ইউজেন দুবোয়া এবং জাভা ম্যান


শীর্ষ ছবি: ১৯০২ সালে মারি ইউজেন ফ্রাসোয়াঁ থমাস দুবোয়া ( ২৮ জানুয়ারী ১৮৫৮ – ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪০) | ছবিসুত্র

No discovery was ever made without a bold guess. Isaac Newton

We live by admiration, love and hope. Wordsworth
(সেপ্টেম্বর ১৮৯৩ সালে শুরু করা দুবোয়ার ব্যবহৃত ফিল্ড নোটবুকের উপরে লেখা ছিল ওয়ার্ডসওয়ার্থের এই পংক্তিটি) 

Where, then, must we look for primaeval Man? ……. In still older strata do the fossilized bones of an ape more anthropoid, or a Man more pithecoid, than any yet known await the researches of some unborn paleontologist?  Thomas Henry HuxleyOn some Fossil Remains of Man’ (1863). 

The question of questions for manking-the problem which underlies all other, and more deeply interested than any others is the ascertainment of place with man occupies in nature and his relations to univers of things.  Thomas Henry Huxley ( Evidence as to Man’s place in nature, 1863)

আমার কিছু কথা: পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন মানব জীবাশ্মটি আবিষ্কার করেছিলেন ডাচ চিকিৎসক ই্উজেন দুবোয়া;মানব বিবর্তনের ধারাবাহিতায় তার আবিষ্কৃত সেই জাভা ম্যান আজ পরিচিত Homo erectus প্রজাতি হিসাবে।  দুবোয়াই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি শুধুমাত্র এই জীবাশ্মটির সন্ধানে তার নিরাপদ জীবন ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিলেন সুদুর ডাচ ইষ্ট ইন্ডিজে, প্রায় অসম্ভব একটা অভিযানে। উদ্দেশ্য ছিল তিনি ডারউইনের মিসিং লিঙ্ক্ খুজে বের করবেন, যা প্রমান করবে মানুষ এবং এইপদের মধ্যবর্তী একটা ট্রানজিশন্যাল অবস্থাকে। বলাবাহুল্য তিনি তার বাজীতে জিতেছিলেন, কিন্তু বিনিময়ে তাকে হারাতে হয়েছে অনেক কিছুই। সব ত্যাগের বিনিময়ে যখন তিনি ইউরোপ পৌছালেন, প্রশংসা আর সন্মানের বদলে তার ভাগ্যে জুটেছিল সন্দেহ, বিতর্ক আর সমালোচনা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে তার এই অসাধারন আবিষ্কারের জন্য আসলে প্রস্তুত ছিল না কেউই, বিস্মিত এবং হতবাক সংখ্যাগরিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক সমাজ তাই এর বীপরিত অবস্থানই বেছে নিয়েছিল নিরাপদ মনে করে। তার জীবাশ্ম অ্যানালাইসিসের টেকনিক, যা কিনা আজ প্রতিষ্ঠিত, তখন কারো জানাই ছিলনা। তার উপসংহার এতো বেশী সুস্পষ্ট ছিল, সন্দেহপ্রবন বিজ্ঞানবিশ্ব তা সহজে গ্রহন করতে পারেনি। দুবোয়াও অবশ্য হাল ছাড়েননি। দেশের মাটিতে পা দিয়ে প্রায় মৃত্যু পর্যন্ত  যুদ্ধ করে গেছেন তার জীবাশ্মর গুরুত্বটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে। তাকে এই সংগ্রামের মুল্য দিতে হয়েছে অনেক, তার স্ত্রী, সন্তানের ভালোবাসা, তার বন্ধুদের বিশ্বাস, সহকর্মীদের শ্রদ্ধা। তিনি মারা যান একাকী, অনেক তিক্ততা আর কাউকে না বোঝাতে পারার যন্ত্রনা নিয়ে। দুবোয়াই শুরু করেছিলেন মানুষের বিবর্তন আর উৎপত্তির সন্ধানে আমাদের দীর্ঘ যাত্রাটি, যা আজ অকল্পনীয়ভাবে সমৃদ্ধ বিজ্ঞানের নানা শাখার ইন্টারঅ্যাকশনে। ১৯৬০ এর দশক শুরু হবার আগেই দুবোয়া অবদান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে আর কোন সন্দেহ ছাড়াই। নতুন প্রজন্মর প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজিষ্টরা জানেন দুবোয়া ছিলেন তাদের অগ্রপথিক। তাঁকে স্মরণ করে আমার এই লেখাটির মুল সুত্র ইউজেন দুবোয়ার নাটকীয় জীবন নিয়ে প্যাট শিপম্যানের অসাধারন জীবনীগাথা The man who found the missing link: Eugene Dubois and his lifelong quest to prove Darwin right এবং শন বি ক্যারলের  Remarkable creatures: Epic adventures in search for the origins of species, এছাড়া ইন্টারনেট তো বটেই।

সব শুরুর শুরু:

১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন এর দি অরিজিন অব স্পেসিস বইটি প্যালীওন্টোলজী বা জীবাশ্মবিজ্ঞানে একটি নতুন অ্যাজেন্ডা ঠিক করে দেয়। যদিও এর আগের বেশ কয়েক দশক থেকেই জীবাশ্ম সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের ধারনা ধীরে ধীরে বাড়ছিল,তবে স্পষ্টতই তাদের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল অনেক, ব্যাপারটা জীবাশ্মবিজ্ঞানের আদি ‍ইতিহাস ঘাটলেই বোঝা যায়। যেমন দি অরিজিন অব স্পেসিস প্রকাশ হবার অনেক আগেই ডায়নোসরদের জীবাশ্ম কিন্তু আবিষ্কার হয়েছিল,বৃটিশ তুলনামুলক অ্যানাটোমিষ্ট রিচার্ড ওয়েন ( যিনি ডায়নোসর শব্দটিও প্রচলন করেন) ডায়নোসরের জীবাশ্ম নিয়ে বিস্তারিত গবেষনাও করেন। কিন্তু ওয়েনের দৃষ্টিভঙ্গীতে এই জীবাশ্মগুলো ছিল বিবর্তন প্রক্রিয়ার মুল ধারনার বিরুদ্ধে একটি প্রমান।

ডারউইনের আগে বেশীর ভাগ জীবাশ্মবিদদের পৃথিবীর বা জীবনের উৎপত্তির সহস্র কোটি বছরের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে খুব সামান্যই ধারনা ছিল। কিংবা জীবাশ্মর যে অস্থিগুলো নিয়ে তারা গবেষনা করছেন,সেগুলো আসলে যে প্রকৃতির সুদুর এক অতীতের স্বাক্ষী, এই বিষয়টা তখনও স্পষ্ট ছিল না তাদের কাছে।

ভূতত্ববিদ্যার দৃঢ় ভিত্তির উপর দাড়িয়ে ডারউইন সেই সব ধারনা আমুল বদলে দেন। তার বইয়ে তিনি সুস্পষ্ট প্রস্তাব করেন, দুটি প্রজাতি বা ভুত্বকের নানা স্তরের মধ্যে সময়ের যে শুধুমাত্র সহস্র প্রজন্মের ব্যবধান বলে মনে করা হয় আসলে তা মিলিয়ন বা শত মিলিয়ন প্রজন্মের ব্যবধানকে ইঙ্গিত করে। তিনি লিখেছিলেন, The crust of earth is a vast museum,  যার খুব সামান্য অংশই আমরা সন্ধান করেছি এবং প্রথমবারের মত দাবী করেন, জীবিত সব প্রজাতির পুর্বসুরী প্রানীরা পৃথিবীর এই পাথরের মধ্যেই সমাহিত আছে,তাই এই সব আদি পুর্বপুরুষ প্রানীদের খুজে বের করাটা জীবনের ‌উৎপত্তি, ইতিহাস এবং বিবর্তন সম্বন্ধে জানার জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ।

খুব খোলামেলাভাবে খানিকটা আক্ষেপের সাথে ডারউইন তার সেই সময়ের বাস্তবতায় স্বীকার করে নিয়েছিলেন তার প্রস্তাবিত বিবর্তন তত্ত্বের গুরুত্বপুর্ন কিছু অংশর স্বপক্ষে সেই সময় জীবাশ্মর নিদর্শনের বেশ ঘাটতি ছিল; যেমন প্রধান প্রধান প্রানীদের গ্রুপের মধ্যেবর্ত ও  উভয় গ্রুপের বৈশিষ্ট বহন কারী  সম্ভাব্য ট্রানজিশনাল ফসিল (ক্রান্তিকালীন জীবাশ্ম);কিংবা কোন আদি প্রানী থেকে ধীরে ধীরে উদ্ভব হবার কোন ইঙ্গিত ছাড়াই আপাত দৃষ্টিতে হঠাৎ করেই জীবাশ্ম রেকর্ডে খুজে পাওয়া অসংখ্য বৈচিত্রময় প্রানীদের উপস্থিতি ( ক্যাম্বিব্রিয়ান এক্সপ্লোশন); তার আগের এছাড়া  মানুষের প্রাচীনতা সংক্রান্ত স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলোতো আছে,যা ডারউইন শুরুর দিকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ‍তার  যুগান্তকারী বইটি প্রকাশের পরপরই ব্যাপারটা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। পরবর্তীতে বেশ কিছু অসাধারন অভিযান আর জীবাশ্মবিদ্যার শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার, এই মধ্যবর্তী শুন্য স্থানটিকে পুরন করেছে এবং সুনির্দিষ্ট প্রানীদের গ্রুপগুলোর মধ্যে যোগসুত্রও স্থাপন করেছে,যেমন মাছ  এবং উভচর প্রানী,সরীসৃপ এবং পাখি কিংবা এইপস এবং মানুষ।

জীবাশ্মবিদ্যার ইতিহাসে সবচেয়ে অসাধারন একটি অভিযানের অভিযাত্রী ছিলেন একজন ডাচ চিকিৎসক ইউজেন দুবোয়া। ডারউইনের নতুন তত্ত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে মানুষের পুর্বপুরুষ প্রানীর খোজে নেদারল্যান্ডে তার চিকিৎসা বিজ্ঞানের পেশা এবং শ্রতিশ্রুতিময় ক্যারিয়াররছেড়ে ইন্দোনেশিয়ার ম্যালারিয়া প্রবন এলাকায় এসে হাজির হন স্ত্রী আনা এবং মেয়ে মারি সহ।

দুবোয়ার মনে হয়েছিল বিবর্তন জীববিজ্ঞানের সবচে গুরুত্বপুর্ন যে কাজটি তার করা উচিৎ তা হলো মানুষ এবং এইপদের মধ্যে প্রস্তাবিত মিসিং লিঙ্কটিকে খুজে বের করা। তার খুজে পাওয়া জাভা ম্যানের কয়েকটি জীবাশ্ম অস্থি এই লিঙ্কটির স্বপক্ষের প্রথম দাবীদার এবং অসংখ্য উত্তপ্ত বিতর্কের সুচনাকারী যা পরবর্তীতে খুজে পাওয়া সকল হমিনিড ফসিল এবং মানব বিবর্তনে পারিবারিক বৃক্ষে তাদের প্রস্তাবিত অবস্থানের দাবীর নিয়তিতেও ছিল।


১৮৮৩ সালে  তরুন ইউজেন দুবোয়া, আশা আর উচ্চাকাঙ্খায় আত্মবিশ্বাসী  (ছবি সুত্র)

ডারউইনের সৈনিক:

দুবোয়া যখন তার অভিযানের পরিকল্পনার কথা ঘোষনা করেন,তখন সহকর্মীরা তার মানসিক সুস্থ্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে বাধ্য হয়েছেন। এটা ভাবা ছাড়া অবশ্য তাদের কোন উপায়ও ছিলনা,কারন এই মেধা্বী প্রতিশ্রুতিশীল চিকিৎসক,অ্যানাটোমি বিশেষজ্ঞ,সবার ধারনা অচিরেই যে নেদারল্যান্ডের কোন বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্মানজনক অধ্যাপকের পদটি পেতে যাচ্ছে,সে কেন হঠাৎ করে সব ছেড়ে ১০,০০০ মাইল দুরে ডাচ সেনাবাহিনীর চাকরী নিয়ে ডাচ ইষ্ট ইন্ডিজ (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) সিদ্ধান্ত নেবে। এছাড়া এরকম এত দুরে স্বজনহীন একটা ভয়ানক জায়গায়, তার সুন্দরী স্ত্রী আর ছোট বাচ্চাকে বা নিয়ে যেতে চায় কোন বিবেকে।দুবোয়ার বয়স তখন ২৯ বছর (যার জন্ম সালে (১৮৫৮) ওয়ালেস এবং ডারউইন প্রাকৃতিক নির্বাচনের উপর তাদের প্রথম প্রবন্ধ সারা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন ); তিনি আসলে দুর প্রাচ্যের ডাচ ইষ্ট ইন্ডিজে কি পাবার আশা করেছিলেন?

দুবোয়ার ধারনা ছিল বিবর্তন বাদের সেই শুরুর বছরগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন আবিষ্কারটি হবে যদি তিনি মানুষ এবং এইপ (Ape) দের মধ্যে মিসিং লিঙ্কটা খুজে বের করতে পারেন। এছাড়া সেটাই হবে ডারউইনের এই বিতর্কিত তত্ত্বের স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমান,যা মানুষের সাথে অন্যান্য প্রানীদের যোগসুত্রটি ব্যাখ্যা করবে সুস্পষ্টভাবে। আর সেই সাথে ইউজেন দুবোয়ার নামটাও বিশ্বজুড়ে খ্যাতি আর সন্মান পাবে। ইস্ট ইন্ডিজে মানুষ আর এইপের মিসিং লিঙ্ক খোজার অভিযান সম্বন্ধে দুবোয়ার মনে কোন ধরনের সন্দেহ বা দ্বিধা দ্বন্দ ছিলনা। যে যাই বলুক নো কেন তিনি জানতেন এটা তার খামখেয়ালী করে নেয়া কোন সিদ্ধান্ত না, বরং এটা আবিষ্কার করাই তার নিয়তি। কারন তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন, দুবোয়া যা শিখেছিলেন তার প্রতি ছিল তার অগাধ বিশ্বাস। লিমবুর্গের সেই ছোটবেলায় নানা ধরনের গাছের খোজে তার অভিযান, তারপর স্কুলের ও পরে মেডিকেলের শিক্ষা এবং মানুষের স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংস (Larynx)সম্বন্ধে তার চলমান গবেষনা, এই সবকিছু তাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত করেছিল এই অভিযানের জন্য। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন একটি বিষয় হচ্ছে, প্রথমবারের মত আমাদের পুর্বপুরুষের ফসিলের সন্ধানে অভিযানে বের হয়েছিলেন ইউজেন দুবোয়া। যদিও দুবোয়া যখন তার অভিযান শুরু করেছিলেন, মানুষের বিবর্তনের চিহ্ন বহনকারী  বেশ কিছু জীবাশ্মর সন্ধান বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে পেয়েছিলেন, তবে সেগুলো সবই হঠাৎ করেই পাওয়া। গভীর আত্মত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম আর ভাগ্য দুবোয়াকে সফল করেছিল প্রায় অসম্ভব একটি অভিযানে।

দুবোয়ার বেড়ে ওঠা:

ইউজেন দুবোয়ার পোষাকী নাম মারী ইউজেন ফ্রাসোয়াঁ থমাস দুবোয়া। পেশায় ছিলেন একজন ডাচ চিকিৎসক, নৃতত্ত্ববিদ, অ্যানাটোমিষ্ট, প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং পরিবেশবিজ্ঞানী।

নেদারল্যান্ডের আইসডেনে ১৮৫৮ সালে ২৮ জানুয়ারী তিনি জন্মগ্রহন করেন। দুবোয়ার পুরো শৈশব কাটে লিমবুর্গ আইসডেনেই। বাবা ছিলেন একজন ফার্মাসিস্ট, ঔষধের ব্যবসা ছিল তার আইসডেনে। ক্যাথলিক পরিবারের চার সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় দুবোয়া বাবার সাথে প্রায়ই আশে পাশেরে গামে পাহাড়ে ঔষধী গাছের সন্ধানে অভিযানে যেতেন। আর এই অভিযানগুলো খুব ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি একটা বাড়তি আকর্ষন তৈরী করেছিল দুবোয়ার মনে।

তার শোবার ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেত দুরে মাসট্রিক্ট এর কাছাকাছি সেন্ট পিটার পর্বত; লাইমস্টোন আর চকের তৈরী জীবাশ্ম সমৃদ্ধ সুবিশাল একটি বেড বা স্তর। এখানেই ১৭৪০ সালে পাওয়া গিয়েছিল প্রথম মোসাসর ( Mosasaur)এর জীবাশ্ম (ক্রেটাসিয়াশ যুগের শেষের দিকে বেচে থাকা বিশালাকৃতির একটি সামুদ্রিক রেপটাইল (মোসাসর বা Mosasaur  এসেছে Mosa বা The meuse River, নেদারল্যান্ডের একটি নদী এবং Sauros বা লিজার্ড বা গিরগিটি থেকে); দুবোয়া বহুবার এখানকার বিভিন্ন গুহায় এসে ফসিলে সন্ধান করেছেন। এছাড়া সেই সময় তারা নানা প্রজাতির গাছ আর প্রানীর নাম তার জানা ছিল। ছোটবেলাতে বাবার অনুপ্রেরনায় তিনি তার সংগ্রহ করা নানা প্রজাতির গাছের শুকনো নমুনা, সামুদ্রিক ঝিনুক, পাথর, নানা ধরনের প্রানীদের মাথার খুলি, পোকা মাকড় দিয়ে তৈরী করেছিলেন একটা কিউরিওসিটি ক্যাবিনেট।

দুবোয়ার যখন দশ বছর বয়স, তখন তিনি  জার্মান জীববিজ্ঞানী কার্ল ভোট ( Carl Vogt) তার ধারাবাহিক বক্তৃতার একটা সিরিজ এর (Lectures on Man: his Place in Creation and in the History of the Earth ) কথা শুনেছিলেন, তৎকালীন ডাচ সমাজে যা নানা বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। ডারউইনের নতুন তত্ত্বের একজন দৃঢ় সমর্থক কার্ল ভোট গ্রহন করে নিয়েছিলেন তৎকালীন সমাজের একটি বিতর্কিত ধারনা : মানুষ প্রানী জগতেরই অন্য যে কোন প্রানীর মতই একজন সদস্য, এর বাইরে কিছু বিশেষ কিছু না।


ছবি: কার্ল  ভোট ( জার্মান সুইস জীববিজ্ঞানী, বিবর্তন বাদের সমর্থক, রাজনীতিবিদ। ৫ জুলাই ১৮১৭ – ৫ মে  ১৮৯৫); ডারউইন তার The Descent of Man এর ভুমিকায় কার্ল  ভোটের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। (ছবি সুত্র)

কাছাকাছি শহর রোরমন্ডে একটি হাই স্কুলে বারো বছর বয়সে তাকে পাঠানো হয় হাইস্কুল শেষ করার জন্য। সেখানে ন্যাচারাল হিস্ট্রিরিতে দুবোয়ার প্রতিভা স্কুলের শিক্ষকদের চোখ এড়ায়নি। এখানে থাকতেই ডারউইনের বিবর্তন ত্ত্ত্ব সংক্রান্ত কার্ল ভোটের লেকাচার তিনি একাগ্রচিত্তে  শুনেছিলেন। এ বিষয়ে তার আরো পড়াশুনা মানুষের বিবর্তন সম্বন্ধে ডারউইন, হাক্সলী এবং হেকেল এর ধারনাগুলো তার চিন্তাজগতে একটা স্থায়ী জায়গা করে নেয়। দুবোয়ার হাইস্কুলে বিজ্ঞানের শিক্ষকই তাকে পরিচিত করিয়ে দিয়েছিলেন ডারউইন, হাক্সলী এবং হেকেল এর বিভিন্ন লেখার সাথে, যেখান খেকে প্রকৃতিতে মানুষের অবস্থার সম্বন্ধে দুর্দান্ত সব বৈপ্লবিক ধারনাগুলোর সুত্রপাত হয়েছে।

সব প্রশ্নর প্রশ্ন: হাক্সলি এবং হেকেল

ডারউইন এবং ওয়ালেস ইতিমধ্যেই the mystery of mysteries বা সব রহস্যের রহস্য সমাধান করে ফেলেছেন, সুতরাং দুবোয়া নজর দিলেন থমাস হাক্সলী যা বলেছেন তার ১৮৬৩ সালের Evidence as to Man’s place on Nature বইটিতে, সেই দিকে : মানবজাতির জন্য সব প্রশ্নের প্রশ্ন -যে সমস্যা সব অন্য আর সব সমস্যার মুল কারন এবং অন্য যে কোন কিছুর চেয়ে বেশী কৌতুহলোদ্দীপক, সেটি হচ্ছে – প্রকৃতিতে যে জায়গাটা মানুষ অধিকার করে আছে ,সেই জায়গাটিকে  সুচিহ্নিত করা, এবং অন্য সবকিছুর সাথে তার সম্পর্কটা ব্যাখ্যা করা।

হাক্সলীর এই বইটাতেই প্রথমবারের মত বিস্তারিতভাবে মানুষের জৈববৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়, বিশেষ করে এইপ এবং প্রথম মানুষের জীবাশ্মর (নিয়ানডারথাল) মধ্যে তুলনামুলক অ্যানাটোমি গবেষনার নতুন উদীয়মান ক্ষেত্র থেকে আসা তথ্যের আলোকে। বিষয়টি হাক্সলীর বিশেষ আগ্রহের সাথে অনুসরন করছিলেন। চার্লস ডারউইন  নিজে মানুষের উৎপত্তি এবং তার বিবর্তনের ইতিহাসের বিষয়টি স্পষ্ট হবে ভবিষ্যতে, এভাবে উল্লেখ করে এ বিষয়ে বিষদ কোন আলোচনাকে ইচ্ছা করেই এড়িয়ে গেছেন, কারন তার মনে হয়েছিল (এবং ধারনাটা সঠিক ছিল) এমনিতেই মানুষের বিবর্তনের মত স্পর্শকাতর বিষয় উল্লেখ করা ছাড়াই তার অসাধারন ত্ত্ত্বটিকে অনেক বাধাই অতিক্রম করতে হবে। কিন্তু হাক্সলে, ডারউইন যেখানে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই তার সকল উৎসাহ নিয়ে শুরু করেছিলেন এবং সমস্যাটির সরাসরি মুখোমুখি হলেন প্রথম।


ছবি: থমাস হেনরী হাক্সলী (৪ মে ১৮২৫ -২৯ জুন ১৮৯৫) :  ইংলিশ জীববিজ্ঞানী। ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের প্রধান সমর্থক ছিলেন। তাকে বলা হতো Darwin’s Bulldog, ১৮৬০ সালে  সাম্যুয়েল উইলবারফোর্সের সাথে বিবর্তন তত্ত্ব নিয়ে তার বিখ্যাত বিতর্ক ডারউইনের তত্ত্বকে আরো বেশী বিজ্ঞানীদের মেনে নেবার ক্ষেত্রে ভুমিকা পালন করেছিল। (ছবিসুত্র)

অন্য কোন গ্রহের প্রানী যেমনটা  করবে, হাক্সলি তার পাঠকদের কাছে অনুরোধ করলেন,তারাও যেন সেরকমই আবেগবর্জিত, নৈর্ব্যাক্তিক, প্রানীবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে মানব জীববিজ্ঞানকেও পর্যবেক্ষন করেন:

Let us… disconnect our thinking selves from mask of humanity; let us imagine ourselves scientific Saturnians, if you will, fairly acquainted with such animals as now inhabit the Earth and employed in discussing the relations they bear to a new and singuar “erect and featherless biped”, which some enterprising traveller overcoming the difficulty of space and gravitation has brought from the distant planet for our inspection,well preserved, may be in a cask of rum.

তারপরে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন :

…is man so different from any of these Apes that he must form an order by themselves? Or does he differ less from them than they differ from one another and hence must he take his place in the same order with them?

হাক্সলী তার পাঠকদের অনুরোধ করেন:

Being happily free from al real or imaginary, personal interest in the results of the inqury thus set foot, we should proceed to weigh the argument on one side and on the other, with as much as judicial calmness as if question related to a new Opossum.


ছবি: হাক্সলীর  Evidence as to Man’s Place in Nature (1863): বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন ডায়াগ্রাম। মানুষের কংকালের সাথে এইপদের কংকালের তুলনা করা হয়েছে। একদম বায়ে গিবনের আকারটি দ্বিগুন স্কেলে দেখানো হয়েছে। ছবি: উইকিপিডিয়া।

দুবোয়া হাক্সলী পড়ার সময় বুঝতে পেরেছিলেন এই judicial calmness এর বেশ অভাব আছে। মানুষের শরীর, ব্রেন নিয়ে হাক্সলীর আলোচনা প্রানীবিজ্ঞানের মানুষের অবস্থানের স্বপক্ষে কেস তৈরী করলেও, তিনি জীবাশ্ম থেকে পাওয়া নতুন প্রমান তার যুক্তিতে যোগ করেছিলেন। তখন, কেবল জার্মানীতে খুজে পাওয়া নিয়ানডারথাল  এর জীবাশ্ম এবং বেলজিয়াম থেকে পাওয়া জীবাশ্ম মাথার খুলির কিছু টুকরো , যার সাথে ছিল বিলুপ্ত ম্যামথ বা লোম সহ গন্ডারের দেহাবশেষ,  হাক্সলী মতে যেগুলো মানুষের প্রাচীনত্বর ব্যাপারটিকে সুস্পষ্টভাবেই প্রমান করেছে।

বিষয়টা নিয়ে অবশ্য অনেকের সন্দেহও ছিল, আর প্রায়ই প্রাচীন মানুষের এই ধারনাগুলোর বিরোধীতাগুলো ছিল  খুবই আক্রমনাত্মক। বিরোধীদের একজন বিখ্যাত জার্মান প্যাথলজিষ্ট রুডলফ ফিরকোহ (Rudolph Virchow) নিয়ানডারথাল জীবাশ্ম পর্যবেক্ষন করে মন্তব্য করেন, জীবাশ্মে যে অস্থির স্বতন্ত্র বৈশিষ্টগুলো দেখা যাচ্ছে তা আসলে আধুনিক কোন মানুষের যার হয়তো কোন অসুখের কারনে এই পরিবর্তনগুলো হয়েছে (যেমন রিকেট), এটা অবশ্যই কোন স্বতন্ত্র জাতের বা প্রজাতির মানুষ নয়। খুব প্রভাবশালী এই জার্মান প্যাথলজিষ্ট ( যাকে একসময় Pasha of German Science বলা হতো) ডারউইনের মতবাদ বিরোধী ছিলেন।

কিন্ত হাক্সলের লেখায় অনুপ্রানিত দুবোয়ারে সেই The question of questions বা সব প্রশ্নের প্রশ্ন ‘র ব্যপারে আরো উৎসাহিত করে আরেক বিখ্যাত জার্মান ভ্রুনতত্ত্ববিদ আর্নষ্ট হেকেল এর দৃষ্টিভঙ্গী (আর্নেষ্ট হেকেল এর অসংখ্য গুনাবলীর মধ্যে একটি হলো তিনি খুব চমৎকার ছবি আকতে পারতেন, তার আকা ইলাসট্রেশন একটি বই All forms of Nature, এছাড়া তিনি প্রথম Ecology শব্দটারও প্রচলন করেছিলেন)। ১৮৬৮ সালে হেকেলের তার Histroy of creation বইটিতে  খুব সরল এককোষী পুর্বসুরী থেকে শুরু মানুষের উৎপত্তির একটি ধারনা তুলে ধরেন। হাক্সলীর পর্যবেক্ষনের উপর ভর করেই, হেকেল সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন যে অভিযোজনের কথা উল্লেখ করেন, যা কিনা তার মতে মানুষকে অন্য প্রানী থেকে আলাদা করেছে: সেগুলো হল, দুই পায়ে ভর করে সোজা হয়ে হাটা এবং স্বতন্ত্র ধ্বণি ও সুস্পষ্ট শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কথা বলার ক্ষমতা। হেকেল বলেন এই অনন্য বৈশিষ্টগুলো মানুষ অর্জন করেতে সক্ষম হয়েছে ‍দুটি প্রধান বাহ্যিক প্রকৃতির বা মরফোলজিক্যাল পরিবর্তনের জন্য: দুজোড়া হাতপা এবং স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংস এর বিশেষায়িতকরনের  মাধ্যমে। হেকেল এখানে সাহসী একটি প্রস্তাব করেন: মানুষ কথা বলার বহু আগেই দুই পায়ে ভর করে হাটতে শিখেছে, এবং তিনি মনে করেন মানুষের পুর্বপুরুষদের বিবর্তনের প্রক্রিয়ায় নিশ্চয়ই সে রকম একটি পর্যায় আছে, যার নাম তিনি দেন Speechless man (বাকক্ষমতাহীন মানুষ বা Alalus) অথবা এই্প-ম্যান (Ape-man বা Pithecanthropus)। যার শরীরের গঠন মানুষের মতই সকল আব্যশকীয় বৈশিষ্ট সহ, শুধুমাত্র তখনও মনের ভাব আদান প্রদানে সে ভাষার ব্যবহার করার ক্ষমতা অর্জন করতে উঠতে পারেনি।


ছবি: আর্নেষ্ট হেকেল  ( ফেব্রুয়ারী ১৬, ১৮৩৪ -আগষ্ট ৯ ১৯১৯) ;  বিখ্যাত জার্মান জীববিজ্ঞানী যিনি অসংখ্য প্রজাতি আবিষ্কার এবং নামকরন করেছিলেন। ভ্রুণতত্ত্ব নিয়ে গবেষনা আছে তার। বিবর্তন তত্ত্বে স্বপক্ষে অনেক গবেষনামুলক প্রমান তিনি জড়ো করেছিলেন। অসাধারন ছবি আকতে পারতেন। প্রথম বারের মত Ecology র ব্যাখ্যা্ দেন। দুবোয়া তার ক্যারিয়ারের শেষের দিকে ইকোলজী সংক্রান্ত কিছু মৌলিক গবেষনা করেছিলেন।(ছবি সুত্র )

হেকেল কিংবা হাক্সলী কেউই জার্মানীর ডুসেলডর্ফের নিয়ানডার উপত্যাকায় একটি গুহায় খুজে পাওয়া নিয়াসডার্থাল মানুষকে, মানুষ এবং এইপের মধ্যবর্তী ‍বা ইন্টারমিডিয়েট প্রজাতি হিসাবে ভাবেননি। হাক্সলী তার বইটি শেষ করেন একটি স্বপ্ন দিয়ে :

Where, then, must we look for primaeval man? …. In older strata do the fossilized bones of an Ape more anthropoid (like a human) or a Man more pithecoid ( ape like), than any yet known await the researches of some unborn paleontologist?  Time will show ;

হাক্সলীর সেই জীবাশ্মবিদ তখন অজাত ছিলেন না, কারন এই লেখার সময় তার (দুবোয়া) বয়স ছিল মাত্র ছয়, যে লেখা পরবর্তীতে তরুন দুবোয়া নতুন করে পড়েন এবং তার নিয়তির ডাকটিতে শুনতে পান। বহুবার এই বইটি পড়ে ১৮ বছরের দুবোয়া সিদ্ধান্ত নেন, তার বাবার মত ফার্মাসিস্ট না, তিনি হাক্সলীর স্বপ্ন দেখা সেই জীবাশ্মবিদ হবেন।

কিন্তু তখন প্রায় কোথাও আলাদা করে জীববিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়ার সুযোগ তেমন করে গড়ে ওঠেনি , শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই সেই সুযোগটা ছিল কারন এর প্রথম বছরটি পুরোপুরি নিবেদিত ছিল প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নানা বিষয়ের অধ্যয়ন।  যদিও তার বাবা চেয়েছিলেন ছেলে তার মত ফার্মাসিস্ট হয়ে পারিবারিক ব্যবসা দেখাশুনা করবে। কিন্ত‍ু দুবোয়া মেধা দেখেই  তার শিক্ষকরা তাকে ১৮৭৭ সালে অ্যামস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়ার জন্য ভর্তি হতে উৎসাহিত করেন। এছাড়া দুবোয়া নিজেই্ তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়বেন। কারন এছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞান পড়ার আর কোন ভালো সুযোগ নেই।

অ্যামস্টারডাম:

১৮৭৭ সালে ১৯ বছরের দুবোয়া আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। প্রথম বর্ষেই দুর্দান্ত সব শিক্ষক পেলেন, পদার্থবিদ ভ্যান ডার ভালস (১৯১০ এ নোবেল জয়ী), রসায়নবিদ ভ্যান্ত হোফ ( রসায়নে প্রথম নোবেল জয়ী), এবং বিখ্যাত ‌উদ্ভিদবিদ ও প্রথম প্রজন্মের জীনবিজ্ঞানী হুগো দ্য ভ্রিস ( ‍  যিনি মেন্ডেলের বংশগতির উপর গবেষনাটাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন, অনেকের মত তিনিও তখন মেন্ডেলের গবেষনার কথা জানতেন না, জেনেটিক্সে ব্যবহৃত মিউটেশন শব্দটি তিনি প্রথম ব্যবহার করেন ও মিউটেশন নির্ভর একটি বিবর্তন তত্ত্বর প্রবক্তা ছিলেন, তার প্রস্তাবিত প্যানজিন শব্দটাই পরে সংক্ষেপিত হয় জিন এ)।

তরুন দুবোয়া প্রায়ই তার শিক্ষক হুগো দ্য ভ্রিস এর সাথে মানুষের বিবর্তন নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়তেন। কিন্তু মেডিকেল পড়তে গিয়ে খু্ব দ্রুতই দুবোয়া বুঝতে পারলেন চিকিৎসা পেশায় আসলে তার তেমন কোন আগ্রহ নেই; কিন্তু ডারউইনের মত তিনি পুরোপুরি চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়াশুনা ছেড়ে দিলেন না। খুব পরিশ্রম করে পড়াশুনা শেষ করলেন এবং যথারীতি প্রতিটা বিষয়ে অসাধারন হলো তার রেজাল্ট। তরুন এই চিকিৎসকের মেধাকে সাথে সাথেই মুল্যায়ণ করা হলো, ১৮৮১ সালে বিখ্যাত গবেষক এবং অ্যানাটমিষ্ট ডাঃ ম্যাক্স ফুরব্রিঙ্গার দুবোয়াকে তার সহকারী হবার প্রস্তাব দিলেন।

এটা দুবোয়ার জন্য অত্যন্ত্ সৌভাগ্যের  একটি ব্যাপার ছিল, ফুরব্রিঙ্গার নিজেও তার প্রশিক্ষন পেয়েছিলেন বিখ্যাত হেকেলের কাছ থেকে। ফুরব্রিঙ্গারই দুবোয়াকে পদন্নোতির ব্যপারে সাহায্য করলেন, প্রথমে  অ্যাসিস্ট্যান্ট, এরপর অ্যানাটমি কোর্সে পড়ানো দায়িত্ব বা প্রোসেক্টর এর পদ, সেখান থেকে দ্রুত লেকচারার; এভাবে খুব দ্রুত ২৮ বছরের দুবোয়া পৌছে গিয়েছিলেন  সবার আরাধ্য পদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো প্রফেসরশীপ পাবার মাত্র একধাপ নীচে। এই সময়টাতে দুবোয়া তার নিজের স্বতন্ত্র  একটি গবেষনা শুরু করেন, বিভিন্ন প্রানীদের স্বরযন্ত্রের তুলনামুলক গঠন নিয়ে, যে অঙ্গটি মানুষের কথা বলার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট এবং ক্ষমতার জন্য দায়ী। এ বিষয়ে তিনি এর মধ্যে একটি গবেষনা পত্র লিখেও ফেলেছিলেন, কিন্ত্‍ু এ বিষয়ে আর বেশী গবেষনা তার করা হয়নি, বেশ কিছু ঘটনা খুব শীঘ্রই তাকে বাধ্য করে এই গবেষনা পরিত্যাগ করে, তার প্রতিশ্রুতিময় ক্যারিয়ার ফেলে ডাচ ইষ্ট ইন্ডিয়ার পথে যাত্রা করতে।

এর একটি কারন সম্ভবত দুবোয়া নিজেই অনুধাবন করেছিলেন তার ছাত্র পড়ানোর কাজটা তার খু্বই অপছন্দের, সাধারনত লেকচারের আগে তিনি এত বেশী নার্ভাস আর চিন্তিত থাকতেন, কারো সাথেতো কথা বলা দুরের কথা, কারো চেহারাও তিনি দেখতে চাইতেন না। দ্বিতীয়, গুরুত্বপুর্ন কারন হিসাবে মনে করা হয় তার মেন্টর ম্যাক্স ফুরব্রিঙ্গারের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি। স্পষ্টতই দুবোয়া আত্নবিশ্বাসী এবং উচ্চভিলাষী ছিলেন, তার কাজের স্বীকৃতি পাবার জন্যও খুব ব্যস্তও ছিলেন তিনি। যখন তার স্বরযন্ত্র সম্বন্ধে গবেষনা পত্রটির প্রথম খসড়াটি ফুরব্রিঙ্গারকে পড়তে দেন, তার মেন্টর মন্তব্য করেন তিনিও  বেশ কিছু একই ধরনের পর্যবেক্ষন এর আগে করেছিলেন। দুবোয়া দুশ্চিন্তায় পড়ে যান, মৌলিকতার অভাবে হয়তো তার কাজের জন্য তিনি স্বীকৃতি নাও পেতে পারেন। তিনি নতুন করে আবার লেখাটি ড্রাফট করেন এবং একবার না বার বার এবং ফুরব্রিঙ্গারের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তার মনে সন্দেহ বাড়তেই থাকে। তৃতীয়, কারনটি ঘটে একটি জীবাশ্ম আবিষ্কার ঘটনায়, যা আবার নতুন করে দুবোয়ার জীবাশ্মবিদ হবার স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলে।

১৮৮৬ সালে বেলজিয়ামের নামুরের কাছে একটি গ্রাম স্পেই (Spy) এ দুই জীবাশ্মবিদ ম্যাক্সিমিন লোহেষ্ট এবং মার্সেল দ্য পুইট বেতশে অ রোশে ক্যাভার্ন বা গুহায় প্রায় ১৬ ফুট নীচে দুটি নিয়ানডার্থাল মানুষের প্রায় সম্পুর্ন জীবাশ্ম কংকাল উদ্ধার করেন। কোন সন্দেহ আর থাকে না যে এগুলো অনেক পুরোনো। এই আবিষ্কারটি এবং এর আগে পাওয়া প্রথম জার্মান নিয়ানডার্থাল কংকাল অসুস্থ কোন মানুষের কংকাল, ভিরকোহ’র সেই ধারনাটিকে পুরোপরি পরাস্ত করে। আধুনিক মানুষ থেকে খানিকটা আলাদা এই জীবাশ্মগুলো, তবে তারা এইপ বা এইপদের মতো পুর্বপুরুষ থেকে অনেক বিবর্তিত হয়েছে এ ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ থাকেনা।

এই খবরগুলো দুবোয়াকে ভীষন অস্থির করে তোলো, অনেক সময় চলে যাচ্ছে, কেউ হয়তো সেই  এইপ আর মানুষের মিসিং লিঙ্ক খোজার পথে অনেকদুর এগিয়েও আছে, তাকে যদি এই আবিষ্কারটা করতে হয়, দ্রুত তাকে শুরু করতে হবে।


ছবি: ১৮৮৭ সালে স্ত্রী আনার সাথে দুবোয়া। ছাত্র থাকা অবস্হায় দুবোয়া একটি আর্ট স্কুলে অ্যানাটোমি শেখাতেন। সেখানে ১৮৮৫ সালে আনার সাথে পরিচয়। ১৮৮৭ সালে তাদের বিয়ে হয়। (ছবিসুত্র)

 ডাচ ইষ্ট ইন্ডিজ : সুমাত্রা

দুবোয়া মনস্থির করে ফেলেন সব কিছু ছেড়ে:, তার নিশ্চিৎ প্রফেসর হবার সুযোগ, অ্যানাটোমি ল্যাব, অধ্যাপনা, ফুরব্রিঙ্গার, অ্যামস্টারডামে স্বাচ্ছন্দ্য, তিনি মিসিং লিঙ্ক এর সন্ধানে বের হবেন। কিন্তু তখন সমস্যা একটা্, সেটা খুজতে তিনি যাবেন কোথায়?

অবশ্যই ইউরোপ না, কারন এখানে ইতিমধ্যেই নিয়ানডারথালদের জীবাশ্ম মিলেছে। দুবোয়া তার যুক্তি খুজলেন ডারউইনের The Descent of Man এ, সেখানে ডারউইন প্রস্তাব করেছিলেন, যেহেতু মানুষ তাদের লোমের আবরণ হারিয়ে ফেলেছে, তাদের উৎপত্তি নিশ্চয়ই হয়েছে ক্রান্তীয় কোন এলাকায় , কোন শীতল পরিবেশে না। সেক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকা বাদ দেয়া যায়, বাকী থাকে  আফ্রিকা, এশিয়া এবং অষ্ট্রেলিয়ার কিছু অংশ। কিন্ত‍ু যেহেতু এইপ দের দেখা মেলে  ট্রপিক্যাল এলাকায়। ধারনা করা যায় মানুষের পর্বপুরুষের উৎপত্তি ঘটেছে তেমন কোন এলাকায়। যা আফ্রিকা বা এশিয়া ছেড়ে সারা পৃথিবীতে বিস্তৃত হয়েছে।

দুবোয়া জানতেন ডারউইন মানুষের উৎপত্তি হিসাবে আফ্রিকাকেই মনে করতেন কারন গরিলা আর শিম্পান্জ্ঞির সাথে মানুষের সাদৃশ্যতা।কিন্তু এশিয়াতে আছে গিবন আর ওরাং উটান এবং হেকেলের মতে গিবনই মানুষের সাথে বেশী সাদৃশ্য বহন করে। এছাড়া ইতিমধ্যেই ব্রিটিশ ভারতবর্ষে সিভালিক পাহাড়ে ( বর্তমান হিমাচল প্রদেশ) সিভালিক শিম্পান্জ্ঞি নামের একটি জীবাশ্ম এইপও আবিষ্কার করেছেন বৃটিশ ভুতত্ত্ববিদ রিচার্ড লিডেকার। এই আবিষ্কারগুলো যে স্তরে পাওয়া গেছে তাদের বয়স এবং স্থান দেখে ধারনা করা যায় এই সময়ের ভুত্বকের স্তরে এই ধরনের ফসিল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া ডাচ জীবাশ্মবিদরা বলছেন, এই একই ডিপোসিট আছে বোর্নিও, সুমাত্রা বা জাভায়।

দুবোয়া ওয়ালেস লাইনের কথাও জানতেন। ওয়ালেস প্রানীদের ভৌগলিক বিস্তারের উপরও গবেষনা করেছিলেন; সেখান থেকে দুবোয়া জানতেন মালয় দীপপুন্জ্ঞের পশ্চিম পাশে যে প্রানী থাকে তাদের এশিয়ার মুল ভুখন্ডের প্রানীদের সাথেও মিল থাকার কথা, সুতরাং যা ভারতে পাওয়া গেছে তা এই দ্বীপগুলোতে পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া তখন পর্যন্ত যত মানুষের মত আদিপুরুষএর জীবাশ্ম আবিষ্কার হয়েছে তা হয়েছে পাহাড়ের গুহায়, আর দুবোয়া জানতেন সুমাত্রায় আছে অসংখ্য গুহা। সবশেষে খু্বই বাস্তবসম্মত একটি কারন তাকে তার গন্তব্য ঠিক করে দেয়, সুমাত্রা।


ছবি : ডাচ ইষ্ট ইন্ডিজ ( বর্তমান মালয় আর্কিপেলাগো, ইন্দোনেশিয়া) ছবি সুত্র

সুমাত্রা তখন একটি ডাচ উপনিবেশ, সুতরাং সেখানে কিছু স্বদেশীর সঙ্গ মিলবে নিশ্চয়ই, হয়তো সরকারেরও সাহায্যও পাওয়া যেতে পারে তার জীবাশ্ম সন্ধানের অভিযানে। দুবোয়া প্রথমে এই প্রস্তাবটি ডাচ কলোনিয়াল অফিসের সেক্রেটারী জেনারেল বরাবর পাঠালেন, আরো উল্লেখ করলেন এ্ধরনের মিসিং লিঙ্ক এর সন্ধানে অভিযানে সফল হলে তা ডাচ বিজ্ঞানের জন্য বিরল সন্মান বয়ে আনবে, কিন্তু সেক্রেটারী জেনারেল দেরী করলেন না ফিরতি চিঠি দিতে, এধরনের কাল্পনিক কোন অভিযানকে পৃষ্ঠপোষকতা করা মত অর্থ কলোনিয়াল সরকারের নেই।

দুবোয়াকে তো তার পরিবারকে ভরনপোষন করতে হবে, সুতরাং এই অভিযানের অর্থই বা কিভাবে যোগাড় হবে। কিন্তু দুবোয়ার একটা দক্ষতা ছিল যা ডাচ কলোনীতে খুবই প্রয়োজন, সেটা হলো তার মুল পেশা চিকিৎসা বিজ্ঞান। চিকিৎসক দুবোয়া নাম লেখালেন ডাচ সেনাবাহিনীতে; তার চুক্তির মেয়াদ …. দীর্ঘ আট বছর। যোগ দেবার পর স্ত্রী আনা কে জানালেন ( ১৮৮৬ সালে আনা লোয়েঙ্গার সাথে তার বিয়ে হয়) আশ্চর্যজনকভাবে আনা তার স্বামীর এই আপাতদৃষ্টিতে পাগলামীটা পুর্ন সমর্থন জানালেন। বলাবাহুল্য দুবোয়ার বাবা মা, বা তার শশ্বুর শাশুড়ী এবং অন্যান্য কোন আত্মীয় সজনই তাকে সমর্থন দেয়নি। সবচেয়ে দু:খ পেলেন দুবোয়ার বাবা, এত উজ্জ্বল একটা ক্যারিয়ারকে এভাবে পায়ে মাড়িয়ে চলে যাবার জন্য। কিন্তু দুবোয়ার মন কেউ বদলাতে পারলেন না। অবশেষে সপরিবারে দুবোয়া সুমাত্রাগামী জাহাজে চড়ে বসলেন একদিন।

প্রায় ৪৩ দিন সমুদ্র যাত্রার পর ১৮৮৭ সালের ১১ ডিসেম্বর আমষ্টারডাম থেকে পাদাং এসে পৌছায় দুবোয়া পরিবার ( দুবোয়া, আনা এবং মারি) ; সুমাত্রায় নতুন করে সংসার গোছানোয় ব্যস্ত হয় আনা ( তখন আনা দ্বিতীয়বারের মত অন্তসত্ত্বা); দুবোয়া ডাচ সামরিক বাহিনীর চিকিৎসক হিসাবে তার কাজ শুরু করেন। সামরিক বাহিনীর হাসপাতালে রিপোর্ট করে দুবোয়া বুঝতে পারলেন, হল্যান্ড থেকে আসলে তিনি কত দুরে। এত রোগী এবং বিচিত্র অসুখ দেখবার অভিজ্ঞতা তার ছিল না। নানা ধরনের জ্বরের রোগী, ম্যালেরিয়া, টাইফাস, যক্ষা এবং আরো অনেক অজানা রোগের রোগীদের চিকিৎসায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন দুবোয়া। কাজের চাপ এত বেশী যে, দুবোয়া বুঝতে পারছিলেন না, কখন তিনি তার এখানে আসার প্রধান উদ্দেশ্য, জীবাশ্ম খোজার কাজটা শুরু করতে পারবেন।

কিন্তু আপাতত যেটা করলেন তাহলো, সুমাত্রায় আসার তার মুল উদ্দেশ্য যে মিসিং লিঙ্ক খোজা সে বিষয়টা তার সহকর্মীদের বোঝানোর জন্য একটি লেকচার তৈরী করলেন তার সব যুক্তি দিয়ে। এটাই পরে খসড়া হিসাবে ব্যবহার করেন  The Journal of The Natural Histroy of Netherlangds Indies একটি নিবন্ধের জন্য। আর্টিকেলটি তার এই অভিযানের স্বপক্ষে যুক্তি তো ছিলই, এছাড়া যোগ করেন একটা সাবধানবানী, যদি সরকার তার এই জীবাশ্ম সন্ধানে সহায়তা না করে, তবে সেই মিসিং লিঙ্ক খুজে পাবার সন্মান হয়তো জুটবে অন্য কোন জাতির।

সেনানিবাসের আশেপাশে দুবোয়ার সন্ধান খু্ব একটা ফলপ্রসু হলোনা, সুতরাং তিনি আর্মির কমান্ডের কাছে আরো দুরের দুর্গম কোন এলাকার হাসপাতালে বদলীর আবেদন করলেন, যেখানে আরো বেশী গুহা আছে সন্ধান করার জন্য এবং তুলনামুলকভাবে রোগীও হবে কম । আনা ততদিনে আট মাসের গর্ভবতী, আবার তাকে নতুন করে নতুন জায়গায় সংসার পাততে হলো। শুধু একটাই স্বান্তনা পাদাং অসহ্য গরমের এর চেয়ে নতুন এই পাহাড়ী অঞ্চলের আবহাওয়াটা বেশ আরামদায়ক। এই পাজাকামবো তে আনা আর দুবোয়ার প্রথম পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। রোগী কম থাকায় দুবোয়া তার জীবাশ্ম খোজার কাজটায় বেশী সময়ও দেবার সুযোগ পেলেন এবং এর ফলও পেলেন কিছু। লিডা আডজার নামে একটি গুহায় তিনি খুজে পেলেন গন্ডার, শুকর, হরিন, সজারু এবং আরো কিছু প্লাইস্টোসিন পর্বের প্রানীদের জীবাশ্মভুত হাড়।

এদিকে তার লেখা প্রবন্ধটি গভর্নরের নজরে এসেছে, যিনি তার কাজের জন্য বেশ কিছু শ্রমিকের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। দুবোয়া তার নতুন আবিষ্কারগুলোর কথা গভর্নরকে জানান। এদিকে দেশে তার কিছু সহকর্মীও সরকারকে সাহায্য করার জন্য অনুরোধ জানান। ১৮৮৯ সালের মার্চে ডাচ সরকার দুবোয়াকে সাহায্য করার জন্য দুজন প্রকৌশলী আর ৫০ জন শ্রমিকের ব্যবস্থা করে দিলেন। দুবোয়ার মনে হলো এবার নিশ্চয়ই তার মিসিং লিঙ্ক খুজে পাওয়াটা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কিন্তু দেখা গেলো সুমাত্রার বেশীর ভাগ গুহাই হয় খালি কিংবা জীবিত জন্তু জানোয়ারের বাস। একদিন দুবোয়া তার শ্রমিকদের একটা গুহার মধ্যে ঢোকার অনিচ্ছা দেখে নিজেই এর সরু মুখ দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলেন, একটু ভিতরে ঢোকার পর পচা মাংশের গন্ধ আর মুত্রের তীব্র গন্ধ দেখে বুঝতে পারলেন এটা আসলে বাঘের গুহা, দুবোয়া তাড়াহুড়া করে বের হয়ে আসার চেষ্টা করলেন কিন্তু আটকে গেলেন এর সরু মুখে, শ্রমিকরা তাকে দ্রুত টেনে হিচড়ে বাইরে বের করে নিয়ে আসে। দুবোয়া এই ভয়ের অভিজ্ঞতা মন থেকে ঝেড়ে ফেললেন বটে কিন্তু সুমাত্রায় যে আরো ভয়ঙ্কর বিষয় আছে তার এড়াতে পারলেন না। বহুবার তার কাজের ব্যাঘাত ঘটেছে ম্যালেরিয়ার জন্য। তার অর্ধেক শ্রমিকদের ম্যালেরিয়া একেবারে কাজের অনুপযুক্ত করে দিল কয়েকদিনের মধ্যেই, আর কিছু শ্রমিক চাকরী ছেড়ে পালালো। তার দুই প্রকৌশলীর একজন মারা গেলেন ম্যালারিয়ায়। মাসের পর মাস কাটলো কোন সফলতা ছাড়াই।

টানা দুই বছর সুমাত্রায় কাটানোর পর লীডেনের ন্যাচারাল হিস্ট্ররী মিউজিয়ামের পরিচালককে চিঠিতে দুবোয়া লিখেছিলেন:  ”এখানে সব কিছুই মনে হচ্ছে আমার প্রতিকুলে চলে গেছে। আমার পক্ষ থেকে সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করে যেমনটা ভেবেছিলাম, তার একশ ভাগের একভাগও অর্জন করতে পারিনি। বেশ কিছু গুহা পেলেও যা খুজছি তা এখনও খুজে পাইনি। এছাড়া, মাঝে মাঝে জঙ্গলে  সপ্তাহর পর সপ্তাহ কাটাতে হয়, সাধারনত কোন ঝুলে থাকা পাথরের নীচে বা কোনমতে বানানো কুড়ে ঘরে, কিন্তু পরে বুঝতে পারছি , আমি আর সহ্য করতে পারছিনা এই  অবস্থা মেনে নিতে; প্রথম দিকে যদিও যে কোন কষ্ট সহ্য করতে পারতাম কিন্তু এই তিন বার জ্বরে ভোগার পর, যা প্রায় মেরেই ফেলেছিল আমাকে, সে অবস্থা থেকে কাজে ফিরে এসে মনে হচ্ছে আমাকে এসব চিরকালের জন্য ছাড়তে হবে” ।

জাভা ম্যান

আসলেই দুবোয়া তার পরিকল্পনা নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন। এসময় কিছু ডাচ ভুতত্ত্ববিদের কাছ থেকে তিনি একটা ধারনা পান যে জাভার জীবাশ্মগুলো সম্ভবত সুমাত্রার জীবাশ্মগুলোর থেকে প্রাচীন হতে পারে। এছাড়া জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া মানুষের মাথার খুলিও সেখানে কিছুদিন আগে পাওয়া গেছে এক পাথুরে গুহায়, দুবোয়ার মনে হলো জাভাই হয়তো তার কাঙ্খিত জীবাশ্ম খুজে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী। দুবোয়া আবার জাভায় বদলীর জন্য আবেদন করলেন।

চার সদস্যর দুবোয়া পরিবার, আবার সব মালপত্র গুছিয়ে জাভায় উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। জাভার তোয়েলোয়েঙ্গ অ্যাগোয়েঙ্গ  (Toeloeng Agoeng) শহরে এসে নতুন করে শুরু হলো সংসার। আর্মি বেস থেকে অনেক দুরে থাকার কারনে দুবোয়া এবার পুরোটা সময় তার জীবাশ্ম সন্ধানের কাজে ব্যয় করতে পারলেন। এবারো তার কিছু শ্রমিক জুটলো এবং তাদের দেখাশোনা করার জন্য দুজন কর্পোরাল। ১৮৯০ সালের মাঝামাছি ওয়াড ইয়াকে (Wadjak) খননকাজ শুরু করলেন, যেখানে দুবছর আগে মানুষের মাথার খুলির একটি জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল।

খননের প্রায় সাথে সাথেই দুবোয়ার টীম নানা ধরনের প্রানীর জীবাশ্ম খুজে পেতে শুরু করলো, একটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া স্তন্যপায়ী প্রানী ( Rattus trinilensis), গন্ডার, অ্যান্টেলোপ, শুকর, বানর, আংশিক মানুষের খুলি।

এরপর দুবোয়া যে সিদ্ধান্তটি নিলেন সেটাই তার ভাগ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

তিনি  জীবাশ্ম খোজার পরিধিটা পাহাড়ের গুহা বা পাথরের আশ্রয় থেকে বাড়িয়ে নদীর পাড়কে অর্ন্তভুক্ত করলেন, কারন তখন শুষ্ক মৌসুম ছিল, পানির স্তর ছিল বেশ নীচে, নদীর পাড়ের স্তরগুলো সব উন্মুক্ত ছিল। পাহাড় এবং সোলো নদীর দুই পারে খোজা শুরু করার পর পরই দুবোয়ার টীম খুবই সমৃদ্ধ একটি ফসিলের স্তর খুজে পেলেন, যেখান নানা ধরনের প্রানী গন্ডার, শুকর, জলহস্তি , দু ধরনের হাতি, বড় কিছু বিড়াল জাতীয় প্রানী, কুমির, কচ্ছপ ইত্যাদি। এখানেই ১৮৯০ সালের ২৪ নভেম্বর, তার টীম দুটো দাত সহ মানুষের চোয়ালের একটা টুকরো খুজে পেলেন। ঠিকমত এটা শনাক্ত করা কঠিন ছিল এর অবস্হার কারনে, তবে আগামী বছরে নতুন করে আবার শুরু করার জন্য এটা ছিল বেশ উৎসাহব্যান্জ্ঞক ।


ছবি: ১৯০০ সালে তোলা ত্রিনিল জীবাশ্ম খনন সাইটের ছবি। বেনগাওয়ান সোলো নদী পাড়ে এখানে পাওয়া গেছে জাভা ম্যানের জীবাশ্ম ( ছবি সুত্র)

দুবোয়ার বাসার বারান্দা ভরে উঠেছিল জীবাশ্মতে। তিনি তাদের ব্যাখ্যা এবং কোথায় কোথায় খুজে পাওয়া গেছে তার রেকর্ড তৈরী করার কঠিন কাজটা শুরু করেন। পরের বছর (১৮৯১) শুকনো মওসুমের কাজ শুরু হয় ত্রিনিল (Trinil) বলে একটি জায়গায়। শুরু করার পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তার টীম  প্রাইমেটের উপরের মাড়ীর তৃতীয় মোলার দাতটি (মাড়ির সবচেয়ে পেছনের দাত) খুজে পায়। দুবোয়ার প্রাথমিক ভাবে মনে হলো এটা শিম্পান্জ্ঞির মতই ( ভারতে শিবালিক হিলের লিডেক্কারের এর পাওয়া সেই জীবাশ্মর মত, ‍Anthropithecus sivalensis); দুবোয়ার হাতে তখন একটা দাত কেবল, কোন চোয়াল সেই ,তারপরও দুবোয়া বুঝতে পারলেন তার এই দাতটি লিডেক্কারের খুজে পাওয়া ফসিলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম প্রাচীন। এছাড়া ত্রিনিলও খুবই  জীবাশ্ম সমৃদ্ধ এলাকা ছিল, আরো অনেক স্তন্যপায়ী প্রানীর জীবাশ্মও খুজে পাওয়া যায় এখানে। কিন্তু সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটা হলো ঠিক তার পরের মাসে।


দুবোয়ার বারান্দায় রাখা ত্রিনিল থেকে সংগ্রহ করা ফসিল ( ছবি সুত্র)

১৮৯১ এর অক্টোবর মাসে তার টীম ঠিক  ভুত্বকের যে স্তরে মোলার দাত খুজে পেয়েছিল, সেই স্তরেই বড় কোন নারিকেলের অর্ধেকটা মালার মত একটি হাড়ের টুকরো খুজে পায়, দুবোয়া তখন অন্য সাইটে কাজ করছিলেন।  যারা  এটি খুজে পায় তাদের প্রথমে মনে হয়েছিল এটি হয়তো বা কোন কচ্ছপের পিঠের শক্ত শেল বা যাকে বলে কারাপেইস, হতে পারে, বাকানো অবতলাকৃতির এবং গাঢ় বাদামী রঙ, পুরোপুরি জীবাশ্মীভুত।

জীবাশ্মটি দুবোয়ার হাতে পৌছানো মাত্র তিনি বুঝতে পারলেন এটি কোন কচ্ছপের কারাপেইস নয়, এটি কোন প্রাইমেট মাথার খুলির উপরিভাগ। একটি সুস্পষ্ট বো রিজ বা যেখানে ভ্রু থাকে তার একটা উচু দৃশ্যমান খাজ আছে শিম্পান্জ্ঞিদের মত, কিন্তু এটার গঠন দেখেই বোঝা যায়, শিম্পান্জ্ঞির তুলনায় আয়তনে বড় ব্রেন বা মগজ ধারন করতো। দুবোয়া বুঝতে পারলেন এটি কোন এইপের মাথার খুলির অংশবিশেষ। কিন্তু তা প্রমান করতে হলে তার একটি শিম্পান্জির মাথার খুলির নমুনা প্রয়োজন, তিনি ইউরোপ থেকে একটা নমুনা চেয়ে অনুরোধ পাঠালেন। পরে এই এলাকায় দুবোয়া আশা করেছিলেন আরো কিছু জীবাশ্ম তিনি পাবেন, কিন্তু ততদিনে খোড়া মওসুম প্রায় শেষ।


ছবি: ত্রিনিলে দুবোয়ার খুজে পাওয়া Pithecanthropus erectus ( জাভা ম্যান, এখন Homo erectus) মাথার খুলির উপরের অংশ (Skull Cup);এটি এখন Trinil 2 , যা  Homo erectus এর ্ টাইপ স্পেসিমেন। ছবি সুত্র

এরপর দীর্ঘ সময় নিয়ে সব প্রটোকল মেনেই দুবোয়া বাড়িতে বসে এই নমুনাটি ধীরে ধীরে পরিষ্কার করা শুরু করেন, পুরো শীতকাল কেটে যায় বেশ কিছু খুলির নমুনাও সংগ্রহ করতে এবং তার নতুন আবিষ্কারের সাথে তাদের বিস্তারিত তুলনামুলক গঠনপরীক্ষা করেন। তার সাথে থাকা কাগজপত্র ঘেটেও আরো কিছু এইপ দের জীবাশ্মর সাথে এটি তুলনা করেন,যেমন ফ্রান্সে পাওয়া Oak Ape (Dryopithecus fontani) বা গিবনের মত Pilopithecus antiquus;  কিন্তু এদের থেকে তার খুজে পাওয়া মাথার খুলিটি অনেক বড়। তার মনে ধীরে ধীরে সন্দেহর দানা বাধতে থাকে।

১৮৯২ সালে মে মাসে ত্রিনিলে আবার খনন কাজ শুরু হয়। প্রথমে দীর্ঘ বর্ষায় জমা পলি সরিয়ে সেই জায়গা আরো মনোযোগ দিয়ে দুবোয়া তার টীম নিয়ে জীবাশ্ম খোজার চেষ্টা করেন,প্রায় দুই মাস ধরে এই প্লটের আশে পাশে খোজার পর জুলাই এর শেষে দুবোয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তার ডায়রীতে লেখেন, “আমি আবিষ্কার করলাম, ম্যালেরিয়া আর স্বাস্থ্য সমস্যার কারনে, একমাত্র নরক ছাড়া জাভা তে জীবাশ্ম সন্ধানের জন্য এর চেয়ে বেশী অনুপযুক্ত জায়গা আর নেই ; এর পর পর আবার তার ভয়ঙ্কর জ্বর হয়।

কিন্তু এর পরের মাসে তার টীম আরেকটি অসাধারন জীবাশ্ম খুজে পেলেন, প্রায় সম্পুর্ন একটা উরুর হাড় ( বা পায়ের ফিমার); দুবোয়া সেটি হাতে পেয়ে প্রথম বারের মত তার এই পরিশ্রম সফল হয়েছে বলে অনুভব করলেন। তিনি দেখেই বুঝতে পারলেনি  এই উরুর হাড়টি গাছে চড়ে এমন কোন প্রানীর হতে পারেনা, এটা মানুষের মত। এখন তার কাছে তিনটি গুরুত্বপুর্ন নমুনা, একটি দাত (মোলার, মাড়ির পেছনের দাত), একটি খুলির উপরের অংশ বা স্কালক্যাপ, এবং উরুর একটি হাড় ( ফিমার); দুবোয়া বুঝতে পারলেন খুব কাছাকাছি জায়গা থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পাওয়া এই হাড়গুলো আসলে একজনেরই। উরুর হাড়টি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ,কারন এর বৈশিষ্ট বলছে এটি সোজা হয়ে দুপায়ে ভর দিয়ে হাটা কোন এইপের, সেকারনে একটি নতুন প্রজাতি, তিনি এর নাম দিলেন Anthropithecus erectus – সোজা হয়ে হাটা শিম্পান্জি।

Pithecanthropus erectus 

ত্রিনিলে বর্ষা শুরুর আগে আর কোন প্রাইমেট জীবাশ্ম পাওয়া গেল না। নভেম্বর তিনি খবর পেলেন ম্যাক্স ওয়েবার (যার কাছে তিনি একটি শিম্পান্জির মাথার খুলির নমুনা চেয়েছিলেন) বার্লিন থেকে তার জন্য একটা নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং তার কাছে সেটি পাঠানো হয়েছে। বাটাভিয়া ( বর্তমান জাকার্তা) থেকে আসা মেল ট্রেনের জন্য তার অপেক্ষা শুরু হলো। অবশেষে ডিসেম্বরের ১৮ তারিখ তিনি সেটা হাতে পেলেন। এবার তিনি গিবন, মানুষ আর শিম্পান্জির মাথার খুলির সাথে তার পাওয়া জীবাশ্ম খুলিটির তুলনামুলক গঠনের মুল অ্যানালাইসিসটি শুরু করলেন।

তার পাওয়া খুলিটি বাহ্যিক দিক থেকে শিম্পান্জির মত কিন্তু বড় পার্থক্য হলো এটা আকারে বেশ বড়। আর এই আকারটা প্রায় মানুষের মাথার খুলির কাছাকাছি, এইপ দের মত স্পষ্ট ভ্রুর উচু খাজ (Bow Ridge) থাকা সত্ত্বে, এর সাথে যদি ত্রিনিলে পাওয়া উরুর হাড়টাকে  চিন্তা করা হয়, তাহলে কি দাড়াচ্ছে? এই হাড়টির সাথে মানুষের উরুর হাড়ের ভীষন মিল। এর পরের কয় দিন দুবোয়া প্রায় সারাটা দিন ধরেই তার স্টাডিতে কাটালেন। ২৫ ডিসেম্বর, অবশেষে ভোর বেলা স্টাডি থেকে বের হয়ে এককাপ কফি বানিয়ে ফিরে আসেন ত্রিনিলের  জীবাশ্মটির কাছে এবং বলেন good moring, merry christmas to you; এর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই দু্বোয়া আর সব হিসার নিকাশ আবার ভালো করে পরীক্ষা করেন, এ কয়দিনে করা সব হিসাবে সাথে মিলে যায়,  এখন দুবোয়া নিশ্চিৎ, পেছনের বারান্দায় সকালের নাস্তা খেতে থাকা স্ত্রী আনাকেই প্রথম বলেন, কাজ শেষ আনা, আমি মিসিং লিঙ্ক খুজে পেয়েছি, ঐ হাড়গুলোই মিসিং লিঙ্ক।

খুব তাড়াতাড়ি তিনি তার আগে ক্লাসিআই করা Anthropithecus erectus এর ক্ষেত্রে তার ভুলটা বুঝতে পেরেছিলেন; খুব চমৎকার একটা ভুল। মাথার খুলির আকৃতি দেখে, তিনি প্রথমবার এই খুলি যে ব্রেন কেস তৈরী করে আর সেখানে যে ব্রেন ধারন করতে পারে তার সম্ভাব্য যে হিসাব করেছিলেন, তার পরিমান ছিল ৭০০ ঘন সেমি, যা শিম্পান্জির চেয়ে বড় ( ৪১০ ঘন সেমি) কিন্তু মানুষের চেয়ে ছোট ( প্রায় ১২৫০ ঘন সেমি); কিন্তু তার প্রথম হিসাবটি আসলে ঠিক মত করা হয়নি, পরে যখন আবার হিসাব করলেন, দেখলেন এই পরিমানটি হবে প্রায় ১০০০ ঘন সেমি, যা যেকোন এইপ এর চেয়ে আকারে বড়, এবং যদিও পুরোপুরি না তবে প্রায় মানুষের সমান।

দুবোয়া সিদ্ধান্তে আসলেন তার জীবাশ্মটি না এইপ, না মানুষ, বরং সোজা হয়ে দু পায়ে হাটা মানুষ এবং এইপ এর মধ্যবর্তী একটি প্রজাতি। এবং দুবোয়া অবশেষে মিসিং লিঙ্ক টা খুজে পেলেন।


ছবি: ত্রিনিলে খুজে পাওয়া Pithecanthropus erectus এর জীবাশ্ম হাড় গুলোর ড্রইং ( স্কাল ক্যাপ, উরুর হাড় বা ফিমার, মাড়ির পেছনের একটি দাত বা মোলার ) ছবি সুত্র

সবকিছু ছেড়ে ডাচ ইষ্ট ইন্ডিজ এর আসার পাচ বছর, দুই সপ্তাহ এবং তিন দিন পর, অসংখ্য গুহা সন্ধান করে, বাঘের হাত থেকে জান বাচিয়ে, বেশ কয়বার ম্যালেরিয়ায় ভুগে অবশেষে দুবোয়া তার আরাধ্য মিসিং লিঙ্ক খুজে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন এটি সম্পুর্ন নতুন একটি প্রজাতি এবং একটি  ট্রানজিশনাল ফর্ম, যা মানুষ আর এইপ এই দুই গ্রুপকে যোগ করেছে। সুতরাং তিনি আর এখন ফসিলটিকে Anthropithecus erectus বলতে পারেন না। তিনি আর্নেস্ট হেকেলের দেয় সম্ভাব্য মিসিং লিংক এর নামটাই বেছে নিলেন, Pithecanthropus, কিন্তু প্রজাতির নাম কি হবে, হেকেলে  alalus বা বাকক্ষমতাহীন শব্দটা নিয়ে ভাবলেন, কোন প্রমান তার কাছে নেই এরা কথা বলতে পারতো কিনা, তিনি উরুর হাড়ের বৈশিষ্ট দেখেই সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এর নাম রাখবেন erectus,  Pithecanthropus erectus  বা সোজা হয়ে হাটা এইপ ম্যান। জন্ম হলো জাভা ম্যানের।

প্রতিক্রিয়া: 


ছবি: ১৮৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, দুবোয়া  ত্রিনিলে যেখানে Pithecanthropus erectus এর জীবাশ্ম পাওয়া যায়, সেখানে এই মনুমেন্টটি  তৈরী করেছিলেন। এখানে লেখা আছে P. e (Pithecanthropus erectus ) 175 m ONO 1891/95 বা এখান থেকে ১৭৫ মিটার উত্তর পুর্বে Pithecanthropus erectus  জীবাশ্ম পা্ওয়া গিয়েছিল ১৮৯১ থেকে ১৮৯৫ সালের মধ্যে। মনুমেন্টটি এখনও আছে। সুত্র: ( সুত্র: Pat Shipman এর The man who found the missing link )

এবার তার আবিষ্কারের কথা সারা পৃথিবীকে জানাতে হবে। 

পুরো ব্যাপারটা হলিউডের সিনেমার মত হতে পারতো, দুবোয়ার সাহসী জুয়া, ভেঙ্গে পড়া স্বাস্থ্য, কঠিন শ্রম, তার পরিবারের অসংখ্য ত্যাগ পুরষ্কৃত হলো সৌভাগ্য  এবং তার আরাধ্য বস্তুটি অর্জনের মাধ্যমে, এরকম কিছু দেখে আমরা সিনেমা শেষে  হল থেকে হাসিমুখে বের হয়ে আসতাম। আমরা জানতাম সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের প্রশংসা আর স্বীকৃতি কোনটারই্ অভাব হবে না এখন তার। কিন্তু সেরকম কিছুই আসলে হয়নি।

মিসিং লিঙ্ক খুজে পাওয়ার দাবী করতে হলে দুবোয়া ও তার ফসিলকে অনেক সমালোচনা মুলক নিরীক্ষার ঝড় সহ্য করতে হবে। এর কিছুটা অবশ্যই ভালো, সৎ বৈজ্ঞানিক আলোচনা, যেমনটা হওয়া উচিৎ, এবং বাকিটা অন্যরকম।

প্রায় পুরো ১৮৯৩ সাল জুড়ে দুবোয়া Pithecanthropus erectus  এর একটি বিস্তারিত বিবরণ দাড় করাবার চেষ্টা করলেন।  তিনি প্রথমে ভাবলেন জাভাতে তার কাজের ‍উপর বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক লেখা লিখবার জন্য, যার একটি অংশে থাকবে জাভার এই এইপ ম্যান। কিন্তু তা করলে হলে তাকে বহু জীবাশ্ম ঘাটতে হবে যা এতদিন সংগ্রহ করেছেন তিনি, কয়েক হাজার তো হবেই। কিন্তু কাজ শুরু করার পর সিদ্ধান্ত নেন, তার প্রধান জীবাশ্মটির দিকেই তার পুরো মনোযোগ দেয়া উচিৎ। মোট ৩৯ পাতার একটি রিপোর্ট তৈরী করেন Pithecanthropus এর উপর, যোগ করেন নমুনাগুলির ফটোগ্রাফ, ডায়াগ্রাম এবং বিভিন্ন এইপ দের মাথার খুলির সাথে এর বিস্তারিত তুলনামুলক আলোচনা।

দুবোয়া যে বিষয়েরে উপর জোর দিলেন তা হল, এই তিনটি নমুনা মোটামুটি কাছাকাছি পাওয়া গেছে এবং এ্ক্ি স্তরে এবং তার দৃঢ় বিশ্বাস এই তিনটি নমুনাই একজনের কাছ থেকে এসেছে। মাথার স্কাল ক্যাপটি পরীক্ষা করে তিনি বলেন, এর মানুষ এবং এইপ দুটির বেশ কিছু বৈশিষ্টিই আছে, এছাড়া  আয়তনে বড় একটা ব্রেনকে এটি ধারন করে। উরুর হাড় দিয়ে তিনি যুক্তি দেন, Pithecanthropus erectus মানুষ যেভাবে দুপায়ে ভর করে হাটে তেমন করেই হাটতো এবং শরীরের আকার এবং ওজনও প্রায় এক, সবমিলিয়ে তার খুজে পাওয়া এ্ইপ ম্যানটি তার নাম যেমন বলছে এইপ এবং মানুষের মধ্যবর্তী একটি প্রজাতি। তিনি লিখলেন : Pithecanthropus erectus হলো ট্রানজিশনাল একটি রুপ, যা, বিবর্তনের তত্ত্বানুযায়ী মানুষ এবং অ্যানথ্রোপয়েড এর মধ্যে যার অবশ্যই একটা অস্তিত্ব ছিল: সে মানুষের পুর্বপুরুষ।

দুবোয়া বাটাভিয়া (বর্তমান জাকার্তা) থেকেই তার লেখাটি প্রিন্ট করলেন এবং ১৮৯৪ সালের শেষের দিকে লেখাটি ইউরোপ পৌছালো। ইউরোপ থেকে প্রতিক্রিয়া পেতে তাকে বেশী দিন অপেক্ষা করতে হয়নি, কিন্তু যা তিনি আশা করেননি, তাই হলো; অনেকদিক থেকেই সমালোচনা আসলো। একজন জার্মান অ্যানাটোমিষ্ট বললেন মাথার খুলির অংশটা কোন এইপ এর আর উরুর হাড়টা অবশ্যই কোন মানুষের, তিনি দুবোয়াকে একটি ফসিল গিবন আর মানুষের প্রাচীনত্ব প্রমানের ক্রেডিট দিলেন শুধু। জার্মান বিজ্ঞানের পুরোধা ব্যাক্তি রুডলফ ফিরকোহ ও বললেন দুবোয়ার দাবী অবশ্যই সঠিক নয়, এটি কোন গীবনের জীবাশ্ম মাত্র এবং অবশ্যই মিসিং লিঙ্ক এর প্রশ্নই এখানে আসেনা। অন্য সমালোচকরা বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা দিলেন, যেমন সিভালিক হিলে শিম্পান্জি যিনি আবিষ্কার করেছিলেন, লীডেকার, তিনি nature  জার্নালে লিখলেন এটি  কোন মাইক্রোসেফালিতে আক্রান্ত মানুষ ( মাইক্রোসেফালী হলে মাথার খুলি ও ব্রেনের আকৃতি একজায়গায় এসে স্থির হয়ে যায়); কেউ কেউ দাবী করলেন হয়তো কোন আদিম মানুষের কোন একটি জাতি। অবশ্য অল্প কিছু ব্যতিক্রমও আছে যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্মবিদ ও সি মার্শ এর মতে, দুবোয়া তার স্বপক্ষে যথেষ্ট প্রমান দিয়েছে। এবং অবশ্যই আর্নেষ্ট হেকেল, দুবোয়াকে সমর্থন করেন।

কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ট মতামতই ছিল দুবোয়ার বিপক্ষে; কিছু কিছু মন্তব্য ছিল খুবই কষ্টদায়ক। হাজার হাজার মাইল দুরে, ভয়াবহ কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে আসল আবিষ্কার করছেন দুবোয়া, আর অন্যদিকে ইউরোপের এই সব অ্যাকাডেমিকরা তাদের স্বাচ্ছন্দময় অফিসে বসে, জীবাশ্মটি না দেখেই পাতার পর পাতা যে একমাত্র মানুষটি ফসিলটি দেখেছেন আর অ্যানালাইসিস করেছেন তাকে সমালোচনা করে যাচ্ছেন সামান্যতম সহানুভুতি ছাড়াই। দুবোয়া মর্মাহত হলেন। তিনি ব্যাপারটি দেখলেন  ঈর্ষা হিসাবে, যেহেতু তিনিই মিসিং লিঙ্কটা আবিষ্কার করেছেন এখন তারা উঠে পড়ে লড়ছে তার প্রাপ্ত স্বীকৃতিটা তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে। 

ইউরোপ:

দুবোয়া তার সমালোচনাকারীদের সন্দেহর মুখোমুখি হতে ই্উরোপ ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন আট বছরের প্রবাস জীবন শেষে।  দুবোয়ার কাছে তখন ৪১৪টি কাঠের বাক্স ভরা প্রায় ২০,০০০ নানা ধরনের প্রানীদের জীবাশ্ম। শুধু দুটো বিশেষভাবে বানানো কাঠের বাক্সে রাখা তার  মহামুল্যবান Pithecanthropus erectus এর জীবাশ্ম যা তিনি বাটাভিয়া থেকে মার্সেই পর্যন্ত  জাহাজে এবং সেখান থেকে ট্রেনে অ্যামস্টারডাম, সারাক্ষনই নিজের হাতেই রাখলেন।

এই ছয় সপ্তাহর যাত্রা পথে মানসিক এবং কৌশলগত দুভাবেই দুবোয়া প্রস্তুত হলেন তার ধারনা প্রতিষ্ঠা করার আসন্ন যুদ্ধের জন্য। কিন্তু তার আগে প্রকৃতি তাকে আরেকটা চ্যালেন্জ্ঞ ছুড়ে দিলেন, ভারত মহাসাগরে ঝড়ের কবলে পড়লো তার জাহাজ; জাহাজ ছাড়তে হতে পারে বলে ক্যাপ্টেন সবাইকে লাইফবোটে ওঠার নির্দেশ দিলেন, তাড়াহুড়া করে লাইফবোটে বসার পর হঠাৎ দুবোয়ার খেয়াল  হলো কেবিন থেকে তার Pithecanthropus এর কাঠের বাক্সটা আনা হয়নি। তার মনে হলো যদি তিনি এটা হারান তাহলে তার হাতে প্রমান করার কিছুই থাকবে না, তার এতদিনের পরিশ্রম ব্যর্থ হবে, সব নির্দেশ উপেক্ষা করে আবার জাহাজের কেবিনে ছুটলেন, শুধু আনাকে বললেন লাইফবোট যদি পানিতে নামিয়েই ফেলে, তিনি যেন তাদের বাচ্চাদের দেখেন। তিনি তার জীবাশ্মটাকে আগে রক্ষা করবেন।

সৌভাগ্যক্রমে ঝড় কেটে যায়, আগষ্ট মাসে প্রথম দিকে দুবোয়া পরিবার মার্সেই হয়ে নেদারল্যান্ডে পৌছান। দুবোয়ার এই দেশে ফেরাটা তার জন্য সুখকর ছিল না, জাভাতে থাকাকালীন সময় তার বাবা মারা যান, তিনি তার ছেলের এই পাগলামীর পরিনতি দেখে যেতে পারেননি, তার মাকে দুবোয়া যখন কাঠের বাক্সে Pithecanthropus এর জীবাশ্মগেুলো দেখান, তার মার মন্তব্য ছিল, but boy, what use of it? দুবোয়ার জার্নাল ছাড়া সেই রাতে তার মার কথায় তিনি যে তীব্র কষ্ট পেয়েছিলেন, তা আর কেউ জানেনি, এমনকি আনাও। এটাই দুবোয়া তার জীবনের শ্রেষ্টতম মুহুর্ত হবে বলে মনে করেছিলেন।  দুবোয়া মার প্রশ্নের কোন উত্তর দেননি। এই একই প্রশ্ন তো আর সমালোচকরাও তো করছে। বাবা নেই, নিজের এক সন্তানকে জাভাতে হারিয়েছেন, দুবোয়ার বাকী ছেলেমেয়েরা অচেনা তাদের পিতামহীর কাছে, দুবোয়া মনে মনে ভাবলেন, না মা, তোমার কাছে এর কোন মুল্যই নেই।

পরের দিন ব্যক্তিগত সমস্ত কষ্টকে উপেক্ষা করে দুবোয়া তার আবিষ্কারের সমালোচকদের সাথে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। পরবর্তী কয়েক বছর তিনি সারা ইউরোপের প্রধান প্রধান ইন্সস্টিটিউটগুলোতে তার জীবাশ্ম গুরুত্ব এবং তারা অ্যানালাইসিসে যথার্থতা নিয়ে ক্যাম্পেইন করে গেলেন। তার প্রথম সুযোগটা এসেছিল নিজ দেশে লিডেনে অনুষ্ঠিত হওয়া  International Congress on Zoology তে। অনেক গন্যমান্য বিজ্ঞানীদের সেখানে ছিলেন, তার প্রধান সমালোচক রুডলফ ফিরকোহ  ছিলেন এই অনুষ্ঠানের সভাপতি। দুবোয়া জানতেন ফিরকোহ সামনে কিছু বলতে হলে তাকে তার সেরা ফর্মে থাকতে হবে, জাভার ফসিল সম্বন্ধে ফিরকোহ আগেই মন্তব্য করেছিলেন, fantasy..beyond all experience;  দুবোয়া বুদ্ধিমানের মতই কোন ব্যক্তিগত আক্রমনে গেলেন না, বরং যৌক্তিক বৈজ্ঞানিক যে প্রশ্নগুলো তার ফসিল সম্বন্ধে উঠেছিল , তার উত্তরগুলোই শুধু দিলেন। তিনি স্বীকার করলেন তার প্রথম ৩৯ পৃষ্ঠার মনোগ্রাফটি এর ব্যাখার জন্য হয়তো যথেষ্ট ছিল না, সুতরাং তিনি বিস্তারিত ভাবে কোন স্তরে জীবাশ্মটি ছিল, এবং আর কি কি প্রানীর ফসিল সেখানে আবিষ্কৃত হয়েছে তার ব্যাখ্যা দেন।  তিনি উরুর হাড়ের মানুষের মত বৈশিষ্ট, মাথার খুলির আকার এবং এর ধারন ক্ষমতা প্রায় যে মানুষের কাছাকাছি ইত্যাদি বিস্তারিত আলোচনা করেন।

প্রভাবশালী ফিরকোহ তার অবস্থান থেকে একটুও নড়লেন না তবে  উপস্থিত অনেকেই প্রথম রিপোর্টের কিছু অসঙ্গতি দুর হয়েছে বলে মনে করলেন। সবচেয়ে বড় সুবিধাটা হলো আরো অনেক প্রভাবশালী বিজ্ঞানীরা তার ফসিলটাকে ভালো করে পর্যবেক্ষন করার সুযোগ পান। এদের কেউ কেউ দুবোয়ার ফসিলের গুরুত্বটা বুঝতে পারেন। প্যারিসে তার সবচেয়ে বড় মিত্র হন Ecole d’ Anthropologie এর বিখ্যাত অধ্যাপক লেওনসে পিয়ের মানৌউভরিয়ে।  এরপর তিনি এডিনবরা এবং ডাবলিনের সম্মেলনে আরো কিছু মিত্র পান।  কিন্তু তার সমালোচকের সংখ্যাই ছিল বেশী।

কিছু পুরষ্কার ও স্বীকৃতিও পান এ সময়ে, গ্রেট ব্রিটেইনে এবং আয়ারল্যান্ডের অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সোসাইটি তাকে সন্মানিত সদস্যপদ দেয়, ১৮৯৬ সালে প্যারিস থেকে পান ব্রোকা পুরষ্কার (Prix Broca)। এ সময় ডাচ সংসদের একটি আইন পাশের মাধ্যমে তাকে হারলেম এর টাইলার (Tyler) মিউজিয়ামের জীবাশ্মবিদ্যার কিউরেটর নিযুক্ত করা হয়।

তার আবিষ্কৃত জীবাশ্মটির মিসিং লিঙ্ক স্বীকৃতি তখনও মেলেনি। তার এইপ ম্যানের জন্য দুবোয়া ক্রমাগত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখে যেতে থাকেন। ১৮৯৮ সালের আগষ্ট এর ২৮ তারিখ জীববিজ্ঞানে মহারথীরা যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে জড়ো হলেন International Congress of Zoology র জন্য। এখানে দুবোয়ার সমর্থক, ভিন্নমত পোষনকারী এবং এখনও সিদ্ধান্ত নেননি এমন অনেকেই ছিলেন। আর্নেষ্ট হেকেল, ততদিনে বিবর্তন জীববিজ্ঞানের একজন বর্ষীয়ান পুরোধা ব্যাক্তিত্ব মঞ্চে উঠলেন ঠিক দুবোয়ার বক্তৃতার আগে। এবং তার অসাধারন বাগ্মীতা দিয়ে সমর্থন করলেন দুবোয়ার মিসিং লিঙ্ক Pithecanthropus কে  এবং সেই সাথে ধারালো যুক্তি দিয়ে পরাভুত করলেন বিবর্তন বিরোধী ফিরকোহ এবং আরো যে কয়জন ফিরকোহ সমমনা ছিলেন, তাদের সবাইকে। তিনি দৃঢ় কন্ঠে দুবোয়াকে Pithecanthropus সুযোগ্য আবিষ্কারক বলে সম্ভাষন জানালেন। তার ভাষায় যে (দুবোয়া) সুস্পষ্টভাবে প্রমান করেছে তার প্রস্তাবিত মিসিং লিঙ্ক এর বিশেষ গুরুত্ব। হেকেল যে অসাধারন কাজটি করলের দুবোয়া বিস্ময়ের সাথে তা দেখতে লাগলেন। হেকেলের প্রধান নিশানা ছিল আসলে জার্মান প্যাথলজিষ্ট ফিরকোহ, কেমন করে বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা ফিরকোহ র প্রতিটি ধারনার বিপক্ষে অসংখ্য প্রমান সংগ্রহ করে তাকে বারবার ভুল প্রমান করেছে, এছাড়া কেমন করে তিনি একসময় নিয়ানডারথাল আর পরে Pithecanthropus কে মানতেই চাননি, উড়িয়ে দিয়েছেন প্যাথলজিক্যাল প্রোডাক্ট হিসাবে, তা সবই মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে বলে ব্যাখ্যা করেন হেকেল;  হেকেল সুস্পষ্ট ভাবে বলেন আসলেই এই প্রভাবশালী জ্ঞানী প্যাথলজিষ্ট সব ধরনের অর্গানিক বৈচিত্রতাকে প্যাথলজিক্যাল বলে আখ্যা দিয়ে যাচ্ছেন বহুদিন ধরেই। হেকেল আরো বলেন গত ত্রিশ বছর ধরে জার্মান বিজ্ঞানের প্রভাবশালী এই ব্যাক্তিটি  ডারউইনের বিরোধিতা করাটাকেই তার জীবনের একমাত্র ব্রত হিসাবে গ্রহন করেছেন, এবং বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে দাবী করে আসছেন মানুষ এইপদের থেকে নিশ্চয়ই বিবর্তিত হয়নি, যখন প্রায় সমস্ত বিশেষজ্ঞর, যাদের বিচার বিবেচনা করার ক্ষমতা আছে, তারা এর ভিন্নমত পোষন করছেন।


ছবি: জাভা ম্যান বা Pithecanthropus এর মাথার একটি রিকনস্ট্রাকশণ ) ছবি সুত্র

হেকেলের আক্রমন যতই আনন্দের হোক না কেন, দুবোয়ার যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। দুবোয়া ক্রমাগত ভাবে তার Pithecanthropus পক্ষে বিজ্ঞানীদের সমর্থণ অর্জনের নানা পথ খুজতে লাগলেন। তিনি  যুক্তির স্বপক্ষে তার নতুন গবেষনা, প্রানীদের দেহের আকৃতি এবং তাদের ব্রেনের আয়তনের তুলনামুলক গবেষনার ফলাফল সামনে নিয়ে আসেন। তিনি প্রায় সমস্ত স্তন্যপায়ী প্রানীদের ক্ষেত্রে এই দুটি প্যারামিটারের একটি গানিতিক মডেল প্রতিষ্ঠা করেন। এই ডাটা থেকেই  তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন কোন এইপ দের ব্রেনের আয়তন ১০০০ ঘন সেমি হতে পারে? তার হিসাব অনুযায়ী এ ধরনের এইপের ওজন হবে প্রায় ৫০০ পাউন্ড। কিন্তু তার পাওয়া উরুর হাড় বা ফিমারের মাত্রানুযায়ী দেখা যায় এটা মাত্র ১৬০ পাউন্ড ওজনের কোন প্রানীর ভার সহ্য করতে পারে। সুতরাং ব্রেনের আকারই বলে দিচ্ছে তা কোন এইপের হওয়া সম্ভব না এবং আবার এটি অবশ্যই ১৬০ পা্উন্ড ওজনের একটি মানুষের ব্রেনের আয়তনের তুলনায় কম। এটি অবস্থান এইপ এবং মানুষের মাঝামাঝি, যেমন গত পাচ বছর ধরে তিনি বলে আসছেন, Pithecanthropus ই মানুষ এবং এইপদের মাঝামাঝি একটা অবস্থান।

১৮৯৯ সালে পরিস্থিতি আরো খারাপ হলো, দুবোয়ার অল্প কিছু জার্মান সমর্থকদের একজন গুস্তাভ শোয়ালবে, যিনি ফিরকোহ র  দুবোয়ার প্রতি সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন।  এর কৃতজ্ঞতা স্বরুপ তিনি শোয়ালবেকে তার জীবাশ্মগুলো পর্যবেক্ষন করার সুযোগ দেন। কিন্তু শোয়ালবের পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। কিন্তু শোয়ালবে দুবোয়ার ফসিল নিয়ে বিনা অনুমতি দু্বোয়াকে কোন স্বীকৃতি না দিয়ে বিশাল দুটি প্রবন্ধ লেখেন তার চিঠিতে তিনি দুবোয়াকে তার প্রতিদ্বন্দী হিসাবে চিহ্নিত করেন। দুবোয়া এই বিশ্বাসঘাতকতায় হতবাক হয়ে যান।

ইতিমধ্যে তার ইষ্ট ইন্ডিজ যাত্রার প্রায় একযুগ পেরিয়ে গেছে। এই বছরগুলোয় তার ফসিল খোজার পরিশ্রম, এরপর এর স্বীকৃতির জন্যেএকের পরে এক যুদ্ধ ততদিনে দুবোয়াকে শরীরে মনে অসুস্থ্য করে ফেলেছে। তিনি এই জীবাশ্ম নিয়ে যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, এছাড়া তার মনে হলো তার যা বলার ছিল সবই বলা হয়ে গেছে। এছাড়া শোয়ালবের দুটি বিশাল প্রবন্ধ ছাড়াও ততদিনে এই ফসিল নিয়ে বিভিন্ন গবেষকদের প্রায় ৮০ টি প্রকাশনা হয়ে গেছে। উনবিংশ শতাব্দীর জীবাশ্মবিদ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন আবিষ্কারটি গুরুত্ব সবাই ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেও এর আবিষ্কারক ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। আর একটুও ধৈর্য্য তার মধ্যে ছিলনা। কেউই তার আত্মত্যাগ, তার প্রতিভাকে মুল্যায়ন করেনি। শোয়ালবে যখন তার ফসিল নিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে সেদিন থেকে দুবোয়া আর কাউকেই কোনদিন বিশ্বাস করেনি, যার জন্য তাকে সমালোচিত হতে হয়েছে আমৃত্যু।

তার আগে তিনি তার ফসিল সবাইকে দেখিয়েছেন,  এমনকি যাকে বিশ্বাস করা উচিৎ না তাদেরকেও, তিনি ত্রিনিলের জীবাশ্ম স্তর এমনভাবে দেখিয়েছেন যে একটা শিশুও বুঝতে পারে, তিনি পরিশ্রম করে নানা পরিমাপের মাধ্যমে ব্রেনের সাইজ নির্নয় করেছেন, অথচ কেউই তা বুঝতে চায়নি। একসময় দুবোয়ার মনে হলো, তার এই জীবাশ্ম সম্বন্ধ নতুন করে আর কিছু বলার নেই। তিনি হয়তো সবাইকে তার মতের পক্ষে আনতে পারেননি, কিন্তু অনেককে পেরেছিলেন, সেটাই ছিল তার স্বান্তনা। সর্ব্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে Pithecanthropus এর গুরুত্ব এবং প্যালিওঅ্যানথ্রোপলজীর ইতিহাসে তার দাবীটুকু প্রতিষ্ঠিত করতে।

Homo erectus

১৮৯৯ সালে অ্যামস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্তি পান দুবোয়া, তার অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তাটা দুর হয় খানিকটা, কিন্তু মনে শান্তি ছিল না। ধীরে ধীরে লেখা কমিয়ে দিলেন। নিজেকে আর তার প্রিয় জীবাশ্মটিকে নিয়ে  সবার চোখের আড়ালে চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু ১৯০০ সালে ডাচ সরকার প্যারিসের ওয়ার্ল্ড এক্সপো তে Pithecanthropus এর ফসিল বা এর কোন কাষ্ট ডাচ ইষ্ট ইন্ডিজের প্যাভেলিয়নে প্রদর্শণ করার জন্য দুবোয়াকে অনুরোধ করে। এটা হবে একটি জাতীয় গর্ব। দুবোয়া আরো মনে দু:খ পেলেন, বৈজ্ঞানিক সমাজ যা বোঝেনি, সাধারন মানুষ তা দেখে কি বুঝবে, কেমন করেই বা তা জাতীয় গর্ব হয়। অনিচ্ছুক দুবোয়া তারপর একটা দারুন পরিকল্পনা হাতে নেন,  তিনি তার Pithecanthropus erectus এর একটি পুর্নসাইজের মুর্তি বানাবেন, জাভাতে একসময় যে রকম ছিল জাভা ম্যান; দুবোয়ার ড্রইং এর হাত ছিল খু্ব ভালো; বাসার ছাদের ঘরে লোহার ফ্রেমের উপর কাদা মাটির উপর প্লাস্টার অব প্যারিসের কাষ্ট দিয়ে তিনি জাভা ম্যানের একটি মুর্তি বানান, তারপর ওরাং উটানের মতো চামড়ায় বাদামী রং আর চুলের লাল রং করেন। এর মডেল ছিল তার বড় ছেলে জ্যাঁ। প্যারিসে পাঠানোর আগে এর নাম দিলেন Piet ।


ছবি: দুবোয়ার বানানো জাভা ম্যানের মডেল Piet (১৯০০ সালে প্যারিসে ওয়ার্ল্ড এক্সপোর জন্য); ছবি সুত্র

১৯০০ সালের প্রথম দিকে দুবোয়া Tyler মিউজিয়ামের নিজের বিশেষ আলমারীতে Pithecanthropus erectus ফসিলটি বন্দী করে রাখেন ১৯২৩ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে দুবোয়া অন্য বিষয় নিয়ে গবেষনা শুরু করেন। আর্নেষ্ট হেকেলের প্রস্তাবিত নতুন ক্ষেত্র  ইকোলজী, প্যালিওক্লাইম্যাটোলজী এবং ইকোসিস্টেম বিষয়গুলোর জন্মলগ্নের বেশ কিছু গুরুত্বপুর্ণ গবেষনা করেন। প্রকৃতি এবং পরিবেশ রক্ষা সংক্রান্ত গবেষনার প্রথম দিককার পাইওনিয়ার ছিলেন তিনি।


ছবি: দুবোয়া এই সেফ এ তার বিখ্যাত জাভা ম্যানের জীবাশ্ম টি রেখেছিলেন। নেদারল্যান্ড এর লীডেনে  National Museum of Natural History তে বর্তমানে এই টাইপ স্পেসিমেনটি আছে। ( ছবি সুত্র)

দুবোয়ার লিগেসী:   


ছবি: ১৯২৮ সালে দুবোয়ার সত্তরতম জন্মদিনে আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয় ফ্রান্স ওয়েরডারকে তার এ্ই প্রতিকৃতিটি আকার জন্য নিযুক্ত করেছিল।( ছবি সুত্র)           

কিন্তু দুবোয়ারও পুরোপুরি জানা হয়নি তার এই আবিষ্কারের সত্যিকারের গুরুত্ব।

পরের দশকগুলোতে তাকে অনুসরন করে আরো অনেক জীবাশ্মবিদ এশিয়ায় গেছেন প্রাচীন মানুষের জীবাশ্ম সন্ধানে। তাদের সন্ধান প্রমান করেছে দুবোয়ার এই ফসিল খুজে পাওয়াটাই কি ভীষন ব্যতিক্রম একটি ঘটনা ছিল, কারন একই জায়গায় বেশীর ভাগ অভিযানই প্রাচীন মানুষ বা হমিনিডদের ফসিল খুজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিল। ডাচ এবং প্রুশিয়ানদের ত্রিনিল অভিযান আর কিছু পায়নি, পরে চীন ও মঙ্গোলিয়ায় আমেরিকার ন্যাচারাল হিস্টি মিউজিয়ামে প্রা্য় একযুগ ব্যাপী স্থল নির্ভর সবচেয়ে বড় ফসিল অভিযানেও কোন হমিনিড এর ফসিল আবিষ্কৃত হয়নি (যদিও তাদের অন্য দুর্দান্ত কিছু সাফল্য ছিল, সেটা আরেক কাহিনী)।

১৯২০ দশকের শেষে ডেভিডসন ব্ল্যাক  বেইজিং  এর কাছাকাছি  পিকিং ম্যান এর ফসিল পান( যার নাম দেয়া হয় Sinanthropus pekinensis); যার বৈশিষ্ট্য দুবোয়ার Pithecanthropus এর মত। পরে জাভাতে জার্মান ডাচ জীবাশ্মবিদ র‌্যালফ ফন কোয়েনিগসভাল্ড ইষ্ট ইন্ডিজ এ আরো ফসিল পান, যা তিনি চিহ্নিত করেন  Pithecanthropus হিসাবে। ১৯৩৯ সালে ফন কোয়েনিগসভাল্ড ডেভিডসন ব্ল্যাক এর উত্তরসুরী ফ্রান্জ ভাইডেনরাইখ এর সাথে দেখা করেন, দুজনে পিকিং ম্যানের ফসিলের সাথে জাভার ফসিলের তুলনা করে বুঝতে পারেন এরা একই প্রজাতি সদস্য। ১৯৫০ সালে দুটি ফসিল হমিনিডকে এক করে নতুন করে নাম করণ করা হয় Homo erectus; দুবোয়ার মাথার খুলিটা এখন পরিচিত Trinil 2 হিসাবে, এটি হচ্ছে Homo erectus এর টাইপ স্পেসিমেন – বা মুল স্পেসিমেন যার উপর ভিত্তি করেই এই নতুন প্রজাতির বিবরণ।

দুবোয়া খুব জোরালো প্রতিবাদ জানান, তার মতে পিকিং ম্যান আধুনিক মানুষের বেশ কাছের একটি প্রজাতি এবং তার Pithecanthropus ই হলো একমাত্র আসল মিসিং লিংক ( এইপ এবং মানুষ)

দুবোয়ার অবশ্য জানার কোন উপায় ছিলনা যে ভবিষ্যতে যখনই কোন হমিনিড ফসিল আবিষ্কার হয়েছে, মানুষের বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় তাদের অবস্থান নিয়ে বিতর্কের তার মতই ঝড় সামাল দিতে হয়েছে তার আবিষ্কারককে।

দুবোয়ার আবিষ্কারের আরো কিছু প্রভাব আছে, পরবর্তীতে দুবোয়ার Pithecanthropus এর প্রাচীনত্ব বিবেচনা করে বেশীর ভাগই নৃতত্ত্ববিজ্ঞানী প্রথম দিকে মনে করতেন মানবজাতির সুচনা হয়েছে এশিয়ায়, আফ্রিকায় নয়, ডারউইন যা মনে করতেন। এ কারনে যে হয়েছিল ১৯২০ এর দশকে (১৯২৬) দক্ষিন আফ্রিকায় আরো প্রাচীন হমিনিডদের আবিষ্কার  ( Australopithecus) প্রথম বিজ্ঞানীরা গ্রাহ্যই করেননি। ১৯৬০ দশকের প্রথম দিকে যখন আরো প্রাচীন Homo erectus এবং আরো কিছু প্রজাতির হমিনিডদের ফসিল মেলে তখন আবার মানুষের উৎপত্তির কেন্দ্র এশিয়া থেকে আবার আফ্রিকায় ফিরে আসে। এবং আরো অনেক নতুন প্রযুক্তির ( যা গত শতাব্দীর বিখ্যাত জীবাশ্ম বিজ্ঞানীরা কখনো কল্পনাই করতে পারতেন না ) ব্যবহার আমাদের আরো কাছে নিয়ে চলেছে হাক্সলীর সব প্রশ্নের প্রশ্নর উত্তরের কাছাকাছি।

দুবোয়ার যে অবদানের কথা অনেকেই জানেন না তা হলো ‍তিনি প্রথম বারের মত মানুষের ‍বিবর্তনের বিষয়টি কে বৈজ্ঞানিক সমাজের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। রেকর্ড ইঙ্গিত করছে তার গবেষনা এবং অধ্যবসায়  এই বিতর্কিত বিষয়টিতে ব্যাপক কৌতুহলের জন্ম দেয়। তার ৩৯ পাতার প্রথম রিপোর্টটি অনেকেই কোন মুল্য দেননি সেই সময়, কিন্তু এটি প্রথম বারের মত সুস্পষ্ট ইঙ্গিত করেছে এটি এইপ এবং মানুষের মধ্যবর্তী একটি  প্রজাতি। কোন আদিম মানুষের জাত নয়। সেই দুর প্রাচ্যে বসে তিনি প্রথমবারের মত মানুষের জীবাশ্ম  অ্যানালাইসিসে প্রথম ধারনাগত ফ্রেমওয়ার্কটি তৈরী করেন, আজো তা ব্যবহৃত হচ্ছে যে কোন হমিনিড ফসিলের গবেষনায়। আসলেই এটি ছিল একটি অসাধারন কাজ।

তাহলে দুবোয়া কেন বেচে থাকতে বঞ্চিত হয়েছিলেন? তার সংক্ষিপ্ত রিপোর্টটি, যার বিরুদ্ধে সমালোচনা হয়েছে প্রচুর, এই সমালোচনা উপেক্ষা করেছে তার রিপোর্টটির প্রকৃত মুল্য।

তার আরেকটি অসাধারন কাজ ছিল তার শরীরের আকৃতি আর ব্রেনের আয়তনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষনা,  যা পরবর্তীতে জীববিজ্ঞানের সুবিশাল Allometric studies  এর পুর্বসুরী। ১৯৩০ এবং ১৯৪০ এর দশকে দুবোয়ার এই গবেষনা ( cephalization)  সমালোচনার স্বীকার হয়ে পরিত্যক্ত হয়েছিল, ১৯৭৩ সালে হ্যারি জেরিসন আবার তা জীববিজ্ঞানের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করেন তার বই Evolution of the brain and intelligence এ।

ট্র্যাজিক্যালী দুবোয়ার দৃঢ় ব্যাক্তিত্ব, দ্রুত রেগে যাবার প্রবনতা তারে সুনামকে ক্ষুন্ন করেছে। দুবোয়া জীবনে যাই করেছেন, সেই কাজটি এত একাগ্র চিত্তে আর তীব্র আবেগ নিয়ে করেছেন, যা তার অনেক সময় সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দুবোয়ার কাছাকাছি যারা এসেছেন তারা কেউই তাকে ভুলতে পারেনি কখনোও।

দুবোয়ার শেষ যুদ্ধটাও দু:খজনক, ফন কোয়েনিগসভাল্ড একই প্রজাতির হমিনিড এর ফসিল খুজে পেয়েছিলেন ১৯৩২ সালে ( ডেভিডসন ব্ল্যাকের পিকিং ম্যানও এই প্রজাতির) কিন্তু দুবোয়া ভিন্নমত পোষন করেছিলেন, বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমান করা তার জন্য অসম্ভব ছিল।

বেচে থাকাকালীন সময়ে দুবোয়াকে অনেকে উন্মাদ বলেছিলেন তার ফসিল লুকিয়ে রাখার জন্য। জীবনের শেষ দিনগুলোতে (১৯২৭) তার বিরুদ্ধে ক্যাথলিক ধর্মবাদীদের গুজব ছিল তিনি তার প্রিয় ফসিলের বর্ননা নতুন করে লিখেছেন, এবং এটিকে কোন হোমিনিড না বলে, বলেছেন জীবাশ্ম গিবন, এ কারনেই লুকিয়ে রেখেছেন সেই ফসিল।

এসব অভিযোগের কোনটাই সত্য ছিল না, না তিনি উন্মাদ, কিংবা নির্বোধ। তিনি যখন মারা যান, তার অনেক শত্রু ছিল। নতুন অনেক বিজ্ঞানী তার সম্বন্ধে বদনামই শুধু শুনেছে, তার গল্প এতো বিকৃত হয়েছে যে মুল সত্যটা খুজে পাওয়া যায়নি।

প্রথম এই মানুষটিকে নতুন আলোয নিয়ে আসেন থিউনিসেন ১৯৮৯ সালে তার Eugene Dubois and the Ape man from Java বইটিতে এবং পরবর্তীতে  পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃতত্ত্ববিদ প্যাট শিপম্যান তার সুবিশাল  The man who found the missing link: Eugene Dubois and his lifelong quest to prove Darwin right বইটিতে। এই লেখার অনেক তথ্যই এসেছে প্যাট শিপম্যানের বই থেকে।

১৯৪০ সালে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ ঘুমের মধ্যেই মারা যান দুবোয়া, কাছের ভেনলো সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।


ছবি: ভেনলো (Venlo) র সমাধি ক্ষেত্রের একপ্রান্তে  দুবোয়ায় চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন ( সুত্র: Pat Shipman এর The man who found the missing link )

Advertisements
ইউজেন দুবোয়া এবং জাভা ম্যান

5 thoughts on “ইউজেন দুবোয়া এবং জাভা ম্যান

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s