একটি অসাধারন বইয়ের ছোট কাহিনী

শীর্ষছবি: চার্লস ডারউইনের On the Origin of Species  এর প্রথম সংস্করণ।( সুত্র:  ইন্টারনেট)

I am infinitely pleased & proud at the appearance of my child. Charles Darwin
(When Darwin first saw the finished volume, bound in green cloth) 

বিজ্ঞানের ইতিহাসের বোধহয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইটি হলো চার্লস ডারউইনের লেখা  On the Origin of Species বইটি; ১৮৫৯ সালে ২৪ নভেম্বর বইটি প্রকাশ করেছিলেন লন্ডনের প্রকাশক জন মারে। নীচের লেখাটি  এই বইটির প্রকাশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে। জীববিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের প্রায় সব শাখায়, ১৫২ বছর আগে প্রকাশিত এই বইটির প্রভাব বলার অপেক্ষা রাখেনা।


প্রথম সংস্করনের ভেতরের পাতা (সুত্র  ইন্টারনেট)

১৮৫৯ সালের ২৪ নভেম্বর, চার্লস ডারউইন তার যুগান্তকারী সৃষ্টি, On the Origin of Species বইটি প্রকাশ করেন। যদি বলা হয়  বিজ্ঞানের ইতিহাসে এর চেয়ে প্রভাবশালী বই আর কখনো আসেনি, তাহলে একটুও অত্যুক্তি হবে না। বিজ্ঞান এবং আমাদের সমগ্র চিন্তার জগতে এর প্রভাব অনস্বীকার্য ।

এইচ এম এস বীগল এ পাঁচ বছরের দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার পর ডারউইন ১৮৩৬ সালে অক্টোবরের ২ তারিখে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন, এবং এর পরের গ্রীষ্মে (১৮৩৭) ডারউইন একটি নোটবুকে, তাঁর নিজের ভাষায়  one long argument টি শুরু করেন। সেই যুক্তি বা আর্গুমেন্টটির কেন্দ্রে ছিল, প্রজাতির ট্রান্সমিউটেশন , এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতির ট্রান্সফরমেশন এর প্রস্তাবটি। লেখার প্রথম দুই বছর মুলত ছিল, তার নিজেকে পুরোপুরি বোঝানো, তার আইডিয়াটা আসলে কি, তার মনের ভিতর ভীড় করে আসা ব্যাখ্যাগুলোর একটা স্থির রুপ খুজে বের করা । ১৮৩৮ এর শেষের দিকে  বৃটিশ দার্শনিক থমাস ম্যালথাস এর বিখ্যাত Essay on the Principle of Population আরো একবার পড়ার সময়, উদীয়মান আধুনিক পৃথিবীতে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম এর ব্যাখ্যাগুলো ডারউইনকে  অনুপ্রাণিত করে  বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের  বেঁচে থাকার নিজস্ব সংগ্রামের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে।

১৮৪০ সালের শুরুর দিকে ঘোড়াদের ব্রীডিং সংক্রান্ত একটি বই পড়ার সময়,  তিনি প্রথমবারের মত Natural Selection শব্দগুলো ব্যবহার করেন তাঁর ধারনাটি কেন্দ্রীয় প্রস্তাবটি ব্যাখ্যা করার জন্য, এবং এই বইটির মার্জিনেই শব্দ দুটি তিনি লেখেন প্রথম । ১৮৪০ সালে শুরুর দিকেই ডারউইন তার Theory of Natural Selection এর মুল বিষয়গুলোর স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় মুল ব্যাখ্যাগুলো সাজিয়ে ফেলেছিলেন। এর পর পরই তিনি বিষয়টি আরো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা সহ লিখতে শুরু করেন, তার ভাষায় অনেকটা পেন্সিল স্কেচ এর মত করে। খুব সম্ভবত তিনি তার এই অসাধারন যুগান্তকারী ধারণা  সম্বলিত বইটি  ১৮৪০ সালেই প্রকাশ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। এর কারণ কি হতে পারে, বিষয়টি গবেষকদের দীর্ঘদিন ধরে ভাবিয়েছে, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ডারউইন আসলে দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক তথ্য সংগ্রহ করে গেছেন তার ধারণার স্বপক্ষে যুক্তি হিসাবে ব্যবহার করতে।

১৮৫০ এর মাঝামাঝি ডারউইন তার লেখার মুল অংশটি শুরু করেন। এখানেই দীর্ঘ আকারে তাঁর নিজের পরীক্ষাগুলোর ফলাফল এবং  নিজস্ব অন্তর্দৃষ্টিগুলো যোগ করা শুরু করেন। কিন্তু এ সময় আরেকটি ঘটনা ঘটে। সুদুর মালয় দ্বীপপুন্জ্ঞে কর্মরত আরেকজন বিজ্ঞানী আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস প্রায় একই বিষয়, প্রজাতির উৎপত্তি নিয়ে কাজ করছিলেন। তাদের দুজনের মধ্যে যোগাযোগও ছিল চিঠির মাধ্যমে। ১৮৫৮  সালে ১৮ জুন , ওয়ালেসের পাঠানো একটি পার্সেল খুলে ডারউইন একটি পান্ডুলিপি পান, সাথের চিঠিতে ওয়ালেস তাঁর লেখা সম্বন্ধে তার মতামত জানতে চান এবং কোন জার্নালে এটি প্রকাশের ব্যবস্থা করা যায় কিনা এ বিষয়ে ডারউইনের সাহায্য চান। ডারউইন ওয়ালেস এর রচনা পড়ে হতভম্ব হয়ে যান, ঠিক তাঁর মতন একই আইডিয়া ওয়ালেসেরও।

এর পর পরই ডারউইন দ্রুত তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসলটি সমাপ্ত এবং প্রকাশ করার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। ডারউইন কিন্তু বুঝতে পারেন, তিনি তাঁর সব গবেষনার ফল  এই লেখাটায় যোগ করতে পারবেন না, তার অসমাপ্ত পান্ডুলিপির শিরোনামে ইঙ্গিত ছিলো এটি শুধু একটি Abstract মাত্র। খুব দ্রুত ডারউইন তাঁর পান্ডুলিপিটি শেষ করেন, মোট ৪৯০ পৃষ্ঠার প্রথম সংস্করনটি লিখতে ডারউইন সময় নেন প্রায় নয় মাস।

চার্লস লায়েলের ( বিখ্যাত ভুতত্ত্ববিদ, Principles of Geology এর রচয়িতা, ১৮৩০ সালে যার প্রকাশকও ছিলেন জন মারে) পরামর্শে তাঁর পরবর্তী পান্ডুলিপিটি প্রকাশ করার জন্য ডারউইন যোগাযোগ করেন লন্ডন ভিত্তিক প্রকাশক জন মারের সাথে। প্রকাশক জন মারের সাথে ডারউইনের প্রথম পরিচয়  অবশ্য ১৮৪৫ সালে, যখন জন মারে,  এইচ এম এস বীগলে তাঁর সমুদ্র যাত্রার জার্ণাল এর ২য় সংস্করনটি প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। এর আগে সেটি প্রকাশ করেছিল কলবার্ন নামের একটি প্রকাশনা সংস্থা। মারের প্রকাশিত ২য় পরিবর্ধিত সংস্করণটি ডারউইনের কাঙ্খিত সফলতা পেয়েছিল। প্রায় ১৪ বছর পর তিনি জন মারের সাথে  আবার যোগাযোগ করেন।


লন্ডনে ন্যাচারাল হিস্ট্রী মিউজিয়ামে ডারউইনের স্ট্যাচু (সুত্র উইকিমিডিয়া)

জন মারে ডারউইনকে তার প্রস্তাবিত বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ের শিরোনামের একটি রুপরেখা পাঠাতে বলেন। মারে পান্ডুলিপি হাতে পাবার পর হালকা করে চোখ বোলান, তারপর দুজন পর্যালোচনাকারীর কাছে বইটা মতামতের জন্য পাঠান। প্রথম জন, জর্জ পোলোক, একজন আইনজীবি, তার সাবধানী মন্তব্য ছিল এই বইটি ‘beyond the apprehension of any living scientist’, দ্বিতীয় জন রেভারেন্ড হুইটওয়েল এলউইন, নরফোকের একজন ধর্ম যাজক, কোয়ার্টারলী রিভিউর সম্পাদক এবং সমালোচক,বলাবাহুল্য  বইটি মুল প্রস্তাব অর্থাৎ ডারউইনের তত্ত্ব তাকে  ভীষন বিচলিত এবং শঙ্কিত করে তোলে।  এলউইন মারেকে উপদেশ দেন এই বিতর্কিত বইটি প্রকাশ না করতে। তার ভাষায় বইটি ‘wild and foolish’  এবং ডারউইনকে তিনি উপদেশ দেন পিজিওন বা কবুতর ব্রিডিং  এর উপর বরং একটি বই লিখতে, Everybody is interested in pigeons. The book would be received in every journal in the kingdom and would soon be on every table. The public at large can better understand a question when it is arrowed to a single case of this kind than when the whole varied kingdom of nature is brought under discussion at the outset’;

ডারউইন ভদ্রভাবে তার প্রস্তাবটি উপেক্ষা করেন এবং জন মারেও ডারউইনের মূল পান্ডুলিপি  অপরিবর্তিত রুপেই প্রকাশের উদ্যোগ নেন ।  On the Origin of Species by Means of Natural Selection, or the Preservation of Favoured Races In the Struggle for Life শিরোনামে বইটি ১৮৫৯ সালে ২৪ নভেম্বর লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে অবশ্য বইটি পরিচিতি পায় এর শিরোনামের সংক্ষিপ্ত রুপ On the Origin of Species নামে।

১৫ শিলিং দামের এই বইটি প্রকাশের প্রথম দুই দিনেই ১২৫০ কপির প্রত্যেকটি বিক্রি হয়ে যায়। পরের মাসে দ্বিতীয় সংস্করন এর পুরো ৩০০০ কপিও বিক্রি হয়। পরবর্তীতে বইটির আরো অনেক সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। প্রথম সংস্করণের জন্য তার প্রকাশক ডারউইনকে মোট ১৮২ পাউন্ড দেন। ১৮৮২ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বইটির মোট ৬ টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়, এবং  প্রকাশক জন মারে ততদিনে প্রায় ৩০০০ পাউন্ড লভ্যাংশ হিসাবে দিয়েছিলেন ডারউইনকে।

বলাবাহুল্য বইটি মুল প্রস্তাব জন্ম দিয়েছিল তীব্র বিতর্কের। ডারউইন নিজেকে  এই বিতর্ক দেখে দুরে রেখেছিলেন এবং তাঁর গবেষণা আর লেখা চালিয়ে যান। পরবর্তী ৬ টি সংস্করনে ডারউইন তার বইটি পুনসম্পাদনা করেছিলেন। এরপর আরো অনেকগুলো গুরুত্বপর্ণ বই লেখেন ডারউউন, এর মধ্যে ১৮৭১ সালে The Descent of Man তার বিবর্তনের ধারনাকে আরো বিস্তৃত করে। পরবর্তী বেশ কয়েকটি বই এর  প্রকাশক ছিলেন জন মারে।


ওয়েষ্ট মিনিষ্টার অ্যাবেতে ডারউইনের সমাধি  (সুত্র ইন্টারনেট)

১৮৮২ সালে ডারউইন এর মৃত্যুর পর তাকে ওয়েষ্টমিনিষ্টার অ্যাবে তে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। ইতিহাসের অন্যতম একজন গুরুত্বপুর্ন মহান বিজ্ঞানী হিসাবে তার আসনটি নিশ্চিৎ করে, ৪৯০ পৃষ্ঠার সবুজ কাপড়ে মোড়া তার এই অসাধারন সৃষ্টি, On the Origin of Species বইটি।

Advertisements
একটি অসাধারন বইয়ের ছোট কাহিনী

27 thoughts on “একটি অসাধারন বইয়ের ছোট কাহিনী

      1. কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারাও সাধারণ কথার মাধ্যমে বিবর্তনকে ভুল প্রমাণ করে। আবার পৃথিবীর বড় বড় সব বিজ্ঞানীরা কেন জানি তাদের গবেষণায় বিবর্তনীয় দৃষ্টিকোনটা উপস্থাপন করেন। তাদের বুদ্ধি-শুদ্ধি মনে হয় কিছুটা কম আছে। আবার কলেজে ভর্তি করা দরকার। বিজ্ঞানকে কেন জানি আমরা নিজের পথে চলতে দিতে চাইনা, বোধগম্য নয়। আমরা তো মধ্যযূগেই আটকে থাকতাম। আপনি এ ব্যাপারটা আরো ভালো বলতে পারবেন।

        কিছুদিন আগে আরেকটা মজার ব্যাপার চোখে পড়লো- evolutionary theology. সময় থাকতে মনে হয় সুবিধাজনক অবস্থান নেবার চেষ্টা। উদাহরণ হিসেবে বক্তা ব্রুনো, গ্যালিলিওকে উপস্থাপন করলেন।

  1. চার্লস ডারউইনকে হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশ থেকে শ্রদ্ধা, ডারউইনের মানসশিশু On the Origin of Species এর জন্য শুভকামনা , যেনো পৃথিবী প্রতিটা মানুষের হাতে ও অ ন্তরে পৌছাতে পারে !

    লেখককে শ্রদ্ধা ও শুভকামনা ; আমাদের মনের অন্ধকারকে একটু একটু করে আলোয় ভরিয়ে দেয়ার জন্য ……যত দ্রুত মানুষের মন অন্ধকার মুক্ত হবে তত দ্রুত মঙ্গল বিশ্বের জন্য, প্রকৃতির জন্য !

  2. ধন্যবাদ আপনাকে।
    নতুন কিছু তথ্য জানতে পারলাম। আমি সপ্তাহখানেক আগে বি।বি।বি-এর তৈরি ‘Charles Darwin and the Tree of Life’ দেখলাম। খুব ভাল লাগল।
    আরও কয়েটি বিষয়ে জানতে আমি খুব তাড়াতাড়ি আপনার সাহায্য চাইব।
    ভাল থাকুন। ধন্যবাদ।

  3. সুন্দর লেখা। +

    আপনি পড়েছেন বইটা? আমি একবার পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। এত্তো কঠিন ইংরেজি! হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম তখন।

    আমি যদি এখন বিবর্তনবাদ ভালোভাবে বুঝতে চাই তাহলে আপনি কি কি বই রেফার করবেন?

    1. হ্যা আমি পড়েছি, এখনও বইটা আমার টেবল কম্পানিয়ন। বিশেষ করে চ্যাপটার IV আমার খুব প্রিয়। এটার একটি দারুন ইলাসট্রেটেড এডিশন পাওয়া যাচ্ছে এখন :
      http://store.exploratorium.edu/browse.cfm/on-the-origin-of-speciesthe-illustrated-edition/4,4026.html ;

      আমার পড়া কিছু বইয়ের কথা বলছি:
      Jerry A Coyne: Why Evolution Is True
      Carl Zimmer: Evolution,The Triumph of An Idea
      Carl Zimmer: The Tangled Bank: An Introduction to Evolution
      Neil H, Shubin: Your Inner Fish: A Journey into the 3.5-Billion-Year History of the Human Body
      Sean B. Carrol: Endless Forms Most Beautiful

      এছাড়া রিচার্ড ডকিন্স এর বই তো আছেই। বেশ কিছু ভালো টেক্সটবুকও আছে….

    1. সম্ভবত হিরন্ময়, নেট এ খুজে দেখা যেতে পারে। থাকার সম্ভাবনাই বেশী।
      আমি তো এখানে লাইব্রেরীতে পেয়েছি। আমি শুরু করেছিলাম Richard Dawkins দিয়ে। তবে Jerry Coyne আর Carl Zimmer দিয়ে শুরু করা ভালো, বিশেষ করে যদি বায়োলজী ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকে। তবে Dawkins এ ফিরে যেতে হবে অবশ্যই।

    2. হিরন্ময় এইটার সফট কপি আপনি নেটে পাবেন, ফিড বুকস অথবা প্রজেক্ট গুটেনবার্গ এ সার্চ করে দেখতে পারেন অথবা উইকি বুকস থেকে ,আমি নামিয়ে ছিলাম কিন্তু এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ঠিক কোথা থেকে পেয়েছিলাম

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s