ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচনকে যাচাই করে দেখার পরীক্ষা:


শীর্ষ ছবি: নিউ ইয়র্ক সিটির ন্যাচারাল হিস্টি মিউজিয়ামের একটি এক্সিবিটের ফটোগ্রাফ : ট্যাক্সিডার্মি র শিল্প এবং বিজ্ঞানী সংগ্রহকারীদের যৌথ প্রচেষ্টার একটি প্রতিচ্ছবি এখানে ইঙ্গিত
দিচ্ছে শুধুমাত্র প্রানী জগতেই বিবর্তন প্রক্রিয়া সৃষ্টি করে অগনিত ফর্মের প্রানীদের। (সুত্র:  ( গ্রান্ট ডেলিন:  সায়েন্টিফিক আমেরিকান, জানুয়ারী ২০০৯);

All these … (edited).. follow from the struggle for life. Owing to this struggle, variations, however slight and from whatever cause proceeding, if they be in any degree profitable to the individuals of a species, in their infinitely complex relations to other organic beings and to their physical conditions of life, will tend to the preservation of such individuals, and will generally be inherited by the offspring. The offspring, also, will thus have a better chance of surviving, for, of the many individuals of any species which are periodically born, but a small number can survive. I have called this principle, by which each slight variation, if useful, is preserved, by the term natural selection. Charles Darwin (Chapter III, On the Origin of Species)

Life results from the non-random survival of randomly varying replicators. Richard Dawkins

শুরুতে: জীববিজ্ঞানীরা যারা এখন সর্বাধুনিক জেনেটিক টুল ব্যবহার করছেন , তারা দেখাতে  সক্ষম হয়েছেন,বেশীর ভাগ বিবর্তন জীববিজ্ঞানীরা যা ধারনা করেছিলেন একসময়,ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন,জীন বিবর্তনে তাদের ধারনার চেয়েও অনেক বেশী ভুমিকা পালন করে। চার্লস ডারউইনের প্রস্তাবিত প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে চালিত বিবর্তন প্রক্রিয়ার তত্ত্বকে -বংশানুক্রমে পাওয়া পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্য যা জীবের বেচে থাকা বা সারভাইভালে ইতিবাচক ভুমিকা রাখে- বেশ কিছু প্রতিদ্বন্দী তত্ত্বের সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে জীববিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করতে গিয়ে। র‌্যানডোম জেনেটিক মিউটেশনগুলো, জীবের বেচে থাকার উপর যাদের প্রভাব নিরপেক্ষ, একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এটাই বেশীর ভাগ আনবিক বা জীন পর্যায়ের পরিবর্তনের জন্য দায়ী।কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষনাগুলো বলছে উপকারী মিউটেশনগুলোর প্রাকৃতিক নির্বাচনের হার অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক বেশী হারেই ঘটে। উদ্ভিদবিদ্যার কিছু জীনতাত্ত্বিক গবেষনা বলছে একটি একক জীনের পরিবর্তনও প্রজাতিদের মধ্যে বিশাল মাপের অ্যাডাপটিভ বা অভিযোজনীয় পার্থক্য সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই লেখাটির এইচ অ্যালেন ওর এর টেস্টিং ন্যাচারাল সিলেকশন (সায়েন্টিফিক আমেরিকান,জানুয়ারী ২০০৯) অবলম্বনে লেখা। এইচ অ্যালন ওর (H. Allen Orr) রোচেষ্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং শার্লি কক্স কেয়ার্ণ চেয়ার অব বায়োলজী এবং জেরী কয়েন এর সাথে ’স্পিসিয়েশন’ এর রচয়িতা। তার গবেষনার ক্ষেত্র অভিযোজন এবং প্রজাতিকরনের জেনেটিক ভিত্তি সংক্রান্ত বিষয়গেুলো।

ভুমিকা:

সাধারনত:বিজ্ঞানের কোন একটি শাখার ইতিহাসে প্রায়ই দেখা যায়, গুরুত্বপুর্ণ  কিছু মৌলিক ধারনা আবিষ্কৃত হয়ে থাকে বেশ বিলম্বে, কারন তারা হয় খুবই সুক্ষ্ম, জটিল নয়ত বেশ কঠিন। প্রাকৃতিক নির্বাচন এর ধারনাটি কিন্তু সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম। যদিও বিজ্ঞানের অন্যান্য বৈপ্লবিক ধারনার সাথে তুলনা করলে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনা অপেক্ষাকৃতভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে বেশ সাম্প্রতিক কালেই-চার্লস ডারউইন এবং আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস এই বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলেন ১৮৫৮ সালে এবং ডারউইনের ’অন দি অরিজিন অব স্পিসিস’ এর আবির্ভাব ১৮৫৯ সালে-তাস্বত্ত্বেও প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটি নিজেই আসলে সহজতা বা সারল্যের প্রতিভু বললে অত্যুক্তি হবেনা। কোন একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ এবং পরিস্থিতিতে কিছু ধরনের অর্গানিজম (কোন একটি জীব,প্রানী বা উদ্ভিদ)অন্যদের চেয়ে জীবন ধারন করার ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃতভাবে বেশী সফল হয়; এই অর্গানিজমগুলো অপেক্ষাকৃত বেশী পরবর্তী প্রজন্ম তৈরী করে এবং সময়ের সাথে ক্রমান্বয়ে এরাই সংখ্যাই বেশী হয়। অর্থাৎ এভাবেই পরিবেশ ’সিলেক্ট’ বা ’নির্বাচন’ করবে সেই অর্গানিজমগুলোকে যারা বিরাজমান বর্তমান পরিস্থিতিগুলোতে সবচেয়ে সফলভাবে অভিযোজিত হয়েছে বা খাপ খাইয়ে নিয়েছে। পরবর্তীতে পরিবেশের যদি পরিস্থিতি(দের) কোন পরিবর্তন ঘটে, যে অর্গানিজম(রা) সেই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেবার মত সবচেয়ে বেশী অভিযোজনীয় বৈশিষ্ট্য ধারন করে, তারাই একসময়  সেখানে প্রাধান্য বিস্তার করে। ডারউইনবাদ বৈপ্লবিক ছিল,তার কারন কিন্তু  জীববিজ্ঞান সম্বন্ধে এটি কোন গোপন বা রহস্যময় দাবী করেছিল সে জন্য না বরং এটি প্রস্তাব করেছিল প্রকৃতির প্রক্রিয়ায় মুল যুক্তিটি হতে পারে অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে সরল।

এই সরলতা বা সহজতা সত্ত্বেও, প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বকে অতিক্রম করতে হয়েছে অনেক দীর্ঘ আর তীর্যক ইতিহাস। প্রজাতি বিবর্তিত হয়,ডারউইনের এই দাবী বেশ দ্রুত জীববিজ্ঞানীরা মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু তার প্রস্তাবিত পৃথক দাবীটি, প্রাকৃতিক নির্বাচনই হচ্ছে বিবর্তনের চালিকা শক্তি বা বিবর্তনের বেশীর ভাগ পরিবর্তনের কারন কিন্তু এত দ্রুত বিজ্ঞানীরা মেনে নেননি। এবং আসলেই প্রাকৃতিক নির্বাচন যে বিবর্তন প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় চালিকা শক্তি তা মেনে নিতে বিংশ শতাব্দীর বেশ কয়েক দশক পেরিয়ে গিয়েছিল।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের বর্তমান অবস্থান সুরক্ষিত,যার কারন,বহু দশকের বিস্তারিত পরীক্ষামুলক গবেষনা এবং অবগত পর্যবেক্ষন। কিন্তু কোনভাবেই অবশ্য বলা যাবেনা,প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে সব গবেষনা শেষ হয়ে গেছে। বরং বর্তমানে প্রাকৃতিক নির্বাচন আরো সতর্ক গবেষনা হচ্ছে,এর একটি আংশিক কারন, নতুন পরীক্ষার পদ্ধতিগুলোর আবির্ভাব এবং অন্য আরেকটি আংশিক কারন, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মুলে  জেনেটিক প্রক্রিয়াটি এখন ব্যাপকভাবে বিস্তারিত পর্যবেক্ষন নির্ভর পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষনের একটি বিষয়ে রুপান্তরিত হয়েছে;এমনকি গত দুই দশক আগেও প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে যত গবেষনা হয়েছে এখন তার চেয়ে বেশী গবেষনা হচ্ছে এ ক্ষেত্রে,বর্তমানে জীববিজ্ঞানে এটি অত্যন্ত সক্রিয় একটি এলাকা।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপর বেশীর ভাগ সাম্প্রতিক গবেষনাগুলো প্রধানত তিনটি উদ্দেশ্যর দিকে নজর দিয়েছে:

প্রথমত: গবেষনাগুলোয় জানার  চেষ্টা করা হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচন কতটা সর্বব্যাপী বা কমন।

দ্বিতীয়ত:,নির্দিষ্ট জীনগত পরিবর্তনটিকে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যে পরিবর্তন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে  সৃষ্ট অভিযোজনের কারন এবং

তৃতীয়ত:বিবর্তন জীববিজ্ঞানের একটা প্রধানতম সমস্যা-নতুন প্রজাতির উৎপত্তির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক নির্বাচন ঠিক কতটা গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করে সেটাকে পরিমাপ করা।

প্রাকৃতিক নির্বাচন – একটি ধারনা:

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন প্রক্রিয়াটিকে বোঝার একটি  ভালো উপায় হচ্ছে, সেই সব অর্গানিজমকে গবেষনায় লক্ষ্য করা, যাদের জীবন চক্র সংক্ষিপ্ত হবার কারনে আমরা বহু প্রজন্ম বা জেনারেশনকে পর্যবেক্ষন করতে পারি। কিছু ব্যাক্টেরিয়া মাত্র প্রতি আধাঘন্টায় মধ্যে তাদের দ্বিবিভাজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে; সুতরাং কল্পনা করুন, একটি ব্যাক্টেরিয়ার জনসংখ্যায় প্রথমে দুইটি জেনেটিক ধরনের সমান সংখ্যক ব্যাক্টেরিয়া আছে; আরো মনে করুন, টাইপ ১ ব্যাক্টেরিয়া শুধু টাইপ ১ প্রজন্ম তৈরী করবে, টাইপ ২ শুধু টাইপ ২ প্রজন্ম তৈরী করবে। এখন হঠাৎ করে ব্যাক্টেরিয়ার পরিবেশটা বদলে দেয়া হলো,সেখানে এমন একটা অ্যান্টিবায়োটিক  যোগ করা হলো, টাইপ ১ ব্যাকটেরিয়াদের যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরী করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু টাইপ ২ এখনও যার প্রতি সংবেদনশীল। এই নতুন পরিবেশে টাইপ ১ হচ্ছে ২ অপেক্ষা  অধিকতর ফিট বা সুঅভিযোজিত; সুতরাং টাইপ ২ এর তুলনায় টাইপ ১ বেশীদিন বাঁচে এবং সুতরাং টাইপ ২ এর তুলনায় তারা প্রজননেও সফল হয় বা বেশী হারে বংশবৃদ্ধি করে। ফলাফলে টাইপ ১ অর্গানিজমরা বেশী পরিমানের পরবর্তী প্রজন্ম বা উত্তরসুরী তৈরী করে টাইপ ২ এর অর্গানিজম অপেক্ষা।

’ফিটনেস’ শব্দটি বিবর্তন জীববিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয় একটি টেকনিক্যাল শব্দ হিসাবে,যে ধারনাটিকে এটি বোঝায় তা হলো:কোন একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে সারভাইভ বা বেঁচে থাকা এবং প্রজনন বা বংশ বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা। যদি অসংখ্যবার এটিকে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে পুণরাবৃত্তি করা হয়,এই সিলেকশন বা নির্বাচন প্রক্রিয়ার ফলাফল হচ্ছে প্রকৃতিতে যা আমরা সবাই দেখতে পাই: উদ্ভিদ, প্রানী (এবং ব্যাক্টেরিয়া) তাদের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে অসংখ্য জটিল উপায়ে।

ছবি:  প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি স্কীমাটিক ডায়াগ্রাম ( বড় করে দেখার জন্য ক্লিক করুন);  ইলাসট্রেশন: Tommy Moorman

বিবর্তনীয় জীনতত্ত্ববিদরা আগের অনুচ্ছেদের যুক্তিটাকে জীববিজ্ঞানের বিস্তারিত বিবরনে আরো সমৃদ্ধ করে ব্যাখ্যা করতে পারবেন। আমরা জানি, যেমন, জেনেটিক টাইপ বা জীনগত প্রকারভেদ বা ভিন্নতার উৎপত্তি হয় ডিএনএ’র মিউটেশন বা পরিব্যক্তির মাধ্যমে -যা আসলে ডিএনএ নিউক্লিওটাইড বেস (অথবা সহজ ভাবে বললে A,G,T,C,সংক্ষেপে যারা এই চারটি বেসকে প্রকাশ করে, ডিএনএ সিকোয়েন্স আসলে সেই অক্ষরগুলোর একটি মালা)এর অনু্ক্রমের র‌্যানডোম বা এলোমেলো ভাবে ঘটা কোন পরিবর্তন; এই সিকোয়েন্স বা অনুক্রমটি বা পাশাপাশি যেভাবে এই বেসগুলো সাজানো থাকে সেটাই আসলে জিনোমের ’ভাষা’; আমরা এখন বেশ ভালো করে জানি কমন বা সচরাচর ভাবে ঘটা মিউটেশনগুলোর  -বা ডিএনএ এই চারটা বেস এর কোন একটি অন্য আরেকটি দ্বারা প্রতিস্থাপন- কি হারে ঘটে থাকে:কোন একটি নিউক্লিওটাইড বেস, কোন একটি গ্যামেট বা জনন কোষ (শুক্রাণু এবং ডিম্বানু) এ, কোন  একটি প্রজন্মে অপর কোন একটি বেস দ্বারা মিউটেশন হবার সম্ভাবনা প্রায় এক  বিলিয়নে একবার।সবচে গুরুত্বপুর্নভাবে, আমরা জানি এই মিউটেশনগুলো কিভাবে এর বহনকারী জীবদের ফিটনেসের উপর প্রভাব ফেলে। বেশীর ভাগ র‌্যানডোম মিউটেশনই জীবের জন্য ক্ষতিকর, অর্থাৎ সে এর বহনকারী জীবের ফিটনেস কমিয়ে দেয়; খুব সামান্য কিছু এধরনের মিউটেশন হতে পারে উপকারী, যা ফিটনেস বাড়িয়ে দিতে পারে। কোন একটি কম্পিউটার কোডে যেমন বেশীরভাগ টাইপো বা বানান ভুল যে কারনে ক্ষতিকর, বেশীর ভাগ মিউটেশনই সে কারনেই ক্ষতিকর। খুব সুক্ষভাবে টিউন করা সিস্টেমে কোন এলোমেলো পরিবর্তন করলে সেটি এর কাজের উন্নতি করার চাইতে বরং ব্যাঘাত সৃষ্টি করার সম্ভাবনাই প্রবল।

সেকারনেই অ্যাডাপটিভ বা অভিযোজনীয় ‍বিবর্তন দুই ধাপ বিশিষ্ট একটি প্রক্রিয়া,যেখানে সুস্পষ্ট ভাবে ভাগ করা আছে মিউটেশন এবং সিলেকশন প্রক্রিয়ার দ্বায়িত্ব বা কাজ ।প্রতিটি প্রজন্মে বা জেনারেশনে,মিউটেশনের মাধ্যমে নানা ধরনের জেনেটিক ভ্যারিয়ান্ট বা জীনগত ভিন্নতার সৃষ্টি হয়,এরপর প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া এই মিউটেশনগুলো স্ক্রিন বা যাচাই বাছাই করে: পরিবেশের দৃঢ় চাপ কমিয়ে দেয়  মিউটেশনগুলোর খারাপ (অপেক্ষাকৃত ভাবে কম ফিটনেস প্রদান করে যেটি)ভ্যারিয়্যান্টদের সংখ্যা এবং বাড়িয়ে দেয় ভালো (অপেক্ষাকৃতভাবে যা বেশী ফিটনেস প্রদান করে) ভ্যারিয়ান্টদের হার।(এটা  এখানে বলে  রাখা প্রয়োজন যে কোন একটি জনগোষ্ঠীতে এক সাথে কিন্তু অনেক জেনেটিক ভ্যারিয়্যান্ট থাকতে পারে এবং এইসব ভ্যারিয়ান্টগুলো পরিবেশগত যখন কোন পরিবর্তন ঘটে, সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির  সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে তাদের বহনকারী অর্গানিজমদের। আগের উদহারনে যে জীনটা টাইপ ১ ব্যাক্টেরিয়াকে সাহায্য করেছে অ্যান্টিবায়োটিক থেকে রক্ষা পেতে,হয়তো অ্যান্টিবায়োটিকহীন পরিবেশে এই জীনটির কোন ভুমিকাই ছিলনা বা হয়তো ক্ষতিকর ছিল, কিন্তু এটি টাইপ ১ ব্যাক্টেরিয়া জনগোষ্ঠীতে থাকার কারনে টাইপ ১ দের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উপকারী ভুমিকা পালন করেছে তাদের ফিটনেস বাড়াতে।)

পপুলেশন জীনতত্ত্ববিদরা  প্রাকৃতিক নির্বাচনের ব্যাখ্যায় আমাদের অর্ন্তদৃষ্টিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন বিষয়টিকে গানিতীকভাবে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে। যেমন জণসংখ্যা জীনতত্ত্ববিদরা দেখিয়েছেন, কোন একটা জেনেটিক টাইপ কোন জনগোষ্ঠীর মধ্যে যত বেশী ফিটনেস দেবে, এটি ততেই দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাবে সেই জনসংখ্যায়। আসলেই,কেউ চাইলেই ব্যাপারটা ভালো করে পরিমাপও করতে পারবেন, ঠিক কত তাড়াতাড়ি এই বৃদ্ধি পাবার ঘটনাটা ঘটে। জণসংখ্যা জীনতত্ত্ববিদরা আরো একটি বিস্ময়কর সত্য উদঘাটন করেছেন, সেটি হলো, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার অকল্পনীয় সুক্ষ্মতার তীক্ষ্ম একটি ’দৃষ্টি’ আছে;যা নানা ধরনের জেনেটিক ভ্যারিয়েন্টদের মধ্যে তুলনামুলক ফিটনেসের মধ্যে বিস্ময়করভাবে অতি ক্ষুদ্রতম পার্থক্যগুলোকেও শনাক্ত করতে পারে। কোন একটি মিলিয়ন সংখ্যক সদস্যের একটি জনগোষ্ঠীতে, প্রাকৃতিক নির্বাচন এক মিলিয়নের এক অংশের মত ক্ষুদ্র ফিটনেস এর পার্থক্যর উপর কাজ করতে সক্ষম।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের স্বপক্ষে যুক্তির সবচে লক্ষনীয় বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে যে এটি জীবের যে কোন পর্যায়ের জন্য সমানভাবে কার্যকর -জীন থেকে প্রজাতি পর্যায়ে। সেই ডারউইন সময় থেকেই জীববিজ্ঞানীরা অবশ্যই পৃথক পৃথক ভাবে এককভাবে অর্গানিজমদের মধ্যে ফিটনেসের পার্থক্যটাকে মুখ্য ভেবেছেন, কিন্তু নীতিগতভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন কিন্তু বিভিন্ন প্রজাতির সদস্য বা বায়োলজিক্যাল এনটিটির মধ্যে সার্ভাইভাল এবং প্রজনন ফিটনেসের পার্থক্যর উপরও কাজ করতে পারে। যেমন, যুক্তি দেয়া যেতে পারে যে সমস্ত প্রজাতিদের বিস্তার  বিশাল অঞ্চল জুড়ে, তারা প্রজাতি হিসাবে সেই সব প্রজাতিদের চেয়ে বেশী দীর্ঘ সময় বাঁচে, যাদের ভৌগলিক বিস্তার সংকীর্ণ। কারন, ভৌগলিকভাবে সুবিস্তারিত কোন প্রজাতি তাদের জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যায় ক্ষুদ্র কিছু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তি যত সহজে সহ্য করতে পারবে, যে প্রজাতির ভৌগলিক বিস্তার সীমিত , তারা সেটা পারবেনা। প্রাকৃতিক নির্বাচন এর একটি যৌক্তিক  প্রেডিক্শন বা ভবিষ্যদ্বানী হতে পারে, ভৌগলিকভাবে সুবিস্তৃত  প্রজাতিদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাবে সময়ের সাথে।

যদিও এই যুক্তির আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ভুল , তবে বিবর্তনবাদীরা সন্দেহ করেন উচ্চ পর্যায়ের সিলেকশনও মাঝে মধ্যে ঘটতে পারে। -বেশীর ভাগ জীববিজ্ঞানীরা  একমত যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন সচরাচর ঘটে থাকে এককভাবে কোন অর্গানিজমদের বা জেনেটিক টাইপের পর্যায়ে। এর একটা কারন, কোন একটি স্বতন্ত্র একক অর্গানিজমের জীবন কাল, কোন একটি প্রজাতির জীবনকাল অপেক্ষা অনেক সংক্ষিপ্ত; এভাবে স্বতন্ত্র অর্গানিজমদের উপর প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়া সাধারনত প্রজাতির উপর কর্মরত প্রাকৃতিক নির্বাচনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।

প্রাকৃতিক নির্বাচন ঠিক কতটা কমন বা সর্বব্যাপী?

প্রাকৃতিক নির্বাচন সম্বন্ধে জীববিজ্ঞানীদের সহজতম প্রশ্নেটির কিন্ত আশ্চর্যজনকভাবেই উত্তর দেয়া সবচেয়ে কঠিন: কোন একটি জনগোষ্ঠীর সার্বিক জেনেটিক মেকআপে, কি পরিমান বা মাত্রায় পরিবর্তনের জন্য দায়ী করা যেতে পারে প্রাকৃতিক নির্বাচনকে? কেউই সন্দেহ পোষন করেন না যে, প্রাকৃতিক নির্বাচন জীবিত অর্গানিজমদের বেশীর ভাগ শারীরিক বৈশিষ্টগুলোর বিবর্তনীয় পরিবর্তনের প্রধান চালিকা শক্তি -এছাড়া আসলে আর কোন যুক্তিসঙ্গত কোন উপায় নেই, জীবের বড় আকারের বৈশিষ্টগুলো, যেমন, পাখির ঠোট বা বীক, বাইসেপ (উপরের বাহুর মাংশপেশী)কিংবা মস্তিষ্ক বা ব্রেইন-ব্যাখ্যা করার জন্য। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশী সন্দেহটা দানাটা আসলে বেধে ছিল অন্য ক্ষেত্রে, সেটা হলো ঠিক কি পরিমানে প্রাকৃতিক নির্বাচন আনবিক বা মলিক্যুলার পর্যায়ে এসব পরির্ব্তনগুলোকে পরিচালনা বা নির্দেশিত করে।  অন্য কোন ভিন্ন প্রক্রিয়ার অবদানের তুলনায় প্রাকৃতিক নির্বাচন, বহু মিলিয়ন বছর সময় ব্যাপী, ডিএনএ তে সার্বিক বিবর্তনীয় পরিবর্তনের ঠিক কি পরিমান অংশ আসলে পরিচালনা করে?

১৯৬০ এর দশক অবধি, জীববিজ্ঞানীর ধরে নিয়েছিলেন এই প্রশ্নের উত্তর হবে ’প্রায় সবটুকু’; পপুলেশন জেনেটিসিষ্টদের একটি গ্রুপ, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন জাপানী গবেষক মোতু কিমুরা, এই ধারনার প্রতি তীব্রভাবেই একটি চ্যালেন্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। তিনি যুক্তি দেন,আনবিক বা মলিক্যুলার পর্যায়ে বিবর্তন সাধারনত ‘পজিটিভ’ বা ’ইতিবাচক’ প্রাকৃতিক নির্বাচন দিয়ে পরিচালিত হয় না- যেখানে প্রকৃতি বা পরিবেশ কোন জনগোষ্ঠীতে, সাধারনত: শুরুতে  ঘটা দুষ্প্রাপ্র উপকারী জেনেটিক টাইপগুলোর উপস্থিতি বা সংঘটনের হার বাড়িয়ে দেয়। বরং তিনি বলেন, প্রায় সব জেনেটিক মিউটেশনগুলো যা জনগোষ্ঠীর জীনোমে টিকে থাকে এবং উচ্চ হারের একটি সংখ্যায় পৌছায়, তারা আসলে সিলেকটিভলি নিউট্রাল বা প্রাকৃতিক নির্বাচনের দৃষ্টিতে নিরপেক্ষ অর্থাৎ যারা ফিটনেসের উপর কোন ধরনের নেতিবাচক কিংবা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেনা; অন্যভাবে যদি বলা যায়, তারা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের পরিমাপযোগ্য বা বোঝা যায় এমন কোন ফিটনেস বাড়ায় কিংবা কমায় না। (অবশ্যই ক্ষতিকর মিউটেশনগুলি কিন্তু ‍নিরবিচ্ছিন্নভাবে ও উচ্চ হারে আসতে থাকে, তবে তারা কখনোই জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ হারে পৌছায় না এবং  এভাবে তারা বিবর্তীয় ডেড এন্ড বা শেষ বিন্দু); যেহেতু  এই নিউট্রাল মিউটেশনগুলো মুলত অদৃশ্য বর্তমান পরিবেশে, এ ধরনের পরিবর্তনও তাই নীরবে জনগোষ্ঠী এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের মধ্যে প্রবেশ করে, এবং যথেষ্ঠ পরিমান সময়ে সাথে এটি জনগোষ্ঠীর সার্বিক জেনেটিক কম্পোজিশনে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিবর্তন আনতে পারে; এই প্রক্রিয়াটির নামই রানডোম জেনেটিক ড্রিফ্ট – আনবিক বা মলিক্যুলার বিবর্তন এর নিউট্রাল থিওরীর এটাই মুল বক্তব্য।

ছবি:  নিউট্রাল বিবর্তনের একটি স্কীমাটিক ডায়াগ্রাম ( বড় করে দেখার জন্য ক্লিক করুন);  ইলাসট্রেশন: Tommy Moorman

১৯৮০ র দশকের শুরুতে অনেক বিবর্তন জীনতত্ত্ববিদরা এই নিউট্রাল থিওরীটা গ্রহন করে নিয়েছিলেন; কিন্তু এর ভিত্তিতে যে উপাত্তগুলো ছিল তারা প্রায় বেশীরভাগই ছিল পরোক্ষ; আরো প্রত্যক্ষ এবং গুরুত্বপুর্ণ পরীক্ষা ছিল বাকী। এই ক্ষেত্রে দুটো উন্নতি এই সমস্যার সমাধান করে: প্রথম, জনসংখ্যা জীনতাত্ত্বিকরা খুব সাধারন কিন্তু কার্যকরী গানিতীক ও পরিসংখ্যানের  একটি বিশেষ টেষ্ট এর প্রণয়ন করেন, যা জীনোমের মধ্যে নিউট্রাল পরিবর্তনগুলোকে অ্যাডাপ্টিভ বা অভিযোজনীয় পরিবর্তনগুলো থেকে আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে, দ্বিতীয়ত, কিছু নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটে, যা বহু প্রজাতির পুরো জীনোমের বেস অনুক্রম করার সুযোগ করে দেয়; এই প্রক্রিয়া জনসংখ্যা জীনতাত্ত্বিকদের বিশালাকার উপাত্তের যোগান দিয়েছে তাদের পরিসংখ্যানের টেস্ট পরিচালনার জন্য। নতুন এই উপাত্ত বলছে, নিউট্রাল থিওরী  প্রাকৃতিক নির্বাচনের গুরুত্বকে আসলে অবমুল্যায়ন করেছে।

ডেভিড জে বিগান এবং চার্লস এইচ ল্যাঙ্গলী, ডেভিসে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দুই গবেষকের নেতৃত্বে একটি টীম Drosophila জেনাসের দুটি পৃথক ফ্রুট ফ্লাই বা ফলের মাছির প্রজাতিদের পুরো জীনোম অনুক্রমের তুলনামুলক একটি গবেষনা পরিচালনা করেছিলেন। তারা এই দুই প্রজাতির প্রায় ৬০০০ জীন এর তুলনামুলক একটি বিশ্লেষন করেন, তারা লক্ষ্য করেন এই জীনগুলো পরস্পর থেকে বৈসাদৃশ্যময় বা আলাদা হয়েছে শেষ কমন বা সাধারন পুর্বসুরী প্রানী থেকে আলাদা হবার পর। পরিসংখ্যানের পরীক্ষা প্রয়োগ করে তারা পরিমাপ করে দেখান যে কমপক্ষে এই ৬০০০ জীনের ১৯ শতাংশ জীনে নিউট্রাল বিবর্তনের কোন প্রভাব নেই; অন্যভাবে বিষয়টি বললে, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রায় এক পঞ্চমাংশ জীনের বিবর্তনীয় বিভাজনের বা ডাইভারজেনস এর জন্য দায়ী ( যেহেতু পরিসংখ্যানের যে পরীক্ষা তারা এখানে ব্যবহার করেছন, যেহেতু তা ছিল খুবই রক্ষনশীল, সেকারনে আসল শতাংশর পরিমান সম্ভবত প্রাপ্ত ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশী হবার সম্ভাবনা); এই পরীক্ষা বলছে না নিউট্রাল সিলেকশনের গুরুত্বহীন- কারন বাকী ৮১ শতাংশ জীনই ভিন্নতা পেয়েছে  জেনেটিক ড্রিফট প্রক্রিয়ায়। কিন্তু গবেষনার ফলাফল যা প্রমান করে তা হলো, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজাতির বিভাজনের একটি বড় ভুমিকা পালন করে, যার পরিমান নিউট্রাল তাত্ত্বিক যা ভেবেছিলেন, তার চেয়ে বেশী। একই ধরনের আরো গবেষনা বিবর্তন জেনেটিসিষ্টদের এই উপসংহারে পৌছাতে সাহায্য করেছে, যে প্রাকৃতিক নির্বাচন এমনকি ডিএনএ নিউক্লিওটাইড বা বেস সিকোয়েন্সেও বিবর্তনীয় পরিবর্তনের জন্য একটি কমন চালিকা শক্তি।


ছবি: অভিযোজনীয় বিবর্তনের কিছু উদহারন, যা আমরা দেখতে পেয়েছি ( বড় করে দেখার জন্য ক্লিক করুন);

প্রাকৃতিক নির্বাচনের জেনেটিক্স:

এমনকি যখন জীববিজ্ঞানীরা শুধু সাধারন শারীরিক বৈশিষ্টগুলোর দিকে নজর দিয়েছেন (বীক, বাইসেপ আর ব্রেইন) এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন বিবর্তনের মুল চালিকা শক্তি, তারা তখন প্রায়শই কিন্তু অন্ধকারে ছিলেন, বিষয়টি আসলে কিভাবে ঘটছে। সাম্প্রতিক কাল ছাড়া, অ্যাডাপটিভ বিবর্তনের মুল ভিত্তি রচনাকারী জীনগত পরিবর্তনগুলো সম্বন্ধে খুব কমই আসলে জানা ছিল জীববি‌জ্ঞানীদের। কিন্তু জীনতত্ত্বের নতুন অগ্রগতির সাথে সাথে জীববিজ্ঞানীরা  এই সমস্যার সমাধানে মুখোমুখি হতে পেরেছেন সরাসরি এবং এখন তারা চেষ্টা করছেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ব্যাপারে বেশ কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে। যখন কোন অর্গানিজম প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে কোন নতুন পরিবেশে অভিযোজিত হয়, তারা কিভাবে সেটি করতে সক্ষম হয়?একটি জীনের পরিবর্তনের মাধ্যমে নাকি অনেকগুলো জীনের পরিবর্তনের মাধ্যমে? সেই জীনগুলো কি শনাক্ত করা সম্ভব? এবং এই একই জীনগুলো কি  একই পরিবেশে অন্যান্য স্বতন্ত্র অভিযোজনের ঘটনাগুলোকে সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা দিতে পারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া কিন্তু সহজ না। প্রধান সমস্যা হলো, কোন উপকারী মিউটেশনের ফলে ফিটনেস বৃদ্ধি হতে পারে খুবই সামান্য, যা বিবর্তনীয় পরিবর্তনকে বেশ মন্হর করে ফেলে। এই সমস্যাটিকে বিবর্তন জীববিজ্ঞানীরা  মোকাবেলা করেছেন যে উপায়ে তা হলো, দ্রুত বংশবৃদ্ধিকারী কোন অর্গানিজমদের পরীক্ষাধীন জনগোষ্ঠীকে একটি কৃত্রিম পরিবেশে রাখা, যেখানে ফিটনেস এর পার্থক্য অনেক বেশী আর সেকারনে বিবর্তন প্রক্রিয়াও দ্রুত। জীববিজ্ঞানীদের ব্যাপারটা বুঝতে আরো সাহায্য করে, যদি যদি অর্গানিজমদের জনগোষ্ঠীর আকারটি অনেক বড় হয়, যা একটি নির্দিষ্ট হারে জনগোষ্ঠীর জীন পুলে নিরবিচ্ছিন্নভাবে নতুন মিউটেশন যোগ করতে থাকে। পরীক্ষামুলক বিবর্তন প্রক্রিয়ায় পরীক্ষাধীণ কোন অনুজীব জনগোষ্ঠী, একই রকম জীন সম্পন্ন এই জনগোষ্ঠীকে সাধারনত নতুন একটি পরিবেশে রাখা হয়, যে পরিবেশের সাথে তাদের অবশ্যই অভিযোজিত হতে হবে এধরনের একটি নির্বাচনী চাপ বা সিলেকশন প্রেশার প্রয়োগ করার কৌশল হিসাবে। যেহেতু সবাই শুরুতে একই ডিএনএ সিকোয়েন্স বা অনুক্রম দিয়ে শুরু করেছিল, প্রাকৃতিক নির্বাচনকে কাজ করতে হয় অল্প কিছু মিউটেশনের উপর, যারা এই পরীক্ষার সময় সৃষ্ট হয়েছে। গবেষকরা এরপর এই জনগোষ্ঠীর ফিটনেস কেমন ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে সময়ের সাথে, সেটি গ্রাফে প্লট করে দেখতে পারেন, নতুন এই পরিবেশে তাদের প্রজনন হার পরিমাপ করার মাধ্যমে।

পরীক্ষামুলক বিবর্তনের কিছু কৌতুহলোদ্দীপক গবেষনা করা হয়েছে ব্যাক্টেরিওফাজদের উপর, এরা হচ্ছে একধরনের ভাইরাস, তবে এরা খুবই ক্ষুদ্রাকৃতির এবং তারা শুধু ব্যাক্টেরিয়াদেরই আক্রমন করে। এছাড়া ব্যাক্টেরিওফাজদের জীনোমও খুবই ছোট, বিষয়টি বিজ্ঞানীদের কাছে সুবিধার, কারন তারা এর প্রতিটি জীন পরীক্ষার শুরুতে, শেষে এবং মধ্যবর্তী যে কোন সময় সিকোয়েন্স বা অনুক্রম করতে পারেন। সেকারনে তারা প্রতিটি জেনেটিক পরিবর্তনকে শনাক্ত করতে পারেন, যা প্রাকৃতিক নির্বাচন ‘নির্বাচন’ করে এবং সময়ের সাথে সাথে এর সংখ্যাও বৃদ্ধি করে।

কে কিচলার হোলডার এবং জেমস জে বুল, অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই গবেষক এরকম একটি পরীক্ষা করেছেন দুটি কাছাকাছি সম্পর্কযুক্ত প্রজাতি, ΦX174 এবং G4 ব্যাক্টেরিওফাজ এর  উপর। এই দুটি ভাইরাসই আমাদের অন্ত্রনালীর সবচেয়ে কমন ব্যাক্টেরিয়াম,  Eschericia coli কে সংক্রমন করে। গবেষকরা এই ফাজগুলোকে খুব উচু তাপমাত্রার পরিবেশের মুখোমুখি করেন এবং এই নতুন এবং উষ্ণ পরিবেশে বাচার জন্য সুযোগ দেন তাদের অভিযোজিত হবার। পরীক্ষা চলা কালীন সময়ে এই দুটো প্রজাতির  ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়, এই নতুন পরিবেশে তাদের ফিটনেসও বৃদ্ধি পেয়েছে নাটকীয়ভাবে। উপরন্তু গবেষকরা উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করেন একটি সদৃশ্য প্যাটার্ন: পরীক্ষার শুরুতে ফিটনেস বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার পর সময়ের সাথে সাথে  এটি একটি স্থির পর্যায়ে নেমে আসে। লক্ষ্যনীয় বিষয়টি হলো, হোলডার এবং বুল সফল হয়েছিলেন এই ফিটনেস বৃদ্ধির কারন, সঠিক সেই ডিএনএ মিউটেশনটিকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে।

বন্য প্রকৃতিতে প্রাকৃতিক নির্বাচন:

যদিও পরীক্ষামুলক বিবর্তন গবেষনাগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচন কিভাবে কাজ করছে সে সম্বন্ধ অভুতপুর্ব তথ্য যোগান দিয়েছে, কিন্তু তারপরও সেই প্রক্রিয়া শুধু সীমাবদ্ধ আছে সহজতর অর্গানিজমের গবেষনায়, যাদের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন শনাক্ত করার জন্য বার বার জিনোম অনুক্রম করা সম্ভব হয়। কিছু গবেষকরা অবশ্য বলছেন, এই ধরনের পরীক্ষামুলক বিবর্তন গবেষনাগুলোতে সিলেকশন প্রেশার বা নির্বাচনী চাপটি অনেক বেশী শক্তিশালী (উল্লেখিত ব্যাকটেরিওফাজদের ক্ষেত্রে যেমন উচ্চ তাপমাত্র) এবং অপ্রাকৃতিক, অর্থাৎ হয়ত প্রকৃতিতে যে নির্বাচনী চাপ কোন অর্গানিজম অনুভব করে থাকে তা এই কৃত্রিম উপায়ে সৃষ্ট চাপের চেয়ে মৃদু হয়। যে কারনে আমাদের প্রয়োজন আছে আরো জটিলতর উন্নত জীবের মধ্যে আরো বেশী প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাকৃতিক নির্বাচন সংক্রান্ত গবেষনা পরিচালৈনা করা। আর সে কারনে আমাদের অন্য একটা পথ খুজে বের করতে হবে অনেক বিবর্তনীয় পরিবর্তনের অতি মন্থর গতিটি


ছবি: প্রজাতিকরণ এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন ( বড় করে দেখার জন্য ক্লিক করুন); ইলাসট্রেশন: Tommy Moorman

এ কাজটা করতে সচরাচর বিবর্তনবিদরা এমন প্রজাতির জনগোষ্ঠীকে বেছে নেন যারা এত দীর্ঘদিন ধরে পৃথক থাকে যে, তাদের মধ্যে  তাদের মধ্যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সৃষ্ট হওয়া অ্যাডাপটিভ পার্থক্যগুলোর খুব সহজে লক্ষ্য করা যায়। জীববিজ্ঞানীরা তার পর সেই পার্থক্যগুলোর জীনগত ভিত্তি খুজে বের করেন। যেমন মিশিগান স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ডগলাস ডাবলিউ শেমস্কে এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচ ডি ব্র্যাডশ (জুনিয়র) দুই প্রজাতির মাঙ্কি ফুলের উপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রভাব বিশ্লেষন করেছিলেন তাদের গবেষনায়। যদিও মাঙ্কি ফুলের এই দুই প্রজাতি বেশ কাছাকাছি সম্পর্কের প্রজাতি হলেও Mimulus lewisii কে প্রধানত: পরাগায়ন করে বাম্বল বি বা মৌমাছি, অন্যদিতে Mimulus cardinalis এর পরাগায়ন করে প্রধানত হামিংবার্ডরা। Mimulus  জেনাসের অন্যান্য প্রজাতির উপরে গবেষনায় দেখা গেছে, এদের প্রজাতিদের মধ্যে পাখির মাধ্যমে পরাগায়ন বিবর্তিত হয়েছে মৌমাছির মাধ্যমে পরাগয়ন থেকে।

শুধুমাত্র যদি ফুলের রং ধরা হয়,যেমন, M.lewisii যার ফুলের রং গোলাপী ( অন্য নাম পিঙ্ক মাঙ্কি ফ্লাওয়ার) এবং M. cardinalis এর ফুলের রং লাল (স্কারলেট মাঙ্কি ফ্লাওয়ার) (উপরে ডায়াগ্রাম দেখুন), এই দুই প্রজাতির ভিন্ন পরাগায়নকারী বেছে নেবার কারন কিন্ত অনেকাংশে ব্যাখ্যা করতে পারে। যখন শেমস্কে এবং ব্র্যাডশ এই দুই প্রজাতির মধ্যে ক্রশ বা আন্ত:প্রজনন করান এবং দেখান যে, এই রঙ এর পার্থক্য অনেকাংশে নিয়ন্ত্রন করে জীনোমের যে অংশ, সেটি হচ্ছে সম্ভবত একটি একক জীন,Yellow Upper,বা YUP;এই আবিষ্কারটির উপর ভিত্তি করে তারা দুই ধরনের শংকর বা হাইব্রিড প্রজাতির মাঙ্কিফ্লাওয়ার তৈরী করেন। এক ধরনের হাইব্রিডে YUP জীনটি এসেছে  M. cardinalis  এর কাছ থেকে, কিন্তু বাকী জীনোমের উৎস M.lewisii; এই M.lewisii হাইব্রিডগুলোর ফুলের রং হয় কমলা। দ্বিতীয় ধরনের হাইব্রিডটি প্রথমটারই মিরর ইমেজ: অর্থাৎ এর YUP জীনটি এসেছে M.lewisii র কাছ থেকে, এবং জীনোমের বাকী অংশ এসেছে M. cardinalis এর কাছ থেকে, এক্ষেত্রে ফুলের রং হয়েছিল গোলাপী (M. cardinalis হাইব্রীড) । এই হাইব্রিড প্রজাতিদের তারা যখন প্রকৃতিতে বা বন্য পরিবেশে রোপন করেন, তারা লক্ষ্য করেন এই YUP জীনটি পরাগায়নকারী প্রানীদের ফুলটিতে বেড়াতে আসার ক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব ফেলছে। হাইব্রীড M.lewisii প্রজাতি, যার YUP জীনটি M. cardinalis  এর, সেখানে বিশুদ্ধ M.lewisii প্রজাতির ফুলের তুলনায় হামিংবার্ড বেড়াতে আসছে ৬৮ গুন বেশীবার। এবং সমতুল্য অপর পরীক্ষায় দেখা যায়, হাইব্রিড M. cardinalis , যাদের YUP জীনটির উৎস M. lewisii, সেখানে বিশুদ্ধ M. cardinalis এর প্রজাতির ফুলের তুলনায় বাম্বল বি বা মৌমাছি বেড়াতে এসেছে ৭৪ গুন বার বেশী। কোন সন্দেহের অবকাশ নেই, যে এই YUP জীনটি M. cardinalis প্রজাতির পাখী পরাগায়নকারীর বিবর্তনের ক্ষেত্রে অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রেখেছে। শেমস্কে এবং ব্র্যাডশ‘র গবেষনা প্রমান করে প্রাকৃতিক নির্বাচন মাঝে মাঝে এমন  অভিযোজনীয় বৈশিষ্ট তৈরী করে যার ভিত্তি খুবই সাধারন কিছু জীনগত পরিবর্তন।


ছবি: মাঙ্কি ফ্লাওয়ার ( ১ Mimulus lewisii  ২ Mimulus cardinalis); ছবিসুত্র: ইন্টারনেট)

প্রজাতির উৎপত্তি:

প্রাকৃতিক নির্বাচন নিয়ে ডারউইনের সবচেয়ে সাহসী দাবী ছিল, যে এটি প্রজাতি কিভাবে উৎপত্তি হয় তার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম ( সর্বোপরি ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার মাষ্টার পীস এর শিরোনামই ছিল On the Origin of Species); কিন্তু আসলেই কি তা পারে ? আজ  অবধি এটি বিবর্তন জীববিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ গবেষনার বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে।

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বোঝার আগে স্পষ্ট করে বুঝতে হবে বিবর্তন জীববিজ্ঞানীরা আসলে  ‘প্রজাতি বা স্পিসিস‘ বলতে কি বোঝাচ্ছেন। ডারউইন থেকে ভিন্নভাবে, আধুনিক জীববিজ্ঞানীরা, প্রজাতির যে সংজ্ঞাটিকে অনুসরন করেন, সেটি হলো, ’বায়োলজিক্যাল স্পিসিস কনসেপ্ট’, এর মুল বিষয়টি হলো, প্রজাতিরা প্রজননের দিক থেকে অন্য প্রজাতি থেকে বিচ্ছিন্ন, অর্থাৎ তারা জীনগত কিছু ট্রেইট বা বৈশিষ্ট ধারন করে যা তাদের অন্য কোন গ্রুপের সাথে জীন আদান প্রদানে বাধা দেয়। অন্য ভাবে বলা যেতে পারে পৃথক পৃথক প্রজাতির পৃথক পৃথক জীন পুল থাকে।

সাধারনত: ভাবা হয়, দুটি জনগোষ্ঠীকে অবশ্যই ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে হবে তাদের ’প্রজনন বিচ্ছিন্নতা’ ‍বা ’রিপ্রোডাক্টিভ আইসোলেশন’ বিবর্তিত হবার জন্য। গালাপাগোস দ্বীপপুন্জ্ঞের দ্বীপগুলোতে ফিন্চ প্রজাতির পাখিরা যারা আলাদা আলাদা দ্বীপগুলোতে বসবাস করতো-যাদের কথা ডারউইন তার ’অরিজিন অব স্পিসিস’ বইটিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন- ভৌগলিকভাবে তারা বিচ্ছিন্ন হবার পর অবশ্যই বিবর্তিত হয়ে ভাগ হয়েছে বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রজাতিতে, যা আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি।

একবার যখন প্রজনন বিচ্ছিন্নতা বিবর্তিত হয়, এটি নানা আকার ধারন করতে পারে, যেমন, কোন প্রজাতির স্ত্রী সদস্যরা প্রাকপ্রজনন আচরণ বা কোর্টশীপ এর সময় অন্য প্রজাতির পুরুষদের সাথে প্রজনন বা মেটিং এ অস্বীকৃতি জানাতে পারে ( যদি এই দুই প্রজাতি কখনো ভৌগলিকভাবে পরস্পরের সংস্পর্শে আসে); প্রজাপতির প্রজাতি, Pieris occidetalis এর স্ত্রী সদস্যরা নিকটবর্তী সম্পর্কিত প্রজাতি Pieris protodice এর পুরুষ সদস্যদের সাথে প্রজনন করে না, সম্ভাব্য কারন মনে করা হয় এই দুই প্রজাতির পুরুষ সদস্যদের ডানা বা উইং এর প্যাটার্ণ বা নকশার ভিন্নতা;  যা স্ত্রী প্রজাতিতের স্বপ্রজাতি শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এবং এমনকি যদি দুটি প্রজাতি কোর্টশীপ এবং প্রজনন করেও, তবে এদের হাইব্রীড হয় স্বল্পায়ু বিশিষ্ট নতুবা প্রজনন অক্ষম বা বংশ বৃদ্ধির ক্ষমতাহীন; এই বিষয়টি আবার এক ধরনের প্রজনন বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে: কারন জীন এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির মধ্যে প্রবেশ করতে পারেনা, যেহেতু এদের হাইব্রীডরা হয় মারা যায় বা স্টেরাইল বা পরবর্তী বংশধর সৃষ্টিক্ষম থাকেনা। আধুনিক জীববিজ্ঞানীদের কাছে তাহলে, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজাতির উৎপত্তির প্রক্রিয়ায় কোন ভুমিকা রাখে কিংবা রাখে না, এই প্রশ্নটি আসলে রুপান্তরিত হয়েছে, প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রজনন বিচ্ছিন্নতা উৎপত্তির প্রক্রিয়ায় ভুমিকা রাখে, কি রাখে না এই প্রশ্নে।

ছবি: ১ Pieris protodice ( নর্থ আমেরিকার ক্যাবেজ বাটারফ্লাই) ২ Pieris occidetalis ওয়েষ্টার্ন হোয়াইট বাটারফ্লাই ( ছবিসুত্র: ইন্টারনেট)

বিংশ শতাব্দীর বেশীর ভাগ সময় ধরেই অনেক বিবর্তনবাদী এর উত্তর মনে করতেন, ’না‘; বরং তারা বিশ্বাস করতেন ’জেনেটিক ড্রিফট’ হলো স্পিসিয়েশন বা প্রজাতিকরণের সবচে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। কিন্তু প্রজাতির উৎপত্তি সংক্রান্ত আধুনিক গবেষনা থেকে পাওয়া একটি গুরুত্বপুর্ণ তথ্য হলো, প্রজাতির উৎপত্তি সম্বন্ধে জেনেটিক ড্রিফট হাইপোথিসিসটি সম্ভবত ভুল, বরং প্রাকৃতিক নির্বাচনই প্রজাতিকরন প্রক্রিয়ায় মুখ্য ভুমিকাটি পালন করে।

এর একটি ভালো উদহারন হতে পারে, আগে বর্ণনা করা  দুই ধরনের মাঙ্কি ফ্লাওয়ারের বিবর্তন ইতিহাস; যেহেতু তাদের পরাগায়নকারী প্রানীগুলো ( বাম্বল বী এবং ‍হামিংবার্ড) অত্যন্ত কদাচিৎ ’ভুল’ প্রজাতির ফুলের নেকটার বা মধূ পান করতে যায়, সেকারনে দুটি প্রজাতি প্রায় পুরোপুরি ‘প্রজনন বিচ্ছিন্ন’; যদিও উত্তর আমেরিকায় এই দুই প্রজাতি মাঝে মাঝে একই জায়গায় হতে পারে, কোন একটি মৌমাছি যে M. lewisii এর ফুলে যায়, প্রায় কখনোই সে M. cardinalis এর ফুলে বসে না, এবং একটি হামিংবার্ড যে M. cardinalis এর ফুলে মধু পান করত আসে, সে M. lewisii ফুলে প্রায় কখনোই যায়না। এভাবে দুই প্রজাতির মধ্যে ফুলের রেণু আদান প্রদানও হয়না প্রায় কখনোই। শেমস্কি এবং তার সহযোগীরা দেখিয়েছেন পরাগায়নকারীদের মধ্যে এই পার্থক্য আসলেই একক ভাবে ৯৮ ভাগে আন্ত: প্রজাতি জীনপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতার জন্য দায়ী। এই ক্ষেত্রে, সে কারনেই কোন সন্দেহ নেই, প্রাকৃতিক নির্বাচন এই উদ্ভিদটির নির্দিষ্ট একটি পরাগায়নকারীর প্রতি নির্ভরশীল হবার অভিযোজনীয় বৈশিষ্টটির আকার দেয় এবং শক্তিশালী প্রজনন বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে।

প্রজাতিকরণ প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভুমিকা সংক্রান্ত অন্যান্য প্রমানগুলো পাওয়া গেছে কিছু অপ্রত্যাশিত গবেষনার ক্ষেত্র থেকে। প্রায় গত একদশক ধরে বিবর্তনীয় জীনতত্ত্ববিদরা প্রায় আধা ডজন জীন শনাক্ত করেছেন, যা হাইব্রিড প্রজাতির বংশবৃদ্ধি করার অক্ষমতা বা বেচে থাকতে না পারার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। যে জীনগুলোর কথা বলা হচ্ছে, তাদের নিয়ে গবেষনা হয়েছে Dorsophila ফ্রুট ফ্লাই বা ফলের মাছিতে। এই জেনাসের প্রজাতিদের মধ্যে, সেখানে এরা নানা ধরনের স্বাভাবিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত: কেউ উৎসেচক বা এনজাইম এর সংকেত বহন করে,কেউ বা গঠনতান্ত্রিক বা স্ট্রাক্চারাল প্রোটিনের সংকেত কিংবা ডিএনএ এর সাথে সংযুক্ত হওয়া প্রোটিন তৈরীর সংকেত বহন করে।

এই জীনগুলো দুটি লক্ষনীয় বৈশিষ্ট প্রদর্শন করে,প্রথমত, যে জীনগুলো কোন হাইব্রিড প্রজাতির মধ্যে সমস্যার সৃষ্টি করে, তাদের বেশীর ভাগই দেখা গেছে খুব বেশী দ্রুত বিভাজিত বা ‍ভাইভার্জ হয়েছে, দ্বিতীয়ত, পপুলেশন জেনেটিসিস্টদের পরিসংখ্যানগত পরীক্ষার তথ্য দেখাচ্ছে, তাদের দ্রুত বিবর্তনের পরিচালিত হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায়।

মাঙ্কি ফ্লাওয়ার এর উপর গবেষনা এবং হাইব্রিডদের বংশবৃদ্ধি করার অক্ষমতা সংক্রান্ত এই গবেষনাগুলো শুধুমাত্র ক্রমশ বাড়তে থাকা অসংখ্য গবেষনার শুধু উপরিপৃষ্ঠ, যারা প্রজাতিকরণ প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক নির্বাচনের ভুমিকার গুরুত্ব প্রকাশ করেছে। আসলেই, বেশীর ভাগ জীববিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন বিবর্তন প্রক্রিয়া মুল চালিকা শক্তি, যা শুধু  প্রজাতির মধ্যে বিবর্তনীয় পরিবর্তনই না নতুন প্রজাতির উৎপত্তিতেও ভুমিকা রাখে। যদিও কিছু অপেশাদার মানুষ এখনও অব্যাহতভাবে এর অকাট্যতা বা পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে যাচ্ছেন, কিন্তু গত কয়েক দশকে বিবর্তন জীববিজ্ঞানীদের কাছে এর অবস্থান, হয়তো খানিকটা আইরোনীর সাথে, আরো বিশ্বাসযোগ্য এবং আরো সুরক্ষিত হয়েছে।

Advertisements
ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচনকে যাচাই করে দেখার পরীক্ষা:

4 thoughts on “ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচনকে যাচাই করে দেখার পরীক্ষা:

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s