বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: প্রথম পর্ব

ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

ভুমিকা: মিলান কুন্দেরা’র ( Milan Kundera) উপন্যাস Nesnesitelná lehkost bytí এর চেক ভাষা থেকে মাইকেল হেনরী হাইম এর ইংরেজী অনুবাদ The Unbearable Lightness of Being এর বাংলা ভাবানুবাদের একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা; এই ব্লগের জন্য আমি এর ধারাবাহিক অনুবাদ করছি বেশ কয়েকদিন হলো, আলাদা পাতা হিসাবে খন্ড খন্ড ভাবে লেখাগুলো আছে এই ব্লগে। এখানে প্রথম পর্বটি সবগুলো অংশ একসাথে পোষ্ট করলাম। দ্বিতীয় পর্বের ১ থেকে ৮  এখানে;

_________________________________________________

 প্রথম পর্ব:  নির্ভারতা এবং ভার
_______________ 

চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের [১] ধারনাটা খুব রহস্যময়, আর নীচাহ [২]  প্রায়ই এটি দিয়ে অন্য দার্শনিকদের ধাধার মধ্যে ফেলে দিতেন: এমনটা ভাবা যে, আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটে ঠিক যেমনটা আগেই ঘটেছিল আর এই পুনরাবৃত্তিরও পুনরাবৃত্তি চলতে থাকে অনন্তকাল; আসলেই এমন একটি উন্মত্ত অলীক ধারনার  অর্থ কি হতে পারে?

নেতিবাচক ভাবে যদি ব্যাখ্যা করতে চাই, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের মিথ বলছে যে, কোন একটি জীবন যা চিরকালের মত হারিয়ে গেছে, যা কখনোই আর ফিরে আসবে না, সে জীবন আসলে ছায়ার মত, নির্ভার, আগে থেকেই মৃত এবং হতে পারে সেই জীবন দুঃসহভাবে কুৎসিত, সুন্দর কিংবা মহৎ, এর ভয়াবহতা, মহত্ব এবং সৌন্দর্য সব কিছুই অর্থহীন। চতুর্দশ শতাব্দীর আফ্রিকার ‍দুই রাজ্যের মধ্যকার যুদ্ধকে যেমন আমরা যতুটুকু গুরুত্ব দেই, যে যুদ্ধ পৃথিবীর নিয়তিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করেনি, এমন কি সেখানে লক্ষ লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ তীব্রতম নিপীড়নের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন হয়েও যদি থাকে, সেই জীবনকে আসলে আমাদের তার চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেবার কোন প্রয়োজন নেই।

চতুর্দশ শতাব্দীর দুটি আফ্রিকার রাজ্যর মধ্যে যুদ্ধটাই কি বদলে যাবে যদি  বার বার এর পুনরাবৃত্তি হয়, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনে?

পরিবর্তিত হবে সেটি: এটি পরিবর্তিত হবে কঠিন একটি বস্তুতে, চিরস্থায়ী ভাবে প্রস্ফীত, যার অসারতা অসংস্কারযোগ্য।

যদি ফরাসী বিপ্লবের চিরন্তনভাবে পুনরাবৃত্তি হতে থাকে, ফরাসী ঐতিহাসিকরা রোবসপিয়েরকে [৩] নিয়ে খানিকটা কম গর্ব অনুভব করতেন। কিন্তু যেহেতু তারা এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলছেন, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না, বিপ্লবের সেই রক্তাক্ত বছর গুলো পরিণত হয়েছে শুধুমাত্র কতগুলো শব্দ, তত্ত্ব আর আলোচনায়, পালকের মত হালকা হয়ে গেছে, আর কারো মনেই  তা ভীতির উদ্রেক করেনা। একজন রোবসপিয়ের, যে ইতিহাসে মাত্র একবার আসে এবং  যে রোবসপিয়েরের যার চিরন্তন পুনরাগমন ঘটে  ফরাসীদের মাথা কাটার জন্য, তাদের মধ্যে পার্থক্য অসীম।

সেকারনে আসুন আমরা অন্ততঃ একমত হই, চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের ধারনাটি আমাদের এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গী দেয়, যেখান থেকে সাধারনত কোন কিছুকে আমরা যেভাবে চিনি, তার থেকে ভিন্ন অনুভুত হয়: তারা আবির্ভুত হয় তাদের ক্ষনস্থায়ী প্রকৃতির গুরুত্ব হ্রাস করিয়ে দেয়া কোন পরিস্থিতি ছাড়াই। এই গুরুত্ব হ্রাস করানো পরিস্থিতি কোন একটি মতামতে পৌছাতে আমাদের বাধা দেয়। কারন কিভাবে আমরা কোন কিছুকে দোষারোপ করবো, যা ক্ষনস্থায়ী, আসা যাওয়ার মধ্যে তার অবস্থান? অবসানের গোধুলীবেলায় অতীতবিধুরতার আলোয় উদ্ভাসিত হয় সবকিছু, এমনকি গিলোটিনও।

কিছু দিন আগে, আমার ভিতর একটি অবিশ্বাস্য অনুভুতির উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম, হিটলারে উপর একটি বই এর পাতা উল্টাতে গিয়ে, তার কিছু প্রতিকৃতি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল: সেগুলো শৈশবে কথা মনে করে দিয়েছিল আমাকে। যুদ্ধের সময়ই আমি বড় হয়েছি, আমার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও তাদের জীবন দিয়েছেন হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। কিন্তু আমার জীবনের হারানো সেই সময়ের সব স্মৃতি, যা আর কোনদিনও ফিরে আসবে না, তার তুলনায়, তাদের মৃত্যু আসলে কি?

হিটলারের সাথে এই পুনর্মিলন আসলে প্রকাশ করে, এই পৃথিবীর একটি গভীরতম নৈতিক বিকৃতি, যা নির্ভর করে প্রধানত পুনরাবৃত্তির অনস্তিত্বের উপর, কারন এই পৃথিবীতে সবকিছুই পুর্বেই ক্ষমাপ্রাপ্ত এবং সেকারনে সবকিছুই নৈরাশ্যজনকভাবেই অনুমতিপ্রাপ্ত।

যদি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহুর্তের অসীম সংখ্যক বার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে অনন্ত কালের কাছে আমরা চিরবন্দী, যেমন পেরেক ঠুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল যীশু খৃষ্টকে। ভয়াবহ একটি ভবিষ্যত। চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের পৃথিবীতে দুঃসহ দায়িত্বের ভার আমাদের প্রত্যেকটি কাজের উপর ভর করে থাকে। একারনেরই নীচাহ চিরন্তন প্রত্যাবর্তনের ধারনাটি চিহ্নিত করেছেন সবচেয়ে ভারী বোঝা হিসাবে।

যদি চিরন্তন প্রত্যাবর্তন আমাদের উপর সবচেয়ে ভারী বোঝাই হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের জীবনগুলো এর বিপরীতে সুস্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত হতে পারে তাদের সব চমৎকার নির্ভারতা সহ।

কিন্তু  এই ভার কি আসলেই নিন্দনীয় আর নির্ভারতা চমকপ্রদ? সবচেয়ে ভারী বোঝা গুলো আমাদের ভেঙ্গে ফেলে, আমরা এর নীচে পতিত এবং পিষ্ট হই। আমাদের মাটির সাথে এটি চেপে ধরে রাখে। কিন্তু প্রতিটি যুগের ভালোবাসার কবিতায়, নারী পুরুষের শরীরের ভার তাদের উপর অনুভব করার তীব্র আকাঙ্খা প্রকাশ করে আসছে। সবচেয়ে ভারী বোঝা তাহলে একই সাথে জীবনের সবচেয়ে তীব্র পরিপুর্নতারও একটি দৃশ্য। বোঝা যত ভারী হবে, আমাদের জীবন ততই পৃথিবীর সন্নিকটে আসে, তত বেশী বাস্তব আর সত্যি হয়।

বীপরিতে, বোঝার চুড়ান্ত অনুপস্থিতি মানুষকে বাতাসের চেয়েও নির্ভার করে তোলে, অনেক উপরে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়, পৃথিবী এবং পার্থিব অস্তিত্বকে পরিত্যাগ করে এবং রুপান্তরিত করে শুধু আংশিক সত্যে, তার প্রতিটি কর্ম যেমন মুক্ত ঠিক তেমনই গুরুত্বহীন।

তাহলে আমরা কোনটাকে বেছে নেব? ভার নাকি নির্ভারতা?

খৃষ্টপুর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারমেনিডিজ [৪] ঠিক এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন। তিনি পৃথিবীটাকে  বিভাজিত দেখেছিলেন বীপরিতমুখী যুগলে: আলো/অন্ধকার, সুক্ষতা/স্থুলতা, উষ্ণতা/শীতলতা, অস্তিত্ব/অনস্তিত্ব। এই বীপরিতমুখী যুগলে অর্ধেককে তিনি চিহ্নিত করেছেন ইতিবাচক হিসাবে( আলো, সুক্ষতা,উষ্ণতা, অস্তিত্ব) এবং অন্য অর্ধেককে নেতিবাচক হিসাবে। আমরা  ইতিবাচক এবং নেতিবাচক মেরুতে তার এই বিভাজন প্রক্রিয়াকে শিশুসুলভ সরল মনে করতে পারি শুধু একটি সমস্যা ছাড়া: কোনটি ইতিবাচক, ভার নাকি নির্ভারতা?

পারমেনিডিজ এর উত্তর ছিল: নির্ভারতাই ইতিবাচক, ভার নেতিবাচক।

তিনি কি সঠিক অথবা না? সেটাই প্রশ্ন। শুধুমাত্র  একটি বিষয় নিশ্চিত তা  হলো: নির্ভারতা/ভার বৈপরীত্যটি সবচেয়ে বেশী রহস্যময় আর অস্পষ্টতম একটি বিষয়।

ড্রইং : কাজী মাহবুব হাসান

অনেক বছর ধরেই আমি টমাসের কথা ভাবছিলাম। কিন্তু  তাকে বোধহয় আরো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, শুধুমাত্র এইসব ভাবনার আলোকেই। তার ফ্লাটের জানালার সামনে তাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম,  মাঝের কোর্ট ইয়ার্ডের অন্য পাশে বিপরীত দিকের দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল সে, বুঝতে পারছিল না কি করবে সে।

তিন সপ্তাহ আগে একটি ছোট চেক শহরে তেরেজার সাথে তার প্রথম দেখা হয়েছিল। এমন কি একঘন্টাও তারা এক সাথে কাটায়নি। তেরেজা স্টেশন পর্যন্ত এসেছিল, যতক্ষন না  টমাস ট্রেনে উঠে বসেছে, ততক্ষন অপেক্ষাও করেছিল তার সাথে। এর ঠিক দশ দিন পর তেরেজা দেখা করতে এসেছিল তার সাথে। তার পৌছানোর দিনেই তারা সঙ্গম করেছিল। আর সে রাতেই হঠাৎ করে খুব জ্বর হয় তেরেজার, পুরো এক সপ্তাহ টমাসের ফ্লাটে সে থেকেছে ফ্লু নিয়ে।

প্রায় সম্পুর্ন এই আগন্তুকটির প্রতি টমাস একসময় এক ধরনের অবর্ণনীয় ভালোবাসা অনুভব করতে শুরু করেছিল। তার কাছে শিশুর মত মনে হয়েছে তেরেজাকে; একজন শিশু যাকে কেউ আলকাতরা দিয়ে লেপা একটা বুলরাশের [৫] এর ঝুড়িতে শুইয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে, যেন টমাস তাকে নদীর পাড় থেকে খুজে  নিয়ে আসে তার বিছানায়।

টমাসের সাথে সে এক সপ্তাহ কাটিয়েছিল সেবার, যতদিন পর্যন্ত না সে  সুস্থ বোধ করে। তারপর ফিরে গিয়েছিল তার শহরে; প্রাহা [৬] থেকে প্রায় একশ পচিশ মাইল দুরে। এবং তারপর আমি যে সময়ের কথা দিয়ে টমাসের গল্প শুরু করেছি কিছুক্ষন আগে, সেই সময়টা এসেছিল এবং যে সময়টাকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন মুহুর্ত হিসাবে আমি দেখি: জানালার সামনে দাড়িয়ে কোর্ট ইয়ার্ডের অপর প্রান্তে টমাস তার বিপরীত দিকে দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল আর গভীরভাবে ভাবছিল;

সে কি তেরেজাকে প্রাহাতে আবার ডেকে আনবে স্থায়ী ভাবে থাকার জন্য? কিন্তু দায়িত্ব নেয়ার ব্যপারে সে শঙ্কিত বোধ করে। কারন যদি তাকে আসার জন্য সে আমন্ত্রন জানায়, তাহলে সেক্ষেত্রে তেরেজা অবশ্যই আসবে তার কাছে এবং তাকে উৎসর্গ করবে তার জীবন।

অথবা তেরেজার প্রতি অগ্রসর হওয়া থেকে তার কি বিরত থাকা উচিৎ? সেক্ষেত্রে মফস্বল শহরে একটি হোটেলের রেস্টুরেন্টে সে চিরকালই একজন ওয়েট্রেস হয়েই রয়ে যাবে এবং তার সাথে আর কখনোই দেখা হবেনা।

সে কি চাচ্ছে, সে আসুক নাকি চাচ্ছে না?

কোর্ট ইয়ার্ডের অপরপ্রান্তের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে একটা ‍উত্তর খুজছিল টমাস।

বার বার টমাসের মনে পড়ছিল তার বিছানায় তেরেজার শুয়ে থাকার দৃশ্যটা; তার অতীত জীবনের কারো কথাই তেরেজা মনে করিয়ে দেয়না। সে না রক্ষিতা না স্ত্রী। সে যেন একটা শিশু, আলকাতরা লেপা বুলরাশের ঝুড়িতে কেউ তাকে তার বিছানা নদীর তীরে পাঠিয়ে দিয়েছে। ঘুমিয়ে ছিল তেরেজা। পাশে হাটু গেড়ে বসেছিল টমাস। তার জ্বরের নিশ্বাস ধীরে ধীরে দ্রুত হচ্ছিল এবং একসময় সে গোঙ্গানীর মত দুর্বল একটি আওয়াজ করে ওঠে। টমাস তার গাল তেরেজার গালের সাথে চেপে ধরে,ঘুমের মধ্যে তাকে ফিস ফিস করে কথা বলে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। কিছুক্ষন পর সে টের পায় তেরেজার নিঃশ্বাস স্বাভাবিক গতি ফিরে পেয়েছে। অচেতনভাবেই তার গাল টমাসের গালের সাথে আরো কাছাকাছি নিয়ে আসে সে,  জ্বরের সুক্ষ একটা গন্ধ অনুভব করেছিল টমাস, আরো বেশী করে নিঃশ্বাসের সাথে গন্ধটি বুকের মধ্যে টেনে নেয় সে, যেন তেরেজার শরীরের অন্তরঙ্গতা দিয়ে নিজেকে অতিরিক্ত পুর্ন করতে চেষ্টা করছে সে এবং একই সাথে সে কল্পনা করছে, তার সাথে তেরেজা যেন আছে বহু বছর ধরে এবং এখন সে মারা যাচ্ছে। সুস্পষ্ট ভাবে হঠাৎ করে তার অনুভুতি হয়েছিল , তেরেজার মৃত্যু হলে সে আর বেচে থেকে পারবে না। তার পাশে শুয়ে এবং তার সাথে মরে যেতে চাইছিল টমাস। তার মাথার পাশে বালিশে টমাস তার মুখ চেপে ধরে রেখেছিল অনেকক্ষন ধরে।

এখন জানালার সামনে দাড়িয়ে সেই মুহুর্তগুলোকে বোঝার চেষ্টা করছে সে। তার ভিতরে ভালোবাসার  ঘোষনা ছাড়া আর কিইবা হতে পারে সেই মুহুর্তের অনুভুতিগুলো?

কিন্তু এটা কি ভালোবাসা ছিল? তার পাশে শুয়ে মৃত্যুর বাসনাটা স্পষ্টতই বাড়াবাড়ি: তেরেজাকে এর আগে সে দেখেছিল মাত্র একবার। এটা কি সেই পুরুষের উন্মত্ততা, যে তার অন্তর থেকেই জানে তার ভালো না বাসতে পারার অক্ষমতার কথা, অথচ সে অনুভব করেছে, এমন অনুভুতির প্ররোচনার জন্য কোন আত্মপ্রবঞ্চনীয় প্রয়োজনীয়তা। তার অবচেতন মন কি এতই ভীরু যে, এই কমেডির জন্য সে সঙ্গী হিসাবে পছন্দ করেছে দুর্ভাগা মফস্বল শহরের কোন ওয়েট্রেসকে,  যার বাস্তবিক অর্থে তার জীবনে প্রবেশ করার কোন সম্ভাবনাই নেই!

কোর্ট ইয়ার্ডের ওপাশে ময়লা দেয়ালগুলোর দিকে তাকিয়ে, সে বুঝতে পেরেছিল, তার কোন ধারনাই নেই এটা কি নিছক পাগলামী ছিল নাকি ভালোবাসা।

এবং টমাস খুবই অস্থির বোধ করছিল, এরকম কোন পরিস্থিতিতে যখন কোন প্রকৃত পুরুষ তাৎক্ষনিকভাবে বুঝতে পারতো তার কি করা উচিৎ, সেখানে সে ভুগছে এই অস্বস্তিকর দোটানায় এবং সেকারনে সে তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দরতম মুহুর্তগুলোর অনুভুতি থেকে নিজেকে যেন বঞ্চিত করছিল ( তেরেজার বিছানার পাশে হাটু গেড়ে বসে থাকা এবং ভাবা যে তেরেজার মৃত্যু হলে তার পক্ষেও বেচে থাকা সম্ভব না)।

নিজের উপর বিরক্তিটা রয়েই গেল যতক্ষন না পর্যন্ত অবশেষে সে বুঝতে পারে, সে কি চাচ্ছে সেটা না জানাটাই আসলে খুবই স্বাভাবিক।

আমরা কখনোই আসলে জানতে পারিনা, কি চাইবো বা কি চাইতে হবে, কারন, শুধু মাত্র একটি জীবন কাটিয়ে, আমরা যেমন না পারি আমাদের অতীতের জীবনের সাথে একে তুলনা করতে, তেমনি পারি না এই ‍চাওয়াকে আমাদের অনাগত জীবনগুলোতে শুধরিয়ে সঠিক করে নিতে।

তেরেজার সাথে থাকাটাই কি ভালো হবে নাকি একা থাকা ?

পরীক্ষা করার কোন উপায় নেই কোন সিদ্ধান্তটি আসলে অপেক্ষাকৃত ভালো, কারন তুলনা করার কোন মানদন্ডও নেই। জীবন যেভাবে আমাদের মুখোমুখি হচ্ছে আমরাও সেভাবেই বাঁচি, কোন সতর্কবানী ছাড়াই, হঠাৎ আড়ষ্ট হয়ে যাওয়া কোন অভিনেতার মত। এবং সেই জীবনের কি মুল্য হতে পারে যদি জীবনের জন্য প্রথম রিহার্সেলটাই আসল জীবন হয়ে থাকে? সেকারনেই জীবনটা সবসময় একটা রেখাচিত্রের মত। না, রেখাচিত্র শব্দটি ঠিক হলো না। কারন রেখাচিত্র হলো কোন কিছুর নকশা, কোন একটা ছবির মুল ভিত্তি, অন্যদিকে যে রেখাচিত্র আমাদের জীবন, সেটি আসলে কোনকিছুরই রেখাচিত্র নয়, কোন ছবি ছাড়া একটি নকশা মাত্র।

টমাস স্বগোতক্তি করে, আইনমল ইস্ত কাইনমল [৭], এই জার্মান প্রবাদবাক্যটি যা বলে তা হলো, শুধু মাত্র একবারের জন্য যা ঘটে, তা আসলে কোনদিনও একেবারে না ঘটবার মতই। যদি মাত্র একটি জীবন আমরা বাচার জন্য পাই, তাহলে হয়তো আমরা আসলে কোনদিনও বেচেই থাকিনি।

কিন্তু  এরপর একদিন  হাসপাতালে অস্ত্রোপোচার করার মধ্যবর্তী বিরতিতে, একজন নার্স টমাসকে টেলিফোন ধরার জন্য ডেকে নিয়ে আসে। রিসিভার থেকে আসা তেরেজার গলার আওয়াজ সে শুনতে পায়। তীব্র একটা আনন্দ অনুভব করে টমাস। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সন্ধ্যায় তার কিছু ব্যস্ততা ছিল, এর পরদিন ছাড়া তার বাসায় তেরেজাকে আসতে আমন্ত্রন জানাতে পারেনি টমাস। কিন্তু টেলিফোন ছাড়ার পরপরই, নিজেকে গালমন্দ করলো টমাস, তেরেজাকে সরাসরি তার বাসায় যাওয়ার কথা না বলবার জন্য। তার সন্ধ্যার পরিকল্পনাটা তো বাতিল করার জন্য যথেষ্ট সময় তো তার হাতে ছিল!  কল্পনা করার চেষ্টা করলো প্রাহাতে তেরেজা তার সাথে দেখা হবার আগের এই ছত্রিশ ঘন্টায় একা একা কি করেতে পারে এবং  প্রায় অর্ধেক মনস্থির করেই ফেলেছিল, এই মাত্র গাড়ীতে উঠে সে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে তেরেজাকে খুজতে বের হবে।

পরের সন্ধ্যায় তেরেজা এলো, কাধ থেকে ঝোলানো একটা ব্যাগ নিয়ে, আগের চেয়েও আরো অনেক বেশী সুন্দর। তার বাহুর নীচে বেশ মোটা একটা বই, বইটা  ছিল আনা কারেনিনা। বেশ ভালো মেজাজে ছিলো তেরেজা, বরং একটু যেন বেশী উল্লাসময় প্রগলভ এবং চেষ্টা ছিল টমাসকে বোঝাতে, সে হঠাৎ করে তার ‍সাথে দেখা করতে এসেছে, যেন ব্যপারটা ঘটেছে কোন একটা সুযোগের কারনেই। প্রাহাতে সে একটা কাজে এসেছিল হয়তো ( এ পর্যায়ে তার সেই কাজ সম্বন্ধে তেরেজা বক্তব্য খানিকটা অস্পষ্ট হয়ে যায়) কোন একটা কাজ খুজে পাবার আশায়।

পরে,  তারা যখন নগ্ন হয়ে পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে খানিকটা সময় কাটাচ্ছিল, টমাস তাকে জিজ্ঞাসা করে, সে  থাকার জন্য কোথায় উঠেছে। ততক্ষনে অনেক রাত হয়েছে এবং সে তাকে গাড়ী দিয়ে সেখানে নামিয়ে দেবার প্রস্তাব করে। বিব্রত, তেরেজা উত্তর দেয়, সে এখনও কোন হোটেল ঠিক করেনি এবং তার স্যুটকেসটি সে রেখে এসেছে স্টেশনে।

মাত্র দুই দিন আগেই, টমাস ভয় পেয়েছিল, যদি তেরেজাকে সে প্রাহাতে আসার জন্য আমন্ত্রন জানায়, তবে সে তাকে তার বাকী জীবনটাই নিবেদন করতে পারে। যখনই তেরেজা তাকে বলে, তার স্যুটকেস আছে স্টেশনে, তাৎক্ষনিকভাবে সে বুঝতে পারে, সেই স্যুটকেসটাই তেরেজার সারা জীবন ধারন করে আছে এবং সে স্টেশনে এটি রেখে এসেছে শুধুমাত্র ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন পর্যন্ত না সে তার জীবনটা তাকে নিবেদন করতে পারে।

বাসার সামনে পার্ক করে রাখা টমাসের গাড়ীতে তারা দুজন এসে ওঠে এবং স্টেশনের দিকে রওনা দেয়। সেখানে গিয়ে রক্ষিত স্যুটকেসটি দাবী করে সে ( আকারে বিশাল এবং অত্যন্ত ভারী) এবং স্যুটকেশ আর তেরেজা দুজনকেই নিয়ে আসে তার ফ্ল্যাটে।

কেমন করে সে এত দ্রুত হঠাৎ এই সিদ্ধান্তে সে আসতে পারলো যখন এক পক্ষ ধরে এত বেশী দ্বিধান্তিত ছিল যে, এমন কি তেরেজা কেমন আছে সেটা জানতে চেয়ে একটা পোষ্ট কার্ড পর্যন্ত পাঠাতেও সে নিজেকে রাজী করতে পারেনি?

বিস্মিত সে নিজেও হয়েছিল। তার মেনে চলা মুল নীতিগুলোর বিরুদ্ধে সে কাজটি করেছে। দশ বছর আগে যখন তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছিল, সেই ঘটনাকে, অন্যরা যেভাবে বিয়ের অনুষ্ঠানকে উদযাপন করে, ঠিক সেভাবে উদযাপন করেছিল টমাস। সে বুঝতে পেরেছিল, কোন নারীর পাশাপাশি বসবাস করার জন্য তার জন্ম হয়নি। একমাত্র একজন ব্যাচেলরের জীবনেই সে তার নিজের পুর্নতা পাবে। সে তার জীবনটা এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছিল যেন কোন নারী স্যুটকেস নিয়ে সেখানে ঢুকতে না পারে। এ কারনেই তার ফ্ল্যাটে একটা মাত্র বিছানা। যদিও সেটা যথেষ্ট প্রশস্ত, টমাস তার প্রেমিকাদের বলতো কারো পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে সে ঘুমাতে পারেনা এবং সাধারনত: মধ্যরাতের পর সে তাদের বাড়ী পৌছে দিয়ে আসতো। সুতরাং তার বাসায় তেরেজার প্রথম বেড়াতে আসার সময় তার পাশে টমাসের না শোবার কারন শুধুমাত্র ফ্লুই ছিলনা । সেবার প্রথম রাত সে কাটিয়েছিল তার বড় আর্মচেয়ারে, আর সপ্তাহের বাকী দিনগুলো সে গাড়ী চালিয়ে ফেরত গেছে হাসপাতালে, সেখানে তার অফিসে একটা অস্থায়ী বিছানা আছে ।

কিন্তু এবার  তেরেজার পাশেই ঘুমিয়ে পড়েছিল টমাস। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই সে তার পাশে তেরেজাকে দেখে, তার হাত ধরে তখনও সে ঘুমিয়ে। তারা কি সারা রাত হাতে হাত ধরে কাটিয়েছিল? তার জন্য এটা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন।

এবং ঘুমের মধ্যে তেরেজা  যখন গভীর ভাবে ঘুমের শ্বাস নিচ্ছিল তার হাতে ধরা ছিল টমাসের হাত (বেশ শক্ত করে ধরা: তেরেজার শক্ত করে আকড়ে ধরে রাখা হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়াতে পারছিল না টমাস), বিশাল আকারের স্যুটকেসটা দাড়িয়ে ছিল বিছানার পাশে।

ঘুম ভাঙ্গিয়ে দেবার ভয়ে তেরেজার হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকে সে এবং খুব সাবধানে পাশ ফিরে শোয় তেরেজাকে একটু ভালো করে দেখার জন্য। আবারও তার কাছে মনে হলো তেরেজা যেন একটা শিশু, যাকে আলকাতরা লেপা বুলরাশের ঝুড়িতে শুইয়ে দিয়ে কেউ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। সে নিশ্চয়ই শিশু সহ এই ঝুড়িটি উত্তাল নদীতে ভেসে যেতে দিতে পারেনা! ফারাও কন্যা যদি মোজেসকে নিয়ে ভেসে যাওয়া ঝুড়িটা ঢেউ থেকে ছিনিয়ে না নিত, কোন ওল্ড টেস্টামেন্টও লেখা হতো না, এখন সভ্যতা বলতে আমরা যা জানি সেটারও অস্তিত্ব থাকতো না। কত প্রাচীন পুরাণ কাহিনীর শুরু হয়েছে পরিত্যক্ত শিশুকে রক্ষা করার মধ্য দিয়ে। পলিবাস যদি শিশু ইডিপাসকে না প্রতিপালন করতো, সফোক্লিস কি তার সবচেয়ে সুন্দরতম  ট্রাজেডীটি লিখতে পারতেন!

টমাস সেই সময় অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল, কখনো কখনো রুপক গুলো খুবই ভয়ঙ্কর হতে পারে। রুপকগুলোকে হালকা ভাবে নেয়া ঠিক না। একটি মাত্র রুপকই কিন্তু পারে ভালোবাসার জন্ম দিতে।

৫ 

তার স্ত্রীর সাথে টমাস মাত্র দুই বছর একসাথে বসবাস করেছিল এবং তাদের একটি ছেলে আছে। বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়ায় বিচারক শিশুটির দায়ভার দেন তার মাকে এবং টমাসকে নির্দেশ দেন তার মাসিক আয়ের এক তৃতীয়াংশ শিশুটির ভরনপোষনের জন্য প্রদান করতে। এছাড়া বিচারক তাকে এক সপ্তাহ অন্তর ছেলের সাথে দেখা করার অধিকারও মন্জ্ঞুর করলেন।

কিন্তু প্রতিবারই, যখনই টমাস এর তার ছেলেকে দেখতে যাবার কথা, ছেলেটির মা কোন না কোন একটা অজুহাত খুজে বের করতো, যেন টমাসের সাথে তার ছেলের দেখা না হয়। খুব দ্রত টমাস বুঝতে পেরেছিল, তাদের জন্য যদি দামী উপহার সে নিয়ে যায় তাহলে এই দেখা করার বিষয়টি অপেক্ষাকৃত ঝামেলমুক্ত হচ্ছে, অর্থাৎ মা কে তার ঘুষ দিতে হবে, তার ছেলের ভালোবাসা পাবার জন্য। ছেলেটির মধ্যে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীগুলো যা অবশ্যই তার মায়ের থেকে সম্পুর্নভাবে বীপরিত, বপন করার একধরনের আবস্তব এবং আদর্শগত একটি কুইক্সোটিক প্রচেষ্টা করার সম্ভাব্য ভবিষ্যত সে অবশ্য দেখেছিল। কিন্তু শুধু সেই ভাবনাটাই তাকে ক্লান্ত  করে দেয়। যখন, এরকম কোন এক রোববারে, ছেলেটির মা, তার নির্ধারিত দেখা করার দিনে, ছেলের সাথে দেখা করার যাবে না বলে অজুহাত দাড় করিয়ে বাতিল করে দেয়; টমাসও সেই ক্ষনিকের মুহুর্তের ‍মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয় আর কখনোই সে তার ছেলেকে দেখবে না।

কেন এই শিশুটির জন্য তার অতিরিক্ত কিছু অনুভব করা উচিৎ, যার সাথে যার তার কোন যোগসুত্রই নেই শুধুমাত্র অন্য অনেকদিনের মতই একটি অপরিনামদর্শী রাত ছাড়া? অবশ্যই সে তার ভরনপোষনের খরচ অব্যাহত রাখার ব্যপারে বিবেকের প্রতি সতর্ক, তবে টমাস চাচ্ছিল না শুধুমাত্র পিতৃসুলভ অনুভুতির খাতিরে কেউ তাকে বাধ্য করুক তার ছেলের জন্য যুদ্ধ করতে !

বলাবাহুল্য, টমাসের এই সিদ্ধান্তে কোন সমব্যথী সমর্থক ছিল না। তার নিজের বাবা মা তাকে সরাসরি একমাত্র দোষী হিসাবে চিহ্নিত করেছিল: যদি টমাস তার ছেলের ব্যপারে কোন আগ্রহ না দেখায়, তাহলে তারা , অর্থাৎ টমাসের বাবা মাও তাদের ছেলের ব্যপারে আর কোন আগ্রহ দেখাবে না। তারা যথারীতি তাদের প্রাক্তন পুত্রবধুর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার যাবতীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেন এবং তাদের এই দৃষ্টান্তমুলক এবং ন্যায়বিচারের স্বপক্ষে তাদের আদর্শগত অবস্থানটি বেশ গর্বের সাথে প্রচারও করলেন।

এভাবেই খু্ব অল্প সময়ের মধ্যেই মুলত; টমাস তার জীবন থেকে স্ত্রী, পুত্র, মা এবং বাবাকে পুরোপরি আলাদা করার বিষয়টি সম্পন্ন করে ফেলে। শুধু মাত্র একটি জিনিস তারা টমাসকে শিখিয়েছিল, তা হলো নারীজাতির প্রতি তার ভয়। টমাস তাদের কামনা করে বটে তবে টমাসের কাছে তারা ভীতিকর।  এই ভয় আর কামনার মধ্যে একটি সমঝোতা করার প্রয়োজনে, সে পরিকল্পনা করেছিল এক বিশেষ ধরনের সম্পর্কের, তার ভাষায় ‘কাম বন্ধুত্বের’; সে তার প্রেমিকাদের বলতো: শুধু মাত্র একটি মাত্র সম্পর্কেই দুই পক্ষ সুখী হতে পারে, যে সম্পর্কে অতিরিক্ত ভাবাবেগের কোন জায়গা নেই এবং কোন পক্ষ‌ই একে অপরের জীবন এবং স্বাধীনতার উপর কোন দাবী করে না।

এই কাম বন্ধুত্বগুলো যেন ভালোবাসার আগ্রাসী রুপ না ধারন করে, সেটা নিশ্চিৎ করতে, টমাস তার দীর্ঘ দিনের প্রেমিকাদের সাথে দেখা করতো শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময় বিরতি দিয়ে। টমাস মনে করতো তার এই পদ্ধতিতে কোন ভুল নেই এবং তার বন্ধুদের মধ্যে বিষয়টি প্রচলনের জন্য প্রচারও করতো: গুরুত্বপুর্ন বিষয়টি হচ্ছে ’তিন’ এর নিয়মটা মেনে চলা। হয় তুমি কোন নারীর সাথে দেখা করবে খুব দ্রুত পর পর তিনবার, এরপর আর কখনোই না অথবা এই সম্পর্ককে অনেক বছর টিকিয়ে রাখতে চাইলে সেক্ষেত্রে নিশ্চিৎ করতে হবে, প্রতিটি দেখার মধ্যবর্তী সময়কাল কমপক্ষে তিন সপ্তাহ।

এই তিন এর নিয়ম টমাসকে সাহায্য করেছিল যেমন বেশ কিছু নারীর সাথে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক রাখতে এবং একই সাথে আরো অনেকের সাথে সংক্ষিপ্ত কিছু সম্পর্কে জড়াতে। টমাসকে অবশ্যই সবাই সহজে বুঝতে পারতো না। তাকে যে একমাত্র নারী সবচেয়ে ভালো বুঝতে পেরেছিল, সে হলো সাবিনা। শিল্পী সাবিনা মুলত একজন পেইন্টার। সাবিনা টমাসকে বলতো, ‘আমি তোমাকে পছন্দ করি, যে কারনে তা হলো. তুমি কিচ [৮] এর সম্পুর্ন বীপরিত, কিচ এর রাজত্বে তুমি একটা দানব হতে’।

প্রাহাতে তেরেজার জন্য একটা কাজ খুজতে এই সাবিনারই শরণাপন্ন হয়েছিল টমাস। কাম বন্ধুত্বের অলিখিত চুক্তি মোতাবেক  সাবিনা তার পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব ততটুকু করার কথা দিয়েছিল এবং খুব শীঘ্রই সে আসলেই তেরেজার জন্য একটা কাজের ব্যবস্থাও করেছিল; একটি ছবিবহুল সাপ্তাহিক পত্রিকার ডার্ক রুমে। যদিও তেরেজার এই নতুন কাজেটি হবার জন্য তার আলাদা কোন যোগ্যতার প্রয়োজন ছিল না, তবে কাজটি তার অবস্থান ওয়েট্রেস থেকে প্রেসের একজন সদস্য হিসাবে উন্নীত করেছিল। যখন সাবিনা নিজেই পত্রিকার সবার সাথে তেরেজাকে পরিচয় করিয়ে দেয়, টমাস বুঝতে পেরেছিল, সাবিনার চেয়ে ভালো বন্ধু হিসাবে এমন কোন প্রেমিকা সে তার জীবনে পায়নি এর আগে।

 ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

কাম বন্ধুত্বের অলিখিত চুক্তির শর্ত দাবী করছে যে টমাস তার জীবন থেকে সব ভালোবাসাকেই পরিত্যাগ করবে। যে মুহুর্তে সে চুক্তির এই শর্তটি লঙ্ঘন করছে, তার অন্য প্রেমিকারা অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরে নেমে আসে এবং  যে কোন সময় বিদ্রোহ করার জন্য একটি ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়।

সেকারনে, তেরেজা এবং তার ভারী সুটকেস এর জন্য টমাস একটি আলাদা ঘর ভাড়া করে। তেরেজাকে দেখাশোনা করা, তাকে রক্ষা করা, তার সঙ্গ উপভোগ করতে পারার ইচ্ছা পোষন করতো টমাস, কিন্তু সে কোন প্রয়োজন বোধ করেনি, তার আগের জীবনযাত্রা বদলে ফেলার জন্য। সে চাচ্ছিল না, কেউ জানতে পারুক যে, তেরেজা তার বাসায় রাত কাটাচ্ছে এবং তার সাথে ঘুমাচ্ছে। এক সাথে রাত কাটানো হচ্ছে ভালোবাসার করপাস ডেলিকটি [৯]।

টমাস কখনোই অন্যদের সাথে রাত কাটায়নি। ব্যপারটা খুব সহজ, যদি সে অন্য কারো বাসায় অবস্থান করে, সে যখনই চায়, তখনই সেখান থেকে বের হয়ে যেতে পারে। শুধু ব্যপারটায় ঝামেলা হয়, যখন অন্যরা তার বাসায় আসে এবং তাকে যথারীতি ব্যাখ্যা দিতে হয়; মধ্যরাত্রির পরে সে তাদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবে কারন তার অনিদ্রারোগ আছে এবং আরেকজন মানুষের খুব কাছাকাছি শুয়ে আর পক্ষে ঘুমানো একেবারেই অসম্ভব। যদিও তার এই দাবী সত্যি থেকে খুব দুরে না, তারপরও সে তার অতিথিদের আসল এবং পুরো সত্যটা বলতে কখনো সাহস পায়নি: সঙ্গমের পরপরই সে তার নিজের নিয়ন্ত্রন ক্ষমতার বাইরে একধরনের তীব্র আকাঙ্খা বোধ করে একা থাকার জন্য; মধ্যরাতে  অচেনা কোন এক শরীরের পাশে ঘুম থেকে জাগা তার খুবই অপছন্দের একটি বিষয়; এবং সকালবেলায়  তার ফ্ল্যাটে একজন অনুপ্রবেশকারীর সাথে ঘুম থেকে ওঠা, তাকে আরো বেশী বিকর্ষন করে। বাথরুমে কেই তার দাত মাজার শব্দ শুনতে পাক সেটা সে কখনোই চায়না, এছাড়া সকালের অন্তরঙ্গ প্রাতরাশ ভাবনাও তাকে আদৌ আকর্ষন করে না।

সে কারনেই সে খুবই অবাক হয়, ঘুম ভেঙ্গে তেরেজাকে তার পাশে, তার হাত আকড়ে ধরে শুয়ে থাকতে দেখে। সে প্রায় পুরোপুরিই বুঝতে ব্যর্থ হয়, আসলে কি ঘটেছে। কিন্তু যখনই মনে মনে পেছনের কয়েক ঘন্টায় কি কি ঘটেছে, সেটা সে ভাবতে শুরু করলেই সে অনুভব করতে শুরু করে, এতদিন পর্যন্ত তার অজানা একটা সুখের আবেশ সেখান থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

সেই সময় থেকে তারা দুজনই একসাথে ঘুমানোর জন্য উন্মুখ হয়েই অপেক্ষা করতো। আমি এমন কি হয়তো বলতে পারবো, তাদের শারীরিক মিলনের উদ্দেশ্য যতটা না সুখ তারচেয়ে বরং সঙ্গম পরবর্তী যে ঘুম, সেটাই মুখ্য ছিল। প্রভাবটা অবশ্য বেশী পড়েছিল তেরেজার উপরেই। যখনই তেরেজা তার ভাড়া করা রুমে রাত কাটাতো ( যা খুব শীঘ্রই টমাসকে কাছে পাবার জন্য শুধুমাত্র একটা অজুহাতে পরিনত হয়েছিল), একা ঘুমানো তার জন্য ভীষন কঠিন হয়ে পড়তো; কিন্তু যখনই টমাসের কাছে খুব সহজেই ঘুমিয়ে পড়তো তেরেজা, যত অস্থিরই সে থাকুক না কেন। টমাস তাকে নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে রুপকথার গল্প বলতো, কিংবা শুধু আবোল তাবোল অর্থহীন কোন কথা, তার একঘেয়ে পুনরাবৃত্তি করা শব্দ, কখনো হাস্যকর, কখনো তাকে সুস্থির করতো, সবকিছুই রুপান্তরিত হতো একটা অস্পষ্ট দৃশ্যে যা তেরেজাকে নিয়ে যেত ঘুমের জগতে, রাতের প্রথম স্বপ্ন দেখিয়ে। তেরেজার ঘুমের উপর এভাবে টমাসের পুর্ন নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে চাওয়া মাত্রই তেরেজাকে ঘুম পাড়াতে পারতো।

যখন তারা একসাথে ঘুমাতো, প্রথম রাতের মতই টমাসকে সে ধরে রাখতো শক্ত করে, কখনো কব্জি, আঙ্গুল বা গোড়ালী। যদি কখনো টমাস তেরেজাকে ঘুম না ভাঙ্গিয়ে উঠতে চাইতো, তাকে বদলি কোন কিছু ব্যবহার করতে হতো। যেহেতু সে টমাসকে এমনকি তার ঘুমের মধ্যে খুব সাবধানে পাহারা দিয়ে রাখতো, তেরেজার হাতের বাধুনী থেকে নিজের আঙ্গুল ছাড়িয়ে নেবার প্রক্রিয়ায় সবসময়ই সে তার ঘুম আংশিক ভাঙ্গিয়ে দিয়ে সফল হত আর তখন টমাস তাকে শান্ত করতো, তার হাতের ভিতর অন্য কিছু গুজে দিয়ে ( গোল করে পাকানো পায়জামার উপরে পড়ার কাপড়, স্লিপার কিংবা বই) যা তেরেজা এমন শক্ত করে ধরতো, যেন টমাসের শরীরেরই কোন অংশ, তারপর আবার ঘুমিয়ে যেত।

একবার, যখন সে কেবল তেরেজাকে ঘুম পাড়িয়েছে, কিন্তু তেরেজা কেবল স্বপ্নের প্রথম স্তরটির বেশী পার হয়নি, সুতরাং তখনও টমাসের গলার আওয়াজ সে শুনছিল, টমাস তাকে বলে, ’বিদায়, আমি এখন যাচ্ছি’; তেরেজা তাকে ঘুমের মধ্যেই জিজ্ঞাসা করে, ’কোথায়’? একটু রুঢ় স্বরে টমাস উত্তর দেয়, ’এখান থেকে দুরে’; তেরেজা বিছানার উপরে উঠে বলে, ’তাহলে আমিও তোমার সাথে যাবো’। ’না, তুমি আমার সাথে যেতে পারবেনা, আমি সারাজীবনের জন্য চলে যাচ্ছ’ ‘’, টমাস বলে দরজা খুলে হলের মধ্যে বেরিয়ে আসতে আসতে। তেরেজা ঘুম চোখেই উঠে দাড়ায় এবং টমাসের পেছন পেছন হলে চলে আসে, ছোট রাত্রিবাসের নীচে পুরো নগ্ন তেরেজা। তার দৃষ্টি শুন্য, অভিব্যক্তিহীন, তবে বেশ ক্লান্তিহীনভাবে সে হেটে আসে টমাসের পিছু পিছু; ফ্ল্যাটের হল থেকে বেরিয়ে বিল্ডিং এর হলে আসে টমাস ( যে হলটি সবার জন্য উন্মুক্ত), তার মুখের উপর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে। কিন্তু ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে তেরেজাও বেরিয়ে আসে হলে তাকে অনুসরন করে, তার ঘুমের মধ্যেই সে যেন নিশ্চিৎ ভাবে বুঝতে পেরেছে, টমাস তাকে একেবারে ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং তাকে তার থামাতে হবে। সিড়ি দিয়ে নেমে প্রথম ল্যান্ডিং এসে অপেক্ষা করে টমাস, তেরেজার জন্য। তেরেজাও সেখানে নেমে আসে এবং টমাসের হাত ধরে তাকে আবার বিছানায় নিয়ে আসে।

টমাস এই উপসংহারে পৌছেছিল: কোন নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হওয়া আর কোন নারীর সাথে ঘুমানো, দুটো আসলে পৃথক তীব্র আবেগীয় অনুভুতি, শুধু পৃথকই না, একেবারে বীপরিত। সঙ্গমের কামনার মধ্যে ভালোবাসা আসলে তার উপস্থিতিকে অনুভত করায় না ( যে কামনা অসংখ্য রমনীর প্রতি হতে পারে) বরং একসাথে ঘুমানোর কামনা মধ্যেই সে তার উপস্থিতিটা জানান দেয়( যে কামনা শুধুমাত্র একটি নারীর প্রতি সীমাবদ্ধ)।

ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

রাতের মাঝামাঝি কোন এক সময়, তেরেজা হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে যন্ত্রনায় গোঙ্গাতে শুরু করে। টমাস তার ঘুম ভাঙ্গায়,কিন্তু যখনই সে চোখ খুলে টমাসকে দেখে,ঘৃণার সাথেই বলে ওঠে,’আমার কাছ থেকে তুমি সরে যাও! আমার কাছ থেকে তুমি সরে যাও’!এরপর তেরেজা তার দেখা দুস্বপ্নটি তাকে বর্ণনা করে:  তারা দুজন এবং সাবিনা বিশাল একটা ঘরের মধ্যে একসাথে,ঘরটির মাঝখানে একটি বিছানা,অনেকটা নাট্য মঞ্চের প্ল্যাটফর্মের মত। যখন টমাস সেখানে সাবিনার সাথে সঙ্গমে ব্যস্ত হয়, সে তেরেজাকে নির্দেশ দেয় এক কোনায় দাড়িয়ে থাকতে; এই দৃশ্যটি তেরেজাকে অসহ্য কষ্ট দিতে থাকে। হৃদয়ের এই যন্ত্রনাটাকে শরীরের যন্ত্রনা দিয়ে লাঘব করার আশায়,তেরেজা তার আঙ্গুলের নোখগুলোর নীচে সুঁই দিয়ে খোঁচাতে থাকে। হাতগুলো শক্ত করে মুঠো বানিয়ে তেরেজা  বলে ‘এত বেশী যন্ত্রনা হচ্ছিল’,যেন সত্যি আঙ্গুলগুলো সুইঁ এর আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে।

নিজের বুকের মধ্যে টমাস টেনে নেয় তেরেজাকে এবং ধীরে ধীরে ( বেশ অনেকক্ষন ধরে বেশ তীব্র ভাবে তেরেজা কাঁপছিল) টমাসের আলিঙ্গনে ঘুমিয়ে পড়ে একসময় তেরেজা।

পরের দিন, স্বপ্নটির কথা ভাবার সময় টমাসের একটা বিষয় মনে পড়ে। সে তার ডেস্কের একটি ড্রয়ার খুলে তাকে লেখা সাবিনার চিঠির একটি প্যাকেট বের করে আনে। বেশী সময় লাগলো না তার এই অনুচ্ছেদটি খুজে পেতে: তোমার সাথে আমি আমার স্টুডিওতে সঙ্গম করতে চাই,এটা হবে চারপাশে মানুষ দিয়ে ঘেরা মঞ্চের মত করে। দর্শকদের কারোরই কাছে আসার অনুমতি নেই,কিন্তু তারা আমাদের দিক থেকে চোখ সরাতেও পারবে না…..।

সবচেয়ে খারাপ বিষয়টি টমাসের মনে হলো,চিঠিটিতে তারিখ ছিল,বেশ সাম্প্রতিক একটি চিঠি,টমাসের সাথে তেরেজার সাথে থাকা শুরু হবার বেশ পরেই লেখা।

’তাহলে তুমি আমার চিঠিপত্র ঘাটাঘাটি করেছো!’

তেরেজা অস্বীকার করে না,‘আমাকে বের করে দাও,তাহলে!

কিন্তু, না, তেরেজাকে সে বের করে দেয়নি।  সাবিনার স্টুডিওর দেয়ালে পিঠ চেপে দাড়ানো তেরেজা তার নোখের নীচে সুঁই ঢোকাচ্ছে, এমন দৃশ্যটা কল্পনা করতে পেরেছিল টমাস। তেরেজার আঙ্গুলগুলো সে নিজের হাতের মধ্যে নিয়েছিল, আদর করেছিল হাত দিয়ে, ঠোটে ছুইয়ে চুমু খেয়েছিল, যেন এখনো সেখানে রক্ত লেগে আছে।

কিন্তু এরপর থেকেই প্রায় সবকিছু যেন টমাসের বিরুদ্ধে যেন ষড়যন্ত্র মেতে উঠলো। তার গোপন জীবন সম্বন্ধে তেরেজার নতুন কিছু না জানতে পারা ছাড়া, এমন কোন দিন অতিবাহিত হয়নি এরপর।

প্রথম প্রথশ টমাস সবই অস্বীকার করেছে, এরপর যখন খুব অনায়াসে চোখে পড়ার মত প্রমান খুজে পাওয়া যায়, টমাসও যুক্তি দেয় এবং দাবী করে, তার জীবনের বহুগামীতা অন্ততপক্ষে তেরেজার জন্য তার ভালোবাসায় কোন অন্তরায় সৃষ্টি করছে না। কিন্তু টমাসের আচরন পরস্পরবিরোধী: প্রথমে সে তার বিশ্বাসভঙ্গতাগুলোকে অস্বীকার করে, তারপর সে চেষ্টা করে সেই কাজগুলোর নায্যতা প্রতিপাদন করার জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তি দিতে।

টমাস একবার যখন টেলিফোনে কারো সাথে দেখার করার তারিখ ঠিক করে বিদায় জানাচ্ছিল, তখনই পাশের ঘর থেকে একটা দাঁতে দাঁত লাগার মত অদ্ভুত আওয়াজ সে শুনতে পায়।

ঘটনাক্রমে, সেদিন তার অজান্তেই তেরেজা বাসায় ফিরে এসেছিল। ঔষধের বোতল থেকে কোন কিছু গলায় ঢালার সময় তেরেজা, এসময় তার হাত এক বাজে ভাবে কাপছিল, যে কাচের বোতল তার দাতের সাথে বাড়ি খায় স্বশব্দে।

টমাস তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে, যেন তেরেজাকে সে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। বোতলটি ছিটকে পড়ে মেঝেতে, তার কার্পেটে একটা দাগ তৈরী করে ভ্যালেরিয়ান ড্রপস [১০]; তেরেজাও টমাসের হাত থেকে ছাড়া পাবার জন্য বেশ ভালো প্রতিরোধ গড়ে তোলে, তেরেজার দুই হাতের কব্জি ধরে, পেছন থেকে শক্ত করে ধরে থাকতে হয় টমাসকে প্রায় সিকি ঘন্টাকাল, তাকে শান্ত করতে।

টমাস জানতো, সে একটা অযৌক্তিক অবস্থানে আছে, কারন সম্পুর্ন অসমতায় যার ভিত্তি।

একদিন সন্ধ্যায়, সাবিনার সাথে তার চিঠিপত্র তেরেজার আবিষ্কারের আগে, তেরেজার নতুন চাকরীর সুখবর উদযাপন উপলক্ষ্যে কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে তারা একটি বার এ গিয়েছিল। সেই সাপ্তাহিকীতে তেরেজার পদোন্নতি হয়েছে,ডার্ক রুম টেকটিশিয়ান থেকেসে এখন স্টাফ ফটোগ্রাফার। যেহেতু টমাস নাচার ব্যাপারে কোন আগ্রহ ছিল না, তার একজন অপেক্ষাকৃত তরুন সহকর্মী তেরেজার সাথে তার সেই দ্বায়িত্বটা পালন করেছিল সেদিন। নাচের ফ্লোরে তাদের যুগলকে চমৎকার লাগছিল এবং টমাসের মনে হয়েছিল, তেরেজাকে এর চেয়ে সুন্দর  সে আগে কোনদিনও দেখেনি। সে অবাক হয়ে দেখছিল, তেরেজা কত অনায়াসে, তাৎক্ষনিকভাবেই নির্ভুল সুক্ষতার আর আনুগত্যের সাথে তার নাচের সঙ্গীর ইচ্ছাকে অনুসরণ করতে পারছিল। নাচটাকে টমাসের মনে হচ্ছিল যেন তেরেজার নিজেকে পুর্ণ নিবেদনের একটা ঘোষনা, তার নাচের সঙ্গীর সামান্যতম ইচ্ছা পুরন করার জন্য তার গভীরতম কামনা; যা এই সঙ্গী পুরুষটির সাথে তার সম্পর্কের কোন বাধ্যবাধকতায় আরোপিত না; যদি টমাসের সাথে তেরেজার পরিচয় না হত, তেরেজা তার সাথে দেখা হওয়া যে কোন পুরুষের আহবানে সাড়া দেবার জন্য হয়ত তৈরী থাকতো। টমাসের কোন কষ্টই হলোনা, তার তরুন সহকর্মী আর তেরেজাকে প্রেমিক প্রেমিকা হিসাবে কল্পনা করতে। এবং এত অনায়াসে সেই কাহিনী সে কল্পনা করতে পেরেছিল দেখে, বেশ  আহতবোধ করলো টমাস। সে বুঝতে পারে, তেরেজার শরীর যে কোন পুরুষ শরীরের সাথে সঙ্গমরত ভাবাটা খুবই সহজ, এবং এই চিন্তাটি তার মেজাজটাকে নষ্ট করে ফেলে অবোধ্য অস্থিরতায়। সেদিন অনেক গভীর রাত না হওয়া পর্যন্ত, বাসায়, তেরেজার কাছে টমাস স্বীকার করেনি, তার ঈর্ষান্বিত হবার কথাটি।

শুধু কিছু কাল্পনিক হাইপোথিসিসের উপর ভর করা, এই অর্থহীন ঈর্ষা, প্রমান করে, তেরেজার বিশ্বস্ততাকে সে তাদের সম্পর্কের একটি নি:শর্ত সত্য হিসাবে আসলে সে ধরে নিয়েছে। তাহলে কেমন করে সে তেরেজার প্রতি অসন্তুষ্ট হতে পারে, যখন তার খুবই বাস্তব, রক্ষিতা বা প্রেমিকাদের প্রতি প্রদর্শিত তেরেজার ঈর্ষার জন্য ?


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

 ৮

দিনের বেলায়, তেরেজা চেষ্টা করতো ( যদিও শুধু মাত্র আংশিক সফলতার সাথে) টমাসের তাকে যা বলছে তা বিশ্বাস করার জন্য এবং চেষ্টা করতো উচ্ছল থাকার জন্য,আগে যেমন সে ছিল। কিন্তু দিনের বেলায় তার এই পোষ মানানো ঈর্ষা  হিংস্র রুপ নিয়ে আক্রমন করতে বেরিয়ে আসতো তার স্বপ্নে, যার প্রতিটি শেষ হতো বিলাপে, একমাত্র ঘুম ভাঙ্গিয়েই টমাস শুধু তা থামাতে পারতো।

তেরেজার স্বপ্নগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটতো, তাদের বিষয়বস্তুতে আর বিভিন্নতায় বা টেলিভিশন সিরিজের মত। যেমন,  বার বার তেরেজা স্বপ্ন দেখতো যে, কতগুলো বিড়াল তার মুখের উপর ঝাপিয়ে পড়ছে, তাদের ধারালো নোখ চামড়ায় বসিয়ে দিচ্ছে নৃশংসতায়। স্বপ্নটির ব্যাখ্যা করতে আমাদের  খুব বেশী দুর যেতে হবে না। কারন ‘বিড়াল‘ শব্দটি চেক অপভাষায় আরেকটি অর্থ হলো,’সুন্দরী রমনী’; নারী, যে কোন নারীকে, তেরেজা তার নিজের জন্য হুমকি হিসাবে অনুভব করতো; কারন যে কোন নারীই হতে পারে টমাসের সম্ভাব্য রক্ষিতা এবং তাদের সবাইকে সে ভয় পায়।

অন্য আরেকটি স্বপ্ন চক্রে, তেরেজা দেখে, তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি ঠেলে দেয়া হচ্ছে। একবার,গভীর রাতে তার ভয়ের আর্তচিৎকার শুনে টমাস তার ঘুম ভাঙ্গায়, তাকে তার দুস্বপ্নের কথা বলে তেরেজা: ’আমি একটা বিশাল ইনডোর সুইমিং পুল এ,  আমরা প্রায় বিশ জন একসাথে, সবাই নারী, সবাই নগ্ন, পুলটি চারপাশে আমাদের মার্চ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, পুলের ছাদ থেকে একটা বিশাল ঝুড়ি ঝুলে আছে, সেখানে দাড়িয়ে আছে একজন পুরুষ, মাথায় চওড়া প্রান্তসহ একটা টুপি পরা, যা তার মুখটাকে প্রায় আড়াল করে রেখেছে, কিন্তু আমি দেখতে পারছিলাম লোকটি ছিলে তুমি। তুমি ওখান থেকে আমাদের নির্দেশ দিচ্ছিলে, চিৎকার করে। পুলের পাশ দিয়ে মার্চ করার সময় আমাদের গানও গাইতে হবে এবং হাটু ভাঙ্গার একটা অনুশীলনও সেই সাথে করতে হবে, যদি আমাদের মধ্যে কেউ ঠিক মত অনুশীলনটা না করতে পারে, তুমি তোমার পিস্তল দিয়ে তাকে গুলি করছো, আর পুলের পানিতে তার মৃতদেহ পড়ে যাচ্ছে; যা দেখে আবার সবাই হেসে উঠছে আর আরো উচ্চস্বরে গান গেয়ে উঠছে। তুমি আমাদের দিক থেকে এক মুহুর্তের জন্য নজর ফেরাচ্ছো না, যে মুহুর্তে আমরা ভুল কিছু করছি, তুমি গুলি করছো, পুলের পানির পিঠের ঠিক নিচে ভরে আছে অসংখ্য মৃতদেহে। এবং আমি বুঝতে পারছি, আমার আর শক্তি নেই এর পরের বার হাটু ভাঙ্গার অনুশীলনটা করার মত, আর তুমি আমাকে তখনই গুলি করতে যাচ্ছো!’

পরে তৃতীয় চক্রের কোন একটি স্বপ্নে তেরেজা দেখে, সে মৃত।

আসবাবপত্র স্থানান্তর করার জন্য ব্যবহার হং এমন একটি বিশাল ভ্যানের মত শবদেহবাহী গাড়ির মধ্যে শুয়ে আছে মৃত তেরেজা, তার চারপাশে আরো মৃত নারীরা। মৃতদেহের সংখ্যা এত বেশী যে, ভ্যানটির পেছনের দরজাটি ঠিকমতন লাগানো যাচ্ছে না, বাইরের দিকে কিছু লাশের পা ঝুলে আছে শুন্যে।

তেরেজা চিৎকার করে বলে, ’আমি মরিনি, আমি এখনও সবকিছু অনুভব করতে পারছি’।

‍অন্য লাশগুলোও সাথে সাথে হেসে উঠে বলে, ‘আমরাও পারছি’।

তাদের সবার হাসি সেই হাসির মত, যে হাসি হেসে জীবিত রমনীরা একসময় খুব উৎফুল্ল মনে তাকে একসময় বলতো, খুবই স্বাভাবিক যে একদিন তারও বাজে দাত হবে, ডিম্বাশয় কর্মক্ষমতা হারাবে, আর ভাজ পড়বে চামড়ায়, কারন তাদের সবারও  দাত বাজে, ডিম্বাশয় অকেজো আর চামড়ায় ভাজ। সেই একই হাসি হেসে মৃত রমনীরা তাকে বলে, সে এখন মৃত, সব কিছু খু্ব স্বাভাবিকই আছে!

হঠাৎ করে তেরেজা পশ্রাব করার তীব্র ‍তাড়না অনুভব করে, চিৎকার করে তেরেজা তাদের বলে, ‘তোমরা দেখেছো, আমার প্রশ্রাব করতে হবে, সেটাই আমার বেচে থাকার স্বপক্ষে সুস্পষ্ট প্রমান!’

তারা শুধু আরো একবার হেসে ওঠে তার কথায়,  ‘প্রশ্রাব করতে চাওয়াটাও খুব স্বাভাবিক’, তারা বলে, ’তুমি আরো অনেকদিন ঠিক এমন কিছু তাড়না  অনুভব করে যাবে। যেমন একজন হাত কেটে ফালা মানুষ, দীর্ঘদিন অনুভব করে যায়, হাতটি আগের মতই সেখানে আছে। আমাদের শরীরের মধ্যে এক ফোটা প্রশ্রাব না থাকতে পারে, কিন্তু প্রশ্রাব করার প্রয়োজনীয়তাটা আমরা অনুভব করেই যাবো।’

বিছানায় তেরেজা টমাসের আরো কাছে সরে এসে শোয়। তেরেজা বলে ‘এবং যেভাবে তারা আমার সাথে কথা বলছিল, যেন আমার বহুদিনের পুরোনো বন্ধু, আমাকে সারা জীবন ধরে যারা চেনে আর জানে, তাদের সাথে আমার অনন্তকাল একসাথে থাকতে হবে, এমন ভাবনা আমাকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল।’

ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

ল্যাটিন থেকে উৎপত্তি হয়েছে এমন সব ভাষাগুলো, ‘সমবেদনা’ বা  ’compassion’ শব্দটি তৈরী করেছে একটি প্রিফিক্স বা উপসর্গ, যার অর্থ ‘এক সাথে’ বা ‘সহ বা সম’ (com-) এবং একটি রুট বা মুল শব্দ যার অর্থ ‘কষ্ট বা বেদনা’ ( ল্যাটিন, passio)  সংযুক্ত করে; কিন্তু অন্য ভাষাগুলোয়-যেমন, চেক,পোলিশ, জার্মান এবং সুইডিশ –এই শব্দটি বোঝাতে একটি বিশেষ্য পদ ব্যবহার করা হয়েছে, যা তৈরী হয়েছে, প্রায় একটি সমার্থক (ল্যাটিন উপজাত ভাষার মত) উপসর্গ এবং অপর একটি শব্দ যার অর্থ  ’‘অনুভুতি’ ( চেক, Sou-cit; পোলিশ, współ-czucie, জার্মান  Mit-gefül; সুইডিশ, med-känsla)।

ল্যাটিন থেকে উদ্ভুত ভাষাগুলোয় ’কমপ্যাশন’ এর অর্থ: অন্য কেউ কষ্ট পাচ্ছে এমন ব্যাপারটি আমরা শীতলভাবে শুধু দেখে যেতে পারিনা; বা যারা কষ্ট পাচ্ছে, আমরা তাদের সমব্যথী হই; আরেকটি শব্দ যার প্রায় একই রকম অর্থ, তাহলো ‘পিটি (pity) বা করুনা’ ( ফরাসী pitié; ‍ইতালীয়, pietà; ইত্যাদি), যা কোন কষ্ট্য সহ্যকারীর প্রতি এক ধরনের অবনমন প্রক্রিয়া কাজ করে, যেমন:‘এই মহিলার প্রতি করুনা করুন, এর অর্থ, আমরা তার চেয়ে অনেক ভালো আছি, আমাদের তার পর্যায়ে  আসতে হবে, বা নিচে নামিয়ে ফেলতে হবে আমাদের’।

সে কারনেই ’কমপ্যাশন’ শব্দটি প্রায়ই সন্দেহের উদ্রেক করে। এমন একটা অনুভুতিকে এটি নির্দিষ্ট করে দেয়, যা মনে করা হয়  অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের এবং দ্বিতীয় শ্রেনীর, ভালোবাসার সাথে যার সংশ্লিষ্টতা খুবই সামান্য। কাউকে সমব্যাথী হয়ে বা সমবেদনার ( অর্থাৎ কমপ্যাশন) কারনে ভালোবাসার অর্থ আসলে, ভালো না বাসা।

যে ভাষাগুলোয় ‘’কমপ্যাশন’ শব্দটি তৈরী করেছে মুল শব্দ ’কষ্ট বা সাফারিং’ থেকে নয়, বরং মুল ’ফিলিং বা অনুভুতি’ থেকে, সেই শব্দগুলোও প্রায় একই রকমভাবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে, এই শব্দগুলো  যে একটি খারাপ বা নিম্নমানের ভাবাবেগকে চিহ্নিত করছে, সেটা নিয়ে তর্ক করাটা বেশ কঠিন । শব্দটির উৎপত্তি সংক্রান্ত অর্থটির গোপন শক্তি, শব্দগুলোকে অন্যে এক অর্থের আলোয় উদ্ভাসিত করে এবং এর অর্থকে দেয় বিশালতা: কারো প্রতি ‘’সমবেদনা বা কমপ্যাশন’ (সহ অনুভুতি) অর্থ শুধু আরেকজনের দুর্ভাগ্যর সাথে বসবাস করাই না বরং তার সাথে একাত্ম হয়ে তার যে কোন অনুভুতিকে সমান ভাবে অনুভব করা  -আনন্দ,দুশ্চিন্তা, সুখ, যন্ত্রনা। এই ধরনের ’কমপ্যাশন’ (Soucit; współczucie, Mitgefül; med-känsla অর্থে) সেকারনে ইঙ্গিত দেয়, অনুভুতি ও সহানুভুতির সর্ব্বোচ্চ কল্পনাক্ষমতার ও আবেগীয় এক টেলিপ্যাথীর বা দুর অনুধাবনের। ভাবাবেগের প্রাধান্যপরম্পরার স্তরবিন্যাসে, তাহলে, এর অবস্থান সবার শীর্ষে।

টমাসের কাছে তার নোখের নীচে সুচ ফোটানোর স্বপ্নের বিবরণ দিয়ে, তেরেজা, নিজের অনিচ্ছাতেই প্রকাশ করে ফেলেছিল, সে তার টেবিলের ড্রয়ারের জিনিসপত্র ঘেটেছে। যদি তেরেজা না হয়ে অন্য কোন নারী হত যে এই কাজটি করেছে, টমাস তার সাথে আর কখনোই কথা বলতো না, সেটা জেনেই তেরেজা, তাকে বলে, ‘আমাকে তাহলে বের করে দাও!’; কিন্তু টমাস তাকে বের করে দেবার বদলে, তার হাত ধরে, আঙ্গুলের মাথায় চুমু খায়, কারন সেই মুহুর্তে টমাস নিজেও তেরেজার নোখের নীচের সেই কষ্ট অনুভব করেছিল সুস্পষ্টভাবে, যেন তেরেজার আঙ্গুলের স্নায়ুগুলো সরাসরি তার নিজের মস্তিষ্কে প্রবাহিত করেছে সেই অনুভুতিটাকে।

যে কোন মানুষ,যে শয়তানের এই উপহার, ’সমবেদনা বা কমপ্যশন’ (সহানুভুতি বা কো-ফিলিং) এর সুবিধা আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা তেরেজাকে তার কাজের জন্য শীতলভাবেই দোষী সাব্যস্ত করতে কোন দ্বিধা করবেনা, কারন ব্যাক্তিগত গোপনীয়তা অত্যন্ত পবিত্র একটা জিনিস, এবং টেবিলের ড্রয়ার, যেখানে অন্তরঙ্গ চিঠিপত্র থাকে তা কখনোই খোলা উচিৎ না। কিন্তু টমাসের নিয়তি ( বা অভিশাপ) যেহেতু ‘কমপ্যাশন বা সমবেদনা‘, সে অনুভব করেছিল, যেন সে নিজেই টেবিলের এর খোলা ড্রয়ারের সামনে হাটু গেঢ়ে দাড়িয়ে আছে, সাবিনার লেখা চিঠিগুলো থেকে চোখ ফেরাতে পারছে না। সে  তেরেজাকে বুঝতে পেরেছিল,  তার উপর রাগ করে থাকতে, টমাস শুধু অক্ষমই না, সে তাকে আরো বেশী ভালোবেসেছিল।


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

১০

তেরেজার আচরন গুলো আরো বেশী আকস্মিক আর অস্থির হয়ে ওঠে। টমাসের অবিশ্বস্ততা সম্বন্ধে জানার প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেছে ততদিনে। এর থেকে মুক্তি পাবার কোন উপায় নেই।

আসলেই কি টমাস এইসব কাম বন্ধুত্বর সম্পর্কগুলো পরিত্যাগ করতে একেবারেই অক্ষম? অবশ্যই সে অক্ষম, এই পরিত্যাগ তাকে বিদ্ধস্ত করে ফেলবে। অন্য নারীদের প্রতি আকর্ষন এবং চাহিদাকে নিয়ন্ত্রন করার মত ক্ষমতা তার নেই। এছাড়া নিয়ন্ত্রন করার কোন প্রয়োজনীয়তাও সে অনুভব করতে ব্যর্থ হয়। তার চেয়ে আর কেউই ভালো জানে না, তার এই সব ছোটখাট অভিযান তেরেজার সাথে তার সম্পর্কের প্রতি কত সামান্যতম শঙ্কার কারন। তাহলে কেন সে তাদের পরিত্যাগ করবে। ফুটবল খেলা দেখা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করার মতই, এধরনের পদক্ষেপের নেবার সে  বাড়তি কোন কারনই অনুভব করেনি।

কিন্তু বিষয়টি কি এখনো আনন্দের ব্যাপার তার কাছে? এমনকি যখন সে অন্য কোন নারীর কাছে যায়, স্পষ্টতই তাকে তার ভালো লাগেনা না এবং আর কখনো সে সেই নারীর কাছে যাবে না বলে প্রতিজ্ঞাও করে নিজের কাছে। সারাক্ষনই টমাস তার চোখের সামনে তেরেজার ছবি দেখতে পায়, এবং ব্যপারটাকে মোছার একমাত্র উপায় তখন দ্রুত মাতাল হওয়া। তেরেজার সাথে তার দেখা হবার পর, সে মদ ছাড়া আর কোন রমনীর সাথে সঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছে! কিন্তু তার নিশ্বাসে মদের গন্ধ তেরেজার কাছে তার অবিশ্বস্ততার  নিশ্চিৎ চিহ্ন।

টমাস একটা অদ্ভুত ফাদে বন্দী: এমন কি তার এইসব বন্ধুদের কাছে যাবার পথে, তার মনে হতো কেন সে যাচ্ছে, অপছন্দ হতো, অরুচি হতো; কিন্তু আবার একদিন যদি সে না যেত, তাকে আবার ফোনে নতুন করে দেখা করার জন্য দিনক্ষন ঠিক করতে দেখা যেত।

তখনো পর্যন্ত সাবিনার সাথেই শুধুমাত্র সে খানিকটা স্বস্তি বোধ করতো। সে জানতো সাবিনা কথা গোপন রাখতে জানে, তাদের গোপনে দেখা হবার ব্যাপারটি সে প্রকাশ করবে না। সাবিনার স্টুডিও  সবসময় যেন তাকে আমন্ত্রন জানাতো অতীতের কোন স্মৃতিচিহ্নর মত, তার প্রিয় সেই ভাবনাহীন ব্যাচেলর অতীত।

হয়তো সে নিজেও বুঝতে পারেনি আসলে তার কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে: এখন সে দেরী করে বাসায় আসতে ভয় পায়, কারন তেরেজা তার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে। তারপর একদিন সাবিনা তাকে ধরে ফেলে সঙ্গমের সময় বার বার ঘড়ির দিকে তাকাতে, এবং কাজটি শেষ করার জন্য তাড়াহুড়া করতে।

এরপর, তখনও নগ্ন, অলসভাবে হেটে তার স্টুডিওতে ইজেলে রাখা অর্ধ সমাপ্ত পেইন্টিং এর এসে দাড়ায় সাবিনা এবং আড় চোখে টমাসকে দেখে দ্রুত তার কাপড় পড়তে।

যখন পুরোপুরি কাপড় পরা হয়ে গেছে, শুধুমাত্র একটি  পা খালি, টমাস সারা ঘরের দিকে তাকিয়ে, এরপর মাটিতে পুরোপুরি শুয়ে পড়ে টেবিলের নীচে কি যেন খুজতে থাকে।

সাবিনা তখন বলেছিল, ‘মনে হচ্ছে তুমি আমার সব ছবির মুল থীমে পরিনত হচ্ছো, দুটি পৃথিবীর সম্মিলন, দ্বিমুখী রুপ, স্বেচ্ছাচারী এক লিবার্টাইন টমাসের রুপরেখার মধ্যে, অবিশ্বাস্যভাবে দেখা যাচ্ছে রোমান্টিক প্রেমিকের মুখ। অথবা, অন্যভাবে, একজন ট্রিষ্টানের মধ্য দিয়ে, যে সারাক্ষন তার তেরেজার কথা ভাবছে, আমি দেখতে পাচ্ছি, বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকার হওয়া এক স্বেচ্ছাচারীর সুন্দর পৃথিব ‘।

টমাস সোজা হয়ে দাড়ায়, অন্যমনস্কভাবে সাবিনার কথাগুলো শোনে।

সাবিনা তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘কি খুজছো তুমি’?

’একটা মোজা’।

সেও সারা ঘর জুড়ে টমাসের সাথে মোজা খুজতে শুরু করে, আবারও  টমাস মেঝেতে শুয়ে পড়ে টেবিলের নীচে খোজে।

’তোমার মোজা তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না’, সাবিনা বলে, ’তুমি মনে হয় মোজা ছাড়াই এসেছিলে’।

টমাস তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, ’আমি কিভাবে মোজা ছাড়া আসি’? ’আমি নিশ্চয়ই আসার সময় শুধু এক পায়ে মোজা পরে আসিনি, তাই না’?

’ সেটা কিন্তু একেবারে অসম্ভব ব্যাপার না। ইদানীং তুমি এমনিতেই খুব অন্যমনস্ক। সবসময় তাড়া করছো, ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছো। একটুও অবাক হবোনা যদি তুমি এক পায়ে মোজা পরতে ভুলে  গিয়ে থাকো’।

খালি পা টা টমাস যখন জুতোর মধ্যে ঢোকাতে যাবে, তখন সাবিনা বলে, ’বাইরে খু্ব ঠান্ডা, আমি তোমাকে আমার একটা মোজা ধার দিচ্ছি’।

সাবিনা তাকে একটা লম্বা, বেশ ফ্যাশনদুরস্ত চওড়া নেটের মোজা দেয় পরার জন্য।

সে ভালো করে বুঝতে পারে তার সাথে মিলনের সময় ঘড়ির দিকে তাকানোর জন্য সাবিনা তার প্রতিশোধ নিচ্ছে। তার মোজা সে নিশ্চয়ই কোথাও লুকিয়ে রেখেছে। বাইরে সত্যি সত্যি খুব ঠান্ডা, সাবিনার প্রস্তাব গ্রহন করা ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই তার। সে বাসায় ফিরে যায় একপায়ে মোজা, অন্য পায়ে  গোড়ালীরে উপর ভাজ করে গুটানো চওড়া নেটের মেয়েলী মোজা পরে।

তার পরিস্থিতি উভয়সঙ্কটের: তার রক্ষিতা প্রেমিকাদের চোখে, সে তেরেজার জন্য তার ভালোবাসার কলঙ্ক চিহ্ন বহন করছে, আর তেরেজার চোখে, সে তার রক্ষিতা প্রেমিকাদের সাথে তার গোপন অভিসারের কলঙ্ক চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে।


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

১১

তেরেজার কষ্টকে খানিকটা সহনীয় করার প্রচেষ্টায় টমাস তাকে বিয়ে করে (অবশেষে তারা তেরেজার জন্য ভাড়া করা সেই রুমটা ছেড়ে দিতে সক্ষম হয়,যদিও তেরেজা সেখানে রাত কাটায়নি বহুদিন হলো) এবং তাকে একটা কুকুর ছানা উপহার দেয়।

তার এক সহকর্মীর সেন্ট বার্নার্ড ব্রিডের পোষা কুকুরের গর্ভে জন্ম নেয়া বাচ্চাটির বাবা অবশ্য্ তার প্রতিবেশীর জার্মান শেপার্ডটি। কেউই এই মিশ্র জাতের এই ছোট কুকুর ছানাগুলোকে চাইছিল না এবং তার সহকর্মীও এদের মেরে ফেলার কথা সহজে ভাবতেও চাইছিল না।

ছানাগুলোকে যেদিন টমাস প্রথম দেখেছিল, টমাস জানতো যে, সে যাদের বাতিল করবে তাদের নিয়তিতে রয়েছে অনিবার্য্য মৃত্যু; নিজেকে তার মনে হয়েছিল যেন প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট, চারজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বন্দীর সামনে দাড়ানো, যার ক্ষমতা আছে মাত্র একজনের জীবন বাচানোর।

অবশেষে টমাস এদের একজনকে বেছে নেয়:  একটা মেয়ে কুকুর ছানা, যার দেহের গড়ন জার্মান শেপার্ড এর কথা মনে করিয়ে দেয় এবং মাথাটি মা সেন্ট বার্নার্ড এর মত। তেরেজার জন্য সে এটিকে বাসায় নিয়ে আসে, দেখামাত্রই তেরেজা তাকে বুকে তুলে নেয়, ছানাটি সাথে সাথে তেরেজার কাপড়ে প্রশ্রাব করে দেয়।

এরপর দুজনে মিলে এর একটি নাম ঠিক করার চেষ্টা করে। টমাস চাচ্ছিল, এর নাম এমন হবে যেন স্পষ্ট বোঝা যায় এটি তেরেজার কুকুর এবং সে ভাবছিল তেরেজা যখন প্রথম প্রাহা’তে  না বলে চলে এসেছিল, তখন তার বাহুর নীচে চেপে ধরে রাখা বইটার কথা; সেটা ভেবেই টমাস প্রস্তাব করে, তারা এই কুকুর ছানাকে ডাকবে টলস্টয়।

তেরেজা প্রতিবাদ করে বলে, ’এর নাম টলস্টয় হতেই পারেনা, কারন, ও তো মেয়ে, আনা কারেনিনা বলে ডাকলে কেমন হয়?’

টমাস বলেছিল, ’এর নাম আনা কারেনিনা হতেই পারে না, কোন রমনীর এত হাস্যকর মুখশ্রী হতে পারেনা, বরং এর চেহারা অনেকটা কারেনিন এর মত, হ্যা, আনার স্বামী, ঠিক এভাবেই আমি তার চেহারাটা কল্পনা করেছিলাম’।

‘কিন্তু কারেনিন বলে ডাকলে কি বিষয়টা তার লিঙ্গ পরিচয়ে কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে নাতো আবার’?

তেরেজার এই প্রশ্নের জবাবে টমাসের উত্তর ছিল, ’খু্বই সম্ভব, হতে পারে সেটা, একটা মেয়ে কুকুরকে সারাক্ষন কোন পুরুষের নাম ধরে ডাকলে, সে নারী সমকামীতার বৈশিষ্ট প্রদর্শন করতে পারে’।

বিস্ময়কর ব্যাপার, টমাসের কথা সত্যিও হয়েছিল। যদি মেয়ে কুকুর ছানারা সাধারনত তাদের নারী মনিবের তুলনায় বেশী পুরুষ মনিব ঘেষা, কারেনিনকে দেখা গেল এর ব্যতিক্রম, স্পষ্টতই সে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে যে, তেরেজাকে সে বেশী ভালোবাসে। এজন্য টমাসও কারেনিনের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। কুকুর ছানাটার মাথায় বুলিয়ে টমাস বলতো, ’সাবাশ, কারেনিন! আমি তোমার কাছে এটাই চেয়েছিলাম, যেহেতু আমি  একা তেরেজার সাথে সামলে উঠতে পারছি না,  তোমার আমাকে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে’।

কিন্তু এমনকি কারেনিন এর সাহায্য নিয়েও টমাস তেরেজাকে সুখী করতে ব্যর্থ হয়। সে তার এই ব্যর্থতাটার স্বরুপটা প্রথম বুঝতে পারে, আরো কয়েক বছর পর, আগ্রাসী রুশ সামরিক ট্যাঙ্ক বাহিনীর তার দেশটিকে দখল নেবার প্রায় দশ দিনের মাথায়। সেটা ছিল, ১৯৬৮ সালের আগষ্ট মাস এবং টমাস জুরিখের একটি হাসপাতাল থেকে প্রায় প্রতিদিনই ফোন পাচ্ছিল। সেখানের হাসপাতালের ডিরেক্টর, একজন চিকিৎসক, টমাসের সাথে যার বন্ধুত্ব হয়েছিল একটি আর্ন্তজাতিক সম্মেলনের সময়, রুশ দের চেক আগ্রাসনের সময় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন টমাসকে নিয়ে, একারনে বার বার তাকে জুরিখে কাজ দেবার প্রস্তাব করছিলেন।

১২

দ্বিতীয়বার চিন্তা না করেই টমাস যদি এই সুইস ডাক্তারের প্রস্তাব বাতিল করে থাকে, সেটার কার আসলে তেরেজা। সে ধরেই নিয়েছিল, তেরেজা কখনোই দেশ ছেড়ে যাবে না। রুশ আগ্রাসনের প্রথম সপ্তাহ তেরেজা যেন একটা ঘোরের মধ্যে সময় কাটিয়েছে, কারো সেটা মনে হতে পারে প্রায় সুখের মত। সারাদিন ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়িয়েছে সে, ছবি তুলে তুলে রোল রোল ফিল্ম সে পাচার করেছে বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে, আক্ষরিক অর্থেই, সেগুলো পাবার জন্য  তারা যুদ্ধ করেছে নিজেদের মধ্যে। একবার তেরেজা বেশ বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিল, এক দল প্রতিবাদী জনতার দিকে পিস্তল তাক করা এক রুশ অফিসারের ‌একটা ক্লোজ আপ ছবি তোলে তেরেজা। তাকে বন্দী করা হয় সাথে সাথেই এবং রুশ সামরিক হেডকোয়ার্টারের জেলে তাকে রাত কাটাতে হয়। সেখানে তারা তাকে হুমকি দেয়, এরপর তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে বলে, কিন্তু ছাড়া পা্বার পর পরই তেরেজা তার ক্যামেরা নিয়ে আবার রাস্তায় নেমে পড়ে।

সে কারনে টমাস খুবই অবাক হয়, যখন রুশ আগ্রাসনের দশম দিনে তেরেজা তাকে জিজ্ঞাসা করে,’ তুমি কি কারনে সুইজারল্যান্ড যেতে চাচ্ছো না?’

’ আমি কেন যাবো?’

’তোমার জন্য এখানে থাকাটা ওরা কঠিন করে ফেলবে’।

’ওরা যে কারো জন্য এখানে থাকাটা কঠিন দিতে পারে’, টমাস হাত নাড়িয়ে কথাটার উত্তর দেয়, ’আর তুমি’? ’তুমি বিদেশে থাকতে পারবে’?

’কেন না?’

’তুমি দেশের জন্য নিজের জীবনের ঝুকি নিচ্ছো প্রতিদিন, তুমি কিভাবে নির্বিকারভাবে দেশটাকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছো?’

’এখন যেহেতু দুবসেক (১১) ফিরে এসেছে, অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে’, তেরেজা বলে।

সত্যি, প্রথম সপ্তাহের বেশী প্রাথমিক এই উল্লাস আর টেকে নি, রুশ সামরিক বাহিনী দেশের জনগনের প্রতিনিধি সব নেতাদের দল বেধে ধরে নিয়ে যায় অপরাধীদের মত। কেউ জানেনা তারা কোথায় এখন, ধারনা করা হচ্ছিল তারা বেচে নেই, রুশদের প্রতি ঘৃনা মানুষগুলোকে মাতাল করে রেখেছিল, মদের মত। সেটা ছিল মদমত্ত ঘৃনার উৎসব। চেক শহরগুলোর দেয়ালে শোভা বাড়িয়েছিল হাজার হাজার হাতে আঁকা পোষ্টার যার মধ্যে ছিল ব্রেজনেভ ও তার সৈন্যদের অশিক্ষিতদের সার্কাস আখ্যা নিয়ে নানা তীর্যক মন্তব্য, ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা আর কার্টুন। কিন্তু কোন কার্নিভালই আসলে চিরকাল চলতে পারেনা। ইতিমধ্যেই রুশরা মস্কোতে ধরে নিয়ে যাওয়া চেক প্রতিনিধিদের জোর করেই একটা সমঝোতার চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়। দুবসেক তাদের নিয়ে প্রাহাতে ফিরে আসার পর রেডিওতে একটি ভাষন দেন, ছয় দিনের বন্দীত্ব তাকে স্পষ্টতই এক বিদ্ধস্ত করেছিল, তিনি কোন শব্দ উচ্চারণ করতেই পারছিলেন না। বার বার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল তার, যেন শ্বাস নিতে পারছেন না, প্রতিটি ধীরে ধীরে উচ্চারিত বাক্যের মধ্যে ছিল দীর্ঘ বিরতি, কখনো প্রায় আধা মিনিট।

এই সমঝোতা দেশটিকে একটি খারাপ পরিস্থিতি এড়াতে সহায়তা করেছিল: কারন সম্ভাব্য গনহারে হত্যা এবং সাইবেরিয়ায় লেবার ক্যাম্পে প্রেরণ করার সম্ভাবনা সবাইকেই আতঙ্কে রেখেছিল। কিন্তু একটা জিনিস স্পষ্ট হয়েছিল অবশেষে, সেটা হল, দেশকে এবার তার শক্তিশালী রুশ দখলকারীর প্রতি নতমস্তক হতে হবে। এবং চিরকালই হোচট খেয়ে চলতে হবে, তোতলাতে হবে, আলেক্সান্ডার দুবসেক এর মতই শ্বাস নেবার জন্য বাতাসের সংকটে পড়তে হবে। কার্নিভালের আনন্দ শেষ, দৈনন্দিন জীবনের অপমানের সুচনা হলো।

তেরেজা টমাসকে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এবং টমাস জানে সব সত্যি। কিন্তু টমাস জানতো, এই সবকিছুর নীচে লুকানো আছে অন্য একটি, আরো মৌলিক সত্য, যে কারনে তেরেজা প্রাহা ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছে: আসলে আগে এখানে সে কখনোই সুখী ছিলো ‍না। যে দিনগুলোতে প্রাহার রাস্তায় রাস্তায় হেটে যে রুশ সৈন্যদের ছবি তুলেছিল সব বিপদের শঙ্কাকে তুচ্ছ করে, সেই দিনগুলোই ছিল তার জীবনের সেরা কয়টি দিন। সেই সময়টায় সেই টেলিভিশন সিরিজগুলোর মত তার দু:স্বপ্নের ধারা ব্যহত হয়েছিল এবং কিছু সুখের রাত অবশেষে সে কাটাতে পেরেছিল। রুশরা যেন তাদের ট্যাঙ্ক নিয়ে তার জীবনের ভারসাম্যও ফিরিয়ে দিয়েছিল, এখন যেহেতু এই কার্ণিভাল শেষ, আবার দুস্বপ্নের ভয় তাকে আতঙ্কিত করে তুলছে, তেরেজা সেই পরিস্থিতি থেকে পালাতে চাইছিল। সেই পরিস্থিতিগুলোকে তেরেজা এখন চিনতে পেরেছে, যখন সে নিজেকে শক্তিশালী আর পুর্ণ অনুভব করে, এবং সে মনে প্রানে চাইছিল, দেশ ছেড়ে পৃথিবীর মুখোমুখি হয়ে অন্যকোথাও সেই পরিস্থিতিগুলোকে আবার খুজে নিতে।

টমাস শুধু জিজ্ঞাসা করেছিল, ’তোমার অস্বস্তি লাগছে না যে, সাবিনাও সুইজারল্যান্ডে চলে গেছে?’

’জেনেভা তো আর জুরিখ না’, তেরেজা বলে, ’প্রাহাতে সে যতটা ছিল ওখানে তার চেয়ে অনেক কম ঝামেলার কারন হবে’।

যে মানুষটি তার বসবাসের জায়গা ছেড়ে চলে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়, সে একজন দু:খী মানুষ। একারনেই টমাস তেরেজার দেশ ছাড়ার ইচ্ছাটাকে মেনে নেয়, একজন অপরাধী যেমন তার শাস্তি মাথা পেতে নেয় এবং একদিন সে, তেরেজা এবং কারেনিন সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহরে নিজেদের আবিষ্কার করে।


ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

১৩

তাদের খালি ফ্ল্যাটের জন্য প্রথমে একটি বিছানা কেনে টমাস ( তখনও তাদের অন্য কোন আসবাব কেনার মত সঙ্গতি ছিল না) এবং চল্লিশ বছর বয়স্ক একজন মানুষের নতুন জীবন শুরু করার উন্মাদনায় তার পেশাগত কাজে ঝাপিয়ে পড়ে।

জেনেভাতে সে বেশ কিছু টেলিফোন করে।  রুশ আগ্রাসনের এক সপ্তাহ পর ঘটনাচক্রে সেখানে সাবিনার একটি প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়েছিল, এবং তার ছোট দেশের প্রতি সমবেদনার ঢেউ এ জেনেভার শিল্প রসিকরা তার সব পেইন্টিং কিনে ফেলেছিলেন।

টেলিফোনে হাসতে হাসতে সাবিনা বলে, ’রুশদের কল্যানে আমি এখন একজন ধনী মহিলা’; সে টমাসকে তার তার নতুন স্টুডিও দেখার আমন্ত্রন জানায়, তাকে নিশ্চিৎ করে, প্রাহাতে সে যেমনটা দেখেছে, তার থেকে নতুন স্টুডিওটির খুব একটা ব্যতিক্রম হবে না। সাবিনার ওখানে বেড়াতে যেতে পারলে টমাস নি:সন্দেহে খু্‌বই খুশী হত, কিন্তু তেরেজার কাছে তার হঠাৎ অনুপস্থিতির জন্য কোন অজুহাত খুজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিল। আর সেকারনে সাবিনাই জুরিখে এসে থাকার জন্য একটি হোটেলে উঠেছিল। হাসপাতালের কাজ শেষে টমাস তার সাথে সেখানে দেখা করতে যায়। নীচের  রিসেপশন ডেস্ক থেকেই প্রথমে সে উপরে ফোন করে জানায়, সে এসেছে, তারপর তার রুমে যায়। যখন দরজা খোলে সাবিনা, টমাস তার সামনে সুন্দর দীর্ঘ পায়ের উপর সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকা সাবিনাকে দেখে , প্যান্টি আর ব্রা ছাড়া পরনে আর কিছু নেই এবং একটি কালো বোওলার হ্যাট তার মাথায়। সাবিনা নিশ্চুপ, স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে টমাসের দিকে একপলকে তাকিয়ে। টমাসও তাই্ করে। হঠাৎ করে সে বুঝতে পারে, সাবিনা তাকে কত গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। সাবিনার মাথা থেকে বোওলার হ্যাটটি খুলে বিছানার পাশের টেবিলে রাখে সে,তারপর তারা সঙ্গমের গভীরে ডুবে যায় আর  কোন কথা না বলে।

হোটেল থেকে বের হয়ে তার ফ্ল্যাটে যাবার পথে ( ততদিনে সেখানে কিছু চেয়ার, একটি টেবিল, কাউচ এবং কার্পেট যোগ হয়েছে) টমাস বেশ খুশীমনে ভাবছিল, শামুক যেমন তার খোলস রুপী বাসা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সেও তার নিজের জীবন ধারনের পন্থাকেও তার সাথে বহন করে নিয়ে বেড়াতে পারছে। তেরেজা এবং সাবিনা তার জীবনের দুটি বীপরিত মেরুকে নির্দেশ করছে, পৃথক এবং অসমন্বয়যোগ্য, অথচ সমানভাবে কাঙ্খিত।

কিন্তু সে যে তার জীবন ধারনের পন্থাকে তার শরীরের অংশর মতই তার সাথে সবজায়গায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই সত্যটির আরেকটি অর্থ হলো তেরেজাও তার দুস্বপ্ন দেখা থেকে পরিত্রান পায়নি।

তখন জুরিখে তাদের ছয় বা সাত মাস হয়েছিল, একদিন যখন টমাস এক সন্ধ্যায় দেরী করে বাসায় ফেরে, সে টেবিলের উপর  একটি চিঠি খুজে পায়, তেরেজা সেখানে তাকে জানায় সে প্রাহাতে ফিরে যাচ্ছে। সে চলে যাচ্ছে কারন বিদেশে বসবাস করার মত শক্তি তার নেই। সে জানে তার উচিৎ ছিল টমাসকে সাহায্য করা, কিন্তু সে জানেনা কিভাবে সে কাজটা করবে। সে তার নির্বুদ্ধিতাকে  স্বীকার করে নেয়, যখন সে ভেবেছিল, দেশের বাইরে গেলে হয়তো সে বদলে যাবে। সে ভেবেছিল রুশ আগ্রাসনের সময় তার অভিজ্ঞতা তাকে হয়তো বদলে দিয়েছে, ছেলেমানুষীর খোলস থেকে বেরিয়ে এসে আরো  বুদ্ধিমান এবং সাহসী, দৃঢ়চেতা হয়েছে সে, কিন্তু সে নিজের সম্বন্ধে শুধু উচ্চধারনাই পোষন করেছে কেবল।  টমাসের বোঝা সে বাড়িয়ে দিয়েছে, আর সে এই কাজটা করবে না। খুব বেশী দেরী হয়ে যাবার আগেই  প্রয়োজনীয়  এই উপসংহারটি সে টেনে দিতে চায় তাদের সম্পর্কে। সে ক্ষমা চায়,  কারেনিনকে তার সাথে নিয়ে যাবার জন্য।

বেশ কিছু ঘুমের ঔষধ খাবার পরও সকালের আগে টমাসের ঘুম হয় না। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ছিল শনিবার, সে বাসায় থাকতে পেরেছিল। প্রায় দেড়শ বার সে পুরো পরিস্থিতিটা নিয়ে ভাবে: তার নিজের দেশ এবং সারা পৃথিবীর মধ্যবর্তী সেই সীমানা আর আগের মত উন্মুক্ত নেই। কোন টেলিফোন বা টেলিগ্রাম পারবেনা তেরেজাকে ফিরিয়ে আনতে। কর্তৃপক্ষ দেশের বাইরে আর কোথাও তাকে যেতে দেবে না। তেরেজার বিদায় ভয়াবহ রকমের সুনিশ্চিৎ।

১৪

এবং তার যে কোন কিছুই করার ক্ষমতা নেই, এই বিষয়টির বোধ তাকে  ভারী হাতুড়ীর মত আঘাত করে, কিন্তু তারপরও ব্যাপারটা রহস্যজনকভাবেই তাকে সুস্থির বোধ করায়। ‍ তাকে সিদ্ধান্ত নিতে কেউ বাধ্য করছে না। সে কোন প্রয়োজন অনুভব করে না, কোর্টইয়ার্ডের অপর দিকে বাড়ীগুলোর দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে এবং ভাবতে, তার সাথে সে জীবন কাটাবে, কি কাটাবে না। তেরেজা নিজেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

একটা রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেতে যায় টমাস। হতাশাগ্রস্থ ছিল সে, কিন্তু খেতে খেতেই তার সেই মুল হতাশাটার প্রভাব কমে আসে, দুর্বল হয়ে পড়ে, এরপর বেশ তাড়াতাড়ি বিষন্নতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না তার মনে।  তেরেজার সাথে কাটানো বছরগুলোর স্মৃতিচারন করতে গিয়ে সে অনুভব করে, তাদের কাহিনীর এর চেয়ে ভালো আর কোন সমাপ্তি হতে পারেনা। যদি কেউ এমন একটি গল্প তৈরী করতো, ঠিক এভাবে টমাস সেই কাহিনীটাকে শেষ করতো।

একদিন কোন আমন্ত্রন ছাড়াই তেরেজা তার কাছে এসেছিল, ঠিক সেভাবেই একদিন সে চলে গেছে। ভারী একটা সুটকেস নিয়ে সে এসেছিল, ভারী একটা সুটকেস নিয়েই সে ফিরে গেছে।

বিল পরিশোধ করে রেস্টুরেন্ট থেকে সে বের হয়ে আসে। রাস্তা দিয়ে হাটতে থাকে, তার বিষন্নতাও ধীরে ধীরে বাড়ছিল আরো সুন্দর হয়ে।  তার জীবনের প্রায় সাতটি বছর সে কাটিয়েছিল তেরেজার সাথে ‌ এবং সে অনুধাবন করে,  তেরেজার সাথে কাটানো সেই বছরগুলো স্মৃতি,আসল সেই সময়ের তুলনায় বরং বেশী আকর্ষনীয় মনে হয়েছিল টমাসের কাছে।

তেরেজার জন্য তার ভালোবাসা অবশ্যই সুন্দর, কিন্তু সেটা আবার খুব ক্লান্তিকরও ছিল: সারাক্ষনই তেরেজার কাছ থেকে নানা কিছু লুকিয়ে রাখতে সে বাধ্য হয়েছে, কখনো ভান করতে হয়েছে, লুকাতে হয়েছে তার আসল অনুভুতি, দোষ স্বীকার করতে হয়েছে, তাকে খুশী করতে হয়েছে, অস্থির হলে ঠান্ডা করতে হয়েছে, তেরেজার জন্য তার অনুভুতির প্রমান তাকে দিতে হয়েছে বহুবার, তার হিংসার অভিযোগেগুলোর আসামী হতে হয়েছে,  তেরজার কষ্ট, আর  দু:স্বপ্নর জন্য তার অপরাধবোধে ভোগা, অজুহাত দেয়া, ক্ষমা চাওয়া,এসব কিছু যা কিছু ছিল ক্লান্তিকর তাদের সেই সম্পর্কে ,আজ সব বিলীন হয়ে, অবশিষ্ট রয়ে গেছে শুধুমাত্র এর সৌন্দর্যটুকু।

সেই শনিবারেই প্রথম টমাসকে জুরিখের রাস্তায় একা একা হাটতে দেখা গেল, তার স্বাধীনতার মাদকীয় গন্ধে নেশাগ্রস্থ হয়ে। রাস্তার প্রতিটা বাকে তার জন্য এখন অপেক্ষা করছে নতুন কোন অভিযান। ভবিষ্যৎ  আবারো রুপান্তরিত হয়েছে গোপনীয় কোন বিষয়ে। তার পুরোনো স্বাধীন ব্যাচেলর জীবনের অভিমুখেই সে যাত্রা শুরু করেছে, যে জীবনটাকে একসময় সে তার নিয়তি বলেই মনে করেছিল, যে জীবন সে যেমন, তাকে ঠিক তেমনই হবার সুযোগ দেবে।

সাতটা বছর সে তেরেজার সাথে বন্দী জীবন কাটিয়েছে, তার প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল তেরেজার দৃষ্টি , বলা যায় সে তার গোড়ালীতে লোহার বেড়ী পরিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ করে যেন তার পদক্ষেপে সে হালকা বোধ করে। সে যেন ভাসতে থাকে;পারমেনিডেজ এর যাদুর ক্ষেত্রে সে প্রবেশ করেছে তখন: সে তার বেঁচে থাকার মাদকীয় মধুর নির্ভারতা উপভোগ করতে শুরু করে।

(সেকি সাবিনাকে জেনেভায় ফোন করতে চাচ্ছিল? কিংবা অন্য নারী বন্ধুদের, যাদের সাথে জুরিখে গত সাত মাসে তার পরিচয় হয়েছে? না, একদমই না। হয়তো সে বুঝতে পেরেছিল যে অন্য কোন নারী তার তেরেজার স্মৃতিকে আরো অসহনীয় বেদনাময় করে তুলবে।)

ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান

১৫

টমাসের এই অদ্ভুত বিষন্ন মুগ্ধতা স্থায়ী ছিল রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু সোমবারে, সবকিছু বদলে যায়-টমাসের চিন্তায় তেরেজা জোর করে ঢুকে পড়ে:তেরেজাকে সে কল্পনা করে টেবিলে বসে তার জন্য বিদায়ের সেই চিঠিটি লিখছে, তার মনে হয় তেরেজার হাত একটু কাপছে;টমাস দেখতে পায়, ভারী স্যুটকেসটা সে টানছে এক হাতে, অন্য হাতে ধরা কারেনিনর এর গলায় বাধা বাধনটা। টমাস কল্পনা করে, তেরেজা প্রাহাতে তাদের ফাকা ফ্ল্যাটের দরজা খুলছে; আর  সম্পুর্নতম পরিত্যক্ততার দীর্ঘশ্বাস তেরেজা তার মুখের উপর অনুভব করে।

টমাসের সেই দুটি সুন্দর বিষন্ন দিনে, তার সমবেদনা ( আবেগীয় টেলিপ্যাথির সেই অভিশাপ) ছিল অনুপস্থিত, যেন খনি শ্রমিকদের  রোববারের গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন ছিল সেটি, যাদের সারা সপ্তাহ পরিশ্রমের পর সোমবারের আবার প্ররিশ্রমের জন্য শক্তি সঞ্চয় করতে হয়।

রোগীদের চিকিৎসা করার বদলে টমাস তেরেজাকে দেখে; নিজেকে মনে করিয়ে দেবার আন্তরিক চেষ্টা করে সে, তেরেজাকে নিয়ে কোন চিন্তা করো না,তার কথা ভেবো না;টমাস নিজেকে বলে, আমি সমবেদনার অসুখে অসুস্থ হয়ে পড়েছি, ভালোই হয়েছে সে চলে গেছে,আমি আর তাকে কখনোই দেখবো না; যদিও এটা কিন্ত তেরেজা না, যার থেকে আমাকে মুক্তি পেতে হবে – বরং সেই অসুখ,অসহনীয় সমবেদনা, আমার ধারনা ছিল  যার থেকে আমি সুরক্ষিত,কিন্তু শুধুই ততক্ষনই,যতক্ষন অবধি তেরেজা আমাকে এই সমবেদনার অসুখ দিয়ে সংক্রমিত করেনি।

শনিবার এবং রোববারে,টমাস অনুভব করেছিল, বেচে থাকার একটা মধুর নির্ভারতা ভবিষ্যতের গভীর থেকে তাকে স্পর্শ করছে। কিন্তু  সোমবার, সে অনুভব করে সম্পুর্ণ অচেনা একটি ভার; রুশ ট্যাঙ্কের টন পরিমান স্টীলের ভার সেই তুলনায় যেন কিছুই নয়। কারন সমবেদনার তুলনায় আর কোন কিছুই ভারী নয়,আমরা যে কষ্টটা অন্য আরেকজনের জন্য অনুভব করতে পারি,তার তুলনায় নিজের কষ্টের ওজনও এতো ভারী মনে হয়না। কারন, অন্য কারো জন্য,আমাদের অনুভুত সেই কষ্টটি আরো তীব্রতর হয়ে ওঠে কল্পনায় ভর করে, এবং প্রলম্বিত হতে থাকে শত প্রতিধ্বনীতে।

নিজেকে বারবার সে সতর্ক করেছিল, সমবেদনার অনুভুতির কাছে কিছুতেই হার না মানতে; আর  সমবেদনা যেন মাথা নীচু করে খানিকটা অপরাধবোধ নিয়ে শুনছিল তার নিষেধাজ্ঞা। সমবেদনা জানতো তার আচরন উদ্ধত অংহকারপুর্ণ; তারপরও সে তার অবস্থান ত্যাগ করেনি এক বিন্দু; এবং তেরেজার চলে যাবার পর পঞ্চম দিনে টমাস তার হাসপাতালের পরিচালককে ( যিনি রুশ আগ্রাসনের পর প্রতিদিন প্রাহাতে টমাসকে ফোন করতেন)জানায়, তাকে তার নিজের দেশে ফিরে যেতে হবে এখনই। টমাস লজ্জিত ছিল, কারন সে জানতো, এ ধরনের কোন পদক্ষেপ দ্বায়িত্বজ্ঞানহীন এবং ক্ষমার অযোগ্য বলে মনে হতে পারে তার কাছে। সে ভেবেছিল, তেরেজা এবং তার জন্য টেবিলের উপর রেখে যাওয়া চিঠিটার কথা তাকে বলে মনের কিছুটা ভার লাঘব করবে,কিন্তু সেটা না করার সিদ্ধান্ত নেয় সে; সুইস পরিচালক এর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তেরেজার এই অন্তর্ধান শুধু পাগলামী আর ঘৃন্য একটি কাজই মনে হতে পারে। এবং টমাস তেরেজাকে নিয়ে খারাপ কিছু ভাবার ‍সুযোগ  কাউকে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

হাসপাতালের পরিচালক মুলত: অপমানিত বোধ করলেন।

টমাস শুধু কাধ ঝাকালো এবং বললো, এস মুস সাইন।

এস মুস সাইন(es muss sein? জার্মান ভাষায় যার অর্থ, এটা হতেই হবে);টমাসের এই বাক্যের ব্যবহার আসলে কিন্তু পরোক্ষভাবে ভিন্ন একটি ধারনার উল্লেখ মাত্র। বীটহোভেন এর শেষ কোয়ার্টেটটি নীচের দুটো মোটিফ বা স্থায়ী ভাব বা সুরের উপর ভিত্তি করে লেখা:

এই শব্দগুলোর অর্থ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বোঝানোর জন্য বীটহোভেন নিজেই এই মুভমেন্টটা (সঙ্গীতের) শুরু করেছিলেন একটি বাক্য দিয়ে,’Der schwer gefasste entschulss’ , যা সাধারনত অনুদিত হয়ে থাকে, ’একটি অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত’ ।

বিটহোভেন এর প্রতি এই পরোক্ষ ইঙ্গিত আসলে টমাসের তেরেজার কাছেই ফিরে যাবার প্রথম পদক্ষেপ, কারন তেরেজাই তাকে বীটহোভেন এর কোয়ার্ট্রেট আর সোনাটার রেকর্ডগুলো কেনার জন্য আগ্রহী করেছিল একসময়।

এই পরোক্ষ সম্পর্কটা টমাস যতটুকু ভেবেছিল তা আরো বেশী প্রাসঙ্গিক কারন এই সুইস ডাক্তারটি নিজেই একজন গভীর সঙ্গীতপ্রেমী; শান্তভাবে মুচকি হেসে, বীটহোভেন এর মেলোডির মোটিফের সুরেই জিজ্ঞাসা করেন, মুস এস সাইন ( muss es sein? অবশ্যই কি তা করতে হবে?)?

ইয়া, এস মুস সাইন ( হ্যা, অবশ্যই তা করতে হবে) টমাস আরো একবার তা বলে।

ড্রইং: কাজী মাহবুব হাসান
১৬

পারমেনিডিজ এর চেয়ে ব্যতিক্রমভাবেই বীটহোভেন ভারকে দেখেছিলেন ইতিবাচক দৃষ্টিতে। যেহেতু জার্মান শব্দ Schwer এর অর্থ ’ভার’ এবং ’কঠিন’, বীটহোভেন এর ’সুকঠিন সিদ্ধান্তকে’ অন্যার্থে বলা যেতে ’ভারী বা গুরুভার’ একটি সিদ্ধান্ত হিসাবে। গুরুভার সিদ্ধান্তটি নিয়তি কন্ঠস্বরের সাথে যেন একসুরে বলছে (es muss sein!); জরুরী প্রয়োজনীয়তা, ভার এবং মুল্য, এই তিনটি ধারনাই অতোপ্রতভাবে জড়িয়ে আছে: শুধুমাত্র জরুরী প্রয়োজনীয়তারই ভার আছে এবং ভার আছে এমন কিছুরই শুধু মুল্য আছে।

বীটহোভেনের সঙ্গীত এমন বিশ্বাসেরই জন্ম দেয় এবং যদিও আমরা ব্যাপারটি ( বা এর সম্ভাবনাকে)উপেক্ষা করতে পারিনা যে, এই ব্যাখ্যার সুত্র বীটহোভেন এর নিজের চেয়ে বরং তার ব্যাখ্যাকারীদের হবার সম্ভাবনাই বেশী, যে মতামত কম বেশী আমাদের সবারই:আমরা বিশ্বাস করি একজন মানুষের বিশালতা বা মহত্ব জন্ম নেয় যে বাস্তবার মাধ্যমে সেটা হলো,সে তার নিয়তিকে বহন করে, যেমন পুরাণের অ্যাটলাস তার কাধে বহন করে এই মহাবিশ্ব। তাই বীটহোভেন এর নায়ক মেটাফিজিক্যাল গুরুভার বহনকারী একজন মানুষ।

টমাস সুইস সীমান্তের নীকটবর্তী হতে থাকে। আমি কল্পনা করছি, বিষন্ন, মাথা ভর্তি এলোমেলো চুলের বীটহোভেন, সশরীরে স্থানীয় দমকল বাহিনীর একটি  ব্রাস ব্যান্ডের সঙ্গীত পরিচালনা করছেন, এই অভিবাসনের বিদায় উপলক্ষ্যে, একটি es muss sein মার্চ।

তারপর টমাস একসময় চেক সীমান্ত অতিক্রম করে, তাকে স্বাগত জানায় রুশ বাহিনীর অগনিত ট্যাঙ্কের সারি। গাড়ী থামিয়ে প্রায় আধাঘন্টা টমাস অপেক্ষা করে রুশ ট্যাঙ্কের সারিটি পার হবার জন্য। ভয়ঙ্কর দর্শন একজন সৈন্য, কালো সামরিক পোষাকে রাস্তার মোড়ে দাড়িয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রন করছে, যেন এই দেশে সব রাস্তাই তার, শুধুমাত্র তার একার।

‘Es muss sein!’ টমাস আরো একবার স্বগোতক্তি করে এবং তারপরই সে সন্দেহপ্রবন হয়ে উঠে, সত্যিই কি এটা অবশ্যই করতে হবে?

হ্যা, তার পক্ষে দু:সহ ছিল জুরিখে থাকা আর কল্পনা করা তেরেজা একা একা প্রাহাতে থাকছে।

কিন্তু কতদিন ধরে সে এই সমবেদনার যন্ত্রনায় অত্যাচারিত হত? তার সারা জীবন? এক বছর? বা এক মাস? বা শুধু এক সপ্তাহ?

কিভাবে টমাস তা জানবে? কিভাবে সে এর পরিমাপ করতে পারতো? যে কোন স্কুলের ছাত্রই পারে পদার্থ বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরীতে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস পরীক্ষা করে দেখতে; কিন্তু মানুষ, যেহেতু মাত্র একটি জীবনই পায় বাচার জন্য,  কোন পরীক্ষা পরিচালনা করে সে তা যাচাই করে দেখার সুযোগ পায়না,তার কি আবেগকে (সমবেদনা)অনুসরণ করা উচিৎ,নাকি, না।

এই ভাবনাটা মনের মধ্যে নিয়ে টমাস প্রাহাতে তার ফ্ল্যাটের দরজা খোলে, ঘরে ফিরে আসাটা সহজ করে খানিকটা কারেনিন, তার গায়ের উপর ঝাপিয়ে পড়ে মুখ চেটে দিয়ে। তেরেজার আলিঙ্গনের স্বাদ পাবার কামনাটা (জুরিখে তার গাড়ীতে ওঠার সময়ও সে স্পষ্ট অনুভব করছিল) পুরোপুরি চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যায়। বরং সে কল্পনা করে, বরফ ঢাকা প্রান্তরে সে তেরেজার মুখোমুখি দাড়িয়ে, দুজনেই তীব্র শীতে কাঁপছে।

১৭

দেশ দখলের সেই শুরুর দিন থেকেই,  সারারাত জুড়ে প্রতিদিনই রুশ যুদ্ধ বিমানগুলো প্রাহার আকাশে উড়ছে; টমাস, সেই আওয়াজে আর অভ্যস্ত না হওয়ায়, ঘুমাতে ব্যর্থ হয়।

ঘুমন্ত তেরেজার পাশে অস্থির বিনিদ্র রাত কাটে তার, তার মনে পড়ে অনেকদিন আগে খুব সাধারন কোন কথোপকথনের মধ্যে, তেরেজা একটা হঠাৎ মন্তব্য। তারা টমাসের বন্ধু জেড (Z)কে নিয়েই কথা বলছিল, তখন তেরেজা বলেছিল, ’আমার যদি তোমার সাথে দেখা না হত, আমি নিশ্চয়ই তার প্রেমে পড়তাম’।

এমনকি সেদিনও তেরেজার এই কথা তাকে এক অদ্ভুত বিষন্নতায় আক্রান্ত করেছিল; আর এখন সে অনুধাবন করে, তেরেজা তার বন্ধু Z কে ভালো না বেসে যে তাকে ভালোবাসে ব্যাপারটা আসলেই একটি দৈবাৎ ঘটনা মাত্র; টমাসের জন্য তার তীব্র সর্বগ্রাসী ভালোবাসা ছাড়া, অবশ্যই সম্ভাবনার জগতে, অসীম সংখ্যক পুরুষের প্রতি তার অপুর্ণ  ভালোবাসা ছিল।

আমাদের জীবনের ভালাবাসা হালকা কিংবা নির্ভার কিছু হতে পারে,এমন কোন ধারনা আমরা সবাই একবাক্যে বাতিল করে দেই;  আমারা আগে থেকে ধরে নেই, আমাদের ভালোবাসার যা হওয়ার দরকার, এটি অবশ্যই সেটি। এবং এই ভালোবাসা ছাড়া আমাদের জীবন কখনোই একই রকম থাকে না;আমরা যেন অনুভব করি স্বয়ং বীটহোভেন,বিষন্ন, বিস্ময় মেশানো সম্ব্রম জাগানো, যেন নিজেই আমাদের মহান ভালোবাসার উদ্দেশ্যে ess muss sein বাজাচ্ছেন।

তার বন্ধু Z সম্বন্ধে টমাস মাঝে মাঝে তেরেজার মন্তব্যটা নিয়ে ভেবেছে এবং সে যে উপসংহারে পৌছেছে তা হলো, তার জীবনের ভালোবাসার কাহিনীর বর্ণনা করতে পারে, es muss sein! না বরং es konnte auch anders sein বা ’এটা অবশ্যই অন্য যে কোন কিছুই হতে পারতো’।

সাত বছর আগে জটিল একটি  স্নায়ুরোগে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল ঘটনাক্রমে তেরেজার নিজের শহরের একটি হাসপাতালে। সেই হাসপাতাল থেকে টমাসের হাসপাতালের প্রধান নিউরোসার্জেনকে অনুরোধ করা হয়, তার বিশেষজ্ঞ মতামত দেবার জন্য, কিন্তু টমাসের হাসপাতালের প্রধান সার্জন ঘটনাক্রমে তখন সায়াটিকায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং যেহেতু তিনি নড়াচড়া করতে পারছিলেন না, তার বদলে তিনি টমাসকে সেই প্রাদেশিক শহরে রোগীটিকে দেখতে পাঠান; সেই শহরে বেশ কয়েকটি হোটেল আছে, কিন্ত ঘটনাক্রমে টমাসের থাকার ব্যবস্থা হলো, তেরেজা যেখানে কাজ করে সেখানে। ঘটনাক্রমে টমাসের হাতে যথেষ্ট অবসর ছিল, ট্রেন ছাড়া আগে, যে কারনে টমাস হোটেলের রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল। তেরেজা ঘটনাক্রমে সেদিন কাজ করছিল, এবং ঘটনাক্রমে টমাসের টেবিলেই পরিবেশনের দায়িত্বে ছিল। প্রায় ছয়টি দৈব ঘটনা বা সুযোগ টমাসকে ঠেলে দিয়েছে তেরেজার দিকে, অর্থাৎ তার নিজের ইচ্ছাটা যেন কম ছিল তেরেজার প্রতি এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে।

প্রাহাতে আবার তার ফিরে আসার কারনও তেরেজা;এরকম একটি দৈবাৎ ঘটা ভালোবাসার উপর ভর করে এত বিশাল নিয়তি নির্ধারক কোন সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে;যে ভালোবাসার অস্তিত্ত্বই তো থাকতো না, সাত বছর আগে যদি টমাসের হাসপাতোলের প্রধান সার্জেন সায়াটিকায় আক্রান্ত না হতেন। এবং এই নারী,চুড়ান্তভাবে আকস্মিক একটি ঘটনার প্রতিভু এখন ঠিক আবারো তার পাশে শুয়ে আছে,গভীর নিশ্বাস নিচ্ছে।

অনেক রাত তখন, প্রচন্ড মানসিক চাপে যেমন হয়,পেটের মধ্যে তেমন একটা অনুভতি  টের পায় টমাস। একবার বা দুবার, তেরেজার নিশ্বাস হালকা নাক ডাকার মত হয়। টমাস কোন সমবেদনা অনুভব করেনা। সে শুধু অনুভব করে তার পেটের মধ্যে বাড়তে থাকা চাপটাকে এবং আর ফিরে আসার বিষন্ন হতাশাটাকে।

_________________________________________________

[১]  Eternal return : নীচাহ’র একটি দর্শন
[২] ফ্রিয়েডরিশ নীচাহ : বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক
[৩] ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবসপিয়ের: ফরাসী বিপ্লবের অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব।
[৪] পারমেনিডেজ: গ্রীক দার্শনিক
[৫] বুলরাশ: এক ধরনের ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ।
[৬] প্রাহা:  প্রাগ চেক প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শহর এবং রাজধানী। চেক ভাষায় উচ্চারন প্রাহা।
[৭] Einmal ist keinmal:  একটি জার্মান প্রবাদ, যার  ইংরেজী অর্থ Once is never।
[৮] Kitsch : (English pronunciation: /ˈkɪtʃ/, loanword from German) is a form of art that is considered an inferior, tasteless copy of an extant style of art or a worthless imitation of art of recognized value. The concept is associated with the deliberate use of elements that may be thought of as cultural icons, while making cheap mass-produced objects that are unoriginal. Kitsch also refers to the types of art that are aesthetically deficient (whether or not being sentimental, glamorous, theatrical, or creative) and that make creative gestures which merely imitate the superficial appearances of art through repeated conventions and formulae. Excessive sentimentality often is associated with the term.
[৯] করপাস ডেলিকটি: Corpus delicti (Latin: “body of crime”) is a term from Western jurisprudence referring to the principle that a crime must have been proven to have occurred before a person can be convicted of committing that crime.
[১০] ভ্যালেরিয়ান ড্রপস: এক ধরনের ভেষজ ঘুমের  ঔষধ।
[১১] আলেক্সান্ডার দুবসেক: Alexander Dubček  (27 November 1921 – 7 November 1992) was a Slovak politician and briefly leader of Czechoslovakia(1968–1969), famous for his attempt to reform the communist regime during the Prague Spring. Later, after the overthrow of the government in 1989, he was Chairman of the federal Czecho-Slovak parliament.

Advertisements
বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: প্রথম পর্ব

3 thoughts on “বেঁচে থাকার দুঃসহ নির্ভারতা: প্রথম পর্ব

    1. সেটাই,নিশ্চয়ই আপনি ইংরেজী অনুবাদটি পড়তে পারেন, সেখানে প্রকাশক আর সম্পাদকরা নির্ভুল অনুবাদ উপহার দিয়েছে।
      অযথা এখানে সময় নষ্ট করার দরকার নেই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s