কুকুর, গরু এবং বাধাকপি


শীর্ষ ছবি: চিহুয়াহুয়া (Chihuahua) এবং গ্রেট ডেন (Great Dane): দুজনেই চামড়ার নীচে আসলে নেকড়ে। মাত্র কয়েক শতাব্দীর কৃত্রিম নির্বাচন বা সিলেকটিভ ব্রীডিং এর ফলে সৃষ্ট এই দুই জাতের কুকুরের ব্যাহ্যিক চেহারা দেখে তা কি অনুমান করা সম্ভব?

ভুমিকা: লেখাটি  রিচার্ড ডকিন্স ( Richard Dawkins) এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ  (The Greatest Show on Earth: The evidence for Evolution) এর দ্বিতীয় অধ্যায় Dogs, Cows and Cabbages র একটি অনুবাদ প্রচেষ্টা।
_____________________________________ 

দ্বিতীয় অধ্যায়: কুকুর, গরু এবং বাধাকপি

একজন ডারউইনের কেন এই দৃশ্যে উপস্থিত হতে এত দীর্ঘ সময় লেগেছিল? আসলেই কি প্রলম্বিত করেছিল মানবজাতির বিবর্তনের এ‌ই সুস্পষ্ট সহজবোধ্য ধারনাটিতে পৌছাতে ; যে ধারনাটি দৃশ্যতই মনে হয় যে এর প্রায় দুই শতাব্দী আগে আমাদেরকে উপহার দেয়া নিউটনের গানিতীক ধারনাটির বা এমনকি দুই হাজার বছর আগে আর্কিমিডিসের এর ধারনাটির চেয়েও অনেক বেশী সহজবোধ্য-? এই প্রশ্নের জবাব হিসাবে বেশ কিছু উত্তরও প্রস্তাব করা হয়েছে ইতিমধ্যে। যে অকল্পনীয় পরিমান সময়ের প্রয়োজন এই বিশাল পরিবর্তনের জন্য সেটা অনুভব করে হয়ত আমাদের মন সচেতনভাবেই শঙ্কা বোধ করেছে কিংবা আমরা আজ যাকে ভুতাত্ত্বিক গভীর সময় বা জিওলজিকাল ডিপ টাইম বলছি এবং যে ব্যক্তিটি সেই সময়টা বুঝতে চাইছেন, তার জীবনকালের দৈর্ঘ্যর সাথে এটির অসামন্জষ্যতা হয়ত  সেই সুবিশাল সময়টার ব্যাপ্তি বোঝার জন্য প্রতিবন্ধকতার কারন হয়েছিল। হয়ত বা এর কারন হতে পারে, ধর্মীয় দীক্ষা, যা আমাদের পিছু টেনে ধরেছিল। অথবা এর কারন হতে পারে, জীবিত অঙ্গ, যেমন চোখের অসাধারন এবং অন্যকিছু ভাবার জন্য নিরুৎসাহিত করার মত যার জটিলতা,যেন এটি কোন এক  মাষ্টার প্রকৌশলীর করা বিশেষ ডিজাইন বা পরিকল্পনার ছলনাময়ী মায়ার নানা চিহ্ন বহন করছে। সম্ভবত এই সব কিছু্‌ই কোন না কোন ভুমিকা পালন করেছে এই সহজ সত্যটাকে আমাদের এত দেরী করে বুঝতে। কিন্তু আর্ণস্ট মেয়ার (Ernst Mayr), নিও-ডারউইনিয়ান সিনথেসিসের বিখ্যাত গ্রান্ড ওল্ড ম্যান, যিনি ২০০৫ সালে ১০০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন, বারবার একটি ভিন্ন সন্দেহর কথাই উচ্চারণ করেছিলেন। মায়ারের দৃষ্টিতে মুল অপরাধী প্রাচীন দার্শনিক একটি মতবাদ-যার আধুনিক নাম- এসেন্শিয়ালিজম (Essentialism),বিবর্তনের আবিষ্কারকে আটকে রেখেছিল প্লেটো মৃত হাত ( এটা অবশ্য মায়ার এর বাক্য না, তবে তার ধারনাটিকে এটি প্রকাশ করে)।

প্লেটোর মৃত হাত:

প্লেটোর দৃষ্টিভঙ্গীতে ’বাস্তবতা’ হিসাবে আমরা আসলে যা দেখছি মনে করে চিন্তা করি, তা আসলে গুহার দেয়ালে পড়া শুধু ছায়া মাত্র ,যা সৃষ্টি করেছে গুহার মেঝেতে আমাদের জ্বালানো খোলা আগুনের কম্পমান শিখা। অন্যান্য ধ্রুপদী গ্রীক দার্শনিকদের মতই প্লেটো তার অন্তরে ছিলেন একজন জিওমিটার ( যিনি জ্যামিতি বিষয়ে চর্চ্চা করেন); বালিতে আকা প্রতিটি ত্রিভুজ আসলে একটি  সত্যিকারের ত্রিভুজের এসেন্স বা মৌলিক গুনাবলী বা নির্যাসের ক্রটিপুর্ণ একটি ছায়া। কোন একটি এসেন্শিয়াল ত্রিভুজের রেখাগুলো হবে বিশুদ্ধ ইউক্লিডীয় রেখা যার দৈর্ঘ্য আছে কিন্তু কোন প্রস্থ নেই, যেখানে রেখাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে অসীমভাবে সংকীর্ণ এবং যখন সমান্তরাল, তখন কখনোই তারা একবিন্দুতে মিলিত হয়না। এই এসেন্শিয়াল ত্রিভুজের কোনগুলোর সমষ্ঠী  একেবারে নিখুতভাবে ঠিক দুই সমকোনের সমান, এক পিকোসেকন্ড আর্ক কম কিংবা বেশী হয়না। কিন্তু বালিতে আকা ত্রিভুজটির ক্ষেত্রে এসব সত্য নয় প্লেটোর কাছে তা শুধুমাত্র একটি আদর্শ ’এসেন্শিয়াল’ ত্রিভুজের অস্থির ছায়া মাত্র।

মায়ার এর মতে এধরনের মতবাদের একটি নিজস্ব সংস্করণ জীববিজ্ঞানকেও আক্রান্ত করেছিল। জীববিজ্ঞানের এসেন্শিয়ালিজম, টাপির এবং খরগোশ; পাঙ্গোলিন এবং ড্রমেডারিসদের এমন ভাবে ব্যাখ্যা করেছিল,যেন তারা ত্রিভুজ, রম্বস, প্যারাবোলা কিংবা ডোডেকাহেড্রনের মত নানা ধরনের জ্যামিতিক ফর্ম। অর্থাৎ যে খরগোশদের আমরা দেখছি, তা আসলে একটি ’নিখুত’ খরগোশের ধারনার বিবর্ণ একটি  ছায়া:একটি আদর্শ এসেন্শিয়াল, প্লেটোনিক খরেগোশ,  ধারনার জগতে নিখুত জ্যামিতিক ফর্মদের সাথে যাদের বসবাস। রক্ত মাংশের খরগোশদের মধ্যে হয়তো ভিন্নতা থাকতে পারে তবে তাদের ভিন্নতা সবসময় দেখতে হবে একটি আদর্শ খরগোশের মুল বৈশিষ্ট বা এসেন্স থেকে ক্রটিযুক্ত ব্যতিক্রম হিসাবে।

কি হতাশাজনকভাবে অবিবর্তনীয় একটি দৃশ্য! প্লেটোবাদীরা খরগোশের কোন পরিবর্তনকে মনে করেন এসেন্শিয়াল খরগোশ থেকে কোন গোলমেলে বিচ্যুতি এবং পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিরোধ থাকবেই- যেন সব আসল খরগোশই আকাশে কোন একটি এসেন্শিয়াল খরগোশের সাথে অদৃশ্য এক ইলাস্টিক কর্ড দিয়ে বাধা। জীবনের বিবর্তনীয় দৃষ্টি  এর একেবারেই বীপরিত। উত্তরসুরীরা অনির্দিষ্টভাবেই তাদের পুর্বসুরী প্রানীদের বৈশিষ্ট থেকে ভিন্নতা বহন করবে, প্রতিটি ভিন্নতাই রুপান্তরিত হয় ভবিষ্যতে আরো বিচিত্রতার সম্ভাব্য পু্র্বসুরী হিসাবে ।  আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস, ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন তত্ত্বর স্বতন্ত্র সহআবিষ্কারক কিন্তু তার যুগান্তকারী রচনাটির নাম দিয়েছিলেন, ‘On the tendency of varieties to depart indefinitely from the original type’  বা ‘মুলরুপ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বৈচিত্রতার বিচ্যুতির প্রবণতা প্রসঙ্গে’ ।

যদি কোন আদর্শ খরগোশ এর অস্তিত্ব থাকেই, তবে এই বিশেষণ সত্যিকারের, ছটফটে, লম্ফমান, বিচিত্র ধরনের খরগোশদের পরিসংখ্যানগত সাধারন বিস্তারের একটি বেল কার্ভের মধ্যবিন্দ‍ু ছাড়া আর কোন কিছুকেই আসলে নির্দেশ করে না। এবং এই বিস্তার সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। বহু প্রজন্মান্তরে ক্রমান্বয়ে এমন কোন অবস্থার উদ্ভব হয়, যা সুষ্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়না, যখন সাধারনত যাদের আমরা খরগোশ বলি, তারা সেই রুপ থেকে এতটাই সরে যায় যে, তারা একটি ভিন্ন নামের দাবী রাখে। ’চিরস্থায়ী খরগোশত্ব’ বলে কিছু নেই, মুল বৈশিষ্ট মন্ডিত কোন খরগোশ নেই আকাশে, শুধু আছে লোমশ, লম্বা কানের, কপরোফ্যাগাস (যারা অন্যান্য নিরামিশাষী ‍অন্য প্রানীদের মল খায়), গোফ নাচানো খরগোশদের জনসংখ্যা ছাড়া, যারা নানা আকার আয়তন, রঙ এবং আচরনের পরিসংখ্যানগত বিস্তার প্রদর্শন করে। পুরানো বিস্তারে যা দীর্ঘ কান যুক্ত প্রান্ত ছিল তা হয়তো পরবর্তী ভুতাত্ত্বিক বা জিওলজিক্যাল সময়ে একটি নতুন বিস্তারের কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারে। যথেষ্ট পরিমানে বহু সংখ্যক প্রজন্মান্তরে, সেখানে হয়ত পুর্বসুরী প্রজাতিদের বিস্তার এবং ‍উত্তরসুরী প্রজাতিদের মধ্যে বিস্তারের মধ্যে কোন মিশ্রন বা ওভারল্যাপ থাকবে না। পুর্বসুরীদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘতম কানটি হয়তো উত্তরসুরী প্রজাতির ক্ষুদ্রতম দৈর্ঘের কানের চেয়েও ক্ষুদ্র হতে পারে। সবকিছুই তরল বা পরিবর্তনশীল, আরেকজন গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাস যেমন বলেছিলেন, কোন কিছুই নির্দিষ্ট নয়। শত মিলিয়ন বছর পর বিশ্বাস করা কঠিন হতে পারে উত্তরসুরী এই প্রজাতির কোন সময় পুর্বসুরী প্রজাতি ছিল খরগোশ। কিন্তু তারপরও বিবর্তন প্রক্রিয়ায় কোন প্রজন্মেই কোন প্রজাতির জনসংখ্যায় প্রধান টাইপটি এর আগের প্রজন্মের বা এর পরবর্তী প্রজন্মের সংখ্যাগরিষ্ট বা মোডাল টাইপ অপেক্ষা খুব বেশী ভিন্ন না। এইভাবে চিন্তা করার প্রক্রিয়াকেই মায়ার বলেছিলেন, পপুলেশন থিংকিং। পপুলেশন থিঙকিং, তার মতে,  এসেন্শিয়ালিয়ালিজম এর অ্যান্টিথিসিস। স্বান্তনার অযোগ্য সময় পরে একজন ডারউইন এর দৃশ্যে আসার কারন-আমরা সবাই, হতে পারে গ্রীকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বা অন্য কোন কারনে, আমাদের মানসিক ডিএনএতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে লেখা ছিল এই এসেন্শিয়ালিজম।

প্লেটোবাদী পট্টি দিয়ে ঢাকা মনে, একটি খরগোশ হচ্ছে একটি খরগোশ হচ্ছে একটি খরগোশ; এমন কোন কিছু যদি প্রস্তাব করা হয়, খরগোশজাত আসলে চলমান মেঘের মত পরিবর্তনশীল পরিসংখ্যানগত গড়পড়তার বৈশিষ্ট সম্পন্ন বা বর্তমানে দেখা খরগোশ এক  মিলিয়ন বছর আগের  বা পরের কোন গড়পড়তা খরগোশ থেকে যে ভিন্ন হতে পারে, বিষয়টা মনে হয় একটি অন্তস্থ ট্যাবু বা প্রতিষিদ্ধকে লঙ্ঘন করে। আসলেই, মনোবিজ্ঞানীরা যারা ভাষার ডেভোলপমেন্ট নিয়ে গবেষনা করেন তারা বলছেন,শিশুরা মুলত প্রাকৃতিকভাবেই এসেন্শিয়ালিস্ট। হয়তো তাদের তা হতে হয় মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে, যখন তাদের পরিণত হবার প্রক্রিয়ায় মন বিভিন্ন জিনিসকে শ্রেনীবিন্যস্ত করার চেষ্টা করে আলাদা আলাদা শ্রেনীতে,যাদের প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট নাম বাচক বিশেষ্যর প্রয়োজনীয়তা আছে। অবাক হবার কোন কারন নেই, জেনেসিসের পুরাণ কাহিনীতে অ্যাডামের প্রথম কাজই ছিল সব প্রানীদের নামকরণ করা।

মায়ারের মতে এজন্য অবাক হবার মত কিছু নেই কেন উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাদের ডারউইনের জন্য। নাটকীয়ভাবে যদি বলতে চাই বিবর্তন কত বেশী এসেন্শিয়ালিজম বিরোধী তাহলে এটি বিবেচনা করুন: জনসংখ্যা ভিত্তিক বা  ’পপুলেশন থিংকিং’ এর  বিবর্তনীয় দৃষ্টি ভঙ্গীতে, প্রতিটি প্রানী অন্য প্রতিটি প্রানীর সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেমন,খরগোশ আর চিতাবাঘ, মধ্যবর্তী একটি অসংখ্য পজাতির সুদীর্ঘ শৃঙ্খল দ্বারা তারা যুক্ত,যে শৃঙ্খলে পাশাপাশি থাকা প্রজাতিগুলো পরস্পরের সাথে এত বেশী সদৃশ্যতা বহন করে যে, শৃঙ্খলটির প্রতিটি সংযুক্তিকে প্রতিনিধিত্বকারী প্রানীরা  এই শৃঙ্খলে তাদের নিকটবর্তী প্রতিবেশী প্রানীর সাথে নীতিগতভাবে প্রজননক্ষম, যা প্রজননক্ষম পরবর্তী প্রজন্ম তৈরী করে। এসেন্শিয়ালিষ্টদের প্রতিষিদ্ধকে এর চেয়ে ভালোভাবে আর লঙ্ঘন করা সম্ভব না। আর এটা কিন্তু কোন অস্পষ্ট, শুধু কল্পনার জগতে সীমাবদ্ধ চিন্তার পরীক্ষা না। বিবর্তনীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে, আসলেই মধ্যবর্তী প্রানীদের একটি শৃঙ্খল বা ধারা খরগোশ আর চিতা বাঘদের যুক্ত করেছে, যাদের প্রত্যেকেরই অস্তিত্ব ছিল, অন্তর্বর্তীকালীন প্রজাতিদের সুদীর্ঘ এই ক্রম পরম্পরার ধারাবাহিকতায় তাদের প্রত্যেককেই তাদের সবচেয়ে নিকটবর্তী প্রজাতির সাথে একই শ্রেনীতে বিন্যস্ত করা যাবে। আসলেই পুরো এই ধারাবাহিকতায় এর ‍ একপাশের নিকটতম প্রতিবেশী প্রজাতির সন্তান এর অপর পাশের  নিকটতম প্রতিবেশী প্রজাতির পিতামাতা। তারপরও  এই পুরো ধারাটি খরগোশ এবং চিতাবাঘ এর মধ্যে তৈরী করেছে একটি অবিচ্ছিন্ন বন্ধন; যদিও,  আমরা পরে দেখবো কখনোই এমন কোন প্রজাতি ছিলনা যাকে বলা যেতে পার ‘ রাবিপার্ড’ ( খরগোশ চিতাবাঘের মিশ্রন); ‍ একই রকম সেতুবন্ধন আছে খরগোশ থেকে ওমব্যাট কিংবা চিতাবাঘ থেকে লবস্টার অবধি, প্রতিটি প্রানী প্রজাতি এবং উদ্ভিদ প্রজাতির পরস্পরের মধ্যে। আপনি সম্ভবত নিজেই যুক্তি দিয়ে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন বিবর্তনীয় বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে কেন আমরা এই বিস্ময়কর উপসংহারে উপনীত হই। যাইহোক আমি বরং বিষয়টা স্পষ্ট করি, আমি এর নাম দেব, হেয়ার পিন বা চুলের কাটা চিন্তার পরীক্ষা (হেয়ার পিনের U আকৃতিটি মনে রাখুন)।

একটা খরগোশ কল্পনা করুন, যে কোন স্ত্রী খরগোশ (কাল্পনিকভাবে আপাতত স্ত্রী লিঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছি সুবিধার জন্য, অন্য লিঙ্গ হলেও যুক্তিটির কোন হের ফের হোতো না; এবার তারপাশে তার মা কে রাখুন, এবার মার পাশে তার নানীকে রাখুন, এরপর তার নানীর মা, এভাবে সময়ে পিছনের দিকে যেতে থাকুন, অনেক অনেক বছর অতীতের দিকে, আপাতদৃষ্টিতে প্রায় অসীম যার শেষ নেই এমন দীর্ঘ স্ত্রী খরগোশদের একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা, প্রত্যেকেই তার মা এবং মেয়ের মধ্যে স্যান্ডউইচ হয়ে আছে, এই সারি অনুসরন ধরে আমরা যদি অতীতের দিকে যেতে থাকি, আমরা একসময় লক্ষ্য করবো, যে প্রাচীনতর খরগোশদের আমরা অতিক্রম করছি তারা সামান্য কিছু ভিন্ন আমাদের পরিচিত আধুনিক খরগোশদের তুলনায়। এই পরিবর্তনের গতি কিন্তু এতো ধীর যে আমরা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের পরিবর্তনের ট্রেন্ড বা প্রবণতাটা সহজে ধরতে পারবো না, যেমন আমাদের ঘড়ির ঘন্টার কাটার গতিটা আমাদের চোখে পড়ে না এবং কোন শিশুর বড় হয়ে ওঠাটা যেমন আমরা দেখিনা, শুধু মাত্র আমরা পরে দেখতে পারি, শিশুটি কৈশোরে পৌছেছে, আরো পরে একজন  পুর্ণবয়স্ক মানুষে রুপান্তরিত হয়েছে। এছাড়া বাড়তি একটা কারন, কেন আমরা খরগোশদের একপ্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতাটা লক্ষ্য করিনা তা হলো, কোন এক শতাব্দীতে বর্তমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভ্যারিয়েশন বা ভিন্নতা সাধারনত মা এবং কন্যাদের মধ্যেকার ভিন্নতার চেয়ে বেশী, সেকারনে আমরা যদি রুপকার্থে বলা সেই ঘড়ির ’ঘন্টার কাটার’ গতি‍টাকে সুস্পষ্ট ভাবে পৃথক করে বোঝার চেষ্টা করি মার সাথে কন্যদের পার্থক্য তুলনা করে অথবা এমনকি নানীদের তাদের নাতনীদের সাথে তুলনা করে। এই ক্ষুদ্র পার্থক্যগুলো যা আমরা হয়তো দেখতে পেতাম, তা আসলে ঢাকা পড়ে যায় মাঠের মধ্যে ‍আনন্দে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করা ‍ খরগোশদের অন্য বন্ধু আর আত্মীয়দের মধ্যে আরো বেশী ভিন্নতার আড়ালে।

তাসত্ত্বেও, আমরা সময়ের ধারায় যতই অতীতে যাবো, ধীরে ধীর, সহজে বোঝা যায় না এমন কিছু পরিবর্তন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ঘটতে থাকে, এবং আমরা এমন পুর্বসুরী প্রানীদের দেখতে পাবো, যারা ক্রমান্বয়ে কম খরগোশ সদৃশ হতে থাকবে  এবং শ্রিউ (Shrew,এক ধরনের ইদুর সদৃশ প্রানী) সদৃশ ( বা এমন কিছু যা কোনটারই  সদৃশ নয়)  হতে থাকে ক্রমান্বয়ে। এই ধরনের প্রানীদের কোন একটিকে আমি বলবো হেয়ার পিন বেন্ড (চুলের কাটার বাকানো অংশ), এর কারনটি স্পষ্ট হবে সময়ক্রমে। এই প্রানীটি হবে সবচেয়ে নিকটবর্তী অতীতের কমন পুর্বসুরী প্রানী (এই স্ত্রী খরগোশদের ধারায়, কিন্তু সেটা জরুরী না), যা খরগোশ এবং চিতাবাঘ দুই লিনিয়েজ এর যোগসুত্রে দাড়িয়ে। আমরা ঠিক জানিনা এরা কেমন দেখতে ছিল, বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অবশ্যই এর অস্তিত্ব ছিল এবং সব প্রানীদের মতই, এটিও তার মা ও কন্যার মত একই প্রজাতির সদস্য। আরো পেছনে আমরা হাটতে থাকি, শুধু এখানে চুলের কাটা বা হেয়ার পিন এর বাকা জায়গায় দিক  আমরা পরিবর্তন করছি এবং এবার সময়ের সাথে হাটছি চিতা বাঘদের দিকে (যেহেতু হেয়ার পিনে অসংখ্য এবং বিচিত্র উত্তরসুরী প্রানীদের বংশধারার উদ্ভব হয়েছে, আমরা ক্রমাগতভাবে যখন প্রজাতির দ্বিবিভাজনের রাস্তায় আসবো, এবং আমাদের সেই মোড়গুলোতে বেছে নিতে হবে যে রাস্তাগুলো আমাদের চিতাবাঘের বংশধারার দিকে নিয়ে আসবে); এবার আমাদের সম্মুখ যাত্রায় প্রতিটি শ্রিউ সদৃশ্য প্রানীর লাইনে পরবর্তী প্রানিটি হবে তার কন্যা এবং ধীরে ধীরে, খুব সহজে অনুভুত হবে না এমন পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এ্ই শ্রিউ সদৃশ্য প্রানীও বিবর্তিত হবে নানা অন্তবর্তীকালীন প্রজাতির ধারাবাহিকতায়, যারা কোন আধুনিক প্রানীদের সাথে সদৃশ নাও হতে পারে, তবে বংশধারার ধারায় তারা পাশাপাশি প্রজন্মের প্রানীদের সাথে অনেকবেশী সদৃশ্য। এভাবে খানিকটা স্টোটদের (Stoat) মত অন্তবর্তীকালীন প্রানীদের এই ধারায় অতিক্রম করার পর কোন ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন চোখে না পড়া ছাড়াই ধীরে ধীরে আমরা এই লাইনে চিতাবাঘের কাছে  পৌছে যাবো।

এই চিন্তার পরীক্ষার ব্যপারে অনেক কিছু বলার আছে; প্রথমত, আমরা খরগোশ থেকে চিতাবাঘের দিকে হাটার পথ বেছে  নিয়েছি, কিন্তু আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি,আমরা সজারু  থেকে ডলফিনও বেছে নিতে পারতাম, ওয়ালাবি থেকে জিরাফ কিংবা মানুষ থেকে হ্যাডক। মুল বিষয়টি হলো, যে কোন দুটি প্রানীর জন্য অবশ্য হেয়ার পিনের মত একটা পথ থাকে যা তাদের সংযোগ করছে, কারন প্রতিটি প্রজাতি কোন  একটি প্রানীকে তাদের পুর্বসুরী হিসাবে অন্য সব প্রজাতির সাথে ভাগাভাগি বা শেয়ার করে। আমাদের শুধু অতীতমুখী হয়ে সেই পথটা অনুসরণ করতে হবে, এক প্রজাতি থেকে তাদের ভাগ করে নেয়া সাধারন পুর্বসুরী প্রানীর দিকে, এরপর হেয়ার পিনের বাক টা ধরে অন্য প্রজাতির দিকে সামনে আগাতে হবে।

দ্বিতীয়ত, লক্ষ্য করুন আমরা শুধু সীমাবদ্ধ আছি সেই প্রানীদের শৃঙ্খলকে শনাক্ত করতে যা একটি আধুনিক প্রানীকে আরেকটি আধুনিক প্রানীর সাথে সংযুক্ত করছে; আমরা অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে কোন খরগোশ থেকে চিতাবাঘের বিবর্তিত হবার কথা বলছি না।  এই চিন্তার অনুশীলনীর প্রেক্ষাপটে আপনি হয়তো বলতে পারেন আমরা পেছন দিকে বিবর্তিত বা ডিইভোলভ হচ্ছি হেয়ার পিন এর বাক পর্যন্ত তারপর সামনের দিকে বিবর্তিত হচ্ছি সেখান থেকে চিতাবাঘের দিকে। পরবর্তী অধ্যায়ে দেখবো কেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা জরুরী, বার বার……আধুনিক প্রজাতি থেকে আধুনিক কোন প্রজাতির বিবর্তন হচ্ছেনা। তারা শুধু কমন কোন পুর্বসুরীকে শেয়ার করে অতীতের কোন একটি সময়ে। তারা আসলে কাজিন, এটাই, আমরা পরবর্তীতে দেখবো, সবচেয়ে অসস্থিকর একটা অভিযোগটির উত্তর: ’যদি মানুষ শিন্পান্জি থেকে বিবর্তিত হয়, তাহলে কেন এখন শিম্পান্জি আছে’?

তৃতীয়, হেয়ার পিনের সেই (পুর্বসুরী প্রানী) থেকে আমাদের সন্মুখ যাত্রায় আমরা কোন পুর্বপরিকল্পনা ছাড়াই বেছে নিয়েছি সেই পথ যা চিতাবাঘের দিকে আমাদের নিয়ে যাবে। বিবর্তন ইতিহাসের এটা প্রকৃত পথ। আমরা অসংখ্য শাখা প্রশাখা আর পথকে সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছি, কিন্তু-একটা গুরুত্বপুর্ন যে পয়েন্টটাকে আমি আবার পুণরাবৃত্তি করছি-  যে সব পথ দিয়ে গেলে আমরা অগনিত বিবর্তনীয় শেষ বিন্দুতে পৌছাতে পারতাম, কারন হেয়ার পিন এর বাকের প্রাণীটি শুধুমাত্র খরগোশ বা চিতাবাঘের আদি পুর্বসুরী প্রানীনা, বেশ বড় অংশের আধুনিক স্তন্যপায়ীদের উত্তরসুরীও বটে।

চতুর্থ বিষয়টি, যা আমি আগেই জোর দিয়েছি, তা হলো, এই হেয়ার পিন এর দুই প্রান্তের প্রজাতির মধ্যে যতই বিশাল পার্থক্য থাকুক না কেন –খরগোশ এবং চিতাবাঘ- এদের যুক্ত করা প্রজাতির শৃঙ্খলে প্রজাতির প্রতিটি সদস্য এই শৃঙ্থলে তার নিকটবর্তী প্রতিবেশী সদস্যদের অনুরুপ, মা এবং মেয়ের যেমন হওয়া উচিৎ। এবং আমি আগে উল্লেখ করেছিলাম, সেই প্রজাতির জনগোষ্ঠীর অন্যান্য টিপিক্যাল সদস্যদের চেয়ে এই শৃঙ্খলে তাদের নিকটবর্তী সদস্যের সাথে আরো বেশী সদৃশ্য।

আপনি দেখতে পাচ্ছেন এই চিন্তার এক্সেপেরিমেন্ট প্লেটোনিক আদর্শ ফর্মের অভিজাত গ্রীক মন্দিরের ধারনা অসারতা কিভাবে প্রমান করছে। এবং আপনি বুঝতে পারবেন কিভাবে, যদি মায়ার এর ধারনা সঠিক হয়ে থাকে;মানবজাতির মধ্যে এসেন্শিয়ালিজম এর প্রাকধারনার সুবিশাল প্রভাব বিদ্যমান, এবং মায়ার হয়তো ঠিক বলেছিলেন আমরা কেন ঐতিহাসিকভাবে  বিবর্তনকে হজম করতে পারিনা।

এই এসেন্শিয়ালিজম শব্দটার জন্ম কিন্তু ১৯৪৫ এর আগে হয়নি, সুতরাং ডারউইনের জানা ছিলনা। কিন্তু তিনি প্লেটোর এই মতবাদের জীববিজ্ঞানীয় সংস্করণটি সম্বন্ধে ভালোই জানতেন, ‌ ইমমিউটেবিলিটি অ্ফ স্পিসিস; বা প্রজাতির অপরিবর্তনশীলতা’, এবং তার সব প্রচেষ্টার একটা বড় অংশই এর সাথে যুদ্ধ করতেই অতিবাহিত হয়েছে। আসলে ডারউইনের বেশ কটি বই পড়লে,‘অন দি অরিজিন অব স্পিসিস’ থেকে বরং বেশী অন্যগুলো–  ভালো করে বুঝতে পারা যায়, কি বিষয়ে তিনি কথা বলছেন,যদি বিবর্তন সম্বন্ধে আধুনিক  প্রাকধারনা থেকে কেউ মনকে মুক্ত করতে পারেন এবং মনে রাখতে হবে তার পাঠকের একটা বিশাল অংশই ছিল এনেন্শিয়ালিস্ট যারা কখনোই প্রজাতির অপরিবর্তিনশীলতাকে সন্দেহ করেননি।   প্রজাতির অপরিবর্তনশীলতা ধারনার বিরুদ্ধে ডারউইনের সবচে জোরালো প্রমান ছিল ডোমেস্টিকেশন বা গৃহপালিতকরণ প্রক্রিয়া এবং এই গৃহপালিতকরন প্রক্রিয়াটাই ববে এই অধ্যায়ের বাকী অংশের মুল বক্তব্য।


ছবি: আর্নস্ট মায়ার ( Ernst Walter Mayr : July 5, 1904 – February 3, 2005); বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বিবর্তন জীববিজ্ঞানী; জীববিজ্ঞানে তার অসংখ্য অবদানের মধ্যে আছে বায়োলজীক্যাল স্পেসিস কনসেপ্ট এর ধারনাটি, যা প্রজাতির একটি সংজ্ঞা নির্ধারন করেছিল। ( ছবিসুত্র: উইকিপেডিয়া)

জীন পুলকে নতুন করে গড়া :

প্রানী এবং উদ্ভিদের ব্রীডিং বা কৃত্রিম প্রজনন সম্বন্ধে ডারউইন অনেক কিছু জানতেন। হর্টিকালচারিষ্ট বা ‍উদ্যানবিদ এবং পিজিওন ফ্যান্সিয়ারদের (যারা নানা প্রজাতির কবুতর সংগ্রহ এবং ব্রীডিং এর সাথে জড়িত) সাথে তিনি যোগাযোগ রাখতেন, এবং কুকুরও ভালোবাসতেন ডারউইন ( কুকুরকে অবশ্য কে না ভালোবাসে,সঙ্গ হিসাবে  পোষা প্রানীদের মধ্যে তারা  অসাধারন); শুধুমাত্র তার On the Origin of Species এর প্রথম অধ্যায়টি বিভিন্ন ধরনের গৃহপালিত বা ডোমেস্টিক  প্রানী এবং উদ্ভিদে বিষয়কই ছিলনা, এ বিষয়ে তিনি আলাদা একটা পুরো বইও লিখেছিলেন; তার The Variation of Animals and Plants under Domestication এ পৃথক পৃথক অধ্যায় ছিল কুকুর এবং বিড়াল, ঘোড়া, গাধা, শুকর, গরু, ভেড়া এবং ছাগল, খরগোশ, কবুতর ( কবুতরের জন্য ছিল দুটি অধ্যায়, কবুতর তার আরেকটি প্রিয় প্রানী), মুরগী এবং আরো অন্যান্য জাতের পাখী  এবং ‌ উদ্ভিদ, যেমন ক্যাবেজ বা বাধাকপির চমৎকার বৈচিত্রসহ নানা বিষয়ে। সব্জী হিসাবে ক্যাবেজ বা বাধাকপি হচ্ছে এসেন্শিয়ালিজমের এবং প্রজাতির অপরিবর্তনশীলতা বা ইমমিউটেবিলিটি মতবাদের জন্য রীতিমত অপমানজনক।

বুনো বাধাকপি, Brassica oleracea কিন্তু তেমন চোখে পড়ার মত কোন বৈশিষ্টপুর্ন উদ্ভিদ না, কিছুটা সাধারন গৃহপালিত বাধাকপির একটি আগাছা সংস্করন মাত্র। মাত্র কয়েক শতাব্দীর মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন বা সিলেকটিভ ব্রিডীং ’ টুলবক্স’ এর যন্ত্রপাতির কল্যানে উদ্যানবিদরা, কোন ভাস্করের মতেই সুক্ষ কিংবা মোটা ছেনির দিয়ে কোন ভাষ্কর্য গড়ে তোলার নানা কৌশল ব্যবহার করে বৈশিষ্টহীন এই বুনো উদ্ভিদকে গড়ে তুলেছেন নানা বৈচিত্রময় সব্জী রুপে, এরা পরস্পর থেকে যেমন পৃথক তাদের আকারে আর গঠনে, তেমনি দৃশ্যত ভিন্ন এদের বন্য আদি উদ্ভিদ, বুনো বাধাকপি থেকে; যেমন ব্রকলি, ফুলকপি, খোলরাবি, কেল, ব্রাসেল স্প্রাউট, স্প্রিং গ্রিন, রোমানেস্কু এবং এছাড়া অবশ্যই  আছে আরো অন্য বেশ কিছু ধরনের সব্জী যাদের এখনও সাধারনত ক্যাবেজ বা বাধাকপি বলা হয়ে থাকে।


ছবি: আপনি কি জানেন, Brassica oleracea  বা ওয়াইল্ড ক্যাবেজ বা ওয়াইল্ড মাষ্টার্ড  নামে পরিচিত এই  উদ্ভিদটি  আমাদের পরিচিত প্রিয় অনেক সব্জীর পুর্বসুরী। হাজার বছর ধরে কৃষকরা এর উপর তাদের আর্টিফিসিয়াল বা কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে জন্ম দিয়েছে আমাদের পরিচিত বাধাকপি, ফুলকপি আর ব্রকলী। (নীচের ছবি দেখুন)


ছবি: কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি বুনো প্রজাতি থেকে পেয়েছি একগুচ্ছ সব্জী। (ছবি সুত্র)


ছবি: কৃষকরা এই সব্জীর বৈচিত্রতা সৃষ্টি করেছেন কয়েক মিলেনিয়া ধরে,  এবার ভাবুন কয়েক শ মিলিয়ন বছর ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচন নন র‌্যানডোম সিলেকশনের মাধ্যমে কেন পারবেনা জীবজগতের এত বৈচিত্রের জন্ম দিতে ।


ছবি: বুনো সুর্যমুখী থেকে শস্য সুর্যমুখী (Helianthus annus); খৃষ্টপুর্ব প্রায় ২৬০০ বছর আগে মধ্য আমেরিকার (মেক্সিকো) ইন্ডিয়ানরা এই ফুলটি গৃহপালিতকরন করেছিল।

আরেকটি পরিচিত উদহারন হচ্ছে, নেকড়ে বা Canis lupus কে প্রায় দুইশ বা তারো বেশী ব্রীড বা জাতের কুকুর, Canis familiaris (যুক্তরাজ্যের কেনেল গ্রুপ যাদের পৃথক ব্রীড বলে চিহ্নিত করেছে)গড়ে তোলা এবং এদের বেশ অনেকগুলো ব্রীড বা জাত জীনগতভাবে বিচ্ছিন্ন একে অপরের থেকে, পেডিগ্রী ব্রিডিং এর বর্নবাদতুল্য আইনের কারনে।

ঘটনাক্রমে সব গৃহপালিত কুকুরের বন্য আদিপুরুষ হচ্ছে নেকড়ে এবং শুধু মাত্রই নেকড় ( যদিও এর গৃহপালিত হবার প্রক্রিয়ার ঘটনাটি হয়তো ঘটেছিল  সারা পৃথিবীতে নানা জায়গায় স্বতন্ত্রভাবে); বিবর্তনবাদীরা কিন্তু একসময় তা ভাবেননি। ডারউইন এবং তার সমসাময়িক অনেকেই  সন্দেহ করেছিলেন, বেশ কয়েক প্রজাতির বন্য কুকুরজাতীয় প্রানী, নেকড়ে ও জ্যাকেল সহ, অনেকেই আমাদের গৃহপালিত কুকুরের বংশধারায় ‍অবদান রেখেছে। নোবেল জয়ী অষ্ট্রিয় ইথোলজিষ্ট ( যারা প্রানীদের আচরন নিয়ে গবেষনা করেন) কনরাড লরেন্জও সেটাই ভাবতেন। ১৯৪৯ সালে তার প্রকাশিত Man Meets Dog বইটিতে তিনি গৃহপালিত পোষা কুকুর নিয়ে মন্তব্য করেন, পোষা কুকুরদের ব্রীডদের মুলত দুটি প্রধান গ্রুপে ‍ভাগ করা যায়: একটি গ্রুপের উৎস জ্যাকেল (প্রধান গ্রুপ) এবং অন্য গ্রুপটি যাদের উৎস নেকড়ে( লরেন্জ এর নিজের প্রিয় জাত Chows সহ); কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে লরেন্জ এর এই দুই ভাগে বিভক্ত করার প্রস্তাবের স্বপক্ষে কোন ধরনের প্রমানই ছিল না, শুধুমাত্র বিভিন্ন জাত গুলোর মধ্যে তাদের ব্যাক্তিত্ব এবং বৈশিষ্টসুলভ কিছু চারিত্রিক গুনাবলী  পর্যবেক্ষন ছাড়া। বিষয়টি আসেলে উন্মুক্ত ছিল, যতদিন না পর্যন্ত আনবিক জীনতত্ত্ব এই বিষয়ে দৃঢ় প্রমানের যোগান দেয়,বর্তমানে কোন সন্দেহ নেই পোষা কুকুরদের বংশধারায় কোন জ্যাকালদের কোন অবদান নেই। কুকুরদের সব ব্রীডের সদস্যরা আসলে রুপান্তরিত নেকড়ে : কোন জ্যাকাল না, কয়োটি না, কোন ফক্সও না।

ছবি: গ্রে উলফ (Canis lupus) এর একটি উপপ্রাজাতি মানুষের প্রিয় প্রানী সহচর কুকুর ( Canis lupus familiaris); বর্তমান সব জাতের কুকুরের লিনিয়েজ ধারনা করা হয় ১৫০০০ বছর আগে গ্রে উলফ প্রজাতিকে গৃহপালিত করন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পোষ মানিয়েছিল। যদিও ৩৩০০০ হাজার বছর আগেও গৃহপালিত কুকুরের চিহ্ন মিলেছে, তবে আগের লিনিয়েজগুলো টেকেনি।

ডোমেস্টিকেশন বা গৃহপালিতকরন প্রক্রিয়ায় যে প্রধান বিষয়টা আমি উল্লেখ করতে চাইছি, সেটা হলো, বন্য প্রানীদের আকার আকৃতি আচরণকে ভিন্ন রুপ দিতে পারার ক্ষেত্রে এর বিস্ময়কর ক্ষমতা এবং যে দ্রুততার সাথে  প্রক্রিয়াটি এই পরিবর্তনগুলো ঘটায়। ব্রীডাররা আসলে যারা মডেল তৈরী করে তাদের মত, অসীম নমনীয় মডেলিং ক্লে বা কাদা সহ বা ছেনী হাতে কোন ভাস্কর এর মত, যারা তাদের নিজেদের খেয়ালখুশী মত খোদাই করে গড়ে নেয়  কুকুর বা ঘোড়া বা গরু বা বাধাকপি; আমি এমন একটি দৃশ্যকল্পের ব্যাখ্যায় খুব তাড়াতাড়ি আবার ফিরে আসছি। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের সাথে এই পুরো প্রক্রিয়াটির প্রাসঙ্গিকতা হচ্ছে, যদিও যে নির্বাচন করছে সে হচ্ছে মানুষ, কোন প্রকৃতি না, এবং শুধু এই পার্থক্যটুকু ছাড়া পুরো প্রক্রিয়াটা কিন্ত একই। সেকারনেই ডারউইন গৃহপালিতকরণ প্রক্রিয়ার উপর  এতো গুরুত্ব দিয়েছেন On the Origin of Species এর শুরুতেই। যে কেউই কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনের এর মুলনীতির বুঝতে পারেন, প্রাকৃতিক নির্বাচনও একই, খুব ছোট একটি পরিবর্তন ছাড়া।

আক্ষরিক অর্থে বললে কুকুরের  বা বাধাকপির শরীর খোদাই করেন না ব্রীডার/ভাস্কর বরং সেই জাত বা প্রজাতির জীন পুলকে তারা নতুন করে সাজান। এই জীন পুলের ধারনাটি ’নিও-ডারউইনিয়ান সিনথেসিস তত্ত্ব’ শীরোনামের অধীনের সব জ্ঞানভান্ডারের কেন্দ্রীয় বিষয়টিকে নির্দেশ করে। ডারউইন এই বিষয়ে কিছুই জানতেন না, কারন এটি তার বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অংশ ছিল না সেই সময়, যেমন আসলেই জীন সংক্রান্ত কোন ধারনা ছিলনা তার । কিন্তু তিনি জানতেন কোনো পরিবারের বংশধারায় নানা বৈশিষ্টগুলোর পুণরাবৃত্তি হয়: সন্তানরা তাদের পিতামাতা  কিংবা ভাইবোনদের মত দেখতে হয়; জানতেন কুকুরদের এবং কবুতরদের কোন কোন বিশেষ বৈশিষ্ট সবসময় নিয়ম মেনে চলে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে । এই হেরেডিটি বা বংশগতির ধারনাটি তার প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বের একটি  মুল স্তম্ভ। কিন্তু জীন পুল বিষয়টি এর থেকে আলাদা। জীন পুলের ধারনাটির অর্থ আছে মেন্ডেলের বংশগতি কোন একক এর স্বতন্ত্র বিন্যাসের সুত্রে। ডারউইনের মেন্ডেলের সুত্র সম্বন্ধে কোন ধারনাই ছিল না, যদিও এই অষ্ট্রীয় সন্ন্যাসী গ্রেগর মেন্ডেল, যাকে জীনতত্ত্বের জনক বলা হয়, ডারউইনের সমসাময়িক ছিলেন এবং তিনি একটি জার্মান জার্নালে তার গবেষনার ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন, যা ডারউইন কখনো পড়েননি।

একটি মেন্ডেলীয় জীন হলো ’অল অর নাথিং’ এনটিটি  অর্থাৎ হয় সবটুকু নয়তো একেবারেই না এমন একটি বিষয়। মায়ের গর্ভে আপনার যখন সুচনা হয়েছিল,আপনি আপনার বাবার কাছ থেকে যা পেয়েছিলেন, তা এমন কোন বস্তু না, যা আপনি আ্পনার মার কাছ থেকে যা পেয়েছেন তার সাথে একটা মিশ্রন হতে পারে, যেন নীল রঙ আর লাল রঙ মিশিয়ে তৈরী করা হয় যেমন পার্পল বা বেগুনী রঙ । যদি এভাবেই হেরেডিটি কাজ করতো (ডারউইনের সময় মানুষজন অস্পষ্টভাবে এমনটাই ভাবতেন), তাহলে আমরা সবাই মধ্যবর্তী গড়পড়তা কিছু হতাম, আমাদের বাবা মায়ের মাঝামাঝি। সেই ক্ষেত্রে সব বৈচিত্রতা খুব দ্রুতই হারিয়ে যেত জনসংখ্যা থেকে (যতই সুক্ষভাবে বা কষ্ট করে আপনি পার্পল রং এর সাথে পার্পল রঙ মেশান না কেন, আপনি সেই মুল লাল আর নীল রং আবার তৈরী করতে পারবেননা); আসলে, অবশ্যই যে কেউই স্পষ্ট দেখতে পাবে, কোন জনগোষ্ঠীতে বৈচিত্রতা বা ভ্যারিশেন কমে যাবার কিন্তু কোন অন্তর্গত প্রবনতা নেই। মেন্ডেল দেখিয়েছিলেন, এটা হয় কারন, পিতার জীন এবং মাতার জীন শিশুর মধ্যে সন্নিবেশিত বা কম্বাইন্ড হয় ( তিনি অবশ্য ’জীন’ শব্দটি ব্যবহার করেননি, যার উৎপত্তি হয়েছে ১৯০৯ সালে), বিশয়টি দুটো রং এর মিশ্রনের মত না। বরং এটা অনেকটা বলা যেতে পারে এক প্যাকেট তাশের শাফলিং এবং রিশাফলিং এর সাথে বেশী মানানসই। ‍এখন আমরা জানি, যে জীন হচ্ছে ডিএনএ কোডের সুনির্দিষ্ট অংশ, যারা হয়তো শারীরিক বা ফিজিক্যাল ভাবে তাশের মতো আলাদা থাকে না, কিন্তু শাফলিং এর সময় যা ঘটে সেই একই মুলনীতি বহাল থাকে। জীনগুলো একটার সাথে আরেকটা মিশ্রিত হয়না; তারা শাফল হয় বা রদবদল হয়। আপনি অবশ্য বলতে পারেন,এই শাফলিং কিন্তু খুব একটা ভালোভাবে হয়না। বেশ কিছু কার্ডের গ্রুপ একসাথে থেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে এক সাথে শাফলিং হতে থাকে, যদি না কোন চান্স বা সুযোগ এদের আলাদা করে দেয়।

আপনার যে কোন একটি ডিম্বানু ( শুক্রানু যদি পুরুষ হন) র মধ্যে,কোন নির্দিষ্ট একটি জিনের, হয় আপনার বাবার সংস্করণ থাকে, নয়তো আপনার মায়ের জীনের সংস্করণ থাকে। কখনোই এদের মিশ্রন না। এবং সেই নির্দিষ্ট জিনটি আসে আপনার চারজন দাদা দাদী নানা নানীর মাত্র একজন থেকে এবং আপনার মোট আট জন প্রপিতা/মাতা মহ/মহী দের শুধু মাত্র একজনের কাছ থেকে (মেন্ডেল আমাদের যে মডেলটি দিয়ে গেছেন এটি সেই সুত্র মোতাবেক পুরোপুরি সত্য এবং এই মডেল অব জেনেটিক্সই মেনে চলেছেন জীববিজ্ঞানীরা ১৯৫০ এর দশকে  ওয়াটসন এবং ক্রিকের ডিএনএ আবিষ্কারের বৈপ্লবিক ঘটনা পর্যন্ত; এটি প্রায় সম্পুর্ন কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়, বিশেষ করে আমরা এখন জীনের সংজ্ঞা হিসাবে যা বুঝি, ডিএনএ র দীর্ঘ অংশ বা বেস অনুক্রমের সিকোয়েন্স। কিন্ত প্রায়োগিক দিক থেকে এটি আমরা পুরোপুরি সঠিক হিসাবে গ্রহন করতে পারি)।

হাইন্ডসাইট বা পুর্বদৃষ্টি বলে এমনটাই তো হওয়ার কথা সব সময়। আপনি যখন কোন নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রজনন করাবেন, আমি একটি ছেলে কিংবা একটি মেয়ে আশা করতে পারেন, এর কোন মিশ্রন না। (যে খামারে আমি আমার শৈশব কাটিয়েছি, সেখানে একটি ভীষন গোয়ার এবং আগ্রাসী ধরনের গরু (cow) ছিল, যার নাম ছিল আরুশা। আরুশার একটা নিজস্ব চরিত্র ছিল এবং সে কারনে ঝামেলার কারণ ছিল। একদিন এই পালটি দেখাশুনা করতেন যিনি, মি: ইভান্স, রুষ্টভাবে মন্তব্য করেছিলেন, আমার মনে হয়, আরুশা গরু আর ষাড়ের কোন শংকর); পুর্বদৃষ্টি এটাও বলছে যে কেউই একটি আর্মচেয়ারে বসে বংশগতির যে কোন একটি বা সব বৈশিষ্ট  নিয়ে বংশগতির ’সবটুকু অথবা কোনটাই না’ সুত্রটার সাধারন ব্যখ্যায় পৌছাতে পারবেন।বিস্ময়ের ব্যপার হলো ডারউইন নিজেও এই ধারনার একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছিলেন, কিন্তু পুরো সংযোগটা বোঝার আগেই তিনি থেমে যান। ১৮৬৬ সালে ওয়ালেস কে একটি চিঠিতে তিনি লেখেন:

প্রিয় ওয়ালেস

আমার মনে হয়না আপনি বুঝতে পেরেছেন, আমি কিছু বিচিত্র বৈশিষ্টর বা ভ্যারাইটির অমিশ্রন সম্বন্ধে কি বলতে চেয়েছি।  প্রজনন উর্বরতার সাথে এটির কোন সম্পর্ক নেই। একটা উদহারন এর ব্যাখ্যা দিতে পারে। আমি পেইন্টেড লেডী এবং  পার্পল সুইট পি এর মধ্যে ক্রশ বা আন্ত:প্রজনন করেছিলাম, এরা দুটোই কিন্তু খুবই ভিন্ন রঙের প্রজাতি এবং একই  পডের মধ্যে আমি দুটো ভ্যারাইটিকে অক্ষত পেয়েছি, এদের কোন মিশ্রন না। আমার মনে হয় এ ধরনের অবশ্যই কিছু প্রথমে আপনার প্রজাপতিদের সাথে ঘটেছে…যদিও এই ক্ষেত্রে কেসগুলো দেখতে এত চমৎকার। আমি জানিনা বিষয়টি আসলেই এরকম কিনা, পৃথিবীর সব  স্ত্রী লিঙ্গ প্রানীদের ক্ষেত্রে যা সুস্পষ্টভাবে  পুরুষ এবং স্ত্রী সন্তানের জন্ম দেয়।

ডারউইন প্রায় ’এতটাই কাছাকাছি’ পৌছেছিলেন মেন্ডেলের জীনের ( আমরা এখন এটিকে যে নামে ডাকি) এই মিশ্রন না হবার সুত্রটি আবিষ্কার করার পথে। এই বিষয়টি অন্যান্য একধরনের কিছু মনক্ষুন্ন হওয়া আত্মপক্ষ সমর্থনকারীদের দাবীর সমতুল্য, যেমন ভিক্টোরীয় যুগে বিজ্ঞানী যেমন, প্যাট্রিক ম্যাথিউ এবং  এডওয়ার্ড ব্লাইথ ডারউইনের আগেই প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন; এক অর্থে কথাটা সত্যি এবং ডারউইন নিজেও সেটা স্বীকার করেছেন, কিন্ত আমি মনে করি, প্রমান বলছে, ডারউইনের মত তারা কেউই বুঝতে পারেননি কত গুরুত্বপুর্ন  এই বিষয়টি। (বহুদিন ধরে টিকে আছে  এমন একটি মিথ্যা গুজব হচ্ছে, যে ডারউইনের সংগ্রহে একটি বাধানো জার্মান জার্নালের কপি ছিল, যেখানে মেন্ডেল তার গবেষনার ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু সেই বিশেষ পাতাগুলো খোলা হয়নি, এবং সেভাবেই ডারউইনের মৃত্যুর পর সেটি পাওয়া গেছে। এই মেমটি (meme)টি উৎস সম্ভবত আরেকটি সত্যি ঘটনা থেকে, ডারউইনের সংগ্রহে আসলেই ডাবলিউ ও ফক এর লেখা  Die Pflanzen-mischlinge শীর্ষক একটি বই ছিল,যেখানে ফক খুব সংক্ষিপ্ত আকারে মেন্ডেলের কথা উল্লেখ করেছিলেন, এবং যে পৃষ্ঠাগুলোয় সেটা লেখা ছিলে, তা না কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়, বোঝাই যায় ডারউইন তা পড়েননি। কিন্তু লেখাটিতে এমনিতেও ফক মেন্ডেলের কাজের উপর বিশেষ কোন গুরুত্ব আরোপ করে কিছুই লেখেননি এবং মেন্ডেলের আবিষ্কারের গুরুত্বর মুল বিষয়টি যে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সেখানে তার কোন প্রমানও পাওয়া যায় না। সুতরাং বিষয়টি স্পষ্ট নয় যে, ডারউইন ফকের লেকা পড়ে এই বিষয়টি  ধরতে পারতেন, এমনকি যদি তার বই এর সেই অংশটিও যদি পড়তেন। এছাড়া ডারউইনের জার্মান ভাষার উপর দক্ষতাও তেমন বেশী ছিলনা)।

তবে যদি আসলে ডারউইন মেন্ডেলের গবেষনার মুল পেপারটি পড়তেন কোন সন্দেহ নেই জীববিজ্ঞানের ইতিহাস অন্যরকম হতো। এমনকি তর্ক সাপেক্ষে বলা যেতে পারে মেন্ডেল নিজেও তার আবিষ্কারের গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝতে পারেননি, যদি বুঝতে পারতেন, তিনি নিশ্চয়ই ডারউইনকে চিঠি লিখতেন বিষয়টির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে। বরনো (Brno)র  মেন্ডেলের মঠের লাইব্রেরীতে, ডারউইনের On the Origin of Species বইটির মেন্ডেলের ব্যক্তিগত কপি (জার্মান অনুবাদ) আমি নিজ হাতে ধরে দেখেছি এবং এর  মার্জিনে মেন্ডেলের নানা মন্তব্যও দেখেছি, যা প্রমান করে মেন্ডেল বইটি পড়েছিলেন।

ডারউইন এবং ওয়ালেসের মত, তারা এটিকে সাধারন সর্বব্যাপী গুরুত্বপুর্ণ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া  হিসাবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, যা জীবিত সকল প্রানীর বিবর্তন প্রক্রিয়াকে পরিচালিত করে ইতিবাচক বা পজিটিভ উন্নয়নের দিকে। একই ভাবে ওয়ালেসের কাছে লেখা চিঠিতে দেখা যায়, ডারউইনও  খুবই কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিলেন বংশগতির একক বৈশিষ্টগুলো মিশ্রন যে হয়না   এই বিষয়টি বুঝতে। কিন্তু তিনি বিষয়টি সার্বিকভাবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, বিশেষ করে কেন কোন জনগোষ্ঠী থেকে কোন একটি ভ্যারিয়েশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অদৃশ্য হয়ে যায় না, এই ধাধার উত্তর হিসাবে এই বিষয়টিকে দেখতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। এই রহস্যটির সমাধান করেন বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানীরা  মেন্ডেলের গবেষনার উপর ভর করে ( মেন্ডেলের গবেষনাটি তার সমসাময়িক সময়ের জ্ঞানের অনেক আগেই  করা); (১৯০৮ সাল থেকে সর্বজনপ্রিয়,খানিকটা ক্ষ্যাপাটে ক্রিকেট প্রেমী গনিতজ্ঞ  জি  এইচ হার্ডি  থেকে শুরু করে এবং পরে স্বতন্ত্রভাবে জার্মান চিকিৎসক ভিলহেম ওয়াইনবার্গ এর অবদানের মাধ্যমে এই তত্ত্বটি তার শীর্ষে পৌছায় বিখ্যাত জীনতত্ত্ববিদ এবং পরিসংখ্যানবিদ রোন্যাল্ড ফিশারের ব্যাপক গবেষনায় এবং আবারো, স্বতন্ত্রভাবে তার সাথে পপুলেশন জেনেটিক্স এর অন্যতম সহ প্রতিষ্ঠাতা  জে বি এস হেলডেন এবং সেওয়াল রাইট এর গবেষনায়)।

সুতরাং এখন জীন পুলের ধারনাটি খানিকটা বোধগম্য হতে শুরু করেছে। যৌনপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রজনন কারী কোন জনগোষ্ঠী, ধরা যাক, অ্যাসেনশন (Ascenson) দ্বীপের সমস্ত  ইদুর জনসংখ্যা, দক্ষিন আটলান্টিক মহাসাগরে বিচ্ছিন্ন দুর্গম এলাকায় অবস্থিত এই দ্বীপটিকে ইদুর জনসংখ্যায়, সবসময়ই দ্বীপে তাদের সব জীনগুলো শাফলিং করছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে, সেখানে কোন অন্তস্থ প্রবণতা নেই যে প্রতিটি প্রজন্ম  তাদের পুর্ববর্তী প্রজন্ম অপেক্ষা কম বৈচিত্রময় (জীন পর্যায়ে) হবে, কিংবা অবশ্যই কোন প্রবনতা নেই তারা মধ্যবর্তী একটি মিশ্রন হবে। জীনগুলো অপরিবর্তিত থাকে, স্বতন্ত্র একটা শরীর থেকে অন্য আরেকটি স্বতন্ত্র শরীরে হাতবদল হচ্ছে তাশের শাফলিং এর মত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কিন্তু একে অন্যের সাথে কিন্তু মিশে যাচ্ছে না, জীনগুলো একে অপরকে দুষিত করছে না। কোন একটি নির্দিষ্ট সময়, কোন একটি একক ইদুরের শরীরে থাকা সব জীনগুলো আছে বা তারা শুক্রানুর মাধ্যেমে নতুন ইদুরের শরীরে প্রবেশ করছে। আমরা যদি অনেকগুলো প্রজন্মের দিকে দুর থেকে দৃষ্টি দেই, তাহলে আমরা দেখবো এই দ্বীপের সব জীনগুলো  নানাভাবে সজ্জিত হয়েছে, যেন তারা খু্ব ভালো করে শাফল করা একটি তাশের প্যাকেট:একটি একক জীন পুল ।

ধারনা করছি যে, অ্যাসেনশনের মত কোন ছোট এবং বিচ্ছিন্ন দ্বীপের জীন পুল স্বয়ংসম্পুর্ন  এবং সুরক্ষিত এবং বরং ভালো মতো নাড়া চাড়া বা শাফল করা হয়েছে এমন একটি জীন পুল। এর অর্থ, এই দ্বীপে যে কোন একটি ইদুর এর সাম্প্রতিক পুর্বসুরী  এই দ্বীপের কোথাও না কোথাও বাস করে, মাঝে মধ্যে এক আধটা জাহাজে লুকিয়ে আসা বা যাওয়া কোন ইদুর ছাড়া। কিন্তু বড় কোন ভুখন্ডে যেমন,‌ ই্উরেশিয়ায় ইদুরদের জীনপুল কিন্তু আরো জটিল। মাদ্রিদে যে ইদুরটি বাস করে সে তার বেশীর ভাগ জীন পেয়েছে  ইউরেশিয়ার পশ্চিম প্রান্তে বসবাস কারী পু্র্বসুরী ইদুরদের থেকেই  বরং ধরুন সাইবেরিয়া বা মঙ্গোলিয়ার কোন ইদুর থেকে না। এর কারন কিন্তু জীন আদান প্রদানে কোন সুনির্দিষ্ট ব্যারিয়ার কোন কারন না ( যদিও তাদের অস্তিত্ত্ব আছে), বরং এর কারন শুধুমাত্র বিশাল দুরত্ব যা জীন আদান প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কোন মহাদেশ এর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত কোন জীনের যৌনপ্রজনন প্রক্রিয়া শাফলিং হতে সময় লাগবে। এমনকি যদি মাঝখানে কোন বাধা, যেমন নদী, পর্বতমালা ইত্যাদি না থাকেও,  এই বিশাল ভুখন্ডের দুরত্ব অতিক্রম করে জীন প্রবাহের গতি এত ধীর হবে, যে জীন পুলের নাম ‘সান্দ্রতাময়’ হলে ভুল বলা হবে না। ভ্লাডিভোস্টকে থাকা কোন ইদুর তার সমস্ত জীনের উৎস খুজে পারে পুর্বে থাকা পুবসুরীদের জীনে। ইউিরেশিয়ার জীন পুল শাফল হবে ঠিকই হবে, দুরত্বের কারনে এটি অ্যাসেনশন দ্বীপের মত সমান ভাবে  বা হোমোজেনাস ভাবে হবে না। উপরন্তু আংশিক বাধা যেমন পর্বতমালা, বড় নদী বা মরুভুমি এই সমভাবে সাফলিং এর ক্ষেত্রে বাড়তি বাধার কারন হয়ে দাড়াবে, সে কারনে জীন পুলের তৈরীতে, এবং ফলাফলে এটি জটিল হবে। এই সমস্যা কিন্তু জীনপুলের গুরুত্ব কমাচ্ছে না। কারন নিখুত ভাবে নাড়াচাড়া করা কোন জীন পুল হচ্ছে উপযোগী চিন্তা মাত্র,  গনিতজ্ঞদের নিখুত সরল রেখার ধারনার মত। আসল জীন পুল, এমনকি আসেনশনের মত ছোট দ্বীপেও আংশিক শাফলিং ঘটে, সুতরাং একেবারে নিখুত শাফলিং হওয়াটা একটা ধারনা। দ্বীপ যত ছোট হবে এবং অবিচ্ছিন্ন হবে, নিখুতভাবে নাড়াচাড়া বা শাফলিং করা জীন পুলের ধারনার সাথে সেটি তত সঙ্গতিপুর্ণ হবে।

জীন পুলের ধারনাটা শেষ করার আগে কিছু কথা আবার বলা দরকার। প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র প্রানী যাদের আমরা জনগোষ্ঠীতে  দেখি, তারা তাদের সেই সময়ের ( অথবা বরং তাদের বাবা মার সময়ের) জীন পুলের একটি নমুনা বহন করে। জীন পুলের কোন অন্তস্থ প্রবনতা নেই, নির্দিষ্ট কোন একটি জীনের সংখ্যা বাড়ানো বা কমানোয়। কিন্তু যখনই কোন একটি নির্দিষ্ট জীনকে আমরা জীন পুলে যেভাবে দেখি, তার থেকে পদ্ধতিগতভাবে যে কোন হারে বাড়া বা কমে যাবার ঘটনাট দেখি, সেটাই আসলে বিবর্তন বলতে যা বোঝানো হয় সেটি। সুতরাং এখন প্রশ্ন হলো, কেন পদ্ধতিগতভাবে জনগোষ্ঠীতে একটি জীনের উপস্থিতির হার  বাড়বে বা কমবে? অবশ্যই এখানেই পুরো ব্যপারটা আরো কৌতুহলোদ্দীপক হয়ে উঠে,  আমি  সময়মত পরে আরো ব্যাখ্যা দেব।

পোষা কুকুরদের জীন পুলে দেখা যায় বেশ অদ্ভুত কিছু মজার ব্যপার ঘটেছে, পেডিগ্রী পিকিনেস (Pekinese) বা ডালমেশিয়ানদের (Dalmatian)  ব্রীডাররা অনেক ধরনের বিস্তারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিশ্চিৎ করেন এক জীন পুল থেকে অন্য জীন পুলে যেন কোন জীন না যেতে পারে। বহু প্রজন্মের বিবরণ সহ ধারাবাহিক ’স্টাড বুক ‘ রাখা হয়, পেডিগ্রী ব্রিডারদের জগতে কোন ধরনের মিশ্র প্রজন্মের অনুপ্রবেশ সবচেয়ে খারাপ বিষয়। ‍মনে হতে পারে প্রতিটি জাতের কুকুর তাদের নিজস্ব কোন ছোট  অ্যাসেনশন দ্বীপে বন্দী, অন্য সব ব্রীড বা জাতের সাথে আন্ত:প্রজনন যাতে না ঘটতে পারে ,সে জন্য তাদের আলাদা করে রাখা হয়। কিন্তু এখানে  প্রজননে বাধা কোন নীল পানি না বরং মানুষের নিয়ম। ভৌগলিকভাবে সব যদিও ব্রীড ওভারল্যাপ করে, কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রজননের দিক থেকে তারা আলাদা দ্বীপে থাকার মতই বিচ্ছিন্ন, কারন যেভাবে তাদের মালিকরা তাদের প্রজনন  সুযোগ নিয়ন্ত্রন করে। অবশ্যই মাঝে মাঝে এই আইন ভঙ্গ হয়। যেমন কোন জাহাজে লুকিয়ে কোন ইদুর অ্যাসেনশন দ্বীপে হাজির হয় বা কোন মেয়ে হুইপেট (Whippet), তার বন্ধনী থেকে মুক্ত হয়ে কোন স্প্যানিয়েলের (Spaniel)  সাথে প্রজনন করে। এই প্রজননের ফলে সৃষ্ট শংকর কুকুর ছানাদের যতই ভালবাসা হোক না কেন  প্রানী হিসাব, পেডিগ্রী হুইপেট নামের দ্বীপ থেকে তারা চির নির্বাসিত হয়। দ্বীপটি নিজে বিশুদ্ধ হুইপেট ই থাকে। অন্যন্য বিশুদ্ধ প্রজননের মধ্যে জন্ম নেয়া হুইপেটরা নিশ্চিৎ করে হুইপেট নামে তাদের  এই ভার্চুয়াল দ্বীপ  ‍যেন অকলুষিত থাকে অন্য জাতের জীন থেকে। মানুষ বানানো এধরনের শত শত দ্বীপ আছে, এদের প্রত্যকটি জাতই পেডিগ্রি কুকুর। প্রত্যেকেই ভার্চুয়াল দ্বীপ, তবে দ্বীপ অর্থে তারা ভৌগলিকভাবে কিন্তু বিচ্ছিন্ন  না। পেডিগ্রি হুইপেট (Whippet) বা পোমেরানিয়ান (Pomeranian)দের একই সাথে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেতে পারে সারা পৃথিবীতে, এবং গাড়ী, জাহাজ এবং প্লেন এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় জীন ফেরী করে নিয়ে যায়। পিকিনেস জীন পুল এর ভার্চুয়াল জীন দ্বীপ ভৌগলিকভাবে ওভারল্যাপ করলে, কিন্তু জেনেটিক কোন সংমিশ্রনে আসেনা ( যদি না এ জাতের কোন কুকুর  এই আইন  ভঙ্গ না করে), বক্সার জীনদের ভার্চুয়াল জেনেটিক দ্বীপে বা সেন্ট বার্ণাডদের জীন পুলের ভার্চুয়াল দ্বীপে।


ছবি: কয়েকটি ব্রীডের কুকুর (উপরে বা দিক থেকে: পেকিনেস, ডালমেশিয়ান,পোমেরানিয়ান, নীচে বা দিক থেকে: হুইপেট, স্প্যানিয়েল, সেন্ট বার্ণাড)

আরো একবার, এই সেকশনটির শুরুতে করা আমার একটি মন্তব্যে ফিরে আসি, যা দিয়ে আমি জীন পুলের আলোচনা শুরু করেছিলাম। আমি বলেছিলাম মানব ব্রীডারদের ভাস্কর হিসাবে দেখতে হলে, তাদের রুপক ছেনী  দিয়ে তারা যে খোদাই করছে, সেটা অবশ্যই কুকুরের মাংশ বা শরীর না, তাদের জীন পুল।  মনে হতে পারে এটা মাংশ বা শরীর কারন ব্রীডার হয়তো ঘোষনা দিলেন তার  ইচ্ছার কথা উল্লেখ করে যে, বক্সারদের পরবর্তী প্রজন্মে তাদের নাক বা স্নাউট টাকে খাটো করে দেবে, এবং এ ধরনের পরিকল্পনার শেষ বিন্দু আসলে হবে খাটো নাক, যেন আদি কুকুরের নাকে  ছেনী দিয়ে খোদাই করে এই বর্তমান রুপটি দেয়া হয়েছে। কিন্তু  আমরা যেমন দেখেছি, কোন টিপিক্যাল বক্সার কোন একটি জেনারেশনে সমসাময়িক জীন পুলের নমুনা মাত্র। এটাই সেই জীন পুল যা ব্রীডাররা ঘষে মেজে তাদের হাতে গড়ে নিয়েছে বছরের পর বছর ধরে। লম্বা স্নাউট বা নাকের জীনটা খোদাই করে জীন পুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, এবং একে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে ছোট স্নাউটের জীনটি দিয়ে। প্রতিটা জাতের কুকুর, ডাচশুন্ড থেকে ডালমেশিয়ান, বক্সার থেকে বরজয়, পুডল থেকে পেকিনেসে, গ্রেট ডেন থেকে চিহুয়াহুয়া এভাবে খোদাই করা হয়েছে, ছেনী দিয়ে কেটে তাদের আকৃতি দেয়া হয়েছে,পছন্দ মত ছাচে ঢেলে তৈরী করা হয়েছে, না আক্ষরিক অর্থে  তার হাড় মাংশ না. তাদের জীন পুলকে।

এই সব কিছু শুধু মাত্র পরিকল্পনা মাফিক খোদাই করে তৈরী করাই হয়নি। আমাদের অনেক পরিচিত জাতের কুকুর প্রথমত এসেছেই অন্য নানা জাতের মিশ্র বা হাইব্রীড হিসাবে, কখনো খু্ব সম্প্রতি, যেমন উনবিংশ শতাব্দীতে। হাইব্রিডাইজেশন, অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে ভার্চুয়াল দ্বীপের সেই জীন বিচ্ছিন্নতার চুড়ান্ত লঙ্ঘন। কিছু হাইব্রিডাইজেশন প্রক্রিয়া এমন যত্নের সাথে সাজানো যে ব্রীডাররা তাদের তৈরী হাইব্রীডকে মঙ্গরেল বা মাটস (  বা শঙ্কর ( যেমন প্রেসিডেন্ট ওবামা আনন্দের সাথে নিজের পরিচয়ে উল্লেখ করেছিলেন) বলাটা আদৌ পছন্দ করেননা);’ল্যাবরাডুডল’ হচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড ’পুডল’ এবং একটি ’ল্যাবরাডর রিট্রিভার’ এর হাইব্রীড, ব্রীডারদের  এই দুই জাত থেকে খুব সাবধানে ভালো বৈশিষ্টগুলোকে একজায়গায় করার চেষ্টা। ল্যাবরাডুডল এর মালিকদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠিত সমিতি আছে যেমন বিশুদ্ধ জাতের পেডিগ্রি কুকুরের মালিকদেরও আছে। ল্যাবরাডুডল প্রীতি বিষয়ে দুটো আলাদা ধারনা প্রচলিত আছে, যেমন অন্য আরো এমন ডিজাইনার হাইব্রিডদের ক্ষেত্রেও আছে। একদল আছেন তারা খুব আনন্দের সাথে পুডল আর ল্যাবরাডর প্রজনন করিয়ে হাইব্রীড প্রজাতি তৈরী করার পক্ষে, আর আছে অন্য গ্রুপ তারা নতুন একটা ল্যাবরাডুডলের জীন পুল শুরু করার কাজে ব্যস্ত,যারা সত্যিকারের ল্যাবরাডুডলের প্রজন্ম তৈরী করবে যখন শুধুমাত্র দুটো বিশুদ্ধ ল্যাবরাডুডল প্রজনন করবে। বর্তমানে ‍দ্বিতীয় প্রজন্মের ল্যাবরাডুডল জীন সন্নিবিষ্ট হয়ে বেশী প্রকারের  ভ্যারিয়েশন তৈরী করে, বিশুদ্ধ জাতের পেডিগ্রি কুকুরদের যে পরিমান ভ্যারিযেশন দেখানো উচিৎ তার চেয়ে বেশী ।এভাবেই অনেক ’বিশুদ্ধ’ জাতের জন্ম হয়েছে। তারা অন্তবর্তীকালীন একটি বহুমাত্রায় বিচিত্রতার একটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়েছে, যা ধীরে ধীরে বহু জেনারেশনের সতর্ক প্রজননের মাধ্যমে কেটে ছেটে বাদ দেয়া হয়েছে।


ছবি:কয়েকটি ব্রীডের কুকুর (উপরে বা দিক থেকে): বুলডগ, বক্সার, ডাখশুন্ড; ( মধ্যে বা দিক থেকে): ব্যাসেট হাউন্ড, বরজোয়, ল্যাব্রাডর রিট্রিভার, (নীচে: বা দিক থেকে): পুডল, ল্যাবরাডুডল, স্কটি)

মাঝে মাঝে নতুন জাতের কুকুর তাদের যাত্রা শুরু করেছে কেবল একটি বড় মাপের মিউটেশনকে বহন করার মাধ্যমে। মিউটেশন হলো জীনের এলোমেলো বা র‌্যানডোম পরিবর্তন যা বিবর্তন প্রক্রিয়ার কাজের কাচামাল, কারন এদের নন-র‌্যানডোম ভাবে নির্বাচন করার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি কাজ করে। প্রকৃতিতে বড় ধরনের মিউটেশন খুব কমই দীর্ঘজীবি হয়, কিন্তু জীনতত্ত্ববিদরা এদের ল্যাবরেটরিতে ভীষন পছন্দ করেন কারন গবেষনা করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। কুকুরের যে জাতের খুব ছোট পা আছে, যেমন ব্যাসেট হাউন্ড এবং ডাচশুন্ড, তাদের এই ছোট পা তারা পেয়েছে একটি পর্যায়ের জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে, যে জেনেটিক মিউটেশনের নাম আকন্ড্রোপ্লাসিয়া,একটি বড় কোন মিউটেশনের একটি  ধ্রুপদী উদহারন,যা প্রকৃতিতে খুব সম্ভবত বাচতে পারেনা। একটি সমতুল্য মিউটেশন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দেখা ডোয়ার্ফিজম বা বামনত্বর কারন হিসাবে: যেখানে মুল শরীরের আকার ঠিক থাকে, কিন্তু হাত বা পা ছোট হয়। অন্যান্য জেনেটিক প্রক্রিয়াও নানা ধরনের  ক্ষুদ্রকায় জাত তৈরী করে,যেখানে তাদের মুল আকারের অনুপাতটা ধরে রাখে। কুকুরের ব্রীডাররা আকার আয়তনে পরিবর্তনগুলো অর্জন করে কিছু বড় মিউটেশন যেমন অ্যাকোন্ড্রোপ্লাশিয়া এবং অনেক ছোট ছোট মিউটেশন এর একটা সন্নিবেশ কে কৃত্রিমভাবে নির্বাচন করার মাধ্যমে; এ ধরনের কোন পরিবর্তনকে সফলভাবে ঘটাতে তাদের জীনতত্ত্ব সম্বন্ধে কোন বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। জীনতত্ত্ব  একেবারে না বুঝেই, শুধু মাত্র কে কার সাথে প্রজনন করবে সেটা নির্বাচন করার মাধ্যেমে, আপনি আপনার পছন্দ মত বৈশিষ্ট সম্পন্ন যে কোন ধরনের ব্রীড তৈরী করতে পারেন। কুকুরের ব্রীডার,বা যে কোন প্রানী কিংবা উদ্ভিদের ব্রীডাররা সাধারণত এটাই করেন ;কারো জেনেটিক্স বোঝার অনেক শতাব্দী আগেই এটি প্রচলিত ছিল। এখানে প্রাকৃতিক নির্বাচনের বিষয়ে এখানে কিছু শিক্ষা আছে:কারন মানুষ ব্রীডারদের মত প্রকৃতিরও অবশ্যই এ বিষয়ে কোন ধারনাই নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রানীবিজ্ঞানী রেমন্ড কপিঙ্গার একটি বিষয় উল্লেখ করেছিলেন, সেটা হলো বিভিন্ন জাতের কুকুর ছানাগুলো কিন্তু একে অপরের বেশী সদৃশ তাদের পুর্ণবয়স্ক কুকুরদের তুলনায়। ছানাদের আলাদা হওয়াটা আসলে পোষায় না। কারন তাদের প্রধান কাজ হোলো মায়ের দুধ চুষে পান করা, আর এই চোষার কাজটা  সব জাতের জন্য কম বেশী চ্যালেন্জ্ঞ হতে পারে। বিশেষ করে, চুষতে ভালো হতে গেলে, ছানাদের লম্বা নাক থাকা চলবে না বরজোই বা রিট্রিভার দের মত। সেজন্য সব ছানারাই পাগদের মত দেখতে ( নাক ছোট, আপনি বলতে পারেন পুর্ণবয়স্ক পাগ হচ্ছে কুকুর ছানা যাদের মুখ ঠিক মত বড় হয়ে উঠেনি। সব কুকুররাই, ‍দুধ ছাড়ার পর,অপেক্ষাকৃতভাবে তার স্নাউটটি লম্বা হয়, শুধু পাগ, বুলডগ আর পেকিনেসের হয়না। তারা অন্যদিকে বাড়ে, তাদের স্নাউটটা শিশুসুলভই থাকে। এর টেকনিক্যাল নাম হলো ’নিওটেনি (neoteny), আমরা যখন ৭ অধ্যায়ে মানুষের বিবর্তন নিয়ে কথা বলবো বিষয়টি আবার আলোচনায় আসবে।

যদি কোন প্রানী তার শরীরের সব অংশে একই হারে বাড়ে তাহলে একজন পুর্নবয়স্ক তার শিশু অবস্থায় স্ফীতকায় রুপ হবে, তখন বলা হয় এটি বৃদ্ধি পেয়েছে আইসোমেট্রিকালী, আইসোমেট্রিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়াটা কদাচিৎ দেখা যায়। কিন্তু অ্যালোমেট্রিক ভাবে বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ,শরীরের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন হারে বাড়ে; কখনো বিভিন্ন অংশে বাড়াটা বাকী অংশদের সাথে একধরনের সরল গানিতীক নিয়মানুপাতে ঘটে। যে বিষয়টি নিয়ে গবেষনা করেছিলেন স্যার জুলিয়ান হাক্সলী ১৯৩০ এর দশকে। বিভিন্ন জাতের কুকুর তাদের ভিন্ন ভিন্ন আকার ও আয়তনে অর্জন করে সেই সব জীনের মাধ্যমে যারা শরীরের বিভিন্ন অংশের সাথে অ্যালোমেট্রিক হারে বাড়তে থাকে।যেমন বুলডগরা চার্চিল এর মত রুষ্ট চেহারাটা পায় তাদের নাকের হাড়ের ধীর গতিতে বাড়ার একটি জেনেটিক প্রবণতা থেকে। এটাই এর আশে পাশের হাড় গুলো এবং আসলেই এখানকার অন্যান্য সফট বা নরম টিস্যুগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রক্রিয়া ব্যহত করে, বিজ্ঞানীরা যাকে নক অন (Knock on) প্রভাব বলেন। এরকম একটি নক অন প্রভাব হচ্ছে মুখ গহবরের ভিতর একটি হাড়, প্যালেট একটু তার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে আরো উচুতে একটি বেকায়দা অবস্থান নেয়, সেকারনে এদের দাতগুলো বাইরের দিকে বের হয়ে থাকে এবং এদের প্রবণতা থাকে মুখ থেকে বেশী লালা পড়ার। বুলডগদের কিন্তু শ্বাস নেবার সমস্যাও আছে, যা পেকিনেসেদেরও আছে। বুলডগদের জন্মের সময়ও সমস্যা হয়, কারন তাদের মাথা আকারে বিষমভাবে বড়। বেশীর ভাগ, যদিও সব না, বুলডগের জন্ম হয়েছে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে।

বোরজোয়রা আবার এর বীপরিত, তাদের নাক বেশী লম্বা। তাদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যপারটা হলো, তাদের এই নাক বা স্নাউট লম্বা হবার বিষয়টি ঘটে তাদের জন্মের আগেই, এজন্য বোরজোয়া কুকুর ছানা দুধ চোষায়  অন্যান্য জাতের কুকুরদের চেয়ে কম পারদর্শী। কপিঙ্গারের মতে মানুষের লম্বা স্নাউটের বোরজয় ব্রীড করার উপর একটা সীমাবদ্ধতা তৈরী করেছে বোরজয় ছানাদের দুধ চুষে খাবার চেষ্ঠায় ছানাদের বাচার ক্ষমতার উপর।

কুকুরদের গৃহপালিতকরণ প্রক্রিয়ার এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কি শিক্ষা নিয়েছি তাহলে? প্রথমত, অনেক ধরনের বা প্রকারের কুকুরের জাত আছে, গ্রেট ডেন থেকে ইয়র্কি, স্কটি থেকে এয়ারেডেল, রিজব্যাক থেকে ডাখশুন্ডস, হুইপেট থেকে সেন্ট বার্ণাড,যারা প্রমান করে যে কত সহজ নন র‌্যানডোমভাবে  জীন নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি,জীনপুলের এই ’খোদাই বা ঘষামাজা, যা সত্যি সত্যি নাটকীয় পরিবর্তন আনে শরীরের আকারে,গঠনে এবং আচরনে এবং বিষয়টি ঘটেও খুব দ্রুত, বিস্ময়করভাবে সামান্য কিছু জীনের অংশগ্রহনের শুধু প্রয়োজন হয়। কিন্তু পরিবর্তন এত বড়,পার্থক্যগুলো এত বিশাল বিভিন্ন জাতের মধ্যে, যে কারো মনে হতে পারে বিবর্তন প্রক্রিয়ার এটি করতে সময় লেগেছে মাত্র কয়টি শতাব্দী কিংবা এমন কি কয়েক দশক  না  বরং সময় লেগেছ কয়েক মিলিয়ন বছর। কল্পনা করুন কি ধরনের পরিবর্তন তাহলে আশা করা যেতে পারে শত বা সহস্র মিলিয়ন বছরে।

শতাব্দী ধরে প্রক্রিয়াটি লক্ষ্য করে,কোন ফাপা পরিকল্পনা নিয়ে কিন্তু কুকুরের ব্রীডাররা তাদের কাজ শুরু করেননি। তারা কুকুরের শরীরকে মডেলিং এর ক্লে বা কাদার মত ছেনে, গড়ে পিটে এদের অনেকটাই তাদের পছন্দ মত আকার দিয়েছেন। অবশ্যই আমি আগে ‍উল্লেখ করেছি, আসলে মাংশ বা হাড় না, ব্রীডাররা আকার দিচ্ছেন এই নানা জাতের কুকুরদের জীন পুলকে। খোদাই করাটা বেশী উপযুক্ত রুপক হবে ময়দার মত ছেনে নমনীয় পিন্ড বা তাল বানানো বলার চেয়ে। কোন কোন ভাস্কর কাজ করেন একতাল কাদা বা  ক্লে নিয়ে, তারপর তা ছেনে, ভালো করে মিশিয়ে নমনীয় পিন্ড থেকে একটি আকার দেন।অন্য কোন ভাস্কর নেন পাথর বা কাঠের টুকরো, এবং একে খোদাই করেন বাটালী বা ছেনী দিয়ে কেটে কেটে নানা অংশ বাদ দিয়ে দিয়ে। স্পষ্টতই কুকুর এর ব্রীডাররা ছেনী দিয়ে কুকুরের মাংশ কেটে বাদ দিয়ে কোন আকার দেন না, কিন্তু তারা তাদের জীনপুলটিকে খোদাই করেন বাদ দেবার মাধ্যমে। শুধু বাদ দেবার চেয়ে যদিও ব্যপারটা আরো জটিল। যদিও মাইকেলেন্জেলো এক টুকরো মার্বেল নিয়ে সেটা খোদাই করে এর ভিতর থেকে বের করে এনেছিলেন এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা ডেভিডকে। নতুন কিছু যোগ না করে। জীন পুল এর ব্যতিক্রম, কারন এখানে যোগ হচ্ছে অবিরত, যেমন মিউটেশনের মাধ্যমে, এবং একই সাথে নন র‌্যানডোম মৃত্যু  এই পুল থেকে বাদ করে দিচ্ছে কিছু। এখানে ভাস্করের তুলনা বা অ্যানালজীটা ভেঙ্গে পড়ে এবং মিল খোজার অতিরিক্ত চেষ্টা না করারই ভালো, আমরা ৮ নং অধ্যায়ে দেখবো বিষয়টা।

ভাস্কর্যের উপমাটা  মনের মধ্যে মানুষ বডিবিল্ডারদের এবং মানুষ নয় এমন কিছু সমতুল্য যেমন বেলজিয়ান ব্লু ব্রীড গরু কথাটা মনে করিয়ে দেয়। এই চলমান বীফ বা গরুর মাংশর কারখানা পরিকল্পিত ভাবে তৈরী করা হয়েছে  একটি নির্দিষ্ট  জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে, যার নাম,’ডাবল মাসলিং’;  মায়োস্ট্যাটিন নামে একটি রাসায়নিক পদার্থ আছে, যা মাংশের বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রন করে,যে জীনটি এই মায়োস্ট্যাটিন তৈরী করে সেটাকে যদি অকার্যকর করে দেয়া যায় মাংশপেশী অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।প্রায়শই যেটা দেখা যায় সেটা হলো কোন একটি জীন একাধিক উপায়ে পরিবর্তিত হয়ে একই ফলাফলই তৈরী করে। আরেকটি উদহারন হলো শুকরদের একটি জাত ’দি ব্ল্যাক এক্সোটিক’, এছাড়া বেশ কিছু জাতের কিছু কুকুর এধরনের অতিরিক্ত মাংশল হয় একই কারনে। মানুষ বডি বিল্ডাররা এই এই শারীরিক গঠন তৈরী করে অতিরিক্ত অনুশীলন, কখনো অ্যানাবলিক স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করে: দুটি পরিবেশগত হস্তক্ষেপই বেলজিয়ান ব্লু এবং ব্ল্যাক এক্সোটিকদের জীনকে মিমিক বা এর অনুকরণীয় প্রভাব ফেলে। দুটোরই ফলাফল হচ্ছে একই রকম, এটা নিজেই একটা শিক্ষা, জেনেটিক এবং পরিবেশগত পরিবর্তন কখনো কখনো একই ধরনের ফলাফলের কারন হতে পারে। আপনি যদি  একটি এমন মানব শিশুকে পালতে চান, যে বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতায়  জিতবে, এবং আপনার হাতে বেশ কয়েক শতাব্দী সময় আছে, আপনি জেনেটিক ম্যানিপুলেশন দিয়ে শুরু করতে পারেন, এবং সেই আজব জীনটি ঠিকই কাজে লাগাতে পারবেন, যা বেলজিয়ান ব্লু ব্রীড বা ব্ল্যাক এক্সোটিকদের ক্ষেত্রে ঘটে। আসলেই বেশ কিছু মানুষ সম্বন্ধে জানা গেছে যাদের  এই মায়োস্ট্যাটিন জীনটি মুছে গেছে, তাদের বেশী মাংসল হবার প্রবণতাও আছে। আপনি যদি এমন কোন মিউটেশন বাহী কোন শিশু পান এবং তাকে ভারী জিনিস দিয়ে অনুশীলন করান (গরু বা শুকরকে দিয়ে যে কাজটি  করানো সম্ভব না, আপনি সম্ভবত মি:  ইউনিভার্সের তুলনায় অনেক বেশী আজব মাংশবহুল কিছু পাবেন।


ছবি: বেলজিয়ান ব্লু ব্রীড, মায়োস্ট্যাটিন জিন মিউটেশনটি সিলেক্ট করে এদের ব্রীড করা হয় মাংশের জন্য। (আরো ছবি এখানে)


ছবি: ব্ল্যাক এক্সোটিক পিগ


ছবি: এক্সট্রিম বডি বিল্ডার। এখানে কোন মিউটেটেড জীন নেই। এটি পরিশ্রম, অনুশীলন, কখনো অ্যানাবোলিক স্টেরেয়ড এর সহায়তায় গড়ে তোলা হয় অর্থাৎ এটি কৃত্রিম ভাবে লালিত; লক্ষ্য করুন পরিবেশের (অনুশীলন, ডায়েট)  প্রভাব কিন্তু জীন গত পরিবর্তনকে অনুকরন বা মিমিক করতে পারে। (ছবি সুত্র)

মানব প্রজাতির ইউজেনিক ব্রিডিং এর বিপক্ষে রাজনৈতিক বিরোধিতা কখনো অবশ্যই নি:সন্দেহে মিথ্যা একটি দাবীতে পৌছাতে পারে, সেটা হচ্ছে,এটি অসম্ভব। শুধু অনৈতিকই না, আমি হয়তো শুনে থাকবেন বলা হয়ে থাকে, এটা এভাবে কাজ করেনা। দুঃখজনকভাবে,অনৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে অকাম্য কোন কিছু হওয়া মানে কিন্তু এটা না যে, বিষয়টি কাজ করবে না। আমার কোন সন্দেহ নেই, যদি মনস্থির করা যায়, এবং যথেষ্ট সময় এবং রাজনৈতিক শক্তি দেয়া হয়, একটি উন্নত বডি বিল্ডার বা হাইজাম্পার বা শটপাট নিক্ষেপকারী, মুক্তো শিকারী, সুমো কুস্তিগীর বা দ্রুত দৌড়বিদ; বা ( আমার সন্দেহ, যদিও খানিক কম আত্মবিশ্বানের সাথে কারন কোন প্রানীদের মধ্যে এধরনের কিছু করার পু্র্বউদহারণ আমার জানা নেই) উচু মানের সঙ্গীতজ্ঞ, কবি, গনিতজ্ঞ বা ওয়াইন টেষ্টার এর ব্রীড তৈরী করতে পারবেন। যে কারনে অ্যাথলেটিক ক্ষমতার সিলেকটিভ বা নির্বাচিত ব্রীডিং এর ক্ষেত্রে কাজ করবে বলে আমি আত্মবিশ্বাসী তা হলো, যে গুনাবলীগুলো এক্ষেত্রে দরকার,সেগুলো প্রমানিতভাবে কাজ করেছে রেসের ঘোড়া বা ঘোড়াগাড়ী টানার ঘোড়া, গ্রেহাউন্ডদের এবং শ্লেজ কুকুরদে ব্রীডিং প্রক্রিয়ায়।আর যে কারনে আমি বেশ খানিকটা মোটামুটি আত্মবিশ্বাসী এর ব্যবহারিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ( যদিও নীতিগত বা রাজনৈতিক ভাবে তা আদৌ কাম্য না)তা হলো,মানসিক বা অন্যার্থে অনন্যভাবে মানবিক বৈশিষ্টগুলোর নির্বাচত ব্রীডিং;এধরনের কোন ব্রীডিং প্রক্রিয়ার চেষ্টার খুব সামান্যই কিছু উদহারন প্রানীদের মধ্যে যা আছে যা কিনা ব্যর্থ হয়েছে। এমন কি এমন কিছু বৈশিষ্টের ক্ষেত্রেও যা বিস্ময়করই ভাবা হতো, কে ভেবেছিল, যেমন, এমন কুকুরের জাত তৈরী করা যাবে যাদের ভেড়ার পাল চরানোর দক্ষতা আছে বা ’পয়েন্টিং’ বা ’বুল-বেইটিং’ এর দক্ষতা আছে।


ছবি: ছবিতে কুকুরটি পয়েন্টিং করছে; এই ধরনের কুকুররা শিকারীদের সাহায্য করে (গানডগ) ব্রীড; এরা শিকারের সময় শিকারীদের শিকার এবং গান রেন্জের দিকে পয়েন্ট করার বৈশিষ্ট আছে। এই জাতটিতে বিশেষভাবে  ব্রীড করা হয়। (ছবি সুত্র)

যদি গাভী থেকে বেশী পরিমান দুধ চান, অনেক গ্যালন বেশী, যা কোন গাভীর তার বাছুর পালার জন্য যা দরকার তারচেয়ে অনেকগুন বেশী। সিলেকটিভ ব্রিডিং আপনাকে সেটি দিতে পারে। গাভীদের কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পরিনত করা হয়েছে বিশাকৃতি স্তন বা পালান হবার জন্য এবং বাছুরদের সাধারন দুধ খাবার পর্ব শেষ হবার পরও যা আরো অনেক পরিমান দুধ তৈরী করবে। কিন্তু যেটা হয়েছে, ডেয়ারী ঘোড়া কিন্তু এভাবে ব্রীড করা হয়নি। কেউ কি আমার সাথে বাজি রাখতে রাজি আছেন, আমরা এটা করতে পারবো যদি চেষ্টা করা হয়।  এবং অবশ্যই ডেয়ারী মানুষের ক্ষেত্রেও এটা সত্যি হবে, যদি কেউ চেষ্টা করতে চান। অনেক বেশী সংখ্যক মহিলা, ছলনার শিকার হয়েছেন সেই পুরাণ কাহিনী দিয়ে যে,তরমুজের মত বড় স্তন নাকি আকর্ষনীয়, তারা সার্জনদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন স্তনের আকৃতি বাড়াতে শরীরের মধ্যে সিলিকন প্রবেশ করাতে ( এবং আমার দৃষ্টিতে) অনাকর্ষনীয় ফলাফলের জন্য। কেউ কি সন্দেহ করেন, যথেষ্ট পরিমান প্রজন্মান্তরে এই একই শারীরিক ক্রটি অর্জন করা যেতে পারে সিলেকটিভ ব্রিডিং এর মাধ্যমে, ফ্রিজিয়ান গাভীদের মত?

প্রায় ২৫ বছর আগে আমি  একটি কম্পিউটার সিমুলেশন প্রোগ্রাম তৈরী করেছিলাম কৃত্রিম বা আর্টিফিসিয়াল নির্বাচনের ক্ষমতাকে প্রদর্শন করতে:  বিশেষ জাতের গোলাপ, কুকুর বা গবাদী পশুদের  ব্রীডিং প্রক্রিয়ার সমতুল্য একটি কম্পিউটার গেম।একজন খেলোয়াড় প্রথমে কম্পিউটার স্ক্রিণের উপর মোট নয়টি ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি বা শেপ দেখতে পাবেন- ’কম্পিউটার বায়োমর্ফ’ – যাদের মাঝখারে অবস্থার রত বায়োমর্ফটি এর চারপাশে বাকী আটটির পিতামাতা বা প্যারেন্ট। প্রত্যেকটি শেপ তৈরী হয়েছে  এক ডজন এর মত জীনের প্রভাবে, যারা শুধু একটি নাম্বারকে প্রতিনিধিত্ব করছে যা  প্যারেন্ট থেকে সন্তানের মধ্যে হস্তান্তরিত হচ্ছে ছোট খাট ‍মিউটেশনের সম্ভাবনা সহ। এখানে মিউটেশন  হলো প্যারেন্টদের জীনের সংখ্যা মানের সামান্য বৃদ্ধি বা হ্রাস। প্রতিটি আকৃতি তৈরী হয়েছে একটি নির্দিষ্ট সেট নাম্বারের (বা জীন) প্রভাবে, যা তাদের নিজস্ব ডজন জীনের একটি নির্দিষ্ট মান। গেমটি খেলছে যারা তারা এই নয়টি শেপের সজ্জা প্রথমে লক্ষ্য করবেন এবং কিন্তু কোন জীন (বা সংখ্যা) দেখতে পাবেন না; তারা এখান থেকে প্রথমে পছন্দ করবেন কোন একটি বডি শেপ বা আকৃতিকে, যেখান থেকে তিনি ব্রীডিং প্রক্রিয়া শুরু করবেন। অন্য  আটটি বায়োমর্ফ তখন স্ক্রীন থেকে সরে যাবে, পছন্দেরটি ঠিক মাঝখানে চলে আসবে। এবং সে আটটি মিউট্যান্ট শিশু শেপের জন্ম দেবে। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকবে খেলোয়াড় যে কয়টি প্রজন্ম তৈরী করার সময় আছে, এবং এই অর্গানিজমটির গড়পড়তা শেপটি স্ক্রিণেই ধীরে ধীরে বিবর্তিত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। শুধুমাত্র জীনই যেহেতু হন্তান্তর হবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে, সুতরাং সরাসরি কোন বায়োমর্ফকে পছন্দ করার মাধ্যমে আসলে খেলোয়ার তার অজান্তে জীনকে নির্বাচন করছেন, এবং ঠিক এটাই হয় যখন ব্রীডারটা কোন একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্টের কুকুর বা গোলাপ বেছে নেয় কৃত্রিম প্রজননের জন্য।

ছবি: Blind Watchmaker প্রোগ্রামে তৈরী করা কিছু বায়োমর্ফ (http://www.phy.syr.edu/courses/mirror/biomorph/)

জেনেটিক্স নিয়ে আর নয়। গেমটা বেশ মজার হয়ে উঠে যখন আমরা এম্ব্রায়োলজী বা ভ্রুণতত্ত্ব বিষয়টি নজরে আনবো। স্ক্রীনের বায়োমর্ফের ভ্রুনতত্ত্ব হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে এর জীনগুলো – সেই সংখ্যা মানগুলো- এর শেপকে প্রভাবিত করতে পারে। অনেকগুলো খুবই ভিন্ন ভ্রুণতত্ত্ব এখানে ভাবা  সম্ভব, আমিও বেশ কিছু চেষ্টা করেছি, আমার প্রথম প্রোগ্রাম যার নাম ছিল ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার, একটি গাছের বাড়তে থাকা মত ভ্রুণতাত্ত্বিক ধারনা ব্যবহার করেছিল; একটি প্রধান ট্রাঙ্ক বা কান্ড থাকবে যা দুটি মুল শাখায় ভাগ হবে, তারপর প্রতিটি শাখা নিজেই আরো দুটি নতুন শাখায় ভাগ হবে এভাব চলতে থাকে। শাখার সংখ্যা, তাদের কৌনিক অবস্থান বা দৈর্ঘ সব কিছু নিয়ন্ত্রন করবে জীন যা নির্ধারন করে জীনের জন্য প্রদত্ত সংখ্যাগত মান। এই শাখান্বিত হওয়া বৃক্ষটির ভ্রুনতত্ত্বর অন্যতম বৈশিষ্টটি হলো যে এটি রিকারসিভ, বা বার বার পুণব্যবহার করে একই সুত্র। আমি মুল আইডিয়া এখানের পুরো ব্যাখ্যা করার প্রাসঙ্গিকতা দেখছিনা, তবে এর অর্থ একটি একক মিউটেশন টিপিক্যালী শুধু কোন একটি অংশ না বরং সারা গাছটির উপরই প্রভাব ফেলে।

যদিও ব্লাইন্ড ওয়াচমেকার প্রোগ্রাম শুরু হয় একটি সাধারন শাখান্বিত হতে থাকা গাছের মাধ্যমে, এটি দ্রুতই একটি ওয়ান্ডারল্যান্ডে পৌছে যায় নানা বিবর্তিত ফর্মে, যাদের অনেকেরই আছে অদ্ভুত সৌন্দর্য যার কিছুটা নিয়ন্ত্রন করে মানুষ খেলোয়াড়টির উপর- বিভিন্ন প্রানীদের মত যেমন কীট পতঙ্গ, মাকড়শা কিংবা স্টারফিস এর মত এরা আকার নেয়। উপরে একটি ডায়াগ্রামে সেই প্রানীদের সাফারী পার্ক যার একটি মাত্র (আমি) খেলোয়ারই পেয়েছেন এই অদ্ভুত কম্পিউটার গেমটিতে। পরবর্তী সংস্করনে  আমি ভ্রুণতত্ত্বকে পরিবর্ধন করেছি জীনদের মাধ্যমে রং এবং শাখাদের আকৃতি পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করার মাধ্যমে।

আরো  বিস্তারিত একটি প্রোগ্রাম, যার নাম অ্যানথ্রোমর্ফ, আমি যা লিখেছি টেড কায়েহলের এর সাথে যৌথভাবে, যিনি অ্যাপল কম্পিউটার কোম্পানীতে কাজ করেন, যার মধ্যে আছে  ’ভ্রুণতত্ত্ব‘ যোগ করা হয়েছে  কিছু অন্যান্য চমৎকার বৈশিষ্ট সহ, যা যা বিশেষভাবে কীটপতঙ্গ, মাকড়শা,সেন্টিপিড এবং আর্থ্রোপড সদৃশ প্রানী সৃষ্টি করারর জন্য প্রোগ্রাম করা হয়েছে। আমি অ্যানথ্রোপোমর্ফ এবং বায়োমর্ফ ও এধরনের আরো কিছু প্রোগ্রাম নিয়ে এর আগে বিস্তারিত লিখেছি, আমার ’ক্লাইম্বিং মাউন্ট ইমপ্রোবাবল’ বইটিতে।

যেহেতু শেল এম্ব্রায়োলজির গনিত এখন খুব ভাল করে বোঝা সম্ভব হয়েছে। সুতরাং আমার কনকোমর্ফ প্রোগ্রাম ব্যবহার করে কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে জীবন্ত প্রানীদের মত দেখতে নানা ফর্মের সৃষ্টি করা সম্ভব (নীচে); আমি এই প্রোগ্রামগুলোর ব্যাপারে আবার পরে কথা বলবো, নতুন একটি বিষয়কে ব্যাখ্যা করতে, শেষ অধ্যায়ে। আমি এখানে এদের ভুমিকা দিলাম শুধু, কৃত্রিম নির্বাচনের ক্ষমতাকে, এমনকি খুব সাধারন কম্পিউটার পরিবেশে, ব্যাখ্যা করার খাতিরে। কিন্তু কৃষিকাজ এবং উদ্যানতত্ত্বের বাস্তব পৃথিবীতে, বা কবুতর বা কুকুরের ব্রীডারদের জন্য কৃত্রিম নির্বাচন ‍আরো অনেক বেশী কিছু অর্জন করেছে। বায়োমর্ফ, অ্যানথ্রোমর্ফ এবং কনকোফর্ম এই মুলনীতিটার উদহারণ; যেমন কৃত্রিম নির্বাচনের ‍উদহারন নিজেই  আমাদের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মুল ভিত্তিটাকে বুঝতে সাহায্য করবে এর পরের অধ্যায়ে।

ছবি: কঙ্কোফর্ম (Conchomorhs), এই কম্পিউটার জেনেরেটেড শেল, যা কৃত্রিম ভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে আকৃতি দিয়েছে প্রোগ্রামটি।

কৃত্রিম নির্বাচনের ক্ষমতা সম্বন্ধে ডারউইনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল এবং অন দি অরিজিন অব স্পেসিস এর প্রথম অধ্যায়েই এই প্রক্রিয়াটির জন্য একটি গর্বিত জায়গাও দিয়েছিলেন। তিনি আসলে পাঠকদের খানিকটা নমনীয় করে নিতে চাইছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ক্ষমতা সম্বন্ধে তার অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টির ধাক্কাটি দেবার আগে। যদি মানুষ ব্রীডাররা পারে নেকড়েকে পেকিনেস এ বা বুনো বাধাকপিকে ফুলকপিতে রুপান্তর ঘটাতে শুধু কয়েক শতাব্দী বা হাজার বছর সময়ের ব্যাপ্তিতে, তাহলে মিলিয়ন বছর ধরে প্রকৃতিতে বন্য প্রানী এবং উদ্ভিদদের নন রানডোম সার্ভাইভাল ও তার উপর কাজ করা প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলাফল, কেন সেই একই কাজটি করতে পারবেনা ? এটাই পরবর্তী অধ্যায়ে আমার উপসংহার হবে; কিন্তু আমার কৌশল হবে আগে আমার পাঠকদের খানিকটা নমনীয় করার প্রক্রিয়াটি আরো কিছ দুর এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, যেন প্রাকৃতিক নির্বাচন বিষয়টি বুঝতে তাদের সহজ হয়।

Advertisements
কুকুর, গরু এবং বাধাকপি

5 thoughts on “কুকুর, গরু এবং বাধাকপি

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s