শুধু এক শতাংশ: আমাদের অতীতের ভবিষ্যৎ


শীর্ষ ছবি: শুধু এক শতাংশ পার্থক্য। শিম্পান্জিদের সাথে আমাদের ডিএনএ পর্যায়ে মিল প্রায় ৯৯ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও আমরা বহু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে শিম্পান্জি থেকে অনেক আলাদা। তুলনামুলক জিনতত্ত্বের নতুন গবেষণাগুলো ধীরে ধীরে উন্মোচন করছে জিনোমের কোন অংশগুলো আমাদের এই দুই প্রজাতিকে আলাদা করেছে। ছবি: JAMES BALOG Getty Images, Scientific American, May 2009)

(তথ্য সুত্র লেখার শেষে)

If Darwin were here today, he’d be absolutely stunned, delighted, even moved, to see how much his theory has grown. Sean B Carroll ( in What Darwin Never Knew)

আমাদের অতীতের ভবিষ্যতের সন্ধানে কিংবা শুধু ভূমিকা:

গত দশকে শিম্পান্জির সাথে মানুষের জিনোমের তুলনা করে বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু দুর্লভ জিনোমের অংশ বা অনুক্রম ( সিকোয়েন্স) খুঁজে পেয়েছেন, যা শুধুমাত্র আমাদের ডিএনএ তেই পাওয়া যায়। জীবিত প্রাণিদের মধ্যে শিম্পান্জি হচ্ছে জিন পর্যায়ে মানুষের সবচেয়ে নিকটাত্মীয়।  বিজ্ঞানীরা শিম্পান্জি জিনোমের অনুক্রম সম্পুর্ন জানার পর, তুলনা করে দেখেছেন যে আমাদের সাথে শিম্পান্জির ডিএনএ র সাদৃশ্য প্রায় ৯৯ শতাংশ। শিম্পান্জি আর মানুষ তাদের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বসূরি প্রানী থেকে পৃথক হবার পর আমাদের জিনোমের যে অঞ্চলগুলোতে সবচেয়ে বেশী পরিবর্তন হয়েছে, বিজ্ঞানীরা সেই অংশগুলো খোঁজার প্রচেষ্টার ফলাফল হিসাবে বিশেষ কিছু ডিএনএ অনুক্রম বা সিকোয়েন্স শনাক্ত করেছেন, যে পরিবর্তনগুলো সম্ভবত মানুষ হিসাবে আমাদের অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে। উপরন্তু গবেষণার এই ফলাফলগুলো ডিএনএ নিল নকশায় এত সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও মানুষ আর শিম্পান্জির মধ্যে পার্থক্য কেন এত গভীর, এ বিষয়েও গুরুত্বপূর্ন কিছু ধারণা দিয়েছে বিজ্ঞানীদের এবং সূচনা করেছে তুলনামুলক জিনতত্ত্বের প্রতিশ্রুতিময় পথ চলা।

আমরা কেন মানুষ:

সান ফ্রান্সিসকোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের  জৈবপরিসংখ্যানবিদ ও সহযোগী অধ্যাপক ক্যাটি পোলার্ড ২০০৩ সালে, তার পোষ্ট ডক্টোরাল এ তুলনামুলক জিনতত্ত্বের উপর একটি ফেলোশীপ করার সময় শিম্পান্জি জিনোমের সিকোয়েন্স বা অনুক্রম করার প্রোজেক্টে অংশ নেন। পোলার্ড তার নিজের লেখা একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামের  মাধ্যমে শিম্পান্জির জিনোম অনুক্রমটির সাথে তুলনা করে মানুষের জিনোমে সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল বেশ কিছু অনুক্রম শনাক্ত করতে সক্ষম হন। নীচের লেখাটি সুত্রপাত ক্যাটি পোলার্ডের এর সায়েন্টিফিক আমেরিকান পত্রিকায় What makes us human? প্রবন্ধটি পড়ার মাধ্যমে। কিন্তু আরো বেশ কিছু প্রয়োজনীয় প্রকাশনা এবং প্রামান্য চিত্র থেকে তথ্য যোগ করেছি নীচের লেখার মুল কলেবরে (তথ্য সুত্র লেখার শেষে)।

যে শব্দগুলোর বা ধারণার ব্যাখ্যা, কারো কারো জন্য প্রয়োজন হতে পারে (মূল লেখাটি পরের অনুচ্ছেদ থেকে শুরু হয়েছে):

Genome বা জিনোম বলতে আণবিক জীববিজ্ঞানীরা বোঝান সম্পুর্নভাবে কোনো একটি জীবের হেরেডিটারী বা বংশগতির সকল তথ্যকে, যা মূলত কোড বা সাংকেতিক আকারে  থাকে  জীবকোষের নিউক্লিয়াসে ডিএনএ (DNA: Deoxyribose Nucleic Acid)  এবং কিছু ভাইরাসের ক্ষেত্রে তাদের আরএনএ (RNA: Ribose Neucleic Acid ) অণুতে। জিনোমের যে অংশগুলো জীবদেহের প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরীর সংকেত বা কোড বহন করে তাদেরকে বলা হয় জিন (Gene), কিন্তু প্রোটিন কোড করা অংশ ছাড়াও ডিএনএ র বিশাল একটি অংশের প্রোটিন তৈরীতে কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। কোড করা এবং  কোড না করা, এই দুই অংশই তৈরী করে কোনো একটি জীবের জিনোম। আমাদের সবারই কমবেশী ডিএনএ সম্বন্ধে ধারণা আছে ; ডিএনএ অণুর বাঁকানো সর্পিকালার ডাবল হেলিক্স মডেলটির ছবির প্রায় সার্বজনীন পরিচিতির কারণেই তাকে বলা হয় বিজ্ঞানের মোনালিসা। এর গঠন আর কার্যপ্রণালীর আবিষ্কারকে মনে করা হয় বিংশ শতাব্দীতে জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক। মুল লেখায় ঢোকার আগে সকল প্রাণের ভিত্তি, এই অসাধারণ অনুটিকে নিয়ে একটি সাধারণ আলোচনা করা প্রয়োজন।

ডিএনএ বা ডি অক্সিরাইবোজ নিউক্লিক এসিড অণুটি থাকে আমাদের কোষের নিউক্লিয়াসে (নিউক্লিয়াসের বাইরেও ডিএনএ থাকে, যেমন কোষের পাওয়ার হাউস বলে পরিচিত মাইটোকন্ড্রিয়াতে থাকে মোট ডিএনএ শতকরা ১ ভাগ); ডিএনএ এর মূল উপাদান হলো চারটি নিউক্লিওটাইড বেস : এরা আসলে খুবই গুরত্বপূর্ণ নাইট্রোজেন যুক্ত একধরনের হেটেরোসাইক্লিক যৌগ, অ্যাডেনিন (Adenine), থাইমিডিন (Thymidine), গুয়ানিন (Guanine) ও  সাইটোসিন (Cytosine), এদের সাথে যুক্ত ডিঅক্সিরাইবোজ নামে একটি সুগার অনু এবং এই সুগার অনুর সাথে যুক্ত একটি ফসফোরাইল গ্রুপ। এই চারটি বেস মনোমার ইউনিটই পরস্পরের সাথে য হয়ে ডিএনএ পলিমার অনুটি গঠন করে।

ডিএনএ র তথ্য বা জেনেটিক কোড বা সংকেত সাজানো থাকে এই নিউক্লিওটাইড বেসগুলোর সিকোয়েন্স বা অনুক্রমে (সংক্ষেপে যাদের A ,T, G, C  এই চারটি বর্ণ দ্বারা প্রকাশ করা হয়, যা যথাক্রমে Adenine, Thymidine, Guanine, Cytosine এর আদ্যক্ষর); ডিএনএ যে জেনেটিক তথ্য বহন করে, ১৯৪৪ সালে তা প্রমাণ করেছিলেন ওসওয়াল্ড এভরি, কলিন ম্যাকলয়েড এবং ম্যাকলীন ম্যাককার্টি। এই নিউক্লিওটাইড বেসগুলো ডিএনএ অনুর দুটি পলিমার স্ট্রান্ড  নিজেদের মধ্যে হাইড্রোজেন বন্ড তৈরী করার মাধ্যমে ডাবল স্ট্র্যান্ড অনু গঠন করে। বেসগুলোর এই জোড় বাধা বা বেস পেয়ারিং ( সংক্ষেপে bp) কিন্তু খুবই সুনির্দিষ্ট; যেমন, A (Adenine) জোড় বাধে T(Thymidine) এবং G (Guanine) জোড় বাধে C(Cytosine) এর সাথে। এই ডাবল স্ট্র্যান্ড পলিমার অনুটি এরপর একটি কেন্দ্রীয় অ্ক্ষের চারপাশে পেচিয়ে একটি সর্পিলাকার হেলিক্স তৈরী করে।


ছবি: ডিএনএ ডাবল হেলিক্সের সরলীকৃত স্কীমাটিক ডায়াগ্রাম ( সুত্র) 

আমাদের কোষের মধ্যে ডিএনএ অনুগুলো সাজানো থাকে ক্রোমোজোমে কিছু বিশেষ প্রোটিনের সাথে। প্রতিটি ক্রোমোজোম তৈরী হয় একটি দীর্ঘ, খুবই জটিল এবং বেশ কয়েকটি স্তরে কুণ্ডলী করে করে প্যাচানো ডিএনএ অনু দিয়ে, যাকে স্থিতিশীল করে রাখে ক্রোমোজোমের প্রোটিনগুলো। এদেরকেই একসাথে বলা হয় ক্রোমাটিন। আমাদের শরীরের কোষে মোট ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে ( অর্থাৎ মোট ৪৬ টি, শিম্পান্জিদের যেমন থাকে  ৪৮টি); এজন্য আমাদের এই কোষগুলোকে বলা হয় ডিপ্লয়েড। কিন্তু কিছু কোষ, যারা যৌন প্রজননের ‍সাথে যুক্ত যেমন ডিম্বাণুবা শুক্রাণুতে থাকে ২৩ টি করে ক্রোমোজোম ( হ্যাপলয়েড); মানুষের এই হ্যাপলয়েড (২৩ টি) ক্রোমোজোমের জিনোম বা সবগুলো ডিএনএ অনুতে থাকে প্রায় ৩.২  বিলিয়ন বেস পেয়ার ( A, G, T, C);

দেখা গেছে এই বিশাল ডিএনএ খুব ক্ষুদ্র অংশই আসলে কোড বা সংকেত বহন করে প্রোটিন ( বিভিন্ন সংখ্যক অ্যামাইনো এসিড যুক্ত হয়ে প্রোটিন তৈরী করে) তৈরী করার জন্য ( অর্থাৎ জিন হিসাবে কাজ করে), ধারণা করা হয় আমাদের জিনোমে প্রায় ২০০০০ থেকে ২৫০০০ জিন আছে, অর্থাৎ আমাদের এই তিন কোটি বেস পেয়ারের সুবিশাল জিনোমের খুব সামান্য অংশ, মাত্র ১.৫% জিন বহন করে।

আমরা যেটাকে জীন (Gene) বলি সেটা  A, G, T, C  বেস এর অনুক্রম নিয়ে তৈরী ডিএনএ সুনির্দিষ্ট একটি অংশ। এই A, G, T, C  গুলো ফাংশনালী ( যেভাবে এটি কাজ করে) সাজানো থাকে  তিনটি বেস ( যাকে লেটারও বলা হয়, যেমন: A, G, T, C  ) পাশাপাশি অবস্থান করার একটা অ্যারেন্জমেন্টের বা সজ্জার মাধ্যমে। ৩ টি বেসের এমন সজ্জাকে বলা হয় কোডোন ( Codon) আর বিভিন্ন সংখ্যক কোডন মিলে তৈরী হয় জেনেটিক কোড। জেনেটিক কোডগুলো জীবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রোটিনের সংকেত বহন করে। একটি পুর্নাঙ্গ জীব তৈরীর ব্লুপ্রিন্টটাই সাজানো থাকে সেই জীবের জীনোমে থাকা জেনেটিক কোডে।

ছবি: জীনের গঠনের একটি ডায়াগ্রাম ( সুত্র: New Scientist, Feb 22,2008)

কোডোন হচ্ছে ট্রিপলেট কোড, কারন তিনটি বেস নিয়ে এটি তৈরী। প্রত্যেকটি কোডন মুলত একটি করে অ্যামাইনো অ্যাসিডকে কোড করে। A, G, T, C  এই চারটি বেস মিলে সর্ব্বোচ্চ ৬৪ টি কোডন তৈরী করতে পারে ( ৪), দেখা গেছে এর মধ্যে ৩টি ছাড়া বাকী ৬১ টি কোডন আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ২০টি অ্যামাইনো অ্যাসিডকে নির্দেশকারী সংকেত বহন করে (যেমন: স্তন্যপায়ী প্রানীদের GGU, GGC, GGA, GGG  এই চারটি কোডোন Glycine নামের একটি প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডকে কোড করে)।

জীবকোষের নিউক্লিয়াসে ডিএনএ থেকে প্রথমে জেনেটিক তথ্যগুলো ( কোডোনের সিরিজ) ‌ঐ জীনটির নির্দিষ্ট A T G C  এর সিকোয়েন্স এর কম্প্লিমেন্টারী সিকোয়েন্সেটি কপি বা ট্রান্সক্রাইব হয় একটি নির্দিষ্ট RNA ‍ বা রাইবোজ নিউক্লিক এসিড এ ( যাকে বলে মেসেন্জার বা mRNA);  এই মেসেন্জার আরএনএ টি বেস সিকোয়েন্স এই জীনটি যে প্রোটিনের জেনেটিক সংকেত বহন করছে সেই প্রোটিনের অ্যামাইনো অ্যাসিডের অনুক্রমে সাজানো। এটি তারপর কোষের সাইটোপ্লাজমের রাইবোজোমে আরো কিছু অ্যাডাপটার মলিকিউল, tRNA বা ট্রান্সপোর্ট RNA ,যারা আলাদা আলাদা ভাবে ( তাদের কোডনের কমপ্লিমেন্টারী অ্যান্টি কোডোনের অনুক্রম অনুযায়ী) একটি করে নির্দিষ্ট অ্যামাইনো অ্যাসিড নিয়ে এসে mRNA এর কোডটিকে ট্রান্সলেট কর একটার পর একটা অ্যামাইনো অ্যাসিড যোগ করে। ফলাফলে তৈরী হয় একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন।

কোন কারনে যদি ডিএনএ কোডনের কোন বেস এর পরিবর্তন হয়, তাহলে সেই কোডন দ্বারা নির্দেশিত অ্যামাইনো এসিডেও পরিবর্তন আসে, অর্থাৎ প্রোটিনেও যে অবস্থানে অ্যামাইনো অ্যাসিডটি ছিল সেখানেও পরিবর্তন আনবে। বেস এর এই পরিবর্তনকেই বলে মিউটেশন। অনেক ধরনের মিউটেশন হতে পারে। কোন কোন সময় এই পরিবর্তন,এটি যে প্রোটিনের অংশ, তার কোন সমস্যা করেনা। আমাদের রক্তের লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যে থাকা প্রোটিন, হিমোগ্লোবিনের (Hb) এর উদহারন দেয়া যাতে পারে (হিমোগ্লোবিনের প্রধান কাজ ফুসফুস থেকে অক্সিজেন নিয়ে শরীরের কোষগুলোতে পৌছে দেয়া এবং কোষের কার্বন ডাই অক্সাইডকে ফুসফুসে নিয়ে আসা):  পুর্নবয়স্ক মানুষের শরীরের হিমোগ্লোবিন এর  বিটা চেইনে, ৬১ নং অ্যামাইনো অ্যাসিডটি হলো লা্‌ইসিন (Lysine) , যার কোডোন AAA কিংবা AAG হতে পারে। কিন্তু কোন কারনে যদি মিউটেশন হয়, যা এর শেষ বেসের পরিবর্তন করে, যেমন কোডনটি AAU বা AAC এ পরিবর্তিত হয়, তখন সেখানে লাইসিনের বদলে হয় যোগ হয় অ্যাসপারাজীন (Asparagine) নামের আরেকটি অ্যামাইনো অ্যাসিড ; জাপানে কিছু মানুষের মধ্যে পাওয়া এই ধরনের মিউটেশনের ফলে সৃষ্ট Hikari  হিমোগ্লোবিন পাওয়া গেছে, এটি কোন সমস্য করেনা প্রোটিনটির কাজের ক্ষেত্রে। আবার  যদি Hb এর একই চেনে ৬ নং অ্যামাইনো অ্যাসিড গ্লুটামেট (Glutamate) এর জায়গায় ভ্যালাইন (Valine) এসে বসে ( কোডোন GAA থেকে GUA বা  GAG থেকে GUG পরিবর্তনের কারনে, মাত্র মধ্যের একটি বেসের পরিবর্তন) তাহলে যে Hb তৈরী হয়, তাকে বলে HbS, যা Sickle Cell Anemia নামের একটি অসুখ করে, এটি অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয় ঠিকই কিন্তু যখনই অক্সিজেনের টেনশন কমে যায় এটি একটি ক্রিষ্টাল গঠন করে লোহিত রক্ত কনিকার আকৃতি পরিবর্তন করে ফেলে। এই মিউটেশন এর বাহককে না মেরে ফেললেও এটি রক্তশুন্যতার কারন হয়।  কিন্তু  যে মিউটেশন একেবারে সহ্য করা যায় না তা হলে যদি Hb এর বিটা চেইনে ৫৮ নং পজিশনে হিস্টাইডিন এর (Histidine)  বদলে টাইরোসিন (Tyrosine) বলে একটি অ্যামাইনো অ্যাসিড বসে পড়ে (কোডোন CAU থেকে UAU বা  CAC থেকে UAC পরিবর্তনের কারনে, মাত্র প্রথম বেসের পরিবর্তন), তখন যে Hb অনুটি তৈরী হয়, যাকে Hb M (Boston) বলা হয়, এটি হিমোগ্লোবিনের মধ্যে যে Fe+2 বা আয়রনের অনুটি থাকে তাকে অক্সিডাইজ করে Fe+3  রুপান্তরিত করে, যা অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হতে পারেনা, তৈরী করে মেথহিমোগ্লোবিন। হিমোগ্লোবিন হিসাবে এটি কোন কাজ করতে পারেনা); এ ক্ষেত্রে মিউটেশনটির ফলাফল ভয়ঙ্কর। মিউটেশন জিনের  (প্রোটিন কোড করা অনুক্রমের) বাইরেও হতে পারে যেমন যেখানে ‍কাছাকাছি কোন জীন রেগুলেট করার কোন জীন আছে।

এবার ফিরে যাই মুল লেখায়।

শিম্পান্জির জীনোম:

২০০৩ সালে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল সাধারন শিম্পান্জির (Pan troglodytes) জীনোমের এর ডিএনএ বেস বা লেটারস’ এর অনুক্রম বা সিকোয়েন্স নির্নয়ের কাজ শুরু করেন। সেই টীমের একজন বায়োস্ট্যাটিষ্টয়ান হিসাবে ক্যাটি পোলার্ড এর প্রধান পরিকল্পনা ছিল, ইতিমধ্যে সিকোয়েন্স হয়ে যাওয়া মানুষের জীনোম এর সাথে জীবজগতে আমাদের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় শিম্পান্জির জীনোমের একটি তুলনামুলক পর্যালোচনা করা। প্রথমেই যে তথ্যটা পাওয়া গেল তা মানুষ হিসাবে আমাদের দর্পচুর্ণ করার জন্য যথেষ্ট। শিম্পান্জিদের জীনোমের সাথে আমাদের জীনোমের হুবুহু মিল প্রায় ৯৯ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে যে তিন বিলিয়ন বেস বা লেটার যা আমাদের জীনোম তৈরী করেছে, তার মাত্র ১৫ মিলিয়ন , আসলে শতকরা ১ ভাগেরও কম –পরিবর্তিত হয়েছে  মোটামুটি গত ৬ মিলিয়ন বছরে, মানুষ আর শিম্পান্জিদের লিনিয়েজ বা বংশ ধারা পৃথক হবার পর।

যদিও জীববিজ্ঞানীরা মনে করেন বেশী ভাগ পরিবর্তনই আমাদের জীববিজ্ঞানে খুব সামান্য বা হয়তো কোন প্রভাবই ফেলেনি। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে ,এই ১৫ মিলিয়ন বেস এর কোথাও না কোথাও কিছু পার্থক্য আছে যা আমাদের মানুষ হিসাবে বিবর্তনের ক্ষেত্রে ভুমিকা পালন করেছে। ক্যাটি পোলার্ড বদ্ধপরিকর ছিলেন, এই ভিন্ন ১৫ মিলিয়ন বেসের অনুক্রমে তিনি সেই বিশেষ অনুক্রমগুলো খুজে দেখবেন যা আমাদের সাথে শিম্পান্জির পার্থক্যর খানিকটা ব্যাখ্যা দিতে পারে ; পরবর্তীতে পোলার্ড এবং আরো বেশ কয়েকটি টিম মানুষ এবং শিম্পান্জিকে থেকে আলাদা করে এমন সম্ভাব্য বেশ কিছু ডিএনএ অনুক্রম শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছেন। তবে স্পষ্টতই এটি তুলনামুলক জীনতত্ত্বের  কেবল শুরু মাত্র।

একটি আগাম বিস্ময়:

এই এক শতাংশ যদিও মানুষের পুরো জীনোমের খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশ, তারপরও এর কয়েক মিলিয়ন বেস এ পার্থক্য খোজা খুব সহজ কোন কাজ না, কারন খোজার জায়গাটা কিন্তু একেবারে ছোট না। এই খোজার কাজটিকে খানিকটা সহজ করতে ক্যাটি পোলার্ড একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম লেখেন, যার কাজ হলো, কমন একটি পুর্বপুরুষ থেকে মানুষ এবং শিম্পান্জি লিনিয়েজ বা বংশধারা পৃথক হবার পর মানুষের জীনোমে ডিএনএ এর যে অংশগুলো, সবচেয়ে বেশী পরিবর্তিত হয়েছে, সেই অংশগুলোকেই খুজে বের করা।

যেহেতু বেশীর ভাগ রানডোম মিউটেশনগুলো এর বহনকারী জীবের কোন উপকারেও আসেনা আবার ক্ষতিও করেনা, তারা একটা নির্দিষ্ট হারে জীনোমে জমা হতে থাকে আর এই মিউটেশনের হার বা রেট থেকে বিজ্ঞানীরা পরিমাপ করতে পারেন, জীবিত কোন দুটি প্রানী তাদের একটি কমন পুর্বপুরুষ থেকে আলাদা লিনিয়েজে পৃথক হবার পর, এর মাঝে মোটামুটি কতটা সময় পার হয়েছে ( এই পরিবর্তনের হারটাকে অনেক সময় ’মলিক্যুলার বা আনবিক ঘড়ির টিকটিক’ করাকে বোঝানো হয়); আবার এই ধরনের মিউটেশনের ঠিক বীপরিত  হচ্ছে, জীনোমে কোন কোন অংশের খুব দ্রুত পরিবর্তন, যা পজিটিভ সিলেকশন বা ধনাত্মক নির্বাচনের এর একটি গুরুত্বপুর্ন চিহ্ন, এ ক্ষেত্রে এই মিউটেশনগুলো এর বাহক জীবকে এই মিউটেশন বহন করেনা এমন কোন জীব অপেক্ষা বেচে থাকার সংগ্রামে ও প্রজনন সাফল্যে বাড়তি কিছু সুবিধা প্রদান করে।

সুতরাং এই প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটা ‍অন্যভাবে বলা যায়, শিম্পান্জি এবং মানুষ তাদের কমন আদিপ্রানী থেকে আলাদা দুটি লিনিয়েজে পৃথক হবার পর, আমাদের জেনেটিক কোডের যে অংশগুলো সবচেয়ে বেশী পরিবর্তিত হয়েছে, ডিএনএ র সেই অনুক্রমগুলোই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন মানবজাতিকে তার অনন্য কিছু বৈশিষ্ট প্রদান করেছে।

নভেম্বর ২০০৪ সালে ক্যাটি পোলার্ডের প্রোগ্রামটিকে ,ডিবাগিং এবং অপটিমাইজেশন এর কাজ হবার পর, সান্তা ক্রজে ক্যার্লিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সুবিশাল একগুচ্ছ শক্তিশালী কম্পিউটারে চালানো হয়। প্রোগ্রামটি শিম্পান্জি এবং মানুষের জীনোম সিকোয়েন্সের তুলনামুলক প্রাথমিক একটি অ্যানালাইসিস করে সবচেয়ে পরিবর্তিত হওয়া জীনোম সিকোয়েন্সের একটি ক্রমবিন্যস্ত তালিকা তৈরী করে;

পোলার্ড এবং তার মেন্টর ডেভিড হাউসলার যখন এই সিকোয়েন্সগুলোর তালিকাটা হাতে নেন, এর শীর্ষে তারা সবচেয়ে বেশী পরিবর্তিত সিকোয়েন্সটা  খুজে পান। সেটি হলো ডিএনএ র ১১৮ টি বেস এর একটি সেগমেন্ট, যার নাম পরবর্তীতে তারা দেন Human Accelerated Region 1 ( বা সংক্ষেপে HAR1);

সান্তা ক্রজের ক্যার্লিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীনোম ব্রাইজার (যা আসলে একটা ভিজুয়ালাইজেশন টুল, পাবলিক ডাটাবেস থেকে বিভিন্ন গবেষনার তথ্য নিয়ে হিউম্যান জীনোমের নানা সেগমেন্টকে ব্যাখ্যা বা প্রয়োজনীয় নোট যুক্ত করে পরিবেশন করে) ব্যবহার করে পোলার্ড HAR1 এর সিকোয়েন্স সম্বন্ধে কোন তথ্য আছে কিনা খোজার প্রক্রিয়া শুরু করেন। ব্রাউজারটি মানুষ, শিম্পান্জি ,মুরগী, ইদুর – যে সব মেরুদন্ডী প্রানীদের জীনোম সিকোয়েন্স ইতিমধ্যে করা হয়ে গেছে,তাদের প্রত্যেকের HAR1 সিকোয়েন্সটি কম্পিউটার স্ক্রিনে নিয়ে আসে। আরো তথ্য পাওয়া যায় যে এর আগে আরেকটি বড় স্ক্রিনিং এর সময়  HAR1 সিকোয়েন্সটি পাওয়া গেছে দুই ধরনের মানুষের মস্তিষ্ক কোষে। যদিও কোন বিজ্ঞানী এই সিকোয়েন্টটির নাম বা এটির কাজ নিয়ে কোন গবেষনা করেননি তখন পর্যন্ত।

ব্যাপারটা পোলার্ড ও তার মেন্টরের জন্য সেই বিখ্যাত ইউরেকা মুহুর্ত।

তারা এমন একটি অনুক্রম খুজে পেয়েছেন যা খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে মানুষ এবং শিম্পান্জির লিনিয়েজ আলাদা হবার পরে এবং এই অনুক্রমটি খুব সম্ভবত বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন এমন একটি জীনের অংশ, যা সক্রিয় হয় মস্তিষ্কে।

মানুষের  মস্তিষ্ক, শিম্পান্জি মস্তিষ্কর তুলনায় আয়তনে, আকারে, গঠনগত এবং কার্যগত জটিলতা ও আরো অনেক বৈশিষ্টের ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। কিন্তু যে ডেভলপমেন্টাল আর বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় উদ্ভুত যে জটিলতাটি মানুষের মস্তিষ্ককে আর অন্য যে কোন প্রানী থেকে আলাদা করেছে, সেই প্রক্রিয়াটা এখনো পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয়নি। তবে পোলার্ড মনে করছেন মানব জীববিজ্ঞানের এই রহস্যময় দিকটিকে আলোকপাত করার মত যথেষ্ট ক্ষমতা আছে এই HAR1 সিকোয়েন্সটির।

২০০৫ সাল পোলার্ড পুরো সময়টা ব্যায় করে HAR1  এর বিবর্তনীয় ইতিহাস খুজতে। এই HAR1 অনুক্রমটির সাথে তারা তুলনা করেন আরো অনেক প্রানীর অনুরুপ অনুক্রমের সাথে, এর মধ্যে ছিল আরো নতুন ১২ টি প্রজাতির মেরুদন্ডী প্রানী, যাদের জীনোম সিকোয়েন্স করা ছিল। এই তুলনামুলক অ্যানালাইসিসে পোলার্ড দেখেন যে, মানুষের আগমনের আগ পর্যন্ত HAR1 সিকোয়েন্সটি বিবর্তিত হয়েছে খুবই ধীরে ধীরে। যেমন চিকেন বা মুরগী আর শিম্পান্জি, কমন আদিপ্রানী থেকে যারা দুটি পৃথক লিনিয়েজে বিভক্ত হয়েছে আনুমানিক প্রায় ৩০০ মিলিয়ন বছর আগে, দেখা যাচ্ছে এই দীর্ঘ সময়ে এই দুটি প্রানীর HAR1 সিকোয়েন্সের মধ্যে পার্থক্য ১১৮ টি বেসের মধ্যে মাত্র ২ টি বেসে, অথচ দেখা যাচ্ছে মানুষ ও শিম্পান্জির জীনোমের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য  মোট ১৮টি বেসে, যাদের লিনিয়েজ বিভাজনের সময়কাল অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক সাম্প্রতিক।


ছবি: মানুষ, শিম্পান্জি  এবং মুরগীর জীনোমে HAR1 এর একটি তুলনামুলক চিত্র 

HAR1 যে দীর্ঘ সময়, বহু মিলিয়ন বছর ধরে অপরিবর্তিত থেকেছে, এই বিষয়টা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই বেস অনুক্রমটি যে জীনের অংশ, সেই জীনটির নিশ্চয়ই খুব গুরুত্বপুর্ন কিছু কাজ আছে এবং এ কারনে বিবর্তন প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘ সময় ধরে এটি রক্ষা করেছে। এবং শিম্পান্জি থেকে মানুষের লিনিয়েজ আলাদা হবার পর HAR1 সিকোয়েন্সে যে যথেষ্ট পরিমান পরিবর্তন ঘটেছে, সেই বিষয়টিও আবার প্রস্তাব করছে, নিশ্চয়ই এই পরিবর্তিত অংশটির কাজও মানুষের  লিনিয়েজে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

২০০৫ সালে আমাদের মস্তিষ্কে HAR1 এর ভুমিকার একটি গুরুত্বপুর্ন ক্লু খুজে পান ক্যাটি পোলার্ড এর সহযোগী বেলজিয়ামের ব্রাসেলস এর ফ্রি ইউনিভার্সিটির পিয়ের ভ্যানডেরহিগেন তার গবেষনায়। সান্টা ক্রজে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব থেকে তিনি HAR1 ডিএনএ অনুক্রমের এর কপির একটি ভায়াল  তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। এই ডিএনএ অনুক্রম কে ব্যবহার করে ফ্লোরেসেন্স (অবিবেগুনী রশ্মির ফিল্টার ব্যবহার করে মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখবার জন্য) মলিকিউলার ট্যাগ ডিজাইন করেন, যেন যখনই HAR1 সিকোয়েন্স সহ জীনটি কোন জীবিত কোষের মধ্যে সক্রিয় হবে ( অর্থাৎ ডিএনএ থেকে আরএনএ তে কপি হবে) ,এই ট্যাগটিকেও আল্ট্রাভায়োলেট লাইটের নীচে শনাক্ত করা যাবে।

সাধারনত যখন কোষের কোন একটি জীন সুইচ অন বা সক্রিয় হয়, কোষ প্রথমে তার জীনের ডিএনএ সিকোয়েন্সটাকে কপি করে মেসেন্জার আরআনএ তৈরী করে। মেসেন্জার আরআনএ (mRNA) একটি মোবাইল অনু। নিউক্লিয়াস থেকে সাইটোপ্লাজমে এসে এটি সেই জীনটির নির্দেশিত প্রয়োজনীয় প্রোটিন অনুটি তৈরী করে। এই বিশেষ ফ্লোরেসেন্স ট্যাগিং এর কারনে পিয়ের যেটা দেখতে পান তা হলো HAR1 সিকোয়েন্সটি  মস্তিষ্কের বিশেষ একধরনের নিউরোন বা স্নায়ুকোষে ( Cajal-Retzius cell) সক্রিয় হয় যারা আমাদের মস্তিষ্কের কুচকানো , বহুমাত্রায় ভাজকরা উপরিভাগটি, যাকে বলে সেরেব্রাল কর্টেক্স, তার নকশা বা প্যাটার্ন এবং এর সজ্জা বা লেআউটটা কেমন হবে সেটা নিয়ন্ত্রনে কেন্দ্রীয় ভুমিকা পালন করে। যখন এই নিউরোনগুলো কোন মিউটেশন জনিত সমস্যায় হলে  ফলাফল হতে পারে ভয়াবহভাবে মারাত্মক। যেমন একটি কনজেনিটাল বা জন্মগত রোগ যা পরিচিত লিসেনসেফালী ( Lissencephaly বা Smooth brain) র ক্ষেত্রে, যেমন দেখা যায় এই্ রোগীদের মস্তিষ্কে সুস্থ্য  মানুষের মস্তিস্কের উপেরিভাগে সাধারণত যে বৈশিষ্টমুলক ফোল্ড বা ভাজ এবং খাজ দেখা যায় তা থাকে না, এই ভাজগুলো আসলে কর্টেক্স এর পৃষ্ঠদেশের হুগুনে আকার বাড়িয়ে দেয়, স্বভাবতঃই স্নায়ুকোষের সংখ্যাও থাকে বেশী। লিসেনসেফালীর রোগীদের মস্তিষ্কের কর্টেক্সের পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্র বা সারফেস এরিয়া অনেক কমে যায়। এছাড়া অন্য একটি টীম এই নিউরোনগুলোর সমস্যার সাথে প্রাপ্তবয়ষ্কদের সিজোফ্রেনিয়া রোগের সুত্রপাত হবার যোগসুত্রতা খুজে পেয়েছেন।


ছবি: প্রস্তাবিত  (বায়ে) ননকোডিং আরএনএ জীনের HAR1 অঞ্চল। মানুষের এই অনুক্রমে ১৮ টি নতুন বেস যুক্ত হয়েছে, যা শিম্পান্জির HAR1থেকে ভিন্ন ( হাইলাইট করা অংশগুলো)। মানুষের ক্ষেত্রে এই সম্ভাব্য RNA গঠন দেখলে দেখা যাচ্ছে একটি RNA হেলিক্স বিশেষভাবে দীর্ঘাকৃতির। (মধ্যে) মস্তিষ্কের নিওকর্টেক্স বিকাশের সময়কালীন একটি স্কীমাটিক ডায়াগ্রাম। স্নায়ুকোষ (গাঢ় সবুজ) গ্লীয়াল (মস্তিষ্কের সহযোগী কোষ) কোষের কাঠামো ( নীল রং এর), যারা পুরো কর্টেক্স এর প্রস্থজুড়ে, কর্টেক্সের ব্যাসাল ল্যামিনা (BL) থেকে ভেন্ট্রিকুলার (VZ) জোন পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে); স্নায়ুকোষগুলো এই কোষগুলোর সাপোর্ট বরাবর ভেন্ট্রিকুলার (VZ) জোনে মাইগ্রেট করে মধ্যবর্তী স্নায়ুকোষের রজ্জু সমৃদ্ধ ইন্টারমিডিয়েট জোন (IZ) অতিক্রম করে। এটা ধীরে ধীরে কর্টিক্যাল প্লেটটি (CP) তৈরী করে । কাজল-রেটজিয়াস কোষ ( Cajal-Retzius কোষ) ( ‍গাঢ় লাল রং) যাদের এখানকার মার্জিনাল জোন (MZ) এ পাওয়া যায়, তারা একই সাথে HAR1 এবং প্রোটিন রিলিন (Reelin) প্রকাশ করে। বিজ্ঞানীরা এখনও সঠিক ভাবে HAR1 এখানে ঠিক কি কাজ করে বোঝার চেষ্টা করছেন, তবে রিলিন খুবই জরুরী, কর্টেক্স কে সঠিকভাবে স্তর বিন্যাস, সুংগঠন এবং কর্টিক্যাল প্লেট তৈরীতে  রিলিন এর ভুমিকা আছে। বিজ্ঞানী ধারনা করছেন HAR1 হয়ত রিলিন প্রোটিনের সাথে কোন একধরনের ইন্টারঅ্যাকশন আছে। (ডানে) মাউসের ক্ষেত্রে স্নায়ুকোষগুলো কর্টিক্যাল প্লেটে মাইগ্রেট করার পর ৬ টি সুবিন্যস্থ স্তরে সজ্জিত হয় (সবুজ); এটির নীচে থাকে একটি সাবপ্লেট (SP) এলাকা এবং এবং হোয়াইট ম্যাটারের একটি ব্যান্ড (WM); যে ইদুরের রিলিন প্রোটিন থাকে না এই স্তরগুলো থাকে এলোমেলো বা উল্টোকরে সাজানো সাবপ্লেটের (SP) এর বদলে থাকে সুপারপ্লেট (SuP)। ভবিষ্যতে আরো স্পষ্ট হবে কর্টেক্স গঠনে HAR1 এর ভুমিকা। (সুত্র: Cell 126, September 22, 2006)

সুতরাং সঠিক জায়গায় এবং সঠিক সময় HAR1 অনুক্রমটির সক্রিয় হওয়া, মস্তিষ্কে একটি সুস্থ্য ও কার্যকরী সেরেব্রাল কর্টেক্স গঠনে জরুরী (পরবর্তীতে আরো কিছু গবেষনার তথ্য জানাচ্ছে,  HAR1 এর বাড়তি একটি কাজ করে শুক্রানু উৎপাদনের সময়); কিন্তু ঠিক কিভাবে এই HAR1 এর জেনেটিক কোড আমাদের মস্তিষ্কের কর্টেক্স গঠনে সাহায্য করে সেই রহস্য এখনো অজানা। পোলার্ড সহ বেশ কটি টীম সেই প্রশ্নটির উত্তর এখনও খুজছে। গুরুত্বপুর্ন এই প্রশ্নটির উত্তর জানার আগ্রহ প্রায় সবারই, কারন HAR1 সিকোয়েন্সে বিবর্তন সময়ের পরিমাপে বেশ সাম্প্রতিক কিছু মিউটেশন আমাদের নিকটতম আত্মীয়দের তুলনায় আমাদের মস্তিষ্ককে বদলে দিয়ে অনেকখানি।

একটি অসাধারন বিবর্তন ইতিহাসের স্বাক্ষী ছাড়াও HAR1 একটু স্বতন্ত্র কারন এটি কোন প্রোটিনকে এনকোড বা প্রোটিন তৈরীর সংকেত বহন করেনা। গত কয়েক দশক জুড়ে আনবিক জীববিজ্ঞানীরা আমাদের কোষে প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরীর জেনেটিক তথ্যকে এনকোড করে এমন ধরনের জীনগুলো নিয়েই মুলত ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু হিউম্যান জীনোম প্রোজেক্টে, যা মানুষের পুরো জীনোমের বেসের অনুক্রম সম্পন্ন করেছে, তার কল্যানে বিজ্ঞানীরা এখন জানেন, আমাদের পুরো জীনোমের ডিএনএ র মাত্র শতকরা ১.৫ ভাগ প্রোটিন কোড করা জীন আছে, বাকী ৯৮.৫ ভাগে- যাকে মাঝে মাঝে Junk ডিএনএ বলা হয়ে থাকে- সেখানেও আছে অনেক গুরুত্বপুর্ন রেগুলেটরী সিকোয়েন্স বা যে অংশগুলো যা নিয়ন্ত্রন করে কোন জীন কখন,কোথায় এবং কিভাবে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হবে। এবং এখানে কিছু জীন বা অনুক্রম আছে যা প্রোটিন না বরং আরএনএ (RNA) কে কোড করে, আর এই আরএনএ গুলো কোন প্রোটিন তৈরীর সাথে জড়িত না। এছাড়া ডিএনএ আরো বেশ কিছু অংশ যাদের কাজ এবং উদ্দেশ্য, বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে বুঝতে কেবল বুঝতে শুরু করেছেন ।

HAR1 এর বেসের অনুক্রমের প্যাটার্ন দেখে  বিজ্ঞানীরা ধারনা করেছিলেন HAR1 সম্ভবত কোন আরএনএ কে কোড করে –সান্তা ক্রজের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সোফি সালামা, হেলান ইগেল এবং ম্যানুয়েল অ্যারেস, সর্বপ্রথম এই ধারনা করেছিলেন, পরবর্তীতে যা প্রমানিত হয়েছে ২০০৬ সালের একটি ল্যাবরেটরী পরীক্ষার মাধ্যমে। বিজ্ঞানীরা দেখলেন HAR1 সিকোয়েন্সটা আসলে থাকে, দুটো পাশাপাশি অবস্থিত জীনকে ওভারল্যাপ করে। এই দুই জীনের ভাগাভাগি বা শেয়ার করা HAR1 সিকোয়েন্সটি সম্পুর্ন নতুন ধরনের একটি আরএনএ তৈরী করে। এর আগে বিজ্ঞানীদের জানা ছিল ৬ শ্রেনীর আরএনএ জীনের কথা, এদের সাথে যোগ হয় HAR1 এর গ্রুপটি। ইতিপুর্বে জানা ৬ টি প্রধান আরএনএ জীন গ্রুপের  প্রায় ১০০০ এর বেশী বিভিন্ন পরিবারের আরএনএ জীন আছে, প্রত্যেকটি জীনই আলাদা করা সম্ভব তাদের কোড করা আরএনএর গঠন এবং কোষের ভিতর তাদের নির্দিষ্ট কাজ লক্ষ্য করে।

HAR1 হচ্ছে প্রথম আবিষ্কৃত আরএনএ কে কোড করা কোন সিকোয়েন্স এর উদহারন, যার ‍উপর বিবর্তনের পজিটিভ সিলেকশন কাজ করেছে। অনেকের কাছেই হয়তো ব্যাপারটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে, আগে কেন তাহলে মানুষের জীনোমে এই চমক লাগানোর মত ১১৮টি বেস কারো নজরে পড়েনি? কিন্তু যে কোন দুটি প্রানীর পুরো জীনোম এর তুলনামুলক অ্যানালাইসিস করার প্রযুক্তি না আসার আগে আসলে কোন গবেষকের পক্ষেই বোঝা সম্ভব ছিলনা, এই HAR1 সিকোয়েন্সটি আর যে কোন Junk ডিএনএ র অংশের চেয়ে বেশী কিছু।

ভাষা যখন ধাধার একটি টুকরা:

মানুষ এবং শিম্পান্জীরা জীনোমের দিক থেকে প্রায় হুবুহু হওয়া সত্ত্বেও, পুরো জীনোম তুলনা করার প্রক্রিয়াটি  শিম্পান্জি এবং মানুষের মধ্যকার ভিন্নতা বিষয়ে আরো বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ন ধারনা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার প্রজাতির (যদিও বেশীর ভাগই অনুজীব)  জীনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পেরেছেন, জীনোমের মধ্যে কোথায় বেস পরিবর্তন হলো, এই বিষয়টা মোট কতগুলো বেস পরিবর্তন হলো তার চেয়ে বেশী গুরুত্বপুর্ন। অন্যভাবে বলা যেতে পারে, একটি নতুন প্রজাতি তৈরী করতে হলে জীনোমের খুব বেশী কিছু পরিবর্তন করার আসলে দরকার নেই। মানুষ-শিম্পান্জি কমন আদিপ্রানী থেকে মানুষ যেভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা ’মলিকিউলার ঘড়ির টিক টিক’ করাটাকে দ্রুত বাড়ানো মাধ্যমে না বা জীনোমে দ্রুত অনেক রানডোম মিউটেশন জড়ো করা বা মোট সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে ঘটে না। বরং সেই প্রক্রিয়াটি হলো জীনোমের এমন বিশেষ কিছু জায়গায় শুধু দ্রুত পরিবর্তন করা, যেখানে এই পরিবর্তনগুলো এর বাহক জীবের গঠন এবং কর্মপদ্ধতির মধ্যেও গুরুত্বপুর্ন পরিবর্তন আনবে।

সন্দেহ নেই HAR1 অবশ্যই এরকম একটি জায়গা, এছাড়াও আরেকটি জীন, FOXP2 (Forkhead Box Protein P2) এর মধ্যেও পোলার্ড খুজে পেয়েছেন দ্রুত পরিবর্তনশীল কিছু ‍মানুষ   নির্দিষ্ট অনুক্রম। এই জীনটি মুলত সংশ্লিষ্ট কথা বলতে পারার ক্ষমতার সাথে । ২০০১ সালে  কথা বলতে পারার ক্ষমতার সাথে এই জীনটার সম্পর্ক প্রথম খুজে পেয়েছিলেন ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তারা দেখেছিলেন এই জীনটিতে যদি কোন মিউটেশন হয় তাহলে সেই মিউটেশন যাদের মধ্যে থাকে তারা মানুষের স্বাভাবিক কথা বলার জন্য শব্দ উচ্চারনের ক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কতগুলো সুনির্দিষ্ট সুক্ষ্ম, মুখের মাংশপেশীদের দ্রুতগতির মুভমেন্ট বা নাড়াচাড়া ব্যহত হয়।  এমনকি যখন তাদের ভাষা বোঝার ও ব্যবহার ( বা প্রসেস) করার মত কগনিটিভ ক্ষমতা থাকে।

FOXP2 বিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীদের বিশেষ কৌতুহল ছিল জীনটি আবিষ্কারের পর থেকেই। এই জীনটি মানুষের কথা বলার জন্য শব্দ তৈরী এবং ভাষার ব্যবহারের ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট যা প্রথম দেখা গেছে একটি বৃটিশ পরিবারের সদস্যদের এই জীনের একটি কপির মিউটেশনের ফলে উদ্ভুত কথা এবং ভাষার ব্যবহার করতে না পারার সমস্যাটি গবেষকদের নজরে আসার পর। FOXP2 জীনোমের বেস অনুক্রম এবং এর সংকেত কৃত প্রোটিনটি অ্যামাইনো অ্যাসিড এর তুলনামুলক পর্য্যালোচনা করা হয়েছে মানুষ, শিম্পান্জি সহ অন্যান্য প্রাইমেট এবং বেশ কিছু স্তন্যপায়ী প্রানীদের মধ্যে। গবেষনায় দেখা গেছে এটি যে ৫ শতাংশ খুবই সামান্য পরিবর্তিত প্রোটিন আছে তাদের একটি, যা ইঙ্গিত করছে স্তন্যপায়ী প্রানীদের ক্ষেত্রে এটি খুব গুরুত্বপুর্ণ কিছু কাজের সাথে জড়িত। বিভিন্ন জনসংখ্যার মানুষেদের মধ্যে দেখা গেছে এই প্রোটিনটি মুলতঃ অপরিবর্তিত,অর্থাৎ আধুনিক মানুষের ক্ষেত্রে জীনটি অনুক্রম স্থির একটি অবস্থায় পৌছেছে।প্রায় ৭০ মিলিয়র বছর আগে মানুষ এবং ইদুরের লিনিয়েজ আলাদা হবার পর অনুক্রমের যে পরিবর্তন হয়েছে মানুষের মধ্যে সেটি মাত্র তিনটি অ্যামাইনো অ্যাসিডের পরিবর্তন ঘটিয়েছে,এর মধ্যে ২টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের পরিবর্তন শুধুমাত্র মানুষের মধ্যে দেখা যায়, শিম্পান্জি, গরিলা বা ওরাং উটানের মধ্যে নয়। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন এই পরিবর্তনটি মানুষ শিম্পান্জি আলাদা ( প্রায় ৪-৬ মিলিয়ন বছর আগে) লিনিয়েজ হবার পরই ঘটেছে। FOXP2 জীনের মিউটেশন ফলে এই দুটি মানুষ নির্দিষ্ট অ্যামাইনো অ্যাসিড পরিবর্তন  প্রোটিনটির  কাজের ‍উপর প্রভাব ফেলেছেও।তবে এখনও প্রমান করা বাকী যে মানুষের  এই জীনটি আধুনিক মানুষের কথা বলা এবং ভাষার ব্যবহার করার ক্ষমতার সাথে ঠিক কিভাবে এই জীনটি জড়িত।

ইতিপু্র্বে উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষের এই জীনটির সিকোয়েন্স এর সাথে শিম্পান্জির জীনের বেশ কিছু পার্থক্য আছে, মানুষের এই সিকোয়েন্সে  এক জায়গায় দুটি বেস ভিন্ন, ফলে এটি যে প্রোটিনকে তৈরী করে সেটাও খানিক ভিন্ন, এছাড়া আরো বেশ কিছু বেস ভিন্ন বা সাবস্টিটিউশন আছে যা ধারনা করা হচ্ছে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে তা  প্রভাব ফেলে, যেমন, মানুষের শরীরে কিভাবে, কখন এবং কোথায় এর প্রোটিন প্রোডাক্টটি কাজ করবে। কিছু সাম্প্রতিক আবিষ্কারের ফলাফলের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা খানিকটা বুঝতে পেরেছেন হোমিনিডদের মধ্যে কখন, আমাদের কথা বলার ক্ষমতা দেয়া FOXP2 জীনের সেই সংস্করনটা উদ্ভুত হয়েছে । ২০০৭ সালে জার্মারীর লাইপজিগে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সস্টিটিউট ফর ইভ্যুলশনারী অ্যানথ্রোপলজীর গবেষকরা একটি নিয়ানডার্থাল ফসিল থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে FOXP2 জীনটা সিকোয়েন্স করেন এবং দেখেন যে এই বর্তমানে বিলুপ্ত (ধারনা করা হয় প্রায় ২৫০০০ থেকে ৩০০০০ বছর আগে নিয়ানডার্থালরা বিলুপ্ত হয়েছে)নিয়ানডার্থাল হমিনিডদের  আধুনিক মানুষদের FOXP2 জীনের ভার্সনের মত একটি তাদেরও এই FOXP2 জীনটি আছে, হয়তো জীনটি তাদেরকেও আমাদের মত শব্দ উচ্চারণ করা ক্ষমতা দিয়েছিল। মোটামুটি কখন নিয়ানডার্থাল (Homo neanderthalensis) আর আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) এর লিনিয়েজ পৃথক হয়েছিল তার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী প্রায় অর্ধ মিলিয়ন বছর আগে FOXP2 জীনটির একটি নতুন রুপ উদ্ভব হয়েছিল এই দুই প্রজাতির মধ্যে।

কিন্তু অন্য যে কোন প্রজাতির উচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে ভাবে আদান প্রদান বা ভোকাল কমিউনিকেশন এর সাথে মানুষের ভাষার যে পার্থক্য তার প্রধান কারন শব্দ উচ্চারন করার শারীরিক বা অ্যানাটমিক্যাল ক্ষমতাই শুধু না বরং আমাদের ভাষা ব্যবহার করার কগনিটিভ ক্ষমতা। আর কগনিটিভি ক্ষমতার অনুপাত প্রায়শই সংযুক্ত আমাদের মস্তিষ্কের আয়তনের সাথে। দেখা গেছে প্রাইমেটদের সাধারনত তাদের শরীরের তুলনায় মস্তিষ্কের যে আয়তন  হবার কথা,তার চেয়ে বড় হয় তাদের মস্তিষ্কের আয়তন। কিন্তু আদিপ্রানী থেকে শিম্পান্জি থেকে মানুষের লিনিয়েজ পৃথক হবার পর থেকে মানুষের মস্তিষ্কের আয়তন বেড়েছে প্রায় ৩ গুন – এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির রহস্যর জট খোলার প্রক্রিয়াটা জীনতত্ত্বের গবেষকরা কেবল শুরু করেছেন।

মানুষের APSM জীনের বিবর্তন:

মানুষ এবং অন্য প্রানীদের মস্তিষ্কর আয়তনের সাথে সম্পর্কযুক্ত যে জীনটি সবচেয়ে বেশী গবেষনা করা হয়েছে সেটি হলো ASPM (Abnormal Spindle-like, Microcephaly-associated)। মাইক্রোসেফালীতে আক্রান্ত রোগীদের-যে রোগে আক্রান্ত রোগীদের ব্রেইনের আয়তন  সাধারণত প্রায় ৭০ শতাংশ কমে যায়-‍উপর গবেষনা করে বিজ্ঞানীরা ASPM সহ ৩ টি জীন খুজে পান আমাদের জীনোমে, MCPH1, CDK5RAP2 এবং CENJP, যারা মস্তিষ্কের আয়তনকে নিয়ন্ত্রন করার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভুমিকা রাখতে পারে।

হিসাব করলে দেখা যায় যে মোটামুটি ২ মিলিয়ন বছর ধরে ( যা প্রায় ০.২ থেকে ০.৪ মিলিয়ন বছর আগে শেষ হয়েছে) আমাদের নিকটাত্মীয় শিম্পান্জির তুলনা আমাদের মস্তিষ্কর প্রায় তিনগুন আয়তনে বেড়েছে। মনে করা হয় মস্তিষ্কের এই বিবর্তনীয় বৃদ্ধি মানুষের ভাষার ব্যবহার সহ আরো কিছু গুরুত্বপুর্ন উচ্চ পর্যায়ের কগনিটিভ ক্ষমতার জন্য উদ্ভবের জন্য গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রেখেছিল। প্রায় ২ থেকে ২.৫ মিলিয়ন বছর আগের ৪০০-৪৫০ গ্রাম ওজনের মস্তিষ্কটির বেড়ে প্রায় ১৩৫০ -১৪৫০ গ্রামে পৌছেছে প্রায় ০.২ থেকে ০.৪ মিলিয়ন বছর আগেই। বিবর্তনের সময় কাঠামোর প্রেক্ষিতে এই দ্রুত বৃদ্ধির কারন আসলে কি? অ্ভিযোজনীয় সিলেকশনের কিছু ব্যাখ্যা থাকলে জেনেটিক ব্যাখ্যা এখনও খানিকটা দুরে। যে মিউটেশনের কারনে মস্তিষ্কের আকার ছোট হয়, সেই মাইক্রোসেফালী গবেষনাই  চিহ্নিত করেছে APSM জীন। দেখা গেছে জীনটিতে মোট চারটি মিউটেশন যা সুস্থ ক্রোমোজোমে দেখা যায় না, কিন্তু তারা মাইক্রোসেফালী রোগীদের মধ্যে বিদ্যমান।

ছবি: মস্তিষ্কের গঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট জীনোম সিকোয়েন্স।

সম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যান আরবরের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন প্রাইমেটদের বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে ASPM এর জীন সিকোয়েন্সে বেশ কয়েকবারই বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে যে প্যাটার্নটা ইঙ্গিত করছে পজিটিভ সিলেকশন এর। শিম্পান্জির লিনিয়েজ থেকে আলাদা হবার পরএই জীনে অন্ততপক্ষে একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের লিনিয়েজে, আমাদের আকারে আয়তনে বড় মস্তিষ্ক বিবর্তিত হবার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি সম্ভাব্য গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রেখেছে। যেহেতু পজিটিভ সিলেকশন জীণ পর্যায়ে প্রভাব ফেলবে তখনই যখন জীনটির কাজ পরিবর্তন হবে এবং সেই পরিবর্তনটি এর বাহক জীবের ফিটনেস (সারভাইভাল এবং প্রজননগত) বৃদ্ধি করবে, সেকারনেই বেশ কিছু বিজ্ঞানীর মতামত,  মানুষের ASPM জীনে কিছু কার্য্যগত অভিযোজনীয় পরিবর্তন এসেছে, যা মানুষের মস্তিষ্ক বিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুমিকা রেখেছে।

আমাদের জীনোমের অন্যান্য অংশও সম্ববত: পরোক্ষ ভাবে মানুষের বৈশিষ্টপুর্ণ মস্তিষ্ক বিবর্তনে সহায়তা করেছে। পোলার্ডের যে প্রোগ্রামটি  HAR1 শনাক্ত করেছিল, সেটি আরো ২০১ টি Human Accelerated Region (HAR) শনাক্ত করেছিল,যাদের বেশীর ভাগই কোন প্রোটিন বা এমনকি কোন আরএনএ কেও কোড করেনা (পোলার্ডের মতই কেমব্রিজের ওয়েলকাম ট্রাষ্ট স্যাঙ্গার ইন্সস্টিটিউট এ একই ধরনের গবেষনা অনেক একই HAR কে শনাক্ত করেছে)।; বরং দেখা যাচ্ছে এরা বেশীর ভাগই রেগুলেটরী বা নিয়ন্ত্রনকারী সিকোয়েন্স, যারা  কাছাকাছি অবস্থান করা জীনগুলো কখন সক্রিয় বা নিস্ক্রিয় হবে সেটা নিয়ন্ত্রন করে। বিজ্ঞানীরা  যে বিষয়ে বিস্মিত হয়েছেন সেটা হলো এই HAR সিকোয়েন্সের আশে পাশে প্রায় অর্ধেকের বেশী জীনগুলো মস্তিষ্কের বিকাশের প্রক্রিয়ায় এবং এর কাজের সাথে জড়িত । এবং FOXP2 এর বেলায় যেটা ঘটে, দেখা যায় এই জীনগুলোর মধ্যে অনেকগুলোর প্রোডাক্ট অন্য কোন এক বা একাধিক জীনকে নিয়ন্ত্রন করে।যদিও HAR সিকোয়েন্সগুলো আমাদের জীনোম সামান্য একটু অংশ জায়গা দখল করে,কিন্তু এই অংশগুলোতে  পরিবর্তন মানুষের মস্তিষ্ককে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে বেশ অনেকগুলো জীনের নেটওয়ার্ককে প্রভাবিত করার মাধ্যেমে।

MYH16

২০০৪ সালে পেনসিলভিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আরো একটি পার্থক্য খুজে বের করেন,যা আমাদের মস্তিস্কের আকার কেন বড় হলো এই প্রশ্নের উত্তরের দীর্ঘ তালিকাটিকে আরো খানিকটা দীর্ঘতর করে।এখানেও জড়িত আমাদের প্রাইমেট আত্মীয়দের তুলনায় আমাদের জীনোমে পরিবর্তিত একটি জীন, MYH16।গবেষকরা বলছেন প্রায় ২.৪ মিলিয়ন বছর আগের এই জীনের একটি মিউটেশন আমাদের চোয়ালের মাংশর প্রধান প্রোটিনটি তৈরী করতে বাধা দেয়,ফলাফলে আমাদের চোয়ালের মাংশ বিবর্তিত হয় অন্য প্রাইমেটদের তুলনায় দুর্বল হিসাবে। খাদ্য চেবানোর যন্ত্র হিসাবে আমাদের চোয়ালের উপর এই মাংশটির প্রভাব কমে যাবার ফলে আমাদের মাথার খুলিও তার বড় হবার অন্যতম বাধা থেকে মুক্ত হয় এবং এটি আকারে বড় হবার প্রয়োজনীয় সুযোগ পায়।

ছবি:  MYH16 জীনের এক্সোন ১৮ র  ডিএনএ সিকোয়েন্স। মানুষ এবং শিম্পান্জির বেস পার্থক্য।

গবেষকদের দাবী এই মিউটেশনের সময়টা খুব গুরুত্বপুর্ন। কারন বিশেষ করে এই সময়টার পরেই (প্রায় ২ মিলিয়ন বছর আগে)আমাদের পুর্বপুরুষদের মস্তিষ্কের আকার নাটকীয় ভাবে বাড়তে শুরু করে। প্রাইমেটদের (মানুষ ছাড়া)চোয়ালের মাংশ খুবই শক্তিশালী কারন এর প্রধান উপাদানটি তৈরী করে MYH16 নামের একটি জীন। যখন মানুষের জীনোমের সাথে বিজ্ঞানীরা শিম্পান্জি সহ মানুষ নয় এমন আরো প্রাইমেটদের এই জীনটি তুলনা করে দেখেন, দেখতে পান মানুষের এই জীনটিতে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়েছে যা এর কোড করা প্রোটিনটির গঠনও বদলে দিয়েছে। মলিকিউলার ক্লক ব্যবহার করে এই মিউটেশনের সময়কালও নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এরপর মানুষ এবং অন্য প্রাইমেটদের মাথার খুলি পরীক্ষা করে দেখেন। সব প্রাইমেটদের মাথার খুলির একটি বিশেষ জায়গা বা ক্রেস্ট খাকে যেখানে শক্তিশালী চোয়ালের মাংশ লাগানো থাকে। মানুষের খুলিতে এটি থাকে না অথচ গরিলা বা শিম্পান্জিদের সাথে আমাদের জেনেটিক সাদৃশ্য অনেক বেশী। আমাদের পুর্বপুরুষটা  সম্ভবত এই অ্যানাটমিক্যাল বৈশিষ্টটি হারিয়েছে যখন আমাদের চোয়ালের মাংশ দুর্বল হয়ে মাথার খুলির উপর তার চাপ কমিয়ে দিয়েছিল। মাংশ সাধারনতঃ আমাদের হাড়ের আকার নিয়ন্ত্রন করে তার শক্তি প্রয়োগের তারতম্যের মাধ্যমে। যেহেতু চোয়ালের মাংশর আকার ছোট হয়ে যাওয়ায় এর আর বেশী জায়গার প্রয়োজন হয়না, ফলে আমাদের মাথার খুলির হাড়গুলো স্বাধীনতা পেয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে প্রয়োজনীয় জায়গা দিতে। বিজ্ঞানীরা এখন তাদের এই প্রস্তাবটির পক্ষে আরো প্রমান খুজছেন।

ছবি: উপরের ছবিতে (a-i) দেখানো হয়েছে (মানুষের টেম্পোরালিস  মাংশর Type II মাংশ তন্তুর আকার এবং আয়তন (মানুষের টেম্পোরালিস  মাংশ চোয়ালের যে হাড়ের সন্ধি আছে তার নিয়ন্ত্রন কারী একটি অংশ।(a-i) এই মাংশটি খুলির যেখানে লাগানো থাকে (লাল) সেই জায়গাটির তুলনা মুলক আকার ও গঠন তিনটি প্রজাতিতে ((M. fascicularis (a–c), Gorilla gorilla (d–f) and H. sapiens (g–i))) ।ম্যাকাক বানর এবং মানুষের টেম্পোরালিস মাংশটি মাইক্রোস্কোপের নীচে ((M. fascicularis ( j) and H. sapiens (k))), লালচে রং এর মাংশ তন্তু গুলোর আকারের তারতম্যই MYH16 জীনে মিউটেশনের ফলাফল।


ছবি: MYH16  জীনের বিচিত্রতা। নিউক্লিওটাইড বেস অনুক্রমের উপর ভিত্তি করে উপরের ডায়াগ্রামটি করা হয়েছে। dN এবং dS এর অনুপাত বোঝাচ্ছে N বা নন সিনোনিমাস বা একরকম অনুক্রম না এবং S বা সিনোনাইমাস ( একই রকম অনুক্রম এর অনুপাত ( জীনটির একটি নির্দিষ্ট এলাকায়); ডায়াগ্রাম প্যানেলের নীচে প্রায় ২.৪ মিলিয়ন বছর আগে dN এবং dS এর অনুপাত অনেক বেশী (যে সময় মানুষের MYH16 জীনটি সবচেয়ে বেশী পরিবর্তিত হয়েছে)।

মস্তিষ্কের বাইরে: 

HACNS1

যদিও জেনেটিক রিসার্চের বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মনোযোগ ছিল মানুষের গঠনএবং কার্য্যগতভাবে জটিল মস্তিষ্কের বিবর্তনের প্রক্রিয়াটি সন্ধান করা কিন্ত বিজ্ঞানীরা আমাদের শরীরের আরো বেশ কিছু অনন্য বৈশিষ্টগুলোই বা কেমন করে বিবর্তন হয়েছে সেই ধাধারও কিছু সমাধান জড়ো করেছেন ইতিমধ্যেই। এই ক্ষেত্রে একটি বড় উদহারন হচ্ছে HAR2 অনুক্রমটি। পোলার্ডের ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হওয়া জীন সিকোয়েন্স এর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে ছিল HAR2 সিকোয়েন্সটি। মুলত এটি একটি জীন নিয়ন্ত্রককারী অনুক্রম। ২০০৮ সালে লরেন্স বার্কলে ন্যাশনাল ল্যাবরেটরীর গবেষকরা দেখিয়েছেন মানুষের HAR2 সিকোয়েন্সের ( যা এখন আরেকটি নামেও পরিচিত HACNS1 বা Human-Accelerated Conserved Noncoding sequences )  সাথে মানুষ নয় এমন প্রাইমেটদের এই  সিকোয়েন্সের সাথে বেশ কিছু বেস পার্থক্য বিদ্যমান, যা মানুষের এই HACNS1 ডিএনএ অনুক্রমটিকে  ভ্রুণাবস্থায় আমাদের কব্জি এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি তৈরী জীনগুলোকে পরিচালিত করার উপযোগী করে। যে কাজটি অন্য পাইমেটদের মধ্যে পাওয়া আদি HACNS1 সংস্করণটি পারেনা। বিশেষ করে এই আবিষ্কারটি বিজ্ঞানীদের নতুন একটি ভাবনার জগত খুলে দেয়, কারন এই পরিবর্তনটি যা আমাদের বিশেষায়িত বৈশিষ্ট সম্পন্ন হাত, কব্জি এবং বৃদ্ধাঙ্গুলীর প্রয়োজনীয় ব্যাহ্যিক এবং প্রকৃতিগত কিছু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যে বিষয়টি মানুষের জটিল যন্ত্র বা টুল তৈরী আর ব্যবহার করতে পারা অসাধারন দক্ষতার কারন।

HACNS1 হচ্ছে সবচেয়ে একটি অন্যতম দ্রুত বিবর্তনশীল ডিএনএ এর কনসার্ভ নন-কোডিং অনুক্রম (কনসার্ভ মানে এই অনুক্রমটির অনুরুপ একই অনুক্রম বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে দেখা যায়, বিবর্তন প্রক্রিয়া এই অনুক্রমগুলোকে প্রায় অপরিবর্তিত থাকে, এবং নন কোডিং অর্থাৎ এই অংশগুলো কোন প্রোটিনকে কোড করেনা); যদিও মেরুদন্ডী প্রানীদের মধ্যে এর কোন পরিবর্তন না থাকলেও, মানুষের জীনোমে এটি ১৬ টি বেস পরিবর্তিত হয়েছে শিম্পান্জি থেকে মানুষের লিনিয়েজ আলাদা হবার পর ( প্রায় ৬ মিলিয়ন বছর আগে); ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীনতত্ত্ববিদ জিম নুনান এর টীম গবেষনায় দেখেছেন, এটি আসলে একটি এনহান্সার অনুক্রম যা অন্য বেশ কিছু জীনকে প্রভাবিত করে। ভ্রুণাবস্থায় এটিকে মুলত সক্রিয় দেখা যায় বিকাশমান লিম্ব বা হাত পায়ে। মোটামুটি স্পষ্ট এখন মানুষের ক্ষেত্রে এই বেস পরিবর্তনগুলো HACNS1 কে বাড়তি কিছু কাজ করার ক্ষমতা দিয়েছে। সেটি হচ্ছে আমাদের কব্জি এবং বৃদ্ধাঙ্গুলের প্যাটার্নের পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে এমন জীনগুলোকে সক্রিয় করা।

ট্রান্সজেনিক ইদুরের ভ্রুনের উপর গবেষনায় দেখা গেছে HACNS1 অনুক্রমটি এনহান্সার হিসাবে কাজ করে এবং এটি ভ্রুনটির সাড়ে এগারো দিনের দিন LacZ জীনটির এক্সপ্রেশন বাড়িয়ে দেয় প্রধানত বিকাশ হতে থাকা সামনের লিম্ব এ ( মানুষের যেমন হাত)এবং আরো কয়েকটি অংশে। (LacZ জীনটি জীনতত্ত্ববিদরা ব্যবহার করেন একধরনের রিপোর্টার জীন হিসাবে, কারন এটি একটি রিপোর্টার প্রোটিনকে সংকেত করে, আর যেহেতু এটি সব প্রানীর মধ্যে থাকেনা, কোন একটি জীন এনহান্সার বা প্রোমোটার অনুক্রম কাজ করছে কিনা এবং ভ্রুণের কোথায় কাজ করছে সেটি দেখার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়। এর কোড করা প্রোটিন একটি রং হীন আরেকটি উপাদানের উপর কাজ করে নীল রং এর একটি উপজাত দ্রব্য তৈরী করে, এই রং দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, এনহানসার বা প্রোমোটার সিকোয়েন্সটি কোথায় কাজ করছে); এর কিছু দিন পরে দেখা যায় HACNS1 অনুক্রমটি হাতের ও পায়ের  প্লেটে এ কাজ করছে, এবং প্রথম আঙ্গুলে (মানুষের ক্ষেত্রে যেটি বৃদ্ধাঙ্গুল); বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন এই অনুক্রমটিতে জমা হওয়া এই পরিবর্তনগুলো সম্ভবত মানুষের এই সুক্ষ এবং দক্ষতার সাথে যে কোন কাজ করার উপযোগী হাতের গঠন বিবর্তনে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রেখেছে।

ছবি: উপরের ছবিতে মানুষের ক্ষেত্রে ১৬টি বেস পরিবর্তিত ও বিশেষায়িত হয়ে HACNS1 অনুক্রমটির অর্জন করেছে এনহান্সার হিসাবে কাজ করার ক্ষমতা। ট্রান্সজেনিক ইদুর ভ্রুণের (মানুষের জীনটি  ইদুরের ভ্রুনের জীনোমের সাথে যুক্ত করা হয়েছে) উপর গবেষনা করে দেখেছেন এটি কাজ করে সামনের লিম্ব ( আমাদের যেমন হাত) এবং অন্য কয়েকটি অংশে। ভ্রুণের সাড়ে ১৩ দিন বয়সে এটি সক্রিয় হয় হাতের ও পায়ের প্লেটে এবং পরে প্রথম আঙ্গুলে ( মানুষের যা বৃদ্ধাঙ্গুলি এবং পায়ের বুড়ো আঙ্গুল); এই জীনটির শিম্পান্জি বা রেসাস বানরের সংস্করণবহন কারী ট্রান্সজেনিক ইদুরের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সেভাবে ঘটছে না); ছবি সুত্র

ছবি: HACNS1 এই বিশেষ ক্ষমতা অর্জনের আনবিক ভিত্তি মুলত ৮১টি বেস পেয়ার এলাকার একটি অনুক্রমে পরিবর্তিত ১৩ টি বেস পেয়ার। মানুষের পরিবর্তিত বেস গুলোকে উপরের ছবিতে লাল রং এ দেখানো হয়েছে। এই ১৩ টি পরিবর্তনই যথেষ্ঠ (A);  B প্যানেলে দেখা যাচ্ছে শিম্পান্জি জীনোমে এই পরিবর্তিত অংশটি যোগ করা হয়ে ট্রান্সজেনিক ইদুরেও এর প্রকাশ ঘটে; C প্যানেলে দেখা যাচ্ছে যদি এই পরিবর্তিত ১৩ টি বেশ সরিয়ে দেয়া যায়, এর প্রকাশের ধরনটাও বদলে যায়। ছবি সুত্র

AMY1

আমাদের আদিপুরুষরা শুধু ফর্ম বা আকার আয়তনের ক্ষেত্রেই পরিবর্তিত হয়নি,তাদের আচরন এবং ফিজিওলজিক্যাল বা শারীরবৃত্তীয় বেশ কিছু বড়সড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে। এই অভিযোজনীয় প্রক্রিয়াগুলো তাদের সাহায্য করেছে পরিবর্তিত পরিবেশ এবং পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়ে এবং মাইগ্রেশন এর মাধ্যমে নতুন কোন পরিবেশে তাদের বসতি গড়তে । উদহারন হিসাবে বলা যায়, আমাদের পুর্বপুরুষরা আগুনের ব্যবহার শিখেছে  প্রায় ১ মিলিয়ন বছরেরও আগে এবং কৃষি বিপ্লবের সুচনা ঘটেছে প্রায় ১০০০০ বছর আগে, যা বৃদ্ধি করেছিল বেশী পরিমান স্টার্চযুক্ত খাদ্যদ্রব্যগুলোর সহজপ্রাপ্যতা। কিন্তু আচরন বা সামাজিক পরিবর্তনগুলোই ( যেমন রান্না করার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন) কিন্তু যথেষ্ট ছিল না এই উচ্চ ক্যালোরী নির্ভর খাবার উপযোগী খাদ্যগুলোকে ঠিকমত ব্যবহার করার জন্য। আমাদের পুর্বপুরুষরা এই খাদ্যগুলো ব্যবহার করার জন্য জীন পর্যায়েও  প্রয়োজনীয় অভিযোজন ক্ষমতাও অর্জন করেছিল।

যেমন AMY1 জীন, যা আমাদের মুখের লালার মধ্যে থাকা একটি গুরুত্বপুর্ন এনজাইম বা উৎসেচক Salivary amylase  কে কোড করে ( আমাদের লালায় এর পরিমান সমস্ত প্রোটিনের যা প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ); এই এনজাইমটি স্টার্চ ( যেমন ভাত) পরিপাক করা শুরু করে আমাদের মুখের ভেতর চেবানোর সময়। এই প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে, খাদ্য আমাদের পাকস্থলী এবং পরে অন্ত্রে প্রবেশ করলে, তখন অগ্নাশয় থেকে আসা আরেকটি অ্যামাইলেজ বাকী পরিপাকের কাজটি শেষ করে। AMY1 জীনটি আমাদের পুর্বপুরুষদের উচ্চ স্টার্চ সম্পন্ন খাদ্যকে ব্যবহার করার অভিযোজন প্রক্রিয়ার একটি উদহারন। স্তন্যপায়ীদের জীনোমে এই জীনটি সাধারনত: একাধিক কপি থাকে, কিন্ত‍ু মানুষের ক্ষেত্রে এর কপি থাকে অনেকগুলো।

আসলেই আমাদের জীনোমের AMY1 জীন কপি নম্বরের বৈচিত্রতায় অন্যতম একটি অংশ। দুজন ব্যক্তির মধ্যে এর সংখ্যারও বিভিন্নতা আছে ( সাধারনত: ২ থেকে ১৫টি কপি থাকে)। যদি অন্য প্রাইমেটদের সাথে তুলনা করা হয় মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষ করে এই সংখ্যা অনেক বেশী। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ২০০৭ সালে দেখেছেন, জীনোমে যত বেশী কপি AMY1 জীন থাকবে, মুখের লালা বা স্যালাইভাতে ততবেশী পরিমান স্যালাইভারী অ্যামাইলেজ এনজাইমটি থাকবে, যা এর বাহককে বেশী পরিমান স্টার্চ পরিপাক করতে সহায়তা করবে। দেখা গেছে যে জনগোষ্ঠী যত বেশী স্টার্চ খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে তাদের জীনোমে এই AMY1 জীনটির কপি সংখ্যা ততবেশী, স্টার্চ কম গ্রহন করে ‌এমন কোন জনগোষ্ঠীর সদস্যদের থেকে।

কোন জীনের কপি নাম্বারের উপর এধরনের পজিটিভ সিলেকশনের উদহারন মানুষের জীনোমে এটাই প্রথম। বেশী সংখ্যার এই জীনটি আমাদের স্টার্চ নির্ভর খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে। জীনটি বিবর্তনে দেখা যায় প্রথমত জীনোমে একাধিক কপি বা অনুরুপ জীন তৈরী হয়েছে এবং এর সাথে যুক্ত হয়েছে এর ডিএনএ সিকোয়েন্সে বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ন সুর্নির্দিষ্ট পরিবর্তন, যা আমাদের পুর্বপুরুষদের নতুন এই স্টার্চউর্বর খাদ্যকে পরিপাক করতে সহায়তা করেছে।

LCT:

মানুষের বিবর্তনে খাদ্য সংশ্লিষ্ট  অভিযোজনের ক্ষেত্রে জীনের ভুমিকার আরো একটি বিখ্যাত উদহারন হলো ল্যাকটেজ নামক এনজাইমটির জন্য নির্দিষ্ট জীন LCT;  ল্যাকটেজ হচ্ছে একটি এনজা‌ইম যা স্তন্যপায়ী প্রানীদের ল্যাকটোজ নামের একটি শর্করা ( যা দুধে থাকে বলে মিল্ক সুগার বলা হয়) কে পরিপাক করতে সহায়তা করে। প্রায় সব স্তন্যপায়ী প্রজাতিতে শুধু মাত্র ছোট শিশু বা ইনফ্যান্ট যারা বুকের দুধ খায় তারাই কেবল ল্যাকটোজকে হজম করতে পারে। কিন্তু প্রায় ৯০০০ বছর আগে-যা বিবর্তনের সময়ের মাপকাঠিতে খু্ব সম্প্রতি, মানুষের জীনোমে পরিবর্তন এসেছে এবং LCT জীনের একটি সংস্করণের উদ্ভব হয়েছে, যা পুর্নবয়স্ক মানুষকেও সুযোগ করে দিয়েছে ল্যাকটোজকে পরিপাক করার জন্য। এই পরিবর্তিত LCT জীনটি স্বতন্ত্রভাবে বিবর্তিত হয়েছে ইউরোপীয় এবং আফ্রিকার জনগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে, যা এর বাহককে গৃহপালিত প্রানীর দুধ খাদ্য হিসাবে গ্রহন করার সুযোগ করে দিয়েছে। বর্তমানে এই সব প্রাচীন গৃহপালিত পশু লালনপালন কারীদের বংশধররা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তাদের খাদ্যে দুধের ল্যাকটোজ হজম করতে পারার সম্ভাবনা বেশী পৃথিবীর অন্য অনেক অংশের প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায়। যেমন এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার অনেকেই ল্যাকটোজ ইনটলারেন্ট ( ল্যাকটোজ সহ্য করতে না পারা ), এর কারন তাদের জীনোমে LCT জীনটির প্রাইমেট সংস্করণ এখনও বিদ্যমান।

কিন্তু  LCT ই শুধু একমাত্র জীন না যা সম্প্রতি মানুষের মধ্যে বিবর্তিত হয়েছে। শিম্পান্জি জীনোম প্রোজেক্টে এরকম আরো ১৫টি সিকোয়েন্স শনাক্ত করেছে, যা আমাদের  এইপ পুর্বপুরুষের সম্পুর্ন কার্য্যক্ষম জীন থেকে পরিবর্তিত হবার প্রক্রিয়ায় আছে এবং একই জীন স্তন্যপায়ীদেরও আছে এবং তাদেরও কোন সমস্যা করছে না।, কিন্তু সেই প্রাচীন রুপে জীনগুলো আধুনিক ‍মানুষের কিছু অসুখ, যেমন আলঝেইমার এবং ক্যান্সারের সাথে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এসব বেশীর ভাগ অসুখ শুধু মানুষেরই হয় অথবা অন্য কোন প্রাইমেটদের তুলনায় মানুষের মধ্যে তাদের হার বেশী। বিজ্ঞানী বর্তমানে এই সব জীনের কাজ নিয়ে গবেষনা করছেন এবং বোঝার চেষ্টা করছেন কেন এই জীনগুলোর আদি সংস্করনগুলো মানুষের জন্য ম্যালঅ্যাডাপটিভ  বা ক্ষতিকর অভিযোজনের কারন হয়েছে। এই গবেষনাগুলো পরবর্তীতে চিকিৎসকদের সহায়তা করবে এই ধরনের ভয়ঙ্কর রোগ হতে পারে এমন রোগীদের অনেক আগেই শনাক্ত করার জন্য, এই রোগগুলো যেন তারা এড়াতে পারে এই আশায়। এই গবেষনার মাধ্যমেই আমরা খুজে পাবো নতুন চিকিৎসা।


ছবি: এক নজরে আমাদের কিছু অনন্য ডিএনএ সিকোয়েন্স।

ভালোর সাথে খারাপও কিছু আসে:

ন্য যে কোন প্রজাতির মতই রোগব্যাধীর সাথে আমাদের চিরন্তন সংগ্রাম, যেন আমরা বেচে থাকতে পারি এবং আমাদের জীনকে পরবর্তী প্রজন্মে হস্তান্তর করতে পারি। বিবর্তনের পথে এই সংগ্রামটি সবচেয়ে বেশী সুস্পষ্ট আমাদের রোগপ্রতিরোধ তন্ত্র বা ইমিউন সিস্টেমে।

যখনই গবেষকরা আমাদের জীনোমে পজিটিভ সিলেকশনের কোন চিহ্ন খোজেন, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় পজিটিভ সিলেকশনের প্রভাব পড়ে এমন জীন অনুক্রমগুলো রোগপ্রতিরোধ বা Immunity র সাথে জড়িত। অবশ্য বিবর্তন প্রক্রিয়া যে এই জীনগুলো নিয়ে খুব বেশী নাড়াচাড়া করেছে, ব্যাপারটা কিন্তু খুব বিস্ময়ের না: কারন অ্যান্টিবায়োটিক বা ভ্যাক্সিনের অভাবে নিজের জীন পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে হস্তান্তর করার সম্ভাব্য বাধা ছিল হয়তো কোন জীবনঘাতী কোন সংক্রামক ব্যাধী, যা প্রজননক্ষম বয়স শেষ বা শুরু হবার  আগে, যা হয়তো জীবনের অবসান করেছে। উপরন্তু ইমিউন সিস্টেমের বিবর্তনকে আরো তরান্বিত করে আমাদের রোগ প্রতিরোধের বিরুদ্ধে রোগজীবানুদের সার্বক্ষনিক অভিযোজনীয় কৌশল। অনুজীব এবং তার পোষকের মধ্যে যা জন্ম দিয়েছে বিবর্তনের একটি অস্ত্র প্রতিযোগিতা।বহু মিলিয়ন বছর ধরে আমাদের পুর্বপুরুষ এবং আমরা ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করে আসছি। চিরন্তন সেই ইদুর বিড়ালের খেলা। ভাইরাস বিবর্তিত হয়,আমরা খাপ খাইয়ে নেই,ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের শরীরের প্রোটিন বদলে যায়,ভাইরাসকে প্রতিরোধ করে,ভাইরাস সেই আক্রমন এড়াতে বিবর্তিত হয়, এভাবে চলতেই থাকে। যেমন HIV ভাইরাসের একটি জীন আছে  vif, যার একমাত্র কাজ হলো আমাদের কোষের যে প্রোটিনটা HIV কে তার রেপ্লিকেশন (নতুন কপি তৈরী করে সংখ্যাবৃদ্ধি) করতে বাধা দেয়, এই vif সেই প্রোটিনটাকে নিষ্ক্রিয় করে। এই vif জীনটি বিবর্তিত না হলে এটি খুব সাধারন একটি অসুখের কারন হতো।  আর এই বিবর্তনটি হয়েছে অনেক মিলিয়ন বছর ধরে।

এইসব সংগ্রামগুলো তার চিহ্ন রেখে গেছে আমাদের ডিএনএ তে। এর একটি সুস্পষ্ট উদহারন হলো একটি বিশেষ পরিবারের ভাইরাস: রেট্রোভাইরাস ( HIV ও কিন্তু একটি রেট্রোভাইরাস); এই রেট্রোভাইরাসগুলো নিজেদেরকে কপি করে এবং বেচে থাকে আমাদের জীনোমে তাদের জীনোমকে সন্নিবিষ্ট বা ইনসার্ট করার মাধ্যমে। মানুষের ডিএনএ তে  ধরনের অসংখ্য ছোট ছোট রেট্রোভাইরাসের ভাইরাল জীনোম আছে, যাদের অনেকগুলো সেই সব ভাইরাসের, যারা বহু মিলিয়ন বছর আগে আমাদের আদিপ্রানীদের অসুস্থতার কারন ছিল এবং যে ভাইরাসগুলো এখন আর কোন অস্তিত্ব নেই। এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের জীনোমের মতই এই রেট্রোভাইরাসের জীনোমগুলোতে জমা হয়েছে মিউটেশন, ফলে ভিন্ন ভিন্ন কপিগুলো হুবুহু এক রকম না হলে তাদের মধ্যে সাদৃশ্য আছে। এই বিভিন্ন কপির মধ্যে পার্থক্য পরিমাপ এবং মলিকিউলার ক্লক টেকনিক ব্যবহার করে  গবেষকরা এখন বলতে সক্ষম এই ভাইরাসটি প্রথম কবে সংক্রমন করেছিল। এই প্রাচীন সংক্রমন এর চিহ্ন দেখা যায় আমাদের  ইমিউন সিস্টেম এর জীনগুলোতেও, যা সব সময় অভিযোজিত হয়েছে দ্রুত বিবর্তনশীল রেট্রোভাইরাসদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য।

PtERV1

ফ্রেড হাচিসন সেন্টারে দুই গবেষক আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিরুদ্ধে ভাইরাসের আক্রমনের এই নানা ধরনের কৌশলগুলো খুজতে গিয়ে গবেষনা করেন শিম্পান্জি  জীনোম নিয়ে। শিম্পান্জিকে যদি HIV ভাইরাস সংক্রমন করে, তাদের কিন্তু মানুষের মত প্রানঘাতী AIDS রোগ করেনা। রহস্যজনক এই বিষয়টি গবেষকদের বেশ ভাবিয়েছে কারন, যে প্রজাতিটি জীন স্তরে আমাদের প্রায় অনুরুপ,সেই প্রানীটি কিভাবে HIV কে রুখে দেয়, যা কিনা আমরা পারিনা। তারা মানুষের জীনোমের সাথে শিম্পান্জি জীনোমের তুলনা করে খুবই নাটকীয়ভাবে আরো ভিন্ন ধরনের কিছু অনুক্রম খুজে বের করেন। তারা দেখেন যে শিম্পান্জির জীনোমে দেখা প্রায় ১৩০ কপি একটি অনুক্রম  আসলে একটি রেট্রোভাইরাসের। গরিলায় দেখা যায় এটি প্রায় ৮০ টি কপি আছে, মানুষের একটিও নেই। এর নাম দেয়া হয় PtERV ( বা পি টার্ভ) অর্থাৎ Pan troglodytes endogenous retrovirus; PtERV1 (Pan troglodytes Endogenous Retrovirus) এরকম একটি প্রাচীন ভাইরাসের জীনোমের অবশেষ বা রেলিক।

ভাইরাসটি শিম্পান্জি এবং গরিলাদের সংক্রমন করেছে অনেক দুর অতীতে, প্রায় ৪ মিলিয়ন বছর আগে, কিন্তু মানুষকে সংক্রমন করার কোন চিহ্নই নেই। হতে পারে এই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত সব আদি মানুষই মারা গেছে, কিন্তু যেটা হবার সম্ভাবনা বেশী সেটা হলো, আমাদের শরীরে এই ভাইরাসটিকে প্রতিরোধ করার মতে কিছু ছিল। বিজ্ঞানীরা দেখলেন যে আধুনিক মানুষের শরীরে TRIM5α বলে একটি প্রোটিন আছে এই PtERV1 এবং সমগোত্রীয় কয়েকটি রেট্রোভাইরাসের রেপ্লিকেশন বা অনুরুপ কপি তৈরী করতে বাধা প্রদান করে। এই ভাইরাসের সংক্রমনের বিরুদ্ধে প্রাইমেটদের শরীরের প্রতিরোধ কেমন ছিল সেটা বুঝতে সিয়াটলে ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টার এর গবেষকরা শিম্পান্জির জীনোম থেকে অনেকগুলো মিউটেশন হওয়া ptERV ডিএনএ সিকোয়েন্স  এর কপি নিয়ে এই প্রাচীন এই ptERV রেট্রোভাইরাসটিকে পুনর্গঠন করেন। তারপর তারা পরীক্ষা করে দেখেন,  মানুষের, এবং গ্রেট এইপদের TRIMα প্রোটিন এই পুনরোজ্জীবিত ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে কে বেশী সফল। তাদের গবেষনা প্রমান করেছে মানুষের TRIMα একটা মাত্র পরিবর্তন সম্ভবত আমাদের পুর্বপুরুষেদের তাদের নিকটবর্তী আত্মীয় প্রাইমেটদের তুলনায় আরো এই ভাইরাসটির বিরুদ্ধে বেশী কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। মানুষের TRIM α এ বাড়তি পরিবর্তনগুলো সম্ভবত বিবর্তিত হয়েছিল ptERV এর সমগোত্রীয় রেট্রোভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসাবে। অন্য পাইমেটদের TRIMα তে তাদের নিজস্ব কিছু পরিবর্তন আছে যা তাদের পু্র্বপুরুষদের রেট্রোভাইরাসদের  সাথে সংগ্রামের চিহ্ন বহন করে। কিন্তু একধরনের রেট্রোভাইরাসকে পরাজিত করা মানে কিন্তু অন্যদের বিরুদ্ধে সাফল্য নিশ্চিৎ করেনা  অবশ্যই।

গবেষনায় বিজ্ঞানীরা দেখলেন যদিও মানুষের TRIMα  র পরিবর্তন আমাদের পুর্বপুরুষদের এই ptERV ভাইরাসের আক্রমন থেকে রক্ষা করেছে ঠিকই, এই একই পরিবর্তন আমাদের শরীরের পক্ষে HIV এর সাথে যুদ্ধটাকে করেছে কঠিন। হাচিসন সেন্টারের তিন বিজ্ঞানী প্রমান সহ একটি নতুন তত্ত্বের প্রস্তাব করেন: বিবর্তনের যে প্রক্রিয়া আমাদের PtERV থেকে রক্ষা করেছে সেটাই আবার HIV থেকে আমাদের রক্ষা করতে না পারারও প্রধান কারন। কিন্তু কিভাবে ?

এই তিন বিজ্ঞানী মানুষের জীনোমে একটি নির্দিষ্ট জীন, যার নাম TRIM5α চিহ্নিত করেন (উপরে  উল্লেখিত); এটি মানব কোষে তৈরী হওয়া একটি প্রোটিন যা PtERV এর সাথে যুক্ত হয়ে এটিকে ধ্বংশ করে অনায়াসে। যে কারনে PtERV আমাদের পুর্বপুরুষদের সংক্রমন করতে পারেনি আমাদের জীনোমেও তাদের সিকোয়েন্স মেলেনি।প্রতিটি প্রাইমেট এর কিন্ত‍ু এই জীনটি আছে,কিন্তু এদের কাজ করার ক্ষমতা একেক প্রজাতিতে একেক রকম,তাদের বিবর্তিনীয় চাহিদা অনুযায়ী।যেমন রিসাস বানরে এই জীনটি তাদের HIV থেকে রক্ষা করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ভাবলেন,এটি কি শুধু HIV ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে,নাকি আরো কিছু ? তারা শিম্পান্জি জীনোমের এই ভাইরাসটি অসংখ্য কিছুটা আলাদা আলাদা কপি অনুক্রম থেকে  পুনর্গঠিত এই আদিম ভাইরাসটিকে ব্যবহার করলেন আরো একটি পরীক্ষায়, মানুষের TRIM5α  প্রোটিনকেও বদলে গবেষকরা এটিকে শিম্পান্জির গঠন বানান এবং দেখেন যে রুপান্তরিত প্রোটিনটি এই পুনর্গঠিত ভাইরাস থেকে আর অমাদের রক্ষা করছে না। এর পর তারা পরিবর্তিত রুপের এই প্রোটিন টিকে প্রথমে HIV  ভাইরাসের এবং পরে PtERV এর সাথে রাখেন। এরপর যা ঘটলো তা বিস্মিত করলো এই গবেষকদের। যতবারেই তারা পরীক্ষা করছিলেন ততবারই ফলাফল হচ্ছিল ভিন্ন। অর্থাৎ একবার এটি HIV কে প্রতিরোধ করে তো অন্যবার ptERV ভাইরাসকে, কিন্তু কখনোই একই সাথে দুটি ভাইরাসকে না। বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করলেন  যেহেতু মানুষ ptERV ভাইরাসের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্য্যকরী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, প্রায় যে সময় শিম্পান্জি থেকে আমাদের বংশধারা পৃথক হয়েছ, আমরা আরকটি নতুন ভাইরাস,HIV ভাইরাসের প্রতি আমরা হয়েছি অরক্ষিত এবং সহজে আক্রাম্য।

গবেষকরা এই তথ্যটি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন HIV ভাইরাসটি মানুষের শরীরে AIDS এর কারন হয় অথচ সেরকম কিছু ঘটেনা আমাদের প্রাইমেট আত্মীয়দের। স্পষ্টতই বিবর্তন এক পা এগোয় তো দুই পা পিছনে আসে। কখনও কখনও বৈজ্ঞানিক গবেষনার ক্ষেত্রেও এই এক পা সামনে তো দুই পা পিছনে আসার অনুভুতিটাও টের পাওয়া যায়। ইতিমধ্যে বিজ্ঞানীরা আমাদের মানুষের বৈশিষ্টসুচক ট্রেইটগুলোর জেনেটিক ব্যাখ্যা দেবার জন্য উপযোগী হতে পারে এমন বেশ কিছু জীন সিকোয়েন্স পেয়ে গেছেন । যদিও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই সিকোয়েন্সগুলো সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞ্যান এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। এখনো আমাদের জ্ঞানের ঘাটতি অনেক বেশী বিশেষ করে HAR1 এবং HAR2 এর মত জীন সিকোয়েন্সগুলোর ক্ষেত্রে, যারা কোন প্রোটিনের সংকেত বা কোড বহন করেনা।

আরো নতুন কিছু জানার খোজে..

বিজ্ঞানীদের জন্য এই দ্রুত বিবর্তিত এবং মানুষের জন্য অনন্য ডিএনএ অনুক্রম গবেষনার একটি নতুন দিক নির্দেশনা দিয়েছে। মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর খোজার প্রচেষ্টা সম্ভবত যে প্রোটিন বিল্ডিং ব্লক দিয়ে আমাদের গঠন হয়েছে সেগুলোর পরিবর্তনের উপর আর নজর দেবে না বরং গবেষকরা খুজে বের করবেন কেমন করে বিবর্তন প্রক্রিয়া এই বিল্ডিং ব্লকগুলোকে নতুন ভাবে সাজিয়েছে আমাদের শরীরের বিভিন্ন জীন কখন এবং কোথায়  সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় হবে সেই বিক্রয়টিকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে।

পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য ল্যাবে এক্মপেরিমেন্টাল এবং কম্পিউটেশনাল স্টাডি আমাদের শতকরা ৯৮.৫ ভাগ জীনোম যা কোন প্রোটিনের সংকেত বহন করে না তার রহস্য উন্মোচনে এখন ব্যস্ত। জীনোমের যে অংশটা একসময়  junk ডিএনএ বলে পরিচিত ছিল শুধু, প্রতিদিনই বিজ্ঞানীদের সেটাকে আর junk মনে হচ্ছে না।

তথ্যসুত্র: 

হ্যান ক্যাথেরিন এস পোলার্ড এর হোয়াট মেকস আস হিউম্যান? সায়েন্টিফিক আমেরিকান, মে ২০০৯
ক্যাটি পোলার্ড ও সহযোগীরা: নেচার, ৪৪৩,১৬৭-১৭২ (১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৬)
দি ডিএনএ অব হিউম্যান ইভোল্যুশন, জন রুবিন (ক্যাথেরিন পোলার্ড এর একটি সাক্ষাৎকার, নোভা) নোভা/পিবিএস এর প্রামান্য চিত্র, হোয়াট ডারউইন নেভার নিউ;
হ্যানেসেল স্টিডম্যান এবং সহযোগীরা, নেচার, ভলিউম ৪২৮, ২৫ মার্চ ২০০৪;
জর্ডান পি আমাদিও এবং ক্রিষ্টোফার এ ওয়ালশ: সেল ১২৬, সেপ্টেম্বর ২২,২০০৬
এস প্রভাকর এবং জে পি নুনান, সায়েন্স,৩১৪:৭৮৬(২০০৬)
জে পি নুনান এর রিসার্চ ওয়েবসাইট;
জিয়াংঝি ঝাং , জেনেটিক্স ১৬৫:২০৬৩-২০৭০ (ডিসেম্বর ২০০৩)
হার্পারস বায়োকেমিস্ট্রি
শারী কাইজার, হারমিত মালিক, মাইকেল এমেরম্যান, সায়েন্স,৩১৬: ৫৮৩২:২০০৭
ফারানেহ ভারগাহ-খাদেম এবং সহযোগীরা: ন্যাচার রিভিউস নিউরোসায়েন্স,৬:ফেব্রুয়ারী ২০০৫
এবং ইন্টারনেট

http://fora.tv/2009/10/03/Dr_Katherine_Pollard_What_Makes_Us_Human

Advertisements
শুধু এক শতাংশ: আমাদের অতীতের ভবিষ্যৎ

7 thoughts on “শুধু এক শতাংশ: আমাদের অতীতের ভবিষ্যৎ

  1. জেনেটিক কোডে >95% কোন কাজ নেই বলে জানি – ওরা “জাঙ্ক”। মানুষে মানুষে ডিএনএ ধারায় 99.99% ই একই। বাকি .01% অমিলের জন্য আমাদের মাঝে এতো পার্থক্য। তাই অবাক হই নাই …

  2. এখন আর বাকী ননকোডিং ডিএনএ কে কেউ আর junk বলছে না। আমাদের বায়োলজীতে এদের ক্রিটিক্যাল কিছু ভুমিকা আছে । অনেক কিছুই আবিষ্কার হচ্ছে। জীনোম সিকোয়েন্সিং এর আগে ধারনা করা হয়েছিল প্রায় ১০০০০০ জীন আছে, দেখা গেল সেই সংখ্যা ২০০০০ এর কাছাকাছি। মাত্র ১.৫ শতাংশ কোডিং করছে এই কটি জীন। সবচেয়ে মজার আবিষ্কারটা হলো জীনোমে ৯ ভাগ পেয়েছি আমরা ভাইরাস থেকে। এছাড়া ভাইরাসের মত কিছু সেগমেন্ট যাদের retrotransposon বলে তারা দখল করে আছে জীনোমের ৩৫ শতাংশ। এছাড়া রেট্রোভাইরাল জীনোমগুলো যা আমাদের জীনোমে endogenisation হয়েছে বিবর্তন প্রক্রিয়ায়, যাদের আমরা HERV বলছি, তাদের কিছু চমকপ্রদ কাজ আবিষ্কার হচ্ছে, যেমন গত দশকে আবিষ্কৃত একটি HERV জীন য‍া একসময় ভাইরাসের Envolope প্রোটিন কোড করতো, সেটাই দেখা গেল Placenta র কাজের জন্য গু্রুত্বপুর্ন কাজ করছে। আরো ‍উদহারন আছে। বিস্ময়ের শেষ নেই 🙂 ‌

  3. Harun বলেছেন:

    লেখাটি কি আমি চুরি করতে পারি ?
    এটা আমার ব্লগে কপি করতে ইচ্ছে হচ্ছে,প্লিজ অনুমতি দিন।

    1. অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
      লেখাটি সাথে আমার ব্লগের লিংক সহ (রেফারেন্স সহ) দিলে আমার কোন আপত্তি নেই। এছাড়া ওয়ার্ডপ্রেসে রি ব্লগও করা যায়।
      শুভকামনা;

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s