লাভোরাঁ’র হিমঅ্যামিবোমা


শীর্ষছবি: আমাদের রক্তের লোহিত রক্ত কনিকার (লাল) মধ্যে ম্যালেরিয়ার পরজীবি Plasmodium falciparum (হাই পাওয়ার ম্যাগনিফিকেশনে); যে ছয়টি ম্যালেরিয়ার পরজীবি মানুষের ম্যালারিয়ার কারন তার মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়ানক।  লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যে ঢুকে এরা হিমোগ্লোবিনকে খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে এবং বংশবৃদ্ধি করে।একসময় কোয়ের পর্দা ছিড়ে বের হয়ে আসে অন্য লোহিত রক্ত কনিকাকে আক্রমন করতে। (ছবি: Lennart Nilsson/ National Geographics)

“…With tears and toiling breath,
I find thy cunning seeds,
O million-murdering Death.”
(fragment of poem by Ronald Ross, written in August 1897, following his discovery of malaria parasites in anopheline mosquitoes fed on malaria-infected patients)

 His writings are a model of clarity and completeness: every sentence is precise and unambiguous. His manner was like his writing – to the point, exact and decisive. He was regarded with affection and admiration by all who came into contact with him. Ronald Ross  in Laveran’s obituary (1923).

আমার কিছু কথা: যারা বিজ্ঞানের ইতিহাস ভালোবাসেন, তারা হয়তো আমার মতই কোন কিছুর সম্বন্ধে পড়তে গেলে, তার ইতিহাসটা জানতে তীব্র একটা আগ্রহ বোধ করেন। ম্যালেরিয়ার রোগের কারন যে পরজীবি, সেটির সম্বন্ধে আমি প্রথম পড়ি মেডিকেল কলেজে তৃতীয় বর্ষে, এরপর যখন চিকিৎসা অনুজীব বিজ্ঞানে পড়েছি তখন আরো একবার। সহস্র বছর ধরে মানুষের পরিচিত এই রোগটির জীবানু যিনি খুজে পেয়েছিলেন তার সম্বন্ধে জানার একটা বাড়তি কৌতুহল ছিল। ছাত্র ছাত্রীদের মাইক্রোবায়োলজী টিউটোরিয়ালে বিশেষ করে ম্যালেরিয়ার পরীক্ষা নেবার সময় আমি মাঝে মাঝেই জানতে চাইতাম, তারা কি জানে ম্যালেরিয়ার এই পরজীবিটাকে কে প্রথম খুজে পেয়েছিলেন; অবশ্য এই প্রশ্নের উত্তর তাদের না জানলেও কোন ক্ষতি নেই; আমার ব্যক্তিগত ইন্টারেষ্ট থেকেই শুধু বলতাম। তবে ম্যালেরিয়ার একটা আবিষ্কার মোটামুটি সবারই পরিচিত, সেটা হলো স্যার রোনাল্ড রস এর, যিনি ম্যালেরিয়ার জীবানুর বিস্তারের সাথে মশার সম্পর্কটি খুজে বের করেছিলেন। কিন্তু রসের আবিষ্কারের প্রায় দুই দশক আগেই কিন্তু এই পরজীবি প্রোটোজোয়াটা আবিষ্কার করেছিলেন ফরাসী চিকিৎসক শার্লে লুই আলফোঁস লাভোরাঁ, আর এই আবিষ্কারের সাথেই প্যারাসাইটোলোজীর একটা বড় অংশ প্রোটোজুয়োলজীর বিশাল ক্ষেত্রটি উন্মোচিত হয়। ক্যারিয়ারের শুরুতে এত বড় আবিষ্কার করার পরও, তাকে এটি প্রতিষ্ঠিত করতে সংগ্রাম করতে হয়েছে বহুদিন, এমনকি নিজের দেয়া প্রথম নামটাও প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি নানা কারনে। ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পেলেও বহুদিন  ছিলেন গবেষনা থেকে দুরে। অভিমান করে সামরিক বাহিনীর চাকরী ছাড়ার পর পরই, সেই প্রথম আবিষ্কারের প্রায় ২৭ বছর পর মনের মত করে স্বাধীনভাবে গবেষনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন, সেই সময়টাতে তিনি আরো কিছু পরজীবি প্রোটোজোয়া নিয়ে অসাধারন কিছু কাজ করেন। তার কাজের সুফল আমরা এখনো পাচ্ছি। ব্যক্তিজীবনে ভীষন নীতিবান এই দেশপ্রেমী মানুষটি নোবেল পুরষ্কারের প্রায় পুরো টাকা খরচ করেছিলেন পাস্তুর ইনস্টিটিউটের একটি ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ল্যাবরেটরী বানাতে।  নীচের লেখাটায় আমি ম্যালেরিয়ার  ইতিহাসের কিছু মাইলস্টোনও ছোবার চেষ্টা করেছি আলাফোঁস লাভোরাঁর জীবনের প্রেক্ষাপটে।

পিবিএফ ফর এম পি ( PBF for MP) অথবা শুধু ভুমিকা:

ঢাকা মেডিকেল কলেজে মাইক্রোবায়োলজী বিভাগে যখন কাজ করতাম, তখন ছাত্র পড়ানো ছাড়াও আমাদের একটা বাড়তি কাজ ছিল হাসপাতালের নানা ধরনের ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজীর নমুনায় ডায়াগনষ্টিক টেষ্টগুলোতে সাহায্য করা ( যেটুকু সরকারী একটা হাসপাতালে করা সম্ভব); এর মধ্যে সবচেয়ে পরিশ্রম সাধ্যটি কাজ ছিল মা‌ইক্রোস্কোপের নীচে ম্যালারিয়ার পরজীবির অস্তিত্ব খুজে বের করা। তখনও ম্যালেরিয়ার ডায়াগনিষ্টক টেষ্টে অপেক্ষাকৃত সহজসাধ্য RDT( বা Rapid Diagnostic Test) টেষ্টগুলোর আগমন ঘটেনি। তাছাড়া রোগীর রক্তে ম্যালারিয়ার পরজীবির অস্তিত্ব সরাসরি দেখা তখন তো বটেই, এখনও এই রোগের ডায়াগনোসিসের সুবর্ন মানদন্ড (প্রফেশনাল ভাষায় গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড); যখন কোন রোগীর উপসর্গ এবং লক্ষণ দেখে মনে করা হয় রোগীর ম্যালেরিয়া হতে পারে বা সম্ভাব্য ডায়াগনোসিসের তালিকা থেকে ম্যালেরিয়াকে বাদ দেবার চিন্তা করা হয়, তখন রোগীর রক্তে ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইট শনাক্ত করার টেস্টটি করা হয় হয়। রোগীর শরীরে তাপমাত্রা যখন খুব বেশী থাকে ( জ্বর) তখন তার শরীর থেকে এক ফোটা রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এই এক ফোটা রক্ত একটি কাচের স্লাইডের উপর রেখে খুবই পাতলা একটি লেয়ার তৈরী করা হয় ( থিন ফিল্ম, থিক ফিল্মও তৈরী করা হয়, তবে দুটোর উদ্দেশ্য আলাদা); তারপর এটি কিছুক্ষন বাতাসে শোকানো হয়। ঠিক এই অবস্থায় যদি আমরা এটিকে মাইক্রোস্কোপের নীচে দেখি, রক্তের কোষগুলোকে চিনতে পারবো, কিন্তু বিশেষ করে শ্বেত রক্ত কনিকাদের ( White Blood Cell, WBC) যারা বেশ কয়েক ধরনের হয় (যেমন, নিউট্রোফিল, ইয়োসিনোফিল, লিম্ফোসাইট ইত্যাদি), তাদের আলাদা করে চিনতে পারবো না। এ অবস্থাতে সহজে চেনা যায় লোহিত রক্ত কনিকাদের (Red Blood Cell,RBC), যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আমাদের রক্তে। এই লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যেই ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইটটি খুজে পাওয়া যায়। কিন্তু  সেটা করতে হলে আমাদের আরেকটি প্রক্রিয়া সাহায্য নেই, যার নাম ডিফারেন্টশিয়াল স্টেইনিং ( বা সেই ব্লাড ফিল্মটি এমন ভাবে রং করা, যাতে কোষের বিভিন্ন অংশ তাদের রাসায়নিক প্রকৃতি অনুযায়ী ,যে মিশ্র রংটি  ব্যবহার করছি, তার ভিন্ন ভিন্ন উপাদানে ভিন্ন ভিন্নভাবে রন্জ্ঞিত হয়); কোন প্যাথলজিক্যাল নমুনা ( এখানে যেমন রক্ত) কে এভাবে স্টেইন করার প্রক্রিয়ার নাম রোমানভস্কি (Romanowski) স্টেইনিং টেকনিক।

১৮৯১ সালে রুশ চিকিৎসক দমিত্রি লিওনিডোভিচ রোমানভস্কি এটি আবিষ্কার করেছিলেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার। এই টেকনিকটি আসার পর মাইক্রোস্কোপের নীচে নানা ধরনের রোগ ডায়াগনসিসের পথটা সুগম হয়। এই টেকনিকটাকে ব্যবহার করেই আরো বেশ কিছু কার্যকরী স্টেইন আবিষ্কার হয়েছে, যেমন জিয়েমসা ( Gustav Giemsa), রাইট (James Homer Wright) ইত্যাদি। এছাড়া আছে পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত লেইশম্যান স্টেইন। এই স্টেইনটিও প্রায় রোমানভস্কি স্টেইনিং টেকনিকের মতই, শুধু খানিকটা ভিন্ন রুপের, স্কটিশ প্যাথলজিষ্ট এবং ব্রিটিশ আর্মির একজন মেডিকেল অফিসার, স্যার উইলিয়াম বুগ লেইশম্যান ১৯০০ সালে তিনি ম্যালেরিয়ার জীবানু সহ আরো কিছু পরজীবি মাইক্রোস্কোপের নীচে ভালো করে দেখার জন্য  মিথাইলীন ব্লু (Methylene blue) এবং ইয়োসিন (Eosine) এর মিশ্রনে একটি স্টেইন তৈরী করেন, যা পরিচিত Leishman’s stain  নামে। লেইশম্যান এর আরো একটি পরিচিতি আছে, তিনি প্রথম মানুষের শরীরে কালাজ্বরের (যে অসুখের নামও Leishmaniasis) জীবানু শনাক্ত করেন, চার্লস ডোনোভানও স্বতন্ত্র ভাবে আবিষ্কার করেছিলেন এই জীবানু, আজো আক্রান্ত রোগী শরীরে কোষের মধ্যে  কালাজ্বরের পরজীবির যে রুপটি পাওয়া যায় তাকে বলা হয় LD body বা Leishman Donovan Body; দুজনই ভারতবর্ষে কাজ করেছিলেন। পরবর্তীতে ভারতবর্ষে কাজ করা আরেকজন বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্যার রোন্যাল্ড রস লেইশমেনিয়ার কাজের এত ভক্ত ছিলেন যে কালা জ্বরের জীবানুর জেনাসটি নাম করেন লেইশম্যানিয়া। রক্তের ফিল্ম এবং ম্যালেরিয়া পরীক্ষার জন্য অন্যতম উপযুক্ত স্টেইনটি হলো লেইশম্যান স্টেইন।

এবার সেই ব্লাড ফিল্মটিকে ভালো করে স্টেইন এবং শুকিয়ে মাইক্রোস্কোপের নীচে রেখে খোজা হয় ম্যালেরিয়ার জীবানু। দেখার সময় ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিষ্ট সাধারনত: উচু মানের ম্যাগনিফিকেশন লেন্স ব্যবহার করেন। এবং লেন্সের সাথে স্লাইডের মধ্যে আলোর প্রতিসরণকে নিয়ন্ত্রন করে আরো ভালো দেখার জন্য ব্যবহার করা হয়, পাতলা একটা তেলের লেয়ার (Oil immersion lens)। অনেকগুলো ফিল্ড পরীক্ষা ( কখনো হাই পাওয়ার বা লো পাওয়ার লেন্স পালাক্রমে ব্যবহার করে) করে খোজা হয় লোহিত রক্ত কনিকায় ম্যালেরিয়া প্যারাসাইটের অস্তিত্ব। কাজটা যতই পরিশ্রম সাধ্য বা ধৈর্য্যর কাজ হোক না কোন লেইশম্যান স্টেইনের কারনে নিউক্লিয়াসবীহিন লোহিত রক্ত কনিকার গোলাপী রঙের সাইটোপ্লাজমের মধ্যে বেগুনী বা পার্পল রঙের নানা ফর্মের ম্যালেরিয়া পরজীবি প্রোটোজোয়াটি খুব সহজে আর ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিষ্টদের চোখ এড়াতে পারেনা। এখন যদি কোন ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজিষ্টকে বলা হয় আপনি স্টেইন না করা রক্তের ফিল্মে প্যারাসাইট খুজে বের করুনতো, তাও আবার কম ম্যাগনিফিকেশনের শুকনো লেন্সে (  Oil immersion lens না ব্যাবহার করেই )? আমার মনে হয় কেউ এই চ্যালেন্জ্ঞটা নিতে রাজী হবে।  ১৮৮০ সালের ৬ ই নভেম্বর আলজেরিয়ার বোন (Bone) শহরে ঠিক এই কাজটি করেছিলেন ফরাসী আর্মির মধ্য ত্রিশের একজন ডাক্তার। প্রথম বারের মত ম্যালারিয়ার জীবানু প্লাজমোডিয়াম প্যারাসাইট খুজে পেয়েছিলেন শার্লে লুই আলফোঁস ল্যাভোরাঁ (Charles Louis Alphonse Laveran)।


সরাসরি কোন রক্তের স্লাইড মাইক্রোস্কোপের নীচে রাখলে যেমন দেখা যায়। ্ এখানে যে কোষগুলো দেখা যাচ্ছে সেগুলো লোহিত রক্ত কনিকা (Red Blood Cell)


লেইশম্যান স্টেইন করা ব্লাড ফিল্মে লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যে বেগুনী রঙের ম্যালারিয়া প্যারাসাইটের বিভিন্ন ফর্ম দেখা যাচ্ছে।

শার্লে লুই আলফোঁস ল্যাভোরাঁ র Oscilliaria malariae :


শার্লে লুই আলফোঁস লাভোরাঁ  (Charles Louis Alphonse Laveran- 18 June 1845 – 18 May 1922) (সুত্র: ইন্টারনেট)

১৮৪৫ সালে ১৮ জুন প্যারিসে লাভোরাঁ জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা থিওডোর লাভোরাঁও  ছিলেন একজন  ফরাসী সামরিক বাহিনীর স্বনামখ্যাত চিকিৎসক। লাভোরাঁর ছোটবেলার বেশ কিছু সময় কেটেছিল তার বাবার কর্মস্থল আলজেরিয়ায়। বাবার মতই চিকিৎসাবিজ্ঞানকে পেশা হিসাবে বেছে নেন তিনি। ১৮৬৭ সালে স্ট্রাসবুর্গের I’ Ecole du Service de Sante Militaire থেকে পাশ করেন। তার গ্রাজুয়েজন থিসিসের বিষয় ছিল স্নায়ু বা নার্ভের রিজেনারেশণ প্রক্রিয়া । ১৮৭০ সালে কিছুদিনের মধ্যে ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ার যুদ্ধ শুরু হলে লাভোরাঁ সেনাবাহিনীতে সক্রিয় হয়ে পড়েন। সামরিক মেডিকেল সার্ভিসের অ্যাসিস্টেন্ট মেজর লাভোরাঁর প্রথম পোস্টিং হয় অ্যাম্বুলেন্স অফিসার হিসাবে ফ্রান্সের মেস (Metz) শহরে। এখানেই যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে তিনি অংশ নেন। যুদ্ধ শেষে প্রথমে লিল (Lille) হাসপাতালে পরে সঁ মার্তা হাসপাতালে কাজ করেন। ১৮৭৪ সালে ফরাসী সামরিক বাহিনী তাকে Professor Agrege des Maladies et Epidemies des Armees নিযুক্ত করেন, যে পদটিতে একসময় তার পিতাও কাজ করেছিলেন। এই পদটি তিনি প্রতিযোগিতা মুলক পরীক্ষায় জয়ী হয়ে অর্জন করেছিলেন।

১৮৭৮ সালে এই পদের মেয়াদকাল শেষ হলে, ৩৩ বছর বয়সী এই ‘Medecin-major de 1re Classe কে পোস্টিং দেয়া হলো আলজেরিয়ার উত্তরপুর্বাঞ্চলের শহল বোন (Bône, বর্তমান নাম আন্নাবা,Annaba)এ অবস্থিত একটি মিলিটারী হাসপাতালে।  এখানে তিনি প্রথম সুযোগ পেলেন পারনিসিয়াস (যে ম্যালেরিয়াটি ভয়ানক, মৃত্যুর হার অনেক বেশী) ম্যালারিয়ায় মৃত রোগীদের অটোপসি বা মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে মৃত্যুর কারন খুজে বের করার। মেকল এর মত তিনিও এসব রোগীদের যকৃত, প্লিহা, ব্রেন সহ নানা আভ্যন্তরীন অঙ্গে পিগমেন্ট (রন্জক পদার্থ) খুজে পান। আমরা এখন জানি এই পিগমেন্টটি আসলে হিমোজোয়াইন (Hemozoin) এর ক্রিষ্টাল;  এটা মুলত: ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইটদের একটি বর্জ্য পদার্থ।এই পরজীবিটি আমাদের লোহিত রক্ত কনিকার মধ্যে ঢুকে হিমোগ্লোবিনকে তাদের খাদ্য হিসাবে গ্রহন করে, কিন্তু এরা হিম (heme) বা আয়রন সহ অংশটি ব্যবহার করতে পারেনা, এবং কোষের মধ্যে প্রচুর পরিমান হিম তৈরী হয়, কিন্ত হিম আবার কোষের জন্য বিষাক্ত,  সেকারনেই ম্যালেরিয়ার পরজীবি  এই বিষাক্ত হিমকে একটি অদ্রাব্য এবং রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় ক্রিষ্টালে পরিনত করে যার নাম হিমোজোয়াইন (এই প্রক্রিয়াটাকে বলে বায়োক্রিষ্টালাইজেশন)।

স্প্লীন (spleen)  বা প্লীহা থেকে সংগ্রহ করা রক্তের নমুনার একটি স্লাইডে, তিনি মাইক্রোস্কোপে নীচে এই ক্রিষ্টালগুলোকে আলাদা বা মুক্তভাবে রক্তের মধ্যে এবং এমনকি শ্বেত রক্ত কনিকার মধ্যেও দেখেন, এছাড়া গোলাকৃতির কাচের মত (hyaline) স্বচ্ছ কিছু কোষ, ক্রিসেন্ট ( বাকা চাদ বা কাস্তে আকৃতির অদ্ভুত কিছু কোষ দেখেন। তার রেকর্ড অনুযায়ী  ১৮৮০ এর ৬ নভেম্বর, একজন তরুন সৈন্যর রক্তে তিনি প্রথম একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেন,  এই গোলাকৃতির পিগমেন্ট সহ কোষের প্রান্তগুলো বিচিত্রভাবে নড়াচড়া করছে। তিনি খুব ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেন এই প্রান্তগুলো আসলে লম্বা সুতার ফিলামেন্ট যা নাড়া চাড়া করছে। এই ফিলামেন্ট বা ফ্লাজেলার মত নাড়াচাড়া দেখে লাভোরাঁ সাথে সাথে বুঝতে পেরেছিলেন তিনি ম্যালেরিয়ার পরজীবিটাকে খুজে পেয়েছেন  এবং এই পিগমেন্টসহ কোষ বা সিস্টটি আসলে ম্যালেরিয়ার প্যারাসাইট বা পরজীবি, ডিজেনেরেট (প্রায় নষ্ট) হয়ে যাওয়া কোন লোহিত রক্ত কনিকা না। এই কোষটির দেহ থেকে মাঝে মাঝে বের হয়ে আসা যে সুতার মত বা ফিলামেন্টগুলো বের হয়ে আসছে এবং আশে পাশের লোহিত রক্ত কনিকাদের নাড়াচাড়া করছে, তারা দেখতে ফ্লাজেলার মত আর এগুলো এবং এরসাথে ছোট সিস্টের মত কোষটি নিশ্চয়ই এই রোগের কারন । এখন আমরা জানি সেদিন লাভোরাঁ যেটা দেখেছিলেন সেটি ছিল আসলে ম্যালেরিয়া পরজীবির পুং গ্যামেটোসাইটের একফ্ল্যাজেলেশন প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়াটি ১৮৯৭ সালে আবিষ্কার করেছিলেন ক্যানাডার এক চিকিৎসা বিজ্ঞানী  জর্জ উইলিয়াম ম্যাককালাম (ম্যাককালাম এই আবিষ্কারটি যখন করেছিলেন তখন কিন্তু তিনি কেবল মেডিকেল কলেজ শেষ করেছেন এবং এক সামার ভ্যাকেশনে বাড়ীতে  ডাক্তার বাবার ল্যাবে বসে পাখির শরীরের রক্ত পরীক্ষা করার সময়। পরে বাল্টিমোরে তার আলমা ম্যাটের জন হপকিন্স বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসার পর মানুষের ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে একই প্রক্রিয়া দেখা যায় তা প্রমান করেন। যা ম্যালেরিয়ার পরজীবির জীবন চক্রের দীর্ঘদিনের একটি রহস্য সমাধান করেছিল);

এখানে একটা জিনিস মনে রাখা দরকার, লাভোরাঁ কিন্তু সরাসরি বা কোন স্টেইন ছাড়া ফ্রেশ ব্লাড ফিল্ম এ ম্যালেরিয়ার পরজীবি দেখেছিলেন (তখনওরুশ চিকিৎসা বিজ্ঞানীর রোমানভস্কির স্টেইনিং টেকনিক আবিষ্কার হয়নি), এছাড়া লেন্সের পাওয়ার (১/৬”), যার ম্যাগনিফিকেশণ বড়জোর ৪০০ ডায়ামিটার এবং ড্রাই লেন্স ব্যবহার করে। স্পষ্টতই তার চোখের দৃষ্টি এবং সুক্ষ পর্যবেক্ষন ক্ষমতাকে প্রশংসা না করে উপায় নেই।

লাভোরাঁ তার আবিষ্কারটি ১৮৮০ সালের ২৩ নভেম্বর Academie de Medecine in Paris একটি সংক্ষিপ্ত রিপোর্টের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশ করেন। পরবর্তী বছরে বোন এবং পরে কনস্টান্টিনে প্রায় ২০০ ম্যালেরিয়ার রোগীর  ১৪৮ জনের রক্তে এই পরজীবি তিনি খুজে পান, এবং তিনি  এই পরজীবিকে ম্যালেরিয়ার কারন হিসাবে চিহ্নিত করে নাম দেন Oscilliaria malariae;  খুব অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আলজেরিয়ার ফিলিপ্পিভিলে (বর্তমান নাম স্কিকদা) তার এক সহযোগী চিকিৎসক  ই রিচার্ড ,লাভোরাঁ র পরজীবিটাকে দেখতে পান।

স্বীকৃতির অপেক্ষায়:

তার আবিষ্কার কিন্তু সাথে সাথে গৃহীত হয়নি। সুবিখ্যাত সব ব্যাক্টেরিওলজিষ্ট দের প্রভাবে থাকা চিকিৎসা বিজ্ঞান বার বার প্রমান দেয়া সত্ত্বেও তার আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিতে সময় নিয়েছিল অনেক। ১৮৮১ সালের ২৪ অক্টোবরে তিনি তার গবেষনার বিস্তারিত বিবরন প্রকাশ করেন Academie des Sciences এ, কিন্তু তার দাবী কৃত পরজীবিটাই যে ম্যালেরিয়ার কারন সেটা তখনও মেনে নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীরা। লাভোরাঁ চাইলেন তার আবিষ্কারের পক্ষে প্রমান দিতে  ইউরোপে গিয়ে। ১৮৮২ সালে এ উদ্দেশ্যে তিনি রোমে  আসেন,তখন রোমান কাম্পানিয়া (রোমের চারপাশে বিস্তৃত নীচু  এলাকা) খুবই ম্যালেরিয়া উপদ্রুত এলাকা। তিনি রোমের ম্যালেরিয়া রোগীদের রক্তে তার আলজেরিয়ায় পাওয়া পরজীবিটা খুজে বের করতে চাইলেন।রোমের বিখ্যাত সান্তো স্পিরিটো হাসপাতালে ওয়েল ইমারশন লেন্স ব্যবহার করে রোমের ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর রক্তে তিনি দেখাতে সক্ষম হন তার আলজেরিয়ায় আবিষ্কার করা পরজীবির অস্তিত্ব।কিন্তু তার বিখ্যাত ইতালীয় সহকর্মীদের বিষয়টা বিশ্বাস করাতে ব্যর্থ হোন।তাদের মতে সেগুলো ম্যালারিয়ার পরজীবি না বরং ডিজেনেরেট হয়ে যাওয়া লোহিত রক্ত কনিকা।

১৮৮৪ সালে  তখন তিনি প্যারিসে ফিরে এসেছেন ; সে বছরই সৌভাগ্যক্রমে প্যারিসে একটি ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার রোগীর রক্তে তিনি প্যারাসাইটের উপস্থিতি প্রমান করেন এবং তার শিক্ষক লুই পাস্তুর এবং এমিল রু কে বোঝাতে সক্ষম হন তার ধারনাটি সঠিক। কিন্তু তখনও বিজ্ঞানীদের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপারটা নিয়ে সন্দিহান।

একই সময় সু্ইস প্যাথলিজিষ্ট এডউইন ক্লেবস এবং ইতালীর বিখ্যাত চিকিৎসক কোরাডো টমাসি-ক্রডেলী, বদ্ধ জলাশয়ের পানি,রোগীর ইউরিন খুজে পাওয়া একটি ব্যাক্টেরিয়া, যার নাম তারা দেন Bacillus malariae,  এবং এটিকে   ম্যালেরিয়ার কারন হিসাবে দাবী করেন। তারা দাবী করেন যে, এই ব্যাক্টেরিয়াকে যখন কালচার করা হয় এবং সেখান থেকে ব্যাক্টেরিয়ার নমুনা নিয়ে যদি খরগোশের শরীরে ইনজেকশন দেয়া হয়, তাদেরও জ্বর হয়।এই ব্যাকটেরিয়াকে ম্যালেরিয়ার কারন বলে সমর্থন ছিল  বিশ্বখ্যাত জার্মান ব্যাকটেরিওলজিষ্টদেরও,  প্রায় ১৮৮৪ সাল অবধি; এই তালিকায় ছিলেন এমনকি ইতালীয় দুই বিখ্যাত বিজ্ঞানী (যারা পরবর্তীতে ম্যালারিয়া নিয়ে বহু গবেষনা করেছিলেন) এত্তোরে মারচিয়াফাভা এবং অ্যান্জেলো চেল্লীও একমত ছিলেন এদের সাথে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাক্টেরিওলজিষ্ট মেজর জর্জ স্টার্ণবার্গ নিউ ওরলিয়ন্সে একটি গবেষনা তাদের এই দা্বীটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটাকে মিথ্যা প্রমান করে। এছাড়া খুব দ্রুত মারচিয়াফাভা এবং চেল্লী ও তাদের ভুলটা ধরতে পেরেছিলেন।

 ১৮৮৪ সালে  প্যারিসে ফিরে আসার পর লাভোরাঁ তার বিখ্যাত বই  Traite des fievres palustres এর প্রথম সংস্করনটি প্রকাশ করেন।   এ সময় সামরিক মেডিকেল সার্ভিস থেকে তাকে Val-de-Grace Hospital এ  military hygiene এর অধ্যাপকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেচ্ছা অবসরে যাবার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদেই আসীন ছিলেন। ল্যাভোরাঁর আবিষ্কারটি বিজ্ঞানী সমাজে ঠিক মত গৃহীত হবার একটা প্রধান বাধা ছিল, ভালো স্টেইনিং টেকনিকের অভাব, যে অভাবের ঘাটতি কাটে ১৮৯০/৯১ সালে রোমানভস্কির স্টেইনিং টেকনিকটি আবিষ্কারের মাধ্যমে।


দমিত্রি লিওনিডোভিচ রোমানভস্কি  (১৮৬১ -১৯২১) ( সুত্র:www.romanowsky.ru/English/Romanowsky)

রুশ ডাক্তার দমিত্রি লিওনিডোভিচ রোমানভস্কি ১৮৬১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে জন্ম গ্রহন করেন। জীবনের প্রথম দিকে পদার্থবিদ্যা আর গনিত বিষয় হিসাবে বেছে নিলেও ১৮৮২ সালে সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসক হবার। ১৮৮৬ সালে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশুনা শেষ করেন। ১৮৮৯/১৮৯০ সালে তিনি গুরুত্বপুর্ন কিছু থিসিস লেখেন তার ডক্টরেট ডিগ্রীর জন্য। এর একটি ছিল About the parasitic malaria structure, যা ১৮৯০ সালে তৎকালীন রুশ চিকিৎসকদের জার্নাল ভ্রাচ (Vrach: রুশ ভাষায় যার অর্থ The Physician) এ প্রকাশিত হয়। এখানেই তিনি ম্যালারিয়া প্যারাসাইটদের মাইক্রোস্কোপের নীচে ভালোভাবে দেখার মৌলিক স্টেইনিং টেকনিকটির ব্যাখ্যা দেন। তার এই আবিষ্কার ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজীর ডায়াগনসিস প্রক্রিয়ার একটি যুগান্তকারী বিপ্লবের সুচনা করে।

দি ইটালীয়ান জব:

 ১৮৮২ সালে রোমে লাভোরাঁ র প্রস্তাবিত ম্যালেরিয়ার পরজীবি নিয়ে ইতালীয় বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী সন্দিহান থাকলেও তারা বিষয়টি নিয়ে তাদের গবেষনা শুরু করেন। ১৮৮৫  সালে ইতালীর প্রভাবশালী তিন বিজ্ঞানী, এত্তোরে মারচিয়াফাভা, অ্যান্জেলো চেল্লী ও ক্যামিলো গলজী  মানুষের রক্তে এই পরজীবির জীবন চক্রর বেশ কিছু রহস্য সমাধান করে ফেলেন। ১৮৮৫ সালে শেষের দিকে ক্যামিলো গলজি আরো দুটি প্রজাতির ম্যালেরিয়ার পরজীবি শনাক্ত  করেন।  যাদের একটির নাম তিনি দেন কোয়ার্টান (Quartan),মানুষের রক্তে যে তার জীবনচক্র সম্পন্ন করে প্রতি তিন দিন পরপর, আরেকটি টারশিয়ান (Tertian)যারা জীবনচক্র সম্পন্ন করে দুই দিনে, গলজি আরো একটি অসাধারন আবিষ্কার করেন সেটা হলো, আক্রান্ত রোগীর জ্বর আসার ব্যাপারটি ঘটে বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন ব্যাচ পরজীবির রক্তে আসার সময় অর্থাৎ এই পরজীবিগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় পরপরই একসাথে বিভক্ত হয়, এবং এই কোষ বিভাজনের সময়ের সাথে জ্বরের আক্রমনটাও ঘটে। ক্যামিলো গলজি তার নিজের দুটি ও পরে মারচিয়াফাভা ও চেল্লীর শনাক্ত করা আরো একটি অর্থাৎ একাই তিনটি প্রজাতিকে আলাদা করে শনাক্ত করেন তাদের বাহ্যিক বৈশিষ্ট ও প্রকৃতির উপর নির্ভর করে, ক্যামিলো গলজির দেখানো সেই শনাক্তকারী বৈশিষ্ট এখনো ব্যবহৃত হয়।


এত্তোরে  মারচিয়াফাভা  (বায়ে) অ্যান্জেলো চেল্লী (ডানে) সুত্র: উইকিপিডিয়া

১৮৯০ সালের পর লাভোরাঁ র খুজে পাওয়া জীবানুটি মোটামুটি ভাবে পৃথিবী ব্যাপী বিজ্ঞানী মহলে স্বীকৃতি লাভ করে। কিন্তু প্রভাবশালী ইতালীয়ার বিজ্ঞানীরা এর শ্রেনীবিভাগের ক্ষেত্রে তাদের ধারনাটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হোন।  যেমন এত্তোরে মারচিয়াফাভা, অ্যান্জেলো চেল্লী এর জেনাসটির নামকরন করেন Plasmodium ; যদিও প্লাসমোডিয়াম শব্দটির অর্থের সাথে এটির বৈশিষ্ট মেলে না, তারপরও নামটা টিকে যায় চিরকালের মত। ১৮৯০ সালের পরপরই দ্রুত তিনটি প্রজাতির পরিচয় নিশ্চিৎ হয়, গলজির Plasmodium vivax এবং Plasmodium malariae এবং এর পরের বছল মারচিয়াফাভা ও চেল্লীর শনাক্ত করেন Plasmodium falciparum। মারচিয়াফাভা এবং অ্যামিকো বিগনামি ১৮৯২ সালে প্রমান করেন ১৮৮০ সালে লাভোরাঁ যে পরজীবিটি বিভিন্ন ফর্ম দেখেছিলেন সেটি আসলে একে ( যার নামকরন করা হয় পরে Plasmodium falciparum; ‍ ‍ইতালীর ম্যালেরিয়া টীম ততদিনে আরো শক্তিশালী হয়েছে;  গিওভানি বাতিস্তা গ্রাসি এবং রাইমন্ডো ফিলেট্টি Plasmodium vivax এবং P. malariae নামটি প্রচলন করেন। কিন্তু লাভোরাঁ মনে করতেন ম্যালেরিয়ার কারন শুধু একটি প্রজাতি, তার Oscillaria malariae, আবিষ্কারের প্রায় ২০ বছর অবধি তিনি তার বিশ্বাসে অটল ছিলেন, পরে যার নাম দেন Haemamoeba malariae । এখানে আরেকটি জিনিস মনে রাখা প্রয়োজন যে লাভোরাঁ প্রথম আবিষ্কারের পর, আসলে এই বিষয়ে আর বেশী গবেষনা করার সুযোগ পাননি যতদিন তিনি সামরিক বাহিনীর সাথে যুক্ত ছিলেন।


ক্যামিলো গলজি (ছবি সুত্র)

বিতর্কিত এই বিষয়টির সমাধানে রিভিউ করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও প্যাথলজিষ্ট  উইলিয়াম এইচ ওয়েলচ ( ওয়েলচ ছিলেন বিশ্ব বিখ্যাত জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার চার অধ্যপকের একজন); ১৮৯৭ সালে তিনি ম্যালিগন্যান্ট টারশিয়ান ভ্যারাইটির ম্যালেরিয়ার নাম দেন P. falciparum, এই নামের ব্যাপারে বিতর্ক হয়েছে বহুদিন, কিন্তু ততদিনে বৈজ্ঞানিক লিটারেচারে এত বেশী নামটি ব্যবহৃত হয়েছে যে ল্যাভেরঁ রদেয়া নামটি ততদিনে হারিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে ম্যালেরিয়ার পরজীবির শ্রেনীবিভাগ নিয়ে জটিলতা চলেছে, নানা ধরনের জেনেরিক নাম প্রস্তাবিত হয়েছে, যেমন Haemamoeba, Haematozoon, Haemosporidium, Laverania এবং Plasmodium, এছাড়া প্রাইমেট প্রজাতি আর দুই ডজন নাম তো আছেই। ১৯৫৪ সালে International Commission for Zoological Nomenclature ব্যাপারটাকে একটি পদ্ধতির মধ্যে নিয়ে আসে, সেখানে P. falciparum প্রজাতির কে যে সাবজেনেরায় রাখা হয় তার নাম দেয়া হয় Laverania লাভোরাঁ আবিষ্কারের একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসাবে ।

১৯২২ সালে John William Watson Stephens মানুষের ম্যালেরিয়ার কারন চতুর্থ প্রজাতিটি,  P. ovale শনাক্ত করেন পুর্ব আফ্রিকায়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা দেখেছেন আসলে P. ovale যে ওভালে ম্যালেরিয়া করে সেটি আসলে করে দুটি স্বতন্ত্র ম্যালেরিয়ার প্রজাতি, দুজন বিখ্যাত ম্যালেরিয়া গবেষক Christopher F. Curtis (1939-2008) এবং David Walliker (1940-2007) এর নাম অনুসারে তাদের নাম রাখা হয়েছে Plasmodium ovale curtisi (classic type) এবং Plasmodium ovale wallikeri (variant type)। ১৯৬৫ সালে আরো একটি প্রজাতি মানুষের মধ্যে ম্যালেরিয়ার কারন হয়ে দাড়ায় বিশেষ করে দক্ষিন পুর্ব এশিয়ায়, P. knowlesi, ১৯৩১ সালে রবার্ট নোলেস (Robert Knowles) এবং বিরাজ মোহন দাস গুপ্ত এটি লং টেইল ম্যাকাক বানরদের মধ্যে এটি আবিষ্কার করেছিলেন। মানুষের মধ্যে ম্যালেরিয়ার প্রধান কারন এখন এই ছয়টি প্রজাতি। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ম্যালেরিয়ার কারন P. falciparum । বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার ‍কারন হিসাবে দুটি প্রধান প্রজাতি দেখা যায়, P. falciparum এবং P. vivax;  আমাদের দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দক্ষিন পুর্ব‍াঞ্চলের ম্যালেরিয়ার মুল কারন P. falciparum ; ২০১০ এ প্রকাশিত একটি গবেষনা বলছে  বাংলাদেশে P. falciparum এবং P. vivax ছাড়াও P. malariae  এবং P. ovale রও অস্তিত্ব আছে। ‍ বাংলাদেশে  দক্ষিন পুর্ব‍াঞ্চলের P. knowlesi র  ট্র্যাডিশনাল পোষক Macaca fascicularis  থাকা সত্ত্বেও অবশ্য গবেষনাটি কোন P. knowlesi পাননি।

 লাভোরাঁর paludisme এবং অ্যানোফিলিশ মশা 


ম্যালেরিয়ার ভেক্টর এবং হোস্ট অ্যানোফিলিস মশা। একমাত্র মেয়ে মশারাই রক্ত খায়। তাদের ডিম্বানুর পুষ্টির জন্য রক্ত প্রয়োজন ( ছবি: National Geographic)

লাভোরঁ র ম্যালারিয়া নামটাও খুব অপছন্দ করতেন, তার মতে, এটি অবৈজ্ঞানিক এবং কুৎসিত একটি শব্দ, যার ভিত্তি হচ্ছে কুসংস্কার। বেশ কয়েকটা নাম তিনি বাছার চেষ্টা করেছিলেন, যেমন ‘fievres des marais, fievres maremmatiques বা limnemiques, paludose or impaludisme’, অবশেষে ১৮৯৮ সালে তার বইটি দ্বিতীয় সংস্করনের জন্য বেছে নেন  ‘paludisme’ শব্দটিকে (palud শব্দটির মুল ল্যাটিন, যার অর্থ মার্শ বা জলাভুমি); প্রাইমেটদের ম্যালারিয়ার পরজীবির সাথে লাভোরাঁর একটি যোগ আছে, ১৯৮৭ সালে রবার্ট কখ যখন বানরের রক্তে প্রথম মানুষের মতই ম্যালারিয়া পরজীবি দেখেছিলেন এর প্রায় দুই বছর পর একটি গ্রিভেট বানরে (Cercopithecus  aethiops) লাভোরঁ ম্যালারিয়া পরজীবি দেখেন এবং এর নাম দেন Haemamoeba kochi (কখের আবিষ্কারের সন্মানে), পরবর্তীতে ফরাসী বিজ্ঞানীরা বানরের যকৃত বা লিভারে প্লাজমোডিয়াম এর প্যারাসাইটের জীবন চক্রের একটি ধাপ খুজে বের করেন। যা ১৯৫০ সালে শর্ট এবং গার্ণহাম মানুষের শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবানুর লিভার স্টেজটি আবিষ্কার করতে সাহায্য করে।


প্যাট্রিক ম্যানসন (বায়ে), অ্যামিকো বিগনামী (মাঝে), অ্যালবার্ট ফ্রিম্যান কিং (ডানে)

কিন্ত‍ু ম্যালেরিয়ার পরজীবি আবিষ্কারের প্রায় দুই দশক ধরে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিৎ হতে পারছিলেন না মানুষের শরীরে এটি কিভাবে বিস্তার লাভ করে। সবচেয়ে সম্ভাব্য যে মাধ্যমটা প্রথমে বিজ্ঞানীরা চিন্তা করেছিলেন, সেটা হলো পানি। কিন্তু ম্যালেরিয়া বিস্তারে মশার যে ভুমিকা থাকতে পারে এমনটাও ভাবছিলেন কয়েকজন, এদের একজন উল্লেকযোগ্য একজন হলেন ব্রিটিশ ট্রপিক্যাল মেডিসিনের দিকপাল স্যার প্যাট্রিক ম্যানসন (যিনি লন্ডনে ট্রপিক্যাল স্কুল অব মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনের প্রতিষ্ঠাতা), অন্যজন লাভোরাঁ নিজে, ১৮৮৪ সালেই তিনি লেখেন,  ‘Les Moustiques jouent-ils un role dans la pathogenie du paludisme? La chose n’est pas impossible. . .’ অর্থাৎ  ম্যালেরিয়ার প্যাথোজেনেসিসে ( রোগ সৃষ্টি প্রক্রিয়া) মশারা কি কোন ভুমিকা পালন করতে পারে? এই ব্যাপারটা অসম্ভব কিছু না; তিনি নিজে কিন্ত‍ু তার এই হাইপোথিসিসটি পরীক্ষা করে দেখেননি।এছাড়া ম্যালেরিয়ার বিস্তার মশার সম্ভাব্য ভুমিকা থাকার কথা ভেবেছিলেন যুক্তরাষ্টের চিকিৎসক আলবার্ট ফ্রীম্যান আফ্রিক্যানাস কিং এবং ইতালীর বিখ্যাত প্যাথলজিষ্ট অ্যামিকো বিগনামি।

অবশেষে এই রহস্যটার সমাধান করেন ভারতের বর্তমান উত্তরখন্ড রাজ্যের আলমোরায় জন্ম নেয়া আরেকজন অসাধারন ব্রিটিশ চিকিৎসা বিজ্ঞানী  এবং তার মতই আর্মি মেডিকেল অফিসার স্যার রোন্যাল্ড রস। ১৮৯৭ সালের আগষ্ট মাসের ২০ তারিখে, ব্রিটিশ ভারতীয় মেডিকেল সার্ভিসের অফিসার রোন্যাল্ড রস প্রথম দেখান ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত কোন মানুষের শরীর থেকে মশার শরীরে এই জীবানু বিস্তার করতে পারে। পরবর্তীতে ১৮৯৮ সালের জুলাই  নাগাদ পাখির (রোগের মডেল হিসাবে পাখি , যেমন চড়ুই, কাক, লার্ক ইত্যাদি ব্যবহার করেছিলেন) ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষনা করে তিনি দেখেন, মশা একটা পাখী থেকে আরেকটি পাখীর শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবানু বিস্তারে ভেক্টর এর কাজ করছে, এবং ম্যালেরিয়া জীবন চক্রের একটা পর্যায় ঘটছে আক্রান্ত মশার পাকস্থলীতে ( এবং সে কারনে ইন্টারমিডিয়েট হোষ্টও বটে); ম্যালেরিয়ার জীবানুর জীবনচক্রের একটি ধাপ, স্পোরোগোনিক চক্র, যে সময়টাতে ম্যালেরিয়ার জীবানু মশার শরীরে ডেভেলপ করে, পরে জীবানুগুলো প্রস্তুত হলে মশার লালাগুন্হিতে এরা অবস্থান নেয়, পরে যখন অন্য পাখিকে রক্ত খাবার জন্য মশাটি কামড়ায় এরা সেই পাখির শরীরে প্রবেশ করে। ১৯০২ সালে এই আবিষ্কারের জন্য রোনাল্ড রসকে নোবেল পুরষ্কার প্রদান করা হয় (লাভোরাঁ কিন্তু  তখনও নোবেল পাননি)।


রোনাল্ড রস

১৮৯২ সালের আগ পর্যন্ত রস নিজেও বিশ্বাস করতেন না এরকম কোন প্যারাসাইট আছে, কিন্তু ১৮৯৪ সালে নভেম্বর মাসে প্যাট্রিক ম্যানসন তাকে প্রথম ম্যালেরিয়ার পরজীবি দেখান (স্যার প্যাট্রিক ম্যানসনকে ট্রপিক্যাল মেডিসিনে জনক বলা হয়, ১৮৭৮ সালে তিনি প্রথম প্রমান করেছিলেন মানুষের শরীরের পরজী্বি মশার শরীরেও বাচতে পারে, তিনি কাজটি করেছিলেন এলিফ্যান্টথিয়াসিস বা গোদ রোগ এর ফাইলেরিয়া প্যারাসাইটের ক্ষেত্রে); তার সাথে এই সাক্ষাৎকারটি রসের জীবন বদলে দেয়। রস তার স্মৃতিচারনে উল্লেখ করেছেন, প্যাট্রিক ম্যানসনের সেই বিখ্যাত মন্তব্যটি, Do you know,I have formed a theory that mosquitoes carry malaria just as they carry filaria। ম্যানসনের একারনে খেতাবও জুটেছিল, pathological Jules Verne  বা  Mosquito Manson।

১৮৯৫ সালে ভারতে ফিরে আসার পর থেকেই তিনি লাভোরাঁ  এবং ম্যানসনের হাইপোথিসিসটি প্রমান করার চেষ্টা শুরু করেন। ম্যানসনের সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। কিন্তু তার গবেষনায় প্রথম বাধ সাধে ভারতীয় আর্মি মেডিকেল সার্ভিস, যখন তাকে মাদ্রাজ থেকে ম্যালেরিয়া মুক্ত এলাকা রাজপুতানায় পোষ্টিং দেয়। তিনিও চাকরী ছেড়ে দেবার হুমকী দেন। প্যাট্রিক ম্যানসন তার প্রভাব খাটিয়ে রসকে এক বছরের জন্য ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের কারন খোজার জন্য একটা বিশেষ পোস্টিং জোগাড় করে দেন। ১৮৯৭ সালে সেকান্দ্রাবাদে রস তার বিখ্যাত আবিষ্কারটি করেন। প্রায় চারদিন ধরে ম্যালেরিয়া রোগীর রক্ত খাওয়া একটি অ্যানোফিলিস মশার পেটের মধ্যে তিনি ম্যালারিয়ার পরজীবি দেখতে পান, এবং পরবর্তীতে ১৮৯৮ সালে জুলা্‌ই মাসে তিনি পাখীর মডেলে প্রমান করেন ম্যালেরিয়ার বিস্তারের জন্য মশার ভুমিকা। প্যাট্রিক ম্যানসন খবরটি পেয়ে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের একটি সভায় মন্তব্য করেন, I am sure you will agree with me that the medical world, I might even say humanity, is extremely indebted to Surgeon Major Ross for what he has already done, and I am sure you will agree with me that every encouragement and assistance should be given to so hard-working, so intelligent, and so successful an investigator to continue his work.


অ্যানোফিলিসের লালা গ্রন্হি থেকে ম্যালেরিয়ার পরজীবির রক্তে প্রবেশ ( সুত্র: Nature Reviews Microbiology) 

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি, রস তার ম্যালারিয়া গবেষনা চালিয়ে যাবার জন্য তেমন কোন সহায়তা পাননি, এক পর্যায়ে তিনি তার ম্যালেরিয়া সংক্রান্ত গবেষনা পরিত্যাগ করেন এবং ইংল্যান্ড ফিরে যান। রস প্রমান করেছিলেন মশা ম্যালেরিয়া বিস্তারে সাহায্য করছে, কিন্তু তার প্রমানের মডেলটি ছিল পাখি। তিনি মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরের ম্যালেরিয়া  হবার বিষয়টি কিন্ত‍ু প্রমান করেন নি। রস সাহিত্যানুরাগী ছিলেন খুব, প্রথম জীবনে সেটাই তার স্বপ্ন ছিল, কবিতা লিখতেন; নীচের  এই কবিতার অংশবিশেষ ম্যালেরিয়ার ট্রান্সমিশন আবিষ্কারের পর লিখেছিলেন (আগষ্ট ১৮৯৭):

“…With tears and toiling breath,
I find thy cunning seeds,
O million-murdering Death.”

ইংল্যান্ড কিংবা ফ্রান্সে  ম্যালারিয়া নিয়ে গবেষনার যেখারে বিজ্ঞানীরা উৎসাহ পেলেন না অপরদিকে কিন্তু ইতালীতে তখন অন্য অবস্থা। রোমের চারপাশে ম্যালারিয়া রোগের প্রকোপ এত বেশী যে বিষয়টি নিয়ে গবেষনার জন্য শ্রেষ্ট বিজ্ঞানীরা জোট বাধলেন, সরকারী, বেসরকারী সয়াহতায় গবেষনার জন্য অর্থের অভাবও ছিল ‍না। বিখ্যাত জার্মান ব্যাক্টেরিওলজিষ্ট রবার্ট কখ ১৮৯৮ সালে রোমে গিয়ে চেষ্টা করে দেখলেন মানুষের মধ্যে মশার কামড়ের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ট্রান্সমিট করা যায় কিনা,  যা এর আগে অ্যামিকো বিগনামীও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কখও ব্যর্থ হলেন এটি করতে। কিন্তু ১৮৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কিন্তু ১৮৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গিওভানী বাসিস্তা গ্রাসি প্রথম রিপোর্ট করেন Anopheles claviger মশাটি মানুষের ম্যালেরিয়ার ভেক্টর বা বাহক। এই প্রমানটি তিনি করেন মানুষের উপর একটি পরীক্ষা করে। রোমের উচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত সান্তো স্পিরিটো হাসপাতালে দীর্ঘ ৬ বছর ধরে আছেন এমন একজন রোগী আবেলে সোলা এই গবেষনায় ভলান্টিয়ার হন স্বেচ্ছায়। প্রথমত হাসপাতালটি উচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত, সেখানে বা তার আশে পাশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ সহ কোন অ্যানোফিলেস প্রজাতির মশাও ছিল না। গিওভানী বাসিস্তা গ্রাসির নেতৃত্বে ‌ ইতালীর এক গ্রুপ গবেষক যাদের মধ্যে ছিলেন বিগনামী এবং বাস্তিয়ানেলী; তারা প্রথমে Anopheles claviger সংগ্রহ করেন এবং আবেলে সোলাকে একটি ঘরে আলাদা করে রাখেন, এরপর তারা সোলার ঘরে এই মশাগুলো ছেড়ে দিয়ে প্রায় ১০ দিন ধরে প্রতি রাতে মশাগুলোকে তাকে কামড়ানোর সুযোগ দেন। এগারো দিনের দিন সোলা ম্যালেরিয়ার জ্বরে আক্রান্ত হন। তার রক্ত পরীক্ষা করে তারা রক্তে বহু ম্যালেরিয়ার পরজীবি শনাক্ত করেন। গ্রাসি লিখেছিলেন, “The rest of the history of Sola’s case has no interest for us, but it is now certain that mosquitoes can carry malaria, to a place where there are no mosquitoes in nature, to a place where no case of malaria has ever occurred, to a man who has never had malaria–Mr. Sola! ;


গিওভানী বাতিস্তা গ্রাসী

তারা এই মশার শরীরে স্পোরোগনিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়গু্লোর বর্ননা করেন। ১৮৯৯ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর রক্ত খাওয়া মশা রোম থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়, সেখানে দুজন ভলান্টিয়ারকে সেই মশা কামড়ালে তাদেরও ম্যালেরিয়া হয়। এভাবে সমাধান হয় মানুষের মধ্যে ম্যালেরিয়ার বিস্তারের রহস্য শেষ ধাধাটি। গ্রাসির মানুষের ‌ উপর এই পরীক্ষার কথা সংবাদপত্রে ফাস হবার পর তার বিরুদ্ধে ব্যপক প্রচারনা হয়, গ্রাসী পুরো ব্যাপারটা উপেক্ষা করে তার মতন কাজ করে যান এবং তার গবেষনা ম্যালেরিয়ার বিস্তার ও ভেক্টর সম্বন্ধে গুরুত্বপুর্ন মৌলিক কিছু তথ্যর যোগান দেন।

এখানে বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি স্মরনীয় তিক্ত প্রতিদ্বন্দীতার জন্ম হয়। এই পরীক্ষা গুলো করার সময় গ্রাসি পাখিদের উপর করা রসের গবেষনা সম্বন্ধে জানতে পারেন ( এটি একজন ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকের মত, গ্রাসি অস্বীকার করেছেন), কিন্তু গ্রাসি নিজে যখন তার রিপোর্টটি প্রকাশ করতে যান তখন রসকে  ক্রেডিট দিতে ব্যর্থ হন। রস এটি ভালোভাবে নেননি।  গ্রাসি তার আবিষ্কার চুরি করছে এটা ধরে নিয়ে তিনি একের পর এক প্রতিবাদী এবং ক্রোধমিশ্রিত চিঠি প্রকাশ করে যেতে থাকেন। গ্রাসিও একই ভাবে রসকে আক্রমন করেন। এই নিয়ে সংঘর্ষ চলতে থাকে দুই দশক ধরে। কিন্তু নোবেল কমিটির কোন সমস্যা হয়নি ক্রেডিটটি রোন্যাল্ড রসকে দিতে। গ্রাসির গুরুত্বপুর্ন এই আবিষ্কারটি রসের আবিষ্কারের একটি ছোট ফুটনোট হিসাবে থেকে যায়। কিন্তু ম্যালেরিয়ার গবেষনার ইতিহাসে গ্রাসির বিভিন্ন অবদান চিরস্মরনীয় হয়ে আছে।

এর পর ম্যালেরিয়া গবেষনায় যে গুরুত্বপুর্ন আবিষ্কারগুলো হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: লন্ডনের ট্রপিক্যাল স্কুল অব মেডিসিন এবং হাইজিনের দুই গবেষক হেনরী এডওয়ার্ড শর্ট এবং পার্সি সিরিল ক্লড গার্ণহাম যারা ম্যালেরিয়া প্যারাসাইটের লিভারের চক্রটির অস্তিত্ব প্রমান করেছিলেন, যা সমাধান করে ম্যালেরিয়া রিল্যাপসের (Relapse) সমস্যাটাকে। এছাড়া ম্যালেরিয়া পিগমেন্টে বা হিমাযায়াইনের গঠন রহস্যটা সমাধান হয়েছে ১৯১১ সালে ব্রাউনের প্রথম গবেষনার প্রায় ৮০ বছর পর আংশিক সমাধান হয়েছে। ম্যা্লেরিয়ায় ব্যবহৃত হয এমন তিনটি সফল ঔষধ এই হিমোযোয়াইন গঠনের প্রক্রিয়াটিকে বাধা দিয়ে কাজ করে।

 His manner was like his writing ..

১৮৯০ এর পরেই লাভোরাঁ ধীরে ধীরে তার আবিষ্কারের জন্য স্বীকৃতি পেতে থাকেন, প্যারিসের বৈজ্ঞানিক এবং মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে, পরিচিতি বাড়তে থাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। কিন্তু তিনি যেমনটি আশা করেছিলেন ফরাসী সামরিক বাহিনী তাকে সেভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। স্বীকৃতি পাবার চেয়ে তিনি চেয়েছিলেন ‍তাকে গবেষনা করার সুযোগ এবং সহায়তা দেয়া হোক। কিন্তু তিনি গবেষনা করার কোন সুযোগই পাননি সেখানে তিনি।

১৮৯৬ সালের শেষের দিকে তিনি পদত্যাগ করেন সামরিক মেডিকেল সার্ভিস থেকে। যে পরজীবির আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীব্যাপী বিশাল একটা গবেষনার দরজা খুলে দিয়েছিলেন, প্রায় ২৭ বছর সেই ক্ষেত্রে তিনি আর কোন গবেষনা করতে পারেননি। প্যারিসের পাস্তুর ই্ন্সস্টি্টিউট তাকে গবেষনা করার জন্য ল্যাবরেটরী এবং স্বাধীনভাবে গবেষনা করার সুযোগ করে দেয়। এখানে সন্মানসুচক চীফ অ্ফ রিসার্চ থাকাকালীন তিনি পাস্তুর ই্ন্সস্টি্টিউটে ট্রপিক্যাল রোগ গুলো নিয়ে নানা গবেষনাগুলোকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলেন । ১৮৯৭ থেকে ১৯০৭ পর্যন্ত্য  তিনি বেশ কিছু মৌলিক গবেষনা করেন, বিশেষ করে হেমাটোযোয়া, স্পোরোজোয়া,  ট্রাইপ্যানোসোমা পরজীবিদের নিয়ে তার অসংখ্য প্রকাশনা আছে। ১৯০০ সাল পরবর্তী বছরগুলোতে ট্রাইপ্যানোসোমা পরজীবিদের জীবনচক্র (মানুষ এবং নানা পশুর), তাদের বিস্তার প্রক্রিয়া, বিশেষ করে স্লিপিং সিকনেস রোগের ট্রান্সমিশণ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রাখেন। এছাড়া কালাজ্বর নিয়ে গবেষনা আছে তার।

১৯০৭ সালে তাকে নোবেল পুরষ্কারে সন্মানিত করা হয়, ‍ মানব  শরীরে রোগ করার ক্ষেত্রে প্রোটোজোয়াদের ভুমিকা আবিষ্কারের জন্য। নোবেল পুরষ্কারের প্রায় পুরো টাকাটা দিয়ে তিনি পাস্তুর ই্ন্সস্টি্টিউট ট্রপিক্যাল মেডিসিনের জন্য একটি ল্যাবরেটরী স্থাপন করেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠা করেন Societe de Pathologique Exotique, যার দেখাশুনা করেন প্রায় ১২ বছর। তিনিই প্রথম সন্দেহ করেছিলেন মানুষের শরীরের বাইরে কোথাও না কোথাও অবশ্যই এই ম্যালেরিয়ার প্রোটোজোয়ার অস্তিত্ব আছে, এছাড়া রোমে ইতালীর কাম্পানিয়ায় অ্যানোফিলিস আর ম্যালেরিয়ার সম্পর্ক নিয়ে গবেষনায় গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রেখেছিলেন। কর্সিকা এবং আলজেরিয়ার সোয়াম্পের আশে পাশে ম্যালেরিয়া নির্মুল করার ক্ষেত্রে তার ভুমিকা ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসী সৈন্যদের ম্যালেরিয়া রোগ প্রতিরোধে বিশেষ ভুমিকা নেন তিনি। ১৯১২ সালে তাকে কম্যান্ডার অব দ্য লিজিওন অব অনারের সন্মানিত করে ফরাসী সরকার। ১৯১৫ সালে তার ৭০ তম জন্মদিনে তার সহকর্মীরা তাকে পাস্তুর ই্ন্সস্টি্টিউট এর সন্মানিত পরিচালক পদে আসীন করে, ১৯২০ সালে অ্যাকাডেমী অব মেডিসিনের প্রেসিডেন্ট পদ তাকে দেয়া হয়। ১৯২২ সালে ১৮ মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

লাভোরাঁর মৃত্যুর পর তার অবিচুয়ারী নোটিশে রোন্যাল্ড রস মন্তব্য করেছিলেন,  ‘His writings are a model of clarity and completeness: every sentence is precise and unambiguous. His manner was like his writing – to the point, exact and decisive. He was regarded with affection and admiration by all who came into contact with him’.

Advertisements
লাভোরাঁ’র হিমঅ্যামিবোমা

2 thoughts on “লাভোরাঁ’র হিমঅ্যামিবোমা

  1. ‘His writings are a model of clarity and completeness: every sentence is precise and unambiguous. His manner was like his writing – to the point, exact and decisive. He was regarded with affection and admiration by all who came into contact with him’. ~

    Amazing !

    !!!

    So far I thought there is Science in Art , now I am realizing gradually there is Art in Science !
    The whole process of discovery and progress of research are so Clear and Creative, that is nothing but ART !

  2. অবশ্যই, বায়োমেডিকেল সায়েন্স এর প্রত্যেকটা বড় আবিষ্কারের পেছনে যে সৃজনশীলতা কাজ করে সেটা বিজ্ঞানের ইতিহাস পড়লেই স্পষ্ট হয়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s