লরেন্স ক্রাউস এর এ ইউনিভার্স ফ্রম নাথিং : প্রথম অধ্যায়


শীর্ষ ছবি: অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সী (M31); আমাদের মিল্কী ওয়ে গ্যালাক্সীর কাছে অবস্থিত সবচেয়ে মেজর গ্যালাক্সী। মিল্কী ওয়ের মতই এটি একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সী, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন আলোক বর্ষ দুরে অবস্থিত। (ছবিসুত্র)

One of the most poetic facts I know about the universe is that essentially every atom in your body was once inside a star that exploded. Moreover, the atoms in your left hand probably came from a different star than did those in your right. We are all, literally, star children, and our bodies made of stardust. Lawrence Krauss

ভুমিকা: লেখাটি কানাডীয় আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউস (Lawrence Krauss) এর A Universe from Nothing: Why There is Something Rather Than Nothing এর প্রথম অধ্যায় A Cosmic Mystery Story: Beginnings এর অনুবাদ প্রচেষ্টা। বর্তমানে তিনি অ্যারিজোনা স্টেট  ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক এবং Origins Project এর পরিচালক। 

_____________________________

এ ইউনিভার্স ফ্রম নাথিং:প্রথম অধ্যায় (একটি মহাজাগতিক রহস্য কাহিনী: সুচনালগ্ন)

যাত্রা শুরুর সাথে প্রথম যে রহস্যটি যুক্ত থাকে, তা হলো: যাত্রা শুরুর সেই বিন্দুতে ভ্রমনকারী প্রথমে কেমন করে পৌছে ছিলেন। (লুই বোগান, জার্নি অ্যারাউন্ড মাই রুম)

সেই রাত ছিল অন্ধকার আর ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ।

______

১৯১৬ সালের শুরুর দিকে; আলবার্ট আইনস্টাইন তার জীবনের সেরা কাজটি কেবল শেষ করেছেন, নতুন একটি থিওরী অব গ্র্যাভিটি বা মধ্যাকর্ষন তত্ত্বর ধারনাতে পৌছানোর জন্য তার এক দশকের সুতীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের ফসল, যার নাম দিয়েছিলেন, জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতার সাধারন তত্ত্ব। অবশ্য এটি শুধুমাত্র একটি নতুন থিওরী অব গ্র্যাভিটি বা মধ্যাকর্ষন তত্ত্বই ছিল না, এছাড়া এটি ছিল মহাশুন্য এবং সময়ের বা টাইম এবং স্পেস এরও একটি নতুন তত্ত্ব। এবং এটাই ছিল প্রথম কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা, মহাবিশ্বে একটি বস্তু কেমন করে তার অবস্থান পরিবর্তন করছে, সেটাকেই শুধুমাত্র ব্যাখ্যা করেনি, এই মহাবিশ্ব কেমন করে বিবর্তিত হতে পারে তারও একটি ব্যাখ্যা দিয়েছিল।

তবে, সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে শুধু ছোট একটা সমস্যা ছিল। যখন প্রথম আইনস্টাইন পুরো মহাবিশ্বকে সার্বিকভাবে ব্যাখ্যা করতে তার তত্ত্বটিকে প্রয়োগ করতে শুরু করেছিলেন, তখন একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, তত্ত্বটি সেই সময়ের ধারনায় আপাতদৃষ্টিতে যে মহাবিশ্বে আমরা বাস করছি, সেটি ব্যাখ্যা করতে পারছে না।

বর্তমানে, প্রায় একশ বছর পর, কারো পক্ষে সম্পুর্নভাবে মুল্যায়ণ করা কিন্তু খুবই কষ্টসাধ্য, একটি মানুষের জীবনকালের সংক্ষিপ্ত ব্যপ্তিতে, এই মহাবিশ্ব সম্বন্ধে আমাদের ধারনা কি সুবিশাল পরিমানে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯১৭ সালের বৈজ্ঞানিক সমাজের ধারনায় এই মহাবিশ্ব ছিল স্থির এবং চিরন্তন অপরিবর্তনশীল, যা তৈরী করেছে শুধুমাত্র একটি ছায়াপথ বা গ্যালাক্সী, আমাদের মিল্কি ওয়ে; যাকে ঘিরে আছে সুবিশাল, অসীম, অন্ধকার এবং সম্পুর্ন মহাশুন্যতা। কারন এটুকুই কেবল, আপনি অনুমান করতে পারবেন খালি চোখে বা কোন ছোট টেলিস্কোপ ব্যবহার করে আকাশের দিকে তাকিয়ে এবং সেই সময় এছাড়া অন্য কিছু সন্দেহ করার অবকাশও ছিল কম।


ছবি: আলবার্ট আইনস্টাইন, Life ম্যাগাজিনের জন্য ১৯২১ সালে E O Hoppe এর তোলা একটি পোর্ট্রেট। বিজ্ঞানের সবচেয়ে পরিচিত মুখ এই জার্মান বিজ্ঞানী মহাবিশ্ব সম্বন্ধে আমাদের ধারনাকে বদলে দিয়েছিলেন (ছবিসুত্র)।

আইনস্টাইনের তত্ত্বেও, এর আগে নিউটনের মধ্যাকর্ষণ তত্ত্বে যেমনটি ছিল, গ্র্যাভিটি বা মধ্যাকর্ষণ শক্তি হচ্ছে বিশুদ্ধভাবে সব বস্তুর মধ্যবর্তী পারস্পরিক আকর্ষন শক্তি। যার অর্থ হচ্ছে, মহাবিশ্বে ভর আছে এমন কোন এক সেট বস্তুর অনন্ত্কাল ধরে কোন নির্দিষ্ট একটি অবস্থানে স্থির হয়ে থাকা অসম্ভব একটি ব্যাপার। তাদের পারস্পরিক মধ্যাকর্ষণজনিত আকর্ষন শেষ পর্যন্ত কোন একসময় তাদের ভিতরের দিকে কলাপস বা ধসে পড়ার কারন হবে, যা আপাতদৃষ্টিতে একটি স্থির মহাবিশ্বর ধারনার সাথে সুস্পষ্টভাবে অসামন্জষ্যপুর্ণ।

আইনস্টাইনের সাধারন আপেক্ষিকতার তত্ত্বটি যে তৎকালীন মহাবিশ্বের ধারনার সাথে সঙ্গতিপুর্ন হচ্ছে না, এই সত্যটি, আপনি যতটা হয়ত কল্পনা করতে পারবেন, তারচেয়ে কিন্তু অনেক বেশী ধাক্কা দিয়েছিল স্বয়ং আইনস্টাইনকেই; এর কারনগুলো আপনাদের ব্যাখ্যা দেবার প্রক্রিয়া আমাকে সুযোগ করে দিয়েছে আইনস্টাইন আর তার সাধারন আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সংক্রান্ত কিছু মিথ যা আমাকে সবসময়ই অস্বস্তি দিয়ে আসছে, সেটাকে মিথ্যা প্রমানিত করে বাতিল করার একটা ব্যবস্থা নেবার। সাধারণত মনে করা হয়ে থাকে যে, আইনস্টাইন একাকী নির্জনে বন্ধ কোন ঘরে বসেই, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে (হয়তো আধুনিক যুগের কোন স্ট্রিং থিওরীর তাত্ত্বিকদের মত), বহু বছর ধরে, শুধু মাত্র বিশুদ্ধ চিন্তার আর যুক্তি মাধ্যমে তার এই সুন্দর তত্ত্বটিতে পৌছাতে পেরেছিলেন, তবে এই ধারনাটা আসল সত্য থেকে বহু দুরে।

আইনস্টাইন সবসময়ই গভীরভাবে পরিচালিত হয়েছেন পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষন দ্বারা। যখন তিনি মনে মনে অনেক  “থট এক্সপেরিমেন্ট” বা চিন্তা নির্ভর পরীক্ষা করেছিলেন এবং একদশকেরও বেশী সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে পরিশ্রম করেছিলেন, তিনি কিন্তু নতুন ধারার কিছু গনিত শিখেছিলেন এবং এই পক্রিয়ায় বেশ কিছু মিথ্যা তাত্ত্বিক ধারনার পিছুও নিয়েছিলেন, তার এই বিখ্যাত তত্ত্বটি আবিষ্কার করতে যা আসলেই গানিতীকভাবে সুন্দর। সাধারন আপেক্ষিকতাবাদের সাথে তার এই ভালোবাসার সম্পর্কটি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে একটি একক গুরুত্বপুর্ণ মুহুর্ত কিন্তু আসলে জড়িত ছিল পর্যবেক্ষনের সাথে। তার তত্ত্বটিকে পুরোপুরি গুছিয়ে আনার ব্যস্ততম শেষ সপ্তাহগুলোতে, জার্মান গনিতজ্ঞ ডেভিড হিলবার্ট  এর সাথে প্রতিদ্বন্দীতা করে, তিনি তার প্রস্তাবিত সমীকরণ দিয়ে সফল একটি প্রেডিক্টশন বা ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন একটি বিষয়ে, যা হয়তোবা  মনে হতে পারে খুব একটা  গুরুত্বপুর্ণ নয় জ্যোতিপদার্থবিদ্যার এমন কোন অচেনা একটি ফলাফল: সেটি ছিল সুর্যের চারপাশে মার্কারী বা  বুধের প্রদক্ষিনের কক্ষপথের  ’পেরিহেলিওন (Perihelion বা সুর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান )’ সামান্য একটু প্রিসেশন হচ্ছে( Presession বা প্রিসেশন হচ্ছে ঘুর্নায়মান কোন বস্তুর ঘুর্ণনের অক্ষের ওরিয়েন্টেশনের বা দিকের পরিবর্তন)।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বহুদিন থেকেই লক্ষ্য করেছিলেন নিউটন যে কক্ষপথ প্রেডিক্ট করেছিলেন বুধ সেখান থেকে খানিকটা সরে যায়; একটি নিখুত উপবৃত্তকার পথ, যা আবার একই দিকে ফিরে আসে তার পরিবর্তে, বুধ এর কক্ষপথের সামান্য পরিবর্তন বা প্রিসেশন ঘটে ( যার মানে গ্রহটি সুর্যের চারপাশে কক্ষপথে ঘুরে আসার পর ঠিক একই জায়গায় ফিরে আসেনা, প্রতিটি প্রদক্ষিনের সময় বুধের উপবৃত্তাকার কক্ষপথটির সামান্য একটু পরিবর্তন হয়, শেষপর্যন্ত খানিকটা স্পাইরাল বা সর্পিকালাকার প্যাটার্নের একটি কক্ষপথ অনুসরণ করে), অবিশ্বাস্যরকম সামান্য পরিমানে: প্রতি শতাব্দীতে বা ১০০বছরে ৪৩ আর্ক সেকেন্ড ( এক ডিগ্রীর ১/১০০ ভাগ)।

যখন আইনস্টাইন  কক্ষপথের পরিবর্তনের পরিমাপটি গণনা করেন তার সাধারন আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব ব্যবহার করে, এর ফলাফল হিসাবে সঠিক সংখ্যাটাই বেরিয়ে আসে। আইনস্টাইনের অন্যতম জীবনীকার আলেক্সান্ডার পাইস এর বর্ণনায়: ‘এই আবিষ্কারটি ছিল, আমি বিশ্বাস করি, আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী একটি আবেগীয় অভিজ্ঞতা, হয়ত তার সারা জীবনেরও’;  আইনস্টাইন দাবী করেছিলে, এসময় তার দ্রুত হৃদস্পন্দন হচ্ছিল, যেন, ’তার ভিতরের কিছু ভেঙ্গে গেছে’; এর একমাস পর যখন একজন বন্ধুর কাছে তার তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করেছিলেন  ’অতুলনীয় সুন্দর’ হিসাবে,  তত্ত্বটির গানিতিক গঠন নিয়ে তখন তার আত্মতৃপ্তির প্রকাশ স্পষ্ট, তবে এর পর আর কোন দ্রুত হৃদস্পন্দনের ঘটনা ঘটেনি।

সাধারন আপেক্ষিকতাবাদ এবং একটি স্ট্যাটিক বা স্থির মহাবিশ্ব সম্ভাবনা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষনের মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে অসামন্জষ্যতা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি যদিও। ( তাস্বত্ত্বেও এই কারনে আইনস্টাইন তার প্রস্তাবিত তত্ত্বে খানিকটা পরিবর্তনও যোগ করেছিলেন, যে পরিবর্তন সম্বন্ধে পরবর্তীতে তিনি মন্তব্য করেছিলেন তার সবচেয়ে বড়  একটি ভুল হিসাবে); এখন সবাই ( যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি স্কুল বোর্ডের ব্যতিক্রম ছাড়া) জানেন যে, মহাবিশ্ব স্ট্যাটিক বা স্থির না, বরং সম্প্রসারনশীল আর  এই সম্প্রসারণ শুরু হয়েছিল অবিশ্বাস্য রকমের তাপমাত্রা ও ঘনত্ব সম্পন্ন একটি বিগ ব্যাঙ্গ এর মাধ্যমে, প্রায় ১৩.৭২ বিলিয়ন বছর আগে। সমানভাবে গুরুত্বপুর্ন আরো একটি বিষয় যা আমরা  এখন জানি, আমাদের গ্যালাক্সীটা শুধু পর্যবেক্ষন করা সম্ভব এমন মহাবিশ্বে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সীর একটি ‍মা্ত্র। আমরা অনেকটা পৃথিবী আদি মানচিত্র আঁকিয়েদের মত, কেবল আমরা শুরু করেছি এই মহাবিশ্বকে তার সবচেয়ে বড় স্কেলে ম্যাপ করার কাজটি। অবাক হবার বেশী কিছু নেই, যে আমাদের মহাবিশ্বের সার্বিক চিত্রর বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বাক্ষী হলো সাম্প্রতিক দশকগুলো।

মহাবিশ্ব যে স্থির না বরং সম্প্রসারনশীল, এই আবিষ্কারটির দার্শনিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে গুরুত্ব বেশ গভীর, কারন এটি প্রস্তাব করে যে, আমাদের মহাবিশ্বের একটি শুরু আছে। আর কোর শুরু ইঙ্গিত বা প্রস্তাব করে সৃষ্টির, আর সৃষ্টি আন্দোলিত করে আমাদের আবেগকে। যদি বেশ কয়েক দশক কেটেছে, ১৯২৯ সালে সম্প্রসারণশীল এই মহাবিশ্বের আবিষ্কারের পর, বিগ ব্যাঙ্গের ধারনাটির স্বতন্ত্র পরীক্ষা নির্ভর নিশ্চিৎ প্রমান অর্জন করতে, তবে ১৯৫১ সালে পোপ পায়াস XII  এটিকে দাবী করেন বাইবেলে বর্ণিত জেনেসিসের প্রমান হিসাবে, তার নিজের ভাষায়:

মনে হচ্ছে যে, বর্তমান যুগের বিজ্ঞান, অতীতের বহু শতাব্দীর ধারনাকে এক ধাক্কায় মুছে ফেলে, সফল হয়েছে সেই আদিমতম ’ফিয়াট লাক্স’ (Fiat Lux) [ বা লেট দেয়ার বি লাইট] এর  সেই অত্যন্ত পবিত্রতম উপাস্য মুহুর্তটির স্বাক্ষী হতে, যখন শুন্যতা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল সব পদার্থ সহ, আলো আর বিকরণের এর একটি সাগর এবং মৌলগুলো বিভাজিত এবং ক্রমশ মন্থিত হয়েছিল, গঠন করেছিল মিলিয়ন মিলিয়ন গ্যালাক্সীদের। এভাবে এই প্রমানের দৃঢ়তায়, যা ভৌতিক প্রমানের সব বৈশিষ্ট বহন করে, (বিজ্ঞান) নিশ্চিৎ করেছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির আকস্মিকতাকে  এবং  এরই সাথে  সেই সময়কালটি সম্বন্ধে সুপ্রমানিত ধারনাটিকে আরো মজবুত ভিত্তির উপর স্থাপন করেছে যে, যখন বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে সৃষ্টিকর্তার হাতের ‍ইশারায় । সুতরাং, সৃষ্টি অবশ্যই হয়েছে। আমরা বলি: ‘সুতরাং, যেহেতু সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই একজন আছেন, অতএব, ঈশ্বরেরও অস্তিত্ত্ব আছে’।

কিন্তু আসল গল্পটা আরো খানিকটা বেশী কৌতুহলোদ্দীপক। আসলে প্রথম যে ব্যক্তিটি একটি বিগ ব্যাঙ্গ এর ধারনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন একজন বেলজিয়ান ধর্মযাজক ও পদার্থবিজ্ঞানী, জর্জ লোমেইত (Georges Henri Joseph Édouard Lemaître)।জর্জ লোমেইত ছিলেন বহুমুখী দক্ষতার একটি অসাধারন মিশ্রন। তিনি তার শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন একজন ইন্জ্ঞিনিয়ার হিসাবে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিশেষ বীরত্বের খেতাব প্রাপ্ত একজন গোলন্দাজ সেনা; ১৯২০ এর দশকে যখন তিনি ধর্মযাজক হবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, তখনই তিনি নজর দেন গনিতের প্রতি। এরপর বিষয় হিসাবে বেছে নেন, কসমোলজী,প্রথমে তিনি কসমোলজী পড়েন বিখ্যাত ব্রিটিশ জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী স্যার আর্থার স্ট্যানলী এডিংটন এর সাথে,এরপর আসেন যুক্তরাষ্ট্রে,প্রথমে হার্ভার্ড এবং পরে তার দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রীটি গ্রহন করেন এমআইটি থেকে পদার্থবিদ্যায়।


ছবি: জর্জ লোমেইত;এই বেলজিয়ান ধর্মযাজক পদার্থবিজ্ঞানী প্রথম অস্থিতিশীল মহাবিশ্ব এবং বিগ ব্যাঙ্গের প্রস্তাব করেছিলেন।ছবিতে Katholieke Universiteit Leuven এ লেকচার দেবার সময় তোলা ছবিটির সময়কাল ১৯৩৩ এর কাছাকাছি.(ছবিসুত্র)।

১৯২৭ সালে,তার দ্বিতীয় ডক্টরেট ডিগ্রীটি পাবার আগে, লোমেইট আসলেই আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরী অব রিলেটিভিটির সমীকরণগুলো প্রমান করেছিলেন; লোমেইত প্রমান করে দেখান যে, আইনস্টাইনের তত্ত্বটি একটি অস্থিতিশীল মহাবিশ্বকেই প্রেডিক্ট করছে এবং এটি আসলে প্রস্তাব করছে, যে মহাবিশ্বে আমরা বাস করছি তার সম্প্রসারণ হচ্ছে।লোমেইত এর এই প্রস্তাবটি এতই দু:সাহসী এবং প্রচলিত ধারনা বিরোধী ছিল, যে আইনস্টাইন নিজেই বেশ নাটকীয়ভাবে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিলেন এই বাক্য ব্যবহার করে:’আপনার অংক নির্ভুল কিন্তু আপনার পদার্থবিদ্যা জঘন্য’।


ছবি: আলবার্ট আইনস্টাইনের সাথে ফাদার জর্জ লোমেইত (সাথে রবার্ট মিলিকান) ; ১৯৩৩ সালে জানুয়ারী ১০ তারিখে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজী, প্যাসাডেনাতে। (ছবিসুত্র)

বিরোধীতা স্বত্তেও লোমেইত আরো দৃঢ়তার সাথে সামনে এগিয়ে নিয়ে যান ‍তার ধারনাটিকে এবং ১৯৩০ সালে তিনি আরো প্রস্তাব করেন, আমাদের এই সম্প্রসারনশীল বিশ্ব আসলে শুরু হয়েছিল একটি ক্ষুদ্রাদপিক্ষুদ্র বিন্দু থেকে,যিনি এর নাম দিয়েছিলেন প্রাইমিভাল (বা আদিমতম)অ্যাটম,এবং এই শুরুটাই প্রতিনিধিত্ব করে-এখানে তিনি জেনেসিস এর প্রতি হয়তো পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন,এমন একটি দিনের,যার আগে কোন দিন নেই ( Day with no yesterday);

এভাবেই ‘বিগ ব্যাঙ্গ’ এর ধারনাটি- যা একসময় পোপ পায়াস বেশ উৎসাহের সাথে স্বাগত জানিয়েছিলেন ঘোষনা দিয়ে-আসলে প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন একজন ধর্মযাজক, যিনি পদার্থবিজ্ঞানীও বটে। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন, যে একজন ধর্মযাজক হিসাবে লোমেইত পোপের স্বীকৃতি পেয়ে নিশ্চয়ই খুব আনন্দিত হয়েছিলেন কিন্তু তিনি মানসিকভাবে আসলে এই বিষয়টি নিয়ে আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন,কারন তিনি আগেই ধারনা করছিলেন যে, এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি ধর্মতত্ত্বের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলবে এবং অবশেষে তিনি এ বিষয়ে করা তার মন্তব্য সম্বলিত একটি অনুচ্ছেদও বাদ দিয়ে দেন,১৯৩১ সালে বিগ ব্যাঙ্গ সংক্রান্ত তার প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষনা পত্রটির  ‍মুল খসড়া থেকে।

লোমেইত কিন্তু ,১৯৫১ সালে পোপের বিগ ব্যাঙ্গের মাধ্যমে জেনেসিসের স্বপক্ষে প্রমান সংক্রান্ত দাবীর বিষয়ে পরবর্তীতে তার আপত্তির কথা উল্লেখ করছিলেন,(তবে তার কারন কিন্তু এই না যে,যদি কোন কারনে ভবিষ্যতে তার প্রস্তাবিত তত্ত্বটি ভুল প্রমানিত হয়,তখন রোমান ক্যাথলিকদের এই জেনেসিসের দাবী চ্যালেন্জ এর মুখোমুখি হতে পারে);ততদিনে তিনি ভ্যাটিক্যানের পন্টিফিক্যাল  অ্যাকাডেমীতে  নির্বাচিত  হয়েছেন, পরবর্তীতে যার সভাপতিও হয়েছিলেন। তিনি যেভাবে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করেছিলেন,সেটা হলো:’আমি যতটুকু দেখতে পারছি,এ ধরনের তত্ত্ব পুরোপুরিভাবেই মেটাফিজিক্যাল বা অধিবিদ্যক বা ধর্মীয় প্রশ্নের আওতার বাইরে’; পোপ এরপর বিষয়টি আর জনসমক্ষে আনেননি।

এখানে একটি গুরুত্বপুর্ণ শিক্ষা আছে,যেটা লোমেইত শনাক্ত করেছিলেন,বিগ ব্যাঙ্গ আসলে ঘটেছিল কিংবা ঘটেনি, এই্ বিষয়টা আসলে বৈজ্ঞানিক একটি প্রশ্ন,ধর্মতত্ত্বীয় না। এছাড়া যদিও বিগ ব্যাঙ্গ ঘটেই থাকে (বর্তমানে প্রাপ্ত অসংখ্য প্রমান যার স্বপক্ষে কথা বলছে),যে কেউ এটির মধ্যে ভিন্নভাবে অর্থ খুজে নিতে পারে তার ব্যাক্তিগত ধর্মীয় বা মেটাফিজিক্যাল বা অধিবিদ্যক প্রবণতার উপর। যদি আপনি প্রয়োজন বোধ করেন, আপনি হয়তো বেছে নিতে পারেন ’বিগ ব্যাঙ্গ’কে একজন সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতির ইঙ্গিত হিসাবে দেখতে বা এর বদলে যুক্তি দেখাতে পারেন যে, কোন ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সাধারন আপেক্ষিকতার গনিত মহাবিশ্বের বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করতে পারে এর ঠিক সুচনা লগ্ন পর্যন্ত; কিন্তু যে কোন ধরনের মেটাফিজিক্যাল ধারনা কিন্তু বিগ ব্যাঙ্গের নিজস্ব ভৌতিক বা পিজিক্যাল পর্যবেক্ষন নির্ভর প্রমান থেকে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র এবং আমাদের জন্য এই প্রক্রিয়াটি বোঝার ক্ষেত্রে তাদের কোন ভুমিকাই নেই। অবশ্যই, আমরা যখন বোঝার জন্য শুধুমাত্র একটি সম্প্রসারনশীল বিশ্বের অস্তিত্ত্ব সংক্রান্তু বিষয়কে অতিক্রম করে পদার্থবিজ্ঞানের ও ভৌতিক সেই মুলনীতিগুলোকে বোঝার চেষ্টা করবো যা এর উৎপত্তিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে,শুধমাত্র বিজ্ঞানই পারে এই বিষয়ে শুধু অনুমান নির্ভর প্রস্তাবগুলোর উপর আরো বেশী আলোকপাত করতে,এবং আমি যুক্তি দেবো,বিজ্ঞান সে কাজটি করছে।

যাই হোক না কেন,না লোমেইত, না পোপ, কেউই কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজকে বিশ্বাস করাতে পারেননি, যে মহাবিশ্ব আসলে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বরং,ভালো বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে যা সাধারণত ঘটে থাকে,এর স্বপক্ষে জোরালো প্রমানগুলো এসেছে দীর্ঘদিনের সতর্ক পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে; এই ক্ষেত্রে প্রথমে যা করেছিলেন, এডউইন হাবল (Edwin Hubble); যিনি মানবতার উপর আমার অগাধ বিশ্বাস পোষন করার সাহস যুগিয়ে চলেছেন বিরামহীনভাবে, কারন হাবল তার জীবন শুরু করেছিলেন একজন আইনজীবি হিসাবে এবং পরে তিনি পরিণত হন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীতে ।


ছবি: এডউইন হাবল। আন্ডারগ্রাজুয়েটে অংক এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়লেও রোডস স্কলার হাবল অক্সফোর্ডে আইন পড়েছিলেন। আইনের পেশায় মন টেকেনি তার, ফিরে যার তার প্রিয় ক্ষেত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানে, যেখানে বেশ কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার তিনি করেছিলেন। তিনি প্রথম পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে নিশ্চিৎভাবে প্রমান করেন মিল্কি ওয়ের বাইরেও গ্যালাক্সী আছে, এছাড়া সম্প্রসারনশীল মহাবিশ্বের মুল প্রমানগত ভিত্তিটাও এসেছে তার পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে। (ছবিসুত্র)

এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে অবদান রাখার আগেই, ১৯২৫ এ হাবল একটি গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কার করেছিলেন নতুন স্থাপিত মাউন্ট উইলসনের ১০০ ইঞ্চি হুকার টেলিস্কোপ দিয়ে,তখন পৃথিবীতে এটি ছিল সবচেয়ে বড় টেলিস্কোপ (এর সাথে তুলনা করার জন্য উল্লেখ করছি বর্তমানে আমরা এমন টেলিস্কোপ বানাচ্ছি এর চেয়ে দশগুন বড় এবং আরো ১০০ গুন বড় জায়গা সহ।);সেই সময়ের আগ পর্যন্ত্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যে ধরনের টেলিস্কোপ পাওয়া যেত তা দিয়ে কিছু অস্পষ্ট ছবি বা ইমেজ লক্ষ্য করেছিলেন,যা আমাদের গ্যালাক্সীল সাধারণ নক্ষত্রদের মত না। এর নাম দেয়া হয়েছিল নেব্যুলী (Nebulae),যা মুলত ল্যাটিন শব্দ, যার অর্থ ’ঝাপসা, অস্পষ্ট কোন কিছু’ (আসলে মেঘ);জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সেই সময় এদের নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি ছিল,এই নেবুলাগুলো কি আমাদের গ্যালাক্সীরই  অংশ নাকি নাকি এদের অবস্থান এর বাইরে।

যেহেতু সেই সময়ের প্রচলিত ধারনা ছিল,আমাদের গ্যালাক্সীর বাইরে আর কিছুই নেই,বেশীর ভাগ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাই ‍এরা আমাদের গ্যালাক্সীর অংশ এই প্রস্তাবে পক্ষেই ছিলেন,যার নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী হার্ভার্ডের হারলো শাপলী। শাপলী পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ার সময় স্কুল ছেড়ে দেন,এরপর নিজেই নিজেই পড়াশুনা চালিয়ে যান। পরবর্তীতে তিনি প্রিন্সটনে আসেন,এবং তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ার সিদ্ধান্ত নেন সিলেবাসের নানা পাঠ্য বিষয়ের তালিকায় প্রথমে থাকা অ্যাষ্ট্রোনোমিকে বেছে নিয়ে ।তার নিজের বিখ্যাত গবেষনা কর্মের মাধ্যমে তিনি প্রমান করেছিলেন, আগে যেমনটা ভাবা হতো, তার তুলনায় মিল্কীওয়ে গ্যালাক্সী আরো অনেক বিশাল এবং সুর্য এর কেন্দ্রে অবস্থান করে না বরং কেন্দ্র থেকে বহুদুরে,আদৌ তেমন উল্লেখযোগ্য নয় এমন একটি সাদামাটা জায়গায়। যেহেতু তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানে ক্ষেত্রে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন, সুতরাং নেবুলীদের প্রকৃতি সম্বন্ধে তার মতামতও যথেষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করে ছিল।


ছবি: হারলো শাপলী, তার সময়ের অত্যান্ত প্রভাবশালী জ্যোতির্বিজ্ঞানী শাপলী প্রমান করেছিলেনৈ সুর্য আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে না বরং কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫০০০ আলোকবর্ষ দুরে অবস্থিত। ছবিসুত্র

১৯২৫ সাল, নতুন বছরের প্রথম দিনে, হাবল তার স্পাইরাল নেবুলী সম্বন্ধে দীর্ঘ দুই বছরের গবেষনাপত্রটি প্রকাশ করেন,যেখানে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন একটি বিশেষ ধরনের ভ্যারিয়েবল (যাদের উজ্জ্বতা পরিবর্তনশীল) তারা, যাদের বলা হয় সেফিড ভ্যারিয়েবল (Cepheid variable) তারা, এইসব নেবুলাগুলোর  মধ্যে শনাক্ত করতে; এছাড়া আরো  একটি নেবুলা তিনি খুজে পান, যা বর্তমানে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সী (M31)নামে এখন পরিচিত।

১৭৮৪ সালে প্রথমবারের মত পর্যবেক্ষন করা হয়েছিল সেফিড ভ্যারিয়েবল নক্ষত্রদের, এরা হলো সেই বিশেষ ধরনের  নক্ষত্র যাদের উজ্জ্বলতা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর পরিবর্তিত হয় (১৭৮৪ সালে জন গুডরিক  প্রথম এদের বর্ণনা দিয়েছিলেন, সেফেউস কনস্টেলশনের ডেলটা সেফেই থেকে এদের নামকরন করার হয়েছিল)। ১৯০৮ সালে হেনরিয়েটা সোয়ান লিভিট (Henrietta Swan Leavitt) নামের অপরিচিত এবং যাকে আদৌ কখনোও মুল্যায়ন হয়নি,এমন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী হবার প্রত্যাশী, হার্ভার্ড কলেজ অবসারভেটরীতে তখন ’কম্পিউটার’ হিসাবে কর্মরত ছিলেন (কম্পিউটার বলা হলো সেই সব মহিলাদের যাদের জ্যোতির্বিজ্ঞানী অবসারভেটরীতে নিয়োগ করা হতো অবসারভেটরীর ফটোগ্রাফিক প্লেটে নক্ষত্রদের উজ্জ্বলতাকে ক্যাটালগ করার জন্য;নারীদের সেই সময় অবসারভেটরীর টেলিস্কোপ ব্যবহারের অনুমতি ছিলনা);প্রোটেষ্টান্ট কংগ্রেশনাল চার্চের একজন ধর্মযাজক বাবা এবং পিলগ্রিমদের বংশধর মায়ের (যারা ১৬২০ সালে মাসাচুসেটস এর প্লিমাউথ রকে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী ইংরেজ কলোনী গড়ে তুলেছিল)  উত্তরসুরী কন্যা লিভিট একটি অসাধারন আবিষ্কার করেছিলেন কম্পিউটার হিসাবে কাজ করার সময়, তিরি যার আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ১৯১২ সালে, তিনি লক্ষ্য করেছিলেন,সেফিড নক্ষত্রদের উজ্জ্বলতা বা লুমিনোসিটি এবং তাদের এই উজ্জ্বলতার বিভিন্নতার বা পরিবর্তনের সময়কালের (বা পালসেশন পিরিয়ড)এর মধ্যে একটি নিয়মিত সম্পর্ক আছে;সুতরাং কেউ যদি জানা আছে এমন একটি সময়কালে (পরবর্তীতে ১৯১৩ সালে সেটি আবিষ্কার করা হয়েছিল)একটি একক সেফিড নক্ষত্রদের দুরত্ব বের করতে পারেন,তবে সেই একই সময়কালের বা পিরিওডের  অন্য সেফিড নক্ষত্রদের উজ্জ্বলতা পরিমাপ করে এইসব অন্যান্য নক্ষত্রদের দুরত্বও পরিমাপ করা সম্ভব!


ছবি: হেনরিয়েটা সোয়ান লিভিট ; হার্ভার্ড অবসারভেটরীতে কম্পিউটার হিসাবে কাজ করা লিভিট তার জীবদ্দশায় তার আবিষ্কারের স্বীকৃতি পাননি। তিনি প্রথম সেফিড ভ্যারিয়েবল নক্ষত্রদের পিরিয়ড লুমিনোসিটি ব্যাখ্যা করেন, যা পরবর্তীতে মহাবিশ্বে গ্যালাক্সীতের দুরত্ব মাপার মাপকাঠিতে পরিনত হয়, এবং এর উপর ভিত্তি করে হাবল তার আবিষ্কার করেছিলেন। (ছবিসুত্র)।

যেহেতু কোন নক্ষত্রর পর্যবেক্ষিত উজ্জ্বলতা কমে যেতে থাকে,মধ্যবর্তী দুরত্বের বর্গফলের পরিমানের সাথে বীপরিত অনুপাতে ( আলো আরো বড় আকারে বৃত্তাকারে সমানভাবে ছড়িয়ে যেতে থাকে, যার আয়তন বাড়তে থাকে দুরত্বের প্রতি এককের বর্গফল বাড়ার সাথে সাথে এবং যেহেতু আলো ছড়িয়ে থাকে আরো বড় বৃত্তাকার এলাকা জুড়ে,সেকারনের কোন একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে আলোর উজ্জ্বলতা বিপরীত অনুপাতে কমতে থাকে সেই বৃত্তাকার এলাকার আয়তন বৃদ্ধির সাথে); সে কারনে দুরবর্তী নক্ষত্রদের দুরত্ব পরিমাপ করাটা জ্যোতির্বিজ্ঞাসে একটি বড় ধরনের চ্যালেন্জ ছিল সবসময়ই। লেভিট এর এই আবিষ্কার এই ক্ষেত্রে এনেছিল বৈপ্লবিক একটি পরিবর্তন।(হাবল নিজে,যিনি নিজেও নোবেল পুরষ্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, প্রায়শই বলেতেন,লেভিট তার এই গুরুত্বপুর্ণ অবদানের নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার যোগ্য;যদিও হাবল যথেষ্ট পরিমানে নিজের স্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখতেন বলে হয়তো  তিনি এটা প্রস্তাব করতে পারেন,কারন পরবর্তীতে এই ক্ষেত্রে তার নিজস্ব অবদানের জন্য লেভিটের সাথে এই পুরষ্কার ভাগাভাগি করে নেবার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক কারনেই তিনিই ছিলেন প্রধানতম প্রার্থী।)১৯২৪ সালে আসলেই কিন্তু রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমী লেভিটকে পুরষ্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে কাগজপত্র তৈরী করাও শুরু করেছিল,তখনই তারা জানতে পারেন, এর তিন বছর আগেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে লেভিট মারা গেছেন। হাবল তার ব্যাক্তিত্বের জোরে,আত্মপ্রচারের সহজাত ক্ষমতার গুন এবং পর্যবেক্ষক হিসাবে তার অসাধারন দক্ষতার কারনেই এখন ঘরে ঘরে সুপরিচিত একট নামে পরিনত হয়েছেন, কিন্ত লেভিট, হায়! জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে যারা বেশী আগ্রহী,শুধু তাদের কাছেই তার পরিচয় সীমাবদ্ধ।

হাবল সেফিড নক্ষত্রদের সম্বন্ধে তার পরিমাপ এবং লেভিট এর ’পিরিওড লুমিনোসিটির’ সম্পর্ক ব্যবহার করে সুস্পষ্টভাবে প্রমান করতে সক্ষম হয়েছিলেন অ্যান্ড্রোমিডার এবং আরো বেশ কয়েকটি নেবুলার সেফিড নক্ষত্ররা  এত দুরে অবস্থান করছে যে, তারা কোনভাবেই আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সির মধ্যে অবস্থান করতে পারেনা। অ্যান্ড্রোমিডাও পরবর্তীতে প্রমানিত হলো আরো একটি স্বতন্ত্র দ্বীপ মহাবিশ্ব,আরো একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সি যা প্রায় হুবুহু আমাদের মিল্কি ওয়ের মত দেখতে এবং এখন আমরা এখন জানি,আমাদের পর্যবেক্ষনক্ষম মহাবিশ্বে অস্তিত্ত্ব আছে এমন প্রায় ১০০ বিলিয়নেরও বেশী গ্যালাক্সীর একটি। হাবলের গবেষনার ফলাফল যথেষ্ট পরিমানে অস্পষ্টতামুক্ত ছিল বলেই জ্যোতির্বিজ্ঞানী সমাজ,শাপলী সহ,ঘটনাক্রমে,তিনি তখন হার্ভার্ড কলেজ অবজারভেটরীর পরিচালক,যেখানে লেভিট তার যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করেছিলেন-দ্রুত এই সত্যটি মেনে নেন যে,আমাদের চারপাশে শুধু মিল্কি ওয়ে ছাড়া আরো অনেক কিছুই আছে। হঠাৎ করেই, বহু শতাব্দী ধরে পরিচিত আমাদের মহাবিশ্বর আকারটি এক লাফে অনেক বিশালকায় হয়ে ওঠে; অন্য প্রায় সবকিছুর মত এর চরিত্র বা প্রকৃতির স্বরুপও বদলে যায়।

এই নাটকীয় আবিষ্কারের পর হাবল কিন্তু তার  এই বিজয়ের রেশ নিয়ে বিশ্রাম নিতে পারতেন,কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল আরো বড় একটা অর্জন,এই ক্ষেত্রে আরো বড় কোন গ্যালাক্সী। আরো অনেক দুরের গ্যালাক্সীদের আরো অনেক অনুজ্জল সেফিড নক্ষত্রদের পরিমাপ করে তিনি এই মহাবিশ্বকে আরো সুবিশাল স্কেলে ম্যাপ করতে সফল হয়েছিলেন। এবং যখন এই কাজটি করছিলেন,তিনি আরো ভিন্ন একটি অসাধারন সত্য আবিষ্কার করেন,যা আরো বেশী চমক লাগানো:এই মহাবিশ্বটি  ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে !

হাবল তার এই আবিষ্কারটি করতে সফল হতে পেরেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভেস্টো স্লাইফার এর পরিমাপ করা সম্পুর্ন ভিন্ন এক সেট পরিমাপের সাথে তার করা গ্যালাক্সীদের দুরত্বর পরিমাপের একটি তুলনামুলক গবেষনা করে। ভেস্টো স্লাইফার,আসলে পরিমাপ করেছিলেন বিভিন্ন গ্যালাক্সী থেকে আসা আলোক বর্ণালীর;এই ধরনের স্পেকট্রা বা বর্ণালীর অস্তিত্ত্ব এবং তাদের প্রকৃতি বোঝাতে হলে আপনাদেরকে আমার নিয়ে যেতে হবে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সেই শুরুর দিনগুলোতে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানে অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ একটি আবিষ্কার হলো ’স্টার স্টাফ’ বা নক্ষত্ররা যে উপাদানেগুলো দিয়ে তৈরী এবং ’আর্থ স্টাফ’ বা পৃথিবী যে উপাদান দিয়ে তৈরী,সেই উপাদানগুলো মুলত: একই। এই সব কিছুর শুরু আসলে হয়েছিল,আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক কিছুই যেমনটি হয়েছিল,আইজাক নিউটনের সাথে। ১৬৬৫ সালে,নিউটন,তখন একজন তরুন বিজ্ঞানী,পুরো ঘর অন্ধকার করে,জানালার পর্দার মধ্যে একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে সুর্য আলোর একটি রশ্মিকে তিনি একটি প্রিজমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন এবং লক্ষ্য করেন সুর্য রশ্মি রঙধণুর পরিচিত নানা রঙে বিচ্ছুরিত হয়েছে। তিনি যুক্তি দেন,সুর্যর সাদা আলো আসলে এই সব রঙই ধারন করে বা এদের মিশ্রনে তৈরী হয় এবং তার ধারনা সঠিক ছিল।

এর প্রায় দেড়শ বছর পর,আরেকজন বিজ্ঞানী (জোসেফ ফন ফ্রাউনহফার)এই বিচ্ছুরিত বর্ণালীর আলো নিয়ে আরো সতর্কভাবে বেশ কিছু বিস্তারিত গবেষনা করেছিলেন এবং এই নানা রঙের বিস্তার বা স্পেক্ট্রাম এর মধ্যে গাঢ় কিছু অন্ধকার কালচে ব্যান্ড আবিষ্কার করেন,এবং তিনি এর ব্যাখ্যা হিসাবে যুক্তি দেন এই ব্যান্ডগুলো বা লাইনগুলো  আসলে সুর্যের বহিমন্ডলের থাকার কিছু পদার্থের কারনে ঘটছে, যারা একটি নির্দিষ্ট ওয়েভলেন্থ বা তরঙ্গ দৈর্ঘ বা নির্দিষ্ট  রঙের আলোকে এরা শোষন (Absorption) করে নিচ্ছে। এই ব্যান্ডগুলো যা অ্যাবসর্পশন লাইন (Absorption line বা ফ্রাউনহফার লাইন)নামে যা পরে পরিচিতি পায়। পৃথিবীতে পাওয়া যায় এমন পরিচিত নানা পদার্থ যে তরঙ্গ দৈর্ঘ বিশিষ্ট আলো শোষন করে,যেমন হাইড্রোজেন,অক্সিজেন,আয়রন, সোডিয়াম এবং ক্যালশিয়াম,তাদের অ্যাবসর্পশন লাইনের সাথে এই লাইনগুলোর তুলনামুলক গবেষনার মাধ্যমে আমরা সেই অজানা মৌলগুলোকে শনাক্ত করতে পারি।


ছবি: জোসেফ ফ্রাউনহফার  ( (6 March 1787 – 7 June 1826) তার স্পেকট্রোস্কোপ দেখাচ্ছেন। ছবি সুত্র

১৮৬৮ সালে আরেকজন বিজ্ঞানী (নরমান লকইয়ের) লক্ষ্য করেন সুর্যের বিচ্ছুরণ প্যাটার্ণে বা স্প্রেকট্রামের হলুদ অংশে দুটি অ্যাবসর্পশন লাইন দেখা যায়, যার এই শোষন করার প্যাটার্ণের সাথে পৃথিবীতে পাওয়া যায়েএমন কোন মৌলের মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছে না,তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিশ্চয়ই এটি নতুন কোন মৌল,এবং এর নাম দেন তিনি হিলিয়াম (গ্রীক সুর্যের দেবতা হেলিওস এর নামের সাথে মিল রেখে);এর প্রায় এক প্রজন্ম পর পৃথিবীতে  হিলিয়াম আবিষ্কৃত হয়।(১৮৯৫ সালে উইলিয়াম রামসে ক্লীভাইট নামে একটি খনিজ পদার্থের গ্যাসীয় এমিশনের মধ্যে এটি খুজে পান)।

নক্ষত্র থেকে আসা বিকিরিত আলোর বর্ণালীর বিন্যাস বিশ্লেষন,এইসব নক্ষত্রদের গঠন,তাপমাত্রা এবং বিবর্তন সম্বন্ধে জানার জন্য একটি খুবই গুরুত্বপুর্ণ বৈজ্ঞানিক টুল। ১৯১২ থেকে শুরু করে স্লাইফার বিভিন্ন স্পাইরাল নেবুলাদের থেকে আসা আলো বর্ণালী বিশ্লেষন করে দেখেন এই সব দুরবর্তী নক্ষত্রদের বর্ণালী নিকটবর্তী নক্ষত্রদের বর্ণালীর মতই-শুধুমাত্র সবগুলো অ্যাবসর্পশন লাইন সরে গেছে সমপরিমান তরঙ্গ দৈর্ঘ পরিমানে।

সেই সময়ে এই ধরনের কোন বিষয়ের কারন মনে করা হত পরিচিত ‘’ডপলার ইফেক্ট’ (Doppler Effect) কে। ডপলার ইফেক্ট এর নামটি এসেছে অষ্ট্রীয় পদার্থবিদ ক্রিস্টিয়ান ডপলার এর নাম থেকে: যিনি ১৮৪২ সালে প্রথম ব্যাখ্যা করেছিলেন, কোন একটি চলমান উৎস থেকে আসা তরঙ্গ (শব্দ কিংবা আলো) প্রলম্বিত বা দীর্ঘ হবে যদি উৎসটি আপনার কাছ থেকে দুরে সরে যেতে থাকে এবং তরঙ্গ কমপ্রেসড বা খাটো চাপা হয়ে আসবে যদি উৎসটি আপনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এই ধরনের অভিজ্ঞতার সাথে আমরা সবাই পরিচিত এবং এটি আমাকে সিডনী হ্যারিস এর একটা কার্টুনের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে দুজন কাউবয় তাদের ঘোড়ার উপর বসে আছে একটা খোলা জায়গায় এবং দুরে একটি ট্রেনের যাওয়া দেখছে এবং একজন আরেকজনকে বলছে, ’আমার এই ট্রেনের বাশীর নির্জন বিলাপ শুনতে খুব ভালো যখন এর তীব্রতার মাত্রার পরিবর্তন হয় ডপলার ইফেক্ট এর জন্য’; আসলেই কোন ট্রেনের বাশী বা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বেশী জোরে আর তীব্রভাবে শোনা যায় যদি ট্রেন বা অ্যাম্বুলেন্সটি আপনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং যখন আপনার থেকে দুরে সরে যাবে তখন আওয়াজটার তীব্রতাও কমে আসবে।

দেখা গেল শব্দ তরঙ্গর সাথে যেমন ঘটে ঠিক তেমনটাই ঘটছে আলোক তরঙ্গর সাথে, যদিও খানিকটা ভিন্ন কারনে। কোন একটি উৎস থেকে আসা আলোক তরঙ্গ যা আপনার কাছ থেকে দুরে সরে যাচ্ছে, হয় মহাশুন্যে তার নিজস্ব স্থানীয় গতির জন্য কিংবা মধ্যবর্তী সুবিশাল মহাশুন্যের বিস্তৃতির জন্য,প্রলম্বিত বা দীর্ঘাকৃতির বা স্ট্রেচড হবে, এবং সেকারনে দেখতে এটি আরো অধিকতর লাল হবে (রেড শিফট), স্বাভাবিকভাবে এর যতটা লাল হবার কথা ছিল তার চেয়ে বেশী; কারন লাল হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিক্ষমতার স্পেক্ট্রামে সবচেয়ে দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘ বিশিষ্ট আলোর প্রান্ত; এবং আলোর কোন উৎস যেটি আপনার দিকে আসছে সেখান থেকে আলোক তরঙ্গ খাটো এবং কমপ্রেসড হবে অতএব আরো বেশী নীল মনে হবে (আমাদের ভিজুয়াল স্পেকট্রাম এর খাটো তরঙ্গ দৈর্ঘ প্রান্ত হচ্ছে নীল)।

১৯১২ সালে সাইফার লক্ষ্য করেছিলেন সব স্পাইরাল নেবুলাগুলো থেকে আসা  আলোর অ্যাবসর্পশন লাইন প্রায় সবগুলোই সিস্টেমেটিক্যালী সরে গেছে দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘর  দিকে (যদিও কয়েকটি যেমন অ্যান্ড্রোমিডা, সরে গেছে খাটো তরঙ্গ দৈর্ঘর দিকে); তিনি সঠিকভাবেই এর উপসংহার টানতে পেরেছিলেন যে,সুতরাং এই সব অবজেক্টগুলো আমাদের কাছ থেকে আসলে  দুরে সরে যাচ্ছে যথেষ্ট পরিমান দ্রুতগতিতে।


ছবি: ভেসটো স্লাইফার (November 11, 1875 to November 8, 1969), যদিও কৃতিত্বটি হাবলকে দেয়া হয়, তবে দুরে সরে যাওয়া গ্যালাক্সীদের রেড শিফট তিনি আবিষ্কার করেন। পরে যা হাবল তার পর্যবেক্ষনের সাথে যুক্ত করে সম্প্রসারনশীল মহাবিশ্বের একটি পরীক্ষামুলক প্রমান প্রতিষ্টিত করেছিলেন। (ছবি সুত্র)

হাবল তার নিজের পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে পাওয়া এই সব স্পাইরাল গ্যালাক্সীদের ( ততদিনে জানা হয়ে গেছে এরা আসলে ‍দুরবর্তী ছায়াপথ) দুরত্বের সাথে স্লাইফারের পরিমাপ করা  গতি, যে গতিতে নক্ষত্র আমাদের কাছ থেকে দুরে সরে যাচ্ছে,  তার তুলনামুলক  বিশ্লেষন করতে পেরেছিলেন। ১৯২৯ সালে মাউন্ট উইলসন এর একজন স্টাফ মেম্বার মিল্টন হিউমাসন এর (যার টেকনিক্যাল প্রতিভা এত বেশী ছিল যে, তিনি মাউন্ট উইলসনে একটি স্থায়ী চাকরী জোগাড় করতে পেরেছিলেন কোন হাইস্কুল ডিপ্লোমা ছাড়াই; হিউমাসন মাউন্ট উইলসন তৈরী করার সময় আসলে মালপত্রবাহী  মিউল পরিবহনের ড্রাইভার ছিলেন, পরে তিনি সেখানকার জ্যানিটর হন এবং ধীরে ধীরে একজন স্টাফ জ্যোতিবিজ্ঞানী হিসাবে তার জায়গা করে নেন। ১৪ বছরের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আর লেখাপড়া করেননি)সাথে তিনি ঘোষনা করেন একটি অসাধারন পর্যবেক্ষন নির্ভর একটি সম্পর্ক: যাকে এখন বলা হয় হাবল এর সুত্র (Hubble’s law): রিসেশনাল ভেলোসিটি বা বেগ (রিসেশনাল ভেলোসিটি বা বেগ বলতে সেই বেগকে বোঝায়, যে বেগে কোন একটি বস্তু একজন পর্যবেক্ষনকারীর কাছ থেকে দুরে সরে যায়,এই ক্ষেত্রে যেমন গ্যালাক্সী)এবং গ্যালাক্সীর দুরত্বের মধ্যে একটি লিনিয়ার বা সরলরৈখিক সম্পর্ক আছে; বা বলা যেতে পারে, কোন গ্যালাক্সী যত দুরে আছে নক্ষত্র  তত বেশী দ্রুত বেগে আমাদের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ দুরবর্তী ছায়াপথগুলোর এই রিসেশনার বেগ পৃথিবী থেকে এর দুরত্বের সমানুপাতিক, অর্থাৎ রিসেশনাল বেগ যত বেশী হবে সেই বস্তুটির দুরত্ব তত বেশী।

যখন প্রথমবারের মত কারো কাছে এই বিশেষ ফ্যাক্ট বা সত্যটি উপস্থাপন করা হয়-যে প্রায় সব গ্যালাক্সী আমাদের কাছ থেকে দুরে সরে যাচ্ছে , এবং যারা দ্বিগুন পরিমান দুরে আছে যে তারা দ্বিগুন বেগে দুরে সরে যাচ্ছে, যারা তিনগুন দুরে আছে তারা তিনগুন বেগে দুরে সরে যাচ্ছে ইত্যাদি -মনে হয় বিষয়টি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে,আমরা তাহলে কি মহাবিশ্বের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত ?

কিছু বন্ধু ঠিক এভাবে বিষয়টি জানতে চেয়েছিল আমার কাছে, প্রতিবারই তাদের মনে করিয়ে দিতে হয়, বিষয়টা আসলে তা না, বরং এটি লোমেইত ঠিক যে সম্পর্ক সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন এটি তার সঙ্গতিপুর্ণ। আমাদের মহাবিশ্ব আসলেই সম্প্রসারণশীল।

আমি নানা ভাবে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আসলে আমি মনে করি এটা আসলে ভালোভাবে বোঝানো সম্ভব হবে না যদিনা আপনি প্রচলিত ধারনার বাইরে বা আউটসাইড দ্য বক্স চিন্তা না করেন-এক্ষেত্রে মহাবিশ্বের বা  ইউনিভার্সাল বক্সের বাইরে। হাবল ল কি বলছে সে বোঝার জন্য, আপনার নিজেকে প্রথমে আমাদের গ্যালাক্সীর সেই মায়োপিক বা হ্রস্বদৃষ্টির দেখার অবস্থান বা ভ্যানটেজ পয়েন্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলতে হবে এবং আমাদের মহাবিশ্বকে দেখতে হবে মহাবিশ্বের বাইরের কোন অবস্থান থেকে। যদিও ত্রিমাত্রিক একটি মহাবিশ্বের বাইরে দাড়ানো কঠিন হলেও,দ্বিমাত্রিক কোন মহাবিশ্বের বাইরে দাড়ানো অপেক্ষাকৃত সহজ।  এর পরের পৃষ্ঠায় আমি এরকম একটি সম্প্রসারনশীল মহাবিশ্বের ড্রইং একেছি দুটি ভিন্ন সময়ে (ধরা যাক t1 এবং t2); আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, দ্বিতীয় ড্রইং এ গ্যালাক্সীগুলো আরো দুরে সরে গেছে পরস্পর থেকে দ্বিতীয় সময় বিন্দুতে।

এখন কল্পনা করুন আপনি এদের মধ্যে কোন একটা গ্যালাক্সীতে বাস করেন দ্বিতীয় সময় বিন্দুতে t2 তে; আমি সেই গ্যালাক্সীটাকে সাদা রঙ দিয়ে চিহ্নিত করবো t2 সময়ে।

গ্যালাক্সীর সেই ভ্যানটেজ পয়েন্ট থেকে মহাবিশ্বর বিবর্তন কেমন দেখতে লাগতে পারে সেটা বোঝাতে আমি শুধু ডানদিকের ছবিটা এবার বা দিকের ছবির উপর সুপারইমপোজ বা উপরিস্থাপিত করেছি।

সাদা গ্যালাক্সীটাকে (যেখানে আপনি বসবাস করছেন) পাশের ছবির সেই ঠিক একই গ্যালাক্সীটার উপর স্থাপন করে। দেখুন এবার এই গ্যালাক্সীটার ভ্যানটাজ পয়েন্ট থেকে অন্য প্রত্যকটি গ্যালাক্সী দুরে সরে যাচ্ছে, যারা দ্বিগুন দুরত্বে আছে তারা একই সময় এই দ্বিগুন দুরত্বে সরে যাচ্ছে, যারা তিনগুন দুরে আছে, তারা এই দুরত্বের তিনগুন দুরত্ব অতিক্রম করছে ইত্যাদি। যতক্ষন না পর্যন্ত মহাবিশ্বের কোন প্রান্ত বা সীমানা থাকবে না যারা এই সাদা রঙ এর গ্যালাক্সীতে থাকবে তাদের কাছে মনে হবে তারা মহাবিশ্বের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত।

আপনি কোন গ্যালাক্সী বেছে নিয়েছেন তাতে কিছু আসবে যাবে না, অন্য একটা গ্যালাক্সী পছন্দ করুন,আর  প্রক্রিয়াটি পুণরাবৃত্তি করুন। আপনার পারসপেকটিভ এর উপর নির্ভর করে, তাহলে হয় ’প্রতিটি জায়গা’ মহাবিশ্বের কেন্দ্র অথবা ’কোন জায়গা’ না, কিছু আসে যায়না এই বিষয়টিতে;হাবলের সুত্র একটি সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের সাথে  সঙ্গতিপুর্ণ।

হাবল এবং হিউমাসন যখন প্রথম তাদের বিশ্লেষনটি প্রকাশ করেন ১৯২৯ সালে, তারা শুধু রিসেশন বেগ এবং দুরত্বের সরলরৈখিক সম্পর্কটাই রিপোর্ট করেননি, তারা এই সম্প্রসারনের হারের একটি সংখ্যাবাচক পরিমাপও গননা করেছিলেন।নীচে এখানে আসল উপাত্ত  উপাস্থাপন করা হয়েছে, সেই সময় যেভাবে দেখানো হয়েছিল। এখানেও আপনারা দেখতে পাবেন, তার পাওয়া ডাটা সেটের মধ্যে একটি সরলরৈখিক সম্পর্ক থাকার হাবলের অনুমানটা মনে হতেই পারে অপেক্ষাকৃতভাবে ভাগ্যের ব্যাপার ( এখানে অবশ্যই একটা সম্পর্ক আছে কিন্তু একটি সরল রেখা এই উপাত্তগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে সঙ্গতিপুর্ণ হবে তা কিন্তু প্রাপ্ত ডাটা দেখে বোঝা সম্ভব না); সম্প্রসারন হারের যে সংখ্যাটি তারা পেয়েছিলেন, তা তাদের করা প্লট  থেকেই এসেছে, যা প্রস্তাব করছে, কোন একটি গ্যালাক্সী যেটি এক  মিলিয়ন পারসেক (parsecs)(বা ৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ ) দুরে আছে -গ্যালাক্সীদের মধ্যবর্তী যা গড় দুরত্ব মনে করা হয়-আমাদের কাছ থেকে দুরে সরে যাচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ কিলোমিটার বেগে। যদিও এটি অবশ্য তেমন সফল পরিমাপ হয়নি।

এর কারনটা কিন্তু অপেক্ষাকৃত সহজ বোঝার জন্য। যদি সব কিছু আজ  পরস্পর থেকে দুরে সরে যেতে থাকে , তাহলে  অতীতের কোন এক সময়ে তারা পরস্পরের কাছাকাছি ছিল;যদি মধ্যাকর্ষন বা গ্র্যাভিটি দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষন বল হয়ে থাকে, তাহলে এটি মহাবিশ্বের সম্প্রসারনকে মন্হর করে দেয়ার কথা, এর অর্থ এখন যে কোন একটি গ্যালাক্সীকে আমাদের  থেকে দুরে সরে যেতে দেখছি,অতীতে নিশ্চয়ই তা আরো দ্রুতবেগে দুরে সরে যাচ্ছিল।

যদি একমুহুর্তের জন্য হলেও আমরা ধরে নেই গ্যালাক্সীরা ঐ বেগেই চিরকাল দুরে সরে গিয়েছে, আমরা তাহলে বীপরিত দিকে গণনা করে পরিমাপ করতে পারি কতদিন আগে সেই গ্যালাক্সীটি আমাদের গ্যালাক্সী এখন যেখানে আছে সেই একই অবস্থানে ছিল। যেহেতু দ্বিগুন দুরত্বের গ্যাল্যাক্সীরা দ্বিগুন বেগে দুরে সরে যায়, আমরা যদি পেছন দিকে অতিক্রান্ত সময়ের হিসাব করি, তাহলে দেখবো যে তারা আমাদের গ্যালাক্সীর একই অবস্থানের উপর সুপারইমপোজ বা উপরিস্থাপিত ছিল ঠিক একই সময়ে। সম্পুর্ণভাবে পর্যবেক্ষন করা সম্ভব হয়েছে,এমন সমগ্র মহাবিশ্ব আসলে উপরিস্থাপিত ছিল একটি বিন্দুতে, বিগ ব্যাঙ্গ,এমন একটি সময়, যা আমরা এভাবে আনুমানিক প্রক্রিয়ায় পরিমাপ করতে পারি।

এধরনের কোন সময়ের পরিমান স্পষ্টতই মহাবিশ্বর প্রকৃত বয়সের উপরের সীমাকেই নির্দেশ করে, কারন যদি গ্যালাক্সীরা কোন একসময় আরো দ্রুত গতিবেগে ‍দুরে সরে যেয়ে থাকে,তাহলে তারা এখন যে অবস্থানে আছে সে খানে পৌছাতে  আনুমানিকভাবে যে সময়ের পরিমাপ প্রস্তাব করা হয়েছে,তার চেয়ে কম সময় লেগেছে।

হাবল বিশ্লেষনের  পরিমাপ অনুযায়ী বিগ ব্যাঙ্গ হয়েছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন বছর আগে।  কিন্তু এমনকি ১৯২৯ সালে, যদিও সুস্পষ্ট প্রমান ছিল (টেনেসী, ওহাইও এবং আর কয়েকটি রাজ্যর আক্ষরিক অর্থে ধর্মগ্রন্হ বিশ্বাসীরা ছাড়া) পৃথিবী ৩ বিলিয়ন বছরের চেয়ে প্রাচীন।

এখন এই পরিমাপ বিজ্ঞানীদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়, যে মহাবিশ্বর তুলনায় পৃথিবীরই বয়স বেশী; কিন্তু তারচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সমস্যাটা হলো এই ফলাফলটি প্রস্তাব করেছিল, নিশ্চয়ই এই বিশ্লেষনে কিছু ভুল আছে।

এই সব সংশয়ের মুল উৎস ছিল আসলে হাবল এর গ্যালাক্সীদের দুরত্ব পরিমাপ প্রক্রিয়ায়: আমাদের গ্যালাক্সীর সাথে সেফিড তারাদের সম্পর্ক ব্যবহার করে এই দুরত্ব পরিমাপে তার প্রক্রিয়ায় কিছু পদ্ধতিগত  ত্রুটি ছিল। দুরত্ব পরিমাপের প্রক্রিয়ার ধাপগুলো ছিল:প্রথমে কাছের সেফিডদের ব্যবহার করে আরো দুরবর্তী সেফিডদের দুরত্ব পরিমাপ করা এবং তারপর আরো দুরে অবস্থিত কোন গ্যালাক্সীর দুরত্ব পরিমাপ করা যেখানে আরো দুরবর্তী সেফিড পর্যবেক্ষন করার পর,তা আসলে ত্রুটিপুর্ণ।

এই পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো কিভাবে অতিক্রম করা হয়েছে তার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ এবং জটিল এখানে বর্ণনা করার জন্য। এবং এছাড়া, এটি এখন আর কোন সমস্যা না কারন আমাদের দুরত্ব পরিমাপ করার এখন অনেক ভালো কৌশল জানা আছে।

হাবল টেলিস্কোপে তোলা আমার প্রিয় একটি ফটোগ্রাফ নীচে দেখানো হয়েছে, ছবিটিতে আমরা দেখতে পাই পৃথিবী থেকে বহু দুরে একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সী এবং অনেক অনেক দিন আগে, (অনেক অনেক দিন আগে কারণ গ্যালাক্সীটি থেকে আলো আমাদের কাছে এসে পৌছাতে  কিছু সময় নিয়েছে-৫০ মিলিয়ন বছরের বেশী-নিয়েছে আমাদের কাছে পৌছানোর জন্য);এরকম কোন একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সী,যার সাথে আমাদের গ্যালাক্সীর মিল আছে,প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র আছে এর মধ্যে। খুব উজ্জল এর কেন্দ্রীয় অংশটিতেই থাকে প্রায় ১০ বিলিয়ন নক্ষত্র। লক্ষ্য করুন ফটোগ্রাফটির নীচের বা দিকের  কোনায় একটি তারা যে উজ্জ্বলতায় জ্বল জ্বল করছে তা প্রায় এইসব ১০ বিলিয়ন নক্ষত্রর উজ্জ্বলতার সমান। প্রথম দেখাতে আপনি সঙ্গত কারনে মনে করতে পারেন এটা আমাদের নিজের গ্যালাক্সীর কাছাকাছি থাকা কোন একটি উজ্জ্বল তারা যা এই গ্যালাক্সীর ছবিটি তোলার সময় সামনে চলে এসেছে। কিন্তু আসলে এটি সেই একই দুরের গ্যালাক্সীরই একটি তারা,৫০ মিলিয়ন আলোক বর্ষরও বেশী দুরে।

স্পষ্টতই এটা কোন সাধারন নক্ষত্র না, এটি এমন একটি নক্ষত্র যা কেবল বিস্ফোরিত হয়েছে,একটি সুপারনোভা। মহাবিশ্বে অন্যতম উজ্জ্বলতম একটি ফায়ারওয়ার্কস। যখন কোন তারা বিস্ফোরিত হয়,সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ( প্রায় এক মাস বা তার কাছাকাছি ) এটি দৃশ্যমান আলোসহ উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ১০ বিলিয়ন তারার উজ্জলতা নিয়ে।

আমাদের জন্য খুশীর ব্যাপার ,সাধারনত নক্ষত্ররা খুব ঘন ঘন বিস্ফোরিত হয়না,সাধারনত: প্রতি একশ বছরে গ্যালাক্সী প্রতি একটি।কিন্তু মনে রাখতে হবে যে আমরা ভাগ্যবান যে নক্ষত্ররা এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়,কারন তারা যদি বিস্ফোরিত না হতো,আমরাও এখানে থাকতাম না, কোন অস্তিত্বই থাকতো না।মহাবিশ্ব সম্বন্ধে সবচেয়ে কাব্যিক যে সত্যটি আমি জানি তা হলো, নি:সন্দেহে আপনার শরীরের প্রতিটি পরমানু কোন এক সময়, বিস্ফোরিত হয়েছে এমন কোন নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ছিল; উপরন্তু আপনার বা হাতের পরমানুরা এসেছে, আপনার ডান হাতের পরমানুদের উৎস থেকে ভিন্ন কোন নক্ষত্র থেকে। আমরা সবাই,আক্ষরিক অর্থেই নক্ষত্র সন্তান,আমাদের শরীর গঠন করেছে নক্ষত্রকণা।

কেমন করে আমরা এটা জানলাম? বেশ, আমরা আমাদের বিগ ব্যাঙ্গ এর সেই পরিস্থিতি সম্বন্ধে যতটুকু জানি, সেটাকে মহাবিশ্বের শুরুর সেই সময়ের, যখন মহাবিশ্বের বয়স মাত্র ১ সেকেন্ড ছিল, সেটার সাথে এক্সট্রাপোলেট করতে পারি (এক্সট্রাপোলেশন হচ্ছে জানা কিছু উপাত্তর উপর ভিত্তি করে নতুন উপাত্ত তৈরী করার একটি প্রক্রিয়া) এবং এভাবে আমরা গণনা করি যে,মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ একসাথে কমপ্রেসড ছিল অত্যন্ত ঘন প্লাজমা আকারে, যার তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডিগ্রী (কেলভিন স্কেলে); এবং এই তাপমাত্রায় নিউক্লিয়ার রিঅ্যাকশন বা পারমানবিক বিক্রিয়া ঘটে খুব সহজেই,প্রোটন এবং নিউট্রণ একসাথে যুক্ত হয় আবার সংঘর্ষের কারনে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার পরবর্তীতে মহাবিশ্ব ক্রমশ শীতল হতে শুরু করে; আমরা কিন্তু প্রেডিক্ট করতে পারি,কি হারে এইসব আদিম নিউক্লিয়াস তৈরীর ‌উপাদানগুলো পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে হাইড্রোজেন এর চেয়ে ভারী কোন পরমানুর নিউক্লিয়াস তেরী করে (যেমন, হিলিয়াম, লিথিয়াম এবং এভাবে বাকীরা ভারী মৌলরা);

আমরা যখন সেটা করি, যা দেখতে পাই তা হলো, লিথিয়ামের  চেয়ে ভারী- যা প্রকৃতিতে তৃতীয়তম ভারী নিউক্লিয়াস-আর কোন নিউক্লিয়াসই তৈরী হয়না এই আদিম অগ্নিগোলকে যাকে আমরা বিগ ব্যাঙ্গ বলছি। আমরা বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে আমাদের গননা  সম্পুর্ণ ঠিক আছে কারন সবচেয়ে হালকা মৌলর মহাজাগতিক প্রাচুর্য  সম্বন্ধে আমাদের প্রেডিকশন নির্ভুল এবং  এই সব পর্যবেক্ষনের সাথে যা অত্যন্ত্য সঙ্গতিপুর্ণ। মহাবিশ্বে এই সব হালকাতম মৌলগুলো –হাইড্রোজেন,ডিউটেরিয়াম ( ভারী হাইড্রোজেন এর নিউক্লিয়াস), হিলিয়াম এবং লিথিয়াম- এর প্রাচুর্যর পার্থক্য একে অপরের থেকে প্রায় ১০ গুনিতক ( মোটামুটি ২৫ শতাংশ ভর অনুযায়ী প্রোটন এবং নিউট্রন, তৈরী করে হিলিয়াম, এবং প্রতি ১০ বিলিয়নে একটি প্রোটন এবং নিউট্রন তৈরী করে একটি লিথিয়াম নিউক্লিয়াস); ‍ এই অবিশ্বাস্য মাত্রার ব্যাপারে তাত্ত্বিক এবং পর্যবেক্ষনগত প্রেডিক্শনও একমত।

এটাই হচ্ছে সবচেয়ে সফল, গুরুত্বপুর্ণ এবং বিখ্যাত প্রেডিক্শন যা আমাদের বলছে বিগ ব্যাঙ্গ আসলেই ঘটেছিল। শুধু মাত্র একটি উত্তপ্ত বিগ ব্যাঙ্গই পারে  মহাবিশ্বে পর্যবেক্ষনক্ষম হালকা মৌলগুলো এই অতিপ্রাচুর্য্যকে ব্যাখ্যা করতে এবং  বর্তমানে পর্যবেক্ষিত সম্প্রসারনশীল মহাবিশ্বের সাথে এটি সঙ্গতি রক্ষা করছে। আমি  আমার পেছনের পকেটে ছোট একটি ওয়ালেট কার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়াই যা একটা তুলনামুলক চিত্র দেখাচ্ছে, হালকা মৌলগুলোর প্রাচুর্য সংক্রান্ত প্রেডিকশন এবং পর্যবেক্ষিত প্রাচুর্য; এটি আমার সাথে রাখি কারন যখনই আমার এমন কারো সাথে দেখা হয় যে বিশ্বাস করে না বিগ ব্যাঙ্গ ঘটেছিল, আমি এটা তাদের দেখাই। সাধারনত আলোচনার সময় এই পর্যায় পর্যন্ত  পৌছানোর প্রয়োজন হয়নি,তবে অবশ্যই,খুব কম সময়ই আসলে ডাটা সেই সব মানুষদের মনে দাগ কাটে,যারা আগে থেকে সিদ্ধান্ত  নিয়ে রেখেছেন,এই ‍দৃশ্যপটে নিশ্চয়ই কিছু সমস্যা আছে। তারপরও আমি কার্ডটা সাথে রাখি, নীচে আপনাদের জন্য এটি কপি করে দিলাম:

যদিও লিথিয়াম কারো কারো জন্য জরুরী হলেও, বাকী সবার কাছে আরো বেশী জরুরী হলো আরো ভারী নিউক্লিয়াসগুলো, যেমন, কার্বন,নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, আয়রন এবং অন্যরা। এই সব ভারী মৌলগুলো কিন্তু বিগ ব্যাঙ্গ এর সময় তৈরী  হয়নি। শুধু মাত্র একটি জায়গায় এরা তৈরী হতে পারে তা হলো নক্ষত্রের উত্তপ্ত কেন্দ্রে। এবং আজ আপনার শরীরে এদের আসার একটিই মাত্র উপায় ছিল, সেটা হলো, এই নক্ষত্রগুলো যদি দয়া করে বিস্ফোরিত হয় এবং তাদের অভ্যন্তরে তৈরী করা এই সব মৌলগুলোকে তারা সজোরে মহাশুন্যে ছড়িয়ে দেয়, যেন  এইসব ভারী মৌল গুলো, আমরা সুর্য নামে ডাকি এমন একটি নক্ষত্রর কাছাকাছি একটি ছোট নীল গ্রহের ভিতরে এবং এর চারপাশে জমাট বাধতে পারে। আমাদের এই গ্যালাক্সীর ইতিহাসে, প্রায় ২০০ মিলিয়ন নক্ষত্র এভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে।  এই অসংখ্য তারা, আপনি যদি বলতে চান বলতে পারেন এরা নিজেদের উৎসর্গ করেছে, যেন একদিন আপনি জন্ম নিতে পারেন। আমি মনে করি এই সত্যটি আর যে কোন কিছুর মত এদের যোগ্য করেছে প্রকৃত ত্রানকর্তা হিসাবে মর্যাদা পাবার।

ছু বিশেষ ধরনের বিস্ফোরিত নক্ষত্র, যেমন টাইপ Ia সুপারনোভা, ১৯৯০ এর  দশকের বেশ কিছু সতর্ক ;; আর নিবিড় গবেষনায় দেখা গেছে এদের কিছু অসাধারন বৈশিষ্ট আছে: জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন খু্ব বেশী নির্ভুলতার সাথে  টাইপ Ia সুপারনোভাগুলো অন্তর্গতভাবে বেশী উজ্জ্বল এবং এই উজ্জ্বলতা তারা ধরে রাখে দীর্ঘসময় ধরে।‌ এই সম্পর্কটি বা কোরিলেশনটি যদিও তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি তবে পর্যবেক্ষন নির্ভর পরীক্ষায় এর ভিত্তি মজবুত। এর মানে হচ্ছে এই সুপারনোভাগুলো খুবই ভালো ’স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডল’, এটা দিয়ে আমরা বোঝাতে চাইছি, এই সুপারনোভাগুলোকে ব্যবহার করা যেতে পারে দুরুত্ব ক্যালিব্রেট বা পরিমাপ করার জন্য, কারন তার অন্তস্থ উজ্জ্বলতা সরাসরি পরিমাপ করার মাধ্যমে নিশ্চিৎ করা যেতে পারে, যা তাদের দুরত্ব থেকে স্বতন্ত্র, অর্থাৎ এদের উজ্জ্বলতা আমরা মাপতে পারবো দুরত্ব সংক্রান্ত কোন ‍উপাত্ত ছাড়া।, আমরা যদি দুরের কোন গ্যালাক্সীতে একটি সুপারনোভা লক্ষ্য করে থাকি-এবং আমরা তা লক্ষ্য করতে পারছি কারন তারা খুবই উজ্জ্বল- এর পর এটি কত দীর্ঘ সময় ধরে উজ্জ্বল আছে সেটি লক্ষ্য করে আমরা এর ইনট্রিনসিক বা অন্তস্থ উজ্জ্বলতা সম্বন্ধে একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারি। তারপর আমাদের টেলিস্কোপ দিয়ে এর আপাত উজ্জ্বলতাকে পরিমাপ করে  সঠিকভাবে বলতে পারি  এই সুপারনোভাটি এবং  এটি যে গ্যালাক্সীতে অবস্থান করছে বা এর হোষ্ট গ্যালাক্সীটা কতদুরে অবস্থিত। তারপর এই গ্যালাক্সীর নক্ষত্রদের থেকে আসা আলোর ’রেড শিফট’ পরিমাপ করে আমরা এর রিসেশন বা দুরে সরে যাবার গতিবেগ নির্নয় করতে পারি এবং এভাবে এই গতিবেগকে  এর দুরত্বের সাথে তুলনা করে মহাবিশ্বের সম্প্রসারনের হার সম্বন্ধে একটি ধারনা পেতে পারি।


ছবি: ক্যাসিওপিয়া এ ‘(Cassiopeia A) এর চমৎকার একটি ছবি। ছবির রংটা অবশ্য কাল্পনিক। ক্যাসিওপিয়া এ  একটি সুপার নোভার অবশিষ্টাংশ। ছবিটির ঠিক কেন্দ্রে  আছে মৃত নক্ষত্রটি, আর চারপাশে পদার্থের ক্রমবর্ধমান একটি খোলস, যা নক্ষত্র থেকে ছিটকে পড়েছে এর মৃত্যুর সময়। সুত্র: Photo credit: NASA/JPL-Caltech/O. Krause (Steward Observatory)/ NOVA)

এই পর্যন্ত সব ঠিক আছে। কিন্তু যদি সুপারনোভা বিস্ফোরিত হয়  গ্যালাক্সী প্রতি একশ  বছরে একটা , তাহলে কেমন সম্ভাবনা আসলে আছে, আমরা তাদের কোন একটা দেখতে পারবো?  কারন, মনে রাখা প্রয়োজন,আমাদের এই গ্যালাক্সীতে ঘটা শেষ সুপারনোভাটি দেখেছিলেন ইয়োহানেস কেপলার, ১৬০৪ খৃষ্টাব্দে। আসলেই একটা প্রচলিত কথা আছে,আমাদের গ্যালাক্সীর সুপারনোভা পর্যবেক্ষন করা সম্ভব শুধুমাত্র কোন মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জীবদ্দশায়,আর অবশ্যই কেপলার অবশ্যই সেরকম একজন ছিলেন।

অস্ট্রিয়ায় একজন সাধারন অংকের শিক্ষক হিসাবে জীবন শুরু করা কেপলার একসময় বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহের সহকারী হয়েছিলেন (টাইকো ব্রাহে নিজেও আমাদের গ্যালাক্সীতে একটি সুপারনোভা দেখেছিলেন এবং এর পুরষ্কার স্বরুপ ডেনমার্কের রাজা তাকে আস্ত একটি দ্বীপ উপহার দিয়েছিলেন) এবং  সৌরজগতের গ্রহদের নানা অবস্থানের প্রায় এক দশকের বেশী সময় ধরে টাইকো ব্রাহের সংগ্রহ করা উপাত্ত বিশ্লেষন করে কেপলার তার বিখ্যাত প্ল্যানেটারী মোশন বা গ্রহের গতিপথের  তিনটি সুত্র বা ল প্রস্তাব করেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে:

১.গ্রহরা সুর্যের চারপাশে  প্রদক্ষিন করছে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে।
২.সুর্য এবং একে প্রদক্ষিনরত গ্রহকে সংযুক্ত করে আকা একটি ’সরলরেখা’ সমপরিমান সময়ের ব্যবধানে সমপরিমান ’এলাকা’য় বিভাজিত করে।
৩.কোন একটি গ্রহের সম্পুর্ণ প্রদক্ষিনকালের সময়কাল বা ’অরবিটাল পিরিওড’ এর ’বর্গফল’, এর কক্ষপথের সেমি-মেজর অক্ষেটির ঘনফল (৩য়শক্তি) এর সরাসরি সমানুপাতিক (উপবৃত্তের ’সেমি-মেজর অ্যাক্সিস’,উপবৃত্তের সবচেয়ে প্রশস্ততম অংশর সরলরৈখিক দুরত্ব বা ব্যাসের অর্ধেক);


ছবি: ইয়োহানেস কেপলার (December 27, 1571 – November 15, 1630) ; কেপলার প্রথম প্ল্যানেটারী মোশনের সুত্রগুলো প্রণয়ন করেছিলেন। (ছবি সুত্র); 
(বাংলাদেশের তরুন জ্যোতির্বিজ্ঞানী খান মুহম্মদ এর লেখা কেপলার এর জীবনী: এখানে) ;

এই সুত্রগুলো পরবর্তীতে, প্রায় একশ বছর পর নিউটনের ইউনিভার্সাল গ্র্যাভিটির সুত্রগুলো উদঘাটনের ভিত্তি রচনা করেছিল। এই অসাধারন অবদান ছাড়াও কেপলার সফলভাবে তার মায়ের বিরুদ্ধে আনা ডাকিনী বিদ্যা চর্চ্চার অভিযোগে বিচারে লড়াই করেছিলেন; এবং এছাড়া চাদে যাবার একটি ভ্রমনকাহিনী লিখেছিলেন,যা সম্ভবত প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী।

ইদানীং অবশ্য সুপারনোভা দেখার একটি সহজ উপায় হচ্ছে বিভিন্ন গ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের আকাশে একটি করে গ্যালাক্সীর দিকে সতর্ক লক্ষ্য রাখার জন্য ভাগ করে দেয়া। কারন, আর যাই হোক,মহাজাগতিক সেন্সে একশ বছর খুব একটা ভিন্ন না,পিএইচডি শেষা করার গড় সময়কাল থেকে এবং গ্রাজুয়েট ছাত্ররা যেমন সস্তা তেমনি সংখ্যায়ও কম না। আনন্দের কথা হলো,আমাদের এই চরম ব্যবস্থা গ্রহন করার কোন প্রয়োজনই পড়েনি,এবং সেটা  খুবই সহজ সরল একটি  কারনে:এই মহাবিশ্ব আসলে অনেক অনেক বিশাল এবং প্রাচীন, আর সে কারনে দুর্লভ ঘটনাও প্রায় সবসময়ই ঘটছে।

যে কোন একটা রাতে বন কিংবা মরুভুমিতে বেড়াতে যদি যান,যেখানে আপনি বেশ স্পষ্টভাবেই আকাশ ভরা নক্ষত্রদের দেখতে পাবেন,এবার আপনার হাতটা আকাশের দিকে উপরে তুলে ধরুন,এর আপনার তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল এক করে খুব ছোট বৃত্ত তৈরী করুন,এবার আকাশের যে জায়গায় কোন দৃশ্যমান তারা দেখা যাচ্ছেনা, এমন অন্ধকার অংশের দিকে এই বৃত্তটি ‍তুলে ধরুন। এই অন্ধকার অংশটিতে,বর্তমানে ব্যবহার করা হয় এমন কোন যথেষ্ট বড় টেলিস্কোপ দিয়ে চোখ রাখলে, আপনি হয়ত ১০০০০০ গ্যালাক্সী খুজে আলাদা করতে পারবেন, যাদের প্রত্যেকটিতে শত বিলিয়ন নক্ষত্র আছে। যেহেতু সুপারনোভা বিস্ফোরিত হচ্ছে প্রতি ১০০ বছরে ১ বার, তাহলে এই ১০০০০০ গ্যালাক্সীতে, যা দেখা যাচ্ছে, আপনি হয়তো আশা করতে পারেন, গড়ে, যে কোন রাতে তিনটি নক্ষত্রকে বিস্ফোরিত হতে দেখা যেতে পারে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ঠিক সেই কাজটি করছেন, প্রথমে তারা টেলিস্কোপ ব্যবহার করার জন্য সময় চেয়ে  আবেদন করেন এবং কোন রাতে তারা হয়তো একটি নক্ষত্রকে বিস্ফোরিত হতে দেখেন, কোন রাতে হয়ত দুটি, আর কোন রাতে হয়তো মেঘলা থাকতে পারে, তখন আর  কিছু দেখা সম্ভব হয়না। এভাবে বেশ কয়েকটি গ্রুপ সক্ষম হয়েছেন নির্ভুলভাবে হাবল কনস্ট্যান্ট (যে হারে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে)বা ধ্রুবর পরিমাপ করতে ১০ শতাংশ অনিশ্চয়তারও কমে। নতুন যে সংখ্যাটি আমরা পেয়েছি, গড়ে ৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দুরত্বে থাকা গ্যালাক্সীদের জন্য এটি হলো প্রতি সেকেন্ডে ৭০ কিলো মিটার । এটি হাবল এবং হুমাসন যা পেয়েছিলেন তার প্রায় ১০ গুন ছোট একটি সংখ্যা;ফলে আমরা এখন পরিমাপ করতে পারি যে, মহাবিশ্বের বয়স ১.৫ বিলিয়ন বছর না বরং প্রায় ১৩ বিলিয়ন বছরের কাছাকাছি।

আমি পরে আরো বিস্তারিত বর্ণনা করবো, এটি স্বতন্ত্রভাবে পরিমাপ করা আমাদের গ্যালাক্সীতে সবচেয়ে প্রাচীনতম নক্ষত্রের বয়সের সাথেও সামন্জষ্যপুর্ণ। ব্রাহে থেকে কেপলার, লোমেইত থেকে আইনস্টাইন এবং হাবল এবং নক্ষত্রদের বর্ণালী থেকে হালকা মৌলের প্রাচু্র্য, চারশ বছরের আধুনিক বিজ্ঞান সম্প্রসারনশীল মহাবিশ্বের এই অসাধারন এবং বার বার একই পুর্বাপর সঙ্গতিপুর্ণ দৃশ্যপটটি আমাদের সামনে উন্মোচন করে চলছে। সবকিছুই এর স্বপক্ষে। বিগ ব্যাঙ্গের দৃশ্যপটটি তার উপযুক্ত অবস্থানটি আরো দৃঢ়তার সাথেই ধরে রেখেছে।

আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সী

 ((((((((((প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত)))))))

Advertisements
লরেন্স ক্রাউস এর এ ইউনিভার্স ফ্রম নাথিং : প্রথম অধ্যায়

9 thoughts on “লরেন্স ক্রাউস এর এ ইউনিভার্স ফ্রম নাথিং : প্রথম অধ্যায়

  1. ”এই মহাবিশ্ব আসলে অনেক অনেক বিশাল এবং প্রাচীন, আর সে কারনে দুর্লভ ঘটনাও প্রায় সবসময়ই ঘটছে “

    ( :

    অসাধারণ লেখা বরাবরের মত !

      1. এমন লেখায় কোনো কমেন্ট প্রয়োজন নেই , অসীম আকাশে কত শত বিস্ময়, কত জন হা করে তাকিয়ে থাকে ?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s