শধুই কি একটা তত্ত্ব?


শীর্ষ ছবি:  Charnia masoni  র ফসিলের সাথে  বৃটিশ ভুতাত্ত্বিক রজার ম্যাসন। যুক্তরাজ্যের  লীষ্টারে Charnwood forest এ ১৬ বছর বয়সী স্কুল ছাত্র রজার ম্যাসন ১৯৫৭ সালে এই গুরুত্বপুর্ণ ফসিলটি খুজে পান। যুক্তরাজ্যে পাওয়া প্রথম প্রি ক্যামব্রিয়ান ফসিল ( ৫৮০ মিলিয়ন বছর আগের একটি লাইফফর্ম), এটি নি:সন্দেহে  প্রথমবারের মত  প্রমান করে ক্যামব্রিয়ান পিরিওডের আগে বহুকোষী এবং জটিল প্রকৃতির জীবনের অস্তিত্ব ছিল। প্রি ক্যামব্রিয়ান এই ভুতাত্ত্বিক সময়কে এখন বলা হয় Ediacaran পিরিওড ( ৬৩৫ থেকে ৫৪২ মিলিয়ন বছর আগের সময়কাল; দক্ষিন অষ্টেলিয়ার ইডিআকারান হিলস এর নামে এই পর্বটির নামকরন করা হয়েছে)। Charnia এই পর্বে অন্যতম একটি জিনাস।


ভুমিকা:
 লেখাটি  রিচার্ড ডকিন্স ( Richard Dawkins) এর দি গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ  The Greatest Show on Earth: The evidence for Evolution এর প্রথম অধ্যায় Only a Theory র একটি অনুবাদ প্রচেষ্টা। এটি এই ব্লগে আলাদা পেজ হিসাবে ইতিপুর্বে চার খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে।  এখানে  একটি স্বতন্ত্র পোষ্ট হিসাবে আবার যোগ করলাম কয়েকজন শুভানুধ্যায়ী পাঠকদের অনুরোধে। পুরো বইটা ধারাবাহিক ভাবে আমি অনুবাদ করে যাবার চেষ্টা করবো, ইতিমধ্যে দ্বিতীয় অধ্যায়টি  আলাদা পোষ্ট হিসাবে যোগ করা হয়েছে। লেখাটির মুল প্রেরণা ছিল এবারের ডারউইন দিবস।
________________________________________

কল্পনা করুন, আপনি রোমের ইতিহাস এবং ল্যাটিন ভাষার একজন শিক্ষক;  আর আপনি প্রাচীন সেই পৃথিবী,ওভিড এর ‍শোকগাথা আর হোরাসের স্তুতিগাথা, সিসেরোর বক্তৃতার সেই পেশীবহুল ল্যাটিন ব্যকরণ, পিউনিক যুদ্ধের কৌশলগত খুটিনাটি, জুলিয়াস সিজারের সামরিক নেতৃত্ব এবং পরবর্তী সম্রাটদের মাত্রাহীন ইন্দ্রিয়পরায়নতা -ইত্যাদি বিষয়ে আপনার তীব্র ‍উৎসাহ সবার সাথে ভাগ করে নেয়ার জন্য খুবই আগ্রহী । ‍স্পষ্টতই এটা অনেক বড় একটা দ্বায়িত্ব, যার জন্য সময়, ‍ একাগ্রতা আর আত্মত্যাগের প্রয়োজন। তারপরও ‍আপনি লক্ষ্য করলেন, আপনার ‍সেই মুল্যবান সময় সারাক্ষনই আক্রান্ত হচ্ছে ‍ এবং আপনার ক্লাসের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করছে  ক্রমাগত চিৎকার করা এক মুর্খের বা ইগনোরেমাস-এর দল ( ল্যাটিন বিশেষজ্ঞ হিসাবে আপনি ভালো জানবেন, ‘ইগনোরামি’ বলার চেয়ে  ‘ইগনোরেমাস’ বলাটাই উত্তম হবে);  যাদের আছে শক্তশালী রাজনৈতিক সমর্থন, বিশেষ করে অর্থানুকল্য;যারা বিরামহীনভাবে ছোটাছুটি করে ‍আপনার দুর্ভাগা শিক্ষার্থীদের প্ররোচিত করে বোঝনোর চেষ্টা করে যাচ্ছে যে, রোমানদের কোনদিনও অস্তিত্বই ছিলনা, রোমান সাম্রাজ্যও কোনদিনও ছিল না। সমস্ত পৃথিবীটারই সৃষ্টি হয়েছে মানুষের স্মরণকালের সামান্য কিছু সময় আগে। স্প্যানিশ,ইটালিয়ান,ফরাসী, পর্তুগীজ, কাতালান, ওক্সিটান, রোমানশ: এই সব ভাষা আর তাদের সংশ্লিষ্ট সকল উপভাষাগুলো স্বতঃস্ফূর্ত এবং আলাদা আলাদা সৃষ্টি হয়েছে কোন পুর্বসুরী, অর্থাৎ ল্যাটিন ভাষা ছাড়াই। ক্লাসিকের একজন বিশিষ্ট পন্ডিত আর শিক্ষকতার মহান পেশার প্রতি আপনি পূর্ন মনোযোগ দেবার পরিবর্তে আপনি আপনার সময় আর শক্তিকে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন, রোমের যে অস্তিত্ব ছিল -এই প্রস্তাবটি রক্ষা করার স্বপক্ষে যুদ্ধ করতে: অজ্ঞতা আর অন্ধ সংস্কারের এই প্রদর্শনী- যা হয়তো আপনাকে ব্যাথিত করতো, যদিনা আপনি এর বিরুদ্ধে সংগ্রামে ব্যস্ত না থাকতেন।

যদি ‍আমার এই ল্যাটিন শিক্ষকের কল্পকাহিনী বেশী বাড়াবাড়ি মনে হয়, তাহলে আরেকটু বাস্তবসম্মত উদহারণ দেই: ধরুন আপনি আরো সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসের একজন শিক্ষক; এবং বিংশ শতাব্দীর ইউরোপ বিষয়ে আপনার ক্লাস বয়কট করা হয়েছে, ‍উত্যক্ত করে বা কোন না কোনভাবে ব্যহত করছে হলোকষ্ট-অস্বীকারকারীরা যারা সুসংগঠিত, অর্থনৈতিক সাহায্যপুষ্ট, রাজনৈতিক পেশীসম্পন্ন। আমার কাল্পনিক রোম-অস্বীকারকারীর  অস্তিত্ব না থাকুক, হলোকষ্ট-অস্বীকারকারীরা আসলেই আছেন। তারা অত্যন্ত সরব, খুবই হালকাভাবে যুক্তিগ্রাহ্য, আপাতদৃষ্টিতে নিজেদের জ্ঞানী হিসাবে উপস্থাপন করতে সুদক্ষ। তাদের প্রতি সমর্থন আছে, অন্ততঃ বর্তমানে একটি শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরও; এছাড়াও আছেন, অন্ততঃ  রোমান ক্যাথলিক চার্চের একজন বিশপ। এখন কল্পনা করুন, ইউরোপীয় ইতিহাসের শিক্ষক হিসাবে আপনাকে সারাক্ষনই মুখোমুখি হতে হচ্ছে একটি উগ্র আক্রমনাত্মক দাবীর : ‘বিতর্কিত মতবাদটাকেও পড়াতে হবে’, এবং ‘একই পরিমান সময়’, দিতে হবে ‘বিকল্প মতবাদ’ পড়াতে যা কিনা দাবী করে হলোকষ্ট কখনোই হয়নি, এটা কিছু ইহুদীবাদীদের আবিষ্কার’; কিছু মৌসুমী আপেক্ষিকতাবাদী বুদ্ধিজীবিরা এর সাথে গলা মিলিয়ে দাবী করছেন, কোন কিছুই তো চরম সত্য না। হলোকষ্ট ঘটেছে ‍কি ঘটেনি তা নির্ভ‍র করবে ব্যাক্তিগত বিশ্বাসের উপর; সব মতবাদই সমানভাবে বৈধ, সমানভাবে ‘শ্রদ্ধা’ করা উচিৎ।

বর্তমানে অনেক বিজ্ঞান শিক্ষকের দুর্দশা এর চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। যখনই জীববিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী নীতিগুলো তারা ব্যাখ্যা করার চেষ্ঠা করে কিংবা ঐতিহাসিক পটভূমিতে সকল জীবিত প্রানীদের  অবস্থান -যার অর্থই হচ্ছেই বিবর্তন- সম্পর্কে তারা যখন সততার সাথে বর্ণনা করার চেষ্টা করে ; বা যখন তারা অনুসন্ধান আর ব্যাখ্যা করেন ‌জীবনের আসল প্রকৃতিটিকে, তখনই তাদের হয়রানি আর কন্ঠরোধ করা হয়, অপমান, জোর খাটানো হয়,  এমনকি  ভয় দেখানো হয় চাকরীচ্যুতির। অন্ততপক্ষে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের অপচয় হয় মু্ল্যবান সময়। ছাত্রছাত্রীদের বাবা মার কাছ থেকে ভয়ঙ্কর চিঠি পাবার সম্ভাবনা থাকে তাদের, সহ্য করতে হয় মগজ ধোলাই করা ছেলেমেয়েদের মুখে শ্লেষাত্মক বা ব্যাঙ্গাত্মক নির্বোধের হাসি। রাজ্য-সরকারের সরবরাহ করা পাঠ্যপুস্তক তাদের পড়াতে হয়, যেখানে বিবর্তন শব্দটাকেই পদ্ধতিগত ভাবে বাদ দেয়া হয়েছে অথবা অনুপযুক্ত শব্দ সম্পাদনার মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হয়েছে ’সময়ের সাথে পরিবর্তন’ দ্বারা। এক সময় আমরা এসব শুধু যুক্তরাষ্ট্রতে সম্ভব বলে হাসতাম, কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের শিক্ষকদের একই সমস্যার সামনে দাড়‌াতে হচ্ছে। আংশিকভাবে এর কারন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, কিন্তু বিশেষভাবে এর কারন শ্রেনীকক্ষে ক্রমবর্ধমান ইসলামী উপস্থিতি -‍বহুজাতিক সংস্কৃতির প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার দায়বদ্ধতা এবং বর্ণবাদী হিসাবে চিহ্নিত হবার শঙ্কায় যা আরো উৎসাহিত হয়।

প্রায়ই এবং সঠিকভাবেই বলা হয় যে, অনেক অভিজ্ঞ ধর্মযাজক ‍এবং ধর্মতত্ত্ববিদদের বিবর্তন নিয়ে কোন সমস্যা নেই এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা সক্রিয়ভাবে এব্যাপারে বিজ্ঞানীদের সহায়তাও করেছেন। এটা অনেক সময় যে সত্য, তৎকালীন অক্সফোর্ডের বিশপ ‍এবং বর্তমানে লর্ড হ্যারিস এর সাথে দুই বার কাজ করার অভিজ্ঞতা সেটাই প্রমান করে। ২০০৪ সালে আমরা যৌথভাবে দৈনিক সানডে টাইমস এ একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম, যার শেষ শব্দগুলো ছিল:’ বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে আর কোন বিতর্ক নেই; বিবর্তন একটি প্রমানিত সত্য। এবং খৃষ্টীয় দৃষ্টিভঙ্গী থেকে,ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠতম একটি কাজ। শেষ বাক্যটি লিখেছিলেন রিচার্ড হ্যারিস, কিন্তু আমরা দুজনে প্রবন্ধটির বাকী অংশগুলোতে একমত ছিলাম। দুই বছর আগে বিশপ হ্যারিস আর আমি যৌথভাবে তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী টনি ব্লেয়ার কে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠিও লিখেছিলাম। যার কিছু অংশ নীচে উল্লেখ করা হল:

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

বিজ্ঞানী এবং বিশপদের একটি সম্মিলিত দলের পক্ষ থেকে আমরা লিখছি, গেটসহেডের ইমানুয়েল সিটি টেকনোলজী কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা প্রদান সংক্রান্ত বিষয়ে আমাদের উদ্বেগ প্রকাশ করার লক্ষ্যে।

বিবর্তন একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব যার ব্যাখ্যা করার একটি বিশাল ক্ষমতা আছে,এবং অনেকগুলো ক্ষেত্রেই শুধু বিবর্তনই পারে নানা ধরনের বিষয়ের কার্য্যকারনকে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে। সুস্পষ্ট প্রমানের ‍উপর ভিত্তি করে বিবর্তনকে আরো পরিশীলিত,নিশ্চিৎকরণ এমনকি বড় আকারের পরিবর্তন করাও সম্ভব। কলেজটির মুখপাত্র যা দাবী করছেন,বিবর্তন কোন ’বিশ্বাসভিত্তিক অবস্থান’ নয়,যা কিনা বাইবেলে বর্নিত সৃষ্টি কাহিনী, যার একটি ভিন্ন কারন ও উদ্দেশ্য আছে, তার সাথে একই কাতারে স্থাপন করা যায়।

বর্তমানে একটি কলেজে যা পড়ানো হচ্ছে বিষয়টি কিন্তু তার চেয়ে ব্যাপক। এইসব প্রস্তাবিত নতুন প্রজন্মের বিশ্বাস ভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কি পড়ানো হবে বা কিভাবে পড়ানো হবে তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি ইমানুয়েল সিটি টেকনোলজী কলেজসহ, এধরনের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচী কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে, যাতে বিজ্ঞান এবং ধর্ম শিক্ষা, এই পৃথক বিষয়গুলো তাদের প্রাপ্য গুরুত্ব পায়।

একান্ত আপনার,

রেভারেন্ড রিচার্ড হ্যারিস, অক্সফোর্ড এর বিশপ; স্যার ডেভিড অ্যাটেনব্যুরো এফ আর এস;রেভারেন্ড ক্রিস্টোফার হার্বার্ট, সেন্ট অ্যালবান এর বিশপ;অক্সফোর্ড এর লর্ড মে,রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি;অধ্যাপক জন এনডার্বি,রয়্যাল সোসাইটির ফিসিক্যাল সেক্রেটারী;রেভারেন্ড জন অলিভার,হেয়ারফোর্ড এর বিশপ;রেভারেন্ড মার্ক স্যান্টার, বার্মিংহাম এর বিশপ;স্যার নীল শালমার্স,ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের পরিচালক;রেভারেন্ড থমাস বাটলার, সাউথওয়ার্ক এর বিশপ;স্যার মার্টিন রীস,এফ আর এস, অ্যাস্ট্রোনোমার রয়্যাল;পরিচালক;রেভারেন্ড কেনেথ স্টিভেনসন, পোর্টসমাউথ এর বিশপ;অধ্যাপক প্যাট্রিক বেটসন,এফআরএস, সোসাইটির বায়োলজীক্যাল সেক্রেটারী;রেভারেন্ড ক্রিস্পিয়ান হলিস,পোর্টসমাউথের ক্যাথলিক বিশপ,স্যার রিচার্ড সাউথউড এফ আর এস; স্যার ফ্রান্সিস গ্রাহাম-স্মিথ,এফ আর এস,রয়্যাল সোসাইটির প্রাক্তন ফিসিক্যাল সেক্রেটারী,অধ্যাপক রিচার্ড ডকিন্স এফআরএস।

বিশপ হ্যারিস এবং আমি খুব তাড়াহুড়া করে এই চিঠিটি প্রস্তুত করেছিলাম। আমার যতটুকু মনে পরে যাদের কাছে স্বাক্ষর চাওয়া হয়েছিল, তাদের  ১০০ শতাংশই এই উদ্যোগে সাড়া দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের এবং ধর্মযাজক বিশপদের মধ্যে এই চিঠি বিষয় বস্তু নিয়ে কোন ধরনের মতবিরোধ হয়নি।

ক্যান্টারবারীর আর্চ বিশপেরও বিবর্তন নিয়ে কোন সমস্যা নেই, পোপেরও নেই ( যদি সঠিক কোন প্রত্নতাত্ত্বিক সন্ধিক্ষনে মানুষের আত্মা বিবর্তন প্রক্রিয়ায় প্রবিষ্ট হয়েছে সে বিষয়ে কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত বিষয়ে তার মতামতকে আমলে না নিলে);শিক্ষিত ধর্মযাজক কিংবা ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপকদেরও এ বিষয়ে তেমন কোন দ্বিমত নেই।

বিবর্তন যে একটি ফ্যাক্ট এই বইটি তার স্বপক্ষে প্রমান বিষয়ক। এই বইটির ধর্ম বিরোধী কোন প্রচারনার উদ্দেশ্য নেই। আমি তা করেছি আগে,সেটা আরেকটি টি শার্ট, সেই টি শার্টটি এখানে আবার পরার কোন কারন দেখছি না। যে সব বিশপ বা ধর্মতাত্ত্বিকরা বিবর্তনের প্রমানগুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন তার এর বিরুদ্ধতা করার সংগ্রামও পরিত্যাগ করেছেন। কেউ কেউ হয়তো অনিচ্ছা সত্ত্বে কাজটা করেছে; কেই অতি আগ্রহের সাথে যেমন রিচার্ড হ্যারিস;কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ বিষয়ে সামান্যতম অবহিত নয় এমন কেউ ছাড়া ,সবাই বাধ্য হয়েছে বিবর্তনের সত্যতাকে মেনে নিতে। তারা হয়ত ভাবতে পারেন প্রক্রিয়াটা শুরু করার ক্ষেত্রে ঈশ্বরের হাত আছে এবং এর পরবর্তী অগ্রগতি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে আর কোন ভুমিকা রাখেননি; কিংবা সম্ভবত ভাবতে পারেন যে,ঈশ্বর এই মহাবিশ্বের সুচনা করেছেন এবং এর জন্মলগ্ন থেকে একে বৈশিষ্টময় করেছেন একগুচ্ছ পরস্পর সম্পুরক আইন এবং ফিজিক্যাল কনস্ট্যান্ট বা ভৌত ধ্রুব পরিমাপ গননা করেছেন কোন এক দুর্বোধ্য রহস্যময় উদ্দেশ্যে যে অবশেষে এখানে আমরা  কোন ভুমিকা পালন করবো। কিন্তু কোন ক্ষেত্রে অসন্তোষের সাথে, কখনো আনন্দের সাথে সকল চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী চার্চগামী পুরুষ ও নারীরা বিবর্তনের স্বপক্ষে প্রমান মেনে নিয়েছে। কিন্তু আমাদের অবশ্যই আত্মতুষ্ট হয়ে ভাবার অবকাশ নেই যে, বিশপ বা শিক্ষিত যাজকদের অনেকে বিবর্তন মেনে নিয়েছে বলে গীর্জায় তাদের নিয়মিত উপাসকবৃন্দরাও তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু হায়! আমি এই বই এর পরিশিষ্টে উল্লেখ করেছি, মতামত জরিপের ফলাফলে বিষয়ের বিপক্ষে যথেষ্ঠ পরিমান প্রমান আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ শতাংশর বেশী নাগরিকরা স্বীকার করেন না যে মানুষ অন্য প্রানী থেকে বিবর্তিত হয়েছে এবং মনে করে আমরা-এবং সেই সুত্রে সকল জীব-গত ১০০০০ বছরে ঈশ্বর কর্তৃক সৃষ্ট হয়েছি। যুক্তরাজ্যে এই সংখ্যা অবশ্য এরকম বেশী নয়, কিন্তু তারপরও চিন্তায় ফেলার মত যথেষ্ট বেশী। এবং এটা যেমন চার্চ কর্তৃপক্ষের জন্য চিন্তার বিষয় তেমনই বিজ্ঞানীদের কাছেও তাই। এই বইটি সেজন্য প্রয়োজনীয়। আমি এর পরে এই বইয়ে ’ইতিহাস অস্বীকারকারী’ শব্দটি  ব্যবহার করবো, সেই সব মানুষের জন্য, যারা বিবর্তনকে অস্বীকার করে: যারা মনে করে পৃথিবীর বয়স পরিমাপ করা সম্ভব হাজার মিলিয়ন বছরে না, কয়েক হাজার বছরে এবং যারা বিশ্বাস করে মানুষ এবং ডায়নোসররা একই সাথে বেচে ছিল। আবার বলতে হচ্ছে এমন মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। এই সংখ্যা কোন কোন দেশে এর চেয়ে বেশী, কোথাও কম, কিন্তু ৪০ শতাংশ একটি গ্রহনযোগ্য গড় এবং এই বইটিতে মাঝে মাঝে আমি ইতিহাস অস্বীকারকারীদের ”৪০ শতাংশবাদী” হিসাবে ‍উল্লেখ করবো।

থিওরী( বা তত্ত্ব) কি? ফ্যাক্ট (বাস্তব সত্য বা সত্য হিসাবে বিদিত বা গৃহীত কিছু) কি?

বিজ্ঞান আলোকপ্রাপ্ত বিশপ এবং ধর্মতাত্ত্বিকদের প্রসঙ্গে ফিরে আসি, খুব ভালো হত যদি তারা এই বিজ্ঞান বিরোধী মুর্খতা যা তারা ঘৃণা করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে খানিকটা বেশী শ্রম দিতেন। অনেক যাজক, যারা বিবর্তনকে সত্য মানেন বা আদম কিংবা হাওয়ার কোন দিন অস্তিত্ব ছিলনা মানেন, তারপর চার্চের পালপিটে খুবই আনন্দের সাথে তাদের সার্মনে আদম হাওয়া সংক্রান্ত নৈতিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ে মতামত প্রদান করেন একবারো উল্লেখ না করে যে, অবশ্যই আদম হাওয়ার কোনদিনও অস্তিত্বই ছিল না। যদি চ্যালেন্জ্ঞ করা হয় তারা হয়ত প্রতিবাদ করে বলবেন যে, তাদের এধরনের বক্তব্যেরে উদ্দেশ্য শুধুমাত্র রুপকার্থে ব্যবহৃত,হয়ত তা ’আদি ও মুল পাপ’ বা ’নিষ্পাপ থাকার সৎগুন’ ইত্যাদির সাথে সংশ্লিষ্ট। তারা হয়তো লজ্জিত হয়ে যোগ করতে পারেন, অবশ্যই কেউ নিশ্চয়ই এত বোকা নন, যে তাদের কথা আক্ষরিক অর্থে মেনে নেবেন, কিন্তু আসলে কি তাদের চার্চের অনুগামীরা সেটা জানেন? কেমন করে একজন মানুষ, যে পিউতে বা প্রার্থনা করার চাদরে দাড়িয়ে বুঝবে ধর্মগ্রন্থের কোন অংশটিকে তারা আক্ষরিক অর্থে গ্রহন করবেন আর কোনটিকে রুপকার্থে? অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত চার্চ গমনকারীদের পক্ষে বিষয়টি অনুমান করতে পারা কি আসলে সহজ? বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে উত্তরটি হচ্ছে না,দ্বিধান্বিত বা সংশয়গ্রস্থ হওয়াটার জন্য যে কেউ ক্ষমা পেতে পারেন। আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে অ্যাপেনডিক্সে দেখুন। বিশপগন, বিষয়টি নিয়ে ভাবুন, ভাইকারগন, সতর্ক হোন। আপনারা ডায়নামাইট নিয়ে খেলছেন। একটা ভুল ধারনাকে তোষন করার ফলাফল কেবল বিস্ফোরনের জন্য অপেক্ষা করা।অনেকেই হয়তো বলতে পারেন আগাম প্রতিহত না করলে এমনটাই হতে বাধ্য। সুতরাং জনসমক্ষে বক্তব্য দেবার সময় আপনাদের হ্যা যেন হ্যা আর না যেন না হয়, সে বিষয়ে আপনাদের কি আরো একটু বেশী সতর্ক হওয়া উচিৎ নয় কি? নিন্দনীয় অবস্থানে পতিত হবার সম্ভাবনা থেকে রক্ষা পেতে আপনাদের কি একটু অতিরিক্ত দায়িত্ব নেয়া উচিৎ নয় কি, যেমন ইতিমধ্যে সর্বত্র বিস্তৃত জনপ্রিয় ভুল ধারনাগুলো প্রতিহত করা এবং বিজ্ঞানী এবং বিজ্ঞান শিক্ষকদের উৎসাহের সাথে সহযোগিতা করা?

এই বইটির মাধ্যমে আমি যাদের কাছে পৌছানোর চেষ্টা করছি তাদের মধ্যে ইতিহাস অস্বীকারকারীরাও আছেন, কিন্তু হয়তো আরো গুরুত্বপুর্ণ যে কাজটি আমি করতে চেয়েছি তা হলো ইতিহাস অস্বীকারকারী নয় যারা,তাদেরকে প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্তে স্বশস্ত্র করে তোলা।কারন তারা নিজেরা ইতিহাস অস্বীকার না করলেও হয়তো এমন অনেককেই চেনেন, তাদের পরিবারে বা চার্চে এবং এ বিষয়ে কোন বিতর্ক করতে গেলে তারা হয়তো নিজেদের যথেষ্ট প্রস্তুত মনে করেননা।

বিবর্তন হচ্ছে একটি ফ্যাক্ট বা বাস্তব সত্য। যে কোন যৌক্তিক সন্দেহের উর্ধে, যেকোন গভীর সন্দেহর উর্ধে, কোন সুস্থ্, অবগত এবং বুদ্ধিমান সন্দেহের ‍উর্ধে,যে কোন ধরনের সন্দেহের উর্ধে বিবর্তন একটি বাস্তব সত্য। হলোকষ্টের স্বপক্ষে যেমন জোরালো প্রমান আছে বিবর্তনের স্বপক্ষেও তেমনই জোরালো প্রমান বিদ্যমান,এমন কি যদি হলোকষ্টের স্বপক্ষে চাক্ষুষ প্রমানও এর সাথে যোগ করা হয়। এটা এখন সুষ্পষ্ট সত্য যে আমরা শিম্পান্জিদের নিকটাআত্মীয়, হয়তো কিছুটা দুরের আত্মীয় বানরদের,আর্ডভার্ক বা ম্যানিতিদের আরো খানিকটা দুরের আত্মীয়, আরো দুরের আত্মীয় কলা এবং শালগমদের.. ক্রমশঃ যত ইচ্ছা দীর্ঘ করা যেতে পারে এই তালিকা।

এটা কিন্তু  সত্য হবার কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না, এটা প্রমানের অপেক্ষা রাখে না এমন কোন সত্য বা কোন সত্যের অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তিও নয় বা অবশ্য সত্যি কোন বিষয় ছিল না এবং একটা সময় ছিল, যখন বেশীর ভাগ মানু্ষই এমনকি শিক্ষিত মানুষরাও ভাবতেন এটা সত্য হতে পারেনা। এটাকে সত্য হতে হবে এমন কোন বাধ্যবাকতা ছিল না কিন্তু সেটাই হয়েছে। আমরা জানি কারন, অসংখ্য প্রমানের মহাপ্লাবন এর স্বপক্ষে প্রমান দিচ্ছে। বিবর্তন তাই বাস্তব সত্য এবং এই বইটি সেটাই প্রদর্শন করবে। কোন সন্মানিত বিজ্ঞানী এ বিষয়টিতে আর দ্বিমত পোষন করেননা এবং কোন পক্ষপাতহীন পাঠক এটা সন্দেহ করে বইটি বন্ধ করে রাখবেন না।

তাহলে কেন আমরা একে ডারউইনের ’বিবর্তন তত্ত্ব বা থিওরী’ হিসাবে উল্লেখ করি। যা মিথ্যা একটি স্বস্তি দিয়েছে সৃষ্টিবাদীদের দ্বারা প্ররোচিতদের -ইতিহাস অস্বীকারকারী, ৪০ শতাংশ ভুক্তদের, যারা মনে করে তত্ত্ব বা থিওরী শব্দটা এক ধরনের হার স্বীকার করে নেয়া, যা তাদেরকে  দিয়েছে এক ধরনের পুরষ্কার বা বিজয়?

থিওরী( বা তত্ত্ব) কি? ফ্যাক্ট (বাস্তব সত্য বা সত্য হিসাবে বিদিত বা গৃহীত কিছু) কি?

শুধুমাত্র  একটি থিওরী বা তত্ত্ব? তাহলে দেখা যাক ’থিওরী বা তত্ত্ব’ বলতে কি বোঝায়। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারী থিওরী (Theory) বোঝাতে দুটি অর্থ ব্যবহার করেছে (প্রকৃতপক্ষে আরো বেশী,কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য এই  দুটি সংজ্ঞাই মুলত: প্রাসঙ্গিক)।

থিওরী – অর্থ ১ –প্রথম অর্থ:এক গুচ্ছ ফ্যাক্ট বা সত্য কিংবা ফেনোমেনা বা ইন্দ্রিয়গোচর কোন বস্তু বা বিষয়কে ব্যাখ্যা দেবার জন্য বা এর কারন নির্দেশনাকারী হিসাবে গৃহীত সুবিন্যস্ত বা প্রণালীবদ্ধ ধারনা বা বক্তব্য সমুহ। একটি হাইপোথিসিস বা প্রকল্প যা প্রমানিত হয়েছে বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পর্যবেক্ষন  এবং পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে এবং  জ্ঞাত কোন সত্যর কারন হিসাবে বিবেচনার জন্য প্রস্থাপিত বা গৃহীত হয়েছে। কোন কিছু জ্ঞাত বা যা পর্যবেক্ষিত হয়েছে তার কারন, মুল নীতি বা সাধারন নিয়ম কানুন সংক্রান্ত কোন বক্তব্য।

থিওরী –অর্থ ২-দ্বিতীয় অর্থ:ব্যাখ্যা দানকারী হিসাবে প্রস্তাবিত হাইপোথিসিস বা প্রকল্প;সেহেতু শুধুমাত্রই একটি হাইপোথিসিস,ধারনা,অনুমান;কোন বিষয়েএকটি বা একগুচ্ছ ধারনা;একটি একক দৃষ্টিভঙ্গী বা ধারনা।

স্পষ্টতই দুটি শব্দের অর্থের মধ্যে পার্থক্য অনেক।বিবর্তন তত্ত্ব বা থিওরী সম্বন্ধে করা আমার আগের প্রশ্নটির সংক্ষিপ্ত উত্তর হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা প্রথম অর্থেই এর সংজ্ঞাটি ব্যবহার করেন এবং সৃষ্টিবাদীরা –হয়তো চালাকী করে কিংবা হয়তো আন্তরিকভাবেই দ্বিতীয় সংজ্ঞাটিকে পছন্দ করেন এর অর্থ বোঝাতে।১ নং ধারনা অর্থে, কোন থিওরীর ভালো একটি উদহারন হতে পারে,হেলিওসেন্ট্রিক বা সুর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব,যা বলছে সুর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহগুলো নিজ কক্ষপথে প্রদক্ষিন করছে। থিওরী সংজ্ঞার প্রথম অর্থটির ধারনার সাথে বিবর্তন তত্ত্বও পুরোপুরিভাবে সামন্জষ্যপুর্ণ। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব আসলেই,’সুবিন্যস্ত বা প্রণালীবদ্ধ ধারনা বা বক্তব্য সমুহ’; এবং এটি ব্যাখ্যা করে সুবিশাল ‘এক গুচ্ছ ফ্যাক্ট বা সত্য কিংবা ফেনোমেনা বা ইন্দ্রিয়গোচর কোন বস্তু বা বিষয়কে’; এবং এটি ‘একটি হাইপোথিসিস যা প্রমানিত হয়েছে বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পর্যবেক্ষন  এবং পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে’ এবং ব্যপকভাবেই তা অবগত সম্মতির উপর ভিত্তি করে; এবং এটি ‘কোন কিছু জ্ঞাত বা যা পর্যবেক্ষিত হয়েছে তার কারন, মুল নীতি বা সাধারন নিয়ম কানুন সংক্রান্ত কোন বক্তব্য’; সুতরাং এটি অবশ্যই ‘শুধুমাত্র হাইপোথিসিস বা কল্পনাপ্রসুত কোন ধারনা বা অনুমান’থেকে অবশ্যই অনেক বেশী ভিন্ন। বিজ্ঞানী এবং সৃষ্টিবাদী রা থিওরী ‍বা তত্ত্ব শব্দটি বুঝছেন ভিন্ন ভিন্ন অর্থে।বিবর্তন একটি থিওরী বা তত্ত্ব সেই অর্থেই যে অর্থে হেলিওসেন্ট্রিক থিওরী যেমন একটি থিওরী বা তত্ত্ব।এদের কোনটির ক্ষেত্রেই ’শুধুমাত্র’ শব্দটি ব্যবহার করা উচিৎ না যেমন ’শুধুমাত্র একটি থিওরী বা তত্ত্ব’।

বিবর্তন কখনোই ’প্রমানিত’ হয়নি এমন দা্বী ক্ষেত্রে, প্রমান হচ্ছে এমন একটা ধারনা যা বিজ্ঞানীদের প্রায় জোরপুর্বক বাধ্য করা হয়েছে সাধারনত: অবিশ্বাস করতে। প্রভাবশালী দার্শনিকরা আমাদের বলে থাকেন,বিজ্ঞানে কোন কিছুকেই আমরা প্রমান করতে পারবোনা।প্রমান করতে পারেন শুধু গনিতজ্ঞরাই -একটা কঠোর দৃষ্টিভঙ্গী দাবী অনুযায়ী-একমাত্র তারাই পারেন কোন কিছুকে প্রমান করতে,কিন্তু বিজ্ঞানীরা তাদের পক্ষে সর্ব্বোচ্চ যা করতে পারেন, তা হলো কোন কিছু অ-প্রমানিত করার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হতে এবং এই কাজ করতে যে তারা যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন সেটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিতে। এমন কি বিতর্কের উর্ধে যে তত্ত্ব, চাদ সুর্য থেকে আকারে ছোট এই বিষয়টিও কোন কোন দার্শনিকদের সন্তুষ্টি অনুযায়ী প্রমান করা সম্ভব না, পিথাগোরাসের থিওরেম বা উপপাদ্যকে যেভাবে প্রমান করা যেতে পারে। কিন্তু সংগৃহীত প্রমানের সুবিশাল ভান্ডার দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে যে তত্ত্বকে,তাকে ফ্যাক্ট বা সত্য না বলে অস্বীকার করাটা পুথিগত পন্ডিত ছাড়া আর সবার কাছেই হাস্যকর। বিবর্তনের ক্ষেত্রেও এটি সত্য। পারি ( প্যারিস) উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত এটি যেমন একটি ফ্যাক্ট যে অর্থে বিবর্তনও সেই অর্থে একটি ফ্যাক্ট। যদিও লজিক-চপাররা ( যারা বিশেষ করে দ্ব্যর্থবোধক কোন বিষয়ের বিতর্কে অস্পষ্ট, বিভ্রান্তিকর এবং আপাতদৃষ্টিতে সত্য বলে মনে হয় এমন যুক্তি প্রস্তাবনা করেন) শহর রাজত্ব করে,কিছু থিওরী বুদ্ধিগ্রাহ্য সব সন্দেহের উর্ধে,যাদের আমরা ফ্যাক্ট  বলি। যত বেশী উৎসাহ উদ্দীপনা আর বিস্তারিত ভাবে কোন তত্ত্বকে অপ্রমানিত করার চেষ্টা হয় আর সেই আক্রমন, তত্ত্বটি সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করে তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারে, সাধারন কান্ড জ্ঞান খুশি মনে যাকে সত্য বা ফ্যাক্ট বলে, তত্ত্বটি ততই তার (ফ্যাক্ট) কাছাকাছি পৌছে যেতে থাকে।

আমি  থিওরী অর্থ ১ এবং থিওরী অর্থ ২ ব্যবহার করে যেতে পারি এই আলোচনায়।কিন্তু সংখ্যা সহজে মনে রাখা যায় না, আমার প্রতিশব্দ প্রয়োজন। থিওরী অর্থ ২ এর জন্য ভালো একটি শব্দ আছে আমাদের। সেটি হলো হাইপোথিসিস (প্রকল্প বা উপপ্রমেয়); সবারই জানা আছে বা বোঝার ক্ষমতা রাখেস যে,’হাইপোথিসিস’ হলো পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য (কিংবা মিথ্যা)প্রমানিত হবার অপেক্ষায় আছে এমন কিছু প্রাথমিকভাবে স্থিরীকৃত বা গৃহীত ধারনা বা প্রস্তাব এবং ঠিক এই পরীক্ষামুলকতাকে ঝেড়ে ফেলেছে বিবর্তন অনেকদিন হলো।কিন্তু ডারউইনের সময়ে এর উপরে চাপানো দায়ভারটি তাকে আজো বহন করতে হচ্ছে। থিওরী অর্থ ১ অপেক্ষাকৃতভাবে কঠিন। ভালো হতো শুধুমাত্র যদি ’থিওরী’ শব্দটি ব্যবহার করা যেত,যেন অর্থ ২ এর কোন অস্তিত্বই নেই। আসলেই থিওরীর অর্থ ২ এর যে অস্তিত্ব থাকা উচিৎ না, এই প্রস্তাবের পক্ষে যথেষ্ট জোরালো যুক্তিও দাড় করানো যেতে পারে। কারন এটি অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর, বিশেষ করে যখন আমাদের কাছে সমার্থক উপযুক্ত হাইপোথিসিস শব্দটি আছে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে থিওরী অর্থ হিসাবে অর্থ ২ টি, সুপ্রচলিত এবং আমরা ডিক্রি জারী একে নিষিদ্ধ ঘোষনা করতে পারিনা। সে কারনে আমি উল্লেখযোগ্য পরিমান, তবে অবশ্যই মার্জনীয়, স্বাধীনতা  ব্যবহার করছি, গনিত থেকে থিওরেম শব্দটি অর্থ ১ এর জন্য ধার করতে। যদিও এই ধার করা শব্দটা প্রতিস্থাপিত শব্দটির সঠিক অর্থ বহন করছেনা, আমরা পরে বিষয়টা বুঝতে পারবো, কিন্তু আমি মনে করি, সংশয় এবং বিভ্রান্ত হবার ঝুকি অপেক্ষা এর উপযোগিতার পাল্লাটা বেশী ভারী। আমার এধরনের আচরণে আহত গনিতবিদদের শান্ত করার প্রচেষ্টা হিসাবে আমি আমার ব্যবহৃত থিওরেম এর বানানটা বদলে নিচ্ছি, থিওরাম  ( Theorem থেকে Theorum) (ভদ্রতার খাতিরে এটিকে ‍উচ্চারন করছি, থিওরাম); প্রথমে, আমি ব্যাখ্যা করে নেই গনিতবিদরা আসলে, সুনির্দিষ্ট কোন গানিতীক অর্থে ’থিওরেম’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন, এবং একই সাথে আমার আগের একটি বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করতে চাই, যে শুধুমাত্র গনিতবিদদেরই কোন কিছু ’প্রমান’ করার লাইসেন্স আছে ( ‍ আইনজীবিদেরও কি নেই? উচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া দাবী সত্ত্বেও)।

একজন গনিতজ্ঞর কাছে, প্রমান হচ্ছে উপসংহারটি, অবশ্যই অ্যাক্সিওম বা স্বতঃসিদ্ধ যে প্রস্তাব সত্য বলে অনুমান করা হয়েছে, সেখান থেকেই ‍আসছে, এই প্রক্রিয়াকেই যৌক্তিক ভাবে প্রদর্শন করা; পিথাগোরাসের থিওরেম অবশ্যই সত্য, যদি আমরা ইউক্লিডের স্বত:সিদ্ধ প্রস্তাব বা অ্যাক্সিওমকে সত্য বলে ধরে নেই, যেমন একটি অ্যাক্সিওম: সমান্তরাল রেখা পরস্পরের সাথে কখনো মিলিত হয় না। হাজার হাজার সমকোনী ত্রিভুজ মেপে দেখতে চায় কেউ যদি চেষ্টা করে একটা সমকোনী ত্রিভুজ খুজে পায় কিনা যা পিথাগোরাসের থিওরেমকে মিথ্যা প্রমান করবে, তাহলে সে অযথাই সময় নষ্ট করবে। পিথাগোরিয়ানরা এটি প্রমান করেছে, যে কেউ তাদের প্রমান করার প্রক্রিয়া ঘেটে দেখতে পারে। এটা প্রমানিত সত্যি। গনিতজ্ঞরা  প্রমানের এই ধারনাটাকে ব্যবহার করেন, কোন ‘থিওরেম’ এবং কোন প্রস্তাবিত ধারনা বা ’কনজেকচার’ এর মধ্যে বিভেদটাকে বোঝাতে এবং  এর সাথে অক্সফোর্ড ইংলিশ অভিধান থিওরী বা তত্ত্বের দই অর্থের মধ্যে যে পার্থক্য করছে, তার সাথে হালকা সাদৃশ্য আছে। ’কনজেকচার’ হলো একটি প্রস্তাব, যা আপাতত সত্য মনে হচ্ছে ঠিকই কিন্তু কখনো এটি প্রমান করা হয়নি। এবং এটি ‘থিওরেম’ হবে তখনই যখনই কেউ এটা প্রমান করবে। একটি বিখ্যাত উদহারন হচ্ছে ’গোল্ডবাখের কনজেকচার’, যা বলছে যে কোন জোড় সংখ্যা (২ এর চেয়ে বড়) দুটি প্রাইম সংখ্যার যোগফল হিসাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। গনিতজ্ঞরা একে ভুল প্রমানিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন, এমন কি ৩০০ হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন মিলিয়ন পর্যন্ত সকল জোড় সংখ্যা পর্যন্ত পরীক্ষা করে। সাধারন জ্ঞান বলছে, একে আনন্দের সাথে ফ্যাক্ট বা সত্য হিসাবে মেনে নেয়া যায়: গোল্ডবাখের ফ্যাক্ট। যাই হোক গনিতবিদের ভাষায় এটা কখনো্ই প্রমানিত হয়নি, এর প্রমানের জন্য অনেক লোভনীয় পুরষ্কার ঘোষনা সত্ত্বেও এবং গনিগজ্ঞরা এক বাক্যেই একে ’থিওরেম’এর মর্যাদায় বসাতে অস্বীকার করেছেন। যদি কেউ এটি প্রমান করতে পারেন তবে এটি গোল্ডবাখের কনজেকচার থেকে উন্নীত হবে গোল্ডবাখের থিওরেমের বা এক্স এর থিওরেমে, ’এক্স’ হচ্ছেন সেই বুদ্ধিমান গনিতজ্ঞ যিনি এটি প্রমান করবেন।

কার্ল সেগান একবার গোল্ডবাখের কনজেকচার এর একটি শ্লেষাত্মক ব্যবহার করেছিলেন, যারা ভীনগ্রহবাসীদের দ্বারা অপহৃত হয়েছেন বলে দাবী করেন এমন দাবীর প্রতি তীর্যক উত্তর দেবার স্বার্থে[১]:

মাঝে মাঝে আমি কারো কারো কাছ থেকে চিঠি পাই যারা ভীনগ্রহবাসীদের সাথে তাদের এখনও যোগাযোগ বা ‘কন্ট্যাক্ট’ আছে বলে দাবী করেন। আমাকে আমন্ত্রন জানানো হয়, তাদেরকে যে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করতে। সেকারনে কয়েক বছর ধরে আমি প্রশ্নের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকাও প্রস্তুত করেছি। মনে রাখতে হবে, ভীনগ্রহবাসীরা আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। সেকারনে আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যেমন, দয়া করে আমাদেরকে ফেরমার শেষ থিওরেম এর একটা সংক্ষিপ্ত প্রমান দিন কিংবা  গোল্ডবাখের কনজেকচার  এর ……. আমি কখনোই আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি। কিন্তু আবার আমি যদি এমন কিছু জিজ্ঞাসা করি, আমাদের কি ভালো হওয়া উচিৎ? আমি সবসময়ই উত্তর পেতাম। যে কোন অস্পষ্ট কিছু, বিশেষ করে প্রচলিত নৈতিক বিচার বিবেচনা সংক্রান্ত কোন কিছু, এই ভীনগ্রহবাসীরা খুবই আনন্দের সাথে তার উত্তর দেয়। কিন্তু যখনই কোন কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করা হয়, একটা সুযোগ নেবার জন্য যে, তারা বাস্তবিকভাবেই সাধারন মানুষ যা জানে তারচেয়ে বেশী কিছু জানে কিনা? তখন শুধু নীরবতা।

ফেরমা’র শেষ থিওরেম, গোল্ডবাখের কনজেকচার এর মতই সংখ্যা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব কেউ এখনো পর্যন্ত যার কোন ব্যতিক্রম কেউ দেখাতে পারেননি। সেই ১৬৩৭ সাল থেকে, এটা প্রমান করা গনিতজ্ঞদের জন্য এক ধরনের হলি গ্রেইল হিসাবে পরিচিত ছিল, যখন পিয়ের দ্য ফেরমা তার পুরোনো গনিত বই এর মার্জিনে রহস্যময়ভাবে লিখেছিলেন, ’সত্যিই আমি এর একটি দারুন প্রমান খুজে পেয়েছি…. বই এর  মার্জিন যা ধারন করার জন্য যথেষ্ট প্রশস্ত না’। ১৯৯৫ সালে  অবশেষে থিওরেমটি প্রমান করেন ইংরেজ গনিতজ্ঞ অ্যান্ড্রু ওয়াইলস। এর আগে বেশ কিছু গনিতবিদ মনে করতেন, একে থিওরেম না বলে কনজেকচারই বলা উচিৎ, কারন ওয়াইলস এর এই সফল প্রমানটির সুবিশাল দৈর্ঘ্য এবং জটিলতা ছাড়াও,  বিংশ শতাব্দীর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্বন্ধে জ্ঞান ও তার ব্যবহারের উপর এই প্রমানের নির্ভরতা পর্যালোচনা করে অনেক গনিতবিদরাই মনে করেন, ফেরমা ( সৎ ভাবেই) সম্ভবত ভুল করে দাবী করেছিল তিনি  এর  প্রমান পেয়েছেন।  এই কাহিনীটা আমি বললাম শুধুমাত্র কনজেকচার এবং একটি থিওরেমের মধ্যে পার্থক্যটা বোঝাতে।

যেমনটা বলছিলাম, আমি গনিতবিদদের এই থিওরেম শব্দটি ধার করবো, কিন্তু আমি এটাকে বানান করছি থিওরাম হিসাবে, গানিতীক থিওরেম থেকে একে আলাদা করে বোঝাতে। একটি বৈজ্ঞানিক থিওরাম, যেমন বিবর্তন বা সুর্যকেন্দ্রীকতা বা হেলিওসেন্ট্রিজম হচ্ছে একটি তত্ত্ব যা অক্সফোর্ড অভিধানের, থিওরী অর্থ ১ এর সাথে সবচেয়ে বেশী মানানসই।

(এটি) প্রমানিত হয়েছে বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পর্যবেক্ষন  এবং পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে এবং  জ্ঞাত কোন সত্যর কারন হিসাবে বিবেচনার জন্য প্রস্থাপিত বা গৃহীত হয়েছে। কোন কিছু জ্ঞাত বা যা পর্যবেক্ষিত হয়েছে তার কারন, মুলনীতি বা সাধারন নিয়ম কানুন সংক্রান্ত কোন বক্তব্য।

কোন গানিতীক থিওরেম যেমন করে প্রমান করা হয়, একটি বৈজ্ঞানিক থিওরাম সেভাবে প্রমান করা হয়না এবং করাও যায় না। কিন্তু সাধারন জ্ঞান এটিকে ফ্যাক্ট বা বাস্তব সত্য বলেই চিহ্নিত করে, সেই একই অর্থে, যেমন যে অর্থে পৃথিবী গোলাকার, সমতল না এমন ’‘থিওরী’ বা তত্ত্ব যেমন একটি ফ্যাক্ট এবং সবুজ গাছ সুর্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে এই ’থিওরী’ টি যেমন একটি ফ্যাক্ট। সবগুলোই হচ্ছে বৈজ্ঞানিক থিওরাম: বিশাল সংখ্যক প্রমান এর স্বপক্ষে, অবগত যে কোন পর্যবেক্ষকই যা মেনে নিয়েছেন। সাধারন যে কোন অর্থেই বিতর্কাতীত একটি সত্য বা ফ্যাক্ট।  আর যে কোন সত্যের মতই আমরা যদি বিষয়টি নিয়ে পুথিগত ‍বিদ্যার পন্ডিতি করি, তবে এটি অনস্বীকার্য ভাবেই সম্ভব যে, আমাদের পরিমাপের সব যন্ত্রগুলো এবং আমাদের অনুভব করার অঙ্গ বা ইন্দ্রিয় যা দিয়ে আমরা এদের পরিমাপ পড়ি, এগুলো সব একটা সুবিশাল কনফিডেন্স ট্রিক বা আত্মবিশ্বাসের ধোকাবাজীর শিকার। যেমনটি বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, ‘হতে পারে আমাদের সবাই অস্তিত্ব লাভ করেছি মাত্র পাচ মিনিট আগেই , পুর্বপ্রস্তুত তাৎক্ষনিকভাবে ব্যবহারযোগ্য স্মৃতি, ছিদ্র হওয়া মোজা এবং কাটার প্রয়োজন ছিল এমন চুল সহ” [২] ;বর্তমানে যে পরিমান প্রমান সংগৃহীত হয়েছে, সেখানে বিবর্তনের ফ্যাক্ট বা সত্য ছাড়া  অন্য কিছু হবার সম্ভাবনার জন্যও প্রয়োজন সৃষ্টিকর্তার একই রকমের বিশাল একটি আত্মবিশ্বাসের ধোকাবাজীর, খুব কম ঈশ্বরবাদীই যা মানতে রাজী হবেন।

এবার সময় এসেছে ‘’’ফ্যাক্ট’ এর আভিধানিক অর্থটা পরীক্ষা করে দেখার। অক্সফোর্ড ইংলিশ অভিধান যা বলছে ( আবারও একাধিক সংজ্ঞা, যেখানে একটি প্রাসঙ্গিক):

ফ্যাক্ট: এমন কিছু যা সত্যিই ঘটেছে বা বাস্তবিকভাবেই এটাই সেই বিষয়;এমন কিছু যা নিশ্চিৎভাবে জানা আছে এই প্রকৃতির;অতএব একটি নির্দিষ্ট সত্য যা প্রকৃত পর্যবেক্ষনের বা খাটি স্বাক্ষ্যপ্রমানের মাধ্যমে প্রাপ্ত;যা শুধুমাত্র অনুমানসিদ্ধ কোন কিছু, বা ধারনা কিংবা কাহিনীর সম্পুর্ন বীপরিত;একটি অভিজ্ঞতালব্ধ উপাত্ত,যা কিনা এর উপর নির্ভর করে কোন ধারনা করা উপসংহারগুলোর থেকে পৃথক।

লক্ষ্য করুন,থিওরাম এর মত,ফ্যাক্ট এই অর্থে প্রমানিত গানীতিক থিওরেম এর মত কোন অনমনীয় অবস্থানে নেই,;গানিতীক থিওরেম, একগুচ্ছ ধরে নেয়া অ্যাক্সিওম বা স্বতঃসিদ্ধ ধারনা থেকেই অবধারিতভাবে আসছে। এছাড়া ’সত্যিকারের পর্যবেক্ষন’ এবং ’খাটি স্বাক্ষ্যপ্রমান’ ভয়ঙ্করভাবে ভ্রমপ্রবন হতে পারে এবং বিচারের আদালতে অযোগ্যভাবেই বাড়তি মর্যাদাপ্রাপ্ত।  বেশ কিছু মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষা এ বিষয়ে আমাদের বিস্ময়কর সব উদহারন দিয়েছে,যা বিচারকার্যে বসা যে কোন জুরির কোন স্বাক্ষীর ‘চাক্ষুষ প্রমানের’ প্রতি বাড়তি মর্যাদা দেয়ার ব্যপারে চিন্তায় ফেলে দেবে। ইলিনোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ডানিয়েল জে সিমন্স এ বিষয়ে একটি বিখ্যাত উদহারন প্রস্তুত করেছিলেন,ছয় জন তরুন তরুনী গোল করে দাড় করিয়ে পরস্পরের দিকে ছোড়ার জন্য একজোড়া বাস্কেটবল দেয়া হয়েছিল, মুলত: বলটি তারা নিজেদের মধ্যে আদান প্রদান করবে,এই বিষয়টি নিয়ে ২৫ সেকেন্ড এর একটি ভিডিও তৈরী করা হয় [৩]; এবং আমরা,যারা পরীক্ষায় অংশগ্রহনকারী,তাদেরকে এই ফিল্মটি দেখানো হয়। যারা খেলছিল তারা বৃত্ত থেকে বের হচ্ছিল আবার ঢুকছিল. এছাড়াও নিজেদের মধ্যে জায়গাও পরিবর্তন করেছে বল ছুড়ে দিতে দিতে বা ধরতে ধরতে। সুতরাং দৃশ্যটি বেশ জটিল হয়ে ওঠে একসময়। এটি দেখানোর আগে দর্শকদের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়, একটি কাজ করার জন্য যা আমাদের পর্যবেক্ষন ক্ষমতার পরীক্ষা করবে। আমাদেরকে গুনতে হবে মোট কয়বার বলটি একজন থেকে আরেকজনের কাছে ছোড়া হয়েছে। ভিডিওটি দেখা শেষে,সবাই তাদের পর্যবেক্ষন করা আনুমানিক একটি মোট সংখ্যা সবাই লিখে দেয়,কিন্তু- দর্শকদের জানা ছিলনা,এটাই আসল পরীক্ষা ছিলনা।

ছবিটি দেখানোর পর,এবং সবার থেকে সংখ্যা জোগাড় করার পর,পরীক্ষক তার আসল বোমাটা ফাটালেন: আপনাদের মধ্যে কয়জন গরিলাটিকে দেখেছেন? বেশীর ভাগ দর্শকই খুব বিস্মিত হয়,কোন উত্তর দিতে পারেননা। এরপর আবার ভিডিওটি দেখানো হয়,এবার দর্শকদের কোন কিছু না গুনতে বলে আরাম করে দেখতে বলেন;দেখা গেল ঠিক ৯ সেকেন্ড এর মাথায় গরিলার স্যুট পরা একজন নির্বিকারভাবে এই তরুনতের বল দেয়া নেয়ার বৃত্তের মধ্যে ঢোকে এবং একটু থেমে ক্যামেরার দিকে তাকায়,বুকে জোরে থাপ্পড় মারে যেন চাক্ষুষ প্রমানের প্রতি একধরনে যু্দ্ধংদেহী ঘৃনা প্রকাশ করছে এবং তার পর ঠিক একই ভাবে ভাবলেশহীন ভাবে বৃত্ত থেকে বের হয়ে যায়। প্রায় নয় সেকেন্ড ধরে এটি দর্শকদের চোখের সামনে ছিল. যা ভিডিওটির এক তৃতীয়াংশ দৈর্ঘ,অথচ বেশীরভাগ দর্শকেই তা দেখেননি; বিচারের আদালতে তারা হলফনামাও দিতে পারতেন গরিলা স্যুট পরা কোন মানুষ সেই ভিডিওতে উপস্থিত ছিল না এবং তারা প্রতিজ্ঞা করে বলতে পারে তারা এই ২৫ সেকেন্ড অতিরিক্ত মনোযোগের সাথে ভিডিওটি দেখেছিরলেন; কারন তারা বল পাস করার সংখ্যাই মনোযোগ দিয়ে গুনছিলেন। এধরনের আরো বেশ কিছু পরীক্ষাও হয়েছে, একই ধরনের ফলাফলও সেখানে পাওয়া গেছে, দর্শকদের যখন সত্যটা জানানো হয়েছে তারা একই ভাবে হতভম্ব হয়েছেন অবিশ্বাসে।’ চাক্ষুশ স্বাক্ষ্যপ্রমান’, ’সত্যিকারের পর্যবেক্ষন’, ’অভিজ্ঞতার একটি উপাত্ত’ সবগুলোই হতাশাজনকভাবে অনির্ভরযোগ্য হতে পারে। এবং অবশ্যই এই আন্তঃপর্যবেক্ষক অনির্ভরযোগ্যতার বিষয়টিকে স্টেজ এ জাদুকরটা ব্যবহার করে তাদের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করার নানা ধরনের পরিকল্পিত কৌশল দিয়ে।


ছবি: আমাদের মধ্যে গরিলা; অসংখ্য মনোবৈজ্ঞানিক পরীক্ষার একটি, অধ্যাপক ড্যানিয়েল জে সিমন্স এর বিখ্যাত গরিলা এক্সপেরিমেন্ট (২০০৫); যা চাক্ষুষ বা আই উইটনেস স্বাক্ষ্যপ্রমানের অনির্ভরযোগ্যতার বিস্ময়কর প্রমান যুগিয়েছে।

ফ্যাক্ট এর আভিধানিক সংজ্ঞা বলছে, ’প্রকৃত পর্যবেক্ষন’ বা ’খাটি স্বাক্ষ্যপ্রমান’, প্রাপ্ত;যা শুধুমাত্র অনুমানসিদ্ধ কোন কিছু, বা ধারনা কিংবা কাহিনীর সম্পুর্ন বীপরিত ( জোর দেয়া হয়েছে এখানে);  এখানে প্রস্তাবিত ’শুধুমাত্র’ শব্দটি ব্যবহার করাটা খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক। কারন সতর্ক অনুমানসিদ্ধ উপসংহার ’প্রকৃত পর্যবেক্ষনের’চেয়ে নির্ভরযোগ্য হতে পারে, এটা মেনে নিতে আমাদের ইনটুইশন বা  স্বজ্ঞা যতই এর বিরোধীতা করুক না কেন। আমি নিজেও হতবাক হয়েছি সিমনস এর ভিডিততে গরিলাকে না দেখতে পারে এবং সত্যি অবিশ্বাস্য লেগেছে যখন দেখেছি ভিডিওতে আসলেই গরিলাটি ছিল। দ্বিতীয়বার দেখার পর খানিকটা বিষন্ন, তবে বুঝতে পেরেছি, আমি আর ভবিষ্যতে কখনোই ‘চাক্ষুষ প্রমান’ এর উপর, পরোক্ষ বৈজ্ঞানিক উপসংহারের চেয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেষ্ঠত্ব আরোপ করতে অতিউৎসাহী হবো না। এই গরিলা ফিল্মটি বা এরকম কিছু হয়তো সব জুরিকে দেখানো উচিৎ যখন তারা রায় নিয়ে ভাববে। সব বিচারককেও তাই করা উচিৎ।

স্বীকার করতেই হবে যে, অনুমান নির্ভর উপসংহার শেষ পর্যন্ত্ আমাদের ইন্দ্রিয়নির্ভর পর্যবেক্ষনের উপর ভিত্তি করেই করতে হয়। যেমন, ডিএনএ অনুক্রম করার মেশিণ থেকে প্রিন্টআউট দেখতে আমাদের চোখকে ব্যবহার করি, কিংবা সেটা হতে পারে বৃহৎ হ্যাড্রন  কোলাইডার এর প্রিন্টআ‌উট। কিন্তু -সব স্বজ্ঞার বীপরিত-কোন একটি অভিযুক্ত ঘটনা ( যেমন কোন হত্যাকান্ড) চাক্ষুষ পর্যবেক্ষিত হয়েছে কিভাবে ঘটেছে, তা কিন্তু এর পরোক্ষ প্রমানের চেয়ে আবশ্যিকভাবে বেশী নির্ভরযোগ্যতা বহন করে না ( যেমন রক্তের দাগের মধ্যে ডিএনএ প্রমান)-ঘটনার উপসংহারে পৌছানোর সুচারুভাবে পরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় যদি এটিকে ব্যবহার করা হয়। ভুল কাউকে শনাক্ত করার সম্ভাবনা বেশী থাকে চাক্ষুষ প্রমানের ক্ষেত্রে, যা ডিএনএ প্রমান থেকে প্রাপ্ত পরোক্ষ উপসংহারের ক্ষেত্রে থাকে না। এবং এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা দরকার, হতাশাজনকভাবে সুদীর্ঘ তালিকা আছে, যারা চাক্ষুষ প্রমানের ভিত্তিতে ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তারা নির্দোষ প্রমানিত হয়ে মুক্তি লাভ করে- কখনো বহু বছর পরে, নতুন ডিএনএ প্রমানের ভিত্তিতে। শুধু টেক্সাসেই ৩৫ জন ভুল ভাবে দোষী সাব্যস্ত মানুষ কোর্টে ডিএনএ প্রমান ‍গৃহীত হবার পর নির্দোষ প্রমানিত হয়, এবং এই সংখ্যা শুধু যারা এখনও বেচে আছে তাদের মধ্যেই [৪]; টেক্সাস যে উৎসাহে এবং দ্রুততার সাথে মৃত্যুদন্ড আইন প্রয়োগ করে ( গভর্নর থাকাকালীন সময়ে জর্জ ডাবলিউ বুশ গড়ে প্রতি পনেরো দিনে একজনের মৃত্যুদন্ডের আদেশে সই করেছেন[৫]), আমরা ধরে নিতে পারি সেই সময়ে যদি ডিএনএ প্রমানের ব্যবস্থা থাকতো, মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর হওয়া আরো অনেকেই হয়তো নির্দোষ প্রমানিত হতেন।

এই বইটি এধরনের অনুমানসিদ্ধ উপসংহার বা ইনফারেন্স গুরুত্বর সাথে বিবেচনা করবে, শুধু অনুমান নির্ভর নয়, বরং সঠিক প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক অনুমানসিদ্ধ উপসংহার। এবং আমি বইটিতে আমি দেখাবো বিবর্তন যে একটি ফ্যাক্ট বা সত্য, এই ইনফারেন্সের বিতর্কাতীত শক্তি। অবশ্যই বিবর্তনীয় পরিবর্তনের সুবিশাল একটি অংশ সরাসরি চাক্ষুষ প্রমানের পর্যবেক্ষনের কাছে অদৃশ্য। এর বেশীর ভাগই ঘটে গেছে যখন আমাদের জন্মই হয়নি। এছাড়াও এর অতি ধীরগতির কারনে কারো সংক্ষিপ্ত জীবনকালে এটি চাক্ষুষ দেখাও সম্ভব না। একই ভাবে আফ্রিকা আর দক্ষিন আমেরিকার ক্রমশ একে অপরের কাছ থেকে অবিশ্রান্তভাবে দুরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়ার বিষয়টি সত্য, এতো ধীরে যা ঘটছে, আমাদের নজরে তা পড়বে না। কন্টিনেন্টাল ড্রিফট এর মতই বিবর্তনের ক্ষেত্রেও ঘটনার পরের উপসংহারই আমাদের কাছে ঘটনার প্রমান বহন করছে, সুস্পষ্ট কারনেই এই ঘটনা ঘটে যাবার আগ পর্যন্ত আমাদের অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু এক ন্যানো সেকেন্ডের জন্যও এই ইনফারেন্সের ক্ষমতাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই। আফ্রিকা এবং দক্ষিন আমেরিকার ধীরে ধীরে এই ব্যবধান বৃদ্ধির ব্যপারটা প্রতিষ্ঠিত একটি সত্য, সাধারন ভাষায় ফ্যাক্ট বলতে যা বোঝায়, তেমনই ফ্যাক্ট হচ্ছে, সজারু আর ডালিমের এবং  আমারা একই সাধারণ বংশের ইতিহাস বহন করছি।

আমরা হচ্ছি সেই গোয়েন্দাদের মত, যারা অপরাধ ঘটে যাবার পরেই অপরাধের ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হন। খুনীর করা অপরাধ ততক্ষনে অতীতের অংশ, গোয়েন্দাদের কোন উপায় থাকেনা আসল ঘটনাকে স্বচক্ষে দেখবার। যাই হোক না কেন, গরিলার সেই ভিডিও পরীক্ষা এবং আরো এরকম কিছু উদহারন আমাদের শিখিয়েছে আমাদের নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে। গোয়েন্দারা যা পায় সেটা হলো ঘটনার কিছু অংশ, যা রয়ে গেছে সেই দৃশ্যে, এবং সেই সব কিছুর উপর অনেকটুকুই ভরসা করা যেতে পারে। সেখানে পায়ের চিহ্ন আছে, হাতের চিহ্ন আছে (এবং ইদানীং ডিএনএ র অনন্য চিহ্নও আছে), রক্তের দাগ, চিঠিপত্র, ডায়েরী।  এটা এবং এটা যদি ইতিহাস হয় তাহলে পৃথিবী যেমনটা হওয়া উচিৎ পৃথিবী তেমন, কিন্তু ওটা এবং ওটা, অন্য ইতিহাস এই বর্তমানকে ব্যাখ্যা করে না।

থিওরী শব্দটির দুটির আভিধানিক অর্থ অসেতুবন্ধনযোগ্য কোন মহাবিভাজন নয়, অনেক ঐতিহাসিক উদহারনই তা প্রমান করে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে থিওরামের জন্ম হয় শুধুমাত্র হাইপোথিসিস দিয়েই। যেমন কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্টে এর তত্ত্ব,  যার যাত্রা শুরু করেছিল বিদ্রুপ আর প্রতিকুলতার মুখে, তবে ধীরে ধীরে সংগ্রামী এবং কষ্টকর পদক্ষেপে এটি থিওরামের মর্যাদা স্পর্শ করেছে, পরিনত হয়েছে বিতর্কের উর্ধে একটি ফ্যাক্টে। দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গীতে এটি কোন কঠিন ব্যপার না। অতীতে কিছু বিশ্বাস করা ধারনা আজ যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত হয়েছে ভ্রান্ত কিন্তু তার মানে এই না যে, আমাদের ভয় করতে হবে ভবিষ্যত প্রমান, আমাদের বর্তমান বিশ্বাসকেও ভুল প্রমান করবে। আমাদের বর্তমান বিশ্বাসগুলোর ঠিক কতটুকু প্রবনতা আছে মিথ্যা হবার, অনেক কিছুর মধ্যে তা নির্ভর করছে, কত মজবুত প্রমানের ভিত্তিতে এখন তা দাড়িয়ে আছে। মানুষ একসময় চিন্তা করেছে, সুর্য পৃথিবীর চেয়ে ছোট, কারন তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমান ছিল না। এখন আমাদের কাছে প্রমান আছে, যা আগে ছিল না, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমান করছে সুর্যের আকারের বিশালতা, এবং আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে পারি, এই প্রমান কখনোই মিথ্যা প্রমানিত হবে না। এটি কোন সাময়িক হাইপোথিসিস না, যা আপাতত: টিকে আছে মিথ্যা প্রমান করতে না পারা ব্যর্থতার উপর। বহু কিছু সম্বন্ধেই আমাদের বর্তমান বিশ্বাসের অনেক কিছুই মিথ্যা প্রমানিত হতে পারে, কিন্তু আমরা পুর্ন আত্মবিশ্বাসের সাথে কিছু নির্দিষ্ট ফ্যাক্ট বা সত্যের তালিকা তৈরী করতে পারবো যা কখনোই মিথ্যা প্রমানিত হবে না। বিবর্তন আর সুর্যকেন্দ্রিকতার তত্ত্ব সেই তালিকায় সবসময় না থাকলেও এখন তারা সেই তালিকায় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে।

জীববিজ্ঞানীরা অনেক সময়ই বিবর্তনের ’ফ্যাক্ট’ ( সকল জীবিত প্রানী সম্পর্কযুক্ত) এবং যে ’ থিওরী বা তত্ত্ব’ বলছে কিভাবে এই প্রক্রিয়াটি চালিত হয় ( সাধারনদ: এটা বলতে তারা বোঝান প্রাকৃতিক নির্বাচন এবং হয়তো এর সাথে প্রতিদ্বন্দী কিছু তত্ত্ব, যেমন লামার্কে ’ব্যবহার এবং অব্যবহার’ তত্ত্ব এবং ’ অর্জিত বৈশিষ্টের  উত্তরাধিকার’ তত্ত্ব) এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করেন।  ডারউইন নিজে কিন্তু দুটিকেই থিওরী হিসাবে ভেবেছিলেন, পরীক্ষামুলক হাইপোথিসিস নির্ভর আনুমানিক ধারনা হিসাবে। কারন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে পাওয়া প্রমান গুলো যথেষ্ট ছিল না এবং তখনও সন্মানিত কোন বৈজ্ঞানি, বিবর্তন আর প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক করতে পারতেন। কিন্তু বর্তমানে একে আর প্রশ্ন করার কোন অবকাশ নেই, বিবর্তনের ফ্যাক্ট নিয়ে আর কোন তর্ক করারও উপায় নেই- এটি এখন একটি থিওরাম বা সুস্পষ্টভাবে সমর্থনপ্রাপ্ত একটি ফ্যাক্ট বা বাস্তব সত্য। এবং এখনও যেখানে ( সামান্য) বিতর্ক করা যেতে পারে, সেটা হলো,  প্রাকৃতিক নির্বাচনই কি এর একমাত্র প্রধান চালিকা শক্তি কিনা ।

ডারউইন তার আত্মজীবনীতে ব্যাখ্যা করেছিলেন[৬], কিভাবে ১৮৩৮ সালে ম্যালথাসের এর ‘অন পপুলেশন’ বইটি, তার ভাষায় ’আনন্দের জন্য’(যদিও ম্যাট রিডলী সন্দেহ করেন,তার ভাই ইরাসমাস এর খুবই বুদ্ধিমান বন্ধু হ্যারিয়েট ম্যার্টিনোর প্রভাবে [৭]) পড়ার সময় প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটি সম্বন্ধে অনুপ্রেরণা লাভ করেন, ’এখানেই অবশেষে আমি একটা তত্ত্ব খুজে পাই, যেটা নিয়ে আমি কাজ করতে পারি’; ডারউইনের কাছে প্রাকৃতিক নির্বাচন ছিল একটা হাইপোথিসিস,যা ঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে,বিবর্তনের ব্যাপারেও তার মতামত ছিল প্রায় একই রকম।যা আজ আমরা বিবর্তনের ফ্যাক্ট বলছি. ১৮৩৮ সালে সেটি ছিল একটি হাইপোথিসিস, যার জন্য প্রমান সংগ্রহের প্রয়োজন ছিল। ১৮৫৯ সালে যখন ডারউইন ’অন দি অরিজিন অব স্পিসিস’ প্রকাশ করেন,তিনি বিবর্তনের স্বপক্ষে যথেষ্ট প্রমান জোগাড় করেছিলেন,যদিও তখনও প্রাকৃতিক নির্বাচন বিষয়টি ফ্যাক্ট এর মর্যাদা পাবার পথ ছিল আরো দীর্ঘতর। আসলেই,এই হাইপোথিসিস থেকে ফ্যাক্টের পর্যায়ে এর উন্নতি করাটাই ডারউ্ইনকে তার বিখ্যাত বইটির প্রায় পুরোটা জুড়েই ব্যস্ত রেখেছিলো। এবং সেই উন্নতির প্রক্রিয়া চলেছে বর্তমান পর্যন্ত, আজ, কোন যুক্তিসঙ্গত মনে আর কোন সন্দেহ অবশেষ থাকেনি এবং বিজ্ঞানীরা কথা বলেছেন,অন্ততপক্ষে অনানুষ্ঠানিকভাবে, বিবর্তনের ’ফ্যাক্ট’ নিয়ে। সব সন্মানিত জীববিজ্ঞানীরাই অবশেষে একমত হন, প্রাকৃতিক নির্বাচন এর সবচেয়ে প্রধান চালিকা শক্তি -যদিও কিছু জীববিজ্ঞানী,অন্যদের চেয়ে যারা খানিকটা বেশী দাবী করেন – এটাই একমাত্র চালিকা শক্তি নয়। এমনকি যদিও বলা হয় এটা একমাত্র চালিকা শক্তি নয়, তবে আমি এখনও খুব সিরিয়াস কোন জীববিজ্ঞানীর দেখা পাইনি,’অ্যডাপটিভ বিবর্তন’ -ক্রমশ ইতিবাচক উৎকর্ষের দিকে যে বিবর্তন -তার জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি বিকল্প প্রক্রিয়াকে তারা ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন।

এই বইয়ের বাকী অংশে,আমি প্রমান দেবার চেষ্টা করবো যে বিবর্তন একটি অনস্বীকার্য ফ্যাক্ট এবং এর বিস্ময়কর ক্ষমতা,সরলতা আর সৌন্দর্যর মাহাত্ম বর্ণনা করবো। বিবর্তন আমাদের ভিতরে,আমাদের চারপাশে,আমাদের পরস্পরের মধ্যে এবং এর কাজ হাজার মিলিয়ন বছরের অতীতের স্বাক্ষী পাথরের মধ্যে গাথা আছে। যেহেতু আমরা এত দীর্ঘ দিন বেচে থাকি না, যে চোখের সামনে বিবর্তনকে ঘটতে দেখবো, এজন্য এই পরিস্থিতিতে ব্যাখ্যার জন্য সেই গোয়েন্দার রুপকটাই পুনব্যবহার করা যেতে পারে,যিনি ঘটনা ঘটার পর ঘটনাস্থলে এসে এ সংক্রান্ত কোন বিষয়ে অনুমানসিদ্ধ একটি উপসংহারে পৌছান ঘটনাস্থলে পাওয়া নানা আলামত পর্যবেক্ষন এবং পরীক্ষা করে। বিজ্ঞানীদের বিবর্তনের ফ্যাক্টের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেবার জন্য যে প্রমানগুলো সহায়তা করেছে, তার পরিমান তুলনামুলকভাবে অনেক বেশী,আরো বেশী নির্ভরযোগ্য এবং যে কোন আইনের আদালতে,যে কোন শতাব্দীতে,কোন অপরাধ প্রতিষ্ঠিত করার কখনো ব্যবহৃত হয়েছে এমন যে কোন ’চাক্ষুষ প্রমান’ এর চেয়েও যা অনেক বেশী বিশ্বাসযোগ্য,আরো বেশী বিতর্কের উর্ধে।

সকল যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের উর্ধে প্রমান? ’যুক্তিসঙ্গত’ সন্দেহ? এটা মনে হয় সবসময়ের জন্যই একটি উনোক্তি।

_________________________________________

[১] ‘Occasionally, I get a letter from someone’: Sagan (1996): 996. The Demon-Haunted World: Science as a Candle in the Dark.
London:  Headline.
[২] ‘We may all have come into existence five minutes ago’: Bertrand Russell, Religion and Science (Oxford: Oxford University Press, 1997), 70.
[৩] A famous example was prepared by Professor Daniel J. Simons at the University of Illinois: Simons and Chabris (1999).
[৪]  The Innocence Project, http://www.innocenceproject.org.
[৫]  ‘Bush’s lethal legacy: more executions’, Independent, 15 Aug.2007
[৬]  Darwin, C. 1887a. The Life and Letters of Charles Darwin, vol. 1. London: John Murray
[৭]  Matt Ridley, ‘The natural order of things’, Spectator, 7 Jan. 2009

Advertisements
শধুই কি একটা তত্ত্ব?

5 thoughts on “শধুই কি একটা তত্ত্ব?

      1. প্রথম ড্রাফট, পুরো চ্যাপটারটা;
        সাধারনত কেউ খু্‌ব একটা আমার লেখা পড়ে না, এই জন্য ছোট খাট ভুলগুলো প্রথমেই ঠিক করতে উৎসাহ পাই না। পরের ড্রাফটগুলায় স্ট্রিমলাইনড করার ইচ্ছা আছে।
        ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s