রবার্ট কখ এর ব্যাসিলাই

 


শীর্ষ ছবি: হাইনরিশ হেরমান রবার্ট কখ ( ১১ ডিসেম্বর, ১৮৪৩ – ২৭ মে, ১৯১০) | ছবি সুত্র

If my efforts have led to greater success than usual, this is due, I believe, to the fact that during my wanderings in the field of medicine, I have strayed onto paths where the gold was still lying by the wayside. It takes a little luck to be able to distinguish gold from dross, but that is all.  Robert Koch (1908)

আমরা যারা অণুজীব বিজ্ঞানের ছাত্র, রবার্ট কখ তাদের কাছে খুবই পরিচিত একটি নাম, কারণ তিনি আধুনিক অণুজীববিজ্ঞানের জনক ( বা বলা উচিৎ ব্যাকটেরিওলজি)।  তিনি একাই  রোগের কারণ হিসাবে অণুজীব সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানকে যেভাবে সমৃদ্ধ করে গেছেন, তার তুলনা করা খুবই কঠিন । তিনি যক্ষা, কলেরা, অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্তকরণ ও সংক্রামক ব্যাধির ধারণার সমর্থনে পরীক্ষামূলক স্বাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিটি প্রস্তাব করেছিলেন। খুব সংক্ষেপে রবার্ট কখের অবদানগুলো বলা প্রায় অসম্ভব। তারপরও বৃথা চেষ্টা করছি, বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই বিখ্যাত চরিত্রকে নিয়ে তার জন্মবার্ষিকীকে অল্প কিছু লিখতে।

জার্মান চিকিৎসা বিজ্ঞানী রবার্ট কখ জন্মগ্রহন করেন ১৮৪৩ সালের ১১ ডিসেম্বর। কৌতুহলী কখকে অণুবীক্ষণ যন্ত্র কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা শিখিয়েছিলেন তার দাদা, আর এটাই তাকে একসময় প্রভাবিত করেছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানী হবার জন্যে। ফ্রান্কো প্রুশিয়ার যুদ্ধ শেষে ১৮৭২ সালে ২৯ বছর বয়সী কখ বার্লিনের কাছেই একটি গ্রামে, ভোলস্টাইন এ ডিস্ট্রিক্ট মেডিকেল অফিসার হিসাবে যোগ দেন।  যুদ্ধকালীন সময়ে টাইফয়েড নিয়ে তিনি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন আর সেটাই তাকে প্ররোচিত করেছিল ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা করার জন্য। ভোলস্টাইনে থাকার সময়ই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা করেন, যা পরবর্তীতে তাকে প্রতিষ্ঠিত করে পৃথিবীর প্রথম সারির একজন বিজ্ঞান গবেষক হিসাবে। ভোলস্টাইনের মেডিকেল অফিসার হিসাবে প্রথম সে সমস্যাটা তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছিল সেটি ছিল গবাদী পশুর অ্যানথ্রাক্স। কিছুদিন আগেই অ্যানথ্রাক্সের সম্ভাব্য ব্যাকটেরিয়াটি আবিষ্কার করেছেন দুই ফরাসী ক্যাসিমির দাভাঁন এবং পিয়ের ফ্রাসোয়া রায়ে। কিন্তু প্রমাণ করা হয়নি এই ব্যাক্টেরিয়াটি আসলেই অ্যানথ্রাক্সের কারণ। রবার্ট কখ ঠিক সেই কাজটি করার জন্য গবেষণা শুরু করলেন। কিন্তু একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া সেই সময় এ ধরনের গবেষণা করার মত বৈজ্ঞানিক কোনো সরন্জ্ঞাম বা ল্যাবরেটরী তার ছিল না;  আশে পাশেও ছিল না কোনো লাইব্রেরী কিংবা অন্য কোনো গবেষকদের সাথে তার যোগাযোগ।

নিজের চার ঘরের বাসায় তিনি তার ল্যবরেটরী বানালেন এবং পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেই শুরু করলেন অ্যানথ্রাক্স নিয়ে গবেষণা। মাইক্রোস্কোপটি ২৮ তম জন্মদিনের উপহার হিসাবে দিয়েছিলেন তার স্ত্রী এমিলি ফ্রাটস।এছাড়া বাকী কিছু সরন্জ্ঞাম তিনি যোগাড় করেন নিজের খরচে। কখের উদ্দেশ্য ছিল বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা ফরাসী বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার করা ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস (Bacillus anthracis) আসলেই অ্যানথ্রাক্স রোগের কারণ। নিজের বানানো কাঠের সরু টুকরা দিয়ে কিছুদিন আগে অ্যানথ্রাক্সে মৃত একটি ভেড়ার প্লীহা থেকে সংগৃহীত রক্ত তিনি এক গ্রুপ ইদুরের শরীরের প্রবেশ করালেন, কিছুদিনের মধ্যেই সেই ইদুরগুলো মারা যায় অ্যানথ্রাক্সে। অন্য যে এক গ্রুপ ইদুরকে সুস্থ্য ভেড়ার প্লীহা থেকে সংগৃহীত রক্ত প্রবেশ করানো হয়েছিল, তিনি দেখলেন তাদের কোনো সমস্যা হলো না। এই পর্যবেক্ষণটি ইতিপুর্বে কিছু গবেষক, যারা দাবী করছিলেন অ্যানথ্রাক্স অসুখটি আক্রান্ত গবাদী পশুরে রক্তের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে, তা নিশ্চিৎ করল।  কিন্তু কখ সেখানেই থেমে গেলেন না।  তিনি আরো জানতে চাইলেন অ্যানথ্রাক্সের এই ব্যাকটেরিয়া যা কখনোই কোনো প্রানীর সংস্পর্শে আসেনি, তাদের যদি সুস্থ্য ইদুরে প্রবেশ করানো হয় তাহলে কি তাদের অ্যানথ্রাক্স হবে? এ জন্য তার দরকার বিশুদ্ধ ব্যাক্টেরিয়ার কালচার। এ কাজটি করতে তিনি একটি ষাড়ের চোখের ভিতরের তরল, যাকে বলে অ্যাকুয়াস হিউমার সেখানে এই ব্যাক্টেরিয়াটির বিশুদ্ধ কালচার (চাষ) করে সংগ্রহ করলেন। এই কালচারগুলোর ড্রইং এবং ছবি তুলে তিনি ব্যাক্টেরিয়াটির বংশবৃদ্ধি রেকর্ড করলেন।


অ্যানথ্রাক্সের জীবানুর স্ক্যানিং ইলেক্ট্রন মাইক্রোগ্রাফ; ছবি সুত্র

তিনিই প্রথম বারের মত দেখালেন এই কালচারের সময় যদি পরিস্থিতি প্রতিকুল হয় ( যেমন অক্সিজেনের ঘাটতি), এই ব্যাক্টেরিয়াগুলো খুব দ্রুত গোলাকৃতির স্পোর তৈরী করে এবং অবস্থা অনুকূলে আসলে আবার এই স্পোরগুলো থেকেই ব্যাক্টেরিয়া বেরিয়ে এসে আবার বংশবৃদ্ধি শুরু করে এবং এই ব্যাসিলাইগুলো যা আগে কোনো প্রাণির শরীরে ছিল না, তারা তারপরও সুস্থ্য ইদুরে অ্যানথ্রাক্স করতে সক্ষম। তার গবেষণার বিষয়টি তিনি দেখান ব্রেসলাউ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক ফার্ডিনান্দ কনকে; কন এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে পেরে তার সহকর্মী এবং প্যাথলজীর অধ্যাপক কনহাইমকে কখে’র গবেষণা দেখার ব্যবস্থা করে দেন। কখের গবেষণা তাদের খুবই বিস্মিত করে এবং তারা কখের গবেষণার বিষয়টি তাদের বোটানিক্যাল জার্নালে ১৮৭৬ সালে প্রকাশ করেন। কখ প্রায় সাথে সাথেই বিখ্যাত হয়ে যান। এর পরের চার বছর কখ তার টেকনিকগুলোকে আরো পরিশীলিত করেন; বিশেষ করে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখার জন্য কিভাবে স্লাইড ফিক্সিং, স্টেইনিং  করা যায় এবং ব্যাকরেটিয়ার ফটোগ্রাফি তোলার টেকনিকতো আছেই। এসময় তিনি ক্ষত’র সংক্রমনের কিছু গবেষণাও করেন।  ১৮৭৮ সালে অ্যানথ্রাক্স এর কারণ, এর বিস্তার এবং প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় বিষয়গুলো নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন তার মুল গবেষণা পত্রটি।

১৮৮০ সালে জার্মান ইম্পেরিয়াল হেলথ সার্ভিসে কখ যোগ দেবার পর তাকে গবেষণার জন্য প্রথম একটি ল্যাবরেটরী দেয়া হয় এবং কয়েকজন অ্যাসিস্ট্যান্ট। কখের অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং পরবর্তীতে তার ল্যাবে কাজ করা ছাত্ররা প্রত্যেকেই তাদের শিক্ষকের নাম আরো উজ্জ্বল করেছিলেন তাদের আবিষ্কারের মাধ্যমে  ( যেমন লয়েফলার, কিংবা গাফকি ও আরো অনেকে) । কখ জানতেন যে,  pure culture is the foundation for all research on infectious disease; এখানেই তিনি ব্যাক্টেরিয়ার বিশুদ্ধ কালচারের জন্য শক্ত বা সলিড মাধ্যম ব্যবহার আবিষ্কার করেন ( যেমন আলু), এবং পরবর্তীতে তার সহকারী পেট্রীর আবিষ্কার করা চ্যাপ্টা পাত্র ( পেট্রি ডিশ) মধ্যে আগার ব্যবহারটিকে পারফেক্ট করেন ((আগার ব্যবহারের টেকনিকটি প্রথম প্রস্তাব করেন ভ্যালথার হেস, তারই পোষ্ট ডক্টরাল ছাত্র; আগার হলো এক ধরনের শৈবালের কোষের দেয়ালে জমা হওয়া পলিস্যাকারাইড, এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্টের জন্যই এটি ল্যাবরেটরিতে ব্যাক্টেরিয়া কালচারের জন্য মিডিয়ার আদর্শ সলিডিফাইয়িং (জমাট বাধার) এজেন্ট হিসাবে ব্যবহৃত হয়, আগার ব্যবহার কিন্তু রান্না ঘরে ব্যবহার হয়ে আসছিল এশিয়াতে বহুদিন ধরেই ));  ্এই আগার প্লেট  আজো ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়া ব্যাক্টেরিয়াকে মাইক্রোস্কোপের নীচে শনাক্ত করার জন্য তিনি স্টেইনিং বা রং করার টেকনিকও আবিষ্কার করেন। তার এই সব কাজের ফলাফল হচ্ছে, বিশুদ্ধ কালচারের মাধ্যমে যে কোন প্যাথজেনিক ( রোগ সৃষ্টিকারী) ব্যাক্টেরিয়াদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়াটা সুগম হয়। এছাড়া কখ কোনো ব্যাক্টেরিয়াকে কোনো একটি রোগের কারণ হিসাবে শনাক্ত করতে হলে তার জন্য কিছু শর্ত বেধে দেন, যা পরিচিত কখের পষ্চুলেট (Koch`s postulate) হিসাবে। পরবর্তীতে ভাইরাস আবিষ্কার হলে, শর্তগুলোকে খানিকটা বদলানো হয়, যা পরিচিত Koch-Henle`s Postulate হিসাবে, শর্তগুলো এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৮৮০ র শুরুতে কখ যক্ষা বা টিউবারকিউলোসিস নিয়ে তার গবেষণা শুরু করেন। তখন বহু বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতে না যে এই রোগটি সংক্রামক ব্যাধি, যার কারণ কোনো রোগজীবাণু। কখ গিনিপিগের উপর গবেষণা করেছিলেন, ২৭১ বার চেষ্টা করে তিনি রোগটির কারণটি আবিষ্কার করেন।

১৮৮২ সালে কখ অসাধারণ পেশাগত জীবনে এটাই সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। ১৮৮২ সালের ২৪ শে মার্চ বার্লিন সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির একটি মিটিং এ উপস্থিত সবাইকে বিস্মিত করে ঘোষণা করেন যে, তিনি যক্ষা বা টিউবারক্যুলোসিস (TB) র জীবাণুটি খুজে পেয়েছেন। উপস্থিত দর্শকরা যারা ছিলেন তাদের কেউ কেউ স্মৃতিচারণ করেছিলেন,কখ যখন এটি ঘোষণা করেন দর্শকরা এতই বিস্মিত হয়েছিল, সম্পুর্ণ নীরবতা নেমে এসেছিল হলরুমে। দীর্ঘ একটি বক্তৃতায় দর্শকদের বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন তার গবেষণার প্রক্রিয়া, অসংখ্য পরীক্ষার বিবরন, সম্ভাব্য অন্যান্য ব্যাখ্যার বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদ। সম্মেলনে উপস্থিত দর্শকরা মন্ত্রমু্গ্ধ হয়ে কখের সেই ভাষণ শোনেন। এই আবিষ্কারটির মাধ্যমে যক্ষা রোগকে জয় করার জন্য মানুষের আসল সংগ্রামটির সূচনা হয়েছিল।

tb_culture
ছবি: Close-up of a Mycobacterium tuberculosis culture revealing this organism’s colonial morphology)

১৮৮২ সালেই রবার্ট কখ টিউবারকুল্যাস ব্যাসিলাস নিয়ে তার বিস্তারিত গবেষণা পত্রটি প্রকাশ করেন। যক্ষার এই জীবাণুটিকে খুঁজে বের করতে কখকে সাহায্য করে তার অসীম ধৈর্য্য;  যক্ষার জীবাণু যা এখন Mycobacterium tuberculosis নামে পরিচিত, খুব ধীর গতিতে বংশ বৃদ্ধি করে। ধৈর্য্যহীন কোনো গবেষক সহজে যেখানে হাল ছেড়ে দিতেন, সেখানে কখ অপেক্ষা করেছেন তার কালচার মিডিয়ায় ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হবার জন্য। কখের পদ্ধতি অনুসরণ করে এর পরবর্তী ২১ বছরে আরো ২১ টি গুরুত্বপূর্ণ রোগ জীবাণু আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানীরা। যাদের মধ্যে কখ সহ, তার অনেক ছাত্রও আছেন। প্রতি বছর ২৪ শে মার্চ কখের এই আবিষ্কারের সন্মানে দিনটিকে WHO পরবর্তীতে চিহ্নিত করে World TB Day হিসাবে।


যক্ষার জীবাণুর স্ক্যানিং ইলেক্ট্রন মাইক্রোগ্রাফ (ছবি সুত্র)

যক্ষার জীবাণু নিয়ে কাজ করার সমযেই ১৮৮৩ সালে জার্মান কলেরা কমিশনের প্রধান হয়ে মিশরে যান তিনি, একটি কলেরার মহামারী তদন্ত করতে। এখানেই তিনি কলেরার জীবাণু আবিষ্কার করেন এবং এর একটি বিশুদ্ধ কালচার জার্মানীতে নিয়ে আসেন। কখ ভারতবর্ষেও কলেরা নিয়ে গবেষণা করে ছিলেন। ১৮৯২ সালে হামবুর্গে কলেরা মহামারীর অভিজ্ঞতার আলোকে এই জীবাণুর প্রকৃতি এর বিস্তারের উপায় এবং কলেরা মহামারীর প্রতিরোধের সংক্রান্ত তার প্রস্তাবগুলো ১৮৯৩ সালে ড্রেসডেনে তৎকালীন পরাশক্তিদের একটি সভায় গৃহীত হয় ( গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরী ও ইতালী); যে প্রস্তাবগুলো আজো ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পরবর্তীতে যা পানি সরবরাহ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রচনা করেন। কলেরা সংক্রান্ত তার এই গবেষণার জন্য তাকে বিশেষ পুরষ্কার দেয়া হয় ( যার মূল্য সেই সময়ে প্রায় ১ লক্ষ জার্মান মার্ক)।


কলেরার জীবানুর ফলস কালার ট্রান্সমিশন ইলেক্ট্রন মাইক্রোগ্রাফ (ছবি সুত্র)

১৮৮৫ সালে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে হাইজিনের অধ্যাপকের দায়িত্ব নেন কখ। পরে ১৮৯১ সালে Royal Prussian Institute for Infectious Diseases (১৯৯৪ সালে যার নাম হয় রবার্ট কখ ইন্সস্টিটিউট) এর পরিচালক হন, এখানে ছিলেন তিনি ১৯০৪ সাল পর্যন্ত। এখানে সহকর্মী হিসাবে পেয়েছিলেন পল এরলিখ, এমিল ভন বেরিং এবং কিটাসাটোর মত অসাধারণ বিজ্ঞানীদের। এখানে আবার তিনি যক্ষার জীবাণু নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি শরীরে যক্ষা রোগের ভয়াবহতা বিস্তার রোধের জন্য একটি চিকিৎসা আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন, যক্ষার ব্যাক্টেরিয়ার কালচার থেকে তিনি তৈরী করেন টিউবারকুলিন। এই সময়টায় কখ বেশ বিতর্কিত হয়ে পড়েন তার টিউবারকুলিন চিকিৎসা নিয়ে। মেডিকেল কংগ্রেসে তার ঘোষণার পর বহু মানুষ বার্লিনে ভীড় জমায় যক্ষার চিকিৎসার জন্য। এছাড়া টিউবারকুলিনের কম্পোজিশন গোপন রেখেছিলেন তিনি। বেশ কিছু অটোপসিতে অনেক বেশী ইনফ্লামেশন দেখার পর তার সহযোগী বিজ্ঞানীরা চাপ দেন এর গঠনটি প্রকাশ করতে। কিন্তু রিপোর্টটি অস্পষ্টতায় আরো বেশী সমালোচনার মুখে পড়েন কখ। এই সময়টাতে তার ব্যক্তিগত জীবনেও কিছু স্ক্যান্ডাল ঘটে, প্রথম স্ত্রীকে ডিভোর্স করে তিনি বিয়ে করেন তার চেয়ে ৩০ বছরের ছোট একজন অভিনেত্রীকে।

জার্মান সরকার কিন্তু কখ কে সহায়তা করে গেছে তার দুঃসময়ে। Royal Prussian Institute for Infectious Diseases এর পরিচালক পদটি তারই ছিল। এখানে তিনি তার সহযোগীদের নিয়ে তার পুরোনো টিউবারকুলিনের ডোজ বদলে নতুন টিউবারকুলিন তৈরী করেন কিন্তু তিনি যেরকম আশা করেছিলেন ফলাফল তেমন হয়নি, তবে পরে তার তৈরী নতুন টিউবারকুলিন চিকিৎসার ক্ষেত্রে না হলেও রোগ শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল পরবর্তীতে। বিষয়টি তার হারানো সন্মান পুনোরোদ্ধারে সহায়তা করে। এর পরপরই আসে ১৮৯২ সালে হামবুর্গে কলেরা মহামারী। এসময় মহামারী নিয়ন্ত্রণে তার পদ্ধতি চ্যালেজ্ঞ করে বেশ কিছু প্রভাবশালী জার্মান বিজ্ঞানী। কিন্তু কখ সব সমালোচনা উপেক্ষা করে তার কাজ করে যান। পরবর্তীতে তার প্রস্তাবই মেনে নেয়া হয় ড্রেসডেনের সন্মেলনে।

১৮৯৬ সালে কখ দক্ষিন আফ্রিকা যান গবাদী পশুর রিন্ডারপেষ্ট (পরবর্তী এর কারণ রিন্ডারপেষ্ট ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে) কারণ অনুসন্ধান করতে। তিনি অবশ্য কারণ আবিষ্কার করতে পারেননি, তবে অসুস্থ্য পশুর পিত্ত  তিনি সুস্থ্য গবাদী পশুদের শরীরে ইনজেক্ট করে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। কখ এর পর ভারত, আফ্রিকায় ম্যালেরিয়া, প্লেগ নিয়ে গবেষণা করেন। ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন তিনি ইতালীতে। এসময়টাতে মানুষের এবং গরুর ( বোভাইন) টিউবারকুলোসিস এর জীবাণু যে এক নয় এই সিদ্ধান্তে পৌছান, ১৯০১ সালে লন্ডনে ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কংগ্রেস অন টিউবারকুলোসিস তার এই বক্তব্য বেশ বিতর্কের জন্ম দেয়, এখন অবশ্য আমরা জানি কখ ঠিকই ধারণা করেছিলেন। টাইফাস নিয়েও তিনি গবেষণা করেছিলেন, তার গবেষণা সেই সময়ে সম্পুর্ন নতুন একটি ধারণার জন্ম দেয়, এই অসুখটি মানুষ থেকে মানুষেই বিস্তার লাভ করে, কারণ তখন মনে করা হতো পানি থেকে এই রোগটি ছড়াচ্ছে। রোগটির নিয়ন্ত্রণের প্রথম সুত্রপাত ঘটে এর মাধ্যমে।

নিজের ছাত্রর উপর Institute for Infectious Diseases এর পরিচালকের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ১৯০৪ সালে ডিসেম্বরে কখ জার্মান পুর্ব আফ্রিকায় (বর্তমান বুরুন্ডি, তানজানিয়া) আসেন গবাদী পশুদের ইষ্ট কোষ্ট ফিভার (theileriosis) নিয়ে গবেষণা করার জন্য। তিনি শুধু এই রোগটি নয় আরো কয়েকটি রোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা করেন এসময়, যেমন ব্যাবেসিয়া, ট্রিপ্যানোসেমা এবং টিক বাহিত স্পাইরোকিটোসিস। জার্মানীতে ফিরে আসার পরও তিনি এই জীবাণুগুলো নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান।

জীবদ্দশাতেই রবার্ট কখ অসংখ্য সন্মানে ভূষিত হন। ১৯০৫ সালে মেডিসিনে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয় তাকে। এছাড়া জার্মানী অর্ডার অব দি ক্রাউন এবং গ্র্যান্ড ক্রশ অব দি রেড ঈগল  (কোন চিকিৎসা বিজ্ঞানীকে সেবারই প্রথম দেয়া হয়), এছাড়া রাশিয়া, তুরস্ক থেকে সর্বেোচ্চ বেসামরিক পদকও পেয়েছিলেন। বিশ্বব্যাপী অসংখ্য সোসাইটি এবং অ্যাকাডেমীর সদস্য ছিলেন তিনি। তার নামে জার্মান সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে রবার্ট কখ পুরষ্কার, প্রতি বছর বায়োমেডিকেল গবেষণায় বিশেষ অবদান রাখার জন্য যা একক বা যৌথভাবে এই পুরষ্কার দেয়া হয়।


বার্লিনে রবার্ট কখের মেমোরিয়াল (ছবি ইন্টারনেট)

১৯০৬ সালে কখ আবার আফ্রিকায় ফিরে যান হিউম্যান ট্রাইপ্যানোসোমিয়াসিস ( আফ্রিকান স্লিপিং সিকনেস) এর উপর গবেষণা করতে, সেখানে তিনি দেখান যে কুইনাইন যেমন ম্যালেরিয়ায় কাজ করে তেমনি অ্যাটোক্সিল কাজ করে স্লিপিং সিকনেসে।  এর পরের বছর গুলোতে তিনি রোগ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত গবেষণা কমিয়ে আবার তার প্রিয় ব্যাক্টেরিয়া এবং সেরোলজী নিয়ে কাজ শুরু করেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ব্যস্ত ছিলেন গবেষণায়। কাজ প্রিয় এই  মানুষটি পৃথিবীর নানা দেশে ভ্রমন করতে ভালোবাসতেন, তার বিশেষ ইন্টারেষ্ট ছিল প্রত্নতত্ত্বে। মেয়ে গারট্রুডকে ভালোবাসতেন খুব।

১৯১০ সালে মে মাসের ২৭ তারিখ, ৬৬ বছর বয়সে বাডেন-বাডেনে হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু বরণ করেন এই  অসাধারণ বিজ্ঞানী।


রবার্ট  কখ এর স্মরণে কয়েকটি দেশের ডাকটিকিট। সুত্র: ইন্টারনেট

Advertisements
রবার্ট কখ এর ব্যাসিলাই

7 thoughts on “রবার্ট কখ এর ব্যাসিলাই

    1. 🙂

      কখ একটা ডায়রী মেইনটেইন করতেন; সেখানেই লেখা ছিল কথাটা। কখ নিজেও তো জিনিয়াস ছিলেনই, কিন্তু ‍তার এই ক্ষেত্রে তার উৎসাহটা এসেছিল তার শিক্ষক জ্যকব হেনলে থেকে। যে কোন ডাক্তারের মতই জীবনটা কাটাতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি। তিনি নিজেও খুব অসাধারন শিক্ষক ছিলেন, তার ল্যাবে কাজ করা সব ছাত্রই পরে অনেক অবদান রেখে গেছেন । উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে তিনি ছিলেন খুবই প্রভাবশালী একজন বিজ্ঞানী। তার ব্যাক্তিত্ব নিয়ে কিছু্ই লেখা সম্ভব হলোনা এই ছোট লেখায়। সেই সময় তার মত আরেকজন ব্যাক্তিত্ব ছিল লুই পাস্তুর; দুজনের মধ্যে বেশ প্রতিদ্বন্দীতা ছিল। মাইক্রোবায়োলজীতে দুজনের অ্যাপ্রোচ ছিল ভিন্ন।মানুষের কল্যানে তাদের অবদান ভুলবার মত নয়।

  1. স্কুল আর কলেজের বায়োলজি বইয়ে অনেকবার জীবাণুগুলো পড়েছিলাম। আজ সেগুলোর আবিষ্কারককে জানলাম কিছুটা। দারুণ একটা adventure এর মত শুনালো তাঁর জীবনের গল্পটা। আজও আমরা তাঁর সুফল পাচ্ছি, পেয়ে যাব। ধন্যবাদ তাঁর স্ত্রী এমিলিকেও যিনি রবার্টের ২৮তম জন্মদিনে মাইক্রোস্কোপটা উপহার দিয়েছিলেন, একটা বড় প্রেরণা হয়ে ছিল নিশ্চয়ই পরবর্তী কাজের জন্য…

    সামনে একদিন লুই পাস্তুরকে নিয়েও লেখা পড়বো আশা করি।

  2. কখের ব্যক্তিত্ব নিয়ে নিশ্চয়ই আরো একটা লেখা পাবো। টিউবারকুলিন যে কখেরই আবিষ্কার – জানতাম না। ভেবেছিলাম তুলনামূলক পরের সময়ে এটির উদ্ভাবন হয়েছে। যথারীতি চমৎকার একটা পোস্ট। ভালো থাকুন।
    +++++

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s