ভালোবাসা, নিউরোবায়োলজী কি বলে….

শীর্ষ ছবি: গবেষনায় দেখা গেছে রোমান্টিক ভালোবাসা এবং মায়ের ভালোবাসা ব্রেনের বেশ কিছু একই অংশগুলোকে সক্রিয় করে; নিউরোবায়োলজিষ্টদের ধারনা মানুষের মধ্যে জুটি বাধা বা পেয়ার বন্ডিং সম্ভবত: বিবর্তিত হয়েছে মা এবং তার সন্তানের সম্পর্ক বা ম্যাটেরনাল বন্ডিং এর ব্রেন মেকানিজম বা স্নায়বিক প্রক্রিয়াটিকে সামান্য কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে। (ইলাসট্রেশন:  জি বেকার,  সুত্র: Love: Neuroscience reveals all. Nature. 457(8 January 2009)

There is always some madness in love. But there is always some reason in madness. Friedrich Nietzsche

মুল:  Semir Zeki,The neurobiology of love; Federation of European Biochemical Societies (FEBS) Letters 581 (2007) এবং  Larry J. Young : Love, Neuroscience reveals all. Nature, 457(8): January 2009;  এছাড়া ব্যবহৃত বাড়তি তথ্য সুত্র (ডায়াগ্রাম এবং কিছু বিশ্লেষণ): Andreas Bartels, Semir Zeki: The neural basis of romantic love (NeuroReport:2000;vol 11(17):3829, Andreas Bartels, Semir Zeki: The neural correlates of maternal and romantic love;NeuroImage; 2004(21):1155; Larry J Young, Zuoxin Wang, The neurobiology of pair bonding. Nature Neuroscience (2004): 7(10):1048 ;

ডঃ সেমির জেকি (Semir Zeki) যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন এর নিউরোএসথেটিকস এর অধ্যাপক এবং ওয়েলকাম কগনিটিভ নিউরোলজী বিভাগের সহপ্রধান।প্রাইমেটদের ভিজুয়াল ব্রেনই মুলত তার গবেষনার বিষয়। কিন্তু তার গবেষনার ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে ব্রেনের সেই অংশগুলোকে খুজে বের করা, যারা আমাদের বিবর্তিত শ্রেষ্ঠতম অনুভুতিগুলোর নিউরোবায়োলজিক্যাল ভিত্তি:,যেমন:ভালোবাসা (রোমান্টিক এবং মায়ের);অসংখ্য গবেষনা পত্র ছাড়াও তিনি এ বিষয়গুলো নিয়ে মোট চারটি গ্রন্থের রচয়িতা:Splendours and Miseries of the Brain (2008), A Vision of the Brain (1993), Inner Vision: an exploration of art and the brain (1999); ২০০১ সাল থেকে তিনি সৃজনশীলতা এবং শিল্পকে বোঝার বা অ্যাপ্রিসিয়েট করার নান্দনিকতার স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি খোজার গবেষনা শুরু করেন।এই লক্ষ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেতে তিনি স্থাপন করেন Institute of Neuroesthetics। ডঃ ল্যারী জে.ইয়ং, যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার এমোরী বিশ্ববিদ্যালয়ে Center for Behavioral Neuroscience এর প্রধান এবং Yerkes Primate Center  এর প্রধান গবেষক এছাড়া Emory University School of Medicine  সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক।

ভূমিকার আগে: রোমান্টিক ভালোবাসা এবং মায়ের ভালোবাসা নিঃসন্দেহে অসাধারন সুখকর আর রিওয়ার্ডিং একটি অভিজ্ঞতা। এই দুটোই প্রজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং সে কারনেই বিবর্তন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ কিছু  বায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়ার সাথে এরা ঘনিষ্টভাবে জড়িত;  অথচ এই আচরনগুলোর স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের গবেষনা অপেক্ষাকৃত নবীন। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত কিছু অগ্রগতি, যেমন: fMRI(ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেসোন্যান্স ইমেজিং) এ ক্ষেত্রে গবেষনার একটি নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছিল ৯০ এর দশকের শুরুতে। নতুন এই ব্রেন ইমেজিং টেকনিকগুলো নিউরোবায়োলজিষ্টদের কোন সাবজেক্টিভ (ব্যাক্তি নির্ভর) অনুভুতির সরাসরি স্নায়বিক পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে, যেমন: রোমান্টিক এবং মায়ের ভালোবাসার ক্ষেত্রে। ৯০ দশকের শেষের দিকে ডঃ জেকি ও তার সহযোগীরা আমাদের ব্রেনে রোমান্টিক ভালোবাসার সাথে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলো খোজার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে তার গবেষনায়ে যুক্ত হয় সন্তানের প্রতি মার ভালোবাসার নিউরোবায়োলজিক্যাল ভিত্তি । দেখা যায় এই দুই ধরনের গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক আমাদের ব্রেনের কিছু বিশেষ এলাকা স্বতন্ত্র ভাবে সক্রিয় বা অ্যাক্টিভেট করে। আবার ওভারল্যাপিংও হয়, যেমন ব্রেনের কিছু কিছু এলাকা এই দুই ভালোবাসার ক্ষেত্রেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যে এলাকা গুলো আমাদের ব্রেনের রিওয়ার্ড মেকানিজমের সাথে জড়িত। এখানে আমাদের ব্রেনের গুরুত্বপুর্ণ  দুটি রাসায়নিক পদার্থ বা নিউরো হরমোন অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিনের রিসেপ্টরের (রিসেপ্টর হলো কোষের ঝিল্লীতে থাকা একটি অনু, যার সাথে নির্দিষ্ট কোন রাসায়নিক অনু যুক্ত হতে পারে) বাহুল্যও থাকে এখানে। এই গবেষনার আরেকটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হলো যখন এই দুই ধরনের ভালোবাসা ব্রেনের কিছু অংশকে সক্রিয় করে, এরা তার সাথে ব্রেনের কিছু অংশকেও নিষ্ক্রিয় বা ডি অ্যাক্টিভেট করে: সেই অংশগুলো আমাদের নেতিবাচক আবেগের সাথে জড়িত, এছাড়াও আছে সামাজিক জাজমেন্ট এবং মেন্টালাইজিং ( অর্থাৎ অন্য মানুষদের ইনটেনশন বা উদ্দেশ্য এবং ইমোশন সম্বন্ধে আমাদের নিজেদের মেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট) প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রনকারী কিছু অংশ। নিউরোবায়োলজিষ্টরা মনে করেন এই মানুষের সম্পর্ক বা অ্যাটাচমেন্টগুলো সৃষ্টিতে এধরনের একটা পুশ-পুল মেকানিজম কাজ করে, যে নেটওয়ার্কগুলো আমাদের ব্রেনে অন্যমানুষ সম্বন্ধে ক্রিটিক্যাল সামাজিক অ্যাসেসমেন্ট এবং নেগেটিভ ইমোশন সৃষ্টি করে, সেটাকে নিষ্ক্রিয় বা নিয়ন্ত্রনে এনে সামাজিক  দুরত্বকে অতিক্রম করতে সহায়তা করে, যা বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে তৈরী করে বন্ধন ব্রেনের রিওয়ার্ড সার্কিট্রিকে ব্যবহার করে। এই নিউরোবায়োলজিক্যাল প্রক্রিয়াগুলো ব্যাখ্যা করতে সক্ষম, কাউকে প্রেরণা দেবার ক্ষেত্রে বা তীব্র সুখের অনুভুতি দিতে ভালোবাসার অসীম শক্তিকে।

 ভুমিকা:

অপেক্ষাকৃতভাবে অল্প কিছুদিন হলো নিউরোবায়োলজিষ্টরা মানুষের সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী আর তীব্রতম সুখানুভুতিগুলোর অন্যতম, ’ভালোবাসা’ ‘র স্নায়বিক ভিত্তির রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা শুরু করেছেন। তাদের এই্ প্রচেষ্টা খানিকটা সহজ হয়েছে আধুনিক ইমেজিং প্রযুক্তির নানা টেকনিক ব্যবহারের মাধ্যমে। এই টেকনিকগুলোই নিউরোবায়োলজিষ্টদের সুযোগ করে দিয়েছে গবেষনায় অংশগ্রহনকারীদের সাবজেক্টিভ বা ব্যক্তিনির্ভর মানসিক কোন অবস্থার ক্ষেত্রে ব্রেন বা নিউরাল সিস্টেমের অংশগ্রহনকারী অংশগুলো খুজে বের করতে। বিষয়গুলো সাবজেক্টিভ ( অংশগ্রহনকারীর নিজের আত্মগত অনুভূতি) থাকার কারনে অবজেক্টিভ কোন বৈজ্ঞানিক গবেষনার ধরাছোয়ার বাইরে ছিল এতদিন। আপাতত বিজ্ঞানীরা এই ভালোবাসার নিউরাল কোরিলেট গুলো সম্বন্ধে যতটুকু জানেন,অবশ্যই এখনও তা অসম্পুর্ন এবং সীমিত, তবে এটা স্পষ্ট যে, আগামী বছরগুলোতে এই ক্ষেত্রে গবেষনা আরো দ্রুত অগ্রগতি লাভ করবে। নিউরোবায়োলজিষ্ট সমির জেকী মনে করেন, ভালোবাসার স্নায়ুবৈজ্ঞানিক উৎস খোজার প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতের নিউরোবায়োলজিষ্টরা হয়তো ভালোবাসা সংক্রান্ত বিশ্বসাহিত্য থেকেও প্রমান খুজবেন, কারন সাহিত্য ব্রেনেরই একটি সৃষ্টি, এবং খুব লক্ষ্য করে পড়লে মানুষের ব্রেনে রোমান্টিক সিস্টেমটা কেমন করে সংগঠিত আছে তা সম্বন্ধে বেশ স্পষ্ট একটি ধারনা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু আপাতত এই আলোচনা সীমাবদ্ধ  থাকবে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টাল স্টাডির মাধ্যমে পাওয়া ভালোবাসার স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে। আটলান্টার এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল প্রাইমেট রিসার্চ সেন্টারের নিউরোবায়োলজিষ্ট ল্যারী ইয়ং মনে করেন এই প্রক্রিয়াগুলো ক্যাবিক তো নয়ই, এমনকি বিশেষভাবে রোমান্টিক কোন কিছুও না; কিন্তু ভালোবাসাকে তার গঠনকারী উপাদানে বিভাজন করার প্রক্রিয়াই কেবল পারে মানুষের সেক্সুয়ালিটি সম্বন্ধে বিজ্ঞানীদের একটি ধারনা দিতে এবং হয়তো অন্যদের জন্য আমাদের ভালোবাসা বাড়ানো কমানোর ঔষধও একদিন উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে এভাবে।

বৃটিশ কবি আলফ্রেড অস্টিন তার Love’s Trinity তে ভালোবাসার একটি হলিস্টিক রুপ তুলে ধরেছিলেন এভাবে, যে রুপটি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মনোজগতে রাজত্ব করে আসছে:

Soul, heart, and body, we thus singly name,
Are not in love divisible and distinct,
But each with each inseparably link’d.

 বর্তমানে গবেষকরা চেষ্টা করছেন আপাতদৃষ্টিতে অনন্য এই মানবিক আবেগটির মুল ভিত্তির স্নায়বিক এবং জেনেটিক উপাদানগুলো পৃথক এবং শনাক্ত করতে। এবং সত্যি সত্যি জীববিজ্ঞানীরা খুব শীঘ্রই হয়তো সক্ষম হবেন ভালোবাসার সাথে সংশ্লিষ্ট মানসিক অবস্থার প্রানরাসায়নিক ঘটনাক্রমটি উদঘাটন করতে আর এই তথ্যগুলো মানুষের সেক্সুয়ালিটির বিবর্তনের ব্যাখ্যায় প্রভাব ফেলবে অবশ্যই । এছাড়াও এর সাথে সামাজিক উদ্বেগটাও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই, বিশেষ করে যখন আমাদের নানা আচরনের উৎস সন্ধানে জেনেটিক  স্ক্রীনিং টেস্ট এবং মানসিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রন করতে বিভিন্ন ঔষধের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার বাড়ছে।

অ্যানিমল মডেল থেকে মানুষ

আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রনের মেকানিজমগুলো বোঝার ব্যাপারে অ্যানিমল মডেলগুলো গবেষকদের অনেক সহায়তা করেছে, বিশেষ করে বিবর্তন প্রক্রিয়ায় সুসংরক্ষিত প্রতিক্রিয়াগুলো: যেমন ভয় (Fear) এবং দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ (Anxiety)। গবেষনার এই অগ্রগতিগুলো নানা ধরনের ফোবিয়া, দুশ্চিন্তা আর পোস্ট-ট্রমাটিক স্টেস ডিসওর্ডারের চিকিৎসার পথকে সুগম করে দিয়েছে। এই সব মডেলগুলো ‘ভালোবাসা’  স্নায়ুবৈজ্ঞানিক বিষয়টি বুঝতে গবেষকদের সাহায্য করছে।


মা ভেড়া এবং তার সন্তান (ছবি সুত্র)

শুধুমাত্র আমরাই কেবল একমাত্র প্রানী না যারা গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সম্পর্ক তৈরী করে। মা এবং শিশুর বন্ধনের কথাই ধরা যাক। একজন মা ভেড়ার সাথে তার সন্তান বা ল্যাম্ব এর বা একটি মা জাপানী ম্যাকাকের সাথে তার সন্তানের আবেগীয় সম্পর্কর গুনগত ভাবে মানব মা’র ভালোবাসার মত হোক বা না হোক, কিন্তু এই সম্পর্কগুলো বিবর্তন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত একই ধরনের ব্রেন মেকানিজম ব্যবহার করার সম্ভাবনা অনেক বেশী। মানুষ, ইদুর, ভেড়ার শরীরে অক্সিটোসিন (Oxytocin) হরমোন তৈরী হয় প্রসব বেদনা, সন্তান প্রসব এবং বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়। গবেষনায় দেখা গেছে স্ত্রী ভেড়াদের ব্রেনে অক্সিটোসিন হরমোন দিলে, অপরিচিত ভেড়া শাবকের সাথে দ্রুত বন্ধন সৃষ্টি হয়।


প্রেইরী ভোল জুটি (ছবি সুত্র)

স্তন্যপায়ী প্রানীদের মধ্যে সঙ্গী সঙ্গীনিদের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদী বন্ধন দেখা যায় খু্বই কম।এটি হয়তো নিয়ন্ত্রন করে সেই একই ব্রেন মেকানিজম যা মাতৃত্বের বন্ধনের জন্যও দায়ী। যেমন, স্ত্রী প্রেইরী ভোল (Prairi vole) , যারা মনোগ্যামাস বা একগামী সম্পর্কের জোড় বাধে, তাদের জুটি বাধার জন্য প্রণোদনা দেয় তাদেরে মেটিং এর সময় ব্রেনে নিঃসরিত হওয়া হরমোন অক্সিটোসিন। কোন মেয়ে প্রেইরী ভোল দ্রুত তার সবচেয়ে কাছের কোন পুরুষ প্রেইরী ভোল সাথে সম্পর্ক তৈরী করে যদি তাদের ব্রেনে অক্সিটোসিন হরমোন দেয়া হয়; এই হরমোনটি ডোপামিন নামে একটি নিউরোট্রান্সমিটার রাসায়নিক প্রদার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রিওয়ার্ড এবং রিইনফোর্সমেন্ট সিস্টেমকেই ব্যবহার করে ( ব্রেনের এই একই সার্কিট্রি ব্যবহার করে নানা ধরনের মাদক দ্রব্যগুলো যেমন সিগারেটের নিকোটিন, কোকেইন বা হেরোইন, মনে উৎফু্ল্লতা বা ইউফোরিয়া তৈরী করে, এবং আমাদেরকে এই পদার্থগুলোর প্রতি আসক্ত করে তোলে); নিউরোবায়োলজিষ্টদের কাছে যে ব্যাপারটা বিস্ময়ের, তা হলো ভোলদের জুটি বাধার সময় তাদের ব্রেনের যে অংশগুলো কাজ করে, মানুষের ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমাদের ব্রেনের একই জায়গাগুলো কাজ করে। ব্রেনে ডোপামিন সংশ্লিষ্ট রিওয়ার্ড এলাকা এলাকাগুলো সক্রিয় হয়ে যায় যখন কোন মা তার সন্তানের ছবি দেখেন, আবার ব্রেনে প্রায় একই এলাকাগুলোই সক্রিয় হয়ে ওঠে যখন কেউ তাদের ভালোবাসার মানুষদের ফটোগ্রাফ দেখে।

মানুষের জুটি বাধা প্রক্রিয়াটি হয়তো বিবর্তিত হয়েছে যে ব্রেন মেকানিজমটা মাতৃত্বের সম্পর্কর সাথে সংশ্লিষ্ট, সেই মেকানিজমটাকেই খানিকটা রুপান্তরিত করে- এই ধারনাটি মানুষের সেক্সুয়ালিটি কিছু বিশেষ বৈশিষ্টকে ব্যাখ্যা করতে পারে। যেমন, নারীদের যৌন কামনা তার উর্বরতা বা ফার্টিলিটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে বা ডিকাপলড হয়েছে এবং নারীদের স্তন পুরুষদের যৌনকামনা উদ্রেককারী অঙ্গে পরিনত হয়েছে, প্রাচীন মাতৃত্বের বন্ধনে ব্রেনের সিস্টেমগুলোকে সক্রিয় করতে। জরায়ুর মুখ এবং স্তনবৃন্তকে যৌন অন্তরঙ্গতার সময় উত্তেজিত করার প্রক্রিয়া ব্রেনে অক্সিটোসিন হরমোন নি:সরনের জন্য অত্যন্ত্য কার্যকরী এবং দু্ই সঙ্গীর মধ্যে আবেগীয় সম্পর্কটি দৃঢ় করার জন্য তা উপযোগী হতে পারে।

পুরুষদের ক্ষেত্রে জুটি বাধার প্রক্রিয়ায় মেয়েদের মত একই রকম ব্রেন সার্কিট্রি ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নিউরোকেমিক্যাল পথটা ভিন্ন। যেমন পুরুষ প্রেইরী ভোলদের ক্ষেত্রে অক্সিটোসিনের মত অন্য আরেকটি হরমোন ভেসোপ্রেসিন (Vasopressin),জোড় বাধার ক্ষেত্রে প্রনোদনা,সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দীর প্রতি আগ্রাসী মনোভাব এবং প্যারেন্টিং বা সন্তান প্রতিপালনের প্রবৃত্তি, যেমন বাচ্চাদের দেখা শোনা করা, ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় কাজ করে । ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর জিন, avpr1a এর নিয়ন্ত্রনকারী ডিএনএ অংশে কোন পরিবর্তন পুরুষ ভোলের কোন মেয়ে ভোলের সাথে জুটি বাধার প্রবনতার সম্ভাব্যতা সম্বন্ধে আগাম ধারনা বা প্রেডিক্ট করতে পারে।

একই ভাবে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ফর্মের AVPR1A ভ্যারিয়ান্ট জুটি বাধা এবং সম্পর্কের গুনগত মানকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে। একটি সাম্প্রতিক গবেষনা বলছে যে, একটি নির্দিষ্ট ভ্যারিয়ান্টের  AVPR1A জিন কোন পুরুষের তাদের ডিএনএ বহন করলে তার অবিবাহিত থাকার সম্ভাবনা, এটা যারা বহন করেনা এমন পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুন বেড়ে যায়। অথবা যদি বিবাহিত হয়েও থাকে তবে দ্বিগুন সম্ভাবনা থাকে তাদের সম্পর্কের কোন সাম্প্রতিক কোন সমস্যা উল্লেখ করার ক্ষেত্রে। এবং এই ভ্যারিয়ান্ট সহ পুরুষদের সহধর্মিনীরাও তাদের পারস্পরিক সম্পর্কে  অসুখী, এই ভ্যারিয়ান্ট নেই এমন পুরুষদের তুলনায়। ভোল কিংবা মানুষ, AVPR1A জেনেটিক বহুরুপীতা বা পলিমরফিজম নির্ধারন করে ব্রেনে কি পরিমান ভেসোপ্রেসিন হরমোন রিসেপ্টর এক্সপ্রেস হবে।

প্রাচীন কিছু নিউরোপেপটাইড আর নিউরোট্রান্সমিটারের ককটেল থেকে উদ্ভুত কোন বিষয় হিসাবে ভালোবাসাকে দেখা সমাজের জন্য কিছু গুরুত্বপুর্ন বিষয়ের অবতারনা করে। একটা ব্যাপারতো আছেই, আমাদের ব্রেনকে প্রভাবিত করার মত ড্রাগ, যা কারো প্রতি আমাদের ভালোবাসা বাড়াতে বা কমাতে পারবে হয়তো খুব একটা দুরে নেই। পরীক্ষা প্রমান করেছে যে নাকে অক্সিটোসিনে স্প্রে আমাদের অন্য মানুষের প্রতি আস্থা ও তাদের আবগের প্রতি সহমর্মী হবার সম্ভাবনা বাড়ায়। ইন্টারনেটে অনেক উদ্যোগীরা ইতিমধ্যে এ জাতীয় কেমিক্যাল বাজারজাত করেছে যেমন: Enhanced Liquid Trust, কোলোনের মত অক্সিটোসিন এবং ফেরোমোনদের একটি মিশ্রন, যার বিক্রেতা বলছে ”designed to boost the dating and relationship”  যদিও এধরনের কিছু ব্যবহারকারীদের আত্মবিশ্বাস খানিকটা বাড়ানো ছাড়া কিছুই তেমন করেনা; অষ্ট্রেলিয়ায় একটা গবেষনা চলছে সাধারন বিবাহিত দম্পতিদের ম্যারিটাল থেরাপীতে অক্সিটোসিন থেরাপি কোন ভূমিকা পালন করতে পারে কিনা।

আমরা এখনও জানিনা যে সমস্ত ড্রাগ সাধারনতঃ  ডিপ্রেশন থেকে সেক্সুয়াল ডিসফাংশান এর চিকিৎসায় আমরা ব্যবহার করে থাকি তারা কি ব্রেনের নিউকেমিষ্ট্রি বদলে দিয়ে কারো পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে কিনা। কিন্তু প্রোজাক (Prozac: Fluoxetine) এবং ভায়াগ্রা (Viagra: Sildenafil Citrate),  এই দুটি ড্রাগই ব্রেনের অক্সিটোসিন সিস্টেমটাকে প্রভাবিত করে। একারনে রোগীদের পারস্পরিক সম্পর্ককে গুনগত মানকে একটি ভ্যারিয়েবল হিসাবে যোগ করা উচিৎ, কন্ট্রোলড সাইকিয়াট্রিক ড্রাগ ট্রায়ালে। জেনেটিক ভ্যারিয়েশন যে, আমাদের রোমান্টিক সম্পর্কের গুনগত মানকে প্রভাবিত করতে পারে এমন সম্ভাবনার কিছু পরিনতি আছে। হয়তো কোন একদিন যোগ্য পাত্রপাত্রী খোজার জন্য জেনেটিক টেষ্ট পাওয়া যাবে। যে টেষ্টের ফলাফল সঠিক পার্টনার নির্বাচনে আমাদের পছন্দের পক্ষে হয়তো অবস্থান নেবে কিংবা ওভাররাইড করবে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তিকে । যাই হোক না কেন,  জুটি বাধা বা পেয়ার বন্ডিং বায়োলজীতে সাম্প্রতিক অগ্রগতির অর্থ হচ্ছে, সেই দিন খুব বেশী দুরে নেই কোন বিবেকবর্জিত কোন পাণিপ্রার্থী আমাদের পানীয়র সাথে ’Love Potion’  ঔষধ মিশিয়ে দেবে আমাদের মন জয় করার জন্য। আর যদি তারা তা করে, আমরা কি গুরুত্ব দেবো ব্যাপারটাকে আর যাইহোক সর্বোপরি ভালোবাসাতো একটা পাগলামীই।

ভিজুয়াল ইনপুট: মনের আয়নায়

বেশীরভাগ সময়ে রোমান্টিক ভালোবাসার সুচনা হয় ভিজুয়াল বা কোন দৃশ্য সংকেত বা ইনপুটের মাধ্যমে ( সহজ করে বললে কারো চেহারা), তার মানে অবশ্যই এটা না যে,অন্য ফ্যাক্টরগুলো যেমন, গলার আওয়াজ, বুদ্ধিমত্ত্বা, আকর্ষন করার ক্ষমতা বা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থান ইত্যাদি নানা বৈশিষ্টগুলো আমাদের কারো প্রেমে পড়ার ক্ষেত্রে কোন ভুমিকা পালন করে না। একারনেই নিউরোবায়োলজিষ্টরা রোমান্টিক ভালোবাসার নিউরাল কোরিলেট ( অর্থাৎ আমাদের ব্রেনের এই অনুভুতির সাথে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলো) খোজার প্রথম গবেষনাগুলো শুরু করেছিলেন ভিজুয়াল ইনপুট দিয়ে। এই গবেষনাগুলোয় দেখা গেছে যখন আমরা এমন কারো চেহারা দেখি, যাদের আমরা খুব গভীর এবং তীব্র আবেগের সাথে ভালোবাসি, যাদের প্রেমে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি, আমাদের ব্রেনের কিছু নির্দিষ্ট জায়গা বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবং ব্যপারটা ঘটে নারী পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই। এরকমই তিনটি এলাকার অবস্থান, আমাদের সেরেব্রাল কর্টেক্স এবং ব্রেনে কর্টেক্সের (উপরিভাগ) নীচের কিছু জায়গায় ( বা সাব কর্টিক্যাল) এলাকায়। এই সব জায়গাগুলো নিয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের ইমোশনাল ব্রেন, কিন্তু এর অর্থ এই না যে এরা ব্রেনের বাকী অংশ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। রোমান্টিক ভালোবাসা অবশ্যই জটিল একটা অনুভুতি, যার থেকে খুব সহজে এরই অংশ এবং আরো কিছু ইমপালস বা আবেগ, যেমন শারীরিক কামনা এবং যৌনকামনা, পৃথক করা সম্ভব না। যদিও যৌনকামনা ভালোবাসাহীন হতে পারে এবং একে রোমান্টিক ভালোবাসার আবেগ থেকে থেকে পৃথক করা সম্ভব। এই বিষয়টিকে স্বাভাবিক নিউরোবায়োজিক্যাল নিয়মের মাধ্যমেই ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব, কারন কেউ যদি এদের আবেগ পর্যায়ে পার্থক্য করতে পারে, তার কারন ব্রেনের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বা নিউরোন এই সেন্টিমেন্টগুলোর সাথে জড়িত। এই নিয়ম মাফিক, রোমান্টিক ভালোবাসা এবং এর  সাথে সংশ্লিষ্ট সব জটিলতাগুলোর সাথে জড়িত ব্রেনের অংশগুলো খুবই সুনির্দিষ্ট, এমনকি যখন তারা কাছাকাছি ধরনের বা সম্পর্কযুক্ত অন্য কোন আবেগের সাথে ব্রেনের একই অংশ ব্যবহার করে।


আমাদের ব্রেনের একটি ডায়াগ্রাম, এই আলোচনায় যে অংশগুলোর কথা বলা হয়েছে, তার কয়েকটি অংশ। সুত্র: (FEBS) Letters 581 (2007)

ভালোবাসার নিউরোকেমিষ্ট্রির একটি সংক্ষিপ্ত রুপরেখা:

কর্টেক্সের যে অংশগুলো জড়িত যেমন: মিডিয়াল ইনসুলা (insula), অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট (anterior cingulate) এবং  সাবকর্টিক্যাল এলাকার হিপপোক্যাম্পাস, স্ট্রায়াটামের কিছু অংশ এবং  নিউক্লিয়াস অ্যাক্যুমবেন্স, যারা  আমাদের ব্রেনের রিওয়ার্ড সিস্টেমের কেন্দ্রীয় অংশটা তৈরী করে। ভালোবাসার আবেগ যে তীব্র ‍আনন্দ, সুখানুভুতি বা ইউফোরিয়া, বা প্রশান্তির অনুভুতি সৃষ্টি করে তা বর্ণনাতীত। এবং ব্রেনের যে জায়গাগুলো এ ধরনের রোমান্টিক অনুভুতির সাথে সংশ্লিষ্ট সেখানে মুলতঃ অতি উচ্চ মাত্রায় ব্রেনের রিওয়ার্ড মেকানিজমের, কামনা, আসক্তি, ইউফোরিক অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট নিউরোমড্যুলেটর, ডোপামিন (dopamin) থাকে। এবং অন্য দুটি মডুলেটর যারা রোমান্টিক ভালোবাসার সাথে জড়িত, অক্সিটোসিন এবং  ভেসোপ্রেসিন (নীচে বর্ণনা) এর মত ডোপামিন নিঃসরন করে, হাইপোথ্যালামাস, এটি ব্রেনের ভিতরের দিকে থাকে, এবং এর গুরুত্বপুর্ন কাজটি হলো স্নায়ুতন্ত্র এবং আমাদের এন্ডোক্রাইন (অন্তক্ষরা গ্রন্হিদের যে তন্ত্রটি আমাদের শরীরের নানা ধরনের হরমোন তৈরী করে) সিস্টেমের মধ্যে যোগসুত্র তৈরী করা। যেহেতু এটি সেই বিবর্তিত ব্রেনের রিওয়ার্ড সিস্টেমের অন্তর্গত অঞ্চল, এই অংশগুলো কিন্ত‍ু সক্রিয় হতে পারে যদি কেউ মাদক, যেমন কোকেইন ( যা নিজেই এধরনের উৎফুল্ল মানসিক অবস্থা তৈরী করতে পারে) গ্রহন করে। ডোপামিন আমাদের ব্রেনে নি:সরিত হলে আমরা একটা ভালো লাগার (Feel good) অনুভুতি অনুভব করি। আর ডোপামিন শুধুমাত্র সম্পর্ক গড়ার স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সাথে অন্তরঙ্গ ভাবে জড়িত তা কিন্ত‍ু না, এটি যৌনতা বা সেক্স এর সাথেও জড়িত; যা কোন রোমান্টিক সম্পর্কের পরিনতির একটি সন্তুষ্ঠিকর এবং ভালো লাগার অনুশীলন বা কাজ হিসাবে গন্য করা হয়। ডোপামিন বেড়ে গেলে ব্রেনে যুগপৎ আরেকটি রাসায়নিক পদার্থর পরিমান কমে যায়, সেটি হলো আরেকটি নিউরোমডুলেটর সেরোটোনিন (5-HT বা 5-Hydroxytryptamine), যা জড়িত আমাদের মুড (মেজাজ বা মানসিক অবস্থা) এবং অ্যাপেটাইটের (ক্ষুধা) সাথে। বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা গেছে রোমান্টিক ভালোবাসার শুরুর দিকে সেরোটনিনের পরিমান যে পর্যায়ে কমে যায়, সেরকম দেখা যায়  অবসেসিস কমপালসিভ ডিসওর্ডার (Obsessisve Compulsive Disorder) এর আক্রান্ত রোগীদের যেমনটা সাধারণত দেখা যায়। ভালোবাসা, সর্বোপরি একটি অবসেশনতো বটেই, এবং এর প্রথম স্টেজগুলো সাধারনতঃ এটি সমস্ত চিন্তাকে প্যারালাইজ করে শুধু একজন ব্যাক্তি বিশেষের দিকেই চিন্তাকে প্রবাহিত করে, সেই বিশেষ একজনই আমাদের সব ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়; রোমান্টিক ভালোবাসার শুরুর দিকে আরো একটি রাসায়নিক পদার্থের সাথে সংশ্লিষ্টতা লক্ষ্য করা যায়, সেটা হলো, Nerve Growth Factor; দেখা গেছে এই রাসায়নিক পদার্থটির পরিমান যারা সম্প্রতি প্রেমে পড়েছেন তাদের ক্ষেত্রে বেড়ে যায়, যারা প্রেমে পড়েননি বা যারা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীল কোন সম্পর্কে আছেন, এমন ব্যক্তিদের তুলনায়। উপরন্তু নার্ভ গ্রোথ ফ্যাক্টরের মাত্রার পরিমান কোরিলেট করে রোমান্টিক অনুভুতির তীব্রতার সাথে, যত তীব্র ভালোবাসা, নার্ভ গ্রোথ ফ্যাক্টরের এর মাত্রাও তত বেশী।


আমাদের ব্রেনের রিওয়ার্ড  পাথওয়ে ( Modified from: Scientific American 298, 88 – 95 (2008) 

অক্সিটোসিন (Oxytocin) এবং অন্য আরেকটি রাসায়নিকভাবে সম্পর্কযুক্ত নিউরোমডুলেটর ভেসোপ্রেসিন (Vasopressin), এই ‍দুটি হরমোন আমাদে ব্রেনে বিশেষভাবে যুক্ত সম্পর্ক স্থাপন ( বা অ্যাটাচমেন্ট, বিশেষ করে মেটিং এর কনটেক্সট এ) এবং পেয়ার বন্ডিং ( মেটিং এর জন্য জুটি বাধা) এর সাথে। ‌এই হরমোন দুটো তৈরী করে হাইপোথ্যালামাস, এবং এটা জমা থাকে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী  রক্তে নি:সরন হয় পিটুইটারী গ্ল্যান্ড থেকে; বিশেষ করে দুই লিঙ্গের চরম যৌনউত্তেজনার সময় ( ওরগাজম), এবং নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান প্রসব এবং বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়ার সময়। পুরুষদের ক্ষেত্রে ভেসোপ্রেসিন কিছু সামাজিক কিছু আচরনকে প্রভাবিত করতে পারে; বিশেষ করে অন্য পুরুষদের প্রতি আগ্রাসী আচরন। এই দুটি নিউরোমডুলেটরের মাত্রা বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায় গভীর রোমান্টিক অ্যাটাচমেন্ট এবং জুটি বাধার সমসাময়িক পর্যায়ে। এদের রিসেপ্টর (কোষের উপর যে অনুটির সাথে যুক্ত হয়ে এরা নিউরোনের এর উপর কাজ করে) গুলো ছড়িয়ে আছে ব্রেন স্টেমের নানা অঞ্চলে, যারা রোমান্টিক এবং মাতৃত্বের ভালোবাসার সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে।

লক্ষ্য করার মত বিষয় হচ্ছে, যৌন উত্তেজনা বা সেক্সুয়াল অ্যারাউজাল ব্রেনের যে অংশটাকে সক্রিয় করে তার অবস্থান রোমান্টিক ভালোবাসায় সক্রিয় জায়গাগুলো কাছাকাছিএবং হাইপোথ্যালামাসের ক্ষেত্রে অবশ্য ওভারল্যাপিং হয় (একই অংশ সক্রিয় করে), এছাড়া অ্যান্টেরিয়র সিংগুলেট কর্টেক্স এবং ইতিপুর্বে উল্লেখিত আরো কিছু সাবকর্টিক্যাল এলাকা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে, রোমান্টিক ভালোবাসা এবং যৌন উত্তেজনা উভয় ক্ষেত্রেই হাইপোথ্যালামাসটা সক্রিয় হয়, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা কিংবা অ্যাটাচমেন্টের ক্ষেত্রে সেটা হয় না। সেকারনের বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এর সক্রিয়তা  রোমান্টিক ভালোবাসার মধ্যে বিদ্যমান যৌন কামনা সংশ্লিষ্ট অনুভুতিগুলোর কারন, মাতৃত্বের ঘনিষ্ঠতায় যেটা অনুপস্থিত। এছাড়া যৌন উত্তেজনা (এবং ওরগাজম) আমাদের ফ্রন্টাল কর্টেক্স ( আমাদের কগনিটিভ ক্ষমতার কেন্দ্র) একটি জায়গাকে ডি অ্যাক্টিভেট বা নিষ্ক্রিয় করে, এই জায়গাটি রোমান্টিক ভালোবাসার সময় পরিলক্ষিত ফ্রন্টাল কর্টেক্স এর নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোর সাথেও ওভারল্যাপ করে। নিউরোবায়োলজিষ্টদেরকে বিষয়টা খুব একটা অবাক করেনি কারন যৌন উত্তেজনার সময় মানুষ মাঝে মাঝে তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে (leave of their senses) এবং এমন আচরন করে ফেলে, যার জন্য হয়তো পরে অনুশোচনা হতে পারে। আসলেই, ব্রেনের ভৌগলিক অবস্থানের বিবেচনায় এই কাছাকাছি অবস্থানের বিষয়টি, একদিকে যে অংশগুলো রোমান্টিক ভালোবাসার সাথে সংশ্লিষ্ট, অন্যদিকে ব্রেন অঞ্চলগুলো যারা যৌনকামনার সাথে সংশ্লিষ্ট, কিন্তু বেশ কিছু আচরনের ব্যাখ্যা দেয়। ভালোবাসা সংক্রান্ত কোন বিশ্বসাহিত্য পড়লেই বোঝা যায় রোমান্টিক ভালোবাসার কেন্দ্রে আছে একটি কনসেপ্ট –সেটা হচ্ছে  দুজনের ঐক্য বা ইউনিটি, যে অবস্থাটা হলো এমন যেখানে, তীব্রতম আবেগের শিখরে, ভালোবাসায় কোন যুগলের কামনা একে অপরে সাথে মিশে যায় মধ্যবর্তী সব দুরত্বকে সরিয়ে। মানুষের ক্ষেত্রে ভালোবাসার মধ্যে এই ঐক্যকে পাবার মোটামুটি সবচে কাছাকাছি প্রক্রিয়াটি যেটি আছে সেটি হলো ভালোবাসার মানুষদের মধ্যে যৌনমিলন। সুতারাং গবেষনার ফলাফলটা খুব আশ্চর্যজনক নয় যে, দুটি পৃথক অথচ খুবই সংশ্লিষ্ট আচরন ব্রেনের যে অংশগুলোকে ব্যস্ত রাখে তাদের অবস্থান পাশাপাশি। আসলেই যৌনমিলনের মাধ্যমে ভালোবাসার মানুষদের এই ঐক্যকে খোজার প্রচেষ্টারা কারনও হয়তো এটি।


 উপরের ছবিতে আমাদের ব্রেনের সক্রিয় অঞ্চলগুলো দেখা যাচ্ছে (লাল এবং হলুদ রঙ), যখন গবেষনায় অংশগ্রহনকারীদের তাদের ভালোবাসার মানুষের ছবি দেখানো হয় এবং এই প্যাটার্নটির তুলনা করা হয়েছে, যখন তারা তাদের অন্য কোন বন্ধুদের ছবি দেখে সেই সময়ে তাদের ব্রেনের সক্রিয় হবার প্যাটার্নের সাথে। অ্যাক্টিভিটিটা সীমাবদ্ধ অল্প কিছু এলাকায়: ac: anterior cingulate; , cer: cerebellum; I:insula; hi: posterior hippocampus, C: caudate nucleus, P:putamen. ( সুত্র: NeuroReport,Vol 11 No 17 27 November 2000)

কর্টিক্যাল ডি অ্যাক্টিভেশণ এবং ভালোবাসার উন্মাদনা:

অনেকের কাছে অবাক লাগতে পারে যে, কোন চেহারা যা একদিন ট্রয় অভিমুখে হাজার জাহাজের যাত্রা ঘটিয়েছে শুধুমাত্র ব্রেনের অল্প কয়টি সীমিত এলাকাকে সক্রিয় করার মাধ্যমে। কিন্তু প্যারিস আর ট্রয়ের হেলেন এর গল্পই শুধু যথেষ্ঠ এদের নিউরোবালোক্যাল পরিনতিটা বোঝার জন্য, কিন্তু এই সক্রিয় হবার ব্যাপারটা আলাদা আলাদা করে দেখলে এর ইন্টারপ্রিটেশনটা অস্পষ্ট মনে হতে পারে। কারন রোমান্টিক ভালোবাসা জীবনের নানা অংশকে (প্রায় সব অংশই) প্রভাবিত করে, মানুষের জীবনকে পারে বদলে দিতে, তাদেরকে যেমন মহৎ বীরোচিত কাজ করতে উদ্ভুদ্ধ করতে পারে, তেমনি প্ররোচনাও দিকে পারে ভয়াবহ কোন খারাপ কাজ করতে। বিজ্ঞানীরা তাই সঠিক ভাবে মনে করেন, যে ব্রেনে রোমান্টিক ভালোবাসার সাথে সংশ্লিষ্ট মুল জায়গাগুলো ব্রেনের অন্যান্য জায়গাগুলোর সাথে স্নায়ুসংযোগের ক্ষেত্রে খুবই সমৃদ্ধ, এটা কর্টিক্যাল এবং সাবকর্টিক্যাল উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।  এ ধরনের সংযোগের মধ্যে অন্যতম ফ্রন্টাল প্যারাইটাল এবং মধ্য টেম্পোরাল কমপ্লেক্স, এবং টেম্পোরাল লোবের শীর্ষে বা অ্যাপেক্স এ থাকা একটি নিউক্লিয়াসের সাথেও, যার নাম অ্যামিগডালা। গবেষনায় দেখা গেছে যখনই রোমান্টিক ভালোবাসার সাথে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় এলাকাগুলো য় কোন ধরনের সক্রিয়তা বাড়ে, এই কর্টিক্যাল এলাকাগুলোর সক্রিয়তা যায় কমে যায় কিংবা পুরো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সাধারন কোন পরিস্থিতিতে অ্যামিগডালা বিশেষভাবে সক্রিয় হয় কোন ভীতিকর পরিস্থিতিতে এবং এর ডি-অ্যাক্টিভেশন, বিশেষ করে রোমান্টিক ভালোবাসায়, ভালোবাসার মানুষের মুখ দেখলে, এমন কি পুরুষদের বীর্যপাতের সময়, ইঙ্গিত করে, ভয় কমে গেছে। এছাড়া রোমান্টিক ভালোবাসার সর্বগ্রাসী আবেগ প্রতিফলিত হয় বিচার বিবেচনা  বা জাজমেন্ট করার ক্ষমতা লোপ পাওয়ার মাধ্যমে বা অন্য কোন মানুষদের  বিচার বিবেচনা করার জন্য যে মানদন্ড ব্যবহার করি তা শিথিল হয়ে যায়, যে কাজটি আমাদের ফ্রন্টাল কর্টেক্স এ। কর্টিক্যাল অঞ্চল, প্যারাইটাল কর্টেক্স, টেম্পোরাল লোবের কিছু অংশ, সাধারনত দেখা গেছে নেতিবাচক ইমোশন বা আবেগের সাথে জড়িত। রোমান্টিক এবং মাতৃত্বর ভালোবাসায় যখন ভালোবাসার মানুষের মুখোমুখি হয়, এর ডি অ্যাক্টিভেশন বা নিষ্ক্রিয় করন, সেজন্য খুব একটা বিস্ময়ের ব্যাপার না, কারন, যখন আমরা গভীরভাবে ভালোবাসি, আমরা অন্য মানুষকে যেমন ক্রিটিক্যালী বিচার করি, সেটাকে আমাদের প্রিয় মানুষের ক্ষেত্রে স্থগিত করে রাখি।


উপরের ছবিতে দেখানো হয়েছে আমাদের ব্রেনের কর্টিক্যাল (উপরিভাগের) এলাকার ডিঅ্যাক্টিভেটেড বা নিষ্ক্রিয়  (লাল এবং হলুদ রঙ) অংশগুলো, যখন গবেষনায় অংশগ্রহনকারীদের তাদের ভালোবাসার মানুষের ছবি দেখানো হয় (তুলনা করা হয়েছে যখন তারা তাদের অন্য বন্ধুদের ছবি দেখে সেই প্যাটার্নের সাথে);  যে অঞ্চলগুলো ডিঅ্যাক্টিভেটেড তারা মুলত ডান দিকের ব্রেনে:প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, মিডল টেম্পোরাল জাইরাস এবং প্যারাই্টাল কর্টেক্স।নীচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে সিংগুলেট জাইরাসের পেছনের অংশ (pc) এবং মিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (mp); বাম দিকে অ্যামিগলয়েড (A) এলাকার ডিঅ্যাক্টিভেশণ দেখানো হয়েছে। ( সুত্র: NeuroReport, Vol 11 No 17 27 November 2000);


মা র ভালোবাসা এবং রোমান্টিক ভালোবাসার সময় কর্টেক্সে এ জায়গাগুলো ডি অ্যাক্টিভেট হয় (লাল ও হলুদ রঙ); লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, উভয় ক্ষেত্রে একই জায়গাগুলোর অ্যাক্টিভিটি হ্রাস পায় বা নিষ্ক্রিয় হয়। A = amygdaloid cortex, pc = posterior cingulate cortex, mp = mesial prefrontal/paracingulate gyrus; mt = middle temporal cortex; op = occipitoparietal junction; tp = temporal pole. .( A. Bartels,S. Zeki/ NeuroImage 21 (2004) 1155–1166)

ফন্ট্রাল কর্টেক্স, প্যারাইটো-টেম্পোরাল জাংশান এবং টেম্পোরাল পোল একসাথে একটি এলাকার নেটওয়ার্ক তৈরী করে যা অবশ্যই সক্রিয় হয়ে ওঠে আমাদের ব্রেনের ‘মেন্টালাইজিং (Mentalizing)’ বা ‘থিওরী অব মাইন্ড (Theory of mind)’ প্রক্রিয়ার সাথে অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ায় আমরা অন্য কারো মনোভাব, উদ্দেশ্য বা ইনটেনশন বা আবেগ বোঝার প্রতিরক্ষা মুলক ক্ষমতা প্রয়োগ করি। লক্ষ্য করার মতো বিষয়, ভালোবাসায় একাত্মতার (unity in love) দৃষ্টিভঙ্গী থেকে দেখলে, এই থিওরী অব মাইন্ড এর মাধ্যমে মেন্টালাইজিং প্রক্রিয়ার একটি বৈশিষ্ট হলো নিজ থেকে অন্যদের আলাদা করতে পারার ক্ষমতা, যার সম্ভাব্য একটা প্রয়োগ হচ্ছে অন্যদের এবং নিজের উপর ভিন্ন ভিন্ন ধরনের বিশ্বাস এবং কামনা আরোপ করা। কল্পনার এই ভালোবাসার একাত্মতা (Unity-in-love) পাওয়ার লক্ষ্যে, যেখানে নিজের সাথে অন্যকে একীভুত করে ফেলা যায়, সেখানে এই মেন্টালাইজিং প্রসেসটি, অর্থাৎ যা নিজেকে অন্যর কাছ থেকে পৃথক রাখে, তাকে অবশ্যই নিষ্ক্রিয় করতে হবে। কিন্তু অনেক সময়ই আমরা কারো সম্বন্ধে আমাদের ক্রিটিক্যাল জাজমেন্ট স্থগিত রাখি, যখন তাদের সাথে আমাদের একটি বিশ্বাসের বন্ধন তৈরী হয়, এছাড়া মায়ের সাথে তার সন্তানের গভীর বন্ধনতো বটেই। একারনে এখানে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, সেই প্রচলিত কথা: `Love is Blind’  এর নিউরাল ভিত্তিটাই শুধু না, ভালোবাসার একাত্মতা , Unity-in-Love কনসেপ্টটির স্নায়বিক ভিত্তিটাকেও । এছাড়া এটাও কোন আশ্চর্যজনক ব্যাপার না,যখন মাঝে মাঝে কারো ভালোবাসার মানুষ বাছাই এ পছন্দ দেখে আমরা অবাক হই, বৃথাই নিজেদের জিজ্ঞাসা করি কেমন করে তারা এমন একজনকে পছন্দ করতে পারলো? কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে কিনা? আসলেই তারা কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। ভালোবাসা প্রায়শই কোন যুক্তি গ্রাহ্য করে না, কারন আমাদের ব্রেনেই যৌক্তিক বিচার বিবেচনা স্থগিত হয়ে থাকে বা  যেভাবে দৃঢ়তার সাথে অন্য কোন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার করা হয়ে থাকে সেভাবে ব্যবহৃত হয় না। প্লেটোর Phaedrus এ সক্রেটিস মন্তব্য করেছিলেন:  ‘‘the irrational desire that leads us toward the enjoyment of beauty and overpowers the  judgment that directs us toward what is right, and that is victorious in leading us toward physical beauty when it is powerfully  strengthened by the desires related to it, takes its name from this very strength and is called love’’.  প্রচন্ড ভালোবাসা তখন নৈতিক বা মোরাল কোন বিধিনিষেধও তোয়াক্কা করে না, কারন নৈতিকতা বিষয়ক কোন ধরনের বিচারবুদ্ধিও স্থগিত হয় ফ্রন্টাল কর্টেক্স এর ডি অ্যাক্টিভেশনের মাধ্যমে। তাছাড়া, মোরাল বিষয়গুলো  যদি কোন ভুমিকা পালন করেও, যেমন আনা কারেনিনা বা ফেদরে বা এমা বোভারী বা ডন গিওভানীর ক্ষেত্রে, সেটা হয়তো সামান্য কোন ভুমিকা; এবং মোরালিটির কেন্দ্রও হচ্ছে আমাদের ফ্রন্টাল কর্টেক্স।

ইউফোরিয়া বা এক ধরনের উল্লসিত অবস্থা এবং সাথে বিচার বুদ্ধি লোপ পাওয়া এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যায়, যা অনেকের কাছে মনে হতে পারে কোন পাগলামী। আর এই পাগলামীটা কবি আর শিল্পীরা লালন করে আসছেন। Phaedrus এ প্লেটো একে কাঙ্খিত উৎপাদনশীল একটি অবস্থা বলেছিলেন কারন এ ধরনের ম্যাডনেস ঈশ্বর প্রদত্ত, অন্যদিকে স্বাভাবিক অবস্থাটা শুধু মাত্র মানবিক। কিন্তু অবশ্যই , যদি এটি ঈশ্বর প্রদত্তই হতো, তাহলে যৌক্তিক পৃথিবীর বাইরে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি বা জ্ঞান দিয়ে এর কোন অর্থ খুজে পাওয়া সম্ভব হতো না। বরং হয়ত নিউরোলজিক্যাল ব্যাখ্যাটি: বিচার করার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্রেনের সেই অংশটি ডি-অ্যাক্টিভেটেড হয়, যার কারনে ভালোবাসার ক্ষেত্রে প্রায়শ দ্রষ্টব্য অযৌক্তিকতার একটি বোধগম্য প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা হতে পারে। নীচাহ লিখেছিলেন, ‘‘There is always some madness in love. But there is always some reason in madness’’; এই কারন খুজতে হবে নিউরোবায়োলজিক্যাল এক্টিভেশন আর ডিএক্টিভেশনের প্যাটার্ণের মধ্যে যা রোমান্টিক ভালোবাসার বৈশিষ্ট, যা আরো বৃহত্তর স্বার্থে বায়োলজিক্যাল কারনে এমন কি অসম্ভব কোন জুটিকেও একাত্ম করার চেষ্টা করে এবং এভাবে জীনে বৈচিত্রতার প্রবাহ নিশ্চিৎ করে। যদি, the heart has its reasons of which reason  knows nothing, এটা প্রায় পুরোটা্ই আক্ষরিকভাবে সত্যি কারন সকল যুক্তি স্থগিত হয়ে যায়। যখন ব্লেইজ প্যাসকাল একথা বলেছিলেন, তার জানা ছিল না, এই যৌক্তিকতার সবকিছু স্থগিত হওয়ার নেপথ্য কারন ফ্রন্টাল লোব ( অন্তত সাময়িকভাবে) এ ডিঅ্যাক্টিভেট বা নিষ্ক্রিয় হয়, জাজমেন্ট প্রক্রিয়াটি স্থগিত হয়। আমরা এই সুনির্দিষ্টভাবে নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে বিচার করার ক্ষমতার  স্থগিতাবস্থা থেকে একটা নিউরোবায়োলজিক্যাল শিক্ষা নিতে পারি কারন, ভালোবাসায় আচ্ছন্ন কেউ যখন তাদের ভালোবাসার মানুষের প্রতি সব ক্রিটিক্যাল জাজমেন্ট স্থগিত করে রাখেও, তারা কিন্তু অন্য সব কিছুর ব্যাপারে তাদের বিচার ক্ষমতা স্থগিত করে রাখে না, তারা কিন্তু পারে, যেমন, কোন বই বা কোন বৈজ্ঞানিক গবেষনার গুনগত মান সম্বন্ধে তাদের জাজমেন্ট ক্ষমতা প্রয়োগ করতে। তারা তাদের ভালোবাসার মানুষ ছাড়া আর যে কোন কারোর সম্বন্ধে তাদের ’থিওরী অব মাইন্ড প্রয়োগ’ করতে সক্ষম। এই জাজমেন্টটা সাসপেসনশন হয় সিলেকটিভ ভাবে, যা ভালোবাসার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট স্নায়ৃ সংযোগ এবং ব্রেনের কর্মকান্ডের পক্ষেই যুক্তি দেয়।

মা’র ভালোবাসার স্নায়বিক ভিত্তি:

নিউরোবায়োলজিষ্টদের জন্য আরেকটি ইন্টারেস্টিং ব্যাপার লক্ষ্য করেন তা হলো, রোমান্টিক ভালোবাসার সময় ব্রেনের যে অংশগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে সেই অংশ গুলোরই বেশ কিছু অংশ, যখন কোন মা তার প্রিয় সন্তানের ছবি দেখে (অন্য কোন শিশুর ছবির দেখে যা হয় তার তুলনায়),  মা’র ব্রেনেও সক্রিয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ রোমান্টিক ভালোবাসার সময় ব্রেনের সক্রিয় হবার প্যাটার্ন এবং মা’র ভালোবাসার সময় যে প্যাটার্ন হয়, তার মধ্যে বেশ ওভারল্যাপিং দেখা যায়। মায়ের ভালোবাসা এবং রোমান্টিক ভালোবাসা, দুই ধরনের ভালোবাসাই একটি কমন এবং গুরুত্বপুর্ন বিবর্তনীয় লক্ষ্য শেয়ার করে, সেটি হলো প্রজাতির রক্ষনাবেক্ষন এবং সংখ্যাবৃদ্ধি। তারা একই ধরনের ফাংশনাল লক্ষ্যও শেয়ার করে, যেখানে দুজন সদস্যকে তাদের জীবনের একটা সময়ে একসাথে থাকতে হয়, সেকারনে প্রাকৃতিক নির্বাচন এই প্রক্রিয়াগুলো হিসাব করে বেছে নিয়েছে, যা বিভিন্ন মানুষের মধ্যে দৃঢ় বন্ধন তৈরী করে, এবং একটি সুখকর অভিজ্ঞতা হিসাবে। একারনে এই দুই সেন্টিমেন্ট একই ব্রেন মেকানিজম শেয়ার করবে এতে অবাক হবার কিছু নেই। কিন্তু  আগেই উল্লেখ করা  নিউরোলজির অ্যাক্সিওম বা সুত্র অনুযায়ী, এ দুটির মধ্যে কেউ যদি পার্থক্য করতে পারে, তা কেবল সম্ভব হবে কারন ব্রেনের আলাদা আলাদা অংশ এদের সাথে জড়িত। একই ভাবে ব্রেন অ্যাক্টিভেশনের যে প্যাটার্ণ মার ভালোবাসায় দেখা যায় আর রোমান্টিক ভালোবাসায় দেখা প্যাটার্ণ এর মত হুবুহু একরকম না।একটা বিশেষ পার্থক্য হচ্ছে মায়ের ভালোবাসার ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্রেনের যে অংশগুলো মুখাবয়বের বা চেহারার সাথে সংশ্লিষ্ট সেই এলাকাগুলোর বেশী মাত্রায় সক্রিয়করণ। এটা হয়তো শিশুদের চেহারা অভিব্যক্তি বুঝতে পারার প্রয়োজনীতাটি, যার মাধ্যমে তাদের ভালোমন্দ নিশ্চিৎ করা করে ব্যাখ্যা করে, একারনে মা তার শিশুর চেহারার দিকে বিশেষ নজর দেন সারাক্ষন। আরেকটা বিশেষ পার্থক্য হলো, হাইপোথ্যালামাস, যা কিনা যৌন উত্তেজনার অন্যতম স্নায়বিক কেন্দ্র, শুধু মাত্র জড়িত থাকে রোমান্টিক ভালোবাসার ক্ষেত্রে। এই দুই ধরনের ভালোবাসা, উভয়েই যে এলাকাটিকে সক্রিয় করে তার অবস্থান স্ট্রায়াটাম (Striatum); যা আমাদের ব্রেনের রিওয়ার্ড সিস্টেমের সাথে জড়িত। রোমান্টিক ভালোবাসার মতই কোন অংশে কম না, মায়ের ভালোবাসার ক্ষেত্রেও  বিচার বুদ্ধি বা জাজমেন্ট করার ক্ষমতাটি নানা মাত্রায় স্থগিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মারা তাদের বাচ্চাদের ব্যাপারে বেশী একটু পশ্রয় দিয়ে থাকেন এবং স্বভাবত সে কারনে নিজেদের সন্তানের ভুলটা সহজে চোখে পড়ে না। আরো একবার, বিজ্ঞানী দেখলেন যে, মার ভালোবাসার সময়ও যে কর্টিক্যাল ডি অ্যাক্টিভেশন  হয় তার সাথে রোমান্টিক ভালোবাসার সময় কর্টিক্যাল ডিঅ্যাক্টিভেশন প্যাটার্নের বিস্ময়কর মিল, বিশেষ করে ফ্রন্টাল কর্টেক্স এ, যে এলাকাটি জাজমেন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট।


কোন মাকে যখন তাদের নিজেদের সন্তানের ছবি দেখানো হয়, তাদের ব্রেন এভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে ( তুলনা করা হয়েছে পরিচিত একবয়সী অন্য কারো সন্তানের ছবি দেখার সময় যে প্যাটার্ন হয় তার সাথে): aC = anterior cingulate cortex; aCv = ventral aC; C = caudate nucleus; F = frontal eye fields; Fu = fusiform cortex; I = insula; LPF = (ventral) lateral prefrontal cortex; occ = occipital cortex; OF = orbito-frontal cortex; Tha = thalamus; S = striatum (consisting of putamen, caudate nucleus, globus pallidus); PAG =periaqueductal (central) gray; SN = substantia nigra.( A. Bartels,S. Zeki/ NeuroImage 21 (2004) 1155–1166)


মা র ভালোবাসা ( হলুদ রঙ)  আর রোমান্টিক ভালোবাসার (লাল রঙ) অ্যাক্টিভেশন প্যাটার্ন। দুই ভালোবাসাই ব্রেনের বেশ কিছু একই অংশকে সক্রিয় করে । ওভারল্যাপিং গুলো লক্ষ্য করুন। aC = anterior cingulate cortex; aCv = ventral aC; C = caudate nucleus; F = frontal eye fields; Fu = fusiform cortex; I = insula; LPF = (ventral) lateral prefrontal cortex; occ = occipital cortex; OF = orbito-frontal cortex; Tha = thalamus; S = striatum (consisting of putamen, caudate nucleus, globus pallidus); PAG =periaqueductal (central) gray; SN = substantia nigra, hi: hippocampus.( A. Bartels,S. Zeki/ NeuroImage 21 (2004) 1155–1166) 


যখন মার ভালোবাসা আর রোমান্টিক ভালোবাসার অ্যাক্টিভেশন প্যাটার্নের একটি তুলনা মুলক পরিসংখ্যান করা হয়, দেখা যায় এই দুই ভালোবাসায় ওভার ল্যাপিং থাকা সত্ত্বে কিছু কিছু জায়গা বিশেষভাবে অ্যাক্টিভেটেড হয় উপরের ফ্রেমে (a: Maternal Vs. Romantic) যেমন মায়ের ভালোবাসার সময় (লেবেল করা অংশগুলো শুধু), এবং নীচের প্রেমে রোমান্টিক ভালোবাসার সময়  (b: Romantic Vs Maternal)(লেবেল করা অংশগুলো শুধু): aCv = ventral aC; C = caudate nucleus; F = frontal eye fields; Fu = fusiform cortex; I = insula; LPF = (ventral) lateral prefrontal cortex; occ = occipital cortex; OF = orbito-frontal cortex; Tha = thalamus; S = striatum (consisting of putamen, caudate nucleus, globus pallidus); PAG =periaqueductal (central) gray; SN = substantia nigra, hi: hippocampu‍s, HTh = hypothalamus; VTA = ventral tegmental.( A. Bartels,S. Zeki / NeuroImage 21 (2004) 1155–1166)

ভালোবাসার মানুষের ব্রেন কনসেপ্ট:

এটা অবশ্য বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বেশীর ভাগ মানুষেরই সে কেমন ধরনের মানুষকে  ভালোবাসবে সে সম্বন্ধে তার একটা নিজস্ব পছন্দ গড়ে ওঠে, সে কারনেই আমাদের সম্ভাব্য প্রেমিক প্রেমিকার ধারনা বা কনসেপ্ট,  অর্থাৎ যে ধরনের মানুষদের সাথে প্রেমে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। এই প্রেফারেন্সটা কিন্তু নানা ধরনের হতে পারে. আর অবশই প্রভাবিত হয় অনেক কারনে, যাদের মধ্যে, বাবা মার প্রভাব, সাংস্কৃতিক কিছু প্রবনতা, এবং কেমন মানুষের সাথে তাদের পরিচয় হয়েছে ইতিমধ্যে এবং সেই অভিজ্ঞতাগুলো ইত্যাদি। একটি সাম্প্রতিক গবেষনা চেষ্টা করেছে মেয়েদের গড়পড়তা কোন ধরনের পুরুষের প্রেমে পড়ার সবচেয়ে বেশী সম্ভাবনা থাকে; দেখা গেছে সেই পুরুষটি মসৃন চামড়ার সাদামাটা একজন মানুষ, অনেকে যে ধরনের অতি পুরুষালী বা ম্যাচো পুরুষদের মেয়েদের পছন্দ বলে মনে করেন, সে রকম কিছু থেকে অনেক ভিন্ন। পছন্দের এই কাল্পনিক বা ভার্চুয়াল পুরুষটির সবচেয়ে কাঙ্খিত গুনাবলীগুলো শুধু মাত্র তার যৌন আকর্ষনীয় ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট না, বরং সেই বৈশিষ্টগুলোও গুরুত্বপুর্ন যা ইঙ্গিত করে তার একটি কেয়ারিং মানসিকতা আছে। স্পষ্টতই স্কটল্যান্ডের সেইন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর পছন্দর এই গড়পড়তা পুরুষটি, একটি কনসেপ্ট বা ধারনারই ফলশ্রুতি, শুধু মাত্র গবেষনাটি যেখানে হয়েছে এটি সেই পরিবেশটির সীমানায় সীমাবদ্ধ। কিন্তু এই গবেষনার গুরুত্বপুর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, আমরা আমাদের ভালোবাসার মানুষ কেমন হবে সেই সম্বন্ধে আসলেই যে আমরা একটা মানসিক ধারনা বা কনসেপ্ট ধারন করি সেটাকে দেখানো। ভালোবাসার সাহিত্যকর্মের  ইতিহাসে, সম্ভবত বিষয়টি এতো বেশী গুরুত্ব পায়নি, যেমনটা পেয়েছে দান্তের সাহিত্য কর্মে,  যার মানস প্রেয়সী বিয়েত্রিস এর প্রতি ভালোবাসা পশ্চিমা সাহিত্যকর্মে একটি কিংবদন্তীর প্রেমকাহিনী। কিন্তু দান্তে  তার প্রথম সাহিত্যকর্ম La Vita Nuova (বা নতুন জীবন) এ বিষয়টি বেশ স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তিনি যা সত্যি সত্যি লিখতে চেয়েছেন তা আসলে বিয়েত্রিসকে নিয়ে না ( যার ততদিনে মৃত্যু  হয়েছে) বরং ‘‘lo gloriosa donna de la mia mente’’  বা তার মনের সেই অসাধারন রমনীকে নিয়ে লিখতে চেয়েছেন।

ভালোবাসা এবং সম্পর্কর ক্ষেত্রে আমরা আরো একটু গভীরে যেতে পারি, এবং একটা রুপরেখা দাড় করাতে পারি ব্রেনের যে রাসায়নিক পদার্থ আমাদের সেই প্রিয় মানুষটার ধারনার ভিত্তি তৈরী করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো আমরা মানুষের উপর এই কাজটা করতে পারিনি কিন্তু অন্য কোন অপেক্ষাকৃত কম জটিল প্রানীদের উপর করা সম্ভব হয়েছে,যেমন প্রেইরী ভোল,ইদুর,মারমোসেট বা বানর ইত্যাদি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে এসব প্রানীদের মধ্যে যে প্রক্রিয়াটি কাজ করে,অবশ্যই অনুরুপ কোন,শুধু আরো অনেক বেশী জটিল কোন একটি প্রক্রিয়া মানুষের মধ্যেও কাজ করে।

হয়তো এ বিষয়ে অনুসন্ধানের প্রথম ধাপটি হতে পারে,রোমান্টিক ভালোবাসার সময় ব্রেনের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোর সক্রিয় রাসায়নিক প্রক্রিয়াটি অনুধাবন করা,বিশেষ করে অক্সিটোসিন,ভেসোপ্রেসিন ও ডোপামিন। সাবকর্টিকাল এলাকা সহ ব্রেনের বেশীর ভাগ এলাকা,যেখানেই অক্সিটোসিন ও ভেসোপ্রেসিনের রিসেপ্টর পাওয়া গেছে, দেখা গেছে তারা রোমান্টিক ভালোবাসা এবং মার ভালোবাসা, উভয় ক্ষেত্রে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই নিউরো মডুলেটরগুলোর কি ভুমিকা আছে মেটিং এর জন্য জোড় বাধা বা বন্ড বা সম্পর্ক তৈরী করার ক্ষেত্রে, সেটা বুঝতে আমাদের ভরসা করতে হবে আপাতত প্রেইরী ভোলদের উপর করা গবেষনায়।

অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিনের আমাদের শরীরে আরো অনেক ধরনের কাজ করে, তবে এই্ আলোচনার জন্য যেটা প্রাসঙ্গিক সেটা হলো, তারা শুধু মাত্র বন্ডিং বা সম্পর্ক বাধার জন্যই জরুরী না, কোন কিছু শেখার প্রক্রিয়া এবং মেমোরী বা স্মৃতির সাথে জড়িত,তবে তা শুধুমাত্র সামাজিক আচরনের প্রেক্ষাপটে।এই দুটি নিউরোমডুলেটরই ব্রেনে নিঃসরিত হয় এবং মাত্রায় বেড়ে যায় যখন প্রেইরী ভোল জুটি যৌন সঙ্গম করে। খুব ঘনিষ্ঠভাবে এরা জড়িত নিউরোট্রান্সমিটার ডোপামিন এর সাথে,যা আমাদের ব্রেনের রিওয়ার্ড মেকানিজমের সাথে সংশ্লিষ্ট। যদিও প্রেইরী ভোলদের সাথে মানুষের তুলনা বহুদুর। কিন্তু মানুষ সহ নানা প্রানীর ব্রেনে অনুরুপ কর্মকান্ডের সময় এদের মাত্রা বেড়ে যাবার কারনে,বিজ্ঞানীরা মনে করছেন,মানুষের শরীরে এই কেমিক্যালগুলো রোমান্টিক এবং মাতৃত্বের ভালোবাসার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ডগুলোর সাথে বিশেষভাবে জড়িত,তার মানে অবশ্য এটাই যে এদের একমাত্র কাজ, সেটা কিন্তু না। প্রেইরী ভোলের গল্পে যে বায়োলজীক্যাল মজার ব্যাপারটি আছে সেটা হলো দুটি ভোল প্রজাতির মধ্যে ভিন্নতা:প্রেইরী এবং মনতান (Montane)ভোল। প্রেইরী ভোল প্রধানত: একসঙ্গী নির্ভর একজামী প্রজাতি ( কদাচিৎ বহুগামী),মনতান ভোল অন্যদিকে তাদের প্রকৃতিতেই বহুগামী,কোন দীর্ঘ মেয়াদী সম্পর্ক এরা গঠন করে না। নিউরোবায়োলজিষ্টরা তাদের গবেষনায় দেখেন যে, যদি প্রেইরী ভোলের  ব্রেনে এই দুটি হরমোন নিঃসরন বন্ধ করা যায়,তারাও বহুগামী হয়ে পড়ে। কিন্তু যদি প্রেইরী ভোলদের এই হরমোন দেয়া হয় কিন্তু তাদের যৌনসঙ্গম থেকে বিরত রাখা হয়,তারা কিন্তু  তাদের সঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্থ থেকে যায়,অর্থাৎ একগামী(যদিও যৌন সম্পর্কহীন)সম্পর্ক বজায় রাখে।স্বভাবতই কারো মনে প্রশ্ন উঠতে পারে যদি বহুগামী প্রকৃতির মনতান ভোলদের এই হরমোনের ইনজেকশন দিলে কি তারা একগামী,এক সঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্থ ভোলে পরিনত হবে প্রেইরী ভোলদের মত। কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম ঘটে না আসলে,মনতান ভোলদের এই ইনজেকশন দিলে তারা একগামী হয়ে যায় না। ব্যাপারটা প্যারাডক্সিক্যাল মনে হলেও একে সহজ জীববিজ্ঞানীয় দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব এবং কনসেপ্ট গঠনের ক্ষেত্রে এর বেশ প্রাসঙ্গিকতা আছে।


ব্রেনের বিভিন্ন সেকশনে অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিনের রিসেপ্টর সমৃদ্ধ এলাকা, এছাড়া দুটো প্যানেলে দুই ধরনের ভালোবাসার সময় অ্যাক্টিভেশন প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে, একটি প্যানেলে সংলিশ্ট ব্রেনের অংশগুলো দেখানো হয়েছে। C = caudate nucleus; GP =globus pallidus; hi = hippocampus; hTh = hypothalamus; P = putamen; PAG = periaqueductal (central) gray; M = nucleus of Meynert; rf = retrorubal fields/ intralaminar/subthalamic nuclei; SN = substantia nigra; Tha = lateral thalamus; VTA = ventral tegmental area, .( A. Bartels,S. Zeki/ NeuroImage 21 (2004) 1155–1166)

পিটুইটারী গ্রন্থি হতে নিঃসরিত হয়ে এই নিউরো হরমোনগুলো কাজ করতে পারে শুধু সেই কোষগুলোতে যেখানে তাদের রিসেপ্টর আছে;প্রেইরী ভোলদের ব্রেনের রিওয়ার্ড সেন্টারে ভেসোপ্রেসিন এবং অক্সিটোসিন এর রিসেপ্টরের সংখ্যা অনেক বেশী।এখনও সুষ্পষ্ট ভাবে এদের চিহ্নিত করা যায়নি কিন্তু এদের মধ্যে অনেকগুলো অংশই রিওয়ার্ড প্রসেসের সাথে জড়িত। অনেকগুলোর অবস্থান সাবকর্টিক্যাল এলাকায়। মনতান ভোলদের ব্রেনে অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর থাকে না বা থাকলেও প্রেইরী ভোলদের তুলনায় পরিমানে অনেক কম। সেকারনে মনতান ভোলদের এই বাড়তি দুই হরমোন ইনজেকশন দিলেও তাদের একগামীতে পরিণত করে না, কারন তাদের রিওয়ার্ড সেন্টারে যথেষ্ঠ পরিমান রিসেপ্টরই থাকেনা, যেখানে কিনা এই হরমোন অনু সংযুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। তার অর্থ এখানে দেখা যাচ্ছে, এই হরমোন দুটি যারা বন্ড বা সম্পর্ক গঠনের ভুমিকা রাখে, যা বিভিন্ন পরীক্ষায় জোরালো প্রমান পাওয়া গেছে,তারাই এই ভোলদের বিশ্বস্থ ও একগামী রাখে এবং তাদের রিসেপ্টরের অনুপস্থিতি এদের আরেক প্রজাতিকে করে বহুগামী।এই হরমোনগুলো মানুষের ক্ষেত্রে কি একই ভাবে কাজ করে কিনা তা নিয়ে ‍এখনও গবেষনা চলছে (কিছু রিসেপ্টর ভ্যারিয়ান্টের কথা এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে); এবং যদি তা করে ব্যাপারটা বিস্ময়কর হবে,বিশেষ করে যখন মানুষের ব্রেনের গঠন যখন ভোলদের তুলনায় বহুগুন জটিল। তাসত্ত্বেও খুব একটা অবাক বিষয় হবে না যদি ভোলদের ব্রেনের মধ্যে মানুষের রোমান্টিক এবং যৌন প্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করতে পারে এমন একটি আদি বা ভেস্টিজিয়াল সিস্টেম খুজে পাওয়া যায় ভবিষ্যতে। মানুষকে প্রায়,এবং ভুলবশত একগামী প্রানী মনে করা হয়। কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদের হার,বিবাহ বহির্ভুত সম্পর্ক ও আরো কমবেশী গোপন বা আকস্মিক সম্পর্ক,এছাড়া দেহ ব্যবসা  আর পর্নোগ্রাফি রম রমা ব্যাবসা কিন্তু অন্য কথা বলে। অবশ্য এর অর্থ এই না যে মানব জাতির মধ্যে অনেকেই একগামী সম্পর্ক বা সিরিয়াল একগামী সম্পর্ক বজায় রাখে না। নিউরোবায়োলজিষ্ট স্পষ্টতই জানার জন্য আগ্রহী এবং চেষ্ঠা করছেন,মানুষের মধ্যে যারা একগামী সম্পর্ক বজায় রাখে তারা তাদের বহুগামী অন্যান্য সদস্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশী পরিমান অক্সিটোসিন বা ভেসোপ্রেসিন হরমোন তৈরী করে কিনা এবং একগামীদের ব্রেনের রিওয়ার্ড সেন্টারে এই হরমোনগুলোর বেশী পরিমান রিসেপ্টর আছে কিনা।মানুষকে তার সম্পর্ক স্থাপনের ব্যাপারে তিনটি বা আরো বেশী শ্রেনীতে ভাগ করা যেতে পারে:যা শুরু বেশী মাত্রায় বহুগামীতা বা প্রমিসকিউয়াস থেকে কঠোরভাবে একগামী অবধি আর নানা রেন্জের এই পার্থক্যগুলো নির্ভর করে ভেসোপ্রেসিন আর অক্সিটোসিনের রিসেপ্টরের বিস্তৃতির উপর, আর বিজ্ঞানীরা দেখেছেন মানুষ কিংবা ভোল, প্রজাতি হিসাবে যত দুরবর্তী হোক না কেন, প্রজাতির প্রত্যেক সদস্যদের মধ্যে এই রিসেপ্টরের সংখ্যায় ব্যাপক ভিন্নতা আছে।

অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিন,কোন প্রানী কেমন সঙ্গী বা সঙ্গীনির সাথে থাকতে চায় তার একটা ধারনা তৈরীতে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে,অন্তত প্রেইরী ভোলদের চিন্তার জগতে। এবং তারা এই কাজটি করে সুনির্দিষ্ট গন্ধর মাধ্যমে তাদের মেটিং সঙ্গীর একটি স্পষ্ট এবং শক্তিশালী প্রোফাইল তৈরী করে; যখন এই কনসেপ্টটা তৈরী হয়,এই গন্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট পোফাইলটা বেশ দীর্ঘ স্থায়ী হয়।এই গন্ধটা কোন একটি নির্দিষ্ট সঙ্গীর সাথে সুখকর দেখা সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার সাথে স্থায়ীভাবে জড়িত হয়। এটি একইভাবে ভিজুয়াল (দৃশ্যগত) ডোমেনেও কাজ করে,যেমনটা দেখা গেছে ভেড়াদের মধ্যে,যখন কোন শিশু ভেড়ার উপস্থিতিতে মা ভেড়ার ব্রেনে অক্সিটোসিন নিঃসরিত হলে,মা ভেড়াটি তাদের চোখে দেখার মাধ্যমে চিনতে পারে শিশুটি চিনে নেয়,এবং শিশুটির মায়ের মতো আচরন করে শিশু ভেড়াটা বড় না হওয়া পর্যন্ত। ইদুরদের মধ্যে গবেষনায় দেখা গেছে যদি এই দুই নিউরোমডুলেটর যে কোন একটার জিন জেনেটিক ইন্জ্ঞিনিয়ারিং এর মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে দেয় ইদুরের জন্মের আগেই,ইদুরটি অন্য যে ইদুরদের সাথে দেখা হবে তাদের সম্পর্কে কোন প্রোফাইল বা কনসেপ্ট তৈরী করতে পারেনা। পুরোপুরি স্মৃতিভ্রংশ হবে তারা এ ক্ষেত্রে এবং সেকারনেই বহুগামী হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন খুব বেশী বাড়াবাড়ি হবে না যদি বলা হয়,নিউরোকেমিক্যালের মধ্যস্থতায় ঘটা অভিজ্ঞতাগুলোর পুরোপুরি বৈশিষ্ট আছে কনসেপ্ট গঠনের প্রক্রিয়ায়,যদিও এই কনসেপ্ট গঠন একেবারে প্রাথমিক মুল এবং রাসায়নিক পর্যায়ে। কিন্তু কোন স্বতন্ত্র সদস্যের বিষয়ে আমাদের ব্রেনে কনসেপ্টটি মুলত তৈরী হয় সাক্ষাৎকার এবং যৌনমিলনের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে,যা জন্মের পরে ঘটে,এবং এর সাথে জড়িত সুখকর,উপভোগ্য একটি অভিজ্ঞতা সঙ্গী বা সঙ্গীনির সাথে যার একটি সুনির্দিষ্ট গন্ধ আছে।

ভালোবাসা এবং সৌন্দর্য:

আমরা সাধারনতঃ জানি, ভালোবাসার অনুভুতি সৃষ্টি করার জন্য  সম্ভবত নিশ্চিৎ একটি উপায় হচ্ছে সুন্দর মখাবয়ব।ঐতিহাসিক কাল থেকেই,সেই প্লেটোর সময় থেকে ভালোবাসার পথকে বর্ণনা করা হয়েছে সুন্দরের মধ্য দিয়েই। দান্তে বিয়েত্রিসকে ভালোবেসেছিলেন কারন বিয়েত্রিস তার কাছে ছিল অনিন্দ্য সুন্দরের উপমা; কৃষ্ণ তার সৌন্দর্য দিয়ে মন চুরি করে নেয় কিংবা মজনু,লাইলীর সৌন্দর্য এ বিমোহিত হয় প্রেমে,যদিও সে অনেকের চোখেই সুন্দর নয়:মজনু তার উত্তরে বলে,আমার চোখ ধার করে দেখো।কামনা থেকে সৌন্দর্য আর ভালোবাসার অবস্থান খুব একটা দুরে না,আর বেশীর ভাগ তীব্রতম ভালোবাসার সাথে দৃঢ় ভাবে জোড় বেধে আছে যৌন বাসনার। কারন এই দুটি অভিজ্ঞতাই ব্রেনের একই অংশ শেয়ার করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একটি আকর্ষনীয় চেহারা,যৌন উত্তেজনা এবং সেই সাথে ভিজুয়াল সৌন্দর্য এর কোন অভিজ্ঞতায় ব্রেনের এমন কিছু অংশকে জড়িত করে যার নাম অরবিটো ফ্রন্টাল কর্টেক্স। রোমান্টিক ভালোবাসায় দুটি ক্ষেত্রেই শুধু এই একটি ব্রেণের কমন অঞ্চল সক্রিয় করে তা কিন্তু না।ভালোবাসার মানুষের চেহারা দেখলে দুটি কর্টিক্যাল অঞ্চল সক্রিয় হয়,ইনসুলা আর অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট এবং একই কাজ করে যৌন উদ্দীপক কোন ছবি।  আকর্ষনীয় কোন চেহারা, এছাড়া প্রিয়জনের মুখচ্ছবি শুধুমাত্র ফ্রন্টাল কর্টেক্সকেই ডি অ্যাক্টিভেট বা নিষ্ক্রিয় করেনা,অ্যামিগডালাকেও নিষ্ক্রিয় করে (আগে উল্লেখ করা হয়েছে ভালোবাসার মানুষের ছবি দেখলে অ্যামিগডালা ডি অ্যাক্টিভেট হয়); যা ‌ইঙ্গিত করছে,ভালোবাসার বা কাঙ্খিত মানুষের ছবির দিকে তাকালে আমাদের ক্রিটিক্যালী বা সমালোচনামুলক জাজমেন্ট করারা ক্ষমতাই শুধু কমে না,এছাড়া সেই আদিম কৌতুহল,অজানা আশঙ্কা যা ব্যবহার আমরা অন্য কোন অপরিচিত চেহারার মধ্যে বিভ্রান্তি বা অস্বস্তিকর কিছুর চিহ্ন খুজি সেটাও স্থগিত থাকে। এছাড়া অরবিটো-ফ্রন্টাল কর্টেক্স  যুক্ত থাকে অ্যামিগডালা এবং আরো বেশ কিছু কর্টিক্যাল এবং সাবকর্টিক্যাল এলাকার সাথে যেমন অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স,প্যুটামেন,কডেট নিউক্লিয়াই,যা রোমান্টিক ভালোবাসার অভিজ্ঞতার সময় সক্রিয় হয়।সে কারনে ভালোবাসা আর সৌন্দর্যের ঘনিষ্ট এক্সপেরিমেন্টাল সম্পর্কর কারন বিজ্ঞানীরা মনে করছেন সম্ভবত ব্রেনের এই অংশগুলোর অন্তরঙ্গ অ্যানাটোমিকাল অবস্থান এবং সংযোগ,যারা এই দুটি অভিজ্ঞতার সাথে জড়িত। এদের অ্যানাটোমিক্যাল লিঙ্কটি এতই ঘনিষ্ট যে এই অভিজ্ঞতাগুলোকে আলাদা করা সম্ভব হয়না।

পরিশিষ্ট:

নিউরোবায়োলজিষ্টরা এ বিষয়ে ক্রমাগত গবেষনা করে যাচ্ছেন,বিশেষ করে পেয়ার বন্ডিং এর ব্যাখ্যা খুজতে। গবেষনায় পাওয়া এসব নানা তথ্যগুলো আমাদের ভালোবাসা নামের বিবর্তনের এই মহা শক্তিশালী কৌশল এর স্নায়বিক ভিত্তিটা বুঝতে সাহায্য করে যাচ্ছে। বিবর্তনের এই কৌশলটি প্রজাতির বংশবৃদ্ধি এবং রক্ষনাবেক্ষনের কাজটিকে আমাদের জন্য একটি গভীর আনন্দময় এবং সুখকর অভিজ্ঞতায় রুপান্তরিত করেছে,যা নিশ্চিৎ করেছে প্রজাতির অব্যাহত অস্তিত্ব রক্ষার প্রক্রিয়াটি।

শেষ করি ডঃ জেকি ‘র একটি মন্তব্য দিয়ে: Yet the biological  study of love, and especially romantic love, must go beyond and look for biological insights that can be derived from studying the world literature of love, and thus bring the output of the humanities into its orbit.  


ভালোবাসায় আমাদের ব্রেন: সুত্র: Scientifi c American, February 2011 /Graphics by James W. Lewis, West Virginia University (brain), and Jen Christiansen)

Advertisements
ভালোবাসা, নিউরোবায়োলজী কি বলে….

26 thoughts on “ভালোবাসা, নিউরোবায়োলজী কি বলে….

  1. Let me not to the marriage of true minds

    Admit impediments. Love is not love

    Which alters when it alteration finds,

    Or bends with the remover to remove:

    O no! it is an ever-fixed mark

    That looks on tempests and is never shaken;

    It is the star to every wandering bark,

    Whose worth’s unknown, although his height be taken.

    Love’s not Time’s fool, though rosy lips and cheeks

    Within his bending sickle’s compass come:

    Love alters not with his brief hours and weeks,

    But bears it out even to the edge of doom.

    If this be error and upon me proved,

    I never writ, nor no man ever loved.

    ~ William Shakespeare

  2. Love has no other desire but to fulfill itself.
    But if you love and must needs have desires, let these be your desires:
    To melt and be like a running brook that sings its melody to the night.
    To know the pain of too much tenderness.
    To be wounded by your own understanding of love;
    And to bleed willingly and joyfully.
    To wake at dawn with a winged heart and give thanks for another day of loving;
    To rest at the noon hour and meditate love’s ecstasy;
    To return home at eventide with gratitude;
    And then to sleep with a prayer for the beloved in your heart and a song of praise upon your lips.

    ~Kahlil Gibran on Love

  3. লেখাটা পড়ছি আর একটা ব্যাপার বারবার মাথায় ঘুরে ফিরে আসছে। ভুল না ঠিক জানিনা। মানুষ প্রথমে অজানাকে নিয়ে কল্পনা সাজায়। কল্পনা থেকে হয়ত বিশ্বাস। বিশ্বাস থেকে দর্শন। প্রতিটাই কোননা কোনভাবে অজানাকে ব্যাখ্যা করছে। এটুকু পর্যন্ত ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ রোমান্টিকই মনে হয়। বিজ্ঞানের জন্ম এর মাঝে ঠিক কখন বলতে পারিনা। কিন্তু যখন বিজ্ঞান আসে আর একের পর এক সবকিছু ব্যাখ্যা করা শুরু করে তখন এবং ঠিক তখন থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারটায় বাকিদের(কল্পনা, বিশ্বাস আর দর্শন) প্রয়োজনটা আর কোথায় থাকে? একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত হয়তবা তারা পথ দেখিয়েছিল, এরপর?

    সবকিছুকে ভেঙ্গে শেষ পর্যন্ত ইলেক্ট্রন প্রোটন আর নিউট্রনই মিলছে। এরিস্টোটোলের (?) আগুন পানি মাটি মতবাদ আজ অসার। তেমনি ভালোবাসার জন্য প্লেটোনিক কনসেপ্টের আজ প্রয়োজনটা কোথায়? বিজ্ঞানই তো ভালোবাসার ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

    এন্থনি এশলি কুপারের মত দার্শনিকেরা হয়ত বলবেন, শুধু বিজ্ঞান দিয়ে এগুলোকে বিচার করাটা একচোখা, অসম্পূর্ণ। কিছু ব্যাপার আছে যেগুলোকে দেখতে হবে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে। সে দৃষ্টিকোনটা এক্সপেরিমেন্ট নির্ভর নয়। আবেগ অনুভূতি নির্ভর। হয়ত তার মাঝে আছে ভালোবাসা, সৌন্দর্য, মানবতা এমনকি বিশ্বাসও। হয়ত আমরা মানুষ বলেই। সবসময় লজিকের ধার ধারি না। যেকারণে গাণিতিক হিসেব মিললেও একজন সুস্থ মানুষের দেহ থেকে পাঁচটা অঙ্গ কেটে নিয়ে পাঁচজন মৃতপ্রায়কে বাঁচাই না হয়ত অনেকটা একই কারণে ভালোবাসার মত ব্যাপারকে আমরা চেষ্টা(!) করি বিজ্ঞানের বাইরে গিয়ে দেখতে।

    কিছুদিন পর দেখা যাবে (অথবা হয়ত এরই মধ্যে হয়ে গেছে ব্যাপারটা), বিজ্ঞান একসময় বিশ্লেষণ করে দেখাবে কেন এ ধরনের আবেগিক ব্যাপারগুলোতে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণটাই বড় কথা নয়।

    1. মাসুম, কষ্ট করে পড়েছো পুরোটা, এতে আমার কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছে, এছাড়া তোমার প্রশ্নও নতুন করে ভাবায়। বিজ্ঞান চেষ্টা করে সব কিছুর স্বপক্ষে এমপিরিক্যাল এভিডেন্স সংগ্রহ করতে। মানুষের বোঝার ক্ষমতায় যখন ওভসারভেশন আর এক্সপেরিয়েন্স এ যুক্ত হয়েছে তখন থেকে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানকে প্রতিদ্বন্দী মনে করলেও বিজ্ঞান কিন্তু কোন প্রতিযোগিতায় নেই্।বিজ্ঞান এর ও দর্শন আছে। এছাড়া দর্শন বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহারটাকে নিশ্চিৎ করে। নতুন প্রজন্মের দার্শনিকরাও এখন এম্পিরিক্যাল প্রমান খুজছেন। ভালোবাসার কি সব ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব, এখানে ব্রেনের কিছু কোরিলেট খোজা হয়েছে, ব্রেনের হরমোনগুলোর কাজ বোঝার চেষ্টায়। নিউটন রঙধনুর রহস্য খুজে বের করেছিলেন কিন্তু তার মুগ্ধ করার ক্ষমতা কমে যায়নি। আমাদের সমস্ত অনুভুতির কেন্দ্রই তো ব্রেন আর সেটা অসীম জটিল একটা অঙ্গ। যে কোন দৃষ্টিকোন দিয়েই যে কোন বিষয়কে বোঝা সম্ভব বিজ্ঞানও তাই করে।

    2. ভালোবাসার প্লেটোনিক ব্যাপারটা তোমাকে ভাবিয়েছে বুঝতে পারছি; রোমান্টিক ভালোবাসার একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ ডেসায়ার, কারন হিসাবে ব্যাখ্যা এসেছে ব্রেনের অংশগুলো কমবেশী একসাথে সক্রিয় হয়। এটা একটা ওবজারভেশন। আমি রোমান্টিক ভালোবাসায় ডেসায়ার থাকে না এটা ভাবতে পারি না। কিন্তু ভালোবাসার তো রকম ফের আছে, অনেকে হয়তো ভাবতে পারে।

  4. ”মায়ের ভালোবাসার ক্ষেত্রেও বিচার বুদ্ধি বা জাজমেন্ট করার ক্ষমতাটি নানা মাত্রায় স্থগিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মারা তাদের বাচ্চাদের ব্যাপারে বেশী একটু পশ্রয় দিয়ে থাকেন এবং স্বভাবত সে কারনে নিজেদের সন্তানের ভুলটা সহজে চোখে পড়ে না।”
    -আমার ধারনা কর্টিক্যাল ডিএক্টিভেশন হবার পরও কাগজে কলমে সন্তানের ভুল ধরবার সম্ভাবনা কিছু কিছু ক্ষেত্রে কম হয়না। কারণ মা স্বাভাবিকভাবে চাইবেন সন্তানের ভালো ভবিষ্যত। সে ভালো একটা মানুষ হোক। সেহিসেবে আবার হয়ত ব্রেনের যে অংশটা সন্তানের ভবিষ্যত সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করছে তার প্রভাবে সন্তানের দোষগুলোর প্রতি বিশেষ মনযোগী হবেন, যাতে ভবিষ্যতের স্বার্থে এগুলো কমে যায়। এটা শুধু আমার ধারনা মাত্র। বিজ্ঞান কি বলে এ ব্যাপারে?

    আর আরেকটা প্রশ্ন, আমরা কি চাইলে বা চেষ্টা করলে ব্রেনের স্বাভাবিক ইন্সটিঙ্কটগুলোকে ম্যানিপুলেট করতে পারি? প্রশ্নটা ঠিক পরিষ্কার করতে পারলাম কিনা বুঝতে পারছি না। …যেমন ধরুন, কারো মনের মাঝে ঈর্ষা আছে। সে আস্তে আস্তে মনকে বুঝানো শুরু করলে ব্যাপারটা ভালো না, খারাপ। এটা সরিয়ে দিতে হবে মন থেকে। তার স্থানে ভালো কিছু নিয়ে আসতে হবে। সম্ভব এমনটা?

    1. অবশ্যই সম্ভব, আমরা সেটা মাঝে মাঝে করি, একসময় আরো ম্যানিপুলেট করা সম্ভব হবে। কিন্তু আমরা কোন টা করবো আর করবো না এই বিতর্ক থাকবে এথিক্স এ, অর্থাৎ দর্শনে। দার্শনিকদের তাহলে মুক্তি নেই 🙂

      1. 🙂

        ..

        ওহ, একটা উত্তর তো মনে হচ্ছে পাইনি এখনো, ”মায়ের ভালোবাসার ক্ষেত্রেও বিচার বুদ্ধি বা জাজমেন্ট করার ক্ষমতাটি নানা মাত্রায় স্থগিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মারা তাদের বাচ্চাদের ব্যাপারে বেশী একটু পশ্রয় দিয়ে থাকেন এবং স্বভাবত সে কারনে নিজেদের সন্তানের ভুলটা সহজে চোখে পড়ে না।” এটা নিয়ে যে প্রশ্নটা করেছিলাম। হয়ে থাকে ব্যাপারটা?

  5. ওহ, আসল কথাটাই বলা হয়নি,

    দারুণ ভালো লাগলো পোস্টটা। সত্যি বলতে কি শতভাগ আমার পক্ষে বুঝা সম্ভব না যদিও। তারপরও প্রয়োজনীয় অনেক কিছু জানার মত আছে। কিছু কিছু অংশ পড়ে মনে হয়েছে ব্যর্থ প্রেমিকদের পড়ে শুনানো যেতে পারে সেগুলো, যদি তারা এতে কিছুটা মানসিক শান্তি খুঁজে নিতে পারে। আবেগ! শেষ পর্যন্ত এটাও তো রসায়নের কারসাজি। 😛

    1. অবশ্যই কেমিক্যাল ব্যাপার..ব্রেনের মধ্যে নানা কারসাজি, কিন্তু সেটা কাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রন করবে সেটাই ব্যাপার

    2. ব্যর্থ প্রেমিক/া রা কোনো কিছুতেই সান্ত্বনা পাবে না : ( …. ‍এর কোরো ব্যাখ্যা নেই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই…

  6. ”মাসুম, কষ্ট করে পড়েছো পুরোটা, এতে আমার কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছে,”
    কষ্টের কিছু নেই। আমি জানি কোন ব্যাপারটা আমার দরকার। ২০১১ এর বড় একটা প্রাপ্তি হিসেবে বলতে পারি, জানার আগ্রহটা বেড়েছে এ সময়ে। আর তাঁর জন্য দুজন মানুষের কাছে ঋণী। তাঁদের সাথে পরিচয়টাও এ বছরেই। কোন দুজন সেটা আর নতুন করে বলে না দিলেও চলে।

  7. অনেক গভীর লেখা। ভাবনাটা নড়েচড়ে বসেছে। প্রেম স্বর্গীয় অনুভূতি ঠিকই একই সঙ্গে নিউরোকেমিক্যাল বাস্তবতাও। ধন্যবাদ 🙂

  8. EduTalk বলেছেন:

    ভালবাসা কি? কে তৈরি করে :
    ভালবাসার আছে তিনটি পর্যায় আর এ পর্যায়ে দেহের বিভিন্ন অংশ ভুমিকা পালন করলে ও Heart এর ভুমিকা প্রায় নেই বললেই চলে।। বিস্তারিত জানতে ভিডিওটি দেখে আসুন।।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s