
[১৭] Dawkins, R. (1998). Unweaving the Rainbow. London: Penguin.
[১৮] T. H. Huxley, ‘Agnosticism’ (1889), repr. in Huxley (1931). The complete text of ‘Agnosticism’ is also available at http://www. infidels. org/library/historical/thomas_huxley/huxley_wace/part_02.html.

[১৯]  Russell, ‘Is there a God?’ (1952), repr. in Russell (1997b). Russell, B. (1957). Why I Am Not a Christian. London: Routledge. Russell, B. (1993). The Quotable Bertrand Russell. Amherst, NY: Prometheus.
[২০] হয়তো আমি একটু তাড়াতাড়ি কথাটা বলে ফেললাম, ২০০৫ সালের ৫ জুন The Independent on Sunday একটি খবর প্রকাশ করে: মালায়শীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, যে ধর্মীয় সেক্টটি, পবিত্র চা’ এর পট এর আকারে একটি বাড়ি বানিয়েছে, তারা গৃহনির্মান সংক্রান্ত নীতিমালাগুলো সুস্পষ্ট লংঘন করেছেন। এছাড়া বিবিসি’র খবরটি দেখুন এখানে: http://news.bbc.co.uk/2/hi/asia-pacific/4692039.stm
[২১] Andrew Mueller, ‘An argument with Sir Iqbal’, Independent on Sunday, 2April 2006, Sunday Review section, 12-16.
[২২] ক্যাম্প কোয়েস্ট যুক্তরাষ্ট্রের সামার ক্যাম্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ব্যতিক্রম এবং এটি সম্পুর্ন প্রশংসনীয় একটি দিকে এই সংস্কৃতিটাকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। অন্যান্য সামার ক্যাম্পগুলো যা একটি ধর্মীয় এবং স্কাউট নির্ভর মুল্যবোধের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়,কেন্টাকীতে এডউইন এবং হেলেন কাগিন এর প্রতিষ্ঠিত ক্যাম্প কোয়েষ্ট পরিচালিত হয় ধর্মনিরেপক্ষ মানবতাবাদী নৈতিকতার উপর। শিশুদের এখানে সংশয় এবং প্রশ্নের সাথে সবকিছুকে বিচার করার জন্য প্রণোদনা দেয়া হয়, এর সাথে অন্যান্য বাইরের নানা কার্যক্রমতো আছেই (www.camp-quest.org)। ক্যাম্প কোয়েস্টর এর মত আরো বেশ কিছু সামার ক্যাম্প গড়ে উঠেছে টেনিসি,মিনোসোটা, মিশিগান, ওহাইও এবং কানাডায়)
[২৩] New York Times, 29 Aug. 2005. Henderson, B. (2006). The Gospel of the Flying Spaghetti Monster. New York: Villard.
[২৪] Henderson, B. (2006). The Gospel of the Flying Spaghetti Monster. New York: Villard.
[২৫] http://www.lulu.com/content/267888.
[২৫]  H. Benson et al., ‘Study of the therapeutic effects of intercessory prayer (STEP) in cardiac bypass patients’, American Heart Journal:151: 4, 2006, 934-42.
[২৬] Richard Swinburne, in Science and Theology News, 7 April 2006, http://www.stnews.org/Commentary-2772.htm.
[২৭]  New York Times, 11 April 2006.
[২৮] In court cases, and books such as Ruse, M. (1982). Darwinism Defended: A Guide to the Evolution Controversies. Reading, MA: Addison-Wesley. His article in Playboy appeared in the April 2006 issue.
[২৯]  Jerry Coyne’s reply to Ruse appeared in the August 2006 issue of Playboy.
[৩০] Madeleine Bunting, Guardian, 27 March 2006
[৩১] Uncle Remus is a fictional character, the title character and fictional narrator of a collection of African American folktales adapted and compiled by Joel Chandler Harris, published in book form in 1881. A journalist in post-Reconstruction Atlanta, Georgia, Harris produced seven Uncle Remus books.
[৩২] Dan Dennett’s reply appeared in the Guardian, 4 April 2006.
[৩৩]http://scienceblogs.com/pharyngula/2006/03/the_dawkinsdennett_boogeyman.
php;http://
scienceblogs.com/pharyngula/2006/02/our_double_standard.php; http://scienceblogs.com/pharyngula/2006/02/the_rusedennett_feud.php.
[৩৪]  http://vo.obspm.fr/exoplanetes/encyclo/encycl.html.
[৩৫]  Dennett, D. (1995). Darwin’s Dangerous Idea. New York: Simon & Schuster.

Advertisements
ঈশ্বর হাইপোথিসিস

4 thoughts on “ঈশ্বর হাইপোথিসিস

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s