প্রজেক্ট ৫২৩ এবং ম্যালেরিয়ার নেমেসিস


শীর্ষ ছবি: তু ইয়ুইয়ু  (ছবি: Simon Griffiths, New Scientist, November 2011)

It is scientists’ responsibility to continue fighting for the healthcare of all humans. What I have done was what I should have done as a return for the education provided by my country. Tu Youyou

মুল:  তু ইয়ুইয়ুর সাথে নিউ সায়েন্টিষ্ট এর সাংবাদিক ফিল ম্যাককেনার একটি সাক্ষাৎকার এবং ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত তথ্য অবলম্বনে।

২০১১ সালের আগ পর্যন্ত তু ইয়ুইয়ু ( Tu youyou) ছিলেন মুলত‍ঃ অপরিচিত একটি মানুষ তার স্বদেশ এবং বিদেশে। এতো বড় একটা আবিষ্কারের পরও কয়েক দশক ধরে অন্তরালেই ছিলেন এই চীনা ফার্মাকোলজিষ্ট; অথচ যার আবিষ্কার প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মানুষের জীবন বাচিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা হিসাবে। ২০০৫ এ যুক্তরাষ্ট্রের দুই ম্যালেরিয়া গবেষক তাদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্ঠায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন, বর্তমানে ম্যালেরিয়ার সবচেয়ে কার্যকরী ঔষধ, আর্টিমিসিনিন এর আবিষ্কারক কে ছিলেন। তাদের মাধ্যমেই অন্তরাল থেকে বেরিয়ে আসেন এই নিবেদিত প্রাণ চীনা গবেষক, তু ইয়ুইয়ু। আশি বছর বয়স্ক, তু ইয়ুইয়ু এখনও কাজ করছেন, বর্তমানে চায়না অ্যাকাডেমী  অব চাইনীজ মেডিকেল রিসার্চ এর চীফ সায়েন্টিষ্ট এবং ডক্টরাল স্টুডেন্টদের টিউটর ‍হিসাবে। চীনা অ্যাকাডেমিক মহলে তু ইয়ুইয়ু পরিচিত Professor of three none’s বা তিনটি না‘র অধ্যাপক হিসাবে, তার নেই কোন স্নাতোকোত্তর ডিগ্রী ( ১৯৭৯ র আগে চীনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীর প্রচলন ছিল না),  নেই কোন দেশের বাইরে কোন গবেষনা বা পড়াশোনা করার অভিজ্ঞতা ( তার সময়ে কম্যুনিষ্ট চীন মুলত: বিচ্ছিন্নই ছিল সারা বিশ্ব থেকে) এবং তিনি কোন প্রফেশনাল চাইনীজ অ্যাকাডেমীর সদস্য নন। এ বছর অর্থাৎ ২০১১ সালে  Lasker~DeBakey Clinical Medical Research Award এ সন্মানিত করা হয় তাকে।

 ভূমিকা

প্রায় ৪০ বছর আগে কম্যুনিষ্ট চীনের একটি গোপন মিলিটারী প্রোজেক্ট এর মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ একটি ড্রাগ বা ঔষধ এর আবিষ্কার হয়েছিল; এই ঔষধটির নাম আর্টিমিসিনিন। এখনও পর্যন্ত  ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকরী ঔষধ হচ্ছে এটি, যা জীবন বাচিয়েছে লক্ষ লক্ষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর।কিন্তু খুব সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত, এই ঔষধের আবিষ্কারের ইতিহাস ছিল সম্পুর্ন অজানা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ (NIH) এর ম্যালেরিয়া গবেষক লুইস মিলার  ২০০৫ সালে সাংহাইতে অনুষ্ঠিত একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের সময় উপস্থিত সব চীনা ম্যালেরিয়া বিশেষজ্ঞদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ম্যালেরিয়ার চিকিৎসার এই মহৌষধটি কে আবিষ্কার করেছে।উপস্থিত কেউই তার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি।রহস্যময় এই বিষয়টি মিলারকে উৎসাহী করে তোলে,সহযোগী  শিনজুয়ান সু কে নিয়ে মিলার এই ঔষধটি ইতিহাস খোজার অভিযান শুরু করেন। অসংখ্য দলিল, চিঠি পত্র, গবেষকদের মুল নোটবুক, একসময়ের গোপনীয় মিটিং এর বিবরনী দেখে তারা বুঝতে পারেন, এই আবিষ্কারের মুল কৃতিত্ব ফার্মাকোলজিষ্ট তু ইয়ুইয়ু’র।গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কারের এই নেপথ্য নায়িকাকে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় পুরষ্কার,লাস্কার (Lasker) পুরষ্কারে সন্মানিত করা হয় এ বছর সেপ্টেম্বরে। এখন তার বয়স ৮০,তু এখনো বেইজিং এ একটি ল্যাবের দায়িত্বে আছেন এবং কাজ করে যাচ্ছেন আর্টিমিসিনিন নিয়ে।

৬০ এবং ৭০ এর দশকে তু যখন তার এই গবেষনা  শুরু করেন, তখন চীনে গ্রেট প্রলেতারিয়ান সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলছে, কমিউনিষ্ট সরকার তাদের নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের আলোকে নতুন সমাজ গড়ার চেষ্টা করছে নতুন নীতি চাপিয়ে দিয়ে। ভীতিকর, অস্থির একটা সময় তখন,যখন বিজ্ঞানী এবং অন্য বুদ্ধিজীবিরা  চিহ্নিত ছিল শ্রেনীশত্রু হিসাবে এবং তাদের অনেককে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল গ্রামে তাদের রি এডুকেশনের জন্য। যে কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ছিল তখন নিষিদ্ধ। কিন্তু তারপরও চীন সরকারকে জন্য একটি জরুরী প্রয়োজনে বাধ্য করে এই বিশেষ ক্ষেত্রে  তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বিবেচনা করতে ।এছাড়া তখন চীনের অল্প কিছু মিত্রের একটি উত্তর ভিয়েতনাম, যুদ্ধ করছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে দক্ষিন ভিয়েতনামের সাথে। এবং ম্যালেরিয়ার ব্যপক প্রকোপ ছিল সেখানে।  ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা ছিল তখন ক্লোরোকুইন, কিন্তু ম্যালেরিয়ার পরজীবি খুব্ দ্রুত এর বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্ট হতে শরু করেছে। ক্লোরোকুইন অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে ম্যালারিয়ার চিকিৎসায়। অ্যামেরিকার বুলেটে যত না চীনা সৈন্য মারা যাচ্ছে, তারচেয়ে বেশী মারা যাচ্ছিল ম্যালেরিয়ায়।

প্রজেক্ট ৫২৩ 

১৯৬৭ সালের ২৩ মে, চীনের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রধান মাও জেদং একটি গোপন ঔষধ আবিষ্কারের প্রজেক্ট তৈরী করার নির্দেশ দেন। যার নাম ছিল শুধু প্রজেক্ট ৫২৩ ( মে মাসের ২৩ তারিখ থেকে প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়েছিল); কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রজেক্টে অসংখ্য বিজ্ঞানী কয়েক হাজারেরও বেশী কৃত্রিম উপায়ে তৈরী বা সিনথেটিক রাসায়নিক যৌগ নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন, ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী কোন যৌগ খুজে পাওয়া যায় কিনা। অন্যদিকে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ( যা অবশ্য গোপন  ছিল না) বিজ্ঞানীরাও ঠিক একই ভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন ক্লোরোকুইন রেজিস্ট্যান্ট ম্যালেরিয়ার কার্যকরী কোন ঔষধ খোজার জন্য। কিন্তু তাদের গবেষনায় তখনও কোন সুফল পাওয়া যায়নি। প্রজেক্ট ৫২৩ এর বিজ্ঞানীরা যখন ম্যালেরিয়ার বিরদ্ধে কাজ করবে এমন সিনথেটিক কোন রাসায়নিক যৌগ খুজে বের করতে ব্যর্থ হলেন, তখন তারা নজর দিলেন চীনের হাজার বছরের পুরোনো ট্রাডিশনাল মেডিসিনের দিকে। ১৯৬৯ সালে সরকার, বেইজিং এর অ্যাকাডেমী অব ট্রাডিশন্যাল চাইনীজ মেডিসিনকে নির্দেশ দিলেন চীনের ভেষজ চিকিৎসার মধ্যে ম্যালেরিয়ার একটি কার্যকরী ঔষধ খোজার কাজে তাদের একজন গবেষককে সার্বক্ষনিক দায়িত্ব দিতে। অ্যাকাডেমী এই নির্দেশ পাবার সাথে সাথে সেই দায়িত্বটি দেয়, তখন মধ্য ক্যারিয়ারে থাকা ফার্মাকোলজীতে গ্রাজুয়েট বিজ্ঞানী তু ইয়ুইয়ুকে। হার্বাল মেডিসিনে গবেষনা করা বিজ্ঞানীদের মধ্যে একমাত্র তু ইয়ুইয়ুরই চীনা এবং ওয়েষ্টার্ণ মেডিসিন দুই দিকেই দক্ষতা ছিল। দায়িত্ব পাবার পর পরই তিনি বুঝেছিলেন, কাজটা খুবই কঠিন হবে।

The work was the top priority….

তু ইয়ুইয়ু চীনের জেইজিয়াং প্রদেশে নিংবো ১৯৩০ সালের ৩০ ডিসেম্বর জন্মগ্রহন করেন। হাইস্কুলে থাকার সময় তার আগ্রহ ছিল ট্রাডিশনাল চীনা হার্বাল মেডিসিন এবং পশ্চিমা মেডিসিনে। ১৯৫১ সালে তিনি পিকিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিন ( যা বর্তমানে পরিচিত পিকিং  ইউনিভার্সিটি হেলথ সায়েন্স সেন্টার) থেকে পাশ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট থেকে তিনি তার বিশেষায়িত শিক্ষা নেবার পর আড়াই বছর চীনা ট্র্যাডিশনাল হার্বাল মেডিসিনে প্রশিক্ষন নেন।

প্রোজেক্ট ৫২৩ এ যখন তু কাজ শুরু করেন ততদিনে প্রায় ২৪০,০০০ টি রাসায়নিক যৌগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট এবং চীনের বিজ্ঞানীরা কাজ করে ফেলেছেন কোন সফলতা ছাড়াই।  এই প্রজেক্টে কাজ শুরু করলে তু কে পাঠানো হয় হাইনান প্রদেশে, চীনের দক্ষিনে এই প্রদেশে ম্যালেরিয়ার তীব্র প্রকোপ, উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি এই রোগটি পর্যবেক্ষন করা। তখন তু বিবাহিত, তার স্বামী সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শিকার, দুর গ্রামে নির্বাসিত। স্থানীয় একটা নার্সারীতে তু তার ৪ বছরের মেয়েকে রেখে যান। হাইনান থেকে ফিরে আসার পর তার মেয়ে তাকে অনেকদিন চিনতে পারেনি, কিন্তু তার জীবনের এই সময়টা নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলে স্পষ্ট হয়, বিষয়টি নিয়ে তিনি কোন তিক্ততা মনে রাখেননি,  বলেছিলেন,  The work was the top priority, so I was certainly willing to sacrifice my personal life, এছাড়া হাইনানের এই সময়টা তার মনোজগতে প্রভাব ফেলেছিল স্পষ্টতই,  I saw a lot of children who were in the latest stages of malaria. Those kids died very quickly।

রেসিপি: Emergency Prescriptions Kept Up One’s Sleeve

হা্‌ইনান থেকে ফিরে এসেই তিনি তার সহকারীকে নিয়ে  অ্যাকাডেমীর লাইব্রেরীর  এবং অন্য সুত্র থেকে চীনা ভেষজ চিকিৎসার প্রায় ২০০০ রেসিপি যোগাড় করেন, এবং প্রায় ২০০ ভেষজ উদ্ভিদ থেকে তার টীম প্রায় ৩৮০ টি এক্সট্রাক্ট তৈরী করে ইদুরের উপর তা পরীক্ষা করে দেখে । তিনি দেখেন যে, এদের মধ্যে একটি আসলেই ইদুরের রক্তে ম্যালেরিয়ার জীবানুর সংখ্যা কমিয়ে দেয়। এই এক্সট্রাক্টটির উৎস চীনে প্রায় সবজায়গায় পা্ওয়া যায় এমন একটি উদ্ভিদ, কিংহাও (Quinghao), যা পশ্চিমে পরিচিত সুইট ওয়ার্মউড (Sweet wormwood) বা Artemisia annua নামে। চীনা ভেষজ চিকিৎসায় এর ব্যাবহার কয়েক হাজার বছর পুরোনো, সাধারনত: থেমে থেমে আসা বা ইন্টারমিটেন্ট জ্বরের চিকিৎসায় ( যা স্পষ্টতই ম্যালেরিয়ার জ্বরের মত) এটা ব্যবহার করা হতো।

প্রাথমিক সফলতার পরে তু আবার তা পরীক্ষা করে দেখেন, কিন্তু দেখা যায় যৌগটা খুব দ্রুত তার কার্যকারীতা হারিয়ে ফেলছে। এর কারন খুজতে তু বার বার এর রেসিপিটা,  প্রায় ১৬০০ বছর  আগে লেখা পুরোনো চীনা টেক্সটটি পড়েন; এই রেসিপিটির শিরোনাম ছিল, ’জরুরী চিকিৎসাপত্র, যা হাতের কাছে থাকা দরকার’, সেখানে নির্দেশ ছিল কিংহাও বা ওয়ার্মউড গাছের একটা ডাল পানিতে ভিজিয়ে এর রস মিশ্রিত পানি পান করার জন্য। তু বুঝতে পারলেন ওয়ার্মউডকে ১০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে সিদ্ধ করার জন্য হয়তো তাপে এর মুল উপাদানটি কার্যকরীতা হারাচ্ছে, এটা পাশ কাটাতে তিনি এক্সট্রাক্টের সলভেন্ট হিসাবে বেছে নেন ইথার সলভেন্টকে, যা ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ফুটতে থাকে।  এবার এক্সট্রাক্টটি তিনি ইদুর এবং বানরের উপর পরীক্ষা করেন এবং দেখেন শতকরা ১০০ ভাগে ক্ষেত্রেই  এটি কার্যকরী।

১৯৭২ সালে তার টিম ‌ এই রাসায়নিক যৌগটি পুরোপুরি বিশুদ্ধ ভাবে পৃথক করতে সক্ষম হয় এবং তিনি এর নাম দেন Quinghaosu , যা পশ্চিমে পরিচিত Artemisinin নামে। সেই সময়ের স্মৃতি চারন করতে গিয়ে তু বলেন, We had just cured drug-resistant malaria, we were very excited ; এরপর তু আরো ব্যাপকভাবে যৌগটি রাসায়নিক গঠন এবং ফার্মাকোলজী নিয়ে গবেষনা করেন।

……….I had the responsibility

কিন্তু তু’ র মনে তখন একটি সন্দেহ ছিল, মানুষের উপর এটি কাজ করবেতো ? এর প্বার্শপ্রতিক্রিয়াই বা কি হবে? তু ইয়ইয়ু নিজেই মানুষের জন্য এই ঔষধের নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরীক্ষার ভলান্টিয়ার হলেন, তার ভাষায়, As the head of this research group, I had the responsibility;  ঔষধটির কোন খারাপ কোন প্রতিক্রিয়াই হোল না। এবার তু পাহাড়ী বনাঞ্চলে কাজ করে  শ্রমিকরা, যারা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় তাদের উপর একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করলেন। ট্রায়ালে দেখা গেল মাত্র ৩০ ঘন্টার মধ্যেই রক্ত ম্যালেরিয়ার জীবানু শুন্য হয়ে যাচ্ছে।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের এলোমেলো সময়টা পার হবার পর, ১৯৭৭ এ এই গবেষনাটি প্রকাশিত হয় এবং সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রথা অনুযায়ী গবেষকদের কোন নাম উল্লেখ করা ছাড়াই। কারন ইগালেটেরিয়ান সমাজে কোন নির্দিষ্ট ব্যাক্তির চেয়ে গ্রুপের স্বার্থই গুরুত্বপুর্ন। যদিও মিলার এবং সু’র গবেষনা ছাড়া কেউ হয়তো বা কোনদিনও জানতো না, এর আবিষ্কারের ইতিহাসের কথা, কিন্তু আর্টিমিসিনিনের আবিষ্কার চীনের জন্য সবসময়ই একটি বড় গর্বের বিষয়। অনেকেই মনে করে চীনা ভেষজ চিকিৎসায় এরকরম আরো অনেক রত্ন লুকিয়ে আছে।

তু ইয়ুইয়ুর খুজে পাওয়া এই ঔষধটি প্রতি বছর ব্যাবহার হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর, বিশেষ করে সাব সাহারান আফ্রিকা সহ পৃথিবীর সব উন্নয়নশীল দেশে। এখনও এর উৎস প্রকৃতি, সেই ওয়ার্মউড গাছ, যা জন্মায় চীন, ভিয়েতনাম এবং  সম্প্রতি পুর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে। গবেষকরা বর্তমানে গাছটির নতুন জাত আবিষ্কার করার চেষ্টা করছেন যেখান থেকে আরো বেশী আর্টিমিসিনিন পা্ওয়া যাবে।  গত দশকে প্রথম আর্টিমিসিনিন কাজ করেনা এমন ম্যালেরিয়া সন্ধান পাওয়া গেছে কম্বোডিয়ায়,তবে ঔষধটি এখনও কাজ করে তাদের উপর, দুই দিনের বদলে চারদিনে মাত্রায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইনে এখন চিকিৎসকদেরকে শুধু আর্টিমিসিনিন একক ভাবে না দেবার জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এটি অপর কোন প্রচলিত ম্যালেরিয়ার  ঔষধের সাথে একসাথে ব্যাবহার করতে হবে, কম্বিনেশন থেরাপি হিসাবে , কারন ম্যালেরিয়ার পরজীবি জীবানু পক্ষে একই সাথে দুটি ঔষধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সহজ কাজ না। এছাড়া আর্টিমিসিনিন খুবই গুরুত্বপুর্ণ একটি ঔষধ, রেজিস্ট্যান্ট ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে এটি আমাদের প্রধান যুদ্ধাস্ত্র।

I feel more reward when I see so many patients cured….

ম্যালেরিয়া নিয়ে কাজ করছেন এমন গবেষকদের আরো সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন,  তার মতে, It is scientists’ responsibility to continue fighting for the healthcare of all humans ; তার গবেষনার বিশেষ গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দিলে তু বিনয়ের সাথে বলেন, What I have done was what I should have done as a return for the education provided by my country ।

লাস্কার পুরষ্কার গ্রহনের  অনুষ্ঠানে এতদিন নেপথ্যে থাকা এই নিবেদিত প্রান চীনা বিজ্ঞানী সবাইকে এই স্বীকৃতি দেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন: “I feel more reward when I see so many patients cured.”

Advertisements
প্রজেক্ট ৫২৩ এবং ম্যালেরিয়ার নেমেসিস

15 thoughts on “প্রজেক্ট ৫২৩ এবং ম্যালেরিয়ার নেমেসিস

    1. ধন্যবাদ হিরন্ময়। আসলেই রুপকথার মত। কোন আবিষ্কারের পিছনের ‍কাহিনী জানাটা আমার খুব প্রিয় একটা বিষয়,সাধারন আর অসাধারনের মধ্যে পার্খক্যটা করতে পারা যায়। আমি আমার সাইড বারে যাদের ছবি দেই তাদেরে প্রত্যেকেরই কাহিনী অসাধারন; আমি আলাদা করে লেখার সময় পাই না। কিন্তু এবার আমার অন্য লেখাটা থামিয়ে এটা শেষ করলাম। ধন্যবাদ পড়ার জন্য, মন্তব্য করার জন্য।

  1. … … “২০১১ সালের আগ পর্যন্ত তু ইয়ুইয়ু ( Tu youyou) ছিলেন মুলত‍ঃ অপরিচিত একটি মানুষ তার স্বদেশ এবং বিদেশে। এতো বড় একটা আবিষ্কারের পরও কয়েক দশক ধরে অন্তরালেই ছিলেন এই চীনা ফার্মাকোলজিষ্ট; অথচ যার আবিষ্কার প্রায় অর্ধ বিলিয়ন মানুষের জীবন বাচিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হচ্ছে ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা হিসাবে। ”

    … কি বলবো! এমন একজন মানুষ… যে কোন স্তুতিই তাঁর মত মানুষদের জন্য কম হবে, ছোট করা হবে। তাই কিছু বলার প্রয়োজন দেখছি না।

    ধন্যবাদ মাহবুব ভাই, শেয়ার করার জন্য। এরকম আরো লেখা নিয়মিত পড়তে চাই।

      1. অজ্ঞাত বলেছেন:

        doa haat tule korte hoi na. mon theke shob shomoi e ache. jodi haat tula lage tao … anyway..

        i want both of you reach there where you belong…
        -masum

      1. mon theke dua shob shomoi e hoye jai. er jonno bolao laage na.. haat o tulte hoi na. jodi tulte hoi tao…

        apnara jekhane pouchar kotha chilo ami chai shekanei puchaben. onek din hoyeche…

    1. মাসুম ধন্যবাদ, আমার লেখা তুমি তোমার ফেসবুকে শেয়ার করার জন্যই অনেকে এদিকে আসে।
      আমার আসলে লেখা শেষ করার পর ভয়াবহ অলসতা চলে আসে, অসমাপ্ত অনেক লেখা, বানানগুলো দেখতে ইচ্ছা করে না।

      তু ইয়ুইয়ু অসাধারন একজন মানুষ। যারা ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে গবেষনা করছেন,এমন একজন বিজ্ঞানী যদি একজন মানুষের জীবনও বাচাতে পারে তার কাজের মধ্য দিয়ে, সেটাই তার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। বিজ্ঞানীদের অসাধারণ আত্মত্যাগের কাহিনী আছে; আজ আমরা যা খুব স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি,সুফল ভোগ করছি, শুধু সেটুকু দেবার জন্য কোন একজন তার সারাটা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। কিন্তু অনেক সমাজেই আমরা তাদের ভুলে যাই অকৃতজ্ঞের মত।

      আর্টিমিসিনিন আসলেই একটা মিরাকল কিউর। ম্যালেরিয়া নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের কাছে এটি সবচেয়ে মুল্যবান। সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা হচ্ছে এর সোর্স এখনও তু ইয়ৃইয়ু‘র খুজে পাওয়া সেই ওয়ার্মউড গাছ; প্রকৃতিতে এরকম নানা বিস্ময় লুকিয়ে আছে, যা এখনও আমাদের অজানা।

      1. (: হ্যাঁ, জ্ঞান মানুষকে বিনয়ীও বানিয়ে দেয়। আপনাকে দেখে তাঁর প্রমাণ পাই। আমি পাঠক আনতে পারলাম কই! যদি পারি তাহলে তো কথাই নেই…

  2. উপরে দিগন্ত যেমন বললেন – আসলেই যেন রূপকথা পড়লাম। কি বিনয় মহিলার! গোগ্রাসে খেয়ে ফেললাম।

    গ্রুপকে ব্যক্তির চাইতে প্রাধান্য দেব বলে ব্যক্তির অবদান কে স্বীকার করবো না? কি অদ্ভূত কথা! গ্রুপে কাজ করার মজাই আলাদা – কিন্তু আইডিয়া প্রথমে এক ব্যাক্তির মাথা থেকেই তো আসে। সরল ভাবে যেটা বুঝি – গ্রুপ এবং ব্যক্তি উভয়ের অবদানই স্বীকার করা উচিত।

    এই পোস্টটা আপনার অন্যান্য অনেক পোস্টের তুলনায় একদিক দিয়ে ভালো হয়েছে। কেন? কারণ যথেষ্ট ছোট বলে। আপনার প্রত্যেকটা পোস্টের বিষয়বস্তুই অসাধারণ। কিন্ত যেহেতু দ্রুত পড়া যায় না বিষয়ের কারণেই – তাই বড় পোস্ট পড়তে একটু কষ্ট হয়। পার্ট পার্ট করে দিলে অনেক সুবিধা হতো।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s