বিবর্তন কি ?


শীর্ষ ছবি: চার্লস রবার্ট ডারউইন (১২ ফেব্রুয়ারী ১৮০৯ -১৯ এপ্রিল ১৮৮২)(ছবি সুত্র: Scientific American, January 2009)

Authors of the highest eminence seem to be fully satisfied with the view that each species has been independently created. To my mind it accords better with what we know of the laws impressed on matter by the Creator, that the production and extinction of the past and present inhabitants of the world should have been due to secondary causes, like those determining the birth and death of the individual. When I view all beings not as special creations, but as the lineal descendants of some few beings which lived long before the first bed of the Silurian system was deposited, they seem to me to become ennobled. Charles Darwin ( On The Origin of Species; Chapter 14: Recapitulation and Conclusion)

A curious aspect of the theory of evolution is that everybody thinks he understands it. Jacques Monod

শুরুর কথা:  মানব সভ্যতার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী আর বৈপ্লবিক ধারনাটির জন্ম দিয়েছিলেন প্রতিভাবান বৃটিশ প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন: প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন। জীববিজ্ঞান তো বটেই বিজ্ঞানের নানা শাখায় এর প্রভাব সুদুরপ্রসারী। ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার মাষ্টারপিস On the Origin of Species বইটি, পৃথিবী এবং তার মধ্যে আমাদের নিজেদের অবস্থান সম্বন্ধে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীটাকে চিরকালের মত বদলে দিয়েছে; খুব সরল এই ধারনার মাধ্যমে, ডারউইন পেরেছিলেন জীবের সকল জটিলতা আর বৈচিত্রের সাধারন একটি ব্যাখ্যা দিতে। গত দেড় শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা তার এই ধারনাটির স্বপক্ষে প্রমান জুগিয়েছে, যা এখনও অব্যাহত আছে। বিবর্তন তত্ত্বের বিরোধীতার কারন কখনোই এর প্রমানের স্বল্পতা নয়, বরং এর সম্বন্ধে অজ্ঞতা। বিজ্ঞান এবং যুক্তির আলোয় কুসংস্কারমুক্ত জীবন উদযাপনের দিন হিসাবে চার্লস ডারউইনের জন্মদিন, ১২ ফেব্রুয়ারীকে বেছে নেয়া হয়েছিল নব্বই দশকের শুরুতে, আন্তর্জাতিক ডারউইন দিবস হিসাবে। ১২ ফেব্রুয়ারী, বিশ্ব ডারউইন দিবস  ডারউইনের প্রতি সন্মান জানিয়ে আমার এই প্রয়াস। এটি মুলত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেরি কয়েন  ( Jerry A. Coyne) এর Why Evolution is true  বইটির প্রথম অধ্যায় What is Evolution? এর একটি অনুবাদ প্রচেষ্টা। ডারউইনের অসাধারন ধারনাটি, বিবর্তন তত্ত্বটির মুলনীতিগুলোই সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এই লেখাটিতে। পুরো বইটি অনুবাদ অবশ্য অব্যাহত থাকবে, সেজন্য যারা আগ্রহী তাদের হয়ত ভবিষ্যতে আবার এই ব্লগে ফিরে আসতে হবে। আসুন আমরা চেষ্টা করি ক্রমশ বাড়তে থাকা অন্ধ কুপমন্ডুকতার ব্যতিক্রম হবার জন্য।

প্রথম অধ্যায়:
 বিবর্তন কি?

প্রকৃতি সম্বন্ধে যদি কোন কিছু  সত্যি হয়ে থাকে,তা হলো,যে কোন উদ্ভিদ এবং প্রানীকে দেখলে মনে হয়,তাদের  জীবন ধারনের জন্য, অত্যন্ত সুক্ষ্ম জটিলতার  সাথে এবং প্রায় নিখুঁতভাবে তাদের ডিজাইন বা পরিকল্পিনা করা হয়েছে । স্কুইড এবং  ফ্ল্যাটফিস,নিমেষে তাদের রঙ এবং শরীরের নকশা বদলে চারপাশের পরিবেশের সাথে মিশে যেতে পারে;শিকারী এবং শিকার,উভয়ের কাছেই অদৃশ্য হয়ে। বাদুড়দের আছে বিস্ময়কর রাডার,অন্ধকার রাতে যা তাদের পোকামাকড় খুজতে সাহায্য করে। হামিংবার্ডরা, যারা শুন্যে একই জায়গায় ভেসে থাকতে পারে আর এক পলকের মধ্যে বদলে ফেলতে পারে তাদের দিক,মানুষের তৈরী যে কোন হেলিকপ্টারের তুলনায় যা অনেক ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন এবং ফুলের গভীরে লুকিয়ে রাখা মধু খেতে তাদের আছে সুদীর্ঘ একটি জিহবা। এবং যে ফুলগুলোর মধু খেতে এরা যায়,তারাও আপাতদৃষ্টিতে পরিকল্পিত-হামিংবার্ডদের ব্যবহার করছে তাদের যৌন প্রজননে সহায়ক হিসাবে। কারন,যখন হামিংবার্ডরা ফুলের মধ্যে জিহবা ডুবিয়ে মধু খেতে ব্যস্ত থাকে,ফুল তাদের লম্বা ঠোটে পরাগরেণু মাখিয়ে দেয়,যেন পরাগরেণুরা হামিংবার্ডরা এর পরের যে ফুলের মধু খেতে যাবে,সেই ফুলকে যেন নিষিক্ত করতে পারে। প্রকৃতিকে দেখলেই মনে হতে পারে, যেন একটি নির্ঝঞ্চাট মসৃন ভাবে চলা যন্ত্র, প্রতিটি প্রজাতি যার কগ বা খাজ কাটা চাঁকা কিংবা গিয়ার।


ছবি: ফুলের মধু খাচ্ছে হামিংবার্ড ( ছবিসুত্র:  Alan Trammel; Alan Trammel Photography

এই সব কিছু তাহলে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে হয়? নিশ্চয়ই একজন মাষ্টার মেকানিক এর। এই বিখ্যাত উপসংহারটিই প্রস্তাব করেছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজ দার্শনিক উইলিয়াম প্যালে। তিনি বলেছিলেন,যদি আমরা মাটিতে পড়ে থাকা কোন একটি ঘড়ি খুজে পাই,আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবো, এটি সৃষ্টি করেছে কোন ঘড়ি নির্মাতা। সেভাবেই,সুঅভিযোজিত জীবদের অস্তিত্ব এবং তাদের সুক্ষ্মতম জটিল বৈশিষ্টগুলো নিশ্চয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে একটি সচেতন স্বর্গীয় ডিজাইনার বা পরিকল্পনাকারীর -অর্থাৎ একজন ঈশ্বর এর। দর্শনের ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত,পেইলী প্রস্তাবিত সেই যুক্তিটি বা আর্গুমেন্টটিকে আসুন একটু লক্ষ্য করি:

আমরা যখন কোন একটি ঘড়িকে সংবীক্ষন করি,আমরা বুঝতে পারি…..এর বিভিন্ন অংশের তৈরী করা একটি কাঠামোয় এদের একত্র করা হয়েছে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে,যেমন,তাদের এমনভাবে গঠন করা হয়েছে এবং তাদের কাজে আনা হয়েছে এমন একটি সুক্ষ্ম সামন্জষ্য,যেন তারা একটি গতি র সৃষ্টি করতে পারে এবং এই গতিটি এতই সুক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রিত যে, সেটি দিনের প্রতিটি ঘন্টাকে নির্দেশ করতে সক্ষম হয়। এবং, সেকারনেই, যদি এর বিভিন্ন অংশ তাদের বর্তমান আকার থেকে ভিন্ন হতো,কিংবা যদি, এখন যেমন আছে তার চেয়ে  ভিন্ন আয়তনের বা ভিন্ন কোন উপায়ে তাদের সাজানো হত,বা যে ক্রমবিন্যাসে অংশ গুলো এখন অবস্থান করছে সেখানে ‍যদি কোন পরিবর্তন করা হতো,সেক্ষেত্রে এই যন্ত্রটিতে হয় আর কোন গতিই পরিলক্ষিত হতো না অথবা এমন কোন গতি সেখানে তৈরী হতো না, যা এই যন্ত্রটি বর্তমানে যে কাজটি করছে, তা করতে সক্ষম হত…..উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রতিটি চিহ্ন,কিংবা পরিকল্পনার প্রতিটি প্রকাশ,যার অস্তিত্ব এই ঘড়িটির মধ্যে বিদ্যমান,প্রকৃতির কাজের মধ্যেও তারও অস্তিত্ব বিদ্যমান,শুধু পার্থক্য, প্রকৃতির ক্ষেত্রে তা আরো সুবিশাল এবং বেশী,এবং সেটি এমন মাত্রার,যা সব গননার অতীত।

যে যুক্তি পেইলী এত সুন্দর বাগ্মীতার সাথে প্রস্তাব করেছিলেন,তা একই সাথে সাধারন বোধ নির্ভর এবং সুপ্রাচীন। তিনি এবং তার সহকর্মী,’প্রাকৃতিক ধর্মতাত্ত্বিক’ রা যখন নানা ধরনের উদ্ভিদ এবং প্রানীদের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করছিলেন, তাদের বিশ্বাস ছিল: ঈশ্বরের মহিমা এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতা,যা তার সুপরিকল্পিত সৃষ্টির মধ্যে প্রকাশমান, তারই তালিকা তৈরী  করছেন তারা।

ডারউইন নিজেও এই ডিজাইনের বা সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার প্রশ্ন তুলেছিলেন – ১৮৫৯ সালে এটিকে চিরতরে বাতিল করার আগে-

কেমন করে,সমষ্ঠিগত জীবনের এক অংশের সাথে অন্য অংশের এবং জীবনের নানা পরিস্থিতিগুলোর সাথে এবং একক ভাবে কোন একটি সুপৃথক জীবের মধ্যে দৃশ্যমান ঐসব অসাধারন চমকপ্রদ অভিযোজনগুলো কিভাবে এর নিখুত উৎকর্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে? আমরা কাঠ ঠোকরা আর মিসেলটোর মধ্যে চমৎকার সুন্দর এইসব সহ-অভিযোজনগুলো অনায়াসে দেখতে পাই। এবং শুধুমাত্র খানিকটা কম স্পষ্টভাবে দেখতে পাই অতিক্ষুদ্র পরজীবিদের মধ্যে, যারা চতুষ্পদী প্রানীদের চুল কিংবা পাখীর পালকের সাথে দৃঢ়ভাবে এঁটে থাকে;কিংবা গুবরে পোকাদের গঠনে যারা পানির মধ্যে ডুব দিতে পারে; কিংবা পালকসহ বীজের মধ্যে যাদের সামান্যতম হালকা বাতাস আলতো করে ভাসিয়ে নিয়ে যায়; সংক্ষেপে, আমরা  এই জৈব পৃথিবীর সর্বত্র এবং সর্বাংশে বিস্ময়করভাবে চমৎকার সব অভিযোজন দেখতে পাই।

ডিজাইন বা পরিকল্পনার অমীমাংসিত ধাঁধার একটি নিজস্ব উত্তর ডারউইনের ছিল। একজন খুবই উৎসাহী আর মনোযোগী প্রকৃতি বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন, মুলত: ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেখানে ঘটনাচক্রে, তিনি পেইলীর প্রাক্তন কক্ষেই থাকতেন) পড়াশুনা করছিলেন ধর্মযাজক হবার জন্য;  খুব ভালো করেই তিনি জানতেন পেইলীর মত এই ধরনের যুক্তিগুলোর সম্মোহনী ক্ষমতা। যত বেশী কেউ উদ্ভিদ আর প্রানীদের সম্বন্ধে জানবে, তত বেশী তারা আসলে বিস্মিত হবেন, কি অসাধারনভাবেই না তাদের ডিজাইন বা পরিকল্পনা করা হয়েছে যা তাদের জীবনের জন্য দারুনভাবে মানানসই। এই চমৎকার মানানসই হবার বিষয়টি, কোন ’সচেতন’ ডিজাইন বা পরিকল্পনাকেই প্রতিফলিত করছে, এমন একটি অনুমানসিদ্ধ উপসংহারের চেয়ে আর  কিইবা স্বাভাবিক হতে পারে? কিন্তু তারপরও ডারউইন এই ’সুস্পষ্ট’ উপসংহার ছাড়া আরো বেশী কিছু ভেবেছিলেন, এবং প্রস্তাব করেছিলেন -এবং এর স্বপক্ষে যথেষ্ট পরিমান প্রমান সহ -দুটি অসাধারন ধারনা, যা চিরকালের মত জীব সৃষ্টিতে সুপরিকল্পিত সচেতন কোন বুদ্ধিমান সত্ত্বার ডিজাইন বা পরিকল্পনার ধারনাটির চুড়ান্ত অসারতা প্রমান করে অপনোদন করেন। তার সেই আইডিয়া বা ধারনাগুলো হলো, বিবর্তন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচন।

তিনি কিন্তু প্রথম না যিনি বিবর্তনের কথা ভেবেছিলেন-তার আগেই বেশ কয়েকজন, তার নিজের পিতামহ ইরাসমাস ডারউইন সহ, জীবন যে বিবর্তিত হয়েছে এই ধারনাটির সুচনা করেছিলেন। কিন্তু ডারউইন হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যিনি প্রকৃতি থেকে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে বিবর্তন প্রক্রিয়াটি সত্য , কিন্তু তার প্রাকৃতিক নির্বাচনের ধারনাটি ছিল প্রকৃতপক্ষে নতুন এবং অভিনব; তার অসাধারন প্রতিভারই স্বাক্ষ্য দেয় যে বিষয়টি তা হলো, প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্বের যে ধারনাটি, ১৮৫৯ সালের আগে বেশীর ভাগ শিক্ষিত পশ্চিমা জনগোষ্ঠী গ্রহন করে নিয়েছিলেন, একটি ৫০০ পাতার বই প্রকাশের অল্প কয়েকবছরের মধ্যে তা পরাভুত হয়। অন দি অরিজিন অব স্পিসিস বইটি জীবনের বৈচিত্রতার সব রহস্যময়তাকে পুরাণ কাহিনী থেকে রুপান্তরিত করে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানে ।

তাহলে. ’ডারউইনিজম’ ‍কি? ( বিবর্তন থিওরী বা তত্ত্বকে এখনো বলা হয়,ডারউইনিজম; যদিও বিষয় হিসাবে এটি,ডারউইন যতটুকু প্রস্তাব করেছিলেন,তার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে বহু আগেই, যেমন তিনি ডিএনএ বা মিউটেশন সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না; এধরনের কোন একক ব্যাক্তির নামের সাথে কোন বিষয়ের ‍ নামকে সংযুক্ত করার এই ইপোনমির উদহারনটি বেশ ব্যতিক্রম বিজ্ঞানের ইতিহাসে,আমরা ক্ল্যাসিকাল পদার্থবিদ্যাকে নিউটনিজম বা আপেক্ষিকতাকে আইনেস্টাইনিজম বলিনা। কিন্তু ডারউইন তার ধারনায় এতো বেশী সঠিক ছিলেন এবং তার ’অন দি অরিজিন অব স্পিসিস‘ বইটির মাধ্যমে বিষয়টিকে এতো ব্যাপক পর্যবেক্ষনের ‍ভিত্তির উপর দাড় করাতে পেরেছিলেন যে, সেকারনে অনেকের কাছেই বিবর্তন জীববিজ্ঞান তার নামের সমার্থক এ রুপান্তরিত হয়েছে। এই বইটিতে অনেক অধ্যায়ে আমি প্রায়শই ‘ডারউইনিজম’ শব্দটি ব্যবহার করবো,কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমি এর মাধ্যমে আধুনিক বিবর্তন জীববিজ্ঞানের থিওরীকে বোঝাতে চাচ্ছি) : প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন তত্ত্ব,খুবই সরল অথচ প্রগাঢ় সুন্দর এই তত্ত্ব; প্রায়শই যার সম্বন্ধে ভ্রান্ত একটা ধারনা পোষন করা হয় এবং এমনকি কখনো কখনো উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও বিদ্বেষপুর্ণভাবেই একে এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে, সে কারনেই উচিৎ হবে কয়েক মুহুর্তর বিরতি নেয়া, এবং এই তত্ত্বটির মুল বিষয় এবং এর প্রস্তাবিত দাবীগুলো প্রথমে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। কারন পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আলোচনার সময় আমরা বারবার এই মুল বিষয়গুলোতে ফিরে আসবো, সেই সংক্রান্ত প্রমানগুলো বিষদভাবে আলোচনা করার সময়।

আধুনিক বিবর্তন তত্ত্বর মুল বিষয়টিকে কিন্তু খুব সহজেই বোঝা সম্ভব; বিষয়টিকে সংক্ষেপে একটি বাক্য (যদিও খানিকটা দীর্ঘ) দ্বারা প্রকাশ করা যেতে পারে: পৃথিবীতে জীবন বিবর্তিত হয়েছে ক্রমান্বয়ে একটি আদিমতম প্রজাতি থেকে শুরু হয়ে-হয়ত আত্মপ্রতিলিপিকারী একটি অনু-যা প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বছর আগে জীবিত ছিল; এর পর  সময়ের সাথে এটি বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় বিভাজিত হয়ে অসংখ্য নতুন এবং বিচিত্র প্রজাতির জীবের জন্ম দেয়; এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই (কিন্তু সবক্ষেত্রে নয়) এই ইভোল্যুশনারী বা বিবর্তনীয় পরিবর্তনের কর্মপদ্ধতি বা মেকানিজম হচ্ছে প্রাকৃতিক নির্বাচন বা ন্যাচারাল সিলেকশন।

যদি উপরের বাক্যটিকে, এর সরলতম মুল অংশগুলোয় ভাগ করা যায়, লক্ষ্য করবেন, বাক্যটিতে মোট ছয়টি প্রধান উপাদান আছে যা বিবর্তন তত্ত্বর মুল বিষয়গুলোকে প্রতিনিধিত্ব করছে: বিবর্তন, ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তন বা গ্রাজুয়ালিজম, স্পিসিয়েশন বা প্রজাতিকরণ, জীবজগতে সকল জীবের একটি কমন আনসেষ্ট্রি বা সাধারণ বংশধারা, প্রাকৃতিক নির্বাচন বা ন্যাচারাল সিলেকশন এবং ননসিলেকটিভ বা প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়া অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলো যা বিবর্তনীয় পরিবর্তন করতে সক্ষম। আসুন পরীক্ষা করে দেখি, এই অংশগুলোর প্রতিটি, বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কি অর্থ বহন করছে।

প্রথম ধারনাটিই হচ্ছে ’বিবর্তন’ এর ধারনা নিজেই। খুব সরলভাবে এর অর্থ হচ্ছে, সময়ের সাথে ধীরে ধীরে যে কোন একটি প্রজাতির মধ্যে জীনগত বা জেনেটিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়। অর্থাৎ অনেকগুলো প্রজন্মান্তরে একটি প্রজাতি বিবর্তিত হতে পারে সম্পুর্ন ভিন্ন কোন কিছুতে এবং এইসব পার্থক্যগুলোর ভিত্তি হচ্ছে তাদের ডিএনএ’তে সংঘটিত পরিবর্তনসমুহ, যার উৎপত্তি ঘটছে কিছু মিউটেশন বা পরিব্যক্তি  হিসাবে। প্রানী এবং উদ্ভিদের যে প্রজাতিগুলো বর্তমানে আমরা জীবিত দেখছি, তারা অতীতে  একটি সময়ে কিন্তু  ছিলনা, কিন্তু অতীতে যাদের অস্তিত্ত্ব ছিল, এরা তাদেরই উত্তরাধিকার, তাদের লিনিয়েজেই এদের জন্ম। আমরা মানুষরা, যেমন বিবর্তিত হয়েছি এইপ-সদৃশ একটি প্রানী থেকে, তবে তারা বর্তমানে অস্তিত্ব আছে এমন আধুনিক কোন এইপদের মত হুবুহু কোন প্রানী ছিল না।

যদিও প্রতিটি প্রজাতি বিবর্তিত হয়, তাদের এই বিবর্তনের হার কিন্তু একই রকম নয়। কিছু প্রজাতি যেমন, হর্স শ্যু ক্র্যাব এবং গিংকো গাছ, বহু মিলিয়ন বছর ধরে যাদের খুব সামান্যই পরিবর্তিত হয়েছে। কোন একটি প্রজাতি অবিরতভাবে সবসময়ই বিবর্তিত হতে থাকবে কিংবা যখন তারা বিবর্তিত হবে, কত দ্রুত তারা পরিবর্তিত হবে, বিবর্তন তত্ত্ব কিন্তু এমন কোন ভবিষদ্বানী করেনা। কারন তা নির্ভর করবে, কি ধরনের বিবর্তীন চাপ বা ইভোল্যুশনারী প্রেশার এর অভিজ্ঞতা তাদের হয়। কিছু প্রানীদের গ্রুপ, যেমন মানুষ এবং তিমি বিবর্তিত হয়েছে বেশ দ্রুত, অন্যদিকে অন্য কিছু প্রানীদের গ্রুপ, যেমন সিলাকানথ , ‘জীবন্ত ফসিল’, এখনও দেখতে তারা প্রায় হুবুহু তাদের আদি পুর্বসুরী প্রানীদের মত, যারা কয়েক শত মিলিয়ন বছর আগে বেচে ছিল।

বিবর্তন তত্ত্বের দ্বিতীয় অংশটি হলো ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ধারনাটি বা গ্রাজুয়ালিজম। অনেকগুলো প্রজন্ম অতিক্রম করতে হয় প্রজাতিতে কোন উল্লেখযোগ্য বিবর্তনীয় পরিবর্তন সৃষ্টির জন্য; যেমন সরীসৃপদের থেকে পাখিদের বিবর্তন। নতুন কোন উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যর বিবর্তন, যেমন চোয়াল এবং দাঁত, যা স্তন্যপায়ীদের পৃথক করেছে সরীসৃপদের থেকে, কিন্তু  একটি মাত্র বা অল্প কিছু প্রজন্মের মধ্যেই ঘটে না, বরং সাধারণত এর জন্য প্রয়োজন হয় শত শত বা হাজার হাজার-এমনকি মিলিয়ন মিলিয়ন প্রজন্মান্তরের। সত্যি, কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটে অপক্ষোকৃত বেশ দ্রুততার সাথে। অনুজীব ( যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস) জনগোষ্ঠীতে প্রজন্মের জীবনকালের দৈর্ঘ্য খুবই সংক্ষিপ্ত, কারো কারো ক্ষেত্রে মাত্র বিশ মিনিটের মত সংক্ষিপ্ত। এর অর্থ হচ্ছে,  এই অনুজীব প্রজাতিগুলো যথেষ্ট পরিমানে বিবর্তিত হতে পারে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই, যার ফলাফল অসুখ সৃষ্টিকারী ব্যাক্টেরিয়া এবং ভাইরাসদের মধ্যে হতাশাজনকভাবে খুব দ্রুত হারে বাড়তে থাকা ড্রাগ রেসিস্টট্যান্স এর ঘটনা (এরা এদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত নানা অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিভাইরালের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে); এবং এটাও মনে রাখা দরকার, বিবর্তনের অনেক উদহারনই আছে যেগুলো ঘটেছে মানুষের জীবনকালের মধ্যেই। কিন্তু আমরা যখনই কোন আসলেই কোন ’বড়’ পরিবর্তনের কথা বলি, আমরা সাধারনত বলতে চাই এমন কোন পরিবর্তনের কথা যার জন্য প্রয়োজন বহু হাজার বছর বা অনেক ব্যাপ্তির একটি সময়কাল। প্রতিটি প্রজাতি একটি নির্দিষ্ট সমান হারে বিবর্তিত হচ্ছে,গ্রাজুয়ালিজম এর অর্থ কিন্তু তা নয়। ঠিক যেমন বিভিন্ন প্রজাতি কত দ্রুত হারে বিবর্তিত হচ্ছে, সেখানে যেমন আন্তপ্রজাতি ভিন্নতা আছে, ঠিক তেমনি কোন একটি প্রজাতি, কত দ্রুত কিংবা মন্থর গতিতে বিবর্তিত হয় সেটি তাদের উপর আরোপিত বিবর্তনীয় চাপের তারতম্য অর্থাৎ বাড়া বা কমার উপরও নির্ভর করে। যখন প্রাকৃতিক নির্বাচন (নির্বাচনী চাপ বা সিলেকশন প্রেশার) শক্তিশালী,যেমন, যখন কোন প্রানী বা উদ্ভিদ প্রজাতি কোন নতুন একটি পরিবেশে তাদের অস্তিত্ব বিস্তার করে বা কলোনাইজ করে, বিবর্তনীয় পরিবর্তনও খুক দ্রুত ঘটতে পারে। যখনই প্রজাতিটি একটি সুস্থির আবাস স্থলে ভালো করে অভিযোজিত হয়,বিবর্তনী পরিবর্তনের হার তখন প্রায়শই মন্থর হয়ে পড়ে।

এর পরের দুটি মুলনীতি হলো আসলে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। একটা অসাধারন বিস্ময়কর এবং উল্লেখযোগ্য বাস্তব সত্য হচ্ছে,অসংখ্য প্রজাতির অস্তিত্ব থাকলেও,আমরা সবাই -আপনি,আমি,হাতি আর টবের ক্যাকটাস – সবারই কিছু গুরুত্বপুর্ণ মৌলিক বৈশিষ্ট কিন্তু একই। এর মধ্যে আছে যেমন,প্রানরাসায়নিক যে বিক্রিয়ার ধাপগুলো আমরা ব্যবহার করি কোষের মধ্যে শক্তি প্রস্তুত করতে,আমাদের চার অক্ষর বিশিষ্ট ডিএনএ কোড বা সংকেত এবং যেভাবে এই কোডটি পড়া হয় এবং অনুদিত (ট্রান্সলেট) হয় সংকেত নির্দিষ্ট  প্রোটিন তৈরীর প্রক্রিয়ায়। এটাই বলে দিচ্ছে প্রতিটি প্রজাতি তাদের দুর অতীতের একটি সাধারন বা কমন আদি প্রানী থেকে বিবর্তিত,যে আদি পু্র্বসুরী জীবের মধ্যে এইসব সাধারণ বৈশিষ্টগুলো ছিল, যা সেই বৈশিষ্টগুলো তারা তাদের উত্তরসুরী বা বংশধরদের মধ্যে হস্তান্তর করেছে। কিন্তু লক্ষ্য করুন, বিবর্তন বলতে যদি শুধুমাত্র একটি প্রজাতির মধ্যে ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে পরিবর্তনকে বোঝাতো, তাহলে আমরা আজ শুধুমাত্র একটি প্রজাতিকে দেখতাম পেতাম,  যা পৃথিবীর প্রথম প্রজাতির থেকে বংশানুক্রমে উদ্ভুত একক, অত্যন্ত্য জটিলভাবে উচ্চমাত্রায় বিবর্তিত কোন একটি উত্তরসুরী প্রজাতি। কিন্তু আমরা পৃথিবীতে একটা প্রজাতির বদলে দেখছি অসংখ্য প্রজাতি; বিজ্ঞানীদের বর্তমান ধারনা অনুযায়ী, প্রায় ১০ মিলিয়নেরও বেশ কিছু বেশী সংখ্যক প্রজাতির বসবাস এই পৃথিবীতে; এবং এছাড়া জীবাশ্ম রেকর্ড থেকে আমরা ইতিমধ্যেই জানি প্রায় আরো সিকি মিলিয়ন প্রজাতির অস্তিত্বর কথা। কোন সন্দেহ নেই জীবজগতের অসাধারন বিস্ময়কর বৈচিত্রময়তা সম্পর্কে। কেমন করে তাহলে,একটিমাত্র আদি পুর্বসুরী প্রানী থেকে এই অসাধারন জীববৈচিত্রতার উদ্ভব হলো? এই ধারনাটি ব্যাখ্যা করতে প্রয়োজন, বিবর্তনের তৃতীয় ধারনাটি: সেটি হলো বিভিন্ন প্রজাতিতে জীবের বিভাজন প্রক্রিয়া বা স্প্লিটিং অথবা আরো সঠিকভাবে বললে, ’স্পিসিয়েশন’, প্রজাতি উদ্ভব প্রক্রিয়া বা প্রজাতিকরণ।

নিচের ছবিটি (ডায়াগ্রাম ১) লক্ষ্য করুন, খুব সাধারন একটি বিবর্তন ট্রি বা বৃক্ষর এই ডায়াগ্রামটি দেখাচ্ছে, পাখিদের (বার্ড) এবং সরীসৃপদের (রেপটাইল) মধ্যে পারস্পরিক বিবর্তনীয় সম্পর্ক। অবশ্যই আপনারা অনেকেই এধরনের ট্রি বা বৃক্ষ ডায়াগ্রাম দেখেছেন আগে, আসুন আমরা নিচের ছবিটিকে আরেকটু ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করি বোঝার জন্য আসলে ড্রায়াগ্রামটা আমাদের কি তথ্য দিচ্ছে: আসলেই কি ঘটে, ধরুন, যখন জোড় বা নোড এক্স (X) দুটি লিনিয়েজ বা বংশধারায় বিভক্ত হয়, একটি লিনিয়েজে আধুনিক সরীসৃপ প্রজাতিগুলো, যেমন লিজার্ড এবং সাপদের বংশধারা বিবর্তিত হয়, অন্য লিনিয়েজ ধারায় তাদের ডায়নোসরীয় আত্মীয়দের বংশধার বিবর্তিত হয়? নোড এক্স (X)একটি একক ’আদি পুর্বসুরী প্রানী’ র প্রতিনিধিত্ব করছে; কোন একটি প্রাচীন সরীসৃপ বা রেপটাইল , যা দুটি উত্তরসুরী প্রজাতিতে বিভাজিত হয়েছে। এর একটি বংশধারা বা লিনিয়েজ, তার নিজস্ব পথে আরো অনেকবার বিভাজিত হয়ে, সকল ডায়নোসর এবং আধুনিক পাখীদের প্রজাতিতে বিবর্তিত হয়। অন্যধারাটিও তাই করে, আরো বহুবার বিভাজিত হয়ে বিবর্তিত হয় বেশীভাগ আধুনিক সরীসৃপদের নানা প্রজাতিতে। এই সাধারন বা কমন পুর্বসুরী X কে বলা হয়, ‘মিসিং লিঙ্ক’ বা উত্তরসুরী সব জীবদের পরস্পরের মধ্যে হারানো যোগসুত্র, এটাই আধুনিক সরীসৃপ প্রানী এবং পাখীদের মধ্যে বংশগতির বা জিনিয়ালজিক্যাল যোগসুত্র; এটা হচ্ছে সেই যোগসুত্র, উত্তরসুরী প্রজাতিদের সবার অতীত বরাবর পেছনে গেলে আমরা মিলিত হই যে একটি জায়গাটায়। এই ডায়াগ্রামে আরো অপেক্ষাকৃত কম প্রাচীন ’মিসিং লিঙ্ক’ ও আছে। যেমন, নোড Y, এই প্রজাতিটি দুই পায়ে চলা মাংশাসী ডায়নোসর, যেমন Tyrannosaurus rex (যারা সবাই এখন বিলুপ্ত) এবং আধুনিক পাখিদের কমন বা সাধারণ পুর্বসুরী প্রানী। কিন্ত‍ু যদিও সেই সাধারন পু্র্বসুরী প্রানীদের আজ অস্তিত্ব নেই, এবং তাদের জীবাশ্ম খুজে পাওয়া অনেক সময়ই প্রায় অসম্ভব একটি কাজ( কারন তারা হাজার হাজার জীবাশ্ম প্রজাতির মধ্যে একটি মাত্র প্রজাতিকে প্রতিনিধিত্ব করে); আমরা মাঝে মাঝে এমন কিছু জীবাশ্মর সন্ধান পেতে পারি, যাদের সাথে এই ’মিসিং লিঙ্ক’ প্রজাতির ঘনিষ্ট সম্পর্ক আছে, তারা এমন কোন প্রজাতির প্রতিনিধিত্ব করে, যাদের সম্পর্কযুক্ত সাধারন কমন বংশধারার প্রজাতিদের সাধারন বৈশিষ্টগুলো আছে। যেমন ’পালকসহ ডায়নোসর’ দের জীবাশ্ম, যা নোড Y কমন পুর্বসুরী প্রজাতির অস্তিত্ব প্রমান করে।


ডায়াগ্রাম ১: একটি উদহারন যা সরীসৃপ প্রানীদের কমন বা সাধারন পুর্বসুরী প্রানীদের দেখাচ্ছে।  পরবর্তীতে বিবর্তিত হওয়া নানা ফর্ম এর  X এবং Y হচ্ছে আদি পুর্বসুরী প্রজাতি। (পৃষ্ঠা ৫, Why Evolution Is True, Jerry Coyne)

তাহলে কি ঘটে যখন পুর্বসুরী প্রানী X, দুটি ভিন্ন প্রজাতিতে বিভাজিত হয়? বেশী কিছু না আসলে, আমরা পরবর্তীতে সেটা দেখবো, খুব সরলার্থে স্পিসিয়েশন বা প্রজাতিকরণ বলতে বোঝায়, বিভিন্ন গ্রুপগুলির বিবর্তন, যে গ্রুপগুলির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে প্রজনন (আন্ত: গ্রুপ সদস্যরা) করতে পারেনা – এর মানে এরা তাদের জীন আদান প্রদান করতে পারেনা। যদি তখন আমরা সেখানে থাকতাম, আমরা যা দেখতাম তাহলো, এই আদি কমন পুর্বসুরী প্রানীটি (X) যখন বিভাজিত হতে শুরু করেছে একটি সরীসৃপ প্রজাতির শুধুমাত্র দুটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীতে, সম্ভবত এই জনগোষ্ঠীগুলো ভিন্ন ভিন্ন ভৌগলিক অবস্থানে বসবাস করে এবং সামান্য কিছু আন্ত গ্রুপ পার্থক্য হয়তো ইতিমধ্যে এদের মধ্যে বিবর্তিত হতে শুরু করেছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলে, এই পার্থক্যগুলো ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এবং অবশেষে দুই জনগোষ্ঠীতে এমন যথেষ্ট পরিমান পার্থক্য  বিবর্তিত হয়, যে তারা আর পরস্পরের মধ্যে প্রজনন করতে পারেনা ( অনেকভাবেই ব্যপারটা হতে পারে:  প্রজাতির ভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্যরা হয়তো একে অপরকে প্রজননসঙ্গী হিসাবে আর আর আকর্ষনীয় মনে করে না, অথবা তারা যদি প্রজননও করে,তাদের প্রজন্ম  হতে পারে স্টেরাইল বা নীর্বীজ, যা পরবর্তীতে আর কোন প্রজন্মের জন্ম দিতে পারেনা। বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতিরা, তাদের ফুলের পরাগায়নের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরাগায়নকারী প্রানীর ব্যবহার শুরু করতে পারে, অথবা তাদের ফুল ফোটার সময়ে ভিন্নতা আসে, যা প্রকারন্তরে আন্তপরাগায়নকেই বাধা দেয়)।

বহু মিলিয়ন বছর পরে আরো অনেক বিভাজন প্রক্রিয়া অতিক্রান্ত হলে, একটি উত্তরসুরী ডায়নোসর প্রজাতি, নোড Y,নিজেই দুটি আরো দুটি প্রজাতিতে দ্বি বিভক্ত হয়, যার একটি একসময় বিবর্তিত হয় দুইপা বিশিষ্ট  বা বাইপেডাল, মাংশাসী ডায়নোসর প্রজাতিদের এবং অন্যটি জীবিত সব পাখিদের প্রজাতি। বিবর্তন  ইতিহাসের এই ক্রান্তিকালীন মুহুর্তে, সকল পাখিদের পুর্বসুরী প্রানীর উদ্ভব কিন্তু সেই সময়ের খুব নাটকীয় কোন বিষয় ছিল না, অর্থাৎ হঠাৎ করেই আমরা সরীসৃপ থেকে উড্ডয়নক্ষম পাখীর উদ্ভব হতে দেখতাম না বরং শুধুমাত্র দেখতাম সামান্য পার্থক্যের বৈশিষ্ট সহ একই ডায়নোসর প্রজাতির দুটি জনগোষ্ঠী; বর্তমানে বিভিন্ন মানুষের জনগোষ্ঠী যেমন পরস্পর থেকে ভিন্ন, সেরকমই, এর চেয়ে বেশী কিছু না। সব গুরুত্বপুর্ন পরিবর্তনগুলো ঘটে বিভাজিত হবার পর হাজার হাজার প্রজন্মান্তরে, যখন নির্বাচন একটি লিনিয়েজ এর উপর কাজ করে, উড্ডয়ন ক্ষমতার বৈশিষ্টর উন্নতি সাধন বা প্রোমোট করতে সাহায্য করে, অন্য লিনিয়েজ এ তা উন্নতি সাধন বা প্রোমোট করে বাইপেডাল (দ্বিপদী) ডায়নোসরদের বৈশিষ্টগুলোকে । শুধুমাত্র অতীতের দিকে তাকিয়েই আমরা শনাক্ত করতে পারি প্রজাতি Y হচ্ছে টি রেক্স এবং সব পাখিদের সাধারন পুর্বসুরী প্রানী। এই বিবর্তনীয় পরিবর্তন খুব মন্থর গতির, এবং পরিবর্তনগুলো শুধু তখনই খুব উল্লেখযোগ্য আর চোখে পড়ার মত মনে হয়,যখন আদি পুর্বসুরী প্রানী থেকে বহু বিভাজিত হওয়া উত্তরসুরী প্রজাতিগুলো বিবর্তনের ধারায় যখন আমরা ক্রমানুসারে সাজাই।

কিন্তু প্রজাতিদের বিভাজিত হতে কবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তারা বিভাজিত হবে কি না, তা নির্ভর করে,  (পরের অধ্যায়গুলোতে আমরা যা দেখবো),সেই পরিস্থিতিগুলোর উদ্ভবের উপর, যেগুলো কোন জনগোষ্ঠীতে যথেষ্ট পরিমানের ভিন্নতা বিবর্তনের সুযোগ করে দেয় ,যেন তারা নিজেদের মধ্যে আর প্রজনন করতে পারেনা। বেশীর ভাগ প্রজাতি-শতকরা ৯৯ ভাগের বেশী প্রজাতি-কোন উত্তরসুরী প্রজাতি ছাড়াই বিলুপ্ত হয়েছে। আবার কোন প্রজাতি যেমন গিংকো গাছ,বহু মিলিয়ন বছর ধরে অপরিবর্তিত আছে নতুন অনেক প্রজাতির সৃষ্টি ছাড়াই। স্পিসিয়েশন বা প্রজাতিকরণ খুব ঘন ঘন কিন্ত ঘটেনা। কিন্তু যখনই একটি প্রজাতি দুটি প্রজাতিতে বিভাজিত হয়, ’ভবিষ্যত’ স্পিসিয়েশন এর সম্ভবনা ও সুযোগ দ্বিগুন বেড়ে যায়,সুতরাং প্রজাতির সংখ্যাও গানিতীক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। যদিও স্পিসিয়েশন খুব ধীরগতির,কিন্তু ইতিহাসের সুদীর্ঘ সময়ের ব্যাপ্তিকালে যথেষ্ট পরিমান প্রায়শই ব্যপারটা ঘটে এবং সেটাই শুধু খুব সহজেই ব্যাখ্যা করতে পারে পৃথিবীতে জীবিত উদ্ভিদ এবং প্রানীদের বিস্ময়কর বৈচিত্র্যতা।

স্পিসিয়েশন বা প্রজাতিকরণ প্রক্রিয়া ডারউইনের কাছে এতই গুরুত্বপুর্ণ ছিল যে,তিনি তার বিখ্যাত বইটির শিরোনাম দিয়েছিলেন এটি এবং বইটি বেশ কিছু স্বাক্ষ্যপ্রমানও দিয়েছে প্রজাতিকরণ প্রক্রিয়ার। পুরো ’অন দি অরিজিন’ ‘বইটির একটি মাত্র ডায়াগ্রামই ছিল,ছবি ১ এর সদৃশ একটি বিবর্তনীয় বৃক্ষ। কিন্তু ডারউইন সেই সময় তার বইটিতে আসলে ব্যাখ্যা করেননি, কেমন করে প্রজাতির উদ্ভব হয়,কারন জেনেটিক্স বা জীনতত্ত্ব সম্বন্ধে কোন ধারনা না থাকার কারনে তিনি কখনো আসলে বুঝতে পারেননি,প্রজাতিকে ব্যাখ্যা করা মানে জীন আদান প্রদানের ক্ষেত্রে  বাধা গুলোকে ব্যাখ্যা করা।  প্রজাতিকরণ আসলে কেমন করে ঘটে সে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার পর্ব শুরু হয় মাত্র ১৯৩০ এর দশকে (এ বিষয়ে পরবর্তীতে আমি অবশ্যই আরো বিস্তারিত বলবো সপ্তম অধ্যায়ে, আমি নিজস্ব গবেষনার ক্ষেত্র সেটা-জেরী কয়েন)।

যদি জীবনের নানা ফর্মের বা জীবের ইতিহাসকে একটি বৃক্ষ হিসাবে ভাবা যায়, যেখানে সকল প্রজাতি একটি মাত্র কান্ড থেকে উদ্ভব হয়েছে, তবে যুক্তিযুক্ত ভাবেই যদি আমরা অনুসন্ধান করি, প্রতিটি জোড়া শাখার (বর্তমানে জীবিত প্রজাতির প্রতিনিধি) একটি কমন বা সাধারন উৎপত্তি খুজে পাওয়া যাবে, এর প্রশাখা এবং শাখা বরাবর এদের উৎস যেখানে এসে বিভাজিত হবার ঠিক আগে এরা একীভুত আছে যেখানে, সেখানে। আমরা আগের আলোচনায় যেমন দেখেছি এই সংযোগ স্থানটি বা নোডটি , এই দুটি প্রজাতির  কমন আদি পুর্বসুরীকে নির্দেশ করছে। এবং জীবন যদি একটি প্রজাতি দিয়ে যাত্রা শুরু করে থাকে এবং বহু মিলিয়ন উত্তরসুরী প্রজাতিতে বহু বিভাজিত হয়, তাহলে স্পষ্টতই প্রতিটি জোড়া প্রজাতি তাদের অতীতে কোন এক সময় একটি সাধারন বা কমন পুর্বসুরী জীব থেকে উদ্ভুত হয়েছে। ঘনিষ্ট সম্পর্ক যুক্ত প্রজাতি, ঘনিষ্ট সম্পর্ক যুক্ত মানুষেদের মতই কমন বা সাধারন আদি পুর্বসুরীদের উত্তরপুরুষ, যারা মোটামুটি একটি নিকটবর্তী কোন অতীতে বেঁচে ছিল। অন্যদিকে আরো দুরবর্তী সম্পর্কযুক্ত প্রজাতিদের কমন আদি পুর্বসুরী , দুরবর্তী সম্পর্কযুক্ত মানুষের  মতই  আরো কোন দুরবর্তী অতীতে বেচে  ছিল। এভাবে একটি ’কমন অ্যান্সেস্ট্রি বা বংশধারা’ র ধারনাটি –ডারউইনিজমের চতুর্থ টেনেট বা মুলনীতি – আসলে স্পিসিয়েশনের বা প্রজাতিকরণের উল্টোপিঠ। এর সাধারন একটি অর্থ হলো, আমরা যে কোন সময়ই ‍অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে পারি, ডিএনএ অনুক্রম কিংবা ফসিল ব্যবহার করে এবং দেখতে পারি উত্তরসুরীদের বংশধারা কিভাবে তাদের কমন পুর্বসুরী প্রানীদের সাথে মিলিত হচ্ছে।


ডায়াগ্রাম ২: মেরুদন্ডী প্রানীদের একটি ফাইলোজেনী ( বিবর্তন বৃক্ষ); যা প্রদর্শন করছে বিবর্তন প্রক্রিয়া কিভাবে নানা বৈশিষ্টগুলোর এবং বৈশিষ্টগুলো বহনকারী প্রানীদের একটি হায়ারআর্কিয়াল গ্রুপিং  তৈরী করে। কালো ডটগুলো ইঙ্গিত করছে বিবর্তন বৃক্ষের কোন পর্যায়ে এই বৈশিষ্টগুলোর উদ্ভব হয়েছে।  (পৃষ্ঠা ৯, Why Evolution Is True, Jerry Coyne);

আসুন আরো একটি বিবর্তনীয় বৃক্ষ পরীক্ষা করে দেখি: মেরুদন্ডী প্রানীদের (উপরের ডায়াগ্রাম ২);  বৃক্ষটিতে আমি কিছু বৈশিষ্ট উল্লেখ করেছি, যা জীববিজ্ঞানীরা সাধারনত ব্যবহার করেন বিভিন্ন প্রজাতির মধ্য বিবর্তনীয় সম্পর্ক সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নেবার সময়ে।প্রথমে মাছ,উভচরী ,স্তন্যপায়ী এবং সরীসৃপরা, এদের সবার মেরুদন্ড আছে, তাদের বলা হচ্ছে ভার্টিব্রেট বা মেরুদন্ডী প্রানী -সুতরাং  নিশ্চয়ই এরা এমন কোন কমন বা আদি পুর্বসুরী প্রানীর উত্তরসুরী যার মেরুদন্ড ছিল। মেরুদন্ডী প্রানীদের মধ্যে আবার সরীসৃপ এবং স্তন্যপায়ীরা আবার অ্যামনিওটিক ডিম -ভ্রুণের চারপাশ পরিবেষ্টিত থাকে তরলপুর্ণ একটি পর্দায়, যার নাম অ্যামনিয়ন,তৈরী করে বলে পরস্পর সদৃশ্য (মাছ এবং উভচরী প্রানীদের থেকে যা পৃথক); সুতরাং এই গুরুত্বপুর্ণ বৈশিষ্ট্যর কারনে বলা যায়, স্তন্যপায়ী এবং সরীসৃপরা অবশ্যই নিকটবর্তী কোন অতীতে একটি কমন আদি প্রানীর উত্তরসুরী, যারা এধরনের ডিম তৈরী করতো।কিন্তু এই গ্রুপটি আবার দুটি উপগ্রুপে বিভাজিত,এদের একটি গ্রুপে সকল প্রজাতির গায়ে চুল আছে, তারা উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট এবং দুধ তৈরী করে (এরা ম্যামাল বা স্তন্যপায়ী), অন্য গ্রুপের প্রজাতিরা শীতল রক্ত বিশিষ্ট,স্কেলী বা আশ যুক্ত চামড়া বিশিষ্ট এবং ওয়াটারটাইট বা পানিরোধী আবরণযুক্ত ডিম তৈরী করে ( তারা রেপটাইল বা সরীসৃপ); অন্য সব প্রজাতির মতই এরাও একটি নেস্টেড হায়ারআর্কি বা অন্তস্থ প্রাধান্যপরম্পরা তৈরী করে: যে প্রাধান্যপরম্পরায়, বড় গ্রুপের প্রজাতিরা, যাদের সদস্যরা অল্প কিছু প্রধান বৈশিষ্ট সমুহ ভাগাভাগি করে,তারা আবার বিভক্ত হয় বেশ কিছু ছোট উপগ্রুপে, যাদের সদস্যরা যারা আরো কিছুটা বেশী বৈশিষ্ট সমুহ ভাগভাগি করে, অবশেষে একটি প্রজাতিতে এসে উপনীত হযয়া সম্ভব, যেমন, ব্ল্যাক বিয়ার এবং গ্রিজলী বিয়ার, যারা প্রায় সবগুলো বৈশিষ্টই ভাগাভাগি করে।

প্রকৃতপক্ষে জীবদের বৈশিষ্টগুলোর এ ধরনের ক্রম প্রাধান্যপরম্পরার বিন্যাস সুপরিচিত ছিল ডারউইনের বহু আগে থেকে। ১৬৩৫ সালে সুইডিশ উদ্ভিদবিদ কার্ল ফন লিনে (যিনি তার ল্যাটিনাইজড নাম,ক্যারোলাস লীনিয়াস নামে বেশী পরিচিত) থেকে শুরু করে,অনেক জীববিজ্ঞানীই নানা ধরনের প্রানী এবং উদ্ভিদদের শ্রেনীবিভাগ করার কাজ শুরু করেন এবং তারা যে বিষয়টি লক্ষ্য করেছিলেন, তা হলো প্রানী এবং উদ্ভিদরা সুনির্দিষ্টভাবে বারংবার একই বৈশিষ্ট নির্ভর শ্রেনীতেই বিন্যাস্ত হচ্ছে ,যাকে বলা হত ’প্রাকৃতিক’ শ্রেনীবিন্যাস। আশ্চর্যজনকভাবে ভিন্ন ভিন্ন জীববিজ্ঞানীদের করা এই শ্রেনীবিন্যাসগুলোতে লক্ষ্য করা যায় পারস্পরিক সাদৃশ্য। এর অর্থ হচ্ছে বিভিন্ন জীববিজ্ঞানীদের করা এই গ্রুপিংগুলো কিন্তু মানুষের সবকিছুকে শ্রেনীবিন্যাস করার অন্তর্নিহিত তাগিদে করা  মনগড়া কল্পনার কোন চিহ্ন না,বরং এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট অনুযায়ী করা শ্রেণীবিন্যাসগুলো আমাদের প্রকৃতি সম্বন্ধে বাস্তব এবং মৌলিক কিছু বিষয়কেই ইঙ্গিত করছিল; কিন্তু ডারউইন এই দৃশ্যপটে না আসার আগ পর্যন্ত কারোরই ধারনা ছিল না এই মৌলিক বিষয়টা আসলে কি; এবং তিনি প্রমান করে দেখালেন জীবজগতের এই পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিন্যাসটি অর্থাৎ প্রধান প্রধান বৈশিষ্টগুলোর নেষ্টেড হায়ারআর্কি ঠিক তেমনই, যেমনটা বিবর্তন প্রক্রিয়া প্রেডিক্ট বা ভবিষ্যদ্বানী করে। অর্থাৎ যে জীবদের আদি পুর্বসুরী অপেক্ষাকৃত নিকট অতীতে বেচে ছিল,তারা অপেক্ষাকৃত বেশী বৈশিষ্ট নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে এবং যাদের  সাধারন পুর্বসুরী প্রানীদের অস্তিত্ব ছিল আরো দুরবর্তী অতীতে, তাদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম সদৃশ্যতা দৃশ্যমান। এই প্রাকৃতিক শ্রেনীবিন্যাস নিজেইে কবিবর্তনের স্বপক্ষে অন্যতম শক্তিশালী প্রমান।

প্রশ্ন হতে পারে, কেন? কারন, আমরা এধরনের কোন বিন্যাস ( অন্তস্থ বা নেস্টেড হায়ারআর্কি ) কখনোই পাবো না, যদি আমরা বিবর্তনের ফলে বিভাজন এবং উদ্ভব হয়নি এমন কোন কিছুকে শ্রেনীবিন্যাস করা চেষ্টা করি। ধরা যাক দিয়াশলাই এর কার্ডবোর্ড বই বা ম্যাচবুক ( Matchbook), যা আমি সংগ্রহ করি। জীবিত প্রানীদের যেভাবে শ্রেনীবিন্যাস করা সম্ভব এই ম্যাচবুক গুলো প্রাকৃতিক কোন শ্রেনীবিভাগের মধ্যেই পড়ে না; আপনি অবশ্য চেষ্টা করতে পারেন,যেমন, ম্যাচবক্স গুলোকে মোটামুটি একটি কাল্পনিক হায়ারআর্কিয়াল বা ক্রমপ্রাধান্যর ধারাবাহিকতায় সাজাতে,যেমন,প্রথমে আকার বা আয়তন দিয়ে শুরু করা যেতে পারে,এর পর এই আকার ও আয়তনের গ্রুপের মধ্যে কতগুলো উপগ্রুপ করা যেতে পারে,যেমন, কোন দেশে তারা তৈরী তার উপর ভিত্তি করে,আবার এর মধ্যে সাবগ্রুপ করা যেতে পারে,রঙ এর উপর নির্ভর করে এভাবে। অথবা আপনি এই সাজানো শুরু করতে পারেন,এর উপর কি ধরনের পণ্যের বিজ্ঞাপন করা হয়েছে সেটা দিয়ে,তারপর সাজাতে পারেন রঙ দিয়ে,তারপর তারিখ দিয়ে। এভাবে তাদের সাজানোর জন্য বহু উপায়ই আছে,এবং যারা এদের সাজাবেন দেখা যাবে প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা ভাবে একটি সজ্জা উপস্থাপন করছেন।সুতরাং এখানে এমন কোন বিন্যাস সিস্টেম বা উপায় নেই যেখানে সব সংগ্রহকারী একমত হবেন। আর এটার কারন হলো,বিবর্তিত না হয়ে,যেক্ষেত্রে  কোন একটি ম্যাচবক্স যার এর পুর্বসুরী ম্যাচবক্স থেকে সামান্য একটু ভিন্ন হতো, তা না হয়ে, এই ম্যাচবক্সগুলো আসলে প্রত্যেকটিই আলাদা আলাদা ভাবে সৃষ্ট,যে ব্যক্তি এটির পরিকল্পনা করেছেন তার নিজের ইচ্ছামত।


ছবি: ম্যাচবুক (Matchbook) কালেকশন (ছবি সুত্র)

এই উদহারনের ম্যাচবক্সগুলো সেই বিশেষ ধরনের জীবদের মত, যাদের আমরা আশা করতে পারি কোন ক্রিয়েশনিষ্ট বা সৃষ্টিবাদীদের প্রস্তাবিত জীব সৃষ্টির ব্যাখ্যায়। তাদের সেই ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে, কোন জীবেরই কমন বা সাধারন অ্যানসেষ্ট্রি বা বংশধারা, অর্থাৎ আদি পুর্বসুরী কোন জীবের অস্তিত্ব থাকতো না। বরং তাৎক্ষনিকভাবে সৃষ্টি করা হতো তাদের, তার নিকটবর্তী পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে একেবারে নতুন বা ডি নোভো তৈরী হতো এই জীবগুলো। এধরনের দৃশ্যপটে আমরা আশাও করতাম না প্রজাতিরা্ একটি অন্তস্থ, সাদৃশ্যতা ভিত্তিক ফর্মের ক্রম একটি প্রাধান্যপরম্পরায় বিন্যস্ত হবে, যা প্রায় সব জীববিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন।  (ম্যাচবক্স এর ক্ষেত্রে যা হয়না, মানুষের ভাষার ক্ষেত্রেও কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, মানুষের ভাষাগুলো একধরনের অন্তস্থ বা নেস্টেড হায়ারআর্কি অর্থাৎ বৈশিষ্ট নির্ভর ক্রম প্রাধান্য পরম্পরায় সজ্জিত হয়, যেমন কিছু ভাষা ( ইংরেজী বা জার্মান), পরস্পর বেশী সদৃশ অন্য কোন ভাষা, যেমন চাইনিজ, অপেক্ষা। আমরা আসলেই একটা ভাষার একটি বিবর্তন বৃক্ষ সাজাতে পারবো, শব্দ আর গ্রামারের মিল বা অমিলের উপর নির্ভর করে। কেন এটা সম্ভব? কারন মানুষের ভাষাও তাদের একটি নিজস্ব ধরনের প্রক্রিয়ায় বিবর্তিত হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়েছে এবং পৃথক হয়েছে যখন মানুষ নতুন এলাকায় গিয়ে বসতি গড়েছিল, এবং আতের গ্রুপের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। জীব প্রজাতির মতই, ভাষারও স্পিসিয়েশন বা প্রজাতিকরণ আছে এবং একটি কমন বংশধারা বা অ্যানসেষ্ট্রি আছে। এবং ডারউইনই প্রথম এই অ্যানালোজীটি লক্ষ্য করেছিলেন। )

প্রায় ৩০ বছর আগ পর্যন্ত, জীববিজ্ঞানীরা চোখে দেখা সম্ভব হতো, এমন বাহ্যিক প্রকৃতি,যেমন অ্যানাটোমি, প্রজনন পদ্ধতি ইত্যাদি প্রধান কিছু বৈশিষ্টের উপর নির্ভর করেই জীবিত সব প্রজাতির বংশধারা ধারাবাহিকতার সম্পর্ক তৈরী করতেন। যুক্তিনির্ভর একটি ধারনার উপর ভিত্তি করেই কাজটি করা হতো; সেটা হলো, একই ধরনের বৈশিষ্ট সম্পন্ন জীবদের একই ধরনের জীন থাকার সম্ভাবনা, এবং একারনে তারা আরো বেশী নিকট সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু বর্তমানে আমাদের এই লিনিয়েজ নির্ধারনে আরো বেশী শক্তিশালী এবং স্বতন্ত্র উপায় আছে। বিভিন্ন প্রজাতির ডিএনএ সিকোয়েন্স (অনুক্রম) করে আমরা পরিমাপ করে দেখতে পারি, কতটুকু মিল আছে  তাদের ডিএনএ বেসের (A,G,T,C) অনুক্রমে, এই  মিল অমিলের পরিমাপগত সম্পর্কর উপর নির্ভর করেই আমরা বিবর্তনীয় সম্পর্কটি পুনর্গঠন করতে পারি। এটি করার যুক্তিযুক্ত ভিত্তিটি হচ্ছে, বেশী সাদৃশ্যময় ডিএনএ যে প্রজাতিদের আছে তারা তত বেশী সম্পর্কযুক্ত, অর্থাৎ তাদের কমন আদি পুর্বসুরী জীবের অস্তিত্ব ছিল অপেক্ষাকৃত নিকটতম অতীতে। এই অনুপ্রানবিজ্ঞানের আনবিক প্রক্রিয়া কিন্তু ডিএনএ আবিষ্কারে আগে, অর্থাৎ প্রাক ডিএনএ সময়ে জীববিজ্ঞানীদের প্রস্তাবিত জীবন বৃক্ষের তেমন কোন বিশেষ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন করেনি: দৃশ্যমান বাহ্যিক প্রকৃতি এবং ডিএনএ বেস অনুক্রম ‍বা সিকোয়েন্স দুটোই বিবর্তন সম্পর্ক সম্বন্ধে সাধারনত একই তথ্যর যোগান দেয়।

সকল জীবের এই কমন অ্যানসেষ্ট্রি বা একটি সাধারন বংশধারার ধারনাটি খু্ব স্বাভাবিক ভাবেই বিবর্তন প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জোরালো এবং পরীক্ষা করে প্রমান করা সম্ভব এমন এটি প্রেডিকশন বা ভবিষ্যদ্বানীকে নির্দেশ করে। আমরা যদি দেখি, পাখীদের এবং সরীসৃপদের একই গ্রুপভুক্ত করা হয়েছে তাদের বৈশিষ্ট এবং ডিএনএ বেস এর অনুক্রমের উপর ভিত্তি করে। আমরা তাহলে প্রেডিক্ট করতে পারি যে, পাখীদের এবং সরীসৃপদের কমন বা সাধারন আদি পুর্বসুরী প্রানীদের আমাদের জীবাশ্ম রেকর্ডে পাওয়া উচিৎ। এধরনের প্রাকধারনাগুলোর ইতিমধ্যে সত্যতা  প্রমানিত হয়েছে, বিবর্তনের পক্ষেই যা আরো শক্তিশালী প্রমান যুগিয়েছে। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আমরা এররকম কিছু আদি কমন পুর্বসুরী প্রানীদের সাথে পরিচিত হবো।

বিবর্তন তত্ত্বের পঞ্চম অংশটি, যা ডারউইন ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোন থেকে, সুস্পষ্ট ভাবে এবং সঙ্গত কারনে তার বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভার শ্রেষ্টতম অর্জন হিসাবে দেখেছিলেন, তা হলো: ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন এর ধারনাটি। প্রকৃতপক্ষে এই ধারনাটি শুধু ডারউইনের একার নয় – তার সমসাময়িক, প্রকৃতিবিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস ও প্রায় একই সময়, একই ধারনা প্রস্তাব করেছিলেন, সম্পুর্ন স্বতন্ত্রভাবে, যা আজো বিজ্ঞানের  ইতিহাসে সবচেয়ে বিখ্যাত যুগপত আবিষ্কার হিসাবে চিহ্নিত। সঙ্গত কারনেই ডারউইন অবশ্যই এর জন্য অনেক বেশী কৃতিত্ব পেয়েছেন: কারন ‘অন দি অরিজিন অব স্পিসিস’ বইটিতে তিনি বিস্তারিতভাবে এই প্রস্তাবিত ধারনাটির ব্যাখ্যা দেন, এর স্বপক্ষে প্রমান দেন, এবং প্রক্রিয়াটির নানা পরিনতির বিশদ আলোচনা করেছিলেন।

কিন্তু আবার বিবর্তন তত্ত্বের এই ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন অংশটিকে ডারউইনের সময়ই মনে করা হয়েছে সবচেয়ে বৈপ্লবিক একটি ধারনা হিসাবে এবং এখনো যা বহু মানুষের অস্বস্তির কারন। প্রাকৃতিক নির্বাচন যুগপতভাবে বৈপ্লবিক এবং  অস্বস্তিকর, একই কারনে: কারন এটি ব্যাখ্যা দিচ্ছে. আপাতঃ দৃষ্টিতে প্রকৃতিতে দেখা ডিজাইন বা পরিকল্পনার উৎপত্তির প্রক্রিয়া বিশুদ্ধভাবে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক বস্তুবাদী বা ম্যাটেরিয়ালিষ্টিক ভাবে ঘটেছে, যে প্রক্রিয়ায় কোন ধরনের বিশেষ সৃষ্টি বা ক্রিয়েশন বা অতিপ্রাকৃত কোন শক্তির নির্দেশনার প্রয়োজন হয়নি।

প্রাকৃতিক নির্বাচনের মুল ধারনা বোঝাও খুব কঠিন না। যদি কোন প্রজাতির একটি জনগোষ্ঠীর সদস্যরা পারস্পরিকভাবে জীনগতভাবে ভিন্ন হয় এবং সেই ভিন্নতার কোন কিছু যদি এর বাহক কোন সদস্যকে তার সেই পরিবেশে বেচে থাকতে এবং প্রজনন সাফল্য পেতে সহায়তা করে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের জীনোমে ‘ভালো’ জীনগুলো যা বেচে থাকার হারে এবং প্রজননে সফলতা দিয়েছে,  তাদের অপেক্ষাকৃত বেশী সংখ্যক কপি থাকবে, ’তেমন ভালো না’ জীন অপেক্ষা। সময়ের সাথে প্রজাতির এই জনগোষ্ঠীটি ধীরে ধীরে আরো বেশী উপযুক্ত হবে সেই পরিবেশে বসবাসের জন্য, কারন উপকারী মিউটেশনগুলোর উদ্ভব হবে এবং সেগুলো জনসংখ্যার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, অন্যদিকে ক্ষতিকর মিউটেশনগুলো বাতিল হতে থাকবে জনসংখ্যার মধ্য থেকে, এভাবে অবশেষে এই প্রক্রিয়াটি প্রজাতির সেই সদস্যদের জন্ম দেয়, যারা তাদের আবাস এবং জীবন ধারনের প্রক্রিয়ার সাথে সুঅভিযোজিত হয়।


ছবি: শিল্পীর চোখে উলী ম্যামথ (ছবি সুত্র)

একটি সাধারন উদহারন দেয়া যেতে পারে, ইউরেশিয়ার উত্তরে এবং উত্তর আমেরিকায় রোমশ উলী ম্যামথ বাস করতো একসময়, ঘন লোমযুক্ত চামড়া তাদের তীব্র শীতের পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেবার জন্য খুবই উপযোগী ছিল ( তুন্দ্রা অঞ্চলে মাটির নীচে পুরো ম্যামথ এর হিমায়িত নমুনা পাওয়া গেছে); উলী ম্যামথ বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ১০০০০ বছর আগে, সম্ভবত: আমাদের পুর্বপুরুষদের অতিমাত্রায় শিকার তাদের বিলুপ্তির কারন। অন্তত একটি প্রাচীন নমুনা তুন্দ্রা অঞ্চলে হিমায়িতভাবে এত সুন্দরভাবে সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, যে ১৯৫১ সালে নিউ ইয়র্ক এক্সপ্লোরার ক্লাব ডিনারে এর খানিকটা মাংশ পরিবেশন করা হয়েছিল) । উলী ম্যামথগুলো, সম্ভবত আধুনিক হাতির মতই অল্প লোম বিশিষ্ট চামড়ার কোন ম্যামথ পুবসুরী থেকে বিবর্তিত হয়েছিল। আদি পুর্বসুরী ম্যামথদের মধ্যে কিছু মিউটেশন এদের কোন কোন সদস্যর চামড়ায় বেশী পরিমানে চুলের কারন হয়, ফলে কিছু আধুনিক মানুষের মতই তারা তাদের প্রজাতির অন্য সদস্যদের চেয়ে বেশী লোমশ হয়। যখন জলবায়ু শীতল হতে শুরু করে বা প্রজাতিটি আরো উত্তরের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়, এই বেশী লোমযুক্ত সদস্যরাই সেখানে খুব শীতল পরিবেশ সহ্য করতে অপেক্ষাকৃত বেশী সফল হয় এবং প্রজননেও তারা সফল হয়, ফলে তারা বেশী পরিমান প্রজন্মর রেখে যায়  তাদের চুলহীন অন্যান্য সদস্যদের তুলনায়। এটাই এই জনগোষ্ঠীতে লোমশ বা বেশী চুল হবার জীনটির সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তী প্রজন্মে ম্যামথরা এই প্রজন্মের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশী লোমযুক্ত হয়। এই পক্রিয়াটিকে কয়েক হাজার প্রজন্ম অতিবাহিত করার সুযোগ দিলে, মসৃন চামড়া ম্যামথের জায়গায় স্থান নেয় চুলযুক্ত লোমশ ম্যামথরা। এবং অন্য অনেক বৈশিষ্ট যা তীব্র শীতল পরিবেশকে মোকাবেলা করে বাচতে সাহায্য করেছে, সেই বৈশিষ্টগুলোও ( যেমন শরীরের আকৃতি, চর্বির পরিমান ইত্যাদি) একই সাথে বিবর্তিত হয় এদের মধ্যে।

খুবই বিস্ময়করভাবে সরল একটি প্রক্রিয়া;  এর জন্য শুধু প্রয়োজন, প্রজাতির সদস্যরা জীনগত ভাবে কিছুটা আলাদা হবে একে অপরের থেকে তাদের পরিবেশে বেচে থাকার এবং প্রজনন সাফল্যের ক্ষমতায়। এই প্রাকশর্ত যদি থাকে, প্রাকৃতিক নির্বাচন –এবং বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। আমরা পরে অবশ্যই দেখবো, এ যাবত পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, এমন প্রতিটি প্রজাতি এই পুর্বশর্তগুলো পুর্ন করেছে। এবং যেহেতু অনেকগুলো বৈশিষ্টই কোন সদস্যর পরিবেশের সাথে তার অভিযোজনের বিষয়টি প্রভাবিত করে ( এর ফিটনেস), প্রাকৃতিক নির্বাচন পারে, বহু ইয়ন (eon)  বা বিশাল ব্যাপ্তির ভৌগলিক সময় ধরে, কোন প্রানী বা উদ্ভিদকে এমন কোন ভাবে গড়ে পিটে  তৈরী করে নিতে, যেন তাদের দেখে মনে হতে পারে, কেউ তাদের বিশেষভাবে ডিজাইন করেছে।

যদিও ,একটা বিষয় অনুধাবন করা জরুরী, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তিত হবার বদলে, যদি কেউ আসলেই সচেতনভাবে সব জীবের ডিজাইন করতো, সেক্ষেত্রে যেমনটা দেখার আশা করা হয়ে থাকে, তেমনই আসল কিছু মৌলিক পার্থক্য পরিলক্ষিত হত আমাদের চোখে। প্রাকৃতিক নির্বাচন কোন ’মাষ্টার প্রকৌশলী’ না, বরং একজন ’টিংকারার’ যে কিনা শুধু গড়ে পিটে কোন  কিছু মেরামত করতে ‍পারে কাজ চালাবার উপযোগী করে। একজন ডিজাইনার, যেমন প্রথম থেকে শুরু করে চুড়ান্তভাবে যেভাবে উৎকর্ষতার সৃষ্টি করতে পারেন, প্রাকৃতিক নির্বাচন সেটা পারেনা, বরং শুধুমাত্র, এটি হাতের কাছে যা পায়, সেটির উপরে কাজ করার চেষ্টা করে তার পক্ষে সর্ব্বোচ্চ যতটুকু করা সম্ভব ।  পারফেক্ট বা একেবারে নিখুত কোন ডিজাইনের মিউটেশন কখনোও নাও হতে পারে, কারন স্পষ্টতই নিখুত কোন ডিজাইন প্রকৃতিতে কদাচিৎ মেলে। আফ্রিকার গন্ডারদের, তাদের দুটি পর পর সাজানো শিং থাকে, নিজের রক্ষা করা এবং সগোত্রীয় সাথে যুদ্ধের মহড়ায় এক শিং এর ( যদিও টেকনিক্যালী এরা শিং নয়, বরং একসাথে কম্প্যাক্ট চুল) ভারতীয় গন্ডারদের তুলনায়, তারা সম্ভবত আরো ভালোভাবে অভিযোজিত; কিন্তু ভারতীয় গন্ডারদের মধ্যে দুই শিং এর জন্য মিউটেশনের কিন্তু উদ্ভব হয়নি। তাস্বত্ত্বেও এক শিং, কোন শিং না থাকা থেকে অপেক্ষাকৃতভাবে ভালো। এক শিং সহ ভারতীয় গন্ডার তার শিং বিহীন পুর্বসুরী প্রানী থেকে সুবিধাজনক অবস্থানেই আছে, তবে তাদের জেনেটিক ইতিহাসে এই দুর্ঘটনা তাদের একেবারে উৎকৃষ্ট বা পারফেক্ট ’ডিজাইন’ থেকে খানিকটা কম পারফেক্ট ’ডিজাইন’ এর সৃষ্টি করেছে। এবং অবশ্যই প্রতিটি উদহারনে, যেখানে উদ্ভিদ এবং প্রানী যারা পরজীবি দ্বারা আক্রান্ত বা অসুস্থ হয়, তারা প্রতিনিধিত্ব করছে সেক্ষেত্রে তাদের অভিযোজনীয় ব্যর্থতার। এভাবেই সব বিলুপ্তির ঘটনায় এই অভিযোজনীয় ব্যর্থতার অবদান আছে; যা প্রায় এ পর্যন্ত বেঁচে ছিল এমন প্রজাতিদের শতকরা ৯৯ ভাগই বিলুপ্ত হওয়া জীবদের প্রতিনিধিত্ব করছে ( প্রসঙ্গক্রমে বলে নেয়া ভালো, এই বিষয়টি ইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন তত্ত্বটিকে একটি বেশ বড় সড় সমস্যার মধ্যে ফেলে দিয়েছে, ব্যাপারটা আদৌ কোন বুদ্ধিমত্তা প্রসুত কাজ  কারো মনে হবার কথা না, এই বহু মিলিয়ন প্রজাতি সৃষ্টি করা হয়েছে শুধুমাত্র তাদের চির বিলুপ্তি হবার জন্য নিয়তিতে অভিশপ্ত করে এবং তারপর আবার তাদের জায়গায় পুর্ন করতে অন্য প্রায় একই ধরনের  প্রজাতি আবার নতুন করে ডিজাইন করা,যাদের বেশীর ভাগেই আবার বিলুপ্ত হবার ভাগ্য নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের সমর্থকরা এই সমস্যাটার কখনই কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।)

প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে জীবের সামগ্রিক ডিজাইন বা পরিকল্পনার উপর অবশ্যই কাজ করতে হয়, যা বিভিন্ন ধরনের অভিযোজনের মধ্যে একধরনের সমঝোতা সৃষ্টি করে: যেমন, স্ত্রী সামুদ্রিক টার্টল বা কচ্ছপ, তাদের ফ্লিপার ( চ্যাট্টা চওড়া হাতের মত লিম্ব, যা সাতার ‍কাটতে সাহায্য করে) দিয়ে সাগরের বেলাভুমি ডিম পাড়ার জন্য ঘর বানায় -খুবই যন্ত্রনাদায়ক, ধীর এবং ঝামেলাকর একটা পদ্ধতি, যা তাদের ডিমগুলোকে শিকারী প্রানীদের কাছে প্রায়শই উন্মুক্ত করে ফেলে। তাদের যদি খানিকটা কোদালের মতো বাড়তি ফ্লিপার থাকত, তাহলে কাজটা আরো ভালো আর দ্রুত করতে পারতো। কিন্তু আবার সেটা থাকলে, তারা আবার এত ভালো সাতার কাটতে পারতো না।  একজন দয়ালু বিবেকবান ডিজাইনার টার্টলদের জন্য বাড়তি একজোড়া  লিম্ব , হাত অথবা পা দিতে পারতে, যার সাথে ভিতরে গুটিয়ে নেবার মত কোদালের মত বা মাটি খোড়ার উপযোগী কোন উপাঙ্গ যোগ করে দিতেন, কিন্তু যেহেতু কচ্ছপরা কোন সচেতন ডিজাইনারের ডিজাইন নয়, সুতরাং কচ্ছপরাও আর সব সরীসৃপদের মতই একই শারীরিক ডেভোলপমেন্টাল পরিকল্পনায় আটকে আছে, যেখানে তাদের হাত পা সংখ্যা দুই জোড়াতেই (মোট ৪ টি) সীমাবদ্ধ।

জীবরা শুধুমাত্র মিউটেশনাল লটারীর ভাগ্যর উপরেই নির্ভরশীল না, আরেকটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, তাদের ডেভেলপমেন্টাল এবং বিবর্তনের ইতিহাস। যে সমস্ত বৈশিষ্ট বা ট্রেইট ইতিমধ্যেই বিদ্যমান, মিউটেশন সেখানে পরিবর্তন আনে; প্রায় কখনোই মিউটেশন কোন আনকোরা নতুন বৈশিষ্ট সৃষ্টি করেনা। এর অর্থ হচ্ছে, বিবর্তনকে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করতে গেলে অবশ্যই তার পু্র্বসুরী প্রানীদের ডিজাইন থেকে শুরু করতে হবে। বিবর্তন অনেকটা একজন স্থপতির মত, যার একেবারে শুন্য থেকে শুরু করে নতুন বিল্ডিং পরিকল্পনা করার কোন উপায় নেই, বরং তাকে প্রতিটি নতুন বৈশিষ্ট্য অবশ্যই তৈরী করতে হবে ইতিপুর্বে অস্তিত্ব আছে এমন কাঠামোর উপর ভিত্তি করে, এবং এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ায় কাঠামোটি যাতে কর্মক্ষমতাটাও অক্ষুন্ন রাখে সেটাও তাকে খেয়াল রাখতে হবে। এই বাড়তি প্রাকৃতিক চাপটাই দৃশ্যমান বা আমাদের চোখে পড়ে এমন নানা গঠনগত এবং কার্যগত সমঝোতার সৃষ্টি করে। আমরা পুরুষরা যেমন, বেশ ঝামেলামুক্ত থাকতাম যদি আমাদের অন্ডকোষ সরাসরি আমাদের শরীরের বাইরে গঠিত হতো,যেখানকার অপেক্ষাকৃত শীতল তাপমাত্রা শুক্রাণুদের জন্য ভালো। ((সম্ভবত আদি পুর্বসুরী স্তন্যপায়ী প্রানীদের পুর্নবয়স্ক অন্ডকোষ তাদের পেটের মধ্যেই ছিল, কিছু স্তন্যপায়ী প্রানী যেমন প্ল্যাটিপাস, হাতি এখনও সেটাই করে), এ বিষয়টি যে প্রশ্নের উদ্রেক করে তা হলো বিবর্তন প্রক্রিয়া কেন শরীরের বাইরে অন্ডকোষের অবস্থান বিবর্তনে সহায়তা বা ফেবার করে, যেখানে শরীরের  বাইরে অন্ডকোষ এর সহজে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে। বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও এর উত্তর নেই, কিন্তু একটা ক্লু যা পাওয়া গেছে, তা হলো, শুক্রাণু সৃষ্টিতে ব্যাবহৃত কিছু উৎসেচক আমাদের শরীরের কেন্দ্রীয় তাপমাত্রায় কাজ করেনা (এজন্য বাবা হতে ইচ্ছুক এমন পুরুষদের চিকিৎসকদের উপদেশ দিতে শোনা যায়, যৌন সঙ্গমের আগে গরম পানিতে গোছল না করতে)); আবার হতে পারে স্তন্যপায়ীরা উষ্ণ রক্ত বিশিষ্ট হিসাবে বিবর্তিত হবার পর, কোন কোন গ্রুপের অন্ডকোষ নীচে নেমে আসে শরীরের বাইরে ঠান্ডা থাকতে। কিন্তু  হয়তোবা শরীরের বাইরে অন্ডকোষের বিবর্তন সম্ভবত হয়েছে অন্য কারনে, এবং শুক্রাণু তৈরী করার উৎসেচকগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় তাদের কর্মক্ষমতা এমনিতে হারিয়ে ফেলেছিল))। কিন্তু অন্ডকোষ তৈরী হওয়া শুরু করে ভ্রণাবস্থায় আমাদের পেটের মধ্যে, যখন ভ্রুণ এর বয়স  ছয় বা সাত মাস, পরে এটি পেট থেকে নীচে নেমে আসার যাত্রা শুরু করে একটা নালি দিয়ে, যাকে বলে ইনগুইনাল ক্যাণাল, যাতে তাদেরকে শরীরের ভেতরের উচ্চ তাপমাত্রা থেকে যৌনগ্রন্থিকে দুরে রাখা যায়। এই ক্যানালগুলো পেটের দেয়ালের সামনে দিক থেকে, যেখানে বাইরে বের হয়ে আসে সেখানে একটি দুর্বল জায়গার সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে হার্নিয়ার (এই দুর্বল জায়গা দিয়ে পেটের অ্ন্ত্রনালীর কোন অংশ বাইরে বের হয়ে আসে) কারন হতে পারে কারো কারো জন্য। হার্নিয়া বিষয়টি ভালো কিছু না, মাঝে মাঝে তারা অন্ত্রনালীতে বাধার সৃষ্টি করে এবং সার্জারী যখন ছিলনা এটি অনেকেরই মৃত্যুর কারন হত। কোন বুদ্ধিমান ডিজাইনার অন্ডকোষের এই ঘুরপথের যাত্রাপথটি আমাদের দিতে পারেন না । আমাদের এই অবস্থাটা রয়ে গেছে কারন আমরা আমাদের শারীরিক গঠনের প্রোগ্রামটি আমরা উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছি মাছের মত পুর্বসুরী প্রানীদের কাছ খেকে, যাদের যৌনগ্রন্থি যেমন পেটের মধ্যে তৈরী হয়, এবং সেখানেই অবস্থান করে। আমাদের শুরুটা হয় মাছের মত অন্ডকোষ তৈরী প্রক্রিয়া পেটের মধ্যে, তবে অন্ডকোষের এই নিম্নমুখী স্থানান্তরের বিষয়টি বিবর্তিত হয়েছে পরে, আনাড়ী গোছের একটা বাড়তি সংযোগ হিসাবে  ( আমাদের এই প্রাচীন শরীর)।


ছবি: পুরুষদের যৌনগ্রন্থির উৎপত্তি এবং ক্রমবিকাশ এবং হার্নিয়া।

সুতরাং প্রাকৃতিক নির্বাচন কখনো চরম উৎকর্ষতা বা পারফেকশনের জন্ম দেয়না – শুধু মাত্র খানিকরা ‍উন্নতি সাধিত হয় এর আগে যা ছিল, তার। এটি অপেক্ষাকৃত ফিটার বা fttter  জীবের জন্ম দেয়, fittest বা ফিটেষ্ট এর না। এবং যদিও এই নির্বাচন, আপাতদৃষ্টিতে এমন ধারনা দিতে পারে যে এদের ডিজাইন করা হয়েছে  কিন্তু সেই ডিজাইন বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ইমপারফেক্ট বা নিখুত বা ক্রটিহীন নয়। এবং এক্ষেত্রে আয়রনীটা  হচ্ছে এই সব ইমপারফেক্শনগুলো বা অসম্পুর্নতা কিংবা ত্রুটিবিচ্যুতি গুলোর মধ্যে  (তৃতীয় অধ্যায়ে যা আলোচনা করেছি) আমরা খুজে পাই বিবর্তনের স্বপক্ষেই গুরুত্বপুর্ন সব প্রমান।

এবার আমরা তত্ত্বটির ষষ্ঠ অংশ বা বিষয়ে এসে পৌছেছি, সেটি হলো, ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়াও অন্য কিছু প্রক্রিয়া বিবর্তনীয় পরিবর্তনের কারন হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন হলো, কিছু সংখ্যক জীনের খুব সাধারন  র‌্যানডোম কিছু পরিবর্তন, যার কারন মুলত বিভিন্ন পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সংখ্যার পার্থক্য। এর মাধ্যমে যে বিবর্তনীয় পরিবর্তন হয়, র‌্যানডোম হবার কারনে, এটি অভিযোজন বা অ্যাডাপটেশনের সাথে সম্পর্কযুক্ত না। গুরুত্বপুর্ন কোন বিবর্তনীয় পরিবর্তনের উপর এই প্রক্রিয়ার প্রভাব যদিও সম্ভবত: ক্ষুদ্র, কারন প্রাকৃতিক নির্বাচনের মত এর সেই মোল্ডিং বা পরিবর্তন করার ক্ষমতা নেই। প্রাকৃতিক নির্বাচনই সে কারনে একমাত্র প্রক্রিয়া যা অভিযোজনের কারন হতে পারে। তা সত্ত্বে আমরা পরবর্তীতে অধ্যায় পাঁচ এ দেখব, যে জেনেটিক ড্রিফ্ট ( বা অ্যালীলিক ড্রিফট: কোন জনগোষ্ঠীকে কোন জীন ভ্যারিয়ান্ট অর্থাৎ একই জীনের সামান্য ভিন্ন কপি ( অ্যালীল) এর উপস্থিতির হার, যার কারন মোট জনসংখ্যার রানডোম স্যাম্পলিং; সন্তানদের মধ্যে পাওয়া অ্যালীল, তাদের পিতামাতাদের মধ্যে যে পাওয়া অ্যালীল গুলোর একটি স্যাম্পল, এবং এখানে চান্স এর একটি ভুমিকা আছে কোন একজন সদস্য ‍কি বেচে থাকবে এবং প্রজনন সফল হবে)  প্রক্রিয়া ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীতে কিছু বিবর্তনীয় ভুমিকা রাখতে পারে, এবং  সম্ভবত ডিএনএ র কিছু অভিযোজন নয় ( নন অ্যাডাপটিভ) এমন বৈশিষ্টের ব্যাখ্যা দিতে পারে।

তাহলে, এগুলোই হলো বিবর্তন থিওরী বা তত্ত্বটির ছয়টি অংশ (বিবর্তন তত্ত্বের বিরোধীরা প্রায়ই দাবী করেন, বিবর্তন তত্ত্বকে জীবন শুরু কেমন হয়েছে, অবশ্যই তার ব্যাখ্যা দিতে হবে, এবং ডারউইনবাদ ব্যর্থ কারন আমরা এখনও এর উত্তর দিতে পারিনি। এই বিরোধিতা অজ্ঞতাপ্রসুত। বিবর্তন তত্ত্ব জীবন ( যা আমি সংজ্ঞায়িত করবো, আত্ম প্রতিলিপিকারী কোন জীব বা অনু ) এর আবির্ভাব হবার পর কি হয়েছে সেটাকেই শুধু ব্যাখ্যা করে। জীবনের উৎপত্তির বিষয়টি বিবর্তন জীববিজ্ঞানের এখতিয়ারে নেই, বরং এটি অ্যাবায়োজেনেসিসএর বিষয়, যে বৈজ্ঞানিক বিষয়টির রসায়ন, ভুতত্ত্ববিদ্যা এবং মলিক্যুলার বায়োলজীর এর সম্মিলিত একটি ক্ষেত্র; যেহেতু এটি বিজ্ঞানের একটি নতুন ক্ষেত্র, এখনও শুরুর পর্যায়ে, সে কারনেই এখন সেই প্রশ্নগুলোর বেশ কিছু  উত্তর এখনও সেখান থেকে আসেনি। আমি এই বইতে পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি নিয়ে কোন আলোচনা পরিহার করেছি। তবে জীবনের উদ্ভব সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রতিদ্বন্দী মতামত নিয়ে জানার জন্য আগ্রহীরা রবার্ট হাজেন এর Genesis:The Scientific Quest for Life’s Origin.)। তত্ত্বটির কয়েকটি অংশ পরস্পরের সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কযুক্ত, যেমন, যদি প্রজাতিকরণ বা ’স্পিসিয়েশন’ প্রক্রিয়া সঠিক হয় তবে ’কমন অ্যানসেষ্ট্রী’ও অবশ্যই সত্য হবে। কিন্তু কিছু অংশ আবার পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র। যেমন বিবর্তন হয়েছে, তবে, সেটি ক্রমান্বয়ে (গ্রাজুয়ালিজম) হতেই হবে এমন কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। বেশ কিছু ‘মিউটেশনিস্ট’, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভেবেছিলেন, এক প্রজাতি থেকে একেবারে ভিন্ন অন্য কোন প্রজাতির সৃষ্টি হতে পারে তাৎক্ষনিকভাবে, কোন একটি দানবীয় বিশাল মিউটেশনের মাধ্যমে। প্রখ্যাত প্রানীবিজ্ঞানী রিচার্ড গোল্ডস্মিট, যেমন, একসময় প্রস্তাব করেছিলেন, পাখী হিসাবে শনাক্ত করা সম্ভব এমন প্রানীর সম্ভবত জন্ম হয়েছে, সুস্পষ্টভাবে কোন একটি সরীসৃপের পাড়া ডিম থেকে। এই ধরনের দাবী কিন্তু পরীক্ষা করা সম্ভব। মিউটেশনিজম প্রেডিক্ট করছে, নতুন প্রজাতির উৎপত্তি হচ্ছে তাৎক্ষনিকভাবে পুর্ববর্তী কোন প্রজাতি থেকে, অর্থাৎ জীবাশ্ম রেকর্ডে কোন ট্রানজিশনাল (মধ্যবর্তী পর্যায়ের) প্রানীর কোন জীবাশ্ম অস্তিত্ব ছাড়াই। কিন্তু ফসিল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, বিবর্তন অবশ্যই সেভাবে কাজ করেনি। যাই হোক না কেন, মুল কথাটি হলো, ডারউইনিজমের বিভিন্ন অংশ স্বতন্ত্রভাবে পরীক্ষা করা দেখা সম্ভব।

বিকল্পভাবে বলা যেতে পারে, বিবর্তন হয়তোবা সত্যি, তবে ন্যাচারাল সিলেকশন বা প্রাকৃতিক নির্বাচন এর কারন বা মেকানিজম নাও হতে পারে। অনেক জীববিজ্ঞানী, যেমন এক সময় মনে করতেন, বিবর্তন হচ্ছে কোন মিষ্টিকাল রহস্যময় বা টেলিওলজিক্যাল (পুর্বকারনবাদ) শক্তির কারনে: অর্থাৎ প্রানীদের নিজেদের ভিতরের একটি ইনার ড্রাইভ বা অন্তস্থ তাড়নার প্রভাবে, যা কোন প্রজাতিকে একটি নির্দিষ্ট ধরা বাধা পথে বিবর্তিত করে। দাবী করা হয় এধরনের কোন শক্তি ’সাবের টুথড টাইগার’ দের দীর্ঘ ক্যানাইন  দাতের বিবর্তনের কারন, যা ক্রমান্বয়ে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছিল, কোন উপযোগিতা ছাড়াই, যতক্ষন না পর্যন্ত তারা আর মুখ বন্ধ করতে না পারে এবং পরিনতিতে না খেতে পেরেই একসময় বিলুপ্ত হয়। আমরা এখন স্পষ্টভাবে জানি টেলিওলজিক্যাল কোন শক্তির অস্তিত্ত্ব নেই- আর ‘সাবের টুথ টাইগার’ রাও না খেতে পেয়ে বিলুপ্ত হয়নি বরং ভালো ভাবেই তারা বেচে ছিল বিশালাকৃতির অন্য ক্যানাইনদের বহু মিলিয়ন বছর ধরে, তারপর পরবর্তীতে তারা বিলুপ্ত হয়েছে সম্পুর্ন অন্য কারনে। বিবর্তন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন কারন থাকতে পারে এই ফ্যাক্টটা সম্ভবত একটা কারন হতে পারে জীববিজ্ঞানীদের প্রাকৃতিক নির্বাচনকে গ্রহন করার বহু দশক আগেই বিবর্তনকে গ্রহন করে নেবার ব্যাপারে।

ছবি: শিল্পীর চোখে সাবের টুথ টাইগার ( ছবি সুত্র)

বিবর্তন তত্ত্বের দাবীগুলো নিয়ে অনেক কথা হলো। কিন্তু  এর একটি প্রধান এবং বহুশ্রুত বিরুদ্ধতা হলো: বিবর্তন শুধু মাত্র একটি তত্ত্ব বা থিওরী, তাই না? ১৯৮০ সালে একটি খৃষ্টীয় ইভানজেলিক্যাল গ্রুপের সমাবেশে বক্তৃতা দেবার সময় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রোনাল্ড রীগ্যান বিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এভাবে: ‘বেশ, এটা একটি থিওরী, এটা শুধুমাত্র একটি বৈজ্ঞানিক থিওরী, এবং বিজ্ঞানের জগতে সম্প্রতি বছরগুলোতে এই তত্ত্বটি চ্যালেন্জ করা হয়েছে এবং এক সময় যেভাবে এটিকে নির্ভুল বলে বিশ্বাস করা হত, বৈজ্ঞানিক সমাজে এখনও এটাকে সেভাবে বিশ্বাস করা হয়না’।

এই উক্তির মুল শব্দটি হচ্ছে, ’শুধুমাত্র’। ’শুধুমাত্র’ একটি তত্ত্ব? এটি যে প্রস্তাব করছে তা হলো: কোন একটি থিওরীতে কিছু আছে যা ঠিক একে সঠিক বলে নির্দেশিত করছে না-অর্থাৎ এটি শুধু মাত্র একটি ধারনা, এবং খুব সম্ভবত ভুল। আসলেই প্রাত্যহিক ব্যবহৃত ভাষায় ’থিওরী’ শব্দটির অন্যার্থই হচ্ছে ’অনুমান’, যেমন পরের এই বাক্যটিতে ’থিওরী’ বলতে যা বোঝাচ্ছে:  ’আমার থিওরী হচ্ছে, ফ্রেড স্যু এর জন্য উন্মাদ’; কিন্তু বিজ্ঞানে ‘থিওরী’ শব্দটির অর্থ সম্পুর্ন ভিন্ন, যা অন্য কোন সাধারন অনুমানের তুলনায় বহুগুন বেশীমাত্রায় ‘নিশ্চয়তা’ এবং ’দৃঢ়তার বৈশিষ্ট’ বহন করে।

অক্সফোর্ড ইংলিশ অভিধানের ভাষায়: ’কোন বৈজ্ঞানিক থিওরী হচ্ছে,  এমন কোন বক্তব্য( সমুহ) যা, কোন কিছু জ্ঞাত বা পর্যবেক্ষিত হয়েছে এমন কোন বিষয়ের সাধারন নীতিমালা, মুলনীতি অথবা কারন হিসাবে মনে করা হয়;এভাবে আমরা ’থিওরী অ্ফ গ্রাভিটি’ বা’ মহাকর্ষন তত্ত্ব’র  কথা উল্লেখ করতে পারি, ভর আছে এমন যে কোন বস্তুদের পারস্পরিক আকর্ষন সংক্রান্ত প্রস্তাবসমুহকে যা বস্তুদের মধ্যবর্তী দুরত্বের সাথে একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক রক্ষা করে বা আমরা ’থিওরী অফ রিলেটিভিটি’র কথা বলতে পারি, যা আলোর গতি এবং স্পেস-টাইম এর কার্ভেচার বা বক্রতা সম্বন্ধে সুস্পষ্ট কিছু দাবী করেছে।

আমি দুটো বিষয়ে জোর দিতে চাই  এখানে, প্রথম, বিজ্ঞানে, কোন থিওরী, কোন বিষয় সম্বন্ধে শুধু মাত্র ‘আনুমানিক’ কোন ধারনা অপেক্ষা আরো অনেক বেশী কিছু বর্ণনা করে, এটি সুচিন্তিত কিছু প্রস্তাবসমুহ যা বাস্তব পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে। অ্যাটোমিক বা আনবিক তত্ত্ব শুধু মাত্র ’আটমের অস্তিত্ব আছে’  এমন কোন বক্তব্য নয়: এটি সেই বক্তব্য যা বলছে, কেমন করে পরমানুগুলো পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া করে, যৌগ গঠন করে, এবং কেমন করে তারা রাসায়নিকভাবে আচরন করে। একই ভাবে ‘বিবর্তন থিওরী’ মানে শুধু মাত্র এটা না যে ’বিবর্তন ঘটেছে’: এটি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত একগুচ্ছ নীতিমালা- আমি প্রধান ছয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছি- যা ব্যাখ্যা করে, ’কিভাবে’ এবং ’কেন’ বিবর্তন হয়েছে।

এখান থেকে আমি দ্বিতীয় বিষয়টিতে আসতে পারি।  কোন  একটি ’তত্ত্ব’কে ’বৈজ্ঞানিক’ হিসাবে  বিবেচনার করতে হলে, একে অবশ্যই ’পরীক্ষাযোগ্য’ হতে হবে এবং এটি প্রমান করা সম্ভব এমন ’প্রেডিকশন’ বা ভবিষ্যদ্বানী করার ক্ষমতা সম্পন্ন হতে হবে। এর অর্থ বাস্তব পৃথিবীতে আমরা এর পক্ষে বিপক্ষে প্রমান কিংবা অপ্রমান করার জন্য পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষন করতে পারবো। ’পারমানবিক তত্ত্ব’ প্রথমদিকে ছিল অনুমান নির্ভর, কিন্তু ধীরে ধীরে এটি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে যখন রসায়ন বিজ্ঞানে এর স্বপক্ষে যথেষ্ট পরিমান প্রমান জড়ো হতে থাকে, যা পরমানুদের সত্যিকার অস্তিত্বটাকে প্রমান করে। যদিও ১৯৮১ সালে স্ক্যানিং  প্রোব মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের আগে কেউই প্রকৃত পক্ষে অ্যাটম দেখেনি ( মাইক্রোস্কোপের নীচে যেমনটা ধারনা করা হয়েছিল, এরা সেরকমই ছোট বলের মত দেখতে); বিজ্ঞানীরা বহু আগেই বিশ্বাস করেছিলেন, পরমানু সত্যি অস্তিত্ত্ব আছে। এভাবেই কোন ভালো ’তত্ত্ব’ এধরনের ভবিষদ্বানী করতে পারে, কি দেখতে পারি আমরা যদি খুব মনোযোগ দিয়ে, কাছ থেকে আমরা প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষন করি। এবং যদি সেই ভবিষ্যদ্বানীগুলো কার্যত সত্যি প্রমানিত হয় তাহলে সেই ’তত্ত্ব’টির সত্যতা সম্বন্ধে আমাদের আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। ১৯২৫ সালে আইনস্টাইনের ’থিওরী অব রিলেটিভিটি’, প্রেডিক্ট করেছিল, কোন সুবিশাল মহাজাগতিক বস্তুর পাশ দিয়ে আলো অতিক্রম করার সময় তার গতিপথ খানিকটা বেকে যাবে  (টেকনিক্যাল ভাষায় এ ধরনের বিশাল মহাজাগতিক কোন বস্তুর মধ্যাকর্ষন শক্তি স্পেস-টাইমকে বাকিয়ে দেয়, যা ফোটন কনার গতিপথকেও বাকিয়ে দেবে); পরবর্তীতে সুনিশ্চিৎভাবে, ১৯১৯ সালে বিষয়টি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমান করেন, আর্থার এডিংটন, সুর্যগ্রহনের সময় দুরবর্তী একটি নক্ষত্র থেকে আসা আলোর গতিপথ বক্র হয়ে যায়, সুর্যকে অতিক্রম করার সময়ে, যা নক্ষত্রটির অবস্থানের আপাতদৃষ্টিতে পরিবর্তন করে। এই প্রেডিকশনটি যখন পরীক্ষিত হলো, তখনই আইনস্টাইনের তত্ত্বর গ্রহনযোগ্যতাও আরো বৃদ্ধি পায়।

যেহেতু কোন ’তত্ত্ব’  গ্রহনযোগ্য হয় ’সত্য’ হিসাবে, যখন এর দাবীগুলো এবং প্রেডিকশনগুলো বার বার পরীক্ষা করা যায়, এবং বারংবার নিশ্চিৎ প্রমান করা হয়, এমন কোন একটি একক মুহুর্ত বলে কিছু  থাকে না, যখন কিনা কোন একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব  হঠাৎ করে একবারেই কোন বৈজ্ঞানিক ‘ফ্যাক্ট বা সত্য’ হয়ে যায়। একটি ’তত্ত্ব’ ’ফ্যাক্ট বা সত্যে’ পরিনত হয় যখন অসংখ্য প্রমান এর স্বপক্ষে জমা হয় এবং এমন কোন গুরুত্বপুর্ন প্রমান পাওয়া যায় না যা কিনা এর সত্যতা ভুল প্রমান করে- এবং আক্ষরিক অর্থে সকল যৌক্তিক মানুষ এটি মেনে নেয়। এর মানে কিন্তু এই না যে, কোনদিনও কোন ’সত্য’ তত্ত্ব মিথ্যা প্রমানিত হতে পারে না। সব বৈজ্ঞানিক সত্যই ’প্রভিশনাল’, প্রাথমিক, যা  নতুন প্রমানের আলোকে পরিবর্তিত হতেই পারে। এমন কোন অ্যালার্ম বেল নেই, যা বেজে উঠে জানান দেয় বিজ্ঞানীদের, তারা অবশেষে প্রকৃতি সম্বন্ধে চুড়ান্ত অপরিবর্তনযোগ্য ’সত্য’টি খুজে পেয়েছেন। আমরা পরে দেখবো, এটা হতে পারে, লক্ষ হাজার পর্যবেক্ষন যা কিনা সমর্থন করছে ডারউইনিজমকে, নতুন কোন উপাত্ত হয়তে দেখাতে পারে এটি ভুল। কিন্ত‍ু আমি মনে করি সেটা হবার কোন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের জন্য কোনটাকে তারা সত্য বলে গ্রহন করবে সেক্ষেত্রে তাদের কোন অন্ধ গোড়া মৌলবাদীদের মত অহঙ্কারী হওয়াটা মানায় না।

‘সত্য’ বা ’ফ্যাক্ট’ হবার প্রক্রিয়ায়, বৈজ্ঞানিক ’থিওরী’গুলোকে বিকল্প ’থিওরী’দের বিপরীতে পরীক্ষা করে দেখা হয়। কারন কোন একটি প্রাকৃতিক ফেনোমেনা বা ঘটনার সাধারনত একাধিক ব্যাখ্যা থাকতে ‍পারে। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করেন, গুরুত্বপুর্ন পর্যবেক্ষন করার জন্য অথবা প্রমান খোজার জন্য পরীক্ষা করেন, যা প্রতিদ্বন্দী ব্যাখ্যাগুলোকে একটার সাথে অন্যটির তুলনামুলক একটি যাচাই বাছাই করার মাধ্যমে। অনেক বছর ধরেই ধারনা করা হতো পৃথিবীর ভুপৃষ্ঠে স্থলভুমিগুলোর অবস্থান জীবনের ইতিহাসের জন্মলগ্ন থেকে অপরিবর্তিত আছে, কিন্তু ১৯১২ সালে জার্মান ভুপদার্থবিদ আলফ্রেড ওয়েগেনার এর একটি প্রতিদ্বন্দী তত্ত্ব প্রস্তাব করেন, ‘কন্টিনেন্টাল ড্রিফট’ থিওরী, যা প্রস্তাব করেছিল, মহাদেশগুলো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। প্রথম দিকে তার এই ধরনের ধারনার পিছনে অনুপ্রেরনা ছিল পর্যবেক্ষন নির্ভর, আফ্রিকা এবং দক্ষিন আমেরিকা মহাদেশের আকৃতি, যাদের অনেকটা জিগস পাজলের টুকরার মত পরস্পরের সম্পুরক, সেখান থেকেই। ’কন্টিনেন্টাল ড্রিফট’ এর বিষয়টি আরো নিশ্চিৎ হয় ক্রমান্বয়ে জীবাশ্ম সংগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে এবং জীবাশ্মবিদরা দেখলেন প্রাচীন প্রজাতিগুলোর বিস্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কোন এক সময় ভুখন্ডগুলো আসলেই একসাথে যুক্ত ছিল। পরে, ‘প্লেট টেকটোনিক’ তত্ত্বর মাধ্যমে( কানাডীয় ভুতাত্ত্বিক জন তুজো উইলসন এর) প্রস্তাব করা হয় মহাদেশীয় ভুখন্ডগুলির নড়াচড়া করার কারন হিসাবে, ঠিক যেমন, প্রাকৃতিক নির্বাচনকে প্রস্তাব করা হয়েছে বিবর্তনের মেকানিজম হিসাবে: পৃথিবীর ভুপৃষ্ঠ (ক্রাষ্ট এবং আপার ম্যান্টল বা লিথোস্ফেয়ার) পৃথিবীর আভ্যন্তরীন তরল পদার্থের উপর ভাসমান।’প্লেট টেকটনিক’ তত্ত্বকে  প্রথমে ভুতত্ত্ববিদদের সন্দেহের মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক এবং বহু ক্ষেত্রে একে নানা কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা বর্তমানে খুব বিশ্বাসযোগ্য ভাবেই তত্ত্বটিকে প্রমান করেছে ’সত্য’ হিসাবে। বর্তমানে গ্লোবাল পজিশনিং স্যাটেলাইট টেকনোলজীর জন্য সুবাদে, আমরা এখন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি মহাদেশীয় ভুখন্ডগুলো একে অপরের থেকে প্রতি বছর ২ থেকে ৪ ইন্চি দুরে সরে যাচ্ছে ( প্রায় যে হারে আপনার হাতে নোখ বাড়ে); প্রসঙ্গক্রমে এটি, এবং এর সাথে যুক্ত উপেক্ষা করা অসম্ভব এমন কিছু প্রমান, যে মহাদেশীয় ভুখন্ডগুলো কোন এক সময় পরস্পর সংযুক্ত ছিল, এ বিষয়টি ‘ইয়ং আর্থ সৃষ্টিবাদী’দের পৃথিবী মাত্র ৬০০০ থেকে ১০০০০ বছর প্রাচীন, এমন ধারনার বিরুদ্ধে জোরালো একটি প্রমান। তাদের দাবী যদি সত্যি হত, তাহলে আমরা স্পেনের সাগর উপকুল থেকে নিউ ইয়র্ক সিটি র শহরের স্কাইলাইন দেখতে পেতাম, কারন তাদের প্রস্তাবিত সময়কালের মধ্যে ইউরোপ আমেরিকার ভুখন্ড এক মাইলেরও কম দুরে সরতো।

যখন ডার‌‌উইন  তার ’অন দি অরিজিন’ বইটি লেখেন, বেশীর ভাগ পশ্চিমা বিজ্ঞানী এবং বাকীরা প্রায় সবাই ছিলেন সৃষ্টিবাদী বা ক্রিয়েশনিষ্ট; জেনেসিসে ব্যাখ্যা করা প্রতিটি বর্ণনা আক্ষরিক অর্থে তারা মেনে না নিলেও, বেশীর ভাগই মনে করতেন, জীবনের সৃষ্টি হয়েছে কম বেশী বর্তমান আকারে বা ফর্মে, সর্বশক্তিমান কোন সৃষ্টিকর্তার দ্বারা, এবং প্রজাতির সৃষ্টির পর থেকে যার আর কোন পরিবর্তনই হয়নি। ‘অন দি  অরিজিন’ বইটিতে ডারউইন এর একটি বিকল্প হাইপোথিসিস প্রস্তাব করেন, জীবনের ‌‌ডেভোলপমেন্ট, এর বহু বিচিত্রতা এবং পরিকল্পনা বা ডিজাইন এর  ব্যাখ্যায় । বইটির বিশাল একটি অংশ শুধু বিবর্তনের স্বপক্ষেই প্রমান জড়ো করেনি, একই সাথে ক্রিয়েশনিজম বা সৃষ্টিবাদের তত্ত্বটিকে খন্ডন করে। ডারউইনের কাছে সেই সময়ে বিবর্তনের স্বপক্ষে জোরালো প্রমান ছিল তবে সে বিষয়ে পুরোপুরিভাবে চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত দেবার মত ছিল না, সেকারনে ডার‌উইনের সেই সময়, আমরা বলতে পারি, বিবর্তন একটি ’তত্ত্ব’ (যদিও খুবই শক্ত প্রমানের উপর দাড়ানো একটি ’তত্ত্ব’) যখন ডার‌উইন প্রথম এটি প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু ১৮৫৯ সালে পর এটি এখন ’সত্য‘ বা ’ফ্যাক্ট’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য প্রমানের উপর ভিত্তি করে এবং এখনও জড়ো হচ্ছে প্রমান। বিবর্তনকে এখনও ’থিওরী’ বলেই ডাকা হয়, ঠিক যেমন মধ্যাকর্ষন এর ’থিওরী’ ( ’থিওরী অফ গ্র্যাভিটি’), কিন্তু এটা সেই ’থিওরী’ যা একটি ’ফ্যাক্ট’ও বটে।

তাহলে আমরা বিবর্তন তত্ত্বকে কিভাবে পরীক্ষা করবো এর এখনও জনপ্রিয় বিকল্প তত্ত্বর বীপরিতে: যা দাবী করছে, জীবন ’সৃষ্টি’ করা হয়েছে এবং সৃষ্টির পর তা অপরিবর্তিত থেকেছে। আসলে এখানে দুই ধরনের প্রমান আছে, প্রথমটি হচ্ছে, ডারউইনিজমের মুল ছটি টেনেট বা মুল বিষয়গুলো ব্যবহার করে ’পরীক্ষাযোগ্য‘  কিছু প্রেডিকশন বা ভবিষ্যদ্বানী করা। এই ’প্রেডিকশন’ মানে আমি বলছি না; ভবিষ্যতে প্রজাতি কিভাবে বিবর্তিত হবে ডারউইনিজম তা প্রেডিক্ট করতে পারে। বরং বর্তমানে জীবিত ও প্রাচীন প্রানীদের নিয়ে আমরা যখন গবেষনা ‍এবং পর্যবেক্ষন করবো, তখন আমাদের কি খুজে পাওয়া উচিৎ। নীচে তেমন কিছু বিবর্তনীয় প্রেডিকশন  উল্লেখ করা হলো:

  • যেহেতু জীবাশ্মগুলো প্রাচীন জীবনের  অবশেষ, জীবাশ্ম রেকর্ডে বিবর্তনীয় পরিবর্তনের প্রমান আমাদের সেখানে খুজে পাওয়া উচিৎ। ভুত্বকের পাথরের গভীরতম স্তরে (এবং প্রাচীনতম) অপেক্ষাকৃতভাবে আদিমতম প্রানীদের জীবাশ্ম থাকবে এবং পাথরের স্তর যতই অপেক্ষাকৃত নবীন হতে থাকবে, কোন কোন জীবাশ্ম প্রজাতিদের গঠনে জটিলতাও বাড়বে এবং  বর্তমান যুগের প্রজাতিদের মত জীবদের জীবাশ্ম পাওয়া যাবে অপেক্ষাকৃতভাবে সাম্প্রতিক স্তরগুলোতে। এবং আমরা দেখতে পারবো, সময়ের সাথে কিছু প্রজাতিদের ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন, যারা তৈরী করছে বংশধারা বা লিনিয়েজ, ‘descent with modification ’ অর্থাৎ পরিবর্তনের সাথে নতুন বংশানুক্রম ( অভিযোজন)।
  • আমাদের কিছু স্পিসিয়েশন বা প্রজাতিকরণ এর কিছু উদহারনও খুজে পাওয়া উচিৎ জীবাশ্ম রেকর্ডে, যেখানে কোন একটি বংশধারা বিভাজিত হয়েছে দুইটি ও আরো বেশী ধারায় এবং বন্য প্রকৃতিতে নতুন প্রজাতির উদ্ভবও আমাদের খুজে পাওয়া উচিৎ।
  • সেই সব প্রজাতিদের নমুনা আমাদের খুজে পাওয়া উচিৎ, সাধারন বা কমন বংশধারার বলে সন্দেহ করা হয় এমন প্রধান গ্রুপ গুলোকে যারা সংযোগ করে। যেমন পাখী এবং সরীসৃপ ও মাছ এবং উভচর প্রানীরা। এছাড়া এই ’মিসিং লিঙ্ক’ ( আরো সঠিকভাবে বললে ’ট্রান্জিশনাল’ ফর্ম) প্রজাতির জীবাশ্ম সেই স্তরে পাওয়া যাওয়া উচিৎ যে স্তরের সময়কাল এই গ্রুপগুলোর বিভাজনকালের সমসাময়িক হবে।
  • আমরা প্রজাতিদের মধ্যে অনেক বৈশিষ্ট্যরই মধ্যে জেনেটিক বৈচিত্রতা বা ভিন্নতা লক্ষ্য করবো (অনথ্যায় বিবর্তন হবার কোন সম্ভাবনা নেই )।
  • ভুল বা ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো বিবর্তনের চিহ্ন, কোন সচেতন সৃষ্টিকর্তার ডিজাইনের চিহ্ন নয়।  আমরা অবশ্য পুরোপুরি সঠিক হয়নি এমন অ্যাডাপটেশন বা অভিযোজনের উদহারন খুজে পাবো, যেখানে বিবর্তন পক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছে সেই পরিমান উপযোগী, ‘অনুকুল’ অভিযোজন ক্ষমতা অর্জন করতে, যা হয়তবা কোন বুদ্ধিমান সৃষ্টিকর্তার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল।
  • বন্য পরিবেশে আমাদের প্রাকৃতিক নির্বাচনকে তার প্রভাব দেখতে পাওয়া উচিৎ।

এই সব ভবিষ্যকথন ছাড়াও, ডারউইনিজম সমর্থন পাওয়া যায় আরেকটি ক্ষেত্রে, আমি যেটা বলছি, রেট্রোডিকশন বা অতীতকথনে: ফ্যাক্ট এবং উপাত্ত যা হয়তো বা বিবর্তন তত্ত্বকে প্রেডিক্ট করেনি কিন্তু  শুধুমাত্র ’বিবর্তন তত্ত্বের আলোকেই তাদের একটি বোধগম্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়’; রেট্রোডিকশন বিজ্ঞানচর্চার একটি গ্রহনযোগ্য পদ্ধতি: কিছু প্রমানাদি যা ‘প্লেট টেকটোনিক’ তত্ত্বকে সমর্থন করে, যেমন, এসেছে সমুদ্রতলদেশে পাথরদের সজ্জার বিন্যাসের থেকে, শুধুমাত্র পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রর অতীত পরিবর্তনের চিহ্ন অনুধাবন করতে যখন, বিজ্ঞান সেই দক্ষতা অর্জন করেছে। কিছু কিছু রেট্রোডিকশন বিবর্তনকে সমর্থন করে ( বিশেষ সৃষ্টিবাদ যা পারেনা), যেমন ভুপৃষ্টে প্রজাতিদের বিস্তার, ভ্রুণ থেকে কিভাবে একটি জীব পুর্নতা পায় সেই প্রক্রিয়ার  কিছু  স্বতন্ত্র বিশেষত্ত্ব এবং ভেস্টিজিয়াল বা বর্তমানে আপাতদৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয় না এমন কিছু বৈশিষ্ট। পরবর্তীতে ৩য় এবং ৪ র্থ অধ্যায় এ বিষয়ে আমি আলোচনা করেছি।

বিবর্তন তত্ত্ব, তাহলে, ভবিষ্যদ্বানী করছে  যা সাহসী এবং স্পষ্ট। ডারউইন প্রায় বিশ বছর ধরে ’অন দি অরিজিন’ প্রকাশের আগে তার ধারনার স্বপক্ষে প্রমান সংগ্রহ করেছিলেন। সেটা ১৫০ বছর আগের কথা। গত এই দেড় শতাব্দীতে, এর স্বপক্ষে আরো অনেক প্রমান জড়ো হয়েছে, জ্ঞানের পরিধিও বেড়েছে, আরো কত বেশী জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়েছে এবং হচ্ছে, অসংখ্য প্রজাতির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তাদের পৃথিবীব্যাপী ভৌগলিক বিস্তারও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।বিভিন্ন প্রানীদের মধ্যে বিবর্তনীয় সম্পর্ক উন্মোচনের প্রক্রিয়ায় এত বেশী কাজ করা হয়েছে। ডারউইন যা স্বপ্নেও ভাবেননি, এমন সম্পুর্ন  নতুন শাখার সুচনা হয়েছে বিজ্ঞানে, মলিকিউলার বায়োলজী এবং সিস্টেম্যাটিক্স ( বিভিন্ন প্রানীদের পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ের বিদ্যা)।

পরবর্তী অধ্যায় গুলোতে আমরা দেখবো, সব প্রমান, পুরোনো এবং নতুন- নির্দেশ করে সেই অনবক্রম্য উপসংহারের দিকে: বিবর্তন সত্যি।

Advertisements
বিবর্তন কি ?

9 thoughts on “বিবর্তন কি ?

  1. ” আসুন আমরা চেষ্টা করি ক্রমশ বাড়তে থাকা অন্ধ কুপমন্ডুকতার ব্যতিক্রম হবার জন্য। ”

    সেটাই, শুভকামনা রইলো।

  2. আমি Sapience: A Brief History of Humankind বইটার বাংলা অনুবাদ করছি। আপনার লেখা থেকে অনেক বাংলা প্রতিশব্দ চুরি করব কিন্তু।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s